The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৪, ১১ মাঘ ১৪২০, ২২ রবিউল আওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বিশ্ব ইজতেমা শুরু, তুরাগ তীরে মুসল্লিদের ঢল | ইজতেমা প্রাঙ্গণে ২ মুসল্লির মৃত‌্যু | বিএনপিকে নাকে খত দিতে হবে : আমু | দশম জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ হলেন আ স ম ফিরোজ | দখলকারী শক্তি পরাভূত হবেই: খালেদা জিয়া

দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাবেশ

 জাকির হোসাইন আজাদী

ভারতবর্ষের মুসলমানদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে তাবলিগ জামাতের শুভ সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাধক হযরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) দাওয়াতে তাবলিগি জামাতের পুনর্জাগরণ ঘটান। তত্কালীন ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ পার্শ্বস্থ এক জনবিরল নীরব অঞ্চল 'মেওয়াত'। চারিত্রিক বিপর্যস্ত ধর্ম-কর্মহীন, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নামেমাত্র মুসলমান 'মেও' জনগোষ্ঠীকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ও কালেমার দাওয়াতি মর্ম শিক্ষাদান এবং বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষে হযরত মাওলানা ইলিয়াস (র.) বিশ্বব্যাপী এ তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জনগণের বৃহত্তর অংশে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সুদৃঢ়করণ ও তার বাস্তব অনুশীলন না হলে মানব সমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। বরং সাধারণ মানুষের জীবনে দ্বীন ইসলাম না আসলে মুমিন হতে পারে না। ১৩৪৫ হিজরিতে দ্বিতীয় হজ থেকে ফিরে এসে তিনি তাবলিগি গাশ্ত শুরু করলেন, জনসাধারণের মাঝে কালেমা ও নামাজের দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাবলিগ জামাত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন, এভাবে গ্রামে গ্রামে কাজ করার জন্য জামাত তৈরি করে দিতেন। কয়েক বছর মেওয়াতে এ পদ্ধতিতে কাজ অব্যাহত থাকলো।

১৩৫২ হিজরিতে তৃতীয় হজ পালনের পর তিনি বুঝতে পারলেন যে, গরিব মেওয়াতী কৃষকদের পক্ষে দ্বীন শেখার সময় পাওয়া কষ্টকর। ঘর-সংসার ছেড়ে মাদ্রাসায় দ্বীন শেখাও অসম্ভব। ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পাল্টে দেওয়া বা জাহেলি বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তাই একমাত্র উপায় হিসেবে তাদের ছোট ছোট জামাত আকারে ইলমি ও দ্বীনী মারকাযগুলোতে গিয়ে সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে আরম্ভ করলেন। সেই ধর্মীয় মজলিসে উলামা-মাশায়েখদের ওয়াজ-নসীহতের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মনীতি বাতলে দেওয়া হতো। দ্বীনদার পরহেজগার লোকদের জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চালচলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। ধর্মীয় মৌলিক বিশ্বাস ও ইবাদতের অনুশীলনের পাশাপাশি তিনি মুসলমানদের অনুসৃত প্রধান ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনের প্রয়োজনীয় কিছু সূরা-কেরআত শিক্ষাদান, দোয়া-দরুদ, জরুরী মাসআলা-মাসায়েল ও ফাতওয়া সম্পর্কে অবহিত করে তার তাবলিগি জামাতকে একটি ভ্রাম্যমাণ মাদরাসাতে রূপান্তরিত করেন। এভাবেই পর্যায়ক্রমে তাবলীগের বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটে।

উল্লেখ্য, শুরুতে তাবলিগি কাজ ব্যাপক সমর্থন পায়নি। ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এ ব্যাপারে মহান সাধক হযরত মাওলানা ইলিয়াস (র.) অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠা, ধৈর্য, পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা অপরিসীম ভূমিকা রাখে। মাওলানা ইলিয়াস শাহ আখতার (র.) সারা জীবন পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে এই দাওয়াত ও তাবলিগি জামাত তথা বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্যের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমাকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক সুদৃঢ় মজবুত ও শক্তিশালী অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি স্থাপন করে ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই ৫৯ বছর বয়সে ইহকাল ত্যাগ করেন। সারা বিশ্বের লাখ লাখ দ্বীনদার মুসলমান আলোর পথের দিশারী এই মহান সাধককে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

তাঁর ইন্তেকালের পর বিশ্ব মুসলিম ঐক্য ভ্রাতৃত্বের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় প্রধান মুবাল্লিগ নিযুক্ত হন তাঁর সুযোগ্য পুত্র হযরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবী (র.)। তিনি তাবলীগের দাওয়াতী জামাতকে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছিয়ে থাকেন। এই তাবলিগের দাওয়াতের সূত্র ধরেই মুসলিম ঐতিহ্যের স্পেনের মাটিতে ৫০০ বছর পর মসজিদের মিনারায় আজানের সুমধুর আওয়াজ ধ্বনিত হয়। দ্বিতীয় আমির মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবী (র.)-এর যুগে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এর আন্দোলন সবচেয়ে বেশী ও শক্তিশালী ছিল। বার্ষিক ইজতেমার প্রয়োজন অনুভব করে হযরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবী (র.) মুরুব্বীদেরকে নিয়ে পরামর্শ বৈঠকে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি সোনার বাংলাদেশের নাম বেরিয়ে আসে। উল্লে¬খ্য, তাবলিগ জামাতের সদর দফতর দিল্লি¬তে থাকা সত্ত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া হয়। কথিত আছে, তাবলিগ জামাতের মুরুব্বিদের বৈঠকে ইজতেমার স্থান নির্ধারণের জন্য নাকি লটারি হয়েছিল। সেই লটারিতে বাংলাদেশের নাম ওঠে। আর সেই থেকেই বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় সর্ববৃহত্ সমাবেশ ও মহাসম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকাস্থ কাকরাইল মসজিদে। আল্লাহ তাআলা বিশ্ব ইজতেমার জন্য বাংলাদেশকে কবুল করেছেন। এটি আমাদের দেশের জন্য পরম রহমত ও করুণার ঝর্ণাধারাই বটে।

অবশ্য মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (র.)-এর নির্দেশে হযরত মাওলানা আব্দুল আযীয (র.)-এর মাধ্যমে ১৯৪৪ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের মেহনত শুরু হয়। প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লীর নিযামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়ার নূহ মাদ্রাসায় আয়োজন করা হয়। এ ইজতেমায় প্রায় ২৫০০০ তাবলিগ দ্বীনদার মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। এভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে মেওয়াতের বিভিন্ন শ্রেণীর কিছু মানুষের কাছে দ্বীনের কথা প্রচারের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী তাবলিগি জামাতের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলিগি জামাতের বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তত্কালীন হাজি ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রতি বছর ইজতেমার অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। ঐ বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশগ্রহণ করায় 'বিশ্ব ইজতেমা' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী বছর অর্থাত্ ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি (২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে) বিশ্ব ইজতেমা টঙ্গীর তুরাগ নদীর উত্তর-পূর্ব তীর সংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুম দখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

দেশ-বিদেশের মুসলমানদের মিলন কেন্দ্র এই বিশ্ব ইজতেমা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য তাবলিগি মুরুব্বিগণ স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর কাছে রাজউকের এ জায়গাটি তাবলিগি জামাতের অনুকূলে বরাদ্দের জন্যে এ দাবী জানিয়ে আসছিল। অবশেষে ১৯৯৫ সালের তত্কালীন সরকার তাবলিগি মুরুব্বিদের সাথে আলোচনা করে রাজউকের ১৬০ একর জায়গা তাবলিগি জামাতদের ব্যবহারের সুযোগ করে দেন। ফলে তাবলিগি জামাতের দুর্ভোগ ও ভোগান্তির সমাপ্তি ঘটে এবং তাদের প্রত্যাশাও পূরণ হয়। তারপর থেকে উক্ত জায়গা আরও উন্নয়নের জন্য সরকারী-বেসরকারী সংস্থাসহ সবাই সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিশ্বের প্রায় ৫০/৫৫টি দেশের তাবলিগি দ্বীনদার মুসলমান জামাতসহ প্রায় ২৫/৩০ লক্ষাধিক মুসল্লি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইসলামী মহাসম্মেলন বা বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেন।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'এই সরকারের আয়ু এক বছরও হবে না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
9 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৪
ফজর৪:৪৩
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :