The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি

বাঙালির সেক্যুলার বাতিঘর

দিব্যদ্যুতি সরকার

সমপ্রতি বদরুদ্দীন উমরের 'পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি' বইটি পড়া হলো। বইটি তিন খণ্ডে বিভক্ত। ছাত্রজীবনে নোট করার জন্য এবং পরবর্তী পর্যায়ে গবেষণার কাজে ফুটনোট তৈরিতে বইটির কোনো কোনো অংশ একাধিকবার কাজে লেগেছে। কিন্তু তখন ভালো সার্টিফিকেট পাওয়ার তাড়না ছিল, ফলে পরীক্ষার বছর ওসব খুব ভালো করে মুখস্থ করতে হতো; এবং পরের বছর খুব ভালো করে তা ভুলেও যাওয়া হতো। কোনোরকম পাশ-ফেলের তাড়না ভুলে এবারই প্রথম বইটি পড়া হলো। পড়তে গিয়ে খুব অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম যে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে যা জানি, তার চেয়ে ঢের বেশি জানি না।

ভাষা আন্দোলন বলতে মোটামুটি কয়েকটি স্নাপশট আমাদের চোখের সামনে ভাসে। যেমন, জিয়াউদ্দিন-শহীদুল্লাহ বিতর্ক, তমুদ্দুন মজলিস, জিন্নাহর 'উর্দু শ্যাল বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ'খ্যাত বক্তৃতা, ছাত্রদের নো নো আওয়াজ, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন, ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও পুলিশের গুলি। এর পরের ঘটনা হলো ১৯৫৬ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তি এবং এর একচল্লিশ বছর পরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এর বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি। একে একে এই পর্বগুলো মনের মধ্য দিয়ে পার হয়ে গেলে মনে হয়, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পরিক্রমা সম্পন্ন হলো। এই পরিক্রমার সাথে একটি বাক্য জুড়ে দিলে তা খুব অর্থবহ হয়ে ওঠে। বাক্যটি হলো : ভাষা আন্দোলন বাঙালির অসামপ্রদায়িক রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান।

ভাষা আন্দোলনকে ঠিক কী কী কারণে অসামপ্রদায়িক রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান বলা হয়, এই পরিক্রমা থেকে তা ঠিক বোঝা যায় না। বরং মনের মধ্যে অপ্রিয় কিছু খটকা জন্ম নেয়। খোদ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটা উদাহরণ দিলে এই খটকার একটি কারণ বোঝা যাবে। ১৯৪৮ সালের ২৪শে মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে সাক্ষাত্ করেছিলেন। জিন্নাহকে যে স্মারক লিপিখানি তারা দেন, তাতে ও সংগ্রাম পরিষদের গঠন সম্পর্কে তারা উল্লেখ করেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের একমাত্র মুসলমান যুবকদের নিয়ে এই কর্মপরিষদ গঠিত।' তাঁদের দেয়া স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, 'বাংলার সুলতান হুসেন শাহ, সংস্কৃত ভাষার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও এই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন এবং এই ভাষার শব্দ সম্পদের মধ্যে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ পারসিক ও আরবি ভাষা হতে গৃহীত।' ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মোহাম্মদ তোয়াহা জিন্নাহর সাথে রাজনীতির জ্ঞান নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছিলেন। এরপর অলি আহাদ ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে এবং শামসুল হক এমনকি নামাজ পড়া নিয়ে জিন্নাহর সাথে দফায় দফায় ঝগড়া করে দারুণ দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁদের তারুণ্যে ভরা এইসব তর্কযুদ্ধ দেখে আমাদের দারুণ ভালো লাগে। কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যুক্তি হিসেবে তাঁরা এর সাথে মুসলমানের কতখানি সংশ্লিষ্টতা আছে, তা দেখাতে চেয়েছিলেন। এই কাজ করতে গিয়ে তারা এমন সব তথ্য দিয়েছিলেন, যা অনেকাংশে ছিল ভুল। যেমন, বাংলা ভাষায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ আরবি-ফার্সি শব্দ রয়েছে বলে তাঁদের দেওয়া তথ্যটা ছিল ভুল। আর হুসেন শাহের আমলে বাংলা রাষ্ট্রভাষার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল, এ কথাও ছিল প্রকৃত ঘটনাকে অনেকখানি বাড়িয়ে বলা। বদরুদ্দীন উমর এই প্রচেষ্টাকে 'সামপ্রদায়িক' বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ এই দলের মধ্যে তাজউদ্দিন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম-সহ এমন অনেক তরুণ ছিলেন, যাঁদের কোনোভাবে সামপ্রদায়িক বলা চলে না।

বাঙালি অনেক বুদ্ধিজীবীও ভাষার প্রশ্নে এই জাতীয় মুসলিম-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দেখিয়ে বাংলা ভাষা কতটা ইসলাম-বান্ধব তা বোঝানোর চেষ্টা করতেন। কাজী মোতাহার হোসেন-এর এ রকম একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে প্রকাশিত এক পুস্তিকায় বাংলা ভাষা বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, 'মোগল যুগে বিশেষ করে আরাকান রাজসভার অমাত্যগণ, বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধির জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করেছেন। মুসলমান সভাকবি দৌলত কাজী এবং সৈয়দ আলাওল বাংলা কবিতা লিখে অমর কীর্তি লাভ করেছেন।' লক্ষণীয়, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে তার জন্য যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে মুসলমান কবি এই ভাষায় কবিতা লিখেছেন কিনা; অথবা কোনো মুসলমান শাসক এই ভাষার শ্রীবৃদ্ধির জন্য টাকা খরচ করেছেন কিনা। অথচ বাংলাদেশের সকল মুসলমান যে বাংলা ভাষায় কথা বলে, সেটিই ছিল রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বাংলা ভাষা বিষয়ক বক্তব্যও সবসময় একরকম ছিল না। পাকিস্তান সৃষ্টির মাসখানেক আগে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়াউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের পাল্টা যে জবাব তিনি 'আজাদ' পত্রিকায় দিয়েছিলেন, তাতে বেশ তথ্য ও যুক্তির জোর ছিল। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন,'বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দী ভাষা গ্রহণ করা হইলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে।' তিনি আরও বলেন, 'উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তা শুধু পশ্চাদগমনই হইবে।' কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর বক্তব্যের গতিপথ কিছুটা ধর্মীয় দিকে ঘুরে যায়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে 'তকবীর' পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, 'মাতৃভাষার পরই স্থান ধর্মভাষার, অন্তত মুসলমানের দৃষ্টিতে। ... এই জন্য আমি আমার প্রাণের সমস্ত জোর দিয়া বলিব, বাঙ্গালার ন্যায় আমরা আরবী চাই। ... সেদিন পাকিস্তানের জন্ম সার্থক হইবে, যেদিন আরবী সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহীত হইবে।' তবে এটি শহীদুল্লাহর একটি কৌশল ছিল বলে মনে হয়। কারণ, তিনি হয়তো বুঝেছিলেন, মুখে যতই ধর্ম ধর্ম করুক না কেন, বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা উর্দু ছেড়ে আরবিকে রাষ্ট্রভাষা করার পথে যাবে না।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর খোদ বাংলাদেশের মধ্যের কিছু মানুষও উর্দুপ্রেমিক হয়ে উঠেছিলেন। সিলেটের কিছু সংখ্যক নাগরিক পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে একবার একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলেন, যাতে বলা হয়, 'মুসলিম সংস্কৃতির গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী উর্দু ভাষাকে বর্জন করার এই নির্লজ প্রচেষ্টা যে শুধু ধ্বংসাত্মক তাই নয়, তা পশ্চাদমুখী, নিন্দনীয় এবং সর্বজনীন ইসলামি ভ্রাতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জস্বরূপ।' উর্দুর উপযোগিতা সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন : 'রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ইসলামের বাংলা ভাষায় ''প্রাদেশিক দেশপ্রেম'' প্রচার করা যায়, কিন্তু কোনো সামরিক কাজকর্ম সে ভাষায় করা সম্ভব নয়।' নাজিমুদ্দিনকে তারা আরও জানান, 'বাংলা ভাষা বর-কনের আলাপের উপযোগী হতে পারে কিন্তু তার মাধ্যমে বীরত্বব্যঞ্জক কিছু ব্যক্ত করা চলে না। বাংলার তুলনায় উর্দু একটি বীর্যপূর্ণ ভাষা এবং তার চরিত্রে পুরুষত্ব আছে।' ভাষার মধ্যে পুরুষত্ব ও বীর্য দেখতে পাওয়া নিঃসন্দেহে বিরল ধরনের দৃষ্টিশক্তির দ্বারাই সম্ভব! এইসব উর্দুপ্রেমী স্বদেশিদের কথা ভেবেই বোধহয় কাজী মোতাহার হোসেন মন্তব্য করেছিলেন, 'বাঙালী মুসলমানের উর্দুর মোহকে সত্যসত্যই মারাত্মক মনে করি। যখন দেখি, উর্দু ভাষায় একটা অশ্লীল প্রেমের গান শুনেও বাঙ্গালী সাধারণ ভদ্রলোক আল্লাহের মহিমা বর্ণিত হচ্ছে মনে করে ভাবে মাতোয়ারা, অথবা বাংলা ভাষায় রচিত উত্কৃষ্ট ব্রহ্মসঙ্গীতও হারাম বলে নিন্দিত, তখন বুঝি এইসব অবোধ ভক্তি বা অবোধ নিন্দার প্রকৃত মূল্য কিছুই নাই।' মূল্য কিছুই থাক বা না থাক, উর্দুর প্রতি বাংলাদেশের মুসলমানদের একটি অংশের একরকম হুজুগে আকর্ষণ যে ছিল, তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছে।

১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদ অধিবেশনেও একটি সমপ্রদায়গত ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল। এই অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। এই অধিবেশনে ভাষা প্রস্তাবের যারা বিরোধিতা করেছিলেন তারা সকলেই ছিলেন মুসলিম লীগের এবং মুসলমান সমপ্রদায়ের, তাদের মধ্যে বাঙালিও ছিল অবাঙালিও ছিল। অন্যদিকে যারা এর বিরোধিতা করেন, তারা সকলেই ছিলেন কংগ্রেস দলভুক্ত এবং হিন্দু সমপ্রদায়ভুক্ত। বক্তব্যের যুক্তির চেয়ে তখন তাই বক্তব্যদাতার ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে উঠেছিল।

দেখা যাচ্ছে, ভাষা আন্দোলনের ভেতরে যেসব 'ঘটনার ঘনঘটা' ছিল, দৃশ্যত তার সবই সেক্যুলার ছিল না, সব দৃষ্টিভঙ্গিও সমপ্রদায়-চেতনা বর্জিত ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই আন্দোলনটি কিভাবে অসামপ্রদায়িকতার অমন খেতাব পেল। তার কারণটি বুঝতে গেলে ভাষা আন্দোলনের আগে পরে বাংলাদেশে আর যেসব আন্দোলন সংগ্রাম ও চেতনার বুদবুদ ওপরে উঠে আসছিল, তা ভালো করে নিরীক্ষণ করা দরকার।

ভাষা আন্দোলনের রয়েছে মোটামুটিভাবে দুইটি পর্যায়। এর একটি সম্পন্ন হয়েছিল ১৯৪৮ সালে অন্যটি ১৯৫২ সালে। আটচল্লিশ ও বায়ান্ন সালের মাঝের তিনটি বছর কিন্তু নিষ্ফলা ছিল না। বরং এই তিনটি বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে তাত্পর্যপূর্ণ অনেকগুলো ঘটনা ঘটে যায়। এর মধ্যে একটি হলো ইডেন ও কমরুন্নেছা গার্লস স্কুলের পাঁচ শতাধিক ছাত্রীর ধর্মঘট-সহ রাজপথের আন্দোলন। এই আন্দোলনের সাথে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কোনো যোগ ছিল না। ইডেন ও কমরুন্নেছা গার্লস স্কুলের একীভূতকরণের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন হয়েছিল। তবু বাংলাদেশের সেক্যুলার আন্দোলনের সূচনাপর্বে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের এই আন্দোলন সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া শুনলে তা বোঝা যাবে। ছাত্রীদের আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, 'তরুণ মুসলমান ছাত্রীদের রাস্তায় রাস্তায় প্যারেড করিয়া বেড়ানো অত্যন্ত অসম্মানজনক এবং অশোভন। ইহা মুসলিম ঐতিহ্যের পরিপন্থী। পাকিস্তানে আমাদের, বিশেষ করিয়া নারীদের, মধ্যে ইসলামিক তমদ্দুন অনুসৃত হওয়া উচিত।' নারী আন্দোলন বিষয়ে এই জাতীয় 'ধর্মীয় উপদেশ' এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাস হলো এসব গেঁয়ো পণ্ডিতিতে কান না দেওয়া। আটচল্লিশ সালে নূরুল আমিনের এই 'ফতোয়া'য় মেয়েরা কান দেয়নি, আজও দেয় না।

সাহিত্যচর্চা নিয়েও তখন নানারকম সরকারি উপদেশ বর্ষিত হতো। বলা হতো, সাহিত্য হবে ইসলামি উপাদান উপকরণে ভরপুর। কিন্তু বাঙালি সাহিত্যিকরা করতে থাকলেন এর উল্টোটা। ১৯৪৮ ও ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত দুইটি সম্মেলন ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সরকারি 'উপদেশের' মুখে সরাসরি চপেটাঘাত। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এমন একটি উক্তি করেন যা আজও স্মরণীয়। তিনি বলেন, 'আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালী। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো টি নেই।' বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এটি ছিল একটি অভূতপূর্ব মেনিফেস্টো। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সম্মেলনে সুফিয়া কামালের দেওয়া বক্তব্যটিকেও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। তিনি বলেন, 'বিশ্বের সঙ্গে, সকল জাতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় যত নিবিড় হবে, ততই আমাদের মনের সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি দূর হবে। …ঘরকে আগে জানুন, তারপর বাহির আপনার পক্ষে সহজ হয়ে যাবে। নিজের দেশের দিকে তাকান, দেশের প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে দেখুন, দেশবাসীর সুখ দুঃখের সঙ্গে পরিচিত হউন, তাদের ভালোবাসুন—তবেই তাদের হাসি অশ্রুময় জীবন আপনার লেখনী মুখে ধরা দেবে।' সাহিত্যের মধ্যে ধর্মীয় অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে এটি ছিল অনন্য জবাব।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও আটচল্লিশ থেকে বায়ান্নর মধ্যে তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তনের চিহ্ন দেখা যায়। এর প্রধান চিহ্নটি ছিল ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের জন্মও হয়েছিল মুসলিম লীগের সামপ্রদায়িক রাজনীতির প্রতি সরাসরি অনাস্থা জানিয়ে। শেখ মুজিবুর রহমান-সহ যাঁরা পরবর্তী কালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের অধিকাংশের সেক্যুলার রাজনীতির সূচনা হয়েছিল এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সকল স্তরের শ্রমিকরা বায়ান্ন সালের আগেই অনেকগুলো শ্রমিক ফেডারেশন গড়ে তুলেছিলেন। এই সময়েই সংঘটিত হয় বিখ্যাত হাজং ও নানকার আন্দোলন এবং নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ। সমগ্র বাংলাদেশে এই সময়ে যে পরিমাণে কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন হয়, তার একটিতেও ধর্মীয় রং মাখানোর প্রয়োজন পড়েনি। বিস্তৃতি ও সেক্যুলার চরিত্রের বিবেচনায় তা তত্কালীন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় রাজনীতিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বাঙালি সেক্যুলারিজমের উত্স যে তার হাজার বছরের সমন্বয়ী ও সহনশীল সংস্কৃতি, পাকিস্তানের চরম সামপ্রদায়িক উন্মাদনার মধ্যেও এই কৃষক-শ্রমিকেরা তা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী কালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে এই কৃষক-শ্রমিক ও তাঁদের সন্তানেরা প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।

দেখা যাচ্ছে, পূর্ববঙ্গের ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক ও নারীরা বায়ান্ন সালের আগেই একে একে তাঁদের অসামপ্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের নানামাত্রিক আবির্ভাব সম্পন্ন করেছিলেন। এর মধ্যে অবশ্য বেশ কয়েকবার সামপ্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে ধর্মরাষ্ট্রের দিকে পূর্ব পাকিস্তানের গতিমুখ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা 'সরকারি ধার্মিকরা' করেছিল, কিন্তু এইসব দাঙ্গা বাঙালি মননে যে অপরিসীম ক্ষতের জন্ম দিয়েছিল, তা তার অসামপ্রদায়িক ও মরমী ঐতিহ্যের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তাতে বরং অসামপ্রদায়িক জাতীয়তাবাদের দিকে যাত্রার প্রয়োজনীয়তা আরো বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক ছাত্র বুদ্ধিজীবী ও নারীসমাজ যে অসামপ্রদায়িক ও সেক্যুলার বাংলাদেশের সূচনাপর্ব নির্মাণ করে চলছিল, একুশে ফেব্রুয়ারির জাগরণের আগে তা তেমন দৃশ্যমান ছিল না। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে এই সংঘবদ্ধ নতুন জাতীয়তাবাদের মুখপাত্র হিসেবে সামনে এল ছাত্রসমাজ। একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা না ঘটলেও অন্য কোনোভাবে নিশ্চয়ই বাঙালিদের ওই সংহত জাগরণের শক্তি প্রকাশ পেত। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি দ্রুতই একটি দুরূহ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল। পাকিস্তানের মধ্যে থেকে কিসের ভিত্তিতে ইসলামি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, শ্রেণি-সংগ্রামের ভিত্তিতে না ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার ভিত্তিতে, এই প্রশ্নের খুব সুস্পষ্ট একটি উত্তর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হলো। পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি পেয়ে গেল তার গণপ্রজাতন্ত্রের ভিত্তিভূমিটি। সেই ভিত্তিভূমি হলো বাংলা ভাষা। বস্তুত সেই দিন থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ধর্মীয় রাজনৈতিক ভিত্তির মৃত্যু ঘটে। বায়ান্নর পর থেকে একাত্তর পর্যন্ত বাঙালিকে আর একটিবারও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি নিয়ে নতুন কিছু ভাবা লাগেনি। বায়ান্নতে ঠিক যা যা নিয়ে বাঙালি সংহত হয়েছিল একাত্তরে সেই তত্ত্ব ও শক্তিসমূহের চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। অর্থাত্ একাত্তর যেন পূর্ণ বিকশিত এক বৃহত্তর বায়ান্ন। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জনক পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা।

ভাষা আন্দোলনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর কোনো একক নেতা ছিল না। যে যূথবদ্ধ নেতারা এই বিরাট ঘটনাটি ঘটিয়ে দিয়েছিল তারা প্রায় সকলেই ছিল কম বয়সী। অত্যন্ত ঔত্সুক্য ও আনন্দ নিয়ে আমরা আবিষ্কার করি যে, এই তরুণদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখ। সাতচল্লিশের আগে এঁদের তরুণ মনের অনেকখানি পূর্ণ ছিল পাকিস্তানি মৌতাতে। কিন্তু যৌবনকে তাঁরা দীপ্ত করেছেন পাকিস্তানবাদকে অস্বীকার করে। আদর্শিকভাবে তো বটেই, শারীরিকভাবেও ভাষা আন্দোলন যেন ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের স্রষ্টাদের বড় করে তুলেছিল।

উর্দু মূলত একটি ভারতবর্ষীয় ভাষা। এমনকি এটি কোনো শক্তিশালী স্বতন্ত্র ভাষাও নয়; আরবি হরফে লেখা হিন্দিই আসলে উর্দু। শব্দসম্ভার, বাক্যগঠন, উচ্চারণ প্রভৃতি দিক দিয়ে উর্দুর সাথে হিন্দির তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু চোখের দেখাতে, একটা দেখতে হিন্দি কিন্তু অন্যটা দেখতে আরবির মতো। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার মূল কারণ ছিল বাংলাদেশকে একটি স্থায়ী উপনিবেশে পরিণত করা। সেটি বোঝা যায় পাকিস্তানের চাকরি-বাকরি ব্যবসা কিংবা বাজেটে পূর্ব পাকিস্তানিদের জন্য বরাদ্দ দেখে। ফলে উর্দু ইসলামি ভাষা, এই মিথ্যাটা গোয়েবলসীয় কৌশলে তাদের বারবার বলে যেতে হচ্ছিল। যদি বাংলা ভাষা ইসলামি কাব্য নাটক কথাসাহিত্য ও সংগীতে পরিপূর্ণও থাকত, আর উর্দু পরিপূর্ণ থাকত সেক্যুলার কিংবা সংস্কৃত প্রভাবিত সাহিত্যে, তাহলে কি তারা ইসলামের খাতিরে উর্দু বাদ দিয়ে বাংলা শেখা শুরু করত? এর উত্তর খুব পরিষ্কার—কখনোই করত না। কারণ, তাদের লক্ষ্য ছিল ধর্মসংস্থাপন নয়, উপনিবেশ সংস্থাপন। ভাষা আন্দোলন থেকে সমগ্র বাঙালি এই উপনিবেশের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শুরু করে। এখান থেকেই বাঙালির গন্তব্য হয় একাত্তর।

বাঙালির মূল শক্তি ও সৌন্দর্য হলো অসামপ্রদায়িকতা। কিন্তু সাতচল্লিশে সে যেন স্মৃতিভ্রংশ হয়ে উল্টোরথে উঠে পড়েছিল। ভাষা আন্দোলন তাই বাঙালির জন্য ঐতিহ্য বিস্মৃতির আঁধারে হঠাত্ স্মৃতি ফিরে পাওয়া। আমাদের কংক্রিটের শহিদ মিনার তাই স্মৃতির মিনার। আর একুশ যেন বাঙালির সুবেহ সাদেকের ঘুম ভাঙানিয়া পাখি, যেন বাঙালির মানচিত্রের মাপে তৈরি একটি আকাশচুম্বী আরশি, যেখানে বারবার নিজেদের আত্মপরিচয় দেখে নেয়া যায়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২৪
ফজর৪:০০
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১০
সূর্যোদয় - ৫:২৪সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :