The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

চলচ্চিত্র 'জীবন থেকে নেয়া'

আন্দোলনের ভাষা

বিধান রিবেরু

জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া', ১৯৭০ সালের যেসময় মুক্তি পায়, শুদ্ধ সেই সময়কার রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই নয়, নির্মাণের দিক থেকেও নির্মাতার সততা ও মেধার পরিচয় আমরা পাই। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এটাও আন্দাজ করা যায়, জহির রায়হান ঠিকঠাকভাবেই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। পূর্বপাকিস্তানের শোষিত পূর্ববঙ্গবাসীদের কথাই তো বলা হয়েছে 'জীবন থেকে নেয়া'তে। সেজন্যই ছাড়পত্র পেতে সমস্যা হয়েছিল, এমনকি শ্যুটিংয়ের সময় থেকেই নানাভাবে এই ছবির কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পায়তারা করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবীর ১৯৭০ সালে 'জীবন থেকে নেয়া'র ওপর ইংরাজি ভাষায় সমালোচনা লিখেছিলেন, সেখানে ওই ষড়যন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই, রাজনৈতিকভাবে উত্তাল এক সময়ের মধ্যে মুক্তি পায় এই ছবি। যে ছবির নাম অনায়াসে হতে পারত 'এক গোছা চাবি'। কারণ পুরো ছবিতে চাবির গোছা দৃশ্যে ও সংলাপে এসেছে মোট পনেরো বার। এরমধ্যে শুধু সংলাপে এসেছে নয়বার। কাজেই বলা যায়, 'জীবন থেকে নেয়া'র একটি কেন্দ্রীয় জায়গায় রয়েছে চাবির গোছা, ক্ষমতার মেটাফোর হিসেবে। যারা ছবিটি দেখেছেন তারা জানেন, একটি পরিবার, সেখানে বড়বোন একদিকে, তিনি বড় 'দজ্জাল'। আর বড় বোনের স্বামী, ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রীরা আরেকদিকে। এরা 'নির্যাতিত'। রাষ্ট্রের যেমন আয়ব্যয়ের হিসাব আছে, পরিবারেরও আছে, দুই জায়গাতেই রয়েছে প্রধান ব্যক্তি। সেই ব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের ভালোমন্দ দেখে, সেই বিচারে সংসার পরিচালনা করে। বলতে পারেন, রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ পরিবার। বুঝতে অসুবিধা হয় না জহির রায়হান কেন পরিবারের গল্প ফাঁদতে গেলেন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি, ধমক ও অন্যায্য আচরণের প্রতিবাদে যখন পূর্ব পাকিস্তান ফুঁসছে তখন এই ছবিতেই একটি বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে পরিবার। যদিও রাজপথের আন্দোলনও আমরা দেখি এতে।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমালোচক আলমগীর কবীর বলছেন, জহির রায়হানের ছবিতে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের মেটাফোর হিসেবে হাজির হয়েছে দজ্জাল বড়বোন। দুটি সমান্তরাল গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন জহির এই চলচ্চিত্রে। ঘরের বাইরে দেখা যায় বড় স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে বিক্ষোভ করছে মানুষ। আর পরিবারের ভেতরে সদস্যরা জোটবদ্ধ হচ্ছে পারিবারিক শাসকের পতন ঘটানোর জন্য। তারা পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে ফেলে ঘরের দেয়াল। পাকিস্তানের সেনাপতি আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নানা কৌশল করতে থাকেন। তারমধ্যে সবচেয়ে হাস্যকর কৌশলটি ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি 'অভিন্ন ভাষা গঠন' ও পাকিস্তানের সব ভাষা রোমান হরফে লেখার প্রস্তাব। সমালোচক আলমগীর কবীর বলছেন, আইয়ুব খানের নানা কূটকৌশল চলচ্চিত্রের পরিবারেও দৃশ্যমান। সেখানে ছোট দুইভাই বিয়ে করে দুই বউ সংসারে আনলে, বড়বোনের আধিপত্য ও ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ে। সেই ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে নানা হাস্যকর পদক্ষেপ নেয় বড়বোন ওরফে রওশন জামিল। দেখা যায়, এক ভাই ও নববিবাহিত স্ত্রীকে আলাদা থাকতে বাধ্য করছে বড়বোন। কিন্তু আরেক ভাইয়ের বিয়ের পর ছোট বউ সংসারে এলে বুদ্ধিতে এঁটে উঠতে পারে না বড়বোন। এক পর্যায়ে চাবির গোছা হারাতে হয় তাকে। কিন্তু সেই চাবির গোছা পুনরুদ্ধারে নানা ছক কাটতে থাকে সে। পুরো জাতির সংকটকে জহির রায়হান তুলে আনেন একটি পরিবারের ঘটনা প্রবাহের ভেতর দিয়ে।

জহির রায়হান বামরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সচেতনভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লেখালেখিও করেছেন। সেসব কর্মযোগ আমলে নিয়ে আপন বুদ্ধিজীবী (পড়তে পারেন অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল) হিসেবে জহির রায়হান যে বক্তব্য তুলে ধরতে চেয়েছেন 'জীবন থেকে নেয়া'তে, সেটার কাছে বোধ করি চলচ্চিত্র সম্পাদনার ক্ষেত্রে আহমদ জামান চৌধুরীর যে অভিযোগ 'সামগ্রিক দক্ষতা অনুপস্থিত' এবং আলমগীর কবীরের যে 'দুর্বল' জায়গা চিহ্নিতকরণ তা আর ধোপে টেকে না। যে সময় পশ্চিম পাকিস্তানে ক্ষমতার লোভে উম্মাদ হয়ে উঠেছে সামরিক কর্মকর্তারা, যেসময় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের চরম অবিশ্বাস করছে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা, যেসময় চলছে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা, তখনই জহির রায়হানের এমন সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাণ ও মুক্তি। সমালোচকরা যতই খুঁত ও দুর্বল জায়গা বের করুক না কেন, হুলিয়ো গার্সিয়া এসপিনোজার দোহাই দিয়ে বলতে চাই, তথাকথিত 'খুঁত' ও 'দুর্বল' জায়গা নিয়েও যদি এমন প্রগতিশীল ও সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায় তাহলে এমন চলচ্চিত্রই আমার দরকার, আমাদের দরকার, নিখুঁত-নির্ভুল কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল চলচ্চিত্রের কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। 'জীবন থেকে নেয়া' নিজের বক্তব্যের জোরেই টিকে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়। আধুনিক সময়ে যেসব ছবি কারিগরি ও সম্পাদনায় নিখুঁত বলে ধরা হচ্ছে বাংলাদেশে, সেগুলোর মধ্যে কটি 'জীবন থেকে নেয়া'র মতো অতটা শক্তিশালী রাজনৈতিক বক্তব্যসমৃদ্ধ, এই প্রশ্ন থাকল। শাসকের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রচেষ্টাকে ব্যঙ্গ করার পাশাপাশি মেটাফোরের ব্যবহার বিবেচনায় 'জীবন থেকে নেয়া' এখনো অতুলনীয়। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ে কটাক্ষ করার যে সাহস জহির রায়হান দেখিয়েছিলেন, তা এখনকার নির্মাতাদের মধ্যে কি দেখা যায়? 'জীবন থেকে নেয়া'র মতো 'খুঁত' ও 'দুর্বল' চলচ্চিত্রকে যদি প্রাথমিক আদর্শ বয়ান ধরে কেউ নির্মাণে নামেন তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থে এই ভূ-খণ্ডের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ নির্দেশ করবে বলে মনে হয়। এই মনে হওয়া ভ্রমও হতে পারে। সে তো সময়ই বলে দেবে। তবে শেষ করার আগে বলতে চাই, যারা 'জীবন থেকে নেয়া' ছবিটি দেখেছেন তাদের আবারও ওই ছবির ফ্রিজশটগুলো দেখার অনুরোধ করছি। ফ্রিজশটের কী অসাধারণ প্রয়োগ!

সহায় :

Julio Garcia Espinosa, 'For an imperfect cinema', translated by Julianne Burton, Jump Cut, no.20, 1979, pp. 24-26 ; আহমদ জামান চৌধুরী, 'জীবন থেকে নেয়া, জনপ্রিয় ছবির নতুন সংজ্ঞা', অনুপম হায়াত্ সম্পাদিত চলচ্চিত্র সমালোচনা, কলি প্রকাশনী, ২০১১, ঢাকা।; Alamgir Kabir, 'Jibon Theke Neya (Glimpses From Life)', অনুপম হায়াত্ রচিত 'জহির রায়হানের চলচ্চিত্র : পটভূমি বিষয় ও বৈশিষ্ট্য, দিব্য প্রকাশ, ২০০৭, ঢাকা। ; গোলাম মুরশিদ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস, প্রথমা প্রকাশন, ২০১০, ঢাকা।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২৭
ফজর৩:৪৬
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪২
এশা৮:০৫
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :