The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা

সংগ্রামের ধারাভাষ্য

মাসুদুজ্জামান

একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ আমার আত্মপরিচয়। শুরু হয়েছিল সেই বায়ান্নতে, সমাপ্তি ঘটে একাত্তরে। বায়ান্ন থেকে একাত্তর—এভাবেই বাংলাদেশ ভাষা আন্দোলন থেকে পৌঁছে গেছে তার পরম প্রার্থিত স্বাধীনতায়। স্বাধীনতা? কিভাবে ব্যাখ্যা করব একে? খুব সরলভাবে বললে, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়াই ছিল স্বাধীনতার মূল কথা। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই বিবরণই পাওয়া যাবে এম. আর. আখতার মুকুলের 'ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা' শীর্ষক গ্রন্থে।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান আন্দোলনের প্রায় শুরু থেকেই নিজেদের স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এ প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক আবদুর রাজ্জাক, 'বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশটি [বাংলাদেশের মানুষ] ... শেষ পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের মিলিত হওয়ার পক্ষে রায় দিল, তবে কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই। তার এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিল যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ।' খুবই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ হচ্ছে এই উক্তিটি। কিন্তু কিভাবে ঘটেছিল এই জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা? তারও বিবরণ আছে আবদুর রাজ্জাকের ওই লিখিত বক্তৃতায়। মুকুলও বিক্ষিপ্তভাবে একথারই প্রতিধ্বনি করেছেন তাঁর বইতে। সেই সঙ্গে তাঁর বইতে পূর্ববাংলার বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকারও বিশ্লেষণ আছে।

ঐতিহাসিক দিক থেকেই দেখা যায়, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ববাংলার মানুষের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল সার্বিকভাবে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক—শৃঙ্খল ছিল সবক্ষেত্রে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার মানুষকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নামে শৃঙ্খলিত করে ফেলে। পরাধীন করে রাখার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ঘটেছিল এটা। সাতচল্লিশের ভারত বিভাগের পূর্বে উনিশ শতকের শুরু থেকে যে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তশ্রেণি বিকাশ লাভ করেছিল, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্টিতে তারা উল্লসিত বোধ করে। কেননা, এর পূর্বে বাংলাদেশের মানুষ সার্বিকভাবে কখনো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব লাভ করেনি। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকে পূর্ববাংলার বিকাশোন্মুখ উঠতি সামন্তশ্রেণি এবং তাদের পরোক্ষ প্রভাবে গড়ে ওঠা মানবতাবাদী মধ্যবিত্তশ্রেণি অনুভব করল যে, তারা যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাইছিল তা অর্জিত হয়নি। এভাবেই বাঙালির রাজনৈতিক ও আত্মসংকটের শুরু। অবাঙালি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, আমলা ও পুঁজিপতিশ্রেণি জন্মলগ্ন থেকেই নিয়ন্ত্রণ ও কুক্ষিগত করতে শুরু করল পূর্ববাংলার রাষ্ট্রক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো।

প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ শাসনতন্ত্র রচনার লক্ষ্যে পাকিস্তান গণপরিষদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। তাতে উল্লেখ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে ইসলাম এবং এর রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। লাহোর প্রস্তাবে পূর্ববাংলার জন্য যে স্বায়ত্তশাসনের বিধান রাখা হয়েছিল, তাও অস্বীকৃত হলো। স্বভাবতই পূর্ববাংলার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব খর্ব হলো। এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের পাশাপাশি সেই সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর কাছে সাধারণ জনমানুষের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয় বিকল্প একটি শাসনতন্ত্র। কিন্তু এই সময়ে গণপরিষদ বাতিল হয়ে গেলে শাসনতন্ত্র রচনার পদক্ষেপটি পরিত্যক্ত হয়।

ইতিমধ্যে পূর্ববাংলায় শুরু হয়ে যায় একধরনের অস্থিরতা। দেশবিভাগের পর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। পূর্ববাংলায় উত্পাদিত কৃষিজাত পণ্যের দাম কমে যায়। সারা দেশে দেখা দেয় নীরব দুর্ভিক্ষ। পূর্ববাংলায় জমিদারশ্রেণি বিলোপের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কৃষকশ্রেণির ওপর চেপে বসা জোতদারী ও মহাজনী প্রথা উচ্ছেদ করা হয়নি। ফলে মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরে ধূমায়িত হতে থাকে একধরনের অসন্তোষ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত পেশাজীবীশ্রেণি সংঘটিত করে নানা ধরনের আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি। এরপর ঘটে সেই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন।

উপরিতল থেকে দেখলে ভাষা আন্দোলন ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলন, কিন্তু মর্মে ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক। পাকিস্তানি শাসকেরা যেভাবে পূর্ববাংলার মানুষের ওপর চেপে বসেছিল, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে বাংলাদেশের মানুষ। তবে রাজনীতির চাইতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনের অভিঘাত সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। আবদুর রাজ্জাকের ভাষ্য অনুসারে, 'আমাদের ক্ষেত্রে এটি [বাংলা ভাষা] একটি জাতির ভাষা, একটি জাতীয় ভাষা। সীমান্তের ওপারে প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলায় এটি একটি আঞ্চলিক ভাষা, একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাষা, তবে জাতীয় ভাষা নয়। ১৯৪৭-এর পরের সাহিত্যে এই পার্থক্য সুস্পষ্ট। সীমান্তের ওপারে সমগ্রের প্রতিনিধিত্বের চেতনা খুব দৃঢ়, তেমনটা আমাদের মধ্যেও রয়েছে। ভাষা আন্দোলন, যা কিনা পরবর্তীকালে জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে, আাামদের সাহিত্যে বর্ণিত আশা-আকাঙ্ক্ষা তার পেছনে একটা চালিকাশক্তি হতে পারতো এবং হয়েছে।' এই যে তুলনাসূত্র, এ থেকেই বোঝা যায়, ভাষার ওপর ভিত্তি করেই একাত্তরে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভুত হবে। কিন্তু এখনো কোনো কোনো স্বঘোষিত প্রগতিবাদী মার্কসবাদী 'বুদ্ধিজীবী'কে বলতে শোনা যায়, বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটেছিল ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে নয়। এরা মার্কসবাদ সম্পর্কে যেমন অজ্ঞ, তেমনি জাতিরাষ্ট্রের সৃষ্টি কিভাবে হয়, সেই ধারণাও তাদের নেই। মার্কসবাদ এদের কাছে একধরনের ছলমাত্র, প্রগতির মুখোশ পরা থাকলেও ভেতরে ভেতরে তারা ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক এবং চরম প্রতিক্রিয়াশীল। বাঙালির দ্বিতীয় জাতীয়তা আন্দোলন গণজাগরণ মঞ্চের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনকে (২০১৩) এরাই ধর্মান্ধতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে।

পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনপর্বে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সামনে তখন মূলত তিনটি পথ খোলা ছিল : প্রথমত, পাকিস্তানি শাসকচক্রের সঙ্গে আপোষ করে সাম্প্রদায়িক ও নিপীড়নমূলক সামন্ত শাসনকে বৈধতা দেওয়া; দ্বিতীয়ত, নব্য-ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে (গোপনে বা প্রকাশ্যে) পূর্ববাংলাকে স্বাধীন করা; তৃতীয়ত, সমকালীন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত থেকে পালিয়ে গিয়ে আত্মবিবরে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদ থাকা। বাংলাদেশের সমকালীন বুদ্ধিজীবীরা মূলত এভাবেই তিনটি ধারায় বিভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে যেসব কবি, লেখক পাকিস্তান আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থন করেছিলেন, তারা ছিলেন ওই প্রথম ধারার বুদ্ধিজীবী। এদের কেউ কেউ এইসময়ে আত্মবিবরে গিয়ে নিরাপদ থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু দেশবিভাগের পর পূর্ববাংলায় শিক্ষিত বুদ্ধিদীপ্ত যেসব তরুণ লেখক-কবির আবির্ভাব ঘটছিল, তারা ওই দ্বিতীয় ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে তাদের লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মুক্ত করা। তারা চাইছিলেন কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। তরুণ এই বুদ্ধিজীবীরা প্রথম দিকে মার্কসবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে জনমুক্তির কথা ভাবলেও পরবর্তীকালে এদেরই একটা অংশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। আসলে এইসময়ে মার্কসবাদী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অনেকটা একীভূত হয়ে যায়। মার্কসবাদীদের মধ্যে অবশ্য আরও একটা ধারা সক্রিয় ছিল। এদের কেউ কেউ জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে কট্টর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মার্কসবাদী আন্দোলনকে জনমানুষের মুক্তির পথ বলে মনে করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ যতই গতশতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশক পেরিয়ে একাত্তরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, ততই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। আর এর সবই ঘটেছে শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত রাজনৈতিক ভাবনা, দূরদর্শিতা এবং নেতৃত্বের অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে।

রাষ্ট্রচিন্তক আবদুর রাজ্জাক ঠিকই বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা জাতি হতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় জাতি-পরিচয়ের মধ্যে বিলুপ্ত না হয়ে তারা পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এ পৌঁছে, আবদুর রাজ্জাকের মতে, 'এই জনগণেরই ব্যাপক অংশ আর পাকিস্তানি জাতিসত্তার ভেতর নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হতে দিতে রাজি হয়নি।' অর্থাত্ একদিকে ভারতীয়তাকে অস্বীকার করা, অন্যদিকে পাকিস্তানি কৃত্রিম জাতিসত্তা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সংগ্রামে নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই ছিলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাজ্জাকের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের 'কেন্দ্রীয় চরিত্র', অর্থাত্ নেতা। অবশ্য আমার মনে হয়, শুধু নেতা বললে তিনি কোন অনুপ্রেরণায় আর কোন লক্ষ্যে বাংলাদেশকে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন সেটা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। যে রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টির কথা ভেবেছিলেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এদিক থেকে ভাবলে, সর্বভারতীয় জাতিসত্তা নয়, পাকিস্তানের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মধ্যে নয়, তিনি চেয়েছিলেন উগ্র ধর্মীয় ভাবাবেগমুক্ত, আধুনিক উদারনৈতিক একটা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে। বাংলাদেশের মানুষ তার এই মতাদর্শকে গ্রহণও করেছিল। বাংলাদেশকে পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য তারা স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিল। একারণেই একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাকমুহূর্তে 'বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন সেই প্রতীক যার চারদিকে নিঃসহায় এক উদ্দেশ্যের সমর্থকেরা একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু এটা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। ওই অন্ধকার দিনগুলোতে, ওই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে, যে কোটি কোটি জনতা, যারা ভবিষ্যতের জাতিকে সৃষ্টি করবে তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বিধা ছিল না। বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন প্রতীক।' রাষ্ট্রচিন্তক রাজ্জাকের এই অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণে, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব যে কতটা গভীর আর যথাযথ ছিল, তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বাংলাদেশের মানুষ আর শেখ মুজিবুর রহমান এভাবেই সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন, 'পাকিস্তানি বা ভারতীয় জাতি থেকে পৃথক একটা সত্তা বজায় রাখার ইচ্ছার মধ্যেই, আমার মতে, রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১৯৭১ সালের এদেশের সংগ্রামী জনসাধারণের প্রকৃত মিল।'

বাংলাদেশের এই যে রাজনৈতিক সংগ্রাম, আগেই বলেছি, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার সূত্রপাত ঘটেছিল। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই এদেশের তরুণ বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া সাংস্কৃতিক মুক্তিও সম্ভব নয়। আর সাংস্কৃতিক মুক্তি না ঘটলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাও সম্ভবপর হবে না। ফলে গতশতকের ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী পুনর্জাগরণ, সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার বীজ এইসময়ে রোপিত হয়ে যায়, যার পরিণাম হিসেবে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ষাটের দশকেই মূলত পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে বারবার নানা ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং তীব্রতা অনুসারে বায়ান্ন পরবর্তী এবং স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়কালটি দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল : ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল; এবং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল। প্রথম সময়কালটি 'কালো দশক' এবং দ্বিতীয় স্তরটি 'গণআন্দোলন'-এর কাল হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের মাত্র তিন বছরের মাথায় পূর্ববাংলার জনগণ পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে (১৯৫৪) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু জনগণের ইচ্ছাকে ভূলুণ্ঠিত করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ১৯৫৮ সালে জারি করা হয় সামরিক শাসন।

জেনারেল আইয়ুব অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক পরিবেশ দ্রুত বদলে যেতে থাকে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে আবির্ভাব ঘটে শেখ মুজিবের। জাতীয় আন্দোলনের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি নিয়ে যদিও ভাসানী-মুজিবের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, যে বিরোধকে মার্কসবাদী ও জাতীয়তাবাদীদের সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করা যায়, কিন্তু এই দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে স্তিমিত করতে পারেনি। এই আন্দোলনে ভীত হয়ে শেখ মুজিব এবং জাতীয়তাবাদের সমর্থক সেনাবাহিনির বাঙালি সদস্য এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসকদের কয়েকজনকে জড়িয়ে শুরু হয় 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা'। অভিযোগ করা হয় বাঙালির এই নেতৃত্ব 'স্বাধীন পূর্ববাংলা' প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই অভিযোগ ছিল জাতিগত নিপীড়নের নতুন কৌশল। ফলে এর বিরুদ্ধে শুরু হয়ে যায় গণআন্দোলন। বাঙালি জনগোষ্ঠী ১৯৫২ সালের পর এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই অর্জন করতে শুরু করে জাতীয়তাবাদের অপ্রতিরোধ্য চেতনা ও শক্তি। হরতাল, সান্ধ্য-আইন ভঙ্গ, সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ, বিক্ষোভ, গুলিচালনা, নির্যাতন, পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থাকে একেবারে অকার্যকর করে দেয়। রাজনীতি থেকে বিদায় নেন জেনারেল আইয়ুব খান, ক্ষমতা গ্রহণ করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এরপর ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ অভূতপূর্ব বিজয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যায়। পাকিস্তানের নেতৃত্ব শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ববাংলা জুড়ে শুরু হয়ে যায় দুর্বার আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সাত তারিখে রেসকোর্সের প্রতিবাদী বিশাল জনসমাবেশে শেখ মুজিব ঘোষণা করলেন :'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।' শেখ মুজিবের কাছ থেকে স্বাধীনতার সুস্পষ্ট ঘোষণা পেয়ে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনি ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে পূর্ববাংলার জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধীনতার যুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস পর পূর্ববাংলা অর্জন করে স্বাধীনতা। বায়ান্নতে শুরু হয়ে সে সংগ্রাম একাত্তরে এসে পূর্ণতা পেল। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটল বাংলাদেশের। এম. আর. আখতার মুকুলের বইটির বিভিন্ন প্রবন্ধে বাংলাদেশ কিভাবে স্বাধীনতা অর্জন করে, তার বর্ণনা আছে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এই বিবরণ হাজির করেননি। ঐতিহাসিক ধারাক্রম অনুসরণ করেও তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস রচনা করেননি। তিনি বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি প্রবন্ধে এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধগুলো তথ্যসমৃদ্ধ, অনেক অজানা কথা এই বইতে পাওয়া যাবে, তবে একজন ইতিহাসবিদ যেভাবে ঘটনাক্রমের পাশাপাশি ঘটনার তাত্পর্য ব্যাখ্যা করে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন, সেই পদ্ধতিটি তিনি অনুসরণ করেননি। এই সমস্যা আরও গভীর হয়েছে অন্য বিষয়ের অন্য ধরনের কিছু প্রবন্ধ সন্নিবিষ্ট হওয়ায়। ফলে বইটি কিছু তথ্যের সমাহার হয়ে থাকে মাত্র, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস হয়ে ওঠে না।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
5 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৭
ফজর৫:১৩
যোহর১১:৫৫
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৮
এশা৬:৩৬
সূর্যোদয় - ৬:৩৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :