The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

ভাষার আপন পর

ভাষাবাহিত মানববৈচিত্র্য

মিল্টন বিশ্বাস

'ভাষার আপন পর' মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ভাষাভাবনা ও ভাষাপ্রেমের অন্যতম গ্রন্থ। 'অমর একুশের ষাট বছর', 'ভাষার আপন-পর', 'বাংলা ভাষার সংগ্রাম চলবেই চলবে', 'অপদার্থতার এক মিনার', 'হালের শবপোড়া মড়াদাহের দল', 'আদিবাসীদের ভাষা-সমস্যা' এবং 'ভাষা ও মাতৃভাষার কবিতা' এই সাতটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ রয়েছে এ গ্রন্থটিতে। লেখক নিজে ভাষাসৈনিক ছিলেন এবং মাতৃভাষার প্রতি তাঁর মমত্ববোধ অসীম। কিন্তু মাতৃভাষা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একদেশদর্শী নয়, বরং যেকোনো জাতির মাতৃভাষা সম্পর্কে এই মনীষীর রয়েছে অশেষ কৌতূহল। গ্রন্থটিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের নানান ভাষার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যের সমাবেশ ঘটেছে; তেমনি রয়েছে আমাদের ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস ও বাংলা ভাষা চর্চা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ অভিমত। বর্তমান শতাব্দীতে অমর একুশের ঘটনাধারা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন করতে উত্সাহী করে। আমরা এখন একুশের চেতনার মধ্যে তাঁদেরকে খুঁজি যাঁরা মানবতাবিরোধী শক্তির দ্বারা অসংখ্যবার নির্যাতিত হয়েও অনন্তকাল বেঁচে থাকেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের দিগদর্শন হয়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। যাঁরা ব্যক্তি থেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন প্রতীকে। এই প্রতীক হয়ে যাওয়াটুকু আমাদের ঐতিহ্য। আমরা সকলে জানি, বাঙালি জাতিসত্তা অন্বেষণে আত্মত্যাগী ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক অস্তিত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বাঙালি জীবনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান ঔপনিবেশিক শাসিত বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সংঘাত-সংকটের দ্বার উন্মোচন করে বাস্তব সংগ্রামশীল পরিস্থিতিতে ব্যক্তির ক্রমবিকশিত রূপ তাঁদের ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রামের সমান্তরাল গুরুত্বে অনুধাবন করা জরুরি। ভাষাশহীদ এবং ভাষা সংগ্রামী ছাড়াও শহীদ লেখক সোমেন চন্দ ও মুনীর চৌধুরীর সমাজ রাজনীতির বহির্বাস্তবতার সঙ্গে দ্বন্দ্বময় ব্যক্তিসত্তার জীবন এজন্য আমাদের কাছে গুরুত্ববহ। রণেশ দাশগুপ্তের মতো অনেকেরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্মরণীয় হয়ে আছে। এভাবে মহত্ ব্যক্তিদের স্মরণ করতে হবে তখনকার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য। সেলিনা হোসেনের 'নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি' উপন্যাসে বিবৃত যুবক সোমেনের এই অভিব্যক্তি খুবই তাত্পর্যবহ—'সময় মতো শত্রুর গায়ে লাথি দিতে না পারলে; শত্রু ওর গলায় ফাঁস দেবে। ওর নিষ্ক্রিয়তাকে কম করে কাছে টানবে না। লাথি দিয়েই দাবিয়ে রাখতে চায়। শ্রমিকদের মধ্যে এই চেতনা ও ছড়িয়ে দিচ্ছে।'

দেশভাগ ও ভাষা-আন্দোলনের প্রাকমুহূর্তে এই চেতনা ও আলোকরশ্মি ছড়ানোর জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সময় এসেছে। সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে গণমানুষের ঐক্য আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ কথা সত্য যে, বঞ্চনা আর শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়ে নির্মমতার শিকার হওয়া সচেতন মানুষ না থাকলে ভাষা-আন্দোলন সম্ভব হতো না। বিশেষত ঢাকার 'প্রগতি লেখক সংঘ'-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। একদিকে সচেতন ব্যক্তিত্ব অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীলদের উপস্থিতি আমাদের দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে সক্রিয় ছিল। সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাত, সামপ্রদায়িক দাঙ্গা অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে জনতার মাঝে নিয়ে এসেছিল। দাঙ্গাবিরোধী নাটক 'মানুষ' এবং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহিত 'কবর' রচয়িতা মুনীর চৌধুরীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এজন্য বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। একই সময় সক্রিয় জয়নুল আবেদীন আর ইলা মিত্রের জীবন ও সংগ্রাম আলোড়িত ঘটনার সাক্ষ্য। প্রত্যয়দৃপ্ত বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে সাহিত্যে রূপায়ণ ভাষা আন্দোলনের পর এভাবে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। সেসব সৃষ্টিকর্মের পাঠ ও পর্যালোচনা দরকার।

বহুল উচ্চারিত কিছু বাক্য রয়েছে, যেমন—একুশ মানে মাথা নত না করা, একুশ মানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, একুশ মানে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে সামষ্টিক মঙ্গলের চিন্তা করা। ১৯৫২ সালের একুশের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা আমাদের জীবনে ৬৬-এর ছয়-দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান আর মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনে পূর্ণতা পেয়েছিল। একষট্টি বছর আগের সেই ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। তাঁর 'ভাষার আপন পর'(২০১২) গ্রন্থে তিনি লিখেছেন—'কাগজে-কলমে ১৯৫৪ সালের ৯ মে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি দান করা হয়। তত্কালীন রাজনৈতিক টানাপোড়েনে 'প্যারিটি' নীতির ফলে তা সহজ হয়েছিল। এরপর ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধানে সেই মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। ইতিমধ্যে ভাষা আন্দোলনের বদৌলতে যুক্তফ্রন্টের একুশ এবং আওয়ামী লীগের ছয় দফা অতিক্রম করে আমরা এক উল্লম্ফন-প্রক্রিয়ায় স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বত্বাধিকারী হয়েছি।' (পৃ. ১৮)। স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের পেছনে একুশের চির অম্লান, চির অজেয় চেতনার ভূমিকা ছিল মুখ্য। মূলত ভাষা আন্দোলনের অর্জন ছিল তাত্ক্ষণিক। ৭ মে ১৯৫৪ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা পায়। ১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়। আর এই বীজ থেকে পাকিস্তানকে হটিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীন ঘোষিত হয় এদেশ।

বাষট্টিতম বছরেও 'বায়ান্নের একুশ' উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে আমাদের চেতনায়। এই একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষাব্যবস্থার সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে বিশিষ্টজনদের। ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে এক ধরনের বিকৃত বাংলা বলা বন্ধ করতে হবে। বাঙালিরা শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলায় কথা বলবে এবং নির্ভুল বাংলা লিখবে—এটাই প্রত্যাশা সকলের। একুশ আমাদের তাড়িত করে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য। একুশের চেতনার কথা বলতে কেউ কেউ বলেছেন, সর্বস্তরে সকলমাত্রায় বাংলার প্রয়োগ সম্ভব করে তুলতে হবে। পৃথিবীর অন্য পাঁচটি বৃহত্ ভাষার মতোই আপন স্থানে গৌরবের সঙ্গে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে বাংলা। একুশের চেতনাকে ধারণ করে পৃথিবীর বিপন্ন ও লুপ্ত মাতৃভাষাগুলোও সজীব হতে চলেছে। ব্যাপ্ত হচ্ছে ভাষাবাহিত মানববৈচিত্র্য। একুশ বৃহত্তর অর্থে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, আর্থ-সামাজিক আন্দোলন আর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল। বর্তমানে এ ধরনের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে একুশের চেতনা কার্যকর হতে পারে। একুশ পৃথিবীর মানুষের সবার নিজ নিজ ভাষায় কথা বলার অধিকারের প্রতীক। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একুশের রোপিত অংকুর বিশাল মহীরুহে পরিণত হবে আগামীতে।

বায়ান্নর একুশের একষট্টি বছর পরও এদেশের মানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আছে বিশদভাবে। কিছুদিন আগে একজন লেখক লিখেছেন, 'বাঙালিদের বাংলা ভাষা আন্দোলন যে যুক্তিহীন ছিল সেটা জিটিভি প্রমাণ করে দিয়েছে, আজ ভারতের উর্দু চ্যানেল জিটিভি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে চলছে। কোথায় গেল বাঙালিদের উর্দু বিরোধিতা।' 'অমর একুশের ষাট বছর' প্রবন্ধে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এ ধরনের ভ্রান্তি অবসানে জানিয়েছেন, 'বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে অপর কোনো ভাষার প্রতি দ্বেষ জানানো হয়নি। পাকিস্তানের লাহোর ও করাচিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কবর ও পাকিস্তান মনুমেন্টে অদ্যাবধি বাংলা ফলক উত্কীর্ণ আছে। উর্দু ভাষার কবি নওশাদ নূরি ছয় দফা উর্দুতে অনুবাদ করেছিলেন।' (পৃ. ২০)। সম্প্রতি এক ব্লগার লিখেছেন আরেকটি বিভ্রান্তিকর তথ্য, 'বাঙালিদের বাংলা ভাষা আন্দোলনে বাংলা প্রেম ছিল না। আন্দোলন ছিল ভাষা-অর্থনীতি আন্দোলন। কারণ, রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে সরকারি চাকরি থেকে বাঙালিদের বঞ্চিত করা হতো।' হাবিবুর রহমান এ সম্পর্কে লিখেছেন, 'রাজনৈতিক উত্পীড়ন বা অর্থনৈতিক শোষণের তাত্পর্য মানুষকে বোঝাতে হয়। সময় লাগে তাকে উদ্বুদ্ধ করতে। কিন্তু মানুষের আত্মমর্যাদা যখন আহত হয়, তখন সে বিক্ষুব্ধ হয় সহজেই। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ দেশের যুবসমাজের আত্মমর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক নিদারুণ আঘাত হিসেবে দেখা দেয়। ক্ষোভ, আবেগ, বুদ্ধি ও যুক্তির একত্র সমাবেশে দুর্বার হলো সেই আন্দোলন। একটা ঔপনিবেশিক নিপীড়নের অবস্থা সৃষ্টি হলো। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দিলে আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে যাব এবং চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অন্যদের কাছে হেরে যাব, সে ধরনের ঠান্ডামাথার যুক্তি তখন আমরা তুলতাম না।'(পৃ ১৮)।

মনে রাখা দরকার, দেশের মধ্যে যতই উর্দু-হিন্দি-ইংলিশ-বাংলিশ চর্চা চলুক, আজকের প্রজন্ম কিন্তু বাংলা ভালোবেসেই একুশের চেতনায় জেগেছে। একুশ মানেই রক্তাক্ত বাংলা, বর্ণমালার ইতিহাস। মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান। লেখা আছে অশ্রুজলে। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ এক নতুন পরিচয়ে বিশ্বে নিজের জায়গা করে নিয়েছে কেবল তার ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির অভিনবত্বের কারণে। দেশকে ভালোবাসার যে মহত্তর দৃষ্টান্ত ভাষাসৈনিক ও ভাষাশহীদরা দেখিয়ে গেছেন তাতে মাতৃভাষার উচ্চারণই ছিল মুখ্য। এজন্য জনপ্রিয় গানের পঙিক্ত রয়েছে এ ভাষ্যে—'বায়ান্নোতে মুখের ভাষা কিনছি বুকের খুনে রে/ বরকতেরা রক্ত দিছে, বিশ্ব অবাক শোনে রে/ দিছি রক্ত জন্মাবধি/ কত সাগর সাগর নদী/ রক্তে বাংলা লাল কইরাছি এই কথা তো মিথ্যা নয়/ দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়।' এই ইতিহাসের কথা মনে রেখে হাবিবুর রহমানের ভাষায় বলতে হয়, 'একুশে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষার কথা কয়।' (ভাষা ও মাতৃভাষার কবিতা, পৃ. ৭৫)।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হাজার বছরের ঐতিহ্য সম্পর্কে জিন্নাহর কোনো ধারণা ছিল না। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এই জিন্নাহর ভেতর যে উর্দু ভাষা প্রীতি ছিল না তারও যথার্থ প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। উপরন্তু বাঙালি মাত্রেই বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্তর্লীন উপলব্ধিতে নিমজ্জিত—এটাও জিন্নাহ জানতে চাননি। এজন্য ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় এসে ঘোষণা দিলেন—"State language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead you is really an enemy of Pakistan." সেদিন সেই সভা থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। প্রতিবাদকারীদের অন্যতম ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তত্কালীন পূর্ব বাংলার জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। সেই ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে অধিকার আদায়ের আন্দোলন। বিশেষত ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি যখন পুনরায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা আসে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে তারপরই শুরু হয় প্রতিবাদ, ধর্মঘট ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের ঐক্যবদ্ধ লড়াই। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জড়িত হয়ে যায় ভাষা বিতর্কে। শেখ মুজিবের মতো অনেক প্রগতিশীল নেতা প্রত্যক্ষ প্রেরণা জোগান সেই আন্দোলনে। ২১ ফেব্রুয়ারির হত্যাকাণ্ডের পর ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরে এবং ছাত্ররা 'ব্লাডি নুরুল আমিন'-এর পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগসহ পাকিস্তানপন্থিদের ভরাডুবি ঘটে। রাজনৈতিক আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রথম বিজয় সূচিত হয় গণমানুষের।

একুশের সারণি বেয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামক স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের গৌরবদীপ্ত পদচারণাকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল। অর্থাত্ আজকের স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে। ভাষা আন্দোলনের সময় আমাদের দাবিটি ছিল নায্য এবং গণতান্ত্রিক। কারণ, বাংলাই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা নয়, বরং বাংলা হবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। একুশ আমাদের শিখিয়েছে যে, সব ভাষার প্রতি সমান সম্মান দেখানো উচিত। কারণ, সব ভাষাই মূল্যবান। ভাষা প্রশ্নে যেমন বায়ান্নতে মানুষ একত্রিত হয়েছিল ধর্মবর্ণ নির্বিশেষ বাঙালি পরিচয়ে তেমনি একাত্তরে পাকিস্তানি অপশক্তিকে রুখতে এবং একটি শোষণহীন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ অর্জন করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। চেতনাগত দিক থেকে বায়ান্ন ও একাত্তর একইসূত্রে গাঁথা বিজয়মালা। গতবছর (২০১৩) যখন ভাষার মাসে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের আবির্ভাব হলো তখনো আমরা বিস্ময়াভিভূত দৃষ্টিতে দেখলাম, ভাষা-আন্দোলনের ষাট বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নবতর উন্মাদনা নিয়ে মানুষের মাঝে দীপ্যমান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বিচারের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি একুশ ও একাত্তরকে একীভূত করে খুঁজে পেল। একুশ ও একাত্তরের চেতনা অপশক্তিকে রুখতে পারে। পারে মানুষকে শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখাতে।

সাংস্কৃতিক তাত্পর্যের কারণে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আজ পৃথিবীর দু-শত দেশ বাংলাদেশের বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে ঘোষিত সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গৌরবকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার উপেক্ষিত হলেও ১৭ ফেব্রুয়ারি (২০১৪) দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপন, নাম ফলক ও গাড়ির নম্বর প্লেট বাংলায় লেখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা।' সুপ্রিম কোর্ট রুলসেও ভাষা হিসেবে প্রথমে 'বাংলা' এবং পরে আদালতের ভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। দেশের নিম্ন আদালতের প্রায় সর্বক্ষেত্রে বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া হচ্ছে। ১৯৮৭ সালে প্রণীত বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, 'আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে।' ১৯৯১ সালে ভাষা নিয়ে হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্র ভাষার অর্থ, যে ভাষা রাষ্ট্রের সব কাজে ব্যবহূত হয়। ওই রায়ে ইংরেজির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়নি। কারণ হিসেবে বলা হয়, ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা আইনে আদালতে রাষ্ট্রভাষা ছাড়া অন্য ভাষার প্রচলন রদ করার কোনো বিধান নেই। তবে অনেক বিচারপতিই উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় দিয়েছেন। 'আইন শব্দকোষ' প্রণেতা হাবিবুর রহমান বলেছেন, 'দেশের আইন ও সংবিধান সম্পর্কে সম্যক পরিচয় ও উপলব্ধি মাতৃভাষার মাধ্যমে অর্জিত না হলে দেশের প্রশাসনে নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে না এবং আইনের শাসনের আলোকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না।'(পৃ ৫১-৫২)।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ায় আমাদের দায়িত্ব আরো বেড়েছে। এই দিবসটি মনে করিয়ে দিচ্ছে ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের সারণি বেয়েই আমাদের বিশ্বায়নের যুগে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে হবে। এজন্য অপরের মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রত্যয় গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে দেশের শান্তি, প্রগতি, উন্নয়ন এই একুশের চেতনার সঙ্গে বিজড়িত। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, 'একুশের ষাট বছরে আমাদের ভাষার দৈন্যমোচনে আমাদের যে কর্তব্য তা শুধু যে পালন করতে হবে, তা-ই নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমাদের ওপর আরেকটা বাড়তি দায়িত্ব পড়েছে, সকল ভাষার উন্নতিকল্পে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। এক্ষেত্রে ঘরে বদান্যতা প্রদর্শন করে আমাদের দেশে যে অ-বাংলা ভাষা রয়েছে তা সংরক্ষণ ও প্রসারণের জন্য বিশেষভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।' (পৃ৫৪)। এই দায়িত্ব পালনের মধ্যে একুশ ও একাত্তর একীভূত বলে আমরা মনে করি।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৭
ফজর৩:৪৫
যোহর১২:০২
আসর৪:৪২
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১৩সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :