The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

নানা ষড়যন্ত্রের শিকার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

আহমদ রফিক

অবিভক্ত ভারতে মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিল অবাঙালি প্রাধান্য। এ.কে. ফজলুল হক বৃথাই চেষ্টা করেছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে জায়গা করে নিতে, কিন্তু পারেননি। বরং জিন্নাহর সমালোচনার দায়ে তিনি মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। তার সমালোচনার কারণ, লীগ নেতৃত্বের বাংলা ও বাঙালির প্রতি অবহেলা। সেখানে অবশ্য ব্যক্তি ফজলুল হকের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও জড়িত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এদিকটা বরাবর উপেক্ষা করেছেন তার স্বভাবসুলভ একনায়কী কায়দায় যা ফজলুল হক মেনে নিতে পারেননি।

মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বাংলা-বাঙালি বিরোধিতার প্রমাণ মেলে যেমন জিন্নাহ-লিয়াকত-নিশতার প্রমুখের বয়ানে তেমনি মেলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাস কয় আগে অপেক্ষাকৃত উদারপন্থি হিসেবে পরিচিত যুক্তপ্রদেশ (ইউপি)বাসী চৌধুরী খালিকুজ্জামানের বক্তৃতায়। হায়দারাবাদে এক সভায় ১৭ মে তিনি বলেন যে, উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। এ আগাম ঘোষণা বিচলিত করেছিল কিছু সংখ্যক বাঙালি কবি, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে। তারা এর প্রতিবাদও করেন একাধিক প্রবন্ধ লিখে ১৯৪৭-এর জুন-জুলাই মাসে। ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠা তখন নিশ্চিত।

প্রসঙ্গত রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে সৃষ্ট বিতর্কে পণ্ডিতপ্রবর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতামত স্মরণ করার মতো। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন হবু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে মতামত প্রকাশ করায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তার মতে, বাংলাকে পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রভাষা ও উর্দুকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। মন্তব্য প্রকাশিত হয় ১৯৪৭-এ জুলাইয়ের শেষদিকে দৈনিক 'আজাদ'-এ। অবশ্য নানা ঘটনাক্রমে এ বিষয়ে তাঁর স্ববিরোধী মন্তব্যও লক্ষ করার মতো, যখন তিনি বলেন, রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে আরবি এবং ইংরেজিকেও বিবেচনায় রাখা উচিত। বিষয়টিকে কেউ কেউ উর্দুর বিরুদ্ধে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। কারণ, পরবর্তী সময়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে সুস্থির ধারাবাহিক মতামত প্রকাশ করেছেন। তবে শর্ষের মধ্যেও ছিল ভূতের অবস্থান। শাসক মুসলিম লীগের দলীয় রাজনৈতিক নেতারা তো বটেই, শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী অনেকেই ছিলেন উর্দু রাষ্ট্রভাষার পক্ষে, এমনকি 'সওগাত'-এর মতো প্রগতিশীল পত্রিকা এবং এর সম্পাদকীয় লেখক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী। কারণ যেমন পাকিস্তানের স্থপতিসহ শীর্ষ লীগ নেতাদের মতামত তেমনি ভারতে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দি প্রচলনের উদ্যোগের প্রতিক্রিয়া। হয়তো এসব কারণে সওগাত সম্পাদকীয়তে এমন মন্তব্য সম্ভব হয়েছিল : 'ইংরেজির স্থলে উর্দুই অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা (Linguafranca) হইবে এবং হওয়া উচিত। ... উর্দুর বিশেষ সম্মান যেন আমরা ক্ষুণ্ন করিতে অগ্রসর না হই'।

এ জাতীয় ধারণার বিরুদ্ধে অবশ্য তমদ্দুন মজলিসসহ প্রগতিশীল ঘরানার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁদের মতামত প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ ব্যক্তি। এ সময়ের একটি বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় বলা হতে থাকে যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা ও আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা উর্দু হলেও পূর্ব পাকিস্তানের 'রাষ্ট্রভাষা' (আসলে সরকারি ভাষা) ও শিক্ষার বাহন হবে বাংলা। সওগাত, দৈনিক আজাদ (মওলানা আকরম খাঁ) এবং অনুরূপ গোষ্ঠী এমন মতামতের প্রবক্তা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে অন্যতম কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ধামাচাপা দেওয়াই ছিল এজাতীয় তত্পরতার লক্ষ্য। এমন প্রচেষ্টা প্রাক-বায়ান্ন সময় পর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

বুঝে বা না বুঝে এ ধরনের বিভ্রান্তির শিকার হয়েছিলেন একাধিক বিশিষ্টজন বা গোষ্ঠীবিশেষ। অবশ্য জ্ঞানপাপী কবি গোলাম মোস্তফা, সাংবাদিক মুজীবর রহমান খাঁ ও মওলানা আকরম খাঁ বা আমলা মীজানুর রহমান প্রমুখের কথা আলাদা। তারা ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাভিত্তিক পাকিস্তানবাদে আচ্ছন্ন (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অবশ্য এদের সম্পর্কে 'মতিচ্ছন্ন' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন)। কিন্তু মধ্যপন্থিরা বা বাংলাপন্থিদের অনেকে যে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার তত্পরতায় নিহিত আপাত-সারল্যের চাতুরি কতটা বুঝতে পেরেছিলেন বলা কঠিন। তাই দেখা যায় ১৯৪৭-এর '১৭ নভেম্বর বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলিয়া ঘোষণা করার অনুরোধ জানাইয়া পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রীর নিকট একখানি স্মারকপত্র দাখিল করা হইয়াছে' ('আজাদ' ১৮. ১১. ১৯৪৭)। স্মারকপত্রে সই করেন মওলানা আকরম খাঁসহ খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিকসহ অনেকে। অবাক হতে হয় দেখে, এ জাতীয় প্রচেষ্টা চলেছে ১৯৫১ সাল অবধি। সম্ভবত মূল দাবি থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর কৌশল। এ সাধারণ কাজটি তাই ঝুলিয়ে রাখে প্রাদেশিক সরকার। এবং ১৯৫১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতেও অনুরূপ স্মারকলিপি পেশ করা হয়। স্বাক্ষরকারীদের অন্যতম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ, এমনকি ড. কাজী মোতাহার হোসেনসহ একাধিক বিশিষ্টজন।

আমার ধারণা, এসব ক্ষেত্রে 'রাষ্ট্রভাষা' শব্দটিকে বিভ্রান্তিকর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এবং বিষয়টিকে নিয়ে বক্তৃতা, বিবৃতির মাধ্যমে যথেষ্ট পানি ঘোলা করা হয় যাতে ওই ঘোলাপানিতে যে যার মতো করে শিকার কাজ চালিয়ে যেতে পারে। তাই একদিকে পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের পক্ষে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সুপারিশ (২৭ নভেম্বর, ১৯৪৭) অন্যদিকে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঢাকায় ছাত্র বিক্ষোভ ও মিছিল, তাতে কিছু সংখ্যক সরকারির যোগদান। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদের মোড় ঘোরাতে তমিজুদ্দীন খানের বিবৃতি : 'পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা উর্দু হইবে না' (আজাদ, ১৪.১২.১৯৪৭) এবং পরদিন মুসলিম হলে ছাত্রসভায় মওলানা আকরম খাঁর অনুরূপ ঘোষণা। তদুপরি অবস্থা সামাল দিতে পাকিস্তান শিক্ষা দফতরের প্রেস বিবৃতি : 'উর্দুকে সাধারণ ভাষা করার জন্য সুপারিশ করা হইয়াছে মাত্র' (আজাদ, ১৭.১২.১৯৪৭)। উল্লেখ্য, এসময় সিলেটের মহিলারা রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ ঘটান বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবি জানিয়ে (আজাদ, ২৪.১.১৯৪৮)।



দুই

বহুসংখ্যক উদ্ধৃতির পরিবর্তে স্বল্প পরিসরে মূল বক্তব্য প্রকাশের তাগিদে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী থেকে খাজা নাজিমুদ্দীন বা তমিজুদ্দীন খান পর্যন্ত শীর্ষ মুসলিম লীগ নেতা কেউ বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে ছিলেন না। বাংলা, বাঙালির স্বার্থ দেখা তো দূরের। বাঙালি লীগ নেতাদের অবাঙালি লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে এ আত্মসমর্পণ ও বাঙালি স্বার্থ বলিদানের কারণ সহজেই বোঝা যায়। মূলত ব্যক্তিস্বার্থ ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতাই সেক্ষেত্রে শক্তিমান উপকরণ হিসেবে কাজ করেছে। আর জিন্নাহর ১১ আগস্টের গণতান্ত্রিক ভাষণ ছিল কথার কথা। তার প্রমাণ মেলে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯ মার্চ ঢাকা সফরে এসে প্রতিটি বক্তৃতায় উর্দু রাষ্ট্রভাষার পক্ষে তার জবরদস্ত প্রকাশ। ধাতব কণ্ঠের সে বক্তৃতার চাপ অনেককে ভাসিয়ে নিলেও ছাত্রসমাজের বড়-সড় অংশ সে চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। তারা দেখতে ভুল করেনি, পাকিস্তানে বাঙালি-অবাঙালিকে কেন্দ্র করে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গৃহীত বৈষম্যমূলক নীতির প্রকাশ। নানা ঘটনায় তার প্রমাণ মেলে।

যেমন—পর্যায়ক্রমে ঢাকায় গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে রাজকুমার চক্রবর্তী যে প্রস্তাব রাখেন, নানা কুযুক্তি দেখিয়ে এক কথায় তমিজুদ্দীন খান তা বাতিল করে দেন। কংগ্রেস সদস্যরা বাদে গোটা গণপরিষদ তার পক্ষে। একমাত্র ব্যতিক্রম শায়েস্তা ইকরামউল্লাহ। তার যুক্তি, পূর্ব পাকিস্তানিদের এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, তারা অবহেলিত এবং পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের ''কলোনি'' হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে' (স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, ১ম খণ্ড, ২৪-২-১৯৪৮)। কিন্তু কোনো সত্ পরামর্শ পাকিস্তানি নেতৃত্বের চিন্তা-ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারেনি।

শক্তিশালী কেন্দ্র ও দুর্বল প্রদেশ (পাঞ্জাব ব্যতিক্রম) এবং প্রাদেশিকতার ধ্যান-ধারণা পাকিস্তান চেতনার দুশমন এমন এক রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে পাকিস্তানি শাসন সূচনালগ্ন থেকে পরিচালিত হয়েছে এবং তা পাক গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ ও তার অনুসারীদের হাত ধরে। জিন্নাহর ঢাকা-বক্তৃতায়ও তা স্পষ্ট। অথচ অবিভক্ত ভারতে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ ও পাকিস্তান দাবির ক্ষেত্রে জিন্নাহর মূল দাবি ছিল দুর্বল কেন্দ্র, শক্তিশালী প্রদেশ ও প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন। অন্যদিকে কংগ্রেসের দাবি এর ঠিক বিপরীত। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জিন্নাহ তার পূর্বচিন্তা পাল্টে ওই বিপরীতকেই শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেন। তার অনুসারীরা গানের ধুয়ার মতো তাদের 'কায়েদে আজম'-এর বক্তব্যই দিনরাত উচ্চারণ করতে থাকেন। উদ্দেশ্য একটাই—গরিষ্ঠ জনসংখ্যার পূর্ববঙ্গকে আর্থ-সামাজিক দিক থেকে দাবিয়ে রাখা। আর একাজে ব্যবহারিক নীতি হিসেবে তারা কয়েকটি বিষয়ের বিরুদ্ধে বলতে গেলে জিহাদ ঘোষণা করেন এবং সে উপলক্ষে চলে দমননীতি ও মিথ্যা প্রচার, ভারত-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ ঘটানো। সেইসঙ্গে কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে গরল উদ্গীরণ।

ভাষা আন্দোলনের চরিত্র হননে জিন্নাহ থেকে লিয়াকত, নাজিমুদ্দীন ওই একই নীতির অনুসারী। মুসলিম লীগপন্থি রাজনীতিক, পাকিস্তানবাদী সাহিত্যিক-সাংবাদিক, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী ওই একই পথের দিশারী। সেইসঙ্গে বিশেষ কয়েকটি সংবাদপত্র। বিশেষভাবে নবাববাড়ির পত্রিকা 'মর্নিং নিউজ' ভাষা আন্দোলন বিষয়ক মিথ্যাচারে এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রচারে সাংবাদিকতার নিয়মনীতি সবকিছু বিসর্জন দিয়ে কুখ্যাতি অর্জন করে। 'ভয়েস অব নেশন' কালো কালিতে ঢাকা পড়ে যায়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষক্রিয়ার টানে বায়ান্নর চরিত্র হননে এমন শিরোনাম ব্যবহারে তদের অরুচি ছিল না যে, 'ডোটিস রোমিং ঢাকা স্ট্রিটস'। এমন বহু উদাহরণের একটি উদাহরণই বোধহয় যথেষ্ট। কারণ, একুশের প্রতিদিনের মিছিলে কিছু সংখ্যক অমুসলিম ছাত্র থাকলেও ধুতি পরিহিত কেউ ছিল না। আর প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন তার পল্টনি বক্তৃতায় (২৭.১.১৯৫২) স্পষ্ট ভাষায়ই বলেন, 'পাকিস্তানকে আমরা এছলামী রাষ্ট্ররূপে গঠন করতে যাইতেছি। ... মরহুম কায়েদে আজম বলিয়াছেন যে, প্রাদেশিকতাকে যে বা যাহারা প্রশ্রয় দেয় তাহারা পাকিস্তানের দুশমন' (আজাদ, ২৮.২.১৯৫২)। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি একই কথা বলেন রাষ্ট্রভাষা উর্দু ও প্রাদেশিকতা সম্পর্কে এবং সব কথাই তাদের 'কায়েদে আজমের' বক্তব্যের সূত্র ধরে। যিনি ১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে (২১ মার্চ) ও কার্জন হলে সমাবর্তন বক্তৃতায় (২৪ মার্চ) ভাষা আন্দোলনকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশের শত্রু, ভারতের চর ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করেন। তাদের কঠোর শাস্তির মাধ্যমে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে, অন্যকোনো ভাষা নয়। আর প্রদেশের ভাষা কী হবে তা জনমতই নির্ধারণ করবে।

প্রাদেশিকতার বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্যে জিন্নাহ তার মতামত ব্যক্ত করেন। কমিউনিস্ট, ভারতীয় এজেন্ট, পঞ্চম বাহিনীর বিরুদ্ধেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে মুসলিম লীগের খেদমতে সদা হাজির থাকার আহ্বান জানান। তার বক্তৃতায় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় চেতনার প্রকাশ ছিল স্পষ্ট। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু ছাত্র প্রতিনিধির অজুহাতে তাদের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষ সাক্ষাতের ইচ্ছায় জিন্নাহর চরম সম্প্রদায়বাদী মানসিকতার প্রকাশ। পাকিস্তানের পরবর্তী শাসকরা জিন্নাহর নির্ধারিত পথ ধরেই চলেছেন। সেইসঙ্গে অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হিন্দু বিতাড়নের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু প্রদেশে পরিণত করা। সে প্রচেষ্টার নগ্ন রূপ দেখা গেছে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতায়।

একুশের ভাষা আন্দোলনের চরিত্র বিকৃতি ঘটাতে তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী তার পূর্বসূরিদের পথ ধরেই চলেছেন। এবং এক পা বাড়িয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি ও ৩ মার্চের বেতার বক্তৃতায় ভাষা আন্দোলনের জন্য সরাসরি ভারতকে দায়ী করেছেন এবং আন্দোলনের উদ্দেশ্য পাকিস্তান ধ্বংস করা, এমন কথাও বলেছেন। বলেছেন, এরা ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু। আর আন্দোলন একটি রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ষড়যন্ত্র। তার ভাষায়, 'রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য কতিপয় কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বিদেশি দালাল ও অসন্তুষ্ট রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে গভীর ষড়যন্ত্র চলিতেছিল, সরকারি ব্যবস্থার ফলে তাহা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হইয়াছে'। তিনি আরো বলেন, 'কেবলমাত্র পাকিস্তান নয়, এছলামও এখন এক মহা পরীক্ষার সম্মুখীন' (আজাদ, ৪.৩.১৯৫২)। এ পর্যায়ে সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আজাদ সম্পাদকীয়তে মন্তব্য : 'নারায়ণগঞ্জের মিছিলে প্রকাশ্যভাবে যুক্তবাংলা চাই' ও 'জয় হিন্দু' ধ্বনি যে রাষ্ট্রবিরোধীদের অস্তিত্ব ও দুষ্ক্রিয়ার প্রমাণ একথা অস্বীকারের উপায় নাই' (৫ মার্চ, ১৯৫২)। 'ইসলাম বিপন্ন' এ শ্লোগান শুধু পাকিস্তান আমলেই নয়, অবিভক্ত ভারতে মুসলিম লীগ তার রাজনৈতিক স্বার্থে বরাবর ব্যবহার করেছে। অথচ খ্যাতিমান পাকিস্তানি সাংবাদিক জেড এ সুলেরি তার ঢাকা সফর শেষে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তার পত্রিকায় ও সংবাদ মাধ্যমে যে, ভাষা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-অছাত্র সবাই গভীর ভাষা প্রেম থেকে আন্দোলন সংঘটিত করেছে, রাষ্ট্রধ্বংসের জন্য নয়। শাসকদের উচিত উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, পশ্চিম পাকিস্তানের দু-একটি দৈনিক পত্রিকাও তাদের মত পরিবর্তন করেছে।

সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে অবমুক্ত একুশের আন্দোলন বিষয়ক গোপন দলিলের যেসব তথ্য উঠে এসেছে এবং সে সব নিয়ে মীজানুর রহমান খান যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করে চলেছেন তাতেও দেখা যায়, মার্কিন কূটনীতিকরা এ আন্দোলনটিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের গোপন ডেসপ্যাচগুলো তথ্যনির্ভর, সবসময় যে সরকার সমর্থনে পক্ষপাতদুষ্ট তা নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ। তবে এ আন্দোলনে কমিউনিস্ট প্রভাব, সাম্রাজ্যবাদ তথা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা ও ভারতীয় সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার প্রকাশ তাতে আতিশয্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে 'লাল জুজু'র ভয়টা তাদের বরাবরই বেশি, এক্ষেত্রেও তেমন প্রভাব লক্ষ করার মতো। ভাষা আন্দোলনের সংগঠকরা এ পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় বড় একটা সোচ্চার ছিলেন না, অন্তত শ্লোগানে তো নয়ই। তখন মূল শত্রু স্বৈরাচারী, বাংলা-বাঙালি-বিরোধী পাকিস্তানি শাসকশক্তি যারা বাংলার ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত দাবি মেনে নিতে গররাজি। আর সেজন্যই আন্দোলন যা একালের মতো সহিংসতার চরিত্র অর্জন করেনি। ছাত্র সমাজ ও জনসমর্থন ভিত্তি করেই ভাষা আন্দোলন তার সফলতা ও সার্থকতা অর্জন করেছে। প্রভাব রেখেছে রাজনীতিতে এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়। সে প্রভাব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ও আধুনিকতার চরিত্রে ইতিবাচক।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২২
ফজর৪:১৮
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৩০
এশা৭:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :