The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

বাঙালি সেদিন ঘরে ফিরেছিল

রণেশ মৈত্র

আমার বিবেচনায় বাঙালি জাতির অত্যন্ত গৌরবজনক বিজয় তার ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছিল। এ ব্যাপারে জাতির কোন অংশের মধ্যেই কোনপ্রকার ভিন্নমত আজও পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু তার পরেও কথা থেকে যায়। কথা থেকে যায় ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অর্জিত বাঙালি জাতির প্রথম বিজয়কে নিয়ে। বিশেষ করে সেই আমরাই সেই বাঙালি জাতিই যখন বলি, ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বলেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করতে পেরেছি। তাহলে দুটি বিজয়ই গুরুত্বপূর্ণ—দুটি বিজয়ই তাত্পর্যবহ। এ বিষয়গুলি বুঝতে হলে দুটি আন্দোলনেরই পটভূমি সামনে রাখা প্রয়োজন। এক. ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসব্যাপী সশস্র সংগ্রাম। অত্যন্ত কঠিন সে সংগ্রাম। অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী, দেশীয় রাজাকার আলবদর, আল শামস ও আলবদর বাহিনী, শান্তিকমিটি প্রভৃতির বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই। দুই. কিন্তু স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের কালরাত্রি আসার আগে মাসব্যাপী ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন, তার আগে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ছয় দফা, এগার দফার প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ রায় প্রদান ও পূর্ব বাংলার প্রায় সকল আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়ে সর্বত্র পাকিস্তানে তাদের এবং বাঙালি জাতির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে গণআন্দোলনের নতুন মাত্রা অর্জন। তিন. তার আগে ১৯৬৯ এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এক বিপ্লবী পটভূমি রচনা। চার. ১৯৬২ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ধারাবাহিক গণআন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে চলে আসা।

এবারে দেখা যাক, ভাষা আন্দোলনের পটভূমি কেমন ছিল। এক. ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু তার আগে? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষপ্রান্তে এসে যখন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ অতিমাত্রায় দুর্বল হয়ে পড়ে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম তখন আরও তীব্র হয়ে নতুন মাত্রা অর্জন করে এবং ইংরেজদের পরাজয় ও ভারতবাসীর স্বাধীনতা অর্জন অনেকাংশেই সুনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ভীত সন্ত্রস্ত ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী মুসলিম লীগকে হাত করে। মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহোর কাউন্সিলে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলি নিয়ে মুসলমানদের সতন্ত্র আবাসস্থল হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে। অর্থাত্ ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্তি। এই তত্ত্বকে দ্বিজাতিতত্ত্ব বলে অবিহিত করা হয়।

মুসলিম লীগ এই দাবি উত্থাপনের সাথে সাথে প্রধানত হিন্দু নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিকপার্টি প্রভৃতি তার তীব্র বিরোধিতা করলে ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক অংশের সাথে ষড়যন্ত্র করে নানাস্থানে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করে। এতে দফায় দফায় এই দাঙ্গা বাধিয়ে প্রায় এক লক্ষ নিরীহ হিন্দু-মুসলমান নর-নারী হত্যা, অপহরণ, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ লুটপাট প্রভৃতির মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলো যাতে কোন ক্রমেই এর কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে সর্বজনশ্রদ্ধেয় অসাম্প্রদায়িক জননেতা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। তা হলে পটভূমিটা দাঁড়ালো এক হিন্দুু মুসলমানের মধ্যে চরম অবিশ্বাস সৃষ্টি। একে অপরের শত্রু বলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রতিভাত করা হলো। দুই. পরিণতিতে ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রশ্নে গণভোটের ব্যবস্থা হলে সেই গণভোটে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় বিপুল সংখ্যক ভোটে একচেটিয়াভাবে পাকিস্তান দাবীর অনুকূলে তাদের সমর্থন ঘোষণা করেন। অতপর ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। তিন. পরিণতিতে হিন্দুু জনগোষ্ঠীর ব্যাপকভাবে দেশত্যাগসহ শিক্ষা, দীক্ষা, শিল্প বাণিজ্য সরকারি বেসরকারি সকল ধরনের চাকুরিতে ও পেশায় এক ভয়াবহ শূন্যতার সৃষ্টি হয়। চার. পুরো আবহটাই সৃষ্টি হয় ঘোর সাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনায় ভরপুর। হিন্দুর সম্পত্তি দখল করা অলিখিতভাবে বৈধতা অর্জন করে ইত্যাদি। পাঁচ. বাংলা ভাষা হিন্দুর ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি হিন্দুর সংস্কৃতি ইত্যকার প্রচার প্রচারণা চালাতে থাকেন পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক অবাঙালি শাসকগোষ্ঠী। ফলে উত্থাপিত হতে থাকে উর্দু বা আরবী প্রভৃতি বিদেশি ভাষাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা প্রসঙ্গ। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সূক্ষ্ম এহেন সন্দেহ অবিশ্বাস এমন ভয়াবহ দাঙ্গা ও দেশত্যাগ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিরেধী এমন অপপ্রচারের পটভূমিতে পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবী উত্থাপন চাট্টিখানি কথা ছিল না। ছয়. তদুপরি পাকিস্তানের ঐ শাসকগোষ্ঠী বাঙালি মুসলমানকে মুসলমান বলে মানতেও রাজী ছিলেন না।

এই পটভূমিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় মাস পরের ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ভাষা আন্দোলনের সরব সূচনা করা হয়। আন্দোলনকারীদেরকে পাকিস্তানের দুশমন ভারতের দালাল, হিন্দুদের দালাল বলে অবপাদও দেওয়া হয়। এই সব কিছুকে অস্বীকার করে মাতৃভাষা বাংলাকে উপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার যে সাহসী সংগ্রামের সূচনা হলো ১৯৪৮ এর শুরুতে—তাই পল্লবিত হয়ে ১৯৫২ তে এক অপ্রতিরোধ্য গতি সঞ্চার করে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা জারি তা অমান্য করা এবং অদম্য সাহসিকতার সাথে ঐদিন পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়ে শহীদ হওয়ার মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া এবং বাঙালি সংস্কৃতি বাংলা কাব্য সাহিত্য বিকাশের অনুকূল পথ রচনা করার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে দ্বিজাতিতত্ত্বের অবমান এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও জাতি হিসেবে সবাই বাঙালি এটাই মুখ্য এবং কে হিন্দু কে মুসলমান সে প্রশ্ন গৌন প্রভৃতি বোধের জাগরণ না ঘটাতে পারলে মুক্তিযুদ্ধ অসম্ভব হয়ে পড়তো। এর আগে মুসলমানদের চোখ আরবমুখী এবং হিন্দুদের চোখ গয়াকাশী বৃন্দাবনমুখী করে তোলা হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন সেই বাঙালিকে ঘরে ফিরিয়ে আনে। তাই ভাষা আন্দোলনের বিজয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

[ লেখক: ভাষাসৈনিক]

E-mail:[email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
3 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৩
ফজর৪:৪৪
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৬
সূর্যোদয় - ৬:০০সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :