The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম

মুহম্মদ সবুর

১৯৪৭ সালে দেশ যখন ভাগ হলো, তরুণ ছাত্র নেতা শেখ মুজিব উপলব্ধি করলেন, এক উপনিবেশ থেকে বাঙালি আরেক উপনিবেশের অধীন হলো। কলকাতা ছেড়ে আসার আগে ঘরোয়া বৈঠকে সহকর্মী ছাত্রনেতা কয়েকজনকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, "আমরা শেষ হয়ে গেছি, নতুন করে সংগ্রাম শুরু করতে হবে।" ঢাকায় এসে রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে বুঝতে পারলেন যে, বাঙালি জাতি শেষ হয়ে গেছে, 'সেই দিনই শপথ নিলাম, বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে হবে'। আর তার কিছুদিন পরই দেখলেন বাঙালির ভাষা ও কৃষ্টির উপর স্বয়ং পাকিস্তানের নেতা জিন্নাহ্সহ শাসকগোষ্ঠীর আঘাত। থেমে থাকেননি। প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। এই সংগঠনের নেতৃত্বেই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে শুরু করেন আন্দোলন। বাঙালি জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার প্রশ্নটি ছিল তীব্র। 'রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে আন্দোলন করতাম'- কী কঠিন অবস্থা ছিল। জনগণের ঘোর কাটানো ছিল প্রধান দায়িত্ব। ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ আন্দোলনে সামিল হলেও জনগণ ছিল নির্জীব। 'সেদিন অক্টোপাসের মত চারদিক থেকে বাংলাকে এবং বাঙালিকে শেষ করতে ষড়যন্ত্র চলছিল'। ঠিক সে সময়ই ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শেখ মুজিব গ্রেফতার হলেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীসহ জেলে আটক থাকা অবস্থায় সংকল্পে আরো দৃঢ় হন যে, বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে, নতুবা ব্রিটিশদের নির্মম শোষণ শেষে পাকিস্তানি প্রভুদের শোষণ শাসনে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াবে। বাঙালি জাতি বলে কিছুই থাকবে না। যে জাতি কিছুদিন আগেই 'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান' বলে আন্দোলন করেছে, তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে হবে বাংলা ও বাঙালিকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গবন্ধুর জানা ছিল সংস্কৃতির বাহন হিসেবে ভাষা হচ্ছে জাতির সামগ্রিক ঐতিহ্যের ধারক। ভাষা নিছক ভাবপ্রকাশ মাত্রে সীমাবন্ধ নয়, একটি জাতির সার্বিক বিকাশ-বিনিময়ের মাধ্যম। মাতৃভাষা দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা না পেলে সেই ভাষাভাষি মানুষের প্রাধান্য অস্বীকৃত হয়, তারা হয়ে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তার ভাষাতে। রাষ্ট্র জাতির পরিচয়ের চেয়ে অনেক গভীরে নিহিত সেই পরিচয়ের শিকড়। দেখলেন, বাংলাকে উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিম ভূভাগকে সমৃদ্ধ করে নিচ্ছে।

বাঙালির ভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেবার সকল আয়োজন ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব একাট্টা হয়ে জীবন মরণ লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তিনি জাতিকে দৃষ্টি ফেরাতে বলেন প্রিয় বাংলা ভাষা ও বাঙালি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যের দিকে। বাঙালি তার বৈশিষ্ট্যগুলো চিনে নিতে শুরু করে, পাকিস্তানি আর বাঙালিতে দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্রতর হতে থাকে। কায়মনে বাঙালি হবার জন্য শেখ মুজিব তাঁর জীবন সাধনা ও সংগ্রাম শুরু করেন সেই ১৯৪৮ সালেই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় যখন একদল বাঙালি 'অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। কিন্তু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতারা শ্লোগান দিলেন, 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। পাকিস্তানিরা শুরু থেকেই 'বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে নানাভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। সংস্কৃতির একমাত্র নিয়ামক শক্তি হিসেবে সামনে তুলে ধরে ধর্মকে। বঙ্গবন্ধু দেখলেন, পাকিস্তানি শাসক চক্র বাংলা ও উর্দুর মিশ্রণে নতুন পাকিস্তানি ভাষা উদ্ভব, কিংবা আরবী হরফে বাংলা লেখার জন্য নানা অপচেষ্টা চলছিল। বাংলা বর্ণমালা, বানান, ব্যাকরণ প্রভৃতির সংস্কার, বাংলা ভাষা সরলীকরণ, রোমান ও আরবী হরফে বাংলা লেখা প্রবর্তন প্রভৃতি উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে ও সেই সূত্রে বাংলা সাহিত্যকে দুর্বল ও বিকৃত করে, বাঙালি সংস্কৃতিকে পঙ্গু খণ্ডিত করে এবং ওই পথ ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনাকে সমূলে উত্পাটিত করার সার্বিক অপপ্রয়াস চালানো হয়। শেখ মুজিব ক্রমশ প্রতিরোধী হয়ে ওঠেন। ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সংহত করতে প্রাগ্রসর ভূমিকা রাখে। তারপরও বাঙালির ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানি নয়াউপনিবেশবাদী শাসক শোষক চক্রের ষড়যন্ত্র বাড়ে। এক্ষেত্রে তারা বাঙালি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সহায়তা পায়। শেখ মুজিব বুঝেছিলেন যে, গণতান্ত্রিক, শোষণহীন, মানবিক সমাজ বিনির্মাণে পাকিস্তান এক অনুর্বর ক্ষেত্র।

স্বাধিকার আদায়ের জন্য ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে যে ভাষণ দেন, তাতে আবেগপূর্ণ ভাষার আড়ালে প্রতিরোধী হবার, কঠিন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হবার আহ্বান জানান। সাত মার্চ ভাষণের পূর্ব পটভূমি এই ভাষণে মেলে। 'প্রয়োজনে বাঙালি আরো রক্ত দেবে, জীবন দেবে, কিন্তু স্বাধিকারের প্রশ্নে কোন আপস করবে না। বাংলার মানুষ যাতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে, বরকত, সালাম, রফিক, শফিকরা নিজেদের জীবন দিয়ে সেই পথ দেখিয়ে গেছেন। বাহান্ন সালে রক্তদানের পর বাষট্টি, ছেষট্টি, উনসত্তরে- বারবার বাঙালিকে রক্ত দিতে হয়েছে। কিন্তু আজও সেই স্বাধিকার আদায় হয়নি। আজও আমাদের স্বাধিকারের দাবি বানচাল করে দেবার ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য বাংলার ঘরে ঘরে প্রস্তুত হতে হবে। এবার চূড়ান্ত সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর ভাষা এবং ভাষা ব্যবহারের সৌন্দর্য ছিল গণমানুষের সহজবোধ্যতাকে ধারণ করে। ভাবীকাল যখন এই ভাষণগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে যাবেন, দেখা মেলবে, সময় এবং স্থান কাল পাত্রকে সামনে রেখে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে মেলে ধরেছেন। একটি জাতি, তার ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর কাজটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার নিজস্ব চর্চার মধ্য দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৩
ফজর৪:৪৪
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৬
সূর্যোদয় - ৬:০০সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :