The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ২৬ মার্চ ২০১৪, ১২ চৈত্র ১৪২০, ২৪ জমা.আউয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বাংলাদেশরে মেয়েরাও হারল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে | শিবগঞ্জে ফুল দেয়ার সময় বিস্ফোরণে নিহত ১ | শিবগঞ্জে ফুল দেয়ার সময় বিস্ফোরণে নিহত ১ | জাতীয় গ্রিডে যোগ হলো আরো ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

অসহযোগ আন্দোলনে ঢাকা বেতার

মোবারক হোসেন খান

আমি তখন বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রের সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে মূলত কেন্দ্রের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছি। কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক তখন আশরাফ-উজ-জামান খান। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সকল কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালকদের মধ্যে প্রবীণ ব্যক্তি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত গতিশীল বেতার ব্যক্তিত্ব। ১ মার্চ ১৯৭১ সালে তাঁর সঙ্গে স্টুডিওতে বসে কেন্দ্রের সহকারী আঞ্চলিক পরিচালকবৃন্দ প্রেসিডেন্টর ভাষণ শুনছিলাম। সেদিন বিকেলে আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফ-উজ-জামান তাঁর অফিস কক্ষে আমাদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন। আমরা ছিলাম কয়েকজন বাঙালি সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক।

ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। আমাদের বৈঠকে অহযোগ আন্দোলনে কর্তব্য সম্পর্কে আঞ্চলিক পরিচালক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। অনুষ্ঠান প্রচারের পরিকল্পনায় সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো। বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। প্রশাসনেও আনা হলো পরিবর্তন। সেদিন থেকেই বেতার ভবনের চূড়ায় উড়ানো হলো বাংলাদেশের পতাকা। ঢাকার শিল্পীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল 'বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ'। সেই শিল্পী সমাজে বেতারের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো। আমি সঙ্গীতশিল্পী বিধায় প্রথমে আমাকে সেই শিল্পী সমাজের সঙ্গে কাজ করতে বলা হলো। কিন্তু পরদিন সেই নির্দেশ পরিবর্তন করে আমাকে পুরো প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলো। সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক নূরনবী খান ও অনুষ্ঠান সংগঠক আশফাকুর রহমান খানকে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা হলো। সেদিনই বেতারের সবগুলো দপ্তরে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের নির্দেশাবলি প্রেরণ করা হলো। অনুষ্ঠানের রূপ বদল করার নির্দেশ দেওয়া হলো। ঢাকা বেতার কেন্দ্রে ট্রান্সক্রিপশন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রতিদিন দেশাত্মবোধক ও উদ্দীপনামূলক গান রেকর্ড করা শুরু হলো। একক ও সমবেত কণ্ঠে সেই গান রেকর্ড করা হতো। পাকিস্তানের সব ছোঁয়া থেকে বেতারকে মুক্ত করা হলো।

আঞ্চলিক পরিচালক প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে নিয়মিত ব্রিফিং নিতেন এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দিতেন। সাত সকালে এসে প্রথমেই বাংলাদেশের পতাকা বেতার ভবনের চূড়ায় উত্তোলন করতে হবে। সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে যাবার পূর্বে সেই পতাকা নামিয়ে এনে আমার কক্ষের ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে নিরাপদ হেফাজতে রেখে যেতাম। প্রতিদিন সকালবেলা আঞ্চলিক পরিচালক কক্ষে নিয়মিত বৈঠক বসত।

৭ই মার্চের আগেই আঞ্চলিক পরিচালকের বৈঠকে সাত তারিখের কার্যপদ্ধতি স্থির হয়ে গেল। ইতোমধ্যে বেতারের সকল বাঙালি কর্মকর্তা অসহযোগ আন্দোলনকে জনগণের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করার ফলে দেশে অসহযোগ আন্দোলনের অনুকূলে ইতিবাচক ও তেজোদীপ্ত মাত্রা যুক্ত হলো, যা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। অনুষ্ঠানের ধার সুতীব্র হয়ে উঠল। অনুষ্ঠান প্রচারে প্রচণ্ড গতিশীলতা এল। যুদ্ধের কলাকৌশলের মতোই অনুষ্ঠান প্রচার এগিয়ে চলল। যার অন্তর্নিহিত থিম ছিল 'জাগো বাঙালি জাগো'।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। রেসকোর্স ময়দানে সর্বকালের সর্ববৃহত্ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। তখন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। রেসকোর্স ময়দানের বৃহত্ মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেবেন, সেই ভাষণ ময়দান থেকে সরাসরি ঢাকা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হবে। পূর্ব পাকিস্তানের সকল স্টেশন তাঁর সেই ভাষণ একযোগে সম্প্রচার করবে। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের ও.বি.টিম (Outside Broadcast team) যথাসময়ের বহু পূর্বেই ময়দানের বক্তৃতা মঞ্চে অবস্থান নেয়।

তার আগে ৬ মার্চ, '৭১-এ আঞ্চলিক পরিচালকের কক্ষে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালকের নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, পাকিস্তান সরকার যদি শেষ মুহূর্তে সম্প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে বেতারের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী তাত্ক্ষণিকভাবে বেতার ভবন ও ট্রান্সমিটার ভবন পরিত্যাগ করবে এবং সেই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সকল বেতার কেন্দ্র থেকে একসাথে অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত বেতারের ট্রান্সমিটারসমূহের অনুষ্ঠান কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের পূর্বাহ্নেই জানিয়ে দেওয়া হলো। পাকিস্তান সরকারের নির্দেশ অমান্য করার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। স্বাধীনতা সংগ্রামে বেতার কর্মীদের এই সাহসিক ভূমিকাই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ।

৭ মার্চ ১৯৭১ সাল। সকালে আবার বৈঠক। রেসকোর্স ময়দানের সকল কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হলো। অনুষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাবৃন্দ পূর্বনির্ধারিত কর্মস্থলে যাবার জন্য তৈরি হলো। সাভার ট্রান্সমিটারে যাবে একদল অনুষ্ঠান কর্মকর্তা। কল্যাণপুরের ট্রান্সমিটার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হলো। সাভার ট্রান্সমিটারে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার, নিজস্ব শিল্পী, ঘোষকদের দায়িত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হলো। বেতারের অনুষ্ঠান প্রচার বয়কট করার সিদ্ধান্তের সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল সেদিন। বেতারের সকল কর্মকর্তাদের পরিবারবর্গকে নিয়ে স্ব স্ব বাড়িতে অবস্থান না করে গোপন আবাসে চলে যেতে হবে, যাতে পাকিস্তান সরকার তাদের বাড়িতে হামলা না করতে পারে। কারণ, ৭ মার্চ বেতার অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিলে কর্মকর্তাদের ভাগ্যে গ্রেফতার বা মৃত্যু—যেকোনো খড়গ নেমে আসতে পারে।

রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ একটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা বিরাজ করছিল। যথাসময়ে বঙ্গবন্ধু এসে পৌঁছালেন। ভাষণদানের জন্য প্রস্তুত হলেন। চারদিকে তাকিয়ে মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে গেলেন। আর ঠিক ওই সময় খবর এলো, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে না। বঙ্গবন্ধুই লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে দীপ্ত কণ্ঠে সে কথা জানালেন। রেসকোর্সের ময়দানে যেন প্রচণ্ড বজ াঘাতের আলামত দেখা গেল। বঙ্গবন্ধু বেতারকর্মীদের যথাযথ নির্দেশ দিয়ে তাঁর ভাষণ শুরু করলেন। আমাদের পূর্বের সিদ্ধান্ত তাত্ক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হলো। ঢাকাসহ বেতারের সকল ট্রান্সমিটার একযোগে বন্ধ হয়ে গেল। বেতার প্রচার বন্ধ হয়ে গেল। বেতারের কর্মকর্তাগণ গা ঢাকা দিল। তবে মঞ্চে ডিউটিরত বেতার কর্মকর্তাগণ বঙ্গবন্ধুর পুরো ভাষণ রেকর্ড করা শেষ করে গা ঢাকা দিল। ইতোমধ্যে অন্য সকল বেতারের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে 'অফ-দ্য এয়ার' হয়ে গেল। একদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার হলো না, অন্যদিকে বেতার কর্মকর্তারাও নাগালের বাইরে। রাতে সকল বেতার কর্মকর্তাই পরিবার-পরিজনসহ অদৃশ্য। তারা গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে বঙ্গবন্ধু আহূত অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম জোরালো প্রতিবাদ।

আমরা তো গা ঢাকা দিয়ে আছি। আমাদের ভাগ্য অনিশ্চিত। পরের দিন অফিসে যেতে পারব কি-না জানি না। চাকরি জীবনের এখানেই পরিসমাপ্তি কি না তা-ও জানি না! কিংবা আমাদের কপালে গ্রেফতার-কারাগার-বন্দি অপেক্ষা করছে কি-না সেই কল্পনা ঝিলিক মারলেও চিন্তা করতে পারছি না। সারাটা রাত ছটফট করে কাটল। কোনো খবর নেই। অবশেষে সকালের আলো ফুটল। ৮ মার্চ এল। মানসিক চিন্তার স্রোত বৃদ্ধি পেতে লাগল। হঠাত্ টেলিফোন বেজে উঠল। ওপার থেকে কণ্ঠ ভেসে এল। অফিসে যেতে হবে। পাকিস্তান সরকার নতি স্বীকার করেছে। সকাল সাড়ে আটটায় পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, গতকাল রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত, ভাষণ প্রচারিত হবে। আনন্দে হূদয় উথাল-পাথাল করে উঠল। সে মুহূর্তের মানসিক অবস্থা লিখে প্রকাশ করা অসম্ভব। আর হ্যাঁ, আমাদের বেতার কর্মকর্তাদের গোপন খবরাখবরটা আদান-প্রদানের মাধ্যম ছিল 'পরম্পরা'।

কালবিলম্ব না করে তৈরি হয়ে অফিসে রওয়ানা দিলাম। অফিসে পৌঁছে দেখলাম, এরই মধ্যে বেতার কর্মকর্তাদের অনেকেই এসে গেছে। সকলের চোখেমুখে বিজয়ের আনন্দ-উল্লাস। তড়িঘড়ি ট্রান্সমিটার চালানোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো। ওদিকে ট্রান্সমিটারেও প্রকৌশলীরা যথাসময়ে পৌঁছে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর রেকর্ড করা টেপখানা রেকর্ডারে চাপিয়ে সাড়ে আটটা বাজার জন্য প্রতীক্ষা। অবশেষে প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হলো। বেতারে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ৮ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায় ইথারে ভেসে গেল। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার উদাত্ত আহ্বানের প্রতিটি শব্দ।

'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম— এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনার মো. জাবেদ আলী বলেছেন, 'বাংলাদেশে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নেই।' আপনি কি তার সাথে একমত?
2 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২০
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :