The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ২৬ মার্চ ২০১৪, ১২ চৈত্র ১৪২০, ২৪ জমা.আউয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বাংলাদেশরে মেয়েরাও হারল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে | শিবগঞ্জে ফুল দেয়ার সময় বিস্ফোরণে নিহত ১ | শিবগঞ্জে ফুল দেয়ার সময় বিস্ফোরণে নিহত ১ | জাতীয় গ্রিডে যোগ হলো আরো ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

'জয়বাংলা' স্টিকারযুক্ত ব্যাট হাতে

রকিবুল হাসানের অনন্য প্রতিবাদ

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

দফায় দফায় বঞ্চিত হতে হতে একটু হতাশই হয়ে পড়েছিল ছেলেটি—আর বুঝি টেস্ট খেলা হবে না!

ঠিক এই সময়ে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক একাদশের বিপক্ষে অনানুষ্ঠানিক টেস্ট ম্যাচে পাকিস্তান একাদশেই নাম ঘোষণা হয়ে গেল তার। ছেলেটির আনন্দ আর দেখে কে! রাতে ঘুম হয় না সেই ম্যাচ খেলার স্বপ্নে। কিন্তু সব স্বপ্ন মাটি হয়ে গেল ঠিক ম্যাচের আগের দিন। ছেলেটি দেখল, পাকিস্তান দলের সব খেলোয়াড়দের দেওয়া হয়েছে 'গ্রে নিকোলস' ব্র্যান্ডের ব্যাট; যার ওপরে আইয়ুব খানের নির্বাচনী প্রতীক তলোয়ার চিহ্ন লাগানো!

ছেলেটির মাথায় রক্ত উঠে গেল। এই সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুরো পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে; বাঙালির দল জিতে গেছে নির্বাচনে। এখন বাঙালির সরকার গঠনের অপেক্ষা। এমন সময়ে সে ব্যাটে আইয়ুব খানের প্রতীক নিয়ে ব্যাটিং করতে নামবে? কক্ষনোই না!

রাতেই পূর্বাণী হোটেল থেকে বেরিয়ে বন্ধু শেখ কামালের সঙ্গে পরামর্শে বসল ছেলেটি—কী করা যায়? শেখ কামাল বুদ্ধি দিলেন, 'তলোয়ারের বদলে তোর গান অ্যান্ড মুরের ব্যাটে জয় বাংলা লেখা স্টিকার লাগিয়ে খেলতে নাম।'

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। স্টিকার জোগাড় হলো। যারা ভেতরের ঘটনা জানত, উত্তেজনায় সবাই ছটফট করছে। ছেলেটি নির্বিকার। অবশেষে এল সেই ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল। পাকিস্তানি আজমত রানাকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাটিং শুরু করতে নামল ছেলেটি। একজন ফটোগ্রাফার প্রথম খেয়াল করলেন ব্যাপারটা। ছুটে এলেন ছবি তুলতে। মুহূর্তে স্টেডিয়াম জুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ল—'জয় বাংলা' স্টিকার নিয়ে পাকিস্তানের হয়ে খেলছে একটি বাঙালি ছেলে। স্টেডিয়াম জুড়ে উঠল স্লোগান—জ য় বা ং লা!

জ্বলে উঠল ক্যামেরার ফ্লাশ। দৈনিক ইত্তেফাক থেকে শুরু করে লন্ডন টাইমস; পরদিন সব জায়গায় সেই ছেলেটির ছবি। সঙ্গে বড় বড় করে হেডিং—পাকিস্তানের হয়ে 'জয় বাংলা' স্টিকার নিয়ে মাঠে নেমে দুনিয়া চমকে দিলেন রকিবুল হাসান।

হ্যাঁ, রকিবুল হাসান। বাংলাদেশের ইতিহাসের কিংবদন্তী এক ব্যাটসম্যান, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক, ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক ম্যাচ রেফারি, সাংবাদিক এবং সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেট মাঠে বাংলাদেশের হয়ে এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তোলা রকিবুল হাসান।

এই লেখা যখন পড়ছেন, সদাহাস্যময় রকিবুল হাসান তখন হূদযন্ত্রের অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে আছেন। তবে তাঁর হূদয় এত সহজে হার মানার নয়। বিশাল হূদয়ের এই মানুষটি সেই কৈশোর থেকেই ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট মাঠে এবং শরীর-মন দিয়ে সর্বত্র বাংলাদেশের হয়ে লড়েই অভ্যস্ত।

১৯৭১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রকিবুল হাসানের এই অনন্য প্রতিরোধ এখন ভুবনবিখ্যাত ঘটনা। তবে তাঁর এই রুখে দাঁড়ানা কিন্তু সেদিন প্রথম ঘটনা নয়। কৈশোর পার হতে না হতেই রকিবুল হাসান দেখেছিলেন, কী এক ভয়াবহ বৈষম্যের মুখোমুখি এই বাংলার মানুষকে হতে হয়।

শতভাগ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান দলে ঠাঁই হয় না রকিবুল হাসান বা শহীদ আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েলের। রকিবুল নিজেই শুধু বাঙালি বলে বারবার অনুর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পেয়েও সেরা একাদশে ঠাঁই পাননি। তখনকার দুই পাকিস্তান মিলিয়ে সেরা পারফরমার হওয়ার পরও একাদশে নেওয়া হতো না তাঁকে, নেটে ব্যাট করতে দেওয়া হতো না নিয়মমতো।

তবে এসব ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তি নিয়ে নয়; রকিবুল প্রথম রুখে দাঁড়িয়েছিলেন রাজনৈতিক কারণেই। অনুর্ধ্ব-২৫ দলের ক্যাম্পে রকিবুল তখন করাচিতে। ক্যাম্পের মধ্যেই একদিন সন্ধ্যায় খুব আড্ডা জমেছে; রাজনীতিও চলে এসেছে আলোচনায়। হঠাত্ বাঁহাতি স্পিনার, পেশোয়ারের কামরান রশীদ বলে উঠল, 'আইয়ুব খান মেড আ মিসটেক। হি শুড কিলড দ্য... মুজিব।'

একটা সেকেন্ডও দেরি হলো না। রকিবুলের সপাট ঘুষিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কামরান। চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার পর শুরু হলো ভয়ঙ্কর পিটুনি। পেটাতে পেটাতে কামরানকে টিলার নিচে নিয়ে এলেন রকিবুল, হাতের কাছে যা পেলেন, তা-ই দিয়ে চলল আঘাত; ততক্ষণে রক্তাক্ত কামরান জীবনভিক্ষা চাইতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের বুকে, করাচিতে বসে একজন বাঙালির এই রুদ্রমূর্তি দেখে যেন বিস্ময়ে, আতঙ্কে পাথর হয়ে রইল পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা।

পরিদন কোর্ট মার্শালে ডাক পড়ল রকিবুল হাসানের। মেজর সুজা জিজ্ঞেস করলেন, কেন এমন করেছ?

রকিবুল চোখে চোখ রেখে উত্তর দিয়েছিলেন, 'ও আমার নেতাকে গালি দিয়েছে, বাঙালির নেতাকে গালি দিয়েছে। যতবার গালি দেবে, ততবার আমি এমন করব।'

এই সিংহহূদয় মানুষটি তাঁর প্রতিজ্ঞা বারবার রেখেছেন। নিজের শত বঞ্চনাতেও চুপ করে থাকলেও যখনই বাঙালির অপমানের প্রশ্ন এসেছে, যখনই আমাদের প্রতিরোধের প্রশ্ন এসেছে, রুখে দাঁড়িয়েছেন। আর সেরা রুখে দাঁড়ানোর গল্প ওই 'জয় বাংলা' স্টিকার।

কোনো প্রতিবাদ শাসকেরা সহজে ছাড়ে না। সেই 'জয় বাংলা' স্টিকারের ফল হিসেবে জীবনটাই দিতে হচ্ছিল রকিবুল হাসানকে। ম্যাচ চলা অবস্থাতেই সংসদ ভেঙে গেল, আগুন জ্বলে উঠল শহরে, খবর পৌঁছাতে স্টেডিয়ামের প্যান্ডেলেও লাগল আগুন। পুরো নগরীই তখন জ্বলছে, ক্রিকেট কি আর বাঁচে। বাকি পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা তখন ক্যান্টমেন্টে আত্মগোপন করল। আর রকিবুল মিশে গেলেন ছাত্র-জনতার মিছিলে। তখনও তিনি জানেন না, তাঁর নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়ে গেছে। চলে এল ৭ মার্চ; জাতি পেয়ে গেল মুক্তির দিশা। রকিবুল বুঝে গেলেন, যুদ্ধেই যেতে হবে। ২৫ মার্চ ঢাকায় নামল পাকিস্তানি বাহিনী; রকিবুল জানলেন, তাঁকে খোঁজা হচ্ছে মেরে ফেলার জন্য। পরিবার চলে গেল গোপালগঞ্জে নিজেদের বাড়িতে; আর রকিবুল হাসানরা দুই ভাই বাবার সার্ভিস রিভলবার হাতিয়ে নিয়ে চললেন ট্রেনিং ক্যাম্পে।

এই স্বল্প জায়গার কী সামর্থ্য বাঙালির সেই বীরত্ব ফুটিয়ে তোলে! আমরা শুধু বলতে পারি, আরো অনেক ক্রিকেটার-ফুটবলারের মতো আয়েশী জীবন ছেড়ে রকিবুলও রণাঙ্গনে শুরু করেন দেশ বাঁচানোর লড়াই। সে লড়াইয়ে রকিবুলরা জয় নিয়ে ফিরলেন, ফিরলেন জুয়েল-মুশতাকের মতো অনেক প্রিয়জনকে হারানোর শোক নিয়ে। বিনিময়ে পেলেন স্বাধীন পতাকা এবং নিজেদের একটি ক্রিকেট দল।

আজও পত পত করে উড়তে থাকা লাল-সবুজ পতাকার দিকে চোখ পড়তে স্মৃতি রকিবুল হাসানকে নিয়ে যায় সেই ১৯৭১ সালে। মনে পড়ে যায় তাঁর মার্চের শুরুতে জহির আব্বাসের সঙ্গে কথোপকথন। সেই ম্যাচ পন্ড হয়ে যাওয়ার পর জহির আব্বাসরা ফিরে যাচ্ছেন পাকিস্তানে। যাওয়ার সময় জহির হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'রকিবুল, করাচিতেই দেখা হবে আবার।'

রকিবুল কী ভেবে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, 'অবশ্যই। তবে আমার সঙ্গে তখন নতুন পাসপোর্ট থাকবে'।

কথা রেখেছিলেন রকিবুল হাসান। নয় মাস যুদ্ধ করে নতুন পাসপোর্টের মালিক হয়ে তবেই ঘরে ফিরেছেন আমাদের রকিবুল হাসানরা।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনার মো. জাবেদ আলী বলেছেন, 'বাংলাদেশে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নেই।' আপনি কি তার সাথে একমত?
8 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২৭
ফজর৩:৪৬
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪২
এশা৮:০৫
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :