The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ২৯ মার্চ ২০১৪, ১৫ চৈত্র ১৪২০, ২৭ জমা.আউয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ১৯৭ | নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ৬ উইকেটে জয় নিউজিল্যান্ডের | রানা প্লাজায় নিখোঁজ আরো ১৮৩ শ্রমিকের তালিকা প্রকাশ | যাত্রীবাহী জাহাজ 'এমভি বাঙালি'র উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী | সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৩ জন দগ্ধ | রাজশাহীতে চিকিৎসক ধর্মঘট স্থগিত

একাত্তরের মার্চে কুমিল্লায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

ড. জি এম মনিরুজ্জামান

১৯৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যে ব্যক্তিটি পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে হবে 'বাংলা' এমন দাবি প্রথম করেছিলেন, তিনি আর কেউই নন, কুমিল্লা জেলার বিশাল ব্যক্তিত্ব শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬—১৯৭১)। তিনি চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র; যেখানে বাঙালিরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, সেখানে রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, আইন-কানুন সব হবে বাংলায়, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা হবে বাংলায়, টাকা হবে বাংলায়, স্ট্যাম্প হবে বাংলায়, পার্লামেন্টে বক্তৃতা হবে বাংলায় এবং তার সবকিছুই সম্ভব হয়েছে। এটাই তাঁর জীবনের সার্থকতা। নির্লোভ, নির্ভীক, সাহসী, স্পষ্টবাদী, অসামপ্রদায়িক রাজনীতিবিদ, নিখাদ দেশপ্রেমিক সমাজসেবী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উপকরণ ভাষার স্বাধীনতা আন্দোলনে পুরোপুরি সফল হয়েছিলেন তাই নয়, তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রাম তথা স্বাধীনতার সংগ্রামে মার্চ মাসে কুমিল্লা থেকেই বলা যায় দুর্বার সোচ্চার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৫৮ সালে যখন মার্শাল 'ল হয় তখন তিনি যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী ছিলেন। মার্শাল 'ল-এর পরে তিনি ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লায় এসে বসবাস করেন। ১৯৭১ সালে অন্য সব ব্যক্তি বা নিজ ধর্মের এমনকি পরিবারের সঙ্গেও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পার্শ্ববর্তী দেশ বা অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে স্বেচ্ছায় দেশের জন্য নিজের জীবনটাই দান করেছিলেন। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন বিশাল রাজনীতিবিদ, পার্লামেন্টারিয়ান, অসম্ভব তীক্ষ্ন মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি, অন্যদিকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ সরল একদম শিশুর মতো ব্যক্তি। তাঁর বাড়িতে সার্বক্ষণিক একটি রাজনৈতিক আবহাওয়া এবং রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজমান ছিল।

এই ব্যক্তিটির বাড়িতে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, প্রভাষ লাহিড়ি, ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল হোসেন প্রমুখ বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তি আসতেন এবং তাঁরা নানা রকম সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিভিন্ন আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করায় কিছুদিন পর পর জেলখানায় আটক থাকতেন। তাঁর বাড়ির সামনে সারাক্ষণ ১৪/১৫ জন পুলিশ বসে থাকতো এবং বাইরের কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হতো না। বাড়ির কোনো সদস্যকে পাসপোর্ট করতে দেয়া হয়নি, এমনকি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পাসপোর্টটিও সিজ করে নেয়া হয়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বেলা ৩টায় ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের তারিখ নির্ধারিত হওয়ায় ৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকে কার্ফু দেয়া হয়। কুমিল্লা থেকে তখন সেই ভাষণ শুনতে কাঁচপুর, মেঘনা ও দাউদকান্দি ফেরি পার হয়ে ট্রাকে করে মানুষ ঢাকামুখি হতে থাকে। রেডিওতে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার শুরু হয়, তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের চোখ থেকে জল পড়তে থাকে এবং তিনি বঙ্গবন্ধুকে 'বাপের ব্যাটা' বলে সম্বোধন করে ওঠেন। কিন্তু পরক্ষণেই রেডিওতে ভাষণ প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। অবশ্য পরের দিন ৮ মার্চ সেই ঐতিহাসিক ভাষণ রেডিওতে পুনঃপ্রচার করা হলে শুনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এতোটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন যে, পরিবারের সবারই উদ্দেশে তিনি যেমনটা বলেছিলেন ও করেছিলেন, এখন আর চিন্তা নেই। বাংলাদেশের পতাকা রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। তিনি বাইরে এসে ছোট ছেলে দিলীপ দত্তকে একটা পতাকা আর বাঁশ আনতে নির্দেশ দিলেন। কুমিল্লার কান্দিরপাড় থেকে পতাকা আর বাঁশ আনা হলে পতাকাটি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজের হাতে বাঁশের গায়ে লাগালেন এবং বললেন, "স্বাধীনতার এই পতাকা আমি নিজের হাতে উড়িয়ে দিয়ে গেলাম। আমার রক্তের ওপরেই এই দেশ স্বাধীন হবে। আমি হয়তো তখন থাকবো না। যোগ্য লোকের কাছে নেতৃত্ব গেছে, বাংলাদেশের জন্ম হবে, এদেশের বাঙালিরা স্বাধীন হবে। তবে রক্তক্ষয় প্রচুর হবে।" তিনি আরো বলেন যে, "শাহনেওয়াজ ভুট্টোর ছেলে জুলফিকার আলী ভুট্টো কি গরিবের হাতে দেশ দিয়ে দিতে পারে? সে তো জোতদারের ছেলে। সে তো কৃষকের হাতে দেবে না অধিকার। এটা কি তারা বোঝে নাই কেউ?"

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এক বন্ধু হাবিবুর রহমান ২৫ মার্চ সকালে কুমিল্লার সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কাছে অন্য কোথাও সবার কথা ভাবছেন কিনা তা জানতে চাইলে তিনি তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় জানান, "এখানে থাকবো না কেন? আমি তো এখানেই থাকবো। আমি তো এখানে থাকার জন্যই আছি।" বন্ধুটি কয়েকটা দিন তাঁর বাড়িতে অবস্থান নেয়ার কথা জানালেও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়ে দিলেন যে, তিনি কারো বাড়িতে থাকবেন না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সামনে দিয়ে আর্মি ট্যাংক ও ট্রাকজিপ বেশি রাউন্ড দিতে থাকে।

পারিবারিক বন্ধু সুধা সেনের স্ত্রী ও অন্যরা এ বাড়িতে এসে এ বাড়ির সবাইকে সঙ্গে নিয়ে গোমতী নদী পার হয়ে ইন্ডিয়াতে যেতে চান। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর পরিবারের সবাইকে চলে যেতে বলে নিজে বাড়িতে থাকতে ইচ্ছা পোষণ করেন।

ঠিক এই সময় কুমিল্লা শহরে রটে যায় যে, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পাক আর্মিরা হত্যা করেছে। কিন্তু তিনি তখনো জীবিত। ২৯-৩০ মার্চ রাত দুইটার দিকে ভীষণ জোরে দরজায় ধাক্কা ও বুটের লাথি পড়তে থাকে। চারদিকে ভীষণ আওয়াজ। ৭/৮ মিনিট পরেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ছোট ছেলে দরজা খুলতেই ১০/১২ জন পাকিস্তানি আর্মি ঘরে ঢুকে পড়ে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটায় প্রথমে কাছারি ঘরের পরেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঘর। পরিবারের সদস্যদের প্রতি তখন একদিকে আর্মিরা অপারেশন চালাতে থাকে, অন্যদিকে আর্মিরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ছেলে দিলীপ দত্তকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়।

১ এপ্রিল ইন্ডিয়ার খবর থেকে জানা যায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পাকিস্তানিরা মেরে ফেলেছে এবং দিলীপ দত্তের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভারতের লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।

অত্যন্ত প্রচারবিমুখ এই ব্যক্তিটি বাঙালির প্রধান দুই আন্দোলনে নিষ্ঠা, কর্তব্য এবং বিশ্বাস থেকেই অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন। খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, পোশাক পরিচ্ছদ সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সাধারণ। মানুষের মাঝে তিনি কোনো জাতভেদ বিশ্বাস করতেন না এবং পারিবারিকভাবেও তিনি কখনোই এ জাতীয় বিষয়কে প্রশ্রয় দেননি। পুরোপুরি সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ এবং হিউম্যানিস্ট এই ব্যক্তির উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর জীবনবিধি জেনে সাধারণ মানুষেরাও যেন তাঁর সঙ্গে অতি সহজেই মিশতে পারে এবং সেভাবে জীবন-যাপন করে। মানুষের প্রতি তাঁর ছিল পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

কুমিল্লা

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, 'স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে হলে প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাবে এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পাবে।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৮
ফজর৫:১৩
যোহর১১:৫৫
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৮
এশা৬:৩৬
সূর্যোদয় - ৬:৩৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :