The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৪, ১ বৈশাখ ১৪২১, ১৩ জমাদিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মিল্কি হত্যা মামলায় ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট | বারডেমে চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি | কালিয়াকৈরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ | তারেকের বক্তব্যে ভুল থাকলে প্রমাণ করুন : ফখরুল

আমার বৈশাখ

মোস্তাফিজুর রহমান মিঠু

বৈশাখ এলে সারা বিশ্বের বাঙালির সংস্কৃতিক পোশাক একই রঙে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই একটি দিনের রঙে অনুরণনে আমাদেরকে একাত্ম করে চিনিয়ে দেয়—আমরা বাঙালি। সেই বৈশাখ নিয়ে নিজের অনুভব, স্মৃতি বা বৈশাখকে নিজের ভেতরে কতটা ধারণ করেন সে কথায় তুলে ধরেছেন এই সময়ের বিশিষ্ট ক'জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের সাথে কথা বলে লিখেছেন মোস্তাফিজুর রহমান মিঠু

ড. ইনামূল হক

বৈশাখ আমার কাছে একাত্ম জাতিসত্তার অনুভব। এই আয়োজনটিই আমাদের বাঙালির অন্যতম পরিচয়। নয়তো দেখুন সারাবছর তো আমরা বিজাতীয় সংস্কৃতির চাদর গায়ে চাপিয়েই ঘুরি, অন্তত এই একটি উত্সব আমাদের নিজেদেরকে চিনিয়ে দেয়। মনে পড়ে আমার মেয়ে হূদি ছোটবেলায় খুব করে বলেছিল, বাবা বৈশাখে আমার সকল বন্ধুরাই দেখি মজা করে। ও তখন এত ছোট। ও আসলে আমাকে ধর্মীয় উত্সবের সাথে এটা তুলনা করে একটা দ্বিধা তৈরি থেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছিল। তখন ওকে বলেছিলাম। এটা সার্বজনীন উত্সব। বছর কয়েক আগে আমেরিকায় গিয়েছিলাম একটি থিয়েটারের কাজে। সেখানে বিদেশি বন্ধুবান্ধবদের দেশে আমন্ত্রণ জানাতেই ওরা বলল, 'বাংলাদেশের বৈশাখ উত্সবটা দেখতে চাই।' এই যে একটা দেশকে চেনা, একটা দেশের কালচার নিয়ে এত বড় এক সার্বজনীন উত্সব আমার কাছে মনে এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। আর আমার নিজের বৈশাখ কবে শুরু হয়েছিল দিন তারিখ মনে করে বলা মুশকিল। তবে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে বাবার সাথে বাজারে গিয়ে প্রথম জানতে পারি হালখাতা কী। এবং কেনাকাটার পর যখন দোকানি মিষ্টি খাওয়ালো, তখন অবাক হলাম। কারণ অন্য কোনোদিন তো এইরকমভাবে কেউ মিষ্টিমুখ করায় না।

রামেন্দু মজুমদার

বৈশাখ নিয়ে আমার মজার এক অভিজ্ঞতা আছে। সেটিও একান্ত ব্যক্তিগত। ফেরদৌসী মজুমদারের সাথে আমার তখন কেবল সম্পর্কটা গড়ে উঠেছে। আমার শ্বশুর তো খুবই পণ্ডিত মানুষ এবং সংস্কৃতিমনা। এরপরও এই একটা দিনে মনে হতো আমরা দুজনা দুই ধর্মের হলেও একই সত্তার। তাই এই উত্সবের দিনটার জন্যই অপেক্ষা করতাম। বৈশাখটা আমাদের আসলে এভাবেই এক করে দেয় সকলকে। আমরা জাতি, ধর্ম-বর্ণ ভুলে এক মঞ্চে একই সাজে আবিষ্ট হয়। আমার কাছে বৈশাখটাও তেমনই। এখন হয়তো দায়িত্ব বেড়েছে। তবে আইটিআই-এর সভাপতি হিসেবে গতবার সেমিনারে অংশ নিয়ে আমি আমার জাতিসত্তার বর্ণনায় এই বৈশাখকেই বারবার তুলে ধরি। তবে আমার মনে হয়, বৈশাখের মতো এত ব্যাপ্তির আয়োজন নিয়ে আমাদের আরও বড় মাপের কাজ করা উচিত। তা মঞ্চে হোক, চলচ্চিত্রে হোক। উদ্যোগটা এখনই, এই সময়ের তরুণদেরই নেওয়া উচিত।

মামুনুর রশীদ

পয়লা বৈশাখ বা বৈশাখী মেলা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অনেকে। আমার বাবা আমাদের পরিবারের সবাইকে শুদ্ধ বাংলায় উচ্চারণের জন্য সবসময় বলতেন। আজ আমার শৈশব থেকে আজকের আমার এই জীবনপাঠ বাংলার ভেতরেই উচ্চারিত হয়েছে। আমি বৈশাখের সাথে বাংলাকে মেশাচ্ছি এই কারণে যে, আমরা আমরা আবেগপ্রবণ জাতি। এই বাংলার সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যের উত্সবে আমরা কতটা বাংলাকে শ্রদ্ধা জানাই, তা আজ একটু বিবেচনা করা প্রয়োজন। জানা প্রয়োজন, ইংরেজি মিডিয়ামের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কতটা বৈশাখের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারছে। কিছুদিন আগে একটি চ্যানেলে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করতে দেখলাম, তাতে তারা দেখাচ্ছে এ সময়ের অনেক তরুণ-কিশোরেরা ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ, একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে জানে না। হ্যাঁ এটা ঠিক যে অনেকেই বৈশাখ বা বৈশাখী উত্সব সম্পর্কে জানে। কিন্তু সেই জানাটা কি শুধু একটি উত্সবকেন্দ্রিক জানায় সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রশ্নটা সেখানেই। আমার বৈশাখ তাই বাংলাকে জানা। বাংলার সংস্কৃতিধারকদের জানা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দকে না জানলে সে বৈশাখ সম্পর্কে জানাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যা আমার দৃষ্টিতে মূল্যহীন। ইদানীং শহুরে কর্পোরেট পহেলা বৈশাখকে বিশেষ ভুরিভোজ আর পাঁচতারা হোটেলের পার্টির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই কারো কাম্য হতে পারে না।

সারা যাকের

বাঙালি হিসেবে বৈশাখ তো অবশ্যই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা তো ট্রেডিশনাল ওয়েতে পয়লা বৈশাখ পালন করি, সেই জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ না। আমরা বাঙালি সেই অর্থে পয়লা বৈশাখ আমাদের বাঙালিদের কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলার পয়লা বৈশাখ আর এখনকার উদযাপনের মাঝে তো পার্থক্য রয়েছেই। যখন ছায়ানট প্রথম বটতলায় পয়লা বৈশাখ উদযাপন করে, সেই অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম। আমার বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে এটাকে ঘিরে যে আমাদের এই সাংস্কৃতিক প্রকাশ সেটা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। আমি যখন কলকাতায় গিয়েছিলাম তখন ওদের বৈশাখ উদযাপন দেখলাম। আমরা যেমন পান্তা-ইলিশ, ভর্তা খাই; ওরা ঠিক তা না। ওরা সবচেয়ে ভালো খাবারটা খায়। যাতে ওদের সারা বছরটা ভালো যায়। কারণ মূলত ব্যবসায়ীরা তো বৈশাখ পালন করে, হালখাতা খুলে; তাই তারা চায় বছরের শুরুটা ভালো খাবার দিয়ে শুরু করতে। আমাদের মতো ঐতিহ্যগতভাবে তারা পহিলা বৈশাখ পালন করে না। আর আমরা তাদের থেকে ঠিক উল্টোভাবে পালন করি। আমরা বাঙালিয়ানাটাকে নিয়ে আসি। যার জন্য আমরা পান্তা ভাত, ইলিশ, ভর্তা খাই। তবে আমার কাছে মনে হয়, এটাই ঠিক আছে। কারণ বৈশাখ গরমের মাস। এত গরমে ভারী খাবার খাওয়ার চেয়ে পান্তা অনেক ভালো। তাছাড়া এর মাঝেই আমাদের ঐতিহ্য। আর আমাদের সংস্কৃতির বড় একটা অংশ পহেলা বৈশাখ। তাই সেই জায়গা থেকে আমরা ঠিকই আছি। আমরা আমাদের ঐতিহ্যটাকে বহন করছি।

ছোটবেলার বৈশাখ তো অন্যরকম একটা আমেজ। ১৯৬৭ সালে যখন বাবার হাত ধরে প্রথম ছায়ানটের আয়োজনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করি। যা আমার কাছে উল্লেখযোগ্য স্মৃতিময় মুহূর্ত। তারুণ্যের জয়জয়কার সবসময়। আর যেকোনো উত্সবে তো তারা একটু বেশিই উত্ফুল্ল থাকে। তাই পহেলা বৈশাখেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না। আর যেহেতু এটা বাঙালির উত্সব। বাঙলা বছরের প্রথম দিন। যেই দিন ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে সাম্প্রদায়িক একটা ঐতিহ্য থেকে। আর আমরা যারা বৈশাখ পালন করি তারা অসাম্প্রদায়িক একটা জায়গা থেকে। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা বৈশাখ উদযাপন করি। এটা আমার কাছে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ। পহেলা বৈশাখ নিয়ে তো আমাদের মিডিয়া ঠিক ভূমিকাই পালন করছে। যথেষ্ট করছে তারা। সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গ তেমন কিছুই করছে না।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির অন্যতম উত্সব। আমরা বাঙালি। বাঙালিয়ানাভাবেই আমাদের এই উত্সব পালন করা উচিত। ভবিষ্যতেও যেন আমরা আমাদের বাঙালিয়ানাটা ধরে রাখতে পারি সেই চেষ্টা করা উচিত। কারণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে না পারলে তো আমরা আমাদের শিকড়ের থেকে আলাদা হয়ে যাব।

মিতা হক

পহেলা বৈশাখ ছাড়া তো আমি আমরা কিছুই না। এই একটি জীবন কেটে গেল বৈশাখী চেতনা বা এই উত্সবের বর্ণচ্ছটায় নিজেকে মেশাতেই। আমি-আমরা যারা রবীন্দ্রগানের চর্চা করি, তারা সকলেই মনে করি ২২শে শ্রাবণ বা ২৫শে বৈশাখের মতোই এই পহেলা বৈশাখের জন্য অপেক্ষা করি। এ বছর খুব করে মিস করব যুবরাজকে। প্রতি বৈশাখে জয়িতা ওর বাবার জন্য বৈশাখের পাঞ্জাবি পরিয়ে তবেই আমাদের বৈশাখটা শুরু হতো। ও আবার ওই গরম ভাতে হঠাত্ পানি মিশিয়ে পান্তা তৈরির পক্ষে ছিল না। যা অনেকেই করে। আমরা আগের রাতেই পানি মেশানোর কাজ করতাম। আর পহেলা বৈশাখে যথারীতি স্টেজ, চ্যানেলের প্রোগ্রামগুলোতে এত ব্যস্ত থাকতে হয় যে পরিবারও বিষয়টি মেনে নিয়েছে। আর প্রথম বৈশাখের কথা মনে নেই। আমার এবং আমার মেয়ের বেলাতেও একই, হয়তো পৃথিবীতে আসার আগেই মায়ের পেটে থাকতেই এই বৈশাখের শব্দ, রং, গন্ধ চিনেই বেড়ে উঠেছি।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'দেশ আজ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। এদেশে বিদেশিরা বিনিয়োগ করছে না'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৮
ফজর৪:৫৬
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৫সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :