The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৪, ১ বৈশাখ ১৪২১, ১৩ জমাদিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মিল্কি হত্যা মামলায় ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট | বারডেমে চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি | কালিয়াকৈরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ | তারেকের বক্তব্যে ভুল থাকলে প্রমাণ করুন : ফখরুল

আনন্দপ্রিয় বাঙালির আনন্দময় খেলা

দিব্যদ্যুতি সরকার

বাঙালির ছোট ছোট কিছু জিনিস খুব সুন্দর। এই সুন্দর জিনিসগুলোর একটি হলো খেলা। মজার ব্যাপার হলো, বাঙালির নিজস্ব প্রায় সব খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্য আনন্দ করা; প্রতিযোগিতার বিষয়টি সেখানে থাকে গৌণ। ভাওয়াইয়া গান অষ্টকের নাচ প্রভৃতি যেমন বাঙালিরা মনের আনন্দে চর্চা করে থাকে, তেমনি বাঙালির খেলাধুলাও মূলত আনন্দের খোরক, সেখানে শ্রেষ্ঠ হওয়া না হওয়া প্রধান ব্যাপার নয়। একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা ভালো বোঝা যাবে।

বাঙালির অত্যন্ত জনসম্পৃক্ত একটি খেলার নাম নৌকাবাইচ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে নৌকা বাইচ আছে। কিন্তু বাঙালির নৌকা বাইচের কাছে সেসব কিছুই না। অন্যান্য দেশের নৌকা বাইচ হলো একটি প্রতিযোগিতা, কিন্তু বাঙালির বাইচ মূলত আনন্দ, সামান্য একটু প্রতিযোগিতার রং সেখানে থাকে। একসময় শুধু বাইচের জন্য নৌকা বানানোর মতো সৌখিন মানুষের বেশ দেখা মিলত। বাইচের সে নৌকা দেখতে অনেকটা লম্বা; নাম পানসি নৌকা। হয়তো আশিজন লোক সেখানে বসে বৈঠা বাইতে পারবে। যারা বৈঠা বাইবে, তারা কিন্তু কেউ পেশাদার নয়। সকাল থেকে দুপুর অবধি হয়তো সে ধান কাটছিল, এরপর বিকালে শুরু হলো বাইচ। আর অমনি লুঙি কাছা মেরে সে বসে গেল বৈঠা বাইতে।

অলিম্পিক কিংবা এশিয়ান গেমসে এক ধরনের নৌকা বাইচ রয়েছে। তবে তা দেখতে ভীষণ ম্যাড়মেড়ে। সেটা দেখলে প্রথমেই মনে হয়, গুটি কয়েক রোবট নৌকা বাইচ দিচ্ছে। কোনো হৈচৈ নেই, হাকডাক নেই; এমনভাবে কয়েকজন লোক নৌকা বাইতে থাকে যে মনে হয় যেন নৌকা বাওয়াটা দেশ ও জাতির জন্য খুব গুরুতর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আর সেখানকার নৌকার কোনো বাহার নেই, দেখে মনে হয় টিনের নৌকা। চলার সময় সে নৌকার দুই পাশে সিংহের কেশরের মতো ঢেউও ওঠে না। অনেক সময় নদীর তীরে দর্শকেরও দেখা মেলে না। কিন্তু বাঙালির নৌকা বাইচ এক এলাহি ব্যাপার। বাইচ উপলক্ষে অন্তত সপ্তাহ খানেক আগে থেকে শুরু হয় নৌকার পরিচর্যা। সে পরিচর্যা এমন যে দেখলে মনে হতে পারে নৌকা বুঝি কোনো জড়বস্তু নয়, জলজ্যান্ত একজন মানুষ অথবা দেবতা। তার গায়ে তেল মাখানো হয়, রং মাখানো হয়, সিঁথি কাটার মতো করে আল্পনা করা হয়, এমনকি নৌকার সাথে কথাও বলা হয়। নৌকার দুই মাথায় বসানো হয় নানান সব বস্তু; হয়তো টিনের তৈরি সাপের ফণা, অথবা পাখি। নৌকা যখন দুলে দুলে চলতে থাকবে, তখন ওগুলো তালে তালে সামনে দুলতে থাকবে। মনে হবে সাপ ছোবল মারছে, পাখি দিচ্ছে ঠোক্কর। কখনও কখনও নৌকার গলুইয়ে পিতলের তৈরি ময়ূর বসিয়ে দেওয়া হয়; ময়ূরপঙ্খী বলে কথা! এসব আয়োজনের কোনো কিছুই বাইচের সময়ে নৌকার গতি বাড়াতে সাহায্য করবে না। কিন্তু তাতে কি, নৌকা বাইচে প্রথম পুরস্কার পাওয়াই বাঙালির প্রধান লক্ষ্য নয়। বাইচ শুরু হওয়াটা সত্যি দেখবার মতো একটা ব্যাপার বটে। প্রতিটি নৌকার মাঝখানে একজন লোক একখানি ঝাঁজ হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। নিয়ম হলো, তিনি যে তালে ঝাঁজে বাড়ি মারতে থাকবেন, সেই তালে সবাই নৌকা বাইবে। নৌকা বাইচে এই ঝাঁজ বাদকটির ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অনেকটা অর্কেস্ট্রা পরিচালকের মতো; তাঁর শব্দের তালে তালে সবাইকে নৌকা বাইতে হয়। কিন্তু নৌকার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে এমন কয়েকজন মানুষ, এদের একমাত্র কাজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৈঠার তালে তালে চিত্কার করে যাওয়া। বাইচের আগে আর পরে এরা অনেকেই ঢাল-তলোয়ার নিয়ে নানা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা দেখায়, কেউ নাচে খ্যামটা নাচ, কেউ এমন সব রগড় করতে থাকেন যে, লোকে হাসতে হাসতে গড়িয়ে যায়। এই বাইচ দেখতে যারা আসে তাদের অনেকেই আসে সপরিবারে নৌকায় চড়ে, নদীর তীর বরাবর তারা নৌকায় করে ঘুরে বেড়ায়। আর নদীর দুই তীরে থাকে হাজার হাজার মানুষ। আকাশ থেকে যদি এই দৃশ্য দেখানো যায়, মনে হবে নদীর দুটি তীর যেন মানুষ দিয়ে তৈরি হয়েছে। বেশি লোকজনের ভিড় না হলে বাঙালির তেমন কিছু ভালো লাগে না। নৌকা বাইচে নৌকা থাকবে হয়তো পাঁচখানা, কিন্তু এই পাঁচখানা নৌকা দেখার জন্য লোক আসবে অন্তত পাঁচ হাজার। প্রতিযোগিতার টানটান আবহ এখানে তেমন দেখা যায় না, যা দেখা যায় তা হলো মানুষের বাঁধভাঙা কৌতূহল আর আনন্দ। এ রকম অজস্র লোকের ভিড়ের আরেকটি খেলা হলো ঘোড়ার দৌড়। খেলাটির নাম ঘোড়ার দৌড় বটে, কিন্তু ঘোড়ার চেয়ে সেখানে মানুষেরই দৌড়াদৌড়িই বেশি হয়। এর ভিতরের ব্যাপারগুলো খুবই মজার। বাংলাদেশের অধিকাংশ ঘোড়াই আকারে খুব ছোট, প্রায় গাধার কাছাকাছি। তাদের করতেও হয় মূলত গাধার কাজ, সারাদিন ঠেলাগাড়ি টানা অথবা ঘানি টানা। ফলে দৌড়ের ঘোড়া খুঁজে পাওয়া হয় খুব কঠিন। খুব খুঁজে খুঁজে হয়তো গোটা তিনেক আধা-পেশাদার দৌড়ের ঘোড়া পাওয়া গেল। বাকি ছয়-সাতটা আসবে ঠেলাগাড়ি আর ঘানির ঘোড়া। এরা সকলেই সকাল থেকে নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিল, বিকেলে এসেছে দৌড় প্রতিযোগিতায়। আর তাই দেখার জন্য হাজার হাজার লোক আসছে। এরপর দৌড় শুরু হলো তো শুরু হলো কাণ্ড। কখন বাঁশি পড়েছে, ঘোড়াগুলোর অধিকাংশই বুঝতে পারেনি। পিঠের পরে যে ত্যাঁদড় ছেলেটি বসে আছে, সে দিলো কষে বাড়ি। ঘোড়া ভাবলো মাল বোঝাই বোধহয় শেষ, অতএব চলতে শুরু করতে হবে। চিরকাল তাকে শিখানো হয়েছে, যেখানে লোকজন কম সেই দিক দিয়ে চলতে হবে। সুতরাং পিঠের উপর থেকে আসতে থাকা অনবরত বাড়ি খেয়ে সে দৌড়াতে লাগলো। কিন্তু এদিন খুব অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার পিঠের ওপর বাড়ি পড়ছে বলে ঘোড়া ঠিক বুঝতে পারে না যে আর কোনভাবে কোন রাস্তা দিয়ে গেলে লাঠির বাড়ি বন্ধ হবে। শেষমেশ তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে; রাস্তা ছেড়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের মধ্য দিয়ে সোজা পাশের বিলে গিয়ে দৌড়াতে থাকে।

বাংলাদেশে সাধারণত ঘোড় দৌড়ের জন্য ঘোড় দৌড় কিংবা নৌকা বাইচের জন্য নৌকা বাইচ তেমন হয় না। অন্য কোনো পার্বণকে উপলক্ষ করে সাধারণত এগুলো অনুষ্ঠিত হয়। বারো মাসের এই দেশে যত দিন তেরো পার্বণ থাকবে, তত দিন এগুলো নিশ্চয়ই থাকবে। বাঙালির একেবারে অন্য ধরনের কিছু খেলাও রয়েছে, যেগুলোর কেতাবি নাম হলো আবহমান কালের খেলা। দাড়িয়াবান্দা, বৌচি, কানামাছি, হাডুডু, তিনঘুটি, ফুলমাছ প্রভৃতি এই জাতীয় খেলা। এগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো খেলতে কোনো পয়সা খরচ হয় না, কিন্তু আনন্দের কোনো অভাবও তাতে হয় না। দাড়িয়াবান্দা, বৌচি, হাডুডু আর ফুলমাছ খেলতে লাগে শুধু কয়েকজন মানুষ। কানামাছি খেলতে লাগে বড়জোর চোখ বাঁধার একখানা রুমাল অথবা গামছা, তিনঘুটি খেলতে লাগে নিতান্তই তিন-তিন ছয়টি ঘুটি। এই ঘুটি আবার তৈরি হয় হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, তাই দিয়েই। হয়তো ঝাটার শলা কিংবা ইটের টুকরো, খরচের কোনো প্রশ্ন নেই। এসব খেলার জন্য যদি কোনোদিন ক্রীড়া ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়, তাহলে সেগুলো দেখতে হবে অভিনব। যেমন দাড়িয়াবান্দা কিংবা বৌচি ফাউন্ডেশনে কোনো ক্রীড়া উপকরণ লাগবে না, পানি খাওয়ার জন্য দু-তিনটি কলস আর গ্লাস রাখলেই মোটামুটি এই ফাউন্ডেশনের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে! কানামাছি ফাউন্ডেশনে অবশ্য কয়েকখানা গামছা বা তোয়ালে ক্রয় করতে হবে। এর জন্য হয়তো কানামাছি ফাউন্ডেশনের প্যাডে একটি দরপত্র আহ্বান করে বলা হবে, বিএসটিআই অনুমোদিত সুতির গামছার সরবরাহকারী চাই! হাড়িভাঙা একাডেমিতে খরচ কিছু বেশিই হবে। গোটা বিশেক বাঁশের লাঠি আর গামছা তো লাগবেই, নিয়মিত সেখানে মাটির হাড়ি সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সবচেয়ে মজা হবে ব্যাং লাফ আর মোরগ লড়াই ফাউন্ডেশনে। কারণ, এখানে প্রায় কিছুই করা লাগবে না; শুধু কিছু ত্যাঁদড় টাইপের ছোকড়া রাখলে এরা দেশকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করে ফেলতে পারবে।

বাঙালির ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দেখতে আসা দর্শক ও সমর্থকদের মধ্যে হার-জিত নিয়ে কোনো টেনশন দেখা যায় না, দেখা যায় শুধু আনন্দ। কোনো কোনো খেলা এত মজার যে, তা দেখতে গেলে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। যেমন, কলা গাছে চড়া। একটা বড় কলাগাছে জবজবে করে সরিষার তেল মাখিয়ে তারপর একেকজনকে তার মাথায় উঠতে বলা হয়। কেউ সাধারণত মাথায় উঠতে পারে না, কিন্তু নিষ্ফল এই চেষ্টা দেখার মতো সুখের ব্যাপার আর হয় না।

বাঙালি সত্যিই খুব আনন্দপ্রিয় একটি জাতি। এই আনন্দ তাঁর আত্মপরিচয়ের অংশ। বাঙালির খেলাও তাই বাঙালির একপ্রকার আত্মপরিচয়। সবচেয়ে স্বস্তির ব্যাপার হলো, এই আনন্দ সৃষ্টি করার জন্য বাঙালির তেমন কোনো টাকা-পয়সা লাগে না। খেলাধুলা তো বটেই বাঙালির সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠতম অনুষঙ্গগুলোর অধিকাংশই বিনে পয়সা বা নামমাত্র পয়সায় আয়োজন করা চলে। বাঙালির নববর্ষও সামান্য খরচের একটি অসামান্য উত্সব। গাছের ছায়ায় বসে গান গাওয়া আর মাঠের মধ্যে বসে মাটির পাত্রে ভাত খাওয়া যে উত্সবের প্রধান একটি আচার, সেখানে অংশ নিতে কাউকে দ্বিতীয়বার ভাবনা চিন্তা করা লাগে না। এত সামান্য মূল্যের বিনিময়ে এত অসামান্য ও বিচিত্র আনন্দ সৃষ্টি করার ক্ষমতা পৃথিবীর খুব কম জাতির আছে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'দেশ আজ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। এদেশে বিদেশিরা বিনিয়োগ করছে না'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
3 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২২
ফজর৪:১৮
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৩০
এশা৭:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :