The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৪, ১ বৈশাখ ১৪২১, ১৩ জমাদিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মিল্কি হত্যা মামলায় ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট | বারডেমে চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি | কালিয়াকৈরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ | তারেকের বক্তব্যে ভুল থাকলে প্রমাণ করুন : ফখরুল

পয়লা বৈশাখের অর্থনীতি

আবু তাহের খান

পয়লা বৈশাখকে ঘিরে সম্রাট আকবরের কালে হালখাতার অর্থনীতির যে প্রবর্তন, গত প্রায় ৩শ' বছর পরও তা কমবেশি চালু আছে। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অত্যন্ত বোধগম্য কারণেই সেটি আরো প্রসারতা লাভ করে এবং বর্তমানে তা ক্রমশই আরো বিকশিত হচ্ছে। আর লক্ষণীয় যে, সেটি আর এখন শুধুমাত্র হালখাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, আরো অনেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই ক্রমান্বয়ে এর সাথে যুক্ত হচ্ছে । বিষয়টি একদিকে যেমন পয়লা বৈশাখের গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলছে, অন্যদিকে তেমনি তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশের ধারাকেও ত্বরান্বিত করছে। এক সময়ে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে মূলত ছিল বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি জাতীয় খাদ্যপণ্যের উত্পাদন, বিক্রয় ও বিতরণ। আর সাথে ছিল এ উপলক্ষে আয়োজিত মেলা ও পার্বনে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পজাত পণ্যের বেচাবিক্রি। কিন্তু পয়লা বৈশাখের অর্থনৈতিক পরিধি এখন বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এবং এ বিস্তৃতি গ্রাম ও শহর উভয় স্থানেই যেমনি ঘটছে, তেমনি তা ঘটছে বিত্তের চরিত্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণি ও পেশার আয়গোষ্ঠীর মধ্যেও।

পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক অর্থনীতির পরিসর, গতিবিধি ও প্রবণতা কিংবা অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিরূপণের বিষয়ে এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো গবেষণা বা সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে বলে জানা যায়নি। ক্রমবর্ধমান এ প্রবণতার আওতায় চোখে পড়ার মতো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট যে সব পণ্যের বেচা-বিক্রি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে তারমধ্যে রয়েছে পোশাক-আশাক, গয়নাগাটি, বাহারি খাদ্য ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী। আর এর অধিকাংশের বিপণন ক্ষেত্র যেহেতু শহর, অতএব বুঝাই যায় যে, এ প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট শহুরে ব্যবসায়ীরা। আর গ্রামে এর বিস্তার এখনো খুবই সীমিত। এমনি পরিস্থিতিতে বৈখাখের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গ্রামের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যায় কিনা বা তা দিতে চাইলে কিভাবে তা সম্ভব, সে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব হচ্ছে যে, বিষয়টিকে শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে না দেখে উত্সব ও আনন্দের একটি সর্বজনীন উপলক্ষ হিসেবে দেখলে তার উপর ভর করেই অর্থনীতি বিকশিত হবার সুযোগ পাবে এবং সেই সূত্রে পয়লা বৈশাখের সামাজিক-সাংস্কৃতিক গুরুত্বেরও প্রসার ঘটবে। অভিযোগ আছে যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের জীবন থেকে উত্সব ও আনন্দের উপলক্ষগুলো ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ মানুষকে আনন্দদানের এ ধরনের আয়োজন পয়লা বৈশাখ উপলক্ষেও করা যেতে পারে বলে মনে করি। আর ধারণা করা চলে যে, গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের আনন্দ-উত্সবের আয়োজন করা গেলে তা গ্রামীণ মানুষের জীবনে সামাজিক সম্পর্ক ও সংহতি বৃদ্ধিতে যেমনি সহায়ক হবে, তেমনি তা সেখানকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারেরও বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা যায়।

পয়লা বৈশাখকে আন্তর্জাতিকতা দানেরও সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি। ভারতে দোলযাত্রা বা দোল উত্সব দেখতে ইউরোপ-আমেরিকা ও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রতি বছরই হাজার হাজার পর্যটক সেখানে এসে ভিড় করে। অন্যের সংস্কৃতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও বলা যায় যে, পয়লা বৈশাখের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য ও অন্তর্গত মোহনীয়তা দোল উত্সবের চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি। ফলে পয়লা বৈশাখকে যদি বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা যায় যে, তাহলে বাংলাদেশেও এ সময় হাজার হাজার পর্যটক এসে ভিড় করবেন বলে ধারণা করা চলে। সে ক্ষেত্রে পয়লা বৈশাখের আয়োজনকে শুধু ঐ একদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না— একে অন্তত আরো সপ্তাহখানেক প্রলম্বিতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ একজন বিদেশি পর্যটক কেবল একদিনের একটি অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য ততোটা উত্সাহী নাও হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে হস্তশিল্প মেলা, লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রামীণ খেলাধুলা, পিঠাপুলি ও মন্ডা-মিঠাইয়ের ন্যায় গ্রামীণ খাবার-দাবারের পরিবেশন ইত্যাদির মাধ্যমে একে প্রলম্বিতকরণের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। কারুগুচ্ছ (Craft Cluster) আছে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এরূপ কিছু গ্রাম চিহ্নিত করে সেখানকার কর্মরত কারুশিল্পীদের (Artisans at Work) কাছে বিদেশি পর্যটকদেরকে নিয়ে যেতে পারলে তা একটি খুবই চমত্কার বিষয় হবে বলে মনে করি। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বিপিসি) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) মিলে এ ক্ষেত্রে ইচ্ছা করলে সহসাই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

পয়লা বৈশাখে ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে এমনকি মফস্বলের দোকানপাটে নানা বাহারী পণ্যের দেদার বেচাবিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু সে পণ্য তালিকায় বইয়ের কোথাও কোনো স্থান নেই। রাজধানীর বিভিন্ন মেলা ও অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে সব পণ্যের স্টল সাজানো হয়ে থাকে, সেখানেও বইয়ের কোনো দোকান নেই। বই বিক্রেতারা হয়তো ভাবেন যে, এসব অনুষ্ঠানের ক্রেতারা আর সবকিছু কিনলেও অন্তত বই কিনবেন। ধারণাটি যৌক্তিক বলে মনে হয় না। এ ব্যাপারে গ্রন্থ প্রকাশকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই যে, আপনারা অন্তত ঝুঁকি নিয়ে হলেও পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানের বইয়ের দোকান খুলে দেখতে পারেন।

আমার বিশ্বাস যে, বৈশাখী অনুষ্ঠানে আসা মানুষজন আপনাদেরকে হতাশ করবেন না। আর বাংলা একাডেমির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠান দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাঠভ্যাস গড়ে তোলার এবং একই সঙ্গে একটি উন্নততর নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পয়লা বৈশাখের বই উপহার দেয়ার সংস্কৃতি চালু করার চেষ্টা করে দেখতে পারে। ধারণা করা যায় যে, এতে করে এক দিকে যেমন পয়লা বৈশাখ উদযাপনের সাংস্কৃতিক মান অনেকখানি সমৃদ্ধশালী হবে, অন্যদিকে তেমনি তা দেশের প্রকাশনা শিল্পকেও লাভবান ও বিকশিত হতে সাহায্য করবে। সব মিলিয়ে কথা হচ্ছে যে, পয়লা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ সত্যিকার অর্থেই বাঙালির এমন এক সর্বজনীন উত্সব যা এ জাতিগোষ্ঠীর ধর্মনিরপেক্ষ অসম্প্রদায়িক চেতনাকেই কেবল ঊর্ধ্বে তুলে ধরে না, একই সাথে তা দেশের সাধারণ মানুষের সুখ, আনন্দ ও উপলব্ধির বোধগুলোকেও শাণিত করে তুলতে সাহায্য করে। আর এসব করতে যেয়ে এর সাথে নিয়ত যে সব অর্থনৈতিক অনুষঙ্গ যুক্ত এবং দিনে দিনে যা আরো প্রসারিত হচ্ছে, সেটার গুরুত্বই-বা কম কিসে! প্রয়োজন শুধু একে ঘিরে সাংস্কৃতিক যে চর্চা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে বিস্তার— এ উভয়ের মধ্যে যেন একটি সমন্বিত মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। এবং তা করতে পারলে সেটি পরস্পরকে সমৃদ্ধি ও সম্পূরকতাদানের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

অভিজ্ঞতা বলে যে, চর্চার সাথে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা না থাকার কারণে বিশ্বের বহু সমৃদ্ধ সংস্কৃতিও পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। আবার অনেক ক্ষীণধারার সংস্কৃতিও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্তিকে অবলম্বন ক্রমান্বয়ে বিস্তৃততর ও বেগবান হয়ে উঠেছে। পয়লা বৈশাখ ওই শেষোক্ত ধারায় উত্তরোত্তর আরো ব্যাপকভিত্তিক ও সমৃদ্ধতর হয়ে উঠবে—সেটাই প্রত্যাশা। আর সংশ্লিষ্ট সকলের যত্ন ও উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নিকট ভবিষ্যতেই বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ যদি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের কোনো পরিচিত পার্বন হয়ে ওঠে, তাতেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। আমরা সে আন্তর্জাতিকতার পরিমল থেকে পয়লা বৈশাখকে উদযাপনের অপেক্ষায় থাকলাম।

লেখক: পরিচালক

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)

ই-মেইল : [email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'দেশ আজ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। এদেশে বিদেশিরা বিনিয়োগ করছে না'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
5 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২১
ফজর৪:৪৬
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৩
এশা৭:২৬
সূর্যোদয় - ৬:০২সূর্যাস্ত - ০৬:০৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :