The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ৩ মে ২০১৩, ২০ বৈশাখ ১৪২০, ২১ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ জিম্বাবুয়েকে ১২১ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে বাংলাদেশ | সব দলের প্রতিনিধি নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে আপত্তি নেই: প্রধানমন্ত্রী | মতিঝিল শাপলা চত্বরে আগামীকাল সমাবেশ করার অনুমতি পেয়েছে ১৮ দল | দেশকে সবার ওপরে রেখে সংলাপে বসতে হবে : ওবায়দুল কাদের | জামিনে মুক্ত জয়নুল আবদিন ফারুক | সাভারে নিহতের সংখ্যা ৫ শতাধিক

উপন্যাসে মনস্তত্ত্বের রূপায়ন

ইয়াসির আজিজ

উপন্যাস সাহিত্যের এমন একটি মাধ্যম যেখানে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়ার অবকাশ থাকে। এখানে লেখক প্রাণখুলে তাঁর মতামত লিপিবদ্ধ করতে পারেন বা একেকটি চরিত্রকে প্রস্ফুটিত করতে পারেন সকল ধরনের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। উপন্যাসকে এক সুবিশাল ক্যানভাস হিসেবে ধরা যায়, লেখক তাঁর পরিকল্পনা মাফিক একেকটি অধ্যায়কে জায়গা করে দেন সেখানে। বাংলা উপন্যাস তার শুরু থেকেই কাহিনিপ্রধান হিসেবে রচিত হয়ে আসছে, উপন্যাস তার আখ্যানের ডালপালা ছড়ায় এবং পাত্রপাত্রী ঘটনার আবর্তন অনুসারে ক্রিয়া করে থাকে। অর্থাত্ উপন্যাসের শুরু ও পরিণতি লেখক সুচিন্তিতভাবে সৃষ্টি করেন, কারণ তিনি প্রায়ই লক্ষ রাখেন নিজের দেশের উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রচলিত গতানুগতিকতা বা ধারাবাহিকতা এবং সেই সঙ্গে পাঠকের প্রত্যাশার দিকে ।

উপন্যাসের কাহিনির পরই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় এর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়-আশয়। একটি সার্থক উপন্যাস হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে লেখকের সুপরিকল্পিত ও দক্ষ হাতের গাঁথুনি সর্বাগ্রে প্রয়োজন হয়, এবং তারই মধ্যে ফুটে ওঠে মনোজগতের নানা ধরনের খেলা। যেন-তেনভাবে কাহিনি এগিয়ে নেওয়া একরকম, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দিককে যথার্থভাবে রূপায়ন করা অবশ্যই ভিন্নরকম। প্রকৃত প্রতিভাবান কথাশিল্পীর প্রয়োজন হয় দ্বিতীয়টির জন্য। স্থান-কালের যথার্থ উল্লেখ, বাস্তবতার প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখা, মানুষের হূদয়ের গভীর তলদেশ স্পর্শ করার ক্ষমতা—ইত্যাদি দরকার একটি সার্থক উপন্যাসের জন্য। উপন্যাসকে অবশ্যই লক্ষাভিসারী হতে হয়। একটি উপন্যাস শুধুই প্রেমের উপন্যাস, না কি সমাজ ও রাজনীতিপ্রধান উপন্যাস, না কি কোনো ঐতিহাসিক কাহিনিনির্ভর উপন্যাস—তা স্পষ্টত নির্দিষ্ট করে নিতে হয় লেখককে। এবং এর গতিপথের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে পাত্রপাত্রীর আচরণ ও বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা। কোনো একটি উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক দিককে আলাদা করে দেখার সময় আমাদের প্রথমেই খেয়াল করতে হয় ঔপন্যাসিকের সামর্থ্য কিংবা তিনি কতটা কী করতে চান ও পারেন সে বিষয়টির প্রতি। প্রাথমিকভাবে একজন পাঠক কোনো উপন্যাসের মনস্তত্ত্ব বলতে নায়ক-নায়িকা ও অন্যান্য প্রধান চরিত্রের মনস্তত্ত্বই লক্ষ করেন। কিন্তু একজন প্রাগ্রসর পাঠক কিংবা একজন সমালোচক অথবা অন্য একজন লেখক কোনো একটি উপন্যাসের পাত্রপাত্রীর মনস্তত্ত্ব বুঝে ওঠার পাশাপাশি লেখকের মনস্তত্ত্বও বুঝে নেন। তিনি সহজেই রচয়িতার আকাঙ্ক্ষা ও অবদমনকে উপলব্ধি করেন। মূলত একজন লেখকের নিজস্ব মানসিক বহুমাত্রিকতার ধরন তাঁর সৃষ্টিকে বিচিত্রতর করে তোলে। অনেক সময়ই দেখা যায়, লেখক তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে যা হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হতে পারেননি, সে রকম কিছুই তাঁর উপন্যাসের নায়ক বা নায়িকার মধ্যে পরস্ফুিট করেন। আবার অনেক সময় লেখকের আদর্শ কোনো নারী বা পুরুষকে রূপায়িত করার কাজটি তিনি করে থাকেন। উপন্যাসের অনেক বলিষ্ঠ চরিত্রই এ রকম পটভূমি থেকে গড়ে উঠেছে। বাংলা উপন্যাসের আবির্ভাব খুব বেশি দিনের না হলেও ইতিমধ্যে তা যথেষ্ট পরিণত হতে পেরেছে এবং বোদ্ধা ও সাধারণ পাঠক উভয়েরই আস্থা অর্জন করেছে। পাঠকের কাছ থেকে উপযুক্ত সাড়া পেয়ে নিজের সৃষ্টির বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন ঔপন্যাসিক। কোনো নির্দিষ্ট দেশের বা ভাষার সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বা ধারাবাহিকতা থাকলে ভালো সৃষ্টি সহজতর হয়। বিভিন্ন বিষয়-আশয়কে উপজীব্য করে তোলার ক্ষেত্রে লেখককে খুব একটা দ্বিধায় ভুগতে হয় না সে ক্ষেত্রে।

প্রেম, নর-নারীর আকর্ষণ ও বিকর্ষণ, মনস্তত্ত্বের জটিলতার উদ্ঘাটন যেমন ঘটতে পারে একটি উপন্যাসে, তেমনি আবার সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, দেশাত্মবোধ, স্বদেশে সংঘটিত নানা ঘটনার অভিঘাত ও বিপন্নতার অধ্যায়, প্রবাসজীবন—ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গের গভীরে ঢুকতে পারেন একজন ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসে।

একটি উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে কোনো একটি সমাজের দর্পণ স্বরূপ। কুশলী ঔপন্যাসিক সেটিকে রূপায়ন করেন এমনভাবে যে সমাজের খুঁটিনাটি অনেক কিছুই তাতে উঠে আসে। কোনো নির্দিষ্ট জনপদকে লেখক তাঁর বর্ণনার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। সেই জনপদের মানুষজনের আচার-আচরণের প্রবণতা, ভাষা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান, জীবনযাপন প্রণালি, স্বপ্ন-সাধ এবং সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষে গৃহীত পদক্ষেপ বা ক্রিয়াকলাপসমূহকে লেখক তাত্পর্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেন। এটি পরবর্তীকালে দলিল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে, কেননা সমাজ দ্রুতই পরিবর্তিত হয় এবং আজ থেকে একশ বছর আগেকার একটি সমাজের বর্ণনা খুঁজতে হলে আমাদের সেই সময়ের প্রতিনিধিত্বমূলক কয়েকটি উপন্যাস পাঠ করাই উপযুক্ত পন্থা।

সামাজিক জীবনযাত্রার বর্ণনার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের চমত্কার রূপায়নও আমরা উপন্যাসে পাই। আজকের যুগে ইট-কাঠ-লোহার শহরের কর্কশতার মধ্যে বসবাসরত একজন পাঠক যথেষ্ট আনন্দ পেতে পারেন নির্মল ও উদার গ্রাম্য প্রকৃতির বর্ণনা পাঠ করার মাধ্যমে।

এসব উপন্যাস আমাদের নস্টালজিয়াকে জাগ্রত করে, কাঙ্ক্ষিত ভ্রমণের পথে নিয়ে যায় আবার প্রকৃতির নিবিড় স্পর্শের পরিভাষায় জীবনের জয়গান ও সাম্যবাদের প্রয়োজনীয় পাঠও গ্রহণ করায়।

উপন্যাস রচনায় লেখকের নানাবিধ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ক্রিয়াশীল থাকে। প্রথমত, লেখক গল্প বা আলেখ্য বর্ণনা করতে চান। সেই গল্পের প্রয়োজনেই তিনি নির্মাণ করেন বিভিন্ন চরিত্র। অনেক সময় এক বা একাধিক চরিত্র খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, গল্পের গতি-প্রকৃতিও অনেকখানি নির্ধারিত হয়ে ওঠে কোনো একটি চরিত্রের যথার্থ পরস্ফুিটনের তাগিদে।

ধরা যাক, কোনো ঔপন্যাসিক একজন নায়ককে খুবই বীরোচিত প্রকাশে তুলে এনেছেন তাঁর উপন্যাসের প্রথম দিকে, এখন সহসাই তিনি এই চরিত্রটিকে মলিন করে দিতে পারেন না বা সরিয়ে দিতে পারেন না। ফলে এই চরিত্রের নানা কার্যাবলির মাধ্যমে তিনি ক্রমাগত তাকে একটি পরিণতির দিকে টেনে নিতে সচেষ্ট হন। এর ফলে স্বভাবতই তাঁর এই উপন্যাসের আয়তন বেড়ে যায় এবং কোনো একদিকে ধাবিত হয় এর ঘটনাপ্রবাহ।

এভাবে যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবেশ রয়েছে আমাদের উপন্যাসের রচনা ও পাঠাভ্যাসের ক্ষেত্রে। এর সুফল ভোগ করে একজন লেখক স্বচ্ছন্দে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার ভেতর প্রবেশ করতে পারেন, ইচ্ছে করলে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও তিনি করতে পারেন। একজন কুশলী ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসে প্রধান চরিত্র এমন সুচারুরূপে তৈরি করেন যে দেখা যায়, পাঠক অবচেতনে সেই চরিত্রের ভক্ত হয়ে ওঠে অথবা হয়তো সেই চরিত্রের মতো করে নিজেই আচরণ করতে শুরু করে। এ প্রসঙ্গে শরত্চন্দ্রের 'দেবদাস' উপন্যাসের কথা বলা যায়। বহুকাল মানুষ এই উপন্যাসের নায়ককে মনে রেখেছে এবং অনেকেই দেবদাসের মতো দুঃখবিলাসী আচরণ করেছে কিংবা নিজের প্রেমিকাকে দেবদাসের উদাহরণ দিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দাবি করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা উপন্যাসের নায়িকা লাবণ্যের আপাত নির্লিপ্ত আচরণ অনেক তরুণীরই পছন্দের বিষয়। অনেক সমালোচক এই উপন্যাসে লাবণ্যের ভালোবাসা ও বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ব্যাখ্যা করেছেন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এবং বোঝা যায় লেখক চাতুর্যের সঙ্গেই এই চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন এমনভাবে যাতে নারীদের কাছে সামাজিক নিরাপত্তা বা নিশ্চয়তার প্রশ্নটি যে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়, তা বোঝা যায়।

তারাশঙ্করের 'কবি' উপন্যাসে যে ধরনের অমানবিকতার পরিবেশে একজন কবিকে থাকতে হয়েছে এবং দেহ পসারিনীদের যে কষ্টের জীবনযাত্রা এখানে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন, তা পাঠকের হূদয়ের গভীরে দাগ কাটে। পাঠককে শিহরিত হতে হয়। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসে নিম্নবর্ণের মানুষদের আচার-আচরণ, হাসি-কান্না, সাধ-আহ্লাদ—নানা সমস্যা ও তা থেকে উত্তরণের বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে যে ধরনের জীবনযাত্রা ও তা থেকে উদ্ভূত সমষ্টির মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ন আমরা দেখতে পাই, তা অভূতপূর্ব। বাংলা উপন্যাসের আঙ্গিকগত পরিবর্তন ও বিবর্তন আমরা লক্ষ করি একটি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে। ইংরেজ উপনিবেশের সমাপ্তির পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়। পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার বাঙালিদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে উপজীব্য করে অনেক উপন্যাস রচিত হয়েছে। এসব উপন্যাসে নাগরিক জীবনের নানা ঘাত-অভিঘাত, সংকট ও সমস্যা নতুনতর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। এখানে কাহিনি এগিয়েছে লেখকের উপলব্ধি মোতাবেক। জীবন যাপন-প্রণালি এবং সংকট থেকে উত্তরণের দিগিনর্দেশনা দিতে গিয়ে লেখক তাঁর বর্ণনাকে ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর করেছেন এবং অনেক উপন্যাসেই প্রেমের আখ্যান থাকলেও তা প্রধান কিংবা একমাত্র বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি। বরং বিবিধ সামাজিক সম্পর্ক, যৌথ পরিবারের সদস্যদের স্নেহময়তার অন্তর্জালে বন্দী থাকা, ধর্মাচারণ, সামপ্রদায়িক বিভেদ ও দাঙ্গা, নতুন রাষ্ট্রের আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন ও বাস্তবতার চিত্র—এসব কিছুই প্রাধান্য পেয়েছে।

এসব উপন্যাসের ভাষাভঙ্গিও যথেষ্ট তাত্পর্যপূর্ণভাবে পরিবর্তনের পথে ছিল। প্রচলিত কলকাতার বাবু ভাষার পরিবর্তে সমাজে প্রকৃত ব্যবহূত ভাষায় সংলাপ রচনার দিকে কথাসাহিত্যিকগণ আগ্রহী হয়েছেন। এ সময়কার উপন্যাসের একটি প্রধান প্রবণতা আমরা লক্ষ করতে পারি, তা হলো গ্রামীণ জনপদের মানুষদের ধর্মভীরুতা। এসব গ্রাম্য ও সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার কার্যকলাপ চালানো ভন্ড পিরদের তুলে আনা হয়েছে অনেক উপন্যাসে।

সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কার এবং এক শ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ী ও ফতোয়াবাজদের নিয়ে ইদানীংকালে লেখা হয়েছে বেশ কটি উপন্যাস। ফতোয়া প্রদান ও নারীর অবমাননার বিষয়ে এসব উপন্যাস উচ্চকিত খুব। এর পাশাপাশি নারী লেখকগণের উপন্যাসে নারীবাদ প্রাধান্য পেয়েছে। নারীর মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করার অবসরে প্রায়ই পুরুষকে অত্যাচারী ও হীন চরিত্রের হিসেবে রূপায়ন করা হয়েছে এসব লেখকের লেখায়। তসলিমা নাসরিন বা নাসরিন জাহানের উপন্যাসে এই প্রবণতা সত্ত্ব্বেও এগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে বুননশৈলীর দক্ষতার কারণে এবং কখনো কখনো যৌনতার অতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে।

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরের ঘটনাবলিকে অবলম্বন করে বেশ কিছু উপন্যাস লেখা হয়েছে। এসব উপন্যাসে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ-কালকে দেখার সুযোগ পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন পক্ষের মানুষের মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তোলার প্রবণতা দেখা যায়। আবার সাম্যবাদ ও যুদ্ধের আবহের উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে কিছু কিছু উপন্যাস এমনভাবে লেখা হয়েছে যে, সেগুলো রুশ সাহিত্যের ছায়া হয়ে উঠেছে। এগুলো যদিও মানুষের মহত্তম আবেগকে রূপায়িত করতে সচেষ্ট থেকেছে, তবু শিল্পের মৌলিকত্ব অনেকখানি ক্ষুন্ন হয়েছে বলেই মনে হয়। এবং অবশ্যই এটা মনে রাখতে হবে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সামাজিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি এবং বিপ্লবের কারণ ও ঐতিহ্য আমাদের দেশের থেকে বহুলাংশে আলাদা। ম্যাক্সিম গোর্কির 'মা' উপন্যাস যে পটভূমিতে রচিত হয়েছে আমাদের দেশের যেকোনো সময়ের সংগ্রাম বা আন্দোলনে সেই ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি পাওয়া যায় না। উভয় দেশের সমাজব্যবস্থায় বিস্তর ফারাক রয়েছে। কাজেই গোর্কির 'মা' উপন্যাসের অনুরূপ 'মা' উপন্যাস আমাদের দেশের পটভূমিতে লেখা হয়েছে বটে, কিন্তু তার সার্থকতা মেলেনি কোনোভাবেই।

শিল্পের দাবি মিটিয়ে বৃহদাকারের ও চিরায়তধর্মী উপন্যাস লেখা কষ্টসাধ্য হওয়ায় এবং বুঝতে দুরূহ হওয়ার কারণে পাঠকদের কাছ থেকে উপযুক্ত সাড়া না পাওয়ায় আমাদের কথাসাহিত্যিকগণ ক্রমেই জীবনমুখী ও উচ্চমানের সৃষ্টি থেকে সরে এসেছেন এবং রোমান্টিক ধরনের সস্তা ও সহজ ভঙ্গির উপন্যাস লেখায় মনোনিবেশ করেছেন। আমজনতাও সহজ বিনোদনের স্বার্থে এগুলো লুফে নিয়েছে এবং দেখা যাচ্ছে, সামপ্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের উপন্যাস এই সস্তা জনপ্রিয়তার অন্ধগলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আমরা হাতে গোনা কয়েকটি উপন্যাসও পাইনি যা ক্ল্যাসিকাল বা মহত্ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সহজতার কাছে ধরনা দেওয়ার প্রবণতা এবং আমুদে ও নাটুকে সিকোয়েন্স তৈরির মাধ্যমে পাঠককে তাত্ক্ষণিক আনন্দ দেওয়ার যে উপন্যাসগুলো ইদানীংকার জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকগণ রচনা করেছেন, তা সংখ্যার বিচারে কেবলই বেড়ে গেছে, তাতে শিল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলতে যা বোঝায়, তার প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। ফলে এসব উপন্যাস থেকে সমাজ, সমাজ পরিবর্তনের নানা সূত্র, কিংবা মানব চরিত্র উদ্ঘাটনের কোনোবস্তুনিষ্ঠ তথ্য এবং নতুন কোনো সত্য উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়া আমরা আশা করতে পারি না। এসব সাহিত্যে নতুন উপলব্ধির দরজাগুলো ক্রমশ বন্ধ হয়ে গেছে এবং ঘটনা ও পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনায় বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে লেখকের বিকৃত চিন্তাধারাই বেশি ফুটে উঠতে দেখা যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্বের উদ্ঘাটন আশা করা বোকামির পর্যায়েই পড়ে এবং দেখা যায় লেখকগণ বুঝে বা না বুঝে যেসব চরিত্র সাধারণত তৈরি করেন এখনকার জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসে, সেখানে পুরুষ বা নারী আর সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু প্রেমেরই জন্য জীবনপাত করে; কিংবা দেখা যায় এলেবেলে ধরনের ঘটনাবলির মধ্যে কিছুটা খামখেয়ালিপনা, কিছুটা উদ্দেশ্যহীন ছ্যাবলামির উপকরণের মধ্যে কাহিনি আবর্তিত হতে থাকে। বীররস কিংবা অনুকরণীয় চরিত্রের রূপায়ন যেন লেখকগণ ভুলেই যান। আর পাঠকও তৈরি হয় এ ধরনের লঘু বিষয়েরই জন্য।

এভাবে প্রকৃত মেধাবী লেখকের সমান্তরালে আর একটি ধারার লেখকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে যারা জনপ্রিয়তা বা বই বিক্রির মাপকাঠির ঊর্ধ্বে অবস্থান নেন। শিল্পের দাবি মিটিয়ে যে উপন্যাসগুলো পরিশ্রমী লেখকের কলম থেকে বেরোয় সেগুলোই সময়ের গণ্ডীকে অতিক্রম করে টিকে থাকে এবং সেখানে বয়ানের জটিল বা সরল যেকোনো রূপই সাদরে আমন্ত্রিত হয়। সেখানে এমন অনেক কিছুই থাকে, যা যুগে যুগে মানুষের অন্তঃকরণকে দোলায়িত করে। উপন্যাসের চরিত্রের মানসিক দিক আর বাস্তবের মানুষের হূদয় অনেক সময়ই একাকার হয়ে যায় মহত্ উপন্যাসের আলোকছটায়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
রানা প্লাজার স্থানে নিহত শ্রমিকদের স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবি যৌক্তিক বলে মনে করেন?
9 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৬
ফজর৫:১২
যোহর১১:৫৪
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩৫
সূর্যোদয় - ৬:৩৩সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :