The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার ৭ মে ২০১৪, ২৪ বৈশাখ ১৪২১, ৭ রজব ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন: সাত দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ | বিএসএমএমইউ পরিচালকের কক্ষের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেফতার ১

আইসিটি সেক্টরের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ :চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

আবদুল্লাহ এইচ কাফী

অ্যাসোসিও'র সভাপতি হিসেবে আমার এশিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চলের বিশটিরও বেশি দেশের আইসিটি সেক্টরের সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রতিনিয়তই সম্পর্ক রেখে চলতে হয়। এ ছাড়া এই সংগঠনটিতে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিভিন্ন পদে কাজ করছি। তাই বাংলাদেশের আইসিটি সেক্টরের সাথে যতখানি আমার সম্পর্ক, ঠিক ততখানি এশিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চলের সঙ্গেও আমার চলাফেরা। অনেক বছর ধরে চলে আসা এই সম্পর্কের মাধ্যমে আমি একদিকে যেমন বাংলাদেশের আইসিটি সেক্টর সম্পর্কে সচেতন, ঠিক তেমনি এশিয়া অঞ্চলের আইসিটির অগ্রগতির অনেকটাই আমার দেখা। যেসব দেশ গত দুই দশকে আশাতীত সাফল্য দেখিয়েছে, তাদের সাফল্যের ক্রমবিকাশ নিজের চোখে দেখা। বাংলাদেশের আইসিটি সেক্টরের সাথে আমার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ১৯৮০ সাল থেকে। ১৯৮৭ সালে আইবিএম-এর তত্কালীন কান্ট্রি ম্যানেজার আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় এসএম কামালের নেতৃত্বে আমরা আইসিটি সেক্টরের প্রথম সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) প্রতিষ্ঠা করি এবং এর প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব আমি পালন করি। এ সমিতি প্রতিষ্ঠায় আমাদের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল জনগণের মধ্যে কম্পিউটার প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা। জনগণের কাছে সহজলভ্য করার জন্য কম্পিউটার এবং এর আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্ত করা ছিল আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি যা অনেক চেষ্টার পর ১৯৯৮ সালে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এএমএস কিবরিয়া বাস্তবায়ন করেন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের উদ্দেশ্য নিয়ে এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরোর (ইপিবি) সহায়তায় এবং জামিলুর রেজা চৌধুরীর সুপারিশে প্রতিষ্ঠিত হয় বেসিস।

এ ছাড়া ২০০০-২০০১ সালে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করি। আমার সময়কালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ইন্টারনেটের ভিস্যাট বেসরকারি খাতে মুক্ত হওয়া এবং ভি-স্যাটের বাত্সরিক ফি ৯৬,০০০ ডলার থেকে মাত্র ৩,৫০০ ডলারে কমিয়ে আনা। সেটি ঘটেছিল ২০০১ সালে। তাই আইসিটি সেক্টর নিয়ে আমাদের যে স্বপ্ন, আমাদের যে চেষ্টা, সেগুলোর মধ্য দিয়ে সেই আশির দশক থেকেই আমরা যে অল্প কয়জন বিসিএস গঠন করেছিলাম, আমরা আশা করেছিলাম বাংলাদেশের আইসিটি সেক্টর এশিয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি স্থান অর্জন করে নেবে। কিছু ক্ষেত্রে যে আমরা অগ্রগতি অর্জন করিনি, তা বলব না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থানের দিক থেকে এখনও ভারত, পাকিস্তান এমনকি শ্রীলংকার চাইতেও অনেক পিছিয়ে রয়েছি। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে নেপালও দিন দিন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই একদিকে যেমন বাংলাদেশে আইসিটি সেক্টরের অগ্রগতি দেখে আমি আনন্দিত, আবার মাঝে মধ্যে ভাবি আমরা কেন পিছিয়ে পড়লাম বা কী করলে আমরা বিশ্বমানের না হোক, এশিয় মানে পৌঁছাতে পারব। বাংলাদেশের আইসিটি সেক্টরের অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিমাণ বাড়ছে এবং হার্ডওয়ারের এই বাজারের চাহিদা বিবেচনা করে বিশ্বের প্রায় সমস্ত জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট পিসি, ও ল্যাপটপ পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার পরে আস্তে আস্তে চট্টগ্রামও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হচ্ছে এবং সিলেটসহ অন্য অনেক শহরকেই বোধহয় কম্পিউটার কোম্পানিগুলো গোনার মধ্যে ধরে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের এখনও অবস্থান অনেকটা একমুখী। আমরা আইসিটি পণ্য এবং সেবা আমদানি করছি এবং তা বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করছি। আর রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের সংখ্যা ডলারে এখনও খুব একটা বলার মতো নয় (প্রায় দুইশত মিলিয়নের কাছাকাছি)। অনেক সম্ভাবনা নিয়েও আমরা যে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছি না, তার কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। আমার যেটা মনে হয় তা হচ্ছে আমাদের সম্ভাবনা অনেক কিন্তু আমরা এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর খুব বেশি চেষ্টা করছি না। এক ধরনের আত্মতুষ্টি সবার মধ্যে চলে এসেছে যে যেহেতু সরকার 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গড়ার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে তাই আমাদের খুব বেশি কিছু করার দরকার নেই। আমরা গত তিন দশকে কখনই আইসিটি সেক্টরে নিজেদের সত্যিকারের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে খুব বেশি উদ্যোগ হাতে নিইনি। আর অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের কাছে দেন-দরবার করতে করতে অনেক জিনিসই আমরা দেরিতে পেয়েছি। ভি-স্যাটের উপর সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করতেও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে আমাদের। সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ আমরা নিজেরাই গ্রহণ করিনি। ইদানীং ই-কমার্সের কথা অনেক বললেও পেপ্যাল বাংলাদেশে এখনও আসেনি এবং অনলাইনে লেনদেন বৈধ হয়েছে খুব অল্প সময় আগে। এখনও দেশ থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য কেনাকাটা খুব সহজ নয় এবং বেশিরভাগ লোকের তা চিন্তারও বাইরে।

এ সমস্যাগুলোর কথা বললাম কিন্তু একইসাথে এ কথাও আমি মানি এবং সবসময়ে বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। তৈরি পোশাক শিল্পে আমি দেখেছি যে আমাদের মূল শক্তি হচ্ছে আমাদের লোকদের পরিশ্রমের মানসিকতা। আর শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি বাধ্যতামূলক থাকায় আমাদের ইংরেজি জানা লোকের অভাব নেই। হয়তো ইংরেজিতে দুর্বল অনেকেই রয়েছে কিন্তু তাদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে পারলে ইংরেজিতে দক্ষ করাটাও অসম্ভব কিছু নয়। বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে যে মাতামাতি হচ্ছে এটা একদিক দিয়ে আমি ইতিবাচক হিসেবে মনে করি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সত্যিকারের ডিজিটাল হবে কি না তা আমি বলতে পারব না। তবে এটুকু বুঝি যে এ নিয়ে চেষ্টার ফলে বর্তমানে মানুষ আগের থেকে অনেক বেশি আইসিটি সেক্টর নিয়ে ওয়াকিবহাল এবং সচেতন। আমাদের স্বপ্ন পূরণ করার জন্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইথের দাম কমালেই হবে না, ভোক্তা পর্যায়ে যাতে সত্যিকারের দাম কমে সেদিকে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে। আর বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে আইসিটি সেক্টরের অনেক কিছুই ঢাকা-কেন্দ্রিক। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষ এসবের আশীর্বাদ থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত। এখনও দেশে এমন মানুষের অভাব নেই যারা জানে না ইন্টারনেট কী। স্বপ্ন থাকতে হবে যে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে নয় বরং প্রতিটি গ্রামে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট থাকবে। একদম কৃষকের হাতে না থাকুক, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকবে এবং সে বিদ্যালয়ে শুধু একটি কম্পিউটার থাকবে না। যদি কোনো বিদ্যালয়ে ৫০০ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে তাহলে তাদের জন্যে ন্যূনতম ২০টি কম্পিউটার থাকবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের উপরেও জোর দিতে হবে। যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক সাফল্য সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের উপর নির্ভর করে। শিক্ষিত মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা যত বেশি থাকবে, কোম্পানিগুলো তত বেশি দক্ষ কর্মী পাবে।

সময় এসেছে সরকারের আইসিটি সেক্টরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উপরে গুরুত্ব দেওয়ার। তবে একথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে একবার গিয়ে একদিনে সবকিছু বদলানো যাবে না। নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক সভা সমাবেশে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এশিয়া অঞ্চলের আইসিটি সেক্টরের সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি ইন্ডাস্ট্রি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জানাশোনা হবে এবং ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকবে। এভাবে একসময়ে অন্য দেশের সঙ্গে আমরা যৌথভাবে কাজ করতে সমর্থ হব এবং এ অঞ্চলে ধনী দেশগুলো আমাদের আউটসোর্সিংয়ের কাজ দিতে আগ্রহী হবে। আর মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে আমাদের। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা যে খাতের কথাই বলি না কেন, সমন্বিত দিক নির্দেশনা না থাকলে সাফল্য আসবে না।

লেখক :চেয়ারম্যান, এশিয়া-ওশেনিয়া কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রি অর্গানাইজেশন (ASOCIO)

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনায় র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান বলেছেন, 'র্যাবের কেউ জড়িত থাকলে তাকে রক্ষার চেষ্টা করব না, বিভাগীয় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।' তিনি কি এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেন?
1 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৮
ফজর৪:৫৬
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৫সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :