The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার ৭ মে ২০১৪, ২৪ বৈশাখ ১৪২১, ৭ রজব ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন: সাত দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ | বিএসএমএমইউ পরিচালকের কক্ষের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেফতার ১

আমি হব নারায়ণগঞ্জের ডন

ঘটনার আগের দিন কর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে নূর হোসেন

আবুল খায়ের নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে

নারায়ণগঞ্জে অপহরণ ও সাত হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে আওয়ামী লীগের এক নেতা ওয়াদা করেছিলেন, 'তোমার ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে গজারিয়া আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে জিতিয়ে দিলে তোমার মিশনও সফল হবে'।

২৩ মার্চ মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ দিন নূর হোসেনের বাহিনী (কয়েকশ') গজারিয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ভয়ভীতি দেখায়। এক পর্যায়ে ব্যাপক গোলাগুলি চালিয়ে তারা সেখানে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় বালুয়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি সামসুদ্দিন ভোট কেন্দ্রে নিহত হন। পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালায়। সে সময় বিএনপির উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল মান্নান দেওয়ানের স্ত্রী লাকী বেগম নিহত হন। এ ঘটনার পর সেখানে নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। উক্ত হামলার পর দিন নূর হোসেনের ক্যাডার বাহিনীর হামলায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহবুব আলম ঝোটন নিহত হন। দ্বিতীয় দফা ৯ এপ্রিল গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনেও নূর হোসেন ক্যাডার বাহিনী আগের মতোই মহড়া দেয়। নজরুলসহ সাত হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধানে এভাবেই একের পর এক বেরিয়ে আসছে নূর হোসেনের কোটি কোটি টাকা আয়ের উত্স এবং তার অপরাধ কর্মকাণ্ডের শিউরে ওঠা সব কাহিনী।

গজারিয়া নির্বাচনে নূর হোসেন সফল হওয়ার পর তার অন্য মিশনটি সফল করার পরিকল্পনা শুরু হয়। তাকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি করার পেছনে আওয়ামী লীগের উক্ত নেতার হাত ছিল। অপহরণের আগের দিন অর্থাত্ ২৬ এপ্রিল সকালে কাঁচপুর সিমরাইল টেকপাড়া বাসভবনে দলীয় ক্যাডারদের সঙ্গে বৈঠক করে নূর হোসেন। ঐ সময় তিনি খুশি মনে ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের জানান, গজারিয়ায় সফল হয়েছি। এবার আমার মিশন সফল করার পালা। আমি হব নারায়ণগঞ্জের ডন, আর মুন্সিগঞ্জে থাকবে আমার বস। ঐ নেতার বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন করা সম্পর্কে নূর হোসেন বলেছিলেন যে, গজারিয়ায় সরকারের ১২০০ কোটি টাকার প্রকল্প চূড়ান্ত হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচিত হলে নূর হোসেন ও তার বস মিলে ঐ সব প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করবে।

ক্যাডার বাহিনীর এক সদস্য তখন বলে 'বস' প্রশাসন আপনার পক্ষে আছে কিনা। উত্তরে তিনি বলেন, আমি (নূর হোসেন) প্রতিদিন ১৮০টি টাকার খাম দলীয় নেতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও অন্যদের দেই। সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানার তার কমান্ডের বাইরে কখনও যায়নি এমন মন্তব্যও করেন কাউন্সিলর নজরুলসহ ৭ হত্যার প্রধান আসামি। তার কথার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় অপহরণের ঘটনা থেকে শুরু করে নদীতে লাশ গুম করা পর্যন্ত ঘটনাক্রম দেখে। জালকুড়ি শিবু মার্কেটের শতাধিক দোকানপাট, ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পথচারিদের সামনে থেকে কাউন্সিলর নজরুল ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। অপহরণকারীদের কেউ কেউ পরিচিত থাকলে জালকুড়ি শিবু মার্কেটের কেউ জীবন বাঁচাতে নাম ঠিকানা বলতে সাহস পায়নি।

অপহরণের রাতে আওয়ামী লীগের উল্লেখিত নেতার সঙ্গে নূর হোসেন দেখা করেন। পরদিন সিমরাইলের বাসায় অবস্থান করেন। পুলিশসহ কয়েক গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সঙ্গে আলাপ করেন। এদিন সন্ধ্যায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে নজরুলসহ ৭ অপহরণের ঘটনার বর্ণনা দেয়ার ঘোষণা দেন। ঐদিন সন্ধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলন না করে তার বসের সিগন্যাল পেয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এলাকাবাসী ও স্বজনহারা পরিবার জানান যে, কাউন্সিলর নজরুল ছিল নূর হোসেনের জন্য বড় বাধা। দলীয় নেতাকর্মীরা নজরুলকে মানত। কিন্তু নূর হোসেনকে পাত্তা দিত না। নজরুলকে ২০০০ সাল থেকে ৫ দফা হামলা করে হত্যা করতে পারেনি নূর হোসেন। তবে এসব হামলায় অন্য ২ জন প্রাণ হারান।

এক আওয়ামী লীগ নেতার গুণধর পুত্র নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ঠিকাদার আবু সুফিয়ানের পার্টনার। ঠিকাদার হাসুর সঙ্গে নজরুলের বিরোধ দীর্ঘদিনের। হাসু আবার নূর হোসেনের ঠিকাদারি পার্টনার। কাউন্সিলর নজরুল মারা গেলে যাদের স্বার্থ হাসিল হবে তারা মিলে নূর হোসেনের নেতৃত্বে একমাস আগে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য পরিকল্পনা বৈঠক শুরু করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে হাত করার ও সহযোগিতা করার দায়িত্ব নেয় ঐ নেতার গুণধর পুত্র। এ নেতার পুত্রের মাধ্যমে ৬ কোটি টাকা বণ্টন করা হয় বলে স্বজনদের দাবি। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে ঐ সব ঘটনা তুলে ধরেন স্বজনরা। হত্যা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার বৈঠকের ধারণকৃত অডিওতে নারায়ণগঞ্জের বহুরূপী আলোচিত ঠিকাদার আবু সুফিয়ানের বক্তব্য ছিল। অপহরণের তিন দিন আগে কাঁচপুর লান্ডি পয়েন্টের কাছে নূর হোসেনের জলসাগর নামক প্রমোদ কেন্দ্রে বসে কাউন্সিলর নজরুলকে হত্যা করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়।

ঢাকা রেঞ্জের পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ফারুক আহমেদ বলেন, সাতটি হত্যাকাণ্ডে নূর হোসেনসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়। জড়িত আসামিদের সংখ্যা আরও। নজরুল মারা গেলে নূর হোসেন ছাড়া কার কার স্বার্থ হাসিল হয়, সেই বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যার নাম বের হয়ে আসবে তাকেই গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান।

নূর হোসেনের দাপটের উত্স টাকা

সমপ্রতি আড়াই হাজারে আওয়ামী লীগের জনসভায় এমপিকে পর্যন্ত নিরাপত্তার কারণে মঞ্চে উঠতে দেয়নি সিকিউরিটির সদস্যরা। অথচ ট্রাক হেলপার থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া নূর হোসেন অর্থ ব্যয় করে ঐ মঞ্চে উঠে বসেছেন। সন্ত্রাসী, কিলার ও অপরাধ জগতের গডফাদার নূর হোসেনকে প্রশাসন কি করে ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছে। এটা নিয়েও চলছে আলোচনা। এর পেছনেও মোটা অংকের অর্থের লেনদেন হয়েছে। বলা বাহুল্য একটি অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

নারায়ণগঞ্জ প্রশাসন দুই ভাগে বিভক্ত

নারায়ণগঞ্জ প্রশাসন বহু বছর ধরে দুই ভাগে বিভক্ত। বলা হয়ে থাকে, এসব কারণেই নূর হোসেনদের মত টোকাই ও ট্রাক হেলপারদের উত্থান। তারা রাতারাতি আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ডন ও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। প্রশাসন হয়ে পড়ে অসহায়। এখন নারায়ণগঞ্জ প্রশাসনের এই অবস্থা। প্রশাসনের অসহায়ত্বের কারণে থানা পুলিশ ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নূর হোসেনদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ গ্রহণ করে নিয়মিত। সুযোগ করে দেয় অপরাধের সংঘটনের। সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানার ঘুষখোর কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করে গতকাল স্বজনহারা তদন্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন। বর্তমান নজরুলসহ সাত হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ইন্সপেক্টর ছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এক সময়ের এসআই। তিনি নূর হোসেনের সোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এমন অভিযোগ স্বজনদের।

নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, সাত হত্যাকাণ্ডে তদন্ত অগ্রগতি হয়েছে অনেক। গ্রেফতারকৃতরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনে পরিবর্তন করা হবে। ঘুষখোরদের কোন ঠাঁই নেই বলে তিনি জানান।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনায় র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান বলেছেন, 'র্যাবের কেউ জড়িত থাকলে তাকে রক্ষার চেষ্টা করব না, বিভাগীয় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।' তিনি কি এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেন?
1 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১৭
ফজর৩:৫৫
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৩
সূর্যোদয় - ৫:২১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :