The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ০১ জুন ২০১৪, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১, ২ শাবান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের পুনর্গঠন প্রয়োজন: এটর্নি জেনারেল

মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শন

দে ল ও য়া র হা সা ন

উপমহাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। মানিক মিয়া ছিলেন এ দেশের সাংবাদিকতার মহাদিকপাল এবং পূর্ব বাংলার সংবাদপত্র জগতের পুরোহিত মধ্যমণি। এরকম অনেক অভিধায় অভিষিক্ত করা যায় মানিক মিয়াকে। কিন্তু তারপরও তাঁর সকল পরিচয় বোধহয় নিঃশেষ হয়ে যায় না। মানিক মিয়ার চারণভূমির চিহ্নিত উজ্জ্বল ক্ষেত্রটি নিঃসন্দেহে সংবাদপত্র; কিন্তু এটাই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। সম্পাদক হিসেবে সাহসী, সত্ ও নিবেদিত সাংবাদিকতার সকল গুণাবলিই তিনি অর্জন ও ধারণ করেছিলেন। সংবাদপত্রসেবী মানিক মিয়ার মাঝে আমরা আরেকজন মানিক মিয়াকে লক্ষ্য করি, যিনি ছিলেন পরিপূর্ণ রাষ্ট্র-চেতনায় একজন পূর্ণ মাত্রায় রাজনীতিক। এটা কি তাঁর অপ্রধান, না প্রধান চরিত্র, সে বিতর্কে না গিয়েও বলতে পারি—রাজনৈতিক চৈতন্যে দীক্ষিত মানিক মিয়া সংবাদপত্রসেবী মানিক মিয়ার চেয়ে কম উজ্জ্বল নন মোটেই। রাজনৈতিক চেতনা আছে বলেই রাজনীতিক মানিক মিয়াকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তাঁর চিন্তা ও লেখনীর মাঝে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি রূপরেখাও প্রচ্ছন্ন আছে। ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণে মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের স্বরূপ ও তার প্রেক্ষিত-ভূমি এখানে কিছুটা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা যেতে পারে। একথা সত্য যে, মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে রাজনীতিবিদ ছিলেন না। যদিও মানিক মিয়া ছিলেন অনেক রাজনীতিকের গুরু এবং অনেক গুরু রাজনীতিকের উপযুক্ত ভাব-শিষ্য। রাজনৈতিক দর্শনের পুরোমাত্রায় উত্তরাধিকার ও উত্তরণ ঘটলে কোনো ভাবশিষ্যও যে স্ব-সমাজে গুরুর মতো মর্যাদার আসনে আসীন হতে পারেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তার উদাহরণ তো সক্রেটিশ ও প্লেটো। আমাদের নিকট-ইতিহাসে দীক্ষা গুরুর রাজনৈতিক দর্শনকে আত্মস্থ করার গৌরবের অধিকারী হয়েছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। আর সেই রাজনৈতিক গুরু হলেন, গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলে খ্যাত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী', মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর 'আমার মানিক ভাই' ও 'আমাদের মানিক ভাই' শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর দু'টো কালজয়ী লেখা, আবুল মনসুর আহমেদ, আসগর খান, আতাউর রহমান খান প্রমুখদের মূল্যায়নধর্মী লেখায় মানিক মিয়ার রাজনৈতিক মানস ও রাজনৈতিক দর্শনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করতে হলে মানিক মিয়ার ওপর সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবের কথা এবং অপর কতগুলো বিষয় বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। বিষয়গুলো হলো—১. সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক আদর্শের প্রভাব মাত্রা নির্ণয়; ২. মানিক মিয়ার চিন্তা, বোধ ও বিশ্বাসের আনুপূর্বিক অলোচনা; ৩. স্বীকৃত দর্শনের প্রভাব বিশ্লেষণ; এবং ৪. সমকালীন রাজনীতির প্রভাব ইত্যাদি। মানিক মিয়ার রাষ্ট্র চিন্তায় ও রাজনৈতিক দর্শনের রূপ-চিত্রটি নির্মাণে যাঁর অবদান বেশি করে উল্লেখ করা হয়, তিনি হলেন—হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সোহরাওয়ার্দীকে বলা হয় 'গণতন্ত্রের মানসপুত্র'। এ অভিধা লোকধারণায় বিস্তৃতির কারণ বোধহয় এই যে, তাঁর ভিতর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সকল প্রচেষ্টাই সক্রিয় ছিল এবং আজীবন তিনি উদার গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। এ চেতনা থেকেই সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক ধারণায় স্থিতি পেয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য ও অবিচল বিশ্বাস। সোহরাওয়ার্দীর সাথে মানিক মিয়ার পরিচয় ঘটেছিল তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে। কিন্তু এ 'পরিচয়' দিনে দিনে এমন প্রগাঢ় ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে রূপ নিয়েছিল যে, সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক চিন্তার প্রত্যক্ষ ও প্রভাবী প্রতিফলন ঘটেছিল মানিক মিয়ার কর্মজীবনে ও চেতনা-পথের অলিগলিতে। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষিত এবং অক্সফোর্ডে পড়ার সময়ই তিনি পাশ্চাত্যের ব্যক্তি ও নাগরিক স্বাধীনতা চর্চার সাথে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। ইউরোপীয় রেনেসাঁর ফসল তখন শিল্প-সাহিত্য, মানুষের চিন্তা-মননে পরিবর্তনের যে আভাস সূচনা করেছিল, তার প্রভাব সমাজ রাজনীতিতেও পড়ে। রাজনীতিতে এ সময় রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব (Political Sociology) ধারণার উদ্ভব ঘটে এবং রাজনৈতিক সাম্য (Political Liberty) প্রতিষ্ঠার ধারণাটিও সংহতি পেতে শুরু করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মানস সংগঠনে পাশ্চাত্য শিক্ষা, রাজনৈতিক চেতনা প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং পাশ্চাত্য দর্শনের নানা সূত্র থেকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের উর্বর ক্ষেত্রটি প্রয়োজন মতো পরিপুষ্টি লাভ করে। মানিক মিয়া ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একান্ত অনুসারী ও ভাবশিষ্য। যে কারণে সোহরাওয়ার্দীর ধ্যান-ধারণার সঠিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন মানিক মিয়া। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, 'একই নেতার দুই শিষ্য; যেন একই পিতার দুই সন্তান। ... নিজ জীবনের ঝুঁকি এবং অত্যাচার ও নিপীড়নের মারগুলো মাথায় পেতে নিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ত্যাগবতী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিমূর্ত দেশপ্রেমিকতা, স্বদেশিকতা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল।' সোহরাওয়ার্দী ছিলেন আজীবন সংসদীয় গণতন্ত্রে আস্থাশীল। মানিক মিয়ারও আজীবন সাধনা ছিল দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্জন ছিল তাঁর জীবনদর্শন। মানিক মিয়া গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। মানিক মিয়া আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ব্যাপারে উত্সাহী ছিলেন। কোনো জাতির নিজস্ব রাষ্ট্র, সরকার, জীবন-দর্শন, আইনব্যবস্থা ইত্যাদি বেছে নেওয়ার অধিকারে তিনি বিশ্বাস করতেন। এই অধিকার থেকেই 'স্বাধিকার' ধারণাটির জন্ম। গোড়াতে মার্কিন রাজনীতিক উইড্রো উইলসন ছিলেন এ অধিকার মতবাদের প্রবক্তা। পরে আফ্রো-এশিয়ার অনেক মুক্তিকামী দেশ আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিটি উত্থাপন করে। কোথাও আবার এটি স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। পূর্ববাংলায় এ দাবিটি বাঙালির অবিংসাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্তৃক প্রথমে স্বাধিকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আকারেই উত্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। মানিক মিয়ার জীবদ্দশায় স্বাধীনতার দাবিটি সরাসরি সামনে আসেনি, স্বাধিকার ও ৬ দফা ভিত্তিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ছিল পূর্ব বাংলার অন্যতম দাবি। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, অর্থনৈতিক বৈষম্যই মূলত পূর্ববাংলায় স্বাধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল, যা পরে ঘটনা পরম্পরায় ও অনিবার্য বাস্তবতায় স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। মানিক মিয়া তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিমায় পাকিস্তানের দু'অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যটি তুলে ধরতেন অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে। তথ্য ও পরিসংখ্যানও ব্যবহার করতেন তিনি। মানিক মিয়ার ভাষায়, 'ফেডারেল রাজধানীও একই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প সম্প্রসারণ, মূলধন গঠন ইত্যাদি ব্যাপারে পশ্চিমাঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকারী হয়।' তাঁর এ কথাটি মূলত 'Cumulative cause connection' মতবাদকে স্পর্শ করেছে। পুঁজি ও উন্নয়ন প্রচেষ্টা অপেক্ষাকৃত উন্নত অঞ্চলেই মেরুকরণ ঘটিয়েছে। মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মূলকথাই ছিল পাকিস্তানের দু'অংশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। মানিক মিয়ার সাপ্তাহিক ইত্তেফাক সময়কালের 'রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি' দৈনিক ইত্তেফাকের 'মোসাফির' ছদ্মনামের 'রাজনৈতিক মঞ্চ' কিংবা দেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে 'রঙ্গমঞ্চ' শিরোনামে তাঁর কলামগুলো যারা পড়েছেন, তারা জানেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পাশাপাশি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য মানিক মিয়ার প্রয়াস ছিল কত আন্তরিক ও সর্বাত্মক। মানিক মিয়ার রাষ্ট্র চিন্তায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রশ্নে তাঁর অভিমতটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করেছেন। তাঁর মতে, 'রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর হইয়া থাকিলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন হইয়া পড়ে। কেননা, সে অবস্থায় সাহায্যকারী দেশসমূহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চাপ প্রদান করিয়া সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি আভ্যন্তরীণ নীতিও প্রভাবিত করিতে পারে।' মানিক মিয়ার বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত অভিনিবেশ যেমন লক্ষ্য করা যায়, তেমনি ঝানু অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যকেও এখানে হার মানায়। মানিক মিয়ার রাষ্ট্র-চেতনায় স্বীয় দর্শনের স্বরূপ এখানে কিছুটা পরস্ফূিট হয়েছে। মানিক মিয়া যা বলতেন, তা স্পষ্টভাবেই বলতেন। সাহস ও স্পষ্টবাদিতা তাঁর জীবন-দর্শনের উল্লেখযোগ্য দিক। মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের আর একটি উজ্জ্বল দিক হলো Civil Liberties বা নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী। নাগরিক স্বাধীনতা মূলত সংবিধান বলে নিশ্চিত হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রে দীর্ঘকাল সাংবিধানিক শাসনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ফলে এ প্রশ্নটি এসেছে, এবং বারবারই এসেছে। মানিক মিয়ার লেখায় বাক স্বাধীনতা, ভোটদানের অধিকার, সভা-সমিতি ও সমাবেশের স্বাধীনতা ইত্যাদি নাগরিক স্বাধীনতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারেই স্থান পেয়েছে। তাঁর লেখা 'পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর' গ্রন্থে, 'রাজনৈতিক মঞ্চ' কলামে এবং অন্যান্য নিবন্ধ ও অভিভাষণে এর উদাহরণ অনেক। এসব লেখায় একজন সংবাদসেবীর সামাজিক দায়িত্ব পালন করার বিষয়টিই শুধু মুখ্য নয়, তাঁর বিচরণ রাজনৈতিক অঙ্গনে, রাষ্ট্রনেতার ভূমিকায়। মানিক মিয়ার লেখায় 'পাকিস্তান' রাষ্ট্রে পুঁজি বিকাশের অসম ধারাটি ও অর্থনৈতিক শোষণের খুঁটিনাটি যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি তাঁর লেখায় সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশের আধিপত্য, শোষণ ও শাসন করার বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও অনেক। 'পাকিস্তান' রাষ্ট্রে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে, তার জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসত পূর্ব পকিস্তান থেকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রথম সারিতে এবং আমলাতন্ত্রে ও সেনাবাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের আধিপত্য ও প্রভাব ছিল বেশি। এ বিষয়টিকে মানিক মিয়া তাঁর লেখায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি পাকিস্তানের একটি বিশেষ কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর আধিপত্যের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন বিভিন্ন লেখায়। তাঁর ভাষায়, 'ক্ষুদ্র একটি কায়েমী স্বার্থ চক্র দেশের শাসনব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই আধিপত্য বিস্তার করিয়া বসিয়া আছেন।... পাকিস্তান ভৌগোলিক দিক দিয়ে একটি বিচিত্র দেশই নয়, পূর্ব পাকিস্তান জনসংখ্যার দিক দিয়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলও বটে। কোনো দেশের এক অঞ্চল অন্য কোনো অঞ্চলের উপর প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করিলে বা এই উদ্দেশ্যে চাতুর্যের আশ্রয় গ্রহণ করিলে সেই দেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকারাচ্ছন্ন।' মানিক মিয়ার রাজনৈতিক চিন্তার এ বিষয়টিকে কেবলমাত্র একজন সাংবাদিকের কিংবা সম্পাদকের কলমবাজি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এ 'ভূয়োদর্শন' একজন রাজনীতিকের ভূয়োদর্শন। এখানে যে মানস-চৈতন্যের ছাপ পরিলক্ষিত হয়, তা মূলত রাজনৈতিক চেতনারই নামান্তর। আগেই বলেছি, প্রচলিত অর্থে রাজনীতিক তিনি ছিলেন না। কিন্তু প্রবাহমান রাজনৈতিক ধারা থেকে তিনি বিচ্যুত হতে পারেননি। অত্যন্ত সচেতনভাবেই তিনি সাংবাদিকতাকে একটি 'মিশন' হিসেবে নিয়েছিলেন। সে দিক থেকে তিনি ছিলেন এ দেশের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার একটি নতুন ধারার প্রবর্তক। যদিও পরাধীন ভারতবর্ষে এ ধারাটি আগেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল এবং তখন প্রায় সকল নেতৃস্থানীয় রাজনীতিক ছিলেন কোনো না কোনো পত্রিকা কিংবা রাজনৈতিক সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত। এভাবে মহাত্মা গান্ধী 'নিউ ইন্ডিয়া', মতিলাল নেহেরু 'ইন্ডিপেনডেন্ট', মওলানা মহম্মদ আলী 'কমরেড', সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জি 'বেঙ্গলি', জওহর লাল নেহেরু 'ন্যাশনাল হেরাল্ড', অরবিন্দ ঘোষ 'বন্দেমাতরম', সুভাষ চন্দ্র 'ফরওয়ার্ড', বিপিন চন্দ্র পাল 'ইয়ং ইন্ডিয়া', দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ 'নারায়ণ' এবং ফজলুল হক 'কৃষক' ও 'নবশক্তি' পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। জিন্নাহ একটি ইংরেজি দৈনিক প্রকাশ করার চেষ্টা করেছিলেন, ইস্পাহানিদের সহযোগিতায়। অবশেষে প্রথমে সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক 'ডন' নামে সেটিও আত্মপ্রকাশ করেছিল। উপর্যুক্ত পত্রিকাগুলো নিছক সাংবাদিকতার লক্ষ্যেই প্রকাশিত হয়নি। রাজনৈতিক অভীষ্টও ছিল। এমনকি, মানিক মিয়ার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি কলকাতার 'ইত্তেহাদ' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। সে পত্রিকারও একটি রাজনৈতিক 'মিশন' ছিল। মানিক মিয়া ছিলেন দৈনিক 'ইত্তেফাক' পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তারও পত্রিকা প্রকাশের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। তাঁর লেখায় তিনি তা উল্লেখও করেছেন অনেক। সেদিক থেকে মানিক মিয়া সম্পাদিত 'ইত্তেফাক' ছিল উপযুক্ত পত্রিকাগুলোর সমগোত্রীয় এবং সম্পাদকের মেজাজ ও মননে রাজনৈতিক ধারার সকল চেতনাকেই ধারণ করেছিল। ব্রিটিশ ভারতের জাতীয়তাবাদী পত্রিকাগুলো যেমন মুক্তি অনুসন্ধানী ছিল এবং ইঙ্গ-ভারতীয় অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টিকে 'ইস্যু' হিসেবে উপজীব্য করেছিল, 'ইত্তেফাক' পত্রিকা ও তাঁর সম্পাদক গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে সে ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, একটি গণতান্ত্রিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। তিনি এ লক্ষ্যে শাসনতন্ত্রের সংশোধন দাবি করেছেন। আইন, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণ তাঁর কাম্য ছিল। এক্ষেত্রে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাটি ব্রিটিশ দার্শনিক বেন্থামের 'উপযোগবাদ' দ্বারা সমর্থিত বলেই মনে হয়। এ মতবাদে দেশের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে সংগঠন করার কথা বলা হয়েছে, যাতে সমাজের সর্বাধিক সংখ্যক ব্যক্তির জন্য সম্ভবপর সর্বাধিক পরিমাণ উপযোগ সৃষ্টি করা যায়। ক্ষমতা পৃথকীকরণের ব্যাপারে প্রথম মত পোষণ করেছিলেন ফরাসি চিন্তাবিদ মতেঁসকিআ। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে এ নীতির সর্বাধিক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ। তিনি যা বলতেন, সেখানে যুক্তি ও বিষয়ের কার্যকারণ তুলে ধরতেন। এক্ষেত্রে মানিক মিয়ার চিন্তার সাথে দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ডেভিড হিউম এবং ইংরেজ ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবনের সাথে অসম্ভব মিল লক্ষ্য করা যায়। গিবনের মতো মানিক মিয়ার মাঝেও ইতিহাসবোধ, দর্শন ও প্রকাশের সাবলীলতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে বলা যায় নিঃসন্দেহে। মানিক মিয়া লিখিত 'পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর' গ্রন্থটি তাঁর স্বচ্ছ ইতিহাসবোধের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

মানিক মিয়া ছিলেন বিশ শতকের স্বর্ণযুগের উজ্জ্বল পুরুষ। তাঁর শৈশবে ছিল বঙ্গভঙ্গের জের, অসহযোগ-খেলাফত আন্দোলন। ত্রিশ-চল্লিশের সব ক'টি রাজনৈতিক ঘটনাক্রম এবং ভাষা আন্দোলন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। সাতচল্লিশের দেশ বিভাগকালে যে স্বপ্ন ছিল, তার সফল বাস্তবায়ন হয়নি বলে তাঁর দুঃখ কম ছিল না। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি বলে রাজনীতির বাঁক পরিবর্তিত হয়েছে। জাতির স্বপ্ন কী ছিল, বঙ্গবন্ধুর মতো তা তিনি বুঝতেন। এ সময়কালের সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির প্রতি তাঁর তীক্ষ দৃষ্টি ছিল। তাঁর রচনায় এর ছাপ স্পষ্ট। তিনি চিন্তা-চেতনায় যে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ধারণা পোষণ করতেন, তা আয়ত্ত করেছিলেন গভীর জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে। তাঁর গণতান্ত্রিক চেতনার উত্স ছিল পাশ্চাত্যের উদার মানবতাবাদ। ১৯৬৩ সালের একটি ছাত্র সম্মেলনে, 'সর্ব মানবের সার্বভৌমত্ব' নামক একটি বক্তৃতা প্রমাণ করে যে, ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রুশ বিপ্লবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন ও মতবাদের সাথে তাঁর পরিচয় কত গভীর। তিনি সরাসরি রাজনীতি করেননি। তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তি সংগ্রামের ক্ষেত্রে কলম হাতে তিনি ছিলেন একজন অগ্রসৈনিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একটি লেখায় তার এ সংগ্রামের বিষয়টি আরও স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছেন, 'গণতন্ত্রের উপর ছিল তার প্রগাঢ় আস্থা। নিয়মতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থানকে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পক্ষপাতি ছিলেন।' তিনি ছিলেন রুশোর প্রকৃতি ও মানব স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্রের জাগ্রত চিন্তাবাহী, লিংকনের Government of the people, by the people, and for the people-এর পূজারি, প্রকৃতির প্রদত্ত বৈচিত্র্য মেনে নিয়ে 'সব মানুষ সমান' এই তত্ত্ববাদে বিশ্বাসী। নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। মানিক মিয়ার লেখনীর সার্বিক বিষয়বস্তুকে বিশ্লেষণ করে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের রূপরেখা তুলে ধরা মূলত একটি দুরূহ কাজ। কোনো গবেষক এ ব্যাপারে এগিয়ে এলে তাঁর রাষ্ট্রচেতনা ও রাজনৈতিক দর্শনের অনেক কিছুই জানা যাবে।

লেখক :পরিচালক, মানিক মিয়া রিসার্চ একাডেমি, ঢাকা।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা স্বীকার করে এর দায়-দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আপনি কি তার দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন?
3 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৭
ফজর৫:১৩
যোহর১১:৫৫
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৮
এশা৬:৩৬
সূর্যোদয় - ৬:৩৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :