The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ০১ জুন ২০১৪, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১, ২ শাবান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের পুনর্গঠন প্রয়োজন: এটর্নি জেনারেল

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রশ্নে একজন 'তাইরেসিয়াস'

রা জী ব ন ন্দী

'তাইরেসিয়াস' নামের এক বুড়োকে চিনি। যিনি গ্রিক নাট্যকার সফোক্লেসের বিখ্যাত ট্র্যাজেডি 'রাজা ইদিপাস' নাটকের চরিত্র। এই বুড়ো ত্রিকালদর্শী আর সর্বজ্ঞ। গ্রিসবাসীর পাপ-পুণ্যের হিসাবরক্ষক তিনি। অন্ধ, তবুও কিছুই তাঁর চোখ এড়ায় না। রাজ্যের ঘোর অমানিশায় তাইরেসিয়াসের কিছু নির্ভীক সাহসী উচ্চারণ নাটকের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দ্বিধাহীন চিত্তে, বলিষ্ট কণ্ঠে রাজা ইদিপাসের পাপের কথা বলে দেয়। রাজার ভয়কে উপেক্ষা করে তাইরেসিয়াসের সত্য উচ্চারণের কারণে এই গ্রিকপুরাণ অনন্য, তাইরেসিয়াসের ভূমিকা প্রশংসনীয়। তাইরেসিয়াসের মতো সাহসী-ত্রিকালদর্শী-সর্বজ্ঞ কিছু মানুষ ইতিহাসে ফিরে ফিরে আসে। সত্য উচ্চারণে তাইরেসিয়াস যেমন নির্ভীক, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পেয়েছিলেন তেমনিই একজনকে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নে নির্ভীক তাইরেসিয়াসের নাম-তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার-ষড়যন্ত্র-অবদমনের মুখেও নতি স্বীকার না করে উচ্চারণ করে গিয়েছেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জয়গান। কঠিন বাস্তবতায় কঠোর কিছু কথা তীক্ষ তীরের মতো ছুড়েছেন সমাজের প্রতি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রশ্নে মানিক মিয়ার সেইসব সাহসী ভাষণ-বক্তব্য-বিবৃতি এবং ক্ষুরধার লেখনী আজো স্মরণীয়। মানিক মিয়ার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের এই লেখাটিতে ব্যবহূত বেশিরভাগ উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে 'সংবাদপত্রের স্বাধীনতা; নির্বাচিত ভাষণ ও প্রবন্ধ :তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া)' বই থেকে। বাংলাদেশ বুকস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের সম্পাদক জনাব আবদুল হাফিজ। কেমন সাংবাদিক ছিলেন মানিক মিয়া? 'মধ্যরাতের অশ্বারোহী' বইয়ে ফয়েজ আহমেদ লিখেছেন, 'রিপোর্টিং করতে গিয়ে অনেক ঝামেলা। কিন্তু এতে আনন্দ অনেক, সৃষ্টিসুখের উল্লাস অনেক, সংগৃহীত খবর আগ্রহী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গৌরব অনেক। সম্পাদক যদি সংবাদের সমঝদার হন এবং যদি তাঁর রসজ্ঞান শালীনতামণ্ডিত হয়, তবে রিপোর্টিংয়ের দুযোর্গপূর্ণ পরিবেশও সংবাদকর্মীর মধ্যে উত্সাহ বৃদ্ধি করতে পারে (ব্যতিক্রম আছে)। চুয়ান্ন সালের রাজনীতির চড়াই-উতরাই ও বিশ্বাসঘাতকতার আবর্তে সর্বদা উত্কণ্ঠিত ও ক্ষুব্ধ ইত্তেফাক-সম্পাদক জনাব তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) অনেকটা এমনি একজন রসজ্ঞানসম্পন্ন সমঝদার সাংবাদিক ছিলেন। আমরা তাঁকে মানিক ভাই বলে সম্বোধন করতাম।' এই যে ফয়েজ আহমেদের কলমে 'ভাই' বর্ণিত লোকটি একজন সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার যাই বলি না কেন; মানিক মিয়ার পরিচয় তিনি বাঙালির স্বাধীনতাযুগের বলিষ্ট কণ্ঠস্বর। সাংবাদিকতাকে তিনি কেবলই তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে হাতিয়ার করেছেন। পাকিস্তানি শাসকের শোষণ ও সেই প্রায়-উপনিবেশিক সমাজকাঠামো বদলাতে তার সাংবাদিকতা পেশা বেছে নেওয়ার চেষ্টাকে দেখতে হয় সুদূরপ্রসারী চিন্তা হিসেবে। কারণ, তিনি তার মত ও পথের দিকে ধীরে ধীরে স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে তার দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকের মাধ্যমে দিয়ে দিয়েছেন স্বাধীনতার বীজমন্ত্র, এক বিশাল পাঠকগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করার জাদুমন্ত্র ছাড়া কে পারে এমন কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে? ১৯৬৬ সালের ৮ মে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে বলছেন, 'দেশের এমন এক ক্রান্তিলগ্নে আপনারা আমাকে আহ্বান জানিয়েছেন দু'কথা বলার জন্য, যে ক্রান্তিলগ্নে পৌঁছে দিগ্বলয়ে তিমিরাবসানের প্রতীক্ষায় আমরা সকলেই অধীর এবং উদ্বিগ্ন। জানি না, তিমির-বিদার ঊষার অভ্যুদয় আমরা দেখে যেতে পারব কি না। কিন্তু আমি নিজে সূর্য-সম্ভাবনায় বিশ্বাসী। আপনাদেরও এই বিশ্বাসে বলীয়ান হয়েই সাংবাদিকতার মহান ব্রতে অটল থাকার জন্য অনুরোধ জানাই।' পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির সামনে শব্দ ও বাক্যের এমন অপার সমন্বয়ের মালা গেঁথে মানিক মিয়া সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন সবাই তিমির-বিদারী ঊষার অভ্যুদয় দেখার স্বপ্ন দেখে যান। স্বাধীনতার জন্মবেদনায় ছটফট করা একটি জাতির প্রসব বেদনা বুঝেছিলেন বলেই তিনি এমন কথামালা সাজাতে পেরেছিলেন।

পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকরা লড়েছিলেন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্যও। আজ সেই স্বাধীন দেশে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য লড়তে হচ্ছে সাংবাদিকদের। পাকিস্তান আমলের শেষভাগ ১৯৬৬ সাল এবং স্বাধীনতার স্বপ্নস্বাদ আস্বাদনের স্বর্ণকাল ২০১৪-এর মাঝামাঝি যদি ১৯৮৪ সালে ধরি, তবে একটি উদ্ধৃতি আমাদের মধ্যভাগের বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে বুঝতে সাহায্য করবে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ নিপতিত ছিল সামরিক শাসনের যাঁতাকলে। দেশ স্বাধীন কিন্তু অগণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা। সেই সময়ে সাংবাদিকতার হালচাল কেমন ছিল? 'গণবিচ্ছিন্ন গণমাধ্যম' বইয়ের গণবিচ্ছিন্ন গণমাধ্যম অধ্যায়ে লেখক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, 'আমাদের গণমাধ্যমগুলো, অর্থাত্ সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে একটি ধারণা প্রায় ধ্রুব সত্যে পরিণত হতে চলেছে যে, ওগুলোর সাথে জনগণের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। এই মাধ্যমগুলোকে আমরা যতই 'গণমাধ্যম' বলে চেঁচাই না কেন বাস্তব অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ওগুলো আর 'গণমাধ্যম' নেই, হয়ে উঠেছে 'গণ-বিচ্ছিন্ন মাধ্যম'। আমাদের ম্যাস মিডিয়া বা গণমাধ্যমগুলোর গণবিচ্ছিন্নতা আজ, কাল বা পরশু'র ব্যাপার নয়। বরং একটি দীর্ঘ সময়ের নীরব অবহেলারি পরিণতি।' সত্যিই তো, গণমাধ্যমকে 'গণ' বলে যতই চেঁচাই না কেন বাস্তব অবস্থাদৃষ্টে পাকিস্তান আমলেও 'গণমাধ্যম' 'গণ' ছিল না। ১৯৬৬ সালের সিরাজগঞ্জের সেই বার্ষিক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে নইলে মানিক মিয়া কেন বলবেন, 'সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সঙ্গে যদি জনজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা এবং শুভাশুভের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকত, তা'হলে বিষয়টিকে শুধু সংবাদপত্রের কল্যাণের গণ্ডিতে আবদ্ধ রেখে এতটা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন আদৌ থাকত না। কিন্তু স্বাধীন সংবাদপত্র বলতেই আমরা বুঝি স্বাধীন জনমত, তাই জনমতের কণ্ঠরোধের অর্থই হলো গোটা সামাজিক স্বাধীনতার তাত্পর্যকে আমাদের কাছে মূল্যহীন করে তোলা।' সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সাথে স্বাধীন জনমতের এমন গভীর মিল তিনি ধরতে পেরেছিলেন, অন্তর দিয়ে ধারণও করেছিলেন। একই সমাবেশে তিনি 'সংবাদপত্র' এবং 'স্বাধীনতা' এই দু'টি শব্দের গভীর অর্থ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, 'সংবাদপত্র এবং স্বাধীনতা এই কথা দু'টোর ভিতর একটা দ্যোতনা রয়েছে। সংবাদপত্র আসলেই যখন জনসাধারণের খবরাখবর, সুখ-দুঃখ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কাহিনী প্রকাশের মাধ্যম, তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাখ্যা দাঁড়ায়, জনসাধারণকেই নিয়ন্ত্রণ করা। মধ্যযুগে সংবাদপত্র ছিল না। সংবাদপত্র গণতান্ত্রিক যুগের ফসল। গণতন্ত্রে একটা বড় অবলম্বন এই সংবাদপত্র। তাও কোনো দেশের সরকার যখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন, তখন প্রকৃত অর্থে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা চালান।' ১৯৬৩ সালের ১৯ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রাদেশিক সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেন, 'সালতামামীর হিসেবে প্রবীণতার দাবী নিয়ে আপনাদের আমি উপদেশ দিতে আসিনি। আমি এসেছি তরুণ প্রাণের সঞ্জীবনী স্পর্শে আমার আপন সত্তার বিগত তিথিকে স্মরণ করতে। দুনিয়াব্যাপী আজকের এই বিচিত্র আলোড়নের দিনে তরুণেরাই দেশে দেশে যুগান্তরের বার্তা বয়ে আনছেন; দেশ, জাতি ও জনতাকে দিচ্ছেন নব সম্ভাবনার পথনির্দেশ।' মানিক মিয়া স্পষ্টভাষায় সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের চেষ্টারত পাক-সরকারের প্রতি বলছেন, 'জনজীবনের সমস্যা সংবাপত্রের দ্বারা প্রতিফলিত হয়। এখানেই বিরোধীদলের ভূমিকার সঙ্গে জনজীবনের যোগাযোগ ঘটে সংবাদপত্রের ভূমিকার। জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের কথা সর্ব সমক্ষে তুলে ধরাই যেহেতু সংবাদপত্রের মুখ্য ও প্রধানতম দায়িত্ব, সে কারণে বিরোধীদলের বক্তব্য সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় ফলাও করে প্রচারিত হয়। কে বলেছেন এবং তিনি কোন দলভুক্ত সেটা নয়, বরং কী বলা হচ্ছে এবং সেই বলায় জনজীবনের সমস্যার উপর আলোকপাত হচ্ছে কি-না, সেটাই সংবাদপত্রের বিবেচ্য।' এইভাবে লেখা এবং বলার মাধ্যমে পাক-শাসকগোষ্ঠীর সকল শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার দৈনিক ইত্তেফাকের 'রাজনৈতিক হালচাল' ও 'মঞ্চে নেপথ্যে' কলামের মাধ্যমে মানিক মিয়া সাহসী ভূমিকা নেন। 'মোসাফির' ছদ্মনামে ক্ষুরধার উপ-সম্পাদকীয় লিখে তিনি নিজের অবস্থান শতকরা একশ ভাগ প্রকাশ করেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের প্রতি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রাদেশিক সম্মেলনের বক্তব্যে তিনি আরও বলেছেন সংবাদপত্রের আত্মসংযম থাকতে হবে স্বতঃপ্রবৃত্ততার উপর। তিনি মনে করতেন, 'আমরা সচেতন যে, সমাজের অন্যান্য অংশের ন্যায় সংবাদপত্রও নির্দোষ কিংবা ত্রুটিমুক্ত নয়। ত্রুটি একেবারেই থাকবে না, এটা কোন কালেই সম্ভব হতে পারে না। একথা অবশ্যই স্বীকার্য যে, সংবাদপত্রের মহান ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদপত্রের পক্ষে আত্মসংযম থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই আত্মসংযম থাকতে হবে স্বতঃপ্রবৃত্ততার উপর। সংবাদপত্রসেবীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা সংবাদপত্রের নিয়মানুবর্তিতা ও সংযত আচরণের বিধি-ব্যবস্থা নিজেরাই তৈরি করতে সক্ষম।'

'স্বাধীন সংবাদপত্র ও গণতান্ত্রিক সমাজ' শীর্ষক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ১২ নভেম্বর, ১৯৬২ তারিখে মানিক মিয়ার এক নিবন্ধ থেকে দেখা যায়, 'আপনাদের এই মহতী সমাবেশে শামিল হইবার সুযোগ লাভ করিয়া আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই সম্মেলনে আমাকে সভাপতিত্ব করার সুযোগ প্রদানের জন্য সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের প্রতি আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তবে আমার মনে হয়, আমাকে এই মহতী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার গুরু দায়িত্ব না দিয়া সম্মেলন কক্ষের এক কোণে বসিয়া যদি আপনাদের জ্ঞানগর্ভ আলাপ-আলোচনা শ্রবণের সুযোগ দেওয়া হইত, তাহা হইলে বরং ভালো হইত।' এই যে বিনয় এবং সভাপতির চাইতেও কক্ষের কোণে বসে শুধু শ্রোতা হওয়ার বাসনা, এটা কতজনের হতে পারে? রাজনীতি এবং সাংবাদিকতা যারা একইসাথে করেন, সেইসব পেশার মানুষের পক্ষে নীরব থাকা অবশ্য বিশেষভাবে অসম্ভব। তাঁদের মুখের সামনে মাইক্রোফোন, নাকের ডগায় কামানের মতো তাক করে থাকা ক্যামেরা। ওরা সরবগোষ্ঠী। তাই নীরব থাকার উপায় নেই, কথা বলতেই হবে। কিন্তু নীরবতার ভাষায় বিনয়ের সাথেই কথা বলেন মানিক মিয়া। এই যে এতবড় বিনয় তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় পেশাগত দায়িত্বের কথাও। একই লেখায় তিনি বলছেন, 'শতাধিক বছর আগে সংবাদপত্রকে 'চতুর্থ এস্টেট' হিসাবে উল্লেখ করা একটা রেওয়াজে পরিণত হইয়াছিল। পূর্বে বৃটিশ পার্লামেন্ট অনুরূপ তিনটি 'এস্টেট' সমবায়ে গঠিত ছিল বলিয়া বলা হইত—'লর্ডস স্পিরিচুয়েল', 'লর্ডস টেম্প্রোরাল' এবং 'কমন্স'। কিন্তু ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ম্যাকলে পার্লামেন্টের গ্যালারিতে উপবিষ্ট সংবাদপত্র প্রতিনিধিদের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিয়াছিলেন যে, তাঁহারা এই রাষ্ট্রের 'চতুর্থ এস্টেট'।' চতুর্থ এস্টেটের ধারণায় তিনি সংবাদপত্রের একটি দামি উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন, 'সংবাদপত্র যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তাহা টমাস জেফারসনের একটি উক্তি এখানে উদ্ধৃত করিলে বুঝিতে পারা যাইবে। একবার তিনি জনৈক সাংবাদিককে লেখেন যে, তাঁহাকে যদি সংবাদপত্রহীন সরকার এবং সরকারহীন সংবাদপত্র জগতের মধ্যে কোনো একটিকে বাছিয়া লইতে বলা হয়, তবে তিনি কোনো দ্বিধা না করিয়া শেষোক্তটির পক্ষেই মত প্রকাশ করিবেন। গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে জেফারসনের ছিল এই ধারণা। পরে তিনি দুইবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন এবং সংবাদপত্র মহলের কঠোর সমালোচনা সহ্য করেন।' মানিক মিয়া শাসকের মুখের উপর, তাপ ও চাপকে অস্বীকার করে নির্ভয়ে উচারণ করেছেন সত্যবাণী। তিনি যেন একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতার প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে যাওয়া এক মহাকাব্যিক চরিত্র। যেমনটি গ্রিক পুরাণের তাইরেসিয়াস, যিনি ছিলেন ত্রিকালদর্শী-সর্বজ্ঞ! তাইরেসিয়াসের মতোই শাসকের মুখের উপর আসল কথাটি বলার হিম্মত ছিল মানিক মিয়ার। মানিক মিয়া সমাজে বিদ্যমান শোষণমূলক অবস্থাকে জারি রাখতে চাননি। তিনি গণমাধ্যমকে সত্যিকারের মুক্তিকামী গণমানুষের করে গড়ে তুলেছিলেন। পাকিস্তানি আধিপত্যশীল শ্রেণীর স্বার্থ পাহারা তার কাজ ছিল না। আজকে সংবাদক্ষেত্রে মানিক মিয়ার মতো দেশপ্রেমিক, স্পষ্টবাদী সাংবাদিকের বড়ই আকাল। গণমাধ্যম গণমানুষের হবে কি না সেটা নির্ভর করে যদি সেই গণমাধ্যমে গ্রিক পৌরাণিক চরিত্র তাইরেসিয়াসের মতো সাহসী কিছু মানুষ থাকেন। যদি সত্য কথা চরম প্রতিকূল সময়ে মুখের ওপর বলা যেতে পারে, তবেই জাতির ট্র্যাজিক মুহূর্তে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবে গণমাধ্যম। তাইরেসিয়াসের ভয়হীন হূদয় আর প্রজ্ঞাবান চরিত্র যেমন ইদিপাসের পাপের কথা উচ্চারণ করায়, তেমনি আমাদের স্বাধীনতাযুগের গণমাধ্যম নায়ক হিসেবে আমরা পাই একটি নাম—মানিক মিয়া!

লেখক :শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা স্বীকার করে এর দায়-দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আপনি কি তার দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন?
8 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৪
ফজর৪:৪৩
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :