The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ০১ জুন ২০১৪, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১, ২ শাবান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের পুনর্গঠন প্রয়োজন: এটর্নি জেনারেল

বাংলার মানিক

তাঁর জীবনাদর্শ ও আমাদের সংবাদমাধ্যম

আ.ন.ম. ওয়াহিদুজ্জামান

'মানুষ মরণশীল কিন্তু জাতি অমর। নেতার আসনে যাঁরা সমাসীন, দেশ শাসনের দায়িত্বভার যাঁরা গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁদের নীতি ও কার্যকলাপ ইতিহাসে স্থান লাভ করিবে। বহু দেশ-নায়ক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নিজেদের খেয়াল-খুশিতে দেশ শাসন করিতে চাহিয়াছেন। কিন্তু জাতির ইতিহাসের গতি তাঁরা পরিবর্তন করিতে পারেন নাই। ইতিহাসের ধারা নির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত হয়। ইতিহাস তার গতিপথে কোনো স্বেচ্ছাচার সহ্য করে না, কোনো অন্যায় ও অপরাধ ক্ষমা করে না।'—লেখাগুলো সংবাদপত্র জগতের প্রবাদ পুরুষ মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার 'পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর' গ্রন্থের সর্বশেষ অংশ থেকে নেওয়া। এদেশের মিডিয়াতে যারা কাজ করেন তাদের কমবেশি সবাই দিনটিতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে এই প্রথিতযশা সাংবাদিকের কথা স্মরণ করেন। সচেতন নাগরিকরা স্মরণ করেন তার ক্ষুরধার লেখনীর। তার লেখাগুলো এখনও পড়লে মনে হয় যেন আমাদের বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তরতাজা লেখা। লেখাগুলো যেন তিনি এই সময়ের জন্য লিখেছেন। মানিক মিয়া যথার্থই বলে গেছেন। ইতিহাসের ধারা নির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত হয়। সত্যিকার অর্থে তাই ঘটে চলেছে। আজ আমরা যারা স্বাধীন দেশের মধ্যবয়সী নাগরিক তারা মানিক মিয়ার জীবনাবসানের পর জন্মগ্রহণ করেছি। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মানিক মিয়া তাঁর লেখনীতে যে সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও আমাদের ভাবতে অবাক লাগে। তিনি কী করে এত সত্ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তা অনুমান করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দক্ষিণ বাংলার মানুষ সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হূদয়ে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার যে সহজাত মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে তা আমাদের জন্য শুধু উদাহরণ নয়, শিক্ষণীয়ও বটে। আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে লিখেছেন, 'তথাকথিত জাতি গঠনকারীরা প্রকাশ্যে কোটি কোটি টাকার আয়কর ফাঁকি দিতেছে। তারা বৈদেশিক আমদানি-রফতানি ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন করিয়া বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় করিতেছে। অথচ এসব তথ্য জানিয়াও নীরব নিষ্ক্রিয় পুঁজিপতি শিল্পপতিদের দেশপ্রেমের প্রতি কটাক্ষ করিবার অভিপ্রায় আমাদের নাই। কিন্তু দেশের শিল্প-বাণিজ্য কোনোদিন গণমুখী করা হইলে, তাদের অনেকেই যে স্বদেশ ত্যাগ করিয়া বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ফাঁদিয়া বসিবে তাতেও কোনো সন্দেহ নাই। আর আমরা যাহাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি, সেই কৃষক সমাজ সম্পদশালী হইলে সে-সম্পদ দেশের শ্রীবৃদ্ধি করিবে। তারা দেশ ছাড়িয়া কখনও বিদেশে পাড়ি জমাইবে না।' একজন সাংবাদিক কতটা দেশপ্রেমিক হলে এ ধরনের যুক্তি দিয়ে তখনকার সময়ে এমন লেখা লিখতে পারেন তা সহজেই অনুমেয়।

মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার লেখা যে আজও জীবন্ত তা সহজেই প্রমাণ পাওয়া যায় 'মোসাফির' ছদ্মনামে তাঁর লেখা রাজনৈতিক মঞ্চের নিবন্ধগুলোতে। ষাটের দশকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি যেসব রাজনৈতিক কলাম দৈনিক ইত্তেফাকে লিখে গেছেন তা পড়লে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কত তীক্ষ মেধা, সত্-সাহস আর দূরদর্শিতা থাকলে একজন কলমযোদ্ধা তত্কালীন সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান তথা আমাদের নিরীহ মানুষের পক্ষে অভাবনীয় ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মানিক মিয়ার স্বপ্নের বাস্তবায়ন আমরা এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে দেখতে পাচ্ছি না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে দেশের সম্পদ লুটপাট করে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করার একশ্রেণীর মানুষের অভাব নেই। আর সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির অন্ত নেই। যে সব কথা মানিক মিয়া বহু পূর্বেই তার লেখনীতে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। একজন মিডিয়া কর্মী হিসেবে আমাদের দেশের সংবাদপত্র/টিভি চ্যানেল/ম্যাগাজিন ইত্যাদির বর্তমান হালচাল নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে পছন্দ করি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মানিক মিয়া তাঁর মোসাফির কলামে ১৯৬৬ সালের জুন মাসে একটি লেখার শুরুতে যে কয়টি লাইন লিখেছিলেন তার উদ্ধৃতি আমি এখানে উল্লেখ করে তারপর আমি আমার স্বাধীন দেশের সংবাদপত্রের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে কয়েকটি কথা লিখেই সমাপ্তি টানবো। মানিক মিয়া তার কলামে লেখেন, 'মানুষের হাত-পা ভাঙ্গা অবস্থায় জীবন-ধারণ যেমনি যন্ত্রণাদায়ক, তেমনি বাক-স্বাধীনতা, সাধারণ নিরাপত্তা এবং সংবাদপত্রের অধিকার খর্বিত হইলে উহা মানুষের মনকে পীড়িত এবং সংবাদপত্র পরিচালনা বিড়ম্বনাস্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়। সংবাদপত্র যদি জনগণের সমস্যা, গণমনের জিজ্ঞাসা এবং দেশের চলতি ঘটনাপ্রবাহের উপর স্বাধীনভাবে খবরাদি পরিবেশন করিতে না পারে, সংবাদপত্রকে যদি বিধি-নিষেধ ও কড়া আইনের অনুশাসনের মধ্যে কাজ করিতে হয় তাহা হইলে সংবাদপত্র পরিচালনার কোনো সার্থকতা থাকে না। বিশ্বসুন্দরী কিংবা অর্ধ উলঙ্গ ছবি ছাপিয়া অথবা পাতায় পাতায় গুরুত্বহীন সংবাদের উপর বড় বড় টাইপের ব্যানার হেডলাইন আঁটিয়া কিংবা দেশীয় সমস্যা ছাড়িয়া বিদেশি সমস্যা নিয়া ঝুলাঝুলি করিয়া সংবাদপত্র জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে পরিচালিত করিবার নিষ্ফল চেষ্টা চালাইতে পারে। কিন্তু এই ধরনের সাংবাদিকতা করিয়া সংবাদপত্র দেশবাসীর আস্থা অর্জন এবং জনমতকে সুপথে পরিচালিত করিতে পারে না। সংবাদপত্রের উপর হামলা করা কিংবা সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করা ক্ষমতাসীন মহলের দুর্বলতারই প্রমাণ। কিন্তু ইহা জানিয়া-শুনিয়াও দুর্বল ক্ষমতাসীন দল অতীতেও এদেশের সংবাদপত্রের উপর হামলা চালাইয়াছে, আজিকার শাসকরাও সেই পথ অনুসরণ করিয়াছেন; বরং বর্তমান শাসককুলের থাবা আরও বড়।' মানিক মিয়ার উপর্যুক্ত কথাগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক। আমরা মাঝেমধ্যেই দেখি সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন, জেল-জুলুম কিংবা সরকারি আদেশে বিভিন্ন মিডিয়ার প্রচারণা বা প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে প্রতিকূল অবস্থায় মানিক মিয়া ১৯৬৬ সালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে লিখেছিলেন তার কোনো পরিবর্তন আমরা আমাদের স্বাধীন দেশেও দেখছি না। মানিক মিয়া এখন বেঁচে থাকলে কী ভাষায় আমাদের মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতেন তা আমরা অনুভব করতে পারি।

মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর জীবনাদর্শ ও তাঁর স্বপ্নকে লালন করার মধ্যে দিয়ে আমাদের স্বাধীন দেশের মিডিয়ায় যারা কর্মরত তাদের ভূমিকা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হোক এটাই কামনা করি। তবেই সত্যিকার অর্থে মানিক মিয়ার আত্মা শান্তি পাবে।

লেখক :মিডিয়া কর্মী

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা স্বীকার করে এর দায়-দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আপনি কি তার দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন?
6 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২৭
ফজর৪:০২
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৭
এশা৮:০৮
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :