The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ০১ জুন ২০১৪, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১, ২ শাবান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের পুনর্গঠন প্রয়োজন: এটর্নি জেনারেল

মো সা ফি রে র নি ব ন্ধ থে কে

মোসাফিরের কলাম, ভাষণ ও নিবন্ধ থেকে নির্বাচিত অংশ

[তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন প্রতিথযশা সাংবাদিক। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে তার দায়বদ্ধতা ছিল সমাজ, রাজনীতি ও দেশের প্রতি। এ সব ক্ষেত্রে তাঁর সুদৃঢ় উপলব্ধি ও সুগভীর চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর 'রাজনৈতিক মঞ্চ' নামের জনপ্রিয় কলাম, ভাষণ ও নিবন্ধে। সেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আদর্শপরায়ণতা এবং ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সমাজ মানুষের যাপিত জীবন ছিল তাঁর লেখার অন্যতম উপজীব্য। নিম্নে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কলাম ও অভিভাষণের অংশবিশেষ বর্তমান পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।]

১. আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় উদ্বোধনী ভাষণ

ইংরেজীতে একটা কথা আছে, A gentleman is what his tailor makes of him, দর্জি যদি একজন ভদ্রলোক তৈরী করতে পারে তাহলে একটি দেশও যথার্থ অর্থে তৈরী হয় সাধারণ মানুষের হাতে, অতি মানবের হাতে নয়। ইতিহাসের নিয়ন্তাও এই সাধারণ মানুষ। তাই সাধারণ মানুষকে পাশ কাটিয়ে যে রাজনীতি তাকে আমি রাজনীতি বলে গণ্য করি না। আপনারাও যে করেন না, তার প্রমাণ আপনাদের আজকের এই সম্মেলন। রাজনীতি দূষণীয় নয়, বরং একটি পবিত্র ব্রত। দেশের এবং দেশের মানুষের হিতাকাঙ্ক্ষা থেকেই এই ব্রত গ্রহণের প্রেরণা জন্মায় প্রাণে। রাজনীতিকে যারা আত্মোন্নতির বা ভাগ্যোন্নতির অবলম্বন বলে ভাবেন, তাঁদের উচিত ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করা, শিল্প প্রতিষ্ঠা করা, কন্ট্রাক্টরী করা, লাইসেন্স ও পারমিটের জন্য উমেদারী করা; কিন্তু রাজনীতি করা নয়। রাজনীতির একটিমাত্র অপাপবিদ্ধ উদ্দেশ্য দেশ ও দেশের কল্যাণ। এই কল্যাণ সাধনের পথ বিঘ্নসঙ্কুল। দমন ও পীড়নের খড়গ এ-পথে নিত্য উদ্যত। গতানুগতিক বা প্রথাসিদ্ধ রাজনীতি নয়—সত্যিকার রাজনীতির এই বিঘ্নসঙ্কুল পথে যাঁরা অভিযাত্রী তাঁরা মহাপ্রাণ, তাঁরা শ্রদ্ধেয়। ক্ষুদ্র স্বার্থের বিচারবোধ বা নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ পণ্ডিতি বুদ্ধি চুলচেরা তর্ক দ্বারা তাদের কল্যাণবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের পরিমাপ সম্ভব নয়।

গণ-কল্যাণের রাজনীতি আর ক্ষমতার রাজনীতি এক নয়। রাজনীতি সুনিশ্চিতভাবে ক্ষমতা লাভের উপায়, কিন্তু উদ্দেশ্য নয়। যাঁরা একে উদ্দেশ্য করে তোলেন, তারা ক্ষমতার রাজনীতি করেন গণ-কল্যাণের রাজনীতি করেন না। কিন্তু আপনারা সেই রাজনীতির পথ বেছে না নিয়ে যে গণকল্যাণের পথ বেছে নিয়েছেন এবং দুঃখ ও ত্যাগের সকল অগ্নি-পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার মনোবল দেখিয়েছেন, এখানেই আপনারা সৌভ্রাতৃত্বের একই রাখী-বন্ধনে বাঁধা। যদিও সাংবাদিকতার জীবন গ্রহণের পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলাম, তথাপি রাজনীতি থেকে মুক্ত ছিলাম, এমন অলীক দাবী আমি করি না। আপনারা যে সংগ্রামী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, কর্মী ও নেতা, সেই প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও বিকাশের ধারার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিবিড়।

স্বাধীনতা উষালগ্নে এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এবং এক ঐতিহাসিক ভূমিকা গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগের জন্ম; দেন-দরবারের থালা বয়ে বেড়াবার জন্য নয়; কোন সুনির্দিষ্ট শ্রেণী কিংবা গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থের পোষকতা করার জন্যও নয়। একটি সদ্যস্বাধীন দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা ও মজবুত করার জন্য বিরোধীদলরূপে আওয়ামী লীগের জন্ম। গণতন্ত্রের প্রসার মানেই গণস্বার্থ ও অধিকারের ভিত্তি মজবুত হওয়া। আওয়ামী লীগের জন্ম এই গণঅধিকারের অতন্দ্র প্রহরীরূপে।

১৯৬৮ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভার উদ্বোধনী ভাষণের অংশবিশেষ।

২. মন্ত্রিসভা, দলীয় লোক ও আমলাদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে

জনসাধারণের মনে আস্থা ফিরাইয়া আনিতে প্রথমে মন্ত্রিসভার সদস্যগণকেই স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির প্রশ্রয় নেওয়া হইতে বিরত থাকিতে হইবে। অনেক সময় দেখা গিয়াছে যে, মন্ত্রিগণ সত্ হইলেও দলীয় লোক বা আত্মীয়-স্বজনের চাপে অন্যায় আবদার রক্ষা করিতে বাধ্য হইয়া থাকেন। যেহেতু আওয়ামী লীগকে পার্লামেন্টারী রাজনীতিতে পুরাতন প্রথার বিনাশ সাধন করিয়া নয়া জমানার সূচনা করিতে হইবে, সেইহেতু দলীয় লোক, আত্মীয়-স্বজন এমন কি পরিষদ সদস্যদের যে-কোন অন্যায় চাপ বা আবদারকে প্রত্যাখ্যান করিতে হইবে। হঠাত্ এতদিনকার এই প্রথার অবসান করিতে চাহিলে নানারকম অসুবিধা এমনকি মন্ত্রিসভার সমর্থক দলে ভাঙ্গন সৃষ্টির আশঙ্কা পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। কিন্তু যেহেতু একবার একটি অন্যায় আবদারের প্রশ্রয় দিলে পর পর আরও অনুরূপ আবদারের প্রশ্রয় দিতে হইবে এবং শেষ পর্যন্ত এই মন্ত্রিসভার অবস্থাও পূর্বকার মন্ত্রিসভাসমূহের মতই হইবে, সেইহেতু শুরু হইতেই মন্ত্রিসভাকে দৃঢ়নীতির উপর দাঁড়াইতে হইবে এবং যে-কোন মহল হইতে যে-কোন প্রকারের অন্যায় আবদার আসুক না কেন, উহা প্রত্যাখ্যান করিতে হইবে। প্রথম দিকে এই দৃঢ়নীতির ফলে এক শ্রেণীর এম. এল. এ বা কর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু এই বন্ধুরা যখন দেখিবেন মন্ত্রিগণ কোন ক্ষেত্রেই—এমনকি তাঁদের পরমাত্মীয়ের ব্যাপারে পর্যন্ত স্বজনপ্রীতির প্রশ্রয় দেন না, তখন সকলের মধ্যেই শুভবুদ্ধি ও জনকল্যাণের ভাব জাগিয়া উঠিবে। আমাদিগকে যে-কোন মূল্যে এই পরিবেশ সৃষ্টি করিতেই হইবে। কতিপয় লোককে অন্যায়ভাবে কোন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিতে গেলে তদ্বারা দুর্নীতিকেই আসকারা দেওয়া হয় এবং জাতীয় কল্যাণমূলক কার্যবাধাগ্রস্ত হয়। তারপরও অনুগ্রহ বা সুযোগ বিলাইয়া এভাব জাগিয়া উঠিবে। এই পর্যন্ত কোন মন্ত্রিসভা মন্ত্রিত্বকে পাকাপোক্ত করিতে পারে নাই, বরং এই প্রকার বিশেষ অনুগ্রহ বিতরণের ফলে দিন দিন ব্যক্তিগত অনুগ্রহপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়িয়া গিয়া মন্ত্রীদের ভাগ্যে নানা বিড়ম্বনা ডাকিয়া আনিয়াছে। রাজনৈতিক কর্মীদের নিশ্চয়ই বুঝা উচিত যে, ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের দ্বারা জাতির ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব হয় না এবং গোটা সমাজের উন্নয়ন বিধান করিতে না পারিলে দুই-চারিজন ব্যক্তির ভাগ্য সুপ্রসন্ন হইলে জনগণের ক্রমবর্ধমান দুরবস্থার মুখে তাহাও টিকিয়া থাকে না। গোটা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের উপরই আমাদের সকলের উন্নত জীবন নির্ভর করে।

তবে মন্ত্রিসভাকে এই কঠোর নীতির পথ অনুসরণ করিতে হইলে তাঁরা যে নিজেরা সত্ তার নিদর্শন জনসাধারণের সম্মুখে রাখিতে হইবে। সকল প্রকার দুর্নীতির তদন্তের জন্য উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্থায়ী কমিশন গঠন করিতে হইবে। এই কমিশন অতীত এবং বর্তমানের মন্ত্রী, পরিষদ সদস্য, সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী সকল শ্রেণীর লোকের দুর্নীতিমূলক কার্যসমূহের তদন্ত করিবার ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে। এই কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ দলীয় রাজনীতির সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাহির হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে। এইরূপ একটি কমিশন গঠন করা হইলে যেমন প্রাক্তন মন্ত্রী বা সরকারী কর্মচারীদের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করিবেন, তেমনি বর্তমান মন্ত্রীদের দুর্নীতিরমূলক কোন কার্যকলাপ থাকিলে উহারও তদন্ত করিবেন। আইন প্রণয়ন করিয়া এই কমিশনকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করিতে হইবে—যাতে ক্ষমতাসীন মন্ত্রিসভা তাদের তদন্ত ও বিচার ক্ষেত্রে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করিতে না পারেন। দুর্নীতি তদন্তের এইরূপ নিরপেক্ষ কার্যকরী ব্যবস্থা করা হইলে একদিকে যেমন মন্ত্রিসভার দুর্নীতিবিরোধী সংকল্পের প্রতি মানুষের আস্থা জাগিবে, অপরপক্ষে তেমনি সমাজের বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতিবাজদের কেল্লায় ভীতির সঞ্চার করিয়া সমাজের দুর্নীতি বিশেষ করিয়া উপর তলার দুর্নীতি প্রশমিত হইবার পথ উন্মুক্ত হইবে। অবশ্য আজ সমাজের বিভিন্ন স্তরে যেভাবে দুর্নীতি বিস্তার করিয়াছে তাহাতে দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। ইহার জন্য মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা দূর করিবার ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করিতে হইবে। তথাপি সমাজের উচ্চস্তর অর্থাত্ মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি নিবারণ করিতে পারিলে দেশে এক সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি হইবে। ছোট ছোট চাকরিজীবী বা ছোটখাটো ব্যবসায়ীর মধ্যে দুর্নীতির প্রশ্রয় নিবার হেতু থাকিতে পারে। কিন্তু তাহাও সমর্থনযোগ্য নয়। আজিকার সমাজের ব্যাপক দুর্নীতির মূলে রহিয়াছে উপরতলার লোকদের দুর্নীতি। এই উপর-তলার দুর্নীতি বন্ধ করিতে পারিলে সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বেও নীচের তলার দুর্নীতি কমানো যাইতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি যে, আমাদের পল্লী অঞ্চলের লোক সরল, সত্ ও সাধু প্রকৃতির। উপর তলার সৃষ্ট অবস্থার চাপেই আজ অনেক ক্ষেত্রে তাদের অসাধু পন্থার প্রশ্রয় নিতে হয়। আর উপর তলার সেই দুর্নীতি বন্ধ হইলে সাধারণ মানুষ সমায়িকভাবে দুরবস্থার মধ্যে থাকিলেও সত্ জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ হইবে। মন্ত্রিসভা যদি সত্যিকারভাবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অন্যায় আবদারের নিকট নতি স্বীকার না করেন তাহা হইলে তাঁরা নিঃসন্দেহে জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন পাইবেন।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা স্বীকার করে এর দায়-দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আপনি কি তার দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন?
4 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২৯
ফজর৩:৪৫
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪৩
এশা৮:০৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :