The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ০৩ জুলাই ২০১৩, ১৯ আষাঢ় ১৪২০ এবং ২৩ শাবান ১৪৩৪

পতুয়ার খাল থেকে পটুয়াখালী

নির্মল রক্ষিত, পটুয়াখালী প্রতিনিধি

দক্ষিণাঞ্চলের সৈকত জুড়ে গঠিত বাংলাদেশের অষ্টাদশ জেলা পটুয়াখালী। প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ ছিল শতাধিক দ্বীপের সমাহার। বর্তমান বাকেরগঞ্জ যেখানে অবস্থিত সে অঞ্চলের কাছাকাছি সুগন্ধা নদীর তীরে গড়ে ওঠে প্রাচীন বাকলা-চন্দ্রদ্বীপের সভ্যতা ও সংস্কৃতি। বহু পূর্বে বাকলা নামের এই ছোট্ট রাজ্যে রাজত্ব করতেন বাংলার বারভূঁইয়ার একজন। সম্ভবতঃ চর্তুদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রামনাথ দনুজমর্দন দে নামে একজন রাজা এ অঞ্চলে রাজ্য স্থাপন করেন। তারও রাজধানী ছিল বাকলায়, তেঁতুলিয়া নদীর পশ্চিম তীরে বাউফলের কচুয়া গ্রামে। সেই থেকে তার পরবর্তী অষ্টম পুরুষ রাজা জগদানন্দ্র বসু পর্যন্ত রাজধানী সেখানেই ছিল। পরে রাজা কন্দর্প নারায়ণ রাজ্যের রাজধানী কচুয়া থেকে বরিশালের নিকটবর্তী মাধবপাশায় স্থানান্তরিত করেন।

ভূতাত্ত্বিক তথ্যানুযায়ী এই এলাকার ভূগঠন আর্য সময়েরও পূর্বের। নদীর ভাঙ্গা-গড়া চলেছে সর্বযুগে। এফ.সি হারসটের ( F.C. Hurst ) মতে, বাকেরগঞ্জের দক্ষিণে বহু পূর্বেও স্থলভাগ ছিল। একাদশ শতাব্দীতে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে এ অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যায়। পরে ধীরে ধীরে আবার সৃষ্টি হয় বর্তমান স্থলভাগ। প্রাকৃতিকভাবে ক্রমশঃ তা পরিণত হয় সুন্দর বনে। নাম হয় তার সুন্দরকূল। সমগ্র পটুয়াখালী এলাকা সেই সুন্দরকূল অথবা সুন্দরবনের গর্ভ থেকে প্রসূত এলাকা।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ১৫৯৯ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের কানুনগু জিম্মক খাঁকে চন্দ্রদ্ব্বীপে প্রেরণ করেন রাজা টোডরমল। মোগল সরকার অরণ্য অঞ্চলকে চন্দ্রদ্বীপ থেকে পৃথক করে বাজুহা অর্থাত্ সংরক্ষিত এলাকা নামে একটি এলাকা গঠন করেন। পরবর্তীকালে বাজুহা থেকেই সৃষ্টি হয় সেলিমাবাদ, বুজর্গ উমেদপুর, ঔরঙ্গপুর পরগনা। সেই অতীত বুজর্গ উমেদপুর পরগনা আজকের পটুয়াখালী শহর ও আশেপাশের এলাকা।

পটুয়াখালী শহরের বয়স প্রায় দেড়'শ বছর। এই নামের উত্পত্তি নিয়ে মতান্তর রয়েছে। কবে, কখন, কিভাবে পটুয়াখালী নামকরণ হয়েছিল তা বলা দুরূহ ব্যাপার। এ নামকরণ সম্পর্কে তেমন কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। পটুয়াখালী নামকরণের ক্ষেত্রে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশেই স্বর্গীয় দেবেন্দ্র নাথ দত্তের পুরানো কবিতার সূত্র ধরে "পতুয়ার খাল" থেকে পটুয়াখালী নামকরণের উত্পত্তি বলে সমর্থন করেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগীজ জলদস্যুদের হামলা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন, অপহরণ ও ধ্বংসলীলায় বাকলা-চন্দ্রদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চল প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। এসময় বর্তমান পটুয়াখালী শহর এলাকা ছিল সুন্দরবন এবং নদীর উত্তর পাড়ে ছিল লোকালয়। উত্তর পাশের বর্তমান লাউকাঠী নদী ছিল লোহালিয়া ও পায়রা নদীর ভাড়ানী খাল। এই ভাড়ানী খাল দিয়েই পর্তুগীজ জলদস্যুরা এসে গ্রামের পর গ্রাম চালাত লুণ্ঠন ও অত্যাচার। এ খাল দিয়ে পর্তুগীজদের আগমনের কারণে স্থানীয়রা তৈরি করে অনেক কেচ্ছা ও কল্প কাহিনী। এর নাম তখন সবার মুখে মুখে পতুয়ার খাল। পরবর্তীতে এই পতুয়ার খাল থেকেই পটুয়াখালীর উত্পত্তি হয়। ১৯৮০ সনে শেরেবাংলা টাউন হলে অনুষ্ঠিত 'পটুয়াখালী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য' শীর্ষক সেমিনারে অধিকাংশ বক্তা, প্রবন্ধকার ও 'বরিশালের ইতিহাস'-এর লেখক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ এই মতকে সমর্থন করেন। পটুয়াখালী নামকরণের অপর দু'টি মত হচ্ছে এ অঞ্চলে একসময় পটুয়ার দল বাস করত। এরা নিপুণ হাতে মৃত্পাত্র তৈরি করে তাতে নানা ধরনের পট বা ছবির সন্নিবেশ ঘটাত। এই 'পটুয়া' থেকে 'পটুয়াখালী' নামের উত্পত্তি হয়ে থাকতে পারে। অথবা পেট-আকৃতির খাল বেষ্টিত এলাকাই হয়তো পেটুয়াখালী এবং পরে তা অভিহিত হয় পটুয়াখালী নামে। তবে শেষোক্ত অভিমত দু'টির কোনো জোরালো সমর্থন মেলেনি।

১৮০৭ সালে বরিশালের জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে আসেন মিঃ বেটি। দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন কেটে বসত বৃদ্ধি পাওয়ায় বেটির শাসন আমলেই ১৮১২ সালে পটুয়াখালীকে নিয়ে গঠন করা হয় মির্জাগঞ্জ থানা। পরবর্তীতে দেওয়ানী শাসন প্রসারের জন্য ১৮১৭ সালে বরিশালে স্থাপন করা হয় পৃথক ৪টি মুন্সেফী চৌকি। এগুলো হোল বাউফল, কাউখালী, মেহেন্দিগঞ্জ ও কোটের হাট চৌকি। বাউফল চৌকির প্রথম মুন্সেফ হয়ে আসেন ব্রজ মোহন দত্ত। ১৮৬০ সালের ১জুন বাউফল থেকে চৌকি স্থানান্তর করা হয় লাউকাঠীতে। ব্রজ মোহন দত্ত লাউকাঠী চৌকিরও মুন্সেফ ছিলেন। লাউকাঠীর উত্তর পাড়ে একসময় ছিল গভীর অরণ্য। ঐ অরণ্য মাঝে কোন এক সময় একদল কাপালিক এসে আস্তানা গাড়ে। বিগ্রহ স্থাপন করে প্রতিষ্ঠা করে কালিমন্দির। তারা জনবসতি এলাকায় গিয়ে ডাকাতি করত। লোকজন ঐ মন্দিরকে বলত ডাকাতিয়া কালিবাড়ি।

ব্রজ মোহন দত্ত প্রস্তাব করেন পটুয়াখালী নতুন মহকুমা প্রতিষ্ঠার। ১৮৬৭ সালের ২৭ মার্চ কলিকাতা গেজেটে পটুয়াখালী মহকুমা সৃষ্টির ঘোষণা প্রকাশিত হয়। ১৮৭১ সালে পটুয়াখালী মহকুমায় রূপান্তরিত হয়। জমিদার হূদয় শংকরের পুত্র কালিকা প্রসাদ রায়ের নামানুসারে লাউকাঠীর উত্তর পাড়ের নাম করা হয় কালিকাপুর। এখানেই গড়ে ওঠে শহর। মহকুমা সদর অফিস স্থাপিত হয় কালীবাড়ি পুকুরের পূর্ব পাড়ে। প্রথমে বাঁশ ও ছনের তৈরি ঘরে কোর্ট বসে বলে স্থানীয় লোকজন একে বলত বাউশশা কোর্ট। তখন ব্রজ মোহন দত্ত মুন্সেফ ও ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট দুই পদেই অধিষ্ঠিত হন। নতুন মহকুমার নাম হয় পটুয়াখালী। পার হয়ে গেল এক শতাব্দী। এল ১৯৬৯ সন। ইতিহাসে সংযোজিত হোল দেশের সাগর বিধৌত নতুন এক জেলা পটুয়াখালী। ১৯৬৯ সনের ১ জানুয়ারি খুলনা বিভাগের তত্কালীন কমিশনার এ.এম.এফ জেলা প্রশাসকের ভবনের দরবার হলে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। একই বছরের ৯ মার্চ পটুয়াখালী জেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস. এম আহসান। পটুয়াখালীর প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন হাবিবুল ইসলাম। সাগরকন্যা পটুয়াখালী ২১০ ৪৯র্ ১৬র্ র্ অক্ষাংশ থেকে ২২০ ৩৬র্ উত্তর অক্ষাংশ, ৮৯০ ৫২র্ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯০০ ৩৮র্ ৫৫র্ র্ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। জেলার উত্তরে বরিশাল জেলা, দক্ষিণে বরগুনা জেলা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভোলা জেলা ও তেঁতুলিয়া নদী এবং পশ্চিমে বরগুনা জেলা। এই জেলার আয়তন ৩,২২০.১৫ বর্গ কিলোমিটার ও লোকসংখ্যা ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৭ জন।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, 'গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোগত পরিবর্তনের দরকার নেই।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৫
ফজর৪:৫৪
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১২সূর্যাস্ত - ০৫:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :