The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার ১২ জুলাই ২০১৪, ২৮ আষাঢ় ১৪২১, ১৩ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ গোল্ডেন বলের জন্য মনোনীত ১০ খেলোয়াড় | গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ১৬ | ঝিনাইদহে 'বন্দুকযুদ্ধে' ২ চরমপন্থি নিহত

ডাক্তার পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার

অধিকাংশ পদই শূন্য, অপারেশনের জন্য রোগীদের ছুটতে হয় অন্য জেলায়

আবুল খায়ের ও নাসিম আলী

একে তো চিকিত্সকের তীব্র সংকট, তার ওপর কর্মরতরাও ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে। ডাক্তার পাওয়াই যেন ভাগ্যের ব্যাপার। কোন মতে ডাক্তার যদিও বা মিললো, মেলে না ওষুধ। অপারেশনের জন্য ছুটতে হয় রাজধানী বা অন্য কোন বড় জেলা শহরে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা পান না স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। বেশিরভাগ পরীক্ষাই করাতে হয় হাসপাতালের বাইরে। এর উপর দালালদের দৌরাত্ম্য তো রয়েছেই। এমন অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই চলছে পিরোজপুর জেলার সরকারি চিকিত্সাসেবা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডাক্তার, নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে এ জেলার চিকিত্সা কার্যক্রম। জেলায় সদর হাসপাতালসহ ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। চিকিত্সা ব্যবস্থার সব কিছু থাকা সত্ত্বেও এ জেলার রোগীদের চিকিত্সাসেবা পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। চিকিত্সকদের এ জেলায় নিয়োগ দিলেও তারা থাকতে চান না। কোন কোন চিকিত্সক যোগদান করলেও আর কর্মস্থলে আসেন না। পুনরায় বদলি বাগিয়ে শহরে কিংবা রাজধানীতে চলে যান। নারী চিকিত্সকরা মোটেই এ জেলায় যেতে চান না। ফলে প্রসূতি চিকিত্সায় চরম দুরাবস্থা বিরাজ করছে। কোনরকম জটিলতা হলে ঢাকা, বরিশাল বা খুলনায় যেতে হয়। রাস্তায় মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

জানা গেছে, পিরোজপুর জেলায় চিকিত্সকের মঞ্জুরিকৃত পদ ১৬৮টি। এর মধ্যে ১১৯টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ৪৯ জন কর্মরত থাকলেও সব চিকিত্সক কর্মস্থলে থাকেন না। সরকারি হাসপাতালে ডিউটি থাকলেও কর্তব্যপালন করেন প্রাইভেট ক্লিনিকে। চাহিদা অনুযায়ী সব ওষুধ সামগ্রী সরকারিভাবে সরবরাহ করা হলেও ৯৫ ভাগ ওষুধ পাচার হয়ে যায়। অধিকাংশ হাসপাতালেই অপারেশন থিয়েটার বন্ধ। যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও রোগীদের জন্য তা তেমন কোন কাজে আসে না। ময়নাতদন্ত ও মেডিক্যাল পরীক্ষা নিয়েও পড়তে হয় নানা সমস্যায়।

পিরোজপুর সদর হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে ন্যূনতম সুযোগ থাকলেও সিজারিয়ান ছাড়া অন্য কোন অপারেশন এখানে হয় না। সার্জারি কনসাল্টেন্ট না থাকায় জটিল রোগের অপারেশন করা সম্ভব হয় না। গাইনীর জুনিয়র কনসাল্টেন্ট থাকলেও এনেসথেসিয়ার ডাক্তার না থাকায় অনেক সময় জটিল অপারেশন করতে পারেন না। তখন বাধ্য হয়ে অনেক প্রসূতি হাসপাতাল ছেড়ে আশে পাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিকে চলে যান। এছাড়া সদর হাসপাতালে ক্লিনিকের দালালরা বেশ তত্পর। হাসপাতালের দু'টি এ্যাম্বুলেন্স থাকলেও মাঝে মাঝে এগুলো বিকল হয়ে পড়ে এবং রোগীদের বাইরের এ্যাম্বুলেন্সের উপর নির্ভর করতে হয়।

পিরোজপুরে একটি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক রয়েছে। যেখানে একজন জুনিয়র কনসাল্টেন্ট ও একজন মেডিক্যাল অফিসার কর্মরত থাকার কথা থাকলেও দু'টি পদই শূন্য। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে তিন জন ডাক্তারের পদ থাকলেও মাত্র একজন কর্মরত। বিভিন্ন ইউনিয়নে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পদায়নকৃত সাত জন সহকারী সার্জনের মধ্যে ছয়টি পদই শূন্য।

জিয়ানগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:ইনডোর, আউটডোর, ইমারজেন্সি সেবাবিহীন ৩১ শয্যার জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০টি ডাক্তারের পদ থাকলেও ৩ জন কর্মরত । পাঁচ বছর আগে চালু হওয়া এই নতুন উপজেলা হাসপাতালে অজ্ঞাত কারণে ইনডোর ও আউটডোর এবং ইমারজেন্সি সার্ভিসের অনুমোদন না থাকায় চিকিত্সকরা নিজ টেবিলে বসে শুধু ব্যবস্থাপত্র দেন। কোন ওষুধ বরাদ্দ না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়। এ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে তিন জন সহকারী সার্জনের পদ থাকলেও তা সবসময়ই শূন্য থাকে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস জানান, এখান থেকে ব্যবস্থাপত্র দেয়া ছাড়া রোগীদের আর কোন স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার সুযোগ নেই। তাই নার্সসহ অনেক কর্মচারীকে জেলা সদর হাসপাতাল ও অন্যত্র ডেপুটেশনে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। চমত্কার কমপ্লেক্স ভবনে পানি সরবরাহ সুবিধা নেই বলে তিনি জানান।

ভান্ডারিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ শয্যাবিশিষ্ট। অবকাঠামোগত সকল সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ৫০ শয্যা চালুর জন্য নানা চেষ্টা চালানো হলেও তা সফল হচ্ছে না। কমপ্লেক্সে নয় জন ডাক্তারের মধ্যে তিন জন আছেন। একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাক্তার আছেন, তবে সাতটি ইউনিয়নের ছয়টিতে সহকারী সার্জন-এর পদ খালি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহাদত্ হোসেন জানান, অধিকাংশ চিকিত্সক ও সহকারী সার্জনের পদ শূন্য থাকায় এ উপজেলায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে টেকনিশিয়ান না থাকায় এক্স-রে মেশিন কাজে লাগছে না। ডাক্তারের অভাব পূরণের জন্য সিভিল সার্জনের নির্দেশে সহকারী সার্জন ইউনিয়ন থেকে এসে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করেন।

কাউখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা সেবার অবস্থা খুবই শোচনীয়। ৩১ শয্যার এ হাসপাতালে নয় জন ডাক্তারের স্থলে তিন জন দায়িত্ব পালন করছেন। দুই জন মেডিক্যাল অফিসার গত তিন বছর ধরে অননুমোদিত ভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন। সাতটি ইউনিয়নের একটিতে একজন সহকারী সার্জন রয়েছেন। একমাত্র জরাজীর্ণ এ্যাম্বুলেন্সটি কোন মতে সার্ভিস দিচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, প্রয়োজনীয় চিকিত্সক না থাকায় এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা সেবাদান খুবই দুরূহ হয়ে পড়েছে। হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে পাঁচ বছর আগে সম্প্রসারিত ভবনের কাজ শুরু হলেও মাঝপথে তা ফেলে রেখে ঠিকাদার চলে যাওয়ায় ভবনটির নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে।

স্বরূপকাঠি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যাবিশিষ্ট। ২০ জন ডাক্তারের মধ্যে ছয় জন কর্মরত। দুইটি স্বাস্থ্য উপ-কেন্দ্রে এক জন চিকিত্সক আছেন। ১০ ইউনিয়নে কোন সহকারী সার্জন নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুণ চন্দ্র মন্ডল ইত্তেফাককে বলেন, চিকিত্সক সংকট থাকায় রোগীদের সন্তোষজনক সেবাদান সম্ভব হয় না। বরাদ্দকৃত একমাত্র এ্যাম্বুলেন্সটি বিকল থাকায় অন্য উপজেলা থেকে এ্যাম্বুলেন্স এনে কাজ চালানো হচ্ছে।

নাজিরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও ৫০ শয্যার। ডাক্তারসহ অন্যান্য লোকবলের সংকট রয়েছে। এ হাসপাতালটিতে 'ডিএসএফ' নামে একটি কর্মসূচি রয়েছে প্রসূতি মাতাদের জন্য। অথচ এখানে কনসাল্টেন্টের চারটি পদ শূন্য। আটটি ইউনিয়নে সহকারী সার্জন পদে কেউ কর্মরত নেই। মাটিভাঙ্গা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার পদটিও শূন্য। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল মতিন সরদার জানান, এই সীমিত জনবল নিয়ে নাজিরপুরে চিকিত্সা সেবা অব্যাহত রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

মঠবাড়িয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জন চিকিত্সকের মধ্যে মাত্র নয় জন কর্মরত। সকল কনসাল্টেন্টের পদই শূন্য। ডেন্টাল সার্জন নেই। দু'টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও ডাক্তার নেই। ১১টি ইউনিয়নে সহকারী সার্জন নেই। কোন মতে চিকিত্সা সেবা চলছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, তিনটি এ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি মাত্র চালু রয়েছে। সিজারিয়ান অপারেশন হলেও জটিল রোগীদের বরিশালে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

জেলার চিকিত্সা সেবার এই করুণ চিত্র সম্পর্কে সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল গনি বলেন, পিরোজপুরে চিকিত্সকের ৭২ শতাংশ পদই শূন্য। এ জেলা নদীবেষ্টিত বলে দূরের চিকিত্সকরা এখানে পোস্টিং নিয়ে আসতে চান না। যারা বাধ্য হয়ে আসেন তারাও আবার তদবির করে দ্রুত চলে যান। নারী ডাক্তাররা সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেন-দরবার করে বড় বড় শহরে থেকে যান। এখানে যারা চাকরি করেন তাদের বাড়ি আশপাশে বলে তিনি জানান।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় ঈদের আগে ৩ দিন এবং পরে ২ দিন মহাসড়কে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আপনি এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন কি?
5 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ১৮
ফজর৫:১৩
যোহর১২:১৩
আসর৪:১৯
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৬:২৯সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :