The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ১৫ জুলাই ২০১৩, ৩১ আষাঢ় ১৪২০ এবং ০৫ রামাযান ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ গোলাম আযমের ৯০ বছর কারাদণ্ড | আগামীকালও জামায়াতের হরতাল | গণজাগরণ মঞ্চে ককটেল বিস্ফোরণ | রায়ে ক্ষুব্ধ গণজাগরণ মঞ্চ, শাহবাগ অবরোধ

বাড়ির পাশে রাজবাড়ী

মোঃ ইয়াসিন আলী

বাড়ীর পাশে রাজবাড়ী। কিন্তু সেখানে এখন কোন রাজা থাকেন না। নেই পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজ, নেই উজির-নাজির। রাণীমহলে রাণী নেই, নেই দাস-দাসী। নেই দেন-দরবার, প্রজাদের আনাগোনা। ঘোড়াশালে ঘোড়া নেই, হাতিশালে নেই হাতি। আছে জরাজীর্ণ মলিন বদন ও ভগ্ন হূদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে সেই প্রাচীন রাজবাড়ী। চুরি হয়ে গেছে তার সৌন্দর্য, হারিয়ে গেছে তার আভিজাত্য, জৌলুস, ফুরিয়ে গেছে তার প্রবল প্রতাপ।

অথচ এক সময় সবই ছিল। ছিল সুনিপুন কারুকাজে নির্মিত বিশাল অট্টালিকা, শ্বেতপাথরে ঢাকা তার মেঝে, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, হাতি, ঘোড়া, ছিল কুলিক নদীর তীরে শান বাঁধানো ঘাটের পাশে সুদৃশ্য কালিমন্দির, যে মন্দিরের চূড়ায় ছিল চৈনিক শিল্পকলার কারুকাজ, যা এখন ধ্বংসের পথে। ঐতিহ্যবাহী এ রাজবাড়ী বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার মালদুয়ার এ্যাষ্টেটে অবস্থিত রাজা টংকনাথ চৌধুরীর রাজবাড়ী। উপজেলা অফিস হতে ১.৩ কিঃমিঃ পূর্বে (বর্তমান সহোদর মৌজায়) কুলিক নদীর পূর্ব তীরে মালদুয়ার এ্যাষ্টেটের উপর রাজবাড়ীটি প্রায় ১০ একর এলাকা জুড়ে এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রাজা টংকনাথ চৌধুরী খুব বড় মাপের জমিদার না হলেও তাঁর ছিল বিরাট আভিজাত্য। ১৯২৫ সালের ১৮ নভেম্বর তত্কালিন বৃটিশ গভর্নর হাউসে টংকনাথ চৌধুরীকে বৃটিশ সরকার 'রাজা' উপাধিতে ভূষিত করেন। কথিত আছে, টংকনাথের আমন্ত্রণে তত্কালীন বড়লাট এবং দিনাজপুরের মহারাজা রাণীশংকৈলে এলে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে টাকা নোট পুড়িয়ে রীতিমতো রাজকীয় অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন করান এবং পর্যাপ্ত স্বর্ণালংকার উপহার দেন। এছাড়াও টংকনাথের 'রাজা' উপাধি লাভের বড় কারন হল, তাঁর আমলে বহুমাত্রিক জনকল্যাণ ও জনসেবামূলক কর্মকান্ডের স্বীকৃতি। যার উলে¬খযোগ্য হল- প্রথমত: তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়াশুনা করেন এবং ১৯১১ সালে তত্কালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার মধ্যে একমাত্র বি,এ পাশ করা উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। দ্বিতীয়ত: তিনি দীর্ঘদিন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন এবং ১৫ বছর যাবত্ তিনি জেলা বোর্ডের সদস্য ছিলেন ও প্রথম ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজ খরচে দু'টো দাতব্য চিকিত্সালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতেন। এছাড়াও তিনি ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনুদান দিতেন এবং যার মধ্যে দু'টোর জন্য তিনি জমি দান করেন। যার একটি হল বর্তমান রাণীশংকৈল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং অপরটি পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। তিনি নিজস্ব সীমানার মধ্যে একটি ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০০ ছাত্রের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাসহ স্কুলের উন্নয়নের সার্বিক দায়ভার গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্বর্গীয় বুদ্ধিনাথ চৌধুরীর নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত তত্কালীন B.N INSTITUTE (ইংলিশ মিডিয়াম) বর্তমানে রাণীশংকৈল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। এ বিদ্যালয়ের লাল দালানটি এখনও রাজা টংকনাথের কীর্তির স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। তিনি শিক্ষানুরাগী হিসেবে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই স্থাপন করেননি, তাঁর ছিল সমৃদ্ধ লাইব্রেরী। যার নমুনা এখনও দিনাজপুর সরকারী কলেজ (তত্কালীন সুরেন্দ্রনাথ কলেজ), কারমাইকেল কলেজ, দিনাজপুর খাজা নাজিম উদ্দীন হলে পাওয়া যায়।

রাজা টংকনাথ ছিলেন বৃক্ষ প্রেমিক। আম, জাম, লিচু, জলপাই, জামরুল, দুধখিলি, বনলিচু, মহুয়া, নাকেস্বর, দেবদারু সহ বহু দূর্লভ প্রজাতির ফলমূলের বাগান তিনি করেছিলেন। যার কিছু নিদর্শন এখনও বর্তমান।

দেশভাগের পূর্বেই রাজা টংকনাথ মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা যায়। তাঁর মৃত্যুর সার্বিক তথ্য পাওয়া না গেলেও লোকমুখে জানা যায়, রাজা মৌমাছির আক্রমণের শিকার হয়ে অসুস্থ্য হয়ে উন্নত চিকিত্সার জন্য কলকাতায় যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর তিন ছেলে কর্মনাথ চৌধুরী, রুদ্রনাথ চৌধুরী এবং শেষনাথ চৌধুরী। যারা বড় কুমার, মাঝিল কুমার ও ছোট কুমার বলে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। দেশভাগের প্রাক্কালে রাজা জমিদারি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান। এর মধ্য দিয়ে মালদুয়ার এ্যাষ্টেটে রাজা টংকনাথ চৌধুরীর জমিদারি পরম্পরার সমাপ্তি ঘটে।

রাজা টংকনাথের স্মৃতি বিজড়িত কীর্তিকে অমর করে রাখার জন্য আজ বড় প্রয়োজন এই রাজবাড়ীটির সংস্কার ও সংরক্ষন। রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের আদলে ছোট আঙ্গিকে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কিংবা পর্যটনের ক্ষেত্র অথবা যাদুঘর হিসেবে এটির যত্ন ও সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা। অর বিলম্ব নয়, শীঘ্রই সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রবল প্রত্যাশা করে রাণীশংকৈলবাসী।

লেখক :সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ, রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, 'সংলাপের বদলে লগি-বৈঠা নিয়ে আন্দোলনের নামে দেশে সংঘাত সৃষ্টি করতে চায় সরকারি দল'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
5 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৬
ফজর৫:১২
যোহর১১:৫৪
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩৫
সূর্যোদয় - ৬:৩৩সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :