The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

মুক্তিযুদ্ধ : মুক্তিযুদ্ধের ঈদ

আনোয়ার কবির

১৯৭১ সাল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল বছর। স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়—সারাদেশে চলছে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। সশস্ত্র যুদ্ধরত সমগ্র জাতি। এ অবস্থায় মুসলিম সমপ্রদায়ের সর্বোচ্চ উত্সব ঈদ-উল-ফিতর এসে উপস্থিত। ২০ নভেম্বর শনিবার আসে ঈদ-উল-ফিতর।
মুসলিম ইতিহাসে প্রথম ঈদ উত্সবের সঙ্গেও যুদ্ধ জড়িত। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর নেতৃত্বে মুসলমানদের প্রথম যুদ্ধ—বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭ রমজান। সে যুদ্ধে বিজয়ের মধ্যদিয়ে ইসলাম প্রবেশ করেছিল নতুন অধ্যায়ে। যুদ্ধের পরের মাসে প্রথম দিনেই পালিত হয়েছিল ঈদ-উল ফিতর। সে থেকে মুসলিম জীবনে প্রতি বছর শাওয়াল-এর প্রথম দিনে পালিত হয় ঈদ-উল-ফিতর।
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই সুমহান সময়ে ২০ নভেম্বর ঈদ-উল-ফিতর এসেছিল বাঙালিদের জীবনে। এ রকম ঈদ আর কখনো
বাঙালি দেখেনি। সেদিন ঈদের রূপ ছিল ভিন্ন। রণাঙ্গন, শরণার্থী শিবির আর দেশের ভেতরে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়েছিল সে ঈদ। ঈদের দিনেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিল বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা। ভুরুঙ্গমারিতে শহীদ হয়েছিলেন বীর উত্তম আশফাকুস সামাদ। এছাড়াও সারাদেশে অসংখ্য যুদ্ধ এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ সমগ্র বাংলাদেশ এবং সহযোগী ভারতের শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধা শিবির, মুজিবনগর সরকার, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণাদায়ক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রচারপত্রে সকল জায়গাতেই বিভিন্নভাবে সামর্থ্য এবং বাস্তবতা অনুযায়ী পালিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এই ঈদ। বাংলাদেশের জনগণের প্রায় অংশই যেহেতু মুসলিম ধর্মাবলম্বী আর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা যেহেতু ধর্মীয় অপপ্রচারে নেমেছিল তাই স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এই ঈদ ছিল মুক্তিযোদ্ধাসহ সারাদেশের আপামর জনগণের জন্য কঠিন পরীক্ষা।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টান সকল ধর্মীয় সমপ্রদায়ের মানুষই মা, দেশমাতৃকাকে রক্ষার তাগিদে অস্তিত্বের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেদিন তাঁদের সামনে আরাধ্য লক্ষ্য ছিল প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা। যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় সমপ্রদায় বাংলার হিন্দু সমপ্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব দুর্গাপূজাও পড়েছিল। গবেষক গোলাম মুরশিদ-এর ‘যখন পলাতক : মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ গ্রন্থ থেকে কলকাতার দুর্গাপূজার নিম্নোক্ত বিবরণটি জানা যায়—
‘ঠিক মনে পড়ছে না, তবে যদ্দুর মনে পড়ে সেবার পুজো হয়েছিল অক্টোবরের প্রথম দিকে।... পুজোর সময়ে কলকাতার অন্য এক চেহারা দেখে বিস্মিত হলাম। কলকাতায় কেমন করে পুজো হয়, তা দেখার জন্যে পার্ক সার্কাস এলাকার কয়েকটা পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিলাম। আমীর আলি অ্যাভেনিউ যেখানটাতে পার্ক স্ট্রিটের সঙ্গে মিশেছে, সেখানে বড় একটা মণ্ডপ হয়েছিল। খুব চাকচিক্য, অগুনতি আবালবৃদ্ধবনিতা।
মনে পড়ছে না সে বছর কোন নায়িকার আদলে দুর্গার প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। তবে নিশ্চিতভাবে সুচিত্রা সেন নন। কারণ, তিনি তাঁর অনেক আগে থেকেই ভাটার দিকে। হয়তো অপর্ণা সেন হবেন। বোধ হয় স্টেটম্যানেও একটা লেখায় এরকম কথা পড়েছিলাম। নয়তো দুর্গা প্রতিমার কোনো বিশেষজ্ঞ আমি নই। সে যাকগে, প্রতিমার দিকে চেয়ে দেখি, গণেশ-কার্তিক-অসুর ইত্যাদি সুরাসুরের কয়েক ফুট দূরেই একটা বড় ফটো টানানো—আদিকালের কোনো দেবতার নয়, এক জীবন্ত দেবতার, শেখ মুজিবের। বিস্মিত না-হয়ে সত্যি উপায় ছিল না। যে মুসলমানদের সংস্পর্শে এলে এককালে হিন্দুদের ধর্ম নষ্ট হতো, মুসলমানদের খাবার গন্ধ কোনোক্রমে নাকে ঢুকলে কুলীন ব্রাহ্মণও পীরালি ব্রাহ্মণে পরিণত হতেন, সেই মুসলমানদেরই একজনের ছবি দুর্গা পূজার মণ্ডপে! মুজিবের ছবি ছাড়া কলকাতার লোকেরা পুজোর আনন্দটা ঠিক যেন পুরোপুরি অনুভব করতে পারছিলেন না। সত্যি বলতে কি, শেখ মুজিব সেবারে ধর্মীয় অনুষঙ্গের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন এবং ‘‘যার যা কিছু আছে তা নিয়ে সংগ্রামে’’র আহ্বান জানিয়ে তিনি শত শত বছরের সাম্প্রদায়িকতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলেন কোটি কোটি লোককে। আমার সত্যি খুব ভালো লাগলো ভেদ ঘোচানোর এই অসাধারণ দৃষ্টান্ত দেখে। তবে এটাকে আমি ব্যতিক্রমধর্মী একটা দৃষ্টান্ত বলেই মনে করলাম। গেলাম অন্য একটা মণ্ডপে। দেখি সেখানেও শেখ মুজিবের ফটো। তারপর আর একটাতে। সেখানেও তা-ই। বুঝতে পারলাম, আজ ভাবের যে বন্যা দেখা দিয়েছে, তাতে এতকালের জাতপাতসহ বহু মূল্যবোধই ধুয়ে-মুছে একাকার হয়ে গেছে।’
অর্থাত্ কলকাতায় সেদিন দুর্গাপূজারও বড় উপলক্ষ ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর—রাজাকার, আলবদর, আল শামস, শান্তিবাহিনীর ধর্মীয় অপ্রচারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঈদ ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। ১৯৭১-এর সেদিনের ঈদের কয়েকটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হলো।
মুজিবনগর সরকারের ঈদ
প্রথমে আমরা দেখব আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দ কীভাবে দিনটি উদ্যাপন করেছিলেন। ঈদ উপলক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে বাণী প্রদান করেছিলেন। ঈদের দিন ভারত কিংবা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দফতরের লোকজনদের জন্য বিভিন্ন ফলমূল ও মিষ্টিসহ প্রচুর শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার কিছুই স্পর্শ করেননি। সবই অফিসের লোকজনের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ঈদের দিনে রাতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশে প্রবেশ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছিলো। সেসময়ে রণাঙ্গনের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম-এর লেখা ‘একাত্তরের রণাঙ্গন : অকথিত কিছু কথা’ গ্রন্থে মুজিবনগর সরকারের ঈদ উদ্যাপনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। গ্রন্থটিতে তিনি ঈদের সময় জুলাই-আগস্ট বলে অনুমান করে লিখেছেন। আসলে তারিখটি ২০ সেপ্টেম্বর। সে গ্রন্থ থেকে জানা যায়—
‘পবিত্র ঈদুল-ফিতর উপলক্ষে সেদিন মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। মুজিবনগর সরকারের সকল দফতর ছিল সেদিন বন্ধ। সেদিন যুদ্ধবিরতিও ঘোষিত ছিল। কিন্তু কার্যত মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধবিরতি পালন করেনি। সেদিন রণাঙ্গনে রাইফেল-বন্দুক হাতে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঈদুল-ফিতরের আনন্দ-উত্সব রণাঙ্গনে একজন শত্রু হননের আনন্দের চেয়ে বড় ছিল না। ঈদুল-ফিতরের দিন প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার হূদয়দৃপ্ত শপথ ছিল মাতৃভূমিকে পাকিস্তানি বাহিনীমুক্ত করার।
মুজিবনগর সরকারের সদর দফতরের ছোট মাঠে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে ঈদুল-ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে মুজিবনগরে খুব ঘটা করে ঈদুল-ফিতর উদ্যাপনের ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে মুসলিম দেশগুলোর কাছে ফ্যাসিস্ট পাকিস্তানিদের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি দূর করার জন্যে। ইতিহাসের জঘন্যতম নািস
হিটলার, গোয়েবলসদের ঘৃণ্যতম উত্তরাধিকার পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অপপ্রচারে বিভ্রান্ত মুসলিম দেশগুলোর বিভ্রান্তি ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সৃষ্ট ভুল ধারণা মোচন করে তাদেরকে জানিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের এই মুক্তিযুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে বিধর্মীদের যুদ্ধ নয়। এটা স্বাধীনতাকামী একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই। বরং যারা একটি জাতির উপর তাদের শাসন-শোষণ-নিপীড়ন অব্যাহত রাখার হাতিয়ার হিসেবে পবিত্র ধর্মকে ব্যবহার করছে, প্রকৃতপক্ষে তারা হচ্ছে ধর্ম বা ইসলামবিরোধী। আল্লাহর পবিত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা নির্বিচারে গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও লুটপাট করছে, আগুন দিয়ে জনপদ পুড়িয়ে দিচ্ছে, পবিত্র ধর্মের উপর কালিমা লেপন করছে। তারা আসলে ধর্মের ছদ্মাবরণে ঢাকা ঘৃণ্য ফ্যাসিস্ট শক্তি। ধর্মের দুশমন, মানবতার দুশমন এই ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধেই আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধ। এটাকেই প্রকৃত অর্থে সত্যিকারের জেহাদ বলা যেতে পারে। এজন্যে আগে থেকেই স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের দখলকৃত মুক্ত এলাকায় ঘটা করে ঈদুল-ফিতর উদ্যাপনের ব্যাপক আয়োজনের খবর ফলাওভাবে প্রচার করা হয়েছিল। ... ঈদুল-ফিতরের জামাত পরিচালনা করেছিলেন মওলানা দেলোয়ার হোসেন। বাংলাদেশের ভোলা নিবাসী এই মওলানা আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের খুব ভক্ত ছিলেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কুরআন পাঠ এবং কুরআনের তাফসির করতেন। ...
ঈদুল-ফিতরের নামায আদায়ের পর যথারীতি ঈদের কোলাকুলি হলো। ঈদ মোবারক বিনিময় হলো। সব আনুষ্ঠানিকতাই হলো। কিন্তু ঈদুল-ফিতর উপলক্ষে সেমাই, পোলাও, গোশত খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এ জন্যে আমরা সবাই মনমরা হয়ে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে আমার জীবনে কোনোদিন এমন নিরানন্দের ঈদ হয়নি। তবে সকালের দিকে আমাদের ব্যারাকে মানের সেমাই রান্না করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী রহমত আলী, ঢাকার শাহাবুদ্দীন এবং আমি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে হাজির হলাম ঈদের দিনের ভালো খাবারের প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু হায়। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে ঈদের কোনো আমেজই পাইনি। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নিজেই ঈদের কোনো খাবার পাননি। প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব খুবই শীতল। ঈদের দিনে আমাদেরকে আপ্যায়ন করার কোনো উদ্যোগ ছিল না এবং অপারগতার জন্যে তাঁর মধ্যে কোনো অনুশোচনার ভাবও ছিল না। আমি নিজে ব্যথিত হয়েছিলাম, খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী রহমত আলীও খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন। শুধু ঈদের কোলাকুলিতে পেট ভরবে না। ঈদের এই আনন্দের দিনেও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের দফতরের পাষাণ নীরবতা ভঙ্গ করার সাহস আমার ছিল না। হিমালয়ের মতো স্তব্ধতা নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বসেছিলেন।
তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে রহমত আলী আমাকে বললেন, চলুন তাজউদ্দীন সাহেবের বাসায় যাই। বেগম জোহরা তাজউদ্দীন খুব ভালো রাঁধুনী। ওখানে নিশ্চয়ই ঈদের পর্যাপ্ত খাবার তৈরি করা হয়েছে।
সিআইটি রোডের ওই বাসায় তাজউদ্দীন সাহেবের বৌ-ছেলেমেয়ে ছাড়াও তাজউদ্দীন সাহেবের পাতানো মামা, বর্তমান গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানার জামালপুরের আফতাব উদ্দীন, রহমত আলীর শ্যালক থাকেন। রহমত আলী সাহেবের সঙ্গে দুপুরের পর তাজউদ্দীন সাহেবের সিআইটি রোডের বাসায় গেলাম। হায় পোড়া কপাল। ঈদের আনন্দ! কোনো আয়োজন ওই বাসায় একবার উঁকিও দেয়নি নীরব নিস্তব্ধতার পাষাণপুরীতে। রহমত আলী ও আমি একই সঙ্গে ভাবী বলে ডাক দিয়ে বেগম জোহরা তাজউদ্দীনের কাছ থেকে ঈদের এমন আনন্দের দিনে কোনো সাড়াটুকু পাইনি।
জ্বরে পুড়ে যাওয়া একমাত্র ছেলের শিয়রে বসা নির্বাক বেগম জোহরা তাজউদ্দীনের দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাসায়
চুলোয় হাঁড়ি পর্যন্ত চড়েনি। পাশের ঘরে তাজউদ্দীন সাহেবের বিত্তবান অথচ কঞ্জুস মামা, তিনি আমাদেরও সকলের কমন মামা, আফতাবউদ্দীন, রহমত আলীর শ্যালক রতন, সবার মুখ কালো। কারো পেটে খাবার পড়েনি। সবাই উপোস। শুনলাম, ঈদের দিনও তাজউদ্দীন সাহেব একবারের জন্যেও বাসায় আসেননি। ঈদের দিন বাসায় খাবারের কী আয়োজন আছে কিংবা নেই, কী রান্না হবে, ছেলেমেয়েরা খেয়েছে কিনা, স্বাধীন বাংলার বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিমশীতল তাজউদ্দীন আহমদ এসব চিন্তাভাবনার সঙ্গে একটিবারও নিজেকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তাটুকু পর্যন্ত অনুভব করেননি। তাঁর অফিস থেকে বাসায় একটিবার টেলিফোন করে খোঁজ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা পর্যন্ত অনুভব করেননি। এটা কি তবে তাজউদ্দীন সাহেবের অভিমান? এ প্রশ্ন কাকে করবো? সিআইটি রোডের একই বহুতল ভবনের অন্য ফ্লাটে সপরিবারে বসবাসরত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক ও অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাসা থেকে ঈদের দিনের কিছু মিষ্টিজাত খাবার তাজউদ্দীন সাহেবের বাসায় পাঠানো হয়েছিল। ছেলেমেয়েরা এবং রতন ও আফতাব মামা সেসব খাবার ভাগ করে খেয়ে নীরব হয়ে শুয়ে রয়েছে। রহমত আলীর শ্যালক রতন জানায়, ভাবী পর্যন্ত কোনো দানাপানি মুখে দেননি। এরকম হলো কেন কিংবা এমন কী হয়েছে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার মতো পরিবেশ পর্যন্ত ছিল না। কতক্ষণ অপেক্ষা করার পর শেষে আমরা নীরবে চলে যাওয়ার সময় ভাবী কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাদের দেখে বললেন, রহমত আলী, নজরুল, গতরাত থেকে ছেলেটির ভয়ানক জ্বর। সে কিছুই খাচ্ছে না। আপনাদের ভাই বাসার কোনো খোঁজ-খবরই নিচ্ছেন না। বাসায় কোনোদিনই আসেন না। আমরা কী খাই না খাই, কোনো কিছুরই খবর নিচ্ছেন না। আপনাদের ভাইকে বলবেন যেন বাসায় আসেন। তিনি না আসতে চাইলে আপনারা তাকে নিয়ে আসবেন।...
ঈদুল-ফিতরের দিন ভারত কিংবা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দফতরের লোকজনদের জন্যে বিভিন্ন ফলমূল ও মিষ্টিসহ প্রচুর শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছিল। তাজউদ্দীন সাহেব কোনো কিছুই স্পর্শ করেননি। সবই অফিসের লোকজনদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। একদিকে বাসায় ভাবীর অবস্থা অন্যদিকে বাসা ও ভাবীর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবের এই নির্লিপ্ততায় আমি ও রহমত আলী ভীষণভাবে ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলাম। তবে অন্য কারো সঙ্গে এসব নিয়ে কোনো আলোচনা করিনি।
ঈদের দিন সারাদিন অভুক্ত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশের মুক্ত এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন। খুবই গোপনে তার আয়োজন লক্ষ করলাম। কিন্তু কারো কোনো কিছু বোঝার উপায় ছিল না। আমি কিছুটা আভাস পেয়েছিলাম জেনারেল ওসমানীর এডিসি ও আর্মি সিগন্যাল কোরের মেজর বাহার সাহেবের সূত্রে। তারাও সব খুলে বলেননি। ক্যাপ্টেন নূর আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন ফটোগ্রাফার, ক্যামেরা, ফিল্ম এসব ঠিক আছে কিনা। রাতে এসব কাজে লাগতে পারে। পিএম রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে যেতে পারেন।
রহমত আলী সাহেব এ খবর জেনেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীদের সূত্রে। আশ্চর্যের ব্যাপার, তাজউদ্দীন আহমদ সারাদিনের মধ্যে, এমনকি সন্ধ্যার পরও তাঁর একান্ত বিশ্বস্ত ও রাজনৈতিক সহকারী, প্রধানমন্ত্রীর অনেক গোপন রাজনৈতিক বার্তাবাহক রহমত আলী সাহেবের কাছেও একটিবার বলেননি যে ঈদের দিন রাতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন। তাঁর সঙ্গে ফটোগ্রাফার যেতে হবে। এসব ঠিক করে রাখতে হবে, এ কথাটি আমাকে পর্যন্ত একটিবার বলেননি। ক্যাপ্টেন নূরের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে আমি নিজ উদ্যোগে মুক্তিবাহিনীর সদর দফতরের ফটোগ্রাফার সুজিত রায়কে সব ঠিক রাখতে এবং এসব নিয়ে রাতে আমার দফতরে হাজির থাকতে বলে রেখেছিলাম। ফটোগ্রাফার মুক্তিযোদ্ধা সুজিত আরও কিছু ফিল্ম রোল কিনে অতন্দ্র প্রহরীর মতো প্রস্তুত হয়ে রইলেন। ঈদের দিন রাত প্রায় ১০টার পর প্রধানমন্ত্রীর সদর দফতরের লোকজন সব চলে যাওয়ার পর রহমত আলীকে জানানো হয় যে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বাংলাদেশের মুক্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ফিল্ড হাসপাতাল পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রহমত আলী ও আমাকে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে গোপনে জানালেন, আমরা যেন প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে ঘোরাফিরা না করে নিজ অফিসে অবস্থান করি। সময় হলে আমাদেরকে তিনি এসে ডেকে নিয়ে যাবেন।
দেশকে পাকিস্তানি বাহিনীমুক্ত করার জন্যে যুদ্ধরত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর একজন পদস্থ বাঙালি অফিসার। তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সব সময়ই তটস্থ ও ব্যস্ত থাকতেন। স্বভাবগত স্বল্পভাষী এই সিকিউরিটি অফিসার রাত প্রায় বারোটায় এসে আমাকে নিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রীর দফতর কলকাতার আট নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়িতে। বাড়িটিতে তখন গভীর নীরবতা। সবাই গভীর নিদ্রায় বিভোর। কেবল আমরা কয়েকজন প্রাণী সজাগ। আমরা তখন নির্বাক। আমাদের কথা বলার শব্দে রাতের এ স্তব্ধতা ভঙ্গ এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, এ ভয়ে আমাদের মুখ নিজেরাই যেন তালাবদ্ধ করে রেখেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বাইরের রাস্তায় অপেক্ষারত ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর একটি পুরো কনভয়। কনভয়ের সম্মুখভাগে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সিগন্যাল জিপ। ওয়্যারলেস সেট সজ্জিত এই সিগন্যাল জিপ প্রধানমন্ত্রীর বহরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। আমি ফটোগ্রাফার সুজিতকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্যে নির্ধারিত একটি গাড়ির পেছনের একটি সামরিক জিপে গিয়ে উঠলাম। এর পরই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর প্রহরাবেষ্টিত হয়ে তাঁর জন্যে নির্ধারিত গাড়িতে গিয়ে উঠলেন।
বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী রহমত আলী প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে উঠলেন। গাড়িতে প্রধানমন্ত্রীকে মাঝে রেখে এক পাশে রহমত আলী এবং অন্য পাশে দেহরক্ষী সিকিউরিটি অফিসার। সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে আমি বসা। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে থেকে গাড়ি আস্তে আস্তে বের হয়ে রাস্তায় নামলো। জনমানব শূন্য নীরব-নিথর কলকাতা মহানগরীর রাজপথ। রাত বোধ হয় তখন সাড়ে বারোটা।...
সিআইটি রোডে কনভয় এগিয়ে যাওয়ার সময় সেই বহুতল ভবনের সন্নিকটবর্তী হলে তাঁর পাশে নিরাপত্তা অফিসার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, স্যার বাসায় নামবেন কি? গাড়ি থামাব?
খুব ছোট করে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী, নো।
কৌতূহলভরা দৃষ্টি দিয়ে নিশীথের কলকাতা মহানগরীকে দেখেছিলাম চলন্ত গাড়িতে বসে। কিন্তু কান ছিল উত্কর্ণ। এ পাষণ্ডতা দেখে বিস্মিত এবং ব্যথিত হয়েছিলাম। অলক্ষে অন্তরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আমার শীতল হয়ে আসছিল। কিন্তু কিছু বলতে সাহস পাইনি তবে সারাটা পথ আমার অনুভূতি ব্যাথায় টনটন করছিল। নিশীথের কলকাতার রূপ দেখার নেশা আমার নিস্তেজ হয়ে গেল। তাজউদ্দীন সাহেব কি মানুষ না অন্য কিছু? তাঁর কি হূদয় ও মন বলতে কিছু আছে? সারাটা পথে কেবল মনের মধ্যে এ প্রশ্নই বারবার গুমরে উঠছিল।...
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন পরম শ্রদ্ধাভরে আনন্দাশ্রু মিশ্রিত এক আবেগ-আপ্লুত অনুভূতি নিয়ে পা রাখলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। বাংলার মাটির পবিত্র পরশে জীবন আমার ধন্য হয়ে গেল। সামনেই আমবাগানের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। মিটমিট করে হারিকেন জ্বলছে। ক্যাম্পের অফিসার এসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে অভ্যর্থনা জানালেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কোনো প্রটোকলের ধার ধারলেন না। বুকে জড়িয়ে ধরলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে। তারপর ক্যাম্পের ভেতর গিয়ে একজন একজন করে অফিসার ও মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলেন। তাদের সঙ্গে বুকে বুক মিলালেন। আমাদের সকলের চোখে আনন্দাশ্রু। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পরনে পায়জামা, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। চোখে সেই কালো মোটা ফ্রেমের স্বচ্ছ চশমা। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গভীর রাতে এই কোলাকুলির ছবি তোলার জন্যে ক্যামেরাম্যান সুজিত ক্যামেরার সুইচ টিপে দিলে ফ্লাশগানের ঝলসানো আলোতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের দুচোখের চিকচিক করে ওঠা অশ্রু কারো দৃষ্টি এড়ায়নি। প্রধানমন্ত্রী রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন। আমরা কেউ চোখের অশ্রু সংবরণ করে রাখতে পারিনি। রাখার জন্যে চেষ্টাও করিনি।
এটা ছিল কুষ্টিয়া জেলার একটি মুক্ত সীমান্ত এলাকা। ঘন আমবাগানে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। জায়গাটার নাম আমাদেরকে বলা হয়নি। জানতেও চাইনি। জানতে চাইলে সন্দেহ জাগতে পারে। তাই কারো কাছে জিজ্ঞেসও করিনি। প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে নাতিদীর্ঘ একটি ভাষণ রাখলেন। তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলেন। বললেন, সুবিধার কথা ভুলে গেছি কী কী অসুবিধায় আছেন জানতে এবং দেখতে এসেছি। আজ আনন্দ নয়, আপনাদের সঙ্গে একান্ত হয়ে মাতৃভূমি উদ্ধার করার শপথ নিতে এসেছি। এসেছি বাংলার ধূলি গায়ে মেখে নিতে, যেন এই অঙ্গীকার জীবন বেঁচে থাকতে না ভুলি।
রুমাল দিয়ে অশ্রু মুছতে মুছতে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বললেন, হানাদার বাহিনী দখলীকৃত বাংলাদেশের ঘরে আমাদের মা-বোনদের জীবনে আজ ঈদ নেই, ঈদের আনন্দ নেই। বাংলার ঘরে ঘরে আজ ভয়ভীতি, হতাশা, কান্নার রোল। পবিত্র ঈদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে নিষ্ঠুর হানাদার বাহিনী। বাংলার প্রতি ইঞ্চি মাটি থেকে এই দস্যুদের উত্খাত করে আমরা মুক্ত বাংলায় ঈদ করবো ইনশাল্লাহ।
ভারতীয় নিরাপত্তা অফিসার তাড়া করলেন। বললেন, মধ্যরাত প্রায় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। প্রভাত হয়ে গেলে কলকাতায় যাওয়া যাবে না। রাতে রাতেই কলকাতায় ফিরে যেতে হবে।
ঈদ উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে কিছু সেমাই রান্না করা হয়েছিল। তাই এনে দেয়া হলো প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সঙ্গীদেরকে। আমরা খেয়ে নিলাম। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন মিষ্টিজাতীয় কোনো খাবার খেতেন না। তবু কিছু মুখে দিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর বহরের এক গাড়িতে করে কিছু ফলমূল, বিস্কুট ও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী এসব খাদ্যদ্রব্য মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করলেন এবং সারাদিনের মধ্যে এই কিছু মুখে দিলেন। ঈদের দিন কলকাতায় সারাদিন বহু অনুরোধ করেও কিছুই খাওয়ানো যায়নি তাঁকে। তিনি বললেন, আমার মুক্তিযোদ্ধারা কেউ খেতে পায়নি। নিজ জীবনকে বিপন্ন করে ট্রিগার হাতে কোথায় কোন জঙ্গলে বসে রয়েছে। খাওয়ার চিন্তা করার সময় কই তাঁর? ঈদের দিনের কথা তো তাঁর মনেই নেই। বনের অজানা অখ্যাত গাছের কিছু লতাপাতা ও ফুল
মিলিয়ে মালা গেঁথে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে দেয়া হয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে।
সত্তরের নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনী বিজয়ের পরে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের মাল্যদানের হিড়িক দেখতে দেখতে মাল্যদানের প্রতি মন আমার আগে থেকেই বিতৃষ্ণ হয়ে গিয়েছিলো। তাই তাঁকে যখন এই গভীর রাতে বন-জঙ্গলের মধ্যেও জীবন-মরণের এক ক্রান্তিলগ্নে কোথাকার অজানা, অজ্ঞাত অখ্যাত গাছের ফুলের মালা দেয়া হয়, তখন খুবই বিরক্তবোধ করছিলাম। এক তো চোখে ঘুম নেই, তার উপর দীর্ঘ ভ্রমণজনিত কিছু ক্লান্তি। বলতে গেলে সবারই মধ্যে যেন একটা অবজ্ঞা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভাব। তাজউদ্দীন সাহেব এটা লক্ষ করছিলেন। কিন্তু আমাদের সবার বিরক্তি ভারাক্রান্ত অনুভূতিকে অচিন্তনীয় আবেগ অশ্রুতে ভাসিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, মালা আমি নিই না, মালা পাবেন বঙ্গবন্ধু। তবু আজকের এ রাতের মালা আমি নেবো। বাংলার বনবাদাড়ের গাছগাছড়ার ফুল দিয়ে তৈরি এ মালা আমি নেবো। আজ যদি আমার মরণ হয়, অন্তত এ সান্ত্বনাটুকু নিয়ে আমি মরতে পারবো যে, মুক্ত বাংলার মাটিতে জন্ম একটি গাছের ফুলের মালা গলায় নিয়ে আমি মরতে পারলাম। আবেগে অশ্রুতে দু’চোখ আমার ছলছল হয়ে উঠেছিল।
এরপর পাশাপাশি আরো কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প পরিদর্শন করে এবং তাদের সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে আমরা রওনা হলাম কলকাতার পথে। প্রধানমন্ত্রী ফলমূলসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, কম্বল, বিছানার চাদর, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি বিতরণ করেন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। ফেরার পথে ভারতীয় সীমানার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সার জন্যে স্থাপিত একটি ফিল্ড হাসপাতালে গেলেন প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখার জন্যে। হাসপাতালের বেডে বেডে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালের ভারতীয় চিকিত্সকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আহতদের চিকিত্সা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনি কাপড়-চোপড় বিতরণ করেন। যুদ্ধাহতদের তিনি সান্ত্বনা দেন। তাদের বাড়িঘরের ঠিকানা নেন। তিনি আশ্বাস দেন যে তাদের এই রক্তদান কিছুতেই ব্যর্থ হবে না। যে কোনো মূল্যেই হোক বাংলাদেশ স্বাধীন করা হবে। হানাদার বাহিনীর একটি সৈনিক বাংলার মাটিতে থাকা পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণ করবে না।...’
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শব্দসৈনিক এম আর আখতার মুকুল তাঁর ‘মুজিবনগরে ঈদ’ প্রবন্ধে লিখেছেন—
‘একাত্তরের নভেম্বর মাস। সেই মুজিবনগর আর অধিকৃত বাংলাদেশে এলো পবিত্র রমযানের কঠোর সিয়াম সাধনা। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর বাণীতে বললেন, ‘‘গত বছরের রমযান মাসে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এক প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করেছে। প্রকৃতির তাণ্ডবে সেবার এখানে সংঘটিত হয়েছে এক ব্যাপক ধবংসযজ্ঞ, বিপুল সংখ্যক মানুষের আকস্মিক মৃত্যু। আর এবারের রমযানে আমরা সাত মাস আগে সূচিত এক আক্রমণের বিরুদ্ধে বিরামহীন পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা করেছি... জীবনের তাগিদে আমরা সেবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছিলাম।... আর এবারের জাতীয় জীবনের তথা বাংলাদেশ ও বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে আমাদের দেশকে শত্রুমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর।’’
পবিত্র রমজানের শেষে মুজিবনগরে আর কলকাতাতেও ঈদ এলো।... দুপুরে পুরো ফ্যামিলি নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে দাওয়াত খেতে এলাম। অনেক দিন পরে ভালো খাওয়ার আশায় সবাই হৈ চৈ করছে। শুনলাম বিএসএফ-এর সব ক’জনা ঠাকুরকে ছুটি দেয়া হয়েছে। এই সত্তর-আশিজনের খাবার অ্যাডভোকেট আশরাফ সাহেবের শ্বশুর বাড়ি থেকে আসবে। আশরাফ সাহেবের বাড়ি ঢাকার গ্রামাঞ্চলে। খুবই হাসি-খুশি মানুষ আর বাড়ির অবস্থা সচ্ছল। সক্রিয় রাজনীতিতে বিশেষ জড়িত ছিলেন না। কিন্তু সত্তরের নির্বাচনী ডামাডোলে আওয়ামী লীগের টিকেটে পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাই সপরিবারে মুজিবনগরে হিজরত করতে হয়েছে। এখানেও তাঁর বিশেষ অসুবিধা নেই। বহু বছর পরে শ্বশুর বাড়ি এসেছেন। দিব্বি বুড়ো বয়সে জামাই আদর ভোগ করছেন আর মিসেস আশরাফ অবস্থাপন্ন বাপের বাড়ি আসতে পেরে খুশিই হয়েছেন। অ্যাডভোকেট আশরাফ প্রায়ই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এসে আমাদের খোঁজখবর করতেন। খাওয়া-দাওয়ার অবস্থা বিশেষ ভালো নয় দেখে ঈদের দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তবে কাউকে কষ্ট করে তাঁর শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে না। রান্না করা পোলাও, কোর্মা, গরুর মাংসের ভুনা আর ফিরনী এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেই রিবেশন করা হবে।
দুুপুর নাগাদ বড় বড় ডেকচি করে রান্না করা খাবার এসে হাজির হলো। সবাই তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েও শেষ করতে পারলেন না। তাই বাকি খাবার রাতের জন্য রাখা হলো।’

অবরুদ্ধ ঢাকায় ঈদ
২০ নভেম্বর ১৯৭১ সালে ঈদের দিন সারাদেশের মতো ঢাকাও ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে। জুলাই- আগস্ট মাসে ঢাকায়
মুক্তিযোদ্ধারা বেশ কয়েকটি গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার দোসর শান্তি বাহিনী, রাজাকার, আলবদর, আল শামস-রা ঢাকায় গেরিলাদের অবস্থানরত বাড়িগুলো ঘেরাও করে বেশ কয়েকজন গেরিলাকে ধরে নিয়ে যায়। ৩০ আগস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে জাহানারা ইমামের সন্তান রুমীসহ বেশ কয়েকজন দেশপ্রেমিক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ে। এর মধ্যেও অনেকগুলো গ্রুপ প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা ও তার আশপাশে গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করতো। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই ঢাকার সচেতন জনগণের কাছে গেরিলাদের ফোটানো গুলি, বোমার আওয়াজ ছিল সবচেয়ে প্রতীক্ষিত। অপরদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দালাল দোসররাও রাজধানী ঢাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে এক মিশ্র অনুভূতি অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য কামনায় অবরুদ্ধ ঢাকার জনগণ ঈদ উদ্যাপন করেছিল। সন্তান রুমী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আটকের পরেও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম প্রতীক্ষা করছিলেন তাঁর সন্তানের গেরিলা বন্ধুদের। জাহানারা ইমাম তাঁর বিখ্যাত ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে ঈদের দিন সম্পর্কে লিখেছেন—
‘আজ ঈদ। ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারো জামা-কাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালার পর্দা কাচা হয়নি, ঘরের ঝুল ঝাড়া হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামী ঈদের নামাযও পড়তে যায়নি। কিন্তু আমি (জাহানারা ইমাম) ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপি চুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য এক শিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।’
অবরুদ্ধ ঢাকায় ঈদের সময় অবস্থান করছিলেন শিল্পী হাশেম খান। তিনি ‘২০ নভেম্বর ১৯৭১’—শিরোনামে একটি লেখায় সেদিনের স্মৃতিচারণ করেছেন। হাশেম খান লিখেছেন—
‘আজ ঈদ। আনন্দের দিন, উত্সবের দিন। কিন্তু কী আনন্দ করবো এবার আমরা? নতুন জামা কাপড় বা পোশাক কেনা-কাটার আগ্রহ নেই! শিশু-কিশোরদের কোনো আবদার নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই। বাড়িতে বাড়িতে কি পোলাও কোরমা ফিরনী সেমাই রান্না হবে? আমার বাড়িতে তো এসবের কোনো আয়োজন হয়নি। প্রতিটি বাঙালির বাড়িতে এরকমই তো অবস্থা।...
তিন তলার বারান্দা থেকে আরামবাগের শুরু ও ফকিরাপুল বাজারের মাঝামাঝি অবস্থানে মসজিদটি দেখা যায়। সকাল ৮টা থেকে মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে সাড়ে নয়টায় নামায হবে। যথাসময়ে মসজিদে গিয়ে হাজির হলাম। নামায হল, খুত্বা হল, মোনাজাতও হল। খুত্বা ও মোনাজাতে ইমাম সাহেব পাকিস্তানের কল্যাণ কামনা করে এবং পাক সেনাবাহিনীর গুণকীর্তন করে দোয়া চাইলেন খোদার কাছে।
ইমাম সাহেব হয়তো রাজাকার ও পাকসেনাদের দালালদের শোনানোর জন্যেই অত জোরে শব্দ করে মোনাজাত জানাচ্ছেন, আল্লাহর কাছে কাঁদছেন, তাতে তার অন্তরের সায় কতখানি ছিল জানি না। তবে বাঙালি মুসল্লি কেউই যে ইমামের মোনাজাত কর্ণপাতও করেনি তা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সবাই বিড় বিড় করে নিজের মোনাজাত করেছে—খোদা, হানাদার আর হিংস্র পশু পাকনোদের কবল থেকে তোমার নিরীহ বান্দা বাঙালিদের বাঁচাও, মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা কর। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যোগাও তারা যেন পশুদের তাড়িয়ে আমাদের দেশকে মুক্ত করতে পারে।’

রণাঙ্গনের পত্রিকায় ঈদ
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে কলকাতা ও রণাঙ্গন থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকাসমূহ। এ সকল পত্রিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, সারাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হতো। স্বাভাবিভাবেই ঈদের আয়োজনেও পত্রিকাসমূহ সেই ভূমিকাই পালন করেছে। রণাঙ্গন থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় ঈদ নিয়ে বাংলার জনগণের আকাঙ্ক্ষাই বেরিয়ে এসেছে। পত্রিকাসমূহ ঈদ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। রণাঙ্গন থেকে প্রকাশিত ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ পত্রিকায় ‘রক্তমত্ত বাংলাদেশ—ঈদের চাঁদ রক্তের সমুদ্রে, এবারের ঈদ রক্ততিলক শপথের দিন’—শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেই সম্পাদকীয়তে লেখা হয়—
‘অনেক স্মৃতির স্বাক্ষর নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে গেল একটা বছর। এল আবার ঈদ। এল খুশীর ঈদ। আনন্দের ঈদ। মিলনের ঈদ। একটা মাসের সংযমের অগ্নিপরীক্ষার পর আসে আমাদের জীবনে এই পবিত্র দিনটি; তাই পবিত্র দিনটিকে আমরা স্বাগত জানাই পবিত্র মনে।
প্রতি বছরের মত এবারও বাংলাদেশে ঈদ এসেছে। কিন্তু আসেনি
আনন্দ। ওঠেনি খুশীর ঢেউ। বাজেনি মিলনের বাঁশী। বাংলাদেশে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে শতশিখা বিস্তার করে। বাংলার তরুণ শক্তি যে আজ দুর্বার দুর্জয় স্বৈরাচার আর শোষণের বিরুদ্ধে।
বাংলার দামাল ছেলেগুলো আজ ঘরছাড়া। আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে বন থেকে বনান্তরে অস্ত্র হাতে ঘুরছে শত্রু হননের প্রতিজ্ঞা নিয়ে। তাইতো বাংলাদেশে এবার খুশীর বান ডাকেনি। এবারে বাংলার তরুণ শক্তির প্রতিজ্ঞা, যে চাঁদ রক্তের সমুদ্রে হারিয়ে গেছে সে চাঁদকে মু্ক্ত করে তবেই তারা ঈদের উত্সব পালন করবে। তাই আজকের এই দিন শপথের দিন। আজ বাংলাদেশের মায়ের চোখে অশ্রু। বোনের চোখে অশ্রু। বাবার চোখে অশ্রু। এবারের ঈদে বাংলাদেশের মায়ের পাশে ছেলে নেই। পিতার পাশে সন্তান নেই। বোনের পাশে ভাই নেই। আজকে মা-বাবার আদরের সন্তান, বোনের স্নেহের ভাই প্রতিবাদের রণাঙ্গনে। তাই বাংলার মা-বাবা আর বোনের ঈদের জামাতে খোদার কাছে প্রার্থনা হবে, হে খোদা, যারা ১৫ লক্ষ মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে তাদের বিচার করো। বাংলাকে মুক্ত করো আর যারা বাংলার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে তাদের আশীর্বাদ করো। সেই হবে এবারের ঈদের প্রার্থনা।’
রণাঙ্গন থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার মুখ’ পত্রিকার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল—‘এবারের ঈদ’। সম্পাদকীয়তে লেখা হয়—
‘বাংলার আকাশে এবারেও শাওয়ালের চাঁদ দেখা দিয়েছে। আত্মবিশ্বাসের বলিষ্ঠতা, সংগ্রামের দৃঢ়তায় সাড়ে সাত কোটি নাগরিক অধ্যুষিত বাঙ্গালী জাতি তাদের ভাগ্যের ইতিহাসের এক করুণ ও সঙ্কটময় মুহূর্তে সেই শাওয়ালের চাঁদকে স্বাগতম জানিয়েছেন। রমজানের পূর্ণ কৃচ্ছ সাধনার পর গত শনিবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উদ্যাপন করলেন। বাংলার ঘরে ঘরে এবারের শারদোত্সব যেভাবে পালিত হয়েছে, ঈদ-উল-ফিতরও সেভাবেই পালিত হয়েছে। ঈদ আনন্দের হলেও, বছরের একটি পুণ্যোত্সব হলেও এবার হয়েছে ত্যাগের, উত্সবের নয়। শারদোত্সবে যেমন এবার বুড়িগঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা-যমুনার বুকে বাজনা বাজেনি, বিচিত্র বেশে নারী-পুরুষ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নামেনি মিছিল করে তেমনি এই ঈদে ঘরে ঘরে আনন্দের ঢেউ খেলেনি, নতুন পোশাকে নামেনি রাস্তায়, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যায়নি উন্মুক্ত খুশীর মন নিয়ে। বাংলার বুকে বর্বর ইয়াহিয়ার ফ্যাসিবাদী চক্র যে অত্যাচার, যে নির্যাতন, যে করুণ মর্মবিদারক পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে তা সব আনন্দকে সব আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিস্যাত্ করে দিয়েছে। বাংলার বুকে আজ এমন কোনো ঘর নাই যার স্বজন হারানোর শোক নাই। কি পরোক্ষ, কি প্রত্যক্ষ শোকে শোকে আজ তারা এমন হয়েছেন যে, অত্যাচার নির্মম নগ্ন পাশবিকতার শিকারে পরিণত হয়ে বাংলার প্রতিটি নারী-পুরুষ দুর্জয় শপথে স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি রক্তের ফোঁটা, মাতৃভূমির মান রক্ষায়, সার্বিক অস্তিত্ব রক্ষায় উত্সর্গীকৃত। অতএব ঈদের উত্সবের জন্যে তাদের স্বাভাবিক অনুভূতিও এর সাথে সাথে বিলীন। তারা ইতিহাসের এমন চরম মুহূর্তে বিশ্বের বুকে নিজেদের প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে আত্মবলিদানরত।
শুধু এবারের ঈদই নয়। বিগত সালের ১২ই নভেম্বর বাংলার বুকে যে ভয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছিল যার ফলে ২০ লাখেরও বেশি নর-নারী বাংলার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন?? হয়েছেন, এক বিস্তীর্ণ জনপদ ধূলিস্যাত্ হয়েছে তার ফলে সেবারও বাংলার মানুষ রমজানের ঈদের পবিত্র সুখ, আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি। স্বজন হারানোর শোকে তখন তারা ছিল মুহ্যমান।
বাংলার মানুষ আজ যে মহান ত্যাগ ব্রতে উদ্বুদ্ধ, দেশকে হানাদার জল্লাদ বাহিনীর কবলমুক্ত করার কাজে হাসিমুখে কোরবান দিচ্ছেন তারই মধ্যে তারা এবারের ঈদের স্বরূপ খোঁজার চেষ্টা করছেন। আকাশে অশ্রু ও কুয়াশামুক্ত খুশীর রোশনাই ছড়িয়ে শাওয়ালের চাঁদের অপেক্ষায় বাংলার বীর সিংহশাবকরা কাজ করছেন, দেশকে মুক্ত করে সে চাঁদের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন আর এক আনন্দ পুলকে দোলায়িত হচ্ছেন এই ভেবে যে, লৌহ শপথ বাস্তবায়িত হলেই তাঁরা ঈদ করবেন। নিজেদের মধ্যে নয়, দুনিয়ার স্বাধীনতাপ্রিয় সংগ্রামী প্রতিটি মানুষের সাথেই তাঁরা ঈদের সত্যিকার আনন্দ আর শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। নিঃস্বার্থভাবে সেই কাজে নিজেদের নিয়োগ করার শক্তি দেয়ার জন্যে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ পরম করুণাময়ের কাছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে হাত উঠিয়ে প্রার্থনা জানিয়েছেন। এই প্রার্থনা, এই মোনাজাত হয়েছে ভাঙ্গা মসজিদে, উন্মুক্ত ময়দানে, শরণার্থী ক্যাম্পে,
হাসপাতালে, গীর্জায়, মন্দিরে সর্বত্র। ছিন্ন বস্ত্রে, কঙ্কালসার দেহে, উন্মুক্ত হূদয়ের এই মোনাজাত বিশ্ব বিধাতার কাছে, মানবতার কাছে, স্বাধীনতাপ্রিয় প্রতিটি বিশ্বাসীর কাছে।
তাই ঈদের সাথে সাথে লক্ষণীয় বিষয় যে, স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত বঙ্গশার্দুলরা হানাদার পাক- দস্যুদের অধ্যুষিত এলাকায় দ্রুতগতিতে নিধন করে চলেছেন একের পর এক।
বিভিন্ন রণাঙ্গন হানাদার বাহিনী মুক্ত হচ্ছে। বাংলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা খুব শীঘ্রই জলে, স্থলে, আকাশে হানাদার দস্যুদের নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। এই হলো বাংলাদেশ সরকারের দুর্জয় বলিষ্ঠ শপথ। ঢাকার পতন আসন্ন। চূড়ান্ত বিজয় একান্ত নিকটতর।
বাংলার প্রতিটি নারী-পুরুষ জল্লাদমুক্ত, অবাঞ্ছিত অবস্থা থেকে মুক্ত এক স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে সুখে শান্তিতে বসবাস করবেন—এই হোক তাদের চরমতম ও দুর্জয় বলিষ্ঠ শপথ।’
এভাবে রণাঙ্গনের প্রতিটি সংবাদপত্রই ঈদকে মূল্যায়ন করেছে। ঈদ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে সার্বিকভাবে তুলে ধরেছে রণাঙ্গনের পত্রিকাগুলো।

রণাঙ্গনে ঈদ
সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থান রণাঙ্গন। সারাদেশের নিপীড়িত নির্যাতিত জনগণ গভীর প্রত্যাশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাকিয়ে ছিল রণাঙ্গনের দিকে। রণাঙ্গনগুলোতেও সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা চালিয়ে গেছেন তাদের যুদ্ধ। বলা যায় একজন যোদ্ধা কখনো তার রণাঙ্গনকে ভুলতে পারে না। হাসি-কান্না সকল কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে তার রণাঙ্গন। মুক্তিযুদ্ধের সেই গৌরবোজ্জ্বল দুঃসহ দিনগুলোতে রণাঙ্গনে রচিত হয়েছে অসংখ্য ইতিহাস। ঈদের দিনে সারাদেশে যুদ্ধের মধ্যে শাহাদাত্ বরণ করেছেন অসংখ্য যোদ্ধা। ঈদের এই দিনে ভুরুঙ্গমারী রণাঙ্গনে সম্মুখ যুদ্ধে শাহাদাত্ বরণ করেন বীর উত্তম লে. আশফাকুস সামাদ। এই যুদ্ধের জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাব লাভ করেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের যুদ্ধ। আর তাই এ যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন সকল ধর্ম-সমপ্রদায়ের মানুষ। আমরা ইসলামের ইতিহাসে দেখতে পাই, মহানবি রাসুল (সা.) মদিনা রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠা করেন, সেখানে তিনি অবস্থানরত জাতি-গোষ্ঠীকে নিয়ে যে চুক্তি করেছিলেন সেটি ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ নামে বিখ্যাত। সে মদিনা সনদে উল্লেখ ছিল, মদিনার নিরাপত্তা রক্ষায় অবস্থানরত সকল ধর্ম-সমপ্রদায় একযোগে যুদ্ধ করবেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মদিনা সনদের এই ধারার পরিপূর্ণ দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অসামপ্রদায়িকতার মূর্ত উদাহরণ রচিত হয়েছে। আমরা রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সকলের লেখাতেই এর দৃষ্টান্ত পেয়ে থাকি। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা যুদ্ধ করেছিলেন মাহবুব আলম। তাঁর লেখা ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’—গ্রন্থে উঠে এসেছে সেই অসামপ্রদায়িক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার স্মৃতি। তাঁর রণাঙ্গনে ঈদের দিনে হিন্দু সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তায় ঈদ জামাত অনুষ্ঠানের এক অনুপম চিত্র পাওয়া যায়। গেরিলা কমান্ডার মাহবুব আলম তাঁর গ্রন্থে লেখেন—
‘রমযান মাস শেষ হয়ে আসে। ঈদুল ফিতর এসে যায়। যুদ্ধের ভিতর দিয়েই একটা রোযার মাস পার হয়ে গেলো।... ঈদ এসে গেলো। ছেলেরা ঈদ উত্সব পালনের জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছে।
একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে এরকমের যে, ঈদের দিন পাক আর্মি ব্যাপকভাবে হামলা করবে সীমান্ত এলাকাগুলো জুড়ে। গুজবটা যেভাবেই ছড়াক, যথেষ্ট বিচলিত করে তোলে আমাদের। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঈদের নামাযের জন্য জামাতে দাঁড়াবে ঠিক সে সময়ই নাকি করা হবে এই হামলা!
যুদ্ধের মাঠে শত্রুবাহিনীর সম্ভাব্য কোনো তত্পরতাকেই অবিশ্বাস করা যায় না। ঈদের দিন মুক্তিবাহিনীর দল যখন ঈদ উত্সবে মেতে থাকবে, তারা নামায পড়তে দলবদ্ধভাবে কোথাও সমবেত হবে, তখুনি সুযোগ বুঝে তারা হামলে পড়বে অপ্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। খবর যখন রটেছে, এ ধরনের হামলা তখন পাকবাহিনীর তরফ থেকে হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই পাকবাহিনীর তরফ থেকে এ ধরনের সম্ভাব্য হামলাকে সামনে রেখে
আমরা ঈদুল ফিতর উত্সব উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেই। ঈদ মুসলমানদের জন্য প্রধান উত্সবের দিন। জন্ম থেকেই সবাই এই উত্সব পালন করে এসেছে যার যেমন সঙ্গতি, সে অনুযায়ীই। এখানেও যুদ্ধের মাঠে ছেলেরা ঈদ উত্সব পালনের জন্য মেতে উঠেছে। ঈদের নামায পড়া হবে না, ঈদের উত্সব হবে না, ভালো খাওয়া-দাওয়া হবে না, ঈদের দিন সবাই হাতিয়ার হাতে শত্রুর অপেক্ষায় ওঁত পেতে বসে থাকবে, এরকম একটা কিছু কেউই যেন মন থেকে মেনে নিতে পারছে না।
যুদ্ধের মাঠে, দিনরাত ক্লান্তিহীন যুদ্ধ প্রক্রিয়ার ভেতর ছেলেদের রিক্রিয়েশান বলতে কিছু নেই। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের একঘেয়ে কাজ। অপারেশন আর যুদ্ধ। এক হাইড আউট থেকে অন্য হাইড আউট। গোলাবারুদ আর হাতিয়ার বয়ে বেড়ানো। ছুটি নেই, আরাম নেই, বিশ্রাম নেই। বড়ো একঘেয়ে আর বিরক্তিকর জীবন সবার। এর মধ্যে ঈদের উত্সব একটা খুশির আবহ নিয়ে এসেছে। ছেলেদের এই খুশির ভাগ থেকে বঞ্চিত করতে ইচ্ছে করে না। পিন্টুসহ বসে তাই সিদ্ধান্ত নেই। আর সেটা এ রকমের : ঈদের দিন নামায হবে, বড়ো ধরনের আহার-বিহারের আয়োজন করা হবে। মোদ্দা কথা, ঈদ উত্সব পালন করা হবে যথাসাধ্য ভালোভাবেই। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও করে ফেলে সবাই একসঙ্গে বসে।
সিদ্ধান্ত হয় ঈদের আগের দিন সবগুলো দল দু’ভাগে ভাগ হবে এবং সমবেত হবে দু’জায়গায়। নালাগঞ্জ আর গুয়াবাড়িতে। ছেলেরা তাদের নিজেদের মতো করেই ঈদ উত্সব পালন করবে।
তবে নামায পড়বে একেবারে সীমান্তের ধার ঘেঁষে। গুয়াবাড়িতে সমবেত ছেলেরা ভারতীয় সীমান্তে উঁচু গড়ের পাদদেশে গিয়ে জামাত পড়বে। নালাগঞ্জে জামাত হবে আমগাছ তলায় পুকুরের পাড়ে।
মুসলমান ছেলেরা যখন ঈদের জামাতে দাঁড়াবে, তখন হিন্দু ছেলেরা কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে হাতিয়ার হাতে সতর্ক প্রহরায় থাকবে। হিন্দু সহযোদ্ধাদের দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মুসলমান ছেলেরা নামায পড়বে।
এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয় গুয়াবাড়ি একরামুলের কাছে। সোনারবানে বকর ও শামসুদ্দিনের কাছে। নালাগঞ্জে মুসা আর চৌধুরীও সেভাবেই তৈরি হয়। হিন্দু ছেলেরা তাদের মুসলমান ভাইদের নামাযের সময় পাহারা দেবার দায়িত্ব পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এই যুদ্ধের মাঠে জীবন-মরনের মাঝখানেই সবার বসবাস। এক ধর্মের মানুষ ধর্মীয় আচরণ পালন করবে, আর তাদের নিরাপদ রাখার জন্য ভিন্ন ধর্মের মানুষ হাতিয়ার হাতে পাহারা দেবে, আমার কাছে এ এক অভাবনীয় আর মহামানবিক ঘটনা বলে মনে হয়। হিন্দু ছেলেদের সংখ্যা বেশি না হলেও ঈদের জামাতের সময় তাদের স্বল্পসংখ্যক সদস্য দিয়েই তারা তাদের মুসলমান ভাইদের কিভাবে নিরাপত্তা বিধান করবে, তার পরিকল্পনায় মেতে ওঠে।
ঈদে বড়ো আয়োজনের আহারাদির বাজেট নিয়ে বসে মিনহাজ। সকালে রান্না হবে সেমাই। দুপুরে কোর্মা-পোলাও ইত্যাদি। আর সে অনুসারেই হিসাব-নিকাশ করে লম্বা একটা ফর্দ তৈরি করে ফেলে সে। হিন্দু ছেলেরা রয়েছে, সেহেতু গরু চলবে না। গ্রামের বন্ধুরা তাদের শুভেচ্ছাস্বরূপ পাঠিয়ে দেয় ৪টা খাসি। এরমধ্যে দুটো পাঠিয়ে দেয়া হয় গুয়াবাড়িতে সেখানকার ছেলেদের জন্য।...
ঈদের দিনের সকাল। উত্সবমুখর পরিবেশ। সবাই আনন্দে উচ্ছল। পাশাপাশি চরম উত্তেজনা পাকবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ হতে পারে। ভারতের নেতৃত্বে ৮-১০ জন হিন্দু ছেলে এগিয়ে খালের পাড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়।
সকাল ন’টায় ঈদের জামাত শুরু হয় পুকুর পাড়ে। আমি নিজে দাঁড়াতে এবং লাঠি ধরে চলাফেরা করতে পারলেও নামায পড়তে পারি না। ওরা সবাই ঈদগাহের মতো জায়গায় পরম পবিত্র মনে নামাযে দাঁড়ায়। আমিও লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি জামাতের কাছাকাছি অবস্থানে। যা হোক, যুদ্ধের মাঠেও তাহলে আমরা নামায পড়তে পারছি। গভীর এক প্রশান্তিতে ভরে ওঠে মন। সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে আমি তাকিয়ে থাকি ঈদের জামাতের দিকে।’
মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম ছিলেন যুদ্ধরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়মিত বাহিনীতে। তাঁর ‘একাত্তরের ঈদের এই দিনে’ প্রবন্ধ থেকে ঈদের দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আপ্যায়নের বিষয়টি জানা যায়। তিনি তাঁর প্রবন্ধে লেখেন—
‘একাত্তরের ২০ নভেম্বর রোজ শনিবার ছিল পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিন। ঈদের এই দিনে আমি তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেল্টা, ইকো এবং ব্যাটেলিয়ন হেড কোয়ার্টার কোম্পানির সৈনিকদের নিয়ে সিলেটের তামাবিল-ডাউকি সীমান্তবর্তী এলাকায়
পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি রাধানগরকে ঘিরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত ছিলাম। ... ২০ নভেম্বর পবিত্র ঈদের দিনে আমরা আশা করেছিলাম অন্তত এইদিন পাকিস্তানিরা আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ বা সরাসরি আক্রমণ পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ছিল এর বিপরীত দৃশ্য। ঈদের দিন সকাল থেকেই পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতিটি অবস্থানেই ব্যাপকভাবে আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। আমাদের কোনো অবস্থানেই মুক্তিযোদ্ধারা জামাতের সাহায্যে ঈদের নামায পড়ার সুযোগ পায়নি। তাছাড়া ঈদের দিনে গোসল করা, নতুন জামা-কাপড় পরা বা মিষ্টি-সুজি-সেমাই খাওয়া বা উন্নতমানের খাবারেরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। দুপুরের দিকে দূরবর্তী গ্রাম থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা কিছুটা উন্নতমানের খিচুড়ি ভার বয়ে নিয়ে এসেছিল। আর্টিলারির গোলা-গুলির মধ্যেই খিচুড়ির টুকরীগুলো বিভিন্ন প্রতিরক্ষা অবস্থানে পৌঁছানো হয়।
২০ নভেম্বর ঈদের দিনে দুপুর ১টার দিকে পাকিস্তানিরা গোয়াইন ঘাট থেকে আসা গ্রাম্য সড়কপথকে আড়াল করে ব্যাপক আর্টিলারি এবং মর্টারের গোলার ফায়ার কভারে আমাদের ছাত্তার গ্রামের প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর এক ভয়াবহ আক্রমণ পরিচালনা করে। ধীরস্থির প্রকৃতির সুবেদার আলী আকবর ছিলেন ঐ এলাকার প্রতিরক্ষা কাজে নিয়োজিত। আমি ঐ সময় দুয়ারীখেল গ্রামের অবস্থানে বাংকারে বসে খিচুিড় খাচ্ছিলাম। তড়িঘড়ি খাওয়া শেষ করে সুবেদার আলী আকবরের অবস্থানের উদ্দেশে রওয়ানা দিই। যাবার পথে ছিল সুবেদার বদির প্লাটুন। সুবেদার বদি এবং তার প্লাটুন থেকে দুটি সেকশনকে সাথে নিয়ে তড়িতে সুবেদার আলী আকবরের অবস্থানে পৌঁছি। একটি অবস্থান থেকে বাইনোকুলারের সাহায্যে দেখতে পাই যে রাস্তার ওপর দু’টি মেশিনগান স্থাপন করে তার ফায়ার কভারে পাকিস্তানিদের একটি বিশাল দল রাস্তাকে আড়াল করে দ্রুতগতিতে আমার ছাত্তার গ্রাম অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসছে। সুবেদার বদিকে সুবেদার আলী আকবরের সাহায্যে রেখে আমি পিছনে দুয়ারীখেল গ্রামে ৩ ইঞ্চি মর্টার দু’টির অবস্থানে দৌড়ে পৌঁছে যাই। মর্টার দুটির স্থান কিছুটা পরিবর্তন করে দ্রুত অগ্রসরমাণ পাকিস্তানিদের ওপর গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করি। ওদিকে সুবেদার বদি এবং সুবেদার আলী আকবরের অবস্থানগুলি থেকেও গোলা নিক্ষেপ শুরু হয়। মুহূর্তেই পাকিস্তানিরা রণে ভঙ্গ দিয়ে পিছু হটতে শুরু করে। সুবেদার বদি গ্রাম্য রাস্তার কভারে গোয়াইন সড়ক পর্যন্ত পাকিস্তানিদের ধাওয়া করে ফিরে আসেন।’
এভাবে সেদিন সারাদেশের সাধারণ জনগণ রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের ঈদের খাবার সরবরাহ করে। জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতাই সফল করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে।

শরণার্থী শিবিরে ঈদ
মুক্তিযুদ্ধের সময় সারাদেশের প্রায় ১ কোটি লোক ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঈদের আনন্দের তেমন কোনো লক্ষণ ছিল না। তবে যথারীতি অনেক শরণার্থী শিবিরেই ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতায় শরণার্থী হিসেবে থাকা বেগম মুশতারী শফী তাঁর ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’ গ্রন্থে তাঁর পরিবারের ঈদ উদ্যাপনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি তাঁর গ্রন্থে ঈদ ১৯ নভেম্বর লিখেছেন। আসলে ঈদ হয়েছিল ২০ নভেম্বর। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর স্বামী ডা. শফী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি ও শহিদ হন। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তিনি কলকাতায় শরণার্থী হন। বেগম মুশতারী শফী তাঁর গ্রন্থে ঈদের যে বর্ণনা দিয়েছেন কলকাতার অধিকাংশ বাঙালি পরিবারের চিত্র এর থেকে ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি তাঁর গ্রন্থে লেখেন—
‘১৯ নভেম্বর। আজ ঈদ। দেশ স্বাধীন হলে আমরা ঈদ করবো।’
‘আজ পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। এক মাস কঠোর কৃচ্ছ সাধনার পর আসে এই আনন্দময় দিন পবিত্র ঈদ।
মনটা বিষণ্নতায় আজ ছেয়ে গেছে। আগের দিন বাচ্চাদের কাপড়-চোপড়গুলো সাবান দিয়ে কেচে লন্ড্রি থেকে ইস্ত্রি করে রেখেছিলাম। মুসলমান পাড়া, তাই ঈদের আমেজটা পরিপূর্ণভাবে অনুভব করছি, ছেলেরা সবাই নতুন জামাকাপড় পরে টুপি মাথায় দিয়ে নামায পড়তে যাচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রঙ-বেরঙের নতুন জামা-জুতো পরে, রঙিন ফিতায় চুল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বউরাও নতুন শাড়ি, অবাঙালির বউরা নতুন সেলওয়ার-কামিজ পরে এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়াচ্ছে, আশে পাশের ঘর থেকে পোলাও-কোর্মা, জর্দা-ফিরনীর খোশবু আসছে। আমার বাচ্চারা মুখ মলিন করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। এমন ঈদ তো ওদের জীবনে কখনো আসেনি। আমার পাশের ঘরের খ্রিস্টান ছেলেমেয়ে জ্যাফরী, ননাট এলো। ওদের বললো, ‘‘তোমরা আজ নতুন কাপড় পরোনি? তোমরা ঈদ করবে না?’’
ওদের প্রশ্নে আমার বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠলো, কী উত্তর দেবে আমার বাচ্চারা? আমি কান পেতে রইলাম। শুনলাম আমার বড় ছেলে এরাদ বলছে, ‘‘না লরী, আমরা ঈদ করবো না।’’ ওরা প্রশ্ন করছে, ‘‘কেন?’’
এরাদ বলছে, ‘‘আমার কাকু বলেছে, দেশে যখন যুদ্ধ চলে, তখন কোনো ঈদ করতে হয় না। এখন আমাদের সাথে আব্বু নেই, মামা নেই, ওদেরকে মিলিটারিরা নিয়ে গেছে। আমরা যুদ্ধ করে পাকিস্তানি আর্মিদের হারিয়ে দেব আর আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে, আমরা দেশে ফিরে আব্বুকে পাবো, মামাকে পাবো, তখন আমরা ঈদ করবো।’’ ওর কথা শুনে কান্না সংবরণ করতে পারলাম না। আঁচলে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললাম। হে খোদা, তুমি আমার বাচ্চাদের ইচ্ছে পূর্ণ করে দাও। তুমি তো অলৌকিক কত কিছু দেখালে আরেকটু দেখাও, সত্যিই যেন ওদের আমরা ফিরে পাই।
না, মুরগি এনে পোলাও, কোর্মা রাঁধার সাধ্য আমার নেই। তবে বেলাল ভাই সেমাই কিনে এনেছিল কাল; আজ মিনু আপাও চোখ মুছতে মুছতে সেটাই রান্না করে বাচ্চাদের সকালে খাইয়েছে। অনেক দিন পর আজ আমি যেন আবার একটু বেশি রকম মুষড়ে পড়ছি, কামনা করছি বারবার এই দিনটার দ্রুত অবসান।
সকাল দশটায় ওরা দুই ভাই মানু আর পিকু এসে হাজির। আমাকে
সালাম করে বললো, ‘‘ছোট মা, আজ আমরা সারাদিনের প্রোগ্রাম নিয়ে এসেছি।’’ ভয়ে ভয়ে বললাম, কী রকম? ওরা বললো, ‘‘আজ ভাই-বোনদের নিয়ে আমরা সারাদিন বেড়াবো।’’ বেড়ানোর কথায় বাচ্চারা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো, ‘‘দাদা আমরা কোথায় বেড়াবো আজ?’’ মানু বললো, ‘‘আজ তোমাদের আলীপুর চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাব। তারপর জাদুঘর, তারপর প্ল্যানোটিরিয়াম, তারপর রবীন্দ্র সরণীতে আজ একটা চমত্কার ফাংশন আছে সেটা দেখে রাতে ফিরবো।’’ মিনু আপা বললেন, ‘‘সর্বনাশ এই সাত জনকে নিয়ে সারাদিন তোমরা সামাল দিতে পারবে?’’ পিকু বললো, ‘‘কেন পারবো না? আমরা দুই ভাই আছি না?’’ ওরা জামাকাপড় পরেই ছিল। এখন জুতো-মোজা পরে রেডি। বললো, ‘‘দাদা চলো।’’ মিনু আপা ধমক দিলেন, ‘‘থাম, তোর দাদাদের কিছু খেতে দিবিনা?’’ বলেই সেমাই এনে দিলেন। ওরা দুই ভাই খুব তৃপ্তি করে খেলো। পিকু বললো, ‘‘বাহ, এমন চমত্কার রান্না তো কখনো খাইনি।’’
মিনু আপা বললেন, ‘‘বাবা শরণার্থী জীবনে কি আর ভালো করে রান্না করা সম্ভব? ঘি গরম মশল্লা নেই। এ তো কেবল বাচ্চাদের বোঝানো।’’
মানু পিকু সবগুলো বাচ্চাকে নিয়ে চলে গেলো। যাবার সময় বাচ্চাদের আনন্দ দেখে মনে হলো, আজ ঈদ যেন মানু পিকুই নিয়ে এসেছে আমাদের ঘরে। আমার বুকের ভেতরে চেপে থাকা কষ্টের ভারটা যেন অনেকখানি নেমে গেল। মিনু আপা কান্নারুদ্ধ স্বরে বললেন, ‘‘হে খোদা, তুমি ওদের দুই ভাইয়ের কল্যাণ করো।’”

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ঈদ
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা মুক্তিযোদ্ধাসহ সারাদেশের সমগ্র বাঙালি জাতির অন্যতম অনুপ্রেরণার উত্স ছিল। চরমপত্র, বজ্রকণ্ঠ, জল্লাদের দরবারসহ অসংখ্য অনুষ্ঠানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো মুক্তিকামী জনগণ। স্বাভাবিক নিয়মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও ঈদ নিয়ে ছিল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। বেতার কেন্দ্র থেকে এদিন প্রচারিত সকল অনুষ্ঠানেই সারাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা, পাশবিকতার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবগাথা প্রচারিত হয়েছে। এদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আবদুল গাফফার চৌধুরী’র রচনা ও মেসবাহ আহমেদ-এর প্রযোজনায় ‘রমযানের ওই রোজার শেষে’—একটি স্মৃতি আলেখ্যও প্রচারিত হয়। এই স্মৃতি আলেখ্যে এজিদের ভয়াবহ নৃশংসতার সঙ্গে তুলনা করা হয় ইয়াহিয়ার নৃশংসতাকে। প্রচারিত স্মৃতি আলেখ্যটিতে বলা হয়—
‘বাংলার আকাশে আবার শওয়ালের চাঁদ উদিত। অঘ্রানের কুয়াশামাখা দিগন্তে এক ফালি খণ্ড চাঁদে কত আলো আর আনন্দের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই আলো আর আনন্দ আজ এমনভাবে নিভে গেল কেন? আকাশে যেন চাঁদ নয়, চাঁদের করোটি। ঈদের আহত চাঁদের গা বেয়ে যেন ঝরছে চাপ চাপ রক্ত। বাংলার আকাশ আজ লাল, মাটি আজ লাল। হেমন্তের পাখি গান গায় না। নবান্নের ধান কুমারী মেয়ের মতো বাতাসের প্রথম সোহাগে আর আন্দোলিত হয় না বাংলাদেশের সবুজ ক্ষেতে। শওয়ালের চাঁদ, তবু তুমি এসেছো মৃত্যুদীর্ণ বাংলার আকাশে আলো আর আনন্দের সব পশরা দূরে রেখে। এসেছো রক্তাক্ত দেহে। এসেছো নিহত শিশুর আর নারীর লাশের ছবি বুকে গেঁথে—
‘‘ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ,
এনেছে এজিদ বাংলার বুকে মোহাররমের চাঁদ।
এসেছেন কাসেম এসেছে সখিনা সারা দেহে
হায় তপ্ত খুন
আজ নয় ঈদ, আজ কোটি মুখে
ইন্নালিল্লা ... ... ... রাজেউন।
ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ,
এনেছে এজিদ আবার এদেশে মোহাররমের চাঁদ।’’
শওয়ালের চাঁদ নয়, মোহাররমের চাঁদ। না তা কী করে হয়? রমযানের পর কি মোহাররম না শওয়াল?
শওয়াল। কিন্তু বাংলার আকাশে এখন রমযানের পর মোহাররম। শওয়ালের চাঁদ পথ ভুলে গেছে এজিদের তরবারির ভয়ে, বর্বরতার ভয়ে বঙ্গোপসাগরে উঁকি মারতে এসে সে পালিয়ে যায় তার সব আলো আনন্দ নিয়ে দূর আরবের মরু বিয়াবানে। এবার দামেস্কে নয়, ঢাকায় হয়েছে এজিদের অভ্যুদয়। তার সীমার সেনারা ঘুরছে বাংলার পথে পথে। লুট করছে নারীর ইজ্জত, হত্যা করছে রোযাদার বাঙালিকে। এজিদের বাবা যেমন একদিন বর্শার আগায় পবিত্র কোরান বেঁধে বিভ্রান্ত করেছিল আরবের মুসলমানদের, এ যুগের এজিদ ইয়াহিয়াও তেমনি ইসলাম আর কোরানের দোহাই পেরে বিভ্রান্ত করতে চাইছে বাংলার মুসলমানকে। সে যুগের এজিদ ছিল মুসলমান। এ যুগের এজিদ ইয়াহিয়াও মুসলামান। এজিদ কারবালায় হত্যা করেছে দশ হাজার মুসলমানকে। আর ইয়াহিয়া বাংলাদেশে হত্যা করেছে কয়েক লাখ মুসলমানকে।...
এবার নিয়ে দু’বার—দু’বছর মোহাররমের চাঁদ এলো আকাশে শওয়ালের চাঁদের পরিবর্তে। গত বছর ঠিক রোজার ঈদের আগে বারোই নভেম্বর কাল রাত্রিতে বিশ লাখ বাঙালি নিশ্চিহ্ন হয়েছে প্রচণ্ড ঝড়ে। সেদিনও ইয়াহিয়া পিণ্ডির শাদ্দাসী বালাখানায় বসে হেসেছে। বাংলার মানুষকে বাঁচাতে, বিপন্ন মানবতার ত্রাণে নেমে অসেনি এই মনুষ্যদেহধারী জানোয়ার গোষ্ঠী।
গত ঈদেও সারা বাংলা কেঁদেছে। কেউ গায়নি প্রাণভরে—ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ—গেয়েছে মোহাররমের মর্সিয়া, ঈদের জামাত হয়েছে—জানাযার জামাত।
বাংলার মানুষের কণ্ঠে শুনেছি তারই আর্ত ক্ষোভ—
“বাঁচাতে চাইলে বাঁচবে এমন কথা তো নেই
প্রমাণ পেলে তো হাতে হাতে
বিশ লাখ শিশু নারী ও যুবক আজকে নেই
মরে গেছে তারা এক রাতে
বাঁচতে গেলেই বাঁচবে এমন কথা তো নেই—

প্রভু, তুমি এই পুণ্যির মাসে ধন্যি,
ঝড়ে নেভায়েছো লক্ষ প্রাণের বহ্নি
সাগরে ডুবেছে আমার স্বপ্ন-শিশুরা
তোমার ধ্যানেতে নিরত এখানো যীশুরা
আর যারা আছে, তারা প্রাণ দেবে নীরবে\
নাহলে তোমার পুণ্যিমাসের কী রবে?

কাফনে জড়ানো চাঁদের শরীর গলিত লাশ
দ্বীপাঞ্চলের বাতাস এখন দীর্ঘশ্বাস
গোলাপের মতো কত ফোটা ফুল লুণ্ঠিত
মৃত্যু মলিন ঠোঁটে চাপা ক্ষোভ কুণ্ঠিত।”

গেলবার প্রকৃতির হাতে মারা পড়েছে লাখো মানুষ। সেই মৃত্যুদীর্ণ বাংলার বুকে আবার আঘাত হানতে দ্বিধা করেনি রক্তপাগল নরপশু ইয়াহিয়া। এ বছর মরেছে দশ লাখ। ১ কোটি মানুষকে হতে হয়েছে দেশ ছাড়া। বাংলার ঘরে ঘরে আজ হাজার সখিনার শরীরে শ্বেতবাস। কাসেমের লাশে ভরে গেছে বাংলার প্রান্তর। শওয়ালের চাঁদের ছদ্মবেশ ধরে আবার বাংলার আকাশে উঠেছে মোহাররমের চাঁদ।
আবার শয়তান সীমারের ছুরি উদ্যত হয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীর বুকে। পবিত্র রমযান মাসে কারফিউ জারি করা হয়েছে ঢাকা শহরে। ঘরে ঘরে চলছে, সার্চ, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ। শওয়ালের চাঁদ, তুমি মুখ ঢাকো। তোমার আলোয় যারা মোনাজাতের হাত তুলবে পশ্চিমমুখো হয়ে পবিত্র কাবাঘরকে সাক্ষী রেখে, যারা জামাতে শামিল হয়ে করবে এবাদত তারা আজ কোথায়? তাদের কঙ্কালের স্তূপে, তুমি কিসের আলো ছড়াবে? আনন্দের, না শোকাশ্রু?...
না শোকাশ্রুর নয়, সংকল্পের। এবারের শওয়ালের চাঁদ বাঁকা খঞ্জর হয়ে বাংলার মানুষকে পথ দেখিয়েছে। উঠুক মোহাররমের চাঁদ বাংলার আকাশে। আমরা কাঁদবো না। অশ্রু ফেলবো না। বাংলার তরুণের হাতে আজ অস্ত্র। ঈদের চাঁদের বাঁকা শরীরের মতো বাঁকা তলোয়ার। শত্রুনিপাতের সংকল্পে আজ ঐক্যবদ্ধ লক্ষ বাঙালি তরুণ। ওই দ্যাখো, সীমারের চোখে আজ ভয়। এজিদের চোখে ঘনায়মান পরাজয়ের আতঙ্ক।...
রমযানের রোযার শেষে এবারের ঈদ খুশীর ঈদ নয়, সংকল্পের ঈদ। সংকল্পবদ্ধ হওয়ার খুশীর ঈদ। শত্রুবধের খুশীর ঈদ। দেশ ও মাতৃভূমির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার খুশীর ঈদ। আত্মোত্সর্গের ঈদ। শহীদী দরজা খুলে দেওয়ার ঈদ। গাজী হওয়ার—বিজয়ী হওয়ার আনন্দের ঈদ।...
হেমন্তের আর্দ্র কুয়াশামাখা চাঁদের কী সজল মিনতি—বাংলার যুবশক্তি রুখে দাঁড়াও। বাংলার আকাশে বজে ও বিদ্যুতে কী গভীর কানাকানি—বাংলার মানুষ, বজ কঠিন শক্তিতে আঘাত হানো। ঈদের জামাতে শামিল হয়ে যে হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে মোনাজাতের জন্য, সে হাত দৃঢ়মুষ্টিতে পরিণত করে শেষ আঘাত হানো হানাদার দস্যুদের উপর। বাংলার বাতাস থেকে মোহাররমের মর্সিয়া মুছে দাও, বাংলার আকাশ থেকে মোহাররমের চাঁদকে বিদায় দাও। আসুক পুণ্য বিজয়ের ঈদ, শওয়ালের চাঁদ। চূড়ান্ত বিজয়ের চাঁদ আলো আর আনন্দ ছড়াক শত্রুমুক্ত বাংলার আকাশে। রমযানের রোযা, ত্যাগ, কৃচ্ছ তা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের শেষে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবনে সত্যি সত্যি আসুক প্রকৃত খুশীর ঈদ। গানে গানে ঝংকৃত হোক কোটি বাঙালির হূদয়, আর সেই দৃঢ় প্রত্যাশায় বুক বেঁধে বলি—মোবারক হো ঈদ, ঈদ মোবারক।’
মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে সারাদেশে এরকম ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে পালিত হয়েছিল ঈদ-উল-ফিতর। একদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের ভয়াবহ পাশবিক নির্যাতনে আতঙ্কিত জনগণ অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথায় আশান্বিত জনগণ। বাংলার ইতিহাসে এরকম ঈদ আর আসেনি। সেদিন সমগ্র জাতি কায়মনোচিত্তে প্রার্থনা করেছিল স্বাধীনতার। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ছিল সমগ্র জাতির কাম্য। আর তাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঈদের সকল আয়োজনের মধ্যেই ছিল মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে স্বাধীনতার আকুল প্রার্থনা। একইভাবে প্রতিটি নিপীড়িত, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধরত জনগোষ্ঠীই তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে পালন করে থাকেন। ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ পর্যায়ের এই ঈদে কলকাতা, প্রবাসে অবস্থানরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকের চাওয়া একই মোহনায় মিলিত হয়েছিল। প্রত্যেকেই প্রত্যাশী ছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। পবিত্র ঈদ উত্সবের পর মাস না পেরোতেই ১৬ ডিসেম্বর আমরা অর্জন করি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশ মুক্ত পরিবেশে ২৭-২৮ জানুয়ারি পালন করে ঈদ-উল-আজহা। যুদ্ধকালীন ঈদ-উল-ফিতরের সময়েও জনগণ কল্পনাও করতে পারেনি স্বাধীনতা এত কাছে!
প্রতি বছরই বর্ষপরিক্রমায় মুসলিম জীবনের সর্বোচ্চ ধর্মীয় উত্সব ঈদ-উল-ফিতর পালিত হয়। আমরা প্রত্যাশা করি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতো ঈদ যেন আর কখনো বাংলার বুকে না আসে।

তথ্যসূত্র :
একাত্তরের রণাঙ্গন : অকথিত কিছু কথা—নজরুল ইসলাম
একাত্তরের দিনগুলি—জাহানারা ইমাম
স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র
মাসিক অগ্রপথিক—২০১০ ঈদ-উল-ফিতর সংখ্যা
গুলিবিদ্ধ একাত্তর—হাশেম খান
গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে—মাহবুব আলম
স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন—বেগম মুশতারী শফী
চল্লিশ থেকে একাত্তর—এম আর আখতার মুুকুল
যখন পলাতক : মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি—গোলাম মুরশিদ

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২২
ফজর৪:১৮
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৩০
এশা৭:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :