The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

আমার ছেলেবেলা

খানিকটা বেলা হলে

হাসান আজিজুল হক

যে বছরে বাংলা ভাগ হয় তার মানে ১৯৪৭ সালে সেই বছরে আমি প্রাইমারি পরীক্ষায় পাশ করি। রেডিওতে ঘোষণা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ দু-ভাগ হয়ে গেল। এক ভাগ হলো পশ্চিমবঙ্গ আরেক ভাগ হলো পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা যেহেতু পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের পূর্বাংশে সেই জন্য এর নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান। এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা আমি ঘামাইনি। আমার বেশ মনে আছে তখন আমরা তেঁতুলতলায় হাডুডু খেলছি, হাডুডু খেলা হয়ে যাওয়ার পরে ডাংগুলি নামে একটা খেলা ছিল, সেই খেলাটা খেলছি। বড়রা খুব বারণ করতেন, তোমরা এটা খেল না, তোমরা যে কাঠের গুলি ছোড় বা পেটাও, সেটা যদি কারো চোখে লাগে সে কানা হয়ে যাবে। তা আমরা তাঁদের কথা শুনতাম না। আমি পরমানন্দে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছি, তখনই শুনতে পেলাম, কী যেন হয়েছে। কী হয়েছে? আবছাভাবে রেডিও শুনলাম। বাংলাদেশ দু-ভাগ হয়েছে। তাতে আমার কী! আমি তখন পশ্চিমবাংলার একটি গ্রামের ছেলে। রাঢ় অঞ্চলের উত্তর-পূর্ব রাঢ় অর্থাত্ মুর্শিদাবাদের গা ঘেঁষা আরো পুব দিকে অনেকটা নবদ্বীপের পাশে।
আমি প্রাইমারি পরীক্ষা পাশ করলাম। এর পরেই স্কুলে গিয়ে ভর্তি হব। স্কুল আমাদের গ্রামেই আছে। আমাদের স্কুলের নাম যবগ্রাম মহারাণী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়। সেই স্কুলে আমি ভর্তি হব। এই স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী। মহারাজার স্ত্রী কাশীশ্বরী দেবী আমাদের গাঁয়ের মেয়ে। আমরা তখন এসব লোকমুখে শুনতাম। অনেক কিছুই মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র এই স্কুলের জন্য করেছেন। আমাদের মতো অজপাড়াগাঁয়ে এ রকম চমত্কার স্কুল কী করে হলো এটা ভাবলে তখন খুবই অবাক লাগত। কেননা আশপাশের গাঁয়ে এ রকম পাকা স্কুলের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ক্ষীরগ্রামে একটা স্কুল ছিল আধাখড়ের, নিগণেও স্কুল ছিল না। ফলে আমাদের এই স্কুলে নানান জায়গা থেকে ছেলেরা পড়তে আসত। গোবর্ধনপুর থেকে, নিগণ, কসি গ্রাম, বেলগাঁ নানান জায়গা থেকে আসত, এই স্কুলে ভর্তি হতো।
আমার বেশ মজা যে আমিও এই স্কুলে ভর্তি হব। ভর্তি হওয়ার আগে বেশ লম্বা ছুটি থাকে। প্রাইমারি স্কুলের পরীক্ষাটা হয়ে যাওয়ার পরে প্রায় দু’মাস স্কুলে ভর্তি হওয়ার কোনো ব্যাপার নাই। স্কুলের সেশনগুলো তখন ছিল জানুয়ারি থেকে জানুয়ারি। স্কুল চলছে, আমাদের ছুটি। আমাদের এখনো ভর্তির সময় হয়নি। আমি তখন স্কুলের চারপাশে ঘোরাফেরা করতাম। তাতেই আমার পরমানন্দ। তখনকার দিনে একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় মুসলিম পরিবার থেকে একটি ছেলে স্কুলে ভর্তি হবে, পড়াশোনা করবে, অন্তত ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়তে পারবে—এটা প্রায় অকল্পনীয় ছিল। আমাদের মুসলমান পাড়া থেকে একটি ছেলেও স্কুলে ভর্তি হয়নি।
আমরা মাত্র দু’জন ভর্তি হয়েছিলাম। আমি এবং আমারই চাচাত ভাই শহিদুল। এমনকি সারা স্কুলে আর মাত্র দু’জন ছাত্র ছিল মুসলিম। তারা আসত ধারসোনা মুসলিম গ্রাম থেকে। আরো মজার ব্যাপার ছিল, সারা স্কুলে কোনো মেয়ে ভর্তি হতো না। ফলে কি মুসলমান কি হিন্দু কোনো মেয়েই স্কুলে পড়ত না। এটা কিন্তু অবাক কাণ্ড! ১৪/১৫ বছরের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত গাঁয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খেলাধুলো করছে। তাদের স্কুলে যেতে হয় না। আমাদের একটু হিংসেও হতো বটে। ওই বয়সে মেয়েদের দেখলে আমাদের ছেলেদের একটু কেমন কেমন লাগত। মেয়েগুলো কী স্বাধীন! চুল এলো করে দিয়ে রাত-দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাঁচা আমড়া, কাঁচা তেঁতুল পেড়ে খাচ্ছে। কী সুখের জীবন ওদের।
আমি প্রত্যেকদিন স্কুলের মাঠে যাই। যে ক্লাসে ঢুকে আমি ক্লাস করব সেই ক্লাসের বাইরে থেকে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম। শিক্ষক আসছেন, হাতে একটা বেত। একেক শিক্ষক একেক ঢং-এ ধুতি পরে আসতেন। কেউ মোটা ধুতি, কেউ ফিনফিনে ধুতি, ধুতির ওপর হাফ শার্ট, কেউ ফুল শার্ট । আর প্রত্যেকের হাতেই একটা করে বেত, মানে কঞ্চি। এর খুব অন্যায় একটা দিক ছিল। কঞ্চিগুলো কেটে পাতা ঝরিয়ে দিয়ে ছোট ছোট ডাল সামান্য কেটে গিঁটগুলো এনে রাখা হতো। কঞ্চির ধারালো জায়গাগুলো সাফ করত না। এগুলো করতে গেলে অনেক ঝামেলা করতে হবে। মাস্টারমশাইরা ওরকম কঞ্চি আমাদের পিঠে ভাঙতেন। ফলে শুধুমাত্র যে বেতের দাগ পড়ত তা নয়, জায়গায় জায়গায় গর্ত হয়ে যেত। গর্তের কারণ ছিল কঞ্চির গিঁটগুলো মসৃণ করা হয়নি।
যা-ই হোক আমাকে স্কুলে ভর্তি হতে হবে। কেমন করে ভর্তি হব। আমাদের তো টাকা নেই, পয়সা নেই। অথচ সবই আছে। খুব অদ্ভুত তখনকার দিনের ব্যাপার। অচল মান্ধাতার আমলের অর্থনীতি। সবকিছু জিনিস দিয়ে কেনা-বেচা হয়। এলাকাটা ধানের এলাকা। ধান ছাড়া কিছুই হয় না। তাও আবার একটি মাত্র ধান আমন ধান। অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে পাকবে। সেটা চৈত্র মাস পর্যন্ত মাঠ থেকে তোলা হবে। এছাড়া আমাদের ওইদিকে আশপাশে গ্রামের উঁচু-নিচু আউশ জমি কিছু থাকত। সেখানে আখ কিংবা আলু, মটরশুঁটি, মসুরি, কুমড়ো—এই সমস্ত ফসল হতো। বাকি সবই ধান। কাজেই কাঁচাপয়সা কোথায়?। যারা ব্যবসা করত, যাদের মুদি দোকান-টোকান ছিল, তারা হয়তো দু-এক টাকা নাড়াচাড়া করত। কিন্তু এমনিতে বেশিরভাগ মানুষের হাতে টাকা-পয়সা সবসময় ছিল না।
আমাদের পরিবার ছিল বড় পরিবার। যথেষ্ট জমি সম্পত্তি। এক গোয়ালে গরু রাখা। অনেকগুলো মোষ। শীতকালে ধান কাটার সময় গ্রামে মুনীষ দিয়ে কুলোতো না। বাইরে থেকে কিষেন আনতে হতো। ছোটনাগপুরের দুমকা জেলা থেকে সাঁওতাল নারী পুরুষ নিয়ে আসা হতো। একেকটি পরিবার প্রায় ২৫/৩০ জন করে সাঁওতাল নিয়ে এসে গ্রামের পুকুরের পাড়ে বা অন্য কোথাও তাঁবু করে অথবা কোনো গোয়ালের পাশে থাকতে বলত। তারাই শীতের সময় ধান কাটত। বর্ষাকালে ধান রোয়ার কাজ করত। এখানে বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, প্রৌঢ়, প্রৌঢ়া, যুবক-যুবতী, অবিবাহিত যুবক-যুবতীও কাজ করত।
এখন স্কুলে বেতন দিতে হবে। স্কুলে ভর্তি হতে হবে। সে তো টাকা দিয়েই। বাবাকে প্রচণ্ড ভয় করি। বাবা ছোটবেলায় আমাকে প্রচণ্ড শাসন করতেন। সামান্য কারণে আমাদেরকে বিশেষ করে আমাকে প্রহার না করে ছাড়েননি। তাঁর কতকগুলো নির্দিষ্ট আদেশ ছিল। সেগুলো না মানলেই মারতেন। আর আমি তো সবকিছু মেনে চলতে পারতাম না। তবুও আমি বাধ্য ছেলেই ছিলাম। আমার অবাধ্যতা যা ছিল সেটা অন্য কোনো মানুষের ক্ষতি করা নয়। চর্কির মতো ঘুরে বেড়ানো। কী যে খুঁজছি! কেন যে খুঁজছি? কেন যে দৌড়াচ্ছি? কেন যে দুপুরে রোদ মাথায় করে বিশাল মাঠ পার হচ্ছি। কখনো সাপ দেখছি। গোখরো সাপ দেখছি। কখনো চন্দ্রবোড়া বা ভাইপার জাতীয় সাপ দেখি। পাখি দেখি। চিল দেখি। কোথাও দেখি ধানের গাদার তলায় অনেকগুলো ধান কাটা। নিচে দেখি ইঁদুরের গর্ত আছে। গর্ত খুঁড়তে গিয়ে সেখানে এক হাঁটু পরিমাণ মাটি ওঠানোর পর দেখি প্রাায় ১০ কেজি ধান ওরা কেটে রেখে দিয়েছে। সেই ধান উদ্ধার করাও আমাদের একটি খেলা ছিল। ধানের পাশে ছোট্ট ছোট্ট ইঁদুরের ছানা। ছানাগুলোর ভাগ্যে কি হতো বোঝাই যায়। ৫-১০ মিনিট পরে আসলে আর একটাকেও দেখা যেত না। মাঠের কাক গ্রামে যেত। আবার মাঠের শকুন শুধু গ্রামের ভাগাড়ের দিকে যেত। মাঠের চিল মাঠেই থাকত। ফিঙে পাখিগুলো মাঠেই বেশি থাকত। ওরা ওখান থেকে একটা একটা করে বাচ্চা তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলত। আর আমরা নাড়াময় মাঠে ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের দেশের ধানের খড় কিন্তু খুব কাজের। আর এইজন্য আমাদের ৯০-ভাগ বাড়িই মাটির। আর ৯০-ভাগ বাড়ির চালা হচ্ছে টিন নয়, পুরোপুরি খড়ের। এই খড় দিয়ে ছাউনি দিলে ৪-৫ বছর পর্যন্ত থাকত। তারপর গোঁজা দেওয়া হতো মানে যে যে জায়গাগুলো নষ্ট হয়েছে, সেসব জায়গাগুলোতে আবার নতুন খড় দেওয়া হতো।
বাবার কাছ থেকে টাকা চাইতে ভয় পেতাম। মাকে বলতাম, মা, তুই বল (মাকে আমি তুই করে বলতাম) ভর্তি হওয়ার দিন চলে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ভর্তি হতে হবে। বাবাকে টাকা দিতে বল। আমার বলার সাহস ছিল না। যখন কিছুতেই কিছু হলো না, তখন আমি মাকে বললাম, তুই কি বলবি না? আমি কি স্কুলে ভর্তি হব না? তোর বাবা তো বলছে যে, হবে। হবে তো কবে হবে? একদিন আমি বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। বাবা খাচ্ছেন। মা পাশে দাঁড়িয়ে পাখা করছে। মা বলছে, ছেলের তো ভর্তি হওয়ার দিন পার হয়ে যাচ্ছে। তুমি ওকে ভর্তি করবে না? আমার বাবা কাউকেই সহজভাবে কথা বলতে দিতেন না। হবে হবে, বলেছি তো।
আমি তখন স্কুলের চারপাশে ঘুরি। স্কুলের পাশে নিমগাছ আছে। নিম গাছে উঠি। গাছে উঠে সারাদিন বসে থাকি। গরমকালে নিমফল পাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিমফল খেতাম। নিমফলে আর কতটুকু শাঁস পাওয়া যেত! লিচুর মতো ছিলে একটুকরো মুখে দিতাম। গোটা পঞ্চাশেক দেওয়ার পর একটু চুষলে খানিকটা রস পাওয়া যেত। তারপর থুতু করে ফেলে দিতাম সমস্ত বিচি।
শেষ পর্যন্ত আমি ভর্তি হলাম ক্লাস ফাইভে। স্কুলের মাস্টারদের সাথে পরিচয় হলো। একেক মাস্টার আমাকে একেকভাবে মুগ্ধ করতেন। তাঁরা আজকের পৃথিবী থেকে মুছে গেছেন। আজ কেউ নেই। বছর দুয়েক আগে আজও জীবিত আমার এক ৯৪ বছরের শেষ স্কুল মাস্টারের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। জানি না তিনি আজও জীবিত আছেন কি না। যদি থাকেন, একশ বছর পার করবেন আশা করি। এঁর নাম শিবরাম বাবু। অন্য মাস্টারদের নাম শান্তিরাম বাবু, দুর্গাশঙ্কর বাবু, গিরীন্দ্রনাথ পাঁজা। মুসলিম একজনও ছিলেন না।
আমার বাবা গ্রামের প্রধানদের মধ্যে একজন ছিলেন। তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। হিন্দু এলাকাতেও তিনি খুব পপুলার। তিনি বাড়িতে যেমনই হন না কেন, বাইরে ওঁর মতো মিষ্টভাষী এবং সুন্দর করে কথাবার্তা বলার মানুষ খুব কমই ছিল। আমিও আমার জীবনে খুব কম দেখেছি। তারাশঙ্কর ধাঁচের কথাবার্তা বলতে পারতেন উনি। বাবাকে আমার খুব নিষ্ঠুর বলে মনে হতো, মিষ্টভাষী বলে মনে হতো, রাগী মানুষ বলে মনে হতো; ভালো তাঁকে অসম্ভব বাসতাম—সে কথাও ঠিক।
শেষ পর্যন্ত হঠাত্ একদিন দেখছি বাবা মুখে স্মিত হাসি নিয়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে বলছেন, ছেলেকে ভর্তি করিয়ে নাও তো মনীন্দ্র। মনীন্দ্রবাবু ছিলেন আমাদের ক্লাস টিচার। সেই সঙ্গে তিনি অফিসের খাতাপত্র মেইনটেইন করতেন। তিনি আমার নাম ধাম লিখে নিলেন। ডেট অব বার্থ লিখতে গিয়ে একটা গণ্ডগোল হয়ে গেল। ডেট অব বার্থ বাবার মনে নেই। তাঁর অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সন তারিখ সবকিছু লিখে রেখেছিলেন। আমার বেলায় বোধ হয় লেখার যোগ্য বলে মনে করেননি। কিচ্ছু লেখেননি। কাজেই বলা যায়, ডেট অব বার্থ পেলামই না। একটা নতুন ডেট অব বার্থ দুই ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ ওখানে দেওয়া হলো। সেইটাই এখন চলছে। লোকে আমার জন্মদিন দুই ফেব্রুয়ারি এটাই জানে।
স্কুলে তো ভর্তি হওয়া গেল। মাইনে প্রতি মাসে আর জোটে না। বাবাকে বলি। বাবার হাতে টাকা নেই। টাকা হবে কী করে? এক ধান বিক্রি করে কিংবা কোনো ফসল বিক্রি করে টাকা জোগাড়

হবে। কিংবা সরষের তেল তৈরি করে তেল বিক্রি করতে হবে। কিন্তু সে সব অঢেল পরিমাণে হলেও বাড়িতে লাগতও অনেক। আমাদের বিশাল একান্নবর্তী বড় পরিবার। ১৬-১৭ জন ভাই-বোন। ৪০-৫০ জন মানুষ। অত বড় পরিবারে কত কিছুই লাগে। তার পর জ্বালানি তো কিনতে হয়। তখনকার দিনে এক কয়লাই জ্বালানি ছিল। জ্বালানির জন্যে কী ভোগান্তিতেই না ভুগেছে গ্রামের মানুষ। গাছ নেই যে সবাই গাছ কেটে কাঠ দিয়ে জ্বালানি করবে। গরিব মানুষ শুকনো পাতা দিয়ে কাজ সারত। অধিকাংশ মানুষেরই বাড়িতে জ্বালানি ছিল না। নিগণ আমাদের মোকাম। ওখান থেকে কয়লা কিনে নিয়ে আসতে হতো। দেখতাম যে ধানভরা গরুর গাড়ি মোকামে, আড়তে যাচ্ছে। দর কত, জিজ্ঞেস করছে। হয়তো একটা দর বলল। চাষি বলল, না, ওই দিকে আরো বেশি পাওয়া যাবে। যা গিয়ে দেখগে, বেশি পেলে সেখানে বিক্রি করবি। আর বেশি না পেলে দয়া করে আমার এখানেই আসিস। আড়তদার ধান কিনবেন। আড়তে রাখা আছে প্রচুর কাঁচা কয়লা। কোক কয়লা না, কাঁচা কয়লা। আমাদের ওখানে ট্রেন চলত ছোট লাইনে। তারা যে কয়লাটা ফেলে দিত সেটা কোক কয়লা ছিল। কোক কয়লা ছাড়া ইঞ্জিন চলত না। পয়সা-কড়ি বা অন্যকিছু দিলে অনেক সময় ড্রাইভাররা ইঞ্জিন থেকে লাইনের পাশে ওই কয়লা ফেলে দিত। তা কুড়িয়ে নিত গ্রামের ছেলে-মেয়েরা। যা-ই হোক, ধান বিক্রি হলো। ধান বিক্রি হওয়ার পরে যে টাকাটা পাওয়া গেল, সেই টাকা দিয়ে কয়লা কেনা হলো। আর যে যে জিনিস না কিনলেই নয় সে হলো নুন। নুন তো আর গ্রামে হয় না। যেমন, কেরোসিন গ্রামে হয় না। এগুলো তো দরকার। আমাদের গ্রামের স্কুলের মাইনে ছিল এক টাকা। আমাদের দুই ভাইয়ের জন্য দু-টাকা মাসে। পাঠশালায় তো কোনোদিন দিইনি। পাঠশালায় কাঁচাপয়সা দেওয়ার রীতিই ছিল না। সিদে দিতে হতো। সিদে মানে হচ্ছে মাসে দুই কেজি চাল, সঙ্গে আলু, পটল এইসব। এই তোর সিদে এখনো দেওয়া হয়নি। আচ্ছা স্যার, বাবাকে বলে এনে দেবো। মজার মজার গল্প সব। তুই আনিসনি কেনরে? সে বলল—বাবা বলেছেন, স্কুলের মাস্টারকে বলিস বাবা বাড়িতে নেই। এইরকম সব ব্যাপার ছিল। আমি সেই সিদেটাও কোনোদিন দিইনি। কাজেই আমি কেবলই ফাঁকি দিয়ে বিনা পয়সায় পড়েছি। কিন্তু স্কুলে তা হওয়ার উপায় নেই। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর মনীন্দ্র মাস্টারের পীড়ন আরম্ভ হয়ে গেল। এই, মাইনে কালকে আনবি। কইরে এনেছিস? না, স্যার কাল আনব। কাল আনবি? এই করতে করতে শেষে বলতেন, স্কুলে নাম কেটে দেবো। বাবাকে ভয়ে বলতে পারতাম না। বললে বলতেন যে, যা যা, হবে হবে। তিনি কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। আমার কপাল ভালো যে ফাইভ আর সিক্সে পড়ার পরে সেভেনে উঠতেই হেডমাস্টার মশাই এসে বললেন—এই স্কুলে মুসলিমদের জন্য তফসিল করা আছে, আলাদা বরাদ্দ আছে। তা তোর নামটা পাঠিয়েছিলাম, তোর নামে ফ্রি স্টুডেন্টশিপটা চলে এসেছে। ব্যস, ক্লাস সেভেন থেকে আর আমার কোনোদিনই বেতন দিতে হয়নি। এতে করে মনীন্দ্রবাবুর হাত থেকে তো বেঁচে গেলাম।
স্কুলের বইপত্র জোগাড় করা কঠিন ছিল। বই আমরা নতুন খুব কমই কিনতে পারতাম। ফাইভ-এর ছেলেরা সিক্স-এর ছেলেদের কাছ থেকে, সিক্স- এর ছেলেরা সেভেন-এর ছেলেদের কাছ থেকে পুরোনো বই কিনত। দু আনা চার আনা করে দাম। কোনো কোনো বই খুব পুরোনো। ইতিহাস, ভূগোল এসব বই প্রতিনিয়ত বদলাত। নতুন রাজ্য হচ্ছে, নতুন ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। নতুন বই কেনার সুযোগ ছিল না। আমার পুরোনো বই পুরোনোই থাকত। আমার বড় পিসতুতো ভাই, মানে ফুফাত ভাই ওই স্কুলে পড়ত। তার বাড়ির লোকেরা সম্পন্ন ছিল। তাকে সব বই কিনে দেওয়া হতো। সেই বইগুলো আমার বিদ্যার প্রথম পাঠ। আমি ফাইভে পড়ি কিন্তু লুই ক্যারলের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড পড়েছি। ক্লাস সেভেন থেকে টেন পর্যন্ত রমেশচন্দ্র মজুমদারের ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ ছিল। বইটা আমার পাঠ্য ক্লাস সেভেনে। আগাগোড়া পড়া হয়েছে আগেই। আমার আগ্রহ ছিল ভারত ইতিহাসে। ভূগোলে কোনো আগ্রহ ছিল না। সাহিত্যে ছিল। কি সংস্কৃত কি বাংলা। আমি যখন স্কুলে ভর্তি হলাম, ক্লাস সিক্স থেকে স্কুলের লাইব্রেরিতে যেতে শুরু করলাম। সপ্তাহে একদিন লাইব্রেরি খোলা থাকত। ওইদিন আমি গিয়ে কিছু বই নিতাম। ওই সূত্রে আমি অনেক পড়েছি। ক্লাস সেভেন থেকে টেন পর্যন্ত অনেক পড়েছি, একেবারে নিরবচ্ছিন্ন পড়া। টলস্টয়, আলেকজান্ডার, দুমা পড়েছি। চার্লস ডিকেন্স ইত্যাদি পড়েছি। কত বই যে পড়েছি। এসব বই কিন্তু সব ইংলিশে নয়। বাংলা বইও পড়েছি। শরত্চন্দ্রের, বঙ্গিমচন্দ্রেরও বই পড়েছি। তবে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সাথে পরিচয়টা একটু দেরিতে হয়েছে। ক্লাস সেভেন একটা খারাপ সময় ছিল। দুর্ভিক্ষের মতো একটা অবস্থা এল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ওই সময়টাতেই শেষ হয়েছে কেবল। ১৯৪৫ সালে। যা-ই হোক পড়াশোনার পরিবেশ অনেকটা অনুকূল ছিল। যার জন্য পড়তে পেরেছিলাম। আমি ভীষণ দুষ্ট ছিলাম। কিন্তু কারো ক্ষতি করতাম না। অনেকেই থাকে, লোকজনের জিনিসপত্র নষ্ট করে দেয়। ফল একটা খেল, ১০টা ছিঁড়ল। আমি সারাদিন বাইরে থাকতাম। বাড়িতে কেউ খোঁজ-খবর নিত না। ছেলে কোথায়—কে দেখে। কোথায় ডুবে মরল, কোথায় গাছ থেকে পড়ে ঠ্যাঙ ভাঙল—এটা দেখার কেউ নেই। বাবা তো সারাদিন গ্রামের বাইরেই থাকতেন। আর আমি এই সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাতাম। তামিল পুকুরের পাড় থেকে একটা তালগাছ বাঁকা হয়ে ওপরে আকাশের দিকে উঠে গিয়েছিল। বাজ পরে তাল গাছের মাথাটা ভাঙা। ওই তালগাছটার মাথায় উঠে দুই হাত তুলে দিয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিতাম। বুকে পানির ধাক্কা লাগলে ওইখানেই মৃত্যু নিশ্চিত। এটা থেকে বাঁচার জন্য আমাদেরকে পা দুটো আগে পানিতে ফেলতে হতো। এসব কায়দা আমরা শিখে ফেলতাম। বড় বড় গাছে উঠতাম। অশথ গাছ। আমাদের বাড়িতে কয়েকটা ছাগল ছিল। আমারও দুয়েকটা আদরের ছাগল ছিল। ছাগলকে পাতা খাওয়াতে আমি বট অশথ গাছের মাথায় উঠে যেতাম। আমগাছে কাঁচা আম পাড়ার জন্য উঠতাম। শীতকালে আমাদের গ্রামের মাঠের বড় বড় গাছেও চড়তাম। এখানে সেখানে জঙ্গল ছিল। কুল গাছের জঙ্গল। আমরা ওগুলোকে বনকুল বলতাম। প্রচুর হতো। কোনো কোনোটি খাওয়াই যায় না। কোনোটি ভালো। বাদ দিতাম না। তাও খেতাম। সাপ দেখলে কথা নেই মারবই। ভয়ঙ্কর সাপ। গোখরো সাপ। একা থাকলে একাই মারতাম। একসাথে কয়েকজন থাকলে তো ওই সাপের রক্ষা নেই। মারা হবেই। সাপ পালিয়েও রক্ষা পেত না। গ্রাম থেকে তিন-চারজন মিলে দুয়েকটা তেজি কুকুর নিয়ে নিতাম। সেদিন আমাদের শিকারের দিন। একটা কুকুর ছিল লেজ কাটা। ভারী তেজ ছিল তার। দূরের মাঠে গিয়ে শিয়াল দেখলে তাড়া করা। কুকুরও দৌড়াচ্ছে, আমরাও দৌড়াচ্ছি। শেষ পর্যন্ত কুকুরটা একদম শিয়ালটার কাছে চলে যেত। জীবনে কোনো কুকুর কোনো শিয়ালকে ধরতে পারেনি। মনে হয় শেষ মুহূর্তে সাহস করত না। শিকারী কুকুর তো নয়। তাড়া করত ঠিকই। এইটুকু ছোট খেকশিয়াল। কী স্পিড! অসম্ভব দৌড়ুত। আর ভোঁড় শিয়াল। ওগুলো দৌড়ুত কম। তবে তারাও ভালো দৌড়ুত।
আমার পড়াশোনায় কোনো ফাঁকি ছিল না। প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। রাত্রিবেলায় হারিকেন নিয়ে পড়তাম। হারিকেন না পেলে লমফ। চৌকো টিনের পাত্রে কেরোসিন। ভেতরে পাক দেওয়া একটা বাতি। দপ দপ করে জ্বলত। আলো অনেক হতো। প্রচুর ধোঁয়া হতো। নাকে এসে ধোঁয়া লাগত। লমফয় পড়া, না হয় হারিকেনে পড়া। মাঝখানে খুব কেরোসিনের অভাব হলো। তখন মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়া। এক টাকায় ১৬-টা মোমবাতি পাওয়া যেত। ক্লাস সেভেনে আমি নষ্ট হয়ে গেছি, বখে গেছি। তখন আমি রাখালদের সঙ্গে গরু চরিয়েছি, গরুর গাড়ি চালিয়েছি। আমার বড় বোন বাড়িতে থাকত। তার সঙ্গে গল্প-টল্প করতাম। বর্ষাকালে জাম পাকত। তিন-চার ঘণ্টা জাম গাছেই থাকতাম। পেট ভরে জাম খেয়ে সূর্য যখন ঝিকমিক ঝিকমিক করছে, তখন গাছ থেকে নামতাম। বাড়িতে যেতাম। ফুফু একটু বকত। কারণ, আমাদের পালয়িতা হচ্ছে আমাদের ফুফু, মা নয়। আমাদের সবারই পালয়িতা হচ্ছে আমার ফুফু। বিধবা হয়ে আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। বকত, আবার ডেকে নিয়ে আদরও করত। আমার ফুফুর কথা মনে পড়লে আমি আত্মসংবরণ করতে পারি না।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ১৯
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০৩
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৩২
এশা৭:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৩৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :