The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

উপন্যাস

পারুল, ও পারুল

ইমদাদুল হক মিলন

লেকের ধারে সব বড়লোকের বাড়ি। ছবির মতো সুন্দর একেকটা বাড়ি, দেখলে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। বাড়ির সামনে নির্জন ধরনের রাস্তা, ওপাশে লেক। লেকের ধারে বিশাল বিশাল গাছপালা, সবুজ ঘাসের মাঠ। কলেজ ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা প্রেম করতে আসে। দুপুরের পর পরও জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে গাছতলায়। স্কুলের ওপরের ক্লাসের ছেলেমেয়েও আছে। ড্রেস আর বইখাতার ব্যাগ দেখে বোঝা যায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে এখানে চলে এসেছে। স্কুলের সময় পার করে বাড়ি ফিরে যাবে। প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য কিছু ব্যবসায়ী জমেছে। ভ্যান গাড়িতে চটপটি, ফুচকার পশরা সাজানো, সিজনাল ফ্রুটের পশরা সাজানো, সনপাপড়ি আইসক্রিম এমন কি চা কফিও আছে। বিস্কুট চানাচুর চিপস, অর্থাত্ খুচরো খাবার যা যা দরকার পাওয়া যায়।
হায়দার হোসেন তাকিয়ে তাকিয়ে এলাকাটা দেখছেন। রবির ডিরেকসান মতো মেয়েটি যেখানে পড়েছিল সেই মেঘশিরিষ গাছটার দিকে তাকালেন। এক জোড়া ছেলেমেয়ে পেছন ফিরে বসে আছে। রাস্তা থেকে দেখে তাদেরকে চেনা যাবে না। পরিচিত কেউ পাশ দিয়ে গেলেও বুঝতে পারবে না ওরা কারা। পাশে ব্যাগ রেখে মেয়েটির কাঁধে হাত দিয়ে বসে আছে ছেলেটি।
সেদিকটায় তাকিয়ে সিগ্রেট ধরালেন হায়দার। তাঁর পরনে সাদা হাফহাতা শার্ট আর ঘি রংয়ের প্যান্ট, পায়ে স্যান্ডেল সু, চোখে সানগ্লাস। দেখে পুলিশ মনেই হচ্ছে না।
ঘণ্টাখানেক ধরে এলাকাটায় ঘুরছেন হায়দার। কয়েকটি বাড়ির সিকিউরিটির লোকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বড়লোক বাড়ির দারোয়ান সিকিউরিটির লোকদেরও বিরাট ভাব। সাধারণ লোকজনকে পাত্তাই দিতে চায় না। যদিও হায়দারকে একেবারেই সাধারণ লোক মনে হচ্ছে না। পোশাক আশাক সানগ্লাস ইত্যাদি মিলিয়ে মার্জিত, ভদ্রলোক মনে হচ্ছে। তবু লোকগুলো কথা বলতে চাইছিল না। পুলিশের লোক বলায় এক বাড়ির সিকিউরিটির লোক আইডি কার্ড দেখতে চাইল। হায়দার খুবই বিনীত ভঙ্গিতে আইডি কার্ড দেখিয়েছেন। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলেছেন। কী নাম, কতদিন কাজ করছে এখানে, বাড়ি কোথায়? একসময় বেশ কায়দা করে প্রসঙ্গটায় ফিরেছে। গত তিন-চার দিনের মধ্যে লেকের ধারে ওই গাছটির তলায় রাতেরবেলা একটি দশ এগারো বছরের মেয়েকে দেখেছে কি না। বাড়ির কাজের মেয়ে। রোগা পটকা কঙ্কালের মতো। শরীরে মাথায় মারের দাগ ছিল। রাতে না দেখে থাকলে দিনে দেখেছে কি না।
না সে দেখেনি। মোট সাতটা বাড়ির লোকদের সঙ্গে কথা বললেন হায়দার, কেউ তেমন কিছুই বলতে পারল না। কেউ কেউ বলল, গরিব ভিখিরি, রাস্তার ওরকম ছেলেমেয়ে কত আসে যায় এখানে। গাছতলায় শুয়ে বসে থাকে। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে রাতেও শুয়ে থাকে কেউ কেউ। গরম পড়ে যাচ্ছে, এখন লেকের ধারে ওরকম মানুষের সংখ্যা সন্ধ্যার পর থেকেই বাড়তে থাকে। আমরা তাকিয়েও দেখি না।
দারোয়ান সিকিউরিটির লোকদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে, এই শ্রেণির লোকদের কাছ থেকে কোনো তথ্যই পাওয়া যাবে না। চালাকি করে এক বাড়ির সিকিউরিটিকে জিজ্ঞেস করেছিল, বাড়িতে ফ্ল্যাট ক’টি, কী ধরনের লোকজন থাকে। কাজের লোকজন কেমন এই বাড়িতে। ফ্ল্যাট মালিকরা কেমন ব্যবহার করেন তাদের সঙ্গে।
এসবেও সুবিধা হয়নি। তোতাপাখির মতো মুখস্থ কথা বলে গেল লোকটা। আরে না না ভাই, এই বাড়িতে যাঁরা থাকেন তাঁরা বিশাল বিশাল সব লোক। বোঝেন না, একেকটা ফ্ল্যাটের দাম চার-পাঁচ কোটি টাকা। কোটি টাকা দামের গাড়ি চালান একেকজন। কাজের লোকজন দেখলে বুঝবেনই না তারা বাড়ির কাজের লোক। অল্প বয়সী মেয়েগুলোকে দেখলে মনে হবে, ওই যে লেকের ধারে যারা ইটিস পিটিস করতে আসে, ওদের মতো। বাড়ির কাজের মেয়ে মনেই হবে না। পরির মতো সুন্দরীও আছে দুই-চার জন।
হায়দার মনে মনে বলেছেন, তুই থাক শালা তোর পরি নিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে তারপর এসেছেন লেকের ধারে। মেয়েটি যেখানে পড়ে ছিল তার কাছেই রাস্তার ধারে চটপটি ফুচকার ভ্যানগাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দোকানদার। লোকটার পরনে চকলেট রংয়ের পাঞ্জাবি, মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় গোলটুপি, স্বাস্থ্য ভালো, মুখে পান আছে আর আছে বেশ একটা সুখী সুখী ভাব।
হায়দার তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। স্লামালেকুম ভাই।
লোকটা কুতকুতে চোখে তাকাল। পানের পিক ফেলে বলল, ওয়ালাইকুম সালাম, আপনেরে তো চিনলাম না স্যার।
আমাকে আপনার চিনবার কথা না। আগে পরিচয় হয়নি। আছেন কেমন?
মাশাল্লা ভালো আছি। যারা স্যার ব্যবসা-বাণিজ্য করে, এই আমার পদের ব্যবসা আর কি, তাগো যখনই আপনে জিজ্ঞাসা করবেন তখনই বলবো, আরে না ভাই, ভালো নাই। ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ। আমি স্যার ওই পদের মানুষ না। আল্লায় আমারে ভালো রাখছে। এই ব্যবসা কইরা যা কামাই করি, বউ-পোলাপান লইয়া ভালোই থাকি।
থাকেন কোথায়?
রায়ের বাজার। কিন্তু স্যার আপনে এত কথা জিজ্ঞাসা করতাছেন কেন?
হায়দার অমায়িক হাসলেন। এমনিতেই। এদিকে বেড়াচ্ছিলাম, আপনার চেহারা দেখে ভালো লাগল, নামাজি মানুষ মনে হলো, এজন্য কথা বলতে এলাম। এখানে দোকানদারি করেন কতদিন ধরে?
বহুত দিন হইল। আট-দশ বছর। সকাল দশটার দিকে আসি, রাত দশটার দিকে ফিরা যাই। তয় স্যার পুলিশরে কিছু পয়সা দিতে হয়, নইলে সরাইয়া দিতে চায়। কায়কারবার করলে পুলিশরে তো স্যার হাতে রাখতেই হইব, না কী কন!
কথাটা এড়িয়ে গিয়ে হায়দার বললেন, দিন চার-পাঁচেক আগে কি সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ছিলেন?
জি আছিলাম। রোজই থাকি।
আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন?
লোকটা তীক্ষচোখে হায়দারের দিকে তাকাল। সাহায্য, আমি!
না না টাকা-পয়সার ব্যাপার না। আরে দেখুন কী কাণ্ড! এতক্ষণ ধরে কথা বলছি কিন্তু আপনার নামটাই জানা হয়নি।
আমার নাম স্যার মজিদ মিয়া।
শুনুন মজিদ মিয়া, আমি জানি আমার মতো পোশাক পরা এক ধরনের লোক, ওগুলো আসলে চিটার, আপনাদের মতো ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে এসে নানাভাবে টাকা-পয়সার ধান্দা করে। কখনো সাহায্য চেয়ে, কখনো ছল-চাতুরি করে পাঁচ-দশ টাকা এমন কি বিশ-পঞ্চাশ টাকা হাতিয়ে নেয়। আমি সেই জিনিস না।
মজিদ মিয়া হাসল। আইজ কাইল মানুষ চিনন যায় না স্যার। কে যে কোন মতলবে আসে বুঝা যায় না। আপনার মতলবটা বইলা ফালান।
হায়দার আবার সিগ্রেট ধরালেন। দিন চার-পাঁচেক আগে ওই গাছটার তলায় দশ-এগারো বছরের একটা মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখেছেন?
মজিদ মিয়া চিন্তিত হলো। মনে হয় দেখছি স্যার। রাতের বেলা দেখছি।
হায়দার চমকালেন। দেখেছেন?
হ স্যার দেখছি। রাত আটটা সাড়ে আটটার দিকে খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে পশ্চিম দিক থিকা হাঁইটা আইলো। রোগা কেংলামতন দেখতে, শরীলে মাইর ধইরের দাগ। মাথার চুল কাটা। খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে আইসা ওই গাছতলায় শুইয়া পড়লো। এই রকম পোলামাইয়া ঢাকার রাস্তায় বহুত দেখা যায়। অগো কয় ‘টোকাই’। ওই টোকাই পদের। কই আছিল, কই মাইর ধইর খাইছে কে জানে। ওগো দিকে কে চাইয়া দেখে!
হায়দার সিগ্রেটে টান দিয়ে বললেন, আপনি দেখেছিলেন কেন?
আমার স্যার চোক্ষে পড়ে সবকিছুই। ফুটপাতে দোকানদারি করি, চোখ রাখতে হয় চাইরদিকে। রাস্তাঘাটের বেবাক মানুষজনই দেখি। ওই মাইয়াটারেও দেখছি। গাছতলায় শুইয়া পড়লো। বুঝলাম দুনিয়াতে কেউ নাই। কোন বাপে কোন মার পেটে জন্ম দিয়া পলাইছে, মায়ও হয়তো খেদাইয়া দিছে, অহন রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। হয়তো চুরি করতে গিয়া ধরা খাইছে, তার বাদে খাইছে

মাইর। পুলিশে না দিয়া মাইর ধইর দিয়া মাইনষে ছাইড়া দিছে। ওগো হইলো স্যার কইমাছের জান। বেদম মাইর খাইয়াও মরে না। বুজলাম আইজ রাইত ওই গাছতলায় পইড়া থাকবো, কাইল বিয়ানে মাইর খাওয়া কুত্তার মতন আবার বাঁচনের আশায় উইঠা বইবো। পরদিন আইসা দেখলামও তা-ই।
কী দেখলেন?
দেখি মাইয়াটা ওইখানে নাই। কই চইলা গেছে কে জানে! বাঁচতে হইব না? খাওন দাওনের আশায় উইঠা খাঁড়াইছে।
হায়দার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মজিদ মিয়া, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনার কাছ থেকে পেলাম। মেয়েটা হেঁটে হেঁটে আসছিল এখানে।
জি স্যার, আমি নিজ চোক্ষে দেখছি। আর একটা কথা হইলো স্যার, আমি মিছাকথা কই না। নামাজি মানুষ। আজানের লগে লগে দোকানে কেউরে বহাইয়া, মসজিদে গিয়া জামাত ধরি। কিন্তু স্যার একটা ঘটনা বুঝি নাই! ওই রকম একটা মাইয়া লইয়া আপনে এত কথা জিগাইতাছেন ক্যান?
আমি পুলিশের লোক।
মজিদ মিয়া আঁতকে উঠল। জে?
হ্যাঁ। মেয়েটা রাস্তার মেয়ে না। মনে হয় কোনো বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল...
বুজছি বুজছি স্যার। কাম পারে না দেইখা মাইর ধইর দিছে। পরে মাইয়াটা পলাইছে। রাস্তাঘাট চিনে না দেইখা ওই গাছতলায় আইসা পইড়া আছিল।
তা-ই হবে। আমরা সব খুঁজে বের করে ফেলবো।
মাইয়াটা অহন আছে কই?
হাসপাতালে।
আল্লাহ রহম করুক।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভাই। অনেকক্ষণ কথা বললেন আমার সঙ্গে। ভাগ্য ভালো আপনাকে পেয়েছিলাম, নয়তো বুঝতেই পারতাম না মেয়েটি হেঁটে হেঁটে এখানে এসেছিল। এখন ধীরে ধীরে আসল ঘটনা বের করে ফেলবো। আসি ভাই।
জি স্যার। স্লামালেকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম।


দুই
করুণ বিষণ্ন চোখে কবির দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। এখন আর চোখে পানি নেই। সামান্য যেন সজীবও হয়েছে চেহারা। দুপুরে টিউব দিয়ে লিকুইড খাওয়ানো হয়েছে। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হচ্ছিল। গলায় বোধহয় ব্যথা। তারপর ধীরে ধীরে খেতে লাগল। মুখ দিয়ে খেতে পারছে বলে স্যালাইন খুলে ফেলা হয়েছে। বাঁ হাতে ক্যানোলা রয়ে গেছে। যদি আবার স্যালাইনের দরকার হয় তখন যেন নতুন করে ক্যানোলা না করতে হয়।
খাওয়ার মিনিট দশ-পনেরো পর ক্যাপসুল ট্যাবলেট মিলিয়ে পাঁচটা ওষুধ দেওয়া হলো। ওষুধও ঠিক মতোই খেল। দুজন নার্স অতিযত্নে উঠিয়ে বসিয়েছিল মেয়েটিকে। স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিল। দু’বার বাথরুমে নিয়ে গেছে। কবি তখন বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করেছে।
কবি এখন বসে আছে মেয়েটির সামনে। তাকে রুমে আনার পর পরই চেয়ারটা বেডের পাশে এনে রেখেছে। সারাক্ষণ বসে থাকছে মেয়েটির পাশে। ভাইয়া ভাবী কুহু কেকা চলে যাওয়ার পর নয়ন ফোন করেছিল। শোন, তুই তো জানিসই আমাদের টিভি চ্যানেল আছে ‘নিউজ টুয়েন্টিফোর’, রেডিও আছে ‘রেডিও ক্যাপিটেল’। তোর ওই মেয়ের নিউজ আমাদের তিনটি কাগজ আর নিউজ পোর্টালে যাওয়ার পর বেশ একটা নাড়াচড়া পড়েছে। মেয়েটিকে নিয়ে আমাদের টিভি একটা রিপোর্ট করবে। নিউজ চ্যানেল তো, এই ধরনের মানবিক রিপোর্ট আমরা করি। রাত্রি নামে আমাদের একজন রিপোর্টার যাবে। ক্যামেরাম্যান থাকবে টিপু। তুই ওদের হেল্প কর।
মেয়েটা তো কথা বলে না। ওর কথা না থাকলে কী রিপোর্ট হবে!
আরে ব্যাটা ওটাই নিউজ। বিভিন্ন এঙ্গেলে মেয়েটিকে ধরবে ক্যামেরা আর রাত্রি বলে যাবে পুরো ঘটনা। তুই তাকে কীভাবে তুলে এনেছিস, এতবড় হাসপাতালে রেখে ট্রিটম্যান্ট করাচ্ছিস, তোর ইন্টারভিউও করবে রাত্রি।
না রে আমার ইন্টারভিউর দরকার নেই। টিভি ক্যামেরা দেখলে আমার বুক কাঁপে। পালপিটিশান শুরু হয়। আমি পারবো না।
চুপ কর। যা বলছি তা-ই করবি। মেয়েটার ভালোর জন্যই এসব দরকার। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রাত্রি পৌঁছে যাবে।
তারপরই নিজের স্বভাবে ফিরল কবি। বন্ধু, রাত্রি দেখতে কেমন?
হেব্বি।
তাহলে ঠিক আছে। আমি আবার সুন্দরী মেয়ে না হলে তাদের সঙ্গে কথা বলি না। খেদি পেঁচিতে আমি নেই।
এজন্যই সুন্দরী পাঠাচ্ছি।
ওকে বন্ধু, পাঠাও। আমার মনে হচ্ছে তুমি এবার আমাকে বিখ্যাত করে ছাড়বে। এরপর মনে হয় সিনেমায় ডাক পড়বে।
চাইলে সেই ব্যবস্থা করা যাবে। নো প্রবলেম। রাখলাম এখন, কাজ আছে।
ওকে কাজ কর।
নয়নের কথামতোই এল রাত্রি আর টিপু। হাসপাতালে টিভি ক্যামেরা ঢোকাতে হলে চেয়ারম্যানের পারমিশান লাগে। রুনুভাই পারমিশান দিলেন। ওরা দুজনই বেশ এক্সপার্ট। টিপু নানা এঙ্গেলে মেয়েটিকে ধরলো আর সেই ফাঁকে কথা বলে গেল রাত্রি। খুবই স্মার্ট সুন্দরী মেয়ে। বাচনভঙ্গি চমত্কার। একসময় কবির সঙ্গে কথা বলল। কথা বলতে গিয়ে কবি টের পেলো একটুও নার্ভাস লাগছে না তার। বেশ স্মার্টলি তার মতো করে গুছিয়ে সব বলল। মেয়েটি তখন বিস্মিত চোখে সবাইকে দেখছিল।
কবির সঙ্গে কথা বলা শেষ করে রুনুভাইর রুমে গিয়েছে ওরা। রুনুভাইর ইন্টারভিউ করেছে, ডক্টর রিমির ইন্টারভিউ করেছে। আজই সন্ধ্যার খবরে প্রচার করা হবে। তার মানে ভালো রকম সাড়া ঘটনাটা নিয়ে পড়বে।
মেয়েটির সামনে বসে এখন সেসব কথাই বলছিল কবি। তুমি কথা বলছো না দেখে কত রকমের অসুবিধা হচ্ছে জানো! প্রথম অসুবিধা হচ্ছে আমি তোমার নামটাই জানি না। কী নাম তোমার, বলো না আমাকে। আমি জানি তুমি কথা বলতে পারো। ইচ্ছে করলেই সব বলতে পারবে। বলো না! আর তুমি কথা বললে কত সুবিধা হতো জানো! কোন বাড়িতে ছিলে তুমি, কতদিন ছিলে, তারা কেন এত অত্যাচার করেছে তোমার ওপর, সব যদি টেলিভিশনে বলতে তাহলে আজই পুলিশ ওই লোকগুলোকে ধরতো, জেলে ঢুকাতো ওদেরকে।
মেয়ে কথা বলে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কবির দিকে।
কবি বলল, আমার ভাই ভাবীকে কেমন লাগল তোমার? আমাদের কুহু কেকাকে? রুনুভাই, ডক্টর রিমি, কেমন ওরা? এই, রিমি খুব সুন্দর না! আমি এখনো বিয়ে করিনি, জানো। রিমিকে বিয়ে করে ফেলবো নাকি?
বলেই হাসল কবি। ধুত্ কী বলছি! রিমি তো বিবাহিতা। ওর একটা ছেলে আছে। বিবাহিতা মেয়েকে বিয়ে করবো কী করে! যদি স্বামী না থাকতো তাহলে বিয়ে করা যেত। রিমিকে বিয়ে করলে একটা সুবিধাও হতো। বউর সঙ্গে রেডিমেড একটা ছেলেও পেতাম।
এসময় টুক টুক শব্দ হলো দরজায়। কবি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, কাম ইন।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঢুকলেন হায়দার। তাঁকে এই পোশাকে দেখেনি কবি। একেবারেই অন্যরকম লাগছে। হাসিমুখে বলল, আপনাকে তো ভদ্রলোকের মতো লাগছে। পুলিশ মনেই হচ্ছে না।
হায়দার অমায়িক হাসলেন। পুলিশও ভদ্রলোক বস। এত হেলাফেলা করবেন না।
তারপরই মেয়েটির দিকে তাকালেন হায়দার। তাকিয়ে মুখ উজ্জ্বল করলেন। আরে বা, জ্ঞান ফিরেছে দেখি। ফ্রেশও লাগছে। কাজ হয়ে গেছে। থ্যাংকস গড। তবে কবি সাহেব, আপনার দোয়ার বরকতে খাগড়াছড়ি ট্রান্সফারটা হইনি।
বলেন কী!
জি। আপনার ভাই আর চেয়ারম্যান সাহেব দুজনেই কমিশনার স্যারকে ফোন করেছেন। আমার ব্যাপারে ভালোই অভিযোগ করেছেন। স্যার তো আর সরাসরি আমার রেঞ্জের অফিসারকে ফোন করবেন না, তিনি করলেন এসপি সাহেবকে, এসপি সাহেব করলেন আমার বসকে, অর্থাত্ ওসি সাহেবকে। স্যার ভালো রকম সানটিং দিলেন আমাকে। সেই সানটিং খেয়ে নিজেই তদন্তে বেরিয়ে গেলাম। ইচ্ছা করলে এসআই টাইপের কাউকে স্পটে পাঠাতে পারতাম। তা না করে নিজেই গেলাম। ভালো তথ্য নিয়ে এসেছি। তবে প্রধান খাদ্যটা আজ কিন্তু খাওয়াতে হবে। পেটে ভীষণ খিদে। এখন একটু চা-বিস্কুট খাওয়ান।
সোফায় বসলেন হায়দার। কাগজের রিপোর্ট ভালো হয়েছে। আমি পড়েছি ডেইলি সানে। কাগজটা ভালো করছে।
কবি বলল, সন্ধ্যাবেলা নিউজ টুয়েন্টিফোরের নিউজে দেখাবে।
তাই নাকি! শাবাশ। ভালো হুলুস্থূল লাগিয়ে দিলেন দেখছি। আর ওই যে ছেলেটা রিপোর্ট করেছে, ওকে আমি চিনি। ভালো ছেলে।
কীভাবে চেনেন তাও জানি। আচ্ছা নয়নের কেস থেকে কত খেয়েছিলেন বলুন তো?
হায়দার হাসলেন। ভুলে গেছি ভাই। মানুষ কোনদিন কতটা ভাত খায় সেটার কি হিসাব রাখে! চায়ের কথা বললেন না?
তার মানে আপনি অনেকক্ষণ থাকবেন?
কিছুক্ষণ তো থাকবোই।
ইন্টারকমে চায়ের অর্ডার দিয়ে কবি বলল, না আপনাকে খাগড়াছড়ি পাঠাতেই হবে। ভালো জ্বালাচ্ছেন!
মেয়েটি একবার কবিকে দেখছে একবার হায়দারকে। হায়দার একবার তার দিকে তাকিয়ে কবিকে বললেন, বড়ভাই, মেয়েটিকে ওরা মেরে ফেলে দেয়নি।
কবি চমকালো। মানে?
মৃত ভেবে ফেলে যায়নি।
তাহলে?
ও হেঁটে হেঁটে ওখানে এসেছিল।
তাই নাকি?
জি।
কে বলল আপনাকে?
কীভাবে তথ্যটা পেয়েছেন, বললেন হায়দার। শুনে কবি বলল, এখন তো আমার অন্যরকম সন্দেহ হচ্ছে।
কী রকম?
ঘটনা আমরা যেমন ভেবেছি তেমন নাও হতে পারে। হয়তো ঘটনা এরকমই না। কোনো বস্তিতে থাকতো। সংসারে হয়তো সত্মা অথবা সত্বাবা। তারাই কেউ এভাবে দিনের পর দিন মেরেছে। একদিন আর মার সহ্য করতে না পেরে পালিয়েছে।
হতে পারে, এমনও হতে পারে। এসবের সবচে’ ভালো জবাব দিতে পারবে মেয়েটি নিজে।
ওখানেই মার খেয়ে গেলাম। মেয়েটি কথাই বলে না।
আমি একটু চেষ্টা করে দেখবো?
দেখতে পারেন। তবে কোনো বাজে আচরণ করতে পারবেন না।
বাজে আচরণ মানে?
পুলিশদের কত বাজে কায়দা আছে না...
আরে না ভাই, এইটুকু মেয়ের কাছ থেকে কথা বের করার জন্য বাজে কায়দার কথা আপনি ভাবছেন কেন? পুলিশকে অমানুষ ভাবছেন কেন? আমিও মানুষ, উচ্চশিক্ষিত রুচিশীল ভদ্রলোক। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে আমার কিছু সুনামও আছে। কিছু ঊর্ধ্বতন আমাকে পছন্দও করেন। সেই জোরেই খাগড়াছড়িটা ঠেকিয়েছি।
বেয়ারা চা নিয়ে এল। ট্রলি থেকে বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে খুললেন হায়দার। মুখে দিয়ে বললেন, বেশ দামি বিস্কুট। খেতে খুব ভালো। চা-বিস্কুট খেয়ে মেয়েটিকে কথা বলাবার চেষ্টা করি।
কবি কথা বলল না। তাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। মেয়েটিকে নিয়ে অন্যরকম একটা ধন্দে পড়ে গেছে।
চা-বিস্কুট শেষ করে মেয়েটির বেডের সামনে এসে দাঁড়ালেন হায়দার। খুবই মায়াবী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী গো মা? নামটা একটু বলো না! তুমি জানো, তুমি কী সুন্দর! তোমার চোখ দুটো পটলচেরা। পটলচেরা কাকে বলে জানো? পটল আছে না, পটল, সবজি। ওই পটল মাঝখান থেকে খাড়াখাড়ি কাটলে যেমন দেখতে হয় তোমার চোখ তেমন। এই রকম চোখের মেয়েরা খুবই সুন্দরী হয়। বড় হলে তুমিও খুব সুন্দরী হবে। তোমার গায়ের রং সুন্দর, চেহারা সুন্দর। এত সুন্দর মেয়েটিকে কারা এমন করে মেরেছে আমাদের সেটা জানা দরকার। আমি পুলিশ। যারা তোমাকে এভাবে মেরেছে তাদেরকে আমরা ধরবো। এজন্য তোমার সাহায্য দরকার। তুমি তাদের নাম বলো। তারা যদি তোমার মা-বাবা, ভাইবোন বা অন্য আত্মীয়-স্বজন কেউ হয়, তাদেরকেও আমরা ছাড়বো না। ধরে যেমন করে তোমাকে মেরেছে ঠিক এমন করে মারবো। ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে মাথার চুল কেটে দেবো। তুমি শুধু তাদের নাম বলো।

মেয়ে কথা বলে না। করুণ উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে। চোখ দুটো ছলছল করে তার।
হায়দার বললেন, তুমি ভয় পেও না। কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমরা তোমাকে সাহায্য করবো, আমরা তোমার গায়ে ফুলের টোকাটি লাগতে দেবো না। তুমি শুধু কথা বলো। তুমি তো কথা বলতে পারো। তুমি তো বোবা নও।
মেয়ে কথা বলে না, আগের মতোই তাকিয়ে থাকে।
হায়দার বললেন, পটলচেরা চোখের কথা বললাম, এখন তোমাকে পটলতোলা কথাটা বলি। ‘পটল তোলা’ মানে মৃত্যু। মরে যাওয়া। তুমি পটল প্রায় তুলে ফেলেছিলে। সেখান থেকে এই যে ভদ্রলোক, তাঁর নাম কবি, তিনি তোমাকে বাঁচিয়েছেন। হাসপাতালে এনে এত দামি রুমে রেখেছেন, এত ভালো চিকিত্সা তুমি পাচ্ছ। তোমার পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচা হচ্ছে। আচ্ছা ‘পটল তোলা’টা বলি, পটল সবজিটা ধরে লতানো গাছে। যে লতা থেকে পটল ছিঁড়ে ফেলা হয় সেই লতাটা তারপরই মরে যায়। এজন্য পণ্ডিতরা মৃত্যুকে পটল তোলা বানিয়েছেন। তথ্যটা মজার না!
কবি অবাক হয়ে হায়দারের মুখের দিকে তাকাল। আরে অদ্ভুত তথ্য তো! জানতাম না।
হায়দার হাসলেন। হ্যাঁ, এটা অনেকেই জানে না। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম।
আবার মেয়েটির দিকে তাকালেন হায়দার। কিন্তু তুমি কথা না বললে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে মা। তুমি ভালো হয়ে উঠবে ঠিকই, কিন্তু কারা তোমার এই অবস্থা করেছে সেটা আমরা কখনো জানতে পারবো না। তাদেরকে ধরতে পারবো না, শাস্তি দিতে পারবো না। কথা বলো না মা, কথা বলো!
মেয়ে কথা বলে না। তার অবস্থা আগের মতোই।
হায়দার হতাশ হয়ে সোফায় বসলেন। না, কাজ হচ্ছে না।
কবি বলল, আমি সারাক্ষণই চেষ্টা করছি।
যাহোক, হয়তো কোনো সমস্যা আছে মেয়েটির। হয়তো বাকরুদ্ধ হয়ে আছে সে। এভাবে দিনের পর দিন কথা না বললে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে হবে। এই হাসপাতালেই নিশ্চয় সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। আর একটু সেরে উঠলে সেই চিকিত্সা করানো যাবে।
একটু থামলেন হায়দার, তারপর বললেন, আমাদের এখন খোঁজখবর করতে হবে অন্যভাবে। যেহেতু মেয়েটি পায়ে হেঁটে ওখানটায় এসেছিল, আমার মনে হয় আশপাশের কোথাও থেকে এসেছে। ওই শরীর নিয়ে বেশি দূর থেকে হেঁটে আসা সম্ভব না।
কিন্তু ওটা তো বড়লোক পাড়া। ওখানে বস্তি কোথায়?
বস্তির কথা কেন বলছেন?
দু’রকম সম্ভাবনাই আছে। হয় মা-বাবা টর্চার করেছে আর নয়তো মেয়েটি ছিল কোনো বাড়ির কাজের মেয়ে। ওই বাড়ির লোকরা কাজটা করেছে।
শুরু থেকে আপনি যে ধারণা করেছেন, আমি আপনার সেই ধারণার সঙ্গে একমত। অর্থাত্ মা-বাবা, সত্ হোক আর আপন হোক তারা এটা করেনি, মেয়েটি কাজের মেয়েই ছিল। সাহেব মেমসাহেবরাই কাজটা করেছেন।
বের করবো কীভাবে? মেয়ে তো কথাই বলে না।
দেখা যাক।
হায়দার উঠলেন। আসি তাহলে! না না প্রধান খাদ্য নিয়ে ভাববেন না। ওটা খাওয়ার সময় আছে। আমি চাইছি ঘটনা আপনাদের বাড়ির হোক। তাহলে খেতে সুবিধা হবে। পরিমাণ হবে ভালো। আপনারা হেব্বি মালদার। স্বীকার করেন না বস, স্বীকারটা করে ফেলেন। তাহলে আমার কাজ ইজি হয়।
কবি বলল, খাগড়াছড়ি কিন্তু ঠেকাতে পারবেন না।
হায়দার হা হা করে হাসলেন।


তিন
আজ বিকেলে রিমির সঙ্গে শিখা আছে। দু’জন রুমে ঢুকে বেডের সামনে এসে দাঁড়াল। শিখার হাতে স্টিলের ট্রেতে ব্যান্ডেজ স্পিরিটের শিশি আর দু-তিনটা অয়েনম্যান্টের টিউব। সে অর্থপূর্ণ চোখে রিমির দিকে তাকালো, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রিমি তাকালো কবির দিকে। বাইরে যান।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না কবি। বলল, জি?
বাইরে যেতে বলছি।
কেন?
ওর ঘাগুলো ড্রেসিং করাবো।
আমি থাকলে অসুবিধা?
নিশ্চয়। ওর সারা শরীরে আঘাত। কোথাও কোথাও গরম খুন্তির ছেঁকা।
ওকে, ওকে।
কবি দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েই বলল, কতক্ষণ?
দশ-পনেরো মিনিট। আগে শিখা ওকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাবে, তারপর ড্রেসিংয়ের কাজ শুরু করবো।
ও কি হাঁটতে পারবে?
হাঁটার দরকার কী? আপনি দেখছেন না রুমে একটা হুইল চেয়ার রাখা আছে। বেড থেকে তুলে হুইল চেয়ারে বসানো হবে...
বুঝেছি, বুঝেছি। কিন্তু আপনি এত রুডলি বলছেন কেন! একটু সফট করে বলুন না!
মুখের মজাদার ভঙ্গি করে রিমি বলল, আচ্ছা বলছি। আপনি প্লিজ একটু বাইরে যান না! এবার হয়েছে?
হয়েছে, যাচ্ছি।
কবি রুম থেকে বেরিয়ে এল।
দশ-বারো মিনিট পর শিখা এসে ডাকলো, আসুন। আমাদের কাজ শেষ।
কবি ভেতরে ঢুকলো। রিমিকে বলল, আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
করুন।
মেয়েটি কথা বলে না কেন?
হয়তো ভয়ে আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে।
একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো যায়!
দেখাতে হতে পারে। দুয়েকদিন যাক। ও একটু শক্তপোক্ত হয়ে উঠুক।
কতদিন লাগতে পারে ওর মোটামুটি সেরে উঠতে?
দিন পনেরো।
একটু থেমে কবির চোখের দিকে তাকাল রিমি। পনেরো দিনে মনে হয় একদমই সেরে উঠবে। চিকিত্সা আমরা সাধ্যমতো করছি। চেয়ারম্যান স্যার দিনে তিন-চার বার খবর নিচ্ছেন।
আমি আরেকটা কারণে খুবই খুশি। আমার পেসেন্টটিকে পুরোপুরি আপনার আন্ডারে দেওয়া হয়েছে।
এ তে খুশির কী হলো?
একবার শিখার দিকে তাকিয়ে রিমির দিকে তাকালো কবি। আপনি বাড়ি যাবেন কখন?
কেন বলুন তো?
তেমন কোনো কারণ নেই। এমনি।
এখান থেকে বেরিয়েই যাবো।
ভরসা দিলে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি?
ভরসা দিচ্ছি।
আপনি থাকেন কোথায়?
কাছেই, ধানমন্ডি চার নাম্বার রোডে।
বাড়ি যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে এক কাপ চা খেয়ে যান না! গ্রিনটি খাওয়াব।
এখানে গ্রিনটি পাবেন কোথায়?
আমার কাছে আছে। ফ্লাস্কে গরম পানিও আছে। খান না, প্লিজ।
রিমি শিখার দিকে তাকাল। তুমি যাও।
ওকে ম্যাম।
শিখা বেরিয়ে যেতেই কবি বলল, আপনি বসুন। এই এক মিনিটের মধ্যে আমি চা তৈরি করে ফেলছি।
গ্রিনটির বক্স ফ্লাস্কের পাশেই রাখা। মগটাও রাখা আছে। গরম পানি দিয়ে সেই মগ দ্রুত ধুয়ে ফেলল কবি। মগভর্তি পানি নিয়ে টিব্যাগ ভিজিয়ে রিমির হাতে দিলো। চেয়ার টেনে রিমির মুখোমুখি বসলো। একটা গল্প শুনবেন?
চায়ে চুমুক দিয়ে রিমি বলল, লম্বা না খাটো?
মাঝারি আকৃতির। আপনার চা শেষ হতে হতে আমার গল্পও শেষ হবে।
কী আর করা যাবে, শুনি। আপনার গল্প বলার ভঙ্গিটা খারাপ না।
থ্যাংকস। এই প্রথম কিঞ্চিত প্রশংসা জুটলো।
কবি এক ফাঁকে মেয়েটির দিকে তাকাল। চোখ বুজে মাথা একদিকে কাত করে রেখেছে। হয়তো ঘুম পাচ্ছে ওর। যত ঘুমাবে তত দ্রুত সুস্থ হবে। কবি মনে মনে বলল, ঘুমাও সোনা, ঘুমাও। তারপর রিমির দিকে তাকাল। এটা এক অর্থে ভ্রমণকাহিনি।
ভণিতা না করে শুরু করুন।
ছেলেটির নাম নীলু আর মেয়েটির নাম বৃষ্টি। তারা পেনফ্রেন্ড। একজন থাকে ঢাকায় আরেকজন মফস্বল শহরে। মেয়েটি একটু বেশি সিরিয়াস। প্রতি সপ্তাহে একটি করে চিঠি লেখে। ছেলেটা উদাস টাইপের। বন্ধুবান্ধব আড্ডা এসব নিয়ে থাকে। তবু সেও মেয়েটিকে লেখে, মানে বৃষ্টিকে লেখে। বৃষ্টি তিনটা লিখলে সে লেখে একটা। দু’জন দু’জনকে ছবি পাঠায়, নীলখামে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দেয় চিঠিতে। ছেলেটা, মানে নীলু প্রায়ই ফুল জোগাড় করতে পারে না। সে একটুখানি পুরুষালি পারফিউম ছড়িয়ে দেয়। নীলু দেখতে বেশ রাফ। লম্বা চুল মাথায়, নাকের তলায় গোঁফ। সেই গোঁফ ঠোঁটের দু’পাশ দিয়ে ঝুলে পড়েছে। জিন্স টিশার্ট কেডস এসব পরে ঘুরে বেড়ায়। হাতে বালা, গলায় চেন। অবিরাম সিগ্রেট টানে। ইউনিভার্সিটিতে ভালো একটা সাবজেক্টে পড়ে। মেয়েটি পড়ে তার শহরের মেডিক্যাল কলেজে।
রিমি চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আমার মতো ডাক্তার!
তখনো ডাক্তার হয়নি।
বুঝলাম, তারপর?
পাঁচ বছর পর প্রথম দেখা হলো দু’জনার। হবু বরকে নিয়ে একদার পেনফ্রেন্ডকে বিয়ের কার্ড দিতে এসেছে। বৃষ্টিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল নীলু। ছবির চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর সে। গায়ের রং শ্যামলা, মুখটা গোলগাল, চোখ দুটো টানাটানা, মাথায় সুন্দর চুল। তাঁতের আকাশি রংয়ের শাড়ি পরা। বরও দেখতে মন্দ না।
বিয়ের অনুষ্ঠান হলো একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্টে। নীলু তার মতো করে গেছে। বরের কথা ভুলে বৃষ্টি শুধু তার পাশে এসে দাঁড়ায় আর ক্যামেরাম্যানকে বলে ছবি তুলতে। বৃষ্টি যত কাছে আসে, নীলুর হাত ধরে, কাঁধের কাছে মাথা দিয়ে দাঁড়ায়, নীলু ততই উদাস হয়, বিষণ্ন হয়। চিঠিতে কোনোদিনও মনে হয়নি বৃষ্টির সঙ্গে প্রেম হতে পারে। তার তখন দুই যুবতীর সঙ্গে প্রায় প্রেম প্রেম সম্পর্ক। কিন্তু বৃষ্টির বিয়ের দিন সে একেবারেই এলোমেলো হয়ে গেল। বিয়ে করে স্বামীর ঘরে চলে গেল বৃষ্টি। ডাক্তার হয়ে গেছে। প্র্যাকটিস শুরু করেছে। নীলুর সঙ্গে যোগাযোগ রইল না। নীলু ব্যস্ত হয়ে গেল নিজেকে নিয়ে।
একটু থামল কবি। হঠাত্ তিন বছর পর বৃষ্টির চিঠি এল। তুমি আমার সঙ্গে দেখা করো। আমি এখন ঢাকায়।
ধানমন্ডির এক চায়নিজ রেস্টুরেন্টে সন্ধ্যাবেলা দেখা করতে গেল নীলু। সেদিনও বৃষ্টি আকাশি রংয়ের শাড়ি পরা।
রিমি বলল, বৃষ্টি শুধু আকাশি রংয়ের শাড়ি পরতো কেন? দুনিয়াতে আর কোনো রং নেই নাকি?
কবি হাসলো। আকাশি ছিল নীলুর প্রিয় রং। চার বছর চিঠি লেখালেখির ফলে ওরা দু’জন দু’জনার পছন্দ অপছন্দ অনেকটাই জেনে গিয়েছিল।
বুঝলাম, তারপর?
বৃষ্টি বলল, আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে। নীলু অবাক, বলো কী? হ্যাঁ। আমি কিছুতেই ওর সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারছিলাম না। ওর আমার রুচিই মেলে না। আমার মন খুবই খারাপ। হাতে কিছু টাকা জমেছে। আমি ইন্ডিয়ায় বেড়াতে যেতে চাই। তুমি আমার সঙ্গে যাবে? না না তোমার কোনো টাকা পয়সা লাগবে না। সব খরচ আমার। তিন বছর ডাক্তারি করে আমার কাছে অনেক টাকা জমেছে। নীলু রাজি হলো। দ্রুত ভিসা করালো দু’জনার, কলকাতায় ফ্লাই করলো। বৃষ্টি আগে কখনো ইন্ডিয়াতে যায়নি। নীলু অনেকবার গিয়েছে। কলকাতার পার্ক হোটেলে গিয়ে উঠল।
চায়ের মগ চিবুকের কাছে দু’হাতে ধরে রেখেছে রিমি। সেই অবস্থায় বলল, দু’জন নিশ্চয় এক রুমে?
না।
না?
না, দু’জন দুই রুমে।
আচ্ছা, তারপর?
একসঙ্গে ডিনার করে যে যার রুমে ঢুকে গেল। গুডনাইট জানাবার সময় একটা ক্যাসেট আর ছোট একটা পকেট রেকর্ড প্লেয়ার নীলুর হাতে দিলো বৃষ্টি। আমার মনে হয় রাতে তোমার ঘুম হবে না। এই গানগুলো শুনো। আমার খুব প্রিয় শিল্পী, শান্তিদেব ঘোষ। সারারাত ওই একই ক্যাসেট ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুনলো নীলু। একেবারেই অন্য ধাঁচের, যেন এক উদাস বাউল গাইছেন রবীন্দ্রনাথের গান। গলা খুলে, প্রাণ ভরে। আমি কান পেতে রই, আমার মল্লিকা বনে যখন প্রথম ধরেছে কলি, অমল ধবল পালে, ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছ যে দান...। নীলু খেয়াল করলো, শান্তিদেব ঘোষের কণ্ঠ অভূতপূর্ব এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। হূদয় তোলপাড় করছে নীলুর। অচেনা কষ্টের এক কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছে, চোখ ফেটে যাচ্ছে। সে ঠিক বুঝতে পারলো না, কেন এমন হচ্ছে। প্রায় সারারাত নিঃশব্দে কাঁদলো। সকালবেলা ব্রেকফাস্ট টেবিলে বৃষ্টি বলল, তোমার চোখ এত ফোলা কেন? ডাক্তার মানুষ তো, বুঝে গেল। বলল, না, এটা অতিরিক্ত ঘুমের ফোলা না। তুমি কেঁদেছ। কেন, কেঁদেছ কেন? নীলু কথা বলল না। দু’দিন পর রাজধানী এক্সপ্রেসে চড়ে দিল্লি চলে গেল ওরা। ঘটনা ঘটলো ট্রেনে।
রিমি হাসল। আমি এই অপেক্ষায়ই ছিলাম। কখন ঘটনা ঘটে।
কবিও হাসল। সরি, আপনি যা ভাবছেন তেমন কিছু না।
তাহলে?
বলছি, শুনুন। পূর্ণিমার কয়েকদিন বাকি। সন্ধ্যাবেলায়ই চাঁদ আকাশে। ওরা দু’জন পাশাপাশি বসে আছে। বৃষ্টি জানালার ধারে, তার পাশে নীলু। মুখোমুখি সিটে একবৃদ্ধ, বৃদ্ধা। একসময় বৃদ্ধ ওপরে চড়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে নাক ডাকাতে লাগলো, বৃদ্ধা শুয়ে পড়লেন নিচের সিটে। নীলু জানতো বুড়ো বয়সে ঘুম পাতলা হয়ে যায় মানুষের। কিন্তু এই বুড়োবুড়ির ক্ষেত্রে হয়েছে উলটো। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গভীর ঘুম দু’জনার। নীলু আর বৃষ্টি জেগে আছে। একসময় নীলুু বলল, আমি ওপরে যাই, ঘুমাই। বৃষ্টি বলল, তোমার ঘুম পাচ্ছে? না। তাহলে যাবে কেন? তারপর নীলুর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল। তখন নীলু টের পেলো, তার বুক ঠেলে উঠছে শান্তিদেবের গান শোনা সেই রাতের মতো কান্না। নীলুর কোলে মাথা দিয়ে বৃষ্টি বলল, ‘মন যেন এক রাতের রেলগাড়ি’। কথাটার অর্থ বুঝল না নীলু। চুপচাপ বৃষ্টির মাথায় হাত বুলাতে লাগল। বৃষ্টি আবার বলল, ‘দূরের মানুষ, তুমি আমার মনের মাঝে রাখা’। তারপর গলার চেনটা খুলে নীলুকে পরিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল, ‘শিল্পীত কাছে আসা’।
রিমির চা শেষ। মগ নামিয়ে রেখে বলল, মেয়ে তো ডাক্তার না, কবি।
কবি বলল, সে কবিতার ভালো পাঠক, রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। শিল্পী টাইপের মেয়ে। অতি রোম্যান্টিক।
তা-ই তো দেখছি। তারপর?
দু’জন জড়াজড়ি করে একই সিটে বসে রইল সারারাত। দিল্লিতে গিয়ে স্টেশানের কাছে এক হোটেলে উঠল।
এবার নিশ্চয় এক রুম!
এক রুমই, তবে অদ্ভুত ধরনের। যেন এক রুমের একটা ফ্ল্যাট। ঢোকার পর সোফা পাতা, অতিথি বসার ব্যবস্থা, ভেতরের দরজা দিয়ে ঢুকে শোয়ার ঘর। ডাবল বেড। নীলু বলল, তুমি বিছানায় থেকো, আমি সোফায়। নীলুর একটা গুণ ছিল, সে খালি গলায় সুন্দর গাইতে পারে। হেমন্ত, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ, মানবেন্দ্র, মান্নাদে’র আধুনিক গান। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় দেবব্রত বিশ্বাসের মতো করে। তখন আর সিগ্রেট খায় না সে। এক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরে ছেড়ে দিয়েছে। ঘুমাবার আগে সোফায় বসে নীলু নিচু গলায় গান গাইছে, শচীনদেব বর্মণের গান, ‘তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছান পথে’। ঘর অন্ধকার। একসময় দেখে বৃষ্টি এসে তার পাশে বসেছে, দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে তার গলা। জড়ানো গলায় বলছে, থেমো না, থেমো না তুমি। আর এখানে না, এসো আমার ঘরে এসো তুমি। ভেতরের রুমে নিয়ে গেল নীলুকে। গানে গানে কখন কেটে গেল সময়, কখন ঘুমিয়ে পড়ল দু’জনে, সকালবেলা দেখে নীলুর বুকের কাছে মুখ রেখে ঘুমাচ্ছে বৃষ্টি।
রিমি বলল, খুবই বোরিং গল্প। কোনো চার্ম নেই। এই গল্প আমি আর শুনবো না। উঠি।
রিমি উঠল।
কবি বলল, আর একটু বসুন, আর একটু। শেষ হয়ে এলো বলে।
রিমি আবার বসলো। তাড়াতাড়ি শেষ করুন। বাড়ি যাবো। আমার সনজুবাবা অপেক্ষা করছে।
দিল্লি থেকে ওরা গিয়েছিল জম্মু। জম্মুতে টমটমে চড়ে ঘুড়ে বেড়ালো। পরদিন মিনিবাসে করে গেল শ্রীনগর, কাশ্মির। ডাল লেকে গিয়ে সিকারায় থাকলো। সেখানে তাদের দেখাশোনা করে ময়মুনা নামের এক মেয়ে। বিকেলবেলা শ্রীনগরের রাস্তায় হাত ধরে ঘুরে বেড়ায় দু’জনে। নীলু গান গায়, ‘ভুলে গেছি কবে সেই পথে যেতে, তুমি ছিলে মোর পাশে’। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, এক বিছানায় থাকছে দু’জনে কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো ফিজিক্যাল রিলেশান হচ্ছে না।
কেন?
জানি না।
নীলু ইমপোটেন্ট নাকি?
আরে না।
তাহলে?
আমার মনে হয় তারা দু’জনেই ছিল গভীর এক প্রেমের আবহে। শরীর নিয়ে ভাবেনি, ভাবছিল মন নিয়ে।
অদ্ভুত ভাবনা। আমি যতটা বুঝি, প্রথমে মন তৈরি হবে, তারপর তৈরি হবে শরীর। মন আর শরীর মিলেমিশে লাভমেকিং।
হয়তো তা-ই। কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে তা হলো না। শ্রীনগর স্টেশানে নেমে ফেরার টিকিট কাটতে গেছে দু’জনে। নীলু টয়লেটে গেছে, টিকিট কাউন্টারে বৃষ্টি। একটা লোক জিজ্ঞেস করলো, তোমার সঙ্গে কি তোমার স্বামী! বৃষ্টি বলল, সে আমার স্বামী, বন্ধু, প্রেমিক সব, সবকিছু সে আমার। আগেই বললাম, বৃষ্টি খুবই রোম্যান্টিক মেয়ে। সে হিসাব করে রেখেছিল পূর্ণিমা রাতে আগ্রায় যাবে তাজমহল দেখতে। ঠিক সেইভাবেই গেল ওরা। পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তাজমহল দেখতে দেখতে নীলুর হাত ধরলো। গান করো। নীলু গাইল পিন্টু ভট্টচার্যের গান। ‘এক তাজমহল, হূদয়ে তোমার আমি হারিয়ে গেলাম’। গল্প শেষ।
রিমি বলল, এত বাজে গল্প আমি জীবনে শুনিনি। মোস্ট বোরিং, স্বাদগন্ধহীন ভাতের মতো। বৃষ্টির জায়গায় যদি আমি হতাম তাহলে নীলু আমার হাতে মার খেতো।
কেন?
এবার আমি একটা গল্প বলি। অতি সংক্ষিপ্ত গল্প। আলেকজান্ডার দি গ্রেট বিশ্ব জয় করে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। এক সন্ধ্যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত নির্জন এক গ্রামে তিনি একা। কোথায় রাত কাটাবেন বুঝতে পারছেন না। হাঁটছেন, হাঁটছেন। গ্রামের শেষপ্রান্তে এসে দেখেন, একটা বিধ্বস্ত বাড়িতে একটা মাত্র দালানঘর অক্ষত আছে। তিনি দরজায় নক করলেন। অনিন্দ্য সুন্দর এক যুবতী দরজা খুলল। আলেকজান্ডার বললেন, আমি একজন পথিক। আজকের রাতের জন্য আশ্রয় চাই। যুবতী বলল, আমার একটা মাত্র ঘর, একটা মাত্র বিছানা। তোমাকে আমার বিছানায় থাকতে হবে। আলেকজান্ডার বললেন, অসুবিধা নেই। শুধু তো একটা রাত। রাতেরবেলা এক বিছানায় শুয়েছে দু’জন। দু’জনার মাঝখানে একটা পাশ বালিশ দিয়ে রাখলো মেয়েটি। রাত কেটে গেল। সকালবেলা বিদায় নেবার সময় আলেকজান্ডার বললেন, তুমি আমাকে আশ্রয় দিয়েছো, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি আমার সত্যিকার পরিচয় তোমাকে দেইনি। আমি আলেকজান্ডার দি গ্রেট, বিশ্ববিজয়ী যোদ্ধা। মেয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, চাপা মারার আর জায়গা পাও না! যে লোক সারারাতে মাঝখানকার বালিশ সরাবার সাহস পায় না সে হচ্ছে আলেকজান্ডার দি গ্রেট। যাও ভাগো।
কবি শব্দ করে হাসলো। ভালো গল্প।
রিমি উঠল। অযথা আমার সময়টা নষ্ট করেছেন। চালাকি করে একমগ চা ধরিয়ে দিয়েছেন, এতটা চা খেতে সময় লাগবে আর সেই ফাঁকে আপনি আপনার কামগন্ধহীন গল্পটা বলে যাবেন। আপনাকে মার দেওয়া উচিত। আমি ডাক্তার বলে বৃষ্টিকে আবার ডাক্তার বানিয়েছেন।
কবি বলল, আসলে ওই নীলু ছেলেটা আমি আর বৃষ্টি মেয়েটা আপনি। গল্পটা আমি বানিয়েছি।
আমি কখনো বৃষ্টি হবো না। আমার পেছনে লাগার চেষ্টা করবেন না। আমার বর মূলত গুণ্ডা। হাড্ডি পাসলি ভেঙে দেবে।
দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে রিমি, কবি বলল, একটা কথা বাকি রয়ে গেল।
জানি, বলবেন, আপনি খুব সুন্দর।
হ্যাঁ, আপনি খুব সুন্দর।
রিমি মিষ্টি করে হাসল। আর আপনি খুব ফাজিল।


চার
স্বপন ভুরু কুঁচকে মহিলার দিকে তাকাল। কী চান?
মহিলার পরনে ফুল লতাপাতা আঁকা একেবারেই সস্তা সুতির শাড়ি। মধ্যবয়সী একটু মোটা মতো শরীর। রোদে পোড়া কালো মুখ দেখে বোঝা যায়, খেটে খাওয়া মানুষ।
স্বপনের কথা শুনে বলল, একখান খবর দিতে পারবেন দাদা?
স্বপন খেয়াল করলো, মহিলার মুখে প্রায় শেষ হয়ে আসা পান। দাঁতে ছোপ ধরা, লাল জিহ্বা। বহুদিন ধরে পান খেলে মুখের ভেতরটা এমন হয়।
কিন্তু তাকে দাদা বলল কেন! চেনে নাকি!
কথাটা বলল স্বপন, আপনি আমাকে চেনেন?
না দাদা।
তাহলে দাদা বলছেন কেন?
আমগো বিক্রমপুরে ভাইরে দাদাই ডাকে।
বুঝেছি। বলুন, কী চান?
শিলা লিজা কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না মহিলার দিকে। তারা ব্যস্ত তাদের কাজে। স্বপনের হাতেও কাজ তবু মহিলাকে দেখে তার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। সাধারণত এই স্ট্যান্ডার্ডের মানুষ এই হাসপাতালে ঢোকে না। বড়লোক বাড়ির কাজের মহিলারা অনেক সময় মহিলা রোগীর সঙ্গে আসে। তাদের ঠাটবাট আলাদা। কাপড় চোপড় ভঙ্গিভাঙ্গি অন্যরকম। রোগীর আত্মীয়-স্বজন মনে হয়, কাজের লোক মনে হয় না। এই কারণেই বেশি চোখে পড়ছে মহিলা।
স্বপনের কথা শুনে মুখের পান একটু চিবালো। ওই যে কইলাম, একটা খবর দিতে পারেননি?
কী খবর জানতে চান, বলুন।
কাইল সন্ধ্যায় টিবিতে দেখলাম একটা মাইয়া এই হাসপাতালে আছে...
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই শিলা লিজা চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। স্বপন কথা বলবার আগেই শিলা বলল, আপনি চেনেন মেয়েটিকে?
চিনা চিনা লাগল। তয় পুরাপুরি চিনতে পারি নাই। এর লেইগা খবর লইতে আইছি। মাইয়াটারে আমি একটু দেখতে চাই।
লিজা ব্যস্ত হয়ে বলল, দাঁড়ান দাঁড়ান।
কবির রুমে ফোন করল লিজা। হ্যালো, স্যার। আমি লিজা, কাউন্টার থেকে বলছি।
কবি বলল, বলুন লিজা। কী খবর?
মেয়েটির খোঁজে এক মহিলা আসছে।
কবি প্রায় লাফিয়ে উঠল। তাই নাকি? গুড নিউজ। মহিলাকে এই রুমে নিয়ে আসুন।
জি স্যার, আমি আসতে পারছি না। পাঠিয়ে দিচ্ছি।
ওকে, ওকে। পাঠান।
মিনিট তিনেকের মধ্যে মহিলা এসে কবির রুমে ঢুকল। এক পলক কবিকে দেখে মেয়েটির বেডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তীক্ষচোখে মেয়েটির দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে হা হা করে উঠল। আরে, আমার সন্দই তো ঠিক। এইডা তো পারুল, আমগো পারুল। টিবিতে দেইখা চিনতে পারি নাই। কেমতে চিনুম, এই পারুল কি আর সেই পারুল! হায় হায়! পারুল, ও পারুল, এই দশা ক্যান তোর? এমতে কে মারল তোরে? কে নাইড়া করল? হায় হায়!
দিশেহারা ভঙ্গিতে পারুলের গায়ে মাথায় হাত বুলাতে লাগল মহিলা। কথা কচ না ক্যান? ও পারুল, ক আমারে, কে এমুন করল তোর? হায় হায়।
পারুল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মহিলার দিকে। প্রথমে একটু চমকেছিল, এখন স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। চোখ ছলছল করছে। একসময় চোখের কোণ বেয়ে কান্না নামলো, গাল ভিজতে লাগল।
মহিলা বলল, কান্দিস না মা, কান্দিস না। ক আমারে, কে এমুন করল তোর? কী অন্যায় করছিলি তুই? কথা কছ না ক্যান? কথা ক। ক আমারে, ঘটনা কী?
পারুল কথা বলে না, নিঃশব্দে কাঁদে।
মহিলা বলল, পাঁচ-ছয় দিন আগে তোরে যেই বাড়িতে দিছিলাম সেই বাড়ির ম্যাডামে মোবাইল করল আমারে। মোবাইল কইরা কয়, রাইত থিকা তোরে পাওয়া যাইতাছে না। তুই তাগো বাড়িত থিকা পলাইয়া গেছস। শুইনা তো আমার মাথায় আসমান ভাইঙ্গা পড়ল। হায় হায় কই পলাইয়া গেল এতটুকু মাইয়া! তুই তো ঢাকা শহর চিনছ না। তয় গেলি কই! বিরাট বিপদে পইড়া গেলাম। ফোন

দিলাম তোর বাপরে। তোর বাপের তো আর ফোন নাই, দুলালের দোকানে ফোন দিয়া কইলাম, লতিফরে একটু ডাইকা দেন দাদা। আমি দশমিনিট বাদে আবার ফোন দিতাছি। তোর বাপে আইয়া দোকানে বইসা রইছে। আমি ফোন দিয়া কইলাম এই ঘটনা। তুই বাড়িতে গেছস কি না। তর বাপে কয়, না, পারুল বাড়িতে আসে নাই। একলা আইবো কেমনে? ঘটনা তারে কইলাম, শুইনা বেদিশা হইয়া গেল তোর বাপে। হায় হায়, কই গেল আমার মাইয়া! তুমি খোঁজ-খবর করো, আমারে জানাইয়ো পাইলা কি না! আমি এদিক ওদিক কত খুঁজছি তোরে, সেই দিনের পর থিকা রোজ খুঁজি। কাইল সন্ধ্যায় টিবি দেইখা সন্দ হইল, হ, মাইয়াটা তো পারুলের মতন লাগে। তয় ও হাসপাতালে ক্যান, হইছে কী! ম্যাডামে কইলো পলাইয়া গেছে...
মহিলা কবির দিকে তাকাল। দাদা আপনেরেও আমি টিবিতে দেখছি। আপনের কথাও শুনছি। আপনে ওরে হাসপাতালে লইয়া আইছেন। তয় ঘটনা কিছুই বুঝি নাই। আমারে একটু বুঝাইয়া কইবেন!
কবি বলল, আপনি কে?
আমি দাদা মাইয়ার দালাল।
জি?
ম্যাডামগো বাড়িতে কামের মাইয়া আইনা দেই। মাইয়ার সাইজ বুইঝা টেকা পাই। পারুলরে লাগাইয়া পাইছিলাম তিন হাজার। পারুলের বেতন ধরছিল দেড় হাজার। যার যা বেতন তার ডবল দিতে হয় আমারে। মাসে দুই-তিনডা কাম আমি করি।
নাম কী আপনার?
জুলেখার মা। নিজের একখান নাম আছে, মরিয়ম। সেই নাম এখন আর নিজেরই মনে থাকে না। মাইয়ার নাম জুলেখা, এর লেইগা আমি হইছি জুলেখার মা। এই নামেই চিনে বেবাকতে।
বাড়ি কোথায়?
বিক্রমপুরের সীতারামপুর গেরাম। লৌহজং থানায়, না না অহন তো আর থানা না, উপজেলা, লৌহজং উপজেলায়।
বুঝেছি। আপনাকে পেয়ে দারুণ কাজ হলো। টিভিতে আপনি শুনেছেন কীভাবে ওকে হাসপাতালে আনা হয়েছে, কীভাবে বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ওর নামধাম কিছুই আমরা জানতে পারিনি। দু’দিন অজ্ঞান ছিল। জ্ঞান ফেরার পর নানারকমভাবে চেষ্টা করছি কিন্তু ও কথা বলে না। এখন আপনার কাছ থেকে নামটা জানলাম।
হ দাদা ওর নাম পারুল। ওগো বাড়িও বিক্রমপুরেই। বিক্রমপুরের কুমারভোগ গেরাম। মাওয়া চৌরাস্তা থিকা পুবদিকে যেই রাস্তা, ওই রাস্তায় গেলে কুমারভোগ গেরাম। আগে অবস্থা ভালোই আছিল। এখন পথের ফকির। বাড়িঘর ক্ষেতখোলা বেবাক গেছে পদ্মায়। ওরা হইল নদীভাঙ্গা মানুষ। এখন রাস্তার ধারে ছাপড়া উঠাইয়া থাকে। পারুল বড় দুঃখী মাইয়া। ওরে চাইর বছরের রাইখা মা মইরা গেছে। বাপে তারবাদে আরেকখান বিয়া করছে। সেই মা’র ঘরে দুইটা পোলা। সত্মায়ে দুই চোক্ষে পারুলরে দেখতে পারে না। খাইতে দেয় না, মাইর ধইর করে। ওর বাপ লতিফ নিরীহ পদের মানুষ। বউর ডরে কথা কয় না। বউটা বিরাট পাজি। এইজন্য আমারে অনুরোধ করল, পারুলরে ঢাকায় নিয়া কামে লাগাইয়া দিতে। সাহেব বাড়িতে থাকবো খাইবো, ওর তো কোনো খরচা নাই। মাসের বেতনটা আমারে তুমি আইনা দিও। দুই মাসের বেতন তুইলা লতিফরে দিছি। ও কামে আইছে তিন মাস পুরা হয় নাই। তার আগেই শুনলাম পলাইছে।
আবার পারুলের দিকে তাকাল জুলেখার মা। ও পারুল, কথা ক। আমারে ক, কই পলাইছিলি তুই? কী জইন্য পলাইছিলি? এমুন মাইর তোরে কে মারল?
কবি বলল, আপনি বসুন। পারুল কথা বলবে না, আমি আপনার সঙ্গে কথা বলি। ওই সোফাটায় বসুন।
জুলেখার মা জিভ কাটলো। দাদায় কয় কী? আপনের সামনে আমি সোফায় বসুম? এইটা হয় না দাদা। আমি বেদপ মেয়েছেলে না।
মেঝেতেই বসল জুলেখার মা। কবি বসল চেয়ারে। বলল, আপনি যে ধরনের সাহেব দেখে অভ্যস্ত আমি ওই টাইপ না। আমার সামনে সোফায় বসলে আমি কিছুই মনে করব না, বরং খুশি হব।
না দাদা, আমি এইখানেই ভালো আছি। বলেন, কী জানতে চান বলেন। যা যা জিজ্ঞাসা করার করেন।
আপনি চা খাবেন?
খাইতে পারি দাদা। আমার চা খাওনের অভ্যাস আছে। দিনে চাইর-পাঁচ কাপ চা খাই।
ইন্টারকম তুলে এক কাপ চা আর একটা স্যান্ডউইচের অর্ডার দিলো কবি। জুলেখার মা বলল, আমি একলা চা খামু? আপনে খাইবেন না?
আমি কিছুক্ষণ আগে খেয়েছি। এখন আর খাব না।
আইচ্ছা দাদা, তয় ঠিক আছে।
কবি জুলেখার মা’র মুখের দিকে তাকাল। আপনি যে বাড়িতে ওকে কাজে দিয়েছিলেন সেই বাড়ির ঠিকানা জানেন? মোবাইল নাম্বার...
জে দাদা, ঠিকানা মোবাইল নম্বর বেবাক আমার কাছে লেখা আছে।
কোথায়?
লগেই আছে।
আমাকে একটু দেখান না!
আরে কয় কী দাদায়! এই যে দেখেন।
ব্লাউজের ভেতর থেকে ছোট্ট ধ্যারধ্যারা একটা নোটখাতা বের করল জুলেখার মা। কোনা ভাঁজ দেওয়া একটা পাতা বের করে কবিকে দিলো। এই যে এই বাড়ি। সাহেবের নাম, মোবাইল নম্বর সব আছে। আমার জুলেখা কেলাস ফাইভ পরযন্ত পড়ছিল। কোন বাড়িতে কারে কামে দিলাম ও লেইখা রাখে। আমি খালি মোবাইল নম্বরটা লইয়া আসি, মাইয়ায় কথাবার্তা কইয়া লেখে।
কবি নোটখাতাটা নিল। খুবই কাঁচা হাতে লেখা ‘মিজান সাহেব’। তার নিচে ঠিকানা, ফোন নাম্বার। কবি চট করে স্লিপ প্যাড টেনে নাম ঠিকানা লিখে নিল। জুলেখার মাকে নোটখাতা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, আমার ধারণা পারুল নিজের জীবন বাঁচাবার জন্য ওই বাড়ি থেকে পালিয়েছিল।
চোখে পট পট করে পলক ফেলল জুলেখার মা। জে?
হ্যাঁ। বাড়ির লোকজন ওকে মারধোর করতো। মেরে মেরে তারাই এই অবস্থা করেছে পারুলের।
কন কী?
হ্যাঁ। দিনের পর দিন মেরেছে, ঠিকমতো খেতে দেয়নি...
জুলেখার মা চিন্তিত চোখে কবির দিকে তাকাল। আপনের কথা শুইনা আমার সন্দ হইতাছে দাদা। আপনে যা কইতাছেন সেইটা হইতে পারে...
আপনি যে দুবার পারুলের বেতন আনতে গিয়েছিলেন, তখন ওর সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি?
না দাদা। একবারও দেখা হয় নাই।
কেন? পারুল ছিল কোথায়?
ম্যাডামে দুইবারই কইলো, পারুল বাড়িতে নাই। অন্য ফেলাটের কামের মাইয়াগো লগে বেড়াইতে গেছে। ওই বাড়ির বেবাক ফেলাটের কামের মাইয়রা বলে একলগে মাসে একবার বেড়াইতে যায়।
দু’বার একই কথা শুনে আপনার সন্দেহ হয়নি?
পয়লাবার হয় নাই, পরের বার হইছিল। ম্যাডামরে বললাম, আমি বইসা থাকি, পারুলের লগে দেখা কইরা যাই। দুই মাস হইয়া গেল মাইয়াটারে দেখি না! ম্যাডামে কইলেন, দেখা করনের দরকার কী? পারুল ভালো আছে। তুমি যাও।
দরজায় নক করে চা স্যান্ডউইচ নিয়ে ঢুকল কেন্টিনবয়। কবি বলল, ওনার সামনে রাখো।
তারপর বিলে সই করে দিল। কেন্টিনবয় নিঃশব্দে চলে গেল। যাওয়ার আগে জুলেখার মাকে একবার খেয়াল করে দেখল।
কবি বলল, আপনি খান। খেতে খেতে কথা বলুন।
জুলেখার মা লাজুক হাসলো। আপনের সামনে বইসা খাইতে শরম করতাছে।
আমি আপনার ছেলের মতো। খান।
মুখটা ধোওয়া দরকার।
ওই যে বাথরুম, যান, ধুয়ে আসুন।
জুলেখার মা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বাথরুমে ঢুকল, পান খাওয়া মুখ

পরিষ্কার করে ফিরে এল। সিলোফিন সরিয়ে স্যান্ডউইচ খেতে লাগল।
কবি বলল, আপনার ওই ম্যাডাম মানুষ কেমন?
বিরাট বদমেজাজি। বিরাট রাগী। তয় টেকা-পয়সার ব্যাপারে কিরপন না। পারুলের বেতন আনতে গেলেই আমারে দুইশো টেকা রিকশা ভাড়া দিত।
আপনি থাকেন কোথায়?
মোহাম্মদপুর বেরিবান্ধের ওইদিককার বস্তিতে। স্বামী নাই, দুই পোলা যে যার মতন বউ পোলাপান লইয়া থাকে। আমি থাকি জুলেখার কাছে। ওর জামাই রিকশা চালায়। জুলেখা কাম করে দুইটা বাড়িতে। বাচ্চা কাচ্চা নাই...
মিজান সাহেব লোক কেমন?
মিজান সাহেবটা কে? ও বুজছি। সাহেবের কথা জানতে চাইতাছেন। সে নরম পদের মানুষ। বউর সামনে কথা কয় না। কথায় কথায় বউ তারে ধমকায়। সে থাকে মিচা বিলাই হইয়া।
তাদের ছেলেমেয়েরা?
শুনছি এক ছেলে এক মেয়ে। দুই জনই আমরিকায় থাকে।
নিজেদের বাড়ি না ফ্ল্যাট?
তারা একটা ফেলাটে থাকে। ওইটা নিজের না ভাড়ার কইতে পারি না।
বাড়িতে কাজের মানুষ আছে ক’জন?
আর তো কাউরে দেখি নাই। তয় আমি শুনছি ম্যাডামে রাগারাগি করেন দেইখা তার ফেলাটে কামের মানুষ থাকে না।
এটা আরও সন্দেহজনক। তার মানে পারুলকে দিয়ে একা সব কাজ করাতো?
হইতে পারে। সংসারে দুইজন মাত্র মানুষ, একজন ডেরাইভার আছে, সে বাজারঘাট কইরা দেয়, ম্যাডামে নিজেই রান্ধনবাড়ন করেন। খুবই পিসপিসা স্বভাবের। পিসপিসা অর্থ হইল শুচিবায়ু। পান থিকা চুন খসলে রাগে আগুন হইয়া যান। আমার সামনে সাহেবের উপরে এমুন রাগ একদিন হইলেন, পারলে স্বামীরে ধইরা মারেন।
স্যান্ডউইচ শেষ করে চায়ে ফুরুক করে চুমুক দিল জুলেখার মা। তয় আমি কইলাম ওই ম্যাডামরে ছাড়ুম না দাদা! আমি বেবাক খোজখবর লমু। যুদি সত্যই তিনায় পারুলের এই অবস্থা কইরা থাকেন তয় তার খবর আছে।
কী করবেন?
থানায় যামু। পুলিশ-দারোগারে জানামু। তয় পারুল যুদি কথা কইতো, ওর মুখ থিকা যদি জানতে পারতাম আসল ঘটনা তয় কাম হইয়া যাইতো।
আবার চায়ে চুমুক দিলো জুলেখার মা। হাসপাতাল থিকা বাইর হইয়া আমি এখন ওই বাড়িতে যামু। গিয়া ম্যাডামরে ধরুম। আমারে সত্য কইরা কন, পারুল কই? ঘটনা কী?
কবি একটু নড়েচড়ে বসল। না, আপনার যাওয়ার দরকার নেই।
ক্যান?
কীভাবে কী করতে হবে সেটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। ঠিকানা ফোন নাম্বার যখন পেয়েছি, আর চিন্তা নেই। আপনি একটা কাজ করুন, আপনার ফোন নাম্বারটা দিন। আমি আপনাকে ফোন করবো। আপনাকে দরকার হবে।
আমি আছি দাদা। যখন দরকার আমারে মোবাইল দিবেন। নম্বরটা লেইখা রাখেন।
জুলেখার মা নাম্বার বলল, কবি লিখে নিল।
চা শেষ করে আবার পারুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল জুলেখার মা। পারুল, ও পারুল আমি এখন যাই গো মা। তুমি ভালো হইয়া ওঠো। আমি আবার আসুম নে। ডরাইয়ো না, চিন্তা কইরো না। তুমি খোদার ফজলে ভালো হইয়া যাইবা।
পারুল কথা বলে না, পারুল নিঃশব্দে কাঁদে।
চলে যাওয়ার সময় জুলেখার মাকে পাঁচশো টাকা দিলো কবি। মহিলা অবাক হলো। এইটা কী জন্য?
আপনি কষ্ট করে আসছেন, রিকশা ভাড়া লেগেছে।
আমি রিকশায় আসি নাই দাদা। হাঁইটা আইছি। আমি হাটনের ওস্তাদ।
তা হোক, তবু রাখেন এটা। দরকার হলে আমি আপনাকে ফোন করবো।
কোনো অসুবিধা নাই দাদা, যখন ইচ্ছা ফোন করবেন, আমি চইলা আসুম। আপনে ফোন না করলেও আসুম। মাইয়াটা ভালো হইল কি না দেখন লাগব না! আমার একটা দায়িত্ব আছে না! ওরে কামে দিছি আমি, ও আমার মাইয়া।
জুলেখার মা চলে যাওয়ার পর জয়াকে ফোন করলো কবি। ভাবী, কাজ হয়ে গেছে।
কী কাজ?
মেয়েটির নাম জেনে গেছি। পারুল।
কী করে জানলি?
জুলেখার মা’র কথা বলল কবি। সব শুনে জয়াও খুশি। এবার তাহলে ওই পুলিশ অফিসারকে জানা। যে বাড়িতে পারুল কাজ করতো সেই বাড়িতে পাঠা। যে রকম জাঁদরেল মহিলার কথা শুনলাম তাতে ওই মহিলাই যে এ অবস্থা করেছে মেয়েটির এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
জয়ার সঙ্গে কথা শেষ করে হায়দারকে ফোন করলো কবি। প্রথম দু’বার বিজি পেলো ফোন, তৃতীয়বার ধরলেন হায়দার। ইয়েস বস।
আপনার প্রধানখাদ্যের ব্যবস্থা হয়ে গেছে।
আরে বলেন কী? এরচে’ শুভ সংবাদ আর হতে পারে না। কী করে হলো? আপনি দেবেন?
না। পারুলকে যারা মেরেছে...
কন্যার নাম পারুল নাকি?
জি। কী করে সব জানলাম শুনুন। আপনার সময় আছে?
আপনার জন্য অঢেল সময়! আফটার অল কমিশনার সাহেব আপনার বড়ভাইয়ের বন্ধু। আপনি কি স্যারকেও তুমি করে বলেন?
ভাইকে তো তুমি করেই বলার কথা।
গুড ভেরি গুড। এবার ঘটনা বলুন।
কবি জুলেখার মা’র কথা বিস্তারিত বলল। শুনে হায়দার স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। কাজ হয়ে গেছে। নাম ঠিকানা দিন, ফোন নাম্বার দিন। জুলেখার মা না কী বললেন, সেই মহিলার নাম্বারও দরকার। তবে বিশেষ প্রয়োজন না হলে তাকে আমি ডাকবো না। ওই ধরনের মানুষ পুলিশের কথা শুনলে ভয় পেয়ে যেতে পারে।
তা হয়তো পাবে। তবে মহিলা আমাদেরকে সাহায্য করবে।
কী করে বুঝলেন?
অনেকক্ষণ কথা বললাম, কথা বলে বুঝলাম। এই জাতীয় মানুষরা সাধারণত দায়িত্ব এড়ানো স্বভাবের হয়। একটা মেয়েকে এনে কাজে দিয়েছে, তিন হাজার টাকা রোজগার হয়েছে, মেয়েটির মাসের বেতন তুলতে গিয়ে পাচ্ছে দুশো টাকা করে, সে চাইবে মেয়েটি ওই বাড়িতেই থাক। কিন্তু এই মহিলাকে তেমন মনে হলো না। পারুলকে দেখে খুবই দিশেহারা হলো। যাওয়ার সময় বলে গেল, যখন দরকার তখনই তাকে যেন ফোন করি। নিজের দায়িত্বের কথাও বলল।
হায়দার একটা শ্বাস ফেললেন। আপনাকে একটা কথা বলবো?
প্লিজ।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই ভালো। সাধারণ মানুষ খুবই ভালো। সামান্যতে খুশি হয়, সামান্যতে হাসে, আনন্দে থাকে। এই সুন্দর মানুষগুলোকে জ্বালাচ্ছে পচা রাজনীতি আর কিছু গুণ্ডা-বদমাস। রাষ্ট্রের অর্থনীতি মজবুত হলে, দেশের মানুষগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ কোথায় পৌঁছাতো ভাবেন তো!
কবি সরল গলায় বলল, খুবই জ্ঞানী কথাবার্তা হচ্ছে। এত জ্ঞান আমার ভালো লাগে না। রাখলাম।
হায়দার হাসলেন। কী আর করবো, রাখুন। তবে ঠিকানা ফোন নাম্বার ইত্যাদি দিন।
সবই দিল কবি।

পাঁচ
ভদ্রলোক দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে কালো চপ্পল। বেশ গোবেচারা, নিরীহ ধরনের

চেহারা। পঁয়ষট্টি-ছেষট্টি হবে বয়স। দাড়ি আছে। চুল তেমন নেই মাথায়। ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে টাক। চুল-দাড়ি সবই সাদা।
হায়দার বিনীত ভঙ্গিতে সালাম দিলেন। স্লামালেকুম স্যার।
ওয়ালাইকুম সালাম। আসুন।
সঙ্গের কনেস্টবল দু’জনের দিকে তাকালেন হায়দার। ওরা কি বাইরে দাঁড়াবে?
না না, কেন? ভেতরেই বসুক।
আমার সামনে বসবে না।
আমরা ড্রয়িংরুমে বসবো, ওনারা বসবেন ডাইনিংটেবিলে।
তা হতে পারে। চলুন।
ড্রয়িংরুমে ঢুকে হায়দার বললেন, বসবো?
নিশ্চয়, নিশ্চয়। বসুন।
ভদ্রলোকের মুখোমুখি বসলেন হায়দার। ম্যাডাম নেই?
না, একটু বাইরে গেছেন। বোধহয় সংসারের কেনাকাটা। আমি করি না কিছুই। সবই তিনি করেন। পুরোনো ড্রাইভার আছে। বিশ্বস্ত লোক। অনেক সময় সেও করে।
ফ্ল্যাটে আপনি এখন একা?
জি।
কাজের লোকজন? মানে বুয়া...
আপাতত নেই। একটা দশ-এগারো বছরের মেয়ে ছিল, ক’দিন আগে সন্ধ্যাবেলা পালিয়ে গেছে। তারপর আর কাজের লোক জোগাড় করতে পারিনি। আজকাল কাজের লোক পাওয়াই যায় না। আগে বেতনও দিতে হতো না, শুধু পেটেভাতেই লোক পাওয়া যেতো। দুই ঈদে শুধু জামাকাপড় দিলেই হতো। এখন তিন-চার হাজার টাকা বেতন, ভালো জামাকাপড়, সাবান- শ্যাম্পু-স্নো-পাউডার সব দিতে হয়। টিভি দেখতে দিতে হয়। কাউকে কাউকে দিতে হয় মোবাইল ফোন। গার্মেন্টে দেশ ভরে যাওয়ার ফলে এসব হয়েছে। মেয়েগুলো সব চলে যাচ্ছে গার্মেন্টে। ভালো বেতন, নিজের মতো করে চলা, বুঝলেন না?
জি বুঝেছি।
আমাদের সংসার অবশ্য ছোট। আমি আর আমার স্ত্রী। আমার স্ত্রী এই বয়সেও সব কাজ করেন। কাজের লোক থাকলেও তিনিই করেন বেশির ভাগ কাজ।
আপনাদের ছেলেমেয়ে?
এক ছেলে এক মেয়ে। দু’জনই আমেরিকায়। ছেলে থাকে লসঅ্যাঞ্জেলেসে, মেয়ে ফ্লোরিডায়। আমি আর আমার স্ত্রীও বছরে একবার করে যাই। মাস তিন চারেক থেকে আসি।
হায়দার একটু নড়েচড়ে বসলেন। আপনাদের বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটির কাছ থেকে আপনার পুরো নাম জেনেছি। খান মিজানুর রহমান। আপনার স্ত্রীর নাম রেখা রহমান।
তাঁর নামের আগেও খান আছে।
সেটাই স্বাভাবিক। আমি প্রথমে আপনার নাম পেলাম মিজান সাহেব।
কার কাছ থেকে পেলেন?
সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। এতক্ষণ হয়ে গেল, বেশ কিছু প্রসঙ্গে কথা বললাম, আপনি একবারও জানতে চাইলেন না, আমাদের আসার উদ্দেশ্য কী! বাড়িতে পুলিশ এলে মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিব্রত হয়। আপনি হচ্ছেন না?
আমিও হয়েছি কিন্তু প্রকাশ করছি না। স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি এলে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। কারণ, আমি কোনো কিছুই সামলাতে পারি না। তিনিই সামলান সবকিছু।
কিন্তু আপনার তো একটা কৌতূহল থাকবে, কেন পুলিশ এসেছে বাড়িতে?
অনুমান করছি।
কী অনুমান বলুন?
ওই যে মেয়েটা, কী নাম, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, পারুল। পারুল পালিয়ে গেছে এই নিয়ে কোথাও কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে!
আপনি স্যার এখন কিছু করেন?
না, অবসর জীবনযাপন করছি। বছর পাঁচেক হলো রিটায়ার করেছি। একটা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলাম।
ধানমন্ডি এলাকায় এত দামি ফ্ল্যাট...
একটা ফ্ল্যাট না, এরকম দশটা ফ্ল্যাট আমাদের।
বলেন কী?
জি। তবে এতে আমার নেই দু’পয়সাও। রেখা খুবই ভাগ্যবতী। বাবার একমাত্র মেয়ে। এক বিঘার ওপর বাড়ি পেয়েছেন পৈতৃকসূত্রে। সেই বাড়ি ডেভেলাপারকে দিয়েছিলেন ফিফটি ফিফটি হিসেবে। গ্রাউন্ডফ্লোরে পার্কিংলট, দুই ইউনিটে দশটা করে ফ্ল্যাট। রেখা পেয়েছেন দশটা। একটায় আমরা থাকি, ন’টা ভাড়া দেওয়া।
তার মানে বহুটাকা ভাড়া পাচ্ছেন?
খুব বেশি না। সাড়ে তিন-চারলাখের মতো পাওয়া যায়। দু’জন মানুষ সেই টাকায় চলি। বছর বছর আমেরিকায় যাই। এই আর কী! তবে থাকে না কিছুই। আমেরিকায় যাওয়া আসাতে খরচা হয় ভালোই। নিজেদের চিকিত্সা আছে। তারপরও ভালোই আছি।
হায়দার হঠাত্ করে কঠিন হলেন। আপনি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন, শিক্ষিত মানুষ, বাড়ি থেকে কাজের মেয়ে পালিয়ে গেল, থানায় রিপোর্ট করেননি কেন?
মিজান সাহেব থতমত খেলেন। না মানে এসব ব্যাপারে আমি মাথা
ঘামাই না। এসব দেখেন রেখা। সংসারে থেকেও আমি থাকি নিজের মতো। কোথায় কী ঘটছে না ঘটছে টেরই পাই না।
এটা বিশ্বাসযোগ্য না।
মানে?
এই ফ্ল্যাটে একটি মেয়েকে প্রায় তিনমাস আটকে রেখে দিনের পর দিন আপনারা তাকে টর্চার করেছেন, খেতে দেননি, কঙ্কালসার মরোমরো মেয়েটি নিজের জীবন বাঁচাতে কোনো রকমে পালিয়ে গেছে আর আপনি বলছেন ফ্ল্যাটের কোথায় কী ঘটছে আপনি জানেনই না, এটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। আপনি কি এই ফ্ল্যাটে থাকেন না?
নিশ্চয় থাকি!
মেয়েটিকে চেনেন না?
অবশ্যই চিনি। না চিনলে নাম বললাম কী করে!
তাকে ওভাবে টর্চার করেছেন কেন? কী অন্যায় ছিল মেয়েটির?
আপনি কি খবরের কাগজের আর টিভির রিপোর্ট দেখে এসেছেন? একটু ওয়েট করুন, আমি রেখাকে ফোন করছি, তিনি এলে তাঁর সঙ্গে কথা বলুন।
হায়দার রাগী গলায় বললেন, ফোন করুন।
মিজান সাহেব স্ত্রীকে ফোন করলেন। এই, তুমি একটু তাড়াতাড়ি আসো। বাড়িতে পুলিশ এসেছে! না না আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে ফোন করিনি। ফোন করলে তুমি আবার রেগে যাও কি না। এজন্য পুলিশ অফিসারের সঙ্গে গল্প করছিলাম। আচ্ছা আর কথা বলবো না। তুমি তাড়াতাড়ি আসো।
হায়দার খেয়াল করলেন, কথা বলার সময় বার দুয়েক ঢোক গিললেন মিজান সাহেব। যেন ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তাঁর, যেন ভেতরে ভেতরে কাঁপছেন। মুখ শুকিয়ে চুন। তার মানে স্ত্রীকে যমের মতো ভয় পান।
প্রায় কাঁপতে কাঁপতে ফোন পাঞ্জাবির পকেটে রেখে শুকনো মুখে হায়দারের দিকে তাকালেন মিজান সাহেব। চা খাবেন?
কে বানাবে?
আমিই বানিয়ে আনবো। তেমন ঝামেলা কিচ্ছু না। শুধু গরম পানিটা করবো। গরম পানিতে চিনি আর টিব্যাগ দিলেই হলো।
আমি দুধচা খাই।
সেটাও বানিয়ে দিতে পারবো।
দরকার নেই। আপনি বসুন। কথা বলি।
আমার কথা বলা নিষেধ। নিষেধ মানে ওই পারুলকে নিয়ে কথা বলতে পারবো না। অন্য যেকোনো বিষয়ে পারবো। রেখা এক্ষুনি এসে পড়বেন। পারুলকে নিয়ে কথা বলবেন তিনি।
হায়দার শ্লেষের গলায় বললেন, আপনার জন্য খুবই মায়া হচ্ছে।
কেন?
একজন ভাইস প্রিন্সিপাল এরকম ভেড়ার জীবনযাপন করছে...
মিজান সাহেব বোকার মতো হে হে করে হাসলেন। খান এক কাপ, বানিয়ে আনি।
আমি এত বেয়াদপ না যে একজন শিক্ষক আমাকে চা বানিয়ে দেবেন আর আমি ফুরুক ফুরুক করে সেই চা খাবো। তবে স্যার, আপনাকে আমার অ্যারেস্ট করা উচিত।
মিজান সাহেব ভয়ার্ত গলায় বললেন, কেন?
পারুলকে টর্চার করার অপরাধে।
আমি কোনো টর্চার করিনি।
তাহলে কে করেছে?
মিজান সাহেব আবার থতমত খেলেন। না মানে কেউ আমরা ওর গায়ে ফুলের টোকাটিও দেইনি। পালিয়ে যাওয়ার পর কোথাও মার খেয়েছে কিনা...
শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁদের মুখে মিথ্যা মানায় না। যে দেশের শিক্ষকরা নষ্ট হয়ে যান সেই দেশে আর কিছু থাকে না। দয়া করে শিক্ষকদের দুর্নাম করবেন না। বরং আপনার কথা বলার দরকার নেই। যা বোঝার আমি বুঝে গেছি। ম্যাডাম আসুক আমি তাঁর সঙ্গেই কথা বলবো। তবে আপনিও ফাঁসবেন স্যার। আমি আপনাকে রক্ষা করতে পারবো না।
মিজান সাহেব কথা বলবার আগেই দরজা ঠেলে ঢুকলেন রেখা। তার পেছনে ড্রাইভারের হাতে কয়েকটা শপিংব্যাগ। রেখা গম্ভীর গলায় বললেন, ফারুখ, শপিংব্যাগ কিচেনে রেখে চলে যাও।
জি ম্যাডাম।
হায়দার তাকিয়ে আছেন রেখার দিকে। নীলপাড়ের সাদা শাড়ি পরে আছেন। শরীর-স্বাস্থ্য ভালো, গায়ের রং ফরসা, মুখটা সুন্দর তবে বেশ রাগী ধরনের। ফলে রাগ দখল করে নিয়েছে মুখের সৌন্দর্য।
ফারুখ বেরিয়ে যেতেই তিনি হায়দারের দিকে তাকালেন। কোন থানার লোক আপনি?
হায়দার কথা বলবার আগেই মিজান সাহেব মিনমিনে গলায় বললেন, ধানমন্ডি থানা।
তাঁকে কঠিন ধমক দিলেন রেখা। চোখ পাকিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি চুপ করো। একদম কথা বলবে না। আমি বাসায় নেই, তুমি পুলিশ ঢুকতে দিয়েছ কেন?
হায়দার গম্ভীর গলায় বললেন, এক্সকিউজ মি ম্যাডাম। ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশান, পুলিশের কোনো বাড়িতে ঢুকতে পারমিশান লাগে না। যখন যে বাড়িতে ইচ্ছা ঢুকতে পারে তারা।
আজকাল অনেক ভুয়া পুলিশও ধান্দা করার জন্য ভদ্রলোকের বাড়িতে এসে ঢোকে। আপনি ভুয়া কি না বুঝবো কী করে। দেখি আপনার আইডি কার্ড দেখি।
পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করলেন হায়দার। তাঁর মেজাজ বেশ খারাপ হয়েছে। কিন্তু নানান ধরনের লোক হ্যান্ডেল করে অভ্যস্ত বলে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলেন। এই যে দেখুন।
রেখা আইডি কার্ড নিয়ে দেখলেন। হায়দারের হাতে ফেরত দিয়ে সোফায় স্বামীর পাশে বসলেন। কী দরকারে এসেছেন বলুন?
মিজান সাহেবকে জিজ্ঞেস করুন।
আমি আপনার কাছ থেকে জানতে চাইছি। কী অভিযোগ?
তিন মাস ধরে আটকে রেখে পারুলকে আপনারা প্রায় মেরে ফেলেছেন, এই অভিযোগ।
না, আমরা কাউকে মারিনি।
অবশ্যই মেরেছেন।
মুখে বললে হবে না, প্রমাণ করতে হবে।
পারুলই প্রমাণ।
ওই মেয়ে তো কথাই বলতে পারে না। সে কী প্রমাণ দেবে।
অবশ্যই কথা বলতে পারে।
তাহলে পত্রিকায় ভুল লেখা হয়েছে, টিভিতে ভুল বলেছে!
না, রিপোর্ট ঠিক আছে। আপনাদের বাড়িতে কাজ করার সময় কথা বলতো না?
অবশ্যই বলতো। খুবই বাচাল টাইপের মেয়ে। অতি পাকনা আর চোর।
হায়দার হাসলেন। এটাই আশা করছিলাম, কখন মেয়েটিকে চোর বলেন। চুরি করে পালিয়েছে না?
জি।
কী চুরি করেছে? গহনা না টাকা, নাকি দুটোই?
আপনিই তো সব বলে দিচ্ছেন!
এসব আমাদের মুখস্থ। আপনি এখন যা যা বলবেন সব আমি বলে দিতে পারি। আপনি বলবেন, প্রথমে টুকটাক চুরি করতো এজন্য দুয়েকটা চড়-চাপড়ও মেরেছি। তাতেও ঠিক হচ্ছিল না। চুরি করে এটা ওটা খায়, টাকা-পয়সা সরায়। ওর জামাপ্যান্টের ভেতর থেকে ভাঁজ করা টাকা বেরিয়েছে। সোনার দুল বেরিয়েছে। ঠিক না? এজন্য মেরেছেন। তারপর বড় রকমের গহনা, এই ধরুন একটা হার, নয়তো এক-দু’ভরি ওজনের সোনার চেন নগদ পাঁচ-সাত-দশ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে।
একজাক্টলি। চেন চুরি করেছে, আমার গলার চেন। দেড় ভড়ি ওজন। আর নগদ টাকা ছ’হাজার। ওই নিয়ে পালিয়েছে।
থানায় রিপোর্ট করেছেন?
না, দরকার মনে করিনি। এই সামান্য ব্যাপারে থানায় কে যায়! পুলিশরা হা করে থাকে টাকা খাওয়ার জন্য। পারুল যা চুরি করেছে তার বহুগুণ বেশি খেয়ে ফেলবে পুলিশ। এজন্য যাইনি।
পুলিশ সম্পর্কে খুবই আপত্তিকর কথা আপনি বলছেন।
আপত্তিকর হবে কেন। এটাই সত্য।
যাহোক এই তর্কে আমি এখন যাবো না। এটার রেজাল্ট আপনি পাবেন।
থ্রেট করছেন? এসব থ্রেটফ্রেট করে কাজ হবে না। আপনার লেবেলের অফিসার পাত্তা দেয়ার লোক আমরা না।
মিজান সাহেব মিনমিনে গলায় বললেন, রেখা প্লিজ।
আগের মতোই চোখ পাকিয়ে স্বামীর দিকে তাকালেন রেখা। তুমি চুপ করো। খবরদার আমি কথা বলবার সময় কথা বলবে না।
হায়দার বললেন, কাজের মেয়ে বাড়িতে রাখতে হলে তাদের ঠিকানা ছবি এসব রাখতে হয়। রেখেছেন? দেখি, পারুলের ছবি আর ঠিকানা দিন।
চাকর-বাকরের ছবি ঠিকানা রাখার দরকার মনে করি না। আজ আসবে কাল চলে যাবে, এদের নিয়ে অত মাথা ঘামাবো কেন?
এটা নিয়ম।
অত নিয়মের ধার ধারি না।
কাজের লোক পালিয়ে গেলে থানায় রিপোর্ট করতে হয়, এটাও নিয়ম। কারণ কাজের মেয়েটি বা ছেলেটি বা লোকটি বা মহিলাটি কোথাও কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে তার দায়দায়িত্ব অনেকটা এসে পড়ে যে বাড়িতে সে কাজ করতো, তাদের ওপর।
রেখা রাগী চোখে হায়দারের দিকে তাকালেন। আপনি কী বলতে চান পরিষ্কার করে বলুন। এত ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলছেন কেন? কী অন্যায় আমরা করে ফেলেছি ওই মেয়ের ঠিকানা না রেখে! বরং ওকে আমরা বাঁচিয়ে দিয়েছি। চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার পরও থানায় জানাইনি, ধরিয়ে দেইনি।
আপনি খুবই দয়ালু।
শ্লেষ করবেন না, একদম শ্লেষ করবেন না। আমার পাওয়ার সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণাই নেই। এক মিনিটে আপনাকে আমি বান্দরবানে ট্রান্সফার করে দিতে পারি।
তাই নাকি?
জি।
হায়দার হাসিমুখে অতি বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল, আমি যা জানতে চাই, সেসব কি আপনি এখানে বসে বলবেন, না থানায় গিয়ে বলবেন?
রেখা বারুদের মতো জ্বলে উঠলেন। আপনার এতবড় সাহস! আমাকে থানায় নেবেন! দাঁড়ান, দেখছি।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে হাতের মোবাইলের বাটন টিপলেন রেখা। বাদল, তুই কি এখন একটু আসতে পারবি। হ্যাঁ ঝামেলা হয়েছে। ওই কাজের মেয়েটার ব্যাপারে পুলিশ এসেছে বাসায়। ভদ্রলোক যাচ্ছেতাই বিহেভ করছেন আমার সঙ্গে। আমাকে থানায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। দিচ্ছি, ধর।
মোবাইল হায়দারের দিকে এগিয়ে দিলেন রেখা। কথা বলুন।
হায়দার নির্বিকার গলায় বললেন, কে?
আমার খালাতো ভাই। সেক্রেটারি।
বলুন, আমি কথা বলতে পারবো না।
কী? একজন সেক্রেটারি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন আর আপনি কথা বলবেন না!
না, বলবো না।
আপনি... আপনি...
ফোন কানে লাগিয়ে রেখা বললেন, উনি কথা বলবেন না। খুবই এরোগেন্ট টাইপের। ধানমন্ডি থানা, ধানমন্ডি। ধর।
আবার হায়দারের দিকে তাকালেন রেখা। আপনার নাম?
হায়দার আগের মতোই নির্বিকার। আইডি কার্ডে লেখা ছিল। আপনি দেখেছেন?
হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে।
বাদল সাহেবকে হায়দারের নাম বললেন রেখা। তুই একটু দেখ। ঠিক আছে, ঠিক আছে।
ফোন রেখে বসলেন রেখা।
হায়দার বললেন, ওইটুকু একটা মেয়েকে এভাবে দিনের পর দিন মারতে আপনার বিবেকে লাগেনি? আপনিও তো মা। হোক কাজের মেয়ে। মানুষ তো!
চোর আর মানুষ এক না।
মিথ্যা বলবেন না, একদম মিথ্যা বলবেন না। ওই মেয়ে কিচ্ছু চুরি করেনি। তার অপরাধ ছিল সে আপনার মনের মতো কাজ করতে পারেনি। অর্থাত্ আপনাকে যেটুকু বুঝলাম, তাতে এটা পরিষ্কার, আপনার মনের মতো কাজ করা পৃথিবীর কারও পক্ষে সম্ভব না। আপনি বদরাগী, ক্রেজি মহিলা। আপনার ফ্ল্যাটে কাজের লোক না থাকার এটা একটা কারণ। শিক্ষিত পরিবারের কোনো ভদ্রমহিলা আপনার মতো রুক্ষ বাজে বিহেভের হতে পারে, আমার ধারণাই ছিল না।
রাগে মুখ লাল হয়ে আছে রেখার। হায়দারের কথা শুনে উঠে দাঁড়ালেন। সাটআপ। মুখ সামলে কথা বলবেন। আপনি বেরোন, বেরোন আমার বাড়ি থেকে। যা পারেন করেন গিয়ে। যান। আপনার মতো অনেক পুলিশ অফিসার আমি দেখেছি।
ঠিক তখনই হায়দারের মোবাইলে রিং হলো। স্ক্রিনে নাম দেখে ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি ফুটল তাঁর। ফোন ধরে বললেন, স্লামালেকুম স্যার। স্যার, স্যার। বুঝেছি আপনি কী জন্য ফোন করেছেন। ওকে স্যার, ওকে। জি, স্লামালেকুম।
ফোন রেখে উঠলেন হায়দার। রেখার দিকে না, তাকালেন মিজান সাহেবের দিকে। আসি স্যার। পরে কথা হবে। স্লামালেকুম।
হায়দারকে শুনিয়ে রেখা বললেন, খবর হয়ে গেছে কোন বাড়িতে এসেছে। এজন্য লেজ গুটিয়ে পালালো।
কথাটা শুনেও শুনলেন না হায়দার। গাড়িতে উঠেই কবিকে ফোন করলেন। বস...
কবি গম্ভীর গলায় বলল, কাজ হলো?
না রে ভাই, আমার কপালই খারাপ। প্রধানখাদ্যের ব্যবস্থা করতেই পারছি না। শুনুন বস, আপনি আমাকে একটু হেল্প করবেন?
প্রধানখাদ্য ছাড়া পারুলের যেকোনো ব্যাপারে করবো।
প্রধানখাদ্য না, পারুলের ব্যাপারই।
বলে ফেলুন।
মিজান সাহেব এবং রেখার কথা সবই বললেন হায়দার, সেক্রেটারি সাহেবের কথা বললেন। তার পর পরই ওসি সাহেব তাঁকে ফোন করে চলে আসতে বললেন। নিশ্চয় ওসি সাহেবকে ফোন করেছেন এসপি। তার মানে ওদের হাত লম্বা, ক্ষমতাবান মানুষজন আছে পাশে। একজন সেক্রেটারি মাত্র দেখিয়েছেন, নিশ্চয় এরকম আরও আছে।
কবি বলল, বুঝে গেছি।
হায়দার দৃঢ় গলায় বললেন, ভদ্রমহিলাকে আমি ছাড়বো না। একটি মেয়েকে প্রায় মেরে ফেলেছেন, এখন তাকে চোর সাজাচ্ছেন, আমি পারুলের পাশে আছি। যদি আমার চাকরি চলে যায় যাবে, কিন্তু আমি এই কেস থেকে এক পা-ও সরবো না।
কবি উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, শাবাশ! আছি আপনার সঙ্গে। আমি এক্ষুনি ভাইয়াকে ফোন করছি, রুনুভাইকে বলছি। তাঁরা দু’জন কথা বলবেন মোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে। দেখি মহিলার ক্ষমতা কত আর আমাদের কত! আপনাকে এই কেস থেকে কেউ সরাতে পারবে না। তবে...
তবে?
যদি প্রধানখাদ্যের ধান্দা করেন তাহলে খবর আছে।
হায়দার হাসলেন। না বস, করবো না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। আমার কথার দাম আছে।
গুড, ভেরি গুড। এই তো চাই।


ছয়
পারুল, ও পারুল! কতদিন পর গোসল করলে তুমি? দশ-বারোদিন হবে নাকি তারও বেশি! এতদিন কখনো গোসল না করে থেকেছ! ওই বাড়িতে কি গোসল করতে পারতে! জামাকাপড় ছিল তোমার! আরে না, কী করে গোসল করবে! যে বাড়ির মানুষ তোমাকে এমন টর্চার করতো তারা কি তোমাকে গোসল করতে দিত! এতদিন পর আজ গোসল করতে পেরে আরাম লাগছে না! আর কী আরাম তোমার দেখো, ছোট্টবেলায় যেভাবে তোমার মা তোমাকে গোসল করিয়ে দিতেন, এই হাসপাতালের দু’জন সিস্টার ঠিক তেমন করে তোমাকে গোসল করিয়ে দিল। গরম পানি সাবান শ্যাম্পু দিয়ে

অনেকক্ষণ গোসল করলে শরীর খুব ফ্রেশ লাগে, ঝরঝরে লাগে। কী যে আরাম! আহ্! গোসল করার পর থেকে আমি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে তোমাকে দেখছি। তোমার চেহারাই আজ বদলে গেছে। শরীরের ঘাগুলো শুকিয়ে আসছে, ব্যথা-বেদনাও বোধহয় নেই, ফ্রেশ অনেক ফ্রেশ তুমি। তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি, প্রায় ভালো হয়ে উঠেছ তুমি! বড়জোড় আর চার-পাঁচ দিন, তারপরই হাসাপাতাল জীবন শেষ হবে তোমার। সোজা বাড়ি চলে যেতে পারবে। জুলেখার মা তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। কোনো চিন্তা করো না, সব ব্যবস্থা করে দেবো আমি। আর ওই যে, যেবাড়িতে তুমি ছিলে, ওই শয়তান মহিলাকে আমরা দেখে নেব। ঠিক জেলে ঢুকাবো। কী রকম মিথ্যুক মহিলা, তোমার নামে চুরির অপবাদ দিচ্ছে। তুমি নাকি সোনার চেন চুরি করেছ, ছ’হাজার টাকা চুরি করেছ! বাজে মহিলা। মিথ্যুক। এসব বলে সে পার পাবে না। তাকে আমরা দেখে নেব।
পারুলের ওই একই অবস্থা, কথা বলে না, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কবির কথা শুনে এখনো তাকিয়ে আছে। এখন আর যখন তখন পানি আসে না চোখে। কিন্তু কবির শেষ দিককার কথা শুনে এল।
কবি বলল, এ কী! কাঁদছো কেন? বুঝেছি, মহিলা তোমাকে চোর বলেছে একথা শুনে কাঁদছ। মহিলা কী বলল না বলল তাতে কিছু যায় আসে না। পুলিশ অফিসার যা বোঝার বুঝেছেন, আমিও বুঝেছি। তুমি খুব ভালো মেয়ে। মহিলা এখন নিজের দোষ ঢাকার জন্য তোমার ওপর উলটো দোষ চাপাচ্ছে। এতে কাজ হবে না। ওকে আমরা জেলে ঢুকাবোই। তুমি একদম কান্নাকাটি করবে না, মন খারাপ করবে না। আর একটা কথা, একটুও ভয় পাবে না। আমি তো তোমার সঙ্গে আছিই, আমার ভাই ভাবী আছেন, এই হাসপাতালের ডাক্তাররা আছেন, পুলিশ অফিসার আছেন, সাংবাদিক আছেন, সবাই তোমাকে হেল্প করবে। এত মানুষ পাশে থাকতে কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
পারুলের মাথায় হাত বুলাতে লাগল কবি। মুখের দিকে ঝুঁকে বলল, তোমার নামটা কী সুন্দর! পারুল। ফুলের নামে নাম। কত সুন্দর সুন্দর গান আছে তোমার নাম নিয়ে। কত কবি তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তুমি দেখতেও তোমার নামের মতো সুন্দর। কী সুন্দর চোখ তোমার, কী সুন্দর মুখের গড়ন।
কবির কথা শুনে একটু যেন মুগ্ধতার আলো ঝিলিক দেয় পারুলের মুখে। চোখের দৃষ্টিতে লাগে ভালো লাগার ছোঁয়া। ঠোঁটে যেন লাগে আনন্দের কাঁপন।
ব্যাপারটা খেয়াল করল কবি। হাসিমুখে বলল, আচ্ছা, নিজের প্রশংসা শুনে ভালো লাগছে, না! আমি একটুও বানিয়ে বলছি না সোনা, একটুও বানিয়ে বলছি না। সত্য কথা বলছি। তুমি সত্যি খুব মিষ্টি মেয়ে। চিনির মতো, না না গুড়ের মতো। পাটালি গুড়ের মতো।
কে পাটালি গুড়ের মতো?
কবি চমকে দরজার দিকে তাকাল। রিমি দাঁড়িয়ে আছে। আজ তার পরনে আকাশি রংয়ের খুব সুন্দর তাঁতের শাড়ি। এপ্রন স্টেথিসকোপ কিছু নেই সঙ্গে। আজ তাকে ডাক্তার মনেই হচ্ছে না। কবি মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কী অসাধারণ লাগছে আজ রিমিকে।
কবি বলল, আমার হয়েছে বিপদ। ঘরে এক সুন্দরী বাইরে আরেক সুন্দরী। কাকে রেখে কাকে দেখি।
রিমি এগিয়ে এসে বলল, সুন্দরী শব্দটা খুবই বাজে। আমার সামনে কখনো এই শব্দটা বলবেন না। শুনলে ঘৃণা লাগে।
তাহলে কী বলব?
সুন্দর, সুন্দর বলবেন।
আচ্ছা বলছি। আপনি অনন্যসাধারণ সুন্দর। আপনার চোখ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নারীর চোখ, ঐশ্বরিয়ার চোখের মতো।
না, বলুন আমার চোখ আমার মতোই। অন্য কারো মতো না।
আপনার চোখ সত্যি আপনার মতো। আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনার তুলনা আপনি, শুধুই আপনি। রবীন্দ্রনাথের গানের মতো, ‘তোমার তুলনা তুমি’।
রিমি মিষ্টি করে হাসলো। খুশি হলাম।
আকাশি রংয়ের শাড়িতে কী যে মানিয়েছে আপনাকে, বলে বোঝাতে পারবো না।
আপনার ওই গল্পের নায়িকার মতো লাগছে?
তারচে’ কোটিগুণ ভালো লাগছে। কল্পনার নারীর চে’ বাস্তবের নারী বেশি সুন্দর হয়, জীবনে প্রথমবার দেখলাম। কিন্তু আপনি আজ একা কেন?
আমার আজ ডেঅফ।
তাই! এজন্যই সকাল থেকে দেখিনি!
বিকেলেও দেখার কথা না। তবু এলাম।
কেন এসেছেন? আমার জন্য?
ইস আমার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই! আপনার জন্য আসবো কেন? এসেছি আমার পেসেন্টের জন্য।
পারুলের সামনে এসে দাঁড়াল রিমি। তোমাকে খুবই ফ্রেশ লাগছে আজ। মনে হচ্ছে একদমই ভালো হয়ে গেছ। চার-পাঁচদিনের মধ্যেই বাড়ি চলে যেতে পারবে।
কবি বলল, আমি চাই আরও বেশিদিন থাকুক।
কেন?
ও চলে গেলেই আমি শেষ। আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না।
কবির চোখের দিকে তাকাল রিমি। চা খাবো।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না কবি। বলল, জি।
কানে কম শোনেন?
না মানে আপনাকে দেখলে আমার অবস্থা হয় হেমন্তের গানের মতো। ‘তুমি কী যে বলো বুঝি না, তোমার মুখের পানে চাহিলে আমি কিছু শুনি না’।
চান্সে আমাকে তুমি করে বলা হচ্ছে?
আরে ছি ছি। সেই সাহস কি আমার হবে!
না হওয়াই ভালো। আমার বর ডেঞ্জারাস লোক।
এই একটা জায়গায়ই মার খেয়ে গেলাম।
রিমি সোফায় বসল। চা দিন। তাড়াতাড়ি। নিজেও নিন।
প্রীত হলাম, অতিশয় প্রীত হলাম।
ফ্লাস্ক থেকে মগে গরম পানি ঢালল কবি, নিজে গরম পানি নিল একটা পানি খাওয়ার গ্লাসে। টি ব্যাগ ভিজিয়ে মগ দিল রিমির হাতে, নিজে গ্লাস নিয়ে বসল তার মুখোমুখি। আমার প্রতি এত দয়া?
রিমি চায়ে চুমুক দিল। কী রকম?
নিজে থেকে চা চাইলেন!
এতে দয়ার কিছু নেই। চা খেতে ইচ্ছে করেছে, চাইলাম।
এটাই দয়া।
হলে ভালো। কাউকে কাউকে মাঝে মাঝে দয়া করা উচিত।
কবিও চায়ে চুমুক দিল। শুনুন, অনেকদূর এগিয়েছি আমরা। পুলিশ অফিসার খুবই সিরিয়াস হয়ে উঠেছেন...
হায়দারের কাছ থেকে শোনা সবকিছুই রিমিকে বলল কবি। তারপর রবিকে ফোন করে বলেছে মোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে, রুনু সাহেবকে বলেছে, এসবও বলল। ওঁরা বোধহয় কথা বলে ফেলেছেন। হায়দার এখন স্বচ্ছন্দে এগোতে পারবে।
শুনে খুশি হলো রিমি। খুব ভালো খবর। একটা পরামর্শ দিতে পারি?
প্লিজ।
আপনার ওই সাংবাদিক বন্ধুকেও জানিয়ে রাখেন। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাপোর্ট অনেক কাজে লাগবে। আমাদের দেশের মিডিয়া এখন খুবই পাওয়ারফুল।
ঠিক বলেছেন। নয়নের সঙ্গে আজই কথা বলবো। এখন একটা গল্প শুনবেন?
না। আজ ঘটনা উলটো।
কী রকম?
গল্প বলবো আমি, শুনবেন আপনি।
রিমি পারুলের দিকে তাকাল। পারুল তার মতো করে তাকিয়ে আছে রিমি আর কবির দিকে। কবি খেয়াল করেছে রিমি এলেই এই অবস্থায়ও সে কেমন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি খেলা করে তার। সেই দৃষ্টিতে মুগ্ধতা কিনা বোঝা যায় না। বিষ্ময়ও হতে পারে। হয়তো পারুল ভাবে ডাক্তার দেখতে কী সুন্দর! এত সুন্দরও মানুষ হয়। আবার হয়তো ভাবে, মানুষে মানুষে কত ব্যবধান। কোথায় ডাক্তার কিংবা কবি আর কোথায় সে। এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মেছে খেটে খাওয়ার জন্য আর কিছু মানুষ জন্মেছে মানুষকে খাটাবার জন্য। কিছু মানুষ জন্মেছে অপমান অপদস্ত আর অপবাদ শুনবার জন্য, আর কিছু মানুষ জন্মেছে ওই মানুষগুলোকে অপমান অপদস্থ করবার জন্য।
রিমি বলল, এও এক ডাক্তার মেয়ের গল্প। বিশাল বড়লোকের মেয়ে। তিন বোনের মধ্যে ছোট, অতি আদরের। খুবই ব্রিলিয়ান্ট, অসাধারণ মেধাবী। স্কুল-কলেজে ভালো রেজাল্ট করলো। ডাক্তারি পড়তে গিয়ে ভালো রেজাল্ট করলো। তিন বোনের মধ্যে তাকে সবাই বেশি ভালো বলে। বড় দু’বোনও সুন্দর, তবে তার মতো না। কিন্তু মেয়েটির দোষ হলো, সে যা ভালো বুঝবে, তা-ই করবে। কারও কথা শুনবে না। তার নিজের বিচার-বিবেচনাই শেষ কথা। গুলশানে তাদের ছ’তলা বাড়ি, ধানমন্ডিতে ছ’তলা বাড়ি। বাবা গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। টাকার অন্ত নেই।
কবি বলল, নাম কী?
নীলবর্ণ।
অদ্ভুত নাম তো!
হ্যাঁ একটু অদ্ভুতই। ছোট বয়সে কাঁদতে কাঁদতে ফরসা মেয়েটি কখনো কখনো নীল হয়ে যেত। এজন্য মা-বাবা ওই নামে ডাকতো। বোনরাও ডাকতো। খুব কাছের আত্মীয় বন্ধু ছাড়া এই নামটা অন্যরা জানতো না।
অন্যদের কাছে কী নাম তার?
সেটা খুব জরুরি না।
ঠিক আছে, বলুন।
রেজাল্ট বেরুবার পর ইন্টারনি শেষ করল নীলবর্ণ, সরকারি চাকরিতে ঢুকলো। পোস্টিং হলো ঢাকার কাছেই, গাজিপুরে। গুলশানের বাড়ি থেকে প্রতিদিন হাসপাতালে যায়। এত দামি গাড়িতে এত সুন্দর ডাক্তার, হাসপাতালে তার কদরই অন্যরকম। ইয়ং ডাক্তারা তো বটেই বুড়োগুলো পর্যন্ত চান্স পেলেই একটু ভাব করার চেষ্টা করে। নীলবর্ণ তার পার্সোনালিটি দিয়ে সব ম্যানেজ করে চলে। তার সৌন্দর্যের জন্য, সুন্দর ব্যবহারের জন্য হাসপাতালের স্টাফদের কাছে সে খুব পপুলার। রোগীরা একবার ওই হাসপাতালে এলে, তাকে দেখালে, পরে এসে তাকেই খোঁজে। তার সঙ্গে কথা বলেই অর্ধেক ভালো হয়ে যায়।
কবি চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, যেমন আপনি।
রিমি চোখ পাকালো। এই, আমার গল্পের মাঝখানে ফোঁড়ন কাটবেন না।
কবি বাধুক ছেলের মতো বলল, ওকে ম্যাম, ওকে।
রিমি চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, এক সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখে, লেবারওয়ার্ডে উনিশ-বিশ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছে। তার বাচ্চা হবে। গ্রামের খুব সরল সুন্দর মেয়ে। মেয়েটির সঙ্গে তার বাবা আছে। গাজিপুর জেলার কোনো এক গ্রাম থেকে এসেছে। বাবার মুখটা কাঁচুমাচু, শুকনো, যেন লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। নীলবর্ণ জিজ্ঞেস করলো, মেয়ের বর কোথায়? ভদ্রলোক নীলবর্ণের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বললেন, মা, আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে। দয়া করে কি শুনবেন!
নীলবর্ণ তাঁকে নিজের রুমে নিয়ে বসালো। বলুন।
ভদ্রলোক ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। মাগো, আপনি আমার মেয়ের মতো। আমি একজন শিক্ষক। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। মেয়েটা আমার ছোটমেয়ে। আমার দুই ছেলে দুই মেয়ে। সবারই বিয়েশাদি হয়ে গেছে। বড় দুই মেয়ে থাকে ঢাকায়, ছেলে বড়টা আমার সঙ্গে, ছোটটা সৌদি আরবে। সৌদি আরবে যে ছেলে, তার বউ শ্বশুর বাড়িতে। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর। বড়ছেলে গাজিপুরের একটা গার্মেন্টে চাকরি করে। এই ছোট মেয়েটা, ওর নাম কুসুম, কুসুম ইন্টারমিডিয়েট পড়তো। গ্রামের লুত্ফর মেম্বারের ছেলে রঞ্জুর সঙ্গে তার ভাব হয়। রঞ্জু দেখতে বেশ ভালো, তবে বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে। নেশাটেশা করে, বাজে আড্ডা দেয়। বাপের একমাত্র ছেলে। অঢেল টাকা মেম্বারের। ছেলে যখন যা চায় তা-ই পায়। এই ছেলের সঙ্গে মেলামেশার ফলে কুসুম কনসিপ করে। কিন্তু সে এতই সরল-সোজা, ব্যাপারটা অনেকদিন বুঝতেই পারেনি। যখন পেট উঁচু হতে শুরু করেছে, প্রথম খেয়াল করেছে আমার বড়ছেলের বউ, তারপর কুসুমের মা। তখন সময় পার হয়ে গেছে। আমাদের করার নেই কিছুই।
কবি বলল, পরের অংশটা আমি বলে দিতে পারি।
রিমি ভুরু কুঁচকে তাকালো। বলুন তো দেখি মেলে কি না!
অবশ্যই মিলবে। মাস্টার সাহেব আর তার বড়ছেলে লুত্ফর মেম্বারকে ধরলো, রঞ্জুকে ধরলো। রঞ্জু স্ট্রেট অস্বীকার করলো। লুত্ফর মেম্বার গেল ক্ষেপে। এতবড় সাহস, আমার ছেলের নামে দুর্নাম রটাচ্ছে গরিব মাস্টার। ওদেরকে গ্রাম ছাড়া করবো। কুসুম একটা বাজে মেয়ে। কোথায় কী ঘটিয়ে এখন আমার নিরীহ ছেলেকে ফাঁসাবার চেষ্টা। অপমান করে বাপ-ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়ালো।
একজাক্টলি। সিনেমায় এরকম হলে মেয়েটি গিয়ে ছেলেটিকে ধরতো। কিন্তু কুসুম তেমন মেয়ে না। ঘটনা বোঝার পর থেকে সে কারও সঙ্গে কথাই বলে না। মা মাঝে মাঝে রাগের চোটে চড়থাপড় মারেন, কুসুম নিঃশব্দে কাঁদে।
আত্মহত্যার অ্যাটেম্পট নেয়নি?
না।
এসব ক্ষেত্রে তা-ই করে অনেকে।
কুসুম করেনি। একটা চাদরে শরীর ঢেকে বাড়িতে বসে থাকে। কোথাও বেরোয় না, কাউকে মুখ দেখায় না। বাপ অসম্ভব ভালোবাসেন মেয়েকে। প্রায়ই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। তোকে নিয়ে আমি এখন কী করবো মা! এই বাচ্চা নিয়ে কী করবি তুই? তোর জীবন আর জীবন থাকবে না। তোর ভবিষ্যত্ বলে কিছু থাকলো না। মানুষকে মুখ দেখাতে পারবি না, বিয়ে হবে না তোর। তোর জীবন কীভাবে কাটবে! কুসুম নিঃশব্দে কাঁদে, অথবা চুপচাপ কোনো দিকে তাকিয়ে থাকে। বাপ ছাড়া বাড়ির কেউ তার সঙ্গে কথা
বলে না। মা একটু রাগী ধরনের। বাপকে বলেন, ওকে বাড়িতে রেখেছ কেন? বের করে দাও বাড়ি থেকে। যেখানে ইচ্ছা যাক। ও মরে গেলেই পারে। ভাই ভাইরবউও বলে একই কথা। কিন্তু বাপ আগলে রাখে মেয়েকে। শেষ পর্যন্ত ব্যথা ওঠে কুসুমের। বাবা তাকে রিকশা করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। ভর্তি করাবার সময় বলে, মেয়ের বর বিদেশে থাকে।
বুঝলাম, কিন্তু নীলবর্ণের কাছে কী সাহায্য চাইলেন ভদ্রলোক!
বললেন, এই বাচ্চা আমরা বাড়ি নেব না। আপনি দয়া করে বাচ্চাটা কাউকে দিয়ে দেবেন।
নীলবর্ণ অবাক। বলেন কী! এ কী করে সম্ভব! আমি কাকে দেবো ওই বাচ্চা! না না এ সম্ভব না, একদমই সম্ভব না।
ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে নীলবর্ণের হাত ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, মা, আপনি আমার সম্মান বাঁচান। কুসুমের জীবন বাঁচান। বাচ্চা না থাকলে আমি ওকে কোথাও না কোথাও বিয়ে দিতে পারবো। আমার মেয়েটা দেখতে সুন্দর।
নীলবর্ণ তখন খুবই অসহায় বোধ করছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। লেবারওয়ার্ড থেকে সিস্টার ছুটে এসে বলল, ম্যাডাম তাড়াতাড়ি আসেন। এখনই বাচ্চা হবে। ভদ্রলোককে বসিয়ে সে ছুটে গেল ওয়ার্ডে। কুসুমের একটা ছেলে হলো। এত সুন্দর বাচ্চা, সত্যিকার অর্থে চাঁদের টুকরো। বর্ষাকাল। সকাল থেকে ঝুম বৃষ্টি। চারদিক অন্ধাকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। নীলবর্ণর মনে হলো, ওই শিশুর আলোয় সত্যি সত্যি আলোকিত হয়ে গেছে চারদিক। কিন্তু কুসুম একবারও শিশুটির দিকে তাকাল না। শিশুটিকে যাতে না দেখতে হয় এজন্য অন্যদিকে মুখ কাত করে চোখ বুজে আছে। নীলবর্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রুমে ফিরে এল। এসে দেখে ভদ্রলোক নেই। সে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। ভাবলো, ভদ্রলোক নিশ্চয় আবার তার কাছে আসবে। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক পার হয়ে গেল, ভদ্রলোকের দেখা নেই। কোথায় গেল সে! নীলবর্ণ লেবারওয়ার্ডে এল। এসে দেখে বাচ্চাটা পড়ে আছে, কুসুম নেই। মফস্বলের হাসপাতালের ওয়ার্ড, একেবারেই গরিব-দুঃখী মানুষের জায়গা। সেদিন তেমন দু-তিন জন রোগী ছিল। কিন্তু কুসুম গেল কোথায়! একজন আয়া বলল, বাথরুমের কথা বলে উঠল, তারপর আর ফেরেনি। কী আশ্চর্য কথা! বাচ্চা ফেলে কোথায় চলে গেল!
বাচ্চাটা তখন ক্ষুধার কষ্টে কাঁদছে।
দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে গেল, না সেই ভদ্রলোক না কুসুম, কাউকে আর পাওয়া গেল না। একজন আয়া বলল, কী আর করা যাবে। এই বাচ্চা আমিই লইয়া যামু নে। আমার এক নিঃসন্তান বইন আছে, ওরে দিয়া দিমু নে।
কিন্তু এরকম দেবশিশুর মতো একটি শিশু চলে যাবে আয়ার হাতে! না, এ হতে পারে না। ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দামি টাওয়েল কিনে আনালো নীলবর্ণ, দুধ ফিডার কিনে আনালো। বাচ্চাকে খাইয়ে টাওয়ালে জড়িয়ে নিয়ে এল নিজেদের বাড়িতে। বাড়ির লোকজন বিস্মিত। এ কী! কার বাচ্চা নিয়ে এসেছে মেয়ে! ঘটনা বলল নীলবর্ণ। শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল বাড়ির লোকজন, শিশুটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করল না। পরদিন হাসপাতালে গেল না নীলবর্ণ, শিশুটির পরিচর্যা, যত্ন নিয়ে থাকলো। শপিংমলে গিয়ে ওইটুকু শিশুর যা যা দরকার সব কিনে আনলো, ডাক্তারি বাদ দিয়ে ওই শিশু নিয়ে মেতে গেল। এদিকে হাসপাতালের বলল, হাসপাতালের রেজিস্ট্রি খাতায় রোগী এবং তার অভিভাবকের নাম ঠিকানা ধরে খোঁজখবর করো। হাসপাতাল তো আর এ কাজ করে না, তারা জানালো পুলিশকে। পুলিশ খোঁজখবর করে জানলো নাম ঠিকানা সবই ভুয়া...
কবি চায়ের গ্লাস নামিয়ে রেখে বলল, আমি এরকমই ভেবেছিলাম।
রিমির চা-ও শেষ হয়েছে, কবি তার হাত থেকে মগ নিয়ে টেবিলে রাখলো।
রিমি বলল, নীলবর্ণ কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুশি।
কেন?
বাচ্চার মায়ের হদিস নেই, ওই শিক্ষক পরিচয় দেওয়া ভদ্রলোকের হদিস নেই। তার মানে শিশুটি সম্পূর্ণই তার। আর ওই শিশু মাত্র কয়েকদিনেই তার নেশা হয়ে উঠেছে। হাসপাতালে যাওয়া সে ছেড়েই দিল। চব্বিশ ঘণ্টা শিশুটিকে নিয়ে থাকে। রাত জেগে শিশুকে খাওয়াচ্ছে, গোসল করাচ্ছে, লোশন লাগাচ্ছে, যখন তখন শিশুর প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ছুটে যাচ্ছে মার্কেটে। তার ধ্যান জ্ঞান প্রেম সব হয়ে দাঁড়াল ওই শিশু। হাসপাতালের চাকরিতে সে যায়ই না।
তার পরের অংশ আমি বলে দিতে পারি।
তাই!
হ্যাঁ, বলবো?
বলুন শুনি!
এই শিশুটিকে নিয়ে পরিবারে শুরু হলো অশান্তি। প্রথমে টুকটাক কথাবার্তা, তারপর সরাসরি নীলবর্ণকে বিব্রত করা। কেউ বলল, এতিমখানায় দিয়ে দাও। কেউ বলল, কোনো গরিব আত্মীয়র কাছে দিয়ে দাও। তাকে আমরা মাসে মাসে বাচ্চা প্রতিপালনের জন্য পে করবো। আত্মীয়স্বজনরা বাজে সন্দেহ করতে লাগল। সন্দেহটা এমন যে, বাচ্চাটা নীলবর্ণেরই। তার কারও সঙ্গে প্রেম ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি।
কবির চোখের দিকে তাকিয়ে রিমি বলল, একজাক্টলি।
এমনকি নীলবর্ণের খুব কাছের বন্ধুবান্ধবরাও একই রকম সন্দেহ করতে লাগল। হতে পারে তার একজন প্রেমিকও ছিল, তার সঙ্গে বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক, সেই প্রেমিকও এত বড়লোক বাড়ির ডাক্তার মেয়ে, অসাধারণ সুন্দর, সেই মেয়েকে ছেড়ে গেল ওই শিশুর জন্য।
হুবহু মিলে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি আপনি অনুমান করে বলছেন। তবে এরকমই হওয়ার কথা। কেউ কেউ নীলবর্ণকে তার ক্যারিয়ার নিয়েও বলছিল। তুমি এত ব্রাইট ডক্টর, কোথায় বড় বড় ডিগ্রি নেবে, প্রফেশানে অনেক নাম করবে, তা না করে কোথাকার কোন একটা বাচ্চা নিয়ে নাটক-সিনেমা শুরু করেছ। বোনরা বোঝায়, বোনজামাই, মা-বাবা সবাই বোঝায়, নীলবর্ণ কারও কোনো কথাই শোনে না। তার ওই এক কথা, যার যা ইচ্ছা ভাবতে পারো তোমরা, আমি সত্য ঘটনা তোমাদেরকে বলেছি। প্রয়োজনে আমার হাসপাতালে খোঁজখবর করেও জানতে পারো আমি ঠিক বলেছি কি না। তারপরও যদি কারও বিশ্বাস না হয়, আমার কিছুই যায় আসে না। কিন্তু আমার ছেলেকে নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না। যদি বলো তাহলে আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। নীলবর্ণের মা একটু রাগী ধরনের। তিনি কঠিন গলায় একদিন বললেন, কোনো রকমের ভয় আমাদেরকে দেখাবে না। তোমার অনেক বাড়াবাড়ি সহ্য করেছি, আর করবো না। হয় আমাদের কথামতো এই বাচ্চার ব্যবস্থা করো আর নয়তো তুমি তোমার পথ দেখো। আমরা তোমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবো না।
কবি বলল, একদম উপন্যাসের মতো। অনেকদিন আগে ঠিক এরকম একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। নাম হচ্ছে ‘দোলনা’। আশাপূর্ণা দেবীর লেখা।
তাই নাকি!
হ্যাঁ, একদমই এই গল্প। নীলবর্ণের গল্পের শেষটা আমি বলে দিতে পারি।
বলুন তো!
শিশুটি বড় হচ্ছে আর তাকে নিয়ে কথাবার্তা বাড়ছে। ওদিকে এই শিশুর জন্য নিজের ক্যারিয়ার প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে নীলবর্ণ। সরকারি হাসপাতালের চাকরি চলে গেছে। মা-বাবা, বোনরা, বোনজামাইরা তার ওপর মহাবিরক্ত। শিশুটিকে নিয়ে গভীর কোনো ষড়যন্ত্রও তাঁরা করতে পারেন। এসব টের পেয়ে আর মায়ের আচরণে, বোন বোনজামাইদের আচরণে অভিমান বিরক্তিতে ছেলেকে বুকে নিয়ে একদিন পথে নামলো নীলবর্ণ...
ঠিক এরকম না, প্রায় এরকম। নীলবর্ণের প্রেমিকও তাকে নানারকমভাবে বোঝাবার চেষ্টা করলো। এই বাচ্চাসহ বিয়ে তাকে সে করতে পারবে না। তাদের বাড়ির কেউ এটা মেনে নেবে না। নীলবর্ণ তার মতো করে বলল, আমাকে বিয়ে করতে হলে আমার বাচ্চাসহ করতে হবে, নয়তো অন্য মেয়েকে বিয়ে করো গিয়ে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। বিয়ে ভেঙে গেল। নীলবর্ণের যে প্রেমিক তারাও উচ্চবিত্তের, উচ্চশিক্ষিত পরিবার। ছেলে পরিবারের বিরুদ্ধে গেল না। এতে নীলবর্ণের মা আরো ক্ষিপ্ত হলেন। না কিছুতেই এই মেয়ের
বাড়াবাড়ি তাঁরা মেনে নেবেন না। শেষ পর্যন্ত সেই বাচ্চা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল সে। এক বন্ধুর বাড়িতে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিল, ছেলের জন্য একজন আয়া রাখলো, নিজে চলার জন্য কাছাকাছি প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি নিল। আর ততদিনে সেই শিশু নীলবর্ণের এমন বাধ্য হয়েছে, অপলক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে মাকে দেখে, মা দেখে ছেলেকে। যতক্ষণ হাসপাতালে থাকে, তার বুকটা হু হু করে। কখন বাড়ি যাবে, কখন দেখবে তার ছেলেকে।
পারুলও কী রকম মুগ্ধ হয়ে শুনছিল রিমির গল্প। অপলক চোখে তাকিয়ে আছে রিমির দিকে।
কবি একবার পারুলের দিকে তাকালো। তারপর রিমির দিকে তাকিয়ে বলল, নীলবর্ণকে আমি চিনি। তার নাম আসলে রিমি আর তার ছেলের নাম সংযুক্ত। তিনি তাকে সনজুবাবা বলে ডাকেন।
রিমি মাথা নিচু করে বলল, একজাক্টলি।
একটা কথা বলবো?
পারমিশানের দরকার নেই। বলুন।
ইউ আর সিম্পলি গ্রেট। তুমি এক মহান মানুষ।
কবির চোখের দিকে তাকাল রিমি। আমাকে তুমি করে বললে আমি কিন্তু তোকে তুই করে বলবো!
বল না, বল। আমি তো চাই তুই আমাকে তুই করে বল।
রিমি উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, আমার ছেলের ছবি দেখবে?
দেখি।
নিজের মোবাইলে ছেলের ছবি বের করে কবির হাতে দিল রিমি। দেখো, অনেক ছবি আছে।
কবি ছবি দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে গেল। এ তো সত্যি দেবশিশু। এত সুন্দর শিশু আমি বহুদিন দেখিনি। পরম করুণাময় ওকে তোমার জন্যই পাঠিয়েছিলেন। তুমি ছাড়া ওর মা হওয়ার যোগ্যতা আর কারও নেই। এখন কী অবস্থা তোমার?
আমার বাবা আমাকে খুবই ভালোবাসেন। তিনি অনেক কান্নাকাটি করতেন আমার জন্য। আবার এটাও জানেন, তাঁর এই মেয়েটি যা বলবে তা-ই করবে এবং সে কোনো অন্যায় করার মেয়ে না। কিন্তু মা কঠিন। আমি একটা যেনতেন ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকি, আর আমাদের এতবড় বাড়ি গুলশানে, ধানমন্ডিতে...
মানে নীলবর্ণের যা বর্ণনা আর কী?
রাইট। শেষ পর্যন্ত বাবা ধানমন্ডির বাড়ি আমাকে দিলেন। আমি একটা বড় ফ্ল্যাটে থাকি। সনজুবাবার জন্য দু’জন আয়া। বেশ দামি দুটো গাড়ি। একটা আমার ছেলের স্কুলের জন্য আর একটা আমার হাসপাতালে আসার জন্য। অন্যান্য ফ্ল্যাটের ভাড়াও আমি পাই।
তবে তো রাজার হালে আছো?
তা আছি। দাও, ফোন দাও। আমি আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলব।
কবির হাত থেকে ফোন নিয়ে বাড়িতে ফোন করলো রিমি। ওপাশে আয়া ধরলো। রিমি বলল, আমার ছেলে কোথায়! দাও তাকে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফোন ধরলো ছেলে। রিমি খুবই আদুরে গলায় বলল, আমার বাবাটা কী করে রে! আমার কলিজুটা, আমার ব্যাতাতা...
কয়েক মিনিট কথা বলে কবির দিকে তাকালো রিমি। ছোট্ট একটা সমস্যা হচ্ছে ইদানীং। এটা তো এক সময় হবেই। ছেলে এবছর থেকে স্কুলে যায়। স্কুলে মায়ের সঙ্গে বাবারাও আসেন। আমার ছেলে একদিন জিজ্ঞেস করেছে, মা, আমার বাবা কোথায়? বাচ্চাদের সঙ্গে মিথ্যা বলা অন্যায়। কী বলবো বুঝতে না পেরে একটা মিথ্যাই বলেছি। বলেছি, তোমার বাবা বিদেশে। একদিন তোমার জন্য অনেক খেলনা নিয়ে আসবে। অনেক ক্যান্ডি নিয়ে আসবে।
তুমি চাইলে একটা রেডিমেড বাবা ছেলের জন্য পেতে পারো।
মুখের মজাদার ভঙ্গি করে রিমি বলল, তুমি?
হ্যাঁ। আমি বাবা হিসেবে অসাধারণ।
ক’টা ছেলেমেয়ে তোমার?
এখনো হয়নি। তবে সতেরো আঠারোটা হওয়াতে চাই। সন্ধ্যাবেলা গুনে গুনে ঘরে তুলবো।
জলতরঙ্গের মতো মিষ্টি শব্দ করে হাসলো রিমি।
কবি বলল, আমাকে বিয়ে করে ফেলো। তোমার পুত্রের পিতার সমস্যা মিটে যাবে।
যা ভাগ। তোর মতো ফাজিলকে কে বিয়ে করে!
রিমি উঠল। আমি এখন যাবো।
পারুলের বেডের সামনে এসে দাঁড়াল সে। পারুলের মাথায় হাত রেখে বলল, কোনো চিন্তা করো না। তুমি ভালো হয়ে গেছ।
পারুল তার মতো করে তাকিয়ে রইল।
রিমিকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে কবি বলল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কবিতার লাইন শুনে যাও।
রিমি তার অসাধারণ চোখ তুলে তাকাল। শুনি।
‘ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে’
মুখের মিষ্টি ভঙ্গি করে রিমি বলল, আমি জীবনেও ডাকবো না। কারও ইচ্ছে হলে নিজ থেকে আসবে।
শাড়ির আঁচল উড়িয়ে বেরিয়ে গেল রিমি।


সাত
নয়নকে দেখেই গম্ভীর হলো কবি। খুবই খারাপ একটা সংবাদ আছে।
হ্যাভারস্যাক খুলতে খুলতে নয়ন বলল, কী হয়েছে?
আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি।
নয়ন থতমত খেল। মানে?
মানে আবার কী! বিয়ে করা কাকে বলে জানিস না?
জানি, ফাঁসির দড়ি গলায় পরা।
তবে এই বিয়েটা করলে আমার লাভ আছে। সঙ্গে রেডিমেড একটা ছেলে পাচ্ছি। সাড়ে তিন বছর বয়স। আর বউটাও মাশাল্লা মহাসুন্দরী, না না সুন্দর। তুই বলতে পারিস আমি একটা টাকার খনি বিয়ে করছি। বউর সঙ্গে ধানমন্ডি এলাকায় ছ’তলা বিল্ডিং, বউ হচ্ছে ডাক্তার...
আচ্ছা এখানে বসে এই কাণ্ড করেছ! ওই মহাসুন্দরী ডাক্তারকে পটিয়ে ফেলেছ!
পুরোপুরি পারিনি বন্ধু। ধান্দা চালিয়ে যাচ্ছি।
চালাও। কিন্তু লাভ নেই।
কেন?
তুমি সংসার করার জিনিস না।
নয়ন পারুলের দিকে তাকাল। পারুলকে দেখে মুখ উজ্জ্বল হলো তার। আরে, আমাদের পারুল আপা তো একদম ভালো হয়ে গেছে। খবর কী আপা! কথাটথা বলবেন না, নাকি? আরে আপনি কথা বললে, আপনার মুখ থেকে ওই রেখা ম্যাডাম আর তার ধ্যারধ্যারা স্বামীটির কথা শুনতে পারলে দেখতেন কী ফাটাফাটি একটা রিপোর্ট আমি করতাম। আপনার ছবি দিয়ে...। না আপনি আমাদেরকে কোনো হেল্পই করছেন না। ভাবুন তো কী অবস্থা হবে আপনার, আপনি যদি নিজ মুখে সব বলেন! দেশের পত্রপত্রিকা ছবিসহ আপনার ইন্টারভিউ ছাপবে, টিভি ক্যামেরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনার ওপর। আপনি হিরো, না মানে হিরোইন হয়ে যাবেন। কারিনা কাপুর।
পারুল তার মতো নির্বিকার, শুধু অসহায় করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে।
নয়ন সোফায় বসে বলল, দুপুরে খাইনি। হেভি নাশতা আর চা দিতে বল।
কবি বলল, রেস্টুরেন্ট পেয়েছিস নাকি?
তাড়াতাড়ি বল নয়তো ওখানে গদাম করবো।
গদাম অর্থ কী?
দেখবি?
না বাপ, ঠিক আছে। কী খাবেন বলুন?
পেটভরে এরকম যা পাওয়া যায়।
ইন্টারকম তুলে ক্যান্টিনে কথা বলতে লাগল কবি। কী কী আছে বলুন তো?
ওপাশ থেকে আইটেমগুলো বলে গেল ম্যানেজার। চিকেন বার্গার, ফ্রেঞ্চফ্রাই আর সফট ড্রিংকসের অর্ডার দিল কবি। দু’জনের জন্যই দিল। তারপর পারুলের দিকে তাকিয়ে বলল, খাবে পারুল? তুমি
এখন মুখ দিয়ে দিব্যি খেতে পারছো! খাও না আমাদের সঙ্গে! তোমার জন্য আইসক্রিম আনাই, খাবে? দারুণ টেস্টি আইসক্রিম।
পারুল কথা বলে না!
রিমি আসার আগে বিকেলের নাশতা খাওয়ানো হয়েছে তাকে। স্যুপ স্যান্ডউইচ, একটু পুডিং। সিস্টাররা অতিযত্নে পারুলের কাজগুলো করে। সবারই কী রকম একটা মায়া পড়ে গেছে মেয়েটির ওপর। এত ব্যস্ততার মধ্যেও রুনু সাহেব একবার না একবার আসবেনই। আজ দুপুরেও এসেছিলেন। পারুলের উন্নতি দেখে খুশি। তার সঙ্গে একটু মজাটজা করে কবিকে বললেন, তোর কাজ হয়ে গেছে। মোরশেদ বলেছে যত চেষ্টাই ভদ্রমহিলা করুন, যাকে ইচ্ছা ধরুন, যাকে দিয়ে তদবির করান, কাজ হবে না। মোরশেদ আইজিপি’র সঙ্গেও কথা বলে রেখেছে। আর পারুলের ব্যাপারে প্রশাসনে মোটামুটি তোলপাড় পড়েছে। পত্রিকার রিপোর্ট, টিভির রিপোর্টে বিরাট কাজ হয়েছে।
কবি বলেছে, সবই বুঝলাম চেয়ারম্যান ভাই, পারুল কথা বলছে না কেন? তুমি কী ডাক্তার হলে, এইটুকু একটা মেয়েকে কথা বলাতে পারছ না!
আমাদের এখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ যিনি আছেন...
ওই তো ডক্টর অভিজিত্ চক্রবর্তী। তাঁর সঙ্গে আমারও কথা হয়েছে। পারুলকে তিনি দেখে গেছেন। আমার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনেছেনও। তারপর বললেন, সকটা পারুল এখনো কাটাতে পারেনি। যেকোনো সময় দেখবেন কথা বলতে শুরু করেছে। চিন্তার কিছু নেই। ঠিক হয়ে যাবে।
আমাকেও তা-ই বলেছে।
তাহলে আর কী! পারুলের কথার জন্য অপেক্ষা করি।
পারুলের দিকে তাকিয়ে এসব মনে পড়ছিল কবির। বলল, তুমি আমাকে টেনশান মুক্ত থাকতেই দিচ্ছ না। প্রথমে টেনশানে থাকলাম তোমার জ্ঞান ফেরা নিয়ে, এখন টেনশানে আছি কথা বলা নিয়ে। আজ তেরোদিন বাড়িতে যাই না। হাসপাতালের এই রুমই আমার জগত্। আমি কি এক রুমে আটকে থাকার জিনিস! এই যে আমার বন্ধু নয়ন, ওকে জিজ্ঞেস করো। আমার স্বভাব খোদাইষাঁড়ের মতো। খোদাইষাঁড় কাকে বলে জানো? তোমার জানার কথা। বিক্রমপুরে বাড়ি না তোমাদের! বিক্রমপুরের লোকরা খোদাইষাঁড় চিনবে।
নয়ন বলল, আমিও চিনি। আমাদের বরিশালেও খোদাইষাঁড় বলে। কেউ মানত করে আল্লাহর ওয়াস্তে একটা ষাঁড় গরু কিনে ছেড়ে দেয়। ওটা যত্রতত্র চড়ে বেড়ায়। কেউ ধরে না, মারে না। যার ক্ষেতে ইচ্ছা মুখ দেয়। দিনে দিনে শরীর স্বাস্থ্য এমন আজদাহা হয়ে ওঠে, শরীরের ভাড়ে আর হাঁটতেই পারে না।
কবি হা হা করে উঠল। ওর কথা ঠিক আছে পারুল, আজদাহা হয়ে ওঠে। আমি ওরকম হইনি। খোদাইষাঁড়ের মতো চড়ে বেড়াই ঠিকই, কিন্তু স্লিম আছি, হ্যান্ডসাম আছি। দেখলে না তোমার ডাক্তার কেমন পটে গেছে। বর যেহেতু নেই, রিমিকে বিয়ে করে ফেলি, কী বলো? আমার সঙ্গে ভালোই মানাবে। আমি শাহরুখ খান, রিমি হচ্ছে কাজল। ‘কুচ কুচ হোতা হায়’।
কেন্টিনবয় খাবার নিয়ে এল। যেমন নিঃশব্দে এল তেমন নিঃশব্দে বিল সই করিয়ে চলে গেল। নয়ন কথা না বলে খেতে শুরু করল। খুবই মনোযোগ দিয়ে বার্গারের অর্ধেকটা খেয়ে, খিদের প্রথম ধাক্কা সামলে বলল, তোকে একটা খুবই ইমপরট্যান্ট কথা বলবো এখন।
বলো বন্ধু।
তোর ওই হায়দার হোসেন সম্বন্ধে অনেক খোঁজখবর নিয়েছি আমি। শুনে খুবই অবাক হবি তুই।
কী রকম? ঢাকায় বাড়িগাড়ি করে ফেলেছে নাকি?
আরে না। ঠিক তার উলটো। কিছুই করতে পারেনি। হানড্রেড পারসেন্ট অনেস্ট অফিসার। আসাদ গেটের ওখানকার আড়ংয়ের গলির ভেতর পুরোনো আমলের একটা বিলডিংয়ে সস্তা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। মাসের বেতনে অতিকষ্টে জীবন চালায়।
বলিস কী?
হ্যাঁ।
তবে যে কথায় কথায় বলে ঘুষই আমার প্রধানখাদ্য।
ফান লাভিং লোক। ফান করে বলে।
এজন্যই ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমার হেল্প চাইলো!
কোন বাড়ি থেকে?
পারুল যে বাড়িতে কাজ করতো সেই বাড়ির ভদ্রমহিলার কথা বলল কবি। জুলেখার মা কীভাবে এসে তথ্য দিয়ে গেল, বলল। মিজান সাহেব আর রেখার চরিত্র বিশ্লেষণ করলো। সব শুনে নয়ন বলল, তাহলে কাজ আমাদের হয়েই গেছে। মহিলাকে সোজা জেলে পাঠাবো। হায়দার সাহেবকে টাকা দিয়ে কিনতে পারবে না। যত লোকজনই থাকুক মহিলার, কাজ হবে না। টাকা এবং ক্ষমতা সবসময় কাজে লাগে না। তোরা কমিশনার সাহেবকে বলেছিস, আমি বলবো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। তাঁর সঙ্গে আমার ভালো খাতির। কঠিন টাইপের লোক। এই ধরনের ঘটনা কিছুতেই প্রশ্রয় দেবেন না। সঙ্গে আমাদের পত্রিকাগুলোর সাপোর্ট, টিভির সাপোর্ট, তুলকালাম করে ফেলব।
তোর ইনভলবম্যান্টে আমি খুব খুশি বন্ধু। আরেকজন মানুষ অবশ্য বলেছেন তোকে সঙ্গে রাখতে। এই ধরনের ঘটনায় সাংবাদিকরা সবচাইতে বড় ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়।
খাওয়া শেষ করে কোল্ড ড্রিংকসে চুমুক দিল নয়ন। কে এই সাজেশান দিল তোমাকে, বন্ধু?
কবি মাথা নিচু করে লাজুক গলায় বলল, তোর ভাবী।
শালা!
ভাবী শব্দটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই জয়ার কথা মনে পড়ল কবির। আজ একবারও ফোন করা হয়নি জয়াকে। প্রতিদিনই ঘণ্টায় ঘণ্টায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। পারুলকে নিয়ে খুঁটিনাটি সবই জয়াকে জানায় কবি। এখন জয়াকে সে ফোন করল। জয়া আন্টি, দারুণ খবর আছে।
ওপাশ থেকে জয়া বললেন, কী খবর?
প্রথমে আমাকে কনগ্রেচুলেট করো মা জননী।
জয়া উচ্ছ্বসিত হলেন। মহিলাকে অ্যারেস্ট করিয়েছিস?
ওটা এখনো পারিনি। তবে করিয়ে ফেলবো।
তাহলে কনগ্রেচুলেট করতে হবে কেন?
তোমার দেবর বিয়ে করতে যাচ্ছে।
বলিস কী? কবে? কাকে?
ডেট এখনো ঠিক করিনি। পাত্রী আমার বয়সি। উচ্চশিক্ষিত। সাড়ে তিন বছরের একটা ছেলে আছে।
জয়া হাসলেন। ফাজিল।
আরে না খালাম্মা, আই অ্যাম সিরিয়াস।
জয়া ধমক দিলেন, চুপ কর। তারপর একটু থেমে বললেন, পারুল কেমন আছে?
ভালো, খুব ভালো।
জয়ার সঙ্গে আর একটু মজা করে ফোন রাখলো কবি। নয়নের দিকে তাকাল। হঠাত্ করে সিরিয়াস হয়ে গেল। শোন নয়ন, পারুলকে নিয়ে আমি আসলে একটা যুদ্ধে নেমেছি। যুদ্ধটা একাই চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। থ্যাংকস গড যে এই যুদ্ধে আমি আমার পাশে অসাধারণ কিছু মানুষ পেয়েছি। আমার ভাই-ভাবী তো আছেনই, রুনুভাই আছেন, তুই আছিস, হায়দার সাহেব আছেন, ডক্টর রিমি আছেন। এত মানুষ যেখানে একত্র হয়েছে সেখানে আমরা যা চাইছি তা ইনশাল্লাহ করেই ছাড়বো। মহিলাকে তাঁর প্রাপ্য শাস্তি পেতেই হবে। কোনোভাবেই তাঁকে আমরা ছাড়বো না। পারুলকে দিয়ে আমরা একটা উদাহরণ সৃষ্টি করতে চাই। এই ধরনের অন্যায় অবিচার দিনকে দিন বাড়ছে। মহিলা অ্যারেস্ট হলে, পত্রপত্রিকা আর টিভিতে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় হলে মানুষ সচেতন হবে, এই ধরনের অনাচার কমে আসবে।
নয়ন দৃঢ় গলায় বলল, অবশ্যই। শাস্তি মহিলাকে পেতেই হবে। এটা আমরা করবোই।


আট
পারুলের মুখের কাছে ঝুঁকে জুলেখার মা বলল, তুই তো ভালো হইয়া গেছস! তয় কথা কচ না ক্যান? ও পারুল, পারুল, কথা ক। কথা ক আমার লগে। তুই কি বোবা হইয়া গেছস! ও পারুল...
পারুল কথা বলে না, পারুল তাকিয়ে আছে জুলেখার মা’র দিকে।
এখন সকাল সোয়া এগারোটা। ন’টার দিকে ঘুম ভেঙেছে কবির। তার আগে সাতটার দিকে একবার উঠতে হয়। দু’জন সিস্টার এসে পারুলকে নিয়ে যায় বাথরুমে। তার আগে রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে পায়চারি করে সে। পারুল ফ্রেশ হওয়ার পর রুমে এসে আবার কাঁথার তলায় নিজেকে চালান করে দেয়। সেই ফাঁকে নাশতা করানো হয় পারুলকে। এখন আর টিউব দিয়ে খাওয়াতে হয় না। শুধু লিকুইডও খায় না পারুল। সে খাচ্ছে স্বাভাবিক খাবার। নিজ হাতে খায় না, সিস্টাররা খাইয়ে দেয়। সেরে উঠেছে পারুল অনেকখানি, কিন্তু দুর্বলতা কাটেনি পুরোপুরি। হাঁটাচলা সামান্য হয়তো করতে পারবে, সেটা তাকে করতে দেওয়া হয় না। পড়েটড়ে গেলে নতুন বিপদ হবে।
কবি নাশতা করে সাড়ে ন’টার দিকে। তখন আবার স্যুপ দেওয়া হয় পারুলকে। আজ সতেরো দিন হলো হাসপাতালে পারুল। এই সতেরো দিনে মাথার চুল একটুখানি বড় হয়েছে। এত ঘন চুল মাথায়, কেটে নেওয়া ঘাসের গোড়ার মতো হয়ে আছে চুল। দেখতে ভালো লাগে মেয়েটিকে। কেমন একটা বালক বালক চেহারা হয়েছে। শরীরের ঘা সবই প্রায় শুকিয়ে গেছে। মুখটা ফ্রেশ হয়েছে। এখন আসল চেহারা বোঝা যায় মেয়ের। শ্যামল বরণ কী মিষ্টি মুখখানি! চোখ দুটো মায়াভরা। এই মেয়ে যদি সচ্ছল পরিবারে জন্মাতো, তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো লোকে।
খানিক আগে চেয়ার টেনে পারুলের বিছানার সামনে এসে বসেছিল কবি। হাতে চায়ের মগ। চা খেতে খেতে পারুলকে বলেছিল, তুমি জানো, তুমি যেমন তাকিয়ে তাকিয়ে আমাকে সারাক্ষণ দেখো, আমি ঠিক তেমন করে তোমাকে দেখি। তুমি দেখতে এত মিষ্টি, প্রথম প্রথম আমি তা বুঝতে পারিনি। যতদিন যাচ্ছে, তোমাকে দেখি আর মুগ্ধ হই। আজ তোমাকে দেখে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছোট্ট একটি কবিতা মনে পড়ছে। ‘মুখখানি যেন তার মতো, মুখখানি তবু কার মতো’। সুন্দর না কবিতাটা!
ঠিক তখনই কাউন্টার থেকে ফোন এল, জুলেখার মা এসেছে। কিছুক্ষণ পর জুলেখার মা এসে রুমে ঢুকলো। কবিকে সালাম দিয়ে পারুলের দিকে ঝুঁকলো। এখন আর মুখে পান নেই তার, তবে ঘণ্টাখানেক আগে যে পান খেয়েছে সেই চিহ্ন আছে মুখে।
কবি বলল, আপনি বসুন। চা খান। ওকে নিয়ে এখন আর ভয়ের কিছু নেই। ও ভালো হয়ে গেছে। কথা বলছে না, যেকোনো সময় বলবে। চিন্তা করবেন না।
জুলেখার মা মেঝেতে বসতে বসতে বলল, আল্লাহ রহম করুক। আমি দাদা লতিফের লগে, অর্থাত্ পারুলের বাপের লগে মোবাইলে কথা কইছি। বেবাক ঘটনা তারে বলছি। ওরা আগেই জানছে পারুল হাসপাতালে। গেরামের লোকে টিবিতে দেইখা ঘটনা লতিফরে বলছে। একবার আসতে চাইছিল মাইয়ারে দেখতে। আমি না করছি। ওরা ঢাকা আহনের টেকা পাইবো কই। নিজে কামলা দেয় গিরস্তের ক্ষেতখোলায়। তাও রোজ কাম থাকে না। দুই মাস ধইরা পারুলের বেতনের টেকা পায়, ওইটা দিয়া বড় উপকার হয়। আমি কইছি তোমার আহনের কাম নাই লতিফ। মাইয়া ভালো হইলে আমি ওরে লইয়া আমুনে। লতিফ কানতে কানতে কইলো, লইয়া তো আইবা, ওরে আমি খাওয়ামু কী! নিজেরাই খাইয়া না খাইয়া থাকি। তয় তুমি বইন ওর দিকে খেয়াল রাইখো। আমার মাইয়াটা য্যান বাঁইচা থাকে, মইরা য্যান না যায়। পারলে অন্য বাড়িতে ওরে কামে লাগাইয়া দিও।
কেন্টিনবয় চা-বিস্কুট দিয়ে গেছে। চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে লাগল জুলেখার মা।
কবি তখন উদাস হয়েছে, আনমনা হয়েছে। কী অদ্ভুত জীবন পারুলদের, কী দুঃখময় জীবন। একজন পারুলকে না হয় সে উদ্ধার করে এতদূর নিয়ে এসেছে, কিন্তু এরকম হাজার হাজার পারুল প্রতিদিন নিগৃহীত হচ্ছে, মার খাচ্ছে, না খেতে পেয়ে, বিনা চিকিত্সায় মরে যাচ্ছে, কেউ তাদের খবর রাখে না। কেউ তাদের দিকে তাকিয়ে দেখে না, তাদের কথা ভাবে না। হায় রে পারুলদের জীবন!
আনমনা চোখে পারুলের দিকে তাকিয়েছে কবি, দেখে নিঃশব্দে কাঁদছে সে। চোখের পানিতে গাল ভাসছে। বেশ কয়েকদিন পর আজ পারুলকে কাঁদতে দেখল কবি। নিশ্চয় জুলেখার মা’র কথা শুনে বাবার কথা মনে পড়েছে, সত্মা আর ভাই দুটোর কথা মনে পড়েছে। হয়তো সেই দুঃখেই কাঁদছে।
চায়ের মগ রেখে উঠে দাঁড়াল কবি। গভীর মমতায় পারুলের চোখ মুছিয়ে দিতে লাগল। কাঁদছো কেন তুমি! কাঁদে না সোনা, কাঁদে না। তুমি কোনোকিছু নিয়ে চিন্তা করো না। আমি তো আছি! আমি থাকতে কিসের চিন্তা তোমার!
জুলেখার মা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, কান্দিস না গো মা। দাদায় তোরে দেখবো। বিরাট ভালো মানুষের হাতে পড়ছস তুই! এইটা তোর ভাগ্য। দাদার মতন মানুষ আল্লায় তোরে মিলাইয়া দিছে। তয় দাদা, ওই ম্যাডামের খবর লইছেন? কী কয় সে?
রেখা এবং মিজান সাহেবের কথা সবই বলল কবি। হায়দার সাহেবের কথা বলল। মহিলাকে কিছুতেই ছাড়া হবে না, জেলে তাকে যেতেই হবে। শুনে জুলেখার মা খুশি। এইটাই হওন উচিত দাদা। তারা মানুষরে মানুষ মনে করে না। আমরা গরিব হইলেও, মানুষ তো! মানুষরে মানুষ এইভাবে মারে কেমনে! এইটুকু একটা মাইয়া কী অন্যায় করছে!
তার ওপর চুরির অপবাদও দিয়েছে।
কন কী! পারুল চুরি করছে এইটাও কইছে?
হ্যাঁ।
আমারে সেদিন কয় নাই। ম্যাডামে তো ভারি শয়তান। পুলিশের কাছে বানাইয়া চুরির কথা কইছে। নিজের দোষ ঢাকনের লেইগা কইছে।
পুলিশ তা বুঝেছে। ওসব বলে পার পাবে না সে।
এসময় ইন্টারকম বাজল। কবি রিসিভার তুলে বলল, বলুন। কী নাম? খান মিজানুর রহমান। ও আচ্ছা বুঝেছি। পাঠিয়ে দিন।
রিসিভার রেখে জুলেখার মায়ের দিকে তাকাল কবি। মিজান সাহেব আসছেন।
জুলেখার মা তেমন উত্সাহ দেখাল না। উনি আইসা কী করবেন! উনার কি দুই পয়সার দাম আছে সংসারে!
আসুক, দেখি কী বলে।
দরজায় নক করে মিজান সাহেব ঢুকলেন। কবি বিনীত ভঙ্গিতে তাঁকে সালাম দিল। স্লামালেকুম। আসুন।
ভদ্রলোকের পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে স্যান্ডেল সু, মুখে কী রকম অপরাধী ভাব। কাঁচুমাচু গলায় বললেন, আপনি আমাকে চিনেছেন বাবা? আমি, মানে পারুল আমাদের ফ্ল্যাটেই কাজ করতো।
জি, জানি। আপনি বসুন।
মিজান সাহেব বসলেন না, পারুলের বেডের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমি তোমাকে দেখতে এসেছি মা।
পারুল একপলক তাঁর দিকে তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল।
মিজান সাহেব বললেন, জানি আমার সঙ্গে তুমি কথা বলবে না, আমার দিকে তাকাবে না। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মা, তুমি তো জানো আমি এক মুহূর্তের জন্যও তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিনি। রেখা যখন তোমাকে মারধোর করতো, আমি ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যেতাম। আমি তোমার কান্না সহ্য করতে পারতাম না। কোনো কোনো সময় তোমাকে ওষুধ এনে খাইয়েছি। শেষ পর্যন্ত...
কবি বলল, তার মানে আপনি স্বীকার করছেন আপনার স্ত্রী পারুলের এই অবস্থা করেছে?
মিজান সাহেব কবির দিকে তাকালেন। জি স্বীকার করছি। আমার আর অস্বীকার করবার কিছু নেই। পারুলের এই অবস্থা করেছেন আমার স্ত্রী। আমি সাক্ষী।
সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠল জুলেখার মা। মিজান সাহেবকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছিল সে। এবার তাঁর কথা শুনে ঝাঁঝালো গলায় বলল, আপনে কেমুন পুরুষপোলা, বউ সামলাইতে পারেন না! মাইয়াটারে এতদিন বাড়িতে আটকাইয়া রাইখা রোজ রোজ মারলো, মাইয়াটা মইরা যাইতাছিল আর আপনে একবারও আপনের বউরে থামাইতে পারলেন না? কেমুন পুরুষপোলা আপনে?
মিজান সাহেব কাতর চোখে কবির দিকে তাকালেন। আমার সেই ক্ষমতা ছিল না বাবা। রেখা খুবই বদরাগী মহিলা। তাঁকে কোনোদিনও আমি কিছু বলতে পারিনি। আমার ছেলেমেয়েও মায়ের ভয়ে তটস্থ। দু’জনেই গোপনে আমাকে বলে আমেরিকায় তারা ভালো আছে। তবে যখন রেখা আর আমি গিয়ে তাদের ওখানে থাকি, ওরা থাকে অস্বস্তিতে। মেয়ের জামাই, ছেলের বউ এমন কি ওদের বাচ্চা-কাচ্চারাও চায় না রেখা আমেরিকায় গিয়ে ওদের কাছে থাকুক। আমাকে তারা পছন্দ করে, রেখাকে একদমই করে না। তারপরও মাকে তোয়াজ করে তাঁর ধনসম্পত্তির জন্য। ধানমন্ডিতে এতগুলো ফ্ল্যাটের মালিক হবে তারা, এই কারণে মুখ বুজে মায়ের সব অন্যায় সহ্য করে। শুধু এই মেয়েটিকে না, এর আগেও আমাদের ফ্ল্যাটে যারা কাজ করেছে তারা সবাই কমবেশি মার খেয়েছে রেখার হাতে। বয়স্ক মহিলারাও বাদ যায়নি। আমাদের ড্রাইভার ফারুখ বহুবার চড়চাপড় খেয়েছে। তারপরও যায় না, ও গাড়ি খুব খারাপ চালায়, ডায়াবেটিস আছে, ওকে কেউ কাজে রাখবে না। এজন্য মুখ চেপে, এই বয়সেও নানারকম অপমান সয়ে, মারধোর খেয়ে লেগে আছে।
কবি বলল, আপনি বসুন। আপনার সঙ্গে আমি কিছু কথা বলি।
মিজান সাহেব সোফায় বসলেন।
কবি বলল, চা খাবেন?
না বাবা, না।
কবি তীক্ষচোখে মিজান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি এখানে এসেছেন কেন?
মিজান সাহেব থতমত খেলেন। চোখ তুলে কবির দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললেন, এসেছি বাবা বিবেকের তাড়নায়। পুলিশ অফিসার হায়দার সাহেব সেদিন কিছু কথা বলেছেন আমাকে, শুনে আমি ভেতরে ভেতরে লজ্জায় মরে গেছি। সত্যি তো, আমি একজন শিক্ষক মানুষ আর আমার ঘরে আমার চোখের সামনে প্রতিদিন ঘটেছে এই অন্যায়, এটা আমার মেনে নেওয়া অন্যায় হয়েছে। স্ত্রীর ভয়ে মুখ বুজে থাকা ঠিক হয়নি। বাড়ির বাইরে গিয়ে ছেলেমেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি আমি। রেখার সামনে ওদের সঙ্গে মন খুলে কথাও বলতে পারি না। আমার ছেলেমেয়ে দুটোও আমার মতো। দু’জনেই আমাকে বলল, আমরা কোনোদিনও তোমাকে কিছু বলিনি বাবা। তবে শুরু থেকেই মায়ের এই ধরনের ব্যবহার আচরণ মেনে নিয়ে তুমি তোমার জীবন নষ্ট করেছো, বিরাট ভুল করেছো তুমি। তুমি যদি কঠোর হতে মা তাহলে এরকম হতে পারতো না। আসলে ভুল আমারই। একটা জীবন আমি অসহায়ভাবে কাটিয়ে গেলাম।
চোখ দুটো ছলছল করে উঠল মিজান সাহেবের। পারুলের ঘটনা ছেলেমেয়েকে আগে আমি জানাইনি। যেদিন বাড়িতে পুলিশ গেল সেদিন জানিয়েছি। শুনে তারা আঁতকে উঠেছে। সর্বনাশ! মা তো ভয়ানক কাণ্ড করে ফেলেছে। তাঁকে তো জেলে যেতে হবে। জীবনে প্রথম ছেলেমেয়েকে আমি বললাম, এরকম অন্যায়ের শাস্তি জেলই। শাস্তিটা তাঁর পাওয়া উচিত। ছেলেমেয়েরা আমাকে বোঝাতে চেয়েছে আমি যেন তাদের মাকে সেভ করি। আমি তাদেরকে কিছুই বলিনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি একজন সত্যিকার মানুষ এক্ষেত্রে যা করবে, আমিও তা-ই করব। যা আমার বহু বছর আগেই করা উচিত ছিল তা আমি এখন করবো। আপনাদের সঙ্গে আমিও আছি বাবা। আমি সাক্ষ্য দেবো, হ্যাঁ আমার স্ত্রী পারুলকে তিন মাস ধরে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে নিয়েছে। আমার চোখের সামনে কাণ্ডটা ঘটেছে, আমি দেখেও না দেখার ভান করেছি। প্রতিবাদ করিনি, মেয়েটাকে বাঁচাবার চেষ্টা করিনি, এজন্য আমিও অনেকখানি অপরাধী। আমারও জেল হওয়া উচিত।
কবি কী বলবে বুঝতে পারল না। অপলক চোখে মিজান সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল।
মিজান সাহেব বললেন, পারুলের চিকিত্সায় যা ব্যয় হয়েছে সব আমি দেবো। ওর যে শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতি হয়েছে তার দাম কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। তবে ওর বাকি জীবনটা যাতে ভালো চলে আমি সেই ব্যবস্থা করে দেবো। জীবনের বেশিরভাগ সময় স্ত্রীর টাকায় চলেছি। নিজের রোজগারে তেমন হাত দিতে হয়নি। আমার নিজস্ব টাকা কিছু আছে। আমি পারুলকে দশ লাখ টাকা দেবো। আপনি সেটা ওর নামে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে দেবেন। মাসে মাসে ইন্টারেস্ট যা আসবে তাতে যেন মেয়েটার লেখাপড়ার এবং খাওয়া পরার খরচ চলে।
উঠে পারুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন মিজান সাহেব। দু’হাতে পারুলের দুটো পা ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। তুমি আমাকে মাফ করে দিও মা, তুমি আমাকে মাফ করে দিও।
প্রথমে দিশেহারা ভঙ্গিতে মিজান সাহেবের দিকে তাকাল পারুল। তারপর নিজেও কাঁদতে লাগল।


নয়
হায়দার তীক্ষচোখে লোকটার দিকে তাকালেন। তোমাকে কোথায় দেখেছি বলো তো! হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। তুমি মিজান সাহেবের ড্রাইভার না? ফারুখ না তোমার নাম?
ফারুখ কাঁচুমাচু গলায় বলল, জি স্যার।
সেদিন কয়েক মুহূর্তের জন্য তোমাকে দেখেছি। রেখা ম্যাডাম তোমাকে বললেন, ফারুখ, শপিংব্যাগগুলো কিচেনে রেখে চলে যাও। ঠিক না?
জি স্যার।
কী মনে করে থানায় এলে?
আমি নিজ থেকে আসি নাই স্যার। সাহেব আমারে পাঠাইলেন। বললেন, আপনেরে যেন ঘটনা সব খুইলা বলি।
হায়দার পুলিশি কায়দায় ফারুখকে আগপাশতলা একবার দেখলেন। তারপর সিগ্রেট ধরিয়ে বললেন, বসো।
ফারুখ সঙ্গে সঙ্গে বসল না। বলল, আপনার সামনে চেয়ারে বসবো
স্যার?
বসো, আমি পারমিশান দিচ্ছি।
আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বসল ফারুখ। তার পরনে খয়েরি রংয়ের ফুলহাতা বেশ পুরোনো একটা শার্ট আর কালো রংয়ের টের্টরনের প্যান্ট। জামা কাপড় মোটামুটি পরিচ্ছন্ন। ফারুখের চেহারা ভীতু টাইপের। মুখের দিকে তাকালে মনে হয় সারাক্ষণ অজানা এক ভয়ে আতঙ্কে আছে। পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে বয়স। শরীর স্বাস্থ্য পলকা ধরনের।
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সিগ্রেট টানছেন হায়দার। চোখ ফারুখের দিকে। বললেন, কী খুলে বলতে চাও, বলো।
ওই পারুল মেয়েটার কথা স্যার।
তার আগে তোমাকে যা যা প্রশ্ন করবো তার জবাব দেবে। কোনো রকমের চালাকি করবে না, মিথ্যা বলবে না। ওসব করলে বিপদে পড়বে। কোনো কিছু লুকালে মুহূর্তে আমি তা বুঝে যাবো। তখন তোমাকে ছাড়বো না। সোজা হাজতে ঢুকাবো।
না স্যার, মিথ্যা কথা বলবো না, কোনো কিছু লুকাবো না, চালাকিও করবো না। যদি ওইসব করার ইচ্ছা থাকতো তাহলে স্যার থানায় আসতাম না। চাকরি ছাইড়া দিয়া পলাইতাম।
থানায় তুমি ইচ্ছে করে আসোনি, মিজান সাহেব পাঠিয়েছেন।
আমরা স্যার মালিকের চাকরি করি, তারা যা বলবেন তা-ই তো করুম।
তোমার পুরো নাম কী?
মোহাম্মদ ফারুখ।
বাড়ি কোথায়?
মানিকগঞ্জের হরিণা গ্রাম।
ঢাকায় কোথায় থাকো?
মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের কাছে।
মিজান সাহেবের ওখানে কাজ করো কতদিন হলো?
সাত বছর স্যার।
অনেকদিন। বেতন পাও কত?
তেরো হাজার টাকা পাই স্যার। আর দুপুরে খাওয়ার জন্য প্রতিদিন নগদ পঞ্চাশ টাকা করে। ডিউটি করি স্যার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। জামাই স্যার ড্রাইভার। নাম মোখলেস। আর ছোট মাইয়াটা বিএ পড়ে। ওই মেয়েটা স্যার বিবাহ করতে চায় না। বিএ পাস করার পর চাকরিতে ঢুকবে। ম্যাডামের খালাতো ভাই সেক্রেটারি সাহেব বলছেন চাকরি দিয়া দিবেন।
এই আশায় মিজান সাহেবের বাড়িতে পড়ে আছ?
অন্য আর একটা কারণও আছে স্যার। আমি ডাইবেটিসের রোগী, গাড়িও ভালো চালাইতে পারি না। অন্য জায়গায় স্যার চাকরি পামু না। যদি স্যার অন্য ড্রাইভারগো মতন ভালো গাড়ি চালাইতে পারতাম আর ডাইবেটিস না থাকতো, তাইলে স্যার ম্যাডামের চাকরি করতাম না। যা খারাপ ব্যবহার সে করে! আমগো মতন মানুষরে মানুষই মনে করে না। মহিলা হইয়া স্যার গায়ে হাত উঠায়। বহুতদিন তার মাইর খাইছি। আমি তো স্যার ড্রাইভার, আমি নাইলে মাইর খাইলাম, স্যাররেও মারে, স্যারেও রেগুলার তার মাইর খায়। সাত বছরে দেখলাম কত কাজের মানুষ আইলো আর গেল, কেউ থাকে না স্যার। উঠতে বসতে মারে। ম্যাডামের মাথায় মনে হয় ছিট আছে। রাগলে বদ্ধ পাগল হইয় যায়। আমার মাইয়াটা পাস কইরা বাইর হওনের পর, আমি স্যার চাকরি আর করুম না। তবে স্যার, ম্যাডাম যখন আমরিকায় থাকে, সেই কয়মাস বহুত আরামে থাকি। ফেলাটের চাবি থাকে আমার কাছে, গাড়ির চাবি থাকে। মাঝে মাঝে আইসা ফেলাট চেক করি, গাড়ি স্টার্ট দেই। আর তিন-চাইর মাসের বেতন অ্যাডভান্স দিয়া যায়, খাওয়ার টেকাটা অ্যাডভান্স দিয়া যায়। বহুত আরামে থাকি স্যার। ডাইবেটিসও তখন স্যার কন্ট্রোলে থাকে। ম্যাডাম থাকলে চব্বিশ ঘণ্টা তার টেনশানে ডাইবেটিস বাইড়া যায়। হে হে।
তোমার কি কথা বেশি বলার অভ্যাস?
জি স্যার। চান্স পাইলে আমি খালি প্যাচাইল পারতেই থাকি। তবে স্যার ম্যাডামের লগে থাকলে ভিজা বিলাই হইয়া থাকি। কথা কইই না। হে হে...
সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে অ্যাসট্রেতে গুঁজে দিলেন হায়দার। মিজান সাহেব কী বলতে পাঠিয়েছেন সেটা বলো।
তার আগে আমারে একটা কথা দিতে হইব স্যার।
কী কথা?
আমি যা যা কমু সেই কথা আপনে স্যার-ম্যাডামরে কইতে পারবেন না।
তুমি আগে বলো।
ম্যাডাম জানলে স্যার আমার চাকরি থাকবো না।
জেলে গেলে এমনিতেই তোমার চাকরি থাকবে না। আর ম্যাডামের চাকরি তুমি কীভাবে করবে? তাঁকে আমি দু-তিন বছর জেল খাটাবো। বলো।
স্যার, ম্যাডামরে জেলে দিতে পারবেন না। তার হাতে মন্ত্রী-মিনিস্টার আছে। যাদের টেকা আছে স্যার তারা জেলে যায় না।
হায়দার কঠিন গলায় বললেন, ফালতু কথা বলো না। যা বলতে চাও ঠিকমতো বলো। নয়তো হাজতে ঢুকাবার আগে বেঁধে পিটাবো।
ফারুখ ঢোক গিলল। আমারে পিটাইবেন ক্যান স্যার! আমিই তো পারুলরে বাঁচাইয়া দিছিলাম।
হায়দার চমকালো। তুমি পারুলকে বাঁচিয়েছো?
জি স্যার। আমি আর সাহেবে।
হায়দার নড়েচড়ে বসলেন। বলো কী?
জি স্যার। এইটাই তো আপনেরে বলতে আসলাম। বিশ্বাস না হইলে স্যার বাড়ির দুইজন সিকিরুটি বেলাল আর ইউনুস, তাগো থানায় ডাইকা আনেন, জিজ্ঞাসা করেন দেখবেন তারাও সাক্ষী দিব। ওরা সাহায্য না করলে কামটা আমি করতে পারতাম না স্যার। তবে স্যার ম্যাডামে য্যান বেলাল ইউনুসের কথা না জানে। তয় স্যার ওই দুইজনেরও চাকরি থাকবো না।
তুমি আসল ঘটনা বলো।
কথা বলতে বলতে আড়ষ্টতা কেটেছে ফারুখের। সে একটু গা ছেড়ে বসল। আসল ঘটনা হইল স্যার, ম্যাডামে যেমনে যেমনে কাম করতে বলতো পারুল সেইটা পারতো না স্যার। ভুল হইতো। ম্যাডাম চাইতো এক রকম, ও কইরা ফালাইতো অন্যরকম। এই জইন্য মাইয়াটারে মারতো। কিল ঘুষি চড় থাপ্পড় তো মারতোই, লাঠি দিয়া পিটাইতো, দেওয়ালে মাথা ধইরা ঠুকতো, খুন্তির ছেঁকা, বটির কোপ, আহা রে কী মাইর মাইয়াটারে মারছে! মাইয়াটা কানতেও পারতো না, কানলে আরও মারতো। খাইতে দিত না, বাথরুমে আটকাইয়া রাখতো। সাহেব দুই-চাইর দিন ধরতে গেছে, সাহেবরেও মারছে। ম্যাডামে মানুষ না স্যার, পেতনি স্যার, পেতনি। তয় স্যার আমার চাকরিটা...
হায়দার চোখ গরম করে ফারুখের দিকে তাকাল। ফারুখ...
না না স্যার, ঠিক আছে ঠিক আছে। চাকরি দরকার হইলে করুম না, তাও সাহেব যা বলতে বলছে, সব আপনেরে বইলা যামু। কাইল রাত্রেই সাহেব আমারে সব বলছে। আমি শরীল খারাপের কথা বইলা ম্যাডামের কাছ থিকা আজকের দিনটা ছুটি নিছি...। বহুত দিন ধইরা স্যার মাইয়াটারে মারছে স্যার। একদিন সাহেব আমারে বলল, ফারুখ, মাইয়াটা মইরা যাইবো। চলো ওরে বাঁচাই। তোমার ম্যাডাম বাইরে গেলে এক ফাঁকে ওরে আমি ছাইড়া দিমু। তুমি সিকুরিটির বেলাল ইউনুসরে বইলা রাখবা, ওরা য্যান ঘুণাক্ষরেও ম্যাডামরে কিছু বুঝতে না দেয়। পারুলরে তুমি রাস্তায় ছাইড়া দিবা। যেইদিকে ইচ্ছা ও চইলা যাউক, গিয়া জানে বাঁচুক। আমি স্যার সেইভাবে কাজ করছি। আমার কথা বিশ্বাস না হইলে স্যার পারুলরে জিজ্ঞাসা কইরেন। সাহেবরেও জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আমি স্যার একটাও মিছাকথা কই নাই।
হায়দার কথা বলবার আগেই তাঁর মোবাইল বাজলো। ফোন ধরে সে বলল, ইয়েস বস।
কবি বলল, আমাকে আর বস বলবেন না। আজ থেকে আমি আপনাকে বস বলবো।
কেন বস?
আপনি ভাই নমস্য। নয়ন আমাকে সব বলেছে। শুনে হতবাক

হয়েছি। আজকালকার দিনে এমন সত্ পুলিশ অফিসারও আছে? অনেক বাজে ব্যবহার আপনার সঙ্গে আমি করেছি। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ফর দ্যাট। আপনাকে পায়ে ধরে সালাম করা উচিত।
কী যে বলেন! কাজ করেছেন আপনি। একটা মানুষের জান বাঁচিয়েছেন। এরচে’ বড় কাজ আর হতে পারে না। একটু ধরুন তো বস।
হায়দার ফারুখের দিকে তাকালেন। এই তুমি এখন যাও। কাল তিনটার দিকে ওই বাড়িতে থাকবে। আমি যাবো। কিন্তু কথাটা কাউকে বলতে পারবে না। বললে, বেঁধে প্রথমে থানায় নিয়ে আসবো, তারপর দেবো মার। এমন মার, কাপড় খারাপ হয়ে যাবে। হাঁড়ি বোতল দুটোই একসঙ্গে করে ফেলবে।
ফারুখ হাসিমুখে উঠল। তার দরকার হইব না স্যার। আমি কাউরে কিছু বলবো না।
ফারুখ দ্রুত বেরিয়ে গেল। হায়দার আবার ফোন তুললেন, জি বস।
কবি বলল, কাকে ওরকম হাঁড়ি বোতলের ধমক দিলেন?
মিজান সাহেবের ড্রাইভার। অদ্ভুত সব তথ্য দিয়ে গেল।
কী রকম?
ফারুখ যা যা বলেছে সবই কবিকে বললেন হায়দার। শুনে কবি বলল, মিজান সাহেব এসেছিলেন পারুলকে দেখতে। মেয়েটির পা ধরে কান্নাকাটি করলেন। হাসপাতালের খরচ দেবেন তিনি, পারুলকে দশ লাখ টাকা দেবেন, কিন্তু তিনি যে মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়েছেন একথা একবারও বললেন না।
হায়দার আবার সিগ্রেট ধরালেন। ভেবেছেন বললে হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না। এজন্য ফারুখকে পাঠিয়েছিলেন আমার কাছে। ভদ্রলোকের জন্য মায়া হচ্ছে। শুনুন, পুলিশ বাদি হয়ে কেস করেছে। কাল ওয়ারেন্ট ইস্যু করাবো।
মিজান সাহেবকে সেভ করা যাবে?
পারুল যদি কথা বলতে পারতো তাহলে সবকিছুই ক্লিয়ার হয়ে যেতো।
কবি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেয়েটা যে কেন কথা বলছে না!
কাল বিকেলে ওই বাড়িতে যাবো। আমি চাই আপনিও আসুন।
অবশ্যই আসবো। পারুলকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে নিয়ে আসবো।
কী লাভ?
আনি না, দেখি ভদ্রমহিলাকে দেখে ও কোনো রকম রিয়্যাক্ট করে কিনা। সঙ্গে অবশ্য ডাক্তারও রাখবো। পারুল যদি অতি উত্তেজনায় অসুস্থ হয়ে পড়ে...
ঠিক আছে। কাল তাহলে দেখা হচ্ছে।
কবি হাসিমাখা গলায় বলল, ওকে বস।


দশ
হুইল চেয়ারে বসে আছে পারুল। তার পরনে জয়ার কিনে দেওয়া ফিরোজা রংয়ের সুন্দর ফ্রক প্যান্ট। সিস্টার যখন তাকে ফ্রক প্যান্ট পরাবে তখনই কবির মনে হয়েছে, আরে, ভাবী তো পারুলের স্যান্ডেল কিনতে ভুলে গিয়েছিলেন। সে দ্রুত কাছাকাছি একটা দোকানে গিয়ে সুন্দর এক জোড়া স্যান্ডেল কিনে এনেছে। অনুমান করে কিনেছে কিন্তু স্যান্ডেল ঠিকই লেগেছে।
পারুলের পাশে এখন অনেক লোক। কবি তো আছেই, রিমি আছে, সিস্টার নিপা আছে। হুইল চেয়ার ঠেলার জন্য আছে একজন ওয়ার্ডবয়। অ্যাম্বুলেন্স এসে সরাসরি ঢুকেছে রেখার বাড়ির ভেতর। সিকিউরিটির বেলাল ইউনুস দু’জনেই আছে। থানা থেকে তাদেরকে থাকতে বলা হয়েছে। গেটের বাইরে দাঁড়িয়েছিল জুলেখার মা আর ড্রাইভার ফারুখ। রাস্তার উলটো পাশে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের গাড়ি। হায়দার দাঁড়িয়ে আছেন গাড়ির সামনে। তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছে নয়ন। হাতে হেলম্যাট পাশে মোটরবাইক।
অ্যাম্বুলেন্স দেখে গাড়ি থেকে দু’জন মহিলা পুলিশ নামলো, দু’জন কনেস্টবল নামলো। নয়নকে নিয়ে ছ’জন মানুষ ঢুকলো বাড়িতে। হায়দারকে দেখে এগিয়ে এল কবি। হাসিমুখে বলল, সালামটা করে ফেলবো নাকি!
হায়দার হাসলেন। পরে করলেও হবে। এখন আসল কাজটা শেষ করি। আমরা আগে যাই তারপর পারুলকে নিয়ে আপনারা আসেন।
ঠিক আছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে রেখার ফ্ল্যাটে সবাই। নয়ন ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে। কোথায় তোমরা? ও আচ্ছা এসে পড়েছো। থার্ড ফ্লোর। চলে এসো।
কবি বলল, আর কে আসবে?
নিউজ টুয়েন্টিফোরের রাত্রি আর একজন ক্যামেরাম্যান।
ভেরি গুড।
পুলিশ এবং অন্যান্য লোকজন দেখে তিতিবিরক্ত মুখে তাকিয়ে ছিলেন রেখা। ওই ভঙ্গিতেই হুইল চেয়ারে বসা পারুলের দিকে তাকালেন। পারুলের হুইল চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আছে কবি। তার পাশে রিমি।
রেখা বললেন, ভালো নাটক দেখছি।
কবি বলল, নাটক না সিনেমা।
সাটআপ। আপনি কে?
আমি হচ্ছি পারুলের বাবা-ভাই-বন্ধু-প্রেমিক।
অসভ্যের মতো কথা বলবেন না।
সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠলেন হায়দার। কাকে অসভ্য বলছেন আপনি? যে মানুষটা মৃতপ্রায় পারুলকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে বাঁচিয়েছেন, তাঁকে। সতেরো-আঠারো দিন একটানা হাসপাতালে মেয়েটির পাশে বসে থেকেছেন, বাড়িতে যাননি, ঠিকমতো খাননি ঘুমাননি, জান দিয়ে দিয়েছেন মেয়েটির জন্য, তাঁকে আপনি বলছেন অসভ্য। অসভ্য তিনি না, তিনি হচ্ছেন চূড়ান্ত সভ্য সত্ শিক্ষিত একজন মানুষ। অসভ্য হচ্ছেন আপনি। শুধু অসভ্য না, বর্বর এবং ইতর। জন্তু-জানোয়ারও আপনার চেয়ে ভালো হয়। এইটুকু একটা মেয়েকে আপনি এরকম অত্যাচার করেছেন! আপনি মানুষের পর্যায়েই পড়েন না।
হায়দারের ধমকে রেখা একটু থতমত খেলেন কিন্তু দমলেন না। তেজ বজায় রেখে বললেন, আমি কাউকে কোনো টর্চার করিনি।
সাক্ষী আমি। আপনি আমার কাছে স্বীকার করেছেন।
করেছি। কাজের লোক চুরি করলে তো মার খাবেই।
সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে হুইল চেয়ার থেকে নামলো পারুল। বারুদের মতো জ্বলে উঠল। এই খবরদার আমারে চোর বলবেন না। আমি চোর না, দুই পয়সার জিনিসও আমি চুরি করি নাই। কাম পারতাম না দেইখা আপনে আমারে মারতেন। মারতেন আর কইতেন, কেউরে যদি মাইরের কথা কস তয় তোরে আমি চোর সাজাইয়া পুলিশ দিয়া ধরাইয়া দিমু। থানায় নিয়া পুলিশরা তোরে হেন করবো তেন করবো। অনেক খাচ্চর খাচ্চর কথা কইতেন। পয়লা পয়লা আমি বুঝি নাই আপনে এই পদের মানুষ। আপনেরে আমি খালাম্মা কইতাম, সাহেবরে কইতাম খালু। ডেরাইভাররে কইতাম ফারুখ মামা। তারা বেবাকতে দেখছে আপনে আমারে কী মাইর মারছেন। পয়লা দিন আমারে দিছেন পুরা ফেলাট মুছতে। তার আগে আমি কোনোদিন কোনো বাড়িতে কাম করি নাই। থাকতাম গেরামে। এই রকম ফেলাট বাড়ি দেখিই নাই। মুছতে সময় লাগছে আমার। তারপর ফুলোর ভিজা ভিজা আছিল, ফ্যান ছাইড়া যে শুকাইতে হয় আমি জানতাম না। আপনে সেইটা আমারে না শিখাইয়া, আমি ঘর মুছতাছি আর আইসা আমার কোকসায় এমন একখান লাত্থি মারলেন, আমার দম বন্ধ হইয়া গেল। ভিজা ফুলোরে আমি পইড়া গেলাম। সাহেব আছিলেন তার ঘরে, বাইর হইয়া আইসা কইলেন, এতটুকু মাইয়াটারে মাইরো না। আপনে তার ঘাড় ধইরা একটা ধাক্কা দিলেন। নিজের স্বামীর লগে কেউ এমুন করে, জিন্দেগিতে দেখি নাই। দেখছি উলটা। জামাইরা বউর লগে এমুন করে। সাহেব তারপর তার ঘরে গিয়া বইসা রইলেন। সেদিন দোফরে আপনে আমারে খাইতেও দিলেন না। সন্ধ্যাবেলা ইলিশ মাছ ভাজতে কইলেন আমারে। আমি কোনোদিন চুলার কাছে যাই নাই। এই যে জুলেখার মা আছে, এই খালায় আমারে কইছিলো, বাড়ির টুকটাক কাম করবি তুই। আপনি ওইসব বইলাই আমারে আনছিলেন। তারবাদে দেখি সবই করতে কন। মাছ ভাজতে পারলাম না দেইখা গরম তেল ঢাইলা দিলেন আমার পেটে। এই যে দেখেন আমার পেট পোড়া। আমার চিত্কার শুইনা আবার বাইর হইয়া আসলেন সাহেব। আপনে গেলেন তারে মারতে। লজ্জায় সাহেব আর কথা কইলেন না। রাত্রে আমার জ্বর আইলো, পোড়া পেটের ব্যথায় আমি মইরা যাই, আপনে আমার দিকে ফিরাও চান না। পরদিন বিছানা থিকা উঠতে পারি না আমি। আপনে আমারে টাইনা বাইরে আইনা কইলেন, বাথরুম পরিষ্কার কর। আমি পারি না লড়তে, কাম করুম কেমনে! একটা মোটা তেলতেলা লাঠি দিয়া আপনে আমারে এমুন পিটান পিটাইলেন, আমি ফিট হইয়া গেলাম। আমার কোনো হুঁশ রইল না...
বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল পারুল। তারপর গরম খুন্তির ছেঁকা দিলেন দুইবার, একদিন এমন জোড়ে জোড়ে দেওয়ালে মাথা ঠুইকা দিলেন, এত জোড়ে ঘুষি দিলেন আমার নাকে, আমার নাকটা ফাইটা গেল। দরদর করে রক্ত বাইর হইল...। বটি দিয়া দুই দিন কোপ দিছেন, একলগে দুই দিন আমি না খাইয়া রইছি। জ্বরে বেহুঁশ হইয়া গেছি, পলাইয়া পলাইয়া ফারুখ মামারে দিয়া অষুদ আনাইয়া আমারে খাওয়াইছেন সাহেবে...। হাসপাতালে সাহেব আমারে দেখতে গেছেন, তারে দেইখা আমি মুখ ঘুরাইয়া রাখছি। আমার মনটা খারাপ আছিলো, আমি কথা কইতে পারি নাই। সে আমার কাছে মাফ চাইছে, কানছে...। সাহেব মানুষ ভালো। ডেরাইভার মামায়ও ভালো। খারাপ হইলেন আপনে! কী অন্যায় করছিলাম আমি? ক্যান আপনে আমারে এমনে মারছেন?
পারুল আর কথা বলতে পারল না, হু হু করে কাঁদতে লাগল। কবি দুহাতে তাকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। সেও তখন কাঁদছে, অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখ মুছছে। রিমির চোখে পানি, নিপার চোখে পানি, শক্ত হূদয়ের পুলিশরাও হতভম্ব।
কোন ফাঁকে রাত্রি আর ক্যামেরাম্যান ঢুকে গেছে, রাত্রি মাইক্রোফোন ধরে রেখেছে আর ক্যামেরাম্যান তার মতো শট নিচ্ছে।
হায়দার রেখার দিকে তাকালেন। বলুন, জবাব দিন।
রেখার গলার তেজ আগের মতোই। বললেন, সব মিথ্যা কথা। হ্যাঁ চড়-চাপড় দুয়েকদিন মেরেছি, ও যেমন বলল, তেমন কোনোদিন করিনি। অন্য কোথায় কাজটাজ করে মারটার খেয়েছে...
না পারুল একটাও মিথ্যা কথা বলেনি। সে যা যা বলেছে তুমি তা-ই করেছো। মেয়েটি সব গুছিয়ে বলতে পারেনি। এরচেয়েও ভয়ংকর কাজ তুমি করেছ। জুলেখার মা এসেছে ওর বেতন নিতে, যেদিন তার আসার কথা, যখন আসার কথা সেই সময় বুঝে মেয়েটির মুখে তুমি স্কচ টেপ লাগিয়ে দিয়েছো, দুহাত পেছনে বেঁধে বাথরুমে আটকে রেখেছো, যাতে সে বেরিয়ে জুলেখার মাকে কিছু বলতে না পারে।
মিজান সাহেবের কথা শুনে সবাই তাকিয়েছে তাঁর দিকে। রেখার মুখটা তখন দেখার মতো হয়েছে। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না মিনমিনে স্বভাবের স্বামীটি আজ তাঁর মুখের ওপর কথা বলছেন এবং পারুলের সঙ্গে তাল মিলাচ্ছেন। কোনো রকমে বললেন, কী বলছো তুমি!
জীবনে প্রথমবার স্ত্রীকে প্রচণ্ড ধমক দিলেন মিজান সাহেব। খবরদার কথা বলবে না, একটাও কথা বলবে না। তুমি সুস্থ মানুষ না, তুমি অসুস্থ, সাইকিক। পাগল, মানসিক রোগী। টাকার অহংকার, সেক্রেটারি ভাইয়ের অহংকারে মানুষকে তুমি মানুষ মনে করো না, যা মনে হয় তা-ই করো। এজন্য আমার ছেলেমেয়েও তোমাকে দেখতে পারে না। পারুলের সঙ্গে তুমি যা করেছো এটা বর্বররাও করে না। দোষ আমারও আছে। আমিও তোমার ভয়ে তটস্থ থেকেছি। তা না থেকে পারুলকে যখন তুমি মারতে আমার উচিত ছিল তোমাকেও তেমন মারা, পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলা। তাহলে আজ এই অবস্থা হতো না। আমার সম্মান নষ্ট হতো না, আমি পুরুষের মতো মাথা উঁচিয়ে বাঁচতাম। তারপরও থ্যাংকস গড, শেষ পর্যন্ত ফারুখ আর বেলাল ইউনুসের সাহায্যে মেয়েটাকে আমি বাড়ি থেকে বের করে দিতে পেরেছিলাম। বাঁচাতে পেরেছিলাম ওকে।
নয়ন তার ব্যাগ থেকে ছোট্ট ক্যাসেট রেকর্ডার বের করেছে, ক্যামেরা বের করেছে। রেকর্ডার অন করে ওয়ার্ডবয়ের হাতে দিয়ে ইশারায় বলেছে ধরে রাখতে। তারপর নিজে একটার পর এরকটা ছবি তুলে যাচ্ছে।
জুলেখার মা বলল, এত বাড়িতে কামের মানুষ দিছি আমি, কোনোদিন আপনের মতন মানুষ দেখি নাই। যেদিন আমারে কইলেন পারুল পলাইছে। পরে শুনলাম সাহেবগো কইছেন চুরি কইরা পলাইছে। আইজ কইলেন আপনে ওরে মারেন নাই, অন্য কোন বাড়িতে কাম করতে গিয়া মাইর খাইছে...। এক মুখে কত পদের কথা কন আপনে? শরম করে না? আমরা মুরুখ্য মানুষ, লেখাপড়া জানি না। তাও তো স্বামীর গায়ে কোনোদিন হাত তুলি নাই। হাত তোলা তো দূরের কথা, ডরে তার মুখের দিকে চাই নাই। আপনে কেমুন মাইয়ালোক? কী দাম আছে আপনেগো লেখাপড়ার, এত টেকা-পয়সার! আইজ যে এত মানুষের সামনে আপনেরে অহন পুলিশে ধইরা লইয়া যাইবো, এত অপমান আপনে হইতাছেন, টেকা দিয়া এইডা ফিরাইতে পারবেন?
তার সঙ্গে গলা মিলালো ফারুখ। কাইল পেপারে লেখা হইব, আপনের ফটো ছাপা হইব, টিবিতে দেখাইবো আপনেরে, মানুষে আপনেরে কী কইবো ম্যাডাম!
মিজান সাহেব বললেন, থুতু দেবে। থুতু।
রেখার অবস্থা তখন চারদিক থেকে মার খাওয়া কিংবা ফাঁদে আটকা পড়া জানোয়ারের মতো। একবার এদিক তাকাচ্ছে আরেকবার ওদিক। কথা বলতে পারছে না। মুখটা অসুস্থ মানুষের মতো দেখাচ্ছে।
হায়দার সাহেব বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে আপনার সেক্রেটারি ভাইকে ফোন করতে পারেন, বা অন্যকানো বড় আত্মীয় বন্ধু পাওয়ারফুল লোক থাকলে তাঁদেরকে ফোন করতে পারেন। ডেকে আনতে পারেন বাড়িতে। আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। এই যে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট, আপনাকে আমরা এখন থানায় নিয়ে যাবো। আজ রাত থানা হাজতে থাকবেন কাল কোর্টে চালান দিয়ে দেবো।
মিজান সাহেব বললেন, নিয়ে যান, নিয়ে যান বদমাস মহিলাকে। বাকি জীবন জেলে পচুক।
হায়দার বললেন, আপনাকেও যেতে হবে স্যার। হ্যাঁ আপনি

মেয়েটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছেন, শেষ পর্যন্ত তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন এসব ঠিক আছে। কিন্তু মাঝখানে প্রায় তিন মাস সময় চলে গেছে। এত সময় আপনি নিয়েছেন কেন? কাজটা তো আগে করলেও পারতেন। নিজে না পারছিলেন পুলিশের সাহায্য নিতেন। একজন শিক্ষিত মানুষ মুখ বুজে দিনের পর দিন নিজ স্ত্রীর এই ধরনের কাণ্ড দেখছেন, প্রতিবাদ করে অপমানিত হচ্ছেন, একটি মেয়েকে তিলে তিলে চোখের সামনে মরে যেতে দেখছেন, যখন এ থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ তিনি দেখছেন না, তাঁর অবশ্যই পুলিশের কাছে যাওয়া উচিত ছিল। আজকাল মাদকাসক্ত ছেলেকে দিব্যি পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন কোনো কোনো বাবা। আপনি এভাবে ভাবেননি কেন?
মিজান সাহেব বললেন, ঠিকই বলেছেন। শাস্তি আমারও হওয়া উচিত।
কবির বুক থেকে মুখ ফিরিয়ে হায়দারের দিকে তাকাল পারুল। না সাহেব, তারে কিছু বইলেন না। সে আর ফারুখ মামায় বাইর কইরা না দিলে আমি মইরা যাইতাম।
হায়দার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর মহিলা পুলিশ দু’জনকে ইশারা করলেন। তারা গিয়ে রেখার দু’পাশে দাঁড়াল। চলেন ম্যাডাম।
এবার রিমি তাকাল রেখার দিকে। তীব্র ঘৃণার গলায় বলল, আপনি নারীজাতির কলঙ্ক। ছি!


এগারো
গাড়ি চলছে। জয়ার পাজেরো জিপ নিয়ে বেরিয়েছে কবি। জুলেখার মা আছে সঙ্গে। সে বসেছে ড্রাইভারের পাশে। কবির পাশে পারুল। শাজাহান গাড়ি চালাচ্ছে। সে ধীর স্থির নরম ধরনের মানুষ। গাড়ি চালায় ভালো, তবে একটু স্লো। এটা জয়ারই ডিরেকসান। স্পিডে গাড়ি চালানো বা হুড়োহুড়ি একদমই পছন্দ করেন না জয়া।
আজ শুক্রবার, রাস্তাঘাট ফাঁকা। তবু নিজের স্টাইলেই ড্রাইভ করছে শাজাহান। জুম্মার দিন বলে তার মাথায় সাদা গোল টুপি।
কাল হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়েছে পারুলকে। তাকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার সময় রুনু সাহেব এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন গেটের কাছে। ডাক্তার নার্সরা অনেকেই ছিলেন, রিমি তো ছিলই। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছলছল চোখে গাড়িতে মাত্র চড়তে যাবে পারুল, রিমি এগিয়ে এসে দু’হাতে পারুলকে জড়িয়ে ধরল। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল, ভালো থেকো তুমি, ভালো থেকো। আমাদের কথা মনে রেখো। আমি জানি কবির সঙ্গে তোমার যোগাযোগ থাকবে। ওর কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে আমাকে ফোন করো।
রুনু সাহেবও মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন পারুলকে। বললেন, তোমার চিকিত্সার জন্য এই হাসপাতাল ফ্রি। আমি চাই না তোমার কোনো অসুখ-বিসুখ হোক। তারপরও যদি কখনো শরীর খারাপ হয়, সোজা চলে আসবে এই হাসপাতালে। আমি থাকি বা না থাকি, চিকিত্সা তুমি পাবে। ভিআইপি ট্রিটম্যান্ট পাবে। মন দিয়ে লেখাপড়া করো। ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো। আমি জানি না তুমি পড়ালেখা আগে করেছো কি না! যদি না করে থাকো, শুরু করবে।
পারুল বলল, আমি ক্লাস থিরি পরযন্ত পড়ছি।
তাহলে তো কথাই নেই। আবার শুরু কোরো। ভালো থেকো। খোদা হাফেজ।
পারুলকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল কবি। সিঁড়ির রুমে রাতে ঘুমিয়েছে। সকালবেলা উঠে কবি দেখে আজ বেশ সকাল সকাল উঠেছে কুহু, কেকা, ভাইয়া মর্নিংওয়াক সেরে এর মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে গেছেন। নাশতার টেবিলে আজকের আয়োজনও ভালো। পারুল দাঁড়িয়ে আছে জয়ার পাশে। তার পরনে ভারি সুন্দর একটা ফ্রক। সবুজ রংয়ের ওপর সোনালি কাজ করা। পায়ে সুন্দর স্যান্ডেল। মুখটা ফুলের মতো লাগছে পারুলের। জয়া টুকটাক কথা বলছেন পারুলের সঙ্গে। পারুল কেমন বিষণ্ন।
কবিকে দেখে জয়া বললেন, ওই মহিলাও এসে পড়েছে। জুলেখার মা। নাশতা খেয়ে নে কবি। তারপর রওনা দে। সকাল সকাল গিয়ে মেয়েটাকে পৌঁছে দিয়ে আয়।
নো প্রবলেম। আমি রেডি।
পারুলকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার সময় সবাই নিচে নেমে এসেছে। জয়ার হাতে নতুন সুন্দর একটা ব্যাগ। ব্যাগটা পারুলের হাতে দিয়ে বললেন, এই ব্যাগে তোমার জন্য জামাকাপড় আছে, স্যান্ডেল আছে। সাবান শ্যাম্পু লোশন সব আছে। জুলেখার মা আমাদের বাড়ি চিনে গেল, যখন তোমার কোনো দরকার হবে তাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসবে।
কুহু এসে লাল টুকটুকে একটা মোবাইল ফোন দিল পারুলকে। এই ফোনটা তোমার। দু হাজার টাকা ব্যালেন্স আছে। আমার, কেকার, মা’র আর চাচ্চুর নাম্বার সেভ করে দিয়েছি। আমাদের তুমি ফোন করবে। যেকোনো দরকারে ফোন করবে। হেজিটেড করবে না।
তারপরই বোকার মতো হাসল কুহু। কেকার দিকে তাকালো। হেজিটেডের বাংলা কী মা?
জয়া বললেন, দ্বিধা।
ইয়েস, দ্বিধা করবে না। কিন্তু ওকি দ্বিধা কথাটা বুঝবে?
অনুমানে বুঝে নেবে।
কবিকে ডেকে তার হাতে কিছু টাকা দিলেন রবি। টাকাটা পারুলের বাবাকে দিস। গরিব মানুষ, কাজে লাগবে।
পারুলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদরও করে দিলেন রবি। পারুল কথা বলছিল না, তার চোখ ছলছল করছিল।
গাড়িতে চড়ে কবি বলল, তোমার ওই রেখা ম্যাডামের কী হয়েছে জানো?
পারুল কথা বলল না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। কথা শুনে কবির দিকে মুখ ফেরাল।
কবি বলল, অ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মিজান সাহেবকেও নেয়া হয়েছিল। এক রাত থানা হাজতে থেকেছে দু’জনে। পরদিন কোর্টে চালান দিয়েছে। মিজান সাহেবের জামিন হয়েছে, তাঁর স্ত্রীর হয়নি। তাঁকে সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন জেল খাটছে।
সামনের সিট থেকে জুলেখার মা বলল, ওরে যে টেকা-পয়সা দিতে চাইছিল সেইটা কবে দিবো?
ফোন করে আমার অ্যাকাউন্ট নাম্বার নিয়েছে। নিশ্চয় অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেবে। হাসপাতালের বিল দিয়ে দিয়েছেন।
পারুলের কাঁধে হাত দিল কবি। তোমার টাকা একটাও নষ্ট হবে না। ফিক্সড ডিপোজিট থেকে প্রতিমাসে দশ হাজার টাকা করে ইন্টারেস্ট পাবে। ওই টাকায় তোমার লেখাপড়া চলবে, জামাকাপড় খাওয়া দাওয়া সব চলবে।
পারুল তবু কথা বলল না, যেন এসব ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহই নেই। সে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
জুলেখার মা বলল, আল্লায় যা করেন মানুষের ভালোর জন্যই করেন। দশ হাজার টাকা মাসে পাইলে পারুলগো সংসার চইলা যাইবো। লতিফের কোনো অভাব থাকবো না। পারুলেরও আর কোনো বাড়িতে কাম করতে হইব না।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
গাড়ি তখন বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হচ্ছে। বাইরে খা খা করছে শেষ চৈত্রের দুপুর হয়ে আসা রোদ। সেতু থেকে নেমে সোজা যাবে গাড়ি তারপর ডানদিকে বাঁক নেবে। এই রাস্তা হাতের রেখার মতো মুখস্থ কবির। বহুবার ঢাকা-মাওয়া রোডে যাতায়াত করেছে সে। মাওয়ার আগের গ্রাম মেদিনী মণ্ডলে তার মামাবাড়ি। পারুলদের যে গ্রাম সেই গ্রামও তার চেনা। কুমারভোগ।
কিন্তু পারুল এমন চুপচাপ হয়ে আছে কেন? এত বিষণ্ন হয়ে আছে কেন?
পারুলের হাত ধরে নাড়া দিল কবি। তুমি মন খারাপ করে আছ কেন? তোমার তো আজ মন ভালো হয়ে ওঠার কথা। এত কিছুর পর বাড়ি ফিরছো তুমি, বাবার সঙ্গে দেখা হবে, হোক সত্মা তবু তো মা, তার সঙ্গে দেখা হবে। ছোট ছোট ভাই দুটোর সঙ্গে দেখা হবে। তোমার তো এখন আনন্দে ফেটে পড়ার কথা। কথা বলছো না কেন তুমি? হাসছো না কেন? খাবে কিছু? কোক, বিস্কুট! কোনো

দোকানের সামনে গাড়ি থামাবো?
পারুল মাথা নাড়ল। না।
মাওয়া চৌরাস্তায় এসে বাঁদিকে যাবে গাড়ি। বাঁকটায় বেশ কিছু দোকানপাট। কবি বলল, চলো পারুল এখানে নামি। তোমার ভাইদের জন্য বিস্কুট চানাচুর চিপস এসব কিনে নিই।
পারুল বলল, দরকার নাই।
অবশ্যই দরকার আছে। তুমি এতদিন পর বাড়ি ফিরছো, ভাইদের জন্য কিছু কিনবে না?
আপনে চাইলে কিনতে পারেন। আমি নামুম না।
তুমি না নামলে আমিও নামবো না। শাজাহান, গাড়ি থামাও।
শাজাহান গাড়ি থামালো। পকেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে তাকে দিল কবি। এই টাকায় বিস্কুট চানাচুর চিপস যতটা হয় নিয়ে এসো।
জি স্যার।
কয়েক মিনিটের মধ্যে ওসব কিনে ফিরে এল শাজাহান। তারও কয়েক মিনিট পর জুলেখার মা বলল, ডেরাইভার ভাই, গাড়ি থামান।
কবি বলল, এসে পড়েছি?
জি সাহেব।
কবি পারুলের দিকে তাকাল। তোমাদের বাড়ির কাছে এসে পড়লাম তাও দেখি তুমি কিছু বললে না! আশ্চর্য মেয়ে তুমি।
গাড়ি থেমেছে পায়ে চলা একটি পথের মুখে। বড় রাস্তা থেকে পায়ে চলা পথটা চলে গেছে দক্ষিণে, নদীর দিকে। সেই রাস্তার ধারে গৃহস্থলোকের ঘরবাড়ি, গাছপালা। পারুলের হাত ধরে রাস্তার মুখে নামলো কবি। পারুলের ব্যাগটা নিল হাতে। শাজাহানকে বলল, খাবারের ব্যাগটা জুলেখার মা’র হাতে দাও শাজাহান। তুমি গাড়িতেই থেকো। আধঘণ্টার মধ্যে আমি ফিরে আসবো।
তিন জন মানুষ হাঁটতে লাগল।
গাড়ি থেকে নামবার পর প্রথমেই গরমের ঝাপটা লেগেছিল। এতক্ষণ গাড়ির এসিতে ছিল। এজন্য গরমটা একটু যেন বেশিই লাগছে।
কবি বলল, পারুল, কোন বাড়ি তোমাদের?
পারুল কথা বলল না। জুলেখার মা বলল, আপনেরে বলছিলাম না ওগো বাড়িঘর নাই, নদীভাঙ্গা মানুষ। রাস্তার ধারে ছাপড়া উঠাইয়া থাকে।
কবির মনে পড়ল। তাই তো! কিন্তু সেই কুঁড়েঘরটা কোথায়?
মিনিট তিন চারেক হাঁটার পর পথের পাশে বেশ কয়েকটা কুঁড়েঘর দেখা গেল। বাচ্চা-কাচ্চারা হৈ চৈ ছুটোছুটি করছে, মাটিতে লুুটোপুটি খেয়ে খেলা করছে। অদূরে সাদা বালির অনেকখানি খালি জায়গা চলে গেছে পদ্মার দিকে। নদী বয়ে চলেছে তার নিজস্ব নিয়মে।
পারুলকে দেখে মুহূর্তে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। প্রতিটা কুঁড়েঘর থেকেই মহিলা পুরুষ বেরিয়ে এল। ভালো রকম একটা ভিড় লেগে গেল। লতিফ ঘরেই ছিল। জুলেখার মা ফোন করে বলেছিল পারুলকে সে আজ নিয়ে আসবে। এজন্য সে কোথাও যায়নি।
কিন্তু মেয়েকে দেখে যতটা আবেগ আপ্লুত হওয়ার কথা তার তা সে হলো না। মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে জোর করে যেন কান্নার চেষ্টা করল। পারুলের চোখেও পানি নেই। সে কী রকম শক্ত হয়ে আছে। পারুলের মা দাঁড়িয়ে আছে ঘরের সামনে। তার কোলে ছোট ছেলেটা। বড় ছেলেটা বাপের সামনে দাঁড়িয়ে পারুলকে দেখছে। সেই ছেলের হাতে খাবারের ব্যাগটা ধরিয়ে দিল জুলেখার মা। নে খা গিয়া।
পারুলের ব্যাগটা লতিফের হাতে দিল কবি। এটা পারুলের ব্যাগ। ব্যাগে ওর জিনিসপত্র আছে।
তারপর পকেটে হাত দিয়ে রবির দেওয়া টাকাগুলো বের করে তার হাতে দিল। আমার বড়ভাই দিয়েছেন। পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। এটা দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করবেন আর মাসে মাসে পারুলের খরচের জন্য আমি দশ হাজার টাকা করে পাঠাবো। ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন। আমি চেষ্টা করবো এই এলাকার কোথাও একটু খাসজমির ব্যবস্থা আপনাদের জন্য করতে পারি কি না। যাতে ভালো ঘরদোর তুলে থাকতে পারেন।
অন্যান্য কুঁড়েঘরের লোকজন কবির কথাবার্তা শুনে এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। এক মহিলা বলল, পারুলির লেইগা লতিফের কপাল খুইলা গেল। মইরা গিয়াও যদি এই রকম সুবিদা পাওয়া যায় তাও ভালো।
কবি বুঝলো বেশিক্ষণ এখানে থাকলে এইসব লোকের আরও নানারকমের কথা শুনতে হবে। তাকে ধরতে পারে শুধু লতিফকে না, তাদেরকে সাহায্য করবার জন্য। না, যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে বিদায় হওয়া ভালো।
জুলেখার মাকে পাঁচ হাজার টাকা দিল কবি। এটা রাখেন। আপনিও অনেক করেছেন পারুলের জন্য।
জুলেখার মা খুব খুশি। বিগলিত গলায় দোয়া করলো কবিকে। আল্লায় আপনেরে বাঁচাইয়া রাখুক সাহেব, আল্লায় আপনেরে বাঁচাইয়া রাখুক।
কবি তারপর পারুলের দিকে তাকাল। আমি যাই পারুল। দরকার হলে আমাকে ফোন করো।
পারুলের মাথায় মুহূর্তের জন্য হাত রেখে পা বাড়াল কবি। কয়েক পা মাত্র গিয়েছে, পারুল পাগলের মতো ছুটে এল। এসে কবিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি এখানে থাকুম না, আমি আপনের লগে চইলা যামু। আমি আপনের কাছে থাকুম, আপনে আমারে লইয়া যান। আমি এখানে থাকুম না।
কবি দিশেহারা হলো। আরে! আমার সঙ্গে কোথায় যাবে তুমি?
আপনেগো বাড়িতে যামু। আমি এখানে থাকুম না।
পারুলকে ওভাবে ছুটে আসতে দেখে জুলেখার মা আর পারুলের বাবাও ছুটে এল। জুলেখার মা টানাটানি করে পারুলকে ছাড়াতে চাইলো, পারুল কিছুতেই কবিকে ছাড়ছে না। কাঁদছে আর বলছে, আমি থাকুম না, আমি এখানে থাকুম না। আমি আপনের লগে যামু।
জুলেখার মা বলল, কই যাবি তুই? সাহেব তোরে কই লইয়া যাইবো! পাগলামি করিস না পারুল, বাড়িত ল। ও লতিফ, তুমি তোমার মাইয়ারে ছাড়াও। বাড়িত লইয়া যাও ওরে।
পারুল আগের মতোই কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি এখানে থাকুম না। কিছুতেই থাকুম না।
লতিফ কাতর গলায় বলল, সাহেব, আপনে ওরে লইয়া যান। এই মাইয়া আমি আপনেরে দিয়া দিলাম। আমি জানি ও এখানে ক্যান থাকবো না। আপনেরা যেই মায়া ওরে করছেন ওই মায়া ও কই পাইবো। লইয়া যান, আপনে ওরে লইয়া যান।
জুলেখার মা বলল, এইডা তুমি কেমুন কথা কইতাছো লতিফ! সাহেব এত কিছু করলো তোমার মাইয়ার লেইগা আর তারে তোমরা একটা বিপাকে ফালাইতাছো! সে কই লইয়া যাইবো তোমার মাইয়ারে! ও পারুল, ছাড় সাহেবরে। যা বাড়িত যা। ছাড়।
এক হাতে পারুলকে জড়িয়ে ধরল কবি। মায়াবি গলায় বলল, না ঠিক আছে। জুলেখার মা, ওর ব্যাগটা নিয়ে আসেন। ও এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে, আমাদের বাড়িতেই থাকবে।
সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল জুলেখার মা। তয় ঠিক আছে সাহেব। আপনে ওরে লইয়া গাড়িতে গিয়া ওঠেন, আমি আসতেছি।
চোখ মুছে কবির হাত ধরল পারুল। গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে কবি বলল, এই আমাকে তুই বিয়ে করবি? চল বিয়ে করে ফেলি। আমার বয়স চৌত্রিশ, তোর এগারো। বরের সঙ্গে কনের বয়সের ব্যবধান তেইশ বছর। তাতে অসুবিধা নেই। আগের দিনে তো এরকমই হতো। পঞ্চাশ বছরের বুড়োর সঙ্গে দশ বছরের মেয়ের বিয়ে হতো। তবে কোনো ন্যাড়া মেয়ের সঙ্গে কারও বিয়ে হয়েছে বলে জানা নেই আমার। আমিই প্রথম লোক যার বউ ন্যাড়া।
কবির কথা শুনে খানিক আগের কান্না ভুলে গেল পারুল। জলতরঙ্গের মতো খিলখিল শব্দে হাসতে লাগল। তার সেই উচ্ছল হাসিতে শেষ চৈত্রের রোদ একটু যেন কোমল হলো। মাথার ওপরকার চিরকালীন আকাশ একটু যেন বেশি নীল হলো। দূরের নদী একটু যেন দ্রুত বইতে লাগল। নিজের কিছু মায়াবি হাওয়া পাঠিয়ে দিল দুই বয়সী দুজন মানুষকে। পথের ধারে ফুটে থাকা বুনোফুল একটু যেন বেশিই ছড়ালো তার গন্ধ।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৪
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :