The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

ভ্রমণ লাওস

মরোক্কান নারীও কমরেড উতাকি

মঈনুস সুলতান

রীতিমতো তিথি নক্ষত্র দেখে, আবহাওয়ার চার্ট ঘেঁটে, শোল্ডারব্যাগে প্রচুর শিশুখাবার ও তেরোটি নানা রকমের খেলনা নিয়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যাত্রা শুরু করি। পনেরো মাসের শিশুকন্যা কাজরিকে কোলে নিয়ে প্লেনের সিট বেল্ট বাঁধতে গিয়ে হলেণ নীরব অভিব্যক্তিতে উদ্বেগ ছড়ায়। আমাদের সামনে একটানা আটারো বিশ ঘণ্টার ফ্লায়িং। প্লেন টেকঅফ করতে গেলে আমি জানালা দিয়ে দেখি—তাবত্ চরাচর জুড়ে ঝরছে থোকা থোকা শুভ্র তুষার। হাওয়াই জাহাজ একটি বনানীর ওপর দিয়ে উড়াল দিচ্ছে, আর মনে হয় সুনসান উপত্যকায় সবুজ পত্রালিতে নীড় বেঁধেছে কিংবদন্তির সহস্র শ্বেত কবুতর।

জাপানের নারিতা ও থাইল্যান্ডের ব্যাংককে দুই রাতের যাত্রাবিরতি। তারপর লাওসের রাজধানী ভিয়েনচানে আমরা যখন এসে পৌঁছাই—দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে বালকরা নারকেল গাছের শিথানে উড়াচ্ছে ঘুড়ি, তেল-মবিলের পোড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে টুকটুক বলে পরিচিত টেম্পোগুলো, এবং মন্দিরে ঘণ্টা বাজিয়ে পূজা সারছেন সন্ন্যাসীরা। শহরটিকে মনে হয়, বিগত যুগের এক মৃদুগতি মফস্বল।
যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পরিবেশ ছিল তীব্রভাবে আর্বান এবং জীবনযাপনে গতি ছিল আরাধ্য। ভিয়েনচানে ব্যাপারটা একদম বিপরীত। আমরা যে গেস্টহাউসে উঠি, তার আঙিনায় টলটলে চৌবাচ্চার সজল পরিসরে
ফুটছে শ্বেতনীল শালুক ও শাপলা। পাশে বেতের আরাম কেদারায় আয়েশের ঢালাও বন্দোবস্ত। আমরা—আমি ও হলেণ, একটি নামজাদা আন্তর্জাতিক সংস্থায় যুগ্ম কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভের চাকরি পাকড়ে লাওসে এসেছি। আমাদের দফতরের ভবনটিও অনেকগুলো বৃহত্ তরুর ছায়ায়, প্রচুর অর্কিড ঝুলিয়ে, মর্নিংগ্লোরি ও গোল্ডেনশাওয়ারের কুঞ্জলতায় রীতিমতো নিবিড় হয়ে আছে শ্যামলিমায়। আমি ও হলেণ অফিসের বারান্দায় বসে প্যাসোন ফ্রুটের শরবত পান করতে করতে চেয়ে থাকি সামনের আদিগন্ত ধানক্ষেতের দিকে।
শুক্রবারে এসেছি বলে শনি বরিবারের উইকয়েন্ডে পাওয়া যায় যাত্রাযুক্ত ক্লান্তি বিমোচনের কাঙ্ক্ষিত অবসর। শোফার চালিত গাড়ি নিয়ে একজন লাও লকেল স্টাফ আসেন আমাদের দেখভাল করতে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি হাঁকিয়ে আমরা শহরটির মাপঝোঁক করতে বেরোই। গাছপালা ও ঘাসে ল্যান্ডস্কেপ করা গোলাকার চত্বরের পাশ দিয়ে শহরের একমাত্র সরলসোজা সড়ক ধরে খানিক এগোতেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন একটি তোরণ, যার স্থাপত্যকলায় প্যারিসের বিখ্যাত গেটে’র ছাপ স্পষ্ট। অবাক হই রাজপথে একটি দুটি রিকশা দেখে—যা স্থানীয়ভাবে সামলো বলে পরিচিত। গাড়ি চলে আসে সম্পূর্ণ স্বর্ণালী এক বৌদ্ধস্তূপের পাশে। ওখানে ফুলের সুদর্শন সাজি নিয়ে দাঁড়িয়ে সুসজ্জিতা চার লাও মহিলা।

লাও স্টাফ আমাদের নিয়ে আসেন শহরের মাঝখানে ঝোপঝাড় ও তরুলতায় ছায়াচ্ছন্ন সুকপালোয়াঙ মন্দিরে। ঢোকার মুখেই দেখি জনা কয়েক বাচ্চা সন্ন্যাসীদের নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন চশমাচোখে গৈরিক বসন পরা শিক্ষক-শ্রমণ। গাড়ির বাইরে তীব্র গরমে আমাদের অস্থির লাগে। নান বা নারী-শ্রমণরা যেন আমাদের কাহিল হালত ঠিকই বুঝতে পারেন। তারা ডেকে নিয়ে কুটিরের দাওয়ায় বসিয়ে খেতে দেন কাটা ডাবের জল। ভিজা গামছা দিয়ে মুছিয়ে দেন কাজরির চোখমুখ। তারপর আমরা চাঁপা-ফুল ঝরা পথে পাপড়ি মাড়িয়ে চলে আসি বেশ কয়েকটি বৌদ্ধমূর্তির কাছে। খোলা আকাশের নিচে অনন্ত নাগের ফণার ছায়ায় ধ্যানস্থ অমিতাভ গৌতম। তাঁর পাথরের শরীরে জমেছে শতাব্দীর সবুজ শ্যাওলা। মনে হয় টাইম মেশিনে চেপে চলে এসেছি—যে যুগ হারিয়ে গেছে সহস্র বছর আগে, তার তীরে নিরিবিলি এক তপোবনে।

সুকপালোয়াঙ মন্দির থেকে বেরিয়ে আসার পথে দেখা হয় হেস্টিংস ও কাওতার দম্পতির সাথে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় আমাদের এদেশে আসা উপলক্ষে স্থানীয় ক্লাবে আয়োজিত হয় একটি রিসেপশনের। ওখানে পরিচয় হয় এ যুগলের সাথে। হেস্টিংস সাহেব ভিয়েনচান শহরে একটি আন্তর্জাতিক এইড এজেন্সির বড় চাঁই। তার সঙ্গিনী মাদমোয়াজেল কাওতার মরোক্কোর নারী। আমাদের দেখতে পেয়ে মাদমোয়াজেল কাওতার বলেন—চলে আসো আমাদের গাড়িতে। তারা প্রথমে নিয়ে আসেন একটি পুরোনো দোতালা বাড়ির সামনে। ফেঞ্চ স্থাপত্য কেতায় নির্মিত এ ভিলাটি যেন ঔপনিবেশিক আমলের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে ভিয়েনচান শহরে যুগের পরিবর্তন। তারপর তারা গাড়ি হাঁকিয়ে আমাদের নিয়ে আসেন শহরের প্রান্তিকে। এখানকার পরিবেশ মূলত গ্রামীণ। আর গাড়ি থেকে নেমে আমরা যা চাক্ষুষ করি—এ ধরনের কোনো ইমেজ কখনো বাস্তবে তো নয়ই, কোনো সিনেমা বায়স্কোপেও দেখিনি। একটি গাছের কাটা কাণ্ডের দুদিকে দাঁড়িয়ে জমকালো ঝালরওলা বস্ত্রে সজ্জিত দুটি দাঁতাল হাতি। আর তাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে গ্রামের ছেলেমেয়ে ও নারীপুরুষ সকলে। হলেণ মাদমোয়াজেল কাওতারকে জড়িয়ে ধরে।

দিন কয়েক গেস্টহাউসে বাস করার পর আমাদের যে বাড়িতে তোলা হয় তা আকারে বিশাল এবং স্থপাত্য শৈলীতে বিচিত্র এক কুঠি বিশেষ। আমরা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে ভোরবেলা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াই। আর দেখি—সড়ক ধরে গৈরিক বসন পরা মুণ্ডিত মস্তক শ্রমণরা স্তোত্র জপতে জপতে হেঁটে যাচ্ছেন ভিক্ষাভাণ্ড হাতে নিয়ে।


দুই
ঈদ উদযাপনে যে বিস্তর এন্তেজামের প্রয়োজন আছে—এ বিষয়ে সচেতনতা আসে মাদমোয়াজেল কাওতার উমাইমার আচমকা সওয়াল থেকে। কাওতার মরোক্ক থেকে লাওসের ভিয়েনচান শহরে আসা এক সুদর্শনা মানবী। এ নারীর জনম হয়েছে ফেজ নগরে, বাতচিতে তার প্রখর তেজ। তিনি ভ্রুকুটি করে জানতে চান, ‘লা-ঈদের আয়োজনে তোমরা কী কী করেছ?’ আমরা অর্থাত্ আমি, হলেণ ও কাওতারের বিয়ে না করা আংরেজ স্বামী বা পার্টনার মি. হেস্টিংস; আজ বিকাল বেলা আমরা বসে আছি আমাদের কুঠি’র পেছনদিকের ব্যালকনিতে। এ ঝুলবারান্দা দেখতে শবে বরাতে হালুয়া রুটি বহন করা খুঞ্চার মতো গোলাকার। তার ওপরে মাছি নিরোধক সরপোষের কায়দায় ছায়া দিচ্ছে রোদ ফেরানো স্বল্প ছাউনি। মাদমোয়াজেল কাওতার জানতে চান, লা-ঈদের এন্তেজামে কোন কোন জিনিসের জরুরত হয় এ বাবদে আমরা অবগত কিনা? আমি কয়েক প্রজন্মের বুনিয়াদি মুসলমান, তাই মরোক্কান নারীর এ হেন খেলো প্রশ্নে বিশেষ একটা পাত্তা দিই না। হলেণের সাথে ইসলামের সম্পর্ক হয়েছে সামপ্রতিক, সে কাওতারের সওয়ালে সিরিয়াস হয়ে ওঠে, তত্ক্ষণাত্ নোটপ্যাড নিয়ে এসে সে তালিকা করতে শুরু করে ঈদ করার জন্য চাই কী কী বস্তু?

মাদমোয়াজেল কাওতার ও মি. হেস্টিংস ভিয়েনচান শহরে আমাদের প্রতিবেশী। তারা অনেক দিন হয় এখানে বাস করছেন। সে হিসেবে আমরা—ভিয়েনচানে নবাগত, এবং লাওসের আচার-আচরণ আদব-কায়দায় আনকুতও বটে। হলেণ শ্বেতাঙ্গ গোত্রজাত আমেরিকান, আমি শ্যামল বর্ণ বাঙালি। সুতরাং, আক্ষরিক অর্থে আমাদের মতো অসবর্ণ কাপোলের প্রতি তাদের মোনাসিব অশেষ। তারা দুজনে আমাদের খুব খোঁজ-খবর নিচ্ছেন, দরকার পড়লে হেল্প করছেন। ভিয়েনচানে আজ গরম পড়েছে খোদাই গজবের মতো ভয়াবহ। কাজ থেকে ফিরেই তারা লোমোনেডের সাথে ঝাঁঝালো আরক মেশানো একটি পানীয় নিয়ে এসেছেন। তরলটির পোষাকি নাম হচ্ছে ‘শ্যান্ডি’। তার সাথে আমরা চাট হিসেবে খাচ্ছি মরোক্কান শিরকায় জারিত ভাজা ভ্যান্ডি। কাওতারের বাচনিকে এই মাত্র জানতে পেরেছি যে—আদম সন্তানের পাকপ্রণালীতে এ দু বস্তুর সমবায়ে সৃষ্টি হয় শারীরিক শীতলতা। হলেণের ধারণা, আমরা জীবনে জেনেবুঝে অনেক পাপ করেছি, তা না হলে চৈত মাসের উত্তাপে জিন্দা কবাব হবো কেন? ঠান্ডা হওয়াটা আমাদের জন্য এ মুহূর্তে অক্তে-জরুরি। তাই খোলা হাওয়ার ইরাদা করে আমরা ঝুলবারান্দায় বসেছি। মাদমোয়াজেল কাওতার হলেণের কাছ থেকে সুঁইসুতা চেয়ে নিয়ে তার মিনিস্কার্ট রিফু করছেন।

কাওতার ভিয়েনচানে কোনো কাজকর্ম করেন না। মি. হেস্টিংসকে তিনি দরকার পড়লে স্বামী বলে পরিচয় দেন, তবে তাকে তিনি বিয়েশাদি করার প্রয়োজন বোধ করেননি। তার হাতে অঢেল সময়, তার খানিকটা তিনি ব্যয় করেন বাইসাইকেল চালিয়ে। বাকিটা তিনি কাটান মহিলা দর্জিদের সাথে, লাও সিল্কের মিনিস্কার্ট-এর ডিজাইন করিয়ে। গরমের কারণে এ স্বল্পঝুলের স্কার্টগুলো তিনি পরেনও হামেশা। ভিয়েনচান শহরটি একটি ছোট্ট দেশের রাজধানী হলেও তার প্রান্তিকে আছে বিস্তর ধানক্ষেত। তাতে উলুলঝুলুল হাওয়া খেলে হরদম। এ খোলামেলা বাতাস শরীরে জড়িয়ে বাইসাইকেল চালাতে কাওতার খুব পছন্দ করেন। তা মিনিস্কার্ট পরে ধানক্ষেতের আইল ধরে সাইকেল চালালে আওয়ারা ব্যাঙগুলো ঝাঁপ দিয়ে পড়ে কাদাপাঁকে থিকথিকে খালে। আর টেকো মাথায় চাষিরা তার নিরাভরণ ঊরুর দিকে তাকিয়ে মধুর কণ্ঠে মন্তব্য করে, ‘নাঙম্ নো,’ বা ‘খুবই মনমুগ্ধকর নয় কি?’ কাওতার কিছু মনে করেন না, তার মেজাজ ভালো থাকলে, তিনি গ্রীবা বাঁকিয়ে বুক টান করে হাসির মিঠা বান ছুড়ে পরিষ্কার ফরাসিতে বলেন, ‘মের্সি, মের্সি বকুপ,’ বা ‘ধন্যবাদ হে, অশেষ ধন্যবাদ।’ ১৯৫৪ সাল ইস্তক লাওস ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ,

সুতরাং নিম্নবর্গীয় আত্রাফ কুলের চাষাভুষারাও চার ছয়টা ফরাসি শব্দ বা বাগবিধি জানে। তারা মাদমোয়াজেলের শিষ্টাচারে মুগ্ধ হয়ে টেকো খুলে বাও পদ্ধতিতে মাথা ঝুঁকায়।

ঈদ উদযাপন যে অত্যন্ত জরুরি, এবং আগে থেকে এন্তেজাম না করলে খানাপিনা পার্টিপরব, ওই দিনে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, কিছুই সুশারে করা যাবে না; সুতরাং এখনই সাজপাড় শুরু করা অত্যন্ত দরকার—বলে কাওতার দাঁতে সুতা কাটতে কাটতে হলেণের দিকে ভ্রুকুটি করে তাকান। তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, নোটপ্যাডের ছোট্ট কাগজে এক পৃষ্ঠায় তা কুলাচ্ছে না, তাই হলেণ এবার পোস্টার পেপার নিয়ে এসে তাতে রঙিন মার্কার দিয়ে বুলেট পয়েন্টে বানাতে শুরু করে আস্ত একটি চেকলিস্ট। খাবারদাবার, মশলাপাতি, খেলনা, কাপড়চোপড়, মোমবাতি, ঈদ-কেক ইত্যাদি। মি. হেস্টিংস গরমে বড় কাহিল হয়ে আছেন। তিনি পলিথিনের ব্যাগে করে কিছু আইসকিউব ঘাড়মাথা ও টাকের কেশবিরল পরিসরে ঘষেন। অতঃপর পাইপ জ্বালিয়ে কথা বলার সুযোগ খোঁজেন, কিন্তু ঈদ এন্তেজামের তালিকা তৈরিতে এনগেইজড্ নারীদ্বয় এমনই মশগুল হয়ে আছে যে তারা তার দিকে ফিরে তাকানোর সাবকাশ পায় না। তাই মি. হেস্টিংস আমার দিকে ফিরে বলেন, ‘কাওতার প্রতি বছর ঈদ করবেই, কোনো বছর এ পরব বাদ পড়ার কোনো উপায় নেই, এমন কি যে বছর আমি তাকে ইলোপ করলাম, সে বছরও ঈদ বাদ দেয়নি সে।’ ইলোপ শব্দটির সরল তর্জমা হতে পারে—কোনো নারীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসে শাদি করা। এ কাপোল বিয়ে না করলেও, তদের জীবনে ইলোপের ব্যাপার ঘটেছিল। বিষয়টা বিস্তারিত জানতে হয়। তাই পানীয়তে আইস কিউব মেশানোর জন্য দুই নারী ভেতরের কামরায় যেতেই মি, হেস্টিংসকে জিঞ্জেস করি—ঘটনা কী? তিনি জবাব দেন, ‘কাওতার মরোক্ক থেকে ফ্রান্সে আসে একটি প্রশিক্ষণে যোগ দিতে। ওই প্রোগ্রামে আমি কনসালটেন্সির কাজ করছিলাম। তো শেষ হওয়ার দিনে সে আমার সাথে চাপলিশে পালাল। তারপর আর সে মরোক্কতে ফিরে যায়নি। আর যাবেই বা কীভাবে? আমার সাথে সহবতের শুরুতেই তার ভার্জিনিটি খোয়া গেছে। এখন মরোক্কতে ফিরে গেলেও কোনো আরবকে বিয়ে করা যাবে না। শারীরিক স্ট্যাটাস না জানিয়ে বিয়ে করলে মহামুসিবতের সম্ভাবনা। সে ডেসপারেট।’ তিনি দুহাত কাচুমাচু করে বলেন, ‘তো আমরা এখন মজবুর, খুব হেল্পলেস হালতে একসাথে লিভ টুগেদার করছি। আর প্রতি বছর আমাকে ঈদ এন্তেজামের হ্যাপা পোহাতে হচ্ছে।’ পুরো কাহিনি শুনে আমি তার কেশ-বিরল মস্তকের দিকে তাকাই, এ টেকো মাথায় ইলোপ করার মতো বুদ্ধি এবং হেকমত আছে দেখে বড্ড ইমপ্রেসড হই। মি. হেস্টিংস আবার কথা বলেন, ‘বছরে একবার ঈদ করা ছাড়া আরেকটি বিষয়ে তার বাতিক আছে। প্রায়ই বলে, বিধর্মী কাফেরের সাথে ইলোপ হয়ে যে পাপ করেছে তা মোচনের জন্য সে মক্কাশরিফ যাবে। আমি সাথে যেতে চাইলে সে রাজি হয় না, বলে জেদ্দা থেকে এক পা সামনে বাড়লে জেহাদিরা আমাকে কতল করতে পারে। সো আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টেক এনি রিস্ক।’ এ পর্যন্ত বলে ঝিম ধরে হেস্টিংস তার মাথায় আইসব্যাগ চেপে ধরেন। কথা বলতে বলতে তার চোখমুখ কেমন যেন কৃকলাসের মতো লোহিত হয়ে ওঠে। এদিকে পলিথিনের ব্যাগে আইস গলে পানি হয়ে গেছে। বিরক্ত হয়ে উঠে তিনি ফ্রিজের দিকে যান। তার গরমের অনুভূতি অশেষ, বরফও স্থায়ী হচ্ছে না, ঘষাঘষিতে তা জল হচ্ছে দ্রুত। ফ্রিজে আইস কিউব না পেয়ে তিনি কমপ্লেন করতে করতে ফিরে আসেন। তার চাঁদি এমন লালে-লাল হয়ে আছে যে ওখানে খানিক কচুরিপানা দিলে বরফের চেয়ে বেশি কর্যকর হতো, উপশম হিসেবে তা স্থায়ীও হতো। তবে তিনি রক্তবর্ণ বদনে এমন কটমট করে তাকাচ্ছেন যে, এ রকমের কোনো সাজেশন দিতে হিম্মত হয় না।

ময়ূরের পালকে তৈরি হাতপাখায় মৃদু বাতাস করতে করতে মাদমোয়াজেল কাওতার ফিরে আসেন ঝুলবারান্দায়। হাওয়া সহজে শরীরে প্রতিসরিত হচ্ছে না বলে তার টপের বোতাম খোলা। তাতে সমুদ্রজলে খানিক ভেসে থাকা ডুবো পাহাড়ের মতো উঁকি দিচ্ছে সুগঠিত স্তনযুগল। পেছনে হলেণ তিনটি পোস্টার পেপারে করা দীর্ঘ তালিকা হাতে...। কাওতার পাখার ডাটি দিয়ে কিছু কিছু উপকরণ যথা মশলাপাতি, ধূপকাঠি, ঈত্ত্বর, জাফরান, আম্বর ও কেক-মিক্সের দিকে ইশারা করে বলেন, ‘এসবের কিছুই ভিয়েনচানে পাওয়া যাবে না। ঈদ তো অতি নজদিক, বলা চলে এসেই গেল। এখনই প্ল্যান করা দরকার কোন দিন মেকং নদীর ব্রিজ পাড়ি দিয়ে শপিংয়ের জন্য থাইল্যান্ডের নংকাই যাওয়া যায়।’ তালিকায় কেক-মিক্সের উল্লেখ দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়। ঈদে কেক খাওয়ার কোনো রসুম নেই, বস্তুটি ফিরিঙ্গিদের মিষ্টান্ন বিশেষ, কেকের উল্লেখকে আমি শিরক বেদাতের মতো শোচনীয় গুনাহ বিবেচনা করি। ফিরনি শেমাই হলে কোনো বকোয়াস না করে তা মেনে নিতাম, কিন্তু ততক্ষণে হলেণ ডায়েরি বের করে ডেট খুঁজতে শুরু করেছে কবে নাগাদ শপিং অভিযানের ইরাদায় বর্ডার ক্রশ করা যায়। সে তালিকার পোস্টার পেপারগুলো ভাঁজ করে ঠোঁট কামড়ে চোখে সবুজ দ্যুতি জ্বেলে এমনভাবে তাকায় যে, আমার কুপোকাত হতে বিশেষ বাকি থাকে না। তার হাবভাবে মনে হয়—সে যেন কোনো ট্র্যাবেল এজেন্সির কাছ থেকে কনফার্মড টিকিট পেয়ে গেছে। এখন মুখিয়ে উঠেছে ফরেন ট্রিপের বাকিটুকু এন্তেজাম করার জন্য। আমি অগত্যা কিছু না বলে স্রেফ অফ যাই।

গরম কেবলই বেড়ে চলছে। ভ্যান্ডি ভক্ষণে ঠান্ডা হওয়া যায়নি, শ্যান্ডি’র জাগে তরল তলানিতে এসে ঠেকেছে। দুই নারী ফরাসি ভাষায় লা-ঈদ সম্পর্কে মৃদুস্বরে শলাপরামিশ করছে। আতঙ্ক হয়—এরা না আবার ছোটখাটো ঈদগাহ নির্মাণের নকশা করে বসে। ঘাড়ে গর্দানে লাগাতার মর্দনের কারণে রেফ্রিজারেটরের বরফ ফুরিয়েছে। ঝুলবারান্দার মাইফেল যাতে দীর্ঘময়াদী না হয়, এজন্য আমি উদ্যোগ নিয়ে মেহমানদের আর কোনো পানীয় সরবরাহ করি না। এ কৌশলে কাজ হয়। আসর ভাঙে তাড়াতাড়ি। হলেণ নিচের তলায় বাগানের গেট অব্দি এগিয়ে যায় কাওতার-হেস্টিংস দম্পতিকে ‘আঁবোয়া’ বা গুডবাই বলার জন্য।
ঝুলবারান্দায় একা বসে আমার মধ্যে আপদ বিদায়ের অনুভূতি হয়। আমি পরিস্থিতি নিয়ে একটু নীরবে প্রতিফলন করি। লাওসে আমরা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কো-কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে মাসখানেক আগে এসেছি। আগের কো-কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভরা কেবলমাত্র দায়িত্ব সমঝিয়েছেন। কিন্তু অফিসিয়াল রেসিডেন্সটি ছেড়ে দেননি। তাদের ছেলেমেয়ের পরীক্ষা শেষ হলে বাড়ি ছেড়ে ফিরে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাই মাস দুয়েকের জন্য এ ভাড়া করা লাও-ফরাসি স্থাপত্যের মিশ্রিত কেতায় তৈরি মস্তবড় কুঠিতে আমাদের তোলা হয়েছে। এ বাড়িতে অনেকগুলো কামরা, কৌণিক কেতার টালির ছাদওয়ালা একাধিক বারান্দা ও বাগিচা নিয়ে বিশাল। তবে আরামপ্রদ নয় একেবারেই। এ ভবনের সিটিংরুমকে মনে হয় কনভেনশন সেন্টারের হলকক্ষের মতো বিশাল। তাতে রোজউডের গদিহীন এক গাদা ফার্নিচার। এগুলো দর্শনে সুদৃশ্য হলেও বসলে শরীরে টাইগার বাম মালিশের প্রয়োজন হয়। আর আমাদের কন্যা কাজরি কিছুদিন হয় হাঁটতে শিখেছে। সে কেবলই ঠিরঠিরিয়ে চলে যায় কক্ষ থেকে কক্ষান্তরে, তখনই মেয়েটির খোঁজাখুঁজিতে প্রয়োজন হয় রীতিমতো সার্চ পার্টির। সে হাঁটছে তবে কথা বলে না একেবারে। এ নিয়ে নিয়ত উদ্বেগ হচ্ছে। হামেশা তাইশবিশ করছে হলেণ। ভিয়েনচানে পিডিয়াট্রিশিয়ান বা শিশুদের জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কবিরাজও নেই। প্রফেশনাল কাজবাজে সহজে গুছিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। কারণ, স্থানীয় লাও ভাষা অচিরে শিখতে না পারলে কাজে কমান্ডও আসবে না। এসব জঞ্জালের ভেতর এবার ঈদও অতি দ্রুত নজগিক হয়ে আসলো, আর যদি শপিং করতে থাইল্যান্ড যেতে হয়—তাহলে নির্ঘাত্ ঘুমনিদও হারাম হবে।

কাওতার ও হেস্টিংসকে বাকায়দা বিদায় জানিয়ে হলেণ হাসিমুখে ফিরে এসে জানতে চায়—কবে মেকং নদী পাড়ি দিয়ে যাওয়া যেতে পারে থাইল্যান্ডে? আমার বাংলাদেশি পাসপোর্ট, ওপারে যেতে হলে চাই থাই ভিসা, সহজে তা না-ও পাওয়া যেতে পারে। আমেরিকান, আংরেজ বা ফরাসি-মরোক্কান কারোরই প্রয়োজন নেই ভিসার। ওরা চলাচল করতে পারে সীমান্ত অতিক্রম করে আওয়ারা যথাখুশি। আমি বাঙালি, ওদের মতো অতটা মুক্ত নই। তাই থাইল্যান্ড যাত্রার প্রস্তাবে খামোকা চটে উঠে বলি—ঈদ উদযাপনে কেক-মিক্সের আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই, থাইল্যান্ড যাওয়াও অবান্তর এখানে। ঈদের এন্তেজামে যেটা সবচেয়ে জরুরি সেটা হলো খুঁজে পাওয়া জনা কয়েক মুসলমান, তারপর একটি মসজিদ। হলেণ তালিকার পোস্টার পেপার ডাইনিং টেবিলে মেলে ধরে তাতে তলার দিকে মার্কার দিয়ে লেখে দুটি শব্দ ‘মুসলিম অ্যান্ড মস্ক’।
বিষয়টির এখানেই নিস্পত্তি হয় না। হলেণ খুব কাছে ঘন হয়ে এসে অডিকোলন মেশানো জলে রুমাল চুবিয়ে আমার কপালের ঘাম মুছিয়ে দিতে দিতে থাইল্যান্ডের নংকাই যাওয়ার প্রসঙ্গটি আবার তোলে। শুধু ঈদের অষ্টাদশ উপাচারই নয়, আমাদের প্রয়োজন একটি মিউজিক সিস্টেম কেনা। আমেরিকা থেকে আমরা যেসব রেকর্ড প্লেয়ার ইত্যাদি নিয়ে এসেছিলাম—তা ভিয়েনচানে এসে প্লাগ ইন করতেই লাওসের ভিন্ন পদ্ধতির ইলেকট্রিসিটির কারণে সাথে সাথে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। নংকাইতে আছে শিশুতোষ পার্ক, কাজরিকে ওখানে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া যায়। চাই কি তার জন্য একটি টয় বুমবক্সও কেনা যায়। আর পাঁচ-সেতারা একটি হোটেলে বিস্তর ছাড়ে রীতিমতো সস্তায় আস্ত সুইট পাওয়া যাচ্ছে। মাদমোয়াজেল কাওতারের কাছে হোটেলের ফ্রি কুপন আছে। তা ব্যবহার করলে সন্ধ্যাবেলা মেকং নদীর ভরা জলে রীতিমতো স্টাইলসে নৌবিহার করা যায় মাগনা। ঈদ-শপিং-এ গেলে উইকয়েন্ডের এক রাত হোটেলের লাক্সারি সুইটে কাটিয়ে আসা যায় অনায়াসে। আমি মনোযোগ দিয়ে তার আর্গুমেন্ট বিশদ শুনি। মাদমোয়াজেল কাওতারের সাথে সে জোট বাঁধছে, নারীদের কোয়ালিশন শক্তিশালী হয় সচরাচর; আর তার নানাবিধ ছল দেখে সাথে সাথে কন্ট্রাডিক করার মতো মনোবলও পাই না। নিচের বাগান মথিত করে গুঞ্জন করে ওঠে এক ঝাঁক ঝিঁঝি পোকা। সন্ধ্যা নেমে আসছে। কার্নিসে পা রেখে বুগবুগ করছে দুটি কবুতর। ছাদে হামাগুড়ি দিতে দিতে কক কক কককে বলে আওয়াজ দেয় নাদুস নুদুস সুরতের একটি তক্ষক। হলেণ সুরভিত মোম জ্বেলে বারান্দার চৌকাঠে দাঁড়ালে নীরবে ভাবি—পত্নীদের সাথে স্বামীদের জীবনযুদ্ধ করার নজির বইপত্রে আছে এন্তার, তবে এতে পুরুষদের বিজয়ের দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। সুতরাং এ মুহূর্তে মৌনতাই মনে হয় বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।

তিন
দিন দুয়েক পর দুপুরের দিকে কাজবাজ একটু গুছিয়ে আসতেই ‘ভিয়েনচান টাইমস্’ বলে এ শহরের একমাত্র ইংরেজি পত্রিকা হাতে অফিসের বারান্দায় বসেছি। হলেণ এসে আমার হাতে একটি ফ্যাক্স ধরিয়ে দিয়ে তার হাইলাইট করা কিছু অংশ পড়তে বলে। ফ্যাক্সটি এসেছে আমাদের সংস্থার হেড অফিস ফিলাডেলফিয়া থেকে। ডেভিড মোহাম্মদ ল্যাজারাস নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান-আমেরিকান ভদ্রলোক ভিয়েনচানে আসছেন ঠিক ঈদের আগের দিন বিকালের ফ্লাইটে। তাঁর জন্য যেন লাওসের স্থানীয় কান্ট্রি অফিস এয়ারপোর্টে ভিসার ব্যবস্থা করে। তা হয়তো করা যাবে, কিন্তু মোহাম্মদ ল্যাজারাস আসছেন কেন? তিনি আদতে কে? এখানে এসে তিনি কী করতে চান? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব ফ্যাক্সে না থাকাতে আমি ব্যাখ্যার জন্য হলেণের দ্বারস্থ হই। তার কামরায় এসে দেখি সে অফিসের ফর্মাল ড্রেস বদলিয়ে জিন্স পরেছে। কী ব্যাপার? চোখে কালো চশমা এঁটে, মাথায় বেইসবল ক্যাপ পরে সে বাইরে যাওয়ার সাজপাড় করছে। আমার কৌতূহলের জবাবে সে নির্লিপ্তভাবে জানায় যে, ফ্যাক্সে হেড অফিস ইচ্ছা করে কোনো ডিটেইলস্ দেয়নি। কারণ মোহাম্মদ ল্যাজারাসের আসল পরিচয় জানাজানি হলে, পরে তা লাও স্টাফদের মাধ্যমে সরকারের কানে গেলে উনি হয়তো ভিসা পাবেন না। হেড অফিস একটু আগে হলেণের সাথে টেলিফোনে কথা বলে বিস্তারিত জানিয়েছে। আদতে ল্যাজারাস সাহেব একটি হিউম্যান রাইটস্ সংস্থার সাথে কাজ করছেন। তিনি ইন্দোচীন ও থাইল্যান্ডসহ এ আত্রাফের কয়েকটি দেশ সফর করবেন। এর মধ্যে লাওসও একটি।
এসব দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবনযাপন কেমন, কোনো নিপীড়ন চলছে কিনা—এ সম্পর্কে তিনি সলিড তথ্য চাচ্ছেন। আমাদের হেড অফিস ফোনে বলে দিয়েছে—তাঁকে যেন সব কিসিমের সহায়তা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে আমি ও হলেণ দ্রুত পরামর্শ করি। লওসের জনসংখ্যার সিংহভাগ বৌদ্ধ হলেও মঙ সমপ্রদায়ের অনেকে ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। দশ থেকে পনেরো বছর আগে ইন্দোচীনের লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় সমপ্রসারিত যুদ্ধে মঙ সম্প্রদায়ের কিছু খ্রিস্টান সদস্য মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীকে মদদ দেয়। এ কারণে বর্তমানে লাওসে গদিনশিন বিপ্লবী কমিউনিস্ট সরকার খ্রিস্ট সমপ্রদায়ের প্রতি খড়্গহস্ত। তাদের গির্জার প্রার্থনানুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মঙ সম্প্রদায়ের বেশকিছু মানুষকে কারাগারেও পোরা হয়েছে। আমাদের সংস্থা তাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কারাগারে কয়েদিদের সাথে যোগাযোগের পারমিশন পাওয়া যায়নি । হলেণ জানায় যে—এসব তথ্য অফিসের ফাইলে আছে। নতুন করে জোগাড় করতে হবে না। তবে যা ফাইলে নেই তা হচ্ছে লাওসে বসবাসকারী সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে কোনো তথ্য। টেলিফোনে তাকে বলা হয়েছে যে, ল্যাজারাস সাহেব মুসলিমদের হাল-হকিকত জানতে বিশেষভাবে আগ্রহী। সুতরাং এ বাবদে তথ্য কালেক্ট করা এখন অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্টের মধ্যে পড়ে।

হলেণ জ্যাকেটের পকেটে ফিল্ডওয়ার্ক করার জন্য ছোট্ট টেপরেকর্ডার ও নোটবুক পুরে প্রস্তুতি নিতে নিতে আমাকে তথ্য সংগ্রহের ব্লুপ্রিন্ট বুঝিয়ে বলে। সে এ বাবদে স্থানীয় কোনো লাও স্টাফকে ইনভলবড্ করতে চাচ্ছে না। সুতরাং, সাথে করে ভাষাগত সহায়তার জন্য কোনো ইন্টারপ্রেটার নেয়া যাচ্ছে না। সে একটি ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁর তালাশ পেয়েছে, তার নাম ‘নাজিম রেস্টুরেন্ট’, লোকেশন অস্ট্রেলিয়ান অ্যামবেসির পাশেই। তার ধারণা ওখানে পৌঁছাতে পারলেই মুসলমানদের সুলুক সন্ধান পাওয়া যাবে। আর মুসলমানদের সাক্ষাত্ পেলে মসজিদ খুঁজে বের করতে তো বিশেষ দেরি হবে না।

ড্রাইভার আমাদের নামিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়ান অ্যামবেসির পাশে। গলিতে সারি দিয়ে দাঁড়ানো অনেকগুলো টুকটুক বা টেম্পো। একটু সামনেই নাজিম রেস্টুরেন্ট। তার বারান্দার এক কোণে মস্ত ফ্রাইপ্যানে ভাজা হচ্ছে মাসালা দোসা। তা থেকে ছড়াচ্ছে আগুনের হল্কা। তবে ভেতরের কামরাটি চালু এয়ারকনে শীতল হয়ে আছে। লাঞ্চের সময় হলেও রেস্তোরাঁয় খদ্দের তেমন নেই। কেবলমাত্র কোণের এক টেবিলে বসে জনা কয়েক তামিল লাচ্ছি খেতে খেতে চুটিয়ে গল্প করছে। আমি তাদের সাথে হাতটাত মিলিয়ে বসে পড়ি। এরা সকলেই শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধের কারণে তামিল এলাকা থেকে উত্খাত হয়ে নানা দেশ ঘুরে লাওসে এসে সাময়িকভাবে বাস করছেন। বাতচিতে সদালাপী, ইংরেজি ভালো বলেন, নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই, যেতেও চান না। সুযোগ খুঁজছেন এরা সকলে তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসী হয়ে চলে যাওয়ার। এদের কারো নাম গণেশা, আবার কারো নাম লছমন। অনুমান করি এরা ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু। এদের কাছ থেকে শ্রীলংকায় মানবাধিকার লংঘন সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। তবে এ মুহূর্তে আমরা খুঁজছি লাওসে বাসরত মুসলিম এবং জানতে চাচ্ছি তাদের হালহকিকত। বিষয়টা তাদের বলতেই মি. গণেশা উঠে গিয়ে কিচেন থেকে ধরে নিয়ে আসেন এক মাঝবয়সী কালোকোলা নাদুস নুদুস ব্যক্তিকে।

তিনি আমাদের ডেকে নিয়ে আলাদা টেবিলে বসান। তাঁর সার্টের আস্তিনে তন্দুরি চিকেনের মশলার লালচে হলুদ দাগ। তবে তাঁর আচার আচরণে কেমন যেন অভিজ্ঞতা ও সফিসটিকেশন মিশে আছে। আমরা গারলিক নানের সাথে চিকেন টিক্কার অর্ডার করে জাঁকিয়ে বসি। খাবার পরিবেশন করতে করতে ভদ্রলোক জানান যে, তাঁর নাম মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, তিনিই রেস্তোরাঁর মালিক। বেশ ভালো ইংরেজি বলেন, হিন্দুস্থানি জবানেও তাঁর দখল আছে। সুতরাং নাজিমুদ্দিনের সাথে কথাবার্তা বলতে কোনো অসুবিধা হয় না। এদেশের মুসলমানদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী শুনে তিনি খুব উত্সাহের সাথে জানান যে, ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে—আজ থেকে আশি নব্বই বা একশ বছর আগে, ভারতের পন্ডিচেরী থেকে তামিল সমপ্রদায়ের মুসলমানরা পয়লা লাওসে আসেন। ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ কলোনি হলেও এর ভেতর পান্ডিচেরী, চন্দন নগর প্রভৃতি স্থান—অনেকটা ছিটমহলের মতো—ছিল ফরাসিদের অধিকারে। তখন তামিল রাওথার গোত্রের কিছু মানুষ ফরাসি কলোনিয়েল সরকারের আনুকূল্যে লাওসে আসেন ব্যবসা ও নিরাপত্তা বিষয়ক চাকরি নিয়ে। তামিলদের আগমনের অনেক বছর পর পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশের কিছু পাশতুন মুসলিম এদেশে এসে থিতু হন। এদের পূর্বপুরুষরা কাজ করতেন ব্রিটিশ আর্মিতে। পোস্টিং ছিল বার্মাতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এরা কীভাবে যেন লাওসে পথঘাট হারিয়ে ঢুকে পড়েন। পরে যোগাযোগ সমস্যার জন্য আর ফিরে যেতে পারেননি ভারতবর্ষে। তো তারাও এদেশে অনেকে বিয়েশাদি করে দোকানপাঠের ব্যবসা জমিয়ে থিতু হন।
মুসলিম জনসংখ্যা সম্পর্কে নাজিমুদ্দিন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেন না। তবে তাঁর ধারণা ১৯৫৪ সালে লাওস যখন ফরাসিদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন এদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৭,০০০ মতো। পরে দেশে বিপ্লবী গৃহযুদ্ধ বাঁধলে বেশির ভাগ মুসলিম ফিরে যান ভারতের পান্ডেচরীতে। বর্তমানে ভিয়েনচানে তামিল মুসলমানদের সংখ্যা ২০০-এর মতো। এদের মধ্যে জনা বিশেক মরদ লাও নারীদের সাথে বিবাহিত হয়েছেন। পাশতুন মুসলমানদের সংখ্যা তাঁর ঠিক জানা নেই। পাসতুনরা মর্নিংমার্কেটে কাপড়ের দোকানদারি করেন। দু-এক জনের কসাইখানা আছে। এদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ওখানে যেতে হবে। এছাড়া ভিয়েনচানে কম্বোডিয়া থেকে অভিবাসি হিসেবে আগত চাম সমপ্রদায়ের কিছু মুসলিম বাস করছেন। তাদের স্বতন্ত্র একটি মসজিদও আছে। নাজিমুদ্দিন চামদের সম্পর্কে তেমন একটা ওয়াকিবহাল নন।
আমরা জানতে চাই মুসলিম সমপ্রদায়ের প্রতি সরকারের আচরণ কী? তিনি এক কথায় জবাব দেন, ‘ভেরি গুড অ্যাকচুয়েলি। লাও নারীদের সাথে কোনো মুসলমানের বিয়েশাদি হলে পারমিশন নিতে হয়। এবং তা চাইলেই পাওয়া যায়। কখনো কোনো অসুবিধা হয় না। ভিয়েনচানের মসজিদে শুক্রবারে জামাতে নামাজ হয়। লাও সরকার কখনো এ নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি করেনি।’
মানুষটি সম্পর্কে আমার তীব্র কৌতূহল তৈরি হয়। জানতে চাই তাঁর শিকড় কোথায়? কীভাবে তিনি এদেশে থিতু হলেন? কোনো দ্বিধা না করেই তিনি

জানান—তাঁর বাবা তামিলনাড়ুর থানজারার ডিসট্রিক্টের মায়ূরাম গ্রামের লোক। তিনি ১৯৪৫ সালে লাওসে আসেন ফরাসি ঔপনিবেশিক সরকারের মদদে। নাজিমুদ্দিনের জন্ম লাওসের ভিয়েনচান শহরে। তাঁর লাও নাম হচ্ছে ‘সামসাক সিভিলেই’। তাঁর বাবা পরে ভিয়েতনামের সায়গন শহরে চলে যান কিছুদিনের জন্য। শুরু করেন ছোটখাটো ব্যবসা, দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন ভিয়েতনামের এক নারীকে। তারপর ওখানে উপনিবেশবাদ বিরোধী লড়াই শুরু হলে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ফিরে যান ভারতে। কৈশোরে নাজিমুদ্দিন তামিলনাড়ুতে ছিলেন বছর কয়েক। কিন্তু ইন্ডিয়ান চালচলনের সাথে ঠিক এডজাস্ট করতে পারেননি। তো ফিরে আসেন লাওসে। সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করেন বছর কয়েক। তামিলনাড়ুর সাথে এখনো যোগাযোগ আছে। তবে ভিয়েনচানের লাও নারীর সাথে চলছে তাঁর সংসার, বড় হচ্ছে সন্তানাদি। তারা লাও ভাষায় কথা বলে, লাও ভাষায় তাদের দ্বিতীয় নামও রাখা হয়েছে। বাচ্চাদের চালচলন লাওসের প্রচলিত কেতা মাফিক। তারপরও তারা বিশ্বাসে মুসলমান। ভিয়েনচানের মসজিদে হুজুরের কাছে কায়দা সিপারা পড়েছে, একটু আধটু নামাজ কালাম শিখেছে। হলেণ ভিয়েনচান মসজিদের ঠিকানা চায়। নাজিমুদ্দিন ওখানে যাওয়ার ঠিকানা ও ডিরেকশন বাতলিয়ে দেন। আমরা নবাগত, ভিয়েনচান শহরের পথঘাট ভালো করে চিনে উঠতে পারিনি। কীভাবে যাব, ডিরেকশনটা ঠিক বুঝতে পারি না।
পাশের টেবিলে বসে কচমচ করে সমোসা খাচ্ছেন থুতনিতে পাতলা দাড়ি ঝুলা ঘোরতর কৃষ্ণ বর্ণের এক ভদ্রলোক। তাঁর সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি হাসেন। তাতে সোনা দিয়ে বাঁধানো দাঁতে ঝিলিক পাড়ে। আমরা মসজিদের ডিরেকশন বুঝতে গলদগর্ম হচ্ছি দেখে তিনি সমোসার তশতরিসহ উঠে এসে আমাদের টেবিলে বসতে বসতে বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লা হি ওয়া বরকাতুহু।’ এ গরমের দিনেও তিনি পুরাদস্তুর স্যুটটাই পরে আছেন। কব্জিতে তাঁর সোনালি রোলেক্স। ডায়েলের দিকে মিরমিরিয়ে চেয়ে আমার সাথে করমর্দন করতে করতে তিনি বলেন, ‘আই অ্যাম মি. মিনহালিল্লা ফ্রম মালোয়েশিয়া।’ সমোসার কুচি লাগা দাঁতে তিনি তাঁর নাম এমনভাবে বলেন যে, হলেণ ঠিক উচ্চারণ ধরতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, ‘মি. ইনহালিল্লা, ভেরি গ্ল্যাড টু মিট ইউ, আর ইউ অ্যা মুসলিম?’ ভদ্রলোক মিঠে করে হেসে বলেন, ‘মাই ডিয়ার ফাইন লেডি, আই অ্যাম এলাইভ, সো ক্যান্ট বি ইনহালিল্লা, ইট ইজ মিনহালিল্লা, ইফ দিস ইজ ডিফিকাল্ট টু প্রোনাইন্স... ইউ মে কল মি মি. মিনমুমিন, আই অ্যাম ফ্রম মালাক্কা, আমার বাড়ি মালাক্কা প্রণালীর একদম পাড় ঘেঁষে।’ একটু দম নিয়ে তিনি নাজিমুদ্দিনকে সবার জন্য মাসালা-চা পরিবেশনের হুকুম জারি করেন। তাঁর কথাবার্তায় এক ধরনের আধিপত্যের সাথে ছড়ায় হাস্যকৌতূকের লাইটহার্টেড আমেজ। তিনি হলেণের দিকে সমোসার তশতরি এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মাই ফাইন লেডি, নাও আই উইল আনসার ইয়োর সেকেন্ড কোয়েশ্চন।’ তিনি এবার দাড়ি মুঠো করে কব্জির রোলেক্সে সোনালি আলো ছলকিয়ে বলেন, ‘ইয়েস, দিস পুওর মি. মিনমুমিন ফ্রম মালাক্কা ইজ অ্যা মুসলিম। আই মাস্ট সে অ্যা ফাইন পাক্কা মুসলিম।’ তিনি একটু পজ নিয়ে আবার বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, ইফ গড উইশেস, আমি আপনাদের নিয়ে ভিয়েনচান মসজিদে যাব। মসজিদ খুঁজে পেতে আপনাদের কোনো তকলিফ হবে না। ডোন্ট ওয়ারি অ্যাট অল, মি. মিনমুমিন ইজ গোয়িং টু হেল্প ইউ। ভিয়েনচান শহরে তামিলদের একটা মসজিদ আছে, আবার কম্বোডিয়ার চাম গোত্রের মুসলমানরা অন্য একটি মসজিদে নামাজ কালাম করেন। আল্লাহ অলমাইটির অশেষ মেহেরবানীতে আমি আপনাদের দুটি মসজিদের লোকেশন দেখিয়ে দেবো।’
ততক্ষণে মাসালা-চা এসে গেছে। তিনি চাপুছি থেকে তিনটি পেয়ালায় তা সাবধানে ঢালেন। এ সুযোগে আমি তাঁকে খুঁটিয়ে অবজার্ভ করি। গাত্রবর্ণে মি.মিনমুমিনকে তামিলদের মতো মনে হলেও তাঁর চোখদুটি চীনাদের মতো ছোট্টমোট্ট ও থুতনি বিগত চওড়া। চা পান করতে করতে মি. মিনমুমিন হলেণের স্কটিশ-ফ্রেঞ্চ হেরিটেজ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিচ্ছেন। তাই মওকা মতো আমিও জানতে চাই তাঁর রুটস্ আদতে কোন দেশের। তিনিও খানিকটা তামিল। তাঁর প্রপিতামহ তামিলনাড়ুর ধর্মপুরী জেলা থেকে গেল শতাব্দীর মাঝামাঝি মাইগ্রেট করেন মালয়েশিয়ার মালাক্কায়। সে আমলে ভারত ও মালয়—দুটি দেশই ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের তাঁবে। তাই যাওয়া আসাতে তেমন কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। মালাক্কাতে কাঠগোলার পত্তন করেন তাঁর পূর্বপুরুষরা। তবে তাঁর পিতামহী চীনা মুসলিম, সে-সূত্রে পরিবারের কেউ কেউ জড়িত জুতার কারবারে। মি. মিনমুমিনের ব্যবসার ব্যাপক অংশ ছড়ানো কম্বোডিয়ায়। ওখানে তিনি জঙ্গলে পাইকারি হারে কাঠ কাটান, তা জাহাজে তুলে দরিয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে যান মালাক্কায়। লাওসেও ব্যবসা তিনি গড়ে তুলছেন। তবে এদেশে তিনি গাছ কাটেনও না, অন্য কেউ কাটলে তা কেনেনও না, এখানে তিনি ট্রিফার্ম করছেন। তাঁর গাছের খামারে তরুগুলো কেবলমাত্র বড় হচ্ছে। তাঁর বাণিজ্যের গল্প শুনে আমি বলি—বিষয়টা নদীর এপাড় ভাঙা ওপাড় গড়ার মতো শোনাচ্ছে হে। আমার তীর্যক মন্তব্য অত্যন্ত লাইটহার্টেডভাবে নিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে একটা সুবিধা আছে, দু’পাড় কিন্তু কখনো একসাথে ভাঙে না। কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক সয়লাবে বাণিজ্য ডুবতে বসলে, লাওসে তা তেজি হতেও পারে।’
কথা বলতে বলতে মি. মিনমুমিন আবার রোলেক্সের দিকে তাকান। আমাদেরও উঠতে হয়। লাঞ্চের পর ফিরে যেতে হয় অফিসে। তাঁরও কাজের তাড়া আছে। তিনি আমাদের তামিল মসজিদটি দেখিয়ে দিতে পারেন, তবে আজকে সময় হবে না চাম গোত্রের মসজিদটি দেখানোর। মনে হয় আজকে দু পক্ষেরই ব্যস্ততা, তাই কথা হয় দুদিন পর ভিয়েনচান শহরের সেন্ট্রাল লোকেশন নামফু’র ফোয়ারার কাছে লাঞ্চের বিরতিতে আমরা তাঁর সাথে দেখা করব। তখন তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন পরপর দুটি মসজিদে।

চার
পরদিন অফিসে লাঞ্চের বিরতির আগেই হলেণ প্রস্তুতি নেয় বাইরে বেরোনোর। সে সংস্থার লাও ড্রাইভারকে সাথে নিতে চায় না। আগের কো-কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভরা ব্যক্তিগত কাজে একটি পুরোনো চিরোকি ল্যান্ডক্রজার ব্যবহার করতেন। গাড়িখানা শক্তপোক্ত, তবে চেচিসে জং ধরা এবং স্টার্ট নিতে বেশ সময় নেয়। তা চালিয়ে এসে অফিস থেকে খানিক দূরে ধানক্ষেতের পাশে লালে লাল হওয়া কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সে দাঁড় করায়। বৃক্ষটির বর্ণবহুলতা এমনই আকর্ষণীয় যে আমরা গাড়ি থেকে নেমে তার ছায়ায় একটু দাঁড়াই। মৃদু হাওয়ায় গাছ থেকে ঝরে পড়ছে ফুলের ডগমগে লাল
পাপড়ি। আশেপাশে অফিসের কোনো লাও স্টাফ নেই, তাই মন খুলে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। সকালে আমাদের হাতে কিছু নতুন তথ্য এসেছে, তা আমরা রিভিউ করি।
মি. সমবাত সম্পন বলে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক লাও ভদ্রলোক আমাদের সংস্থার কাছ থেকে ফান্ড নিয়ে কৃষি উন্নয়নের ওপর একটি প্রকল্প চালাচ্ছেন। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর প্রকল্প বন্ধ করার নির্দেশের সাথে অফিস থেকে ফাইলপত্র, কম্পিউটার, কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও কীটনাশক সব হুকুম-দখল করে নিয়ে গেছে। মি. সম্পন গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে কুটুমখেশদের বাড়িতে গা ঢাকা দিয়ে আছেন।
এছাড়া কমরেড তান উতাকির বিষয়ও আমাদের উদ্বিগ্ন করে খুব। তান উতাকির সাথে আমাদের কোনো পরিচয় নেই, তাঁর সাথে আমাদের সংস্থার কাজেরও কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি আদতে লাও কমিউনিস্ট পার্টি প্যাটেট লাও-এর ওপরের মহলের লোক। মাসখানেক আগে পার্টির প্লেনামে তিনি লাওসে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার সংক্রান্ত বিধিনিষেধ সংস্কারের প্রস্তাব করেন। পরদিন তাঁকে গ্রেফতার করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হুয়াপান প্রদেশের এক রিমোট পর্বতের গুহায়। গুহাটি বিপ্লবী আমলে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার কমান্ড কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহূত হতো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বর্তমানে কেইভটি ব্যবহূত হচ্ছে পার্টির রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাবলম্বীদের চরিত্র সংশোধনের শিবির হিসেবে।

তান উতাকির স্ত্রী মাদাম উতাকি পেশায় ডাক্তার। তিনি ভিয়েনচানে জেন্ডার বিষয়ক প্রশিক্ষণে কনসালটেন্সিও করে থাকেন। বেইজিংয়ে জেন্ডার বিষয়ে সচেতনতার ওপর আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল একটি সম্মেলন হতে যাচ্ছে। ভিয়েনচান থেকে ওয়োমেন্স রাইটস জাতীয় তত্পরতায় লিপ্ত লাও নারীদের একটি গ্রুপ কয়েক দিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে বেইজিং সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। লাও ডেলিগেশনের লিডার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মাদাম উতাকি। আমাদের সংস্থা পুরো ট্রিপ ফান্ড করছে। দুদিন আগে মাদাম উতাকিসহ তাবত্ নারী ডেলিগেটদের জন্য এরোপ্লেনের টিকিট ফিকিট কেনা হয়েছে। পুরা বিষয়ের দ্বায়িত্বে আছে হলেণ। আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাকে জানানো হয়েছে যে মাদাম উতাকির লিডারশিপ রোল খারিজ করা হলো। একই সাথে তাঁর দেশের বাইরে যাওয়ার পারমিশনও বাতিল করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিপন্ন হলেণ আজ সকালে মাদাম উতাকির বাসায় গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করে। বেইজিং সফর বাতিল হওয়াতে মহিলা অবাক হন না একেবারে।
দুদিন আগে তিনি হুয়াপান প্রদেশের কেইভে গিয়েছিলেন স্বামীর সাথে দেখা করতে। তান উতাকিকে গুহায় চেন দিনে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁর হাতের কব্জিতে শিকল কেটে বসে যাচ্ছে। ডেঙ্গুজ্বরে তিনি তীব্রভাবে কাঁপছেন। তাঁর গাঁটে গাঁটে প্রদাহজনিত প্রচণ্ড ব্যথা। স্ত্রীকে চিনতে পারেন, তবে জ্বরের ঘোরে ভালো করে কথা বলতে পারেন না।
কৃষ্ণচূড়ার ডালপালায় হলুদ বর্ণের কিছু ছোট্ট পাখি খানিক উড়ে পাখা ঝটপটিয়ে কী যেন খুঁটছে। হলেণ গাছের তলা থেকে ঝরা পাপড়ি কুড়াতে কুড়াতে চাঁপাস্বরে কথা বলছে। লাঞ্চের পর এ তথ্যগুলো গুছিয়ে আমি লিখে ফেলতে পারব। কম্পিউটারে সেইভ না করে প্রিন্টআউট নেয়া যাবে। বিষয়টি হেডঅফিসে জানানো দরকার। ফ্যাক্সে এসব বিস্তারিত লেখা যাবে না। ফ্যাক্স ইন্টারসেপ্ট হলে সংস্থা সমস্যায় পড়বে। ডেভিড মোহাম্মদ ল্যাজারাসের মাধ্যমে এ রিপোর্ট হাতে হাতেও পাঠানো যায়। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যেতে পারে। তবে মেকং নদী অতিক্রম করে থাইল্যান্ডের নংকাই থেকে ফ্যাক্স পাঠানো যায়। কিন্তু আমার থাই ভিসা পেতে সময় লাগবে। হলেণ ওপারে একা যেতে চায় না। আমরা আরেকটি অপশন নিয়ে পরামর্শ করি। আমাদের সংস্থায় নিউজিল্যান্ডের যে বয়স্ক ভলানটিয়ার কাজ করছেন, তাকে ওপারে পাঠানো যায় ফ্যাক্স করার জন্য।
এক থোকা ডগমগে লাল পাপড়ি গোছা বেঁধে হলেণ আবার ড্রাইভিং সিটে বসে। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে সে আরেকটি তথ্য ফাঁস করে। আমাদের কুঠিতে বেবিসিটার ও কুক হিসেবে কাজ করছে যে দুই লাও নারী তাদেরকে মূলত রিক্রুট করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের নির্দেশে তারা—অনেকটা ডেপুটেশনের মতো, কাজ করছে আমাদের কুঠিতে। সুতরাং তাদের বেতনভাতা দিতে হবে সরকারের নির্ধারিত পে-স্কেল মোতাবেক। হলেণ আজ সকালে বেতনভাতার ফাইল দেখতে গিয়ে এ তথ্য আবিষ্কার করেছে। সরকারি পে-স্কেলে তাদের বেতন দেওয়া কোনো সমস্যা না, তবে এরা কি আমাদের ব্যক্তিগত চালচলনের ওপর নজরদারি করে মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করবে! মাত্র এ দেশে কাজ করতে এসেছি, এখনই সরকারের সাথে সম্পর্ক খারাপ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমরা ভিয়েনচানের ডাইক রোডে চিরোকি ল্যাান্ডক্রুজার হাঁকাতে হাঁকাতে কীভাবে আরো সাবধান হওয়া যায় তার ফিকির খুঁজি।
মানচিত্র দেখে হলেণ নিখুঁতভাবে ড্রাইভ করে চলে আসে মর্নিং মার্কেটের কাছে। পার্ক করতে করতে সে বলে, ‘দ্যা ফ্লেমিংরেড ট্রি ইজ সো প্রিটি, ব্রাইট অ্যান্ড কালারফুল। আই হ্যাভ নেভার সিন সামথিং লাইক দিস।’ সত্যিই কৃষ্ণচূড়ার গাছটি অত্যন্ত উজ্জ্বল। এ রকম সুদর্শন রং ঝলসানো গাছ সচরাচর দেখা যায় না। আমি তার তলায় একটু আগে অল্প সময় যুগলে দাঁড়ানোর কথা ভাবি। চোখের ওপর দিয়ে যেন উড়ে যায় নরোম পাপড়িতে বোনা পশমিনার একটি তীব্র লোহিত চাদর। আমরা মর্নিং মার্কেটের দিকে ধীরে ধীরে হাঁটি। আর বৃক্ষের রংদার আবহও চলে আমাদের সাথে সাথে। তার নিচে কালো জলছাপের মতো ভাসে আবছা একটি মুখ। মানুষটির সাথে আমাদের কোনো পরিচয় নেই। কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখি তাঁর জ্বরতপ্ত মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কাঁপতে কাঁপতে তীব্র ডিলিরিয়ামের ভেতর তিনি পাথরে ঝাঁকি মেরে খুলে ফেলতে চাচ্ছেন লোহার শিকল। চাতালে বাড়ি লেগে তাতে শব্দ হয়। তাতে বিরক্ত হয়ে গুহার ছাদে ঝুলে থাকা ক’টি বাদুড় অস্থিরভাবে পাখা ঝাপটায়।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৪
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :