The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

কাব্যজীবনী

কবিতার জীবন

মহাদেব সাহা

আমি জন্মেছিলাম এক অসম্পূর্ণ মানুষ, সবার মতো নয়, জন্মেই আমি যেন কোথাও উড়াল দেওয়ার জন্য তৈরি। মহাভারতের কবি ব্যাসদেব জন্মেই গৃহত্যাগ করেছিলেন; কিন্তু সে খানিকটা পুরাণকাহিনির মতো, ঠিক ইতিহাস নয়, আবার ইতহাসও। হয়তো ব্যাসদেবের মতো মহত্তম কবির জন্মের সাথে যুক্ত হয়েছিল এই মিথ। আমি কোনো মিথবালক নই, বিস্ময়-বালকও নই, খুব সাধারণ শিশুদের মতো, জন্মেই যে কাঁদে, আপনজনদের জড়িয়ে ধরতে চায়। শুনেছি আমিও খুব কেঁদেছিলাম, কিন্তু কিছুই নাকি জড়িয়ে ধরতে চাইনি। অবিরল ধারার বৃষ্টির সঙ্গে আমিও কেঁদেছিলাম। কেন এত কেঁদেছিলাম আমি, সে কি এ কারণে যে সারা জীবন আমাকে কাঁদতে হবে? শিশুর জন্মের পর একুশ দিন তার চোখে জল থাকে না, কিন্তু আমি বোধ হয় চোখে জল নিয়েই জন্মেছিলাম। অশ্রু প্রায় আমার জন্মগত, এ কীভাবে সম্ভব আমি ভেবে পাই না। তবে বিশ্বাস করি আমি চোখে জল নিয়েই বুঝি জন্মেছিলাম, সজল চোখ, জল না ঝরলেও দুচোখভরা ছিল অবারিত অশ্রু। এই রহস্যের ব্যাখ্যা আমি জানি না। শুনেছি আমার পরিবার-পরিজনদের মুখে। সেদিন ছিল শনিবার, শ্রাবণ মাসের বিশ তারিখ, পাঁচ আগস্ট; আকাশ প্লাবিত মেঘ-বৃষ্টি, অবিরাম ধারায় বর্ষণ। সেই আকাশ উপচানো বর্ষণের মধ্যে সন্ধ্যায় আমার জন্ম। উতাল-পাথাল বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া, অন্ধকার, গ্রামের সেই ঘনঘোর বাদল সন্ধ্যায় আমি জন্মেছিলাম। পিতামাতার একমাত্র সন্তান আমি। আমার বাবা আঁতুড়ঘরে আমার জন্মের আয়োজন করেননি, অন্য একটি ঘরকে রূপান্তরিত করেছিলেন আমার জন্মঘর রূপে। এত নিখুঁত আয়োজনের মধ্যে যে শিশুর জন্ম, যাকে নিয়ে এত আশা, এত উল্লাস, সেই আমি তার কিছুই পূরণ করতে পারিনি। শুধুই হারিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট করে বড়ো হয়েছি। আমি শুধুই ভেঙেছি, কত কী যে ভেঙেছি, পেনসিল, কলম, খেলনা, আসবাব, কত বই-খাতা যে হারিয়েছি, হারাতে হারাতে ভাঙতে ভাঙতে শৈশব-কৈশোর পার

করেছি আমি, এক অখণ্ড স্বাধীনতার মধ্যে বড়ো হয়েছি আমি, অবাধ স্বাধীনতা, এত আপন ইচ্ছার অনুকূল পরিবেশ, আমি যা চেয়েছি তা-ই পেয়েছি, যা ভেবেছি তা-ই করেছি। নিষেধ বারণ আমার জীবনে প্রায় ছিলই না, আমার শৈশব কেটেছে এক সীমাহীন স্বাধীন জীবনের মধ্যে, কোনো বাধা নেই, বন্ধন নেই, নিষেধ নেই। ভাঙো, ফেলো, হারাও কিছু আসে যায় না। আমি খেলতে গিয়ে কতবার যে জুতো হারিয়ে এসেছি, ব্যাডমিনটন কিংবা ভলিবল খেলতে গিয়ে শীতের দিনে গায়ের চাদর ফেলে এসেছি খেলার মাঠে। তা নিয়ে বকুনি গালমন্দ কিছুই শুনতে হয়নি আমাকে। এভাবে বেড়ে ওঠা ছেলের বখে যাওয়াই স্বাভাবিক, বখেই হয়তো গেছি আমি, মানুষ তো হইনি। আমার যা হওয়ার সেই তো আমাকে হতে হবে, যা হওয়ার ছিল, যে অফুরন্ত সুযোগ আর অনুকূল পরিবেশ পেয়েছিলাম তার কিছুই আমি কাজে লাগাতে পারিনি। আমি কিছু অসংলগ্ন অস্বাভাবিক বালকের মতো বড়ো হতে থাকি। খেলার মাঠে গিয়ে যে একা হয়ে যায়, স্কুলে যাওয়ার পথে গাছের তলায় বসে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়, কোলাহল উত্সব আয়োজনের মধ্যে যে ঘরের কোণে একা বসে থাকে, প্রায় কোনো কিছুতেই যার মন বসে না, ঘুরে বেড়ায় ধু-ধু প্রান্তরে, খোলা মাঠে, ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে যে গ্রামের পর গ্রাম ছেড়ে চলে যায়, বর্ষা নদী বৃষ্টি যার আপন হয়ে ওঠে, গাছ ফুল পাখি যার বন্ধু হয়ে ওঠে, গাভীর সজল চোখের দিকে তাকিয়ে যে সকাল-দুপুর কাটিয়ে দেয়, কোনো দূর বিলে নির্জনতার মধ্যে মাছ ধরতে বড়শি ফেলে সারাদিন যে বসে থাকে; নদী, নৌকা, নৌকার মাঝি, মাঝিদের গান, গভীর রাতে গরুর গাড়ির চাকার শব্দ, রাখালের বাঁশি, হাটের গমগম শব্দ, কুমোরের চাক ঘুরিয়ে সরা, পাতিল, কলস বানানো, মাটি ছেনে প্রতিমা গড়া, এই সব কিছুর মধ্যে যে প্রায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে তাকে বোধ হয় ঠিক স্বাভাবিক মানুষ বলা যায় না, একেবারেই না, এক অসম্পূর্ণ, অসংলগ্ন মানুষ।
আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি নদী, খুব বড়ো নয়, কিন্তু বর্ষায় দুকূল ছাপিয়ে সাগরের মতোই তো হয়ে যায়। এই নদীর নাম ফুলজোড়। এই নদীর নাম রাখতে গিয়ে কার জোড়া ফুলের কথা মনে এসেছিল, আমি জানি না। নদীর নাম শুনে মন ভরে যায়, সেও নিশ্চয় কবিই ছিল, না হলে এমন নাম তার কীভাবে মনে আসলো। এই নদীটি চলে গেছে আমাদের বাড়ির কূল ঘেঁষে, শুধু কূল ঘেঁষে চলে গেছে তা-ই নয়, সে আমাদের বাড়ির আমাদের বাস্তভিটার আমাদের বাগানের বহু অংশ গ্রাসও করেছে। এই নদীতে ভাঙতে ভাঙতে আমাদের বাড়ির কত জায়গা যে হারিয়ে গেছে, কিন্তু তা নিয়ে আমাদের বাড়ির কেউ কোনো দুঃখ করেনি। তার পরেও এই নদীটিই ছিল তাদের খুব আপন, আমরা বলতাম আমাদের নদী, আমাদের নিজের নদী। এই নদীর একটি অংশ জুড়ে পাকা ঘাট করেছিলেন আমার পিতামহ। পরে নদী তা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের বাড়ির পাশের পুকুরটি পর্যন্ত এসে নদী তার আধিপত্য বিস্তার করে; তবু এই নদীই ছিল বোধ হয় আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কত সন্ধ্যা কত রাত কত জ্যোত্স্না আমি নদীর বুকে নৌকায় শুয়ে বসে অনুভব করেছি, চোখ বুজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মগ্ন হয়ে থেকেছি নদীর দিকে, নদীর শব্দ আমি গেঁথে নিয়েছি আমার বুকের মধ্যে, নদীতে খলবল করে লাফিয়ে পড়তে দেখেছি মাছ, ডুবসাঁতার দিতে দেখেছি শিশুকদের, একবার ওঠে, জল নাচিয়ে আবার ডুবে যায়। গাছের ডালে নদী রাঙিয়ে বসে থাকতে দেখেছি মাছরাঙা পাখিকে, সাদা বকগুলি উড়ে এসে পড়েছে নদীর কূলে, নদীর পাড়ে গর্ত করে বাসা বেঁধেছে গাঙময়না, পাখিদের সে এক বিচিত্র ঘরবাড়ি। ঘাস, লতাপাতা, গঙ্গাফড়িং, শিশির, ঘাসফুল তারা সবাই ছিল আমার সঙ্গী। বর্ষাকালে এই নদী দিয়ে চলত গহনার নৌকো গ্রাম থেকে গঞ্জে শহরে। ঢেঁড়া পিটিয়ে যাত্রী তুলত গহনার নায়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সুর করে গাইতো—‘গয়নার নাও, গয়নার নাও, পান খেয়ে যাও/ ঘরে আছে নতুন বউ তুলে নিয়ে যাও।’ খুলনা, যশোর অঞ্চল থেকে নারকেল বোঝাই বড়ো বড়ো নৌকো আসত আমাদের এই নদী দিয়ে, সেই নায়ে একটি দুটি তিনটি পর্যন্ত বাদাম। আমার খুব ইচ্ছে করত এই নৌকার মাঝি হই, নৌকার হাল ধরা ছিল আমার খুব সখের। নৌকায় আমি দিন কাটাতাম একা একা। সবাই খুব অবাক হয়ে যেত, নদী আর নৌকো নিয়ে ছেলেটির এত মাতামাতি কেন? আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না, কেন নদী-নৌকো বৃষ্টি-মেঘ, জ্যোত্স্না রাত, দূরের বাঁশি, জলের কলশব্দ, উথাল পাথাল ঢেউ আমার এত প্রিয় ছিল। কী দেখেছিলাম আমি নদীর জলে, কী শুনেছিলাম আমি নদীর কলধ্বনিতে? সে ছিল বুঝি আমার জন্ম-জন্মান্তরের ভালোবাসা, আমার জন্ম-জন্মান্তরের আবেগ। এই জলের শব্দে, এই জলের নৈঃশব্দ্যে, এই আকাশের ধ্বনিতে, বাতাসের গুঞ্জনে, পাখির কলকাকলিতে, শিশিরের ঝরে পড়ার শব্দে, মৌমাছির গুঞ্জনে, আকাশ-বাতাস সন্ধ্যা-দুপুরের নিস্তব্ধতায় আমি এক আশ্চর্য স্বপ্নজগতের মধ্যে মিশে গিয়েছিলাম। এর বেশি আর কিছুই আমি বলতে পারব না। পূর্ণিমার রাতে আমি ছিলাম প্রায় স্বপ্নে পাওয়া অবুঝ কিশোর। এই ঘোরের মধ্যে এক আচ্ছন্নতার মধ্যে কখন যে আমি কোথায় চলে গেছি, আমাকে সারাবেলা খুঁজেছে বাড়ির লোকেরা, আমাকে কোলে পিঠে করে রাখত যে মধুদা, মধু বৈরাগী, আমাকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে যেত। তার গলার স্বর এখনো আমার কানে ভাসে, ‘দাদা, তুমি কোথায়?’ আমাকে পেয়ে কোলে তুলে নিয়ে, কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে কেঁদেই ফেলত বেচারা, ‘দাদা, তুমি কী যে করো, কোথায় যে যাও, মা কেঁদে আকুল, তোমার কি কিছুই মনে পড়ে না?’ কাঁদতে কাঁদতে হাসতে হাসতে আমাকে কাঁধে নিয়েই গান ধরত মধুদা—‘বিয়া না করালে দাদা আসাম যাবো গা/ আসাম গিয়া করবো বাড়ি/ বিয়া করবো সুন্দর নারী/ দাদা, দেশে আসবো না, দাদা, দেশে আসবো না।’ গান করতে করতে হো হো করে হাসত মধুদা, কেঁদেও ফেলত, ‘দাদা, তখন তুমি কী করবে?’ সেই মধু বৈরাগী কোথায় হারিয়ে গেল। আমি কবিতাও লিখেছি সেই মধু বৈরাগীকে নিয়ে। মধুদা আমার খুব প্রিয় ছিল, এত ভালোবাসা আর কোথাও পাব না, চোখ ভিজে ওঠে। রাখাল দা-ও এমনি করে আমাকে কোলে নিয়ে নেচে বেড়াত। আমাকে বসিয়ে রেখেও সে দুহাত তুলে নাচত, কীর্তন করত—‘যন্ত্র যদি পড়ে থাকে লক্ষজনার মাঝে/ যন্ত্রিক বিহনে যন্ত্র কেমনে বা বাজে/ বাজে না, বাজে না।’ নৌকায় আমি সঙ্গী হতাম সেকেন্দার চাচা আর আবেদ চাচার সঙ্গে। বর্ষার নদীতে বিলে নৌকার মাঝখানে বসিয়ে একজন আমাকে ধরে রাখত, অন্যজন নৌকা বাইত। কিন্তু কার সাধ্য আমাকে ধরে রাখে, আমি লাফিয়ে উঠে সেকেন্দার চাচার কাছ থেকে বৈঠা নিয়ে নিতাম, আমিই বাইব নৌকা। নৌকা বাইতে আমার কী যে আনন্দ হতো। মনে হতো এই নৌকা নিয়ে আমি গ্রাম ছাড়িয়ে দেশ ছাড়িয়ে পৃথিবী ছাড়িয়ে হয়তো কোথাও চলে যাব। জল থেকে জলে নদী থেকে নদীতে সগর থেকে মহাসাগরে, না তা তো আর হলো না, আটকা পড়ে গেলাম, মুক্তি বড়ো কঠিন, সে পারেন ব্যাসদেব, পারেন গৌতম বুদ্ধ, পারেন শ্রীচৈতন্য। আমি কে, আমি কী পারি? যে

জীবনের সন্ধান করেছিলাম আমি, সে জীবন খুঁজে পাইনি, এক অর্থে কেউই হয়তো পায় না।
আমাদের বাড়ির লাগোয়া পুব দিকে আমাদের জারুল গাছের বাগান, জারুলবীথির পেছনে বাঁশঝাড়। এই জারুল গাছে ফুল ফুটে রাঙিয়ে দিত আমাদের বাড়ির পুব পাশটা, পাশের রাস্তাটা, যেন মাথার ওপরের আকাশটাও, আমি মোহিত হয়ে যেতাম। এই ফুলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হয়তো তার অফুরান গন্ধে আমি ঘুমিয়ে যেতাম, জেগে উঠতাম। কত আলো-আঁধারীর খেলা দেখেছি এই বাঁশবাগানের মধ্যে, এই জারুলবীথিতে, ভোর হতে দেখেছি পুবের আকাশে সোনার থালার মতো সূর্য, সেই জারুল গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা ভোরের সূর্যটা এখনো আমার চোখ জুড়ে আছে। এত বড়ো সূর্য আমি আর কখনো দেখিনি, আর দেখা হলো না। এ যেন আমার জীবনের প্রথম সূর্য, প্রথম ভোরের আলো, প্রথম পৃথিবীর আলো, প্রথম কবিতা। এই জারুল আর বাঁশবাগানের মধ্যে জ্যোত্স্নার সেই লুটোপুটি চাঁদের সেই উদ্দাম তরঙ্গরাশি আমি কী করে ভুলে যাই? চোখ বুজলেই দেখতে পাই আমি, জেগে থেকেও স্বপ্ন হয়ে ওঠে এই সব চিত্র-বিচিত্র দৃশ্যরাজি, এইসব গাছ, বাঁশবন, ভোর, শিশির, জ্যোত্স্না, আকাশ; এইসব কোলাহল, নদীর কলস্বর, গাভীর হাম্বারব, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, মাটির সৌরভ, সান্ধ্যপ্রদীপের আলো, তুলসীমঞ্চ এখনো আমার মন জুড়ে আছে। সেইসব ছায়া সেইসব আলো সেইসব গন্ধ সেইসব মাধুর্য মাতৃস্নেহ আর জন্মগ্রামের সেই আপনজনদের ভালোবাসার মধ্যে এখনো আমি বেঁচে আছি। আমি নিঃশ্বাসে তাদের গন্ধ পাই, তাদের শরীরের মিষ্টি গন্ধ, আহা ধুলোমাটির সেই ঘ্রাণ, হাটের মিঠাই, সবজি বাগানের তাজা গন্ধ ভুলতে পারি না আমি। না না ঠিক বললাম না, ভুলে তো গেছিও, না গেলে কেন সেই নদী সেই বিল সেই মাঠ সেই খোলা আকাশ সেই হাটখোলা সেই দিঘি ছেড়ে এলাম, কীভাবে ভুলে গেলাম আমি, সেই জারুল গাছকে জড়িয়ে ধরে থাকতে পারলাম না তো, দুপুর বেলার সেই ঘুঘুর ডাক ফেলে এলাম, দুই হাত ভরা জোনাকির আলো ফেলে এলাম, কাঁচামাটির পথ ফেলে এলাম, পাতার ঘোমটা পরা বাড়ি ফেলে এলাম, নৌকা ফেলে এলাম, নদী ফেলে এলাম, খেয়াঘাট ফেলে এলাম, বাঁশি ফেলে এলাম, যাত্রা গানের আসর ফেলে এলাম, ঢোলের বাদ্য ফেলে এলাম, মৃত্পাত্রের সেই শিল্পগুলো ফেলে এলাম; কত যে ভালোবাসা ফেলে এলাম, কত যে পিছুটান ফেলে এলাম, কত কাজলা দিদি ফেলে এলাম, আমার নিতুদিকে ফেলে এলাম, আমার ভাই ফেলে এলাম, আমার আপনজনদের ফেলে এলাম। এই অকৃতজ্ঞতার বুঝি ক্ষমা নেই। কোথায় পাব তাকে? সেই শৈশব সেই কৈশোর সেই ধুলোমাটির পথ, সোঁদা গন্ধ, হাজামজা পুকুর, অথৈ বিল? না এর কিছুই আর পাওয়া যাবে না, আমাকেও আর পাওয়া যাবে না। এ শুধু নিরর্থক চেষ্টা, নিজেকে ফিরে দেখার, নিজের কথা বলার। বলা যাবে না, বলা সম্ভব নয়। এর সব গান সুর ছবি কোন অদৃশ্যলোকে নৈঃশব্দ্যের মধ্যে কোন সুদূর স্বপ্নের মধ্যে হাহাকারের মধ্যে অশ্রুর মধ্যে মিশে গেছে, আমি তার কতটা বলতে পারি? উদ্ধার করা যাবে না সেই নক্ষত্র, সেই মেঘ, সেই জলধারা, সেই উত্স।

দুই
আমার ঠিক জীবনকাহিনি নেই, সবটাই এলোমেলো ওলটপালট, বালক বয়সে মানুষ যেমন হয় আমি ঠিক তেমন নই, কিশোর বয়সেই আধা বৃদ্ধের মতো, কিন্তু আমাকে নিয়ে বাড়িতে পাড়ায় প্রতিবেশীদের মধ্যে অকারণ একটা আশার ভাব, একধরনের মিথ্যা গর্বও; না, আমি এমন কিছু নই, আগেই বলেছি, বিস্ময়বালক বা প্রডিজি এসব কিছু আমি নই, কিছুটা পাগলাটে উদ্ভট এলোমেলো, যখন যা মনে হয় তা-ই করি। এ বড়ো ঝুঁকির জীবন, এই ঝুঁকি আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি। আমার কাঁধের ওপর দৈত্যের মতো ভর করে আছে এই ঝুঁকি। সে যা-ই হোক, আমার জ্যেঠতুতো বোন নিতুদির সাথে পেছনে পেছনে ওর হাত ধরে ওদেরই ইস্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। বয়স তখন খুবই কম। এই বয়সে কোনো গ্রামের ছেলে স্কুলে যায় না, কিন্তু আমার সবই এমন অস্বাভাবিক, আমার আবদার আর জেদ কে থামায়, আমি এই বয়সে স্কুলে যাবই, সেই মেয়েদের স্কুল কালীতলা বালিকা বিদ্যালয়েই। আমি নিতুদির খুব নেওটা, আমার ছয়-সাত বছরের বড়ো ও, আমাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে, ভাই বলতে অজ্ঞান, মাটিতে নামলে পিঁপড়েয় খাবে এমন অবস্থা। ও আমাকে ফেলে স্কুলে যেতে পারে না। আমিও স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। হেডমাস্টার মণীন্দ্রবাবু মেনেও নিলেন আমাকে। হয়তো বাবা-কাকাদের কিছুটা সামাজিক প্রভাবের জন্যেই, আমার পিতামহের সময়েই ঈশান বাবুর বাগানবাড়িতে মেয়েদের একটা স্কুল হয়েছিল। নদীতে এই বাগানবাড়ি ভেঙে যায়। তখন এই স্কুল চলে যায় কালীতলায়। একেবারেই ছোট বয়সে আমি স্কুলে যাতায়াত শুরু করলাম, ঠিক পড়তে নয়, দেখতে বেড়াতে, কৌতূহল, অনেকটাই ছেলেখেলার মতো। আমার গোটা জীবনটাই আসলে তা-ই, একেবারেই ছেলেখেলা, তামাশা।
আমাদের বাড়িতে এলো নতুন র্যালে সাইকেল, আমার দাদা, জ্যেঠতুতো বড়ো ভাই, কলকাতা থেকে একেবারে ঝকঝকে নতুন সাইকেল নিয়ে এলো। গ্রামে এই প্রথম সাইকেল, তখন সাইকেল হচ্ছে—র্যালে সাইকেল, হারকিউলিক্স, ফিলিপ্স; সারা গ্রামে কী উত্তেজনা, সাইকেল দেখতে কী ভিড়। শুধু সাইকেল নয়, সঙ্গে নিয়ে এলো হিজ মাস্টার্স ভয়েস কোম্পানির গ্রামোফোন। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে রেকর্ড চালাতে হয়, সেখানে কুকুরের ছবি, হিজ মাস্টার্স ভয়েসের প্রতীকচিহ্ন। সারা গ্রামের মানুষ এসে গ্রামোফোনে গান শোনে। ছোটবেলা থেকেই আমারও গান শোনা শুরু হলো। কলকাতা থেকে আরো আসে ব্রেসলেট ও সেনগুপ্তের ধুতি, ডি এন বোসের গেঞ্জি, লিলি বিস্কুট, গুপ্তপ্রেস, পিএম বাগচীর পঞ্জিকা। ঢোল কোম্পানির মলমও আসে। এইসব নানা কিছু দেখতে দেখতে আমি বড়ো হচ্ছিলাম। এর সঙ্গে ছিল আমার মায়ের প্রায় প্রতিদিন অদ্ভুত সুরেলা গলায় রামায়ণ-মহাভারত পাঠ। আমাদের বাগানবাড়ির কিছুটা অংশ জুড়ে কখনো সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির উঠোনে বা কখনো বারান্দায় প্রদীপ জ্বালিয়ে এই রামায়ণ-মহাভারত পাঠ চলত। পয়ার আর ত্রিপদী ছন্দটা এভাবেই আমার মনে গেঁথে যায়। মা’র সাথে সাথে আমিও রামায়ণ-মহাভারত পড়া শুরু করি—‘রামের জনম শুনি/ নাচেন সকল মুনি/ দণ্ড কমণ্ডলু করি হাতে/ স্বর্গে নাচে স্বর্গজন/ মর্ত্যে নাচে মর্ত্যজন/ হরিষে নাচিছে দশরথে’ কিংবা ‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান/ কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান’। পয়ার, ত্রিপদী, উপাখ্যান আর পুরাণকাহিনির মধ্যে ডুবে গেলাম, রাম-রাবণের যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, ভীম, ভীষ্ম, অর্জুনের বীরত্বগাথা, কুন্তীর মহত্ত্ব, অপার লাঞ্ছনা ও নির্যাতন ভোগ করে দ্রৌপদীর অসামান্য ত্যাগ ও সাধনা আমাকে প্রায় মোহিত করে ফেলে। সপ্তরথী মিলে অন্যায় যুদ্ধে কিশোর অভিমন্যুকে হত্যা বড়ো ব্যাতিত করে আমাকে। সীতা আর দ্রৌপদী হয়ে ওঠে আমার কাছে আদর্শ নারীর প্রতিমূর্তি, মানুষ হয়েও যেন দেবী। দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা থেকে নারীদের মুক্তি হলো কোথায়, এভাবে বা সেভাবে এখনো তো দেশে দেশে সমাজে সমাজে নারীরা বলদর্পী পুরুষদের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার। সীতা আর দ্রৌপদীই বোধ হয় প্রথম প্রতিবাদ।
সেই ১৯৪৪ সাল, পৃথিবীজোড়া দুঃসময়, আমার জন্মের সেই সময়টা খুব ভালো সময় নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। মাত্র তিন বছর আগে পৃথিবী হারিয়েছে তার প্রিয়তম কবি রবীন্দ্রনাথকে। পৃথিবীর জন্য এ সত্যিই বড়ো দুঃসময়। জাপানি বোমার আতঙ্ক, ঝাঁকে ঝাঁকে বোমারু বিমান উড়ছে আকাশে, জাপানি সেনা প্রায় বার্মা পর্যন্ত এসে গেছে, ব্রিটিশ ভারতের সেই দুর্দিনে জন্মেছিলাম আমি। সবার মধ্যে চাপা শঙ্কা আতঙ্ক ভয় দুশ্চিন্তা, কখন কী হয়। এদিকে স্বরাজ আর স্বাধীনতা নিয়েও ভারতব্যাপী তোলপাড় চলছে, ঘরে ঘরে মহাত্মা গান্ধীর ছবি, হাঁটুর ওপর কাপড় পরা শীর্ণ দেহ, পায়ে মোটা রাবারের সেন্ডেল, দুই পাশে দুই তরুণীর কাঁধে ভর দিয়ে চলা গান্ধীর ছবি। নেতাজী সুভাষের ছবিও সবার হাতে হাতে। দশ হস্তে প্রহরণধারিণী দেবী দুর্গা আশীর্বাদ করছেন সুভাষচন্দ্রকে। আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে নেতাজী সুভাষ বসু ব্রিটিশদের পরাজিত করবেন। পৃথিবীর জন্য আরো বড়ো দুর্দিন ১৯৪১ সালের ২২শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু। পৃথিবী অভিভাবকহীন। অন্তিম বয়সে রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার সংকট লিখেছিলেন, ‘এ আমার পাপ, এ তোমার পাপ’, সেই পাপে পৃথিবী তখন পুড়ছে।
আমি হঠাত্ তখন খুব বদলে গেলাম, একেবারেই অন্যরকম, বৃত্তি পরীক্ষার আগে মা-দাদা ও আমার আরো আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে কলকাতা গিয়েছিলাম। সিরাজগঞ্জ শহরে এসে সেই প্রথম রেলগাড়িতে চড়া, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ বা সারার ব্রিজ পার হয়ে দর্শনা দিয়ে শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছা, সন্ধ্যায় ট্রেনে চাপা, ভোরে গিয়ে নামা কলকাতায়। উঠলাম বিডনস্ট্রিটে পুরসুন্দরী ধর্মশালায়। পরেশনাথের মন্দির, আলীপুর চিড়িয়াখানা, গড়ের মাঠ ঘুরে ঘুরে দেখা। সিরাজদ্দৌলা নাটক দেখেছিলাম স্টার থিয়েটারে, শচীন সেন গুপ্তের লেখা। অভিনেতাদের নাম মনে নেই। দ্বারিক ঘোষের দোকানে রাবড়ী খাওয়া, ট্রামে চড়া—এইসব দেখে কলকাতা থেকে ফিরলাম।
তখন যুদ্ধ থেমে গেছে, মিত্রপক্ষ জয়ী হয়েছে যুদ্ধে। ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন ও বিভক্ত। আমি পুরাণকাহিনির ধ্রুব চরিত্রের মতো মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাই, আমার যেন মনে হয়, উত্তর দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমিও ধ্রুবর মতো স্বর্গের সন্ধান পেয়ে যাব। এই সময় কী যে করেছি আমি, সার্কাস দেখে সার্কাসের রিংমাস্টার, ম্যাজিক দেখে জাদুকর, সাধু-সন্ন্যাসীদের দেখে তাদের মতো গৃহত্যাগ করার ইচ্ছা, সাপের ওঝাদের দেখে মন্ত্র শেখার চেষ্টা। প্রতি বছর আমাদের গ্রামে ম্যাজিক দেখাতে আসতেন ম্যাজিশিয়ান রশিদ, তিনি চমত্কার ম্যাজিক দেখাতেন, এত ভালো ম্যাজিক আমি আর কখনো দেখিনি, আমি রশিদ সাহেবের ভক্ত হয়ে গেলাম, ম্যাজিশিয়ান হব, তার আর পিছু ছাড়ি না। মনে আছে, একটা অপূর্ব ম্যাজিক দেখেছিলাম রশিদ সাহেবের। আমার কাছে এখনো অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমাদের গ্রামের এক লোক ছিলেন, তার নামও রশিদ। তখনকার দিনে, বিশেষত গ্রামে, দুজনের একই নাম হলেই বলা হতো মিতা; দুজনের এক নাম হলেই মানুষ যে মানুষের মিত্র হয় না, গ্রামের সহজ-সরল মানুষ তখনো তা বুঝতে শেখেনি। খুব খবরের কাগজ পড়তেন, ভালো ফুটবল খেলতেন, বেশ ভালো কথাও বলতে পারতেন। তিনি নাকি রশিদ সাহেবের ম্যাজিকের সমালোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, এ সবই মিথ্যা ফাঁকি, কিচ্ছু না। সন্ধ্যায় ম্যাজিক শুরু হয়েছে, হলভর্তি মানুষ, ম্যাজিশিয়ান রশিদ জাদুর কাঠি হাতে নিয়ে ম্যাজিক দেখাতে এলেন, ম্যাজিক শুরু করার আগেই তিনি আমাদের গ্রামের রশিদ সাহেবকে মঞ্চে ডাকলেন। বললেন, আমাদের দুজনেরই এক নাম। শুনলাম আপনি আমার ম্যাজিক পছন্দ করেন না। এসব কিছুই নাকি মিথ্যা জারিজুরি। ঠিকই বলেছেন রশিদ ভাই, এ সবই হাতের খেলা, এমন কিছু না, কৌশল, তবুও একটা কিছু হয়তো আছেও আবার। আচ্ছা আপনি দয়া করে আপনার দুটো হাত একত্র করুন, যেমন করে জোড়হাত করে। রশিদ সাহেব হাত দুটো একত্র করে জোড়হাতে দাঁড়ালেন। ম্যাজিশিয়ান রশিদ তার কাছে এসে হাতের চারপাশ দিয়ে জাদুর কাঠি ঘোরালেন, তার চোখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। পরে বললেন, রশিদ ভাই এবার হাত খুলে ফেলুন। আপনার সিটে গিয়ে বসুন। কিন্তু কী আশ্চর্য, রশিদ সাহেব তার জোড়হাত আর খুলতে পারেন না। নিজে চেষ্টা করছেন, পাশে থেকে লোকজন এসে দুদিক থেকে দুই হাত ধরে টানাটানি করছে, কিন্তু কিছুতেই হাত আর খোলে না। ভয়ে একসময় কেঁদেই ফেললেন রশিদ সাহেব। ম্যাজিশিয়ান রশিদ বললেন, কী হলো, জায়গায় গিয়ে বসুন, কাঁদছেন কেন? আমি তো কিছু করিনি, আপনার গায়ে স্পর্শও করিনি, হাতও দেইনি আপনার শরীরে, আপনি নিজের হাত নিজে খুলতে পারছেন না? হাসতে লাগলেন ম্যাজিশিয়ান রশিদ। কিছুক্ষণ পরে বললেন, রশিদ সাহেব, এসব মন্ত্রটন্ত্র হয়তো কিছু না, ম্যাজিক হাতেরই খেলা, তবু একটা কিছু আছে, না হলে এই ম্যাজিক নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলাম কেন? আপনারা উড়িয়েও দিতে পারেন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যও করতে পারেন, কিন্তু আমি তো এই ম্যাজিক ভালোবাসি, এই ম্যাজিকই তো আমার জীবন। এবার আমাদের রশিদ সাহেবের কাছে এলেন ম্যাজিশিয়ান রশিদ। হাতের জাদুর কাঠিটা এবার উল্টোদিক থেকে কয়েকবার ঘোরালেন, বললেন, রশিদ ভাই, আপনি ভাবতে থাকুন আপনার হাত খুলে যাচ্ছে। দেখুন তো এবার হাত খুলছে কি না? মুহূর্তে রশিদ সাহেবের দুই হাত খুলে গেল, হাত আগের মতো। দুই রশিদেরই চোখে জল, দুই জনে কোলাকুলি। এই দৃশ্য এখনো আমি ভুলতে পারি না। এ কি ম্যাজিক না ম্যাজিকের চেয়েও আরো কিছু বেশি? রশিদ সাহেব এত বড়ো ম্যাজিশিয়ান ছিলেন, তার কথা ভেবে এখনো আমার কান্না পায়। আমি জুনিয়র পি সি সরকারের ম্যাজিকও দেখেছি। পরে, আশির দশকের শেষ দিকে কলকাতায় একবার পার্থসারথিবাবুর বাড়িতে একসঙ্গে আমরা নেমন্তন্নও খেয়েছিলাম। পার্থদা তখন বোধকরি সি আই টি-র চেয়ারম্যান। তখন আমার দিনরাত্রির স্বপ্নই হয়ে ওঠে ম্যাজিশিয়ান হওয়া। ঘরের মধ্যে মোম জ্বালিয়ে ম্যাজিক শুরু করতাম। বাঁশের কাঠি দিয়ে ত্রিফলা বর্শা বানাতাম, তাসের খেলা দেখাতে শুরু করলাম, একটা দুটো ম্যাজিক শিখেও ফেললাম। আমার এক মাসতুতো ভাইও কিছু কিছু ম্যাজিক দেখাতে পারত। তার কাছে ম্যাজিক শিখার বায়না ধরলাম।
সিরাজগঞ্জে থাকেন অবিনাশ গুহ, সন্ন্যাসী, তিনি সব ধর্মের সার কথা যে এক—এই কথা প্রচার করেন। বলেন, সব ধর্মেরই মূলকথা শান্তি। এই শান্তি আর অহিংসা প্রচারই তাঁর কাজ। গেরুয়া পোশাক পরেন, কাঁধে গেরুয়া রঙেরই ঝোলা, এটার মধ্যেই তাঁর যাবতীয় জিনিসপত্র, বই, খাবার-দাবার, খাতা-কলম, দুয়েকখানা কাপড়—এইসব। আমাদের বাড়িতে এসে উঠলেন অবিনাশ গুহ। গ্রামে গ্রামে সভা করেন, কোনো বিশেষ ধর্ম নয়, প্রচার করেন মানবধর্ম, অহিংসা আর শান্তি। আমি তাঁর বশ হয়ে গেলাম। তাঁর সাথে সাথে এসব সভায় যেতে শুরু করলাম, আমি তখন কবিতা লিখি। অবিনাশ সাধু বললেন, তুমি গান লেখ, আমি সুর দিয়ে সভায় সভায় গাইব। আমি গান লিখতে শুরু করলাম। অবিনাশ সাধু সেইসব গান স্বকণ্ঠে গাইতেন। স্কুল, লেখাপড়া ফেলে আমি তাঁর সাথে সভায় সভায় যাই, গ্রামে গ্রামে ঘুরি। বাড়ির লোকেরা সব চিন্তায় পড়ে গেল, সাধুর পেছনে এইবার না বাড়িঘর ছেড়ে যাই। পিতামাতার একমাত্র সন্তান, তাদের দুঃশ্চিন্তার শেষ নেই, কিন্তু সাধু হওয়া কি সবার কপালে জোটে? সাধু সাজা যায়, সাধু হওয়া কঠিন। আমি সাপের ওঝা হওয়ার জন্য মন্ত্রের বইও কেনা শুরু করলাম, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে সেইসব মন্ত্র পড়ি, বিষ নামাই। এই বয়সের খেলা। চৈত্র মাসের শেষের দিকে বা বৈশাখের প্রথম প্রথম কেদার আচার্য আসতেন আমাদের বাড়িতে। তিনিও থাকতেন সিরাজগঞ্জে। প্রতি বছর নতুন পঞ্জিকা নিয়ে আসতেন কেদার আচার্য। তিনি জ্যোতিষ ঠাকুর, কোষ্ঠী করেন। আমার একটা লম্বা কোষ্ঠী করেছিলেন তিনি, দ্রৌপদীর বস্ত্রের মতো দীর্ঘ, শেষ করা যায় না। সেই কোষ্টীতে কী লেখা ছিল জানি না, ভালো যা ছিল তার কিছুই হয়নি, মন্দটা সবই ফলেছে। আমার এক মেঝতুতো বোনের স্বামী পুণ্যবাবু এই গ্রামেরই মানুষ। পুণ্যবাবুকে সবাই গান্ধীজী বলে ডাকেন। তিনি কোনো সেলাই করা জামা-কাপড় পরতেন না, ধুতির এক অংশ পরতেন, এক অংশ গায়ে জড়িয়ে রাখতেন। শীতের দিনেও প্রায় এরূপই। মাঝে মাঝে একটা সুতির মোটা চাদরও জড়াতেন গায়ে, একেবারেই গান্ধীর ভাবশিষ্য। খবরের কাগজের পোকা। আমাদের বাড়িতে কলকাতা থেকে লোকসেবক আর ইংরেজি বাই উইকলি অমৃতবাজারও আসে। লোকসেবক আনতে হয় কুমিল্লা অভয় আশ্রমে মানিঅর্ডারে টাকা পাঠিয়ে। ইত্তেফাক ও সংবাদ আসে ঢাকা থেকে। তখন খবরের কাগজের ডেটলাইনে এই পত্রিকায় দুটো তারিখ। ঢাকা ও মফস্বল। পত্রিকা যায় একদিন পর পোস্টাপিস দিয়ে। ভাঁজ করে মোড়ানো পত্রিকা। নাম ঠিকানার সঙ্গে গ্রাহক নম্বরও লেখা থাকে। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এই কাগজ পড়েন তিনি। গান্ধীর খুব ভক্ত, যদ্দুর মনে পড়ে মাছ-মাংস খেতেন না। আমি কখনো তাঁকে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে শুনিনি, মাটির মানুষ বলতে যা বোঝায়। তিনি বিবেকানন্দেরও খুব ভক্ত। স্বামীজী তাঁর আদর্শ। খুবই নরম মানুষ। আমি তখন কবিতা লিখি। আমার কবিতা নিয়ে তাঁর খুব গর্ব। সবাইকে পড়ে পড়ে শোনান। আমার আরেক মাসতুতো বোন ইন্দ্রানীদি-র স্বামী শ্যামবাবু কলকাতায় চাকরি করেন। বছরে দু-তিন বার গ্রামে আসেন এক্কাগাড়ি হাঁকিয়ে। কী যে তোরজোর। বড্ড শহুরে ভাব। ইন্দ্রানীদিও খানিকটা স্বামীগর্বে গরবিনী। ইন্দ্রানীদির’র এক ভাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরে কিছুদিন চাকরি করেছেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলে একটি গ্রামে ডাক্তারি
শুরু করেন। এভাবেই বড় হচ্ছি আমি। নদীতে নামলে আর উঠি না, নৌকা নিয়ে বেরোলে আর ফিরি না। তখন সাইকেল চালানো শিখে গেছি। গ্রাম থেকে সাইকেল চালিয়ে গঞ্জে চলে যাই। মাঝ পথে পাঙ্গাসীতে আমার মামাবাড়ি, ইছামতীর তীরে। মামারা খুব বড়লোক, জাঁকজমক করে বাড়িতে দুর্গা পূজা হয়, কলকাতা থেকে ভোলানাথ অপেরার যাত্রাদল আসে। প্রায় মাসাবধি চলে এইসব উত্সব। ছোটবেলায়ই আমি ভোলনাথ অপেরার দক্ষযজ্ঞ যাত্রাপালা দেখেছি। মামাদের বাড়িতে অনেক লোকজন, তাদেরই জ্ঞাতিগোষ্ঠী মিলে এক বাড়িতে একটা ফুটবল টিম হয়ে যায়। আমার মামা ছিলেন ফুটবলের খুব অনুরাগী। ফুটবল টিমে খেলতে শহর থেকেও প্লেয়ার হায়ার করে নিয়ে আসতেন তিনি। মাসে না হলেও দু মাসে তাঁর একবার কলকাতা যাওয়াই চাই। শরত্চন্দ্র তাঁর খুব প্রিয় লেখক। শরত্চন্দ্রের ‘বিরাজ বৌ’ থেকেই সম্ভবত তিনি তাঁর ছোট বোনের নামও রেখেছিলেন। বাবা এন্ট্রান্স পরীক্ষার সময়ই স্বদেশী আন্দোলনের ডাকে স্কুল ছাড়েন। মুকুন্দ দাসের গান তাঁর মুখে মুখে, দরাজ গলাও ছিল বাবার, যাত্রার দলে বিবেকের গানও করেছেন। কীর্তনের আসরে তাঁর গলা উঠত সবার ওপরে। তিনিই গান ধরিয়ে দিতেন—‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’, ‘পণ করে সব লাগরে কাজে খাটবো মোরা দিন কড়া’। এইসব গান কতবার যে শুনেছি বাবার কণ্ঠে। মাইকেলের আবৃত্তিও শুনেছি তাঁর কাছে। বাবার মাইকেল গ্রন্থবলীটি এখনো আমার কাছে আছে।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় আমাদের বাড়ির বসার ঘরটিতে নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থা। যদ্দুর মনে পড়ে, অমূল্য লাহিড়ী এসেছিলেন লাহিড়ী মোহনপুর থেকে। তখন মুসলিম লীগের আমলে স্বতন্ত্র নির্বাচন ব্যবস্থা। সংখ্যালঘু বা হিন্দুরা হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দেবে। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় আর মুসলিম লীগের ভরাডুবি। মুসলিম লীগের প্রতীক তখন হারিকেন, যুক্তফ্রন্টের সাইকেল। জারি গান লেখা হয়েছিল মুসলিম লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। এই সময় লবণ হয়েছিল ষোলো টাকা সের। মানুষের দুর্দশার শেষ ছিল না। সেই জারি গান ছিল—‘মরি হায়রে হায় দুঃখ বলি কারে/ সোনার বাংলা শ্মশান করলো মুসলিম লীগ সরকারে’। হক-ভাসানীর তখন জয়জয়কার। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে গোপালগঞ্জ কোটালিপাড়া নির্বাচনী এলাকায় বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী। তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী ওয়াহিদুজ্জামান। মুসলিম লীগের নেতাকে হারিয়ে বিপুল ভোটে জিতলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি হয়ে উঠলেন বাঙালির নেতা। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পরে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের আকবর উকিল। আমাদের স্কুলের মাঠে, ধানঘড়ায় নির্বাচনী পরিচিতি সভা হয়েছিল। সেই সভায় এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্কুলের শিক্ষকেরা আমাকে কবিতা লিখতে বললেন। তখন সব পত্র-পত্রিকায় ছোটদের পাতায়, ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে, আজাদের মুকুলের মাহফিলে, সংবাদের খেলাঘরে, কলকাতার লোকসেবকের সবুজ পাতায় আমার কবিতা ছাপা হয়। বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষে কবিতা লিখলাম আমি, ঠিক কবিতা নয়, সমিল পদ্য—‘তুমি আসিয়াছ ফুলজোড় তীরে আমাদের এই গ্রামে,/ পাতার তোরণ গড়েছি আমরা মুজিব তোমার নামে।’ এই কবিতা মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সভায় আমি পাঠ করলাম। কোনো সভায় মাইকের সামনে এই আমার প্রথম কবিতা পড়া। কবিতা পড়া শেষ হতেই বঙ্গবন্ধু আমাকে কোলে টেনে নিলেন। কোলে নিয়ে আমার কপালে চুমু খেলেন তিনি, মাথায় হাত বুলালেন। তাঁর সেই দিব্যদৃষ্টি, সেই চোখ এখনো আমি দেখি। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা কান্তিমান পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি মাইকের সামনে দাঁড়ালেন, সভায় তিল ধারণের জায়গা নেই। রাস্তায়, আশেপাশের জমিতে উপচে পড়েছে মানুষ, সবাই একবার শেখ মুজিবকে দেখতে চায়। তিনি তখনো বঙ্গবন্ধু হননি বটে, কিন্তু তিনি বন্ধুই, সকল মানুষের বন্ধু। বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়ে তিনি স্বকণ্ঠে আমার নাম উচ্চারণ করলেন, বললেন, একদিন আমি বড়ো কবি হবো, তাঁর সেই কণ্ঠ এখনো আমার কানে বাজে। অবিশ্বাস্যই মনে হয়, কীইবা লিখেছিলাম আমি, সবটাই তাঁর মহানুভবতা। তিনি এত বড়ো ছিলেন যে, আমার এই সামান্য রচনাকেও তিনি অসামান্য করে দেখেছিলেন। তিনি আমার কাঁধে কবিত্বের যে গুরুভার চাপিয়ে গেছেন, আমি তা এখনো বহন করে চলেছি। তিনি যত বড়ো কবি হওয়ার কথা আমাকে বলেছিলেন, আমি তত বড়ো কবি হতে পারিনি। কিন্তু কবিতাকে আমার জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছি, কবিতাই হয়ে উঠেছে আমার জীবন, কবিতা ছাড়া আমার আর পৃথক কোনো জীবন নেই। বঙ্গবন্ধু আমার কানে কবিতার এই মন্ত্র দিয়ে গিয়েছিলেন। ধানঘড়া থেকে আরো তিন মাইল দূরে চান্দাইকোণা স্কুল মাঠেও এমনই আরকটি নির্বাচনী পরিচিতি সভা ছিল, তিনি তাঁর জিপে কোলের কাছে বসিয়ে সেই চান্দাইকোণা স্কুলের মাঠের সভাতেও আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। ধূলি ওড়া কাঁচা রাস্তা, সেখান দিয়ে জিপ চলছে, আমি বসে আছি বাংলার সাতকোটি মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধুর কোলের পাশে, কী দুর্লভ ভাগ্য আমার, এ যেন আমার জন্ম-জন্মান্তরের পুণ্যের ফল। নাহলে এই বয়সে কীভাবে এমন ঘটল। বঙ্গবন্ধু কি জানতেন, একদিন তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আমি তাঁর জন্য দু’চোখ ভাসিয়ে কবিতা লিখব, প্রায় অপ্রকৃতস্থ হয়ে যাব আমি, ভূমিশয্যায় শুয়ে আমার নিজের পিতার মুত্যুশোক পালনের সাথে সাথে তাঁরও মৃত্যুশোকের তর্পণ করব। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে হয়তো একথা জানতেনও তিনি, তাই কবিত্বের এই ভার তিনি আমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।
গ্রামের এক অপরিচিত অজ্ঞাত বালকের পক্ষে এই বয়সে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা লাভ তার জীবনকে কতটা মহিমান্বিত করে তোলে তা বুঝিয়ে বলা যায় না, আমি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। সেই থেকে সবার কাছে আমি কবি। সেই বোধ হয় আমার কবিজীবনের অভিষেক।

তিন
আমার হাতেখড়ির দিন নাকি একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, একটি থালায় দোয়াত, কলম, কাগজ, বই, রুপোর টাকা, সোনা এইসব রেখে যথারীতি আমার দিকে এগিয়ে দেওয়া হয়। বালকেরা কৌতূহলবশত বা তাদের ইচ্ছানুসারে যেকোনো পছন্দের জিনিসটি তুলে নেয় বা ধরে, কিন্তু আমি নাকি এর কোনোটাই ধরিও না তুলেও নেই না। এই থালার দিকে আমি তাকাই-ই না, আমি উঠোনের অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি যেখানে শালিখ বা চড়ুই পাখি নাচছে, ফুলগাছে বাতাসে ফুলগুলো দুলছে। বাড়ির লোকজন সবাই অবাক হয়ে যায়। এ কেমন ছেলে, কোনোকিছুতেই তার মন নেই, কিছুই সে ধরতে চায় না, ঠাকুরমশাই আরো বেশি বিস্মিত হয়ে যান। আসলে এই না ধরা না জড়িয়ে পড়াই বোধহয় আমার স্বভাব। শেষে একটা কলম আমার হাতে গুঁজে দেওয়া হয়, আমি তত্ক্ষণাত্ কলমের ক্যাপটা খুলে ছুঁড়ে ফেলি, শুধু খোলা কলমটা হাতে নিয়ে হাতের তালুতে আঁকাজোখা করতে শুরু করি। আমার প্রথম শিক্ষকের নাম ধর বাবু। খুবই বৃদ্ধ তিনি, একটিও দাঁত নেই। কথা প্রায় বোঝাই

যায় না। চোখে সুতো দিয়ে বাঁধা চশমা। তিনি এলেন আমার গৃহশিক্ষক হয়ে। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগ আমার প্রথম পাঠ্যবই। ধর মাস্টারমশাই বই খুলে আমাকে অক্ষর পরিচয় করাতে চান, কিন্তু আমি বইয়ের দিকে না তাকিয়ে তাঁর এই দন্তবিহীন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মাস্টারমশাই বিরক্ত হয়ে যান। অস্পষ্ট উচ্চারণে বলতে থাকেন, আমার মুখের দিকে কী দেখছ? বইয়ের দিকে তাকাও। কিন্তু আমি বইয়ের চাইতে তাঁর মুখভঙ্গি দেখতেই বেশি মজা পাই। একদিন দু’দিন এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহ এমনি করে মাস কেটে যায়, আমার আর বর্ণপরিচয় হয় না। একদিন ধর বাবু আমার মাকে বললেন, এ ছেলের লেখাপড়া কিছু হবে না, খামোকাই চেষ্টা করা। তিনি আমাকে শিক্ষাদানের আশা ত্যাগ করে পড়াতে আসাই বন্ধ করলেন। কিন্তু আমি আমার দিদির পড়ার সময় তার পাশে বসে একা একাই অক্ষর ও বর্ণমালা শিখে ফেললাম। তখন আমি নিজে নিজেই পড়তে পারি—‘কর কর, খর খর/ জড় জড়, ঝর ঝর/ ঝড় বয়, ভয় হয়/ মিঠাই খাইব, কোথায় পাইব’ আমি ঝরঝর করে পড়ে যাই। মা একটু অবাকই হয়। শিশুশিক্ষা বইয়ের শেষের ‘প্রভাত বর্ণনা’ কবিতাটিও আমি অনায়াসে মুখস্থ করে ফেলি—‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল/ কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল/ উঠ শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ/ আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ’—সেই আমার বিদ্যালাভের সূচনা, সূচনাই মাত্র, কিছুই আয়ত্ত হলো না। আমি সেই শিশুশিক্ষাতেই আছি, প্রথম ভাগ বড়োজোর দ্বিতীয় ভাগ—‘আলস্য অশেষ দোষের আকর/ জাড্য দোষ দূর কর/ কুসংসর্গে নানা দোষ ঘটে/ দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না’—এইসব আর কি। পড়াশোনা বলতে এই যত্সামান্য, ‘শিশুশিক্ষা’, ‘বর্ণ পরিচয়’, ‘সহজ পাঠ’ বা যোগীন্দ্রনাথের বই। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যা কিন্তু এ পর্যন্তই। এরপর সব চৌকাঠ পেরোনো। স্কুলে এসে আমি বরাবরই খুব ভালো, একশতে একশ’, এক নম্বরও কম দিতে পারেন না শিক্ষকেরা। আমার তখন গৃহশিক্ষক পঞ্চানন পাল, লোকে তাঁকে পঞ্চ পিয়ন বলে ডাকে, স্কুলেও পড়ান, পোস্ট অফিসে পিয়নেরও চাকরি করেন। পঞ্চবাবু বড্ড কড়া মেজাজের মানুষ। আমার পড়া নিয়ে খুব অসুবিধা হয় না, আমার অসুবিধা মনোযোগ দেওয়া নিয়ে, আমি পড়তে বসেও প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে যাই, গাছ-পালা, ফুল-পাখির দিকে তাকিয়ে থাকি। পঞ্চানন স্যার আমাকে অযথাই বেশি বকাঝকা করেন। একটু বিদ্রূপও যেন করেন, ক্ষীর নবনী খাও, পড়ায় মন দাও না, কানটা টেনে লম্বা করে দেবো। আমার বড্ড খারাপ লাগে, আমি পাখিই দেখি আর আকাশই দেখি তাতে আপনার কী, আমি পড়া পারলেই তো হলো। কালীতলা স্কুলে পরীক্ষায় প্রথম স্থানটা আমারই। অঙ্ক দাও আমি চোখের নিমিষে করে দেবো। তুমি কবিতা মুখস্থ করতে বলো, আধ ঘণ্টার মধ্যেই মুখস্থ করে ফেলব,—‘টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার/ হাউ আই ওয়ান্ডার হোয়াট ইউ আর’—এসব মুখস্থ করতে কতক্ষণ লাগে। তার জন্য আমি আকাশ দেখব না, পাখি দেখব না, নদীর দিকে তাকাব না, এও কখনো হয়? কে ঠেকায় আমার আকাশ দেখা, নদী দেখা, পাখি দেখা। আমাদের সেই বালিকা বিদ্যালয়েই পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠান হতে দেখেছি। স্কুলের হেডমাস্টার মনীন্দ্র নিয়োগী নিজেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতে পারতেন, আমি তাঁর কণ্ঠেই প্রথম ‘মালতী লতা দোলে’ রবীন্দ্রনাথের এই গানটি শুনেছিলাম। তখন আমি একেবারেই বালক, যদিও এখনো। একবার কালবৈশাখী ঝড়ে আমাদের গ্রামের মাইনর স্কুলের টিনের চাল উড়ে যায়। আফজাল হোসেন, আমরা তাঁকে আফজাল ভাই ডাকতাম, আমার দাদার বন্ধু। তিনি ছিলেন লোককবি। তিনি গান রচনা করলেন—‘কালবোশেখির প্রবল ঝড়ে গিয়েছে উড়ে মোদের বিদ্যালয়/ মোরা তারই তরে মাগি সকাতরে দাও গো যা কিছু সাধ্য হয়’। আফজাল ভাই গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে লোকজন সঙ্গে নিয়ে এই গান গেয়ে গেয়ে বাড়ি বাড়ি এসে স্কুলঘর তৈরির জন্য সাহায্য তুললেন। আমি আরো দুজন গৃহশিক্ষক পেয়েছিলাম, হূষিকেশবাবু, নিতাইবাবু। তাঁরা স্কুলে পড়াতেন, আমাদের বাড়িতে লজিং থাকতেন। বাড়িতেই শিক্ষক, আমি তাঁদের ছায়ায় বড়ো হয়েছি।
দুর্গাপূজার আগ দিয়ে মাস খানেক আমার কেবলই দিন কাটে দেউড়ি বাড়িতে মূর্তি তৈরি করা দেখে দেখে। প্রথম খড় দিয়ে আদল, পরে তার ওপর মাটি দিয়ে মূর্তি তৈরি হয়। আমি স্নানাহার ভুলে সারাদিন সেই মৃিশল্পীদের বাড়িতে পড়ে থাকি। হাত, পা, চোখ, মুখ বানানো দেখি। এক মুহূর্ত নড়ি না, ঠায় বসে এই মূর্তি তৈরি করা দেখি আমি। পরে আমি নিজেই বাড়িতে মাটি দিয়ে মূর্তি গড়ার চেষ্টা করেছি, গড়েছিও। কিন্তু সেসব কিছুই ধরে রাখা হয়নি। ফুটবলের ময়দান থেকে ব্যাডমিনটন-ভলিবলের মাঠ, হা-ডু-ডু, মার্বেল, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, সাধুর পেছনে ঘোরা, নৌকা নিয়ে নদী-বিলে পাড়ি জমানো, গরু চরাতে মাঠে মাঠে ঘোরা, ঘোড়ায় চড়তে যাওয়া, ম্যাজিক, সার্কাস এতসব কিছুর মধ্যে থেকে কোনোটাই হলো না। ম্যাজিক হলো না, মন্ত্র হলো না, পাঠ হলো না, শুধু ঘুরলাম ফিরলাম সাঁতার কাটলাম হাবুডুবু খেলাম। হরিহর ছত্রের মেলা থেকে ঘোড়া কিনে আনা হতো আমাদের বাড়িতে, বড়ো রেসের ঘোড়া।
একদিন সকালবেলা হঠাত্ দু’জন নাগা সন্ন্যাসী এসে উপস্থিত হলেন আমাদের বাড়িতে। বাবা খুব আদর-যত্ন করে বসালেন। গায়ে শুধু এক টুকরো কাপড়ের কৌপিন ছাড়া আর কিছু নেই। কোমরে গলায় মোটা কাছি জড়ানো, হাতে লোহার চিমটা আর কমণ্ডলু। জানি না নাগা সন্ন্যাসীরা আমার মাথায় হাত রেখে কী বর দিয়েছিলেন। বাবা কিছু ফলমূল, মিষ্টান্ন আহারাদির ব্যবস্থা করলেন, আমাদের বাড়িতে একদিন দু’দিনের আতিথ্য নেওয়ারও অনুরোধ জানালেন। নাগা সন্ন্যাসীরা একদিনের বেশি কোনো বাড়িতে থাকেন না। তারা গ্রামের পর গ্রাম, পর্যটন করেন। যেখানে সূর্যাস্ত হয় সেখানে কোনো বাড়িতে এক রাত্রির জন্য আশ্রয় নেন। সেই নাগা সন্ন্যাসীদের আর দেখিনি। ছোটবেলায় একা ঘরে আমি ঘুমাতে পারতাম না। অন্ধকারে আমার ভীষণ ভয় হতো। আমাদের দোতলা ঘরের ওপরে কোনো শব্দ হলেই আমি ভয়ে আঁতকে উঠি। এত নদী সাঁতরাই, মাঠ-ঘাট ঘুরি, বন-বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়াই, পাখির খোঁজে কোথায় থেকে কোথায় যাই, কিন্তু কুকুরছানা বেড়ালছানা দেখলে আমি ভয়ে অস্থির। শত হাত দূর দিয়ে আমাকে যেতে হয়। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা কুকুরের বাচ্চা, বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে খেলা করে। আর আমি বাচ্চা কুকুর বা বাচ্চা বিড়াল দেখলে ভয়ে একেবারে গর্তে সেঁধিয়ে পড়ি। এটা এক অদ্ভুত ভীতি আমার। এখনো এই ভীতি কাটেনি। শুনেছি যে নেপোলিয়নের মতো এমন সাহসী বীরও নাকি বিড়াল দেখলে ভয়ে একেবারে কেঁপে উঠতেন। এখানেই বলে রাখি, মনে আছে, ১৯৯৪ সালের দিকে কলকাতায় সল্টলেকে আমরা ক’জনে সাহিত্য অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। পরদিন সকালবেলা শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ আর আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। শক্তিদা তাঁর কর্নেল বিশ্বাস রোডের বাসা থেকে নতুন বাড়িতে এসে উঠেছেন। বোধহয়, ফুলতলার দিকে। শক্তিদার বাড়িতে তাঁর বন্ধু ক’দিনের জন্য একটা অ্যালসেশিয়ান কুকুর রেখে গেছেন। একসময় ঘুরতে ঘুরতে সেই কুকুরটা আমাদের বসার ঘরে এসে হাজির হলো। কুকুর দেখে আমার হূদকম্প হওয়ার অবস্থা। আর কুকুরও দেখি যার ভয় হয় তার দিকেই এগিয়ে আসে। যে ভয় পায় তার শরীরে নাকি একধরনের সিক্রেশন হয়। কুকুর শব্দ করে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতেই আমি ভয়ে লাফ দিয়ে শামসুর রাহমানের চেয়ারের ওপরে উঠে পড়লাম। রাহমান ভাইও কী করো কী করো বলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শক্তিদা কোনোভাবে দৌড়ে এসে কুকুরটাকে সামলালেন।
আমাদের বাড়ি লাগোয়া কবিরাজ বাড়ি। আমার পিতামহ এই করিবাজমশাইকে এইখানে থাকতে জায়গা করে দিয়েছিলেন। রজনীকান্ত দত্ত ঢাকার বিক্রমপুরের লোক। আমাদের গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। তাঁর এই ঔষধকেন্দ্রের নাম আর্য ঔষধালয়। তাঁর বাড়িতে যে কত রকমের গাছ কত রকমের ঔষধি বৃক্ষ—অর্জুন, গাম্ভারী, ঘৃতকাঞ্চন। এই কবিরাজবাড়িতে এই ঔষধালয়ে তৈরি হয় সারিবাদী সালসা, দ্রাক্ষারিষ্ট, মধ্যম নারায়ণ তেল, মহাবৃঙ্গরাজ তেল, এইসব। আমি যে কত পাখির নাম জানি গাঙশালিক, গাঙময়না, মেছো বক, কত রকমের টিয়া, ঘুঘু, সারস তার সব লিখে শেষ করা যাবে না। যেন পাখির রাজ্যে আমি বড়ো হয়েছি, স্বপ্নরাজ্যে। আমরা কাজলি মাছকে বলতাম বাঁশপাতা মাছ, কেঁচকি
মাছকে সুবর্ণ খরকি মাছ, আহা কী চমত্কার নাম, মন ভরে যায়, এইসব পাখি, গাছপালা, নদী, শিশির, বৃষ্টি, শিশিরকে আমরা বলতাম ওস; মেলা, উত্সব এতসব বৈচিত্র্যের মধ্যে বড়ো হয়েছি আমি। আমাদের বাড়িতে থাকতেন গানের মাস্টার রাখালবাবু, বরিশালের লোক। যাত্রাদলে কলকাতা থেকে আনা হতো রাজার রয়েল ড্রেস, এই গ্রামেই আমি সিরাজদ্দৌলা ও টিপু সুলতান নাটক হতে দেখেছি। ঈদের উত্সব দেখেছি, পূজার আনন্দ দেখেছি, লক্ষ্মীপূর্ণিমা রাতে নষ্ট চন্দ্রা দেখেছি, গ্রামেই দেখেছি কেষ্ট যাত্রা। তখন ছেলেরাই মেয়ে সেজে মেয়েদের চরিত্রে অভিনয় করে। মনি পোদ্দার এই মেয়েদের চরিত্রে খুব ভালো অভিনয় করতেন। তাঁর খুব নামডাক। সিরাজদ্দৌলা নাটকে মনি পোদ্দার আলেয়ার অভিনয় করেছিলেন।
বিষ্ণুপ্রিয়া অভিনয়ের কথা এখনো আমার মনে আছে। মাঘী পূর্ণিমায় ভবানীপুরে মাঘের স্নান হতো, আমরা ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে সপরিবারে যেতাম ভবানীপুরে প্রায় মাইল দশেক দূরে। তখন মাঘ মাসে আরো বেশি ঠাণ্ডা পড়ত। কনকনে সেই শীতে মন্দিরের পুকুরে স্নান করা, পরে মাটির চুলোয় রান্না, সেখানেই খাওয়া-দাওয়া। ফিরতে ফিরতে প্রায় মধ্যরাত। নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা, অষ্টমীর মেলা, চৈত্র সংক্রান্তি এসব নিয়ে গ্রামে তখন একটা অন্যরকম সুখের জীবন। পরস্পর সম্প্রীতি ভালোবাসা অনেকটা আত্মীয়ের মতো, একে অপরের বিপদ-আপদে এগিয়ে আসে।
আমি লোকজীবনের ঐশ্বর্যের মধ্যে বড়ো হয়েছি, আমার যা কিছু শেখা তা এই লোকজীবনের উদার আকাশ, বাতাস, প্রকৃতির কাছ থেকে, এইসব মাটি ও মানুষের মাছ থেকে। আমার কল্পনা ও চিন্তাজগেক সমৃদ্ধ করেছে এই অফুরন্ত প্রাকৃতিক উপকরণ, নদী, মেঘ, নক্ষত্র, আকাশ, সন্ধ্যাতারা। বৃষ্টি, জল, ফুল শস্যরাজি। আমি সবজি বাগানের গন্ধে বিভোর হয়ে থেকেছি, নদী, মেঘ, আকাশ, নক্ষত্র, সন্ধ্যাতারা, জলের কলকল ধ্বনি, টিনের চালে শিশিরের টুপটাপ শব্দ আমার মন ভরিয়ে দিয়েছে। জাগিয়ে দিয়েছে আমাকে। আমি এইসবের মধ্যে হারিয়ে গেছি। আজ আর খুঁজেও পাবো না, ছোটবেলা আমার খুব প্রিয় ছিল হেমেন্দ্রকুমারের ‘হিমালয়ের ভয়ঙ্কর’, শশধর দত্তের ‘মহন সিরিজ’। গ্রামে ছোটবয়সী ছেলেরা তাস খেলা শিখে ফেলে। কিন্তু তাস খেলার দিকে আমার কখনো মন যায়নি, আমি বরং ম্যাজিকের তাসের খেলা দেখতে পছন্দ করতাম। আমাদের বাড়িতে মাংসের চল ছিল না। নিরামিষভোজী না হয়েও আমরা আধা নিরামিষভোজী, বাঙালির প্রিয় খাদ্য মাছই আমাদের পরিবারের প্রিয় খাদ্য।
বাড়িতে পাঁঠার মাংস আনা হলে তা রান্না হতো একেবারে রান্নাঘরের বাইরে উঠোনে মাটির চুলোয়। বাড়ির মেয়েরা তার কাছ দিয়ে ঘেঁষত না, দাদা, কাকা এরাই রান্না করতেন, উঠোনে বসে কলাপাতাতে সেই মাংস-ভাত খাওয়া হতো। বাড়িতে মশুর ডাল পর্যন্ত বন্ধ, আমি মুরগির মাংস খেয়েছি বোধহয় ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর, সম্ভবত কলেজ-হোস্টেলে এসে। বাড়িতে তখন সব কাঁসার থালা, কাঁসার বাটি, কাঁসার গ্লাস। দুধের বাটি ছিল খুবই চমত্কার। একেবারে কবজি ডুবিয়ে দুধভাত খাওয়া যায়। তখন গ্রামে মেয়েরা চলাফেরা করত ডুলি-পালকিতে, ছই দেওয়া নৌকায় বা ছই দেওয়া গরুর গাড়িতে। ডুলি ঢেকে রাখা হতো শাড়ি কাপড় দিয়ে। সপ্তাহে দু’দিন বসতো গ্রামে হাট, যদিও আমাদের গ্রামে প্রতিদিনই সকাল-বিকালে বাজারও বসতো। চোর-ডাকাতের ভয়ে গ্রামে গ্রামে ছিল ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি। হুইসেল বাজিয়ে রাত জেগে পালা করে গ্রামের লোকেরা গ্রাম পাহারা দিত। চৌকিদারও পাহারা দিত লাঠি হাতে নিয়ে। আমাদের গ্রামে ছিল রামস্বরূপ চৌকিদার। তখন গ্রামের বড়লোকদের বাড়িতে ডাকাতির খুব ভয় ছিল। রাতগুলো খুব আতঙ্কে কাটত। কখনো কখনো বাঘের ভয়ের কথাও শোনা যেত। হয়তো বেশির ভাগই গুজব, কিন্তু মানুষ রাতে চলাফেরা করতে, ঘরের বাইরে বেরুতে বেশ ভয় পেত। টর্চলাইট আর হাতে লণ্ঠন বাতি নিয়ে চলাফেরা করত লোকে। আমরাও লণ্ঠনের আলোতে সন্ধ্যায় পড়াশোনা করতাম। বাড়ির চারপাশে অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারের মধ্যে মাঝে মাঝে জোনাকির আলো। গ্রামের জ্যোত্স্নারাতগুলো খুব মজার, শহরে জ্যোত্স্না উপভোগ করা যায় না। গ্রামে উপচে পড়ে জ্যোত্স্না, চাঁদ আর জ্যোত্স্না যেন গ্রামের জন্যই। নদীর জলে তাকালে আকাশ দেখা যায়, তারাভরা আকাশ, নক্ষত্র। ভোরবেলা বাড়িবাড়ি এসে বোষ্টম-বোষ্টমীরা কীর্তন করে যেত—‘রাই জাগো’। কতদিন যে এই কীর্তনের সুরে ঘুম ভেঙেছে, সকালবেলাটা কী যে পবিত্র মনে হতো, আজানের ধ্বনি, কীর্তন, ভজন। কী সুখেরই না দিন ছিল সে সময়। কী সুন্দর দিন কাটাতাম আমরা। পূজা, ঈদ, পয়লা বৈশাখ, হালখাতা, শবেবরাত; গ্রামবাংলার লোকজীবন ছিল একেবারে রূপকথার মতো, নানা প্রাণসম্পদে ভরা, তাজা ফুল-ফল স্বপ্নের মতো। সেই জীবন হারিয়ে গেল বিকৃতি, কৃত্রিমতা আর নানা অনাচারের মধ্যে, আমরা ভুলে গেলাম আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের পরিচয়, আমাদের ইতিহাস। নতুন ভোরের আলোর মতো সেই গৌরব কি জাগিয়ে তোলা যায় না?

চার
আমি খুব ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শিখেছিলাম যে, এই নশ্বর পৃথিবীতে অমরত্ব যদি কোথাও থাকে তা কবিতায়, কবিই সেই অমরত্বের সাধনায় নিয়োজিত ব্যক্তি; সেজন্যই বাল্মিকী, ব্যাস, হোমার, রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে এত বড়ো হয়ে ওঠেন। শুধু কবিরাই আকর্ষণ করেন আমাকে। রাজা, রাজ অমাত্য, রাষ্ট্রনায়ক, ধনবান, বিত্তশালী, সমাজপতি, উচ্চ পদাধিকারী, বিদ্বান—কেউই সেভাবে আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি, শুধু কবি ছাড়া। বাল্যকাল থেকেই কেন এভাবে আমি কবির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি তার কারণ আমার জানা নেই। কবিই হয়ে ওঠেন আমার আদর্শ ও লক্ষ্য। শপেনহাওয়ার ও কাল্টের মতো কোনো কোনো বড়ো দার্শনিকও জগত্সংসারে শিল্পের মধ্যে কবিতাকেই শ্রেষ্ঠ বলেছিলেন, কবিকেই সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছিলেন, যদিও জানি যে প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত করতে চেয়েছিলেন কবিকে, তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে কবির কোনো জায়গা নেই। কারণ কবিরা মিথ্যা বলে, মিথ্যা ভাষণই তাদের কর্ম। কথাটা পুরোপুরি অসত্যও নয়। কবিরা মিথ্যাই বলে; কিন্তু সে মিথ্যা সত্যের অধিক। সব কবির কথা জানি না, বাল্মিকী, ব্যাস, হোমার, রবীন্দ্রনাথ মিথ্যা বলেন না। রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ধরে যা প্রতিষ্ঠা করেছেন তার মূলকথাই সৌন্দর্য ও সত্য। ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’—রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন এই। রবীন্দ্রনাথের মতো কবিকে মিথ্যাভাষী বলা অসম্ভব; তিনি সত্যেরই সাধনা করেছেন। অবশ্যই সৌন্দর্যেরও; কিন্তু তিনি সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন সত্য, মনুষ্যত্ব, বিকেবিতা, মানবধর্ম, মানবপ্রেম—এই ছিল তাঁর জীবনসাধনা। আমি কীভাবে এত কম বয়স থেকেই কবিদের চিনেছিলাম, আর সব অস্বীকার করে অর্থ, সম্পদ, প্রতিষ্ঠা, পদ, প্রতিপত্তির কোনোকিছুর দিকে না তাকিয়ে কবিতাকেই ভেবেছিলাম সব। কবিকেই ভেবেছিলাম সর্বোত্তম। যদিও এখন ভাবি, কবিতাও ঠিক অবিনশ্বর কি-না বলা দুরূহ। তবু কবিতার জন্য জীবনপাত করার জন্যই একটি জীবন বেছে নিয়েছিলাম। সেই কোন শৈশবকাল থেকেই সেই অপরিণত বয়েসেই। এ বোধ হয় পূর্বনির্দিষ্ট কোনো ঘটনা, এই বোধ হয় আমার জীবনের পরম্পরা, আর কোনো জীবন নাই আমার, বাল্য, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য কিছুই নেই আমার, হয় আমি চিরকাল বালক, না হয় আমি চিরকাল বৃদ্ধ, চিরকাল আমি রুগ্ন তাপিত দগ্ধ কাতর। আমার কোনো স্বাভাবিক জীবন নেই, এক অস্বাভাবিক অসংলগ্ন অপ্রকৃতিস্থ জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি আমি, তারই সূচনাকালের সামান্য কিছু ফুটনোট, সামান্য কিছু আখ্যান এখানে। এই মিলে যা গড়ে ওঠার উঠুক, না ওঠে না উঠুক। কিছু ঘটনা, কিছু কাহিনি, কিছু কল্পকথা, যথাযথ বিবরণ বা জীবন-ইতিহাস কিছু নয়, জীবনকাহিনিও এক অর্থে উপন্যাস। মানুষ তার চরিত্র মাত্র। কত খণ্ড খণ্ড জীবন নিয়ে আমার জীবন, কত মানুষের জীবনের মধ্যে আমি বেঁচে আছি, অন্যের জীবনের মধ্যে বেঁচে থাকা এই জীবন নিয়ে সঠিক কোনো বর্ণনা দেয়া যায় না, কত স্রোত এসে মিশে যায়, কত দিনরাত্রি এসে হারিয়ে যায়, আবার কত খণ্ড মুহূর্ত উজ্জ্বল ও দীপ্র হয়ে ওঠে। আমি তাকেই জীবন বুঝি, তাকেই বলি কবিতার জীবন। আগেই বলেছি, আমাদের বাড়ির সাথেই কবিরাজ রজনীকান্ত দত্তের
আর্য ঔষধালয়, সেখানে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা—কবিরাজ রজনীকান্ত দত্ত। কবি ও কবিরাজ শব্দ দুটির সাথে আমার খুব বাল্যকাল থেকেই পরিচয়; কিন্তু কবিরাজ নয়, আমাকে আকর্ষণ করে কবি, রাজ কথাটা ছেঁটে ফেলি। আমি ভাবি, কবিরাজের দরকার কী, কবিই যথেষ্ট, আমি কবিরাজ থেকে কবি-ই বেছে নিই। আমার চোখে মনে অন্তরে গেঁথে যায় কবি। যেন অলৌকিকভাবেই কবি এসে আমার সমগ্র সত্তা অধিকার করে, ছোটবেলা থেকেই আমার চোখে ভাসতে থাকে কবি, এই নাম, এই শব্দ। কবিরাজ থেকে আমি দেখতে শুরু করি কবি, রাজ আমার চোখে পড়ে না। এসব ভেবে আজ অবাকই হই; কিন্তু সত্য, আমার জীবনের সত্য। যত এলোমেলোভাবেই হোক, যত ঘটনাচক্রেই হোক, এসব তো আমার অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্ত হয়েছে। আমি পেয়েছি এই বোধ, উপলব্ধি, অনুভব। এভাবে আমি কবি চিনেছি। কবিতে জড়িয়ে গেছি, কবিতায় জড়িয়ে গেছি। আমার অন্য কোনো পথ ছিল না। কবি না হয়ে বোধ হয় উপায়ই ছিল না আমার। ঈশ্বরই আমাকে কবি বানিয়েছেন, আমার জন্মগ্রাম, জল, মাটি, প্রকৃতি, মানুষ, আকাশ, মেঘ, বর্ষা, ঋতুচক্র, মানুষের জীবন কবি করে তুলেছে আমাকে। এত ঐশ্বর্য, এত উপাদান, এত ঐতিহ্য, এত আলো, এত রহস্য—এর মধ্যে কেউ কবি না হয়ে পারে? আমার আরো অনেক বড়ো কবি হওয়া উচিত ছিল, যা পারিনি তা আমার অক্ষমতা। প্রকৃতি পরিবেশ—ঈশ্বর আমাকে সব দিয়েছেন। এত দিয়েছেন যা বলে বোঝাতে পারব না। যা পেয়েছি তুলনা তার নেই। মানুষের কাছে প্রকৃতি ও মাটির কাছে এত যে পেয়েছি তার কোনো তুলনা হয় না। ‘দিয়েছি যতো নিয়েছি তার বেশি।’ আমি কতটা ব্যবহার করতে পেরেছি এইসব সম্পদ, এইসব ঐশ্বর্য।
গ্রামে মানুষ হয়েছি, কত কি যে দেখেছি হাটখোলা, মাঠ, প্রান্তর, খেয়াঘাট, নদী, বাঁশের সাঁকো, কাঠের পুল, পাখি, প্রজাপতি, জোনাকি, কত রকমের মানুষ, কত রকমের জীবন। এ আমার জীবনী নয়, বহু মানুষের জীবনকাহিনি। পাখির জীবনী, নদীর জীবনী, এইসব শব্দ-নৈঃশব্দ্য, আলো-অন্ধকার, কোলাহল, নির্জনতা, কলগুঞ্জন, কলকাকলি—এসবের মধ্যে বড়ো হয়েছি আমি। কত বৈচিত্র্য, কত বিস্ময়, কত কৌতুক, কত রোমাঞ্চ। আমাদের গ্রামে দুজন একেবারে বিপরীত চেহারার মানুষ ছিলেন, একজন লক্ষেশ্বরবাবু, আরেকজন কোটিশ্বরবাবু; কিন্তু এই লাখ আর কোটির অঙ্কের দূরত্বের চেয়েও লক্ষেশ্বরবাবু ও কোটিশ্বরবাবুর আকৃতির ব্যবধান অনেক বেশি। লক্ষেশ্বর অস্বাভাবিক মোটা, কোটিশ্বর যারপরনাই ক্ষীণকায়; এই শীর্ণদেহ নিয়ে কোটিশ্বর বাবুর বড়ো অশান্তি, ডাক্তার দেখান, ওষুধপত্র খান; কিন্তু কিছুতেই তাঁর স্বাস্থ্য ভালো হয় না। ওদিকে লক্ষেশ্বরবাবু মোটা থেকে আরো মোটা হন, লোকজন বলাবলি করে কোটিশ্বরবাবু ইনজেকশন নেয় আর লক্ষেশ্বরবাবু মোটা হয়, কী কাণ্ড। কত হাসির উপাদানই না ছিল আমাদের সেই জীবনে। এই হাসি-আনন্দ, কোলাহল, নৈঃশব্দ্য, এই ফুল, পাখি, বৃক্ষ, ঘাস, পুষ্পপল্লব অফুরন্ত, অনিঃশেষ; পদ্মফুল, কচুরিফুল, শালুক, শাপলা, কলমীলতা, বেত, বাঁশ, নদীর চরে গিমাশাক, সজনে ফুল, আম, জাম, কাঁঠাল, সরষে ফুল, ‘একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা’ উপচে পড়ছে প্রকৃতি। কত গন্ধ, কত ঘ্রাণ, কত শিহরণ, সব কি আর মনে আছে?
সিরাজগঞ্জে একবার কমলা সার্কাস এসেছিল, এই সার্কাস পার্টিতে ছিল একটা সার্চলাইট, সন্ধ্যাবেলায় সেই সার্চলাইটের আলো দশ-বারো মাইল দূরে আমাদের গ্রাম থেকেও দেখা যেত। আমি বাবার সাথে এই কমলা সার্কাস দেখতে গিয়েছিলাম। অদ্ভুত সব খেলা, অ্যাক্রোবেটিক, বাঘ, ঘোড়া, হাতি—এইসব পশু-প্রাণীর নানা ধরনের কসরত। অনেকটা গ্লোবের মতো গোলাকার একটা লোহার বৃত্তের মধ্যে মোটরসাইকেল চালিয়ে ওপরে-নিচে ওঠানামার খেলা দেখেছিলাম, এখনো সেই খেলা মনে মনে দেখতে পাই। সে সময় ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের যাত্রাপালার বই ছিল খুব জনপ্রিয়। তাঁর বই থেকেই আমাদের গ্রামের যাত্রাদলে সামাজিক, পৌরাণিক সব পালা হতো। রাজার পাঠ যারা করত তারা গায়ে রয়েল ড্রেস আর মাথায় রাজার মুকুট পরতো, এসব আনা হতো কলকাতা থেকে। আমাদের গ্রাম থেকে একটু দূরে রায়গঞ্জে জমিদার অনাদি সান্যালের বাড়ি। দালান-কোটা, বাগান সব মিলে দেখবার মতো সেই বাড়িটি। আমরা দল বেঁধে তাঁর বাগান থেকে ফুল তুলতে যেতাম। নিঃসন্তান অনাদিবাবুর মৃত্যুর পর তাঁর বাড়িঘর সম্পত্তি নানা জনে নানাভাবে দখল করে নেয়। অনাদিবাবুর স্ত্রী আমাদের বাড়িতে থাকেন। অনাদিবাবুর স্ত্রীর দাদা অর্ধেন্দু নারায়ণ মুন্সী বুড়ো বয়সে আমাদের গ্রামের স্কুলে এসে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনিও থাকতেন আমাদের বাড়িতে। মোটা কাচের চশমা দিয়েও প্রায় দেখতেনই না, সব দাঁতই পড়ে গেছে, মুখে বাঁধানো দাঁত, তবু চাকরির প্রয়োজনে তিনি শেরপুর থেকে আমাদের গ্রামের স্কুলে এসে মাস্টারি নেন। আমাদের গ্রামের এক লোক অতি দরিদ্র, প্রায় অন্ধ, চোখে দেখেন না, লাঠি সম্বল করে চলাফেরা করতে হয়; কিন্তু তার ছিল অসাধারণ পুষ্পপ্রীতি। বাড়িতে ছোট্ট একখানা ভাঙা চালাঘর; কিন্তু তার চারপাশে ফুলের বাগান, কতরকমের ফুল যে ছিল তার বাগানে। এই অন্ধপ্রায় মানুষটি নিজ হাতেই এই বাগান পরিচর্যা করত। ভেবে পাই না কীভাবে গাছে জল দিত, গাছের যত্ন করত। ফুল সংগ্রহ করত। কাউকে ফুল ছিঁড়তে দিত না। তার নাম ছিল দুখীরাম। বাড়ি বাড়ি ঘুরে তার পেটভাত জোগাড় করতে হতো। আমাদের বাড়িতে তার খাওয়ার ব্যবস্থাটা একরকম নিশ্চিতই ছিল, মা দুঃখীরামকে বলত, তুমি কখনো লজ্জা করবে না। আমাদের বাড়িতে চলে আসবে। খেয়ানৌকায় গরু-মহিষের গাড়ি পার হতো, দুটো নৌকা একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে এই গাড়ি পারাপারের ব্যবস্থা। গরু-মহিষ নৌকার সাথে সাথে নদী দিয়ে সাঁতরে পার হতো। গ্রামের দক্ষিণে ছিল মত্স্যজীবীদের বাড়িঘর। লোকে বলত জেলেপাড়া। কেউ কেউ মাঝিপাড়াও বলত। সেখানে বড়ো বড়ো জাল শুকানো হয়। হিন্দু জেলেদের পাশাপাশি মুসলমানরাও কেউ কেউ মাছ ধরার ও মাছ বিক্রির কাজ করত। তাদের বলা হতো জিউনী, এরা সাধারণত খাল-বিল থেকে কই-মাগুর-শিং মাছ ধরত, জিয়ানো মাছ ধরত বলেই বোধ হয় তাদের বলা হতো জিউনী। তেলের ঘানি টেনে যারা তেল বানাত তাদের বলা হতো কলু, তারাও থাকত গ্রামের দক্ষিণ দিকেই, খুবই দরিদ্র তারা, কোনো কোনো বাড়িতে গরু না থাকায় বউদেরই ঘানি টানতে হতো। ঋষিপাড়াও ছিল গ্রামের একপাশে, ঋষিদের মতোই আরেক শ্রেণির লোক ছিল তারা ডুলি, পালকি বাইতো, পূজো ও বিয়েতে ঢাক-ঢোল বাজাত, তাদের বলা হতো বাদ্যকর। মাটিয়ালও বলত কেউ কেউ। এছাড়া প্রায় সব গ্রামেই কামার, কুমোর, ছুঁতোর, নরসুন্দর এরাও থাকত। যারা মিষ্টি বানাত তাদের বলা হতো হালুই। আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামে ছিল বাগদীপাড়া। এরা সবাই অতি দরিদ্র। আমি এই বয়সেই সমাজের অর্থনৈতিক শোষণের চিত্রটা খুব ভালোভাবেই লক্ষ করেছিলাম। কী যে দারিদ্র্য, যেমন খাবার জোটে না তেমনি মাথার ওপরে কোনো রকমে ছন-খড়ের ছাউনি। জাতি-বর্ণ এসব যে প্রভেদ তার মূলে আছে অর্থনৈতিক বৈষম্য, হিন্দু সমাজে যেমন জেলে, ঋষি, বাদ্যকর এদেরকে অবহেলা করা হতো, একইভাবে মুসলমান সমাজেও জিউনী ও কলুদের উপেক্ষা করা হতো। জাতিভেদ বর্ণভেদের শিকড় হচ্ছে অর্থনীতির মধ্যে, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দারিদ্র্য, বঞ্চনার জন্যই সব সমাজেই এরা নিম্নশ্রেণির লোক হিসেবে চিহ্নিত, এদের সম্মান করা হয় না, মূল্য দেয়া হয় না। অথচ এরাই সমাজ-জীবনকে চালু রাখে। বেত-বাঁশ দিয়ে পলো, খালুই, কুলো, চালুনি, ধানের বেড় বানায়, আরো নানা ধরনের সুন্দর সুন্দর হাতের কাজ করত তারা। বাদ্যকরেরা কী সুন্দর বাদ্য বাজাত। জেলে, জিউনীরা মাছ ধরে সবার আমিষের জোগান দিত, কলুরা ভেজালহীন টাটকা সরষের তেল খাওয়াত সবাইকে, সেই সরষের তেল, সরষের তেলে ইলিশ ভাজা খেয়ে হিন্দু-মুসলমান বড়লোকেরা তাদের রসনা তৃপ্ত করত, অশেষ আনন্দ উপভোগ করত; কিন্তু এই কলুদের তারা কেউই সম্মান করত না, তারা ছিল অবহেলার শিকার, শোষিত বঞ্চিত নিপীড়িত, খাবার জুটত না, মাথা গোঁজার মতো এতটুকু আশ্রয় ছিল না, চিকিত্সার সুযোগ ছিল না, শিক্ষার সুযোগ ছিল না। বাড়ির বৌ-ঝিদের পর্যন্ত গরুর অভাবে ঘানি টানতে হতো। সে এক করুণ দৃশ্য। অনেক সময় গরুর অভাবে হালও টানতে হতো বৌ-ঝিদের। লোকজীবনের নানা উত্সব আনন্দ আয়োজনের মধ্যে এইসব দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা কোনো সুযোগ-সুবিধাই পেত না, অংশগ্রহণেরও
সুযোগ ছিল না তাদের, চিরবঞ্চিত, শোষিত, অর্থনৈতিক শোষণের নির্মম শিকার তারা। এই বাস্তবতাও আমার চোখ এড়ায়নি।
শৈশবেই এই নিষ্ঠুর শোষণের চিত্র আমি দেখেছিলাম। নানা কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও নানা আনন্দ উপকরণের মধ্যে থাকলেও এই শোষণ ও বৈষম্য আমি খুব ছোটবেলা থেকেই স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলাম। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাও তখন থেকেই তৈরি হয় আমার মধ্যে। আমার সন্ন্যাস বৈরাগ্য—এসবের কেন্দ্রে ছিল দরিদ্রদের প্রতি আমার মমত্ববোধ, তাদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমি সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজের অবস্থান ঠিক করি। তারাই হয়ে ওঠে আমার জীবনের মূল লক্ষ্য। হয়তো লিখতে শুরু করার মধ্যে এও ছিল একটি বড়ো কারণ। আমি জানতাম, কবির কাজ এই সামাজিক অন্যায় অসঙ্গতি শোষণের প্রতিবাদ করা। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা, তাঁর অগ্নিবীণা, তাঁর সাম্যবাদীর কবিতাগুলো তখন আমাকে খুবই গভীরভাবে আলোড়িত করতে থাকে; নজরুলের একেকটি জ্বলন্ত প্রতিবাদের কবিতা রাত জেগে জেগে মুখস্থ করতে থাকি। আমার মনে হয়, আমার সেই শৈশব-কৈশোরে চারপাশে দেখা এই নিম্নবিত্ত নিম্নবর্ণ শোষিত দরিদ্র পিছিয়ে থাকা নিপীড়িত মানুষের জীবন থেকেই আমি আমার প্রথম কবিতার উপাদান সংগ্রহ করি, তাদের কাছ থেকেই কবিতার পাঠ নিই, বুঝতে শিখি কবিতা কোনো বিলাসিতা নয়

পাঁচ
আমাদের গ্রামের নামটি নাকি একসময় ছিল ধান্যপুরী, প্রচুর ধান হতো এই অঞ্চলে—আউশ ধান, আমন ধান, রোপা ধান, সোনালি ধান্যে মাঠ ভরে যেত। এইসব অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতেই কি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনারতরী’ লেখার কথা মনে হয়েছিল? ধান্যপুরী নামটা কঠিন, ধান্যপুরী থেকে ধানপুর, ধানপুর থেকে ধানপুরা, তারপর ধানঘড়া। এই গ্রামে সব ধরনের পেশার মানুষ বাস করত। গ্রাম হলেও এটা আসলে নদীবন্দর, দুবেলা বাজার, সপ্তাহে দু’দিন কোল হয়, পাইকারী বেচাকেনার বাজারকে বলা হতো কোল। এখানে পাইকারী ধানচাল পাট বিক্রি হতো। বাজারে বড়ো বড়ো মুদি দোকান, চায়ের স্টল, মিষ্টির দোকান, কাপড়-চোপড়ের দোকান—সবই ছিল। তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি, গামছাও বোনা হতো এখানে। পাড়াজুড়ে সারাদিন মাকুর শব্দ, একেবারে জীবন্ত একটি অঞ্চল, নদী-নালা, শস্য, ফলফুল, পাখিতে ভরপুর; কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই ছিল দরিদ্র, তাদের দুঃখকষ্টের কোনো শেষ ছিল না। কামার, কুমোর, ছুঁতোর, ধোপা, নাপিত—এরাই সবল রাখত গ্রামীণ জীবনকে; কিন্তু এদের কাজের স্বীকৃতি বা শ্রমের মর্যাদা কিছুই ছিল না। এরা অবজ্ঞাই পেত সবার কাছ থেকে। জমি চাষ করে যারা সকলের খাদ্য জোগাত, সেই চাষিরা ছিল বঞ্চিত, অবহেলিত, বর্গাচাষিদের দুর্দশার কোনো শেষ ছিল না; জমিদার, জোতদার উচ্চবিত্তরা তাদের কাজের কোনো মূল্য দেয়নি, মধ্যবিত্তরাও তাদের উপেক্ষা করেছে, কি হিন্দু কি মুসলমান—সব সমাজেই নিম্নবিত্ত দরিদ্র লোকেরা ছিল অবহেলিত শোষিত, এই দরিদ্র শ্রেণির মধ্যেও সব সময় নারীরাই বেশি অত্যাচারিত ও নিস্পেষিত; দারিদ্র্য, দুরবস্থা, দুর্ভাগ্যের সবচেয়ে বেশি শিকার হয় নারীরা—একই কাজ করে তারা পুরুষের সমান মজুরি পায় না। সব দেশে সব সমাজেই নারীরা বেশি নিগৃহীত, যুদ্ধ, বিগ্রহের সময় নারীরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়ে পড়ে। তাছাড়া সংকট-বিপর্যয়ের সময়ে দারিদ্র্যের মুখে স্বামীরা অনেক সময় স্ত্রীকে ফেলে চলে যায়। মাকেই সন্তানদের মানুষ করতে হয়, লালন-পালন করে বড়ো করতে হয়। সমাজে নারীদের এই অসামান্য আত্মত্যাগ, অবদান ও ভূমিকারও কোনো স্বীকৃতি নেই। আমি খুব ছোটবেলাই বুঝেছিলাম মানুষে মানুষে এই বিভেদের মূলে আছে অর্থনীতি, অর্থনৈতিক অবস্থান; অর্থনৈতিক বৈষম্যই দরিদ্র লোকদের সমাজে এভাবে হেয় করে রাখে, তারা ছিল রোগ-ব্যাধি, অকালমৃত্যুর শিকার। কবির দায়িত্ব এর প্রতিবাদ করা। সিরাজগঞ্জে তখন বড়ো ডাক্তার পার্বতী চৌধুরী, পার্বতী শুনে কারো কারো মনে হতে পারে মহিলা ডাক্তার, কিন্তু না, পুরুষদের নামও দুর্গাদাস, দুর্গাপদ, দুর্গাচরণ হয়, কিংবা পার্বতীদাস, পার্বতীচরণ এরকম হয়। পদ, দাস, চরণ শব্দটি একসময় বাদ পড়ে যায়। দুর্গাবাবু, পার্বতীবাবুই নাম হয়ে ওঠে। খুব নামডাক পার্বতী চৌধুরীর। তিনি কোট-প্যান্ট ও সাহেবদের মতো মাথায় হ্যাট পরতেন। ঘোড়ার গাড়ি চড়ে তিনি গ্রামেও রোগী দেখতে আসতেন। পার্বতীবাবু আমার মামাবাড়ির পারিবারিক চিকিত্সক, কোনো অসুখ-বিসুখ হলে বাড়িতে তাঁর ডাক পড়ত। ছয়-সাত মাইল দূরে এই গ্রামে তিনি ঘোড়ার গাড়িতে করে চলে আসতেন, দুয়েকবার আমাদের গ্রামে আমাদের বাড়িতেও এসেছেন। পরে আমার কবি শিশির ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তিনি সাহিত্য পত্রিকাও বের করতেন। জানতে পারি শিশির ভট্টাচার্য সিরাজগঞ্জের পার্বতী চৌধুরীর জামাতা। শিশিরবাবুর সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্বও গড়ে ওঠে।
আমার জন্ম দেশবিভাগের কিছু আগে। তখন ভারতবর্ষ জুড়ে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন চলছে, গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে ব্রিটিশ শাসকদের রাজত্ব প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, কেঁপে উঠেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। এর পরে ভারত স্বাধীন হয় ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতা আসে দেশ বিভাগের মধ্য দিয়ে। দেশ বিভাগের ফলে দলে দলে লোক তত্কালীন পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে চলে যেতে থাকে। উদ্বাস্তু সমস্যা এক ভয়াবহ রূপ নেয়। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে মানুষ দেশত্যাগ করতে শুরু করে, পশ্চিমবঙ্গে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হলেও তাদের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত ছিল না। কাউকে কাউকে আশ্রয়ের জন্য দণ্ডকারণ্য পর্যন্ত যেতে হয়। আমার মামা-মাসীমারা দেশ বিভাগের পরপরই পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। কেউ কলকাতার পাশে নৈহাটি, কেউ পশ্চিম দিনাজপুরে বালুরঘাট, কেউ উত্তর বঙ্গের শিলিগুড়ি।
আমার বয়স তখন খুবই কম, প্রায় সবসময়ই আত্মীয়-স্বজনদের দেশত্যাগ নিয়ে মাকে কাঁদতে দেখতাম। আমার বাবা কিছুতেই নিজের দেশ ছেড়ে যাবেন না, যতকিছুই হোক তিনি মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে প্রস্তুত। সামাজিক অবস্থা তখন বিকৃত অশুভ রাজনীতির প্ররোচনায় ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উপমহাদেশে তখন বড়ো দুঃসময়। সেই বাল্যকালেই তার কিছু কিছু বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা আমার মনে জমা হয়। যদিও আমাদের গ্রাম ও এই অঞ্চলটি ছিল খুবই সম্প্রীতিপূর্ণ, কখনো কখনো ছোটখাটো ঝগড়া-কলহ হলেও কখনো এখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা হিংস্রতা দেখা যায়নি। হিন্দু-মুসলমান ভাই-বন্ধুর মতো একত্রে বসবাস করেছে। একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার অন্তত সৌভাগ্য, আমি কোনো বিভেদ দেখিনি। যদিও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই পরিস্থিতি পালটে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামে ঢুকে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে, তাদের উস্কানিতে অনেক প্রতিবেশীও প্রতিবেশীদের বাড়িতে লুটপাট করতে শুরু করে, কিন্তু আগাগোড়া আমাদের এই অঞ্চলটি ছিল শান্তিপূর্ণ একটি এলাকা।
পাকিস্তানিদের কুশাসন ও কুমন্ত্রণা এই শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটিতেও অশান্তি, উত্তেজনা ও ধ্বংস ডেকে আনে। মামা-মাসীমাদের দেশত্যাগের ফলে মা’র মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়, প্রায়ই দেখতাম কেমন বিষণ্ন মুখে বসে আছে। কবে তার দেশত্যাগী ভাই-বোনদের একখানা চিঠি আসবে। এভাবে দিন কাটতে থাকে। পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় তখন মুসলিম লীগ, তাদের অত্যাচার, অনাচার, দুঃশাসন বাড়তে থাকে। পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেকের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রমনা ময়দানে বক্তৃতা দিতে উঠে সদম্ভে ঘোষণা করেন, ‘উর্দু, কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’, কিন্তু সেই জনসভাতেই বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণার প্রতিবাদ জানান, সশব্দে বলে ওঠেন, ‘না না, কখনোই না’। বাঙালির জীবনে তৈরি হয় এক নতুন ইতিহাস, তারা তাদের আপন সত্তাকে খুঁজে পায়, বাঙালি তার আত্মপরিচয়ের সন্ধান পায়।
আমি মেঘ, বর্ষা, বৃষ্টি, নদী, জলধারা, প্রকৃতির মধ্যে কিছুটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকলেও সেই কিশোর বয়স থেকেই বাঙালির নিজস্ব রাজনৈতিক নবজাগরণের দিকেও আমার চোখ নিবদ্ধ হয়। আমার শৈশবের সেই কবিমনকেও আলোড়িত ও উদ্দীপ্ত করে বাংলা ভাষা ও বাঙালির জাগরণ। মুসলিম লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা ক্রমে কমতে থাকে, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি ঘটে।
আমি আগেও সেকথা লিখেছি। সিরাজগঞ্জে তখন ছিলেন কবি ও নাট্যকার ফররুখ শিয়র। তাঁর ‘ব্লাক মার্কেট’ নাটকটি সে সময় খুব জনপ্রিয় হয়। ওই যে জারি গানটি—‘মরি হায়রে হায়, দুঃখ বলি কারে/ সোনার বাংলা শ্মশান করল মুসলিম লীগ সরকারে’। এই জারি গানটি সম্ভবত তিনিই লিখেছিলেন।
আমি আরো কবিতার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে থাকি। চোখের সামনে যখন যা দেখি, তা-ই হয়ে ওঠে আমার কবিতার বিষয়। প্রকৃতি, গাছপালা, মেঘ, জ্যোত্স্না এসব আমার মন বিভোর করে রাখে। কবিতার জন্যেই সেই তখন থেকেই আমি কত সময় যে ব্যয় করেছি, কত দিনরাত্রি যে আচ্ছন্ন হয়ে একা কাটিয়েছি তা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর উপায় নেই। আমাদের বাড়িতে ছিল একটা খুব বড়ো দেয়ালঘড়ি, ওয়ালক্লক, এই ওয়ালক্লকটিতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেল বাজত, এই বেলের শব্দে কখনো কখনো আমার ঘোর কাটত; আমার সেই আচ্ছন্নতার মধ্যে এই দেয়ালঘড়ির শব্দ আমার মনে বসে যায়। আমি এখনো যেন কোনো কোনো মুহূর্তে একাকিত্ব, নির্জনতার মাঝে সেই ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ শুনতে পাই। আমার সেই শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে ফিরে যাই আমি, চারপাশে তাকাই। ব্যাকুলভাবে উত্কর্ণ হয়ে উঠি। কিন্তু কোথাও কিছু দেখতেও পাই না, শুনতেও পাই না। জলপ্রপাতের কল কল ধ্বনির মতো সেই ঘড়ির শব্দ এখনো মাঝে মাঝে আমার মধ্যে বাজতে থাকে। আমি কেমন উদাস এলোমেলো হয়ে যাই; রাখালের বাঁশি, মাঝির ভাটিয়ালী গান, কোকিলের কুহুস্বর, পাখিদের কলরব, বৃষ্টির শব্দ, শিউলি ফুল ঝরে পড়ার টুপটাপ ধ্বনি, বর্ষার নতুন জলের কলস্বর এই সবের মধ্যে সেই দেয়ালঘড়ির শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আমি আমাকে খুঁজতে থাকি, এই হয়তো আমার জীবনকাহিনি, আমার কবিতার জীবনী।
নানা পত্র-পত্রিকায় তখন আমার কবিতা ছাপা হতে শুরু করেছে। ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী, মাসিক মোহাম্মদী, মাহে নও এসব পত্রিকায় তখন আমার কবিতা ছাপা হয়, তখন আমি নিজেই নিজের মধ্যে কবি হয়ে উঠেছি। আমার সেই কবিকে আমি আমার নিজের মধ্যে অনুভব করতে থাকি, তখনই বুঝতে শিখি কবির জীবন আলাদা; কতকিছুর মধ্যে যে জড়িয়ে পড়ি, কত মোহে, কত আলোতে অন্ধকারে, কত শব্দে গন্ধে। সেই বয়সে নিজেকে ধরে রাখাই কঠিন, শুধু সেই বয়সই বা বলি কেন, এই বয়সেও নিজের মধ্যে নিজের কবিকে তার আবেগ উত্তেজনা বিভোরতাকে ধরে রাখা দুরূহ। কত কিছুর মধ্যে যে হারিয়ে গেছি, হারিয়ে যাই, শোকে মোহে শব্দে নৈঃশব্দে ভালোবাসায় বিচ্ছেদে বিষাদে সুখে। কবির জীবনের এত উল্লাসও কারো জীবনে নেই, এত দুঃখও কারো জীবনে নেই। সেই বয়স থেকেই কিভাবে যে নিজেকে ক্ষয় করতে শুরু করেছি আমি, ভাঙতে ভাঙতে পোড়াতে পোড়াতে এতটা পথ আসা কিংবা কোথাও আসা-ই নয়। সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু কবিতাই হয়ে আছে আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। আমি বলতে চাই আমার জীবন, আমি ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্য যা করেছি সবই এই কবিতার জন্য; এখন, কখনো কখনো ভাবি, কবিতা কেন আমাকে এভাবে জড়ালো, এভাবে পোড়ালো, এভাবে ছারখার করল। কবিতা নিয়ে একটা জীবনেই ছেলেখেলা করলাম, ধুলোমাটির খেলাও বলতে পারি, হাতে কিছুই থাকল না, সব হাত গলিয়ে কোথায় পড়ে গেল। আমার জন্য আমার চারপাশে যারা তাদের জীবনও নষ্ট হলো, আমার স্ত্রী-সন্তান শুধু কষ্টই পেলো। ওদের জন্য এখন আমার খুব কষ্ট হয়। কত দুঃখের মধ্যে ওদের ফেলেছি; বড়ো দায়িত্বহীন আমি, এই ভয়ংকর দায়িত্বহীনতার কথা আমিই শুধু জানি। আমি এই ভরা বর্ষার জলোচ্ছ্বাসের মুখে দাঁড়িয়ে একা, নিঃসঙ্গ, বন্ধুহীন, কেউ নেই আমার, এমনকি আমিও আমার নেই। এমন নিরন্তর একা একা এই আমূল নিঃসঙ্গতার মধ্যে কেবল নিজের সঙ্গে কথা বলা, নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো। এই হচ্ছে কবিতার জীবন। কত সঙ্গী, বন্ধুজন, ভক্ত, অনুরাগী, শত্রুমিত্র, কত বিদ্রূপ, অবজ্ঞা, কত অপমান তাচ্ছিল্য, কত কটাক্ষ, পরাজয় নিজের মধ্যে ধারণ করে কবি হয়ে উঠেছি আমি, প্রকৃতপক্ষে কেউ কখনো আমার সঙ্গে ছিল না, কোনো সঙ্গী না, বন্ধু না, সুহূদ না, একা একা পাড়ি দিয়েছি এই মহাসমুদ্র। এই আমার অসীম বিস্তীর্ণ জলভূমি, পায়ের নিচে এক ইঞ্চি মাটিও না, ঢাকায় এসেছি সবার পরে, আমি সবার পেছনের মানুষ, সর্বদা পেছন সারিতে বসি, হয়তো সেই পেছনে বসার জায়গাও পাই না, এই দুঃখ-অপমান নিয়েও আমি কবিতাকে বুকের গভীরে পুষে রেখেছি, কবি হওয়ার দুরন্ত তৃষ্ণা ছাড়িনি। কতদিন লাইট পোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে একা একা কেঁদেছি, ফুটপাতে বসে হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে এই লজ্জিত-পরাজিত মুখ ঢেকে রেখেছি, কত ভুল কাজ করেছি, কত কাঁটা বিঁধিয়েছি পায়ে, কত ভুলপথে চলে গেছি। মানুষ হতে হলে যা যা করতে হয় তার কিছুই করিনি। অকাজে অপকর্মে আলস্যে দিনরাত্রি কাটিয়ে দিয়েছি; উদ্ভ্রান্তের মতো, স্বপ্নতাড়িত অসংলগ্ন মানুষ কোথায় গেছি, কোথায় বসেছি, কোথায় দিনরাত্রি কাটিয়েছি তার অনেককিছুই আজ আর মনে নেই। আমার ওপর দিয়ে প্লাবন বয়ে গেছে, জলোচ্ছ্বাসের চেয়েও বেশি জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও বেশি ঘূর্ণিঝড়, এইসব তথ্য কেউ জানে না, জানানোও যাবে না কখনো কাউকে। আমি যাদের সঙ্গী ছিলাম যাদের সঙ্গী হতে চেয়েছিলাম তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, চালাকি করেছে, আমি তার মধ্যে অস্থির উদ্ভ্রান্তের মতো শুধু একা একা ঘুরে বেড়িয়েছি। আজও এই বয়সেও ঘুরে বেড়াচ্ছি। বসার মতো কোনো জায়গা পাইনি, কোনো চেয়ার পাইনি কোথাও। কোনো উচ্চপদ পাইনি। কোনো প্রতিষ্ঠান গড়তে পারিনি, কোনো সংঘ-সংগঠন গড়তে পারিনি। আমি একার চেয়েও একা, সেই জন্ম থেকে জন্মসূত্রেই আমি একা, এ যেন পূর্বনির্দিষ্ট, আমার অন্যকোনো উপায় নেই, আমি কখনো পাখির সঙ্গে কথা বলি, উপচে পড়া জোছনার সঙ্গে কথা বলি, অন্ধকারের সঙ্গে কথা বলি, কোনো নিঃসঙ্গ বৃক্ষের সঙ্গে কথা বলি, কখনো মানুষের মিলিত কণ্ঠস্বরের সঙ্গে কথা বলি, তারা বুঝতেও পারে না, এই বালক, এই কিশোর, এই বয়স্ক শিশু তাদের সঙ্গে কী কথা বলছে। তাদের নিয়েই আমার জীবন, আমার জীবন-ইতিহাস, আমার কবিতার কাহিনি; না না, সেভাবে সুসংবদ্ধরূপে দিনক্ষণ তারিখ মিলিয়ে সব নাম-ধাম যুক্ত করে ঘটনার পর ঘটনা সাজিয়ে আমার জীবনস্মৃতি লেখা হবে না, আত্মকথা লেখা হবে না; আমার জীবন খুব আলাদা, আমার জীবনকথাও আলাদা, আমার জীবনকথা কবিতারই জীবনকথা, কবিতার বাইরে আমার আর কোনো জীবন নেই। কবিতার জন্যেই আমি ভালোবেসেছি, প্রেমে ডুবেছি, দুঃখে মজেছি এলোমেলোভাবে এই কবিতার কথাই আমি লিখে যাব, তার মধ্যে থেকেই যেটুকু আমাকে পাওয়া যায়, যতটুকু আমাকে পাওয়া যায়। আমি তো অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, জোছনায় গলে যাওয়া মানুষ, স্বপ্নে মোহিত হওয়া মানুষ। আমি উড়তে উড়তে পুড়তে পুড়তে এখানে এসেছি। কোথাও আসিনি, আসা যাওয়ার পথের ধারে হয়তো কিছু ফুল ফোটাতে চেয়েছি, পারিনি, দুঃখ নেই, পারতেই হবে তার কি কোনো কথা আছে, কিন্তু আমি এটুকু জানি, আমি চঞ্চল, আমি সুদূরের পিয়াসী। আমি কী ধরলাম, কী ছাড়লাম কিছুই জানি না, শুধু এটুকু জানি আমি শুধু ভাসলাম, অন্তহীনভাবে ভাসলাম, সেই উদ্দাম উচ্ছল জলস্রোতের মধ্যে আমি আমার নিঃসঙ্গ ভেলা ভাসিয়ে দিলাম, সেটুকুই হয়তো করেছি আমি, ভাসাও তোমার ভেলা, কোথাও হয়তো পৌঁছা হয়নি, পৌঁছা হবে না, দুঃখ নেই, আমার যা করার আমি তা-ই করেছি, তাতে কী, আমার হাতে কোনো গোলাপ ফুটবে না, কোনো গন্ধ ছড়াবে না, আলো বিচ্ছুরিত হবে না, আমি এই একাকিত্বের মধ্যে অন্ধকারে মিশে যাব। জীবনকে আমি রূপকথা ভাবি না, আমি সবসময়ই ধুলোমাটির মধ্যে, মাটিতেই পা রেখেছি, হয়তো শক্ত করে দাঁড়ানো হয়নি, পায়ের নিচে অনেক সময় মাটি পাইওনি, কিন্তু আমি মাটি ছাড়িনি, মাটিতেই লেপটে আছি, এই আমার জীবন, এর কোনো অভিনব আশ্চর্য বিবরণ হয় না, অসামান্য কোনো বর্ণনা হয় না, আমি ভেঙে-পড়া, নুয়ে-পড়া মানুষ, কাতর, আহত, অসহায়। কিন্তু আমি তাকিয়ে আছি আলোর দিকে, বারবার সেদিকেই মুখ করে দাঁড়াতে চেয়েছি আমি, এটুকুই আমার আনন্দ, এটুকুই আমার সুখ। কী হয়েছে, কী হয়নি, তা নিয়ে ভাবি না। পিঁপড়ের মতো এই ছোট্ট জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে যেতে চাই। (অসমাপ্ত)

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২৭
ফজর৪:০২
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৭
এশা৮:০৮
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :