The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

ভয় অভয়ের নগরী

অদিতি ফাল্গুনী

‘পাগলের ডঙ্কা বাজায় হরিচান্দ বোলে,
নাগরের জয়ধ্বনি করে সকলে...
রামাগণে বামা স্বরে করে মঙ্গলাচরণ,
চৌদ্দ মদন সঙ্গে লইয়ে অপদৈত্যের আগমন!
প্রেমরসে হইয়ে মগন করে মধুর সঙ্কীর্তন—’

...এমনিতে ছাল ওঠা কুকুরের মতো দেয়ালের প্লাস্টার ওঠা, রংচটা হাসপাতাল। মেল ওয়ার্ডের সার সার বিছানার একটির নিচে পেতে রাখা গামলায় কদিন ধরে সমানে রক্তবমি হচ্ছিল দেবজিতের। গতকাল থেকে ডাক্তার আর নার্সদের কড়া হুকুমে টানা চব্বিশ ঘণ্টা চুপ করে থাকায় খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গলা, বুক আর অসাড় বোধ করতে থাকা শরীরের গোটা ওপরের অংশ কেমন একটু হালকা আর নির্ভার বোধ হতে থাকে! অবশ্য শরীরের ওপর বা নিচ বলে আর কী? লাঠি আর হকিস্টিকের বাড়ি তো সপাট সমানে গায়ে পড়েছে টানা এক ঘণ্টা। পনেরো জন মিলে তাকে একা একজনকে মেরেছে। প্রাণ বাঁচাতে সে সাঁ সাঁ দৌড়েছে আর পনেরোটি মানুষ লাঠি আর হকিস্টিক হাতে তাকে মেরেছে। সে মার খেতে খেতে দৌড়েছে, দৌড়াতে দৌড়াতে পড়ে গেছে, তখন সবাই ঘিরে ধরে তাকে পায়ে পাড়িয়েছে...স্যান্ডেল ও স্যান্ডেলের কাদাসুদ্ধ পায়ে তাকে পাড়িয়েছে...তবু অন্যদের মতো...অনিল, নির্মল বা শশীর মতো মাথায় বা পায়ে রাম দার কোপ তো পড়েনি তার। কাজেই ক্র্যাচ লাগছে না। বাহ্যি পেচ্ছাপ চাপলে একা একাই বাথরুমে যেতে পারছে। সে-ই কি ভগবানের অশেষ দয়া নয়? মাথাতেও ব্যান্ডেজ নেই তার। একদিক থেকে দেখলে সে-ই এই ওয়ার্ডের সবচেয়ে সুস্থ রোগী। ক্র্যাচ নেই, পায়ে-মাথায় ব্যান্ডেজ নেই... কিন্তু আবার এই ওয়ার্ডে একা তারই রক্তবমি হচ্ছে। কেন? তবু গতকাল থেকে আজ ভোর অবধি টানা চব্বিশ ঘণ্টার মৌন ব্রতে কি খুব ভোরের সাদা আলোয় ঘুম ভেঙে গেল তার? নিজেকে খুব হালকা লাগল? আর তাতেই কি গলায় গুনগুনিয়ে উঠতে চাইল ওড়াকান্দিতে বারুণীর মেলায় মতুয়া দলের গান? মেল ওয়ার্ডের পাশের টানা করিডোর থেকে একটু হেঁটে গেলেই ময়লা কাদা থিকথিকে আর ভাঙা স্যুয়ারেজ পাইপ ও বেসিন থেকে অবিরত জল পড়া বাথরুমের হাড়-কাঁটা সমৃদ্ধ বেসিনে কুলি করে, চোখে জল দিয়ে আবার ওয়ার্ডে ফিরতে ফিরতে এই নওয়াপাড়া হাসপাতালের সামনের ধূ-ধূ সবুজ মাঠ, মাঠের সামনের কিছু গাছে জমে থাকা ভোরের কুয়াশা তাকে কি পুনশ্চ জীবনের প্রতি আরাম বোধে আহ্লাদিত করে?
‘জয় গুরু—জয় বাবা হরিচান্দ গুরুচান্দ!’ তা গানের গলা তো তোমার তেমন খারাপ নয় দেবজিত্! এক নম্বর প্রেমবাগ ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সে সেক্রেটারি। বক্তৃতার গলা তার জম্পেশ। কথা যে বলতে পারে বেশ গুছিয়েগাছিয়ে তা অনেকেই স্বীকার করে। ইউনিয়নের বাজারে তার টেইলরিং বা দর্জির দোকান। ফুট মেশিনে দমাদম পা নেড়ে রাত-দিন জামা-কাপড় সেলাই করে করেই বড় মেয়েটিকে কলেজ পাশ করিয়ে এখন নাকি ভার্সিটিতেও ভর্তি করাবে। আবার এই দেবজিত্ই পালা গানের আসরেও দিব্যি গান গায়। তাই বুঝি গেলবার বারুণী স্নানের তিথিতে ওড়াকান্দিতে বারুণীর মেলায় মতুয়া দলের গান আধফোঁটা সকালের এই কুসুম সাদা আলোয় তাকে ওয়ার্ডের করিডোরের কার্ণিশে ঝুঁকে গাইয়ে নেয় সেই ঈশ্বরপ্রেমে মাতোয়ারা হবার গানের স্থায়ী থেকে অন্তরা অবধি?
‘প্রেমের পাগল যতজন মিশা গেছে ঐ দলে
যোগীজনা যোগ ভুলে, যজ্ঞ পবিত্র ফেলে...
নাচে দু বাহু তুলে, ভাসে দু নয়ন জলে
ভূতলে সুতলে...পাগলের ডঙ্কা বাজায়...’
এমন না যে গলা ছেড়ে গাইছিল দেবজিত্। একটু গুনগুনিয়েই সুর টানছিল। আর তাতেই আবার বেদম কাশি শুরু হলো তার। কোনোমতে রুমে ঢুকে বিছানার নিচের গামলাটা সে নিজেই টেনে মুখ নিচু করল। গলগল করে আবার বের হওয়া শুরু হলো রক্ত।

‘কি দেবুদা, একটু ভালো ঠেকিছে তো আবার গান শুরু করিছ?’ মুখোমুখি বেডে অনিল কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসে। কোনোমতে বালিশে পিঠ ঠেকায়। তার তো দুটো পায়েই ব্যান্ডেজ। হায়রে ভোটের দিন! তুই কেন আসিস রে বাবা ভোট? দেবজিত্ কি কয়েকবারই ওয়ার্ড আর ইউনিয়নের নেতাদের জোড়হাত করে বলে নি, ‘ভেবে দেখেন আমরা ভোট দিতি যাব কি যাব না। মা-বউ-বোন-বিটি নিয়ে আমাদের সংসার। জামাতের লোকরা এসে পিটোতি শুরু করলি কি হবেনে? গরিব মালো আমরা! ভৈরবে জাল ফেলে মাছ মেরে কেউ খায়। কেউ আমার মতো ছোট দর্জি কি মুদির দোকান চালায়! এইসব ভোটটোট কি আমাদের পোষায়?’
‘এ কতা তুমি কলি হয় দেবজিত্? তুমি কিনা আমাদের তৃণমূলের এত বড় সংগঠক! তোমাকে পার্টি কত বিশ্বাস করে!’ নেতা বলেছিলেন।
ভোটের আগের রাত বারোটায় তবু দমাদম কয়েকটা বোমা পড়ার শব্দ শুনল তারা। তবু নেতাকে কথা দিয়েছে যখন, কথা তো কথাই! পিতার কথার দাম রাখতে রামচন্দ্র চৌদ্দ বছরের বনবাসে যায়, মায়ের কথা মানতে পান্ডবেরা পাঁচ ভাই মিলে এক বউ নিয়ে ঘর করে, আর দেবজিত্ সরকার বুঝি এইটুকু পারবে না? পার্টি তাকে বিশ্বাস করে পোলিং সেন্টারে কাজ করতে দিয়েছে! হাজার হোক, এই দলের পোস্টারেই না লেখা থাকে, ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলমান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান! আমরা সবাই বাঙালি!’? সাতসকালে বউ ঝিনুক সরকারের ছলছল চোখ গম্ভীর মুখে উপেক্ষা করে, বিড়ি টানতে টানতে, টেনশনে অত সকালে বউয়ের বাড়া গরম ভাতে ঘি-আলু সেদ্ধ না খেয়েই সে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে সাতটায় পৌঁছে গেছিল ‘চাঁপাতলা আলিয়া মাদ্রাসা’য়। সেখানেই পোলিং সেন্টার। গিয়ে দেখে তল্লাটের নামী জামায়াত নেতা খোদ আদিব ইউসুফ মওলানার ক্যাডার...ঐ শিবিরের ছেলেরা সব হাজির! একটু থমথমে লাগলেও পার্টির জেলা পর্যায়ের হাই কম্যান্ডকে পর্যন্ত সে কথা দিয়েছে। কথা দিয়েছে যে এই পাঁচশ ভোটারের গ্রামের সব ভোট সে পার্টির ব্যালট বাক্সে ভর্তি করে দেবে। তাই একটু কেমন কেমন লাগলেও পকেট থেকে মোবাইল বের করে গ্রামের কয়েকজনকে ফোন করে বলল, ‘মেয়েদের নিয়ি তোরা আয়! কেন্দ্রে আয়! সকাল সকালই ভোট দিয়ি যাক সব!’ ফোন শেষ করতে না করতেই আবার ফুটল বোমা। ভয়ে ইউনিয়ন সেক্রেটারি ভাইকে ফোন দিতে থাকে সে। কিন্তু ফোনের মেয়েটা ঐ শহুরে মেয়েদের ন্যাকা ন্যাকা গলায় বলতে থাকে, ‘দুঃখিত, এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না!’ পাঁচ-ছয় রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুটতে না ছুটতেই তার চারপাশে ঘিরে ধরল জনা পনেরো মানুষ। সবার হাতেই লাঠি আর হকিস্টিক। কেঁদে ফেলল দেবজিত্, ‘তোমরা ভোট দিতি না দিলি দেব না। কিন্তু আমাদের গ্রামের উপর দোহাই লাগে হামলা করো না! একই গাঁয়ের মানুষ আমরা!’
প্রথম কার হাতের হকিস্টিকের বাড়ি তার গায়ে পড়ে তা এখন ঠাওর করা কঠিন। সবই তো চেনা মুখ। শুধু প্রচণ্ড ভয়ে, এক অজানিত ত্রাসে সে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেছিল...পোলিং সেন্টার কাম মাদ্রাসার পুকুরের পাড় থেকে শুরু হলো তাকে পেটানো! আর সে পিটানি খেতে খেতেই ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে পড়ে যায়। স্যান্ডেলে কয়েকজন তাকে পাড়িয়ে ধরতেই আবার সে জীবন বাঁচানোর অদম্য ছটফটানিতে উঠে দৌড়ায়। কোনোমতে নিজের পাড়ায় পৌঁছেই অজ্ঞান হয়ে গেছিল। আর চোখ মেলে নিজেকে দেখে এই নওয়াপাড়া হাসপাতালে। এখানে আহত অন্য প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানতে পায়, আহত তাকে এই হাসপাতালে পাঠিয়েছে ভৈরবের অপর পাড়ের বাপ্পি চেয়ারম্যান। যখন পার্টির অন্য বড় ভাইরা মায় ‘দাদা’রা পর্যন্ত তাদের কারো ফোন ধরেনি, একা বাপ্পি চেয়ারম্যান দুদিন ধরে নদী সাঁতরে ওপারে ওঠা সব নর-নারীকে আশ্রয় দিয়েছেন। তার লোকেরাই বিশাল সব মাটির চুলায় ডেকচি চাপিয়ে এই অভুক্ত মানুষগুলোকে খিচুড়ি রান্না করে খাইয়েছে। নৌকার মাঝি হতে হলে বুঝি এমন হতে হয়! আর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরতে ফিরতে, আশপাশের বেডে আহত প্রতিবেশীদের দেখতে দেখতে তাদের কাছ থেকেই সে শুনতে পায় সেই দিন রাত এগারোটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে তার বাড়ি ফেরা মেয়ে মাত্র একটি লাফের এদিক-ওদিকে জান আর ইজ্জতে বেঁচে গেছে! একদম ঠিক সময়ে ঝাঁপ দিয়ে... ভগবানের কী মহিমা...একটি খেয়া নৌকা তখনো ছিল! সেটাতে উঠে বসতেই বাসুধর কীর্তনিয়া সোজা দাঁড় টেনে মেয়েকে পৌঁছে দেয় ওপারে...তারপর আর কেউ নাকি নৌকা পায় না...মাঘ মাসের রাতের ভৈরব তার হিম কালো জলে তবু মাতৃ আশ্রয় দিয়েছিল বৈকি অসংখ্য সাঁতরে বেড়ানো, জলে মাথা লুকিয়ে থাকা তার বহু সন্তান-সন্ততিকে! ভাগ্যিস মেয়েরা সব সন্ধ্যা থেকেই ঝাঁপ দিয়েছিল নদীতে। কেউ সাঁতরে আর কেউ নৌকা করে পৌঁছে গেছিল ওপারে।
হাসপাতালের আয়া সকালের প্রাতরাশ নিয়ে ঢোকে। সবার হাতে একটি করে থালা ধরিয়ে দেয়। সেই কয়েক পিস পাউরুটি, একটি আস্ত সেদ্ধ ডিম আর কলা।
‘জানেন তো দাদা, জাকারিয়া, ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি আর তার দলবল আপনাদের গাঁয়ের পেছন দিকটায় সন্ধ্যা বেলায় একদফা হামলার পর রাতে আর একবার গিয়িছিল আর তার লোকেরা তখন প্রতিটা বাড়ির টিনের দরজায় দাও দিয়ি কুপিয়ে বলিচে কি—মেয়ে মানুষ তো একটাও নাই, বেটা মানুষও নাই?’ আসলাম হোসেন বলে। সে শেখের ছেলে হলেও আওয়ামী লীগ করে। কাজেই তার মাথাতেও নির্বাচনের দিন রাম দার কয়েকটা কোপ পড়েছে। বাচ্চা ছেলে। বছর চব্বিশ বয়স! লম্বা, শ্যামল, মায়া কাড়া চেহারা। তাকে পাঁচ তারিখ রাত একটার দিকেই নাকি আনা হয়েছিল এই হাসপাতালে। উদ্ভ্রান্ত তার মা-ও নাকি পেছন পেছন এসেছিল। মাথায় সেলাই দেবার সময় ছেলের মুখে ঝরঝর করে রক্ত পড়তে থাকার কথা প্রতিদিনই ভদ্রমহিলা ছেলেকে দুপুরের খাবার দিতে এসে হাউমাউ করে বলতে থাকে। দেবজিেদর নিজের পাড়ার বউ-মেয়েরা এখনো বাড়ির পুরুষদের রান্না করে খাবার পাঠানোর পর্যায়ে আসেনি। ভাঙা ঘরদোরে কি বা রান্না করবে তারা?
‘আমরা তো দাদা সন্ধ্যার পর রাত্তিরের দিকি সাহস করে কজনা মিলি গেলাম আপনাদের পাড়ায় হামলার পাল্টা দিতি। ওরা সংখ্যায় ছিল অনেক বেশি। আমাদের চোকের সামনেই দিকি এইভাবে দাও দিয়ে বারোচ্ছে সবার দরজায় আর ওই কথা কচ্চে। তারপর তো ধেয়ে এল আমাদের দিকি। মাথায় যখন দুটো-তিনটে দাওয়ের বাড়ি মারল...তারপর দাদা আমার আর কিছু মনে নেই!’ আসলাম হোসেন পাউরুটির সাথে সেদ্ধ ডিম মুখে পোরে।
‘এই জাকারিয়া এক বদমাইশ। ও ব্যাটার লোকজনরাই তো আমার পায়ে আর মাথায় রাম দা দিয়ি কোপাল!’ অনিল কুমার বিশ্বাস ফোঁস করে ওঠে। পরমুহূর্তেই তার গলায় কৌতুক খেলা করে, ‘শোনো আসলাম, তোমার বয়স গুনে গুনে হলো মোটে চব্বিশ। তোমরা যদি এই বয়সিতিই দুটো দাওয়ের বাড়িতে চেতন হারা হও তো চলবিআনে ক্যামনে? আমার দ্যাকো পঁয়ত্রিশ বছর রানিং। আমরা উত্তর পাড়ার মানুষ, বেলা পাঁচটার দিকি ভোট দেওয়া শেষ করি মাত্র ফিরিচি। কানে তো আসিছেই যে আশপাশের সব হিঁদু গায়ে হামলা হতিচে। এ-ও জানি যে প্রথমে সকাল এগারোটা-বারোটার দিকে হামলা করতি আসলি পর আমাদের বেটারা কিন্তু আশপাশের গাঁয়ে সব ঠেকা দিয়িচে। তখন ওরা সব চলি গিয়ি গুজব ছড়াল কি যে আমরা হিঁদুরা নাকি ওদের তিন-চার জনকে খুন করিচি। তাই চারটার সময় এল সব দলে দলে। হাতে লাঠি, কিরিচ, রাম দা, হকিস্টিক, বোমা—কী নাই কও তো? তাইতে না আমাদের বেটা-বিটি-বুড়ো-বাচ্চা সব নদীতে ঝাঁপ দিয়ি পালাতি লাগল সন্ধ্যার পর থেকেই। কথায় বলে জল মানেই গঙ্গা। ভৈরব নদও মা গঙ্গারই প্রকাশ। তিনি পতিত পাবনী। সবাইকে বিপদে আশ্রয় দেন। ওঁ মা গঙ্গা—’ কলার খোসা ছাড়িয়ে মুখে খানিকটা নিয়ে অনিল কুমার আবার হাসে, ‘যা বলতিচিলাম। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় উত্তর পাড়ায় বিএনপি-জামাতের লোকরা আসিছে। আমার মাথায় দাও দিয়ি দিল বাড়ি। আমি সেই অবস্থায় চেতন হারা না হয়ে সোজা ভৈরবের ঢাল বেয়ে নামি নিলাম একটা ছোট ডিঙ্গি। মাথা থেকে রক্ত পড়িচে আর জীবন বাঁচানোর কী নেশা তোমায় কী কব—ডিঙ্গি করি চেমুটিয়া বাজারে গিয়ি জালাল বিশ্বাস কম্পাউন্ডারের কাছে গিয়ি কই, ‘আমার মাথায় সেলাই দাও তো!’ ঐ সেলাই দিতি দিতি জ্ঞান হারা হলাম।
‘পায়েও দাওয়ের আস্ত আস্ত কোপ। কত দিনি আর খাড়া হতে পারব নি কে জানে!’
পঞ্চাশের শোভন বিশ্বাসের একটি হাত আর একটি পায়ে প্লাস্টার, ‘কই কি প্রধানমন্ত্রী আমাগো বর্ডার খুলি দিক! আমরা হিন্দুরা সব ওপারি চলি যাই!’
মুরাদ আলীর এ কথায় সামান্য অভিমান হয়। তারও তো পায়ে দায়ের বাড়ি পড়েছে। মাথাতেও। আওয়ামী লীগ করে বলে। কাজেই বালিশে ঠেস দিয়ে সে-ও খাড়া হয়, ‘বলি, আমি যে পঞ্চাশের বুড়োখানা শেখের বেটির দল করতি গিয়ি আমিও তো মাথাত বাড়ি খালোম। সে বেলা কী কবানে? বিএনপি-জামাত কি মুসলমান বলি আমারে ছাড়ি দিয়িচে? তোমরা না হয় ইন্ডিয়া যাবা নে—আমি কই যাই?’
শোভন বিশ্বাস বলে, ‘তার পরও তোমরা আমে-দুধে মিশ খেয়ে যাবানে। গতকাল গাঁয়ের একজন আসি জানাল কি মাছ ধরতি যাতি সবাই ভয় পাচ্ছে। নাকি জামাতিরা বলতিচে—মালোর পো, তোরা ফের মাছ ধরতি আসপিনানে? তখন দেখে নিব!’
আসলাম হোসেন বোঝে সবাই এই ওয়ার্ডে তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তার চব্বিশ আর অন্যদের পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ। বয়স হিসেবে ‘কাকা’ই হয়তো এদেরকে তার ডাকার কথা। তবু পার্টি করে বলে এখানে সবাই ‘দাদা’ বা ‘বড় ভাই’। ছোটবেলা থেকে সে বাবার কাছে শুনে এসেছে যে একাত্তরে খানেরা যখন গ্রামকে গ্রাম হানা দিয়েছিল, তখন তার বাবারা নাকি হিন্দু-মুসলিম সব একসাথে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। সেই শৈশব থেকে বহুশ্রুত কথাই সরল বিশ্বাসে সে বলে, ‘শোভন দাদা, থাকেন আনে! দেশ ছাড়ি কই যাবেন কন? আমার চাচাতো ভাইও তো আওয়ামী লীগ করে বলি অনেক দিন হয় তার দোকানে বসতি পারচে না। বোঝেন, আমরা সরকারে থাকিই এই অবস্থা!’
‘না বাবা, এই দেশে আর নাই আমরা!’
‘এ কী কথা কন দাদা? আমার মাথাতেও কি দায়ের কোপ পড়ে নাই? আব্বা বাঁচি নাই। আব্বার কাছে তো শুনিছি মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান সবাই নাকি আমরা একসাথে যুদ্ধ করিচি। এ দেশটা কি আপনাগেরও দেশ না দাদা? আপনারা না হয় বর্ডার পার হলেন। আমরা কই যাব নে?’
এ কথায় শোভন, দেবজিত্ আর অনিলের মুখে দেখতে দেখতে মাঘের সকালের প্রসন্ন, সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ভয় আর বেদনার পর আজ তারা অনেকগুলো প্রহূত, অপমানিত মানুষ একে অন্যের চোখে চোখ রেখে পুনরায় এক অভয়ের নগরীতে বাস করার আশ্বাস যেন খুঁজে পায়।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২৫
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৫
এশা৭:০৮
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৫০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :