The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

অনুবাদ

পশ্চিম রণাঙ্গনে সব শান্ত

এরিখ মারিয়া রেমার্ক

অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

এরিখ মারিয়া রেমার্কের কালজয়ী উপন্যাস All quiet on the Western Front-এর সংক্ষিপ্তাংশের অনুবাদ করেছেন আন্দালিব রাশদী। প্রথম মহাযুদ্ধভিত্তিক একটি উপন্যাসই যদি বাছাই করতে হয়, যেকোনো বিচারে সবার হাতেই উঠে আসবে : পশ্চিম রণাঙ্গনে সব শান্ত। একটি জার্মান ম্যাগাজিনে ১০ নভেম্বর—৯ ডিসেম্বর ১৯২৮ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়; গ্রন্থাকারে জানুয়ারি ১৯২৯। প্রকাশনার প্রথম দেড় বছরে ২২টি ভাষায় উপন্যাসটির ২৫ লাখ কপি বিক্রি হয়। ১৯৩০-এ নির্মিত হয় অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র All Quiet on the Western Front।
টানা দুই সপ্তাহ প্রাণঘাতী যুদ্ধের পর পল বাওমার ও সেকেন্ড কোম্পানির সৈন্যরা সীমান্ত থেকে ছাড়া পেয়ে খানিকটা বিশ্রাম করছে। সেকেন্ড কোম্পানি জার্মান সৈন্যবাহিনীর একটি ইউনিট, প্রথম মহাযুদ্ধে লড়ছে। পল বর্ণনা করে যাচ্ছে উপন্যাসের সব কাহিনি। ১৫০ জনের কোম্পানি হলেও শেষদিনের প্রচণ্ড আক্রমণের পর সংখ্যা এখন ৮০-তে নেমে এসেছে। পলের সহযোদ্ধা লিয়ার, মুলার ক্রপ এবং পলের বয়স উনিশ বছর। চারজনই একই স্কুলের একই ক্লাসের ছাত্র। স্বেচ্ছায় সৈন্যবাহিনীতে নাম দিয়েছে। সহযোদ্ধা টিয়াডেন তালা ওয়ালা সমানে খায়; পল ভাবে, এত খাবার তার হাড্ডিসার শরীরের কোথায় লুকিয়ে থাকে, আবার উনিশ বছর বয়সী ওয়েস্থাস-এর শরীরটা ঠিক উল্টো, ফুলোনো-ফাঁপানো। তাদের ছোট দলের বেসরকারি দলনেতা কেইটজিনস্কি ধূর্ত মানুষ, বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি।
রাতের ঘুমটা ভালোই হলো। সকালে সবাই নাস্তার লাইনে দাঁড়িয়ে। কোম্পানির কুক হয়তো তেমন গা করেনি—১৫০ জনের নাস্তা বানিয়ে ফেলেছে। সীমিত খাবারের কারণে সৈন্যরা নিহত সহকর্মীদের ভাগটাও নিতে চাচ্ছে। কিন্তু কুক সাফ সাফ বলে দিল, হুকুম অমান্য করা যাবে না। মাথাপিছু একজনেরই খাবার। বাকি খাবার নষ্ট করে ফেলা হবে। তবুও কেউ পাবে না। এ নিয়ে বেশ ঝগড়া ও তর্কবিতর্কের পর কুক মৃত-সৈনিকদের ভাগের নাস্তা অন্যদের মধ্যে বিতরণ করতে রাজি হলো।
পলের বেশ মনে পড়ছে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার পরপর গণ টয়লেটে যাওয়া নিয়ে সবাই কী বিব্রতকর অবস্থায়ই না পড়েছে। আর এখন মনে হয় সৌখিনতা, বিশ্রাম, ধূমপান ও কার্ড খেলায় নিজেদের ব্যস্ত রেখে তারা রণাঙ্গনের রক্তাক্ত স্মৃতি আড়াল করে রাখতে চাইছে। পলের আরেক ক্লাসমেট কেমেরিখ মারাত্মক জখম নিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর দিন গুনছে।
তাদের শিক্ষক উগ্র দেশপ্রেমিক ক্যান্টোরেক তাদের যোদ্ধার খাতায় নাম লেখাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। জোসেফ বেনকে রাজি করাতে পারেনি। তখন তার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে ‘স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক’ হিসেবে তাকে রণাঙ্গনে পাঠানো হয়েছে। প্রথমদিকেই যাদের মৃত্যু হয় বেন তাদের একজন। বেনের মৃত্যুর পর তার বন্ধুরা ক্যান্টোরেকের মতো মানুষদের অবিশ্বাস করতে শুরু করে। ওদিকে ক্যান্টোরেক তার তরুণ ছাত্রদের ‘লৌহ যুবক’ আখ্যা দিয়ে রণাঙ্গনে চিঠি লিখে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেন। যারা কেমেরিখকে দেখতে যান, তাদের অনেকেই জানেন না এই তরুণ যোদ্ধার একটি পা কেটে ফেলা হয়েছে। তার ফুলে ওঠা ত্বক দেখে পল বুঝে নেয় সময় আর তেমন নেই। মরফিন ইনজেকশন দিয়ে তার যন্ত্রণা লাঘবের জন্য তারা হাসপাতালের একজনকে সিগারেট ঘুষ দেয়। মুলারের চোখ পড়ে কেমেরিখের বুটজোড়ার ওপর—তার তো একটি পা-ই নেই, জোড়া বুটের কী কাজ? পল তাকে নিবৃত্ত করে। তারা কেমেরিখকে চোখে চোখে রাখে। তার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে যাতে আর্দালিরা চুরি করার আগে বুটজোড়া সরিয়ে নিতে পারে।
পল বাওমার তার তারুণ্যভরা ছাত্রজীবনের কথা মনে করে। সে-জীবনে পল কবিতা লিখত। এখন তার ভেতরটা শূন্য হয়ে গেছে। ক’মাসের সৈনিক-জীবন তাকে যে কঠিন শিক্ষা দিয়েছে, স্কুলের এক দশকে তা হয়নি। কবিতায় তার আর আগ্রহ নেই, কবিতা লেখার সময়ও নেই। বাবা-মা-র স্মৃতি ধূসর হয়ে আসছে, অনেক স্মৃতি নির্ভরযোগ্যও মনে হচ্ছে না। এখন সে জানে কেবলমাত্র তথ্যবহুল বিষয়ই বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ।
সে-জীবনে পল ও তার বন্ধুরা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। বুড়ো সৈনিকদের চাকরি ও পরিবার আছে। যুদ্ধশেষে তারা সেখানে ফিরে যাবে। কিন্তু পলের মতো তরুণদের তো কিছুই নেই, তারা যাবে কোথায়? যুদ্ধই তো তাদের গোটা জীবন। বুড়োরা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিখা ও মৃত্যুর কথা ভুলে যাবে। কিন্তু তরুণরা কোথায় মনোযোগ নিবিষ্ট করবে? তাদের যুদ্ধপূর্ব জীবন অবস্থা স্বপ্নে ভরা; বাস্তব পৃথিবীর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।
পল মনে করছে সে মানবগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার ভালোবাসা আর আনুগত্য কেবল তার বন্ধু আর সহযোদ্ধাদের জন্য। মুলার যে কেমেরিখের বুটজোড়া নিতে চেয়েছে এটা আর অবিবেচনাপ্রসূত মনে হয় না, বরং মুলারকেই মনে হয় ঠিক কাজই করেছে।
প্রশিক্ষণের সময় পল ও তার বন্ধুরা শিখেছে দেশপ্রেম ধারণ করতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিতে হয়। সাবেক ডাকপিয়ন কর্পোরাল হিমেলস্টস পলের প্ল্যাটুনকে ট্রেনিং দিয়েছেন। তিনি তার অধঃস্তনদের বিশেষ করে গ্রুপ, হেইয়ে, টিয়াডেন ও পলকে সারাক্ষণ নির্মমভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতেন।
পল ও তার বন্ধুরা একসময় সরাসরি বিরোধিতা না করে হিমেলস্টসের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। তারা তাকে ঘৃণা করত। কিন্তু পল জানে পলের অবিরাম অপমান ও স্বৈরাচারী শৃঙ্খল তাদের অনেক বেশি সহনশীল করেছে, নতুবা রণাঙ্গনে যা ঘটছে তাতে সে পাগল হয়ে যেত।
কেমেরিখ মৃত্যুর খুবই কাছে। তার স্বপ্ন ছিল প্রধান ফরেস্টার হবে। হতে পারল না তা-ই মন খারাপ। পল পাশে থেকে তার মৃত্যুর তীব্র যন্ত্রণা দেখছে। সে বন্ধুর পাশের বিছানায় শুয়ে তাকে আশ্বস্ত করছে—সে ভালো হবে, আবার বাড়ি ফিরে যাবে। পা যে নেই কেমেরিখ তা জানে। পল কৃত্রিম পা সংযোজনে চিকিত্সা বিজ্ঞান কতটা এগিয়েছে সে গল্প করে। কেমেরিখ পলকে বলে তার বুটজোড়া যেন মুলারকে দিয়ে দেওয়া হয়। এবার নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করে এবং পলের যেকোনো কথার জবাব দিতে অস্বীকার করে। পল ডাক্তার আনতে গেছে, তিনি আসতে অস্বীকার করছেন। পল যখন কেমেরিখের বিছানার পাশে ফিরে এসেছে, তার সহযোদ্ধা বন্ধুটি আর নেই। আর একজন আহত যোদ্ধাকে বেড দিতে দ্রুত তার দেহটি সরিয়ে ফেলা হলো। পরের হাতে মুলারের জন্য এক জোড়া বুট।

কমে যাওয়া সৈন্যের সংখ্যা পূরণ করতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত একদল সৈনিক এসে যোগ দিল। ফলে পল ও তার বন্ধুরা হয়ে পড়ল ধূসর চুলের মুরুব্বি। যোগ দেওয়া সৈনিকদের কুড়িজনেরও বেশির বয়স সতেরো বছর। কোম্পানির কুককে ঘুষ দিয়ে বের করে আনা সিমের বিচি ক্যাট নবাগতদের একজনকে দিল। এই খাবারের বদলে পরেরবার তার জন্য সিগারেট আনার নির্দেশ দিল। বাড়তি খাবার বের করে আনার এই যোগ্যতা দেখে নতুন সৈনিক মুগ্ধ। পেশায় মুচি ক্যাট রণাঙ্গনের জীবনটাকে উজ্জীবিত রাখার রহস্যময় ক্ষমতার অধিকারী। যুদ্ধ নিয়ে তার কতগুলো উদ্ভাবন রয়েছে। সে বিশ্বাস করে সৈনিকদের সকলেই যদি সমান খাবার আর সমান বেতন পায় তাহলে যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হবে। ক্রপ প্রস্তাব করল যুদ্ধের ঘোষণা উত্সবের মতো পরিচালিত হওয়া উচিত। সে মনে করে খোলা ময়দানে বিভিন্ন দেশের জেনারেল এবং জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের হাতে মুগুর নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই করা উচিত। শেষ পর্যন্ত যে একজন বেঁচে থাকবে, সে যে দেশের নাগরিক, যুদ্ধে সে দেশেরই বিজয় হবে।
পল ও তার বন্ধুরা যুদ্ধের জন্য নিয়োগ পাবার পর যে ব্যারাকে অবস্থান করছিল এখন তাদের সেখানে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। সেখানে হিমেলস্টস তাদের যেভাবে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করত, যুদ্ধের ভয়াবহতার চেয়ে সেটাই বরং অনেক ভালো। ড্রিল সার্জেন্ট হিসেবে তার এমন কড়াকড়ি গালাগালি শুনে মনে হয় ডাকপিয়ন হিসেবেও হিমেলস্টস খুব সুবিধের লোক ছিলেন না। রেলস্টেশনে ট্রেন বদলাবার যে হুকুমজারি তিনি করতেন সেই স্বর নকল করে তারাও কমান্ড করত। ক্যাট বলল, যত ট্রেনিংই করুক হিমেলস্টস অন্য যেকোনো মানুষের মতোই সাধারণ একজন। কুকুরকে আলু খাওয়ানোর যত প্রশিক্ষণই দেওয়া হোক, সুযোগ পেলেই মাংসে কামড় দেবে। মানুষও কুকুরের মতো একই আচরণ করে। একটু কর্তৃত্ব পেলে সুন্দর আচার-আচরণের তলায় প্রতিটি মানুষ একটি ভয়ঙ্কর জন্তু। সেনাবাহিনীর গঠনটাই এমন যে একজনের চেয়ে অন্যজনের ক্ষমতা বেশি। ক্যাট মনে করে তাদের ক্ষমতা বাড়াবাড়ি রকমের বেশি। সাধারণ বেসামরিক মানুষের চেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের ক্ষমতা বেশি। ক্যাট বলে, অস্বাভাবিক রকম বেশি। সৈন্যরা যেভাবে একজন অন্যজনকে নির্যাতন করে, সাধারণ মানুষের সে অনুমতি নেই। টিয়াডেন এসে জানায়, হিমেলস্টস রণাঙ্গনে আসছেন। পল জানে টিয়ডেনের ভেতর হিমেলস্টসের ব্যাপারে প্রতিহিংসা কাজ করে। ট্রেনিং-এর সময় টিয়াডেন বিছানা ভিজিয়ে ফেলত। হিমেলস্টস বললেন, আলস্যের কারণে সে বিছানা ছেড়ে ওঠে না। বিছানায় পেশাব করা আর একজন—কিন্ডারভাটেরকেও অলস সাব্যস্ত করে দুজনকে একই বাঙ্কবেডে—একজন ওপরে ও একজনকে নিচে ঘুমাতে নির্দেশ দিতেন। ওপর থেকে গড়িয়ে পড়া পেশাবে একদিন ভিজত ডেনের গা, পরদিন কিন্ডারভাটেরের। তিনি তাদের অনেক সময় ফ্লোরে ঘুমোতে বাধ্য করতেন।
হ্যারি, পল, ক্রপ আর টিয়াডেন তার ওপর প্রতিশোধের ষড়যন্ত্র করল। এক রাতে হিমেলস্টস যখন তার প্রিয় শুঁড়িখানা থেকে ফিরছেন, অন্ধকার রাস্তায় ওঁত পেতে থাকা চার জন একটি চাদর দিয়ে দ্রুত তার মুখ ঢেকে দিল, ঘুঁষি মেরে তাকে অজ্ঞান করে তার প্যান্ট খুলে নিল, তার মুখের ওপর বালিশ চেপে চাবুক দিয়ে একের পর এক ঘা মারাল। একসময় চারজন পালিয়ে গেল। হিমেলস্টসের জানা হলো না কারা এই আক্রমণকারী।
সেকেন্ড কোম্পানির ওপর নতুন দায়িত্ব পড়ল—সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে হবে। খুবই বিপজ্জনক কাজ। একটি বাড়ির পাশ দিয়ে সৈন্যদের ট্রাক যখন সীমন্তের দিকে যাচ্ছে, পল রাজহাঁসের ডাক শুনল। ক্যাটের সাথে কথা বলে ঠিক করল পরে দুজন এসে হাঁস নিয়ে যাবে এবং ভোজের আয়োজন করবে। বন্দুকের গুলির শব্দ ও শেল আকাশ ভারী করে তুলেছে; নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা খুবই আতঙ্কিত। কান খাড়া করে কোন বন্দুকের কেমন আওয়াজ ক্যাট নতুন সৈন্যদের শেখাতে শুরু করল। ক্যাট বলল—তার মনে হচ্ছে রাতে ব্রিটিশরা বোমাবর্ষণ শুরু করবে। ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের সাধারণ সময়ের প্রায় একঘণ্টা আগেই গোলাগুলি শুরু করল। পল জানে বন্দুকের গর্জন আর শেল ছোটার শিস মানুষের ইন্দ্রিয় ধারালো করে।
পল জেনেছে রণাঙ্গনে না এলে সৈনিকের জীবনে পৃথিবীর আর একটি রূপ জানা হয় না। এখানেই মানুষের আদিম প্রবৃত্তি সবচেয়ে বেশি জেগে ওঠে। কখন ঘাতকের ভূমিকা পালন করতে হবে সে জানে; গুলির শব্দ শোনার আগেই কেমন করে মাথা নুইয়ে মাটিতে শুয়ে পড়তে হবে তা-ও তার জানা রণাঙ্গন সৈন্যদের জন্তুতে পরিণত করে।
সৈন্যরা কাঁটাতার আর লোহার রড নিয়ে রণাঙ্গণে যায়। বেড়া দেওয়ার কাজ শেষ হলে তারা ঘুমোতে চেষ্টা করে—যতক্ষণ না একটি ট্রাক এসে তাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায়। রাতের বেলা বোমাবর্ষণের যে ভবিষ্যদ্বাণী ক্যাট করেছিল তা সত্যি হলো। যখন শেল ছুটতে শুরু করল, সবাই কিছু না কিছুর আড়ালে নিজেদের ঢাকতে চেষ্টা করল। নব নিযুক্ত এক তরুণের মাথায় যতই হেলমেট চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে, সে ততই তার বগলের নিচে ঢুকতে চেষ্টা করছে। ছুটন্ত শেলের আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য পল যতটা সম্ভব তাকে ঢেকে রাখতে চাইছে। শেল নিক্ষেপ কমে আসার পর নতুন সৈনিকটি দেখল, সে আতঙ্কে তার কাপড় নষ্ট করে ফেলেছে। পল বলল, প্রথম দিকে এমন হতেই পারে। আন্ডারওয়্যার খুলে দূরে ফেলে দাও; ব্যারাকে ফিরতে পারলে ধুয়ে নিয়ো।
আহত ঘোড়ার তীক্ষ চিত্কার ভেসে আসে। যুদ্ধে আসা একজন আতঙ্কিত কৃষক ডেটারিং বিমূঢ় হয়ে পড়ে, কারণ সে ঘোড়াদের ভালোবাসে। আহত জওয়ানদের একত্রে জড়ো করার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত ক’জন আহত ঘোড়ার কাছে আসে, তারপর একে একে গুলি করে সীমান্তে সহযোদ্ধা এই ঘোড়াগুলোকে হত্যা করে। এটাই নিয়ম। কৃষক ভাবে, এর চেয়ে জঘন্য কাজ আর কী হতে পারে।
ট্রাক যখন তাদের ফিরিয়ে আনে, ক্যাট অস্থির হয়ে পড়ে। তাদের চারদিকে ঝাঁকে ঝাঁকে বোমা পড়তে থাকে। কাছাকাছি একটি কারখানায় তারা আশ্রয় নেয়। পল হামাগুড়ি দিয়ে একটি খোলা কফিনের কাছে চলে আসে। ক্যাট পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে গ্যাস মুখোশ পরে নিতে বলে। পল নিজের মুখোশ পরে নতুন আর একজনকে পরিয়ে দেয়। এই মাত্র শেলের আঘাতে সৃষ্ট একটি গর্তে ঢুকে পড়ে। তার যুক্তি, একই জায়গায় দ্বিতীয়বার শেল পড়ার নজির তেমন নেই। তার সাথে যোগ দেয় ক্যাট আর ক্রপ। মুখোশের ভাল্বে পল শ্বাস নেয়। ধরে নেয় এটা নিশ্চয়ই এয়ারটাইট।
বোমাবর্ষণের আওয়াজ বন্ধ হলে পল বাইরে এসে দেখে যারা মুখোশ পরেনি, তারাও ভালো আছে। অমনি নিজের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দেয়। একটু এগিয়ে দেখে যুদ্ধে নাম লেখানো নতুন ছেলেটির রক্ত-মাংস-হাড় স্প্রিন্টারের আঘাতে একাকার হয়ে গেছে। এই ছেলেটিই কাপড় নষ্ট করে ফেলেছিল। পল ও ক্যাট জানে এই ছেলে আর বাঁচবে না। ক্যাট ফিসফিস করে বলল, তাকে আর মৃত্যুযন্ত্রণা না দিয়ে এখন গুলি করে মেরে ফেলাটাই হবে তার প্রতি শ্রেষ্ঠ দয়া প্রদর্শন। তারা এই কাজটা শেষ করার আগেই গর্ত আর ট্রেঞ্চ থেকে সৈন্যরা বেরিয়ে আসতে শুরু করে।
পল রণাঙ্গনের অস্বাস্থ্যকর অবস্থার কথা বলছে। টিয়াডেন একটার পর একটা উকুন বের করে এনে বুট পালিশের কৌটায় পিষে মারছে। তার আগে কৌটার টিনের ঢাকনা আগুনে গরম করে নেয়। উকুনের মাথায় লাল ক্রস চিহ্ন রয়েছে। কৌতুক করে বলছে, উকুন তার মাথায়, হাসপাতাল থেকে এসেছে, যেখানে সার্জন জেনারেলের চিকিত্সা চলছিল।
হিমেলস্টস ক্যাম্পে ফিরে আসার পর জানা যায় গুজবটি সত্যি—নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অতিরিক্ত যন্ত্রণা দেওয়ার শাস্তি হিসেবে তাকে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুলার একে একে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল : হঠাত্ যুদ্ধ থেমে গেলে তখন কী করবে? ক্রপ বলল, যুদ্ধ শেষ হবে না।
তারপরও যদি শেষ হয়?
ক্যাট বলল, স্ত্রী আর বাচ্চাদের কাছে ফিরে যাবে।
তরুণরা বলল, মদ টেনে মাতাল হবে এবং কোথাও না কোথাও একজন নারী খুঁজে নেবে।
হায়ি বলল, সেনাবাহিনীর নন-কমিশনড অফিসার হবে। তার পুরোনো চাকরি কয়লার খনি খননের কাজটি ভীষণ বাজে।
টিয়াডেন বলল, হিমেলস্টসের ওপর প্রতিশোধ নেবার দিকে মনোনিবেশ করবে।
ডেটারিং তার খামারে ফিরে যেতে এখনই প্রস্তুত।
হিমেলস্টস যার কাছে যাচ্ছে, সেই নির্মমভাবে তাকে উপেক্ষা করছে। সে টিয়াডেনকে দাঁড়াবার আদেশ দিলে জবাবে সে তার প্যান্ট খুলে পাছা দেখিয়ে চলে যায়। হিমেলস্টস কর্তৃপক্ষের কাউকে নিয়ে হাজির হবার আগেই টিয়াডেন দ্রুত পালিয়ে যায়।
মুলার তার পুরোনো প্রশ্নটি করতেই থাকে। তারা হিসাব করে দেখে, এখন তাদের ক্লাসের বন্ধুদের মধ্যে আর বারো জন চাকরিতে আছে। কুড়ি জন সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছিল। রণাঙ্গনে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত চার জন আর পাগল হয়ে গেছে তাদের একজন। তাদের শিক্ষক ক্যান্টোরেক ক্লাসে যেসব প্রশ্ন করত তা নকল করে একজন অন্যজনের দিকে ছুড়ে দেয়।
যুদ্ধ শেষ হলে পল কী করবে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ক্রপ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে যুদ্ধ তাদের সব আশা-ভরসা ধূলিস্যাত্ করে দিয়েছে। তারা এখন আর তারুণ্যের আস্তরণের নিচে নেই, তারা পুরোদস্তুর মানুষ—কেবলই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো কিছুতেই বিশ্বাসী নয়।
টিয়াডেনকে শায়েস্তা করার জন্য হিমেলস্টস সার্জেন্ট মেজরকে নিয়ে ফিরে আসে। টিয়াডেন কোথায় লুকিয়ে আছে তা জানাতে পল ও অন্যরা অস্বীকার করে। সার্জেন্ট মেজর নির্দেশ দিয়ে যান—দশ মিনিটের মধ্যে টিয়াডেনকে অর্ডারলি রুমে হাজিরা দিতে হবে।
তারা সবাই হিমেলস্টসকে অপদস্ত করতে চাইছে। টিয়াডেনের কথা জিজ্ঞেস করায় ক্রপ তাকে অপমান করে। হিমেলস্টস চিত্কার করে বেরিয়ে যায়।
সেই সন্ধ্যায় কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করার অভিযোগে ক্রপ ও টিয়াডেনের কোর্ট মার্শাল হয়। পল ও অন্যরা প্রশিক্ষণের সময় টিয়াডেনের প্রতি হিমেলস্টসের নির্মম আচরণের সাক্ষ্য দেয়। সব শুনে বিচারক লেফটেন্যান্ট দুজনকে লঘু শাস্তি দিলেন এবং আচরণ ভালো করার জন্য হিমেলস্টসের ওপর একটি বক্তৃতা ঝাড়লেন। টিয়াডেনের তিন দিনের এবং ক্রপের একদিনের জেল হলো। পল ও অন্যরা তাদের দেখতে অস্থায়ী জেলে গেল এবং তাদের সাথে কার্ড খেলল।
পল ও ক্যাট গোলাবারুদের ওয়াগনের ড্রাইভারকে দুটি সিগারেট ঘুষ দিল। যেখানে হাঁসের ডাক শুনেছিল, ড্রাইভার তাদের সেখানে নিয়ে যাবে। পল বেড়া ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকে দুটো রাজহংসী ধরে দেয়ালের সাথে এদের মাথা চেপে ধরল। কাজ হলো না, প্রচণ্ড জোরে ডাকতে ডাকতে একটি তার হাত থেকে ছুটে গেল, অন্যটি নিয়ে ধরা পড়ার আগে কোনোভাবে বেড়া ডিঙিয়ে পালাতে সক্ষম হলো। ক্যাট এটাকে দ্রুত জবাই করে অন্যদের দৃষ্টির বাইরে রান্না করে দ্রুত খেয়ে নিল। পালকগুলো ঢুকিয়ে দিল বালিশে। খেতে খেতে দুজন আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। অবশিষ্ট খাবার নিয়ে সঙ্গোপনে টিয়াডেন ও ক্রপের কাছে চলে গেল।
সেকেন্ড কোম্পানি দু-দিন আগেই রণাঙ্গনে এসে পৌঁছাল। আসার পথে দেখল একটি স্কুল গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। স্কুলের পাশে কফিনের স্তূপ। এই কফিনগুলো যে তাদের ব্যবহারের জন্যই আনা হয়েছে এই অপ্রীতিকর জ্ঞানের কথাটি ভুলে থাকার জন্য তারা এসব নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে থাকে। দূরে রণাঙ্গনে শত্রুদের গাড়ি বন্দুকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তারা বের করতে সক্ষম হয় যে শত্রুদের সৈন্যসংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, তারা এখনই বুঝতে পারছে ইংরেজ গোলন্দাজশক্তি আগের চেয়ে অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। তারা হতাশ হয়ে পড়ে। ট্রেঞ্চে রাখা তাদের গোলাগুলির মজুত কমে আসছে, তাদের বন্দুকের ব্যারেলও হয়ে পড়েছে জরাজীর্ণ।
সৈন্যদের অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। সুযোগই বলে দেয় তারা ভালোর দিকে যাচ্ছে, না মন্দের দিকে। পল একবার এক ট্রেঞ্চ থেকে বেরিয়ে বন্ধুদের দেখতে অন্য ট্রেঞ্চে গেল। যখন সে প্রথমটিতে ফিরে আসতে চাইল, দেখল, গোলার আঘাতে একটি ধ্বংস হয়েছে, দ্বিতীয়টাতে ফিরে আসার পর দেখল, এটি সম্পূর্ণভাবে সমাহিত হয়ে গেছে।
নিজেদের খাবার সংরক্ষিত রাখার জন্য সৈন্যদের মোটামোটা আক্রমণাত্মক ইঁদুরের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয়। তাদের দেওয়া হয় পনির ও মদের বড় রেশন, অসংখ্য গ্রেনেড এবং পর্যাপ্ত গোলাবারুদ। সৈন্যরা তাদের বেয়নেট থেকে করাতি ব্লেড সরিয়ে নেয়; কারণ শত্রুরা তাদের কাউকে ধরে ফেলতে পারলে এবং এমন ব্লেড দেখলে এটা দিয়েই হত্যা করে—নিজের বেয়নেটে খুন! ক্যাটের মন খারাপ, পল মনে করে এটা খারাপ লক্ষণ—সামনে রণাঙ্গনে কী ঘটবে তা নিখুঁতভাবে আগাম বলে দেবার ক্ষমতা তার রয়েছে। আবার বোমা বর্ষণের আগে কয়েকদিন কেটে যায়। সরাসরি কোনো আক্রমণ না এলেও বোমা নিক্ষেপ চলতে থাকে। ট্রেঞ্চে খাবার পাঠানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এমনকি কায়দা করে ক্যাট যে কিছু নিয়ে আসবে তাও হয় না। তাদের অপেক্ষা করতে হয়। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত একজন পালিয়ে যেতে চায়। ক্যাট ও পল পিটিয়ে তার আনুগত্য আদায় করে। তারপর ট্রেঞ্চে সরাসরি আঘাত আসে। শেলটি হালকা হওয়ায় রক্ষা, কংক্রিট তা ঠেকিয়ে দেয়। আরো তিন জন নতুন সৈনিক পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে, একজন সফল হয়। অন্যজনকে পল তাড়া করে, তাকে ধরে ফেলার আগেই শিস দিয়ে যাওয়া একটি শেল তাকে আঘাত করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। অপরজনকে বেঁধে রেখে পালানোর পরিণতি কী ভয়াবহ হতে পারে তা মনে করিয়ে দিয়ে বাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় সবাই কার্ড খেলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউই মনোযোগ দিতে পারছে না।
শেষ পর্যন্ত শেল নিক্ষেপ কমে আসে এবং প্রকৃত আক্রমণ শুরু হয়। গর্তের ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরোবার আগেই পল ও তার সতীর্থরা ভেতর থেকে গ্রেনেড ছুড়ে। জার্মান মেশিনগান ও গ্রেনেড আক্রমণকারী ফরাসিদের অনেক ক্ষতি করে। একদিকে অন্ধকারে যখন মাথার ওপর বোমা পড়ছে, বেকার ও অপেক্ষমাণ সৈনিকরা হঠাত্ কাজ পেয়ে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করতে লাগল। জার্মানরা আক্রমণ চালিয়ে শত্রুদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। যা কিছু সম্ভব লুটপাট করে নিয়ে আসার আগে জার্মান সৈন্যরা ভয়ঙ্কর এক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেল। এক ঘণ্টার মধ্যে তারা আবার আগের জায়গায় ফিরে এসে অবস্থান নিল। শত্রুশিবিরে তারা যা পেয়েছে, টিনজাত খাবারের চেয়ে ভালো কিছু তারা পাবে এটা মোটেও ভাবেনি।
পল পাহারায় নিয়োজিত থাকে। স্মৃতি তার কাছে ফিরে আসতে থাকে। শান্তি ও নিভৃত স্মৃতি আনন্দের বদলে বরং বেদনাই দেয়। আকাঙ্ক্ষার দিন শেষ হয়ে আসে। তার মনে হয় আকাঙ্ক্ষা অন্য কোনো পৃথিবীর একটি বিষয়, তাদের পৃথিবীর নয়। এখন সে নিশ্চিত তার যৌবন ফুরিয়ে গেছে, এখন সে নিথর নিস্পৃহ এক বুড়ো।
দিন যায় আর দু’পক্ষেই মৃত মানুষের পাহাড় উঁচু হতে থাকে। পল ও তার সঙ্গীরা তাদের একজনের আর্তচিত্কার টানা তিন দিন ধরে শুনতে থাকে; আপ্রাণ চেষ্টা করেও বের করতে পারে না সেই মৃত্যুন্মুখ মানুষটি কোথায়। নতুন নিয়োগ পেয়ে যারা যুদ্ধে আসছে নিহত ও আহতের সংখ্যা তাদেরই বেশি। তাদের শূন্যস্থানে যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলতে গেলে তাদের কোনো প্রশিক্ষণই নেই। তারা মৃত মাছির মতো রণাঙ্গনে ঝরে পড়ছে।
যখন আক্রমণ চলছে, পল হিমেলস্টসকে পেলো, একটি গর্তে আহতের ভনিতা নিয়ে পড়ে আছে। ঘুষি মেরে, হুমকি দিয়ে পল তাকে বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করে; কিন্তু হিমেলস্টস এক পা-ও নড়বার নয়। এর মধ্যে লেফটেন্যান্ট এসে দু’জনকেই আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিল। লড়াইয়ে সাময়িক বিরতির সময় পুরোনো সৈন্য নতুনদের যুদ্ধের জ্ঞান দেয় এবং চাতুরি শেখায়। কিন্তু যখন আক্রমণ শুরু হয় নতুনরা সব ভুলে গিয়ে ঝরে পড়তে থাকে। এর মধ্যে হায়ি মারাত্মক জখম হয়। যখন এই রণক্ষেত্র থেকে সেকেন্ড কোম্পানিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, ১৫০ জন সৈন্যের মধ্যে তখন জীবিত কেবল ৩২ জন।
পুনর্গঠিত হবার জন্য সেকেন্ড কোম্পানিকে ডিপোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত ও মৃত্যু দেখে হিমেলস্টস অনেকটাই বদলে যায়। খাবার ও কাজের ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি উদার। এমন কি টিয়াডেনও তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ভালো খাবার ও বিশ্রাম সেকেন্ড কোম্পানির সদস্যদের সন্তুষ্ট করে। ট্রেঞ্চ থেকে বেরিয়ে এসে পল ও তার বন্ধুরা নারী ও যৌনতা নিয়ে অশ্লীল কৌতুক বানাতে থাকে। একসময় এই রসভরা যৌনালাপও তিক্ত মনে হতে থাকে।
সাঁতার কাটার সময় পল, লিয়ার ও ক্রপের সাথে তিন জন মহিলার সাক্ষাত্ হয়। ফরাসি ভাষায় তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। ভাঙা ভাঙা ফরাসিতে সৈনিকদের বোঝালো, তাদের কাছে খাবার নেই, কিন্তু নারী হওয়ায় তাদের খাল পেরিয়ে এপারে আসা নিষেধ। রাত বাড়লে তিন জন কিছু খাবার নিয়ে সাঁতরে খাল পাড়ি দিল। তাদের পায়ের বুট ছাড়া শরীরে আর কোনো পোশাক ছিল না। অপেক্ষমাণ তিন জন তাদের দিকে কাপড় ছুড়ে দিল। ভাষার বাধা ডিঙিয়ে তারা অনেকক্ষণ ধরে সৈনিকদের সাথে বকবক করল; তাদের বলল, ‘হতভাগা ছোকড়া’। পলের যৌনসম্ভোগের অভিজ্ঞতা নেই, তবুও নারীসঙ্গে শরীরের তাড়নায় সে কামনার কাছে আত্মসমর্পণ করল। উত্তেজনা যেন তাকে যৌবন একটু হলেও ফিরিয়ে দিল। এমন এক নারীর সাথে সঙ্গম, যে তাদের কোনো ব্যারাকের কোম্পানির নারী নয়।
এর মধ্যে পল সতেরো দিনের ছুটি পেয়ে যায়। তারপর তাকে একটি ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দিতে হবে। ঠিক ছ’সপ্তাহ পর আবার ফিরে আসবে রণাঙ্গনে। পল তখন গভীর সন্দেহ নিয়ে ভাবতে থাকে, ছ’সপ্তাহ তার বন্ধুদের আর ক’জন টিকবে।
পল সাঁতার কেটে আবার ওপারের একজন নারীর কাছে যায়, তার ছুটির কথা তাকে শোনায়। কিন্তু নারী তার ছুটির কথা শুনতে একটুকুও আগ্রহী নয়। পলের মনে হলো যদি তাকে রণাঙ্গনে যাবার কথা বলত তা হলে বরং সে আরো আগ্রহী ও উত্তেজিত হতো। কার যে কী ভাবনা, পল মেলাতে পারে না।
পল যখন তার নিজের জন্মশহরে পৌঁছাল, দেখল তার মা শয্যাশায়ী, ক্যানসার ধরা পড়েছে। শহরের বেসামরিক লোকজন অতি সামান্য খাদ্য সরবরাহের কারণে না খেয়ে মরতে বসেছে। দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে। তার ভেতরের অদ্ভুত অনুভূতি ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। নিজের বাড়িতে নিজেকে আগন্তুক মনে হচ্ছে। মা জিজ্ঞেস করে, সেখানকার অবস্থা খুব খারাপ, তা-ই না?
পল মায়ের কাছে মিথ্যে কথা বলে। তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার মতো ভাষা নেই। অন্তত এমন কোনো ভাষা তার আয়ত্ত্বে নেই যা তার মা বুঝবে।
পল একজন মেজরকে রাস্তায় স্যালুট না দেওয়ায় তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। শাস্তি হিসেবে পলকে রাস্তায় মার্চপাস্ট করায়, তাকে চৌকশভাবে স্যালুট দিতে বাধ্য করে। এ ধরনের ঘটনা এড়াতে পল বেসামরিক পোশাক পরতে শুরু করে।
মা একটা প্রশ্ন করে থেমে যায়, কিন্তু বাবা একটার পর একটা প্রশ্ন করতে থাকে। বাবা বোঝে না পলের অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা বিপজ্জনক হতে পারে। যারা কোনো প্রশ্ন করে না তারা তাদের নীরবতার জন্য এক ধরনের গর্ববোধ করে।
রাস্তায় ট্রামের শব্দ পলকে চমকে দেয়; আঁতকে ওঠে, মনে হয় শেল বর্ষণ হচ্ছে। সে শোবার ঘরে গিয়ে বসে, বই ঘাঁটে, ছবি দেখে, শৈশব উদ্ধার করতে চেষ্টা করে, যৌবনের অনুভূতি ও কামনা কেমন, মনে করতে চেষ্টা করে। কিন্তু স্মৃতিগুলো কেবল অস্পষ্ট ছায়ার মতো। সৈনিক হিসেবে তার যে পরিচয়, তা আঁকড়ে ধরে রাখা ছাড়া আর ধরার মতো কিছুই নেই।
পল তার স্কুলের বন্ধু, এখন ট্রেনিং অফিসার মিটলস্টেড-এর কাছে শুনল ক্যান্টোরেককে সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। কারণ সে স্কুলের শিক্ষক হবার কারণে মিটলস্টেড-এর কর্তৃত্ব উপেক্ষা করতে চেয়েছে। অথচ তার কারণেই জোসেফ বেনকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নাম লেখাতে হয়। তার বিশ্বাস ক্যান্টোরেকের কারণেই তাকে তিন মাস আগে মরতে হয়েছে। অবশ্য তিন মাস পরে হলেও তাকে মরতে হতো—সে কথা ভিন্ন। এখন মিটলস্টেড ক্যানটোরেকের কোম্পানির দায়িত্বে—এখন তার স্কুলশিক্ষকের অহংকার ধূলিস্যাত্ করে দিয়ে মিটলস্টেড তাকে প্রতিদিনই অপদস্ত করে চলেছে।
পলের ছুটি ঘনিয়ে আসতেই তার মায়ের বিষণ্নতা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে তার যন্ত্রণা।
পল কেমেরিখের মায়ের সাথে দেখা করতে যায়। সেই দুঃসংবাদটি দেয় যে তার ছেলে আর বেঁচে নেই।
ছেলে কেমন করে মারা গেছে, মা জানতে চায়। পল তাকে মিথ্যে কথা বলে। ইনিয়ে বিনিয়ে বলে, কেমেরিখের কোনো যন্ত্রণাই হয়নি, খুব দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
পলের ফিরে যাবার দিন মা ছেলের সাথে তার শোবার ঘরে বসে। সে ঘুমিয়ে আছে এমন ভান করতে থাকে—কিন্তু এর মধ্যে বুঝতে পারে মা নিজের ভেতর প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মাকে বিছানায় যেতে বলে। পলের তখন ইচ্ছে হয়, মায়ের কোলে মাথা রেখে সেও কাঁদতে থাকবে এবং তার সাথেই মারা যাবে। তার আরও মনে হয়, ছুটিতে বাড়িতে না এলেই হতো—এতে তার এবং মায়ের কষ্টগুলো জেগে উঠেছে।
পল ট্রেনিং ক্যাম্পে রিপোর্ট করে। ক্যাম্পের পাশেই যুদ্ধবন্দি রুশ সৈন্যদের কারাগার। তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। জার্মানদের উচ্ছিষ্ট ও পরিত্যক্ত ময়লা-আবর্জনার মধ্যে খাবার খুঁজতে হচ্ছে। পলের মাথায় আসছে না তারা এই আবর্জনার মধ্যে খাবার পাবে কোথায়। এমনিতেই খাবারের এত সংকট যে সবাই সব চেটেপুটে খাচ্ছে, উচ্ছিষ্ট থাকার কোনো কারণ নেই।
পল যখন এই রুশ সৈন্যদের দিকে তাকায়, তাদের চাষাভুষার মতো নিষ্পাপ চেহারা দেখে তার কখনো মনে হয় না—এরা শত্রু।
তাদের কোনো কিছুই মৌলিকভাবে জার্মানদের চেয়ে এমন কিছু ভিন্ন নয় যার জন্য তাদের হত্যা করতে চাইবে। না খেয়ে ভুগতে ভুগতে রুশ সৈন্যদের কেউ কেউ হাড্ডিসার হয়ে আসছে; আমাশয়ে ভুগছে অনেকেই। বন্দিদের নরম ও অনুচ্চ স্বর পলের চোখের সামনে তাদের আরামদায়ক ঘরবাড়ির ছবি তুলে ধরছে। এই ভিখারি বন্দিদের জন্য কারও দয়ামায়া নেই, সামনে পেয়ে কেউ কেউ লাথিও মারছে।
বন্দিদের নিজেদের ভেতর সৌভ্রাতৃত্ব পলকে স্পর্শ করে। রুশ বন্দিরা সবাই সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় এমনই করুণ জীবনযাপন করছে যে তারা যে নিজেদের মধ্যে লড়াই করবে তারও প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। কিসের জন্য লড়াই করবে—সবাই নিঃস্ব, সবাই অসহায়। পল তাদের কাউকে আগে থেকে চেনে না—একক ব্যক্তি হিসেবে তাদের কাউকেই সে মেলাতে পারে না, তাদের কারো শৈশব, যৌবন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই—সে দেখতে পাচ্ছে তাদের ভেতরের জান্তব যন্ত্রণা। যাদের সে জীবনে কখনো দেখেনি তারা কিভাবে তার শত্রু হলো? তার ওপরের দিকের ক্ষমতাশালী ও প্রভাব বিস্তারকারী কিছু লোক বলে দিল—তারা শত্রু, অমনি শত্রু হয়ে গেল? অন্যকারো কারণে তৈরি করা এই শত্রু আর পল ও তার বন্ধুদের মধ্যে গোলাগুলি চলছে। গ্রেনেড দিয়ে খোঁচাচ্ছে, জেলে পুরছে, চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে—নির্মমভাবে একজন অন্যজনকে হত্যা করছে। পল অনেকটা জোর করে এসব দুঃশ্চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখে। নতুবা তার সৈনিক মূর্তি ধরে রাখতে পারে না। তারপরও তার কাছে থাকা সিগারেটগুলো মাঝখানে দুভাগ করে বন্দিদের দিয়ে দেয়। তারা সানন্দে সুখটান দেয়। শত্রু ও বন্ধুর ধারণাটি হঠাত্ করে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
পল পিয়ানো বাজাতে পারে—এটা বন্দিদের কেউ কেউ জেনেছে। একজন ক্ষুধার্ত অসহায় বন্দি তখনো তার অধিকারে থাকা বেহালাটি বের করে আনে। কাঁটাতারের গা ঘেঁষে বন্দি পলকে শোনাতে বেহালা বাজায়। বেহালার সুর রাতের বাতাসে নিঃসঙ্গতার হাহাকার সৃষ্টি করে—পল আরও বেশি কষ্ট পেতে থাকে।
রণাঙ্গনে যাবার আগে পলের বাবা ও বোন ট্রেনিংক্যাম্পে তাকে দেখতে আসে। যতক্ষণ তারা একসঙ্গে ছিল, সময়টা দুর্বিসহ ঠেকছিল। মায়ের অসুস্থতা নিয়ে কথা বলা ছাড়া তার আর বলার মতো কিছুই নেই। তারপর ভয়ঙ্কর নিঃশব্দ। সময়টা সবার কাছেই অসহ্য মনে হচ্ছে। ক্যানসার চিকিত্সার জন্য তার মাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তার বাবা বলল, অপারেশনের জন্য কত টাকা লাগবে এটা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছেন না। তার ভয়, টাকার অঙ্ক শুনে তিনি আঁতকে উঠবেন এবং তার অভিব্যক্তি দেখে ডাক্তাররা অপারেশনটা করবেই না।
যাবার আগে পলের বাবা ও বোন তার হাতে মায়ের বানানো জ্যাম ও পটেটো কেক তুলে দিল। মা তার জন্যই বানিয়েছে।
কিন্তু এসব খাবারের কোনো ক্ষিধে তার নেই; তার মন ভেঙে পড়ছে। ভাবছে এগুলো ক্ষুধার্ত রুশ বন্দিদের দিয়ে দিলে কেমন হয়! সিদ্ধান্ত নেয় দিয়ে দেবে। পরক্ষণেই মনে হয়, মৃত্যুপথযাত্রী যে মা কষ্ট করে এগুলো তার জন্য বানিয়েছে, সে না খেলে এটা মায়ের জন্য বড় কষ্টের কারণ হবে। তখন সিদ্ধান্ত নেয় খাবারটা ভাগাভাগি করবে—বন্দিদের দুটো কেক দেবে।
পল যখন রণাঙ্গনে এসে যোগ দিল, দেখল ক্যাট, মুলার, টিয়াডেন ও ক্রপ তখনো জীবিত, তাদের কেউই আহত হয়নি। মায়ের দেওয়া তার ভাগের খাবারটুকু বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করে। সৈনিকদের মধ্যে একধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে—জার্মান সম্রাট কায়জার রণাঙ্গন পরিদর্শনে আসছেন। তার সফরের প্রস্তুতি হিসেবে সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। সৈনিকরা নতুন এক সেট করে পোশাক পেয়েছে। যখন কায়জার এসে উপস্থিত হলেন, পল ও তার সহযোদ্ধারা দেখল তিনি তখন কোনো আকর্ষণীয় মানুষ নন। সম্রাট চলে যাবার পর নতুন পোশাকগুলো খুলে নেওয়া হলো। পলের বন্ধুরা সবাই যুদ্ধ নিয়ে ভাবল। বলল, যদি তিরিশ জন গুরুত্বপূর্ণ লোক বলতেন, যুদ্ধ চাই না, তা হলে যুদ্ধ হতো না।
তারা উপসংহার টানে—যারা ইতিহাসের বইতে নিজের নাম উঠাতে চান, যুদ্ধটা তাদের জন্য উপকারী।
শত্রুর শক্তি সম্পর্কে ধারণা পেতে, আরও তথ্য জানতে পল হামাগুড়ি দিয়ে নো ম্যানস ল্যান্ডে যেতে রাজি হলো। কিন্তু ফেরার পথে সে পথ হারিয়ে ফেলল। ততক্ষণে বোমাবর্ষণ শুরু হয়ে গেছে; সে জানে, এখন বড় ধরনের আক্রমণ আসন্ন। বুঝতে পারে, বাঁচতে হলে এখন তাকে মরার মতো পড়ে থাকতে হবে। এক ফাঁকে টুপ করে গোলার আঘাতে সৃষ্ট হওয়া কোনো গর্তে ঢুকে পড়বে। আক্রমণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করবে।
পলকে অবাক করে একজন শত্রুসৈন্যও হুট করে একাই গর্তে ঢুকে পড়ল। অতি দ্রুত সে তার হাতের ঘাতক ছুরি ঢুকিয়ে দিল তার পেটে। গর্তের বাইরের দিকটা খুব আলোকিত—এ অবস্থায় বের হয়ে বিপদে পড়বে। উঁকি দিয়ে আবারও গর্তের ভেতর লাশটির কাছে চলে এলো। পল অন্ধকার হবার অপেক্ষায় আছে। হঠাত্ পলের চোখে পড়ল, ফরাসি সৈন্যটি নড়ে উঠেছে; আরো নিবিড়ভাবে দেখে বুঝতে পারল, এখনো শত্রুর মৃত্যু হয়নি।
পল তাকে পানি খাওয়াল, ছুরিকাঘাতের জায়গাটিতে যতটা সম্ভব ব্যান্ডেজ করে দিল। তার মৃত্যু হতে আরো বেশ কয়েক ঘণ্টা লেগে গেল। এই প্রথম মুখোমুখি লড়াইয়ে পলের হাতে কারো মৃত্যু হলো। হত্যা করার অভিজ্ঞতা তাকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করতে থাকল।
ঘোরের মধ্যে পল তখন তার হাতে নিহত সৈনিকের সাথে কথা বলছে। তাকে বোঝাতে চেষ্টা করছে, সে আসলে তাকে মারতে চায়নি। এই মরা মানুষটির পকেটবইতে পল একজন যুবতী এবং একটি ছোট্ট মেয়ে শিশুর ছবি পায়। এর ভেতরে একটি চিঠিও ছিল, যতটা সম্ভব পল পড়তে চেষ্টা করে। চিঠির প্রতিটি শব্দ পলকে গভীর অপরাধবোধ ও যন্ত্রণায় ডুবিয়ে রাখে। এই মৃত সৈনিকের নাম জেরার্ড ডুভাল। পেশাগতভাবে ছাপাখানার কর্মচারী। পল তার ঠিকানা টুকে রাখে। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করে, অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি হিসেবে সে তার স্ত্রী ও সন্তানের কাছে টাকা পাঠাবে। যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, তার বেঁচে থাকার প্রবৃত্তিগুলো জাগতে থাকে। তখন তার মনে হয়, এই ফরাসি সৈনিকের পরিবারের জন্য তার যে প্রতিশ্রুতি তা কখনো পালন করা হবে না। এবার সে তার পথ খুঁজে পেয়েছে, হামাগুড়ি দিয়ে সে নিজেদের ট্রেঞ্চে ফিরে আসে। নিজের হাতে ছাপাখানার কর্মচারীটিকে হত্যার অভিজ্ঞতা বন্ধুদের জানায়। ক্যাট ও ক্রপ বলে, তাদের স্নাইপাররা একটার পর একটা শত্রুর দেহ ফেলে দিচ্ছে। স্নাইপাররা আড়ালে থেকে টার্গেট লক্ষ করে গুলি চালায়।
স্নাইপারদের মতো হত্যার আনন্দ সে পাচ্ছে না, বন্ধুরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কিন্তু তার হাতে তো কোনো বিকল্প নেই; হয় নিজে নিহত হও নতুবা হত্যা করো।
একটি পরিত্যক্ত গ্রামে কোম্পানির রসদ ও গোলাবারুদের মজুত ছিল। পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পেলো পল, টিয়াডেন, মুলার, ক্রপ, ডেটারিং এবং ক্যাট। ক্রেঞ্চ হিসেবে তারা কংক্রিট নির্মিত আশ্রয়স্থল পেয়ে গেল। এমন চমত্কার জায়গা আগে কখনো পায়নি। সানন্দে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা এখানে কেবল খাবে আর ঘুমোবে। ভেতরে মেহগনি কাঠের একটি খাট, তোষক ঢুকায়। কম্বলও পেয়ে যায়। সৈনিক হিসেবে যোগ দেবার পর তখন ঐশ্বর্য উপভোগের সুযোগ তাদের হয়নি; যে জীবন তারা যাপন করছে সে তুলনায় বড় সৌখিন জীবন। তারা ডিম ও মাখন সংগ্রহ করে, ভাগ্য ভালো হওয়ায় দুটো শূকরছানাও পেয়ে যায়। তাজা শাকসবজিও নিয়ে আসে। তাদের আশ্রয়স্থলটির পাশে চমত্কার একটি চুলোয় গ্র্যান্ড ডিনার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পল তৈরি করে প্যানকেক, অন্যরা শূকরছানার রোস্ট।
তাদেরই দুর্ভাগ্য। শত্রুদের চোখে পড়ে, চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এমনি তারা বাড়ির ওপর বোমা বর্ষণের সিদ্ধান্ত নিল। আক্রমণ শুরু হতেই তারা যতটা সম্ভব তৈরি খাবার নিয়ে ট্রেঞ্চের ভেতর ঢুকতে চাইল। পলের প্যানকেক বানানো কেবল শেষ হয়েছে, অমনিই তার পাশে বোমা পড়ল। প্লেট হাতে সে মুহূর্তের মধ্যে ট্রেঞ্চে ঢুকে পড়ল। একটি কেকও তাকে চুলোতে রেখে আসতে হয়নি। প্রায় চার ঘণ্টায় তাদের সব খাবার শেষ হলো। তারপর নিজেদের মজুত থেকে সিগারেট বের করে কিছুক্ষণ প্রাণ ভরে টেনে নিল। তারা কফি খেল। রাতের বানিয়াকে চুমুক দেবার আগে আরো একবার পেট ভরে খেয়ে নিল। এমনকি নামগোত্রহীন একটি বিড়ালকেও খাওয়াল।
আবারও স্থান বদলের আগে তাদের তিন সপ্তাহের একটি মনোমুগ্ধকর জীবন যাপনের ইতি টানতে হলো। তারা সাথে বিছানা, দুটো হাতাওয়ালা চেয়ার এবং বিড়ালটিকে সাথে নিল। তারা যখন আরো একটি গ্রামকে যুদ্ধের জন্য সাধারণ মানুষ সরিয়ে জনশূন্য করছে, গোলার আঘাতে ক্রপ ও পল জখম হলো।
শেলিং জোনের ভেতর বহু চেষ্টা করে একটি অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করল। ক্রপের হাঁটুর কাছে জখম। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যদি তার পা কেটে ফেলতে হয়, সে আত্মহত্যা করবে। পলের পা ভেঙে গেছে, হাতেও বড় জখম। একজন সার্জেন্ট মেজরকে সিগার ঘুষ দিয়ে পল ও ক্রপ দুজনে ট্রেনের একই বগিতে হাসপাতাল পর্যন্ত যাবার সুযোগ পায়।
ক্রপের জ্বর এসে যায়। পাশের ক্যাথলিক হাসপাতালে নামতে হয়। তার সাথে যাওয়ার জন্য পলও গুরুতর অসুস্থতার ভান করে। ক্রপের জ্বরের কমতি নেই, ঊরুর কাছ থেকে তার পা কেটে ফেলতে হবে। হাসপাতালে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের জখম ও পঙ্গুদের দেখার পর পলের মনে হয়েছে, যুদ্ধ কী তা বোঝার জন্য হাসপাতাল হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জায়গা।
পল হতবাক হয়ে তার নিজের প্রজন্মের কথা ভাবে—যুদ্ধের পর তাদের কী হবে?
লেবানডভস্কি পেটে খুব খারাপ একটা জখম নিয়ে হাসপাতালে এসেছিল—এখন ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। দু’বছর আগে চল্লিশ বছর বয়সী এই সৈনিক সংসার ছেড়ে এসেছে। সে দারুণ উত্তেজিত। তার স্ত্রী তাকে দেখতে আসছে, সাথে একটি সন্তান। লেবানডভস্কি যখন চলে আসে, তখন সান্তানটি তার স্ত্রীর পেটে। একটি গোপন জায়গার জন্য সে মারিয়া হয়ে উঠেছে। দু’বছর সে স্ত্রীর সাথে শোয়নি, আজ এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। কিন্তু স্ত্রী আসার আগেই তার জ্বর আসে এবং তা হু হু করে বেড়ে যায়। বিছানা থেকে উঠার শক্তি আর নেই। স্ত্রী যখন পৌঁছে স্বামীকে দেখে, বিচলিত হয়ে পড়ে। লেবানডভস্কি তার সাথে কী করতে চায়, বলতেই সে লজ্জায় লাল হয়ে যায়। ব্যাপারটা আশপাশের বেডের চিকিত্সাধীন সৈনিকরাও বুঝতে পারে। তারাই তার স্ত্রীকে বলে, যখন যুদ্ধ চলে তখন সংসারের ও সমাজের সব নিয়মকানুন না মানলেও সমস্যা নেই। তাদের দু’জন দরজায় পাহারায় দাঁড়ায় যেন রোগী দেখার কথা বলে কোনো ডাক্তার বা নার্স ঢুকে না পড়ে। ক্রপ বাচ্চাটিকে কোলে নেয়; অন্যরা এই দম্পতির দিকে পিঠ দিয়ে তাস খেলতে থাকে এবং জোরে জোরে কথা বলতে শুরু করে। যতটা সম্ভব কম বিবস্ত্র হয়ে এই দম্পতি দু’বছর পর সঙ্গমে মিলিত হয়। চমত্কারভাবে বিনা বাধায় এই মিলন সম্পন্ন হয়।
লেবানডভস্কির স্ত্রীর সাথে আনা খাবার তার স্বামী অন্য রোগীদের সাথে ভাগাভাগি করে খায়।
পলের অবস্থা ভালো দিকে, দ্রুত সেরে উঠছে। হাসপাতাল যখন কাপড়ের ব্যান্ডেজের বদলে কাগজের ব্যান্ডেজ ব্যবহার করছে, ক্রপের পা-ও সেরে উঠছে। তবে এখন সে আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত, কথাও কম বলছে। পলের মনে হয়েছে অন্য রোগীদের সাথে না রেখে ক্রপকে আলাদা কোনো কক্ষে রাখা হলে সে আত্মহত্যা করতে পারে। বাড়ি গিয়ে ক্ষত শুকোতে পল কয়েকদিনের ছুটি পায়। যদি ফিরে আসে, মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়াটা আগের চেয়েও কষ্টকর হয়ে পড়বে। দু’জনের জন্যই। মা আগের চেয়ে আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। পল যদি আরও একবার ফিরে আসে, মা-কে পাবে কি না কে জানে।
যুদ্ধ যত তেতে ওঠে জার্মান সৈন্যবাহিনীকে তত নিষ্প্রভ মনে হতে থাকে। পল ও তার সহযোদ্ধা ক’দিন যুদ্ধে কাটালো, সে সময়টা গুনত। এখন তা ছেড়ে দিয়েছে। কারণ, যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তারা আদৌ বেঁচে থাকবে কি না, তাদের কোনো ধারণাই নেই।
পল যুদ্ধকে ফ্লু, যক্ষ্মা কিংবা ক্যানসারের মহামারীর সাথে মেলাতে চেষ্টা করে। দিনবদলের সাথে মানুষের চিন্তাভাবনাও বদলাতে থাকে। যখন তারা যুদ্ধ করে, তাদের চিন্তাগুলো মরে যায়, যখন তারা বিশ্রাম করে, চিন্তা ফিরে আসে। তাদের প্রাক-যুদ্ধ জীবনের আর কোনো বৈধতা নেই। যখন তারা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে, তখন থেকে সেই জীবনের আর কোনো মানে নেই। আগে তারা ছিল বিভিন্ন প্রদেশের মুদ্রার মতো। এখন সকলকে গলিয়ে একই ছাঁচে ঢেলে নতুন করে ছাড়া হয়েছে। তাদের প্রধান পরিচয়—সবার আগে তারা সৈন্য; এরপর যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে এক-একজন ব্যক্তি। মুত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীরা নিজেদের মধ্যে সহমর্মী, যুদ্ধের সৈনিকদেরও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ও পরস্পরের সাথে নিবিড় বন্ধন।
পলের মনে হয় সৈন্যদের বেলায় জীবনটা সারাক্ষণই মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। তারা নিজেদের চিন্তাহীন প্রাণীর পর্যায়ে নামিয়ে আনে; সার্বক্ষণিক মৃত্যুর হুমকির মুখে একমাত্র অনুভূতিজাত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে টিকে থাকতে হয়। মৃত্যুউপত্যকায় সর্বক্ষণ বসবাস করে আর সব গুণাগুণ বিদায় দিতে হয়। যুদ্ধ ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। একসময় তারা ভেঙে পড়ে।
হঠাত্ একদিন ভেটারিং-এর চোখে পড়ে, চেরি গাছে ফুল ফুটছে। এগিয়ে এসে একটা ডাল ভেঙে দেয়। ডালটা তাকে মনে করিয়ে দেয়, তাদের ফলবাগান এখন নিশ্চয় চেরি ফুলে ছেয়ে গেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সে হুট করে সেনাবাহিনী ছেড়ে দেয়। হল্যান্ডে পালিয়ে না গিয়ে বোকার মতো সে বাড়ি ফিরে যায়। সেনাবাহিনী পরিত্যাগকারী হিসেবে গ্রেফতার হয়; বিচারও হয়। সেকেন্ড কোম্পানিতে তার কথা আর শোনা যায়নি।
শত্রুরা সরাসরি মুলারের পেটে গুলি করে। আধ ঘণ্টার মৃত্যুযন্ত্রণার পর মুলার চিরদিনের জন্য শান্ত হয়ে যায়।
পল মুলারের বুটজোড়া গ্রহণ করে। একসময় এগুলোর মালিক ছিল কেমেরিখ।
যুদ্ধ ধীরে ধীরে জার্মানির বিরুদ্ধে চলে যায়। সৈন্যদের খাদ্যের মান নেমে যায়। যেন প্রতিশোধ নেবার জন্য আমাশয় প্রায় সকলকে শয্যাশয়ী করে ফেলে। শত্রুর নতুন ও ঝকঝকে অস্ত্র ও প্রচণ্ড শক্তিশালী গোলন্দাজ শক্তির সামনে জার্মান অস্ত্র পুরোনো জরাজীর্ণ। নতুন যাদের নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের চেয়ে কমবয়সী কাউকে আর নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাদের সামান্য প্রশিক্ষণও নেই।
যারা জখমপ্রাপ্ত, একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই আবার রণক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পঙ্গুদেরও রেহাই নেই; তাদেরও যেতে হচ্ছে।
মারাত্মক এক জখমের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে হতে লিয়ারের মৃত্যু হয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও জার্মানি লড়াই করে যাচ্ছে। যুদ্ধ থেমে যাবে—এমন গুজব কানে আসতেই সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে অনীহা প্রকাশ করতে থাকে।
এখান থেকে ওখান থেকে জোগাড় করা খাবার নিয়ে ফিরে আসার পথে ক্যাট জখম হয়। ক্যাটের এতটাই রক্তপাত হচ্ছে যে, তাকে ফেলে পল স্ট্রেচার আনতে যাবে সে সুযোগ আর পাচ্ছে না। তাকে কাঁধে নিয়ে অনেক কষ্ট করে পল ব্যারাকের ড্রেসিংরুমে নিয়ে আসে। আসার পথে বিক্ষিপ্ত শেল চারদিকে আঘাত করছিল।
সেনাবাহিনীতে ক্যাট ছাড়া পলের আর কোনো বন্ধু নেই। ক্যাটকে বহন করে যখন পৌঁছায়, সে আবিষ্কার করে, বিস্ফোরিত শেল থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা একটি স্প্রিন্টার তার মাথায় আঘাত করেছে।
পলের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু তার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে।
১৯১৮-র শরত্কাল। পলের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে রক্তাক্ত সময়। সেই ক্লাসমেট গ্রুপের একমাত্র জীবিত সদস্য পল। যুদ্ধে আসার তীব্রতা ও নির্মমতা বেড়েই চলেছে। এখন মিত্রদের সাথে যোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জার্মানির পরাজয় অনিবার্য। কেবল সময়ের ব্যাপার। জার্মান সৈন্য ও জার্মান নাগরিকদের লাঞ্ছনা ও দৈন্য এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, যুদ্ধ না থামলে তারাই তাদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসবে।
পল আবার রণাঙ্গনে। বোমার বিষাক্ত গ্যাস তাকে অসুস্থ করে তোলে। সুস্থ হয়ে ফিরে আসার জন্য তাকে চৌদ্দ দিনের ছুটি দেওয়া হয়। বাড়ি ফিরে যাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে পেয়ে বসে; কিন্তু সে আতঙ্কিত, কারণ তার কোনো লক্ষ্য নেই। সে কি বাড়ি ফিরে যাবে? নিজেকে নিয়ে কী করবে পল জানে না। তার ভয়, তার প্রজন্মের কেউ আর জীবিত ফিরে আসবে না—যারা ফিরবে তারা জিন্দালাশ, মানুষের খোলসমাত্র।
এই ভাবনা সে আর বহন করতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে গোলাগুলি ও বোমাবর্ষণের মধ্যেও একটা মানবিক শক্তি জেগে থাকার কথা ছিল, কিন্তু তার মনে হচ্ছে, তার নিজের জীবন এতটাই ধ্বংস হয়ে গেছে, সেখান থেকে জীবনটাকে টেনে তোলার আর কোনো উপায় নেই।
যুদ্ধ করতে করতে ১৯১৮-এর অক্টোবরে অসাধারণ শান্ত ও শান্তিপূর্ণ একটি দিনে বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র জীবিত পল বাউমার নিহত হয়। সেদিনকার সেনাবাহিনীর দৈনিক প্রতিবেদনে শুধু বলা হয়, ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’—পশ্চিম রণাঙ্গনে সব শান্ত।
মৃত পলের মুখেও প্রশান্তি, অন্তত শেষটা তো এসে গেছে।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৩
ফজর৪:৫৯
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৮সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :