The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

চলচ্চিত্র

ভারতেজাতীয় চলচ্চিত্র

বিধান রিবেরু

“ভারতে বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশক এবং সারাবিশ্বে সিনেমার সূচনা থেকে আঞ্চলিক চলচ্চিত্র কারখানার সমন্বয়সাধন পর্যন্ত যে তোড়জোড় চোখে পড়ে সেটার প্রাথমিক সূত্রায়নগুলো একই। এই সূত্রায়নে সমাবেশ ঘটে বিচিত্র দিগন্তের। তবে ভারতের চলচ্চিত্র প্রকল্পে ব্রিটিশ রাজ ভিন্ন নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশাও চোখ এড়ায় না। চলচ্চিত্র কারখানা ও ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব প্রকৃত অর্থে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’ হিসেবে ভারতীয় সিনেমায় অঙ্গীভূত, এটা এজন্য বলা হচ্ছে না যে রাষ্ট্রের সঙ্গে কারখানার সম্পর্ক কোনো সমস্যা ছাড়াই সমকালিক সম্পর্ক (synchronic relation) দিয়ে খোলাসা করা সম্ভব, যেখানে চলচ্চিত্র ‘দেখাবে’ (reflect) জাতিরাষ্ট্রে কী কী হওয়া উচিত। তাহলে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’ হিসেবে ভারতের চলচ্চিত্র নিয়ে কিভাবে আগানো যায়?”
— ভ্যালেন্তিনা ভিতালি
যুক্তরাজ্যের উলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেমাবিদ্যার শিক্ষক ভিতালি ভারতীয় সিনেমা সংক্রান্ত এক প্রবন্ধে উল্লিখিত অংশে বলার চেষ্টা করছেন বিংশ শতাব্দীর শুরুর তিন দশক ভারতের বাইরে ও ভেতরে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া মোটামুটি একরকম হলেও পার্থক্য টেনে দেয় চলচ্চিত্রের বক্তব্যে জাতীয়তাবাদ বা স্বাধিকারের জন্য আর্তি। ব্রিটিশ শাসনের ভেতরে কারখানার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হলেও মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব চোখ এড়ায় না। ভিতালি বলার চেষ্টা করছেন, সেখান থেকেই মূলত ভারতের জাতীয়তাবাদ চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেছে এবং সেই বিচারে তত্কালীন ছবিগুলো ভারতের প্রাক-জাতীয় চলচ্চিত্র।
১৯১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘রাজা হরিশচন্দ্রে’র কথাই ধরা যাক। এর ভেতর ভারতমুক্তির ধারণা বেশ ভালো রকমই ছিল। দাদাসাহেব ফালকে জাতীয়তাবোধ থেকেই এই চলচ্চিত্রে ভারতীয় দেবদেবীদের জীবন্ত করতে চেয়েছেন। যিশুখ্রিস্টের উপর ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ফালকে পর্দায় আনতে চাইলেন ভারতীয় পুরাণের দেবতাদের। ‘কল্পিত সমপ্রদায় বা গোষ্ঠী’ কল্পনাকে পুরাণের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আনা সম্ভব দেখে ফালকে সাহেবকে অনুসরণ করতে শুরু করেন সেই সময়কার অনেকেই। ‘ভক্ত বিদুর’ চলচ্চিত্রে ধৃতরাষ্ট্রকে আনা হয় রাজা জর্জকে বোঝাতে। আর বিদুর হয়ে ওঠে মহা্তা গান্ধীর নামান্তর। এরপর পঞ্চাশের দশকে ধ্রুপদী ছবি ‘মাদার ইন্ডিয়া’য় আমরা ভারতমাতাকে নির্মাণ হতে দেখি রক্তমাংসের এক নারীর মাঝে। ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে মা বা মাতৃরূপ বারবার ফিরে এসেছে। ঋত্বিক ঘটক বেঁচে থাকলে হয়তো ইয়ুঙের চরণ ছুঁয়ে এই ঘটনাকে দেগে দিতেন মৌলরূপ বা ‘গ্রেট মাদার আর্কিটাইপ’ বলে। শুধু ভারতীয় কেন, বহু চলচ্চিত্রেই মা সমার্থ হয়েছে দেশ ও দেশপ্রেমের। এভাবেই জাতীয় ঐক্যের এক কল্পনা রচিত হতে দেখা যায় মাতৃরূপের ছায়াতলে। যেন পুরো ভারতমাতা আর এর সকল নাগরিক, হোক না গরিব বা ধনী, শ্রমিক কি ব্যবসায়ী, সর্বহারা অথবা বুর্জোয়া, মায়ের প্রিয় সন্তান। সবাই ভাই ভাই। কেউ কারো শত্র নয়। শোষক আর শোষিত, যতই তাদের স্বার্থে দ্বন্দ্ত থাকুক তারা ভারতমাতার সন্তান। এমনই এক ‘আর্কিটাইপাল মাদার’কে আমরা ঘুরেফিরে আসতে দেখি ভারতের চলচ্চিত্রে, প্রত্যেক দশকেই। গণমাধ্যম বিষয়ক লেখক ভামসি জুলুরি অবশ্য বলেন, ভারতীয় সিনেমার প্রথম ‘আর্কিটাইপাল’ হিরো হলো মায়ের সন্তানেরা। এই সন্তানের জন্য মা সব করতে প্রস্তুত। আর মায়ের জন্য সন্তানও সর্বোচ্চ আ্ত্তত্যাগে কুণ্ঠা বোধ করে না। চলচ্চিত্রের নায়িকাও এত মর্যাদা পায় না। দেশ ও দেশের জনগণের ক্ষেত্রে মা ও সন্তানের এই মেটাফোর ভারতীয় চলচ্চিত্রে বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গেই এসেছে বলতে হয়। এই রূপান্তর জাতীয়তাবোধের নামান্তর মাত্র, এই নামান্তরের মধ্য দিয়েই তৈরি হতে থাকে কল্পিত জাতি আর জাতীয় চলচ্চিত্র।
ফিরে যাই শুরুর আলাপে। যে প্রবন্ধ থেকে ভ্যালেন্তিনা ভিতালিকে উদ্ধার করেছি প্রথমে, সেই রচনায় ভারতীয় চলচ্চিত্র কারখানায় জওহরলাল নেহরু তথা কংগ্রেসের ভূমিকা এবং দেশটির অর্থনীতি, কালো টাকার ভূমিকা ইতি আদির চিত্র দেয়ার পর নিজের প্রশ্নেরই উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন ভিতালি, ব্রিটিশ চেক দার্শনিক আর্নেস্ট গেলনারের বরাত দিয়ে। ভিতালির প্রশ্ন ছিল, ভারতের ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’ শুধু সময়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠেনি, সেখানে রয়েছে আরো কিছু, সেই কিছুটা কী? এটাই ছিল তার প্রশ্ন। ভিতালি নিজের লেখারই শেষ অংশে এর জবাবে বলেন এই জাতীয় চলচ্চিত্র গঠনের পেছনে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী ছিল আর কেমন ছিল এর অর্থনীতি। আর্নেস্ট গেলনারকে সহায় করে ভিতালি বলেন, শিল্পপুঁজির গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ভারতের ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’ গড়ে উঠেছে। এই শিল্পপুঁজি শিল্পায়ন পূর্বযুগের বৈষম্যমূলক সামাজিক বিভেদকে ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং জাতীয়তাবাদ ‘আবিষ্কারে’ পথ দেখিয়েছে। ভিতালি বলছেন, শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে চলচ্চিত্র সব সময়ই সম্পর্কযুক্ত আর জাতীয়তাবাদ ও উত্পাদিত চলচ্চিত্র উভয়ই এই প্রক্রিয়ার ফল বা পণ্য। এবং বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের (বাঙালি, ব্রিটিশ, জার্মান ইত্যাদি) পার্থক্য ও বিভেদরেখা তুলে ধরে চলচ্চিত্র নিজে একক জাতিগোষ্ঠীর ফেরিওয়ালা হয়ে ওঠে। এই ক্ষমতার প্রমাণ ভারতের ভেতরকার আঞ্চলিক চলচ্চিত্রগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৬০ সালের মধ্যে জওহরলাল নেহরু হিন্দির পাশাপাশি অন্য আঞ্চলিক ভাষাকেও রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেন। এর একমাত্র কারণ পুরো ভারতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ছাতার তলে নিয়ে আসা। যেন হিন্দি ভিন্ন অন্য ভাষার মানুষ নিজেদের বিচ্ছিন্ন না ভাবে। তারপরও কি চলচ্চিত্র কারখানাগুলোকে থামানো গেছে নিজেদের ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে? তামিল নাড়ু কিংবা পশ্চিমবঙ্গে তো এন্তার সিনেমা হচ্ছে নিজস্ব ভাষায়। এক রাষ্ট্রের ভেতর তামিল, বাংলা ও হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষায় ছবি হলেও ভারতের বাইরে বাংলাদেশ বাদ দিলে হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রকেই ভারতের চলচ্চিত্র বলে ধরা হয়। অবশ্য হিন্দিকে ভারতের সর্বত্র চালু করার ব্যাপারে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারেরও চেষ্টা ছিল এবং এখনো জারি আছে। এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তো আগেই বলেছি। নিজেদের এক অভিন্ন জাতির বলে কল্পনা করা বা অন্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যে, এই জাতির নাম ‘ভারতীয়’।

দুই
‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ জিনিসটা কী? এর ছায়াতলে জাতীয় চলচ্চিত্র বেড়ে ওঠে না চলচ্চিত্রের সহায়তায় জাতীয়তাবাদ পুষ্ট হতে থাকে সেই ধাঁধা একটু আগালে পরিষ্কার হবে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর ভাগে ভারতে জাতীয়তাবাদের শিকড় চোখে পড়ে একটা ছোট, পশ্চিমা ভাবধারার এলিট গোষ্ঠীর মধ্যে। চলচ্চিত্র শিক্ষক জ্যোতিকা ভার্দি আরো যোগ করেন, এই গোষ্ঠীর প্রেরণাদাতা হিসেবে কাজ করেছে ফরাসি বিপ¬ব, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং মুক্তি ও স্বাধিকারের যে চেরাগি আদর্শ— সেগুলা। এই ধারণা ব্যবহূত হয়েছে রাজনৈতিক দমন ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে। ভারতে রাজনীতি এগিয়েছে একক জাতিকে কল্পনা করে— এখানে ছড়ি ঘুরিয়েছে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও ঐতিহাসিক পুনর্বয়ান। ভার্দির বাহাস, পুরো ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে এই দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এমন এক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছে যেখানে নানা বৈপরীত্যের দেখা মেলে। শ্বেত সাম্রাজ্যবাদীদের থেকে নিজেদের আলাদা করতে এই আন্দোলন তৈরি করেছে ‘ভারতীয়’ ঐতিহ্য। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বরাত দিয়ে ভার্দি বলেন, অন্য আর দশটা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের মতো (পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের মতো নয়) আধুনিক ‘রাষ্ট্রের’ ধারণায় ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ গ্রহণ করেছে ‘প্রাচীন’ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। ইউরোপে যখন বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানে বণিকশ্রেণী রাজশাসন ও চার্চের দৌরাত্ম্যকে বিদায় করছে তখন ভারতে চলছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে অপর ও নিজের যে ভেদ রেখা টানা হয়েছে সেটার মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদ পোক্ত হয়েছে আরো কয়েক গুণে।
ভারতীয় জাতি মূলত রাজনৈতিক সত্তা, এই সত্তা কাজ করে ভারতের বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উপর এবং সেটা হয় বুদ্ধিভিত্তিক ‘যন্ত্রপাতি’র সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে— মাধ্যমগুলো হলো— কাহিনি ও সাহিত্যিক কল্পনা, ইতিহাস রচনা, শিক্ষাব্যবস্থা প্রভৃতি। ভার্দি বলছেন, এসব মাধ্যমের মধ্যে চলচ্চিত্র একটু কম নজরই পেয়েছে। তিনি বলছেন, জাতি কল্পনায় ও জাতীয় কল্পমূর্তি নির্মাণে চলচ্চিত্র যে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে সেটাকে ভারতে বিশেষ আমলে নেয়া হয় নাই। ভারতীয় চলচ্চিত্র দেশটির বহু পুরাতন মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া কল্পকাহিনি বা বয়ানের রীতি দখল করে নিয়েছে কৌশলে। হিন্দি সিনেমা নিজ ক্ষমতা বলেই জাতিগঠনের যত রকম অস্ত্র প্রয়োজন সব বুদ্ধি দিয়ে প্রয়োগ করে চলেছে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর মতে, জাতি ‘বুদ্ধিভিত্তিক কাঠামো’ ছাড়া কিছু নয়। ভার্দি মোদ্দা কথায় বলেন, অতএব জাতি স্রষ্টাদের সৃষ্ট কাল্পনিক বস্তুর চেয়ে বেশি কিছু না। এখন ভারতে হিন্দি যে আসনে রয়েছে তার পেছনে রয়েছে হেজিমনি বা আধিপত্য। এই আধিপত্য বিস্তারকারী গোষ্ঠী সেটা করেছে আপন স্বার্থেই। হিন্দি ভাষাকে অবশ্যই অন্যান্য ভাষার সঙ্গে সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এখানে সিনেমা এক বাহনমাত্র। এক্ষেত্রে হিন্দি সিনেমার পেছনে পুঁজি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ যে কারখানা বলিউড নামে আজ পরিচিত সেই কারখানার মূল চালিকাশক্তি এর বিনিয়োগ ও এর প্রক্রিয়া।

তিন
ভারতের সিনেমা বাজারের প্রথম পর্যায় যদি ধরা যায় ১৮৯৬ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত তবে এই কাল ছিল ‘নিছক বাণিজ্যপুঁজির যুগ’। এরপর শহরাঞ্চলে ব্যবসায়িক পণ্য হিসাবে চলচ্চিত্রের পসার ঘটতে থাকে শহরে তো বটেই, গ্রামেও। ত্রিশের দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে নাচগান যোগ হওয়ায় বাজারে কাটতি বেড়ে যায়, ফলে বেড়ে যায় বিনিয়োগ। ১৯২৮ সালে ভারতের সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ২৭৫টি। কিন্তু দশ বছরের মাথায় ১৯৩৮ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৫৭টিতে। বাজার সমপ্রসারণের ক্ষেত্রে শুদ্ধ সাধারণ মানুষ নয়, সহায়তা করল ‘মোটামুটি সংগঠিত এক উত্পাদনক্ষেত্র’।
চলচ্চিত্রের অর্থনীতি বিষয়ক পণ্ডিত সোম্বেশ্বর ভৌমিক ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই পর্যায় প্রসঙ্গে বলেন, পুঁজি পরিচালনা (capital management), যা উত্পাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাতে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেননি ভারতীয় স্টুডিয়োর কর্ণধারেরা। নিউ থিয়েটার্স, বোম্বে টকিজের মতো বিখ্যাত প্রযোজনা সংস্থার পক্ষ থেকে নিয়মিত পুঁজির সংস্থান থাকলেও ছিল আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব। মানে কোনো চলচ্চিত্রের কাজ শুরু হলে তা কবে শেষ হওয়া দরকার বা সঠিক পরিকল্পনা করে পুঁজির যথাযথ প্রয়োগ— এসবের ঘাটতি ছিল সে সময়কার সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ফলে পুঁজির গতি বা আবর্তনের নির্দিষ্ট ধারা তৈরি হয়নি সে সময়। ভৌমিক বলছেন, ‘কার্যকর পদ্ধতিতে পুঁজির ব্যবহার তখনই সম্ভব, যখন পুঁজির সঞ্চালন বিষয়ে থাকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা।’ তার পরও শহর ও মফস্বলের চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের দৌলতে তিরিশ ও চলি¬শের দশকে চলচ্চিত্র ব্যবসা বেড়েছে বৈ কমে নাই। লক্ষ্মীর এই তেজিভাবের পেছনে পুঁজিবাজারের সঙ্গে যতটা না, নির্মাতাদের তার চেয়ে বেশি নির্ভরতা ছিল মহাজনি পুঁজির উপর। তাছাড়া হলিউডের মতো চলচ্চিত্র সম্পর্কিত শিল্পোদ্যোক্তা ভারতে ছিল না। নিউ থিয়েটার্সের কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকার সম্পর্কে ভৌমিকের মূল্যায়ন, ‘হলিউড-এর স্টুডিও মালিকেরা যদি হন নিমর্ম একনায়ক, বীরেন্দ্রনাথকে তাহলে বলতে হয় উদাসীন পৃষ্ঠপোষক। নিউ থিয়েটার্স সমৃদ্ধ হয়েছে অনুকূল পরিস্থিতির প্রসাদে; ভেঙে পড়েছে প্রতিকূলতার প্রথম ধাক্কায়।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বাজারে মন্দা নেমে আসে। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে বহু প্রযোজনা সংস্থা, হলমালিক ও পরিবেশক। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে না হতেই তেজিভাব ফিরে আসে বাজারে। তৈরি হতে থাকে নতুন ধরনের বড় বাজেটের ছবি। চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হয় বোম্বাইয়ের উত্পাদনক্ষেত্রে। যুদ্ধকালে ক্ষতিগ্রস্ত স্টুডিওমালিকরা হুট করে এই পুঁজির যোগান দেননি। যুদ্ধের সময় অসাধু উপায়ে, মজুদদারি করে, নানাভাবে কালো অর্থ উপার্জনের হিড়িক পড়ে যায়। ভারতেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। যুদ্ধের পর হঠাত্ করেই সিনেমার বাজার চাঙা হয়ে ওঠার পেছনের শক্তি ঐ কালো টাকা। ভৌমিক ১৯৫২ সালে প্রকাশিত ফিল্ম অ্যানকোয়্যারি কমিটির এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলছেন, ‘এই পুঁজির সিংহভাগই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অসাধু উপায়ে অর্জিত কালো টাকা। সিনেমার জগতে আয়ব্যয় বা লাভক্ষতির ঠিকঠাক হিসেব রাখার কোন দস্তুর নেই এদেশে।’
এই কালো টাকার মালিক বিনিয়োগকারীদের চলচ্চিত্রের স্টুডিয়ো বা পরিকাঠামো উন্নয়নে কোনো আগ্রহ ছিল না। বরং যে পরিকাঠামো আগে থেকেই তৈরি ছিল সেটিকে কাজে লাগিয়ে কালো টাকা সাদা আর মুনাফাই ছিল এদের মূল লক্ষ্য। এ সময় অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের লেনদেন যেমন বেড়েছে তেমনি তারা হয়ে উঠেছেন তারকা। স্বাধীনতার পর দুই দশকের মধ্যে কালো টাকার মাস্তানিতে সংগঠিত উত্পাদন ব্যবস্থা যেমন সমূলে উচ্ছেদ হলো (বোম্বে টকিজ, নিউ থিয়েটার্সের মতো প্রযোজনা সংস্থা ব্যবসা গুটিয়েছে) তেমনি দেশভাগের ধাক্কা ও শিল্পায়নের জোয়ারে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্র পেতে শুরু করে অন্যরকম দর্শক। মানে শহরে শুধু শহুরে বাবু নয়, সীমান্তের ওপার থেকে এবং গ্রাম থেকে কায়িকশ্রম বেচতে শহরে ভিড় জমাতে থাকে দরিদ্র মানুষ। তাদের মাথার উপর স্থায়ী ছাদ বলতে খোলা আকাশ। আধপেটা খাওয়া দরিদ্র এসব মানুষ ছিন্নমূল, ক্ষোভ তাদের নানা কারণে।
এসব ছিন্নমূল, ক্ষুব্ধ ও ভবঘুরে মানুষের একটা বড় অংশ হয়ে পড়ে সিনেমার ক্রেতা। সময় যত গড়াতে থাকে এদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশেও কমবেশি এ রকম চিত্র দেখা যায়। বর্তমানে যেমন পোশাক কারখানার শ্রমিকরাই বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের প্রধান ক্রেতা। যাই হোক, বলিউডে এই কারণেই অনেকে বলেন ফর্মুলা ফিল্মের আবির্ভাব। বিষয়টা তর্কসাপেক্ষ, তবে সত্তরের দশকে অমিতাভ বচ্চনের মতো ‘এ্যাংরি ইয়ঙম্যান’ কেন বলিউড কারখানায় আমদানি হয়েছিল তা আর ভেঙে না বললেও চলে।
ভারতে চলচ্চিত্র ব্যবসা খুব যে লাভজনক তা নয়। আগেই বলা হয়েছে, এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বেড়েছে কালো টাকার বিনিয়োগ। আর সরকারিভাবে করছাড়, ভর্তুকি কিংবা সহজ শর্তে ঋণ ও ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি— কোনোটাই ছিল না, এখনো নাই। তার পরও প্রচুর ছবি হয় সারা ভারতে এবং লোকসানও গুনতে হয় প্রচুর পরিমাণে। দর্শকের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি ও নানা সামাজিক কারণে মানুষ চলচ্চিত্র দেখা কমিয়েছে। এর উপর বিষফোঁড়া হয়ে আছে টেলিভিশনে চলচ্চিত্র সমপ্রচার ও পাইরেসি। সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রের বাজার অধিকাংশের জন্যই হতাশাজনক। ১৯৮৫ সালের এক জরিপে দেখা যায় ভারতের বাজারে যত ছবি মুক্তি পায় তার ৬৫ শতাংশই বাণিজ্যে সফল হয় না। ২৫ শতাংশ ছবির খরচ কোনোরকমে উঠে আসে। আর বাকি ১০ শতাংশ মোটামুটি লাভের মুখ দর্শন করে, এদের মধ্যে ২ শতাংশ ছবি সত্যিকার অর্থেই ব্যবসা সফল বা বক্সঅফিস হিট হয়। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে সুমিত মিত্র দেখিয়েছেন, ১৯৭৫ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের উত্পাদন ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১২ কোটি রুপি আর ১৯৮৫ সালে ক্ষতির মাত্রা দশগুণ, মানে ১২০ কোটি রুপি। এর পরও কেন বস্তা বস্তা ছবি হচ্ছে? লোকসান জেনেও? চাহিদা কমার কথা আগেই হলো। সোমেশ্বর ভৌমিক বলছেন, স্বাধীনতার পরে ভারতের বাজারে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য শুধু নয়, আন্তঃসম্পর্কই নষ্ট হয়ে গেছে। আর দশটা ভোগ্যপণ্যের মতো চলচ্চিত্রের জোগান চাহিদা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত নয়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে ‘বাজারে চাহিদা-নিরপেক্ষ জোগানের নেশা’ (demand inelastic supply syndrome)১৬। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, কারণ অধিকাংশ প্রযোজক ও পরিবেশকের অর্থের জোগান স্বচ্ছ উত্স্য থেকে নয়। ভারতের চলচ্চিত্র কারখানাকে তাই কারখানা বা শিল্প না বলে কালো টাকা সাদা করার যন্ত্রও বলতে পারেন।

পাঠসূত্র
১. Valentina Vitali, Not a Biography of ‘Indian Cinema’ : Historigraphy and Question of National Cinema in India, Theorising National Cinema edited by Valentina Vitali and Paul Willeman , a BFI book published by Palgrave Macmillan, 2008,
২. Vamsee Juluri, Bollywood Nation : India through its Cinema, Penguin Books 2013,
৩. Valentina Vitali,
৪. Jyotika Virdi, The Cinematic Imagination : Indian Popular Films as Social History, Permanent Black 2007,
৫. সোমেশ্বর ভৌমিক, সিনেমার আশ্চর্য বাজার, শতবর্ষে চলচ্চিত্র (প্রথম খণ্ড), নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত, আনন্দ পাবলিশার্স

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ২০
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫১
মাগরিব৫:৩২
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৮সূর্যাস্ত - ০৫:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :