The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

উপন্যাস

মানুষের মাংস

ইরাজ আহমেদ

জানিস, সেদিন একটা পত্রিকায় পড়লাম, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময় স্ট্যালিনগ্রাডে লাল ফৌজের সদস্যরা নাকি তাদের মৃত কমরেডদের মাংস খেয়ে যুদ্ধ করেছিল।
শিশির মনে হয় আরও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু তার আগেই ওর পাশে বসে থাকা রঞ্জন হড়হড় করে বমি করে দিল।
শিশির লাফিয়ে সরে গিয়ে বলে, এই শালা, এটা কী করলি? কথা নেই বার্তা নেই, খালাস করে দিলি! এই জন্য আমি সব সময় বলি, জ্ঞানের আলো যাদের কাছে এখনো পৌঁছায়নি তাদের জন্য মদ্যপান হারাম।
একটু দূরে দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে বসা মন্টু জড়ানো গলায় বলে, তোর জ্ঞানদান প্রক্রিয়াটা রঞ্জনের জন্য একটু হেভি হয়ে গেছে মামা। ধারণ করতে পারেনি, মাফ করে দে। মেঝেতে ক্রমশ ছড়িয়ে যেতে থাকা হলদেটে রঙের তরল পদার্থের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মাথা ঝাঁকায় রঞ্জন। মুখ তুলে বলে, তুই শালা কথা বলার আর কোনো সাবজেক্ট খুঁজে পেলি না! মানুষের মাংস খাওয়ার গল্প। পেটের ভেতরে সবকিছু নড়েচড়ে বের হয়ে গেল।
শিশির সযত্নে ওর গ্লাসটা বমির জায়গা থেকে সরিয়ে বলে, কেন, আমি খারাপটা কী বললাম! এটা তো হিস্ট্রি। ভাবলাম তোদের সঙ্গে শেয়ার করি।
উঠে জানালা দিয়ে থুতু ফেলে রঞ্জন বলে, এই ব্যাটা, মদের সঙ্গে ইতিহাসের সম্পর্ক কোথায়? কথা বলার কোনো বিষয় খুঁজে পাচ্ছিস না? দূর, আমার ঘরটার বারোটা বেজে গেল।
আমরা চারজন অনেকক্ষণ ধরে মদ খাচ্ছি। সেই সন্ধ্যা থেকে। আমরা চারজন মানে আমি শাহেদ, আমার বন্ধু রঞ্জন, মন্টু আর শিশির। বোতলের টাকাটা আমি দিয়েছি। কেরুর ভদকা। গলির মোড়ের দোকান থেকে শিক কাবাব আর নান এনেছে রঞ্জন। অনেক দিন পর জমিয়ে আড্ডা আর মদ্যপান। এই জম্পেশ মদ্যপানের আসরের একটা কারণ আছে, আমার চাকরি হয়েছে। চাকরি বলতে ঠিক যা বোঝায় সে রকম কিছু নয়। কিন্তু তার পরেও একটা চাকরি।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ধাপটা টপকাতে পারিনি। রাজনীতি করতে গিয়ে লেখাপড়ার খাতা থেকে আমার নাম ঝরে গিয়েছিল। মাঝখানে পার্টির কাজে কয়েক বছর মফস্বলে কাটিয়ে আবার ফিরে এসেছি ঢাকায়। পার্টির সঙ্গেও সম্পর্কের ইতি হয়ে গেছে। এই শালাদের সাথে রাজনীতি করা আর গরম ইস্ত্রি দিয়ে গাল ঘষা সমান কথা। শেষ পর্যন্ত পোড়ার যন্ত্রণাটাই নিট ফল। কিন্তু ফিরে এলেই তো হবে না। আমার জন্য এই শহরে কেউ এখন আর ডালা সাজিয়ে বসে নেই। যে কয়েক বছর ঢাকার বাইরে ছিলাম, বাসার সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ রাখতাম না। ফিরে এসে দেখি বাবা রিটায়ার করেছে ওষুধ কোম্পানি থেকে। ছোট বোনটা এক বছর ড্রপ দিয়ে উচ্চমাধ্যমিক দেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। আমার মতো বেকার লোকের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি। পাগলের মতো কয়েক দিন চাকরি খুঁজলাম। কিন্তু আমার মতো পলিটিক্যাল ছাপ মারা লোককে চাকরি দেবে কে? রঞ্জন আর শিশির অনেক দিন ধরে লবি করে যাচ্ছিল ওদের সঙ্গে শেয়ার বাজারে ঢোকার জন্য। আমি বিশেষ আগ্রহ দেখাইনি। টাকা কই? শেয়ার বাজারে জুয়া খেলতে হলে কিছু হলেও টাকা লাগে। হতাশার শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাবার আগে চাকরি মিলল। আমাদের স্কুলের এক বন্ধু হানিফের সঙ্গে হঠাত্ দেখা মতিঝিলে। হানিফ পারিবারিকভাবে মালদার ছেলে। পুরনো ঢাকায় ওদের স্যানিটারির বিশাল পারিবারিক ব্যবসা। হানিফ এখন নাটকের ব্যবসা শুরু করেছে। উত্তরায় একটা শুটিং হাউজ খুলেছে। আমার বেকার জীবনের কথা শুনে ফট করে ওর হাউজে ম্যানেজারের চাকরি অফার করল। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। আমার জন্য এটা কোনো চাকরি না। তার পরও মাস গেলে বেতন পাওয়া যাবে। এই চাকরি পাওয়া সেলিব্রেট করতেই এই আয়োজন। আমরা চারজন থাকি শান্তিনগরে। রঞ্জনের ঘরটা ওদের দোতলা বাড়ির ছাদের ওপর। আমার মতোই বেকার রঞ্জন। কয়েক বছর আগে একটা বাচ্চাদের স্কুলে পড়াত। স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেছে। রঞ্জনের ভাব দেখে মনে হয় ও বেঁচে গেছে।
বন্ধ ঘরে বমির টক গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে আমরা ছাদে এসে দাঁড়াই। রঞ্জন শিশিরের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে নিচে গেল বালতি আর কাপড় আনতে। আজকের সন্ধ্যাটা খুব সুন্দর। বিকেল থেকে মন-কেমন-করা হাওয়া দিচ্ছে। রঞ্জনদের ছাদের টবে ফুল ফুটেছে। খালাম্মা নিয়মিত গাছের যত্ন করেন। ফুল দেখে হঠাত্ মনে পড়ল, পত্রিকায় লিখেছে, এখন বসন্তকাল চলছে। বসন্তের সন্ধ্যা কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতরে কড়মড় করে ওঠে। এ রকম সুন্দর সন্ধ্যায় মানুষের ভালোবাসা হয়। আমাদের চার বন্ধুর কখনোই প্রেম হয়নি।
তুই কি জানিস, মধ্য আফ্রিকার গভীর অরণ্যে এখনও কোনো কোনো গোত্র আছে যারা নিজেদের মাংস নিজেরা খায়। এরা একধরনের সাংস্কৃতিক আচরণ হিসেবে কাজটা করে।
শিশির কথাটা শেষ করতে ওকে হাত তুলে থামাই।
তুই কি আর কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিস না? তখন থেকে এক প্যাঁচাল শুরু করেছিস। মাথায় একটা কিছু ঢুকলে আর বের হতে চায় না?
শিশিরের মনে হয় নেশা হয়ে গেছে। গলার ভেতরে তেরিয়া ভাব এনে বলে, তোরা কেউ কোনো কিছু শিখতে চাস না। এটা একটা প্রবলেম। এ জন্যই কেউ এমএ পাশ করতে পারলি না।
আমাদের চারজনের মধ্যে একমাত্র শিশির এমএ পাশ করেছে। মন্টু আর রঞ্জন কোনোরকমে হাবুডুবু খেয়ে বিএ পাশ করেছে। আর আমার তো মাঝপথে ব্যাটিং বিপর্যয়।
আমি এক ঢোকে অনেকটা ভদকা গলায় চালান করে দিয়ে বলি, তুই জানিস, এমএ পাশ লোকেরা আজকাল প্যান্ট উল্টা করে পরছে?
আমার কথা শুনে মহা খাপ্পা হয়ে যায় শিশির। রেগে গিয়ে কিছু একটা বলার আগেই মন্টু ঢুকে পড়ে মাঝখানে। দু হাত তুলে বলে, শান্তি, শান্তি। আজ নো ঝগড়া। আমাদের বন্ধু কাল থেকে আমাদের ছেড়ে আবার মফস্বলে চলে যাচ্ছে। শাহেদের জন্য আমাদের এক মিনিট নীরবতা পালন করা উচিত।
আমি মন্টুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলি, মফস্বল মানে! আমি তো যাচ্ছি উত্তরা।
মন্টু হাতে ধরা বোতল থেকে কিছুটা ভদকা গ্লাসে ঢেলে বলে, ওই একই কথা। উত্তরা মানে মফস্বল। ময়মনসিংহের কাছে।
শিশির মন্টুর কথায় হাসে।
ঠিক বলেছিস। শালা মফু।
মফু বলিস না। আসল দানটা মেরে দিল শাহেদ।
আমাদের পেছনে বালতি আর ন্যাকড়া হাতে রঞ্জন কখন এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। আমরা ঘুরে তাকাই রঞ্জনের দিকে। মন্টু বলে, আসল দান মারল মানে? বুঝলাম না।
তুই একটা গান্ডু। কোনো দিনই ঠিকমতো কিছু বুঝলি না। শাহেদ যাচ্ছে শুটিং হাউজে চাকরি নিয়ে। কত নায়িকার সাথে দেখা হবে ভেবে দেখেছিস? শালার যা হিরো মার্কা চেহারা, কোন দিন শুনবি কোন নায়িকার সঙ্গে প্রেম করছে।
রঞ্জন বালতি নিয়ে ঘরের ঢুকে যায়। শিশির আমার কাঁধে হাত রেখে বলে, দোস্ত, এটা তো আগে বুঝতে পারিনি। তুই তো এবার প্রেমের ওপর এমএ পাশ করে ফেলবি।
আমরা সবাই ওর কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠি।

দুই
রঞ্জনের বাসার ছাদে সেই সন্ধ্যার পর প্রায় তিনশ আশি দিন কেটে গেছে। আমি হানিফের শুটিং হাউজের দারোয়ানের চাকরি চালিয়ে যাচ্ছি। প্রথম প্রথম কাজটা জঘন্য মনে হয়েছিল। সকালে উঠে হাউজের বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় আর পর্দার হিসেব রাখা, শুটিং পার্টি ঢুকলে ফ্লোরের দেখাশোনা করা, মাঝে মাঝে ডিরেক্টরদের ধমক শোনা। অনেক কষ্টে মাথাটা ঠান্ডা রেখেছি। নিজেকে বলছি, মাথা ঠান্ডা রাখো শাহেদ, মাসের শেষে বেতনের টাকাটা তোমার দরকার। কিন্তু শুধু কি বেতনের টাকা আমাকে এখানে বেঁধে রেখেছে? না, অন্য একটা কারণ আছে। সেটা পরে বলছি। হানিফের ‘চেনা পথ’ শুটিং হাউজে আমার কাটানো তিনশ আশি দিনে আমার জীবনে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ঘটনা। লিখতে বসলে বই হয়ে যাবে। কিন্তু লেখা তো আমার আসে না। এই ব্যাঙের ছাতার ভিড়ের মধ্যে দু-একটা ছোট চারা গাছও ঢুকেছে। গাছের গল্প তো দীর্ঘ হয়। ডালপালা ছাড়ায়, পাতা গজায়।
তিনশ আশি দিনে আমি বাসায় গেছি তিন বার। বেতনের টাকা অবশ্য নিয়ম করে কুরিয়ার করে পাঠিয়েছি। আমার তিন বন্ধু এর মধ্যে বার চারেক আমার সাথে দেখা করতে এসেছে উত্তরায়। খুব বেশি সময় ওদের দিতে পারিনি। প্রতিবারই শুটিং চলছিল। মন্টু তো আমার ব্যস্ততা দেখে বিলা খেয়ে গেল। ওর কথা হচ্ছে, এর চাইতে আমার আগের বেকার জীবনটাই ভালো ছিল। প্রত্যেক দিন দেখা হতো। আমার বন্ধুরা আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে। দূরে থাকলেও ওদের ভালোবাসাটা আমি টের পাই। ওদের সঙ্গে বসে হারিস মিয়ার চায়ের দোকানে আড্ডা, বাসে উঠে স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়া, সন্ধ্যাবেলা ‘হক’ রেস্তোরাঁয় পুরি আর মাংসের ঝোল খাওয়া— সবকিছু আমি খুব মিস করি। কিন্তু কিছু করার নেই। ভালোবাসার পাশে উট পাখির মতো গলা উঁচিয়ে বসে থাকে টাকা নামের অমোঘ বস্তুটি। শান্তিনগরে ফিরে গেলে টাকা পাব কোথায়?
পারুলের ফোন পেয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে বাসায় গিয়েছিলাম। বাবা আবারও বাসা থেকে চলে গেছে। রিটায়ারমেন্টের পর থেকে বাবার এই অদ্ভুত রোগটা দেখা দিয়েছে। প্রথম দিকে ‘আসছি’ বলে বাসা থেকে বের হয়ে যেতেন। দুদিনের জন্য উধাও। খোঁজখবর করে হয়তো পাওয়া গেল, বাবা তার কোনো বন্ধুর বাসায় বসে আছেন। এখন বাবার এই উধাও হয়ে যাওয়ার রোগটা আরও বেড়েছে। সারাদিন বাসায় থাকলে হাত দেখার ওপর বইপত্র পড়ে। পারুলের ভাষ্য অনুযায়ী, পড়ে আর ভাবে। ভাবতে ভাবতে একসময় রাস্তায় বের হয়ে যায়। বাবাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা বলে, কখনও তার সবকিছু খুব একঘেঁয়ে লাগে। সারাদিন একা বসে সময় কাটতে চায় না। তাই বের হয়ে যায়।
কথাটা শুনে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। এই বয়সে একজন মানুষ এত ইরেসপন্সিবল হবে কেন? বাবা আমার মনের কথাটা বুঝতে পেরে গলা নামিয়ে বলেছিলেন, সবার টেনশন করার তো দরকার নেই। আমি তো ছোট মানুষ না।
মা বলে, সারাদিন বসে শুধু ভাবে মানুষটা। বাড়ির কারও সঙ্গে খুব একটা কথাবার্তাও বলে না। বাবাকে শেষে মানসিক চিকিত্সক দেখাতে হবে বলে মনে হয়।
ঈদের সময় হাউজে কোনো কাজ হয় না। নাটকের শুটিং অনেক আগে শেষ হয়ে যায়। এ সময়টা আমিও ছুটি পাই। গত ঈদে বাসায় গিয়ে কয়েক দিন ছিলাম। একদিন সকালবেলা নাস্তার টেবিলে বাবা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাত্ বলল, চরিত্রানুমান বিদ্যা অনুযায়ী আমি নাকি শ্লেষ্মপ্রকৃতির ছেলে। এই প্রকৃতির জাতকের মধ্যে কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা বেশি থাকে। এরা গুরুমান্যকারী এবং বন্ধুবত্সল। বাবার মুখে হঠাত্ আমার প্রকৃতি বিচার শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। তিনটি কথার মধ্যে শেষটা ছাড়া আমার মধ্যে বাকি দুটো গুণের একটাও নেই। আমি যে বন্ধুবত্সল তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এ জন্য প্রকৃতি বিচারের দরকার পড়ে না। কথাটা শুনে আমি হেসে বলেছিলাম, আপনি কি হাত দেখার দোকান খুলতে চাচ্ছেন? বাবা হেসেছিলেন আমার কথা শুনে। কিছু বলেননি।
বাসে যেতে যেতে ঘটনাটা মনে পড়ল। পারুল বলছিল, বাবা কাল সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়েছে। ওরা আশপাশে খুঁজেছে। কোথাও নেই। খবরটা শুনে খুব মেজাজ খারাপ হয়েছে। বাসায় গিয়ে আবার ছুটতে হবে বাবার খোঁজে। কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে।
সকালবেলা রাস্তায় দীর্ঘ যানজট। গাড়ির লাইন এঁকেবেঁকে কোথায় যে চলে গেছে কে জানে। দেখে মনে হচ্ছে একটা বিশাল ড্রাগন তার অদৃশ্য শিকার ধরার জন্য ধীরে-ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। পথের পাশে রাধাচূড়া গাছ আলো করে ফুটে আছে হলুদ ফুল। হাওয়া দিচ্ছে। কিন্তু আমার খুব বিরক্ত লাগছে। আজ আমাদের হাউজে শুটিং নেই। প্ল্যান করেছিলাম সারাটা দিন শুয়ে কাটাব। কিন্তু পারুলের ফোনটা আমার সব পরিকল্পনার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। আচ্ছা, বাবা কোথায় যেতে পারে? ঢাকা শহরে আমার একজন ফুপু বেঁচে আছে এখনও। আমি শিওর, বাবা তার বোনের বাসায় যায়নি। পারুল বলছে, আশপাশের পাড়ায় বাবার বন্ধুদের বাড়িতেও খোঁজ নেয়া হয়েছে। কোথাও নেই। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এবার বাবার খোঁজে আমাকে থানায় যেতে হবে। বাবার মানুষের মুখ স্টাডি করা, এসব বিষয়ে বইপত্র পড়া আমার ভালো লাগেনি। এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করলে মানুষের মাথায় গ্লগোল দেখা দেয়। আমাদের বংশে এ রকম কেস আছে। বাবার এক চাচাতো ভাই মহাকাশ, জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে অনেক পড়াশোনা করতেন। একসময় ভদ্রলোক পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। আচ্ছা, বাবা পাগল-টাগল হয়ে যায়নি তো? এ রকম কিছু ঘটলে আমি মহা ঝামেলায় পড়ে যাব। গত এক বছর শুটিং হাউজে কাজ করে আমার মধ্যে কোথায় যেন একটা পরিবর্তনের ঢেউ এসে লেগেছে। বাড়তি ঝামেলা এদম সহ্য হয় না। কাজটা আমাকে ঠেলে অন্য এক জগতের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই জগতের মধ্যে বাবার জ্যোতির্বিদ্যা নেই, পারুলের পরীক্ষার ফিস দেয়া নেই, মায়ের ব্লাডপ্রেশার নেই, আমার কম বেতনের চাকরি নেই, রাজনীতির চোরাগোপ্তা আক্রমণ নেই। লাইট...ক্যামেরা আর অ্যাকশনের মধ্যে প্রত্যেক দিন গজিয়ে ওঠা আবার ফেটে যাওয়া বুদবুদের জীবন এখানে। এইমাত্র ফুলেফেঁপে উঠছে বুদবুদ। তাতে আলো পড়ছে, রংধনু তৈরি করছে। পরমুহূর্তে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। ডেইলি সোপ। হানিফের সঙ্গে দেখা না হলে এ রকম এক জীবনের সাথে আমার কখনও দেখা হতো না।
ভাবনার জাল অনিঃশেষ। ছড়াতে শুরু করলে কোনো কোনো ভাবনা যে কোথায় গিয়ে ঠেকে নিজের মনও জানে না। ভাবতে ভাবতে বাস থেকে নেমে পড়ি মগবাজার মোড়ে। এখান থেকে রিকশা নিয়ে সোজা শান্তিনগর। উলঙ্গ পাগলের মতো চারদিকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রোদ। রাস্তায় নেমে আরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ফুটপাতে গায়ে গা লাগানো মানুষ, রাস্তায় গাড়ির ক্রমাগত প্যাঁ-পোঁ আর ঘাড়ের ওপর চেপে বসা পাগলা রোদ— অস্থির লাগে আমার। একটা উঁচু বিল্ডিংয়ের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াই। একটু আগের ভাবনাগুলি তখনও মনের ভেতরে ডালপালা ছড়াচ্ছে। হঠাত্ ডালপালা ঠেলে সরিয়ে মনের ভেতরে ডানা মেলে দেয় ফাহমিদা হোসেন। নামটা মনের ভেতরে গুনগুনিয়ে ওঠে। ইস্কাটনে থাকে মহিলা। এখন টিভি নাটকের জগতে আলোচিত স্ক্রিপ্ট রাইটার। পরপর তিনটা ডেইলি সোপ হিট হয়েছে। লিখতে এসে এক বছরের মাথায় পুরস্কারও পেয়েছে। প্রডিউসার, ডিরেক্টরদের লাইন লেগে গেছে তার বাসায়। আমার সঙ্গে মহিলার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে হানিফ। কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের হাউজে এসেছিল মিটিং করতে। মেয়েদের ব্যাপারে আমার অবজার্ভেশন হচ্ছে, ইন্টেলেকচুয়াল মহিলারা সাধারণত দেখতে সুন্দর হয় না। কিন্তু ফাহমিদা হোসেনের কেসটা অন্য রকম। ভেতরে চমকে দেয়ার ক্ষমতা আছে। তাকানোর ভঙ্গি, হাসি, কথা বলা— সবকিছু প্রতি মুহূর্তে বলে দেয়, মহিলা ভীষণ স্মার্ট, ভীষণ ধারাল। ভেতরে খুব শক্তিশালী একটা চুম্বক বসানো আছে। টানতে থাকে।
হানিফ পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর ফাহমিদা হোসেনের সঙ্গে সেদিন আমার তেমন কোনো কথা হয়নি, ছোটখাটো দু-একটা তথ্য বিনিময় ছাড়া। কিন্তু মনের ভেতরে কোথায় যেন আটকে গেছে এই মহিলা। আটকে গিয়ে একটা ঘোর তৈরি করেছে। ঘোরটা ভাঙ্গা যাচ্ছে না। রঞ্জনরা শুনলে আমাকে নিয়ে হাসবে। শিশির তো সব সময় বলে, পলিটিক্স করতে করতে আমার ভেতরটা নাকি একটা কাঠের বাক্সের মতো হয়ে গেছে। বাক্সের ভেতরে রাজনীতির কয়েকটা চটি বই আর রাগ ছাড়া আর কিছু নেই। আমারও এতদিন তাই-ই মনে হতো। কিন্তু ফাহমিদা হোসেনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর মনে হচ্ছে কাঠের বাক্সের ভেতরে অন্যকিছুও আছে। অন্যমনষ্ক হয়ে সিগ্রেট ধরাই। মহিলার বাসায় গিয়ে হাজির হওয়ার ইচ্ছাটা ক্রমশ মনের মধ্যে ধারাল নখের আঁচড় টানছে। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে বাসাটা সম্ভবত ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। খুঁজলেই পেয়ে যাব। ইস্কাটনে যাওয়ার চিন্তাটা মাথার ভেতরে আরেকটু জোরাল হওয়ার আগেই গলা টিপে খুন করি। আমি ফাহমিদা হোসেনের বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে বেল টিপছি দৃশ্যটা চিন্তা করেই ঘাবড়ে যাচ্ছিলাম। দরকার নেই, মাথার ভেতরের গোলমেলে পোকাটার ঘুমিয়ে থাকাই ভালো। একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়ি। বাসায় মা আর পারুল অপেক্ষা করছে আমার জন্য।

তিন
ছোটবেলায় আমার দাদু বলতেন, পারুল নামের মেয়েরা নাকি খুব ছটফটে হয়। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করতাম, তাহলে আমার নাম পারুল রাখলে কেন? দাদু হেসে বলতেন, তুই বড় হয়ে ছটফট করবি বলে। আমি নিজেই এখন বুঝতে পারি আমি অনেক ছটফট করি। কিছুক্ষণ গান শুনি, কিছুক্ষণ গান থামিয়ে বন্ধুদের মোবাইলে মিস কল দিয়ে জ্বালাই। ছাদে উঠি। একটু পরে আবার নিচে নামি। কোথাও বেশিক্ষণ থাকতে ভালো লাগে না। শুধু নিজের ঘরের এই জানালাটা আমার পছন্দের জায়গা। এখন জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে অনেক কিছু দেখা যায়। গলির ভেতরে গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়ানো বাড়ি। বাড়ির জানালাগুলি আমার কাছে টিভি-পর্দার মতো। সারাদিনে কত রকমের কা্লকারখানা যে দেখা যায় এখানে দাঁড়ালে। গোপন ভিডিও দেখার মতো একটা ব্যাপার। একদিন তো অনেক রাতে এখানে দাঁড়িয়ে সামনের বাসায় নতুন আসা দম্পতির যৌন কর্মও দেখে ফেললাম। ওরা জানালা খুলেই...বেশিক্ষণ দেখতে পারিনি। খুব লজ্জা লাগছিল। জানালায় দাঁড়িয়ে প্রত্যেক দিন এই নাটক দেখাটা আমার খুব পছন্দের একটা কাজ। কিন্তু এ বাড়িতে নিজের পছন্দের কোনো কাজ করার উপায় নেই। সারাক্ষণ মা শুধু ডাকাডাকি করবে। আমাকে রান্না দেখতে হবে, বাবাকে ওষুধ দিতে হবে, কোনো দিন ছুটা কাজের বুয়া না এলে ঘর ঝাড়ু দিতে হবে। পরীক্ষা হয়ে যাবার পর আমাকে সারাক্ষণ কাজে ব্যস্ত রাখা মার একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। এরপর আছে বাবার উপদ্রব। আজকাল কোত্থেকে মুখ দেখে মানুষ বিচার করার কতগুলি বই জোগাড় করেছে। সারাদিন ঘরে বসে পড়ে আর আমাকে হাতের কাছে পেয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে। আচ্ছা, এসব জেনে আমি কী করব? আমার নাটকে অভিনয় করার শখ। কোনোভাবে একটা চান্স পেলে আমি দেখিয়ে দিতে পারতাম আমার ক্ষমতা। আমি প্রতি রাতে বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করি। কখনও হাসি, কখনও কাঁদি। নিজের মুখ নানাভাবে বাঁকাচোরা করে দেখি। শুনেছি, এসব নাকি অভিনয় করতে গেলে কাজে লাগে।
আমার সবচাইতে বড় ভরসার জায়গা সৌন্দর্য। আমি জানি, আমি দেখতে অনেক সুন্দর। আর এখনকার পৃথিবীতে তো সুন্দরের জয়জয়কার। অভিনয়-টভিনয় নিয়ে মাথা ঘামানোর দিন শেষ। সুন্দর চেহারা নিয়ে একবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারলে কেল্লা ফতে। আমার দিক থেকে কেউ চোখ ফেরাতে পারবে না। আর একবার ঢুকতে পারলে আমি আকাশ ছুঁয়ে ফেলতে পারব। ওই তারায় ভরা আকাশটা আমাকে ছুঁতে হবেই। আমার বন্ধু রিয়ার এক মামা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করে। রিয়ার কাছে গোপনে কয়েকটা ছবি দিয়েছি মামাকে দেয়ার জন্য। দেখি কী হয়।
বাবা আবারও বাসা থেকে পালিয়েছে। মা কাল থেকে বিছানায় শুয়ে আছে। কিছু খায়নি। আমি অনেক সাধাসাধি করেও কিছু খাওয়াতে পারিনি। এবার বাবা কোনো আত্মীয়র বাসায় যায়নি। বাবার দুজন বন্ধুকেও কাল রাতেই ফোন করেছিলাম। কেউ কিছু বলতে পারেনি। শেষে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাইয়াকে ফোন করেছি। ভাইয়া আসছে।
বাবার এই এক নতুন রোগ। রিটায়ার করার পর হঠাত্ করেই টাইফয়েড হয়েছিল। প্রায় দেড় মাস ভোগার পর অসুখ সারল কিন্তু তার জায়গায় নতুন অসুখ এসে জায়গা করে নিল। প্রথম প্রথম দেখতাম বাবা পুরনো বইয়ের দোকান থেকে রাজ্যের বই কিনে এনে পড়ে আর কী যেন ভাবে সারাদিন। তারপর একদিন হঠাত্ করেই বাসা থেকে উধাও হয়ে গেল। প্রথমবার আমার খুব টেনশন হয়েছিল। এখন আর হয় না। জানি বাবা ঘুরেফিরে আবার বাসায় ফিরবে। আমার মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে। আমিও একদিন এই বাড়ি থেকে পালিয়ে যাব। বাবার মতো আবার ফিরে আসব না।

ভাইয়া এখনও আসেনি। আমি মায়ের ঘরে এক গ্লাস লেবুর শরবত রেখে আবার সেই জানালার কাছে ফিরে এসে মোবাইল থেকে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, ফিলিং এক্সাইটেড। একটু পরেই দেখি নেহাল জবাব দিয়েছে, ক্যাফে ওয়ানে চলে আয়। তোর সাথে এক ডিরেক্টরের পরিচয় করিয়ে দেব। এবার আমি সত্যি সত্যি এক্সাইটেড ফিল করছি। ডিরেক্টরের সঙ্গে পরিচিত হওয়া মানে কাজের সুযোগ। আমার যাওয়াটা খুব জরুরি। কিন্তু যাব কিভাবে? মাকে এ অবস্থায় কিছু বলা যাবে না। ভাইয়াও আসছে না। খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছে আমার। এ রকম একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে খুব বাজে হবে। নেহাল আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার অভিনয় করার ইচ্ছের কথা ও জানে। হয়তো কোনো ডিরেক্টর ওর পরিচিত। আমি বাসা থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। দরকার হলে মাকে না বলেই চলে যাব। ফিরে এসে একটা কিছু বুঝিয়ে দেব।
আয়নার সামনে সাজতে বসে যাই। ডিরেক্টর ব্যাটাকে প্রথম চান্সেই গেঁথে ফেলতে হবে। অল্প সাজলেই আমাকে অ্যাট্র্যাকটিভ মনে হয়। হঠাত্ মনে হলো ভাইয়াকে একটা ফোন করে তাড়া দেই। ভাইয়া ফোন ধরছে না। মাঝে মাঝে ভাইয়ার ওপর ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়। চাকরি পাওয়ার পর ভাইয়া নিয়মিত বাসায় আসে না। কি চাকরি করে তা-ও বলে না। মাঝে মাঝে হুট করে এসে মার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়। ভাইয়ার মধ্যেও সবকিছু থেকে দূরে-দূরে থাকার একটা ভাব চলে এসেছে। হয়তো ভাইয়ার এতসব ঝামেলা ভালো লাগে না। আমার ভাইটা একটু আজব কিসিমের। আমি যতদিন ধরে দেখছি, সোজা পথে হাঁটার লোক না। এক জীবনে রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক উল্টোপাল্টা করেছে। লেখাপড়া ছেড়ে ঢাকার বাইরে চলে গেল। ওর খোঁজে বাসায় পুলিশ পর্যন্ত এসেছিল। কয়েক বছর বাইরে কাটিয়ে আবার ফিরে এল। কিছুদিন চুপ করে ঘরে বসে থাকত। আমাদের সঙ্গেও ভালো করে কথা বলত না। ভাইয়া ছোটবেলা থেকে রাগী। আচমকা ক্ষেপে গেলে ভালো-মন্দ কোনো কিছু মাথায় থাকে না। ভাইয়ার এই রাগটাকে আমি খুব ভয় পাই। সেজন্য বেশি ঘাঁটাই না। চাকরি পাবার পর অবশ্য ভাইয়ার মধ্যে আমি চেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি। ক্রমশ সবকিছু থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার মনে হয় আমাদের এই বাসাটার মধ্যে ঝামেলা আছে। কেউ কারও কাছে থাকতে চাচ্ছে না। বাবা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। ভাইয়া দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আর আমি একটা চান্স পাওয়ার জন্য অধীর হয়ে বসে আছি। পেয়ে গেলে সোজা ডানা মেলে দেব।
সাজুগুজু শেষ করে উঠে পড়ি। মায়ের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম মা ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল রাত থেকে টেনশন করছে। অনেকক্ষণ কান্নাকাটিও করেছে। আমি সাবধানে বাসার দরজা খুলে বের হয়ে এসে বাইরে থেকে টেনে দিলাম। ক্যাফে ওয়ান আমাদের বাসা থেকে খুব দূরে না। লোকটার সঙ্গে কথা বলতে হয়তো আধা ঘণ্টাও লাগবে না। মা কিছু বোঝার আগেই চলে আসব। গলির মুখে দাঁড়াতেই একটা রিকশা পেয়ে যাই। রিক্সাওয়ালাটা এই পাড়ার। উঠে পড়ি রিকশায়।

চার
বাবাকে কোথাও পেলাম না। রাত আটটা পর্যন্ত খুঁজে বাসায় ফিরে এলাম। আমার সঙ্গে রঞ্জন আর মন্টু ছিল। অন্যবার বাবা যেসব জায়গায় যায় সব জায়গা খুঁজে দেখলাম। কোথাও নেই। ছোট ফুফুর বাসায় গিয়ে তো মহা কা্ল হলো। ফুফু আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ হাউমাউ করে কাঁদলেন। ফুফু আমাদের বাসায় চলে আসতে চেয়েছিলেন,অনেক কষ্টে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রেখে এসেছি। ফুফুর বাসা থেকে বের হয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে পাড়ায় ফিরে এলাম। মন্টু আমাকে প্রায় জোর করে গলির মাথায় আমিনের চায়ের দোকানে বসাল। আমিনকে চা দিতে বলে আমরা বসে থাকি দোকানের সামনের বেঞ্চে। আমিনের চায়ের দোকানের জায়গাটা বেশ নির্জন। রাস্তাটা আরেকটু সামনে গিয়ে একটা বাড়ির সীমানা দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে। ব্লাইন্ড লেন। অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাওয়া দিচ্ছিল তখন। হঠাত্ জোরে, হঠাত্ আস্তে। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ছেঁড়া ঠোঙ্গা আর পাতা কিছুটা উড়ে গিয়ে আবার অবতরণ করছিল। আমার মনে হয়েছিল হাওয়াটা যেন এই গলি থেকে পালানোর চেষ্টা করছে। পারছে না। আমরা কেউ কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছিলাম না। মন্টু নীরবতা ভেঙ্গে পাশ থেকে প্রশ্ন করল, থানায় একটা মিসিং ডায়েরি করাবি? আমি কী যেন আকাশ-পাতাল ভাবছিলাম। মন্টুর প্রশ্ন শুনে আমি ভাবনার অতল থেকে সাঁতার কেটে ফিরে আসি। মাথা ঝাঁকিয়ে বলি, আমারও তাই মনে হচ্ছে। কোথাও যখন পাওয়া গেল না তখন পুলিশকে জানিয়ে রাখা ভালো। কিন্তু থানায় যেতে হলে তো বাবার একটা ছবি লাগবে।
কথাটা নিজের কানেই কেমন লাগল। বাবাকে কি সত্যিই আর পাওয়া যাবে না?
রঞ্জন গম্ভীর মুখে বলে, তাহলে তুই বাসায় গিয়ে ছবি নিয়ে আয়। আমরা এখানেই অপেক্ষা করি।
কী করব বুঝতে পারছিলাম না। বাসায় গিয়ে মার মুখোমুখি হতে হবে। আমি বুঝতে পারছি বাবা আজ রাতে আর ফিরবে না। কাল ফিরবে? মা আমাকে এই প্রশ্নটাই করবে। কী উত্তর দেব আমি? বাবা যদি আর না ফেরে! একটু আগেও এই প্রশ্নটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কথাটা আবার মনে হতেই শরীরটা শিরশির করে ওঠে। বাবা যদি ফিরে না আসে তাহলে মা বাঁচবে না। বাবা-মায়ের মধ্যে ভালোবাসার কেমিস্ট্রিটা কতটা শক্তিশালী আমার জানা নেই। কিন্তু এটুকু বুঝি, বাবা আর ফিরে না এলে এই বয়সে মা বাঁচবে না। আমার এখন কী করা উচিত বুঝতে পারছি না। কাল থেকে হাউজে নতুন সিরিয়াল শুরু হচ্ছে। বড় পার্টি ঢুকবে। আমাকে হাজির থাকতেই হবে। বাবার ওপর খুব রাগ হয়। আচ্ছা, এই বয়েসে এসব কেউ করে! এ ধরনের রোগ তো ষোল বছর বয়সে হলে মানায়। আমি যে বাসা থেকে দূরে দূরে থাকি তার বড় একটা কারণ হচ্ছে এই উটকো ঝামেলা। আর কারও বাবা হারিয়ে গেলে তারা হয়তো একেবারেই অন্যভাবে রি-অ্যাক্ট করত। তাদের কাছে ঘটনাটা আর যাই হোক ঝামেলা বলে মনে হতো না। কিন্তু আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা ঝামেলা বলে মনে হচ্ছে। বাবা আজ রাতে বাসায় না ফিরলে আমার উত্তরা ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত। বাবা আগামী কাল অথবা তার পরের কিছুদিন না ফিরলে আমার চাকরির কী হবে আমি জানি না। আমি বুঝতে পারছি এ রকম অবস্থায় মা আমাকে ছাড়তে চাইবে না। কিন্তু আমার জন্য এখন কোনটা বেশি জরুরি— নিখোঁজ বাবা না চাকরি?
পাশ থেকে রঞ্জন ধাক্কা দিয়ে বলে, এই, কী ভাবছিস? চা ঠা্লা হয়ে গেল।
আমি একটু থতমত খেয়ে তাকাই রঞ্জনের দিকে। মন্টু আমার কাঁধে হাত রেখে বলে, তুই এখন বাসায় যা। খালাম্মার সাথে কথা বলে ঠিক কর কী করবি।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াই। ওদের দোকানে অপেক্ষা করতে বলে বাসার দিকে রওনা দেই।

বেশ রাত এখন। আমি উত্তরায় ফিরে যাইনি। একটু আগে থানা থেকে ফিরেছি। শিশির অফিস শেষ করে থানায় এসেছিল। থানার ওসি শিশিরের পরিচিত। কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। অফিসার অবশ্য বারবার বলছিল, মিসিং পার্সনের ছবি আর খবরটা তারা সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেবে বিভিন্ন থানায়। আসার সময় লোকটা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল আমাকে। বলল, অপনার বাবা রাগ করে চলে যাননি তো? প্রশ্নটা শুনে একটু ভাবি। বাবাকে এই জীবনে আমি কখনও রাগ করতে দেখিনি। আমাদের সঙ্গেও গলা চড়িয়ে কোনো দিন কথা বলেননি।
বাবা প্রায়ই বলতেন, রাগ হচ্ছে শরীর আর মনের সবচাইতে বড় শত্রু। রেগে গেলেই হেরে গেলি। আমি ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে থানা থেকে বের হয়ে আসি।
বাইরে এসে শিশির হঠাত্ বলে, আচ্ছা, হাসপাতালগুলিতে একবার খোঁজ করা দরকার না?
হাসপাতালের কথাটা এতক্ষণ আমাদের কারুর-ই মাথায় আসেনি। আমি একটু ইতস্তত করছিলাম দেখে শিশির আর রঞ্জন বাইক নিয়ে চলে গেল। মন্টু আমার সঙ্গে পাড়ায় ফিরল। সে রকম কোনো ঘটনা ঘটলে ওরা আমাকে ফোনে খবর দেবে। আমার মনে হচ্ছে না বাবার কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। সে জন্যই আমি হাসপাতালে যেতে চাইনি। কেন জানি মনে হচ্ছে, বাবা জেনে-বুঝে কোথাও চলে গেছে। কিন্তু কেন? আমাদের এই সংসারটার বিরুদ্ধে বাবার মনে কি গভীর কোনো ক্ষোভ জমা হয়েছিল? অভিমান? কার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাবে বাবা? কার সঙ্গে অভিমান করবে? আমি তো অনেক দিন ধরেই বাড়ি থেকে দূরে আছি। পারুলের সঙ্গেও বাবার সে রকম গভীর সম্পর্ক আমার চোখে পড়েনি। আর আমাদের মা তো এসব আলোচনার বাইরে। তাহলে বাবার মনে কোনো ক্ষোভ-বিক্ষোভ জমা হবে কেন? ছোটবেলায় শুনেছি মানুষ সন্ন্যাসী হয়ে যায়। বাবার বেলায় কি সে রকম কিছু ঘটল!
আমাদের বাড়িতে বসার ঘর নামে চিলতে একটু জায়গা আছে। সেখানে মান্ধাতা আমলের একসেট বেতের সোফা সাজানো। মাঝখানে একটা নিচু কাঠের টেবিল। বাবার বইপত্র সব টেবিলে রাখা। দু-একটা বই পাতা উল্টে বুঝলাম খুব কঠিন কথাবার্তা লেখা আছে বইগুলিতে। এসব বোঝা আমার কর্ম না। একটা ব্যাপার ভেবে খুব অবাক লাগল, বাবা সারাজীবন কাজ করলেন ওষুধের কোম্পানিতে। তার মাথায় এসব ঢুকল কিভাবে? বই গুছিয়ে রেখে একটা সিগ্রেট ধরাই। পারুলের ঘরে আলো জ্বলছে। এত রাতে ও কী করছে কে জানে! বেশ অনেক দিন আগে মার কাছে শুনেছিলাম পারুল লেখাপড়া বাদ দিয়ে অভিনয় করার প্ল্যান করছে। আমি কথাটা খুব বেশি পাত্তা্ দেইনি। কিন্তু ইদানীং মনে হচ্ছে লেখাপড়ার চাইতে এসব নিয়ে ওর আগ্রহটা বেশি। এ জন্যই ওকে বলিনি আমি শুটিং হাউজে কাজ করি। একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলাম, আজ দুপুরে আমি যখন বাসায় ঢুকি, পারুল ছিল না। দরজাটাও খোলা ছিল। আমি বাসায় আসার কিছুক্ষণ পর ও ফিরে এসেছিল। তখন পারুলকে কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি। কাল সকালে জিজ্ঞেস করতে হবে, কোথায় গিয়েছিল।
হাতের সিগ্রেটটা নেভাতে যাচ্ছি হঠাত্ দেখি মা এসে দাঁড়িয়েছে। মার চেহারাটা হঠাত্ করেই একদম বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। এর আগেও বাবা এরকম হাওয়া হয়ে গেছে। মা বেশ শক্ত ছিল। কিন্তু আজ একদম অন্যরকম দেখছি। মা-ও কি বুঝে গেছে বাবা আর ফিরবে না? মা আমার পাশের চেয়ারটাতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোর বাবার কোনো খোঁজ পেলি না?
আমি জানি এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। তার পরও বললাম, পুলিশ চেষ্টা করছে। ওরা আশা করছে কাল কিছু একটা জানাতে পারবে।
মা আমার দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসে। হাসিটা বলে দিচ্ছে, মা ভীষণ এলোমেলো হয়ে আছে। গভীর অস্থিরতা তাকে ছুড়ে দিয়েছে অস্থিতিশীল সময়ের মধ্যে। সহ্য করার ক্ষমতাটা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। মা অন্যমনস্কভাবে নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে বলে, তোদের বাবা কেন চলে গেছে তুই কিছু জানিস?
মার জন্য আমার কেমন মায়া হয়। একটু হেসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলি, আমি কিভাবে বলব বলো? বাবার সাথে আমার তো তেমন কথা হতো না।
মা একটু চুপ করে থেকে বলে, তোরা মানুষটার কাছ থেকে এত দূরে সরে গেলি কেন শাহেদ? বাবার সঙ্গে ছেলেমেয়েরা কত কথা বলে, গল্প করে। তোরা দুজনই এত দূরে সরে গেলি...মানুষটা খুব একা হয়ে গিয়েছিল।
কথাটার কোনো উত্তর দেই না আমি। মাথা নিচু করে থাকি। হঠাত্ তাকিয়ে দেখি মা নিঃশব্দে কাঁদছে। আমি কিছু বলার আগে মা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। দেখে মনে হচ্ছিল মার কোমর পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। অনেক কষ্টে পানি ভেঙ্গে হাঁটছে মানুষটা।

পাঁচ
আমার জন্য দারুণ একটা খুশির খবর আছে। মনে হচ্ছে আমার এতদিনের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত কিনারায় পৌঁছাতে পেরেছে। ক্যাফে ওয়ান থেকে বের হয়ে বাসায় ফেরার পথে ঘটনাটা নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি শেষ পর্যন্ত অভিনয় করার সুযোগ পাচ্ছি? তা-ও আবার সিরিয়ালে! ডিরেক্টরের নাম পারভেজ। পারভেজ মেহেদী। বলল অনেকগুলি নাটক বানিয়েছে। আমি অবশ্য একটাও দেখিনি। আধ ঘণ্টা ধরে একাই অনেক কথা বলল ভদ্রলোক। অভিনয় সম্পর্কে জ্ঞান দিল। আসল কথা হচ্ছে, দুদিন পরে আমাকে একটা শুটিং হাউজে যেতে হবে। সেখানে একটা স্ক্রিন টেস্ট নেয়া হবে। তারপর খুলে যাবে আমার স্বপ্নের দরজা। আমি কনফিডেন্ট, টেস্ট-ফেস্ট নিয়ে আমাকে আটকাতে পারবে না। এতদিন ধরে আয়নার সামনে খামোখা এত কষ্ট করিনি। ফয়সাল মেহেদী লোকটাকে আমার মোটেই পরিচালক বলে মনে হয়নি। চোখে বেঢপ সাইজের ফ্রেমওয়ালা চশমাটা খুবই বিরক্তিকর। লোকটার গালে কয়েক দিনের না কাটা দাড়ি। মাথার চুলে আবার মিশমিশে কালো করে কলপ দেয়া। হাতের পাঁচ আঙুলে পাঁচটা আংটি। সব মিলিয়ে লোকটাকে আমার খুব-একটা পছন্দ হয়নি। কিন্তু কিছু তো করার নেই। এই অদ্ভুত কিসিমের লোকটার হাতেই আছে আমার ভবিষ্যতের চাবি।
ফয়সাল সাহেব চলে যাওয়ার পর রেস্তোরাঁয় বসেই নেহালের গালে টপ করে একটা চুমু দিয়ে ফেলেছি। নেহাল তো লজ্জা-টজ্জা পেয়ে একাকার। আমার তখন মাথার ঠিক ছিল না। এই অনুভূতিটা আমি কাউকে বোঝাতে পারব না। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ফেরার পথে আমি রিকশা নিতেই ভুলে গিয়েছিলাম। পুরো রাস্তা আমি হেঁটে চলে এসেছি। বাসার দরজায় এসে ব্যাপারটা খেয়াল করে খুব হাসি পাচ্ছিল।
বাসায় ঢুকে তো প্রায় বাঘের মুখে পড়ে যাচ্ছিলাম। প্রায় শব্দহীনভাবে দরজা খুলেই ঘরের ভেতরে ভাইয়ার গলা পেলাম। ভাইয়া মার সঙ্গে কথা বলছে। আমি পা চেপে চেপে হেঁটে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম। ভাইয়া নিশ্চয়ই বাসায় ফিরে আমার খোঁজ করেছে। রাতে ভাইয়া যখন খাচ্ছিল, অন্যমনস্ক ছিল। কিছু জিজ্ঞেস করেনি আমাকে। কাল সকালে নিশ্চই ধরবে। একটা ভালো কাহিনি খুঁজে বের করতে হবে। ভাইয়া আজ আর কাজের জায়গায় ফিরে যায়নি। বাড়ির অবস্থা ভীষণ থমথমে। রাতেও মা কিছু খায়নি। ভাইয়া চেষ্টা করেছিল কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আমার বাবার ওপর খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছে। বাড়ি থেকে পালানোর আর দিন খুঁজে পেল না বাবা। এখন আমাকে কয়েক দিন বাইরে যেতে হবে, এ সময় বাবা...। আপনাদের হয়তো আমার চিন্তার গতিপ্রকৃতি দেখে খুব অবাক লাগছে। ভাবছেন কী ভীষণ স্বার্থপার এই মেয়েটা! কিন্তু বিশ্বাস করুন, আজকের এই ঘটনাটা আমার জন্য খুব বড় একটা ব্যাপার। আমি তো এ রকম একটা সুযোগের অপেক্ষায় এতদিন বসে ছিলাম। আমি জানি, আমাদের বাবা হয় কাল অথবা পরশু ঠিক ফিরে আসবে। কিন্তু এ রকম একটা সুযোগ তো আমার জীবনে বারবার আসবে না। এখন থেকে যা লেখা হবে সেটা আমার স্বপ্ন সার্থক হওয়ার গল্প।
আমি ঠিক করেছি, পুরো বিষয়টা নিয়ে বাসায় কিছু জানাব না। ভাইয়া যদি শোনে, আমাকে কেটে দু টুকরো করে ফেলবে। খুব রেগে আছে। রাতে খেতে বসে ভাইয়া জানতে চেয়েছিল, বাবা এই চলে যাওয়া নিয়ে আমাকে কিছু বলত কিনা। কিছু বলবে কী, বাবা গত কয়েক মাসে আমাদের সঙ্গে কথা বলাই কমিয়ে দিয়েছিল। কয়েক দিন আগে বাবা আরেকবার এভাবে চলে গিয়েছিল। পরদিন সকালে যখন ফিরে এল, খুব উদভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। মা অনেক কান্নাকাটি করল। বাবা কোনো কথা বলেনি। আমি চা বানিয়ে দিলাম, খুব স্বাভাবিকভাবে চা খেল। তারপর তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে গেল গোসল করতে, যেন কিছুই হয়নি। এর পরের দুইদিন বাবা বাসায় বসে থাকল। সামনে দাবার বোর্ড সাজানো। একা-একাই দাবা খেলছিল। এর মধ্যে মার সঙ্গে খুব সাধারণ কথাবার্তা বলেছে। তখন বাবাকে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখতে দেখেছি। প্রথমে বুঝতে পারিনি কী লিখছে। একসময় উঁকি দিয়ে দেখলাম চিঠির মতো কিছু একটা লেখা কাগজে। আমি আর পড়ার চেষ্টা করিনি। খুব অবাক হয়েছিলাম আমি। বাবা কাকে চিঠি লিখছে! নাটকের গল্প হলে বলা যেত, হয়তো অনেক বছর আগের হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রেমিকাকে। কিন্তু মানুষটা বাবা। এই লোকের কোনো প্রেমিকা থাকতে পারে আমাকে মেরে ফেললেও বিশ্বাস করব না। বাবাকে আমার সব সময় নন-রোমান্টিক মানুষ বলেই মনে হয়েছে। অবসর নেয়ার আগে বাসায় ফিরে পত্রিকা পড়া আর টিভি দেখা ছাড়া বাবা আর কিছু করত না। আমি বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। এখন জানতে ইচ্ছে হচ্ছে বাবা কী লিখছিল, কাকে লিখছিল। কাল সকালে ভাইয়াকে বাবার চিঠি লেখার কথাটা জানাতে হবে।
ঘুম আসছে না। মনের ভেতরে গভীর উত্তেজনা। ঘরের ভেতরে কিছুক্ষণ পায়চারি করলাম। তারপর জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আশপাশের বাড়িগুলির আলো নিভে গেছে। ডিমের মতো স্থির হয়ে আছে রাত্রির নৈঃশব্দ্য। আমার মাথায় ঘুরেফিরে স্ক্রিন টেস্টের বিষয়টা ধাক্কা দিচ্ছে। স্ক্রিন টেস্টে কী করতে হয় আমার মোটামুটি একটা ধারণা আছে। কোনো একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়তে দেবে। একটা ক্যামেরায় শুটিং করা হবে। এই পার্টটা নিয়ে আমার চিন্তা নেই। উতরে যাব। আমার চিন্তা হচ্ছে, নাটকে কী ধরনের ক্যারেক্টার করতে হবে সেটা নিয়ে। প্রথম কাজেই সবার চোখে পড়তে হবে। বিশেষ করে দিনা, মুন্নিদের। কলেজে দিনের পর দিন ওদের অনেক বাঁকা কথা সহ্য করেছি। এবার আমার সময় এসেছে। ওদের ধারণা ছিল অভিনয় করা, টিভিতে চেহারা দেখানো আমার জীবনে স্বপ্ন হয়েই থাকবে। এবার ওদের দেখাতে হবে আমার ক্ষমতা।
ঘর থেকে বের হয়ে খাবার ঘরে এসে পানি খাই। বাড়িটা ভীষণ নির্জন হয়ে আছে। ভাইয়াকে দেখলাম বসার ঘরের মেঝেতে একটা চাদর পেতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মা মনে হয় এখনও ঘুমায়নি। হালকা নীল আলো জ্বলছে মার ঘরে। খাবার ঘরের দেয়ালে দাদুর একটা ছবি ঝুলছে। দাদু মারা যাওয়ার পর বাবা ছবিটা বড় করে বাঁধিয়ে এখানে লাগিয়েছিল। ছবির ওপর ধুলো জমেছে অথচ দাদুর চোখদুটি আজও কী উজ্জ্বল! আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি দাদু আমাদের বাড়িতে থাকে। দাদা মারা যাওয়ার পর বাবা দাদুকে নিয়ে এসেছিল গ্রাম থেকে। বাবার অরও এক ভাই আছে। আমাদের ছোট চাচা। চাচা দাদুকে তার ওখানে রাখতে রাজি হয়নি। আমি বড় হয়ে মার মুখে এসব কথা শুনেছি। ছোট চাচা এখন আমাদের সঙ্গেও আর সম্পর্ক রাখে না। বাবাদের একমাত্র বড় বোনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা পেরেকের মাথায় বাঁধা পুরনো দড়ির মতো এখনও ঝুলে আছে যেকোনো সময় খসে পড়ার অপেক্ষা নিয়ে। আমার নাম রেখেছিল দাদু। দাদুর বোনের নাম ছিল পারুল। দাদুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুব সুন্দর ছিল। আমি সব সময় ঘুমানোর সময় দাদুর কাছে শুতাম। আমার মনে হতো খুব গরমে ঝুপড়ি একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছি। সমস্ত শরীরের ওপর দিয়ে ঝিরঝির করে ঠা্লা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। আমি দাদুর বুকের মধ্যে নাক ডুবিয়ে শুয়ে থাকতাম। মহিলা আমাকে অন্ধের মতো ভালোবাসত। দাদুর এই তীব্র ভালোবাসাটা আজও আমি খুব মিস করি।

ছয়
প্রথম দিকে হানিফ আমাকে কাজের হুকুম দিতে দ্বিধা করত। ছোটবেলায় স্কুলের সময়টা মনে পড়ে যেত হয়তো। আমি বুঝতে পারি বিষয়টা ওর জন্য বেশ অ্যাম্বারাসিং ছিল। আজকাল সমস্যাটা কাটিয়ে উঠেছে হানিফ। ফুট-ফাট এটা-সেটার জন্য আমাকে অর্ডার দেয়। হাউজের কাজকর্ম নিয়ে হম্বি-তম্বি করে। আমি মনে মনে খুশি হই। আমার কাজটা প্রফেশনাল জায়গায় দাঁড়াচ্ছে। বন্ধুত্বের জায়গাটা ভুলে যেতে পারাটা আমাদের দুজনের জন্যই ভালো। হাউজের দোতলার একপ্রান্তে হানিফ নিজের একটা ছোট অফিস তৈরি করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে নিজে এসে বসে। অন্য সময় ঘরটা তালাবন্ধ থাকে। আজ এক উঠতি নায়িকাকে নিয়ে অফিসে বসে কথা বলছে হানিফ। মেয়েটা নতুন কাজ শুরু করেছে। পত্রিকায় ছবি দেখেছি। হানিফের প্রডিউস করা একটা নাটকে কাজ করেছে।
শুটিং শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। আমি দোতলার বারান্দায় বসেছিলাম। নির্জন শুটিং-বাড়িতে আমার মতোই একা গভীর রাত নেমে আসে। সারাদিনে ফ্লোরে জমা ধুলো, পোড়া সিগ্রেটের টুকরো, চিপসের ঠোঙ্গা হঠাত্ হাওয়ায় উড়ে আবার মুখ থুবড়ে পড়ছে। মোটা মোটা ক্যাবল-ওয়্যার মরা সাপের মতো কু্লুলি পাকিয়ে পড়ে আছে বারান্দায়। নিচের কেয়ারটেকার ছেলেটাও মনে হয় শোয়ার আয়োজন করছে। অন্যদিন এ সময় ছেলেটা গলা ছেড়ে গান গায়। আজ গান শোনা যাচ্ছে না। মনে হয় বস আছে বলে।
হানিফ আজকাল এই ‘হতে পারে’ নায়িকাদের নিয়ে হাউজে অনেক সময় কাটাচ্ছে। প্রথম দিকে কম আসত। আমার হাতেই সব ছেড়ে দিয়ে রেখেছিল। আজকাল হুট করে চলে আসে। অফিসে বসে হিসাবের খাতা দেখে। সন্ধ্যার পর হানিফের রুমে ভিড় জমায় মেয়েরা। অমি একবার ভেবেছিলাম হানিফের সঙ্গে হাউজে মেয়ে আসার ব্যাপারে কথা বলব। আমার মনে হয়েছিল ওকে অ্যালার্ট করা দরকার। চারদিকে অনেক কথা ডালপালা ছড়াচ্ছে। কিন্তু পরে ভাবনাটা নাকোচ করে দিয়েছি। এখন তো আমি এই হাউজের একজন কর্মচারী ছাড়া আর কিছু না। আমি মুখ খুললে ওর ইগোতে লাগতে পারে।
আজকের মেয়েটা এ নিয়ে বেশ কয়েকবার এসেছে এখানে। নাম তারা। নির্দিষ্ট কয়েকটা টিভি চ্যানেলে মেয়েটির নাটক নিয়মিত প্রচারিত হয়। শোনা যায় চ্যানেলের প্রোগ্রাম-হেডদের সঙ্গে হেভি দহরম-মহরম চলছে তারার। হানিফ এখন বাজারে নতুন প্রডিউসার। দুই হাতে টাকা ওড়াচ্ছে। অনেকগুলি চ্যানেলের কর্তাদের সঙ্গে লাইন তৈরি করে ফেলেছে হানিফ। এখন ওর নাটক প্রচার হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। এই জগতের নিয়ম অনুযায়ী, যে প্রডিউসারের অন-এয়ার কনফার্ম তার ডিমান্ডও হাই। নতুন নতুন মেয়ে তার চারপাশে ভিড় করবেই।
অনেকক্ষণ ধরে ক্ষুধা পেয়েছে। পেটের ভেতরে নানা ধরনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। হানিফ আছে বলে খেতে যেতেও পারছি না। হানিফ কতক্ষণ থাকবে তাও বুঝতে পারছি না। হঠাত্ অফিস রুমের দরজা খুলে হানিফ ডাকে আমাকে। গলাটা জড়ানো। মনে হয় মদের মাত্রাটা বেশি হয়ে গেছে। হানিফ আমার হাতে একতাড়া নোট গুঁজে দিয়ে গ্রিলড চিকেন আর বিরিয়ানি আনতে বলে। দরজায় দাঁড়িয়ে টলছিল হানিফ। চোখ রক্তজবার মতো লাল। দরজা আবার বন্ধ হয়ে যায়। টাকাগুলি পকেটে ঢুকিয়ে ভাবি, এত রাতে সে খাবার কোথায় পাব। আচমকা মনে পড়ে ‘হট এয়ার’ রেস্তোরাঁর কথা। জায়গাটা গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। লাইন ধরে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে সামনে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে বসে থাকতে দেখা যায় রেস্তোরাঁর ভেতরে। ওখানে গেলে খাবার মিলতে পারে।

আমার আন্দাজ সঠিক। রেস্তোরাঁটা খোলা। ভেতরে একটু খোলা জায়গা। শিক কাবাব তৈরি হচ্ছে। কাবাবের গন্ধে পেটের ভেতরে ক্ষুধাটা আড়মোড়া ভাঙ্গে। আমি একটা ছেলেকে ডেকে অর্ডার দিয়ে চেয়ার টেনে বসি। খুব বেশি ভিড় নেই। সামনের টেবিলে একটি ছেলে আর দুটি মেয়ে বসে খাচ্ছে। একটু দূরে আরেকজন একা বসে খাচ্ছে। পুরো জায়গাটার ওপর ধোঁয়ার ভারী পর্দা ঝুলে আছে। লোকজনের খাওয়ার বহর দেখে একবার মনে হলো আমিও কিছু একটা খেয়ে নেই। আজ পকেটে টাকা আছে। হানিফ যে হারে খাবার নিচ্ছে তাতে আরও অনেকক্ষণ থাকবে বলে মনে হয়। শেষে ঘরের খাবারটা নষ্ট হবে। আজকাল টেবিলে খাবার রেখে দিলে পিঁপড়া ধরে যায়। খাওয়ার ইচ্ছাটা যখন আমাকে প্রবলভাবে ঘিরে ধরেছে ঠিক তখন পেছনে পরিচিত গলা শুনে চমকে ঘুরে তাকাই। ভূত দেখলেও মনে হয় আমি এতটা চমকে যেতাম না যতটা চমকালাম ফাহমিদা হোসেনকে দেখে। ঘিয়ে রঙের সুতি শাড়ি আর সাদা স্লিভলেস ব্লাউজে অসাধারণ দেখাচ্ছে মহিলাকে। হঠাত্ মনে হলো পানির অনেক তলা থেকে উঠে এসেছে জলকন্যা। আমি বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে দেখি। মহিলাও আমাকে দেখে একটু অবাক হয়েছে বোঝা গেল। হেসে বলল, আপনি এখানে!
আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটু হেসে বলি, খাবার নিতে এসেছি। হানিফ অফিসে।
ফাহমিদা হোসেনের চোখে কৌতুক খেলে যায়। মুচকি হেসে বলল, পার্টি চলছে নাকি? চলেন, আমিও জয়েন করব।
কথা শুনে আমি থতমত খেয়ে যাই। বলে কী মহিলা! এখন গিয়ে হাজির হলে কাল সকাল হওয়ার আগেই হানিফ আমার চাকরিটা খেয়ে দেবে। তাড়াতাড়ি বলি, চ্যানেলের লোকজন এসেছে। মিটিং।
কথার বলতে বলতে লক্ষ করি মহিলা একা। সঙ্গে কেউ নেই। বেশ অবাক হলাম। এত রাতে এখানে একা খেতে এসেছে! ফাহমিদা বোধহয় মনের কথা পড়তে পারে। হাতে ধরা গাড়ির চাবিটা আঙুলে ঘুরিয়ে বলে, আপনি বোধহয় ভাবছেন এত রাতে আমি একা এসেছি কেন? আপনাদের এই এলাকাটা রাতে অদ্ভুত নির্জন হয়ে যায়। আমার খুব ভালো লাগে আসতে। এখানে এসে বসে থাকি, কফি খাই। রাতের এই নির্জনতাটা আমি এনজয় করি।
আমি কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। হঠাত্ ফাহমিদা বলল, চলেন, আপনাকে কফি খাওয়াই।
আমি চমকে উঠে বলি, কফি...এখন! আমাকে খাবার নিয়ে যেতে হবে, হানিফ অপেক্ষা করবে।
কথাটা খুব স্বাভাবিক গলায় বলি ঠিকই কিন্তু বুকের ভেতরের ধুকপুকটা নিজেই শুনতে পাই। ফাহমিদা হোসেন আমার সঙ্গে কফি খেতে চাইছে!
ফাহমিদা আমার সমস্যাটা বুঝতে পেরে হেসে বলল, ঠিক আছে। আজ আপনাকে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু সেটা এক শর্তে।
রেস্তোরাঁর ছেলেটা তখন আমার হাতে খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছে। আমি শর্তটা জানার জন্য তাকাই ফাহমিদার দিকে। ফাহমিদা তখনো তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি নিচু গলায় বলি, শর্তটা কী বললেন না?
ফাহমিদা ওপরে খোলা আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে বলে, কাল এখানে আমার সাথে কফি খেতে হবে। কি, রাজি?
বিষয়টা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে আমি বুঝতে পারছিলাম না। তার পরও মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম। ফাহমিদা আবারও হেসে বলে, থ্যাংকস। তাহলে কাল আমাদের এখানে দেখা হচ্ছে। আমি সাড়ে এগারোটার দিকে আসব। গুড নাইট।
ফাহমিদা হোসেন আর দাঁড়ায় না। ঘুরে বের হয়ে যায় রেঁস্তোরাঁ থেকে। আমি এরপর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। হঠাত্ পাশ থেকে রেস্তোরাঁর ছেলেটা বিল চাইতে চমক ভাঙ্গে। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে টাকা বের করে বিল মিটিয়ে দেই। খাবারের পোঁটলা হাতে বের হয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়াই। ফাহমিদা চলে গেছে। পেছনে ফেলে গেছে রাতের নির্জনতা আর আমাকে। আজ বাইরে বাতাস দিচ্ছে না। মনে হলো, এখন হঠাত্ করে হাওয়া দিলে ভালো লাগত, রেস্তোরাঁর সামনে ঝুপসা বকুল গাছের তলায় পড়ে থাকা বকুল ফুলের গন্ধ ভেসে এলে ভালো লাগত। কিন্তু এসব কিছুই ঘটবে না এখন। মনে হচ্ছে কারফিউর রাত ভারী হয়ে জমে গেছে। রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডের আলোটাও নিভে যায় পট করে। আমি হাঁটতে থাকি অনেকটা চাবি দেয়া পুতুলের মতো।

সাত
কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে হয়তো কয়েক ঘণ্টা। তার পরই ঘুম ভেঙ্গে গেল। কাছেই কোথাও পাখি ডাকছে। উত্তরায় না থাকলে আমি জানতে পারতাম না এই শহরে আজও পাখি ডাকে। আজকাল শুনি, মোবাইল ফোনের টাওয়ারের জন্য ছোট পাখির প্রজাতি মরে যাচ্ছে। ওরা ফ্রিকোয়েন্সিটা সহ্য করতে পারছে না। একদিন হয়তো আমরাও মরে যাব। সব ফুরিয়ে যাবে, শুধু যন্ত্র সগর্বে তার উপস্থিতি ঘোষণা করবে।
জানালা খোলা, তবুও ঘরের ভেতরটা গুমোট হয়ে আছে। উঠে দরজা খুলে ছাদে দাঁড়াই। এই শুটিং-বাড়িতে ছাদটাও আমার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। ছাদের একপাশে আমার এক রুমের খাঁচা। সামনে খোলা ছাদ। প্রকৃতি বলে একটা জিনিস যে এখনও টিকে আছে সেটা আমি এখানে বসে টের পাই। আজ ভোরের আকাশটা ভীষণ নীল হয়ে আছে। ঘুম না হওয়ার একধরণের স্নায়বিক অসারতার পর্দা ভেদ করে হঠাত্ মনে পড়ল রাতে ফাহমিদা হোসেনের সঙ্গে আমার দেখা হবে। কথাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতরে তিরতির করে হাওয়া দেয়। আমার কোনো মেয়েবন্ধুও এ রকম এক্সক্লুসিভলি আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়নি কোনো দিন। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় চা-টা খাওয়ার পর্ব সব সময় হতো দলবেঁধে। মহিলার কাল রাতের আচরণ, হঠাত্ আমাকে কফির আমন্ত্রণ জানানো, পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে একটা ধাঁধা বলে মনে হয়। ফাহমিদা যে লেভেলে চলাফেরা করে তার সঙ্গে আমার ফ্রিকোয়েন্সি একেবারেই মেলে না। রাতে রেস্তোরাঁ থেকে ফেরার পথে ভাবছিলাম। কিন্তু কিনারা করতে পারিনি। হাউজে ফেরার পর যা সব কা্ল ঘটে গেল তাতে ফাহমিদা হোসেনকে নিয়ে ভাবার আর কোনো সুযোগ পাইনি। আমি অফিসরুমে খাবার পৌঁছে দিয়ে খেতে বসেছি, হঠাত্ আমার ফোনে হানিফের বউ ফোন করল। আমি তো নাম্বার দেখে প্রথমে বুঝতে পারিনি। বুঝলে কলটা রিসিভ করতাম না। ফোন ধরতেই হানিফের বউ রেখা কঠিন গলায় জানতে চেয়েছিল, হানিফ কোথায়? আমিও বোকার মতো হঠাত্ বলে ফেলেছিলাম, অফিসে মিটিং করছে। তখন বুঝতে পারিনি রেখা হানিফকে ফোনে না পেয়ে কিছু একটা সন্দেহ করে আমাকে ফোন করেছে। ও যখন ফোনটা হানিফকে দিতে বলল, বুঝতে পারলাম কলটা রিসিভ করে আমি ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছি। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় দেড়টা। আমি প্রথমে রেখাকে মিটিংটার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। নাছোড়বান্দা মেয়ে। শেষে আমি ফোন নিয়ে দোতলায় গিয়ে অফিসের দরজায় টোকা দিলাম। হানিফ দরজা খুলে রেখার ফোনের কথা শুনে হেভি বিলা হয়ে গেল। তারপর বউয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শুরু হয়ে গেল ঝগড়া। আমিও ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। হানিফের হৈচৈ শুনে মেয়েটাও ঘর থেকে বের হয়ে এসেছিল। বউয়ের সঙ্গে ঝগড়াটা এরপর এসে ভর করে আমার ওপর। ফোন কেটে দিয়ে হানিফ আমাকে গালাগাল করতে শুরু করে। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছু করার নেই। ঘোর মাতালের সামনে কোনো যুক্তির মূল্য নেই। তাছাড়া বস গালাগাল করলে কর্মচারীর রাগের মৃত্যু ঘটে। আমি শুধু ভয় পাচ্ছিলাম, যে রকম উচ্চস্বরে হানিফ চিত্কার করছে তাতে আশপাশের বাড়ির লোকজন ঘুম থেকে উঠে এখানে জড়ো হতে পারে। অনেক কষ্টে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে হানিফ আর মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আমি যখন নিজের ঘরে ফিরেছিলাম ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটা। তারপর আর ঘুম হয়?

সারাদিন বিছানায় ঘাপটি মেরে পড়ে থাকলাম। আজ শুটিং নেই। হাউজে চড়ুই পাখির কিচিরমিচির ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দুপুরে একবার উঠে ভাত খেয়ে আবার বিছানায়। এর মধ্যে হানিফ ফোন করেছিল। অনেকক্ষণ ধরে সরি-টরি বলল। বারবার বলছিল কাল ড্রিংকসের পরিমাণ বেশি হয়ে গিয়েছিল। সে জন্য মেজাজটা ঠিক ছিল না। বাসায় ফিরে বউয়ের সঙ্গে আরেক দফা ঝগড়া হয়েছে। সকাল থেকে দুজনের মধ্যে কথা বন্ধ। হানিফ অবশ্য এসব পাত্তা দেয় না। বলল, আজ বাসায় যাওয়ার সময় রেখার জন্য একটা দামি শাড়ি কিনে নিয়ে যাবে। মেয়েরা শাড়ি পেলে নাকি সাত খুন মাফ করে দেয়। আমি ফোন রেখে আবার শুয়ে পড়ি। আমার জানতে ইচ্ছা করছিল কাল রাতে তারা যে এখানে ছিল সেটা ওর বউ টের পেয়েছে কিনা। পরে আর জিজ্ঞেস করিনি। মেয়েরা বিশেষ করে বউরা এসব ব্যাপারে ভীষণ সেন্সেটিভ হয়। আজ টের না পেলেও কোনো একদিন ঠিক বুঝে যাবে। আর তারপর শুরু হবে আরেক যুদ্ধ। সে যুদ্ধ একান্তই হানিফের। আমার নাক না গলানোই ভালো। আমি শুধু কথার ফাঁকে একবার ওকে সাবধান করতে চেষ্টা করেছি। হানিফ পাত্তা দেয়নি আমার কথাটা। হেসে বলেছে, দোস্ত, মানি ক্যান বাই এভরিথিং। আমি আমার বউকে লাইফে যে কমফোর্ট দিয়েছে সেটা ফেলে ও কোথাও যেতে পারবে না।
ফোন রেখে দেয়ার পরেও হানিফের কথাটা মনের ভেতরে নড়াচড়া করে বেড়াচ্ছিল। রেখাকে আমি আগে চিনতাম না। এখানে চাকরি হওয়ার পর চিনেছি। একেবারেই সাধারণ একটা মেয়ে। এই মেয়েটি হানিফদের বাড়িতে এসে যে জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়েছে তার সঙ্গে রেখার কুমারী জীবনের কোনো মিল নেই। হানিফদের পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়ার বাসায় আমি গেছি। তিনতলা বাড়ি। জয়েন্ট ফ্যামেলি। প্রত্যেক ঘরে এসি আছে, বাথরুমে গিজার। নিচের গ্যারেজে তিন-চারটা গাড়ি। রান্নাঘরে আলাদা লোক আছে রান্না করার। রেখার এখনকার জীবন শুধু শুয়ে-বসে থাকার জীবন। সত্যি, চাইলেই এ জীবন ছেড়ে যাওয়া কঠিন। সে জন্য রেখা শুধু গভীর রাতে ফোন করে হানিফের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারবে। কোথাও চলে যেতে পারবে না। এভাবে অপরিমিত বিত্ত মানুষকে ভেতর থেকে দূষিত করে দেয়। কথাগুলি ভাবতে ভাবতে বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে ঢুকি। শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে মনে হয়, সত্যি, এসব কথা আমার ভেবে লাভ কী? আমি তো আদার ব্যাপারি।
বাথরুম থেকে বের হয়ে হঠাত্ মনে হলো আমিও তো রেখার মতোই একজন মানুষ। বাবা আমাদের বাসা থেকে চলে গেছে আজ বারো দিন পার হচ্ছে। সারাদিন আমি একবারও বাবার কথা ভাবিনি। সকাল থেকে এই হাউজে বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছি, রাতে ফাহমিদা হোসেনের সঙ্গে দেখা করার কথা ভেবে পুলকিত বোধ করছি। বাবা কোথায় আছে আমি জানি না। জানি না বাবা বেঁচে আছে কি না। অথচ আমার জীবন ঠিকই বয়ে যাচ্ছে। দুদিন আগে একটা ফোন করে পারুলের কাছ থেকে বাসার খবর নিয়েছি। কিন্তু শান্তিনগরে যাওয়ার চেষ্টা করিনি। ভাবতে গিয়ে গলার কাছে কিছু একটা আটকে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। সেটা কি কান্নার অনুভূতি? জানি না। পারুল বলেছিল, মা এখনও ভালো করে কিছু খায় না। শরীর খুব খারাপ হয়ে গেছে। আচ্ছা, এখানে আমি কী করতে পারি বলতে পারেন? আমি তো শার্লক হোমস না যে হারানো বাবাকে খুঁজে বের করে আনব। চেষ্টা তো করেছি। থানায় ডায়েরি করিয়েছি, শহরের সব হাসপাতালে আমার বন্ধুরা খোঁজ করেছে। বাবা যদি হার্ট-অ্যাটাক করে মরে যেত তাহলে আমার কী করার ছিল? হয়তো বলবেন, আমার বাবার মৃত্যুসংবাদ তো পাইনি। মানুষটা এখনও মিসিং। আর আমি সব ভুলে গিয়ে...দূর, আপনাদের কেন জিজ্ঞেস করছি এসব কথা? আপনারা তো আমাকেই দোষারোপ করবেন। এ রকম অবস্থায় বাড়িতে ছেলে থাকলে অভিযোগের কামানটা তার দিকেই দাগা হয়। কেউ একবার ভাবছেন না আমার আর কী করার ছিল।
ভাবনাগুলি হঠাত্ করেই বুকের ভেতরে ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো লেজ ঝাপটাতে থাকে। ঘরে বসে পরপর দুটো সিগ্রেট খেয়ে ফেলি। ধোঁয়া দিয়ে ঢেকে দিতে চাই ভেতরের তোলপাড় করা চিন্তা। পারলাম কি?

সাড়ে এগারোটা বাজার একটু আগেই আমি পৌঁছে যাই ‘হট এয়ার’ রেস্তোরাঁর সামনে। আজও সামনে সারবেঁধে গাড়ি দাঁড়ানো। রেস্তোরাঁর নিয়ন সাইনের লাল আলো রাস্তার কালো পিচের ওপর পড়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। আমি লক্ষ করেছি, যেসব হোটেল-রেস্তোরাঁ অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে তাদের বেশির ভাগের নিয়ন সাইনে লাল রং ব্যবহার করা হয়। কারণটা আমি জানি না। দোতলায় রেস্তোরাঁর বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ভেতরে অনেক মানুষ খাচ্ছে, গল্প করছে। মনে হলো বড় পর্দায় সিনেমা দেখছি। নির্বাক ছবি। ফাহমিদা হোসেন আরও দশ মিনিট পরে এল। শাড়ির বদলে মহিলার পরনে লম্বা ঝুলের কামিজ আর সালোয়ার। একেবারেই অন্য রকম লাগছিল। আমরা দোতলায় উঠে জানালার পাশে একটা টেবিলে বসি। ফাহমিদা কফির অর্ডার দেয়। কাচের জানালার ওপাশে ঘুমে জড়িয়ে যাওয়া উত্তরা। রাস্তায় উজ্জ্বল হ্যালোজেন আলো ঘিরে অসংখ্য পোকা। বাইরের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দেখি ফাহমিদা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু থতমত খেয়ে হাসার চেষ্টা করি। হঠাত্ করেই ফাহমিদা জানতে চায় আমি একসময় রাজনীতি করতাম কি না। প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠি। এই তথ্য তো মহিলার জানার কথা না। ফাহমিদা মুচকি হেসে জানায়, তথ্যটা তাকে হানিফ বলেছে। আমি কিছু বলার আগে ফাহমিদা চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে বলে, রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে বন্ধুর অফিসে পিওনের চাকরি নিলেন কেন? আমি প্রথম দিন শুনেই খুব অবাক হয়েছি।
এ রকম সোজাসাপ্টা প্রশ্নের সামনে পড়ে কেমন অসহায় বোধ করি। মনের ভেতরে কথা গুছিয়ে নিতে সময় লেগে যায়। সেই ফাঁকে ফাহমিদা আবারও হেসে বলে, সরি, আপনাকে খুব পার্সোনাল প্রশ্ন করে ফেললাম মনে হয়।
হাসলে মহিলাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। সংক্ষিপ্ত বৃষ্টি শেষে হঠাত্ রোদ ঝলসে ওঠার মতো। আমি টেবিলে অনাবশ্যক কয়েকটা টোকা দিয়ে বলি, চাকরি পাচ্ছিলাম না। হানিফ অফার করল, ঢুকে পড়লাম। কাজটা ইন্টারেস্টিং।
কথার ফাঁক গলে ধুমায়িত কফি ঢুকে পড়ে। কফিতে চুমুক দিয়ে আরও কিছুক্ষণ টুকরো টুকরো কথার আদান-প্রদান চলে। আমি তখনও মনে মনে আমাকে এখানে কফি খেতে ডাকার কারণ অনুসন্ধান করে চলেছি। ফাহমিদা হোসেন খুব সুন্দর গল্প করতে পারে। তারপর আমি মহিলার গল্পের তোড়ে প্রায় ভেসে গেলাম। নিজের অনেক কথা বলল ফাহমিদা। তার লেখক হওয়ার কথা, আগের জীবনের কথা। শুনল বোধহয় তারচেয়ে অনেক বেশি। বাবার চলে যাওয়ার কথাটা শুনে খুব অবাক হলো। আমাকে বলল বাবা ফিরে এলে একবার মিট করিয়ে দিতে। বাবার ক্যারেক্টারটা তার কাছে খুব সাংঘাতিক ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। একটা নাটক লেখা যায়। আমারও কথা বলতে ভালোই লাগছিল। অনেক দিন এভাবে মন খুলে কারও সঙ্গে কথা বলা হয় না। কখন ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত পার হয়ে আরও দূরের পথে যাত্রা করেছে, আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। ফাহমিদা বিল মিটিয়ে বের হয়ে আসে। পেছনে আমি।
ফাহমিদা আমাকে হাউজের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেছে। গাড়ির ব্যাক লাইটটা দৃষ্টিসীমা থেকে একেবারে মুছে না যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকি। রমিজ গেট খুলে দেয়। আমি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে কিছুক্ষণ বসে থাকি রেলিংয়ের ওপর। আজকের দিনটা আমার জন্য সত্যিই অন্যরকম ছিল। আমার দৃষ্টির সামনে বারবার ফাহমিদার হাসি, কথা বলার ভঙ্গি, ভীষণ গভীরভাবে তাকিয়ে থাকার দৃশ্য ভেসে উঠছিল। ভেতরে কেমন অস্থির চিন্তার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শুনেছি মানুষ প্রেমে পড়লে নাকি এ রকম হয়। আশ্চর্য, আমি ফাহমিদা হোসেনের প্রেমে পড়ব! এ রকম হতে পারে? আমি অস্থিরভাবে আরেকটা সিগ্রেট ধরাই। চারপাশের বাড়ির ভেতরে মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কোথাও কোনো আলো জ্বলছে না। কিন্তু আমার আজ ঘুম আসবে না। বুঝতে পারছি, ফাহমিদা হোসেন আমাকে ঘুমাতে দেবে না ।

আট
বলেছিলাম না কোনো টেস্ট আমাকে আটকাতে পারবে না? একটা সুযোগ পেলে আমি ঠিক খেলা দেখিয়ে দেব? স্ক্রিন টেস্টে আমার অভিনয় দেখে পারভেজ মেহেদীর টাস্কি লেগে গেছে। ঝাড়া দশ মিনিট প্রশংসা করল। ওর সঙ্গে আরেক ভদ্রলোক ছিল হাউজে। কমল আয়ুধ নাম বলল। ইন্ডিয়ান, কলকাতায় থাকে। ঢাকায় কোন একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করতে এসেছে। দেখে বিগ শট বলে মনে হলো। দেখতে স্মার্ট ওই কমল আয়ুধ। লম্বা, ফর্সা। পুরো মাথাটা শেভ করা। লোকটার চেহারায় একটা আলগা কাঠিন্য এনে দিয়েছে একজোড়া ধারাল চোখ। বেশিক্ষণ তাকানো যায় না চোখের দিকে, গা ছম ছম করে। পরিচিত হওয়ার সময় লোকটার দৃষ্টি আমার ভেতরটা উল্টেপাল্টে পড়ে নিচ্ছিল। আমি অবশ্য পাত্তা দেইনি। আমার কাজ হয়ে গেছে। পারভেজ মেহেদী তার নতুন সিরিয়ালে কাজ করার জন্য আমাকে ডাকবে বলেছে। কিছুদিনের মধ্যে কাজ শুরু করবে। বলল আমাকে স্ক্রিপ্ট পাঠাবে। শক্ত একটা পরীক্ষায় পাশ করে গেছি আমি। এখন বাকিটা হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার অপেক্ষা।
নেহালকে রাতেই ফোন করে রেখেছিলাম। ও আমার জন্য উত্তরায় এসে অপেক্ষা করবে। নেহালকে আমি অনেক জ্বালাই। আমার কলেজের বন্ধুদের মধ্যে ও হচ্ছে ‘ডোন্ট মাইন্ড’ ফ্যামেলির ছেলে। আমাকে নেহাল অনেক সাপোর্ট দেয়। নেহালের সঙ্গে আমার পরিচয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। কিন্তু বন্ধুত্বটা খুব দ্রুত একটা গভীর জায়গায় চলে এসেছে। নেহালের সবচাইতে পজেটিভ দিক হচ্ছে, ও ‘ভেতরে একটা বাইরে একটা’ টাইপের ছেলে না। আড়ালে কিছু করার অভ্যাস নেই ওর। নেহাল আজ আমাকে খাওয়াবে বলেছে। শুটিং হাউজ থেকে বের হয়ে ফোন করি নেহালকে।

রেস্তোরাঁটার নাম ‘হট এয়ার’ হলেও ভেতরটা ঠান্ডা এয়ারে ভর্তি। নেহাল আমাকে বিশাল কাঁচের একটা জানালার পাশে বসিয়ে ওয়াশ রুমে গেছে। রেস্তোরাঁটা আমার হেভি পছন্দ হয়েছে। বিশাল একটা ফ্লোরের চারদিক ঘিরে ছোট ছোট টেবিল বসানো। মাঝখানে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় রাখা আছে সোফা। রেস্তোরাঁর নাম হট এয়ার কেন বুঝতে পারিনি। নেহালকে জিজ্ঞেস করতে বলল, বুঝলি না, এখানে খাবারের দাম অনেক বেশি। খেলেই তোর মাথা দিয়ে হট এয়ার বের হবে। নেহালটা ভীষণ শয়তান। সব কথার মধ্যে ফাজলামি করা ওর স্বভাব।
দুটো কফি আর স্যান্ডউইচের অর্ডার দিয়ে নেহাল আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, এবার তো তোর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সবাইকে একদিন পেট-চুক্তি খাওয়া। আমরা তোর উন্নত ভক্ষিষ্যতের জন্য দোয়া করি।
সবাই বলতে তো দিনা, মুন্নি আর ফয়সাল। ওদের খাওয়ানোর কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমি জানালার বাইরে দূরে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের দিকে তাকিয়ে থেকে বলি, সবাইকে খাওয়াতে হবে কেন! খাওয়াতে হলে তোকে খাওয়াব। কাজটা তো তোর জন্যই পেলাম।
এবার হো হো করে হেসে উঠে নেহাল বলে, এই কথাটাই শুনতে চাচ্ছিলাম মামু। আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। যা পয়সা খরচ করবি আমার পেছনে করবি। ওরা কে?
নেহালের কথায় আমি হেসে ফেলি। ওয়েটার কফি আর খাবার দিয়ে যায়। নেহাল স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে বলে, ওই শালা পারভেজ আর কী বলল, শুটিং শুরু হচ্ছে কবে থেকে?
আমি কফির কাপের ওপর জমে থাকা অনেকটা ফেনা চামচে তুলে বলি, এখনও ঠিক হয়নি। ফোন করে জানাবে।
ফয়সাল টেবিলে তাল ঠুকে বলে, এবার তাহলে ভর্তিটা হয়ে যা। টাকা জমা দিলেই তো কাজ শেষ।
ফয়সাল খুব চাচ্ছে আমি জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাই। অ্যাডমিশন টেস্টে আমি টিকে গেছি। কিন্তু আমার আর পড়াশোনা করার কোনো ইচ্ছে নেই। এখানেই শুভসমাপ্তি ঘোষণা করতে চাই। কথাটা নেহালকে বললে হৈচৈ শুরু করে দেবে। ও খুব চায় আমি অনার্সে ভর্তি হই। শুধু নেহাল কেন, শুনলে ভাইয়া আমাকে মারতেও পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। পড়াশোনা করতে আমার কোনোকালেই ভালো লাগেনি। আর অভিনয়ে যদি ক্যারিয়ার করে ফেলি তাহলে আমার হাতে সময় কোথায়? আমি খুব ভালো করে জানি, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে বড়জোর একটা সেকেন্ড ক্লাস নিয়ে এমএ পাশ করব। মাঝখানে অনার্সের পর বিয়ে হয়ে যাবে। তারপর কোথাও স্কুল টিচারের চাকরি, ভাড়া বাসা, বাচ্চা, হাজবেন্ডের সেবা করা— এই তো জীবনের গল্প। এ দেশে আর দশটা মেয়ের ভবিষ্যত্ জীবনের গল্পটাও এ রকমই। আমি নিজেকে এভাবে ফুরিয়ে ফেলতে চাই না। আমি চাই মানুষ আমাকে চিনুক, রাস্তায় আমাকে দেখে অটোগ্রাফ নিতে চাক। জীবনের ঠেলাগাড়ি মার্কা ছন্দটা আমি ঝেড়ে ফেলে দিতে চাই। আমার এসব স্বপ্নের কথা নেহালও বুঝবে না।
বিল মিটিয়ে রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার সময় নেহাল হঠাত্ অদ্ভুত একটা খবর দিল। ওর কথা শুনে আমি চমকে গিয়েছিলাম। কাল ফার্মগেটের ওভার ব্রিজের পাশের মার্কেটে ও নাকি বাবাকে দেখেছে। একটা ওষুধের দোকান থেকে বাবা ওষুধ কিনছিল। নেহাল প্রথমে খেয়াল করেনি। দোকানটা পার হয়ে বেশ খানিকটা দূরে চলে আসার পর হঠাত্ ওর মনে হয় কাউন্টারের সামনে আমার বাবা দাঁড়িয়েছিল। নেহাল আবার ফিরে যায় দোকানে। কিন্তু ততক্ষণে ওর কথা অনুযায়ী বাবা চলে গেছে। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে জেনেছে, একজন বয়স্ক ভদ্রলোক কিছুক্ষণ আগে দোকানে এসেছিল ওষুধ কিনতে। আমি নেহালের কথাটা উড়িয়ে দিয়েছি। আজ পনেরো দিন হয়ে গেল বাবা ফিরে আসেনি। কেউ কোনো খবরও দিতে পারেনি। বাবা খামোখা ফার্মগেটের ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে যাবে কেন! নেহাল অবশ্য জোর দিয়ে বলেছে, ও বাবাকে ঠিক চিনতে পেরেছে। আমার বিশ্বাস হয় না। তার পরও ভেবেছি বাসায় ফিরে ভাইয়াকে ফোন করে কথাটা জানাব।
এখন আমি নেহালের সঙ্গে উত্তরায় রিকশা নিয়ে ঘুরব। আজকে মনটা খুব ফুরফুর করছে। মাকে বলে এসেছি ভর্তির কাজে যাচ্ছি। তাই দেরি হলেও মা কিছু বলবে না। বাসায় ফিরলেই তো সেই গম্ভীর পরিবেশ, মায়ের কান্নাকাটি। আমার আর ভালো লাগে না।

নয়
অনেক দিন হলো কাউকে চিঠি লিখিনি আমি। শুধু আমি কেন, আজকাল কেউই লেখে না। মোবাইলে এসএমএস পাঠায়। বাংলায় এসএমএসের বাংলা করা হয়েছে ক্ষুদে বার্তা। আচ্ছা, বার্তা কখনও ক্ষুদে হয়? ক্ষুদে বার্তা আগে লোকে লিখত টেলিগ্রামে। কারও অসুখ অথবা মৃত্যু-সংবাদ। চিঠি লেখার আনন্দটাই আলাদা। কত কালের কত জমানো কথা গুছিয়ে লেখা যায় চিঠিতে। কত বর্ষা-বসন্তের কথা, ভালো লাগার কথা, ভালো না লাগার কথা। আমার বাবা স্কুলের চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামে থাকতেন। আমরা গ্রামে। বাবা মাঝে মাঝে চিঠি লিখতেন। একবার মনে আছে বর্ষাকালের বিবরণ দিয়ে বাবা একটা চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটা পড়ার পর কয়েক রাত আমি একা একা কেঁদেছি বোকার মতো। আমার শুধু বাবার কাছে গিয়ে বর্ষা দেখতে ইচ্ছে করত। আমি অনেক দিন চিঠিটা রেখে দিয়েছিলাম। বড় হয়ে মনে হতো বাবার লেখার হাত খুব ভালো ছিল। বাবা বড় লেখক হতে পারতেন।
আমার এই চিঠিটা লেখার যদিও কোনো মানে নেই, তবুও লিখছি। এক প্যারা লিখে ফেলার পর ভেবেছি চিঠিটা আসলে আমি কাকে পাঠাতে চাই? কিছুক্ষণ ভেবে ঠিক করলাম ছেলেকে লিখব। আমার কথাগুলি ওকেই বলে যেতে চাই। আফটার অল, আমার পক্ষ থেকে একটা একস্প্ল্যানেশন ওরা পেতেই পারে।
আজ পঁচিশে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। সকাল থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেসে আসছে মাইকে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা গাইছে। আমি আমার ঘরের বারান্দায় বসে চিঠি লেখার কাগজ-কলম নিয়ে বসেছি। এবার বৈশাখ মাসে খুব একটা ঝড়বৃষ্টি হয়নি। আজ অবশ্য সকাল থেকে দিন আলো হারিয়েছে। আকাশটা ছেয়ে আছে মেঘে। বাতাস হঠাত্ করেই গাছপালার ভেতর দিয়ে ঘূর্ণি তুলে আবার কোথায় চলে যাচ্ছে। দিন পনেরো হলো আমি এখানে আছি। মাঝখানে একদিনের জন্য ঢাকায় গিয়েছিলাম কাজে। এই জায়গাটার নাম দুর্গাপুর। বাংলাদেশের একেবারে উত্তর সীমান্ত ঘেঁষে গারো পাহারের পায়ের কাছে ছোট্ট একটা গ্রাম। জনসংখ্যা খুব বেশি না। অধিকাংশ বাসিন্দাই গারো। আমি একটা স্কুলে গারো বাচ্চাদের পড়ানোর কাজ শুরু করেছি। মধ্য ষাটে নতুন করে একটা জীবন শুরু করা, স্কুলে পড়ানো— এই সবকিছুর সঙ্গে আমার যোগসূত্র স্থাপিত হয় এখন থেকে ছয় মাস আগে। শ্যামল আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।
হয়তো ভাবছেন শ্যামলের সঙ্গে আমার পরিচয় কিভাবে হলো, আমিই বা কে? সত্যিই তো, আপনাদের কৌতূহল নিবৃত্তির প্রয়োজন আছে। আমি শাহেদ আর পারুলের বাবা। বাড়ি থেকে পালানো সেই মানুষ। আমি চাকরি থেকে রিটায়ার করিনি। ছেড়ে দিয়েছিলাম। বাসায় অবশ্য সবাই জানে, বয়স হয়ে যাওয়ায় অফিস গোল্ডেন হ্যান্ডশেক করে আমাকে বিদায় দিয়েছে। আমার কাজ করতে আর ভালো লাগছিল না। সারা জীবন ওষুধের কোম্পানিতে ওষুধের মান পরীক্ষা করা, রিপোর্ট লেখা কারও কাছে ভালো না-ও লাগতে পারে। কাজ করতে করতে একটা সময়ে এসে সবকিছু খুব অর্থহীন মনে হচ্ছিল। একটা সংসারে অনেক দিন ধরে শিকড় ছড়ানোর পর আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল আমি বাহান্ন বাই চার শান্তিনগরের বাড়িতে কোথাও নেই। আমার বউ আমাকে বুঝতে পারেনি কোনো দিন। ছেলেমেয়ে তাদের বাবাকে বোঝার চেষ্টাই করেনি। বড় হয়ে ওরা ওদের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। সংসার নামে যে সামাজিক প্রক্রিয়াটির সঙ্গে মানুষ জীবনের অনেকটা সময় জড়িয়ে থাকে, নানা রকমের স্বপ্ন দেখে— আমার ভেতরে সেই চাহিদা বা স্বপ্ন কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আমি এতকাল অন্যদের ইচ্ছায় একটা জীবন কাটিয়েছি। স্ত্রীর কাছে ভালো স্বামী হয়েছি, ছেলেমেয়ের জন্য যথার্থ বাবা হয়েছি। কিন্তু আমার নিজের যা করতে ইচ্ছে হয়েছিল তার কিছুই করা হয়নি। এই চিন্তাটা মাথায় ঢুকে পড়ে হঠাত্ করেই। তখন থেকেই বুকের ভেতরে কেমন একটা পাগলা বাতাস বইতে শুরু করে। আমার তখন অফিস থেকে বাড়ি ফিরতেও ভালো লাগত না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত না। একদিন ফট করে দিলাম চাকরিটা ছেড়ে। আমি তখন প্রায় দিনই সময় কাটাতে বাসা থেকে বেশ দূরে একটা মাঠে গিয়ে বসে থাকতাম। পুরনো বইয়ের দোকান ঘুরে চরিত্রানুমান বিদ্যার বই কিনে পড়তাম। মানুষের মুখ দেখে চরিত্র বলে দেয়া। খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে মানুষের মুখ দেখা আমার একটা হবি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ রকম একসময় শ্যামলের সঙ্গে আমার পরিচয়।
শ্যামলের সঙ্গে আমার কথা হতো অদ্ভুত সব সাবজেক্ট নিয়ে। শ্যামল শাহেদের সমান বয়সী। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে ছেলেটা অনেক কিছু জানে। ওই মাঠের একপাশে একটা সিমেন্টের বেঞ্চে বসে আমরা যখন কথা বলতাম তখনও আমি বুঝতে পারিনি দুর্গাপুর নামে একটা অখ্যাত গ্রামে শ্যামল ভীষণ কঠিন এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। শ্যামল ধান চাষ, ফুল গাছের যত্ন থেকে শুরু করে ছবি আঁঁকা, গানসহ অনেক বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখে। আমি ওর সঙ্গে কথা বলি আর অবাক হই। অল্প বয়সে একটা ছেলে কতকিছু জেনে ফেলেছে! শ্যামলের মধ্যে জানার একটা গভীর আগ্রহ আছে। এই আগ্রহটাই শ্যামলকে আর দশজন মানুষ থেকে আলাদা করে দিয়েছে। একেবারে চলে আসার আগে দুর্গাপুরে আমি আরেকবার এসেছিলাম। শ্যামল আমাকে ইনসিস্ট করছিল ফাইনালি চলে আসার আগে একবার ওর প্রজেক্টটা ঘুরে দেখে যেতে। দুর্গাপুর আসতে হলে ঢাকা থেকে চার ঘণ্টা চলার পর বাস আপনাকে নামিয়ে দেবে একটা শুকিয়ে যাওয়া নদীর পারে। নদীর পেটের ভেতরে শুধু বালি আর বালি। মনে আছে, আমাদের আসতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছিল। আমরা দুজন যখন হেঁটে নদীর পেটের ভেতরে নামলাম তখন মাথার ওপর ছড়িয়ে যাওয়া আকাশে হাজার তারার হাট বসেছে। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম এখানে চলে আসার।
শ্যামল এখানে একটা স্কুল করেছে। গারো বাচ্চারা সেখানে লেখাপড়া করে। ভালো করে খেতে না পাওয়া, ভালো জামাকাপড় পরতে না পাওয়া একদল বাচ্চাকে শ্যামল ওর স্কুলে পড়ায়। বছর খানেক আগে একাই কাজটা শুরু করেছিল। এখন স্কুলে আমাকে নিয়ে দুজন শিক্ষক। স্কুলের পাশে সমপ্রতি একটা পুকুর কাটানো হয়েছে। পুকুরের চারপাশে লাগানো হয়েছে ফলের গাছ। পুকুরের অন্যধারে টিন দিয়ে দুটো ঘর তোলা হয়েছে। সেখানেই একটা ঘরে আমি থাকি। জীবনে কিছু একটা করার জন্য শ্যামলের তীব্র রোখটাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। আজকাল এ রকম দেখা যায় না।
আমি বাচ্চাদের স্কুলে বাংলা আর ইংরেজি পড়াই। আরেকটা কাজ করি আমি, ক্লাসের ফাঁকে ওদের গল্প শোনাই। মাঝে মাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই এতসব রূপকথার গল্প আমার এখনও মনে আছে দেখে। আমি ক্লাসে ঢুকলেই বাচ্চারা এখন গল্প শুনতে চায়। এই পঁচিশে বৈশাখের আগে ওদের আমি রবীন্দ্রনাথের গল্প শুনিয়েছি। রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলায় বেত হাতে বারান্দার রেলিংকে পড়াত শুনে ওরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল। আজ সকাল থেকে ওরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবে। শ্যামল সুন্দর গান গাইতে পারে গিটার বাজিয়ে। ও বাচ্চাদের কয়েকটা গান শিখিয়েছে। দুজন কবিতা আবৃত্তি করবে। আমি ঝন্টুকে ওদের জন্য মিষ্টির আনার জন্য বলে দিয়েছি। ঝন্টু সেই ভোরে উঠে চলে গেছে বাজারে। ঝন্টু ছেলেটা স্কুলের কাজকর্ম করে।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। আমি কাগজ-কলম গুছিয়ে রেখে রওনা দেই স্কুলঘরের দিকে। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে বেশ দ্রুত। আজ ঝড় না তুলে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। ভোরের হাওয়ায় বাচ্চাদের মিলিত কণ্ঠে গান ছড়িয়ে পড়ছে— আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে...। আমি যেতে যেতে ভাবি, এ রকম সুন্দর একটা দিন এতকাল কোথায় লুকিয়ে ছিল?

দশ
মদ খাওয়া বেড়ে যাচ্ছে। পকেটে পয়সা আর হাতে অলস সময় থাকলে মনে হয় এ রকমই ঘটে। আজকাল আমি হানিফের ঘরে রাখা বোতল থেকেও খেতে শুরু করেছি। হানিফ হয়তো টের পায়। কিছু বলে না। আজকাল অবশ্য অন্যদিকে নজর দেয়ার সময় পায় না হানিফ। উঠতি নায়িকা আর পার্টি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে।
রঞ্জন আর মন্টু আজকাল মাঝেমধ্যেই চলে আসে উত্তরায়। শুটিং না থাকলে ওদের নিয়ে সন্ধ্যার পর ছাদে বসি। শিশিরটা অফিসের জন্য আসতে পারে না। মন্টু বলে, শালা আজন্ম কৃতদাস। চাকরির জন্য জান কুরবান করে দিচ্ছে। আজ অবশ্য মন্টু খাওয়াচ্ছে। অনেকগুলি শেয়ার বিক্রি করেছে। ওর পকেটে টাকা হাঁড়িতে ভাতের মতো ফুটছে।
প্রথম পেগটা গ্লাসে ঢেলে পানি মেশাচ্ছি, ফোনটা বেজে ওঠে। ভেবেছিলাম ফাহমিদা হোসেনের ফোন। আজকাল উত্তরায় আসতে না পারলে আমাকে ফোন করে ফাহমিদা। আমি এই বিশেষ কলটার জন্য সারাদিন উন্মুখ হয়ে বসে থাকি। স্ক্রিনে পারুলের নাম ভেসে উঠেছে। কলটা রিসিভ করলাম না। আমি জানি পারুল কেন ফোন করেছে। ফোনটা ওকে দিয়ে মা করিয়েছে। বাবার খবর জানতে চায়। পারুলের কোন বন্ধু নাকি বাবাকে ফার্মগেটে দেখেছে। এই খবরটা জানার পর থেকে মা সকাল-বিকাল পারুলকে দিয়ে ফোন করায় আমাকে। যদি ধরে নেই পারুলের বন্ধুর কথা সত্যি, তার পরও বাবাকে কোথায় খুঁজব আমি এই বিশাল শহরে? সেদিন মা বলছিল, আমাদের শান্তিনগরে কোথায় নাকি এক ফকির বাবা আছে। তাকে ছবি দেখালে হারানো মানুষের সন্ধান দিতে পারে। মা আমাকে ওই ফকির বাবার কাছে পাঠাতে চায়। কে নাকি বলেছে, ওনার কাছে গেলেই জানা যাবে বাবা এখন কোথায় আছে। মাকে কে বোঝাবে, একজন মানুষ যদি ঘরে বসে হারিয়ে যাওয়া কাউকে খুঁজে দিতে পারত তাহলে পুলিশ বাহিনীর কোনো কাজ থাকত না। সবাই ওই ফকির বাবার কাছেই যেত। মার একটাই কথা— মানুষটা সংসার থেকে উধাও হয়ে গেল আর আমরা সবাই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? চেষ্টা তো করতে হবে। আমি ভেবেছি কয়েকটা পাগলা গারদে খোঁজ নেব। হয়তো বাবা পাগল হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হয়ে এখন ফিরে আসতে পারছে না। অনেক সময় পাগলা গারদ থেকে রাস্তায় এ রকম ভ্রাম্যমাণ পাগলদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। হয়তো এ রকম কোনো কাস্টডিতে আছে।

গ্লাসে চুমুক দিয়ে রঞ্জন আমার দিকে তাকিয়ে বলে, তোর ব্যাপারটা কী বলত? বাসায় যাওয়া ছেড়েই দিলি মনে হয়?
আমি কিছু বলার আগে মন্টু বলে, বুঝিস না কেন, নায়িকাদের সঙ্গে চলাফেরা করছে। শালা জাতে উঠেছে।
আমি শান্তিনগরে যাই না অনেক দিন হয়ে গেছে। উত্তরা আমাকে এক অমোঘ আকর্ষণের জালে বেঁধে ফেলেছে। আকর্ষণটা ফাহমিদা হোসেনের। মন্টু আর রঞ্জনকে তো বিষয়টা বলা যাবে না। ফাহমিদার সঙ্গে ফোনে গল্প করা, আমাদের দুজনের নৈশ ভ্রমণ— এসব আমাকে সর্বক্ষণ টানতে থাকে। ফাহমিদা এবার একটা উপন্যাস লেখা শুরু করেছে। সারাদিন বাসায় বসে লেখে আর রাতে ‘হট এয়ারে’ বসে আমাকে গল্পটা শোনায়। আমি শাহেদ আমার জীবনের যৌবনকাল খরচ করে ফেলেছি রাস্তায় চোঙ্গা মেরে আর মিছিল করে। এ রকম দুর্দান্ত সুন্দরী রমণীর সঙ্গে এ রকম ঘনিষ্ঠ সময় কাটানোর সুযোগই পাইনি। একটা মারাত্মক ভাবনা বর্ষাকালের চাঁদের মতো মাঝে মাঝে আমার মাথায় উঁকি দিচ্ছে। ফাহমিদা হোসেন কি আমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে? কেউ আমার চিন্তা পড়ে ফেললে হাসতে হাসতে খুন হয়ে যাবে। আমার সঙ্গে ফাহমিদা! ডাল ঘুঁটনির সঙ্গে গোলাপ? কিন্তু আমি কী করব? আমার মাথা থেকে ভাবনাটা যাচ্ছে না। প্রত্যেক দিন আরও জোরালো হয়ে গেঁথে বসছে।
রঞ্জন আমার হাতে ধরা গ্লাসে টোকা মেরে বলে, তোর কী হয়েছে শাহেদ? কী ভাবছিস তখন থেকে?
আমি ছড়িয়ে যাওয়া ভাবনার সুতো গুটিয়ে রাখি একপাশে। তারপর রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলি, আমার কিছু ভালো লাগে না। কী করি বল তো?
রঞ্জন মুচকি হেসে বলে, সে তো আমারও লাগে না। আমাদের সবার জীবনটাই কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। আমরা যে খুব খারাপ আছি তা কিন্তু না। আমাদের চেয়ে খারাপ অবস্থায় অনেকেই আছে। কিন্তু তার পরও ভালো লাগে না। মনে হয় কী যেন একটা পেলাম না। হাতের তালুতে এসেও মালটা বের হয়ে গেল।
রঞ্জনের কথা শুনে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসে মন্টু। ছাদের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে বলে, জ্ঞান দিতাছো মামু? তোমার এই জ্ঞানের লাইনে আমি নেই। মাথা ঢুকালেই সব নষ্ট। আমার কথা হচ্ছে মাল কামাও, খাও, ফুর্তি করো। চিন্তা করে কোনো লাভ আছে? এই দুনিয়ায় মাত্র পাঁচ ভাগ লোক চিন্তা করে। পনেরো ভাগ লোক ভাবে তারা চিন্তা করে। আর বাকি পঁচাশি ভাগ লোক একদম হাকুল্লা। এরা কিচ্ছু ভাবে না। এরাই শান্তিতে আছে। আমি দোস্ত ওই পঁচাশি ভাগের মধ্যে আছি।
রঞ্জন গ্লাসে একটু হুইস্কি ঢেলে নিয়ে বলে, তোর মতো যদি হতে পারতাম মন্টু, জীবনে কোনো দুঃখ থাকত না।
মন্টু হঠাত্ উঠে বলে, আমার মনে হয়, আমরা যদি প্রেমে পড়তাম তাহলে এতসব দুঃখ-কষ্ট থাকত না। জীবনটা শালা ফুরফুরা হয়ে যেত। দেখ, এত বয়স হয়ে গেল আমাদের, কারও প্রেম হলো না। হোমো ক্লাব বানিয়ে বসে আছি।
আমি হাসি মন্টুর কথা শুনে। মন্টু আমার দিকে তাকিয়ে বলে, শাহেদ, তোর চেহারার মধ্যে আজকাল কিন্তু একটা প্রেমিক ভাব এসে গেছে। তুমি মামা গোপনে গোপনে চু করতাছো নাকি?
চমকে যাই কথাটা শুনে। মন্টু শালা টের পেয়ে গেল নাকি! ফাহমিদার ব্যাপারটা ওরা জানতে পারলে আমার লাইফ তামা হয়ে যাবে। আমার বন্ধুরা এসব ব্যাপারে ঝামেলা পাঁকাতে ওস্তাদ। আমি কথার লাইন ঘোরানোর জন্য বলি, আচ্ছা, শিশির ওর ব্যাংকের একটা মেয়েকে পছন্দ করত বলেছিল, ওর অবস্থা কী?
রঞ্জন হেসে বলে, যেখানে মন্টু আছে সেখানে কারও কিছু হবে না। ও একদিন মেয়েটাকে দেখার জন্য ব্যাংকে গিয়ে সবার সামনে ভাবিটাবি ডেকে ছ্যারাব্যারা সিচুয়েশন করে দিল। ব্যস, মেয়েটা শিশিরের সাথে আর কথা বলে না। মুখ ঘুরিয়ে থাকে।
মন্টু আবারও খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসে। হাসি থামিয়ে আরও কী যেন বলে। আমি খেয়াল করি না। আমার বারবার মনে হচ্ছে ফাহমিদার কথা। কাল ফাহমিদা ফোন করেনি। এখন যদি করে বসে তাহলে বিপদে পড়ে যাব। এদের সামনে কথা বলতে পারব না। ফাহমিদা তো আমার বন্ধুদের কা্লকারখানা বুঝবে না। ভাবনার মাঝখানে আচমকা ফোন বেজে ওঠে। ফাহমিদা ফোন করেছে। আমি ঝট করে ফোন হাতে নিয়ে একটু দূরে চলে যাই। ফোনের ওপারে ফাহমিদার মসৃণ কণ্ঠস্বর আমার বুকের ধুকপুক বাড়িয়ে দেয়। মে মাসের বৃষ্টিহীন সন্ধ্যার বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ ভেসে আসে দূর থেকে। ফাহমিদা আমাকে এখনই ওর বাসায় যেতে বলছে। সন্ধ্যা থেকে খুব বোরিং সময় কাটাচ্ছে। কথাটা শুনে আমার ভেতরে কাটা মাছের মতো লেজ ঝাপটাতে থাকে এক অদ্ভুত ভালোলাগা। ফাহমিদা আমাকে বাসায় যেতে বলছে! এই প্রথম আমি ইস্কাটনে ফাহমিদার বাসায় যাব। দুজন বসব মুখোমুখি। দৃশ্যটা ভাবতেই মাথার ভেতরে গোলমাল হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। কিন্তু এখন আমি বের হব কিভাবে? মন্টু আর রঞ্জনকে কী বলব? ওদের ওপর মেজাজ খারাপ হয় আমার। শালারা আসার আর দিন পেল না। আমাকে ফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রঞ্জন বলে, এই, তোর আবার কী হলো, কার ফোন?
হঠাত্ করেই মাথায় আসে হানিফের কথা। ওদের বলি, একটা ঝামেলা হয়েছে। হানিফ ফোন করেছিল। হঠাত্ করেই ওর কিছু টাকার দরকার। টাকা নিয়ে আমাকে এখনই যেতে হবে। সেকেন্ডের মধ্যে এ রকম একটা গল্প বানাতে পেরে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিই। মন্টু অনেক ক্যাওম্যাও করে। কিছুতেই ছাড়বে না আমাকে। ওদের খাওয়া চালিয়ে যেতে বলে আমি বের হয়ে আসি শুটিং হাউজ থেকে। আমি জানি, আমার যত দেরি হবে ওরা যা-তা বলে গালিগালাজ করবে আমাকে। অসংখ্যবার ফোন করবে। গলির মুখে একটা সিএনজিতে উঠে ফোনটা অফ করে দেই। ব্যস, এখন আমি ওদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওরা বোতলটা শেষ না করে উঠবে না। রমিজকে সব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। আমার জন্য শহরের আরেক প্রান্তে এখন অপেক্ষা করছে ফাহমিদা হোসেন। ফাহমিদা বলছিল, উপন্যাসের আরও একটা চ্যাপ্টার লেখা হয়ে গেছে। আমাকে শোনাবে। আমাকে নিয়ে সিএনজি ঝড়ের বেগে ছুটতে থাকে ঢাকার দিকে।

এগারো
কৈশোরে আমার চাইতে বয়সে বড় এক মামাতো বোন জোর করে চুমু খেয়েছিল আমাকে। এরপর অনেক দিন ওই চুমুর জ্বালাধরা, নোনা স্বাদ লেগে ছিল ঠোঁটে। রাতে ঘুমাতে গেলেই সেই জ্বলজ্বলে চোখ, দাঁতের কামড় আর খসখসে জিভের স্বাদ আমার অনুভূতির শ্বাসরোধ করে দিত। আমি অন্যকিছু ভাবতে পারতাম না। ঘুমাতে ভয় পেতাম। আবার কখন সেই দৃশ্য আর অনুভূতি একসঙ্গে আক্রমণ করে। তারপর একসময় ভুলে গেছি। কলেজে ঢুকে জড়িয়ে গেছি রাজনীতির সঙ্গে। সেখানে মানুষ নিয়ে কারবার। চুমু খাওয়ার সুযোগ হয়নি। আজ ফাহমিদা আমাকে চুমু খেয়েছে। অনেক বছর পর আবার সেই নোনা সা্বাদের অনুভূতিটা ফিরে এসেছিল। বোকা হয়ে গিয়েছিলাম আমি। ফাহমিদা সেই রকম জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। আমি বুঝতে পারিনি। একটা দমকা হাওয়া, হঠাত্ ঘূর্ণি জঙ্গলের ভেতরে হঠাত্ ঢুকে যে রকম গাছপালাকে নাড়িয়ে দিয়ে আবার ফেরার হয়ে যায়, ঘটনাটা অনেকটা সে রকম ছিল। আমি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারিনি। আমার কাছ থেকে উঠে ভেতরে চলে গিয়েছিল ফাহমিদা। একটু পরে আবার ফিরে এসেছিল। ওর মুখ ভেজা ছিল। বাথরুমে গিয়ে পানির ঝাপটা দিয়েছে মুখে বোঝা যাচ্ছিল। আমার সামনে রাখা একটা মোড়ায় বসে বলেছিল, আমাকে পাগল মনে হচ্ছে?
প্রশ্নটার কোনো উত্তর হয় না। আমিও দিতে পারিনি। সামান্য হেসেছিলাম। ফাহমিদার গাল বেয়ে তখনও এক ফোঁটা পানি স্লো-মোশানে নেমে আসছে। ফাহমিদা একটু হেসে বলেছিল, আমি এ রকমই। যখন যা করতে ইচ্ছা হয়, করে ফেলি। তুমি খুব সরল একটা ছেলে। তোমাকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল, খেয়ে ফেললাম।
উপন্যাসের অংশটা আর পড়া হয়নি। এ রকম একটা সিচুয়েশনের পরে ফাহমিদাও হয়তো পড়তে চায়নি। ও শুধু তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বের হয়ে চলে এসেছি। এখন রাত প্রায় সাড়ে এগোরাটায় বাংলামটর মোড়ে উদভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে আছি। বারবার মনের ভেতরে একটু আগের দৃশ্যগুলো ফ্ল্যাশব্যাক করে দেখার চেষ্টা করছি। একটা চুম্বনের আকাঙ্ড়্গার কার্যকারণ বোঝার চেষ্টা করছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না। শরীরী আবেগময় ঘটনার গতির কাছে পরবর্তী বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া বোধহয় এভাবেই পিছিয়ে পড়ে। ভাবনা গুলিয়ে যায়। ফাহমিদা হঠাত্ করে আমাকে চুমু খেল কেন? ও কি আমাকে ভালোবাসে? ভালোবাসার প্রকাশটা কি এতটাই ক্যাজুয়াল? নাকি এভাবেই ভালোবাসা হয়? একটা সিগ্রেট ধরিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করি।
রাতেও এই শহর শান্ত হয় না। কারওয়ান বাজারের মোড় পর্যন্ত আসতে আসতে মনে হলো আমার পাশ দিয়ে আলো আর শব্দের ভীষণ অস্থির এক নদী বয়ে যাচ্ছে। একসময় মনে হলো আমিও এই প্রবাহের ভেতরে একটা বিন্দুর মতো ঢুকে পড়েছি। ভেসে চলেছি। ছুটে চলা গাড়ি, গাড়ি থেকে ছিটকে আসা হেডলাইটের চোখ ঝলসানো আলো, এখানে-সেখানে দ্বীপের মতো ছড়িয়ে থাকা ঘরে ফেরা মানুষ, বিশাল ভবনের দেয়াল বেয়ে নেমে আসা গভীর অন্ধকার আমাকে আস্তে-ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। আমি ভীষণ অন্যমনষ্ক হয়ে শুধু হেঁটে চলেছি। কিছুতেই মনের ভেতরের ছত্রখান চিন্তার প্রক্রিয়াটাকে এক জায়গায় আনতে পারছি না। ফাহমিদা আমার সমস্ত চেতনাকে গ্রাস করেছে। মনে হচ্ছে অদ্ভূত এক ভালোলাগার অনুভূতি সাঁতার কাটার ভঙ্গিতে আমার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে অবিরাম গতিতে।

ফার্মগেটে এসে আমার সম্বিত্ ফেরে। উদভ্রান্তের মতো অনেকটা পথ একটানা হেঁটে টায়ার্ড লাগছে। ক্লান্ত পায়ে ওভার ব্রিজে উঠি। ওপারে গিয়ে উত্তরার বাস ধরতে হবে। ব্রিজের ওপরে উঠে দাঁড়াই। নিচে বয়ে যাচ্ছে যানবাহনের স্রোত। আমি একটা থামের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াই। আর ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটে। ব্রিজের আলোকিত সিঁড়ির গোড়ায় আমি বাবাকে দেখতে পাই। দূর থেকেও বাবাকে চিনতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। বাবা একটা ছেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নেমে যাচ্ছে সিঁড়ি বেয়ে। ঘটনার আকস্মিকতার একটা ধাক্কা আছে যা মুহূর্তের জন্য অসাড় করে দেয় সমস্ত শরীর। তখন দেখার অনুভূতির যে সংকেতবার্তা মাথায় তৈরি হয় সেটাকে গ্রহণ করতে সময় লেগে যায়। আমি বাবাকে চিনতে পারলেও দেখার সত্যতা নিয়ে একটি বিরোধী চিন্তা আমাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থবির করে দিল। আমি ঠিক দেখছি তো? ঘড়ির কাঁটা লাফিয়ে সামনের দিকে কয়েক ঘর এগিয়ে যেতেই সত্যিটা আমাকে মুহূর্তে সচল করে দেয়। সিঁড়ি দিয়ে যে লোকটা নেমে গেল সে আমার বাবা। প্রায় ছুটে গিয়ে আমি সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াই। ততক্ষণে বাবা অদৃশ্য হয়েছে শেষ ধাপ থেকে। ক্ষিপ্র পায়ে সিঁড়ি ভাঙ্গতে শুরু করি। ফুটপাথে পা দিয়ে অসহায় বোধ করি। আমার সামনে ফার্মগেটের প্রতিদিনের জনস্রোত চলছে। পাশের দোকানগুলোর শাটার নামানো বলে জায়গাটাও বেশ অন্ধকার। ভিড় ঠেলে সামনে আগানোর সময় বুঝতে পারি আর পাওয়া যাবে না। সামনের কয়েকজন লোককে ধাক্কা দিয়ে প্রায় ছিটকে ফেলে দিয়ে আমি এক দৌড়ে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে দাঁড়াই। অস্থির দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাই। হলের সিঁড়ির গোড়ায় যথারীতি একটা লোক জিলাপি ভাজছে। একটু দূরে ঝালমুড়িওয়ালা আর ঘুঘনি বেচা লোকটা শেষবেলায় ডেকে ডেকে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। একটা বাসের হেল্পার বাসের গায়ে চাপড় মারছে, ফুটপাতে ফল বিক্রেতাদের ভ্যানের সামনে ভিড়। বাবা কোথাও নেই। আমি ঠিক দেখেছি তো? আবার প্রশ্নটা ফিরে আসে।আমার দেখার ভুলও তো হতে পারে? এ রকমটা হবেই বা কেন? বাবা আমাদের ফাঁকি দিয়ে এই শহরে থাকবে কেন? মুহূর্তে মনে পড়ে, পারুলের বন্ধু বাবাকে এখানেই দেখেছিল। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি রাস্তায়। এখন আমার কী ভাবা উচিত সেটাও বুঝে উঠতে পারি না। তাহলে কি বাবার আরেকটা সংসার আছে? সেখানে আরেকজন মহিলা আছে, সন্তান আছে? আচমকা এই চিন্তাটা বোকা বানিয়ে দেয় আমাকে। হঠাত্ বৃষ্টির মতো কোত্থেকে নেমে এল চিন্তাটা? এ রকম হওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক, কখনও হয় না? কিন্তু বাবার সঙ্গে এ রকম একটা ঘটনার সম্ভাবনা কিছুতেই মেলাতে পারছি না। দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। হঠাত্ করে মনে পড়ে, সেই ছোটবেলায় বিশাল এক মেলার ভিড়ে হারিয়ে গেছি আমি। এদিক-ওদিক যাচ্ছি, টালমাটাল পায়ে মানুষের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছি। পথ খুঁজে পাচ্ছি না। সমস্ত শরীরে একটা অনিশ্চিত অনুভূতি আমাকে ক্রমাগত ঠেলে দিচ্ছে এক অচেনা কেন্দ্রের দিকে যেখানে সব এলোমেলো, অস্পষ্টতায় আচ্ছন্ন।

বারো
গতকালের সন্ধ্যাটা আমার অদ্ভুত কেটেছে। এ রকম একটা সময়ের কথা এতদিন আমি শুধু মনে মনে ভেবেছি। কাল এতদিনের ভাবনাটা এমনভাবে সত্যি হয়ে গেল যে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নতুন সিরিয়ালের প্রমোশনাল পার্টিতে ডেকেছিল আমাকে। গুলশানের একটা ক্লাবে পার্টি। সন্ধ্যাবেলা নেহাল আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল। আমার প্রথমে একটু ভয় ভয় করছিল। বিশাল দোতলা দেয়ালঘেরা বাড়ি। ভেতরে ঢুকলে ছিমছাম একটা বাগান। বাগানের পরেই সুইমিং পুল। পুলের চারপাশে অনেক মানুষের ভিড়। কয়েকটা চ্যানেলের ক্যামেরাও ছিল। কাল প্রথম কাছ থেকে নাহিদকে দেখলাম। আমার স্বপ্নের নায়ক। টেলিভিশনের স্ক্রিনে কত দেখেছি! পারভেজ মেহেদী যখন পরিচয় করিয়ে দিল, আমি কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
গতকাল দুপুরে পারভেজ মেহেদী যখন ফোন করে পার্টির কথা জানাল, আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম মাকে সব বলব। এভাবে লুকোচুরি খেলাটা আর ভালো লাগছিল না। আর আমি তো ঠিক করে ফেলেছি এই প্রফেশনে ক্যারিয়ার তৈরি করব। মা সব শুনে প্রথমে একটা কথাও বলেনি। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বলেছিল, আমার কিছু বলার নেই পারুল। আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না। তোমার যা ইচ্ছা করো। বাবা চলে যাওয়ার পর মা একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। প্রথম দিকে তো শুধু কাঁদত। আজকাল কান্নাটাও মনে হয় ফুরিয়ে গেছে। ফুরিয়ে গেছে কথাও। সারাদিন বেশির ভাগ সময় নিজের ঘরে বসে থাকে। নামাজ পড়ে। এমনও দিন যায় যেদিন মার সঙ্গে আমার একটাও কথা হয় না। ভাইয়াকে একটা ফোন করা যেত। কিন্তু করিনি। ভাইয়া খামোখা চিত্কার করবে। অবশ্য চিত্কার করে এখন আর কোনো লাভ নেই। ভাইয়াও তো বাসায় আসা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ফোন করে খবর নেয়। সবাই সবকিছু করবে আর আমি শুধু ঘরের ভেতরে আটকে থাকব?
পার্টিতে আমাদের নাটকের প্রডিউসারের সঙ্গে পরিচয় হলো। হানিফ সাহেব। অনেকক্ষণ কথা বলল আমার সঙ্গে। ওনার একটা শুটিং হাউজ আছে উত্তরায়। আমাকে একদিন যেতে বলল। পার্টিতে প্রচুর মদের ছড়াছড়ি ছিল। আমি জীবনেও এসব খাইনি। কাল হানিফ সাহেব জোর করায় খেলাম। প্রডিউসার বলে কথা। কেমন একটা টক স্বাদের জিনিস। রক্তের মতো রং। এটা নাকি ওয়াইন। ওয়াইন আর মদের মধ্যে তফাত্টা কী আমি জানি না। তবে খেতে খুব একটা খারাপ লাগেনি। আমি শুনেছি এখানে কাজ করতে এসে সবাই এ জিনিসটা একটু-আধটু খায়। হানিফ সাহেব কয়েকবার আমার গ্লাস ভর্তি করে এনে দিয়েছিল। আমিও সাহস করে খেয়ে ফেললাম। একটু পরে গরম লাগতে শুরু করল। টাইট কামিজের ভেতরে শরীর ভিজে যাচ্ছিল ঘামে।
সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পর শুরু হলো নাচ। সঙ্গে বিশাল সাইজের দুটো অ্যামপ্লিফায়ারে কান ফাটানো শব্দে গান। আমি জীবনে কোনো দিন এ রকম পার্টি দেখিনি। কাউকে বুঝতে দেইনি আমি ব্যাপারটা। তবে ভেতরে ভেতরে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। নাহিদের সঙ্গে দেখলাম মুনিয়া নাচছে। পত্রিকায় ওদের প্রেম নিয়ে অনেক নিউজ ছাপা হয়েছিল। ফরিদা হাসানকে দেখে তো আমি বোকা হয়ে গিয়েছিলাম। একটা সিরিয়ালে মহিলা এখন এক বিধবার চরিত্রে অভিনয় করছে। পার্টিতে এসেছিল প্রায় কিছু না পরে। ব্লাউজের পিঠ বলে কিছু নেই। মহিলার সঙ্গে ছিল কমল আয়ুধ। আমার মনে হচ্ছিল ওরা দুজনই কিছু খেয়ে এসেছে। পার্টিতে ঢুকেই মিউজিকের সঙ্গে পাগলা হয়ে নাচতে শুরু করেছিল। আমি চুপচাপ এক কোনায় দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলাম। হানিফ সাহেব হঠাত্ এসে আমাকে টেনে ড্যান্স ফ্লোরে নিয়ে গেল। আমি জীবনে কখনও নাচিনি। তারপ আবার চাপাশে এত মানুষ। খুব লজ্জা করছিল। তার পরও বাধ্য হয়ে হানিফ সাহেবের সঙ্গে নাচার চেষ্টা করলাম। ফ্লোরে যাবার সময় পারভেজ মেহেদী কানে কানে বলে দিয়েছিল নাচার জন্য। আফটার অল নাটকের প্রডিউসার। নাচতে নাচতে চারপাশের আলো আর রক্তে কাঁপন ধরানো ড্রামের বিট আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল, একটা সন্ধ্যা হঠাত্ করেই আমার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল আর কখনোই আমার এখান থেকে শান্তিনগরে আমাদের বাসায় ফিরে যাওয়া হবে না। তীব্র এক অনুভূতির ভেতরে আমি তলিয়ে গেছি।

রাতে হানিফ সাহেবের গাড়ি আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেল বাসায়। ঘড়িতে এগারোটা। মা দরজা খুলে দিয়ে ভেতরে চলে গেল। একটাও কথা বলেনি আমার সাথে। আমারও কথা বলতে ভালো লাগছিল না। কথা বললেই তো একগাদা কথা শুনতে হবে। এসব আর পাত্তা দিলে হবে না। ঘরে ঢুকতেই মোবাইলে হানিফ সাহেবের ফোন। আমি পৌঁছলাম কি না জানতে চান। আমি মনে মনে হাসি। প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিয়েছি বলে মনে হচ্ছে। সুযোগ এখন আমার দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। এখন ঠিকভাবে হাঁটতে পারলেই হলো। হানিফ সাহেব আগামী পরশু ওনার হাউজে যেতে বললেন। কমল আয়ুধ একটা বিজ্ঞাপনের জন্য মডেল খুঁজছে। আমার সঙ্গে মিট করিয়ে দিতে চান কমলকে। কথাটা শুনে বুকের ভেতরে এক হাজার পাখি ডানা মেলে দিল। এই সুযোগটার জন্যই আমি এতদিন অপেক্ষা করে ছিলাম। হানিফ সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে সোজা বাথরুমে ঢুকে যাই। ওয়াইন খাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় খুব গরম লাগছে। কাপড় খুলে সোজা শাওয়ারের নিচে দাঁড়াই। গুনগুন করে গান গাই। আমি জানি ওই কমল আয়ুধ লোকটাও আমাকে ফেলতে পারবে না। কাজটা আমি পেয়ে যাব। তাছাড়া হানিফ সাহেবের আমাকে পছন্দ হয়ে গেছে। এখন আমাকে ঠেকায় কে?

তেরো
সকালবেলা আমি ঘরের জানালার পাশে টেবিলে বসে চিঠিটা লিখছি। আজ ছুটির দিন। স্কুল বন্ধ। বৈশাখ মাস শেষ হতে চলল। এখনও ভালোভাবে বৃষ্টি হয়নি। গুমোট গরমে গাছপালা দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশটা ফটফটে নীল। দেখে মনে হয় আশ্বিন মাসের আকাশ। সামনের খোলা জায়গায় শ্যামল গ্রামের কয়েকজন লোকের সঙ্গে কথা বলছে। শ্যামল ওদের সঙ্গে পানির পাম্প আর জেনারেটর বসানোর ব্যাপারে কথা বলছে। আশপাশের ধানী জমিতে শ্যামল আরেকটা ফসল ফলানোর জন্য বুদ্ধি দিয়েছে কৃষকদের। ওরা রাজি। এখন শ্যামল পাম্প আর জেনারেটর বসিয়ে ওদের সেচের ব্যবস্থা করে দেবে। শ্যামল অবশ্য পুরো কাজটা ফ্রি করে দিচ্ছে না। কৃষকদের বলেছে তাকে পাম্পের খরচ বাবদ মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল দিতে হবে। এই চাল দিয়ে স্কুলের তিরিশটা বাচ্চাকে একবেলা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করবে শ্যামল। কৃষকরা হাসিমুখে শ্যামলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে।
কয়েক দিন ধরে এসব নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এর মধ্যে গতকাল সন্ধ্যায় অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে এখানে । হঠাত্ করেই নূরু মিয়া আর ওর এক সঙ্গী এসে হাজির বাসায়। এখানে আসার পর আমি এই নূরু মিয়ার কুকর্মের কথা কিছু কিছু শুনেছি। কিন্তু লোকটার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। প্রভাবশালী নূরু মিয়া একটা রাজনৈতিক দলের পা্লা। ওরা যখন এল শ্যামল ছিল না। আমি স্কুলের দিক থেকে হেঁটে ঘরে ফিরছি। হঠাত্ অন্ধকারে মাটি ভেদ করে দুটো লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। একটু চমকে গিয়েছিলাম। দুজনের মধ্যে একটু বয়স্ক লোকটা সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিল নূরু মিয়া বলে। নূরু মিয়া মিয়া শ্যামলের সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমি দুজনকে আমার ঘরে বসালাম। নূরু মিয়া লোকটা একটু অস্থির প্রকৃতির। বসেছিল চেয়ারে কিন্তু তার দৃষ্টি ঘুরছিল ঘরের চারদিকে। সঙ্গের ছেলেটি ভীষণ ঠা্লা। ঘরে ঢোকার পর থেকে একবারও নড়েনি। ছেলেটার কাঁধ আর ঘাড়ের গঠন সুদৃঢ়। চিবুক চৌক, ঠোঁট পাতলা। চরিত্রানুমান বিদ্যা বলে, এ ধরনের মানুষ নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়। আমি হারিকেনের আলোয় ছেলেটার মুখ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছিরাম। হঠাত্ নূরু মিয়া জানতে চাইল আমি এখানে কী করি। বললাম, শ্যামলের স্কুলে পড়াই। লোকটার মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে বুঝতে পারছিলাম। সঙ্গী ছেলেটা শুরু থেকেই কোনো কথা বলছিল না। অনেকক্ষণ পরে নীরবতা ভঙ্গ করে জানতে চাইল আমি এখানে কেন এসেছি। ছেলেটার স্বভাবের মতো ওর কণ্ঠস্বরটাও নিষ্ঠুর ধরনের। প্রশ্নটা আমাকে থমকে দিয়েছিল। কী বলব ভাবছিলাম। তখন হঠাত্ শ্যামল এসে ঘরের দরজায় দাঁড়ায়। নূরু মিয়া উঠে দাঁড়িয়ে শ্যামলকে সালাম দিল। লোকটাকে শ্যামল আগে থেকেই চেনে। আমি বুঝতে পারছিলাম শ্যামল নূরু মিয়ার সঙ্গে আমার সামনে কথা বলতে চাইছে না। ওরা তিনজন ঘর থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের দিকে চলে গেল।
রাতে শ্যামলের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আমার আর কোনো কথা হয়নি। শ্যামলকে দেখলাম বেশ চিন্তিত। কথা শেষ করে ফিরে এল গম্ভীর মুখে। আমার সঙ্গে কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেল। ঝন্টু ওর খাবারটা সেখানেই দিয়ে এল। আমি আর আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যাইনি।
সকালে উঠে শ্যামলকে পেলাম না। ভোরে উঠে ও হাঁটতে যায়। যখন ফিরে এল, সঙ্গে কয়েকজন লোক। আমি তখন চিঠিটা লিখতে বসেছি। এখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছি শ্যামলকে। ছেলেটার মুখে চিন্তার একটা ছায়া পড়েছে। কথা বলছে লোকজনের সঙ্গে, একটু অন্যমনস্ক। সবাই চলে যেতে আমি ঘর থেকে বের হয়ে উঠোনে দাঁড়াই। শ্যামল আমাকে দেখে হেসে বলে, আপনি চিঠি লিখছিলেন বলে বিরক্ত করিনি। ওদের সঙ্গে কথাবার্তা ফাইনাল করে ফেললাম। এবার একদিন পাম্প আর জেনারেটর কিনতে ঢাকায় যেতে হবে। আমার টাকাও চলে এসেছে ব্যাংকে। আমি শ্যামলের কথার উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করি, কাল নূরু মিয়া কেন এসেছিল?
শ্যামল মনে হয় জানত আমি এই প্রশ্নটা করব। কথা গুছিয়ে নিয়ে শ্যামল বলে, নূরু মিয়া আমাদের স্কুলটা বন্ধ করতে বলে গেল।
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। স্কুল বন্ধ করতে বলবে কেন নূরু মিয়া! এর সঙ্গে তো রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। শ্যামলের ঠোঁটে এক মুহূর্তের জন্য ম্লান হাসি ফুটে ওঠে। বারান্দায় রাখা একটা টবে রক্তজবার গাছটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে, ওরা মনে করে, আমরা এই স্কুল থেকে গ্রামের মানুষের মধ্যে খৃিষ্টান ধর্ম প্রচার করছি। গারোদের মতো আমরা সবাইকে ক্রিশ্চিয়ান বানাতে চাচ্ছি। আমাদের টাকা দিচ্ছে এনজিওরা।
এদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেছে?
একটুও না। ঠা্লা মাথায় রাজনীতি করছে। ধর্মের নামে রাজনীতি। নূরু মিয়ার একটাই ভয়, আমি এসব করে ওর এলাকায় বিরোধী রাজনৈতিক মত প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে পারি। লোকটার সন্দেহ আমি এখানে পলিটিক্স করতে এসেছি। সে জন্য এসব কাজ শুরু করেছি। আমি সফল হলে আগামী নির্বাচনে লোকে নূরু মিয়ার পার্টিকে ভোট দেবে না।
তুমি কী বললে?
শ্যামল একটু চুপ করে থেকে বলে, আমি বলেছি, আমি কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা নিয়ে আসিনি। বাচ্চাগুলি খেতে পায় না, স্কুলে যায় না। ওদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা করছি। এই স্কুল আমি বন্ধ করব না।
লোকটাকে আমার সুবিধার মনে হয়নি। ও ঝামেলা তৈরি করবে।
করুক। আমি নূরু মিয়ার মতো লোকের হুমকিতে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাব না স্যার।
শ্যামলের গলা পাথরের মতো কঠিন শোনায়।
আমি শ্যামলের মুখের দিকে তাকাই ভালো করে। ছেলেটার মুখ গোলাকৃতি। চোখের কোণ ঈষত্ লাল। হাত-পায়ের গড়ন সুষম। এ ধরনের মানুষ জলীয় প্রকৃতির হয়। এরা স্বভাবে স্পর্শকাতর আর দয়ালু হবার কথা। কিন্তু আমি সামনে দাঁড়ানো এক অন্য শ্যামলকে দেখতে পাচ্ছি। ওর অবয়বে ধার দেয়া পাথরের ছুরির কাঠিন্য ফুটে উঠছে। দৃষ্টিতে ক্রোধের বাষ্প ঘূর্ণি তৈরি করছে। বুঝতে পারি ঝড় উঠছে।

প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হইনি কখনো। শ্যামলকে দেখে মনে সাহস আনার চেষ্টা করলাম। ছেলেটা নির্বিকার। একসময় আমারও মনে হলো জীবনের শেষ প্রান্তে হাঁটছি এই আমি রাশেদ কবীর। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা, বয়স পয়ষট্টি। শরীরে এখনও অতিরিক্ত মেদ জমেনি। জীবনের সব অর্জন তো আমি পেছনে ফেলে রেখে চলে এসেছি। যদি অর্জন বলতে আপনারা ঘর-সংসার, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা— এসব ধরে নেন। জীবনটা হঠাত্ দড়ি ছেঁড়া একটা নৌকার মতো ভাসতে ভাসতে এই ঘাটে এসে ঠেকেছে। আমার কাছে এ পর্যন্ত জীবনটা অস্পষ্ট কিছু নয়। এই পৃথিবীর আলো-হাওয়া মেখে ক্রমশ বেড়ে উঠেছি। জীবনের জৈবিক তাড়নায় বিয়ে করেছি, বংশধর তৈরি করেছি, সংসারের মানুষগুলোর গ্রাসাচ্ছদনের জন্য কাজ করেছি। তারপর একসময় এই জীবনটাকে খুব অর্থহীন মনে হয়েছে। মনে হয়েছে এভাবে নয়, অন্যভাবে কোথাও একটা দাগ রেখে যাওয়া উচিত এই জীবনের শরীরে। এই মহাকাশে ছড়ানো লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র কি জানে তাদের জীবনের শেষ দৃশ্যের কথা— কোথায়, কবে, কোন সংঘর্ষে, কোন চৌম্বক ক্ষেত্রের টানে সব ছাই হয়ে যাবে? তারপর আবার স্তব্ধ, বায়ুহীন অনন্ত মহাকাশ, অনন্ত সময়। আমার জীবন তো এসব গভীর, বিশাল ঘটনার কাছে কিছুই না। অণুমাত্র কাল। তবে ভয় পাচ্ছি কেন?
ভয় পাওয়ার মতো একটা কারণ কিন্তু ঘটে গেল। ভয়টা আমার নিজের জন্য নয়, স্কুলের জন্য। শ্যামল ঢাকায় চলে গেছে বিকেলে। পাম্প বসানোর কাজটা যত দ্রুত সম্ভব সেরে ফেলতে চায়। জ্যোতি, তিনু আর মালেক এসেছিল আমার কাছে গল্প শুনতে। প্রথম দিকে ওরা মাঝে মাঝে আসত। এখন গল্প শোনাটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। ওরা আশপাশেই থাকে। আমি ওদের ঠাকুরমার ঝুলি থেকে গল্প শোনাই। শ্যামল বলে, গল্পের জন্য এখনও ঠাকুরমার ঝুলি বেস্ট। এসব গল্প না শুনতে শুনতে বাচ্চারা স্বপ্ন দেখা ভুলে যাচ্ছে। ঘোড়ায় চড়ে অজানা অরণ্যে ছুটে চলার স্বপ্ন, পাহাড় টপকানোর স্বপ্ন। গল্প শোনানো শেষ করে ওদের আমি একটা করে চকলেট দেই। জ্যোতিটা এদের মধ্যে বুদ্ধিমান। গল্প অর্ধেক পথ যেতেই জানতে চায় কখন শেষ হবে। বুঝি চকলেটের জন্য মন উশখুশ করছে। ওদের চকলেট দিয়ে বিদায় করে বাইরের উঠানে এসে দাঁড়িয়েছি, হঠাত্ ঝন্টু কোত্থেকে ছুটতে ছুটতে এসে উঠোনে পড়ে যায়। ওর মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। আমি ছুটে গিয়ে ঝন্টুকে ধরে দাঁড় করাই। ওর সমস্ত মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ঝন্টুকে ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসে বারান্দায় বসাই। শ্যামল অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে ফার্স্ট-এইড বক্স। আমি দৌড়ে গিয়ে বক্সটা নিয়ে আসি। ঝন্টুর মাথায় কাটা জায়গাটায় দ্রুত একটা ব্যান্ডেজ করে দেই। সেলাই লাগবে না। ফাটেনি। ঝন্টুকে এক গ্লাস পানি দেই। পানিটা একটানে খেয়ে ঝন্টু হাঁফাতে থাকে। আঘাত এবং ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে ঝন্টু বলে, শ্যামলকে বাসে তুলে দিয়ে ও ফিরছিল। গ্রামের সীমানায় ঢুকতেই নূরু মিয়ার ডান হাত রুস্তম আর শামসুর মুখোমুখি হয় ঝন্টু। শামসুর সঙ্গে হঠাত্ ধাক্কা লেগে যায় ঝন্টুর। ঝন্টুর বক্তব্য, শামসু ইচ্ছা করেই ধাক্কা দিয়েছিল। তখন রুস্তম ঝন্টুর কলার চেপে ধরে আর শামসু হাতের লাঠি দিয়ে ঝন্টুর মাথায় মারে।
বুঝতে পালাম, যে ঝড়টা উঠবে বলে ভাবছিলাম সেটা শুরু হয়ে গেছে। ওরা আঘাত করতে শুরু করেছে। এখন আর থামবে না।

চৌদ্দ
দুপুরবেলা ফাহমিদা হোসেনের শূন্য বাড়িতে বসে বিয়ার খাচ্ছি। ফাহমিদা আমাকে বসিয়ে রেখে হঠাত্ বাইরে চলে গেছে। বলে গেছে জরুরি কাজ আছে, একটু পরেই ফিরবে। আমার যাবার কথা ছিল মন্টুর কাছে। ওকে নিয়ে থানায় যাব ওসির সঙ্গে কথা বলতে। ফার্মগেটে সেদিন রাতের ঘটনার পর মনের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। বাবা কি তাহলে আমাদের ফেলে এই শহরে কোথাও বহাল তবিয়তে দিন কাটাচ্ছে? বাবার কি আরেকটা সংসার আছে? এই প্রশ্নগুলি আমার ভাবনার দরজায় কড়া নেড়ে যাচ্ছে। মন্টুদের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছিলাম। আমার মতো ওরাও চিন্তায় পড়ে গেছে। ঘটনাটা এমন যে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শিশির আমাদের মধ্যে সবচাইতে মাথাঠা্লা ছেলে। রঞ্জন আর মন্টু ঘটনাটা শুনে উত্তেজিত হয়ে পড়লেও শিশির চুপ করে ছিল। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শিশির আমাকে আরেকবার থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলতে বলল। ঘটনাটা পুলিশকে আবারও জানানো দরকার। আমি মাকে কিছু জানাইনি। খামোখা উদ্বিগ্ন হয়ে শরীর আরও খারাপ করবে। এমনিতেই মা অনেক কষ্ট পাচ্ছে। কয়েক দিন আগে বাসায় গিয়ে দেখলাম মার শরীরটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। পারুল বলল, সারাদিন বসে বসে শুধু ভাবে। খাওয়া একদম বন্ধ। মায়ের বিছানায় দেখলাম বাবার শেষবার ব্যবহূত লুঙ্গিটা যত্ন করে পাতা। দেখে বুকের ভেতরে কোথায় যেন ধক করে লাগল। মা তো বাবার শেষ চিহ্ন আগলে বসে আছে। কিন্তু শেষে যদি আবিষ্কার হয় বাবা এই শহরেই আছে, আরেকটা সংসার করছে, তখন কী হবে? এই কথাটা মনে হলে আমার খুব রাগ হয়। বাবা আমাদের সঙ্গে এতটা প্রতারণা করতে পারে না। মানুষের অনুমানশক্তি যখন কোনো রহস্যের পরিণতি খুঁজে পায় না তখন সবচাইতে খারাপ সম্ভাবনাটাই ভেবে নেয়। এ রকম তো হতেই পারে, বাবার আরেকটা গোপন জীবন আছে। সেখানে একজন নারী আছে। বাবা শেষ বয়সে তার কাছে চলে গেছে। দুজন সাজানো সুখী একটা জীবন যাপন করছে। মাথার ভেতরে অস্থিরতা লাফিয়ে ওঠে, মন ভরে যায় গভীর তিক্ততায়। ঠকে যাওয়ার একটা অনুভূতি আমাকে ঠেলতে ঠেলতে অচেনা অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায়।
আমি মন্টুর কাছে যাবার জন্য বের হয়েছিলাম। কিন্তু মাঝপথে ফাহমিদার ফোন সব গুবলেট করে দিল। ফাহমিদা দুদিনের জন্য কলকাতায় গিয়েছিল। ফিরে এসেই আমাকে তলব। আমি জানি মন্টু আমার জন্য অপেক্ষা করবে। কাজটা আমারই। কিন্তু কিছুই করার নেই। ফাহমিদা ডাকলে আমার মাথা কেমন গুলিয়ে যায়। ভেবেছিলাম এখান থেকে সন্ধ্যায় মন্টুর বাসায় যাব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আজ আর যাওয়া হবে না। না গেলে থানায় যাওয়া হবে না। না হোক। বাবা তো চলে যাওয়ার আগে আমাদের কথা একবারও ভাবেনি। তাহলে আমি খামোখা ভাবছি কেন? এখন আমি দুটো বিয়ার খেয়ে ফাহমিদা হোসেনের নির্জন ফ্ল্যাটে বসে আছি। ফ্রিজে আরও বিয়ার রাখা আছে। গরমে ঠা্লা বিয়ার ভালো লাগছে। শরীরের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। ফাহমিদার ড্রইংরুমটা খুব সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে চমত্কার সব পেইন্টিংস, ছিমছাম সোফা, নিচু কাঁচের টেবিল, তার ওপর ফ্লাওয়ার-ভাসে ঘর আলো করে আছে ফুল। সবকিছু ফাহমিদার মতো স্বপ্নময়, আবেগপ্রবণ। এই ঘরেই সেদিন ফাহমিদা আমাকে চুমু খেয়েছিল। মানুষের শরীরের আবেগটা বড় মারাত্মক। শুধু উসকে দেয়। ফাহমিদাকে দেখে আজও খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু ও কেন জানি খুব ঠা্লা আজকে। সেদিনের সেই জ্বলে ওঠার তীব্র আগ্রহটা একেবারেই উধাও। মনে হলো ফাহমিদা হয়তো ভুলেই গেছে আমাদের মধ্যে এ রকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। স্বভাবে পাগলামি আছে ফাহমিদার। অল্প বয়সে অনেক কিছু এখন তার করতলগত। মানুষের প্রশংসা, পুরস্কারের স্বীকৃতি, চারপাশে স্তাবকদের ভিড়। পাগলামিটা সেজন্য ওকে মানিয়ে যায়। কিন্তু আমি যে কস্তুরীর গন্ধে পাগল হয়ে ঘুরে মরছি ফাহমিদার পেছনে! আচ্ছা, ফাহমিদা কি সত্যি আমাকে ভালোবাসে? এখনও সোজা ভাষায় কিছু বলেনি। কিন্তু এই যে নির্জন ফ্ল্যাটে আমাকে ডেকে আনা, হঠাত্ করে চুমু খাওয়া, আমার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা— এসবের তাহলে মানে কী? আমার ভাবতে ভালো লাগে ফাহমিদা আমার প্রেমে পড়েছে। আর কারও সঙ্গে তো ওর গভীর সম্পর্কের কথা শুনতে পাই না। কেউ বলে, আমেরিকায় থাকতে বিয়ে হয়েছিল ফাহমিদার। পরে ডিভোর্স হয়ে গেছে। হানিফের কাছে তথ্য আছে, ফাহমিদা বিয়ে করেনি। আমি কখনও এসব নিয়ে প্রশ্ন করিনি। বিগড়ে যেতে পারে। এমনিতেই যে রকম পাগলাটে স্বভাবের মেয়ে।
হাতঘড়ি দেখি। এক ঘণ্টা হয়ে গেছে এখানে বসে আছি। কপালের মাঝখানটা ভারী হয়ে আসছে। বিয়ারের নেশার পারদ ওপরে উঠছে। উঠে গিয়ে ফ্রিজ খুলে আরেকটা বিয়ার বের করি। খেতে খারাপ লাগছে না। পরিবেশটাও অসাধারণ। ক্যান ওপেন করে অনেকটা বিয়ার গলায় ঢেলে দেই। এ রকম একটা পরিবেশে যদি সারাজীবন থাকা যেত? ফাহমিদা লেখা পড়ছে আর আমি ওর কোলে মাথা রেখে শুনছি। একধরনের মিষ্টি অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীরে। এ রকম একটা ঘটনা তো ঘটতেই পারে। ফাহমিদা হুট করে আমাকে বিয়ে করে ফেলল। এই চমত্কার করে সাজানো ফ্ল্যাটে আমার জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো। হানিফের দুই টাকার চাকরির চাপ, বাবা উধাও হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, জোড়াতালি দেয়া একটা সংসারের দায়-দায়িত্ব— সব ভুলে যেতে পারতাম আমি।

বিয়ার খেয়ে সোফায় শরীরটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি। ঘুম ভাঙ্গল ফোনের আওয়াজে। ধরার আগেই থেমে গেল ফোনটা। হাতে নিয়ে দেখি অনেকগুলি মিসড কল। মন্টু ফোন করেছিল অনেকবার। শেষ কলটা করেছে ফাহমিদা। হঠাত্ মনে হলো গভীর পানির নিচে তলিয়ে গেছি। চারপাশে স্থির হয়ে আছে গাঢ় অন্ধকার। বাড়ির কোথাও কোনো আলো জ্বলছে না। সোফা থেকে উঠে অন্ধকার ভেঙ্গে সুইচ খুঁজে বের করে আলো জ্বালাই। ফ্লুরোসেন্ট লাইটের আলো বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘরে। আমি আবার ধপ করে বসে পড়ি সোফায়। মন্টুকে এখন আর ফোন দেয়া যাবে না। বাইরে অন্ধকার নেমেছে। তারচেয়ে ফাহমিদাকে একটা ফোন করি। ফোনের অপরপ্রান্তে ঝলমল করে ওঠে ফাহমিদার কণ্ঠ। গুলশানের একটা রেস্তোরাঁর ঠিকানা দিয়ে বলল, আমি যেন এখনই বের হয়ে সোজা ওখানে চলে আসি। আমাকে কথা বলার আর সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দেয় ফাহমিদা। আমি উঠে পাশের বাথরুমে ঢুকে পানির ঝাপটা দেই। মাথাটা এলোমেলো লাগছে। বাথরুমের আয়নায় নিজের বিপর্যস্ত চেহারাটা ভেসে ওঠে। তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। হাত চালিয়ে এলোমেলো চুল ঠিক করি। মন্টুকে কলব্যাক করা উচিত ছিল। কিন্তু এখন তো মন্টুর বাসায় যাওয়া হবে না। ফাহমিদা নিশ্চয় কোনো নতুন অ্যাডভেঞ্চারের প্ল্যান নিয়ে বসে আছে আমার জন্য। বুকের ভেতরে এক অচেনা অনন্দের বাতাস বয়ে যায়।

অনেক খুঁজে রেস্তোরাঁটা পেলাম। জাপানি খাবারের দোকান। ভেতরে খুব বেশি কাস্টমার নেই। দরজা দিয়ে ঢুকলে খোলা জায়গা। লোকজন বসে খাচ্ছে। সাউন্ড সিস্টেমে সন্তুর বাজছে। একটা লম্বা টেবিলে ফাহমিদা বসে আছে। সঙ্গে কয়েকজন ছেলেমেয়ে। আমাকে দেখে হাত নাড়ে ফাহমিদা। টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ফাহমিদা বলে, আশ্চর্য, সেই কখন থেকে তোমাকে ফোন করে যাচ্ছি...ঘুমাচ্ছিলে?
টেবিলের বাকি সবাই তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি হাসার চেষ্টা করে মাথা নাড়ি। ফাহমিদা ওর পাশের চেয়ারে বসতে ইশারা করে। ফাহমিদার কোনো বন্ধুবান্ধব আমি চিনি না। টেবিলে বসা তিনটি মেয়ে আর দুটি ছেলে খুব অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিল। ফাহমিদা পরিচয় করিয়ে দিতে সবাই কাঁধ নেড়ে সামান্য হাসে। আমার একটু অস্বস্তি হয়। এ ধরনের লোকজনের সঙ্গে আমার খুব বেশি পরিচয় নেই। দেখলেই বোঝা যায় এরা সবাই পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলেমেয়ে। লক্ষ করলাম এরা সবাই অকারণেই অনেক বেশি হাসছে। আমার মনে হলো সবাই কিছু একটা নেশাদ্রব্য খেয়েছে। তবে সেটা মদ নয়। ফাহমিদা হঠাত্ আমার গলা জড়িয়ে ধরে অন্যদের লক্ষ করে বলে, আমি একটা ঘোষণা দিতে চাই এই টেবিলে।
কথাটা বলে আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসে ফাহমিদা। সবাই তাকায় ওর দিকে। একটা ছেলে টেবিল চাপড়ে বলে, ঘোষণা যাই হোক, এরপর আমরা ডিনার করব।
আমি খুব অবাক হই। আমাকে ডেকে আনিয়ে কী ঘোষণা দেবে ফাহমিদা? বুকের ভেতরে সেই অচেনা হাওয়াটা আবার ঘুরে যায়। ফাহমিদা কিছুক্ষণ সবার দিকে তাকিয়ে থেকে এবার আমার দিকে ঘুরে তাকায়। গলা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলে, আমি শাহেদকে বিয়ে করতে চাই। আই ওয়ান্ট টু ম্যারি দিস ম্যান।
কোলের ওপর একটা সাপ ছেড়ে দিলেও বোধহয় এতটা চমকে উঠতাম না আমি। ফাহমিদা হোসেন আমাকে বিয়ে করতে চায়! কয়েক সেকেন্ডের জন্য বাকি সবার কথা বন্ধ হয়ে যায়। আমি নিজেও কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না। এ সময় একটা মেয়ে বলে, ফাহমি, আর ইউ সিরিয়াস দিস টাইম? তুই ওনাকে বিয়ে করবি!
ফাহমিদা আমার একটা হাত শক্ত করে ধরে বলে, হোয়াই নট? আমি শাহেদকে অনেক পছন্দ করি।
আমি ভীষণ অবাকি হয়ে তাকিয়ে আছি ফাহমিদার দিকে। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ওর কথাগুলি। একটু আগে বুকের ভেতরে ঘুরে ওঠা আনন্দের হাওয়া ক্ষ্যাপা ঘূর্ণির রূপ নেয়। ফাহমিদা হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কী, আমাকে বিয়ে করবে না?
আমি বোকার মতো তাকাই ফাহমিদার দিকে। অন্যরা নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে। আমি কিছুই শুনতে পাই না। ফাহমিদার প্রশ্নটা ছুড়ে মারা পাথরের মতো বুকের অনেক গভীরে লেগে শব্দ তোলে। প্রতিধ্বনি ফিরে আসতে থাকে সগর্জনে।

পনেরো
এই দুর্গাপুর গ্রামটা শ্যামলের বাবার নানার বাড়ি। ছোটবেলায় ভদ্রলোকের বাবা মারা যাওয়ার পর শ্যামলের দিদা দুই ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসেন বাপের বাড়িতে। শ্যামলের বাবা বড় হয়েছেন এই গ্রামেই। তারপর একসময় দুই ভাই বড় হয়ে লেখাপড়া করতে ঢাকায় চলে যায়। সেখান থেকে শ্যামলের বাবা জাফর আহমেদ বিদেশে চলে যান। বহু বছর বিদেশে থেকে ওখানেই মারা যান ভদ্রলোক। শ্যামলের মা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন। জাফর আহমেদ বিদেশে থাকতে আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। সে বিয়েটাও টেকেনি। একদিন শ্যামল আমাকে ওদের পরিবারের গল্প শুনিয়েছে।
শ্যামল গ্র্যাজুয়েশন করে হঠাত্-ই দেশে চলে আসে। ঢাকায় ফিরে শ্যামল কিছুদিন চুপচাপ চাচার বাসায় বসেছিল। জাফর আহমেদ ঢাকায় বেশ কয়েকটা বাড়ি কিনেছিলেন। শ্যামল একদিন হুট করে সেই সম্পত্তি বিক্রি করে সোজা চলে আসে এই দুর্গাপুরে। শ্যামল আমাকে বলেছিল, ওর বড় চাচা বিষয়টা ভালোভাবে নেয়নি। দুর্গাপুরে এসে জমি কিনে স্কুল বানানোও ওর চাচা ওয়াসিম আহমেদের পছন্দ হয়নি। আজ দুপুরে হঠাত্ শ্যামলের চাচা এসেছিলেন দুর্গাপুরে। আমার কাছে খবর পেয়ে শ্যামল তাড়াহুড়া করে সকালে রওনা দিলেও ওয়াসিম সাহেবের সঙ্গে ওর দেখা হয়নি। ভদ্রলোকের সঙ্গে এই প্রথমবার আমার দেখা হলো। ওনার কথায় মনে হলো গতকাল এখানে মারপিটের ঘটনাটা জানেন। আমি শ্যামলকে ফোন করতে বললাম। উনি ফোন করলেন না। উল্টো আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে শ্যামলের কাজকর্ম সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করলেন। শ্যামলের স্কুলে বাচ্চারা বিনা বেতনে পড়ে শুনে বেশ অবাক হলেন। ভদ্রলোকের বোধহয় ধারণা ছিল শ্যামল এখানে স্কুলের ব্যবসা খুলে বসেছে। ওয়াসিম আহমেদের মুখম্লল চারকোনা। বড় কান। এ ধরনের মানুষ আগ্নেয় বৈশিষ্ট্যের হয়। এরা উচ্চাভিলাষী। সব সময় প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ভদ্রলোক আমার চাইতে বয়েসে কিছুটা বড় হবেন। কিন্তু দেখায় ছোট। সতর্ক চোখ, তীক্ষ দৃষ্টি, তাকালে মনে হয় ভেতরে এক্স-রে মেশিন লাগানো আছে। সব স্পষ্ট দেখে ফেলছেন। মানুষটাকে আমার পছন্দ হলো না। আমাকে আরও কিছুক্ষণ জেরা করে ভদ্রলোক চলে গেলেন। বললেন, ঢাকায় জরুরি কাজ আছে।
আমি আর শ্যামল দুপুরে খেয়ে হাঁটতে বের হয়েছি। স্কুলের সীমানা পার হয়ে আরও উত্তর দিকে গেলে মাঠের পর মাঠ ছড়িয়ে আছে। দূরে ছোট ছোট টিলা। টিলা পার হয়ে আরও অনেক দূর হাঁটলে বাংলাদেশের সীমানা শেষ। ওপাশে পাহাড়ের মাথা দেখা যায়। বৃষ্টি নেই। কিন্তু চারপাশ ঘন সবুজ রং ধরে আছে। হাওয়ায় কেমন মাটি মেশানো গন্ধ। আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নেই। শ্যামল একটা ছোট মাটির ঢিবির ওপর বসে। পুরোটা রাস্তা চুপ করে ছিল। গভীরভাবে কিছু ভাবছে। ঝন্টুর ঘটনাটা ওকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আমি ভাবছি ওরা আমাকে না মেরে ঝন্টুকে মারতে গেল কেন।
অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে কথা বলে শ্যামল।
সহজ বিষয়, এটা ওয়ার্নিং।
আমার কথা শুনে শ্যামলের চোখে ক্রোধের ছায়া পড়ে।
আশ্চর্য, বাচ্চাদের স্কুলের সঙ্গে ওদের রাজনীতির কী সম্পর্ক! নূরু মিয়া কেন ভাবছে আমি এখানে পলিটিক্স করতে এসেছি?
আমি একটু হেসে বলি, রাজনীতি ছাড়া ওরা তো আর কিছু বোঝে না। নিজের ছায়ার ভেরেও রাজনীতি খোঁজে।
আমি নূরু মিয়ার সঙ্গে কথা বলব। লোকটাকে বোঝাতে হবে।
আমি শ্যামলের দিকে তাকাই। ছেলেটা বুঝতে পারছে না কিসের ভেতরে জড়িয়ে পড়েছে। রাজনীতি কর্কটক্রান্তি রেখার মতো দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে সমাজকে। মানুষের স্বাভাবিক আচরণের একটা উপাদান এখন রাজনীতি। এই কাঠামোর একটা অংশ মানচিত্রে ছোট্ট বিন্দুর মতো গ্রাম দুর্গাপুর। এই নূরু মিয়া লোকটা এই কাঠামোর নিয়ন্ত্রক শক্তি হতে চায়। এই ক্ষমতা অর্জন করার জন্য সে প্রয়োজনে ধর্মকেও ব্যবহার করবে।
শ্যামল অধৈর্য কণ্ঠে বলে, স্যার, কিছু বলছেন না? আমার তো মনে হয় এখনই কথা না বললে নূরু মিয়া আরও অনেক কিছু ঘটাতে পারে।
আমি তাকিয়ে ছিলাম দূরে অস্পষ্ট পাহাড়-শীর্ষের দিকে। মাঠের ওপর দিয়ে হাওয়া চলে যাচ্ছে আমাদের দুজনকে অতিক্রম করে। এভাবে হাওয়া উড়ে যায় শুধু অজানা দুঃখের দিকে। পেছনে পড়ে থাকে মানুষের ঘরবসতি, আলোলাগা-ভালোলাগা দিন। কী সব ভাবছিলাম। শ্যামলের ডাকে সম্বিত্ ফেরে। আমি বুকের ভেতরে গভীর এক অসহায় বোধ আড়াল করে করে বলি, তোমার কি মনে হয় নূরু মিয়ার সঙ্গে কথা বললে সব থেমে যাবে?
শ্যামল একটু ভেবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, না, থামবে না আমি জানি। কিন্তু নূরু মিয়াকে বোঝাতে হবে আমরা ভয় পাচ্ছি না, আমরা আমাদের কাজটা চালিয়ে যাব।
বিকেল ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। এখন দিন স্বল্পায়ু নয়, তবুও। দূরে পাহাড়ের অস্পষ্ট মাথাটা এখন আরও বেশি অস্পষ্ট। ক্রমশ অজানা একটা ভয়ের আকার নিচ্ছে। মাঠের গায়ে রোদ হারিয়ে ছায়া পড়ছে। আমি মনে হয় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় চুপ করে ছিলাম। শ্যামল বলে, স্যার, আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?
প্রশ্নটার একটা প্রলম্বিত প্রতিক্রিয়া আছে। সেই প্রতিক্রিয়ায় আমি দাঁড়াই নিজের মনের আয়নার সামনে। সত্যিই কি ভয় পাচ্ছি আমি? মনের ভেতর থেকে অসহায়ের মতো উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি আসন্ন বিপদের মাত্রা? আমি শ্যামলের কাঁধে হাত রাখি। তারপর লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলি, না, আমি ভয় পাচ্ছি না, শ্যামল। ভয় পেলে এই যুদ্ধটা লড়তে পারব না। আমি শেষ পর্যন্ত আছি তোমার সঙ্গে।
শ্যামল উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টে লেগে থাকা মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, আমি ভাবছিলাম আপনাকে বলব এখান থেকে চলে যেতে। খামোখা একটা ঝামেলার মধ্যে না থাকাই ভালো।
আমি শ্যামলের দিকে তাকিয়ে বলি, আমার কি ফিরে যাবার কোনো পথ খোলা আছে? আমি তো সব পথ ফুরিয়ে এখানে এসেছি। চলো, ফেরা যাক।
শ্যামল আর কিছু বলে না। আমরা দুজন বাড়ির দিকে রওনা হই।

ষোল
কোথাও সামান্য একটু শব্দ হলেও মনে হচ্ছে মাথাটা ফেটে যাবে ব্যথায়। দুদিন ধরে মাথাব্যথা। ওষুধ খেয়েই যাচ্ছি, কমছে না। ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাত্ মার ঘরের দরজাটা বাতাসের ধাক্কায় ঠাস করে বন্ধ হলো। চমকে উঠে বসি বিছানায়। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে মাথাব্যথার তীব্র, একটানা অনুভূতিটা। বাইরে অন্ধকার নেমেছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরে আরও বেশি অন্ধকার। বিছানায় বসে দৃষ্টিকে অন্ধকারে অভ্যস্ত করে নেয়ার চেষ্টা করি। পরনের ম্যাক্সিটা টেনে পায়ের অনাবৃত অংশ ঢাকি। শুধু মনে হয় কেউ হাত রাখছে পায়ের ওপর। কার ঠা্লা হাতের তালু ক্রমশ চেপে বসছে। চমকে উঠি। এক ধরনের আচ্ছন্ন অনুভূতিতে লেগে আসা চোখের পাতা ঝট করে খুলে যায়।
পুরো বাসাটা অন্ধকার হয়ে আছে। মা বোধহয় বের হয়নি ঘর থেকে। আলো জ্বালানো হয়নি। ভূতের বাড়ি বলে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, ভূতের বাড়ি ছাড়া আর কী? মা সারাদিন চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে বিছানায়। মার স্বাস্থ্য খুব খারাপ হয়ে গেছে। পরিচিত মানুষ হঠাত্ দেখলে চিনতে পারবে না। খাওয়া প্রায় বন্ধ। ভাইয়া গত সাতদিনে আসা তো দূরের কথা, একবারও ফোন করেনি। আমি ফোন করেছিলাম। অনেকক্ষণ রিং হয়ে লাইন কেটে গেল। আমাদের বাবা আর ফিরে আসেনি। সম্ভবত এক মাস পার হয়ে গেছে।
আমি গত দুদিন ধরে বাসা থেকে বের হই না। আমার পৃথিবীটা গত বাহাত্তর ঘণ্টায় অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। এখন দেয়ালে মাথা ঠুকে ফাটিয়ে ফেললেও আগের পৃথিবীকে আমি ফেরত পাব না। এখন আমার জন্য বাঘের মতো থাবা পেতে বসে আছে গা শিরশির করা অনুভূতি, শ্যাওলার মতো ঘন অন্ধকার রাত, মরা মানুষের চোখের মতো স্থির হয়ে থাকা দিন। দুদিন আগে যখন বাসায় ফিরে আসি, ভেবেছিলাম আত্মহত্যা করব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটা করার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস জোগাড় করতে পারিনি। তাই অদ্ভুতভাবে বদলে যাওয়া এক পৃথিবীতে আমি বেঁচে আছি।
আমি বুঝতে পারিনি আমার জন্য এত গুছিয়ে একটা ফাঁদ পাতা হয়েছে। আমার মতো অনেক মেয়েই হয়তো বুঝতে পারে না। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমার মতো তারাও হেঁটে গিয়ে ঢুকে পড়ে ফাঁদের ভেতরে। হ্যাঁ, ফাঁদই তো। হানিফ সাহেবদের পাতা ফাঁদ। আমাকে ফোন করে ডাকা হয়েছিল একটা শুটিং হাউজে। বিজ্ঞাপনের শুটিং হবে। সেই রাতের পার্টির পর আমি তখন হাওয়ায় উড়ছিলাম। সকালবেলা সোজা গিয়ে হাজির হয়েছিলাম হাউজে। বিজ্ঞাপনের শুটিং হবে অথচ হানিফ সাহেব আর একজন লোক ছাড়া কেউ নেই দেখেও আমার মনে সন্দেহ হয়নি। শুটিংয়ের আগে আমাকে যখন গ্লাসে করে একটা ড্রিংকস দেয়া হলো তখনও অন্য কিছু ভাবিনি। সব বুঝতে পেরেছিলাম, আরও অনেকটা সময় পরে যখন নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম একটা ঘরে। উলঙ্গ। আমার সামনে তখনও একটা ট্রাইপডের ওপর ক্যামেরা বসানো। হুড়মুড় করে উঠে বসতেই মাথার ভেতরে তীব্র যন্ত্রণা আমাকে গেঁথে ফেলে বিছানার সঙ্গে। বাথরুম থেকে হানিফ সাহেব বের হয়ে এসেছিল মনে আছে। আমার পাশে বসে মাথায় হাত রেখেছিল। খুব পরিতৃপ্ত দেখাচ্ছিল তাকে। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। হানিফ সাহেব খুব স্বাভাবিক গলায় আমাকে বুঝিয়েছিল, এ রকম অবস্থায় আমার কিছু ছবি নেয়া হয়েছে। এখন থেকে মাঝে-মাঝে আমার এ ধরনের ছবি তোলা হবে। এসব ছবি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিক্রি হবে। রাতারাতি আমি পর্নো ছবির খ্যাতিমান নায়িকা বনে যাব। প্রথমে এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল পুরো ব্যাপারটা একটা জোক। অবাস্তব। পরমুহূর্তে চাদরের তলায় আমার উলঙ্গ শরীরটা জানিয়ে দিল সব সত্যি, নিরেট পাথরের মতো সত্যি। শরীর বিক্রি হয়ে যাওয়ার উপলব্ধিটা এক তীক্ষ চীত্কারের মতো আমার সমস্ত শরীরকে দখল করল।

তারপর আমি কী করেছিলাম আমার এখন কিছুই মনে নেই। মনে আছে বাসায় ফেরার পথে ওষুধের দোকানে নেমে পেইন কিলার খেয়েছি। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছিল মাথায়। ব্যথাটা আজও কমেনি। একটানা, একঘেয়ে যন্ত্রণার অনুভূতি। শুধু মনে হচ্ছে একটা ধারাল ছুরির মসৃণ ইস্পাতের গায়ে হাত রেখে বসে আছি। ছুরিটা গভীর থেকে আরও গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। চামড়া কেটে প্রথমে সাদা মাংস, তারপর লাল রক্তের ধারা বের হয়ে আসছে। কিন্তু কোনো যন্ত্রণা টের পাচ্ছি না।
এই দুদিনে নেহাল অসংখ্যবার ফোন করেছে। ধরিনি। মনে হচ্ছিল ফোন ধরলে নেহালের গায়ে রক্ত লেগে যাবে। আমার শরীরের একমনে বয়ে চলা বিষের মতো কালো রক্ত। নেহালকে তো এসব কথা বলা যাবে না। ও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। বুক ভেঙ্গে কান্না আসছে। বাবার কথা মনে পড়ছে। বাবা কেন আমাদের ফেলে চলে গেল? এখন বাবা থাকলে বাবার কোলঘেঁষে শুয়ে থাকতে পারতাম। হয়তো ভুলতে পারতাম সব দুঃস্বপ্ন। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। বাবার গায়ের গন্ধে আমার ঘুম এসে যেত। এসব কিছুই ঘটবে না আমি জানি। আমি শুধু এই অন্ধকার ঘরে বসে থাকব। পাশের ঘরে মা না খেয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকবে। হাওয়া এসে খোলা দরজা সশব্দে বন্ধ করে দেবে। তারপর আবার ফোন আসবে। হানিফ নামে ওই মানুষটা বলে দিয়েছে, আমাকে আবার যেতে হবে। এবার অনেক গুছিয়ে কাজ হবে। ছোট পর্নো মুভি তৈরি হবে। আমাকে যেতেই হবে। পালিয়ে যাবার কোনো পথ তো আমি রেখে আসিনি। ওদের হাতে আমার ছবিগুলো আছে। অবাধ্য হলে সেসব ছবি প্রকাশ করে দেয়া হবে। লজ্জা, কী ভীষণ লজ্জা। মাথার ভেতরে কে যেন হাতুড়ি মারছে। কঠিন পাথরের ওপর পড়ে পিছলে যাচ্ছে হাতুড়িটা। অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে। শব্দটা বাড়ছে।

সতেরো
অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে আজ। ঘর থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে। নামটা অদ্ভুত সুন্দর। সোমেশ্বরী। শুনলেই মনের ভেতরে পরিচ্ছন্ন হাওয়ার গন্ধ পাওয়া যায়, ভোরের ফিনফিনে নীল হাওয়া। সূর্যের আলো এখনও ভালো করে ফোটেনি। আমি একটা বড় হিজল গাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছি। এখান থেকে আরেকটু দূর গিয়ে নদীটা বাঁক নিয়েছে। নদী আমার কাছে সব সময় খুব প্রিয়। আমাদের গ্রামের কাছেও একটা নদী ছিল। ভীষণ অশান্ত নদী। তার চলা ছিল চারপাশের বসতি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে। মানুষ রাগ করে নদীটার নাম দিয়েছিল ভাঙ্গা। সোমেশ্বরী খুব শান্ত নদী। মুখ নিচু করে বয়ে যাচ্ছে শুধু।
কাল রাতে চিঠিটা লিখে শেষ করেছি। শাহেদকে লেখা চিঠি। একটা খামে ভরে টেবিলে রেখে এসেছি। শ্যামলকে দেব পোস্ট করার জন্য। মনের ভেতরে যেসব কথা অভিমানী বালকের মতো এতদিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল তাদের মুক্তি ঘটেছে। আমি নিজেও মুক্তি পেয়ে গেছি। তবে লেখা শেষ করার পর নিজেকে খুব একা মনে হয়েছে। একা। শব্দটা একদম অন্য রকম। একটা ধ্বনি আছে, প্রাণ নেই। উচ্চারণ করতেই মনে হলো খুব আবছা, নির্জন এক ভোর হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যাচ্ছে আরও অস্পষ্টতার দিকে। বাসার সবার কথা খুব মনে পড়ছিল। পারুল, শাহেদ, রত্না— সবার কথা। চিঠি লেখা শেষ করে মনে হলো ওদের সঙ্গে সম্পর্কের শেষ সুতোটাও ছিঁড়ে গেল। আত্মপক্ষ সমর্থন করে মুক্ত হয়ে গেলাম? হয়তো। কোনো একটা বইতে পড়েছিলাম, গৌতম বুদ্ধ ভোরবেলা গৃহত্যাগ করেছিলেন। আমি ভগবান বুদ্ধ নই। নির্বাণের পথ খুঁজতে আসিনি। এসেছি জীবনকে আমার মতো করে খুঁজে নিতে। স্বার্থপর ভাবছেন আমাকে? কিছুটা যে স্বার্থপর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সত্য এত কঠিন হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল, কিছু করার ছিল না আমার। মানুষের এ রকম হয় না? সংসারের ভেতরে বাঁচতে-বাঁচতে, সবার ইচ্ছাপূরণের গল্প হয়ে যেতে-যেতে একজন মানুষ হঠাত্ বুঝতে পারে সে এখানে কোথাও নেই। সে শুধু ইচ্ছাপূরণের গল্প, প্রত্যেক দিন চাল, ডাল, ডিম, তরকারি আর মাংসের মধ্যে ফুরিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায়। হয় তো এ রকম, হয় না?
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হয়ে আমাকে বিয়ে করতে হয়েছিল। আমার তাড়া ছিল না, মায়ের ছিল। করে ফেললাম। মা আমার সংসারেই ছিলেন। আমার স্ত্রী রত্না এমনিতে খারাপ মেয়ে না। কিন্তু মায়ের সঙ্গে ওর কখনোই মেলেনি। যে রকম হয় আমাদের আরও দশটা বাঙালির সংসারে। রত্না বিষয়টা মানিয়ে নিতে চায়নি। এই দুই বিপরীত মেরুকে মেলাতে গিয়ে জীবনের বেশির ভাগ সময় আমি পার করে দিয়েছি। আমি অনেক পরে বুঝতে পেরেছি চাকরি, সংসার— এসবের কোনোটাই আমার করতে ভালো লাগেনি কখনো। উচ্চাকাঙ্ড়্গা ছিল না বলে চাকরিজীবনে বিশেষ উন্নতি হয়নি। আমার লেখালেখি করার ইচ্ছা ছিল। একসময় ভাবতাম ছবি আঁঁকব। প্রথম জীবনে ছবির প্রদর্শনী দেখতে যেতাম। শেষে নয়টা-পাঁচটার চাপে সেটাও আর সম্ভব হতো না। নিঃশ্বাস নেয়ার যে দু-একটা জানালা ছিল সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি ছাত্রজীবন থেকে বই পড়তাম। পারুল হওয়ার পর অফিস শেষ করে আমাকে টিউশনি করতে হচ্ছিল। তখন টাকার খুব টানাটানি যাচ্ছিল। ছাত্র পড়িয়ে রাতে বাসায় ফিরে ভীষণ ক্লান্ত থাকতাম। বই পড়ার কথা মনেই হতো না। একসময় দেখলাম এই অভ্যাসটাও ছাড়তে হলো আমাকে। আপনারা হয়তো ভাবছেন এত ছোটখাটো বিষয়ের জন্য কেউ গৃহত্যাগী হয়! সংসার তো এভাবেই সবকিছু থেকে আসল মানুষটাকে এভাবে টেনে নেয় তার জঠরের মধ্যে। আমি বুঝি এসব। কিন্তু একধরনের খারাপ লাগার অনুভূতি বেলুনের মতো ধীরে ধীরে বাতাস সঞ্চয় করে বড় হচ্ছিল আমার ভেতরে। শাহেদ কলেজে পড়ার সময় থেকেই কেমন আলগা হয়ে গেল। রাজনীতির সঙ্গে জড়াল। ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে লেখাপড়া শেষ করল না। একটা সময়ে আমার সঙ্গে কথা বলারও সময় হতো না ওর। আর পারুল তো এসএসসি দেয়ার পর জানিয়ে দিল আর লেখাপড়া করবে না। অভিনয় করবে। ওদের ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাচ্ছিল। বড় অস্থির লাগত তখন। বাড়ি ফিরলে রত্না অভিযোগের ঝুলি খুলে বসত। ছেলেমেয়ে দুজনই আমাকে মনে করত ওদের চিন্তা-আকাঙ্ড়্গার জগত্ থেকে পিছিয়ে পড়া একজন মানুষ আমি। ভালো-না-লাগার বেলুনটা একদিন বড় হতে হতে ফেটে গেল। আমি ঠিক করলাম আর এখানে নয়। কোথাও চলে যাব ।
চাইলেই তো চলে যাওয়া যায় না। একটা জায়গা লাগে। শ্যামল আমার জন্য সেই জায়গার সন্ধান নিয়ে এসেছিল। এই ছেলেটির সঙ্গে দেখা না হলে জীবনের অন্য মানে খোঁজার কাজটা আমার জন্য সহজ হতো না। শ্যামলের গল্প শুনে আমার মনে হলো এখনো পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জায়গা আছে। সংসার, অভিমান, ভালো-না-লাগার বাইরে আরেকটা পৃথিবী। ঠিক করে ফেললাম, শ্যামলের সঙ্গে চলে আসব এখানে। এখন ঢাকার শান্তিনগরের বাসায় আমার জন্য কারও জীবন কোথাও আটকে থাকবে না। রত্না হয়তো কষ্ট পাচ্ছে। কষ্ট পেতে পেতে তা-ও একসময় সয়ে যায়। একা হয়ে যাওয়া হয়তো আমার জীবনের নিয়তি ছিল। আমি নিয়তি মানি। আমি বুঝতে পারি নিয়তি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে জীবনের শেষ দৃশ্যে অভিনয় করাবে বলে।

ফিরে আসার সময় দেখলাম স্কুলের পুব দিকের সীমানার বাইরে জামগাছটার নিচে একটা চায়ের দোকান বসে গেছে রাতারাতি। টুল পেতে সামনে বসে আছে কয়েকটা ছেলে। ব্যাপারটা ভালো লাগল না। আমাকে আসতে দেখে ওরা নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বলাবলি করছিল। শ্যামলকে বললাম। শ্যামল বলল ঘটনাটা ও জানে। ওখানে যারা বসে আছে সবাই নূরু মিয়ার ছেলেপেলে। দোকানটা ওরা এখানে বসিয়েছে আমাদের ওপর একধরনের চাপ তৈরি করার জন্য। কাছাকাছি থাকলে ঝামেলা তৈরি করা সহজ হবে। বিপদ ঘনিয়ে উঠছে বুঝতে পারছি। রাজনীতির ড্রাগনের ঘুম ভেঙ্গেছে। কোনো কিছুই সে আর তার পাকস্থলীর বাইরে রাখবে না।
আটটা বেজে গেছে। বাচ্চারা স্কুলে আসতে শুরু করেছে। শ্যামল কোনো একটা হিসাবের কাজ করছিল। কাগজপত্র গুছিয়ে রেখে আমাকে বলল, স্যার, আপনি রেডি হয়ে নেন। আমার ক্লাসটা আপনাকে নিতে হবে। আমি একটু ঘুরে আসছি।
কথাটা বলে শ্যামল ঘরে ঢুকে যায়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।

আঠারো
পুরো চব্বিশ ঘণ্টা আমি উত্তরায় ফিরিনি। ফাহমিদার বাসায় ছিলাম। ওই জাপানি রেস্তোরাঁ থেকে ফাহমিদা আমাকে সোজা বাসায় নিয়ে এসেছিল। প্রথমে একটু আপত্তি করেছিলাম আমি। আসলে আচমকা আমাকে বিয়ে করার জন্য ফাহমিদার নাটকীয় প্রস্তাবের বিষয়টা আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। বলা যায়, আমার মাথার ভেতরে চিন্তার জায়গায় জট বেঁধে গিয়েছিল। ফাহমিদার বন্ধুরা আরও অনেকক্ষণ হৈ-হুল্লোড় করার পর সবাই যখন বের হলাম তখন বেশ রাত। আমি উত্তরায় ফিরতে চাইলে ফাহমিদা আটকাল। ওর কথা ছিল— বিয়ে যখন আমরা করব তখন বাসায় যেতে সমস্যা কোথায়? আমি আর বেশিক্ষণ ভাবিনি। ফাহমিদার গাড়িতে চড়ে চলে এসেছিলাম ইস্কাটনের বাসায়।
বাসায় ঢুকে ফাহমিদা বেডরুমে ঢুকেছিল। বুক ঢিপঢিপ করছিল আমার। সেই দিনের চুমু খাওয়ার স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেদিন তো চুমুতে থেমে গিয়েছিল। এরপর তো আরও সিঁড়ি নেমে গেছে গভীরে। মনে হচ্ছিল, সেই অজানা সোপানের ধাপ রাত-গভীরে উন্মোচিত হবে আমার সামনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই ঘটেনি। ফাহমিদা আমাকে ডেকে বেডরুমে বসিয়ে লিখতে শুরু করল। প্রায় ভোর পর্যন্ত লিখল একটানা। মানসিক রোগী একটা মেয়ে। তাকে নিয়ে উপন্যাস লিখছে ফাহমিদা। মেয়েটি প্রমাণ করতে চায় তার আশপাশের সব চরিত্র আসলে মানসিক রোগী। ফাহমিদার বিশ্বাস তার এই উপন্যাসটা চারদিকে আলোড়ন তৈরি করবে। পুরস্কার পেয়ে যেতে পারে। একসময় ফাহমিদার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছিল আমিও একজন মানসিক রোগী। তা না হলে এই গভীর রাতে একটি মেয়ের বেডরুমে এভাবে বসে আছি কেন? পরমুহূর্তে মনে হয়েছে, আমার এই ম্লান, মুখ থুবড়ে পড়া জীবনে ফাহমিদা তো বসন্তের হাওয়া। রাজনীতি করতে গিয়ে কপাল পুড়িয়েছি, বন্ধুর অফিসে ভিক্ষাবৃত্তি করার মতো করে একটা জীবন টেনে পার করছি, বাবা উধাও হয়ে গেছে সংসার ফেলে, টাকার শূন্যতা আমাকে শ্বাসরোধ করছে প্রতি মুহূর্তে। ফাহমিদাকে পেলে এই জীবনটা আমি ভুলে যেতে পারব। আমি ভুলে যেতে চাই সবকিছু। হতে পারে সবকিছু একটা ঘোর। হোক। ঘোরের মধ্যে থেকে মানুষ বেঁচে থাকে না?
ফাহমিদা লেখাটা নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত ছিল। আমি চেয়ারে বসে ওর অস্থির অথচ নিমগ্ন শরীরটাকে দেখছিলাম। রাতপোশাকের ভেতর দিয়ে ছুরির মতো ফুটে থাকা ফাহমিদার স্তন, গোছানো নিতম্ব, নগ্ন হাত, মুখের ওপর এসে পড়া অবাধ্য কয়েকটা চুল— সব মিলিয়ে ওর তীব্র শরীরটা টানছিল আমাকে। কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহসটা জোগাড় করতে ব্যর্থ হলাম সারা রাতে। শুধু মনে হচ্ছিল কোনো ধরনের বেচাল আচরণে ফাহমিদা যদি রেগে গিয়ে সন্ধ্যার ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেয়? জীবনের এই স্বাদ তো আমাকে আর কেউ দিতে পারবে না। আমার এই সামান্য জীবনে এর চাইতে বড় পাওয়া আর কী আছে? ফাহমিদার কাছে টাকার গন্ধমাখা স্বস্তির জীবন আছে, দুইবেলা পেট ভরে ভাত খাওয়ার নিশ্চয়তা আছে। তার বদলে যদি এভাবে রাত জেগে বসে ফাহমিদাকে দেখতে হয় তাতে আমার কোনো ক্ষতি নেই।

সকালবেলা ফাহমিদার বাসা থেকে বের হলাম। সারারাত লিখে ক্লান্ত ফাহমিদা এখন ঘুমাবে। ওর এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। আমি ফ্ল্যাট থেকে নেমে হেঁটে গলির মাথায় এসে দাঁড়াই। ব্যস্ত, জীবন্ত ঢাকার রাস্তা। চারদিকে অফিসগামী মানুষের মিছিল, গাড়ির হর্নের তীব্র আর্তনাদ, বাসের অপেক্ষায় পথের মোড়ে মানুষের ভিড়— সব মিলে নরক গুলজার। পকেট থেকে শেষ সিগ্রেটটা বের করে ধরাই। গলির মুখে শাটার নামানো একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আয়েশ করে লম্বা একটা টান দেই। নিজেকে হঠাত্ জামাই-জামাই মনে হয়। কাল রাত থেকে ফাহমিদা হোসেনের অলিখিত স্বামী। আচ্ছা, ফাহমিদার কি আগে বিয়ে হয়েছে? প্রশ্নটা হঠাত্ মনে উদয় হয়ে চমকে দিল আমাকে। ফাহমিদা সম্পর্কে আসলে আমি প্রায় কিছুই জানি না। হানিফের কাছে শুনেছি, ফাহমিদা অনেক বছর বিদেশে ছিল। দেশে ফিরে ওর লেখালেখির শুরু। ওর বিদেশে কাটানো জীবন সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। ইস্কাটনের এই ফ্ল্যাটটা কার তা-ও জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি ফাহমিদার অনেক টাকা। আর এই তথ্যটা আমার জন্য এখন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস ধরে উত্তরায় চলে যাব ভাবছিলাম। হঠাত্ ফোন এসে আটকে দিল। হানিফের বউ রেখা ফোন করেছে। নামটা দেখে কয়েক সেকেন্ড ভাবি। রেখা এখন আমাকে ফোন করেছে কেন! কোনো খারাপ খবর নেই তো? ফোন ধরতেই রেখা প্রথম প্রশ্ন করে, হানিফের সঙ্গে আজকাল আমার দেখা হয় কিনা।
প্রশ্নটা শুনে একটু বোকা হয়ে যাই। হানিফের সঙ্গে দেখা না হওয়ার কী আছে? পরশু সকালেও হানিফ অনেকক্ষণ হাউজে ছিল। আমি উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চাই, কী হয়েছে, কোনো সমস্যা?
রেখার পরের প্রশ্নটা সংক্ষিপ্ত।
আপনি পারুল নামে কোনো মেয়েকে চেনেন?
পারুল নামটা আমার মাথার ভেতরে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়।
কে পারুল?
নিজের কাছে নিজের গলা অচেনা মনে হয়।
কাল রাতে আমার কাছে এক লোক ফোন করেছিল। আমি চিনি না। লোকটা বলল, এই পারুল নামে মেয়েটার সঙ্গে হানিফের একটা সম্পর্ক চলছে। একে দিয়ে হানিফ নাকি পর্নো ছবি বানাচ্ছে। দুদিন ধরে হানিফ বাসায় ফিরছে না। আপনি ওর ছোটবেলার বন্ধু। প্লিজ, আমাকে হেল্প করেন।
আমি রেখার কথার কোনো জবাব দিতে পারি না। আমার চারপাশে যেন এক গভীর নৈঃশব্দ্য নেমেছে। সে নৈঃশব্দ্যের কোনো সীমা নেই। চারপাশের অস্থির শব্দরাজি ক্রমশ যেন দূরে, আরও দূরে সরে যাচ্ছে। আমি একা হয়ে যাচ্ছি। দোকানের শাটারে ভর দিয়ে দাঁড়াই। পারুল নামটা শুনে এত ভয় পেয়ে যাচ্ছি কেন আমি? আমার বোন পারুল ছাড়া এই শহরে কি আর কোনো পারুল নেই? আর পারুলের সঙ্গে হানিফের কোথায় দেখা হবে? খুব ধীরে আবার বাস্তবে ফিরতে শুরু করি আমি। ভাবনার দমবন্ধ করা ভারী পর্দায় জড়িয়ে যাওয়া কয়েক মুহূর্তকে পেছনে ফেলে আবার স্বাভাবিক ভাবনায় ফিরে আসা। কিন্তু রেখার পরের প্রশ্নটা আমার ফেরার পথের সেতুটা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিল।
পারুল মেয়েটা শান্তিনগর এলাকায় থাকে শুনলাম। আপনাদের তো শান্তিনগরে বাসা, একটু খোঁজ নেয়া যায়?
এবার মনে হয় দোকানের বন্ধ শাটার আমার শরীরের ভার ধরে রাখতে পারবে না। আমার পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। পড়ে যাচ্ছি? আমার কাছ থেকে আলোর গতির চেয়েও দ্রুতবেগে সবকিছু দূরে সরে যাচ্ছে। এই রাস্তা, মানুষ, ভিড়, বন্ধ দোকান, গাড়ির তীব্র হর্নের শব্দ— সবকিছু।

উনিশ
শ্যামল ফিরল দুপুরে। ততক্ষণে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। ঝন্টু স্কুল ঘরের বারান্দায় ওদের খেতে বসিয়েছে। শ্যামলের মুখ গম্ভীর। আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, নূরু মিয়ার পার্টি বাজারে জনসভা ডেকেছে বিকেলে। মিটিংয়ের বিষয় হচ্ছে, গ্রামের মধ্যে স্কুল চালানোর নামে আমরা ব্যবসা খুলে বসেছি। এনজিও ব্যবসা। এনজিওদের রুখতে হবে। ওদের লোক চোঙ্গা মারছে।
তোমার সঙ্গে নূরু মিয়ার দেখা হয়নি?
আমার প্রশ্ন শুনে হাসে শ্যামল।
নূরু মিয়া আমার সাথে আর দেখা করবে না। আমাদের বিরুদ্ধে এখন জেহাদ ঘোষণা হয়ে গেছে। এখন তো বাজারে মিটিং ডেকেছে। এরপর সরাসরি আক্রমণ করবে।
আমার মনে হয় থানার সঙ্গে কথা বলা উচিত।
কথা আমি বলে এসেছি। কিন্তু খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে না। ইস্যুটা জটিল।
আমি বুঝতে পারছি না কী বলব। বুঝতে পারছি পরিস্থিতি খুব দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শ্যামল তাকিয়ে আছে স্কুলের দিকে। বাচ্চাদের খাওয়া শেষ। লাইন করে সবাই চলে যাচ্ছে। শ্যামল ওদের দিকে হাত নাড়ে। বাচ্চারাও হাত নেড়ে জবাব দেয়। শ্যামল আমার দিকে তাকিয়ে বলে, আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন স্যার। এই দেশে রাজনৈতিক দলগুলির ব্যানারের বাইরে কেউ কিছু করতে গেলে তাকে এভাবে ফাউল করে আটকানো হয় কেন?
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে শ্যামল বলে, উত্তরটা আমি জানি। রাজনৈতিক দলগুলি সমাজের বিকাশকে তাদের হিসেবমতো নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে বলে। কিন্তু সমাজের বিকাশ তো রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সেটা নিয়ন্ত্রণ করার কথা মানুষের। রাজনীতির লোকেরা এই সত্যটা ভুলে যেতে বসেছে। এ জন্য আজকে নূরু মিয়ার পার্টি আমাকে আটকাতে চাচ্ছে। ওরা পুরো ব্যাপারটাকে রাজনৈতিকভাবে দেখছে। বাচ্চাদের লেখাপড়া, গ্রামের কৃষকদের উন্নয়ন ওদের কাছে মুখ্য নয়। দেশের চাইতে দল বড় হয়ে যাচ্ছে।
কথা বলতে বলতে শ্যামলের মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। আমি অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভঙ্গ করে বলি, এটাই তো এখন সিস্টেম হয়ে গেছে। তুমি সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছ। তোমাকে আটকানোর চেষ্টা তো হবেই।
শ্যামল আমার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকায়। ওর চোখে রাগের আগুন লাফিয়ে ওঠে। কঠিন গলায় শ্যামল বলে, আমি এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেখতে চাই স্যার। দেখতে চাই কে শক্তিশালী, মানুষ না রাজনীতি।
কথাটা বলে শ্যামল দাঁড়ায় না। নিজের ঘরের দিকে চলে যায়।
সন্ধ্যাবেলা আরজ মিয়া, নির্জলা, হাসান আর জল্লাদ এল। ওরা জনসভা ঘুরে এসেছে। নির্জলা আর জল্লাদের জনসভা নিয়ে আগ্রহ বেশি। কারণ ওদের বাচ্চাদের স্কুল নিয়ে ঝামেলার সূত্রপাত। আরজ মিয়া বলল, আজকের সভায় নূরু মিয়া বলে দিয়েছে, এই গ্রামে তারা বাইরের লোককে কোনো কাজ করতে দেবে না। এই গ্রামের প্রতি তাদের দায়িত্ব আছে। এলাকার মানুষ উন্নয়নের কাজে তাদের সঙ্গে থাকবে। এসব কথা বলার অর্থ হচ্ছে ওরা শুধু স্কুল না, শ্যামলের সেচ পাম্প বসানোর কাজটাকেও টার্গেট করেছে।
সব শুনে শ্যামল বলে, আমি তো এই গ্রামে বাইরের মানুষ না। আমার বাবা তো এখানেই বড় হয়েছে। এই গ্রাম, গ্রামের মানুষ তো আমার দূরের কেউ না।
আরজ মিয়া বয়স্ক মানুষ। হাসান, নির্জলাদের মতো উত্তেজিত হয় না। একটা বিড়ি ধরায় আরজ মিয়া। বিড়ির আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ার আগে সাবধানে হাত দিয়ে আড়াল করে আরজ মিয়া। তারপর কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলে, শ্যামল মিয়া, এই জমিনের ওপরে মানুষ দুই কারণে বাঁচে। একটা কারণ হইতাছে স্বার্থ, আরেকটা ভালোবাসা। তুমি ভালোবাসার দলের মানুষ। তোমার লগে তো স্বার্থের মানুষগো যুদ্ধ হইবই। এইটা নতুন কিছু না। দ্যাশ স্বাধীনের সময় তোমরা তো ছোট আছিলা। তহনও এই যুদ্ধটাই হইছিল। স্বার্থের বিরুদ্ধে মানুষের ভালোবাসার যুদ্ধ। তুমি আমাগো কাছের মানুষ। তোমার বাপেরেও আমি দেখছি এই গেরামে। কিন্তু নূরু মিয়ার মতন মানুষরা তো স্বার্থের জন্য কাম করে। হেরা তোমার কথা শুনব ক্যান, কও?
অনেকক্ষণ কথা বলে আরুজ মিয়া হঠাত্ চুপ করে যায়। ছোট কয়েকটা টান দেয় বিড়িতে। পাতা পোড়ানোর গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে যেতে থাকে। আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম আরজ মিয়ার কথা। কত সহজে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে দিল। শ্যামল হঠাত্ বলে, তাহলে কি আমরা থাইমা যামু, কাকা?
কাশি ওঠে আরজ মিয়ার। কাশির ধাক্কায় বিড়ির আগুন ছোট ছোট ফুলকি হয়ে ছড়িয়ে যায় উঠোনে। আরজ মিয়া বিড়িটা নিভিয়ে ফেলে বলে, সেইটা তো তুমি জানো বাপধন। তয় একটা কথা কই, সংগ্রামের সময় আমরা কিন্তু থামি নাই। পাকিস্তানি সৈন্যগো অনেক কামান-বন্দুক আছিল, তার পরও থামি নাই। যুদ্ধ কইরা দ্যাশ স্বাধীন করছি। অনেক বেশি মানুষের ভালার জন্য অনেক সময় যুদ্ধ কত্তি হয়।
আমরা কেউ আর কোনো কথা বলি না। উঠোনের একপাশে বিশাল জামগাছের মাথার ওপর নিঃশব্দে চাঁদ উঠে আসে। হঠাত্ হাওয়া দেয়। স্কুলের পেছনে চায়ের দোকান থেকে রেডিওতে গান ভেসে আসে। একটা মেয়ে অদ্ভুত বেসুরা গলায় গান গাইছে। ছেলেগুলির আড্ডা এখনও ভাঙ্গেনি। ওরা আমাদের ওপর নজর রাখছে।

বিশ
আমার শরীরটা কি অনেক সুন্দর? সরি, ভুল বললাম, সেক্সি? বইয়ের ভাষায় যৌন আবেদনসমৃদ্ধ? সবাই কি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখবে আমার একটু লম্বা হাত-পা, স্তন, নাভি, নাভির আরেকটু নিচের নির্জনতা? এসব দেখে দর্শকদের শরীরে ভীষণ উত্তেজনা তৈরি হবে? এসব ছবি যখন তোলা হয় তখন আমি ওষুধের প্রভাবে গভীর ঘুমের রাজ্যে আটকে ছিলাম। কিছুই বুঝতে পারিনি। মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে, আমার ঘুমন্ত মুখটা তখন কেমন ছিল? আমি আমার ঘুমিয়ে থাকা মুখের ছবি কখনও দেখিনি। কিন্তু শরীরটাকে দেখেছি। উনিশ বছর বয়সী এই শরীর প্রতিদিন বাথরুমের আয়নার সামনে একবার করে নিরাভরণ হয়েছে। বাল্বের হলুদ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আমি তাকিয়েছি আয়নায়। কিন্তু এখন তো আমার দৃষ্টির পাশে ভূতের মতো জেগে আছে আরও হাজার দৃষ্টি। ছোটবেলায় শোনা গল্পের সেই দৈত্যের মতো। যার সমস্ত শরীরে ছিল শুধু চোখ। এখন হয়তো সেই চোখগুলি গিলে খাচ্ছে আমাকে।
দুদিন ধরে অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকার পর আজ সকালে বের হয়েছিলাম। ভোরে হানিফ সাহেবের ফোন এসেছিল। দেখা করতে হবে তার সঙ্গে। না বলার তো কোনো রাস্তা নেই। মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। বের হয়ে একটা সিএনজি নিয়ে গেলাম গুলশানে। যাবার সময় মার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। মা যথারীতি চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। হঠাত্ করেই দেখি মা চোখ খুলে তাকাল আমার দিকে। চমকে উঠেছিলাম। মার চোখটা অদ্ভুত রকমের সাদা। মাঝখানে কালো বিন্দুর মতো মনি। মার দৃষ্টিটা হঠাত্ যেন আমাকে বলল, আমি সব জানি। ভয় পেয়ে ছিটকে সরে এসেছিলাম দরজার সামনে থেকে। মা সব জেনে ফেলেছে! সেটা কিভাবে সম্ভব?
একটা অজানা ভয় বুকের ভেতরে থম ধরে থাকে। এখন অবশ্য শুধু ভয়টাই আছে। লজ্জার ব্যাপারটা চলে গেছে। শুধু মনে হয় আর কী হবে আমার? এরপর আর কিছু হওয়ার নেই। কী অবলীলায় গুলশান চলে গেলাম। একটা অফিস। হানিফ নামে লোকটা খুব সাধারণ ভঙ্গিতে ওই অফিসরুমেই আমার শরীরে কিছুক্ষণ কিছু একটা খুঁজে ফিরল। তারপর টাকা ভর্তি একটা প্যাকেট ঢুকিয়ে দিল আমার ব্যাগে। ক্যামেরার সামনে কাপড় খোলার পারিশ্রমিক। আমিও নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। টের পেলাম আমার দৃষ্টি কোথাও পৌঁছাচ্ছে না। সামনে যা দেখছি তার সবটাই ভিডিও ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করার মতো দ্রুত পিছলে চলে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। কোনো ছবি সেখান থেকে আর ফিরে আসছে না। আমি মনে করতে পারছি না কিছু।
হানিফ সাহেবের অফিস থেকে বের হয়ে কিছুদূর হেঁটে আর কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না একটু আগে কোথায় ছিলাম। একটা সিএনজি ডেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম কোথায় যাব।
আচ্ছা, মা সত্যি বুঝে ফেলেছে আমার কী হয়েছে? এসব তো মায়ের বোঝার কোনো প্রয়োজন নেই। কারুর-ই বোঝার দরকার নেই। বুঝে কী হবে? দুপুরে যখন ফিরছিলাম, চারপাশে কী অদ্ভুত নিয়মে বাঁধা হয়ে সবকিছু ঘটে যাচ্ছিল। একটা ফলওয়ালা রাস্তার পাশে আপেল ওজন করছে, সিগ্রেটের দোকানের কেউ সিগ্রেট ধরাচ্ছে, ব্যস্ত মানুষ অফিসের সিঁড়ি ভাঙ্গছে, লিফটের লাইনে দাঁড়াচ্ছে, সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে, যানজট একটা বিশাল পোকার আকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থির হয়ে আছে আমার শহর। এরা কি কেউ জানে আমার মতো একটা মেয়ের কী হয়েছে? কেন আমি গুলশানে এসেছিলাম, কেন প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা পরেও আমার মাথাব্যথা যাচ্ছে না, কেন আমি আর স্বপ্ন দেখি না? না, কেউ জানে না। কাল আমি এই শহরে না থাকলেও জানবে না। জানলে কারও কিছু এসে যাবে? উদাসীন শহর তার ধুলো আর বিশাল বাড়িগুলোর পায়ের কাছে মুখ গুঁজে আরও একটা দিন পার করবে। তার পরও কাল আমি আর থাকব না। আর কখনোই এখানে ফিরে আসব না। অনেক ঘুমের ওষুধ কিনলে পারতাম। মৃত্যুটা সহজে হতো। কিন্তু নিজেকে কষ্ট দিতে চাই। স্বপ্ন নষ্ট হয়ে গেছে বলে অনেক কষ্ট পেয়েছি আমি কয়েক দিনে। আরও একটু কষ্ট পেলাম না হয়। ভুল স্বপ্ন দেখার জন্য এটুকু শাস্তি তো নিজেকে নিজে দিতে পারি আমি? ঠিক করে রেখেছি আজ রাতে হাতের শিরা কেটে শুয়ে থাকব বিছানায়। শরীরের সব রক্ত বের করে ফেলতে হবে। হয়তো মাথাব্যথাটা কমবে একটু।

একুশ
পারুল চলে গেছে। থানা-পুলিশ, পোস্টমর্টেম, কবর দেয়া— সব শেষ। আমি বাসার ড্রইংরুমে বসে আছি। পারুলের বিছানার চাদরটা এখন পর্যন্ত বদলানো হয়নি। রক্তে ভেজা চাদরের ওপর মাছি উড়তে দেখেছিলাম সকালে। পারুলের হিম শীতল কপালের ওপর একটা মাছি বসে ছিল। এতক্ষণে মনে হয় আর নেই। পাশ থেকে শিশির একটা সিগ্রেট বাড়িয়ে দেয়। আমি হাত নেড়ে সরিয়ে দেই। নাকের ভেতরে রক্তের গন্ধ ঢুকে গেছে। পারুলের রক্তের গন্ধ। মন্টু সিগ্রেট খাচ্ছে। আমার পেট ঠেলে বমি আসছে। পুরো বাসায় রক্তের গন্ধ। পারুলের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়েছিলাম। এত রক্ত থাকে একটা মানুষের শরীরে? বিছানা থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে মেঝেতে নেমেছে। তারপর জমাট বেঁধে গেছে। এই বিছানায় বসে আমি আর পারুল কত গল্প করেছি।
হানিফের বউ ফোন করার পরও আমি হানিফের মুখোমুখি হইনি। রেখা ফোন রাখার পর ভীষণ রাগ হয়েছিল। মনে হচ্ছিল হাতের কাছে সবকিছু আছড়ে ভেঙ্গে ফেলি। মনে হচ্ছিল সোজা বাসায় গিয়ে পারুলের মুখোমুখি দাঁড়াই। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে গিয়েও বাসে উঠতে পারিনি। খুব ভয় পেয়েছিলাম। পারুলের কাছে কিছু জানতে চাইলে ও যদি বলে বসে, সব সত্যি!
যখন আমি বাসে উত্তরায় ফিরছিলাম, সম্ভবত পারুল তখন আত্মহত্যা করার প্ল্যান করছিল। রাতে যখন আমি ফাহমিদা হোসেনের পাঠানো এসএমএস পড়ছিলাম ফোনে, পারুল তখন হয়তো মৃত। ফাহমিদা কাল আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে মেসেজটা পাঠিয়েছে। এতদিন নাকি ও আমার সাথে যা যা করেছে সব বানানো। ফাহমিদা ওর উপন্যাস লেখার জন্য আমাকে বেছে নিয়েছিল। ওর এক বন্ধু ওকে বলেছিল, উপন্যাসে যা লিখবে তা যদি একজন মানুষের ওপর প্রয়োগ করা যায় তাহলে প্রতিক্রিয়াটা সত্যের কাছাকাছি চলে যাবে। লেখাটাও ভালো হবে। ফাহমিদা এ জন্য আমার সঙ্গে দিনের পর দিন অভিনয় করেছে। আমাকে বিয়ে করার কথা বলে দেখতে চেয়েছে আমার ভেতরের প্রতিক্রিয়া। এসএমএসটা পেয়ে সত্যি বোকা হয়ে গিয়েছিলাম। মানুষের জীবনে এতটা মিথ্যা থাকতে পারে, এতটা অভিনয় থাকতে পারে? এখন অবশ্য এই এসএমএসটার কোনো মানে নেই আমার কাছে। আমার জীবনের নাটকের চাইতে অনেক বড় একটা নাটকের মুখোমুখি আমি। এটা কি আসলে নাটক? পারুলের চলে যাওয়ার পেছনে কতটা যন্ত্রণা, কতটা কষ্ট জমে ছিল আমি কোনো দিন জানতে পারব না। শুধু বুঝতে পারি, এখন যন্ত্রণায় আমার সবকিছু বিকল হয়ে আসছে। আমার চিত্কার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু গলার কাছে পাথরের মতো একটা অনুভূতি আমার কণ্ঠরোধ করে রেখেছে।
টলতে টলতে বাসার বাইরে এসে দাঁড়াই। বাইরে প্রতিবেশীদের ভিড়। ভিড় ঠেলে বের হয়ে অনির্দিষ্ট কাল হাঁটতে শুরু করি। এই শহরে আমি কোথায় যাব এখন? কোন গর্তে গিয়ে লুকাব? চাইলে আমি হানিফের মুখোমুখি হতে পারি। কিন্তু তাতে কী লাভ হবে? পারুলকে ফিরে পাব আমি? আমি কোনো দিন ভাবতেই পারিনি পারুল হানিফের সঙ্গে এ রকম একটা ভয়ঙ্কর বিষয়ে জড়িয়ে যাবে। রেখা আমাকে আবারও ফোন করে সব বলেছিল। আমি এখন জানি, মেয়েদের নাটকে অভিনয়ের কথা বলে, রাতারাতি মডেল বানিয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়ে হানিফের পর্নো ছবি বানানোর ব্যবসার কথা।
পেছন থেকে রঞ্জন ডাকে আমাকে। দাঁড়াতে ইচ্ছে করছিল না। তার পরও দাঁড়ালাম।
আমার সাথে থানায় যেতে পারবি শাহেদ?
রঞ্জনের কথা শুনে অবাক হই। আবার থানায় কেন!
ওসি সাহেব তোকে নিয়ে যেতে বলেছে। তোর বাবার সন্ধান পাওয়া গেছে।
আমি রঞ্জনের কথাটা শুনে অবাক হয়ে তাকাই। মনে হলো কথাগুলি অনেক দূর থেকে আমার কাছে ভেসে আসছে, মাঝখানে কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষের দূরত্ব। বাবাকে পাওয়া গেছে মানে? বাবা বেঁচে আছে!
রঞ্জন আমার হাত ধরে। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত থানার দিকে হাঁটতে শুরু করি।

বাইশ
স্কুলঘরে আগুন লাগানো হলো শেষ রাতে। তখনও চারদিক অন্ধকার। আগুনটা প্রথম দেখে শ্যামল। ওর ডাকাডাকিতে ঘুম চোখে ঘর থেকে বের হয়ে এসে দেখি আগুনের উজ্জ্বল কমলা রঙের শিখা লাফিয়ে ধরতে চাইছে অন্ধকার আকাশ। যারা আগুন দিয়েছে তাদের কয়েকজন তখনও ছিল স্কুলের সামনে। আগুনের কম্পমান শিখার মধ্যে ওদের ছায়া কতকগুলি বিশাল ভৌতিক রেখার সমষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবার হাতে অস্ত্র। সম্ভবত বড় সাইজের রামদা। শ্যামল দ্রুত এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। কটি ছায়ামূর্তি কিছুটা এগিয়ে এসে রামদা উঁচিয়ে সতর্ক করল। আমি আটকালাম শ্যামলকে। আগুনের মধ্যে কাঠ ফাটার শব্দ শোনা যায়। টিনের চাল বাঁকা হয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে। স্কুলঘরের চালের ওপর ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছের একটা অংশ পুড়ছে আগুনে। আগুনের তা্লবকে পেছনে রেখে ওরা চলে যায় একসময়। শ্যামল এই সময়টা একটি কথাও বলেনি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল আমার পাশে।
ভোরবেলা মানুষের ভিড় বাড়ির সামনের উঠোনে। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও এসেছে। হতভম্ব দৃষ্টিতে ওরা তাকিয়ে আছে পোড়া স্কুলঘরের দিকে। শ্যামল একটা চেয়ারে চুপ করে বসে আছে। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াতে নিচু গলায় বলল, স্যার, ওরা স্কুলটা জ্বালিয়ে দিল! আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম না?
আমি শ্যামলের হাতটা ধরি। আরজ মিয়া ভিড় থেকে সরে এসে শ্যামলের পাশে মাটিতে বসে। আঙুলের ফাঁকে বিড়ি ধরা। কিছুক্ষণ চুপ করে বিড়ি টানে আরজ মিয়া। তারপর শ্যামলের দিকে তাকিয়ে বলে, আগুনের ধর্ম হইল সব পোড়াইয়া ছাই কইরা ফালানো। কিন্তু বাপধন, আগুন একটা জিনিস ছাই বানাইতে পারে না, সেইটা হইল মানুষের মন। সেইখান থেইকা আবার সব শুরু হয়। তোমার ইশকুল আবার শুরু করো।
আরজ মিয়ার কথা শুনে শ্যামল তাকায়। কিছু বলে না। হঠাত্ বাইরে থেকে আসে হাসান আর রাজু। হাসানের মুখ গম্ভীর। সঙ্গে রাজু উত্তেজনায় ছটফট করছে। শ্যামলের দিকে তাকিয়ে হাসান বলে, স্যার, নূরু এহন প্রচার করতাছে আমরা নাকি নূরু মিয়ার পার্টিরে বিপদে ফালানোর জন্য কাইল রাইতে ইশকুলে আগুন দিছি। এই জন্য গেরামে তারা পুলিশ আসতে দিব না। ইচ্ছা কইরা গেরামের মানুষের মইধ্যে গ্লগোল লাগানোর জন্য অরা আপনের বিচার বসাইব।
আমরা সবাই হতবাক হয়ে হাসানের দিকে তাকাই। রাজু পাশ থেকে বলে, তাগো কথা হইল এই খ্রিস্টান বানাইবার ইশকুল হইল সব ঝামেলার মূলে। এই সব কারবার এহন থেইকা একদম বন্ধ। দুর্গাপুরে নূরু মিয়ার পার্টির কথার বাইরে আর কোনো কাজ হইব না।
আমি এই প্রথম শ্যামলকে অস্থির হতে দেখলাম। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শ্যামল তাকায় সবার দিকে। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, স্যার, বুঝতে পারছেন ওরা কী করবে?
আমি মাথা নাড়ি। আমি আসলেই নূরু মিয়াদের প্ল্যান বুঝতে পারছিলাম না। শ্যামল হাত নেড়ে বলে, পুলিশ ঢুকতে বাধা দেবার মানে হচ্ছে ওরা আমাদের ওপরও হামলা করবে। আর বিচার সভা ডাকার মানে আজকেই সব শেষ করে দেবে।
হাসান পরনের লুঙ্গিটা ভালো করে বেঁধে নিয়ে বলে, এই দুর্গাপুর তো স্যার মগের মুল্লুক না। নূরু মিয়া যা কইব সব আমরা মানুম ক্যান? এই ইশকুলে আমাগো মতন গরিবের পোলা-মাইয়ারা পড়ে। আমরা এইটা বন্ধ করতে দিমু না। দরকার হইলে আমরা একশ লোক এই জায়গা পাহারা দিমু।
শ্যামল হঠাত্ উঠে দাঁড়ায়। হাসানের দিকে তাকিয়ে ভীষণ ঠা্লা গলায় বলে, না। তোমাদের এখন কিচ্ছু করার দরকার নেই। শুধু বাচ্চাদের ডেকে আনো। এখানে, এই পোড়া স্কুলে আমি ওদের ক্লাস নেব।
আমার চোখের সামনে এক যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি ঝলসে ওঠে। ধুলো উড়ছে, আগুন জ্বলছে। তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক যোদ্ধা, একা, অচঞ্চল। তাকে আঘাত করার জন্য দূর থেকে ছুটে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার। তাদের পাশবিক চিত্কার ছড়িয়ে যাচ্ছে মাঠের ওপর দিয়ে।
শ্যামলের কথায় অবাক দৃষ্টিতে তাকায় হাসান। একটু থতমত খেয়ে বলে, এহন আপনে কেলাস নিবেন!
শ্যামল মাথা নাড়ে। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আরজ মিয়া বলে, হাসান, বাপধন যা কইতাছে তাই করো। বাচ্চাগো ডাইকা আনো।
আমি দেখতে পাই যুদ্ধের মাঠে সেই যোদ্ধা আর একা নয়। তারপাশে মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে।

আমি যা ভেবেছিলাম তাই হলো। নূরু মিয়ার পার্টির লোকেরা দুপুরে একটা মিছিল বের করল। মিছিলটা সারা গ্রামে একটা চক্কর দিয়ে এল। এবার ওরা আমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। রাজু ছুটতে ছুটতে এসে জানাল, ওরা আইতাছে। সবতের হাতে লাঠি আর বল্লম। আপনেরা পলান। বাড়ি থেকে কিছু দূরে বটগাছটার কাছে বোমা ফাটার শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে অনেক মানুষের চিত্কার। আমি উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি। শ্যামল ঘর থেকে বের হয়ে এসে দাঁড়ায়। ওদের চিত্কার শুনে মনে হচ্ছে একটা বিশাল অদৃশ্য প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ার প্রচ্ল গতিতে এগিয়ে আসছে। আচমকা আমাদের সামনের উঠোনে বোমা পড়ে আরেকটা। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারদিক। শ্যামল চিত্কার করে আমাকে ডাকে। ধোঁয়ার মধ্যে আমি ওকে দেখতে পাচ্ছি না। শুধু টের পাচ্ছি একদল উন্মত্ত মানুষ এগিয়ে আসছে। আবার বোমা ফাটে। এবার খুব কাছে। কিসের একটা টুকরা উড়ে এসে পেটে লাগল মনে হয়। হঠাত্ ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছি। পায়ের ওপর শরীরটা আর কিছুতেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। চোখ বন্ধ করার আগে শাহেদ, পারুল আর রত্নার মুখ এক মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠে আবার হারিয়ে গেল। অন্ধকার চারদিকে। তীব্র, গহিন অন্ধকার।

তেইশ
বাবার চিঠিটা যে আমাকে দিল তার নাম শ্যামল। একটা সাদা খামের ভেতরে বেশ মোটা একটা চিঠি। খামের ওপর আমার নাম লেখা। আমি কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে খামটার দিকে তাকিয়ে থাকি। বাবা আমাকে চিঠি লিখেছে! কী লেখা আছে চিঠিতে? একটু দূরে একটা গাছের তলায় শ্যামল দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছে জানতে চাইতে পারি। শ্যামল কী জানাবে? কিন্তু বাবাকে তো জিজ্ঞেস করতে পারব না। কয়েক ঘণ্টা আগেও বাবা এখানেই ছিল। এখন বোমার আঘাতে বাবার শরীরটা ছিন্নভিন্ন একতাল মাংস। আমি জায়গাটার দিকে তাকাই। ল্লভ্ল মাটির ওপর ভৌতিক আকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মাত্র ঘর। ঘরের টিনের গায়ে বোমার করডাইটের হলুদ বৃত্তাকার দাগ। বাকি স্থাপনার মধ্যে বেশির ভাগই পুড়ে গেছে। পোড়া কাঠের ঠুনি মৃত মানুষের আঙ্গুলের মতো এখানে-ওখানে মাটির গভীর থেকে বের হয়ে আছে। সন্ধ্যা নামছে দুর্গাপুর গ্রামে।
থানার ওসি আমাকে এই গ্রামের ঠিকানা দিয়েছেন। মানুষটা খুব অদ্ভুত। বাবার কেসটা নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর করছিলেন। বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে বর্ডার এলাকায় ছবি পাঠিয়েছিলেন বাবার। স্থানীয় থানা থেকেই তার কাছে খবরটা যায়। দুর্গাপুরে এই মানুষটা আছে। একটা স্কুলে পড়াচ্ছে। পুলিশ অ্যারেস্ট করতে চেয়েছিল। ওসি সাহেব বাধা দিয়ে আমাকে খবর পাঠিয়েছিলেন। খবর শুনে আমি পরের দিন মন্টুকে নিয়ে বাসে রওনা হয়ে যাই। মাকে অবশ্য কিছু বলে আসিনি। ভেবেছিলাম এখানে পৌঁছে ফোন করব।
বাবাকে এখানেই কবর দেয়া হয়েছে। পোড়া স্কুলঘরটার পাশে। মন্টু বলছিল, এখান থেকে বডি কোনোভাবে বাজার পর্যন্ত নিতে পারলে কিছু একটা ম্যানেজ করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া যায়। আমিই শেষ পর্যন্ত রাজি হইনি। কী হবে নিয়ে গিয়ে? বাবা তো ঢাকা থেকে চলে এসেছিল এখানে। ফিরে যেতে চায়নি আর। তাহলে মানুষটার শেষ গন্তব্য এখানেই হোক। কাফনে জড়িয়ে বাবাকে কবরে নামানোর সময় শ্যামলের চোখে কান্না দেখলাম। কী অদ্ভুত ব্যাপার, আমার বাবার জন্য অচেনা একটি ছেলে চোখের পানি ফেলছে। আর আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দেখছি। বাবাকে কি আমার অনেক কথা বলার ছিল? বাসে আসতে আসতে কথা গোছাতে পারছিলাম না। সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। দেখা হলে কী বলতাম বাবাকে? পারুলের কথা, আমার বুকভর্তি কষ্টের কথা? বলতে পারতাম? কোনো দিন তো কিছু শেয়ার করিনি বাবার সঙ্গে। আজও হয়তো দেখা হলে কিছুই বলা হতো না। মৃত্যু মানে তো গভীর এক অনুপস্থিতি। কারও অনুপস্থিতি বুকের মধ্যে শুধু অভিযোগের সুর বাজাতে থাকে। মনে হয় কত কথা বলা হলো না মানুষটাকে।
খাম খুলে চিঠিটা বের করি। কয়েক পৃষ্ঠার চিঠি। প্রথম পাতায় ওপরে ছোট হাতের লেখায় আমার নাম—প্রিয় শাহেদ। শরীরটা থরথর করে ওঠে। গলার কাছে কী যেন একটা এসে আটকে যায়। এর নাম কান্না? শোক? চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়ার আগে মন্টু এসে কাঁধে হাত রাখে।
‘এখন কী করবি?’
প্রশ্নটা চমকে দেয় আমাকে। তাই তো, এখন কী করব আমি? আবার ফিরে যাব ঢাকায়? মাকে কী বলব গিয়ে? বাবা আজ সত্যি সত্যি মরে গেছে। শ্যামল এসে দাঁড়ায় পাশে। নিচু গলায় বলে, আপনারা কি এখন ফিরে যাবেন? একটা ঘর ঠিক থাকলে আপনাদের থাকতে বলতাম।
আমি তাকাই। শ্যামলের বয়স আমার মতোই হবে। ডান হাতে বড় একটা ব্যান্ডেজ বাঁধা। ব্যান্ডেজের ওপর রক্তের দাগ আজকের রক্তাক্ত ঘটনার সাক্ষ্য দিচ্ছে। আমি বোকার মতো তাকাই শ্যামলের দিকে। আসলে এখন আমি কী করব নিজেই বুঝতে পারছি না। আমার শুধু মনে হচ্ছে, এই পুরো জায়গাটায় বাবার অদৃশ্য চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। বাবা হয়তো এই গাছটার তলায় দাঁড়াত, সামনের পথটা ধরে সকালবেলা স্কুলে পড়াতে যেত। চিঠিটার পাতা ওল্টাই। শেষ কয়েকটা লাইনের ওপর এসে চোখ আটকে যায়। বাবা লিখছে— দ্যাখো, কেমন সুন্দরভাবে কেটে যাচ্ছে এক-একটা দিন। বাতাসে মিশে যাচ্ছে আমার নিঃশ্বাস, স্মৃতি মিশে যাচ্ছে স্মৃতিতে। কাল যেখানে ছিলাম আজ আর সেখানে নেই আমি। তোমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে এখন। ঘাস, মাটি আর নির্জনতার গন্ধে ভরা এই অন্ধকারে খুব শব্দহীনভাবে আরও একটু এগিয়ে যাব আগামী কাল। একে কি হারানো বলে? যদি তাই হয়, তাহলে আমি হারিয়ে গেছি শাহেদ। তোমাদের বাবা সত্যি হারিয়ে গেছে।
চিঠির পাতাটা সামান্য হাওয়ায় কেঁপে ওঠে। আমি তাকাই সামনের দিকে। সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে নেমেছে। আশপাশে যা কিছু দৃষ্টিগ্রাহ্য ছিল, সব আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে দৃষ্টিসীমার বাইরে। আমিও কি হারিয়ে যাচ্ছি বাবার অস্তিত্বে মিশে থাকা এই দুর্গাপুর গ্রামে?
ঘুরে দাঁড়িয়ে শ্যামলের হাত ধরি। শ্যামল চমকে তাকায় আমার দিকে। আস্তে বলি, এখানে থাকব আমি।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৪
ফজর৪:১০
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৭
এশা৭:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:২৯সূর্যাস্ত - ০৬:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :