The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

নমস্কার

মোস্তফা তারিকুল আহসান

সঞ্জীব ভেবেছিল সে কোনদিন অন্যদের মতো ভারতে চলে যাবে না; কারণ তার ঠাকুরদাদা ভারতে গিয়ে যেভাবে নাজেহাল হয়েছিল সে কথা সে বাবার কাছে শুনেছে। যদিও তারপর বাবা ভারতে চলে গেছে কিন্তু সঞ্জীব যাবে না। সে বুঝতে পারে না মানুষ তার জন্মভূমি বন্ধু-বান্ধব গাছপালা পুকুর পরিচিতি মাঠ-ঘাট ছেড়ে কীভাবে অন্য দেশে যাবে, সেখানে তো নতুন করে সখ্যতা তৈরি করতে হবে সব কিছুর সাথে। তবু নিজের মতো কিছুই হয় না। নিজেকে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে হয় সেখানে। অন্তত বাবার সাথে কথা বলে ওর সেরকম মনে হয়।
সে ভাবতে ভাবতে কাজলার দিকে যাচ্ছিল, কয়েকদিন আগে প্রচণ্ড ঝড়ে ক্যাম্পাসের প্রচুর গাছপালা উপড়ে গেছে, বড় বড় গাছ রাস্তায় পড়ে আছে, কোনভাবে হেঁটে রাস্তা অতিক্রম করা যাচ্ছে। তবে সেই রাতের প্রচণ্ড তাণ্ডবের কথা মনে আছে সঞ্জীবের, তীব্র ঝড়ের বেগের সাথে প্রচণ্ড শব্দ, চারিদিকে চিত্কার; অন্ধকার হয়ে এলো একটু পরে আর শুরু হলো বৃষ্টি তবে ঝড়ও চলতে থাকলো অনেকক্ষণ। বিকেলের এই সময়টা সে বের হয়, বের না হলে থাকতে পারে না। হাসানকে সে দেখতে পেল উল্টো দিকে থেকে আসতে। ওর সুন্দরী বউটা ওর সাথে সব সময় থাকে, এখনও আছে। আরো সঙ্গে আছে পাঁচ বছরের ছেলে শামস। কাছাকাছি হলে সালাম-কালাম দেয়া লাগবে। সে কি নমস্কার বলবে নাকি স্লামালেকুম বলবে। এ নিয়ে সে আগে বেশ দ্বিধায় ভুগতো। কাউকে সালাম দিতে গিয়ে মনের কোথায় যেন থাক্কা লাগতো। সংকুচিত হয়ে যেত মনটা। কেন সে সালাম দেবে? সে তো নমস্কার দেবে। যা সে শিখেছে ছোটবেলা থেকে। ওর গ্রামের বাড়িতে স্কুল-কলেজে পড়ার সময় ওর কোন সমস্যা হয়নি, এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। হিন্দুদের সব আচার-আচরণ পালন করতে কোন অসুবিধা হয়নি কখনো। কখনো মনে হয়নি দেশটা তাদের সংস্কৃতিতে চলে না। সবাই বাঙালি হলেও এখানে তারা সংখ্যালঘু। কাজেই তাদের সংস্কৃতি প্রাধান্য পাবে না। আবার একদল উগ্র লোকজন আছে তারা তো পারলে ওদের ভাগিয়ে দেয়। সঞ্জীব ভাবতে ভাবতে আগায় আর হাসানের কথা ভাবতে থাকে। হাসান ওরকম নয়, সে সবাইকে শ্রদ্ধা করতে বা সম্মান করতে জানে। হাসান ওর সমবয়সী, বন্ধুও বলা যায়। বয়সে ওর চেয়ে বছর দুয়েকের বড় হবে। পরিচিত, একসাথে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, তবে সব সময় দেখা হয় না। মাঝে-মধ্যে কথাবার্তা হয়। সে ভেবেছ অনেকবার যে ওর সাথে কথা বলবে। কেন জানে না ওকে সঞ্জীবের ভালো লাগে। দুজন পড়তো একই বিশ্ববিদ্যালয়ে, তবে অন্য বিষয়ে। এখন দুজনেই মাস্টার, বড় স্কুলের।
সঞ্জীব ভেবে পায় না আগে তাকে দেখা হলে কী বলতো? মনে পড়ে না। কাছাকাছি আসতেই হাসানই আগে বলল, নমস্কার, কেমন আছেন? সঞ্জীব বলল, নমস্কার, ভালো আছি, কোথায় যাচ্ছেন? প্রশ্ন করেই সে বোকা হয়ে গেল কারণ ওতো বাড়ির দিকে যাচ্ছে সেটা তো ও বুঝতেই পারছে। হাসান একটু হাসলো। বলল, কোথায় আর যাবো, বাড়ির দিকেই যাচ্ছি। হাসান নমস্কার বলার সাথে সাথে ওর ছেলে শামস বলল, নমস্কার, আঙ্কেল। সাধারণত সে কিছু বলে না। আজ বলল। সে নমস্কার বলে বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকলো। ভাবখানা এমন যে সে বিরাট কিছু করে ফেলেছে। সঞ্জীব লক্ষ্য করলো, হাসান যখন তাকে নমস্কার দিলো তখন ওর সুন্দরী বউ আফরোজা কেমন একটা ভঙ্গি করলো, অনেক ইংরেজি স্টাইলে শ্রাগ করার মতো, ভঙ্গিটার অনুবাদ করতে পারে না সঞ্জীব তবে বোঝে যে সে ভেংচি কাটতে চেয়েছিল স্বামীকে, সে সরাসরি তাকাবার কারণে যা সে করতে চেয়েছিল তার খানিকটা করতে পেরেছে মাত্র। বাকিটা জমা করে রেখেছে সুবিধামতো সময়ে প্রয়োগ করবে। হাসানের হাসিমাখা মুখ দেখে সঞ্জীবের বেশ ভালো লাগলো, সে ‘আচ্ছা দেখা হবে বলে’ তার গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালো। তবে সে হাসান ও তার বউয়ের মধ্যে তীব্র কথাবার্তার খানকিটা ঝাঁঝ শুনতে পেল, তবে বুঝতে পারলো না ঠিক তারা কি বললো।
বাসন্তী চার বছরের মেয়ে স্নিগ্ধাকে নিয়ে বাড়িতে প্রায় সারাদিন একাই থাকে। সঞ্জীব সারা দিন কোথায় কি করে সেসবটা জানে না, জানতে সে চায়ও না। সভা সমিতি সাহিত্য সংস্কৃতিমূলক নানা কাজে সে ব্যস্ত থাকে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অবশ্য নানাভাবে কৈফিয়ত দিতে চেষ্টা করে। বাসন্তী না শুনতে চাইলেও সে বলে। মেয়ের সাথে খুনসুটি করে। বাসন্তী আড়চোখে দেখে সে কী করে। রবীন্দ্রনাথের লাইন তার মুখে মুখে ফেরে কখনো গুনগুনিয়ে কখনো প্রকাশ্যে। আগুনের পরশমণি গানটি ঘুরে-ফিরে আসে। সেদিন দেখল সে রজনীকান্তের গান করছে। আর মেয়েটা বাবার মুখের দিকে চেয়ে আছে। সেও কয়েক মিনিট পরে যোগ দেয় বাবার সাথে। তবে অন্য গানে। রজনীকান্তের এ গান সে জানে না। দুয়েক একদিন শোনার পরে সে এটাও গাওয়া শুরু করবে। সে বাবার সাথে ‘আলো আমার আলো’ গাওয়া শুরু করে। বাসন্তী তাকায়। মেয়েকে ঘাড়ে করে সে বারান্দায় যাচ্ছে। বারান্দায় গিয়ে সে নিশ্চয় অন্য গান শুরু করবে। কোন গান সে পুরোপুরি জানে বলে তার মনে হয় না। একদিন সে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল, জানবো না কেন, জানি তবে সব গানের সবটা জানি না। তবে সুরটা সে ঠিক ঠিক জানে। নিজের মতো কথা বসিয়ে দিয়ে গায়। বারান্দায় গিয়ে সে শুরু করলে, ‘ও আমার চাঁদের আলো, আজ ফাগুনের সন্ধ্যাকালে’। পূর্ণিমা ছিলো কাল, বৌদ্ধ পূর্ণিমা। সঞ্জীব ডাক দেয়, শোন, শোন, আজ সিদ্ধার্থের চাঁদ আকাশে, কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার দেখ। বাসন্তী জানে না যাওয়া পর্যন্ত সে ডাকতে থাকবে। অগত্যা সে গেল। বারান্দা থেকে মহুয়া গাছের ওপর দিয়ে বিশাল বড় চাঁদ দেখা যাচ্ছে আম-জাম গাছের পাতার জন্য পুরোটা দেখা যাচ্ছে না, যা যাচ্ছে তাতেই প্রগাঢ় একটা অনুভূতি খেলে গেল বাসন্তীর মনে। বাসন্তী সব কথা বলে না কখনো সঞ্জীবকে। কারণ এমনিতেই তার পাগলামিতে সে অস্থির, তার ওপর যদি তার অনুভূতিমাখা কথা শোনে তাহলে আরো পাগলামি করবে। সেটা আরো বিপদের হতে পারে। বারান্দায় গেলেই সঞ্জীব বলল, জানো এই চাঁদের আলোতে পাগল হয়েই সিদ্ধার্থ বিবাগী হয়ে সংসার ত্যাগ করেছিলেন। বাসন্তী মৃদু সুরে বলে, তাই? আমি তো জানি সে আগেই বিবাগী ছিল। চাঁদ তাকে কী পাগল করবে সে নিজেই পাগল ছিলো। স্নিগ্ধা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, জানো, বাবা কি সব আবোল-তাবোল কথা বলছে। বাবাকে নিয়ে ভেতরে চলো। সে বাবার হাত ধরে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল।
চারতলা বাড়ির নীচতলার পূর্ব দিকের এই বাসাটি বাসন্তী পছন্দ করেছিল। সঞ্জীবকে বলেছিল এই বাড়িটাতে আমরা থাকবো। দেখ চেষ্টা করে পাওয়া যায় কি না। খুব বেশি চেষ্টা করতে হয়নি। নীচতলার বাড়িতে সাধারণত কেউ থাকতে চায় না। মশা-মাছি সাপ বেজি শেয়াল দেখা যায় প্রায়শ। দিনের বেলায়ও শেয়াল ঘুরে বেড়ায়। কুকুর-শেয়াল যুদ্ধ করে। ইদানীংকালে কুকুররা ভয় পাচ্ছে, তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। প্রচুর পাখি আছে মানুষের কাছাকাছি। এসব কাম্পাসের চিরচেনা চিত্র। সঞ্জীব বলেছিল, তোমার ভয় করবে নাতো? বাসন্তী বলেছিল, না। সে তার নিজের মতো ব্যাখ্যা দিয়েছিল। সেই ব্যাখ্যার মধ্যে তার কিছু গোপন আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয়েছিল। বাড়িটার তিন পাশ দিয়ে কোমর সমান উঁচু বেশ বড় একটা বাগান। আগে কে থাকতো ওরা জানে না তবে যে ভদ্রলোক থাকতো তার রুচি ছিলো বলা যায়। বাড়ির চার পাশ দিয়ে নিম জবা রঙ্গন পাতাবাহার আর মেহেদী গাছ দিয়ে ঘেরা। ডান পাশে দরোজার ঢোকার মুখে একটি বাগানবিলাস। পূর্ব পাশে একটি গন্ধরাজ। একটি হাসনাহেনা ও একটি বকুল গাছও রয়েছে তার পাঁচ-ছয় হাত দূরে পাশাপাশি। আরো যেটা তার ভালো লাগে তা হলো বারান্দা থেকে নামলেই চার-পাঁচটা তুলসি গাছের চারা। ভদ্রলোক হিন্দু না মুসলমান ছিলেন তা সে জানে না, জানার চেষ্টা করলে হয়তো জানতে পারতো। তবে শহরে, বিশেষ করে এখানে সে দেখেছে সাধারণত বাচ্চাদের সর্দি-কাশির জন্য সবাই তুলসি পাতার খোঁজ করে। গাছও লাগায় জায়গা থাকলে। আর তাদের গ্রামে প্রতিটি বাড়িতে থাকতো তুলসিতলা। তাদের উঠানের এক কোণে ছিল ইট দিয়ে বাঁধানো কয়েকটি তুলসি গাছ। মা প্রতিদিন তার গোড়ায় জল দিতো। তাজা থাকতো গাছগুলো। সে যখন এখানে প্রথম দিনে এসে তুলসি গাছগুলো দেখলো তখন গাছগুলোর মর মর দশা। জল দিতে দিতে এখন সেগুলো বেশ তরতাজা হয়েছে। তুলসি আর জবা গাছটি দেখলেই বাসন্তীর মায়ের কথা মনে হয়। সকালবেলা মাকে তুলসি তলায় যেন এখনো সে দেখতে পাচ্ছে। আম জাম কাঁঠাল লিচু— মিলিয়ে বাসায় প্রায় সবই আছে। আর সবকিছুর সাথে মিলিয়ে যেন সামনে আছে মস্ত বড় একটা দীঘি। এটা শহর তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আবাসিক এলাকা একদম গ্রামের মতো। বাসন্তীর খুব ভালো লাগে। খাক না ক’টা মশা। সাপটাপ সে তো কখনো দেখেনি। বাবা বলতো, কোন প্রাণীই মানুষকে সহজে আক্রমণ করে না, সাপও করে না। আমরাই তো ওদের পৃথিবীটাকে দখল করে আছি, ওদের প্রতিদিন জ্বালাতন করছি। সত্যি তো এতো বড়ো ক্যাম্পাসে কেউ তো সাপের কামড়ে মারা যায়নি কোনদিন। ইস যদি বাবা থাকতো। বাবাকে সে এই বাসায় নিয়ে আসতো জোর করে। কারণ বাবা হয়তো সহজে মেয়ের বাসায় আসতে চাইতো না। সে বাবাকে বলতো দেখো, তোমার স্বপ্নের মতো বাসায় থাকি। কি সুন্দর বাসা। বাবা হয়তো বলতো তোদের এখানে কী ঠাকুরঘর আছে? নিয়মিত তুই কী বাড়ির মতো রেওয়াজ করতে পারিস সকালবেলা? যদিও বাসাটি তাদের নিজের বাসা নয় তবু নিজের মনে হয়। তারা ইচ্ছে করলে সঞ্জীবের চাকরির শেষ পর্যন্ত এখানে থাকতে পারবে। ক্যাম্পাসের এই বাসায় তারা এখন বেশ নিরাপদ বোধ করে। আগে যখন কাজলায় থাকতো তখন ভয়ে বুক কাঁপতো মাঝে মাঝে। কী জোরে জোরে মিছিল হতো, ককটেল ফুটতো, টিয়ার গ্যাস আসতো ঝাঁঝালো গন্ধসহ। বাসন্তী ভাবতো এবার বোধ হয় তাদের ওপর আক্রমণ হবে। সারা বাংলাদেশে সে সেময় তারা প্রচণ্ডভাবে মার খেয়েছে। মন্দির ভাঙা হচ্ছে, ঘরবাড়ি লুটপাট করা হচ্ছে, আগুন জ্বালানো হচ্ছে দোকানপাটে। সরকার দুঃখ প্রকাশ করছে এবং বলছে এই দেশ অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল উদাহরণ। টিভিতে যখন প্রধানমন্ত্রী ও তার কয়েকজন পরিষদ বেশ গুছিয়ে বলতে থাকে তখন বাসন্তীর খানিকটা হাসি পায়, কারণ ভোটের পর হিন্দু পরিবারের সদস্যদের যেভাবে মারা হয়েছে, তাদের ঘর বাড়িতে যেভাবে আগুন দেয়া হয়েছে কিংবা যেভাবে তাদের মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে তাতে মন্ত্রীদের বক্তব্য রীতিমত প্রহসন। ছোট মেয়েটা যদি কথা শুনতে বা বুঝতে পারতো তবে সে তাকে বলতো। সঞ্জীব বাড়ি আসবে সেই বিকেলে কিংবা সন্ধ্যায় ততক্ষণে তার আর বলার মতো কিছু হয়তো মনে থাকবে না। সেভাবে এই দেশে তার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। বাবা-মা গত হয়েছেন অনেক আগেই। একমাত্র ভাই ভারতে পড়তে গিয়ে ওখানেই থেকে গেছে, ভালো চাকরি করে বিয়ে করেছে। বয়সে ওর মাত্র দু’ বছরের ছোট। বিয়ের সময় ও ছিলো, তারপর আর ওর সাথে দেখা নেই । সঞ্জীবেরও এপারে কেউ নেই। ভাই-বোনেরা তাকে অনেবার বলেছে কলকাতায় চলে যেতে, সে যায়নি, সে যেতে পারিনি। সে আসলে যেতে পারে না। কেন সে যেতে পারিনি সে ব্যাখ্যা অনেকবার বলেছে সে বাসন্তীকে তবে বাসন্তীর সে ব্যাখ্যার সবটা পছন্দ হয়নি। সঞ্জীব বিস্তারিত করে বলেছে তার মনের কথা বাসন্তীকে— ধরো আমাদের কষ্ট হচ্ছে, সেরকম কষ্ট কী মুসলমানদের নেই? তারাও খুন হচ্ছে, গুম হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে, সম্পত্তি হারাচ্ছে। তাহলে তারা দেশ ছেড়ে কোথাও কি যাচ্ছে? আমরা না হয় ভাই-বোনের কাছে গেলাম বা সেখানে গেলে একটা আস্তানা পাবার সম্ভাবনা আছে, তো ওদের কী হবে। ওরা কোথায় যাবে? আর আসল কথা আমার জন্মভূমি ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না । কখ্খনো যাবো না। যে বাতাস আমাকে অক্সিজেন দেয়, যে গাছ আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, যে মাতৃভূমি আমাকে দেশের চেতনা দিয়েছে, ভালোবাসতে শিখিয়েছে, সেই দেশ ছেড়ে, সেসব ছেড়ে আমি কখনোই যাবো না। আমরা ভালো নেই বলে ভারতে যাবো, ভারতের মুসলমানরাও তো ভালো নেই তারা কি এপারে আসছে। গুজরাটের ভয়াবহ দাঙ্গার পরেও কি একজন মুসলমান এপারে এসেছে? অথচ তাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা যে কত মারাত্মক তা তুমি সবটা জানো না। মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, গর্ভবতী মেয়েদের পেটের বাচ্চা বের করে টুকরো টুকরো করেছে। হাজার হাজার মুসলমান এখনো বস্তিতে অনাহারে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দিনাতিপাত করেছে। অথচ তাদের সবার অবস্থা ভালো ছিলো। সঞ্জীবের কথা শুনে ওর মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে বাসন্তী। সে বলে, তুমি তো মুসলমানদের মতো কথা বলছো। সঞ্জীব বলে, আমি মানুষের মতো কথা বলছি, হিন্দু-মুসলিমকে আলাদা করে কখনো ভাবতে আমি শিখিনি। বাসন্তী বলে, তুমি কী মনে করো এদেশে আমাদের কোন সমস্যা নেই? আড়ালে-আবডালে মুসলমানরা আমাদের সম্পর্কে কী ভাবে তুমি জানো? কী চোখে দেখে তুমি জানো? তারা বলে কমিউনাল, স্বার্থপর, এদেশে আছি কৌশল করে টাকা-পয়সা নিয়ে ভারতে চলে যাবার জন্য, গালিগালাজ তো করেই। সঞ্জীব খানিকটা বিমর্ষ ভাব নিয়ে বলে, জানি, আমরাও কী তাদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করি? নিজেরা আলোচনা করার সময় আমরাও তাদের যাচ্ছেতাই বলি। ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবদানের কথা কী আমরা মনে রেখেছি? গুটিকতক প্রতিক্রিয়াশীল খারাপ লোকের জন্য গোটা সমাজকে তো দায়ী করতে পারি না। বাসন্তী আর কথা বাড়ায়নি। জানে যে সে ওর সাথে যুক্তি-তর্কে পারবে না। আর সে সব কিছু দেখে মমতা দিয়ে মানবতা দিয়ে। তবে এটাও ঠিক যে বাসন্তীও কখনো ভাবিনি যে সব ছেড়ে-ছুঁড়ে একদিন তারা ওপারে চলে যাবে। তার বাবা-মাও কখনো ভাবিনি ভারতে যাবে, বেড়াতে গেছে দু’-একবার। ছেলে পড়তে যাবার পরও বাবা-মা বেঁচে ছিলেন কয়েকবছর। দুজন মারা গেল কয়েক মাসের ব্যবধানে। বাসন্তী ঠিক জানতো না মার কোন অসুখ ছিলো কিনা। বাবার ছিলো তা সে জানতো। আর বাবা-মা মারা যাবার সংবাদ শুনে যখন সুবোধ বাড়ি ফিরলো তখন সঞ্জীব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো নিজে নিজে। এক গ্রামের ছেলে একই স্কুল-কলেজে পড়েছে তবু তেমন জানা শোনা ছিলো না। দূর থেকে দেখেছে বাসন্তী। ভালো ছেলে, ক্লাসের ফার্স্ট বয়। একটা সমীহ করা ভাব ছিলো, ভালো লাগতো তবে কোনদিন কথা বলা হয়নি। পাস করার পরেই সে নিজের বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়। সেটা তার সৌভাগ্য। কারণ সে সময় তাদের সমর্থিত দল ক্ষমতায় ছিলো। না হলে বসে থাকতো হতো পাঁচ বছর। যা হোক, বাসন্তীকে বিয়ে করার জন্য সে নিজে সুবোধকে বললে সুবোধ কাকাদের বলে। কাকারা সবকিছু শুনে রাজি হয়ে গেলে পনের দিনের মাথায় তাদের বিয়ে হয়ে যায়। তখন বাসন্তীর পড়া শেষ হয়নি। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সে পড়তো বলে ওর লেখাপড়া ছেদ ঘটেনি।
বাড়ি ফিরলে হাসানকে রীতিমতো আক্রমণ করে বসলো আফরোজা। সে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো। হাসান ঠাণ্ডা মাথায় দৈনিকের পাতা উল্টাচ্ছিল। সোফায় তার মুখোমুখি বসে আফরোজা উত্তেজিত হয়ে প্রথমে বলল, তুমি কী মনে করো আজ যা করলে সেটা করে তুমি খুব বাহাদুরি করেছ? আমার ছোট ছেলেটারও মাথা খেলে। এদেশে হিন্দুদের ভালো রাখার যাবতীয় দায়িত্ব কী তোমার একার? তুমি কী সোল এজেন্সি নিয়েছ? হাসান চোখ তোলে আফরোজার দিকে। তার সুন্দরী পরীর মতো বউকে এখন তার কাছে ডাইনি মনে হচ্ছে, কুিসত মনে হচ্ছে; বিশেষ করে তার তাকানো দেখে। সে বলল, একজন হিন্দু মানুষকে যেভাবে সম্বোধন করতে হয় সেভাবেই করেছি। এটাই ভদ্রতা, এটাই সৌজন্য। এটুকু যদি না করি তাহলে আমার লেখাপড়া করার কী দরকার ছিলো? আমিও যদি গোমূর্খের মতো, প্রতিক্রিয়াশীল-ধর্মান্ধের মতো আচরণ করি তাহলে আমার এতো লেখাপড়ার কী দরকার ছিলো? এগুলো তো আমার ছেলেরও শেখা দরকার? প্রতিটি সমাজের বিভিন্ন ধর্মের ও গোত্রের লোক বাস করে, তাদের আলাদা আলাদা কিছু রীতিনীতি-আচার থাকে, তাকে আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত। আফরোজা বলে, দেখো আমাকে ঔচিত্যবোধ শেখাতে এসো না, আর আমি তোমার ছাত্রী নই। তুমি তাকে বা অন্য হিন্দুদের মতো সালাম দেবে, এদেশে পঁচানব্বই ভাগেরও বেশি মানুষ যেভাবে সম্বোধন করে সেভাবে তুমিও করবে, তুমি বড়ো পণ্ডিত হয়েছো, না? আমার এসব মোটেও ভালো লাগে না। হাসান একটু সময় নেয় জবাব দিতে। সে খানিকটা অবাক হয় আফেরোজা কথাবার্তায়। সে কেন এত প্রতিক্রিয়াশীলদের মতে আচরণ করছে। তাকে সে ভালো জানতো। সে কথা হালকা করার জন্য বলে, আমি তো পণ্ডিতই, তুমি জানো না। আর সবাই যা বলবে, যা করবে পণ্ডিতরা তো তা করবে না। আমি কাজ করবো আমার মতো আমার নিজস্ব স্টাইলে। তাছাড়া তোমার কথার মধ্যে তো কোন যুক্তি নেই। আফরোজা বলে, মস্করা আমার সাথে করবে না। তুমি কত বড় পণ্ডিত সেটা আমার কাছে বোঝাতে এসো না। আমি বাস্তবতায় বিশ্বাস করি আবেগকে নয়। আমার ছেলেটাকে নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। সে তোমার মতো বুদ্ধু হলে আমার মোটেও ভালো লাগবে না। হাসান বুঝতে পারে কোন কারণে আফরোজা খানিকটা উত্তেজিত, হয়তো কারো কাছে কিছু শুনেছে। সে বলতে থাকে, শোন ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে রাগ করো না। আমি সারা জীবন আমার পরিচিত হিন্দু বন্ধুদের নমস্কার বলে সম্বোধন করি। তাদেরকে সম্মান করি, তারা কিছুটা স্বস্তি পায় এই ভেবে যে তাদের হূদয়কে কেউ কেউ বুঝে। তুমি ভেবে দেখ সবাই তো তাদের আসসালামু আলাইকুম বলে। তারাও ওআাালাইকুম সালাম বলে। তাদের কষ্ট হয় মনে মনে, উচ্চারণ করতেও কষ্ট হয় তবু তারা বলে। তারা কিন্তু প্রকাশ্যে কখনো প্রতিবাদ করেনি। রেডিও টিভি ক্লাসে সবখানে তারা মুসলমানদের মতো সালাম-কালাম দিচ্ছে, জবাব দিচ্ছে। তাদের কষ্ট বুঝার চেষ্টা করেছ কখনো? আফরোজা বলে, তোমার দায়িত্ব তুমি বুঝ। আমার বুঝার দরকার নেই। সব হিন্দু সুবিধাবাদী, অল্প সংখ্যক হয়ে দেখ তারা কত সুবিধা পাচ্ছে। সুবিধামতো সময়ে টাকা-পয়সা নিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে। এদেশকে নিয়ে তাদের কোন দরদ নেই। হাসান কোন জবাব দেয় না। হাসান পত্রিকার যে খবরটা মনোযাগে দিয়ে পড়ছিলো সেটা আফরোজার চোখের সামনে তুলে ধরে বলে, পড়ো। আফরোজা দেখে খানিকটা চমকে ওঠে। ছবিসহ একটি খবর ছাপা হয়েছে লাল কালি দিয়ে। একটি হিন্দু স্কুল ছাত্রী মায়ের সামনে গণধর্ষিতা হয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি লিখেছে, মেয়ের মা যুবকদের বলছে, আমার মেয়েটা অনেক ছোট তোমরা একটু দেরি করে একজন করে তার কাছে যাও। হাউমাউ করে আহাজারি করছে মা। সেই ছবি ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। আফরোজা হয়তো বলতে পারতো ধষর্ণ কী মুসলিম মেয়েরা হচ্ছে না, ধর্ষকের আবার ধর্ম কী। সে বলতে পারে না। কোথায় যেন সে আটকে যায়, তর্ক করতে চায় না। মেয়েটার মায়ের করুণ আহাজারি তাকে আহত করে। হাসান বলে, এদেশে হিন্দু-মুসলমানরা সারা জীবন সুখে-শান্তিতে পাশাপাশি বাস করেছে। তখন প্রায় সবাই মূর্খ ছিলো তবু সাম্প্রদায়িকতা চোখে পড়েনি কোনদিন, এসব শিক্ষিত লোকের আমদানি আরো ভালো করে বললে রাজনীতিবিদেরা তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এগুলো শুরু করেছিল। তাদের হয়তো কিছু লাভ হয়েছিল তবে দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে তাদের জন্য। তাদের তৈরি লোকজনেরা এখন এসব নিয়ে সক্রিয়। কাজেই অহেতুক উত্তেজিত হইও না। ছেলেটা ছুটে এসে মা মা করে আফরোজার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লে সে ছেলেকে নিয়ে উঠে যায়।
বিকেলে নিয়মমতো বের হয় সঞ্জীব। আজ একটু ক্লাবে যেতে হবে। সনাতন হিন্দু সমিতির একটা মিটিং আছে। সামনে সরস্বতী পূজা কিভাবে করা হবে তা নিয়ে মিটিং। সঞ্জীব সাধারণত ধর্ম পালন করে না। তবে সবাই মিলে আচরণ পালন করতে সে আনন্দ পায়। সবাই এক জায়গায় হয়। ক্যাম্পাসে সব ধর্মের শিক্ষকরা আসেন, বেশ আনন্দ হয়।
বাড়ি বরাবর রাস্তা পার হয়ে ডানে মোড় নিতেই বিপরীত দিকে থেকে আসা পাড়ার মসজিদের ইমাম সাহেব খুব জোরে সহী উচ্চারণে আস্সালামু আলাইকুম, স্যার বলে ওকে সম্বোধন করে। আগে বেশ খারাপ লাগতো, এখন যেন কেমন গা সওয়া হয়ে গেছে। সে যদ্দুর পারে ওয়াআলাইকুমুস সালাম বলে। মাওলানা সাহেব সাইকেল থামায় না একটু স্লো করে ডান হাত উঁচু করে চলে যায়। এই হুজুরকে সঞ্জীবের খুব খারাপ লাগে না। বহুদিন থেকে তাকে চেনে। পাড়ার মসজিদে ওয়াক্তিয় নামাজ পড়ায়। ছেলেটা পড়ে ফাইন আর্টসে, মেয়েটা সায়েন্সের একটা সাবজেক্টে পড়া শেষ করে চাকরির চেষ্টা করেছে। একদিন তার সাথে সঞ্জীবের বিস্তারিত আলাপ হয়ে ছিল হাঁটতে হাঁটতে। ছেলে-মেয়েদের কেন বাংলা লাইনে পড়ালেন প্রশ্ন করলে, তিনি বলেছেন, ওদের যা ইচ্ছে ওরা তাই পড়ছে। আমি কোরান শরীফটা ভালোভাবে পড়িয়েছি। আপনারা দোয়া করেন, ওরা যেন ভালো কিছু করতে পারে। সঞ্জীব বলেছিল, অবশ্যই দোয়া করি। অবশ্য পরে তার মনে হয়েছিল, দোয়া কী করে করবে সে তো জানে না। সে তো কখনো প্রার্থনাও তেমন করে না। কিন্তু মওলানার ছেলে-মেয়ের প্রতি তার একটা করুণার উদ্রেক হয়েছিল। সেটাই হয়তো দোয়া।
ক্লাবে গিয়ে দেখে একটি ছোট সোফায় বসে হাসান চা খাচ্ছে। ও এগিয়ে গিয়ে পাশে বসতেই। হাসান হাতে হাত মিলায়। বলে, কেমন আছেন, চা তো চলবে নিশ্চয়? সে কলিং বেল চাপলেই, তাকে যে চা দিয়েছিল সেই ছেলেটা আসে। তাকে বলে, স্যারকে চা দাও। ক্লাবে তেমন কেউ এখনো আসেনি। হাসান বলে, আর কিছু খাবেন? সঞ্জীব বলে, না। হাসান বলে, ক্লাবে কী মনে করে, দেখি না তো তেমন? সঞ্জীব বলে, সরস্বতী পূজা নিয়ে সবাই বসবে এখানে। এতদিন দীপঙ্কর স্যার সব একাই করতেন। তিনিই আমাদের জন্য মন্দিরের একটা জায়গা নিতে পেরেছিলেন ভিসি স্যারকে বলে। এতদিনে হয়তো পাকা একটি মন্দিরও হয়ে যেতো। স্যার থাকলে আমাদের আর চিন্তা করতে হতো না। হাসান বলে, স্যারের চলে যাওয়াটা আমার পছন্দ হয়নি। এতবড় একজন পণ্ডিত মানুষ, বাংলাদেশে তার কত সুনাম ছিলো, বিদেশে তো ছিলই। সেই মানুষটা রাতের আঁধারে আমাদের কাউকে কিছু না বলে চলে গেলেন। আপনি কি জানেন স্যারের সাথে আমার কোলকাতায় দেখা হয়েছিল, আমি গিয়েছিলাম একটা সেমিনারে। নিউমার্কেটের কাছে হাঁটতে হাঁটতে দেখি স্যার একটা ময়লা শার্ট পরে হেঁটে যাচ্ছেন। আমাকে হয়তো দেখেছিলেন, তবে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন বলে মনে হয়। আমি স্যারের হাঁটা দেখে চিনতে পারি। একটু দ্রুত হেঁটে স্যারের কাছে গিয়ে নমস্কার দিয়ে বলেছিলাম, স্যার কেমন আছেন? তিনি আমার দিকে তাকালেন, কী বিষণ্ন মুখ, সাদা শার্টটি চেনা যাচ্ছে না তার রং আগে কি ছিলো। তিনি বললেন, ভালো। এমন আস্তে, আর ম্রিয়মাণ ভঙ্গিতে বললেন যে আমার কান্না পেল। আমি বললাম, আপনার এই অবস্থা কেন? তিনি বললেন, ভালো তো। তুমি আমার বাসায় এসো কথা হবে। একটা ঠিকানা বললেন, উত্তর কোলকাতার একটি যায়গা, আমি চিনি না। তবে তিনি যে আমাকে এড়াতে চান সেটা বুঝা যায়। চলে গেলেন স্যার। আমি তাকিয়ে থাকলাম তার পথের দিকে। হাসান থামলে, সঞ্জীব বলে, আমি জানি স্যার গেছেন, তবে কোথায় গেছেন জানি না। আসলে স্যারের কী সমস্যা ছিলো সে তো আমরা জানতাম না। শুনেছি তিনি সমস্ত সম্পত্তি বিক্রির টাকা ও পেনশনের যাবতীয় টাকা তার এক আত্মীয়কে দিয়েছিলেন। তারা তাকে বঞ্চিত করেছে। টাকা দাবি করলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা প্রফেসর, স্কলারের এই সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারি না। এটা কোন হয় বলতে পারেন? হাসান বলে, তিনি তো আমার স্যার ছিলেন, আমি তার সম্পর্কে সব জানি। তাকে নিষেধ করার মতো ধৃষ্টতা আমার ছিলো না। তিনি মনে করতেন, আমরা জানি না। অন্যদের বিশেষ করে তার বন্ধুদের দিয়ে আমি তাকে বলেছিলাম, যাতে তিনি না যান। শেষ পর্যন্ত তিনি গেলেন এটাকে কী বলবো এটা আসলে মাইনোরিটি কমপ্লেক্সিটি। আমাদের অবস্থান থেকে তার যন্ত্রণা বুঝা মুশকিল।
সঞ্জীব আর কী বলবে বুঝে পায় না। সে খানিকটা হতচকিত হয় হাসানের কথা শুনে। সে তো নিজেই মাইনোরিটি গ্রুপের মানুষ। তবে তার মধ্যে এসব কথা কখনো সে বাড়তে দিইনি। জানে না শেষ পর্যন্ত কতদূর পারবে। ক্লাবের মিটিং শেষে সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে পা বাড়াতে থাকে। বার বার দীপঙ্কর স্যারের কথা মনে হতে থাকে। মিটিং-এ সে মনযোগ দিতে পারেনি। কারণ তার মাথার মধ্যে হাসানের কথাগুলো বাজতে থাকে। তাদের মিটিং-এ অনেক কথাবার্তা তার পছন্দ হয়নি। কিছুদিন পরেই শুরু হবে পূজা, কে-কত চাঁদা দেবে, কোন জায়গা থেকে কোন আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যায় কিনা সেসব নিয়ে কথা হয়েছে। তাকে উদযাপন কমিটির সচিব করা হয়েছে। সে যদিও রাজি ছিলো না। একটা আমন্ত্রণপত্র ছাপানোর জন্য খসড়া করা হয়েছে তাতে তার দস্তখত থাকবে। একটি পোস্টারও ছাপা হবে দু’-একদিনের মধ্যে। ভাবতে ভাবতেই সে বাড়ি পৌঁছুলে মেয়ে তাকে বারন্দা থেকেই লাফিয়ে ঘাড়ে চড়ে বসে। সে অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষায় ছিলো নিশ্চয়। মা আছে ওর পেছনে। মেয়েকে দেখে তার বিষণ্নতা কাটে খানিকটা। অনেকবার এমন হয়েছে যে মেয়ে তাকে বাধ্য করেছে হাসিমুখী হতে। ভেতরের কষ্ট নিয়ে সে হেসেছে। একবার ভাবে তাকে খুলে বলবে, পরে ভাবে ছোট মানুষ তাকে এসব বলা ঠিক না। এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে? আমার কথা মনে পড়ে না কেন? ইত্যাদি নানা প্রশ্নে করে তাকে জর্জরিত করে ফেলে স্নিগ্ধা। সে কোন জবাব দেয় না। মেয়েকে ঘাড়ে করে ঘরে ঢোকে। তবে গান করে না বলে মেয়ে অভিযোগ করে।
বিকেলে সঞ্জীব সেদিন হন্তদন্ত হয়ে বের হয় কার যেন ফোন পেয়ে। কারা যেন ক্যাম্পাসের ঠাকুর ভেঙ্গে ফেলেছে। কমিটির সচিব হিসেবে তার যাওয়া উচিত সেখানে। সে ছোটে দ্রুত। বাসন্তীকে কিছু বলে না। পৌঁছে দেখে পুকুর পাড়ে অনেক লোকজন। প্রশাসনের লোকজন, পুলিশ, প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা সবাই হাজির। হাসানকেও দেখল সে। একটা থমথমে ভাব। সারাদেশে বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিমা ভাঙ্গা হলেও ক্যাম্পাসে কখনো কেউ ভাঙ্গেনি কেউ। সবাইকে উদ্বিঘ্ন দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন ফটোসাংবাদিককে দেখা যাচ্ছে। একজন তার দিকে দৌড়ে এল। এসেই বলল, স্যার, আপনার প্রতিক্রিয়া কি? সে অপ্রস্তুত ছিলো, বলে, আমি কোন কথা বলতে চাই না। বলুন স্যার। নাছোড় সাংবাদিককে এড়াতে পারে না সে। সে বলে, এটা অনভিপ্রেত, অমানবিক, আমার ধারণা প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপ এর জন্য দায়ী। সে আর কোন কথা বলে না। সাংবাদিক অন্যদিকে চলে যায়। প্রশাসনের লোকজন নানা কথা বলে। প্রচুর আশ্বাসের বাণী দেয়। সঞ্জীব শোনে মনযোগ দিয়ে। এক পর্যায়ে ভিসি সাহেব এসে তাকে সহানুভূতি জানায়। সে কিছু বলে না। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে যে-যার মতো চলে যায়।
সঞ্জীব বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে একা একা। কে-কোন দিকে গেছে সে খেয়াল করেনি। ওর বাড়ির রাস্তায় উঠতে দেখে রাস্তায় কোন বাতি নেই। পুরো রাস্তা অন্ধকার। মোবাইলের চার্জ নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। সে আজকের ঘটনা নিয়ে ভাবতে থাকে। খানিক পরে লক্ষ্য করে সামনের দিক থেকে সাইকেলে করে একজন আসছে। আবার শোনে পিছন দিকে বেল বাজছে সাইকেলের। এক মিনিটের মধ্যে ঘটনা ঘটে। দুজন যুবক তাকে ক্রিকেটের ব্যাট দিয়ে সমানে পেটাতে থাকে। রাস্তায় পড়ে যায় সে। অজ্ঞান হবার আগে সে শুনতে পায়, শালা মালাউন, শুয়োরের বাচ্চা, খুব বাড় বেড়েছে, না। এখন মজা দেখ, যা চলে তোর বাবার দেশে।
নিজের বিছানায় যখন সঞ্জীবের জ্ঞান ফেরে তখন দেখে স্নিগ্ধা ও বাসন্তী তার শিহরে বসে আছে। আর কেউ নেই। হয়তো অনেকে এসেছিলো, চলে গেছে সবাই। বাসন্তী তার মুখে ঘাড়ে তুলসি পাতা বেটে দিচ্ছে। তুলসির কোন ঔষধি গুণ আছে কিনা সে জানে না। হয় তো বাসন্তী জানে। অথবা সে অনন্যোপায় হয়ে করছে। বাসন্তীর মুখ বিষণ্ন। স্নিগ্ধার মুখটা সে দেখতে পাচ্ছে না। সে চোখ বুজে। তাকাতে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারে। সে চোখ বুজে। খানিক পরে দেখতে পায় দীপঙ্কর স্যারকে, সেই পাশুটে রঙের সাদা শার্ট। ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন পার্ক স্ট্রীটের দিকে। মুখটা মলিন, তিন দিনের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি মুখে। তাকে কি দেখতে পাচ্ছেন স্যার? তার মনে হয় পাচ্ছে। সে চোখ বুজেই স্যার এর কড়া আর বিধ্বস্ত মুখটা দেখে ভয় পায়। কেন ভয় পায় তা সে বুঝাতে পারবে না কাউকে।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৪
ফজর৪:১০
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৭
এশা৭:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:২৯সূর্যাস্ত - ০৬:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :