The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

কিশোর গল্প

ন্যাড়ারলোচনকাকু

কাইজার চৌধুরী

বেশ ক’দিন হলো, ন্যাড়ার কাছ থেকে কোনো গল্প বাগাতে পারিনি আমি। গল্প বাগানোর মতন দুরূহ কম্ম—অনেকটা বাগান সাজানোর মতনই—দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই—খুব জানি আমি। গল্প লেখার চাইতেও ভারি শক্ত কাণ্ড একখানা—এই গল্প বাগানোর কম্মটি। এই যেমন দ্যাখো, কল-কারখানা কেমন তরতরিয়ে বানিয়ে ফেলে মানুষজন—কিন্তু কল-কারখানা বানানোর আগে এই সকল মানুষজনকে ধার-দেনা করার জন্যে ব্যাংকে ব্যাংকে হাজিরা দিতে হয় না কি? খুব হয়! কিন্তু ব্যাজারমুখো ব্যাংকের ম্যানেজারগুলো তোমাকে অনায়াসে ধার-দেনা দিতে গেলে তো! টাকা-কড়ি ধার-টার দেওয়ার ধারে কাছে ওরা নেই, এমনই কাণ্ড-কারখানা করে বেড়ায় ওরা।
স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে কি অবসরে আমার পড়ার ঘরে ন্যাড়াকে তাগাদা দিয়েও কোনো ফল পাইনি।... ‘তোর গল্পের স্টক কি ফুরিয়ে গেল? ফুরিয়ে গেছিস নাকি তুই?’ কিংবা, ‘তুই কি চাস এই কাঁচা বয়সে আমার সাহিত্য-জীবন কেঁচে যাক, তোর মতন আমিও লেখাজোখায় ইস্তফা দিই? সেটাই কি চাস তুই?’ কিংবা, ‘অবসরে গেলি নাকি হঠাত্? রিটায়ার করলি শেষকালে? গল্প বলা থেকে রিটায়ার করার এই কি বয়স হলো তোর?’—এমনতর উসকানিমূলক মন্তব্য আমি ন্যাড়াকে শুনিয়ে আসছি বেশ ক’দিন ধরে, কিন্তু ন্যাড়া তথাপি নট নড়ন-চড়ন। আমার শত তরফদারি সত্ত্বেও ন্যাড়ার তরফে কেবলই অবস-অবস ভাব।
তবে বরফ গলল গেল হপ্তায়।
আমার পড়ার ঘরে নিজ হাতে চিঁড়েভাজা—সাথে অরেঞ্জ স্কোয়াশসহ ফুলকপির শিঙাড়া—পরিবেশন করতে করতে ন্যাড়াকে বলেছি, আজ তোর কাছ থেকে একটা গল্প না শুনে ছাড়ছি না আমি।
তাই বুঝি? —ন্যাড়া চিঁড়েভাজা কুড়মুড়িয়ে মুখস্থ করতে করতে বলল।
হুম, তাই! —আমি নাছোড়বান্দা।
ন্যাড়া আমার হুমকিতে এতটুকু বিচলিত হলো না। বরং ফুরফুরে মেজাজেই বলল, গল্পের স্টক যে নেই আমার—ফুরিয়ে গ্যাছে! আমি ফুরিয়ে গেছি—এ কথাগুলোই তো বললি সেদিন তুই আমাকে—নিজ মুখেই তো বলেছিলি। তা, কথাগুলো বিলকুল ঠিক ঠিক, কোনো গল্পও নেই এতে।
ক’দিন আগে আক্ষেপ ঝরানো কথাগুলো ন্যাড়াকে শোনানোর জন্যে মনে মনে পস্তাতে থাকি। তবুও মরিয়া হয়ে গুলতি-গতিতে ঝাপটা মারি, আহ, আমার কথার উল্টো মানে ধরতে যাচ্ছিস কেন?—একটু খুঁজেই দ্যাখ না বাপু, তোর গল্পের গুদামের আনাচে-কানাচে উঁকি মেরে দ্যাখ্ই না একবার।
হ, ছোটলু ঠিকই কইসে। —পিচ্চি পাশ থেকে একটা শিঙাড়া সমারোহে গলদেশে পাচার করতে করতে বলে ওঠে—অনেকটা চীনাবাদামের লাহান; ঠোঙাভর্তি চীনাবাদাম শ্যাষ কইরাও দেখবি, একটা-দুইটা চীনাবাদাম খালি খোসাগুলার মইধ্যে ঘাপটি মাইরা আছে।
পিচ্চি দারুণ দামি একটা খাদ্য-সংশ্লিষ্ট উপমা ঝাড়তেই আমার উত্সাহ বাড়ে। বাদামভোজের অভিজ্ঞতা আমারও কম নয়; আহারপর্ব শেষে প্রায়ই আধখানা চীনেবাদাম উপেক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি আমি।
ওই আধখানা চীনেবাদামের কথা স্মরণে আসতেই ন্যাড়ার শরণ নিই ফের। —না হয় আধখানা গল্পই শুনিয়ে গেলি! বাকি আধখানা আমি কষ্টে-সৃষ্টে ম্যানেজ করে নেব।
আ-ধ-খা-না গ-ল্-প—-? —ন্যাড়ার কণ্ঠ হঠাত্ মিইয়ে পড়ে, বলতে গেলে উদাসই হয়ে যায় সে।
আমি বলি, হুম।
হ, কইয়া ফালা। অর্ধেক গল্পটাই কইয়া ফালা। কথায় কয়, নাই মামার থাইক্যা কানা মামা ভালো। —পিচ্চি আমার মনের কথাটা ন্যাড়ার কানে পৌঁছে দ্যায়।
ম্ ম্ ম্ ম্ ...। ন্যাড়া গুনগুন করে গেল কতক্ষণ। একমুঠ চিঁড়ে ভাজা মুখে পুরলো—গল্প শুরুর পূর্বাভাষ; এতক্ষণে চিঁড়ে ভিজল বুঝি! আমি আহ্লাদে আটখানা নয়, আধখানা হয়ে ন্যাড়ার দিকে উত্সুক চোখে তাকাই।
তা বলা যেতে পারে বটে; বলতে পারি আমি—আমার লোচনকাকুর গল্পটাই আধখানা শোনাতে পারি— আধখানা যমজের গল্প যখন! —ন্যাড়া ভূমিকা সারে।
আধখানা যমজ মানে?
ওই ডলু-বেলুর কাহিনি আরকি!
এই না বললি লোচনকাকুর কথা? এই ডলু-বেলু আবার এলো কোত্থেকে? —প্রশ্নটা করেই জিভ কাটি। জমাটি গল্পের শুরুতেই বাগড়া জমা দিলাম না কি?
ন্যাড়া কিন্তু আমার বাগড়ায় এতটুকু তম্বিতম্বা করল না, ঝগড়াও বাঁধালো না।
আড়চোখে আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল, লোচনকাকু তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। মানে, নাইনে সবে উঠেছে। নতুন ক্লাসে ঠাঁই নিতে না নিতেই সংসার-ভাবনায় পেয়ে বসল ওকে। মানে, ক’বছর বাদে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পেরুনোর পর কোন পেশাটা বেছে নেবে ও, সে ভাবনাটাই ভাবিত করে তুলল লোচনকাকুকে। প্রচুর বাছ-বিচারের পর শিক্ষকতার—তাও আবার স্কুল মাস্টারির পেশাটাই পছন্দ হয়ে গেল। খাসা একখানা পেশা! স্কুলেতে আসো—তা সাত সকালে না আসলেও চলবে—ভরদুপুরে টিফিন পিরিয়ডের পর হলে আরো ভালো—ক্লাসে লেট করে এলেও বকুনির বালাই নেই। দিনে একটা কি বড়জোর দুটো ক্লাস। তোফা আরামের চাকরি একখানা!
তবে চাকরি করতে হলে যে অভিজ্ঞতার পরিচর্যা করাটা দস্তুর—পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকাটা যে অপরিহার্য—সেটা লোচনকাকু দৈনিক পত্রিকার নিয়োগ জাতীয় বিজ্ঞপ্তিগুলো পড়ে পড়ে মালুম করেছে। তবুও লোচনকাকুর একরোখামি রুখতে যাবে কে! পার্ট-টাইম মাস্টারি চাকরির সন্ধানে লোচনকাকু খবরের কাগজের পাতাগুলোতে সকাল-সন্ধ্যা চোখের পাতা বুলোতে থাকে, বুলোতেই থাকে।
দিন যায়। মাস কাটে। বছরের শেষাশেষি খোঁজাখুঁজির পালা শেষ হলো।
খবরের কাগজের পাতায় নয়, পাড়ার মুদির দোকানের পাশে লাইটপোস্টের মধ্যিখানে ঝোলানো বিজ্ঞপ্তিটি নজর কাড়ে একদিন লোচনকাকুর। হস্তাক্ষরে কালো কালিতে কে যেন লিখে রেখেছে—‘ক্লাস এইটের ছাত্রকে পড়ানোর জন্য উপযুক্ত শিক্ষক চাই। অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নাই। সত্ত্বর যোগাযোগ করুন...।
একে তো ক্লাস নাইনের লোচনকাকুর জন্যে ক্লাস এইটের ছাত্র, তায় আবার অভিজ্ঞতা নিষ্প্রয়োজন—এ যে মণিকাঞ্চনযোগ!
লোচনকাকু আত্মহারা হয়ে মুদির কাছ থেকে বাড়ির জন্যে একটা ডিম আর দাদার জন্যে এক হালি ব্লেড বাকিতে কিনে চটজলদি বাড়ি ফিরে সামানগুলো হতভম্ভ বড়চাচীর হাতে গছিয়ে দিয়ে ত্বরিতে হবু ছাত্রের বাড়িতে গিয়ে হাজির।
কড়া নাড়তেই দরজা খুলে যে লোকটি দ্যাখা দিল, তার বয়স লোচনকাকুর আন্দাজে পঁচিশ থেকে চল্লিশের ভেতর।
কী চাই? —বলে লোকটি।
লোচনকাকু তখন হাঁপাচ্ছে। অনেকটা পথ দৌড়ে হেঁটে এসেছে কিনা!
বলল, লাহাইটপোহোস্ট... বিহিজ্ঞপ্তি ... ক্লাস এহেইট...। এহ্ হে... ওফ ফো... এহ্ হে (হাঁপানোর শব্দ)।
ও! পড়াতে এসেছ বুঝি! —লোচনকাকুর আগাপাস্তলা দেখেশুনে লোকটি বলল। লোচনকাকু ঘাড় ওপর নিচ করে গেল।
আরো কতক্ষণ লোচনকাকুকে নিরীক্ষা করে লোকটি বলল, হুম্ম্! এসো, ভেতরে এসো। বাবাকে ডেকে দিচ্ছি, তার সাথেই কথাবার্তা সেরে নাও।
ভেতরে ঢুকেই একটা বৈঠকখানা বিশেষ।
ঘরেতে দু’খানা দরজা। তারই একটার চৌকাঠের কাছাকাছি গিয়ে গলা হাঁকড়ায় লোকটি। —বাবা আ আ আ! মাস্টার এসেছে এ এ এ! ... বলেই, পাশের দরজার পর্দা ঠেলে পর্দানশিন হলো।
পরমুহূর্তে অন্দরের দরজা দিয়ে যিনি ঘরেতে উদয় হলেন, তিনি বাবা বটে। বয়স পঞ্চাশ থেকে সত্তরের মধ্যে। মাথায় কাঁচা-পাকা চুলের পাকামো; পরনে শার্ট-লুঙ্গি।
বিগত লোকটির মতোই নবাগত বাবা লোচনকাকুর আপাদমস্তক পর্যালোচনা করে গেলেন খানিকক্ষণ।
তারপর বললেন, তুমি? ... মাস্টারি করতে এসেছ?
লোচনকাকু ঘাড় নাড়ে।
পারবে তো? —লোচনকাকুর প্যাঁকাটি-দেহের দিকে তাকিয়ে গলায় সন্দেহ ঢালেন বাবা। ভাবটা এমন, আমাদের বয়সী কোনো কিশোর-বালকের মাস্টার নয়, যেন কলেজ-পড়ুয়া ছাত্রদের ড্রিল মাস্টারের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন যেন।
তা পারব। পারব না কেন? গতবারই তো ক্লাস এইট পাস করেছি—ফার্স্টও হয়েছি—পড়াগুলো এখনও মুখস্থ বলতে গেলে। —লোচনকাকু মুখে বোল ফোটায়।
আগে যারা পড়াতে এসেছিল ওরাও তো সবাই ক্লাস এইট পাস করেছিল—কই, পারল কি ওরা ডলুকে পড়াতে? ডলুকে ক্লাস এইট পাস করাতে পারল কি ওরা? পারল না তো! —বাবা মুখ বাঁকায়।
ডলু? আপনার ছেলের নাম ডলু বুঝি?
হ্যাঁ, ডলুই ওর নাম। তবে আমার আরেক ছেলেও আছে—বেলু। বেলুকে অবশ্যি পড়াতে হবে না তোমাকে। ... তা, তুমি পারবে তো? —বাবা ফের মুখর হয়ে লোচনকাকুর মুখের দিকে তাঁর লোচনক্ষেপণ করেন।
পারব, নিশ্চয়ই পারব। একবার পরখ করেই দেখুন না। —দৃঢ়চিত্তে নিজেকে জাহির করে লোচনকাকু, যেন পাকা জহুরি খদ্দেরকে খাঁটি জহর দ্যাখাচ্ছে।
পরখ করার খাতিরে বাবা ফের কতক্ষণ লোচনকাকুর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অব্দি দৃষ্টি বুলিয়ে যান।
তারপর বলেন, হুম, ঠিক আছে।... তাহলে আজ থেকেই—আজ থেকে কেন? —বলি এখন থেকেই কাজে লেগে যাও না।
লহমায় চাকরিটা পেয়ে যেতেই লোচনকাকুর মনটা বেজায় চনমনে হয়ে ওঠে। তারপর হঠাত্ বৈষয়িক ব্যাপারটা মাথাচাড়া দিতেই বলে ফ্যালে, বেতন কত দেবেন?
বেতন? বেতন!! —আশ্চর্য হয়ে যান ভদ্রলোক। একটু রেগেও গেলেন বোধকরি—লোচনকাকু যেন নেহাত বেতমিজের মতন প্রশ্নটি করে বসেছে।
হ্যাঁ, বেতন। —লোচনকাকুর ঠান্ডা মেজাজ। —মাস মাস গল্পের বই কিনতে হবে না আমার? সিনেমা দেখতে হবে না? আইসক্রিম খেতে হবে না? বিনা বেতনে কাজ করে নাকি কেউ? এ যে বিনা টিকিটে রেলে চড়ার মতন অপরাধ!
বাবা চড়াও হন এবারে। —বিনা টিকিটে রেলে চড়তে বলছে কে তোমায়, অ্যাঁ? মাথায় এখনো মাস্টারির টিকি গজায়নি, আর তুমি চাইছ কিনা বেতন! চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলে বেতন কিসের, অ্যাঁ? ... তারপর একটুক নরম হয়ে বললেন, পাবে, বেতন অবশ্যই পাবে তুমি—তবে তার আগে তোমার কাজের নমুনা তো দেখি একটু! ডলুকে আগে পাস তো করাও! নাইনে উঠুক তো ডলু! তারপর নাহয় মাইনের কথাটি পেড়ো!
প্রস্তাবটা মন্দ ঠেকল না লোচনকাকুর কাছে।
নির্বিরোধ গলায় বলল, ডলু কোথায়? পড়ার ঘর—ওটি কোথায়?
লোচনকাকুর বশ্যতা স্বীকারে মনে মনে আপ্লুত হন বাবা। প্রকাশ্যে বলেন, পাশের ঘরে যাও, ওটাই পড়ার ঘর। ডলুকে ওখানেই পাবে।
লোচনকাকুকে অভ্যর্থনা জানিয়ে যুবক কিংবা তরুণ লোকটি যে ঘরটিতে ঢুকে পড়েছিল, সে ঘরটির দিকে বাবা চোখ-মুখের ইশারা করলেন।
এবং ঘরে ঢুকেই—।
সে লোকটিই একলাটি দৃশ্যমান! পড়ার টেবিলে টোকা মেরে তবলা বাজাচ্ছে একমনে।
লোচনকাকুকে দ্যাখা মাত্তর লোকটি খোশমেজাজে টেবিলে তবলা বাজাতে বাজাতেই বলল, কী? চাকরিটা হলো শেষে?
লোচনকাকু ঘরের চারকোনায় দৃষ্টিপাত করে বলে, ডলু কোথায়?
লোকটি যেন অবাক হলো। বলল, কেন, আবার কোথায়? এই ঘরেই তো! তোমার চোখের সামনেই বসে আছি, দেখতে পাচ্ছ না?
তুমি-ই-ই! মানে আপনি-ই-ই... আপনি...? লোচনকাকু ডবল অবাক হলো। দস্তুর পাল্টে সম্বোধনটাকে ‘তুমি’ থেকে আপনিতে গিয়ে ঠেকালো, পরম্পরা ভেঙে আপন মানুষকে পরই করে দিল এক নিমিষে; ছাত্র-শিক্ষকের পরস্পর সম্বোধনের ওলট-পালট দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো সে লগ্নে।
হ্যাঁ, আমিই ডলু। আমাকেই পড়াতে হবে তোমাকে। তা দাঁড়িয়ে কেন, বসো, বসে পড়ো। —ডলু আমন্ত্রণ জানায়।
মাস্টারের জন্যে বরাদ্দ করা চেয়ারটির দিকে ভীরু পায়ে এগোয় লোচনকাকু।
চেয়ারে আসীন হতে হতে লোচনকাকু নব্য-শিক্ষক নয়, বরং অভিজ্ঞ দাঁতের ডাক্তারের অভিনব ভঙ্গিতে শুধায়, আপনার অসুবিধেটা কোথায়, বলুন শুনি?
অসুবিধে? আমার আবার কিসের অসুবিধে?
না, মানে বলতে চাইছি, এতদিনে তো আপনার কলেজ ছাড়িয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় মাড়িয়ে চাকরি-বাকরি করে প্রমোশন-ট্রমোশন পেয়ে ম্যানেজার হয়ে যাবার কথা। ক্লাস এইটে আটকে আছেন যে? ব্যাপার? অসুবিধেটা কোথায়?
আমার যে অসুবিধে হচ্ছে, এ কথা তোমায় কে বললে? —ডলু পাল্টা প্রশ্ন সাধে! বরং বছরের পর বছর একই ক্লাসে লগি পুঁতে বেশ সুবিধেই তো হচ্ছে আমার।
সুবিধে!! —লোচনকাকু প্রায় হেঁচকি তোলে।
সুবিধে নয়? কী যে বলো! বছর বছর নতুন করে বইপত্তর কেনাকাটার ঝক্কি-ঝামেলা থাকে না, বছর বছর নতুন চেহারার বন্ধু জোটে—বয়সে বড় বলে ওরা সমীহ করে চলে আমাকে, পারলে নিত্যদিন গাঁটের পয়সা খরচা করে টিফিন পিরিয়ডে পেয়ারা-লটকন খাইয়ে ছাড়ে। তারপর ... তারপর ক্লাস এইটে পড়ি বলে ক্লাস নাইনের ছেলেপুলে থেকে শুরু করে এইট্টি নাইন বছরের বুড়োরা পর্যন্ত আমাকে ছোট্টটি ভেবে জন্মদিনে উপহার দ্যায়, চকলেট কিনে দ্যায়, আরও কত কী যে! সুবিধে কি একটা-দুটো? বলো কী হে!
লোচনকাকু ঘাড় হেঁট করে সায় দিয়ে যায়। —তা সুবিধে আছে হয়তো, বলছেন যখন।
বলব না আবার! বলো কী! —টেবিলে চাপড় মেরে আরো কতক্ষণ ঝেড়ে কাশবার জন্যে উদ্দীপিত হলো লোচনকাকুর ছাত্রটি। নিজেকে ছত্রখান করবার খায়েশেই যেন দুম করে বলে বসে—তাছাড়া, অভ্যেস বলে কথা!
অভ্যেস! —নাহ, আজ যেন লোচনকাকুর অবাক হবারই দিন। —সে কেমন?
এই যে, একই ক্লাসে বছর বছর ঘাপটি মেরে পড়ে থাকার অভ্যেস! সে কথাই তো বলছি হে!
সে কেমন? —প্রশ্নের পুনরুক্তি লোচনকাকুর।
ডলু অকপটে বাতলায়—এই যেমন, ক্লাস থ্রিতে তিন বছর কাটিয়েছি, ফোর-এ চার বছর, ফাইভে...।
পাঁচ বছর নিশ্চয়ই! —লোচনকাকু ছাত্রের পাঁচালি গাঁথতে একপ্রস্থ এগোয়।
ঠিক ধরেছ। তারপর...। ডলু ক্রমশ করে। —এমনি করতে করতেই ক্লাস এইটে এখন আমি।
আর এই ক্লাসে আট বছর গ্যাঁট হয়ে থাকবেন আপনি—এই আপনার ইচ্ছে, তাই কি না? —লোচনকাকু আড়চোখে তাকায় ডলুর দিকে।
ফের ঠিক ধরেছ হে! তুমি তো ভারি ইন্টারলিজেন্ট দেখছি! —ডলু বলে।
লোচনকাকু ঢোঁক গেলে। —কী বললেন? ইন্টার... কী যেন? মানে কী ওটার?
আহা, এটা বুঝতে পারলে না? —ডলু বুঝি বেদনাহত হলো। —তাহলে তো তোমাকে ইন্টারলিজেন্ট বলাটা ভুল হয়ে গেল আমার। আরে বাবা—ইন্টারেস্টিং আর ইন্টেলিজেন্টের সন্ধি করলে যা হয়, ইন্টারলিজেন্ট হচ্ছে তা-ই। তবে তুমি যে সেটা নও, সে তো এখন দিব্যি বুঝতে পাচ্ছি।
ইংরেজিতে সন্ধি-ফন্ধি বলে কোনো কিছু আছে বলে আমার জানা নেই। —লোচনকাকু স্বীকার যায়।
জানা নেই তো? তা এখন না হয় জেনে গেলে—এই তো! শেখা-জানার কি আর বয়স আছে হে! আসলে তুমি দেখছি এখনো নেহায়েত একটি হাবায়ট বিশেষ।
হাবা—! লোচনকাকু ডলুর নতুন অভিসন্ধির হদিস পেয়ে হোঁচট খেল।
এ হচ্ছে হাবাগোবা আর ইডিয়টের বাংরেজি সন্ধি—আমার নতুন আবিষ্কার।
—ডলুর গলায় স্বর-ব্যঞ্জনের নতুন ব্যঞ্জনা।
বাংরেজি উপাধিটা অনেকটা গালাগালির মতনই শোনালো। গলা খাকারি দিয়ে লোচনকাকু বলেন, ছিঃ, অমন করে বলতে নেই—একটু বেয়াদবি হয়ে গেল না কি? হাজার হোক, আমি আপনার শিক্ষক তো! তা প্রথম অপরাধ হিসেবে আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম আমি।
ক্ষমাটাকে প্রত্যাখ্যান করে ডলু আত্মপক্ষ সমর্থনে এগোয়। আমার কসুরটা কিসের? অ্যাঁ? সকল দোষ তো ওই ব্যাকরণ বইয়ের—সন্ধি-ফন্দি সব তো ওই ব্যাকরণেরই কারণে। তবে কিছুটি ভেবো না, আমি একটা ব্যাকরণের বই লিখে ফেলব বলে ভাবছি ইদানিং। ইংরেজি গ্রামার আর বাংলা ব্যাকরণ মিলিয়ে ‘ব্যামার’ নামে একটা বাংরেজি ব্যাকরণের বই লিখে ফেলব আমি। ওতে সন্ধি-ফন্ধি সমাস-টমাস ণত্ব-ষত্ব বিধান ইত্যাদি সব বাতিল করে দিয়ে নতুন করে সবকিছু ঢেলে সাজাবো—দেখে নিও।
ছাত্রের মুখে ব্যাকরণের প্রায় পুরোটাই হরণ করে নেবার অসাধারণ উদাহরণের কথা শুনে—আসন্ন বিমারি-জাতীয় ণত্ব-বিধানহীন ব্যামারের অভিনবত্বের পরিচয় পেয়ে—তাজ্জব বনে যায় লোচনকাকু।
তাজ্জব গলাতেই বলে, তাই বুঝি! তা কবে লিখতে যাচ্ছেন ওই ব্যামার নামের বইটি?
বড় হলে। বড় হলে লিখব। —ডলু বলে, বড় গলায়।
বড় হলে মানে?
মানে, ওই কলেজে ওঠার পর। তখন ব্যামার বইটি লিখে সেটা ইস্কুলে ইস্কুলে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে চালু করে দেবো। ছেলেপুলেরা তখন একটু শান্তিতে লেখাপড়া করতে পারবে। আর সন্ধি-কারক বহুব্রীহি-কর্মধারয় সমাস-টমাসের বালাই যখন থাকবে না আমার বইটিতে তখন তো ছেলেপুলেদের পোয়াবারো; ইংরেজি-বাংলা আলাদা-আলাদা করে পড়তে হবে না, ওই এক বইতেই কম্ম কাবার।
পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সন্ধি-সমাস তথা যাবতীয় ব্যাকরণ-বিষয়ী সমস্যাবিহীন স্কুল-জীবনের কথা ভাবতে গিয়ে লোচনকাকু শঙ্কিত হলো নাকি অভিভূত হলো, বোঝা গেল না।
মুখ ফুটে বলল, ভালো কথাই শোনালেন যা হোক! ভালো পরিকল্পনাই বটে। তবে কলেজে ঢুকবার আগে যে ইশকুলের পাট এবং পর্ব দুটোই চুকাতে হবে, সে খেয়াল আছে? ক্লাস নাইন-টেনের কথা না হয় বাদই দিলাম, ক্লাস এইট টেনেটুনে পাস তো করে নিন আগে!
ডলু টানটান গলায় বলে, ছ’ ব-ছ-র!
তার মানে? —লোচনকাকু ভুরু কুঁচকায়।
আমার স্বভাবের বিরুদ্ধে যাই কী করে, বলো? ক্লাস এইটে আট বছর কাটাবো বলে স্থির করেছি—মাত্তর তো দুটো বছর গ্যাছে। আট থেকে দুই বাদ দিলে বাকি তো ছয়ই থাকে—না কী?
তা থাকে। —লোচনকাকু মনে মনে অঙ্ক কষে বলে।
ওই আরো ছ’বছর ক্লাস এইটে পড়ে থাকব শুনে কোনো মাস্টার আমাকে আজতক পড়াতে রাজি হয়নি। কেটে পড়েছে সবাই। একই ক্লাসে এঁটে থাকাটা ওদের কারুরই পছন্দ নয়। —ডলু তেএঁটে বুকনি শোনায়।
পছন্দ হবার কথাও নয়। —পদত্যাগী শিক্ষকদের সম্মানে প্রণতি জানায় লোচনকাকু। —ফেল করা ছাত্রকে পড়িয়ে সুখ কোথায়?
তা সুখ যদি পেতে চাও...। —ডলু ঘরের সিলিঙের দিকে তাকায়, যেন সিগ্রেটে সুখটান দিচ্ছে। —...তো বেলুকে পড়াও না কেন?
বেলু? বেলু আবার কে?
কে আবার! আমার ভাই! যমজ ভাই আমরা। কেন, বেলুর কথা বাবা বলেনি তোমাকে?
বলেছিলেন বলে মনে হয়।
তবে আর কি! পড়াতে হলে বেলুকেই পড়িয়ে যাও, ও-ও আমার মতন ফেল মেরে-মেরে ক্লাস এইটে এখন। তবে তড়িঘড়ি নাইনে ওঠার বেজায় শখ ওর। ওইদিনই তো বলল আমাকে—এইটে পড়ে থাকতে থাকতে ওর নাকি গেঁটেবাত হয়ে যাবার জোগাড়। ওকেই পড়িয়ে যাও—সুখ পাবে।
অসম্ভব! এ হতে পারে না। —বিদ্রোহে ফেটে পড়ে লোচনকাকু, চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। —আপনাকে পড়িয়ে পাস করানোর চুক্তি করেছি আমি আপনার বাবার সাথে, সে পথেই চলব আমি। আজ আমি চললাম, কাল থেকে লেখাপড়া শুরু—কেমন?
ডলুর তরফ থেকে কোনো উচ্চবাচ্য উচ্চারিত হবার আগেই লোচনকাকু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ফিরল পরদিন।
এবং সেই পরদিন থেকেই শুরু হলো লোচনকাকুর অঘটন ঘটানোর যত কসরত। নাছোড় ছাত্রকে বাগে নিয়ে আসার যাবতীয় কার্যকলাপ। ক্লাস এইটে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকা ডলুকে ক্লাসোত্তীর্ণ করার কালোত্তীর্ণ প্রচেষ্টা। অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে ডলুকে পারাবার পার করবার জন্যে লোচনকাকুর শ্রেণিসংগ্রামের কারবার।
কিন্তু হা হতোস্মি! লোচনকাকুর কোনো কথায় ডলুশর্মা কর্ণপাত করতে গেলে তো।
ওই দ্বিতীয় দিনের প্রারম্ভে ডলুকে শিক্ষকসুলভ স্নেহে লোচনকাকু বলেছিল, যে সাবজেক্টে আপনি বেশি দুর্বল, সেটা দিয়েই শুরু করা যাক—কী বলেন? তা, কোন সাবজেক্টে দুর্বল আপনি?
শিক্ষকের কথা শুনে ছাত্র নিজেই কেমন দুর্বল হয়ে পড়ে। মিইয়ানো গলায় বলে, অতশত কি আমি বুঝি বাপু? বুঝি না হে—বুঝলে কি না! তবে আমাকে এ বছর বাংলা ব্যাকরণ আর ইংরেজি গ্রামার একটু খোলাসা করে দাও, তাহলেই চলবে।
লোচনকাকু তার অতিপরিচিত প্রশ্নটি করে। —তার মানে?
তার মানে, এ বছর আমি কেবল ব্যাকরণ আর গ্রামার পড়ে যাব।
বাকি সাবজেক্টগুলোর কী হবে তাহলে? গণিত-ভূগোল-পৌরনীতি... এগুলো পাঠ করবেন কখন?
কেন? বাকি বছরগুলো পড়ে আছে কী করতে? গত বছর ইতিহাসটা শেষ করেছি। আগামী বছর ভূগোলটাকে পাকড়াও করব। পরের বছর বিজ্ঞান। তারপর...।
ডলুর পাঠকার্যক্রমের অষ্ট বার্ষিকী পরিকল্পনা শুনে যায় আর থেকে থেকে চমকে চমকে ওঠে লোচনকাকু।
তারপর ডলুর নকশায় সায় আছে, এমনটি ভাব করে লোচনকাকু বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে, আজ না হয় ব্যাকরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকা যাক—বললে যখন!
গুরুর নতিস্বীকারে পরম আহ্লাদিত হলো ডলু। বলল, তাহলে রচনা দিয়েই শুরু করি আমরা, কী বলো? গরুর ওপর একটা রচনা লিখে দাও তো এখন—ওটাকেই মুখস্থ করি বসে বসে।
লোচনকাকু গরুর মতন ড্যাবড্যাব চোখে ডলুর দিকে তাকায়। —গরু! গরুর রচনা!!
বাহ্, এতে আশ্চর্য হবার কী আছে? গরুই তো সকল রচনার মূল হে! রচনা লিখতে গেলে গরু দিয়েই তো শুরু করতে হয়। জানো না বুঝি? নাও এখন, চটপট রচনাটা লিখে ফ্যালো দেখি!
রচনার বিষয়বস্তুর গুরুত্বটা বোধকরি লোচনকাকুর মনে ধরল। কাগজ-কলম হাতে নিয়ে গরুর রচনা লিখতে বসে। ডলু টেবিলে তবলা বাজিয়ে গুনগুন করে ভাটীন্দ্র (ভাটিয়ালি+রবীন্দ্র) সংগীত গেয়ে যায়।
মিনিট কুড়ি বাদে লোচনকাকুর রচনাটির ওপর সপ্রশংস চোখ বুলিয়ে ডলু মাথা দোলাতে দোলাতে বলে, হুম... হুম... ভালোই তো লিখেছ দেখছি। এটা এখন আমার হোমওয়ার্ক। আগামীকাল এসো, মুখস্থ শুনিয়ে দেবো তখন। এখন তুমি আসতে পারো।
ছাত্রের ছুটি ঘোষণাটি মাথায় পেতে নিতে হলো। লোচনকাকু বাড়ির পথে পা বাড়ায়।
পরদিন—বিশ্বাস করবি না ছোটলু—পরদিন ডলু পুরো রচনাটা লোচনকাকুকে মুখস্থ শুনিয়ে ছাড়ল।
ডলুর পারদর্শিতায় আবেগাক্রান্ত হয়ে লোচনকাকু বলল, বাহ্, মুখস্থবিদ্যায় আপনি তো বেশ!... তারপর টিপ্পনী কাটে, আজ তাহলে কিসের ওপর রচনা লিখতে হবে? হাতির ওপর কি?
গতকাল কি গরুর উপরে বসে রচনাটি লিখেছিলে? —পাল্টা চিপটেন কেটে ডলু একপ্রস্থ হাঃ হাঃ হাঃ হেসে নিল।
লোচনকাকু গম্ভীর গলায় বলল, আমি অমনটি বলিনি। তাছাড়া হাতির উপরে চড়ে বসতে পারাটা কেমন কষ্টসাধ্যের ব্যাপার একখানা—একবার চেষ্টা করে দেখলেও দেখতে পারেন।
ডলু এবারে যথাসাধ্য স্বাভাবিক। বলল, ব্যাপারখানা কষ্টসাধ্য যে—সে আমিও জানি। তোমার সাথে এমনিই রসিকতা করবার জন্যে কথাগুলো বলেছি। ছাত্র-শিক্ষকের সাথে মজার একটা সম্পর্ক না থাকলে কি জমে বলো? তা হ্যাঁ, হাতি নিয়ে রচনা লেখার কোনো দরকার নেই; ওই এক গরুতেই চলবে—চালিয়ে নেব সব।
দরকার নেই মানে?
মানে, গরুটাকে হজম—ইয়ে মানে রপ্ত করতে পেরেছি তো! এতেই চলবে; অন্যান্য জীব-জন্তুর ওপর রচনা লেখার বেলায় গরুর বদলে হাতি, ঘোড়া, বাঘ, উট, ছাগল—রচনার শিরোনামের দাবি অনুযায়ী বসিয়ে যাব। এই সামান্য ব্যাপারটা বুঝতে পারছ না?
লোচনকাকু থ মেরে যায়।
এবং পরের সপ্তাহগুলো কেটে গেল ওই থ-মারা অবস্থাতেই। ডলুর জ্ঞানের মান তথা জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা অবলোকন করতে করতে লোচনকাকু ম্রিয়মাণ হয়ে ওঠে ক্রমশ। পড়াতে পড়াতে বাত্সরিক পরীক্ষার দিনক্ষণ নিকট গড়াতে গড়াতে—লোচনকাকু অনুভব করে, পরিস্থিতি যথাপূর্বং তথাপরং, অবস্থা তথৈবচ।
পরীক্ষার দিন সাতেক বাকি যখন, তখন লোচনকাকু তিড়বিড়ে ভাব নিয়ে বলেই ফেলল, নাহ! এমনটি হলে চলবে না। মোটেও চলবে না। এবারেও আপনি নির্ঘাত ফেল যে মেরে বসবেন, তা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
ডলু অসংকোচে বলে, এ আর নতুন কথা কী! ফেল মারার জন্যে আমি সব সময় প্রস্তুত।
কিন্তু আমি প্রস্তুত নই! —লোচনকাকু মাথা ঝাঁকিয়ে কয়। —এ আমি হতে দেবো না। আপনাকে পাস করিয়েই ছাড়ব আমি। আর তার আয়োজনও করে ফেলেছি।
গলায় উদ্বেগ ঢেলে ডলু জিজ্ঞেস করে, সে কী রকম?
আমার ক্লাস এইটের সকল খাতা-পত্তর আমি নিয়ে এসেছি—দেখতেই তো পাচ্ছেন। এই খাতা-পত্তরগুলো মুখস্থ করুন এখন রাত-দিন। বরাত আপনার ভালো থাকলে—পরীক্ষার প্রশ্নগুলো কমন পড়ে যায় যদি—তখন আপনাকে আর পায় কে! মুখস্থবিদ্যায় আপনার হেকমত আছে যখন, তখন আমার এই নোটগুলো মুখস্থ করতে থাকুন। আপনার পাসের খবর আর আমার পারিশ্রমিক—দুটোই নিতে রেজাল্টের দিন আপনার এখানে আসব আমি। এখন আমি চললাম।
লোচনকাকু তার গাপিড (গাধা+ইস্টুপিড) ছাত্রকে খাতা-পত্তরের স্তূপের আড়ালে স্থানুব্য বসিয়ে রেখে—অণু পরিমাণ বাত্সল্য প্রদর্শন না করে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দিন পনের পর এক রবিবারে ডলুদের বাড়িতে লোচনকাকুর পদধূলি পড়ল।
ডলুর বাবা যেন লোচনকাকুর অপেক্ষাতেই ছিলেন।
দরজাটা খুলে লাল-লাল চোখে লোচনকাকুকে কটমটিয়ে বললেন, ফের এসেছ আমার বাড়িতে? ফের চেহারা দ্যাখাতে এসেছ? লজ্জা করে না তোমার? আস্ত একটা ফেরেব্বাজ দেখছি তুমি!
লোচনকাকু মুখ চুন করে বলে, ফেল করেছে বুঝি? প্রশ্নগুলো মনে হয় কমন পড়েনি। তা অঙ্ক-টঙ্ক কি আর কমন পড়ে বলুন?
লোচনকাকুর মৃদুভাষণে ডলুর বাবার চোখে-মুখে এতটুকু কমনীয় ভাব দ্যাখা দিল না। ওই দাপুটে মেজাজেই জানান দিলেন—পাস করেছে!
পাস করেছে!! —লোচনকাকুর চোখ বস্ফািরিত হয়। —ডলু পাস করেছে... মানে... করেছেন! তা এতে এত হতাশ হবার কী আছে, ভালো খবর তো!
কচু ভালো খবর! —কচকচিয়ে ওঠেন ডলুর বাবা। —পাস করেছে বেলু—ডলু নয়।
বে... বে... কে...? বুললাম না তো! বেকুব বনে যায় লোচনকাকু।
তা বুঝবে কেমন করে? বেকুবের মতন ডলু-বেলুর পার্থক্য না বুঝে বেলুকেই পড়িয়ে এসেছ এ্যাদ্দিন ধরে। এবারে বুঝেছ?
লোচনকাকু তো হতভম্ব। অনেকদিন আগে থ মেরে গিয়েছিল, এবারে রীতিমতো থতমত খেল। এদিক সেদিক তাকালো লোচনকাকু। মাথাটা চুলকে নিল একটুক। তারপর বলল, তা বাড়ির একজন পাস করলেই তো হলো, তাই না? এখন আমার বেতনটা...।
ডলুর বাবা জলদমন্দ্র গলায় মন্দ কথাটি শুনিয়ে যান। বেলুকে নয়, ডলুকে পড়ানোর কথা ছিল তোমার। সেটি তুমি করনি। চুক্তিভঙ্গের দায়ে উল্টো তোমাকেই যে জরিমানা গুনতে হয় এখন!
কিন্তু... কিন্তু... কিন্তু....।
এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘কিন্তু কিন্তু’ করে কোনো ফায়দা হবে না। এখন জরিমানার অঙ্কটা শুনবে নাকি এখান থেকে মানে মানে বিদেয় নেবে—সেটা ভেবে দ্যাখো এখন।
লোচনকাকু মানে মানে বিদেয় নিল। আর আমার আধখানা গল্প এখানেই শেষ হলো। —এই বলে ন্যাড়া আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তপতরিতে পড়ে থাকা পিচ্চির নজর বাঁচানো দুটো চিঁড়ের দানা মুখে পুরে আমার পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
... ন্যাড়ার গল্পটাকে ক’দিন সাজিয়ে-গুছিয়ে যখন ‘আর আমার আধখানা গল্প এখানেই শেষ হলো’ ইস্তক লিখে শেষ করেছি, তখন ভাবলাম—বাহ্, বেশ তো! আধখানা কোথায়, আস্ত গল্পটাই তো আস্তানা গেড়েছে দেখছি! Full-গল্পটা পেয়ে গেছি, তাই না শোনা গল্পের বাকি আধখানা জোগাড় করতে ন্যাড়াকে আর ধাওয়া করতে হচ্ছে না বলে মনে একটা নিশ্চিন্তি জ্ঞান নিয়ে ক’দিন দিব্যি কাটানো গেল। তবে মনের প্রফুল্ল ভাবখানা উধাও হয়ে গেল ওই ক’দিন বাদেই।
পল্টুমামার সাথে দ্যাখা হয়ে গেল।
দ্যাখা হয়ে গেল মানে—কাজ নেই কম্ম নেই, এমন এক ছুটির দিনে স্রেফ গ্যাজানোর তাগিদে পল্টুমামার আপিসে ঢু মেরেছিলাম আমি।
শহরের জাঁদরেল দারোগা পল্টুমামা আমাকে দেখেই তার দারোগাসুলভ আক্রমণ করে বসে আমাকে। —তুই? তুই আবার এই অসময়ে আমাকে জ্বালাতে এলি যে? দেখছিস না, আমি কেমন ব্যস্ত?
তুমি তো সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকো, তাই বলে কি তোমার সাথে দু-দণ্ড গল্প করতে আসতে নেই নাকি? —আমি অভিমান ঝরাই।
এখন আমার গল্প করার একটুও ফুরসত নেই। একটা জটিল কেস নিয়ে দারুণ হিমশিম খাচ্ছি এখন। তুই এখন যা—আরেক দিন আসিস। আমাকে বিদেয় করতে উঠেপড়ে লাগে পল্টুমামা।
পল্টুমামার পাশে দণ্ডায়মান খাস-কনস্টেবল আড়িয়াল খাঁর দিকে আমি ভুরু নাচিয়ে প্রশ্নবোধক ইশারা করতেই, আড়িয়াল খাঁ ভুরভুর করে পল্টুমামার মনঃপীড়ার কারণ বাতলে যায়। —আবুল আর বাবুল দুই ভাই; যমজ ভাই ওরা। চুরির দায়ে আবুলকে পাকড়াও করে আনা হয়েছে। এদিকে আবুল সমানে বলে চলেছে—চুরিটা আদতে বাবুলই নাকি করেছে, ওর কোনো কসুর নেই। প্রত্যক্ষদর্শীরা নাকি বাবুলকে আবুল ঠাউরে ভুল সাক্ষী দিয়ে গ্যাছে। আড়িয়াল খাঁ বলে শেষে, হেঃ হেঃ, বুঝুন এবারে, স্যার কেমন গেরোতে পড়েছেন!
আড়িয়াল খাঁর কথাগুলোর সাথে ন্যাড়ার গল্পের একটা মিল খুঁজে পেলাম যেন।
সে-রাতেই ন্যাড়াকে ব্যাপারটা খুলে বলতেই ন্যাড়া আমার দিকে খানিক অপলক তাকিয়ে বলল, তাহলে তো আমার গল্পের বাকি আধখানাও বলে ফেলতে হয়!
বাকি আধখানা! আমি তো ভেবেছি তুই পুরো গল্পটাই বলে সেরেছিস। —আমি বলি।
ন্যাড়া খেঁকিয়ে ওঠে, গল্প আধখানা হলো কি আটখানা হলো, তা তুই বুঝবি কেমন করে রে? আসলে গল্পকার কে? আমি না তুই?
আমি মুখ কাঁচুমাচু করে থাকি। গল্পটাকে আরো কদ্দুর টেনে নিয়ে যাবে ন্যাড়া—ডলু-বেলুর টানাপড়েন আর কতক্ষণ সইতে হবে—তা-ই নিয়ে ভাবতে থাকি।
হ্যাঁ, শোন তারপর কী হলো। —ন্যাড়া শোনাতে শুরু করে। তারপর দিন গেল। আন্দোলন হলো। লোচনকাকু আন্দোলনে শরিক হয়ে গলা ফাটালো। রাত গেল। মুক্তিযুদ্ধ গেল। লোচনকাকু মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানিদের ট্যাংক ফাটালো। ফের দিন গেল। পড়াশোনা শেষ হলো। লোচনকাকু ডলু-বেলু জাতীয় উত্পাতের কথা স্মরণ করে শিক্ষকতার পথ উপেক্ষা করে ওকালতিতে মন দিল।
শহরের এক নামকরা উকিলের জুনিয়র হিসেবে বেশ কিছুদিন কাজ-কম্ম করার পর লোচনকাকু সবেমাত্র তার নিজস্ব আইন-ব্যবসাটি চালু করেছে। আলাদা চেম্বার হয়েছে, পিয়ন-চাপরাসি -কেরানী নিয়োগও দেওয়া হয়েছে; বাকি থাকে কেবল চেম্বারে বাদী-বিবাদী-আসামির শুভ পদার্পণ।
তা, পদার্পণ পর্বটিও সম্পন্ন হলো একদিন।
চেম্বারের পর্দা ঠেলে যিনি ঢুকলেন, লোচনকাকু চোখ কচলে তাকে এক নজর দেখেই চিনতে পারল—ডলু কিংবা বেলু—পাকিস্তানি আমলের সেই পুরাতন ছাত্র—তার সম্মুখে দণ্ডায়মান।
তুমি... মানে... আপনি ডলু না?
ডলু কিংবা বেলু অনেকটা কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, তুমিও? লোচন—তুমিও ওদের মতন ভুল করে বসলে? আমি যে বেলু!
বেলু! মানে আমি যাকে ভুল করে পড়িয়েছিলাম?
ভুল তুমি কক্ষনো করনি লোচন। ডলুকেই তুমি পড়িয়েছিলে। তবে প্রায়ই পানি খাবার নাম করে ও বাইরে সিগ্রেট ফুঁকতে যেত। খানিকবাদে আমাকে পড়ার ঘরে ঢুকে পড়াশোনার ভান করতে হতো। আরো কতক্ষণ বাদে আমি বাথরুম চেপেছে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তাম, সিগ্রেট ফোঁকা শেষে ডলু ঘরে ফিরত তারপর। ক্লাস এইট ডলুই পাস করেছিল। তোমাকে যাতে বেতন দিতে না হয়, সে জন্যেই বাবা তোমার সাথে চালবাজিটি করেছিল।
আপনার বাবা! কী আশ্চর্য!
হুম, বাবা দারুণ চালবাজ ছিলেন এককালে।
এককালে?
বাবা মারা গ্যাছে—সেই একাত্তরে। কারা যেন বাবাকে মেরে ফেলেছিল—ওই চালবাজির কারণেই।
ও!
এখন তুমি আমাকে বাঁচাও ভাই। ডলুর হাত থেকে বাঁচাও তুমি আমায়।
ডলু? ডলু এখন আবার কী করতে গেলেন?
আর বলো না! এই ডলুর গতিকে আমার এখন লাইফ বলতে কিস্যু নেই।
আহ, কী হয়েছে খুলেই বলুন না!
কী আর হবে—সেই বুদোর মুণ্ডু উদোর ঘাড়ে আর কি! বাবার স্বভাবের পুরোটাই ডলু বলতে গেলে আত্মসাত্ করেছে। ও এখন একাত্তরে মানুষের ফেলে যাওয়া ভিটে-মাটি দখলের ব্যবসায় নেমে পড়েছে।
তাই নাকি?
তবে আর বলছি কী! ক’খানা বাড়িঘর ডলু যে দখল করে নিয়েছে এরই মধ্যে, সে হিসেব কে রাখে! তবে এইবার ডলু নিজে ধরা খেয়ে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবার বন্দোবস্ত করেছে।
সে কেমন করে?
একটা বাড়ির আসল মালিক যে জ্যান্ত ফিরে আসবে, তা কে জানত! এখন ওই মালিক আমার নামে মামলা ঠুকে দিয়েছে—পুলিশ তাই ক’দিন ধরে খুঁজছে আমাকে। আমাকে বাঁচাও তুমি—প্লিজ। আমার ওই নচ্ছার ভাইটির হাত থেকে উদ্ধার করো আমাকে। আমি বাপু নিরীহ গোনেস্ট মানুষ—গোনেস্ট মানে বুঝলে তো? গোবেচারা আর অনেস্টের যুগল-সন্ধি আর কি!
লোচনকাকু কতক্ষণ বেলুর মুখের দিকে তাকিয়ে ডলুকে খুঁজে বেড়ায়। তারপর বেলুর সকরুণ আকুতিতে মন গলে লোচনকাকুর। ডলুর অসদাচরণে কঠোর হয় চোয়াল দুটো।
প্রথম মামলা পরিচালনের সুযোগ পেয়ে বিগলিত হয়ে তক্ষুনি থানার দিকে ছোটে লোচনকাকু। পুলিশের বড়কর্তার সাথে ধুন্ধুমার বাকযুদ্ধ হয়ে যায়।
লোচনকাকু একসময় গলা ফাটিয়ে বলে, পাষণ্ড ডলুকে ছেড়ে আপনারা গোবেচারা বেলুর পেছনে ছুটছেন কেন? এটা কোন ধরনের আচরণ আপনাদের, অ্যাঁ?
শেষ পর্যন্ত তর্কে হেরে পুলিশবাহিনী বেলুকে বেকসুর মেনে ডলুর তল্লাশিতে মাতে। ডলুর খোঁজ আজ অব্দি মিলেছে বলে কেউ শুনতে পায়নি।
এদিকে মুক্ত হয়ে বেলুও ক’দিন বাদে নিজেকে গুম করে ফেলেছিল বলে শোনা যায়। স্বেচ্ছা-নির্বাসনে যাবার আগে লোচনকাকুর সাথে শেষবারের মতন দ্যাখ্যা করে গেছিল বেলু। নির্বিকার গলায় জানিয়েছিল—মামলা হয়েছে তো বাড়ির দখলদার, মানে ডলুর বিরুদ্ধে, আমার বিরুদ্ধে তো নয়! মামলার ফি-টি যা পাবার, সেটি ডলুর কাছ থেকেই আদায় করে নিয়ো, কেমন?
বেলুর কথা শুনে লোচনকাকু তক্ষুনি চোখ ছানাবড়া করে ফিট হয়ে গেল। তারপর মূর্ছা ভেঙে ওকালতিতে ইস্তফা দিয়ে তেজপাতার তেজারতিতে মন দিয়েছিল। ব্যবসা ওর ভালোই চলছে বলে জানি।
ন্যাড়া চুপ মেরে যেতেই আমি বলি, ব্যস? এই তো? তোর গল্প শেষ তো এখন?
ন্যাড়া সন্ন্যাসীর মতন হাত তুলে বলে, না বত্স্য, আরো একটু বাকি আছে।
ওরে বাবা, এতকিছুর পর—আরও! —আমি শিউরে ওঠার ভান করি।
হুম, আরও একটি প্যারাগ্রাফ বাকি। ... লোচনকাকু একদিন ডলুদের পাড়ার এক মুদির দোকানে তেজপাতার সাপ্লাই দিতে গিয়ে বুড়ো মুদির কাছ থেকে যা শুনল, তাতেই আক্কেল গুড়ুম। বুড়ো মুদি চক্ষু মুদে যা বলেছিল, তা এই রকম। —ওই সাদা বাড়িটার কথা বলছেন তো? এক মহা চালবাজ ও বাড়িতে থাকত এককালে। একাত্তরে রাজাকারগিরি করতে গিয়ে—মানে খানসেনাদের চাল-ডাল-পেঁয়াজ-রসুন জোগান দিত তো! —মুক্তিবাহিনীর হাতে প্রথমে ধরা পড়ে। তারপর পালাতে গিয়ে মারা পড়ে। একটা মাত্র ছেলে ছিল লোকটার—ডলু। ডাক্তার অবশ্যি বলেছিল যমজ ছেলে হবে—তাই লোকটা আগে থেকেই নাম ঠিক করে রেখেছিল—ডলু আর বেলু। আধখানা যমজ ছেলে পেয়ে লোকটার মাথাটাও কেমন কেমন হয়ে গিয়েছিল যেন।... সব শুনে লোচনকাকু আবারও চোখ উল্টে মূর্ছা গেল।
ন্যাড়া ফের চুপ।
আমি তাগাদা দিই। —তারপর?
তারপর আবার কী রে গাপিড! গল্প তো শেষ!! 

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৪
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :