The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

মঞ্চ

নাট্যমঞ্চেখণ্ডিত বাংলাদেশ

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

শিল্পকলা একাডেমির নাটক ভবনের তিনটি মঞ্চে এখন অর্ধশতাধিক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। দেখেছি তিরিশটির বেশি। একাডেমি প্রায় প্রতিদিনই মুখর থাকে নাট্যকর্মীদের কর্মচাঞ্চল্যে। বাইরের একজন লোক হিসেবে গত তিন মাস আমি তাদের মধ্যে মিশেছিলাম। তারা আমাকে কী যে অফুরান আনন্দ দিয়েছে তা ঘটা করে না বললে অবিচার করা হবে। এই ধরনের অবিচার আমাদের এখানে হামেশাই হয়ে থাকে। বিচারক বা সমালোচক নয়, দর্শক বা নাগরিক হিসেবে সেই অবিচারের দায় কিছু শোধ করার জন্যই এই লেখা। যে নাটকগুলো দেখেছি সেগুলো নিয়ে নিতান্ত সাধারণ দর্শকের মতো কথা বলতে চাই।
নাটকের মঞ্চায়ন নিয়ে কথা বলার একটি সমস্যা আছে। প্রথম মঞ্চায়নের অনেক কিছুই দ্বিতীয় মঞ্চায়নে থাকে না। নাটকের পাণ্ডুলিপিসহ সবকিছুই একটি বিশিষ্ট ধরন ও কাঠামোকে লক্ষ্য মেনে কখনো কখনো প্রতি মঞ্চায়নে এত দ্রুত বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে যে সেগুলো নিয়ে কথা বলার পরের সপ্তাহেই দেখা গেল, দর্শক লেখা পড়ে যে ধারণা পেলেন মঞ্চে তা আর নেই। মঞ্চের এই চলমানতা শিল্পের অন্য কোনো শাখায় এত প্রবল নয়। অতএব, যা বলা হবে তা নিতান্তই যে মঞ্চায়নটি আমি দেখেছিলাম শুধু সেটির মধ্যেই শুধু সেদিনের শো’র মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকবে।
মঞ্চে এখন যে মৌলিক নাটকগুলো মঞ্চস্থ হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে আরণ্যকের ‘রাঢ়াং’। আরণ্যকের এই প্রযোজনার রচয়িতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ। ‘রাঢ়াং’-এর প্রতিটি মঞ্চায়নে দর্শকের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। অভিনেতাদের অনেকেই এই নাটকের সাথে আছেন অনেক দিন। যে কারণে তারা অভিনয় দক্ষতায় জমিয়ে তুলতে পারেন অনায়াসে। ‘রাঢ়াং’ যে জনগোষ্ঠীর কথা বলে, ভাষা কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর নয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ বা অরণ্য-মানুষের মতো বাস্তবানুগ থাকেনি সেই ভাষা।
আরণ্যকের নতুন প্রযোজনা ‘স্বপ্নপথিক’। রিয়েলিস্টিক থিয়েটারের এই জমকালো পরিবেশনায়ও আরণ্যকের নিজস্বতা স্পষ্ট। আরণ্যকের নাটক দেখলে কখনো মনে হয় না যে আপনি নির্বাচিত কিছু মানুষ, তাদের সমস্যা ও সংকট দেখছেন। মনে হয়, গণমানুষের সংকট ও সমস্যার স্বরূপ উপস্থাপনে গোটা একটা সমাজকে তুলে আনা হয়েছে মঞ্চে। হারুন রশীদের রচনা ও মামুনুর রশীদের নির্দেশনার এই নাটক আমাদের রানা প্লাজা ধসের মতো ঘটনায় পোশাক-কারখানার শ্রমিক হত্যার এক বাস্তবানুগ বিবরণ। মঞ্চে একই সময়ে প্রায় তিরিশটির মতো চরিত্রকে গতিময় রাখা খুবই কঠিন। এই কঠিন জায়গাটায়ই সফলতা আছে আরণ্যকের। তবে সেই গতিময়তা সবসময় ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতাও আছে। ভবন ধসের পর উদ্ধার তত্পরতার অংশটিতে তা দেখা গেছে।
অনগ্রসর ও অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী নিয়ে আরো কিছু নাটক এখন মঞ্চে আছে। নাটক হিসেবে সফলতা-বিফলতার চেয়ে বিষয়-বিবেচনায় উল্লেখযোগ্য তেমন দুটি নাটক হচ্ছে ‘শিখণ্ডী কথা’ ও ‘হরিমন্থন’। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনা ‘শিখণ্ডী কথা’র নির্দেশক রশিদ হারুন ও রচয়িতা আনন জামান। বাংলাদেশের হিজড়া সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি-আচার-প্রথা-দুঃখ-বঞ্চনা নিয়ে এটিই বাংলাদেশের মঞ্চে এখন একমাত্র নাটক। প্রামাণ্য ধরনের এই নাটকটিতে অভিনেতারা সাবলীল। সিরাজগঞ্জের নাবিক নাট্যগোষ্ঠীর ‘হরিমন্থন’ ডোম সম্প্রদায়কে নিয়ে। জাহিদ পিন্টুর রচনা ও শাহীন রহমানের নির্দেশনার এই নাটককে ব্রোশিয়োরে নাট্যকার বলেছেন ‘নাট্যোপখ্যান’। ‘নিম্নবর্গের মানুষ ডোম সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, আচার, ভাষ্য, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, বঞ্চনা’র কথা দিয়ে যে নাট্যোপাখ্যান রচনার চেষ্টা করা হয়েছে তাকে মাঝে মাঝে আমাদের আখ্যান-নাট্যের প্রবক্তার দৃষ্টিভঙ্গিকে ভুল বোঝার চেষ্টা মনে হয়। মঞ্চে যখন কোনো পুরুষ চরিত্রের বাঁশি শুনে নারী চরিত্র পাশে এসে বসে তখন আর বর্ণনায় উল্লেখ করার দরকার নেই যে, তার বাঁশি শুনে নারীটি চুপচাপ পাশে এসে বসে থাকল। এই রকম কিছু বিষয় নাটকের বিভিন্ন জায়গায় আছে। ‘শিখণ্ডীকথা’ বা ‘হরিমন্থন’ যেখানে ডকুমেন্টেশনের ঊর্ধ্বে উঠতে চেয়েছে সেখানেই হয়ে উঠেছে অতিনাটকীয়। বিশেষ সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতি কিছুটা বাড়তি পক্ষপাত থাকলেও নাটকগুলো সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
বিশ শতকের গোড়ার দিকের থিয়েটার অভিনেত্রী স্বশিক্ষিত বিনোদিনী দাসীর আত্মজীবনীর নির্বাচিত অংশ নিয়ে নাটক ‘বিনোদিনী’ এখনকার মঞ্চে একমাত্র আত্মজীবনীমূলক নাটক। সাইমন জাকারিয়ার গ্রন্থনা ও গবেষণা এবং সেলিম আল দীনের মুখবন্ধে এই নাটক শিমুল ইউসুফের একক অভিনয়। নাসির উদ্দীন ইউসুফের নির্দেশনা এবং ঢাকা থিয়েটারের এই প্রযোজনা গান-নাচ ও অভিনয়ে মঞ্চে উপস্থাপনের সামর্থ্য কেবল শিমুল ইউসুফেরই আছে। তারপরও শিমুল ইউসুফের নাচের মুদ্রাগুলো কখনো কখনো বিশ শতকের গোড়ার সময়ের এক অভিনেত্রী ও গায়িকা বিনোদিনী দাসীর নাচের সঙ্গে ঠিক মেলে না। বিশেষ করে মনিপুরী নৃত্যের ঢংয়ের মধ্যে কুংফু-কারাতের শিল্পীর মতো হাত-পা ছোড়ার ভঙ্গির যৌক্তিকতা নিয়ে দর্শক হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারে। আত্মজীবনীমূলক নাটকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা চরিত্রটির অভ্যন্তর ও তার পরিপার্শ্বের সবকিছু অতীতের সত্যের সমান করে ফিকশনে দাঁড় করানোর যে চ্যালেঞ্জ, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আখ্যানধর্মিতার টেকনিক এই নাটকে খুব কাজে লেগেছে বলা যায়।
মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে জীবনীমূলক নাটক ‘মহাত্মা’ মঞ্চে এনেছে ইউনিভার্সাল থিয়েটার। ‘মহাত্মা’ মাজহারুল হক পিন্টুর রচনা ও নির্দেশনা। সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টার মধ্যে ১৯৪৬ সালের নোয়াখালীর দাঙ্গার ওপর আরেকবার আলোকপাত করা প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল।
বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবনী নিয়ে নাটক ‘মহাজনের নাও’। গীতি ও কাব্যের মিশেলে সুবচনের এই প্রযোজনার রচয়িতা শাকুর মজিদ। নির্দেশনা ও পরিকল্পনা সুদীপ চক্রবর্তীর। ‘মহাজনের নাও’ আসলে নানা নাটকীয় উপাচারে শাহ আবদুল করিমের জীবনী উপস্থাপন। এ ধরনের রচনা ও নির্দেশনা খুবই একরৈখিক হওয়ায় তা সমসাময়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না।
গত দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আরো কিছু নাটকের মঞ্চায়ন আমাদের সামনে চলে এসেছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। প্রয়াত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশনা ও থিয়েটারের প্রযোজনার এই নাটক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই কাব্যনাটক একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। মঞ্চায়নও বরাবরের মতোই ছিল সফল।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো একটি আপাতসফল প্রযোজনা ‘বৌ বসন্তী’। উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর এই প্রযোজনার রচয়িতা রতন সিদ্দিকী এবং নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সরাসরি আক্রান্ত নয় এমন একটি গ্রামের গল্প। প্রতীক ও রূপকের ব্যবহার এই নাটকের বড় সৌন্দর্য। অভিনেতা ও অভিনেত্রীর দক্ষতাও ভালো। গ্রামের মানুষকে তার বাহ্যিক কদর্যরূপে উপস্থাপনে যে সৌকর্য তা বেশ ভালো লাগে।
মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি নাটক ‘কমরেডস হাত নামান’। একটি যাত্রাদলের মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার কাহিনিই বলা যায় এই নাটককে। গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়ের এই প্রযোজনার রচয়িতা প্রবীর দত্ত এবং নির্দেশক অসীম দাশ। যাত্রাদলের শিল্পীরা এই নাটকে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শামিল হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে।
বাংলাদেশের মঞ্চে এখন একমাত্র কোর্টরুম ড্রামা ‘কোর্ট মার্শাল’। সেনাবাহিনীর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ ও বিপক্ষের দ্বন্দ্বের নাট্যরূপ ‘কোর্ট মার্শাল’ থিয়েটার আর্ট ইউনিটের প্রযোজনা। হিন্দি নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক স্বদেশ দীপকের লেখা এই নাটকের অনুবাদক সলিল সরকার এবং নির্দেশনা এস এম সোলায়মানের। নাটকটি বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে নাটকটিকে বিদেশি বলে মনেই হয় না।
আজাদ আবুল কালামের রচনা ও নির্দেশনায় প্রাচ্যনাটের ‘সার্কাস সার্কাস’ নাটকের প্রেক্ষাপটও মুক্তিযুদ্ধ। দক্ষিণবঙ্গের বিখ্যাত সার্কাস দল লক্ষণ দাসের সার্কাসের মুক্তিযুদ্ধে যে পরিণতি বর্তমানের সার্কাস দল সোনার বাংলা সার্কাসের পরিণতিও একই। চল্লিশের বেশি বছর ধরে এই একই অবস্থার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন লক্ষণ দাস। ঠিক একইভাবে উগ্রবাদী একটি গোষ্ঠী পুড়িয়ে দেয় সোনার বাংলা সার্কাসের মানুষ ও জীবজন্তু। নাটকটির শুরু খুব চমত্কার, কিন্তু শেষের দিকে মৃত্যু ও মৃত্যুর সংবাদ যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তা একঘেয়ে এবং ব্যঞ্জনাহীন মনে হয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও ডকুমেন্টারি থিয়েটারের ধরনের বাইরে আমাদের মঞ্চে এখন নাটকের সংখ্যা খুবই কম। যে ক’টি আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’র নাট্যরূপ। রেজা আরিফের নির্দেশনা ও তানভীর আহমদ সিডনির নাট্যরূপে আরশিনগরের এই প্রযোজনা ভালো লাগার পেছনে শহীদুল জহিরের উপন্যাসের প্রতি আগাম ভালো লাগা আছে। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও সামাজিক সংকটের জটিল মিশ্রণ শহীদুল জহিরের উপন্যাস। নাট্যরূপে কিছু গৌণ জায়গাকে মুখ্য করে তোলা হয়েছে। যৌনতা নিয়ে স্পর্শকাতর জায়গাগুলো নাটকে দীর্ঘায়িত না করলেও কোনো ক্ষতি ছিল না। মঞ্চে সারাক্ষণ নৌকা থাকার পরও নৌকায় সঙ্গমের দৃশ্য দেখানোর জন্য আরেকটি কাঠের কাঠামো মঞ্চে আনার কারণ বোধগম্য নয়। আখ্যানধর্মিতার প্রয়োগও কখনো কখনো বাড়াবাড়ি মনে হয়।
বরাবরের মতোই আমাদের মঞ্চে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি নাটক। এর মধ্যে রয়েছে ‘রক্তকরবী’, ‘শাস্তি’ ও ‘রথের রশি’। আশিষ খন্দকারের নির্দেশনা ও নাট্যধারার প্রযোজনায় ‘রথের রশি’ এখনকার মঞ্চে পুরাতনী স্বাদ। রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য পুরোনো হয়নি, কিন্তু ভাষাটা নতুন কালের কাছে খুব ম্লান হয়ে থাকে। রবীন্দ্রভাষার এই নাটক এই ঘাটতি সত্ত্বেও ভালো লাগাতে পেরেছে নাট্যধারা।
সংগৃহীত লোককাহিনি নিয়ে কাজী চপলের নাট্যরূপ ও নির্দেশনা ‘পাইচো চোরের কিচ্ছা’। ঢাকা পদাতিকের এই প্রযোজনায় খুলনা অঞ্চলের একটি লোককাহিনিকে লোক-আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে পদাতিকের তরুণরা। একটি লোককাহিনির লোক-আঙ্গিকের উপস্থাপনাটি নাটক হয়ে উঠেছে কি না সে প্রশ্ন জাগতে পারে। শুধু চরিত্র ঢুকিয়ে আর কথক দিয়ে সাজানো-গোছানো আধুনিক মঞ্চে উপস্থাপন করা হলেও একজন বয়াতির উপস্থাপনার চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু এতে নেই।
আমাদের সময়ে অথবা সব সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি প্রচণ্ড বিদ্রূপ মলয় ভৌমিকের ‘দণ্ড’। অনুশীলন নাট্যদলের এই প্রযোজনার নির্দেশকও মলয় ভৌমিক। দণ্ড আসলে কাহিনিনির্ভর কিছু নয়। বরং, দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের নিয়ে একটি সৃজনশীল প্রবন্ধের মঞ্চায়ন। মঞ্চায়নের পর নাট্যকার মামুনুর রশীদ মঞ্চে উঠে বলেছিলেন, ‘নাটকটি আগামীতে আরো অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে হয়তো।’ সামান্য এই বাক্যই নাটকটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন। সম্ভাবনাময় এই রচনাটি আরো অনেক বেশি অভিনয়-দক্ষতা দাবি করে। পাণ্ডুলিপিও আরো ঋজুতা চায়। সঙ্গীতের ব্যবহার, বিশেষ করে প্যারডি কখনো কখনো সার্থক হয়েছে।
নাটক অনুবাদে আমাদের একটা বিশাল সীমাবদ্ধতা আছে। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ কিংবা অন্য দেশের প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে আমরা অনুবাদ করতে পেরেছি খুব কম। ল্যাটিন আমেরিকার কোনো সাহিত্যের অনুবাদ এই দেশে যত সহজে মিলবে তত সহজে মিলবে না কোনো নাটক। গত ষাট-সত্তর বছরের দুনিয়া সম্পর্কে এবং বিশ্বনাটক সম্পর্কে আমাদের এখনকার মঞ্চ থেকে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। আমাদের অনুবাদ নাটকের অধিকাংশই ইংরেজি সাহিত্যের। এর বাইরে যে ক’টি আছে সেগুলোও ইউরোপের ভাষা ও সংস্কৃতির বাইরের নয়।
মঞ্চে এখন আছে ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘দ্য ট্যাম্পেস্ট’ ও ‘ম্যাকবেথ’। রুবাইয়াত্ আহমেদের অনুবাদে ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনা ‘দ্য ট্যাম্পেস্ট’-এর নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ। শেক্সপিয়রের নাটকের কাঠামো আছে, কিন্তু মূল নাটকের স্বাদ এতে নেই। সমালোচকদের ধারণা এটি শেক্শপিয়রের শেষ নাটক। ‘দ্য ট্যাম্পেস্ট’-এর বাংলা রূপান্তর হয়ে উঠতে চেয়েছে দেশীয়। পোশাকে ও আঙ্গিকে আছে সেই স্বাদেশিকতা, কিন্তু চরিত্রের নামগুলো (প্রসপেরো, মিরান্ডা, অ্যান্তোনিয়ো, আলোনসো, ফার্দিনান্দ) আর কাহিনিকে সেই পোশাক ও আঙ্গিক কি আড়াল করতে পারে?
ইংলিশ রেনেসাঁ থিয়েটার বা এলিজাবেথান থিয়েটারের যেমন নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, তেমনি শেক্সপিয়রেরও আছে নিজস্ব নাট্যবৈশিষ্ট্য। ১৬ শতক এবং ১৭ শতকের ইংরেজি নাটকগুলো এ পর্যন্ত বহু রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এলেও অধিকাংশ সময়ই সেই মূলানুগ বৈশিষ্ট্যগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ধারায় থেকে পদাতিক নাট্য সংসদ নিয়ে এসেছে শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’। সৈয়দ শামসুল হকের মঞ্চরূপের এই নাটক সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ম্যাকবেথ’-এর নাট্যরূপ দিয়েছেন সৈয়দ হক। শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ তো তাঁর কোনো কবিতা নয়, নাটকই। যে কারণে ‘নাট্যরূপ’ বললে সাধারণ দর্শকের বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দুই শতক আগের ইউরোপীয় নাটকের আরো দুটি উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা আছে এখনকার মঞ্চে। একটি সতের শতকের ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের ‘কঞ্জুস’ এবং অন্যটি আঠারো শতকের ইতালীয় নাট্যকার কার্লো গলডোনির ‘দুই যে ছিল এক চাকর’। লোকনাট্যদলের প্রযোজনা কঞ্জুসের অনুবাদ তারিক আনাম খানের এবং নির্দেশনা লিয়াকত আলী লাকীর। ‘দুই যে এক চাকর’ও তারিক আনাম খানের অনুবাদ। নাট্যকেন্দ্রের এই প্রযোজনার নির্দেশকও তিনি। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের মঞ্চে থাকার কারণে ‘কঞ্জুস’ একটা বঙ্গীয় রূপ পেয়েছে।
আইরিশ-আমেরিকান নাট্যকার ইউজিন ও’নিলের ‘বনমানুষ’ মঞ্চে পরিবেশন করছে প্রাচ্যনাট। বাকার বকুলের এই নির্দেশনার অনুবাদক কে তা উল্লেখ নেই। বিশ শতকের গোড়ার দিকের মার্কিন বাস্তববাদী ধারার এই নাটক বাংলাদেশে এসে বদলেছে অনেক। মঞ্চায়নে বিশেষভাবে নজর কাড়ে আলোছায়ার খেলা, কোরিওগ্রাফি ও প্রধান চরিত্রগুলোর অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।
ভারতীয় নাট্যকার স্বদেশ দীপকের কথা বাদ দিলে আমাদের এখনকার মঞ্চে পশ্চিমের একমাত্র জীবিত নাট্যকারের নাটক ‘মুক্তি’। মার্কিন নাট্যকার লি ব্লেসিংয়ের এই নাটক অনুবাদ করেছেন মিজারুল কায়েস। ত্রপা মজুমদারের নির্দেশনায় এটি মঞ্চে এনেছে থিয়েটার। তিন মেয়ে আর এক বৃদ্ধ মায়ের গল্প। নিঃসঙ্গতা, আতঙ্ক আর অসুস্থতার এই গল্পে যেমন আছেন নারীর একান্ত নিজস্ব জীবন তেমনি আছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সময়ের ছোবলে এলোমেলো ও অবান্তর জীবনের নানা দিক। মঞ্চায়নের বিভিন্ন দিক ধরে বলা যায় থিয়েটার তাদের সুনামের প্রতি সুবিচার বহাল রেখেছে।
মার্কিন নাট্যকার আর্থার মিলারের ‘পুসি বিড়াল ও একজন প্রকৃত মানুষ’ মূলত শ্রুতিনাটক। প্রৈতি হকের অনুবাদে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের এই প্রযোজনার নির্দেশনা দিয়েছেন লাকি ইনাম। ১৯৩৯ সালের দিকে কমিউনিজম-আতঙ্কিত মার্কিন সরকার ফেডারেল থিয়েটার বন্ধ করে দেওয়ায় তরুণ মিলার ব্রুকলিন নেভি ইয়ার্ডে কাজ নেন। মঞ্চের সুযোগ না থাকায় লিখতে থাকেন রেডিও-নাটক। তাঁর সেসব রচনার প্রথমটি হচ্ছে ‘পুসি বিড়াল ও একজন প্রকৃত মানুষ’। প্রখ্যাত বিদেশি নাট্যকারদের নাটকের প্রোডাকশনগুলোর ভিডিও এবং আলোচনা-সমালোচনা এখন ইন্টারনেটে সহজে পাওয়া যায়। এই নাটকের জন্য সেসব সুবিধা খুব একটা কাজে না এলেও মিলারের শ্রুতিনাটককে মঞ্চ সফল এক পলিটিক্যাল স্যাটায়ার করে তুলেছেন ড. ইনামুল হক পরিবার।
আলবেয়ার কাম্যুর ‘ক্যালিগুলা’র মতো নাটক আমাদের মঞ্চে নেই, আছে তার উপন্যাস ‘আউট সাইডার’-এর নাট্যরূপ। রুবাইয়াত্ আহমেদের অনুবাদ ও নাট্যরূপে ‘আউট সাইডার’-এর নির্দেশনা নাসির উদ্দীন ইউসুফের। ঢাকা থিয়েটারে এই নাটকে আলবেয়ার কাম্যুর মরসোঁ চরিত্রের স্বরূপ এবং অস্তিত্ববাদ ভালোভাবেই উঠে এসেছে। বাংলাদেশের অন্য দলগুলোর চেয়ে ঢাকা থিয়েটারের জাঁকজমক ভালো। প্রপসে সৌকর্য আছে। নাটকে যে প্রপসটা কফিন হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে সেটাই যখন কোনো ডিসকন্টিনিউটি ছাড়া বাথটাব হিসেবে ব্যবহূত হয় তখন বেশ খারাপ লাগে। আলোর ব্যবহারে হতাশ। মরসোঁ যখন বলে, বাহ কী সুন্দর সকাল, তারপরই সকালের আলো পড়ে। তখন প্রশ্ন জাগে মরসোঁ বলেই কি সকাল হয়, নাকি সকাল হয় বলেই মরসলের সুন্দর লাগে। চরিত্রগুলোর সবাই কিন্তু সাদা শার্ট আর সবুজ প্যান্ট নয়, কেউ কেউ সুট-টাই বা ব্লেজারও দাবি করে। গোসলের আগে ও পরে চরিত্ররা একই রকম থাকে। তারা পোশাক বদলানোর অভিনয়ও করে না। ঘনিষ্টতার দৃশ্যে ঘনিষ্ট হয় না। উপন্যাসে আলবেয়ার কাম্যুর বর্ণনা ছিল উত্তম পুরুষে। উত্তম পুরুষের কারবার নাটকে এসে তা নাম পুরুষে আখ্যান ধরলেও তা জুতসই হয় না। কাম্যুর মূল উপন্যাসের সঙ্গে বাড়তি অংশ জুড়ে দিয়ে কোনো নতুন ব্যঞ্জনা তৈরির চেষ্টা প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক মনে হয়নি। কারো কারো অভিনয় দুর্বলতাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
মঞ্চে এখন ঐতিহাসিক নাটক খুব বেশি নেই। যে ক’টি আছে তা দেখে মনে হয়, আওরঙ্গজেব, বাহাদুর শাহ, সিরাজদ্দৌলা ছাড়া যেন আমাদের ইতিহাস ও রাজনীতি নেই। বাংলার ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বাংলাদেশের চল্লিশ বছরের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ধরে নেই কোনো নতুন নাটক ও নাট্যপ্রযোজনা। এখনকার মঞ্চে ঐতিহাসিক নাটক আওরঙ্গজেব প্রযোজনা করছে ‘প্রাঙ্গণেমোর’। অনন্ত হিরা নির্দেশিত এই নাটকের রচয়িতা কলকাতার মোহিত চট্টোপাধ্যায়।
বাংলাদেশের মঞ্চের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের নাটক। এর মধ্যে রয়েছে : ‘সিরাজ যখন নবাব সিরাজদ্দৌলা’ (বাংলাদেশ থিয়েটারের প্রযোজনা ও আব্দুল আজিজের নির্দেশনায় শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের নাটক), ‘প্রথম পার্থ’ (থিয়েটার স্কুল প্রাক্তনীর প্রযোজনা ও জয়িতা মহলানবীশের নির্দেশনায় বুদ্ধদেব বসুর নাটক), ‘যা নেই ভারতে’ (কণ্ঠশীলনের প্রযোজনা ও মীর বরকতের নির্দেশনায় মনোজ মিত্রের নাটক), ‘কিনু কাহারের থেটার’ (কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমনের নির্দেশনা ও প্রাচ্যনাটের প্রযোজনায় মনোজ মিত্রের নাটক), ‘বারামখানা’ (পান্থ শাহরিয়ারের নাট্যরূপ ও ত্রপা মজুমদারের নির্দেশনায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাহিনি), ‘অ্যাডভেঞ্চার কারে কয়’ (অনীকের প্রযোজনা ও মলয় বিশ্বাসের নির্দেশনায় অমলেশ চক্রবর্তীর নাটক), ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ (স্বপ্নদলের প্রযোজনা ও জাহিদ রিপনের নির্দেশনায় বাদল সরকারের নাটক), ‘দ্বীপ’ (নাট্যতীর্থের প্রযোজনা ও তপন হাফিজের নির্দেশনায় উত্পল দত্তের নাটক)। এর বাইরেও পশ্চিমবঙ্গের নাট্যকারদের আরো কিছু নাটক প্রায়ই আমাদের মঞ্চে দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভাষাগত সামঞ্জস্যের জায়গাটির কারণে মঞ্চে তাদের নাটক প্রাধান্য পায়। তবে পশ্চিমবঙ্গের নাটক ছাড়াও ভারতের অন্য সব ভাষা এবং আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর ভাষার নাটক আমাদের মঞ্চে প্রায় উঠেই না বলতে গেলে। এটি একেবারেই একদিকদর্শিতা। এছাড়া বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে একটা ব্যাপার প্রায়ই দেখা যায়। তারা পরস্পর পরস্পরের খুব প্রশংসা করেন। এই প্রশংসার মধ্যে সুস্পষ্ট অন্তঃসারশূন্যতা আছে এবং এর মধ্যে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের একটা আপাত-নিরীহ রাজনীতিও আছে বোধহয়। যে পরিমাণে পশ্চিমবঙ্গের নাটক আমাদের মঞ্চে দেখা যায় সে তুলনায় চার ভাগের এক ভাগও নেই আমাদেরই তিরিশ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের নাট্যকারদের উল্লেখযোগ্য নাটক। সেই নাটকগুলোর ব্যাপারে যেন সব আগ্রহ নিঃশেষিত।
মঞ্চে এখন নারী নাট্য নির্দেশক ও নাট্যকার শিমুল ইউসুফ, ত্রপা মজুমদার, লাকি ইনাম, প্রৈতি হক, জয়িতা মহলানবীশ ও আছমা আক্তার লিজা। এঁদের মাত্র একজনই, আছমা আক্তার লিজা, নির্দেশক ও নাট্যকার। বাকিরা অনুবাদক বা নির্দেশক। বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে নারীর মুখ যত দেখা যায়, মঞ্চের পেছনে তত নারী নেই। নারী নাট্যনির্দেশক, নাট্যকার ও অনুবাদকের সংখ্যা নিতান্ত কম। এটি আমাদের মঞ্চে নারীদের ক্ষমতায়নের ঘাটতি এবং নারীদের অনাগ্রহেরই প্রমাণ। মঞ্চে নারীর নারী হিসেবে মূল্য থাকলেও মঞ্চের পেছনে নারী বা পুরুষের আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। নারীরা নাটক রচনা ও নির্দেশনায় থাকলে আমরা আরো নতুন ধরনের অনেক নাটক পেতাম। আছমা আক্তার লিজার রচনা ও নির্দেশনা ‘চন্দ্রাবতী’। নাটনন্দনের এই প্রযোজনার ব্রোশিয়োরে নাট্যকার বলছেন, ‘কাহিনী তিনশত বছর আগের।’ ব্রোশিয়োরে নাট্যকার দাবি করলেও নাটকের মূল তিনটি চরিত্রের একটি চন্দ্রাবতী আমাদের মধ্যযুগের প্রথম নারীকবি চন্দ্রাবতীর কথা দর্শককে মনে করিয়ে না দিলে মনে পড়ে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকে। অন্য দুটি চরিত্র মাধবলাল ও চাঁদ সওদাগরও আমাদের মধ্যযুগের লোককাহিনি ‘সোনাই মাধব’-এর মাধব এবং ‘চাঁদ সদাগরের’ চাঁদের ব্যাপারেও একই রকম সন্দেহ জাগে। কাহিনি ও বাস্তবের এই তিন চরিত্র ধরে ক্ষুধা ও যৌনবাসনার যে মানসিক দ্বন্দ্বমুখরতা আছমা আক্তার লিজা উপস্থাপন করেন তা অতিনাটকীয়তা সত্ত্বেও দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে কি না সে প্রশ্ন রাখাই যায়। কিছু দৃশ্যের দীর্ঘায়িত রূপ দর্শকের বিরক্তিও জাগাতে পারে। বিশেষ করে চন্দ্রাবতীর অজ্ঞান হয়ে পড়া, চন্দ্রাবতীর রথে চড়া থেকে মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী দৃশ্য।
ঢাকার বাইরে থেকে কোনো গ্রুপ যখন ঢাকায় নাটক নিয়ে আসে তখন তাদের পছন্দের তালিকায় থাকে লোককাহিনি বা মৌলিক কোনো নাটক। সেই মৌলিক নাটকেও আবার আঞ্চলিকতার প্রাধান্য থাকে। লোককাহিনি ও মৌলিক নাটক বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য জানান দিলেও উত্কর্ষের বিবেচনায় সেই আত্মশ্লাঘা ধরে রাখতে পারেন না। যে লোকনাটকটি মঞ্চে দেখেছি সেটি অবশ্য ঢাকার বাইরে থেকে আসা কোনো গ্রুপের নয়। দ্বীজ কানাইয়ের ‘মহুয়া’ মঞ্চে এনেছে থিয়েটার পুণ্যভূমি। নির্দেশনা জুলফিকার হুসাইন সোহাগের। ২০ বছর আগে ময়মনসিংহের একটি সৌখিন গ্রুপ এই পালাটা মঞ্চস্থ করত ফি বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তাদের সেই মঞ্চায়নটি ভারতীয় দূরদর্শনে এখনো সংরক্ষিত আছে। যদিও গ্রুপটির নাম ছাড়া কোথাও সেটিকে বাংলাদেশের প্রযোজনা হিসেবে গ্লোরিফাই করা হয়নি। এই রকম একটি প্রযোজনা ভারতের দূরদর্শনের আর্কাইভে থাকলেও আমাদের বিটিভি বা কোনো টিভির কাছে আছে বলে আমার জানা নেই। শুধু এটি কেন, আমাদের এখনকার কোনো নাটকের প্রযোজনা তারা সংগ্রহ করে কি না কে জানে!
লেখাটি শেষ করার আগে মোটের ওপর কিছু কথা বলে নিই। ভাষা ও বানানের ক্ষেত্রে অধিকাংশ নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের অসচেতনতা একটু বেশিই মনে হয়। তাদের ব্রোশিয়োর, লিফলেট, টিকেট, ব্যানার—সবখানে ভুল বানান আর ভাষাগত ত্রুটির ছাপ।
সঙ্গীত ও শব্দ সংযোজনে আমাদের নাটকের দলগুলোর দুর্বলতাও মোটা দাগে চোখে পড়ার মতো। নাটকের সময়, স্থান, মেজাজ, ধরন ও গতিবিধি এবং চরিত্রদের চলন-বলন ও অঙ্গভঙ্গির ব্যাপারে সঙ্গীত ও শব্দের যে ভূমিকা সেটাই অনেক সময় ঠিক থাকে না; সঙ্গীত-শব্দ দিয়ে নাটকে আলাদা কোনো দ্যোতনা-ব্যঞ্জনা তো দূরের কথা, এখনকার মঞ্চের খুব কম নাটকই আছে যেগুলো এক্ষেত্রে সফল।
মঞ্চে এখন নাটক রচনার দুর্বলতা আছে। একটি আখ্যানধর্মী প্রবল ধারার বাইরে আমাদের নাটকগুলো প্রথানুগ গল্পের পুনরুত্পাদন ছাড়া আর কিছু নয়। এর বাইরে তেমন কেউ যেতে পারছেন না। এই দুর্বলতার কারণই বা কী? রবীন্দ্রনাথ বাংলাসাহিত্যকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এই সত্য স্বীকার করেও রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে এসে নতুন সাহিত্য রচনায় মনোযোগী হয়ে বাংলাসাহিত্যকে গতি দিয়েছিলেন বিশ শতকের তিরিশের দশকের কবি-সাহিত্যিকরা। নাটকে সেলিম আল দীনের প্রভাববলয়ে মজে আছেন আমাদের অনেক নাট্যকার ও নির্দেশক। এটি আমাদের নাটকের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়।
বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের একটি বড় সীমাবদ্ধতা মঞ্চসজ্জায়। প্রায় প্রতিটি নাটকে একই ধরনের মঞ্চসজ্জা দেখতে দেখতে দর্শককে ক্লান্ত হয়ে যেতে হয়। একই ধরনের স্টেজ অবজেক্ট দিয়ে সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে মঞ্চে। জানি আমাদের নাটকের দলগুলোর বাজেট স্বল্পতার কথা। জানি, সারা দুনিয়ায়ই সামান্য বস্তু আর অভিনেতাদের কোরিয়োগ্রাফি বা শরীর দিয়ে বহু ধরনের কাজ সারার একটা প্রবণতা এখন বহুল ব্যবহূত। মেটাফর আর সিম্বলের মধ্যে যেন আমরা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছি। ফ্র্যাগমেন্টেড আর সাজেস্টিভ সেটের সিম্পলিসিটি নিয়ে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু দুনিয়ায় তো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে টুডি বা থ্রিডি ইমেজ বা এনভায়রনমেন্ট ব্যবহার বা প্রজেকশন ব্যবহারও কম নেই। সেসব তো আমাদের দর্শকদের দেখা দরকার।
মঞ্চে এখন আছে এক খণ্ডিত বাংলাদেশ। আছে মুক্তিযুদ্ধের নাটক, আছে বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর দুঃখগাথা। বিশেষ জনগোষ্ঠী, বিশেষ মানুষ আর বিশেষ সময়ের দুঃখ-হাহাকার-কান্না-আর্তনাদের ভিড়ে গ্রাম বা শহরে বাস করা আমাদের যে মূল জনগোষ্ঠী তাদের নির্বিশেষ বেদনার নাটকের সংখ্যা মঞ্চে খুব কম। গ্রামের মানুষের নির্বিশেষের জীবন প্রায় অনুপস্থিত, অনুপস্থিত নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবনও। 

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১১
ফজর৫:১০
যোহর১১:৫২
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:৩০সূর্যাস্ত - ০৫:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :