The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

মনস্তাপ

আলমগীর রেজা চৌধুরী

এই যে মিয়া ভাই শোনেন, এত গফ মারবেন না, এতক্ষণ ধৈর্য ধরে শুনতে শুনতে এখন ক্লান্ত। এত গফ মারেন কেমনে? অথচ ট্রেনে যখন উঠলেন, তখন তো ভাবলাম যাক, প্রফেসর সাব উঠছেন, আর যা হোক, জ্ঞানের কথা শোনার সুযোগ আছে। পুরু লেন্সের চশমা, উন্নত নাক, ড্যাব-ড্যাবা চোখ, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, কপাল এবং চুল মিলিয়ে আলাদা ব্যক্তিত্ব। না মিয়া ভাই, আপনি আমারে হতাশ করছেন! আপনি ছাগলের অধম। ওরা তো বিষের আড়াই পাতা খায়। আর আপনি এক চা নিয়ে এতক্ষণ চালিয়ে এলেন। ছাগল বললাম, রাগ করছেন? করতে পারেন। আপনি তো জানেন না, শাতিল তরু বলে এক ছাগল কবি আছে। আরে ছাগল কি কবিতা লিখতে পারে? তো এই কবি ছাগল নিয়া একটা অপাঠ্য কবিতা লিখলে বন্ধুমহলে ওকে ছাগল কবি কয়। আর দাড়ি-চুলের যা বাহার তাতে তো মনে হয়, ওর পূর্ব পুরুষ হনুমানের বংশধর! রামচন্দ্রের সঙ্গে সীতাকে উদ্ধার করা নিমগ্ন প্রেমিক সেজে লঙ্কাপুরী এসেছে। বাপে নাম দিছিল ছফরউদ্দিন। এইডা কোনো আধুনিক কবির নাম হইল! তাই পলিতেরিয়েত সাজার জন্য নামান্তর। এর বলে কইরা-কাইটা খাওনের জো হইছে। না ভাই, ছাগল কবি কইলেও সে রাগ করে না। বরঞ্চ পরিচিতি বেড়েছে! এই ছাগলটা তাতেই খুশি। তাই ছাগল বলায় রাগ করতে বারণ করেছি। লাভ অইতে পারে।
তো সোনার চাঁদ! এই ভিড়বাট্টার মধ্যে ঠিকঠাকমতো ফুলেশ্বরী ইসটেশনে নেমে যাওয়া ওই ধুমসি মেয়েলোকটার কাছাকাছি গিয়ে বসলেন। টাইবাবু মুকিত সাহেব আপনাকে বসার জন্য জায়গা দিতে চেয়েছিল। আপনি না বসে বেশ বিজ্ঞের মতো মাথা নিচু করে ধুমসির সামনে গিয়ে বসলেন। তখন ভাবলাম, এই চিড়িয়া তো মেয়েমানুষ ঘেঁষা! প্রফেসর সাব হয়ে গেল প্রেমিক পুরুষ! কিন্তু ধুমসি তো আপনাকে পাত্তাই দিল না। মনঃকষ্টে ঠিকঠাকমতো আমাগো ছাগল ভাইবা আপনার আসল রূপ প্রকাশ করলেন। খুব পরিশীলিত ভাষায়, ‘ভাই, ওরা খুব অবিশ্বস্ত। ওদের থেকে দূরে থাকবেন।’ ভাইসাব, আপনি তো বিয়েশাদি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সুখেই আছেন? না গলা ধাক্কা দিয়ে বাইর করে দিছে। দিতে পারে। আরে আপনি তো কাজের মেয়ের সঙ্গে কি জটিলতা করতে গিয়ে শেষে গৃহত্যাগী হবার জন্য ট্রেনে উঠে পড়েছেন। নিজেকে তো বাঁচাতে হবে। নইলে কেমন করে আফসোসের সুরে বললেন, ‘না ভাই, আমি খুবই সুখী?’
আরে ভাই, আপনি তো একটা বেক্কেল মরদ, সুখ কী বলেকয়ে বেড়ায়। আপনি স্ত্রী কর্তৃক নির্যাতিত পুরুষ। অক্ষমতা ঢাকার জন্য ভেক নিয়েছেন। নিতে পারেন।
‘আপনার কি লভ ম্যারেজ?’
‘জি না!’
‘তাহলে তো ফাইনালে আছেন।’
‘কেন?’
‘কেন আবার! ইয়েটিয়ে না থাকলে অন্তর শূন্য থাকে। সবাইকে পর মনে হয়।’
‘আমার কি তাই হইছে?’
‘আপনি তো বেশ টাসকি মাইরা গেছেন।’
ভাই, এইগুলো হলো ইউনিভারসোয়াল। প্রথমে আপনাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘মিয়া ভাই, করেন কী?’
তার আর প্রয়োজন হয়নি। কারণ, বকবক করে আপনি ঠিকুচি বলতে শুরু করলেন। ‘না ভাই এত অল্প বেতনে কি চলে?’
চলে না। সে কথা তো আমি আপনাকে আগেই বলেছি। আপনি যে টিপিক্যাল করনিক। আন্ডার গ্র্যাজুয়েট। প্রফেসর সাব নন। আপনার স্ত্রীর নাম জোবেদা খানম। কন্যা মোছাম্মত্ বিলকিস খানম তামান্না। ক্লাস ফোর-এ পড়ে। জোবেদা খানমের নানাবিধ রোগশোক আছে। তার জন্য ডাক্তার খরচ কম নয়। যে হারে লোক বৃদ্ধি ঘটছে তাতে তো চীনাদের মতন এক সন্তান নেবার শ্লোগান উঠবে। তাই আগে থেকেই সতর্ক পদক্ষেপ নিয়ে বেশ তৃপ্তিতেই আছেন। তা তো ঠিকই। ছোট্ট দেশ। মানুষ সতেরো কোটি। রাস্তায় হাঁটা যায় না। কাঁধের সঙ্গে কাঁধ লেগে যায়। স্বাধীনতার সময় ছিল সাত কোটি। বিয়াল্লিশ বছরে এত তো, ভবিষ্যতে কী যে হবে! ভাইসাব, এইখানে আপনে ভুল করছেন। সাত কোটির সময় আমরা না খেয়ে থাকছি। এখন ভাতের অভাব নেই। দেখেন না, লাউগাছ বুনলে এক মাসের মধ্যে ফলন খাওন যায়। মাটি ফলবান। শুধু সঠিক সময় চাষবাস করতে হবে। এই ফলবান মাটির জন্য কত হুন-পাঠান, মোগল-ইংরেজ-পাকিস্তানি ছুটে এসেছে। কেউ রাখতে পারে নাই। যাদের মাটি তাদের রয়ে গেছে। চিন্তার কিছু নাই। নিজেরাই ভালো হইলে হয়।
গফ ভাইসাব, আপনি স্বাধীনতার যুদ্ধ দেখছেন? দেখেন নাই। বয়স কত? তিরিশ। তার মানে আপনার জন্মের বারো বছর আগে দেশ স্বাধীন হইছে। কিন্তু কথা বলার সময় তো মনে হলো যে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ধনুয়া-কামালপুর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীর-উত্তম খেতাব নিয়ে বসে আছেন। তা ভাইসাব, আপনি কোন সেক্টরে যুদ্ধ করছেন? যুদ্ধ করেননি। তাইলে কিছুই জানেন না। এত বছর যে আলো-বাতাস প্রকৃতি, পশু-পাখির মধ্যে বেড়ে ওঠেছেন তার খোঁজখবর কিছু রাখেন? অ্যাই মিয়া, গণ্ডগোলের বছর কী? বলেন মুক্তিযুদ্ধের বছর। তিরিশ লক্ষ লোক প্রাণ দিল, তিন লক্ষ মা-বোন ইজ্জত দিল যার জন্য, তারে আপনি কইলেন গণ্ডগোলের বছর। লেহাপড়া তো শিখছেন ভালোই। ভাষাটাও শিখেন। আপনেরে বলি, এ দেশটা ফুঁ দিয়া জন্ম নেয় নাই। জন্মভূমিকে ভালোবাসতে শিখেন। কেন, তা ভাইসাব হিন্দু না মুসলমান? মুসলমান। তাহলে তো কোরানে পড়েছেন, ‘যে মাতৃভূমিকে ভালোবাসতে পারে নাই, তার পক্ষে কোনো কিছুই ভালোবাসা সম্ভব নয়।’ আপনে দেখি আগে থেকে পচ্চাবাদ গেছেন।
হেদায়েত ভাবছেন! ভাবতে পারেন। এখানে হেদায়েতের কিছু নাই। হেদায়েত, হেফাজতের জন্য প্রচুর লোক আছে। দেখেন নাই, হেদায়েত আর হেফাজতওয়ালাদের অবস্থা? ঢাকা শহরটা পুড়িয়ে দিতে পারলে খুশি হতো। গাছ-পালা-মসজিদ-কোরান-মানুষ-দোকানপাট কোনোটা পোড়াতে কাপর্ণ্য করেছে? এ রকম পোড়াপুড়ি মুক্তিযুদ্ধের সময় করেছে। ইসলাম আর পাকিস্তান রক্ষাকর্তা হিসেবে। আবারও সেই প্রেতাত্মারা কাউলা-কাউলি করছে। সাবধান। আপনি জন্মনিয়ন্ত্রণ করেছেন জানলে আপনার ভেসেকটমি খুলে দেবে। রাগ কইরেন না। তাইলে আমারটা শোনেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স চৌদ্দ-পনেরোর মতো। ক্লাস টেনে পড়ি। বাবা স্কুলশিক্ষক। এলাকার হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা বাবার ছাত্র। আমরা বাড়িঘর ছেড়ে বন-জঙ্গলে থাকি। রাত নামলেই যোদ্ধা গেরিলারা বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসে, স্যারের কাছ থেকে দোওয়া নিতে। আমার মা পরম মমতায় যোদ্ধাদের জন্য খাবার বন্দোবস্ত করেন। এ কথা চাউর হবার সঙ্গে সঙ্গে বাবার এক ছাত্র রিয়াজ কমান্ডার বাবাকে জায়গা ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। একদিন শেষ রাতের দিকে বাবা-মা আর আমি মিলে পালাতে গিয়ে ব্রিজ পাহারাদার চার-পাঁচ জন রাজাকার এবং মিলিশিয়া পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়। তারা বাবা-মাকে ছেড়ে দিলেও আমাকে আটকে রেখে রাস্তার এক পাশে নিয়ে যায়। আমার শিশ্ন দেখিয়ে মুসলমানিত্বের প্রমাণ দিতে হয়। যারা বেশি উত্সাহ নিয়ে এ কাজটি করল তারা ওই চার-পাঁচজন রাজাকার। তারা সবাই বাবার ছাত্র। যাদের বাবা শিক্ষা দিয়েছেন, ‘শিক্ষকের সম্মান মা-বাবার সমান।’ আমি! বাবা-মার সামনে ঘটে যাওয়া এ পরাজয় বহন করে যাচ্ছি। কত গ্লানি, পরাজয়ের শেকড় এতগুলো বছর ধরে ডাল-পালা বিস্তার করে চলছে।
ভাইসাব, আপনার জয়-পরাজয়ের কিছু নাই। আপনি তো যুদ্ধ দেখেন নাই। তৈরি সালুন পাইছেন, ঝাল-নুন কম হইতে পারে। শুকরিয়া আদায় করেন।
ও মিয়া ভাই, আপনি দেখি ট্যালা মাইরা গেছেন। কথা কন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন, কী সুন্দর হলুদ সর্ষেফুলের সমারোহ। যেন হলুদের চাদর বিছিয়ে রেখেছে। এসব ভালো লাগে না। না লাগার কথা। আপনি কি মরবিড। মনে হয় না। এ শ্রেণির হোমোসেপিয়েনরা আত্মকেন্দ্রিক হয়। জগত্ ও জাগতিকতা নিয়ে ভাবে না। একটাই জীবন, একবার মরে গেলে কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। সব মাটির আহার হয়ে যায়। তাইলে তো আকবর বাদশা এখনো ভারতবর্ষে রাজত্ব করত। একবার করে আজরাইল এলেই বলত, তোমাকে আমি বাংলা মুলুক দিয়ে দিলাম, আমারে দশ বছর আয়ু দাও। আরে অমরত্ব তো আর আমাদের আমলাদের মতো না। পারলে বঙ্গদেশ বিক্রি করে দেয়। আসল কথা কি জানেন, আপনি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আর তো কেউ জন্ম নেবে না। চিন্তা করার কিছু নেই। একদিন না একদিন আমি-আপনি ফাইনালে যামু। ওমাঃ আপনি দেখি ট্যারা। এতক্ষণ তো পুরু লেন্সের কারণে চোখ দেখিনি। আপনি কি লক্ষ্মীট্যারা? লক্ষ্মীট্যারা তো মেয়েমানুষ হয়। না না, আপনি মেয়েমানুষ না। পুরুষ। নইলে কি আর ধুমসির কাছ ঘেঁষতে চেয়েছিলেন। তো ভাইসাব, কী যেন বলছিলেন? জোবেদা খানমের অসুখ। অসুখ তো হবেই। ওই টাইবাবু মুকিত সাবরে জিজ্ঞেস করে দেখেন ওনার বেগম সাবের অসুখ কি না। আরে ভাইসাব, এইটা বোঝেন না কেন, মেয়েদের সব অসুখ জামাইবাড়ি। বাপের বাড়ি কোনো অসুখ নাই। তারপর জড়াইয়া থাকতে হয়। ছাইড়া দেবেন! সে জো নাই। নারী কেস সাংঘাতিক। জেলের ভাত খাইতে হবে। আর দেনমহরের টাকা কান ধইরা নিয়া নেবে। কন্যা বিলকিস খানম তামান্নাসহ ঘোরপোষ দাবি করব। আর যদি জজ সাহেবরে কেঁদে বলে আপনি তারে নির্যাতন করছেন, তাইলে তো আসল ক্যাচকি। জেলের ভাত ফিরায় কে? এত দিন সংসার করছেন, তার সন্তানের জনক হইছেন। তা কিন্তু মনে থাকব না। আবার বলে, দেবতা পারেনি বুঝতে, আমি সেই নারী। দেখলেন কেমন সুন্দর কথা? বাবা আদমেরে ভুলাইয়া কি সুতার প্যাঁচে ফেলে একেবারে স্বর্গচ্যুতি। সাবধান। ভাবিসাবরে যত্ন না করলে অসুখ আরো বাড়বে। টাকা খরচ হবে। যে স্বভাব আপনার! ভাবিসাব নজর রাখতে রাখতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মমতা দিন। অর্ধেক অসুখ কমে যাবে। কন্যা বিলকিস খানম তামান্না কি আপনার চেহারা পেয়েছে? ভাবিসাবের গায়ের রং ফর্সা। কন্যা হয়েছে দুধে আলতা। চোখ পাইছে আপনার। তাহলে তো সোনায় সোহাগা। মগজ কি আপনার না ভাবির? ভাবির। তাহলে কন্যা নিয়া ভাবনা নেই। ওর চিন্তা আপাতত স্থগিত রেখে দিন। কারণ কন্যা যতই বড় হবে ততই আপনার বদ খাছিলত বুঝে ফেলবে।
মিয়া ভাই কি ধর্মকর্ম কিছু করেন? নিয়মিত নন। তাহলে তো বিপদ! আধা ক্যাচলা কোনো কিছু ভালো না। ধর্ম সঠিক পালনে মানুষের ক্ষতি হয়েছে এমন নজির নেই। কোনো ধর্মেই মানুষের ক্ষতির কথা লেখা নেই। কল্যাণের কথা আছে। সৃষ্টিকর্তা একই কথা বলেছে। ভিন্ন সময়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অশান্ত নিখিলের জন্য কল্যাণকররা এসেছেন। আপনি আল্লাহ রাসুলের নাম নেন। দিলে মহব্বত পয়দা করেন। ভাবিও আপনাকে একজন ধার্মিক মানুষ ভেবে অনেক কিছু ক্ষমা করে দেবেন। না না, আপনি কোনো অপরাধ করছেন এমন কথা কি আপনাকে বলেছি। আকাশের তারা, জমিনের ফসল, মধ্যরাতের নিঝুম প্রহর কিন্তু আপনার বিপক্ষে সাক্ষী দেবে। বলবে, আপনি কেরামত আলী, পিতা মৃত জনাব আলী, সাং কাঞ্চনপুর, মিয়াবাড়ি, জিলা টাঙ্গাইল—এর বিরুদ্ধে তিনটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ১. সতেরো বছর বয়সে কৃষক কন্যা কিশোরী জরিমন বেগমকে পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। মেয়েটির চিত্কারে লোকজন ছুটে এসে আপনাকে জুতাপিটা করে ছেড়ে দেয়। জরিমন বেগমের কৌমার্য হননের চেষ্টাকারী হিসেবে পাপিষ্ঠের খাতায় নাম আছে। অতএব...
২. চৌদ্দ বছর বয়সে আপনার সিফিলিস হয়েছিল। আপনার ভূস্বামী বাবা শহরে নিয়ে চিকিত্সা করিয়ে পুত্রের জীবন রক্ষা করেছিল। তারপরও আপনি বলতে পারেন, কত মহান মানুষের কত গোপন রোগ রয়েছে। সমস্যা হলো, তারা মহামানব। আপনি এখনো কেরামত আলী। মহামানবরা মানবের কল্যাণ করে। কেরামত আলী রোগ বহন করে। সমাজে ছড়ায়।
৩. প্রথম স্ত্রী মোহসেনা আক্তারকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। দরিদ্র পিতার সন্তান ঘৃণায়, অপমানে আত্মহত্যা করেছে।
আপনি বলছেন, আপনার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সত্য নয়। আরে ভাই, খামাখা এ বিষয়ে আমাকে জড়াচ্ছেন কেন? আমি কি এসব ঘটনা জানি? যারা বলছে, তারা আমাদের সগোত্রীয় নয়। ঈশ্বরের সৃষ্টি। আমি না হয় আপনাকে প্রথম দেখলাম। ওদের চেনা জন্ম-জন্মান্তরে। পালাবার পথ নেই। কী করবেন। বদস্বভাব ঝেড়ে ফেলুন, জীবন এমনি সুন্দর হয়ে উঠবে। জ্ঞান দান করছি। ওই যোগ্যতা কি আমার আছে? বোঝেন না, আপনাকে প্রফেসর সাব ভেবে বসি? মাফ করবেন, মিয়া ভাই। এ পৃথিবী হয়েছে জ্ঞানের আড়ত্। জ্ঞান দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধের সুযোগ আছে। দেখেন না অন্ধকারের জন্য বিদ্যুত্ বানাইছে। ঝড়-বৃষ্টি-রোদ-শীতের জন্য ঘর বানাইছে। চলনের জন্য যে ট্রেনে চড়ে আমরা যার যার গন্তব্য যাচ্ছি তা তৈরি করেছে জ্ঞানীরা। রসুল তো জ্ঞান অর্জনের জন্য চীনে যাইতে কইছে। তার সময় চীন জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ছিল। সৃষ্টিকর্তা এত বড় একটা পৃথিবী তৈরি করেছে তা কিন্তু আমার আপনার জন্য। কষ্ট পাবার কিছু নাই। দেখেন না, রেডিও বানাইলো মার্কনি। মরে কবে ভূত হয়ে গেছে, আপনি তা ভোগ করছেন। অবাক, না? এখন তো রেডিও-টেলিফোন, টেলিভিশন পকেটে নিয়ে চলাচল করে। দেখেন না মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়ে দেশ বানাইলো আর রাজাকারদের গাড়িতে ফ্ল্যাগ ওড়ে। অবাক, না! কী করবেন। কোনো দিন প্রতিবাদ করেছেন? করেননি। করবেন কী করে। আপনি নিজেই তো অপরাধী। আপনার কারণে একটি ফুটফুটে চাঁদের মতো মেয়ে আত্মহননের শিকার। আপনি অস্বীকার করলে কী হবে। জগত্ জানে। আপনি একজন পাপিষ্ঠ। আচ্ছা আপনার ওই মেয়েটির কথা মনে পড়ে না? অভিমানী একজন নারী নীরবে পৃথিবীর সঙ্গে সব দেনা চুকিয়ে আপনাকে অপরাধী করে চলে গেছে। কী নিষ্করুণ পৃথিবী!
আরে আসল কথা তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। আপনি যাবেন কোথায়। অনন্তপুর। এ নামে কোনো স্টেশন নেই এই লাইনে। ওইখানে আপনার গ্রামের বাড়ি? সুন্দরপুর স্টেশনে নেমে তিন কিলো পথ। চারদিকে ঘন গাছ-গাছালি। পাশ ঘেঁষে স্রোতস্বিনী বংশাই নদী। ছেলেবেলায় এই নদীর জলে কত ডুব-সাঁতার দিয়েছেন। অনন্তপুর এখন কে থাকেন? কেউ না। বলেন কী? তাহলে তো অনেক দিন আগেই এতিম হয়ে গেছেন। কী করবেন। বাবা-মা চিরকাল কারো বেঁচে থাকে না। বাড়িভিটা পাহাড়া দেয় কে? পাড়াতো ফুপু। ক্ষেত করার জন্য একজন চাকর আছে! তাহলে তো ঠিকানাটা আছে। খেয়াল রাখবেন যাতে বেদখল না হয়ে যায়। এ রকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে! রক্ষক শেষ পর্যন্ত ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়। আমার কথায় রাগ করবেন না। মানুষ এ রকমই। জানেন তো, পৃথিবীতে কোনো প্রাণী সগোত্রীয় হত্যা করে না। শুধু মানুষ করে।
ভাইসাব, এত উশখুশ করছেন কেন? না না, সুন্দরপুর এখনো অনেক দূর। আরো ঘণ্টাখানেকের পথ। ও মুকিত বাবু, আমাদের জন্য তিন কাপ চার ব্যবস্থা করা যায় কিনা। বরঞ্চ আপনি খাবার গাড়ির স্টুয়ার্টকে বলেন। মিয়া ভাইকে তো আর অসম্মান করতে পারছি না। না বলছেন কেন? আপনাকে ভালো না লাগলে এতক্ষণ যে প্যাঁচাল পাড়লাম তা হয়তো পাড়া হতো না! চুপচাপ। এ যাত্রা নিরানন্দ কাটত। এখন মনে হচ্ছে, মিয়া ভাই মানুষ হিসেবে পাপ-পুন্নির দোসর। তা তো ঠিকই, আপনি তো আর খোদার ফেরেস্তা না! মানুষ। পৃথিবীর এত জটিলতার মধ্যে কিছু ত্রুটি তো থাকবেই। মানুষ বলেই থাকবে। প্রভু জ্ঞান দিয়ে তো বিপদে ফেলেছেন রে ভাই! কুকুর, বিড়ালের তো পাপ-পুণ্যি নেই। মৃত্যুর পর হিসেব দিতে হবে না। মানুষের দিতে হবে। জগতের দায়ভার মানবকুলের।
আমি কিন্তু আপনার গফ-এর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কী সুন্দর করে আপনি গফ বলেন। যেন গফের নায়ক স্বয়ং। উচ্চারণে আঞ্চলিকতা থাকলেও কাহিনি বেশ রসালো। রহস্যময়। রহস্যময় বুঝলেন না। মিস্ট্রিরিয়াস। সত্য লুকানোর স্বভাব রয়েছে। না না, আপনাকে মিথ্যুক বলব কেন? আপনি কি মিথ্যার কিছু বলেছেন? বলতে পারেন! মিথ্যা বলা মানব চরিত্রের সহজাত প্রবৃত্তি। দেখুন দেখুন, মুকিত বাবু কষ্ট করে চা নিয়ে এসেছে। নিন, এক কাপ চা খান। চায়ের রং ভালো। বেশ গরম।
বাইরে তাকিয়ে দেখেন, কী চমত্কার সন্ধ্যা নামছে। দিগন্তজুড়ে সূর্যের তেরছা আলো পড়ছে। আর কতক্ষণ পর জাঁকিয়ে আঁধার নামবে। অবশ্য তার আগেই আপনি সুন্দরপুর স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। আর তিন কিলো রাস্তা তো আপনার চেনা। ওই রাস্তা দিয়ে পথ হেঁটে আপনি কতবার সুন্দরপুর স্টেশন এসে ঢাকার গাড়ি ধরেছেন। তারপরও অনন্তপুরের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে গেছে। এ রকম সবার হয়। আমার হয়েছে। নগর সভ্যতা আমাদের গ্রাস করেছে! সুন্দরপুর স্টেশনে নামার পর আপনার প্রথমা স্ত্রী মোহসেনা আক্তারের কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক। প্রথম যেদিন দূর গাঁ থেকে তাকে বিয়ে করে পালকি চড়ে বাড়ি ফিরলেন, সে কথাও মনে পড়তে পারে। মোহসেনা আক্তার প্রগলভা নারী। জগতের এত কিছু জানার সুযোগ নেই। স্বামীকে নিয়ে কোনোরূপ অবিশ্বাস্য চিন্তা তার মাথায় ছিল না। আর থাকবে কেমনে, শান্ত, স্নিগ্ধ, সারল্য গড়া নারীটির আপনার কোনো ছলনা বোঝার অথবা প্রতিবাদ করার যোগ্যতা ছিল না। সে তার স্বামীকে মনে করত নির্ভরশীল আশ্রয়। অথচ কী আশ্চর্য! কিছু বোঝার আগেই লাশকাটা ঘরে টেবিলের ওপর চিত্পাত শুয়ে থেকে এক রকম ঘৃণা উপহার দিয়ে কেমন ব্যঙ্গ করল। আপনি কি তার লাশ দেখেছিলেন? আপনার কি তার জন্য একটু অনুতাপ হয়নি। অবশ্যই হয়েছিল। কারণ বাসর রাতে আপনি তো তাকে কত নির্ভরতা, কত বিশ্বাসের বাণী উপহার দিয়ে সম্ভ্রমের অধিকার পেয়েছিলেন। আহ্! কেরামত ভাই, সত্যি করে বলেন তো আপনি কি তার মৃত্যু চেয়েছিলেন? নইলে তলপেটে লাথি মেরে ভ্রূণ হত্যা করতে পারতেন না। মোহসেনা আক্তারের দরিদ্র পিতার যৌতুকের দশ হাজার টাকার চেয়ে ওই ভ্রূণ অনেক মূল্যবান।
তো আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে পরবর্তী স্টেশনে ভাইসাব নেমে যাবেন। এ অধমেরে ক্ষমা করবেন। অনেক বেফাঁস কথা বলে ফেলেছি।
আরে ভাই কাঁদছেন কেন? ছেলেমানুষি করবেন না। ঠিক আছে, কিছুক্ষণ কাঁদুন। কাঁদলে বুকটা হালকা লাগবে।
বলতে বলতে সুন্দরপুর স্টেশন এসে ট্রেন থেমে যায়। চোখে জল নিয়ে ব্যাগ হাতে প্লাটফর্মের ও মাথায় হেঁটে যায় কেরামত আলী। সুন্দরপুর স্টেশনে তিন মিনিট ট্রেন থামে। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা যায় কেরামত ভাই ফিরে আসছে। ট্রেন ছেড়ে দেবার আর তিরিশ সেকেন্ড বাকি!
‘জানেন, আজ মনে হয় আমি মোহসেনার ওপর অন্যায় করেছি! ও আমাকে কোনো দিন ক্ষমা করবে না। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।’
বলতে বলতে ট্রেন ছেড়ে দেয়। কলরবমুখর প্লাটফর্ম দিয়ে ব্যাগ হাতে নিঃসঙ্গ কেরামত আলী হাঁটছে। একজন পাপিষ্ঠ, সন্তপ্ত মানুষ ক্রমশ দূরতর হতে হতে এক সময় অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। 

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৪
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :