The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

সরহের দোহাএবং অতীশ দীপঙ্কর

আবুল কাসেম

অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতের থো-লিং বিহারে দোহা সম্পর্কে রাজা, বৌদ্ধপণ্ডিত এবং শ্রমণদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। সময়টা একাদশ শতক। তখন সারা তিব্বত জুড়ে সরহের ‘ত্রিচক্র’ দোহার ব্যাপক চর্চা এবং আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
অতীশ দীপঙ্কর সর্বজনশ্রদ্ধেয় পণ্ডিত ব্যক্তি এবং জ্ঞানতাপস। তিব্বতের পণ্ডিতেরা তাঁকে ‘শ্রীজ্ঞান’ বলে সম্বোধন করেন। তিনি বললেন, কোনো পাণ্ডুলিপি ছাড়াই সরহ রাজা-রাণী এবং জনগণের সম্মুখে মুখে মুখে আবৃত্তির মতো সুর করে দোহাগুলো গাইছিলেন। উপস্থিত সবাই ভেবেছিলেন সরহ মুখস্থ করে এসেছেন দোহাগুলো। আসলে কিন্তু তা নয়। বলে একটু থামলেন অতীশ দীপঙ্কর। পরে আবার বললেন, পরদিন কতিপয় লিপিকর উপস্থিত হলেন তাঁর কাছে। এরা দোহাগুলোর প্রতিলিপি তৈরি করবেন। সরহ তাদের অবাক করে দিয়ে বললেন, আমি কোনো পাণ্ডুলিপি তৈরি করিনি, মন থেকে বলেছি। এরা হতাশ হলেন।
সরহ বললেন, আমি এখন আবার বলে যাব, আপনারা লিখে নেবেন। আমি অবশ্য এগুলো লিপিবদ্ধ হবে সেরকমটি কখনো ভাবিনি। সরহ তিন জন লিপিকরকে বেছে নিলেন।
অন্যেরা আবেদনের সুরে বললেন, ভান্তে, দোহাগুলো তিন রকম হলেও আমরা সবাই মিলে লিপিবদ্ধ করতে চাই। তিন জন নয়, তিন ভাগে ভাগ করুন আমাদের।
কীভাবে ভাগ করব?
চল্লিশ স্তবকের জন্য দু’জন, আশি স্তবকের জন্য চার জন।
কথা শেষ হবার আগেই সরহ বললেন, একশ ষাট স্তবকের জন্য আটজন। কিন্তু আপনারা তো এগার জন।
তাহলে দুই, তিন এবং ছয় হিসেবে।
তা-ই সাব্যস্ত হয়ে গেল।
সরহ বলা শুরু করলেন। এখন সুর সংযোগ নয়, কবিতা আবৃতির মতো করে। তিন শ্রেণির লিপিকরকে একই সময়ে তিন রকম দোহা লিপিবদ্ধ করতে বললেন। ওরা খুব অবাক হলেন। কিন্তু সরহের প্রতিভায় মুগ্ধ, লিপিবদ্ধ করতে উদ্যোগী হলেন দ্রুততার সঙ্গে।
একজন জানতে চাইলেন, ভাষা কি গতকল্যের মতোই?
গতকল্য অপভ্রংশ ভাষায় দোহাগুলো গেয়েছিলেন সরহ। বললেন, নিশ্চয়ই, আপনাদের অসুবিধে হবে না তো!
সংস্কৃত ভাষার একজন লিপিকর বললেন, সংস্কৃত ভাষার পাঠক বেশি। গতকল্য অপভ্রংশ ভাষায় গেয়েছেন, সংস্কৃত ভাষায় বললে উত্তম হয়।
আরেকজন বললেন, শৌরসেনী প্রাকৃতে হলে ভালো হয়।
সরহ এ ভাষাগুলোও ভালো জানেন। কিন্তু বললেন, অপভ্রংশ লোকজনের অন্তরের ভাষা। একই ভাষায়ই লিপিবদ্ধ করুন। কেউ চাইলে তা অন্য ভাষায় রূপান্তর করতে পারবে।
গণদোহা যারা লিপিবদ্ধ করবেন তাদের সংখ্যা বড়। তাদের তিনি আলাদাভাবে সামনে বসতে দিলেন। রাণীদোহার লিপিকররা বামে এবং রাজদোহার লিপিকরদের ডানে বসালেন।
ডানদিকের লিপিকরদের উদ্দেশ করে বললেন, আপনারা লিখুন, একটু ভেবে আবার বললেন, না সবাই লিখুন, ‘আমার প্রণতি গ্রহণ কর হে মহত্ মঞ্জুশ্রী’।
সবাই তা লিখলেন এবং পরে সরহ শুধু বলে গেলেন। আর লিপিকররা লিখে গেলেন। একবার একেক শ্রেণির দোহা।
তান্ত্রিক উত্সবেই তাঁর দোহার সুনাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। লিপিকররা লিপিবদ্ধ করার পর দোহাগুলো সংগ্রহের জন্য একটা প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হলো। ফলে লিপিকরদের বহু কপি লিপিবদ্ধ করতে হলো। ভিন্ন ভিন্ন হাতে একসময় এগুলো লিপিবদ্ধ হতে শুরু করল। ফল হলো এই, কিছু শব্দ এবং পঙিক্তও পালটে গেল। তারপরও মনে করার সঙ্গত করণ রয়েছে যে, তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তার মূল্যবান বাহন হিসেবে দোহাগুলোর সাহিত্যিক মূল্য কম ছিল না। সমকালে দোহাগুলো ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে জনপ্রিয় সাহিত্য হিসেবে।
আমাদের কাছে দোহাগুলোর মূল্য শুধু সাহিত্য হিসেবে নয়, এগুলোর মধ্যে তান্ত্রিক বজ সাধনার যে অমিয় উপাদান রয়েছে, আধ্যাত্মিক ভাবনা ও গুহ্যসাধনার যে নিগূঢ় রহস্য রয়েছে—তার জন্যও। বললেন বিনয়ধর। তিব্বতি আচার্য বিনয়ধর তিব্বতের রাজা চানচুবের সময়ে তাঁর পিতৃব্য রাজা লাহ-লামা-যে-শেস-এর মৃত্যুকালে লিখে যাওয়া পত্র নিয়ে বিক্রমশীল বিহারে গিয়েছিলেন। এ চিঠি পেয়ে প্রয়াত রাজার প্রতি সম্মান দেখাতেই অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে আসেন। তবে বিক্রমশীল বিহারের অধিনায়ক আচার্য রত্নাকর আসতে দিতে চাননি। আচার্য রত্নাকর বিনয়ধরকে বলেছিলেন, ‘অতীশ না থাকিলে ভারতবর্ষ অন্ধকার’।
অতীশ দীপঙ্করকে দোহাগুলো সম্পর্কে শিক্ষা দিতে অনুরোধ করেন ব্রমস্তোন। তাঁর বিশ্বাস তাহলে তিব্বতিরা দোহাগুলোর মর্মার্থ এবং সাহিত্যগুণ সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারবে। কেউ কেউ দোহাগুলোর তিব্বতি অনুবাদ করলেও অতীশ দীপঙ্কর শিক্ষা প্রদানের সময় তা অনুসরণ করেননি। রচনার মূল ভাষা এবং তিব্বতি ভাষা তাঁর সমানভাবে জানা ছিল। একাদশ শতকের দাম পা-র অনুবাদ মূলের কাছাকাছি হলেও অতীশ তা পছন্দ করেননি। এসময়ের আরেক ভারতীয় পণ্ডিত বজ্রপাণি। তিনি অনেক তিব্বতিকে শিক্ষা দান করেছেন। একদিন অতীশ দীপঙ্করকে বললেন, মূল অপভ্রংশটা আমার তেমন জানা নেই, এ ব্যাপারে আমি আপনার সহায়তা চাই। কারণ, মূলটা ভালো জানা না থাকলে অনেক শব্দের মর্মার্থ বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে। স্বীকার করতেই হবে সরহ অত্যন্ত গভীরতাসম্পন্ন কবি ছিলেন।
অতীশ দীপঙ্কর দীর্ঘকাল বঙ্গ ও পুণ্ড্রবর্ধনের জগদ্দল বিহারসহ নানা বিহারে অবস্থান করেছেন। তিনি মহারাজ মহীপালের আমন্ত্রণে বিক্রমশীল মহাবিহারের মহাচার্যের পদ গ্রহণ করেছিলেন। অপভ্রংশসহ প্রাকৃত ভাষাসমূহে তাঁর দখল অপরিসীম। বললেন, ভাষাগত বিষয়টা অবশ্যই সর্বাগ্রে বিচার্য। তবে অনেক শব্দের ব্যুত্পত্তিগত অর্থকে অতিক্রম করেছেন সরহ। আপনি এবং অন্য যারা সরহ পাঠ করছেন কিংবা পঠনে সাহায্য করছেন তাদের তা অনুধাবন করতে হবে। এ নিয়ে আমরা আলোচনাও করতে পারি।
বজ্রপাণি সূক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন পণ্ডিতব্যক্তি। অতীশ দীপঙ্করের কথার অর্থ সহজে বুঝতে পারেন, বললেন, তা অবশ্যই। কিছু কিছু শব্দের অর্থ আমার কাছে স্পষ্ট নয়।
এ সময় নারু পা উপস্থিত হলেন, আপনাদের সঙ্গ পেতে ছুটে এলাম। একটু হেসে বললেন, আমি স্বীকার করছি তাঁর সময়ে তো বটেই আজও সরহ আমার কাছে অসাধারণ এক দোহাকার। তাঁর ভাষা প্রাচীন অপভ্রংশ হলেও বিরাম চিহ্নের সন্নিবেশটা ঘটিয়েছেন বাংলার ধরনে। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সহজে তা বুঝতে পারেন।
অতীশ বললেন, অন্য বিষয়গুলো আমার জানা নেই, তাই আমি কতটুকুই জানি বা বুঝি, তবে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছি, গণদোহায় সরহ তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ তত্ত্বকথার জায়গায় এমন সহজ কিছু কথা বলছেন, যা তিব্বতি ভাষার অনুবাদে অনুপস্থিত। মূলের সঙ্গে তার দূরত্ব এত বেশি যে, মনে হবে এরা মূলটি কখনোই দেখেননি।
সেজন্যই আমি আপনার সঙ্গে আলোচনার যথার্থতা খুঁজে পাই। বজ্রপাণি একথা বলে নারু পা-র উদ্দেশে বললেন, বয়স আমাদের চাইতে কম হলেও আপনার বিচক্ষণতার মূল্য আমি দিই। সরহ তাঁর সব লেখায়ই এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেগুলোর বৈশিষ্ট্য শুধু তাঁর শিল্পভাবকে নির্দেশ করে। এগুলোর নিগূঢ় মর্মার্থ অনুধাবন সত্যিই দুঃসাধ্য।
বজ্রপাণি তাঁর সঙ্গে একমত প্রকাশ করলেন মাথা নেড়ে। তিব্বতে ভারতীয় চিন্তাবিদ অবধূতি পা’র কিছু অনুবাদকর্ম পাওয়া যায়। অতীশ দীপঙ্কর বললেন, আমি তাঁর অনুবাদ পড়েছি। তাঁর পাণ্ডিত্য আছে। তবে তিনি সম্ভবত অপভ্রংশ থেকে নয়, অন্য কোনো ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন। তাঁর উচিত ছিল মূলের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়া। আমরা যদি ধরেও নিই তিব্বতীয় টীকাকাররা মূলের ভাষায় দোহাগুলোর অর্থ অনুধাবন করেছেন, তারপরও কথা থেকে যায়, মূলের সংশ্লিষ্ট শব্দটা হূদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন কিনা—কারণ মূল অপভ্রংশ দোহা তিব্বতে দুর্লভ। অপভ্রংশ ব্যতীত অপর কোনো ভাষা থেকে অনুবাদ সঙ্গত কারণেই ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে।
বজ্রপাণি বললেন, আরেকটি মজার তথ্য আছে, কোনো কোনো তিব্বতি অনুবাদে মূলের চেয়ে বেশি শ্লোক বা স্তবক দেখতে পাওয়া গেছে। এতে কী প্রমাণ হয়?
নারু পা আরও একটু গভীরে গিয়ে বললেন, তালপত্রে লিপিবদ্ধ অপভ্রংশ ভাষার দোহাগুলোর কিছু অংশ ভেঙে যাওয়ার ফলে সেগুলো হারিয়ে যায়। ওই অংশটি কেউ কেউ জুড়ে দিয়েছেন মনগড়াভাবে।
বজ্রপাণি সায় দিলেন। সরহ নাগার্জুনের শিক্ষক ছিলেন। মনে করা হয় মৈত্রী পা-কে সরহ তিনটি দোহাই আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন। আমরা নাগার্জুনকে দ্বিতীয় শতকের মানুষ বলে জানি। মধ্যমকা দর্শন চিন্তার নাগার্জুন কি তিনি? হয়তো তিনি আরেকজন, যিনি সরহকে অনুসরণ করেছেন।
হতে পারে। বলে থামলেন নারু পা। আবার নিজে থেকেই বললেন, নাও হতে পারে।
অতীশ দীপঙ্কর বললেন, আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি। সরহের ঐতিহাসিকত্ব সন্দেহাতীত। তিনি যেন নিজেকে অতিক্রম করেছেন চিত্রকল্প থেকে চিত্রকল্পে, আবেগের সৌন্দর্য থেকে আবেগের সৌন্দর্যে, তত্ত্ব থেকে তত্ত্বের গভীরে, তবে তা যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্যভাবে। তাতে সমস্যা হয়েছে কোনো কোনো দার্শনিকের, এরা উত্তরণের পথে কাব্যিক ভাবনায় খেই হারিয়ে সরহের বিচিন্তন ধারা থেকে ছিটকে পড়েছেন। অনুবাদকদের ক্ষেত্রেও এ সত্য প্রযোজ্য। কেউ যদি চিন্তার পদ্ধতিগত ক্রমবৃদ্ধিকে অনুসরণ করতে না পারেন তাহলে তার পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন তিনটি দোহার গভীরতায় প্রবেশ বাস্তবিক ক্ষেত্রেই কঠিন।
বজ্রপাণি বলে উঠলেন, এজন্যই কি কেউ কেউ রাজদোহা ও রাণীদোহাকে সরহের সৃষ্টি বলে স্বীকার করতে চান না।
এ বিতর্কটি আমি শুনেছি। বললেন অতীশ দীপঙ্কর। ঐতিহ্যগতভাবে সরহের কাজগুলো ‘দুহা স্কুল জসম’ বা ত্রিচক্রদোহা বলে পরিচিত এবং রাজার দোহা, রাণীর দোহা এবং গণদোহা বলে বিবেচনাও করা হয়। এগুলোর মূল শৈল্পিক পরিচয় সঙ্গীত হিসেবে। আর ভাষা হচ্ছে দেশীয় ভাষা বা উপভাষা। এই ভাষারও একধরনের জোর বা শক্তি আছে—যা প্রমিত ভাষা বা সংস্কৃতের নেই। দেশীয় বা উপভাষায় অনেক শব্দ পাঠক বা অনুবাদকদের কাছে পরিচিত নয়—তাই এগুলোর মর্মার্থ শুধু ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। প্রত্যেকটি দোহার সংগ্রহে তার মৌলিকত্বের সমস্যা রয়েছে। এমনকি অস্তিত্বের সমস্যাও। এসব বিচিত্র সমস্যার কারণে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে যে, তিন ভাগ করা দোহাগুলোর সবগুলো কি সরহের সৃষ্টি? কিন্তু এ নিয়ে আমার জবাব সুস্পষ্ট। এগুলো সরহেরই মৌলিক সৃষ্টি—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
নারু পা বললেন, অতি সম্প্রতি রাসচূং পা আমাকে জানিয়েছেন, জিলইংরাজ পা তাকে বলেছেন গণদোহাই একমাত্র সরহের সৃষ্টি। বাকি দু’টি লামা-বাল পু-র রচনা।
লামা-বাল-পু-র রচনা বলা হলো কেন? প্রশ্ন করলেন বজ্রপাণি।
এরা শুধু গণদোহার টীকা পেয়েছেন ভারতে। ভারতে অন্য দুই দোহার টীকা-টিপ্পনী কোথাও পাননি। বাল-পুর কাছে তিনটি দোহা পাওয়া গেছে।
অতীশ দীপঙ্কর এই যুক্তিতে হেসে দিলেন। বললেন, মার পা আমাকে বলেছেন তিনি ভারতে মৈত্রী পা-র কাছে দোহাগুলো পাঠ করেছেন এবং তিনটি দোহার কথাই তার প্রিয় শিষ্য মি লা রাস পা-কে বলেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন এবং তার কাছে দোহা তিনটি হস্তান্তর করেছেন। ভারতে মৈত্রী পার সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি পণ্ডিত ব্যক্তি। অপভ্রংশের মূল দোহা তিনটি আমি তার কাছে প্রথম দেখেছি।
বজ্রপাণি খুব হেসে বললেন, শ্রীজ্ঞান, আপনি শুনে অবাক হবেন লামা-বাল-পু আমার শিষ্য। আমার কাছে সে দীর্ঘদিন শিক্ষা গ্রহণ করেছে। আমি তার কাছে দোহাগুলো দেখেছি। আমি তার যুক্তি এবং ব্যাখ্যায় মুগ্ধ। অনুবাদটাও গ্রহণযোগ্য মনে করি। সে নেপালি বলে তিব্বতিদের কাছে তার কাজের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। তবে সব তিব্বতি এক নয়, তাদের অনেক কাজের আমি প্রশংসা করি।
নেপালরাজ অনন্তকীর্তির পুত্র পদ্মপ্রভ অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে তিব্বতে এসেছেন। বললেন, লামা-বাল-পু-এর পাণ্ডিত্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। তবে মহাচার্য যথার্থই বলেছেন দোহাগুলোর মৌলিকত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ করা চলে না। লামা-বাল-পু ভুল বুঝতে পারেন।
অপরান্তরাজ ভূমিসংঘ রাজসিংহাসন ছেড়ে অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গী হয়েছেন। তিনি বললেন, রাসচূং পা জিলংরাজ পা-র কথা উদ্ধৃত করে যে উক্তি করেছেন তা ত্রিচক্র দোহার মূল ভাবনাকে ব্যাহত করে। কারণ, দোহাগুলোর অভ্যুদয় যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে, তা একজন রাজার উপস্থিতি এবং গৌবরময় মুহূর্তকে অবলম্বন করে, যা কোনো অবস্থায়ই উপেক্ষা করার মতো নয়। রাজার সম্মুখেই সরহ তিন ধরনের দোহাগান করেছিলেন।
পণ্ডিত ভূমিগর্ভ অতীশ দীপঙ্করের ভ্রমণসঙ্গী। বললেন, তিব্বতি পণ্ডিতদের সৌভাগ্য আচার্য রত্নাকরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও মহাচার্য অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে এসেছেন। না এলে দোহা সম্পর্কে বিভ্রান্তি থেকে যেত।
রাজা চানচুব অতীশ দীপঙ্করের একজন গুণমুগ্ধ শ্রোতা। এতক্ষণ চুপচাপ পণ্ডিতদের আলোচনা শুনছিলেন। এবারে বললেন, আমাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে। রাজা লাহ-লামা-যে-শেস প্রথম যখন আমন্ত্রণ জানান তিনি তিব্বতে আসেননি। আমি সৌভাগ্যবান, এ সময়ে তাঁর পদার্পণ ঘটেছে। তাঁর এই আগমন অনেক বিষয়ে আলোক বিচ্ছুরণের মতো ত্রিচক্রদোহা বিতর্কের সমাপ্তি ঘটিয়েছে।
বলে তিনি হাত জোড় করে অতীশ দীপঙ্করকে ভক্তি জানালেন।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বললেন, পুণ্ড্রবর্ধনের সোমপুর বিহার এবং বঙ্গ কামরূপসহ ভারতের সর্বত্র যত না সরহের দোহার চর্চা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে এই তিব্বতে। আমার তা ভালো লাগছে এবং পণ্ডিতদের সান্নিধ্যও ভালো লাগছে। দেখুন, মতের অমিল থাকবে।
তা নিয়ে বিতর্ক হবে, তা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমি এ বিতর্ককে গুরুত্ব দিই। আচার্য ধর্মপাল, মহাচার্য শীলভদ্র মহাযানী মতবাদকে প্রচারের ক্ষেত্রে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। সরহ পা এবং কাহ্ন পা প্রমুখ সিদ্ধাচার্যগণ বজ্রযানী তান্ত্রিক ধ্যান সাধনার পাশাপাশি সহজযানী মতবাদকে প্রতিষ্ঠার জন্য বার বার উন্মুক্ত বিতর্কের আয়োজন করেছেন, কখনো কখনো বিব্রতও হয়েছেন, কিন্তু পরমতের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা কম ছিল না। আমরা এসব তান্ত্রিক সাধকদেরই উত্তরাধিকারী। তিব্বতের পণ্ডিতগণ ত্রিচক্র দোহা নিয়ে যে বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন তা অমূলক নয়। মূলের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হলেই অমূলক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এখন আশা করি বিতর্কের অবসান হবে। তবে আমি গর্বিত আপনাদের সান্নিধ্য পেয়ে।
আচার্য বিনয়ধর বললেন, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের আলো বোধহয় আর বেশি দিন পাব না। আচার্য রত্নাকর তাঁকে তিন বছরের জন্য ছুটি দিয়েছিলেন। সে সময় শেষ হতে চলেছে।
রাজা চানচুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমরা মহাচার্যকে হারাতে পারি না।
একথা শুনে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান শুধু স্মিত হাসলেন। এ হাসি থো-লিং বিহারের পণ্ডিতগণের চেহারায় প্রত্যাশার এক আলোকরশ্মি ছড়িয়ে দিল।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ১৯
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০৩
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৩২
এশা৭:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৩৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :