The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

হূদয়ের রসায়ন

গোলাম শফিক

রমনা পার্কে এক প্রত্যুষে হাঁটার স্মৃতি এখনো মনে আছে শামীমের। সেদিনই প্রথম ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বিকট অট্টহাসি শুনে সে চমকে ওঠে। তারপর শুরু হয় যুবা-প্রৌঢ়দের সম্মিলিত অট্টহাসি। শামীম থমকে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ উপভোগ করে। ফিরবার পথে এক পরিচিতজনের সাথে সাক্ষাত্ হলে সে এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে। তার পরিচিতজনটি বললেন, ‘হাসলে হার্ট ভালো থাকে, এটাও এক্সারসাইজের অংশ, হূিপণ্ডটা তো আর এমন জিনিস নয় যে এটাকে খুলে এনে দৌড়ঝাঁপ করিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দেওয়া যায়।’ ‘ভালো কথা মনে করেছেন, অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় দেখেছিলাম একটি মজার কার্টুন: একটা হার্টের ওপর ব্রাশ দিয়ে ঘষা হচ্ছে।’
শামীমের মুখে এ কথা শুনেই ভদ্রলোক হাঃহাঃ হেসে উঠলেন।
এদিন বিকেলে নিলার সাথে দেখা হলে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে শামীম এক বিকট অট্টহাসি দেয়। নিলা লাফ দিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করে, ‘এমন করলে কেন? আমি ভীষণ ভয় পেয়েছি।’ বলেই জামার গলাটা বুড়ো আঙ্গুলে টান দিয়ে সরিয়ে মাথা নুইয়ে ‘থুথু’ দিল বুকের ওপর। শামীম আড়চোখে দেখে নিলার বুকের ভাঁজ, মাঝখানে হূদয়াকৃতির লকেট। বলে, ‘থুথু দিয়ে হার্ট ঠিক রাখা যায় না। আমার মতো একটা হাসি দাও, দেখবে হূদয় সতেজ হয়ে উঠেছে।’
‘যা দুষ্টু!’ একথা বলেই নিলা আবার বলল, ‘অনেক হয়েছে। মাই গড, ভুলেই গিয়েছিলাম যে এ নোটটা ফটোকপি করতে হবে।’ অতঃপর দুজন গেল কলা ভবনের ফটোকপি কর্নারে। প্রথম সেট কপি করার পর দোকানি স্ট্যাপলার পিন আটকাতে গিয়ে মেশিনের ঝামেলার কারণে আর পারছিল না। দু-তিনবার করার পর সেটি পিন রিমুভার দিয়ে তুলে ফেলল সতর্কভাবে। আবার টেবিলের ওপর রেখে হাতের তালু দিয়ে চাপ দিয়ে একবারেই সেরে ফেলল কাজটা। দ্বিতীয় সেট স্ট্যাপলার মারতে আর ভুল হয়নি ছেলেটির। নিলা ফটোকপি হাতে নিতেই মূল্য পরিশোধ করে শামীম। এটাই ভালোবাসার নিয়ম, প্রেমের মতিগতি।
হাঁটতে হাঁটতে নিলা বলল, ‘তোমার আমার ভালোবাসা এ স্ট্যাপলার পিনের মতোই। পৃথিবীর তাবত্ প্রেমের একই বৈশিষ্ট্য। পিনের মতো সহজেই লাগানো যায়। এই দেখো।’ নিলার কথা শেষ হওয়া মাত্রই শামীম আবার হো হো করে হাসল। ‘তুমিও তাহলে...’
‘কী করব, যেভাবে তুমি হূদয়ের চিন্তায় কিংবা দুশ্চিন্তায় মশগুল হয়েছ, হূদয়ঘটিত ব্যাপার-স্যাপার, তোমার হূদয়টাকে তো চাঙ্গা রাখা চাই, এবার বলো তোমার হার্টের আয়ু কত দিন বাড়ল।’
‘তা জানি নে। তবে আমাদের যদি ছেলে হয়, নাম রাখব হূদয়। এটা হবে নিজেদের হার্টের এক্সটেনশন।’
‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।’
‘না, সত্যিই বলছি, তোমাকে তেল মারার জন্য বলছি না। তাছাড়া তোমার তো গোঁফই নেই।’
‘আবার দুষ্টামি!’
‘স্যরি। আজ এখানেই ক্ষ্যান্ত দিচ্ছি। তবে গোঁফ নিয়ে একটি মজার কথা তোমাকে বলছি। আমাদের ডিপার্টমেন্টের অমুক ভাইয়ের...নামটা বলছি না, তুমি চিনে ফেলবে।’
‘ঠিক আছে, অমুক ভায়ের কী হয়েছে সেটা বলো।’
‘তার বউ নাকি বলেছেন, গোঁফটা কাটো তো বাপু, রোজ রোজ পাপসে মুখ ঘষতে ইচ্ছে করে না।’
‘এত বাজে কথা বলল?’
‘বাজে হোক আর যা-ই হোক, তিনি তো সত্যি কথাই বলেছেন, পাপস তো পা ঘষার জন্য, মুখ নয়।’
‘হ্যাঁ, হয়েছে হয়েছে, এবার যাই।’

দুই
শামীম-নিলার যথারীতি বিয়ে-থা হয়ে গেল। সন্ধ্যায় আসর মাত্ করতে এলেন কাশেম ভাই। ‘কাশেম ভাই’ শামীমের কাজিন। ‘কাজিন’ কথার অর্থ আজকাল অনেক ব্যাপক। মানুষ কোনো জুতসই শব্দ না পেলে কাজিন পদবিটা লাগিয়ে দেয়। তেমনি এক কাজিন আবুল কাশেম মজলুল হক, ওরফে কাশেম ভাই। বিয়ের শুভকার্যাদি সম্পন্ন হওয়ার পর বরালয়ে সবাই আড্ডায় মাতে।
কাশেম ভাই বললেন, ‘তোমরা যতই খুশি থাকো না কেন, আজ রাতে যতই উচ্ছ্বাসে গদগদ হোক না কেন তোমাদের মন, মনে রাখবে এই দিনই দিন না। কঠিন এক বাস্তবতার চোরাগলিতে প্রবেশ করছ তোমরা, সামলে না চলতে পারলে বুঝবে কত ধানে কত চাল!’
অন্যদের বললেন, ‘তোমরা তো নিশ্চয় দেখেছ যে, বিয়ের পর দুজনের হাত একত্রিত করা হয়। অনেকটা হ্যান্ডশেকের মতো। এ কি কেবল সপে দেওয়া? আসল কারণ বলো দেখি?’
সবাই নীরব। কেউ বলতে পারছে না।
কাশেম ভাই বললেন, ‘যে কারণে বক্সিং রিংয়ের ভেতর দুজন বক্সারের হাত একত্রিত হয় ফাইটিং শুরুর আগে, এখানেও বর-কনের হাত একত্রিত হয় একই উদ্দেশ্য নিয়ে। মনে রাখবে, প্রত্যেকটা ঘটনার পেছনে একটি অন্তর্নিহিত কারণ থাকে যা সাধারণত দেখা যায় না। আচ্ছা বলো তো অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার পূর্বে ডাক্তাররা সবাই মাস্ক পরে নেয় কেন? এরও একটা অন্তর্নিহিত কারণ আছে, বলো দেখি সেই কারণটা কী?’
‘জীবাণুর ভয়।’
‘না, হলো না। অন্তর্নিহিত কারণ বলো। কী, বলতে পারছ না কেউ? তাহলে বলছি, যাতে ব্যাপক অংকের ও.টি চার্জ দাবি করার সময় রোগীর আত্মীয়-স্বজনের চোখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তারের লজ্জায় পড়তে না হয়, সে জন্য। নিজের মুখ ঢাকা থাকলে তখন আর লজ্জা কিসের?’
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
‘তোমরা যেভাবে হাসছ, মনে হয় আমি মিথ্যে বলছি। ঠিক আছে, আমি চুপ করলাম। তোমরা কেউ আড্ডাটাকে টেনে সামনে নিয়ে যাও।’
‘একজন বলল, আমার একটা কথা আছে, কাশেম ভাই।’
‘কী নাম তোমার?’
‘মুন্না।’
‘কী পড়ো?’
‘ক্যামেস্ট্রি, ফাইনাল ইয়ার।’
‘আচ্ছা তাহলে বলো বিয়ের ক্যামেস্ট্রি বা রসায়নটা কী?’
‘সেটা বলছি, কাশেম ভাই। কিন্তু নর-নারীর সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে সব সময় বলা হয় ক্যামেস্ট্রি-ক্যামেস্ট্রি। আমি অনেক ভেবে দেখেছি, সেটা আসলে হবে ফিজিক্স, যেহেতু এটা ফিজিকের কাছাকাছি।’
ছেলেটির বন্ধু পান্না বলল, ‘আসলে ও দুটোর একটাও না। এটা আসলে হওয়া উচিত বায়োলজি।’
অন্যজন বলে, ‘না, বোকা! ফিজিওলজি। যেহেতু শারীরবিদ্যা ভালো করে জানা থাকতে হয়।’
এবার মুন্না বলে, ‘এই তো, পদার্থের কাছাকাছি আরকি। কিন্তু রসায়ন নয়।’
পান্না জবাব দেয়, হলো। আমরা সবাই অনেক বললাম। কিন্তু বর-কনে মুখ খুলছে না।
‘কিরে শামীম, মুখ খুলছিস না কেন?’
‘বিয়ের একটা টিপস চাই।’ এটাই বরের প্রথম কথা।
‘সেটা বলবি তো। তাহলে শোন।’ কাশেম ভাই আবার বলছেন, ‘মনে রাখবি, কিছু না কিছু কথা পেটের মধ্যে রেখে দিতে হয়। দুটো যোগাযোগ মাধ্যম খুব দ্রুত পৃথিবীময় সংবাদ ছড়িয়ে দেয়। একটি নতুন, অন্যটি পুরাতন। নতুনটা ইমেল, পুরানটা ফিমেল। কাজেই কিছুটা তো চেপে রাখতেই হবে। তুই তো আর গণযোগাযোগের কারখানা খুলে বসিসনি।’
আবার হাসির রোল। এরই মধ্যে একটি কণ্ঠ উচ্চকিত হয়ে ওঠে, সেটি নারী কণ্ঠ।
‘এভাবে বলা ঠিক হচ্ছে না, ইট ইজ এ ক্লিয়ার ইনসালটেশন। আমাদের ভাবি এমন মেয়েই নয়। পেটে বোমা মারলেও যার কথা বের হয় না, সে এ সমস্ত মেলটেলের কী বোঝে?’
‘কিন্তু কাশেম ভাইয়ের কথা তো আর ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই ভাবির ঘাড়ে অ্যাড্রেসটা ঝুলিয়ে রাখতে হবে : নিলা, অ্যাট দ্য রেট অব ফিমেল ডট কম।’
পান্নার কথায় মুন্না জবাব দেয়, ‘আরে বোকা, ইমেল অ্যাড্রেসে অ্যাট দ্য রেট অব বলতে হয় না, কেবল অ্যাট বললেই চলে, অ্যাট দ্য রেট অব মানে এত টাকা মূল্যে...মানুষ কি আর বিনিময়যোগ্য?’
‘বিয়ের দিনে তো কিছুটা বটেই। এই যে কাজি সাহেব বললেন না, এত টাকা দেনমোহরে...’
এবার হো হো আর খিলখিল হাসির সংমিশ্রণে এক অদ্ভুত শব্দলহরী সৃষ্টি হয়। মনে হলো ড্রাম আর ভায়োলিন একসাথে বাজছে। একটা বাচ্চা কেঁদে উঠলে তাতে ছন্দপতন ঘটে।
কাশেম ভাই বলেই চললেন, ‘কারা কারা বিবাহিত এবার হাত তোলো তো। অনেকেই তুলল, কিন্তু মুন্না-পান্না কেউই তুলল না।’
‘আচ্ছা, এ তো হলো ছেলেদের কথা। সবাই বলতে তো মেয়েদেরও বোঝানো হয়েছে। মেয়েদের মধ্যে কি কেউ নেই ম্যারেড? আমি কোনো জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন করতে চাই না। বলো দেখি মেয়েদের কয়জন বিবাহিতা?’
এবার বেশির ভাগই হাত তুলল।
‘তার মানে এখনো মেয়েদের বিয়ে আগেভাগেই হয়ে যাচ্ছে। একটা স্ট্যাটিস্টিকস নিলাম। প্রবণতাটা ঠেকানোই যাচ্ছে না। সে যাই হোক, মুন্না-পান্না, তোমাদের কি গার্লফ্রেন্ডও নেই?’
‘একটা আছে কোনোমতে,’ বলল মুন্না।
‘কোনোমতে মানে?’
‘মানে ইয়ে হয়নি আরকি!’
‘আচ্ছা ধরো শামীম বিয়ে করল, তার একজন স্ত্রী আছে, কিংবা নিলার একজন স্বামী, ইট ইজ এ পার্ট আর লিভিং। কিন্তু যাদের স্ত্রী এবং গার্লফ্রেন্ড দুটোই আছে তাদের অবস্থাকে কী বলব?’
সবাই চুপ।
‘পারলে না?’
‘না।’
‘আর্ট অব লিভিং। বাট এনাফ ইজ এনাফ, ইট ইজ দ্য টাইম অব স্লিপিং। বর-কনের ঘুুমের দরকার না থাকতে পারে, আমাদের আছে।’ বলেই প্রথম উঠলেন কাশেম ভাই। একে একে অন্যরাও।

তিন
নিলা-শামীমের দিন ভালোই কাটছে। কিন্তু অল্পতেই মাঝেমধ্যে কমিউনিকেশন গ্যাপ হয়ে যায়। সেটা কখনো সখনো লঙ্কাকাণ্ডে গিয়ে গড়ায়। শামীম অফিসে চলে গেলে নিলাকে দীর্ঘ সময় একা থাকতে হয়। রান্না করা ছাড়া অন্য কোনো কাজ থাকে না। সে একা রাঁধে, একাই খায়। দুপুরে ঘুমায়ও। কিন্তু দিবানিদ্রাটা ভেঙ্গে গেলেই একটা হাহাকার ওকে আচ্ছন্ন করে। শামীম না ফেরা পর্যন্ত বিকেলটা তার কোনোমতেই কাটতে চায় না।
একদিন বলল, ‘হ্যাঁ গো, আমিও একটা চাকরি করব।’
‘তা পাবে কোথায়?’
‘পেলেই তো করব।’
অতঃপর চাকরি খোঁজা নিয়ে উভয়ের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়। নিলা অভিমানের সুরে বলে, ‘তোমার জীবনে কি আমার কোনোই মূল্য নেই?’
‘অবশ্যই আছে, তুমি আমার জীবনে এক মহামূল্যবান বস্তু, মূল্যবান নিলা পাথর।’
নিলার বরফ গলতে শুরু করে, কিন্তু ‘বস্তু’ কথাটি কোথায় যেন একটা ধাক্কা দেয়।
কয়েক দিন শামীম কিছুটা বিলম্বে বাড়ি ফেরায় নিলার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। এ নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিও হয়। অবশেষে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে নিলা বলল, ‘আচ্ছা সত্যি করে বলো তো, জীবনে আর কজন মেয়েমানুষের সাথে ঘুমিয়েছ তুমি?’
‘কী বলছ? যার-তার সাথে কি ঘুমানো যায়? আমি কেবল তোমার সাথেই ঘুমিয়েছি, বাকি সবার সাথে তো জেগে ছিলাম।’
‘কী? কী বললে?’
‘একটু মজা করলাম। যেমন প্রশ্ন তেমনি উত্তর।’
ঐদিন কথাটিকে সহজে মেনে নিলেও নিলার মনে একটা খটকা থেকেই যায়। যদি কথাটি সত্যিই হয়ে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে গো ধরে থাকার সময় ওর থাকে না। কারণ শেষাবধি নিলার একটা চাকরি হয়েই যায়। এনজিওর চাকরি, প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হয়। মোটামুটি ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরলেও যতক্ষণ অফিসে থাকে ততক্ষণ তার স্বামীপ্রবর কোথায় কী করছে তা নিয়ে ভাববার ফুরসত মেলে না। তাছাড়া ফিল্ডট্রিপে চলে গেলে পুরো সপ্তাহ একা থেকে থেকে ওর মনের অবস্থা তিরিক্ষি হয়ে থাকে। উল্টাপাল্টা যে সে ভাবে না তাও নয়। এখন তো হাতের নাগালের বাইরে, যদি কিছু...নাহ্, থাক। শামীম আর ভাবতে চায় না। তবে এবার ফিরলে সোজা বলে দেবে, চাকরির দরকার নেই।
যথারীতি নিলা ফিরলে এ কথাটি বলাও হয়। তাতে সে তেলবেগুনে জ্বলে ওঠে। চাকরিটা যে সে খুব এনজয় করে তা নয়, তবে স্বাধীনতার স্বাদ সে পেয়ে গেছে। স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়?
ওদিকে নিলাদের অফিসের পিকনিক আয়োজন হলো। প্রত্যেকের সপরিবার যাওয়ার কথা থাকলেও শামীম যেতে পারেনি নিলার সাথে। নিলা একাই যায়। কিন্তু শামীম বিকেলে খবর পায় নিলাদের পিকনিকের গাড়িটি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। এক লাইনে কয়েকটি গাড়ি ছিল, অল্পের জন্য বিটিভির গাড়িটি বেঁচে যায়। অন্য আরো কয়েকটি গাড়ির ক্ষতি হয়েছে। সবাই বনভোজন ফেরত। এ কথা শুনে সে ফকিরাপুল মোড়ে যায়। অন্যান্য পরিবারের লোকজনও আছে। হতাহতের সঠিক সংবাদ না পেয়ে সবার মুখ বিমর্ষ। এটুকু সংবাদ পেয়েছে যে, দুজনের অবস্থা আশংকাজনক। গ্রামের লোকেরা নাকি দুর্ঘটনার পরপর সবার ব্যাগ হাতিয়ে নেয়। সে ভাবছে, হয়তো এভাবে নিলারটাও চলে গেছে। কিন্তু ওখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে তার একটি পশ্চিমা জোক মনে পড়ল, গৃহবধূদের নিয়ে একটি বাস বনভোজনে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনাকবলিত হয়। সবাই বাসস্ট্যান্ডে দৌড়ে এসে শুনতে পায়, হিসাবমতে একজন মাত্র বেঁচে আছে, বাকি সবাই মৃত। সংবাদ শুনে সবার স্বামী হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, একজন একটু বেশি কাঁদল, একেবারে বিলাপ।
‘আপনি এত বেশি কাঁদছেন কেন, ভাই? এতটা ভেঙ্গে পড়তে নেই, উঠে দাঁড়ান, যা করার ঈশ্বর করেছেন, এখানে আমাদের হাত নেই।’ ‘আচ্ছা, আপনার স্ত্রী কি আপনাকে খুবই ভালোবাসত?’
‘নারে ভাই, এখানে এসে জানতে পারলাম আসার সময় আমার স্ত্রী বাস মিস করেছে, তাই কাঁদছি।’
জোকটার কথা মনে হতেই শামীম হেসে ওঠে। পরক্ষণে সে বিষাদে আক্রান্ত হয়। কী আবোল-তাবোল ভাবছে সে, নিলার সাথে কি তার সম্পর্ক এই পর্যায়ে গড়িয়েছে? নিশ্চয় নয়। সংসারে একটু-আধটু মনোমালিন্য হতেই পারে। এটাই দাম্পত্যের বৈশিষ্ট্য, অনেক চিন্তা করে তাই মনীষীরা এ সম্পর্কের নাম দিয়েছেন ‘অম্লমধুর’। শামীম এ পর্যায়ে কেঁদেই ফেলল। নিলা ফিরে আসার পর তার অন্তর্গত কান্নাটি থেমে যায়।
তবে নিলা স্বাধীনতার কথা বেশি চিন্তা করতে গেলে পরাধীনতার শৃঙ্খল তার চোখের সামনে ঝলমলিয়ে উঠতে থাকে। এক সকালে হুড়মুড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে বমি করতে করতে নিজেই কথাটি ভাবতে থাকে। হায়রে কপাল, এক বছর পেরোতেই এ পোড়া দেশের বংশবৃদ্ধির উত্সবে তাকেও অবদান রাখতে হলো। কী জানি, সেটা শামীমের চালাকি কিনা কে জানে। হয়তো ওকে কাবু করার এক মোক্ষম অস্ত্র।
একদিন নিলা বলল, ‘জানো, আমার খুব টায়ার্ড লাগে।’ শামীম তাত্ক্ষণিক বলে, ‘ছুটি নিয়ে নাও, ছয় মাসের মাতৃত্ব ছুটি তো আছেই।’
‘সেটা কি এখন?’
‘তুমি ইচ্ছে করলে এখনো নিতে পারো, কেউ জানবে নাকি?’
‘ছুটিতে থাকতে আমার একদম ভাল্লাগে না। ছয় মাসের ম্যাটারনিটি কিভাবে যে কাটাব বুঝতে পারছি না। তার চেয়ে বরং তোমাদেরও একটা প্যাটারনিটি লিভ চালু হওয়া উচিত। দায়িত্ব কি মায়ের একার?’
‘ঠিক বলেছ, তাহলে তো বেঁচে যাই।’ শামীম বলল।
‘তবে ছুটিটার নাম পিতৃত্ব না হয়ে পিতৃতান্ত্রিক হওয়াই যুক্তিযুক্ত।’
শামীম বুঝতে পারে বউয়ের এ চেতনা তার এনজিওর চাকরির ফল। ‘আচ্ছা এসব বাদ দাও তো। নিশ্চয় তুমি খুশি হয়েছ। আমাদের সন্তান হবে। আমি তো মহাখুশি।’
‘তা তো হবেই, গায়ে তো আর আঁচড় লাগবে না।’
‘এ কষ্টটাই তো নারীকে মহীয়সী করে।’
রাতে দুজন শুয়ে পড়লে নিলা এপাশ-ওপাশ করে। শামীম মাথায় বিলি কেটে দেয়, কখনো কপাল টিপে দেয়। তাতে নিলা কিছুটা নিদ্রালু হয়। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে সে বলে, ‘আমি তো মরেই যাব।’
শামীম জবাব দেয়, ‘আমিও।’
‘কেন?’
‘কারণ এত সুখ আমার সইবে না।’
শেষ কথাটি বুঝে ওঠার আগেই নিলা ঘুমিয়ে পড়ে। তাই কিছু ঠাহর করতে পারেনি। সে কারণে প্রতিবাদও ওঠেনি।

চার
নিলার সময় কাটে এখন সন্তান লালন করে। নাম রেখেছে বিয়ের পূর্বে নির্ধারিত হূদয়। হূদয়ের ছয় মাস হতেই নিলা আর একটা বেসরকারি সংস্থায় যোগ দেয়। বেতন কম, কাজও কম, প্রায় অর্ধবেলা। কিন্তু তাতেও বাচ্চা দেখভালের ব্যবস্থাটার সুরাহা হলো না। তাই গ্রাম থেকে শামীমের পিতাকে নিয়ে আসা হয় অনেক ভরসা করে। শামীমের মাতা বিগত হয়েছেন ক বছর হলো। এখন পিতাই ভরসা, তাকে জানিয়ে দেওয়া হলো যে, গ্রামে ফেরার আর প্রয়োজন নেই। তবে হূদয়ের পিতামহ যেখানে বাস করেন সেটা এখন একটা ছোটখাটো মফস্বল শহরে পরিণত হয়েছে। তাই প্রথম আসতে রাজি হননি, কিন্তু পৌত্রের সাথে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর সংবাদে তিনি বেজায় খুশি। ঢাকায় এসে তিনি মখমলের জায়নামাজে বসে সারাদিন নামাজ পড়তে পারেন। ফুরফুরে মেজাজে থেকে কখনো দাড়িতে লাগাতে পারেন মেহেদি। নাগরা জুতো পরে শখের লাঠি হাতে যখন-তখন বেরিয়েও পড়তে পারেন। হূদয় এক বছর বয়স থেকেই দাদার সাথে রাত্রিযাপন করতে থাকে। তাতে শামীম-নিলা আবার স্বাধীন হয়ে যায়। তবে এ স্বাধীনতা তাদের সন্তানকে ইঁচড়েপাকা করে তোলে। তাছাড়া বিদ্যালয়ের যে পরিবেশ তা হূদয়কে বোকা থাকতে দেয় না। বন্ধুরা ওকে হূদয় নামে ডাকে না, বলে হার্ট। তার পিতা-মাতার দেওয়া নামটা ওখানে প্রতিষ্ঠা পায় না।
সন্তানের ইঁচড়েপক্বত্বের সাথে শামীমের মাথার চুলেও কিছুটা পাক ধরেছে। একদিন ছেলে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, তোমার কিছু কিছু চুল সাদা কেন?’
‘যখনই কোনো সন্তান কোনো কারণে, ধরো লেখাপড়া না করে বা অন্য কোনো কারণে তার পিতাকে অসন্তষ্ট করে তখনই পিতার একটি করে চুল পেকে যায়।’
‘ও, এখন বুঝছি দাদুর সবগুলো চুল কেন সাদা।’
মা এসে জিজ্ঞেস করে, ‘কী বললি, কী বললি?’
‘কিছু না’ বলেই সে পাশের রুমে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে। একটু পর হাঁক ছাড়ে, ‘মা, এক গ্লাস পানি দিয়ে যাও না।’
‘তুই এসে খেয়ে যা।’
‘প্লিজ মা!’
‘আবার বললে দেব এক থাপ্পড়।’
‘যখন থাপ্পড় দিতে আসবে তখন পানিটা নিয়ে এসো।’
ছেলের কথা শুনে নিলার রাগও পানি হয়ে যায়।
ক্রমান্বয়ে হূদয়ের জ্যাঠামি বেড়েই চলল। একদিন স্কুল থেকে ফিরলে বাপ জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট কী?’
‘বাবা, পাঁচ সাবজেক্টে আমি...’
‘কী, কী করেছিস?’
‘পুওর নম্বর পেয়েছি।’
‘ঠিক আছে। এখন থেকে তুই আমাকে আর বাবা ডাকবি না।’
‘ওহ্ ড্যাড! ইট ওয়াজ সিম্পলি এ ক্লাস টেস্ট, নট অ্যা ডিএনএ টেস্ট।’
শামীম তার স্ত্রীর সাথে পরে আলোচনা করে, নিশ্চয় কেউ হাতে ধরে ওর ভবিষ্যত্টা নষ্ট করছে। তাতে উল্টো শামীমকেই বকাঝকা করে নিলা। ‘বলেছিলাম না এত অল্প বয়সে সন্তানদের কারো হাতে ছাড়তে নেই? তা তিনি শুনলেন না, বরং বাড়ি থেকে বাবাকে এনে এখানে সন্তানের তাবেদারি করানো হচ্ছে।’
‘আরে দূর! বাজে বকো না তো, আমার পিতা ডিএনএ টেস্টের কী বোঝে?’
নিলা কোনো জবাব দিতে পারেনি। শামীমের মনে হলো তার পিতাকে এনে এক বিরাট বোঝা সংসারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
ওদিকে নানা বিষয়ে হূদয়ের ঔত্সুক্য বেড়েই চলেছে। পরদিনই স্কুল থেকে ফিরে পিতাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘বাবা, একটি বিয়ের মূল্য কত?’ ‘তা তোর জানার দরকার কী? বল্, কার কাছ থেকে কী শুনে এসেছিস? বললাম না তোকে যে আজেবাজে ছেলেদের সাথে মিশবি না?’
‘আহা বলোই না। অনেক বেশি? কাল একটা বাড়িতে লাল-নীল অনেক লাইট জ্বলতে দেখলাম। লোকেরা বলছে বিয়েবাড়ি। অনেক খরচ, বাবা?’
‘তুই কি মূল্য না খরচের কথা জানতে চাচ্ছিস?’
‘একই তো কথা, বাবা।’
‘মূল্য কত ঠিক জানি না, তবে আমি এখনো প্রতিদিন পরিশোধ করে যাচ্ছি।’

পাঁচ
হূদয় এখন পাকামি না করে বড় বড় ব্যক্তিগত গবেষণায় মত্ত। ওদিকে অনেক চড়াই-উত্রাই অতিক্রম করে শামীম-নিলার সম্পর্কটা পাকাপোক্ত হয়েছে। এক রাতে শুয়ে শুয়ে তারা খুঁনসুটি করে। নিলা বলল, ‘আচ্ছা তুমি কি আমার জীবনে চাঁদের মতো হতে পারবে?’
‘তা তো অবশ্যই।’
‘দেখব তাহলে।’
‘আমিও দেখব। প্রথম কথা হলো এর জন্য তোমাকে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার মাইল দূরে সরে যেতে হবে।’ বলে শামীম।
শুনেই নিলা জোরে একটা ধাক্কা দেয়, বলে, ‘যাও তবে।’ শামীম খাট থেকে পড়তে গিয়েও নিজকে সামলে নেয়।
‘আচ্ছা ওসব বাদ দাও। তবে চাঁদে যেতে পারলে না জানি কেমন লাগত তা ভেবে দেখেছা?’ নিলা জিজ্ঞেস করে।
‘বলো তো কেমন লাগত?’
‘তা জানি না। নেইল আর্মস্ট্রং নাকি ওখান থেকে মাত্র দুটো জিনিসের অস্তিত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, সারা দুনিয়ায় পানি আর পানি, আর একটা হচ্ছে আঁকাবাঁকা চীনের প্রাচীর। আচ্ছা, তুমি আমাকে চীনের প্রাচীর দেখাতে নিয়ে যাবে?’
‘কেন নয়? চলো যাই একবার। এ আর এমন কী? মানুষ তো দমে দমে এখন কুনমিং যাচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, মানুষ কুনমিং যাচ্ছে, আবার মঙ্গল গ্রহে যাওয়ারও চিন্তা করছে। বাংলার মেয়ে লুলু ফেরদৌস নাকি মঙ্গলে যাবে বসতি গাড়তে। নাসার কী যে ভেলকিবাজি!’ বলেই নিলা ঝিমিয়ে পড়ে।
রাত গড়িয়ে যায়। দুজনই ঘুমন্ত। শামীম চাঁদে যেতে না পারলেও স্বপ্নে সে নিলাসহ আকাশে উড়ে বেড়ায়। হঠাত্ পড়ে যেতেই তার ঘুম ভাঙ্গে। তার বক্ষপিঞ্জর কাঁপছে। সে কাঁপুনিতে নিলাও জেগে ওঠে। বলে, ‘কী হয়েছে?’
‘তোমাকে নিয়ে আকাশ থেকে পড়ে গেলাম।’ বলেই সে উঠে জানালার কাছে যায়। সকাল হয়ে এল। দেখতে পায় ডুমুর ফল ও চকচকে পাতার গাছটা। দাঁড়িয়ে আছে অনড়-অব্যয়। আজ একে আরো সতেজ দেখাচ্ছে। বলে, ‘দেখো নিলা, আমার স্বপ্নের কী তাত্ক্ষণিক প্রতিফলন! শুনেছি আদম-হাওয়ার পতনের সময় তাদের শরীরে ডুমুর পাতা জড়ানো ছিল।’
‘আমাদের কী জড়ানো ছিল বলো না।’
শামীম বলে, ‘তা তো বুঝতে পারিনি। কেবল মেঘ আর মেঘ। তাই তোমাকেও অস্পষ্ট দেখাল।’

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ২০
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫১
মাগরিব৫:৩২
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৮সূর্যাস্ত - ০৫:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :