The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

প্রত্নতত্ত্ব

তাম্রলিপ্তি থেকে পঞ্চনগরীপ্রাচীন বাংলারবাণিজ্যনগরী

খন্দকার মাহমুদুল হাসান

মস্ত এক বন্দরনগরী। দেশ-দেশান্তরের হরেক চেহারার মানুষের মুখে সেখানে শোনা যায় হরেক রকমের ভাষা। এশিয়ার নানান দেশ ছাড়াও দূর ইউরোপের মানুষের পর্যন্ত দেখা মেলে সেই শহরে!
দু’হাজার বছরেরও বেশিকাল আগে বাংলায় সত্যি সত্যিই ছিল সেই শহর। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্ত খুব নামডাক ছিল শহরটির। প্রাচীন দুনিয়ার বিখ্যাত সেই শহরটির নাম তাম্রলিপ্তি। এই শহর সম্পর্কে চীনা পরিব্রাজক ফা হিয়েন (ভ্রমণ যাত্রার শুরু : ৩৯৯ খ্রি. চীনে প্রত্যবর্তন; ৪১৪ খ্রি.)-এর ভ্রমণকাহিনির বর্ণনা এরকম—
‘গঙ্গার গতি লক্ষ করিয়া এবং পূর্বদিকে অষ্টাদশ যোজন পথ অগ্রসর হইয়া ফা-হিয়ান গঙ্গানদীর দক্ষিণ তীরের চম্পা নামক সুবৃহত্ রাজ্যে উপনীত হইলেন।... পূর্বদিকে প্রায় আরও পঞ্চাশ যোজন পথ অগ্রসর হইয়া তিনি তাম্রলিপ্তি নামক বন্দর যে দেশের রাজধানী তথায় উপনীত হন। এই প্রদেশে দ্বাবিংশটি সংঘারাম রহিয়াছে এবং প্রত্যেকটিতেই যতিগণ বাস করেন। এই স্থানেও বৌদ্ধধর্মের প্রাদুর্ভাব আছে। ফা-হিয়ান এই স্থানে সূত্র নকল ও প্রতিমূর্তির আলেখ্য প্রস্তুত করিয়া দুই বত্সর অতিবাহিত করেন।
অতঃপর তিনি এক বৃহত্ বাণিজ্যপোতে আরোহণ করিয়া সমুদ্র দিয়া শীত ঋতুর প্রারম্ভে দক্ষিণ-পশ্চিমে যাত্রা করেন। চতুর্দশ দিবারাত্র অতিবাহিত করিয়া তাঁহারা সিংহল প্রদেশে উপস্থিত হন। অধিবাসীদের মতে সিংহল হইতে তাম্রলিপ্তি সাতশত যোজন দূর।’
(তথ্যসূত্র : চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়ান, যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার, সম্পাদনা : ড. বারিদবরণ ঘোষ, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২য় মুদ্রণ : ২০১১, পৃ. ১১২)
বর্ণনাটিতে তাম্রলিপ্তির ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং সেকালের শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রপথে যাতায়াতের বিবরণ পাওয়া যায়। বোঝা যায়, তাম্রলিপ্তিতে বিদেশিদের নিয়মিত যোগাযোগ-যাতায়াত ছিল এবং বহির্যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। ইউয়ান চোয়াং বা হিউয়েন সাং-এর বর্ণনায় তাম্রলিপ্তি বেশ প্রবলভাবে উপস্থিত। হিউয়েন সাং ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে চীন থেকে রওনা দিয়ে ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে ছিলেন। তিনি দেশে ফিরে যে ভ্রমণ বৃত্তান্ত লেখেন তাতে আছে—
‘সমতট থেকে পশ্চিম দিকে ৯০০ লি পথ পাড়ি দেয়ার পর এসে পৌঁছলাম তান মো লি তি বা তাম্রলিপ্তি রাজ্যে। রাজ্যটি আকারে ১৫০০ লির মতো। রাজধানীর আয়তন ১০ লি। ... নিয়মিত চাষবাস চলে। প্রচুর ফল ও ফুলের ছড়াছড়ি এখানে। ... এখানে দশটির মতো সংঘারাম আছে, হাজার খানেক ভিক্ষুর বাস। দেবমন্দির আছে পঞ্চাশটির মতো। নানা সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে মিলেমিশে বাস করছে। দেশটির উপকূল ভাগ একটি সমুদ্র খাঁড়ি দিয়ে বেষ্টিত। জল ও ভূমি যেন একে অপরকে আলিঙ্গন করছে এখানে। প্রচুর দামী দামী জিনিস এবং রত্নসামগ্রী এখান থেকে সংগৃহীত হয়। এজন্য এলাকার অধিবাসীরা বেশ ধনী। ...’ (তথ্য সূত্র : হিউয়েন সাঙ ভ্রমণকাহিনী, ভাষান্তর; খুররম হোসাইন, শব্দগুচ্ছ, ঢাকা, ২০০৩, পৃ. ৮৯)
চীনা পরিব্রাজক ইিসঙ (জন্ম : ৬৩৫ খ্রি. মৃত্যু : ৭১৩ খ্রি.) তাম্রলিপ্তিতে ৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন এবং তাম্রলিপ্তির গুরুত্বের কথা তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন। নীহাররঞ্জন রায় তাম্রলিপ্তিকে প্রাচীন বাংলার বহির্বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবার সেকালের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে মেঘনা-বুড়িগঙ্গা মুখের কোনো বন্দর অথবা চট্টগ্রামের কথাও ভেবেছেন। এসব বিবেচনা করে তিনি মত দিয়েছেন—
‘সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান বন্দর যে ছিল গঙ্গাবন্দর ও তাম্রলিপ্তি, তাহাও সুস্পষ্ট। তাম্রলিপ্তিই জাতকের দামলিপ্তি এবং Ptolemy’র Tamalites, য়ুয়ান চোয়াঙের তন্-মো-লিহ-তি। সিংহলের সঙ্গে তাম্রলিপ্তির বাণিজ্যপথের আভাস ফাহিয়ান রাখিয়া গিয়াছেন (চতুর্থ শতক)। তাহারও তিন চারি শত বত্সর আগে ভারতের দক্ষিণ সমুদ্রতীর বাহিয়া গঙ্গাবন্দর ও তাম্রলিপ্তির সঙ্গে সুদূর রোম-সাম্রাজ্যের বাণিজ্য-সম্বন্ধের আভাস তো Periplus ও Ptolemy-র গ্রন্থেই পাওয়া যায়।
... মিলিন্দ-পঞ্চহ গ্রন্থে বঙ্গ বা পূর্ববঙ্গকেও একটি অন্যতম সামুদ্রিক বাণিজ্য-কেন্দ্র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে... এই বন্দর কোন্ বন্দর তাহা অনুমান করিবার উপায় নাই। তবে বুড়ীগঙ্গা (Ptolemy’র Antibole?) বা মেঘনার মুখের কোনও বন্দর হওয়া অসম্ভব নয়, অথবা চট্টগ্রামও হইতে পারে, কিন্তু মধ্যযুগে Bengala বন্দর হওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।...’
(তথ্যসূত্র : নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিকথা, আদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০১, পৃ. ১৫৭) তবে তার পরেও তিনি মন্তব্য করেছেন—
‘বাঙলাদেশের প্রধান বন্দর ছিল তাম্রলিপ্তি; সেই তাম্রলিপ্তির বাণিজ্যসমৃদ্ধির কথা সকলের মুখে মুখে, পুঁথির পাতায় পাতায়।’ (সূত্র : প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪)

তামলুক-কথা
প্রাচীন বাংলায় তাম্রলিপ্তি নামে যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাণিজ্যনগরী ছিল তার পক্ষে প্রাচীনকালের লিখিত সাক্ষ্য এবং বর্তমানকালের পণ্ডিতদের মতামতও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু জায়গাটা আসলে কোথায় ছিল তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট মত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ততা দেখা যায়। অবশ্য তা সত্ত্বেও প্রাচীন বর্ণনাকে অবলম্বন করে অনুসন্ধান চালাতে গেলে আমরা সমুদ্রের নিকটবর্তী এমন এক জায়গায় তামলুককে খোঁজব যেখান থেকে সমুদ্রযাত্রা করে সহজে সিংহল অর্থাত্ শ্রীলঙ্কায় যাওয়া সম্ভব ছিল। এসব কথা বিবেচনায় রেখে অনুমান করা হয় যে, পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলায় রূপনারায়ণ নদের প্রায় ২ কিলোমিটার পশ্চিমের তামলুক এলাকাতেই অবস্থিত ছিল প্রাচীন তামলুক। যদিও বর্ধমানের পান্ডুরাজার ঢিবি ও বানেশ্বর ডাঙ্গাসহ অন্যান্য অনেক স্থানের প্রাগৈতিহাসিক পুরাবস্তুর সাথে এখানকার অনেক পুরাবস্তুর সাদৃশ্য আছে, কিন্তু তামলুক এলাকা থেকে প্রাপ্ত বেশকিছু প্রত্নসামগ্রীর বৈশিষ্ট্য বহির্বিশ্বের সাথে স্থানটির বাণিজ্যিক যোগাযোগের দিকে ইঙ্গিত করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
০১. টি এন রামচন্দ্রন কর্তৃক ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত ও বর্তমানে ২৪ পরগনার গুরুসদয় সংগ্রহশালায় রক্ষিত ক. পোরসেলিনের বয়াম ও খ. পত্র, তারকা ও মাছ আঁকা দুটি মৃন্ময় কলস। প্রত্নবস্তু দুটির আকার ও কারুকাজের সাথে মিনীয়, মাইসেনীয় ও মিশরীয় প্রাচীন রীতির মিল থাকায় এখানকার সাথে ওসব এলাকার যোগাযোগ ছিল বলে মনে করা হয়।
০২. আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২,০০০ থেকে ২,৫০০ বছরের প্রাচীন হাড়ের হারপুন, যার সাথে মিশরের নীলনদ উপত্যাকা ও কাশ্মীরের বুর্জাহোমের অনুরূপ প্রত্নবস্তুর সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ওসব এলাকার সাথে এখানকার যোগাযোগের বিষয়টি অনুমান করা হয়।
০৩. গ্রিকো-রোমান রীতির সাথে সাদৃশ্যযুক্ত পোড়ামাটির আবক্ষমূর্তি, পোড়ামাটির পাত্র ও তার ভাঙ্গা অংশ।
(তথ্য সূত্র : ক. প্রণব রায়, মেদিনীপুর, জেলার প্রত্ন-সম্পদ, প্রত্নতত্ত্ব অধিকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯৮৬, পৃ. ১৪৪; খ. শ্রীতারাপদ সাঁতরা, পুরাকীর্তি সমীক্ষা : মেদিনীপুর, প্রত্নতত্ত্ব অধিকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯৮৭, পৃ. ৮৮, ৮৯)

কর্ণসুবর্ণ
প্রাচীন বাংলার আন্তর্জাতিক গুরুত্বের প্রমাণবাহী আর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নাম কর্ণসুবর্ণ, যার সাথে জল ও স্থলপথে তাম্রলিপ্তির যোগাযোগ ছিল। কর্ণসুবর্ণের রক্তমৃত্তিকানিবাসী বিখ্যাত বণিক ও মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের সমুদ্রযাত্রার দালিলিক প্রমাণ ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে মালয়ের ওয়েলেসিল জেলার প্রাচীন একটি বৌদ্ধ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল। প্রমাণটি ছিল স্লেট পাথরে উত্কীর্ণ লিপি। পাথরখণ্ডের মাঝখানে বৌদ্ধস্তূপের চিত্র ছাড়াও বৌদ্ধসূত্র ও তার দক্ষিণতম প্রান্তে উত্কীর্ণ ছিল—মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তস্য রক্তমৃত্তিকা বাস্ [ত বাস্য]
সংস্কৃত ভাষার এই লিপির অক্ষর বিশ্লেষণ করে এটিকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের বলে পণ্ডিতরা অনুমান করেছেন (সূত্র : নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস; আদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, ২০০১, পৃ. ১৫৮)। পঞ্চম শতকের মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের নিবাসস্থল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায় আবিষ্কৃত হয়েছে। স্থানটি যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি কেন্দ্র ছিল সে সম্পর্কে সুধীররঞ্জন দাস উল্লেখ করেছেন—
‘... লেখতে উল্লেখিত রক্তমৃত্তিকা ও চৈনিক পরিব্রাজকের ভ্রমণ বিবরণীর রক্তমৃত্তিকা যে একই স্থানের নির্দেশক তাতে কোন সন্দেহ নেই। মুর্শিদাবাদ জেলার বর্তমান রাঙামাটি অঞ্চলের প্রাচীন রক্তমৃত্তিকা (রাঙামাটি) ও লেখমালার রক্তমৃত্তিকা যে অভিন্ন তা সাম্প্রতিক উত্খনন দ্বারা প্রতিপন্ন হয়েছে। রাজবাড়ি ডাঙায় উত্খননে রক্তমৃত্তিকা নামাঙ্কিত অনেক সীলমোহর পাওয়া গিয়েছে। রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আশিস নিয়েই বুদ্ধগুপ্ত সুদূর মালয় উপদ্বীপে বাণিজ্য করতে গিয়েছিলেন। কর্ণসুবর্ণ অন্ততপক্ষে, পঞ্চম থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত বহির্বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। অধিকন্তু রাজবাড়িডাঙার উত্খননে গ্রীক অক্ষরে উত্কীর্ণ পোড়ামাটির সীলমোহরও উদ্ধার করা হয়েছে। সীলমোহরে এক গ্রীকদেবীর নাম লিখিত আছে। গ্রীনদেবী সমুদ্রযাত্রার ও নৌযানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। এই সীলমোহর আবিষ্কার অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সীলমোহরটি দেখে কর্ণসুবর্ণের সাথে গ্রীক ও রোমক নাবিক বা বণিকদের সম্পর্ক অনুমান করা যায়।’
(সূত্র : সুধীর রঞ্জন দাস, কর্ণসুবর্ণ মহানগরী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষত্, ১৯৯২, পৃ. ১৬৫) এসব বর্ণনা থেকে অন্তত দুটি দূরবর্তী দেশের সাথে কর্ণসুবর্ণের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রমাণ মেলে—
১. ইউরোপের গ্রিস
২. এশিয়ার মালয়

উয়ারি-বটেশ্বর
নরসিংদী জেলার বহুল আলোচিত উয়ারি-বটেশ্বর এলাকার ব্রহ্মপুত্র বিধৌত অঞ্চলে সুপ্রাচীনকালে যে বাণিজ্যনির্ভর একটি মহানগর গড়ে উঠেছিল তার পক্ষে প্রমাণের এখন আর অভাব নেই। এখান থেকে উত্খননের মাধ্যমে খ্রিস্টপূর্বকালের নগরীর নিদর্শনাদি আবিষ্কৃত হয়েছে। ইটে তৈরি দালানকোঠার ধ্বংসাবশেষ যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি আবিষ্কৃত হয়েছে অসংখ্য প্রত্নবস্তুও। এসবের মধ্যে বহির্বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগের প্রমাণবাহী প্রত্নবস্তুর সংখ্যাও নগণ্য নয়। উদাহরণ হিসেবে নিচের বিবরণকে তুলে ধরা চলে।
১. ভারতীয় রীতি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রযুক্তিগত উত্কর্ষের সমন্বয়ে নবযুক্ত হাইটিন ব্রোঞ্জের পাত্র প্রাপ্তিতে বোঝা যায় দক্ষিণ ভারত থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত (এসব জায়গায় এমন পাত্র পাওয়া গেছে) উয়ারি-বটেশ্বরের সাথে যোগাযোগ সূত্রে সংযুক্ত ছিল এবং বলাই বাহুল্য, সেই যোগাযোগ ছিল বাণিজ্যিক যোগাযোগ (সূত্র : বুলবুল আহমেদ, নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বর : একটি প্রত্নতাত্বিক সমীক্ষা, রাইটার্স ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ২০০১, পৃ. ৫০)। উল্লেখ্য, সঙ্কর ধাতু ব্রোঞ্জে তামা থাকে ৭৫ থেকে ৯০%, দস্তা থাকে ২৫ থেকে ১০ ভাগ। আর কাঠিন্যের জন্য ৮ থেকে ১২% টিন মেশানো হয় এর সাথে।
মেশানো হয় এর সাথে। এই টিনের পারিমাণ যখন ২০%-এর বেশি হয় তখন তার নাম হাইটিন ব্রোঞ্জ এবং উয়ারির আলোচ্য প্রত্নবস্তুতে ব্রোঞ্জের পরিমাণ ২৬% (সূত্র : প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫)।
২. ভারতীয় উপমহাদেশের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নকশাখচিত রক্ষাকবচ ও খ্রি.পূ. ২য়—৩য় শতকের রিংস্টোনের মতো প্রত্নবস্তু ছাড়াও বিপুল সংখ্যক নকশা করা পুঁতি পাওয়া গেছে এখানে। এর মধ্যে ছিদ্রহীন পুঁতিও যথেষ্ট সংখ্যায় রয়েছে। মনে করা হয় যে, পুঁতি তৈরির কারখানাই ছিল এখানে। তবে এসব পুঁতির কাঁচামাল আমদানি করা হতো উপমহাদেশীয় দূরবর্তী এলাকা থেকে। এখানে আবিষ্কৃত স্বল্প মূল্যবান পাথরের পুঁতি এবং বিপুল সংখ্যক ছাপযুক্ত মুদ্রা ও উপমহাদেশীয় দূরবর্তী এলাকার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। মহাস্থান ও চন্দ্রকেতুগড়েও (২৪ পরগনার অন্তর্গত) এমন পাথরের পুঁতির নির্মাণকেন্দ্র থাকার কথা অনুমান করা হয়। কাজেই এই অনুমান অসঙ্গত নয় যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পুঁতির রপ্তানি বাণিজ্যে উয়ারি-বটেশ্বরের অবস্থান ছিল। আরও প্রাসঙ্গিক অনুমান সঙ্গত যে, চন্দ্রকেতুগড় এবং মহাস্থান থেকেও তা রপ্তানি হতো।
৩. পূর্বাপর বিবেচনায় দিলীপ কে. চক্রবর্তী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং রোমান সাম্রাজ্যের সাথে উয়ারি-বটেশ্বরের যোগাযোগ ছিল বলে ধারণা ব্যক্ত করেছেন।
তিনি লিখেছেন—
‘As far as the issue of external trade is concerned, we argue that the Wari-Bateshwar could cater both to the southeast Asiatic and Roman trades of the Bengal delta.... Infact, both these traders must have been interrelated in the early centuries A.... About the postulated participation of Wari-Bateshwar in the Roman trade there is at least some classical literary evidence. Section 63 of the Periplus of the Erythrean sea.
Which was composed in the first century A.D. refers to the Gangetic estuary before if refers to chryse or the Malayan Peninsula... The Wari-Bateshwar area was possibly an entrepot which had a local manufacturing importance of its own and imported the products of Assam along the Brahmaputra before forwarding this to the Roman trade which eventually went from here to the Malayan peninsula... the other magacities being Tamluk and Chandraketugarh... like these two other sites this also must have participated in the contemporary southeast Asiatic trade and Roman trade.
(সূত্র : Dilip K. Chakraborti. Ancient Bangladesh. The University Press Limited, Dhaka. 2001. p. 65, 66)
তবে বর্তমানকালের উয়ারি-বটেশ্বরে সেকালে অবস্থিত নগরীটির প্রাচীন নাম এখনও পর্যন্ত বিস্তৃত।

পুণ্ড্রনগর
প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর একটি ছিল পুণ্ড্রনগর, যা বর্তমান বগুড়া শহরের নিকটবর্তী মহাস্থান এলাকায় অবস্থিত ছিল বলে আবিষ্কৃত হয়েছে। অন্তত খ্রি.পূ. চতুর্থ শতক পর্যন্ত প্রাচীনতা সম্পন্ন এই নগরীর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। ইমারত-অট্টালিকা ছাড়াও ভাস্কর্য মুদ্রাসহ নানা রকমের প্রত্নবস্তুর বিশাল ভাণ্ডার এটি। তবে প্রাচীনকালে নগরীটির বাণিজ্যিক গুরুত্বও যে বিশেষভাবে ছিল তাতে কোনো ভুল নেই। প্রবল অনুমান পুণ্ড্র বা আখের ব্যবসাকেন্দ্রকে ভিত্তি করে পুণ্ড্রনগর নামের প্রাচীন নগরীর গোড়া পত্তন হয়ে থাকতে পারে। সূত্র :সৈয়দ আমীরুল ইসলাম, বাংলা অঞ্চলের ইতিহাস, প্যাপিরাস, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ. ১৫৩)। তবে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে যখন এটি মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করেছিল তখন এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও নিশ্চয়ই ছিল। খ্রিস্টপূর্বকালের যে বিপুল সংখ্যক প্রাচীন মুদ্রা এখান থেকে পাওয়া গেছে তা জায়গাটির বাণিজ্যিক গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিক্রমপুর
প্রমত্তা নদীবেষ্টিত প্রাচীন নগরী শ্রীবিক্রমপুরের নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ভালো থাকায় এবং এটি একটি বিশাল রাজধানী শহর হওয়ায় এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও বিশেষভাবে ছিল। নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন—
‘প্রাচীনকালে নদনদীবহুল নৌ-যাতায়াত পথের হূদয় দেশে অবস্থিত থাকায় ইহার বাণিজ্যিক গুরুত্বও ছিল বলিয়া মনে হয়। অধিকন্তু আনুমানিক নবম-দশম শতক হইতে বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও একটা বড় কেন্দ্র ছিল বিক্রমপুরে।’
(সূত্র : বাঙ্গালীর ইতিহাস : আদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০১, পৃ. ২৯৩, ২৯৪)
নিশ্চিতভাবে অনুমান করা চলে, এই মহানগরে মুসলিম বিজয়ের আগেই বৈদেশিক যোগাযোগের সূত্র ধরে বহির্বাণিজ্য চলত।

পঞ্চনগরী
পঞ্চনগরী যে দিনাজপুরে অবস্থিত ছিল তাতে পণ্ডিতদের সন্দেহ নেই, তবে এর একাধিক সম্ভাব্য অবস্থানস্থলের বর্ণনা রয়েছে।
নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন—
‘পঞ্চম শতকে পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্যতম বিষয় ছিল পঞ্চনগরী এবং পঞ্চনগরীতেই বিষয়ের শাসনাধিকরণ অধিষ্ঠিত ছিল। পঞ্চনগরী দিনাজপুর জেলায় সন্দেহ নেই, কিন্তু কোন স্থানে তাহা নির্ণীত হয় নাই।...’ (সূত্র : প্রাগুক্ত, পৃ-৩০১)
প্রাচীন গ্রিক বিবরণীতে পেন্টাপলিস অর্থাত্ পঞ্চনগরীর উল্লেখ থাকায় বোঝা যায়, প্রায় দু’হাজার বছর আগেও গ্রিকরা পঞ্চনগরীর কথা জানত। নিঃসন্দেহে বাণিজ্যিক গুরুত্ব এই নগরীর ছিল। কেউ কেউ দিনাজপুরের চরকাই বিরামপুরে, আবার কেউ কেউ জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবির পাথরঘাটায় এই নগরীর অবস্থান থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। পঞ্চনগরী নামটা শুনে প্রতীতী জন্মে যে, পাঁচটি পরস্পর সংলগ্ন নগরীর একত্রীভূত নাম—পঞ্চনগরী।

আরও অনেক বাণিজ্য কেন্দ্র
প্রাচীন বাংলায় নৌবাণিজ্য অধিকতর বিকশিত হয়েছিল। তবে স্থলবাণিজ্যও নিঃসন্দেহেই চলত এবং শহর নির্বিশেষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল। এমনকি দিনাজপুরের সীতাকোট বিহার, কুমিল্লার শালবন বিহার, নওগাঁর পাহাড়পুর বিহারের মতো বৌদ্ধবিহারে দূরদেশের শিক্ষার্থীরা আসায় এসব শিক্ষাকেন্দ্রের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ছিল এবং বহির্যোগাযোগ ক্ষেত্রেও এগুলোর ভূমিকা ছিল। সেজন্যে শালবন বিহার থেকে গুপ্ত অনুকৃত মুদ্রা, আরব দেশীয় মুদ্রা এবং পাহাড়পুরের সোমপুর বিহার থেকে বাগদাদের খলিফা হারুন অর রশিদ-এর শাসনকালের (৭৭৮ খ্রি.) রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গেছে। এখানে বাংলার অন্যকিছু প্রাচীন নগরীর নাম আমরা উল্লেখ করতে পারি যেগুলোর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল।

পট্টিকেরা :মুদ্রাভাষ্যে এই নামের প্রাচীন নগরীর কথা জানা যায়। তবে কোথায় এর অবস্থান ছিল তা নিয়ে ধোঁয়াশা পুরোপুরি কেটেছে কি না, বলা দুষ্কর। অবশ্য ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় মত দিয়েছেন—
‘আকস্মিক খননের ফলে ময়নামতীর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ধ্বংসস্তূপের ভিতর হইতে এক সুপ্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং সঙ্গে সঙ্গে অনেক লিপিখণ্ড, পোড়ামাটির ফলক, মূর্তি, মৃত্পাত্র ইত্যাদি পাওয়া গিয়াছে। গোমতীর তীর এবং ময়নামতী পাহাড়ের ক্রোড়স্থিত এই সুবিস্তৃত ধ্বংসাবশেষই প্রাচীন পট্টিকেরার ধ্বংসাবশেষ, এমন মনে করিবার সঙ্গত কারণ বিদ্যমান।
(সূত্র : প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৪, ৩০৫)
এই পট্টিকেরা যে প্রাচীন বাংলার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর ছিল তাতে ভুল নেই।

গৌড় :সুপ্রাচীন ও অতি গুরুত্বপূর্ণ এ নগর নৌ ও স্থল বাণিজ্য পথের সাথে যুক্ত ছিল। যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মালদহ জেলাজুড়ে অবস্থিত।

গঙ্গাবন্দর :‘পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি’ সূত্রে গঙ্গাবন্দর বা গাঙ্গে নগরীর কথা জানা যায়। কেলটিস নামের মুদ্রা এখানে পাওয়া যেত। তবে বিখ্যাত এই বাণিজ্যনগরীটি কোথায় ছিল তা সঠিকভাবে বলা যায় না।

সুবর্ণগ্রাম : প্রাচীন সুবর্ণগ্রাম ও সোনারগাঁকে একই স্থানের ভিন্ন নাম বলে কেউ কেউ মত দিয়েছেন। এখানে মুসলিমপূর্ব আমলে শহর ছিল। নদী তীরবর্তী শহরটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল।

চন্দ্রবর্মণকোট :এটি একটি দুর্গের নাম হলেও দুর্গকেন্দ্রিক শহুরে জনপদের কথাও ভাবা যায়। স্থানটি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় অবস্থিত ছিল। সেই শহরের বাণিজ্যিক গুরুত্বের কথাও বোঝা যায়। এ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায়ের মন্তব্য—
‘ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায় প্রাপ্ত ষষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে চন্দ্রবর্মণকোট বলিয়া একটি দুর্গের উল্লেখ আছে। সামরিক প্রয়োজনে এই দুর্গ—নগরে গড়িয়া উঠিয়াছিল, সন্দেহ নাই। কিন্তু এই লিপিতে এবং এই স্থানে প্রাপ্ত সমসাময়িক অন্যান্য লিপিতে স্থানটি যে নৌবাণিজ্যপ্রধান ছিল তাহারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।...’ (সূত্র : প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯৪)
প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল বাণিজ্য। বস্ত্র, গুড়-চিনি, প্রভৃতি রপ্তানিপণ্য বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল। বাণিজ্যের পথ ধরে সাংস্কৃতিক লেনদেনও হয়েছিল। বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে তাই প্রাচীন বাণিজ্যনগরীগুলোর নাম উজ্জ্বল হয়ে রয়ে রয়েছে।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৪
ফজর৪:১০
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৭
এশা৭:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:২৯সূর্যাস্ত - ০৬:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :