The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

উপন্যাস

মুছে গেছে দিন

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

পাহাড়-সাগর-মাজার আর ব্যবসাপাতির এই শহরে একটা ওয়ারসেমিট্রি আছে। তারই পাশে রাত নামে, রাতের নিগূঢ় আঁধারে বা আলোয়, রক্তের একটা ধারা দেখা যায়—এটা কিসের তা অনেকের ভিতরই বিস্ময় তৈরি করে। বিস্ময় বিস্ময়কে জাগায়। সেটা কি তা তো জানা যেতেই পারে। আমরা অবশেষে বিষয়টা জানার জন্য সময়, পরিবেশ, বাস্তবতার পর-পরই যার কাছে যাই তার নাম তো মানুষই—আমরা অবশেষে মানুষেই আস্থা রাখি। অনেক ধরনের বিষয় আছে, নানান ধরনের রাজত্ব হয়তো দেখা যায়। এমনকি মিডিয়ার রাজত্বেও মানুষ বিনে তো মানুষের গতি নাই। রক্তের ধারা মানুষের জীবনকে অনেকভাবে দেখায়, অনেকভাবে এক-একটা চিহ্ন দেখায়। এক চিহ্ন ধরে আমরা অন্য চিহ্নের দিকে যাই। এই যে চিহ্নের কথা আমরা বলছি, এর যে কত রূপ, কত তার ক্রিয়াকৌশল, তার কতকিছু জেনে নিতে হবে। হয়তো এ ধারা জীবনের; অথবা মরণের। তবে এর সাথে সুমিত সৌরভ নামের মানুষটার ফেসবুকপ্রীতির একটা রিলেশন থাকার কথা। আমরা সেই ইতিহাসে ঢুকব, গল্পের সেই কাহিনি জেনে নিতে থাকব। এখানে সুমিত সৌরভ নামের একজন যেমন আছে, আছে মাধুরীমা, কিংবা আছে সুমিত সৌরভের বিলীয়মান রক্তের ধারার কথা। তারা এখানে এখন হয়তো নাই। কিন্তু সেদিন, আমরা যেদিনের কথা বলছি, কম্পিউটারের মনিটরেও তাদের জীবন ছিল। ফেসবুকের নানান কাহিনি থেকে নিজেকে মুছে ফেলার কথা ভাবতে গিয়েই সুমিত সৌরভের সারা অঙ্গে কাঁপুনি লাগে—গলা শুকিয়ে কারবালার হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। কী যেন কী সব প্যাঁচ শুরু হয় সেখানে। এত প্যাঁচের ভিতর ওর থাকতে মন চায় না। এ জগত্-সংসারের চলায়, ফেরায়, কানুনে, চিত্কারে, এমনকি শ্লোগানে এত একতরফা ভাব আছে তো আছেই! এইসব আর তার মনে ধরে না। সে বুঝে যায়, সে যা দেখে বা বোঝে, তা আসলে দেখে না, বোঝেও না। কারণ তা দেখার আগেই হয়তো মুছে মুছে যায়! না-দেখার জগত্টাই এখন এমন যে তাতে দেখার অন্তর্জগতে বাড়তি বিষয় মনে হয়! দিন তার মুছে গেছে। তার তো আর সেইসব দিন আসবে না, সেইসব দিনই তার আসবে না; যা আসলে তার জীবনে আসেনি। এইসব সে ভাবে, ভাবতে ভাবতে আবারও ফেসবুকে দেওয়া status-টার কথা মনে করে। সেইদিন সে আবার লেখে, ‘জীবনের ভার আমার আর সয় না, মনে লয় নিজের কবরের ভিতর নিজেই ঢুইকা পড়ি।’ এই ধরনের status যেই ফেসবুকের পাবলিক পেয়েছে, তখনই তারা এর অনেক মজা নেয়। সমানে like (এইটা ফেসবুকের এমন এক শব্দ যা কেবল পছন্দই বোঝায় না; যেন বলে, আচ্ছা, দেখলাম/ জানলাম/ খেয়াল করলাম/ পরে কথা হবে/ এমনও তবে লেখা যায়/ আরে ধুর, এইটা একটা কথা) দিতে থাকে। এর ওপর মন্তব্যের পর মন্তব্য আসতেই থাকে, তা এইরকম—‘ভাইজান, দারুণ কইছেন/ আমারে নিয়া ঢুইকেন/ বাহ, দারুণ তো/ এক্সিলেন্ট/ নিজের মরণকে নিজের হাতে রাখার ভিতর পৌরুষ আছে। সুমিত ভাই এগিয়ে যান/ আমরা আছি আপনার সাথে।’
এই যে কথাটা বলল সে, তারপরও মাধুরীমা তা নিয়ে কথা বলে না। status-এ একটা like-ও দেয় না। অনেক জায়গায় খুঁজে খুঁজে সুমিত সৌরভ ক্লান্ত হয়। কেন মাধুরীমা নাই? সে কি ফেসবুক থেকে নিজেকেই সরিয়ে নিল? না, তা তো নয়। সে তো দেখা যায় আছে। সুমিত সৌরভকেই ওর ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বাদ দিয়ে দেয় নাই তো! তা হতেও পারে, এইখানকার বন্ধুত্বের কী বিশ্বাস? একটা সেকেন্ড লাগে না ব্লক মারতে বা আনফ্রেন্ড করতে। এই জগত্টাকে তার কাছে আজরাইল ফেরেস্তার চেয়েও নিষ্ঠুর মনে হয়। প্রাণীর জান কবচ করতেও হয়তো আজরাইলের টাইম লাগে; আত্মা ধরে খ্যাচ করে গলা দিয়ে বের করে, তবেই না তা সৃষ্টিকর্তার দরবারে নিয়ে পৌঁছে দিবে। কিন্তু এইখানকার আইডিধারীর ক্ষমতা ফেরেস্তার চেয়েও বেশি মনে হয়। সেইসব ভাবতে ভাবতেই তার ভয় হয়, ভয় তার বাড়েও! কিছু একটা মনে হয় হয়েছে। তখন সে সে তার ইনবক্সে (ফেসবুকওয়ালার চিঠিপত্র সমানে জমা হয় তথায়।) থেকে, একটা ম্যাসেজ সিলেক্ট করে মাধুরীমার ওয়ালে ঢোকে। নাহ, তাকে তো সে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বাদও দেয়নি। নিজের ওয়াল থেকে সজল তানভিরের ওয়ালে গিয়ে সে বুঝতে পারে মাধুরীমা আছে, সে হারায় নাই। ওইখানকার একটা comments-এ like দেওয়া আছে। পাহাড়ি কবি হিউবার্ট তঞ্চঙ্গার একটা কমেন্টসে তার একটি শব্দও আছে, শুধু লেখা ‘কবিতা...’। মাধুরীমার অতি সাংকেতিক ভাষায় হয়তো বোঝানো হয়েছে, ‘দেখো, দেখো, কারে কয় কবিতা দেখো বত্সগণ হাহাহা!’ তাই হিসাব করে সুমিত সৌরভের বোঝা হয়ে যায়, গতকালও সে ফেসবুক ওপেন করেছিল। তাও তো ৮ ঘণ্টা হয়ে গেল! তার দীর্ঘশ্বাস ক্রমে ক্রমে আরও সজীব হয়ে তাকে ক্লান্ত করতে থাকে। সুমিতের পতন হয়তো এইভাবে প্রসারিতই হয়। তা থামে না, তার নিজের রক্তধারা নিজেকেই বিনাশ করার আগপর্যন্ত তা হয়তো থামবে না। inbox, chat, outbox, বন্ধুর ওয়াল বা পার্সোনাল ইনফরমেশন মিলেমিশে এখানে একটা সমাজ তৈরি হয়। সেই সমাজে একে একে কত কথা চলে। একটা সমাজ বলে কথা, সুমিত সৌরভ সেই সমাজীবনে চলতে পারে না। দিনের ভিতর চৌদ্দবার সে তথায় ঘুরঘুর করে। মানুষের মুখ দেখে, মুখ দেখা সওয়াবের কাজ মনে করে। নানান জনের সাথে কুশল বিনিময় করে। এই সমাজকে সে সাজায়, ভালোবাসার মতো ভালোবাসতে চায়। অনেক চরিত্র, অনেক তাজা কথার জন্য বুকের ভিতর গুবগুব করে। তবে মনের ভিতর অনেক ভাঙচুরও হয়। নতুবা ফাঁকা-ফাঁকা না-দেখা এক জগত্ নিয়ে তার অত কাহিল অবস্থা কেন?
পরদিনই সুমিত সৌরভ আবারও একটা status দেয়, ‘মুছে গেছে দিন/ পুরনো স্মৃতি।’ তার দিন তো ধুয়েই যাচ্ছে যেন, মুছে যাচ্ছে! তার এই ক্রমবিলীয়মান অবস্থা আমরা দেখতেই থাকব। কেন তা হচ্ছে, তা আমরা কখনো জানব না হয়তো। আমরা কত কম জেনেই তো জিন্দেগি পার করি! সেইদিন তাতে খুব বেশি like বা comments পড়ে না। ১৩৪টা like আর বিশটা comments পড়ে। নানা পদের বন্ধু আছে এখানে, কেউ দেখায়, কেউ দেখে, কেউ আসে সংসারে রায়ট দিতে। কেউ আসে জীবনের ব্যালেন্স করতে! কত রঙের মানুষ যে এই দুনিয়ায় আছে—যা ফেসবুকে জানা যায়, বোঝা যায়, তা যেন জাদুতে প্রস্ফুটিত হয়। অনেক অনেক বন্ধুর ভিতর তার এক বন্ধু লাইজু খানম। তিনি খুব বেশি comments করেন না। তিনি আর কি comments করবেন, ফেসবুকে পিকচার আপলোড করতে করতেই তো তার অনেক সময় চলে যায়। সুমিত সৌরভ প্রথম দিকে প্রায়ই সেখানে কিছু না কিছু comments করে রাখত। তার কারণও আছে, কথার মা-ই তাকে বলে রেখেছিল, লাইজু খানমের কোনো পিকচার থাকলে যেন তাকে অবশ্যই দেখানো হয়। তা করতে আর সমস্যা কী? ফাঁকে ফাঁকে সেসব দেখাবে আর-কি। মানে কথার মা যখন ধারেকাছে থাকে তখন ডাক দিয়ে দেখিয়ে দিলেই হবে। কিন্তু তা তো অত সহজ হয় না। কারণ হঠাত্ এসে কথার মা সেদিন কথাকে তছনছ করার মতোই বলতে থাকে, আচ্ছা, লাইজু, কাল বিকাল ৫টার দিকে একটা কাতান শাড়ি পরে একটা ছবি দিলো, সেইটা কোথায়? এই তো মুশকিল, সেইটা একেবারে এখনই কী করে সে দেখায়! কিন্তু না, কথার মা তা শুনতেই রাজি নয়। তোমার এইসব রংবাজি বন্ধ করো। মুখের কথাকে যেন সে টেনেহেঁচড়ে লম্বা করছে, শ্বাস যেন শ্বাসের ভারে ঝলসে যাচ্ছে। সে ঠিক ধরতে পারে না যে এখানে রংবাজি কোথায় হলো! তাই সে কথার মাকে বোঝাচ্ছে, আরে এখানে রংবাজির কী হলো? কী ধরনের ভাষা এসব? ব্যস, কথার মা কি আর এই কথাকে ছেড়ে দেওয়ার বান্দা। তুমি আমারে ভাষা শেখাও। আমি বাংলায়ও যে লেটার মার্ক পেয়েছি তা তুমি জানো? কথা কয়টি বলেই সে সুমিতের ভাবসাব দেখে। এর উত্তরটা জানার আগেই, তার টেলেন্টফুল লাইফের বর্ণনা দেওয়া শেষ। ক্লাস ফাইভ আর এইটে বৃত্তি পেয়েছে। মেট্রিকে ৪টা লেটারমার্কসহ ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে। আর তার কপাল খারাপ যে ইন্টারমেডিয়েটে রেজাল্ট খারাপ হওয়াতে সুমিত সৌরভের মতো পাগল-ছাগলের সংসার করতে হচ্ছে। কিন্তু সংসার না হয় করল, বা একটা ধমকের ওপরই তার সংসার টিকিয়ে রাখল, এখন সে লাইজু খানমের কাতান শাড়ি পরা পিকচার কোত্থেকে দেখায়? কথার মাকে সে বোঝাতেই পারে না যে তার ফ্রেন্ডই আছে পাঁচ হাজারের কাছাকাছি, ফলোয়ার আছে তিনশ’র মতো। তাহলে একটু সতর্ক না থাকলে সেইটা কেমন করে ওকে বের করে দেখাবে? তাকে তো সে স্পেশাল কোনো ব্যবস্থা করে তা জানায় নাই, যেমন, শেয়ার বা tag-ও করেনি যে তা চাইলেই তিন ঘণ্টা আগের একটা পিকচার টাইমলাইন খুঁজে বের করে ফেলবে। এই ঝামেলার হাত থেকে বাঁচার জন্যই সে, লাইজু খানমের কিছু পেলেই হয় কিছু মন্তব্য করে রাখে, অথবা একটা like হলেও দিয়ে রাখে। তা হলে অন্তত কথার মা’র এই ধরনের হঠাত্ আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
সেইদিনের বিকাল আরও বিকাল হয়। বিকাল গোঙাতে গোঙাতে সন্ধ্যার ম্লান আলোর দিকে সরতে থাকে। তখনও কথার মা ওরফে মাহী চৌধুরীর কথার ধার কমে না। সেই ধারের সাথে যুক্ত হয় লাইজু খানমের chat তথা facebook কথন :
কী করছেন?
কিছুই না! (তার কথার নমুনা সরাসরি শুনে এলে পর বিষয়টা হয়তো কিছুটা টের পেত সে—বিস্ময়বোধক চিহ্ন তার মেজাজে ঢোকে না। তাই লাইজুর কথার নমুনা হয়তো একই থাকে!)
আমি তো দেখছি কিছু করছেন।
তুমি কী করে দেখলে?
দেখলাম তো।
আচ্ছা, প্যাঁচাল বাদ দাও। ফেসবুকের কিছু কারো নজরে আনার জন্য তুমি tag করতে জানো?
না।
শিখে নাও—এই অপশন তো status আপডেটের সাথেই আছে। ইউজ করলেই পারো। স্ট্যাটাস বা নোট লিখলে ওপরে, এরই নিচে তো তোমার অতি প্রিয় পিকচার আপলোড হয়, ট্যাগ মানে অন্যকে যুক্ত বা শেয়ার করার ব্যবস্থাও সেখানে আছে। তারও নিচে আছে like / comments / share করার ব্যবস্থা। এইগুলি নিয়ে কিছু কাজ করলেই তো এক্কেবারে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।
ভালোই তো বলছেন ব্রাদার। আর কী করা যায় বলুন তো।
দেখো, পুরো জাতি এখন তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
হাহাহা, কেন কেন?
এইসব তো জাতিকে জানাতে হবে। তুমি এক কাজ করো না কেন?
কী করতে বলছেন?
একটা স্কুল খুলে ফেলো, কোচিংসেন্টার আর-কি। ফেসবুক নিয়ে আর-কি। তোমার বান্ধবীকে এটাচড করে নাও। তোমাদের তো ফেসবুকে মাশাল্লা সবই আছে।
ফাইজলামি রাখেন। আপনি কি সিরিয়াস?
অবশ্যই।
হাহাহা, তাহলে কী করতে হবে?
তোমরা প্রথমেই জানাবে, স্কুল খুইলাছেরে মওলা স্কুল খুইলাছে, ফেসুবকের স্কুল খুইলাছে। এখানে ফেসবুকের প্রাইমারি সব কাজ করতে পারো। অ্যাকাউন্ট খোলা, প্রোফাইল-পিকচার দেওয়া, ব্যাককভার ঠিক করা, পাসওয়ার্ড মেইনটেইন করা, ইমেইলের সংযুক্তি, ব্লগ, নেট-ম্যাগাজিন; তারপর ধরো, স্ট্যাটাস মানে কিছু লেখা, নোট মানে তার চেয়ে বড়ো কিছু মানে প্রবন্ধ ধরনের কিছু লেখা, তারপর like / comments / share সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। কিভাবে কথা বলতে হয়, চ্যাট মানে ফেসবুকসংলাপ চালাতে হয়, ফাইল বা ফটো জুড়ে দেওয়া, গ্রুপ মেইনটেইন করা না-করা, ব্লক মারা, আনফ্রেন্ড করা, স্পেশাল ফ্রেন্ড হিসেবে নেয়া, ওয়ালে কাজ করা থেকে নোটিফিকেশন, ফ্রেন্ড সংগ্রহ হ্যাক্ড পর্যন্ত সবই জানাতে পারো।
হাহাহা, ভালোই তো, ভালো না?
তারপর ফেসবুকের একটা জাতীয় সম্মেলন করে ফেলো হাহাহা।
মজা করতেছেন? এইসব আপনি করেন।
হাহাহা, আর সবাই তো করতে পারে। শুধু আমায় কেন বলছো?
বলছি এ জন্য যে আপনার তো সারাদিন কোনো কাজ নাই, খালি ফেসবুকে গুঁতাগুঁতি হাহাহা।
আরে অফিসটা কি তোমার সাহেব এসে করে দেয়?
আমার সাহেব, হে তো একটা সাইলদার বলদ।
সাইলদা মানে?
জানি না।
বললা যে?
আমার মন চাইছে। এইটা মনে হয় বোকা টাইপের বড়ো কোনো বলদ।
মন কেন চায়?
এই যে প্যাঁচাল শুরু করছেন; দাঁড়ান, মাহীকে জানাই।
জানালে কী হবে?
কী হবে মানে? আপনি তার দোস্তের সাথে ঠারে ঠারে কথা বলবেন, আর আমি ছেড়ে দেবো।
আরে কী বলো।
হাহাহা, ভয় খাইছেন? মাফ কইরা দিলাম।
আচ্ছা শোনো, তোমার পিকচার tag করো, প্লিজ।
না, করব না, প্রতিদিন মাহীর বকা খাওয়াবো হিহিহি।
আচ্ছা, তোমার শাড়িটা আমার ইনবক্সে আবার attached করে পাঠাও না, প্লিজ।
না।
কেন?
আপনি মাহীর ব্যাপারে মোটেই সিরিয়াস না।
আরে ধুর।
আরে ধুর বলেন কেন?
আরে ধুর মানে আরে ধুর।
তাহলে ওর এইটুকু চাওয়া আপনি ফিলাপ করতে পারেন না?
কী বলো তুমি?
কী বলি মানে, আপনি কবে তাকে শাড়ি দিছেন বলেন তো?
আরে ওর হাতেই তো সব টাকা তোলে দিই, একটা কিনে নিলেই হয়। আমি সন্ন্যাসী জাতের মানুষ, সংসারের ভার নিতে পারি না হাহাহা।
তা জানি, কিন্তু আপনি তো স্বামীজি, আপনার হাতের তো আলাদা বরকত আছে হিহিহি!
বরকত নিয়ে কথা বলবে, বলো নাগো, আর কী বলতে পারো দেখি তো!
আরে মিয়া, শাড়ির কথা শেষ করেন।
এই আলাপ এখন কেন?
এখন কেন মানে?
এইটা বাদ দাও না।
কেন? তাইলে আপনার সাথে কী আলাপ করবো? কোথায় কোথায় কী করেন জানি না মনে করছেন?
কী জানো!
আরে সেইদিন যে ওয়ারসেমিট্রির ভিতরে, সারি সারি কবরের ভিতর দিয়া একটা মেয়ের গা ঘেঁইষা হাঁটছিলেন...
আরে ওইটা তো জায়েদের ফ্রেন্ড, আমারও ফেসবুকফ্রেন্ড...
সৌরভ ভাই, আপনি মিছা কওয়া শুরু করছেন।
হাউ স্ট্র্রেঞ্জ, তুমি জানো না আমি মিথ্যা বলি না!
একসময় জানতাম, এখন জানি না।
আচ্ছা, শাড়িটার কথা বলো। কী শাড়ি আপলোড করেছিলে?
এইটা জর্জেট, হালকা পিতের ভিতর গাঢ় সুরমা রঙের ঢেউ খেলানো বডি—পাড়টা ফিরোজা রঙের।
জর্জেট পছন্দ তোমার!
শাড়িও চেনেন?
হাহাহা, আরে নাহ। আচ্ছা, এইটার কি আলাদা কোনো সিগনিফিকেন্ট আছে?
হ্যাঁ, আছে, একটু ভারী ভারী, শরীরের সাথে জমে থাকে।
তা-ই!
জি জনাব, আমি জানি এইটা মাহীর খুব পছন্দ হবে। তবে তা আপনাকে বলে লাভ কী, বউরে ছয়মাসে একটা শাড়ি দেওয়ার নাম করেন না—কিপ্টা একটা হিহিহি।
এইসব কথা এইভাবে শেষ হতে পারত, কিংবা আরও চালাতে পারত ওরা। তারা অনেককিছুই করতে পারত। লাইজু খানম কোনো অ্যাটাচড করে না, তার শাড়িময় আপলোডের লিঙ্ক দেয় না। কোনো সূত্র দেয় না সে। যা দেয় তার নাম ঝগড়া, মাহী ওরফে কথার মাকে সে কী বলে, আল্লাই জানে, সেই দিনের রাত, ঘন রাত, এমনকি রাতের শেষ প্রহরও তাদের ভিতর কথা চলে, কথার ভিতর প্যাঁচ হয়, সেই আরও প্যাঁচকে ইনভাইট করে, তা আরও চলে, তাকে কাইজা-ফ্যাসাদ বলা যায়—এর সবই চলতে থাকে। সবই লেখালেখি নিয়ে, ফেসবুকে সময় খরচ করা নিয়ে হয়। সময় যায়, তাদের কথা যায় না। সে চাইলে লাইজুকে ব্লক করতে পারে, আনফ্রেন্ড করতে পারে, ফোনে থ্রেট দিতে পারে, তার স্বামীকে কমপ্লেইন করতে পারে, কিন্তু কিছুই তারা করা হয় না। কারণ তাকে ব্লক বা আনফ্রেন্ড তো করা যাবেই না, তাহলে এইসব কথাকথি আরও বাড়বে। বাসার শান্তি কি আর থাকবে। যেইটুকুর ফাঁকে ফাঁকে লেখালেখি করতে পারছে তাও যাবে। লাইজুর কথা দিয়েই লাইজুকে মাফ করতে থাকে। সে বলেছিল, জনাব, ঘর ঠিক তো দুনিয়া ঠিক।
সেই দিনের রাত আরও গভীর রাতের দিকে যায়। সুমিত সৌরভের ঘুম আর আসে না। আবার তার মনে হয়, নিজের কবরই তাকে কবরের দিকে টানছে। ঝুরঝুর করা কাঁচামাটির গন্ধ যেন তার নাকে এসে লাগছে। সময় যায়, আবারও সময় আসে, কিন্তু কান্ধের কবরটা সে নামাতে পারে না। আসলেই দিন তার মুছে গেছে। কোথায় গেছে? কিছু কি মুছে যায়! নাকি কিছু থাকে? কোথায় থাকে তা? কিভাবে থাকে? এইসব ভাবতে ভাবতে ড্রয়িংরুমের দরজা খুলতে যেয়েও ড্রয়িংরুমটার দিকে তাকায় সে। কাঠের নয়, বেতের সোফাসেটটা তার বরাবরই খুব প্রিয়। ইরানি কার্পেটটার জায়গায় জায়গায় রং উঠে গেছে। যেন কেউ এসে খাবলাখাবলি করে রং খেয়ে নিয়েছে। সদ্য কেনা ৪০ ইঞ্চি এলসি টিভিটার দিকে সে তাকায়, কোনো চ্যানেলে গান-টান আছে কিনা দেখার ইচ্ছা হয় তার। গভীর রাতে ডিশওয়ালাদের জন্য দুইটা মজাদার আইটেম যুক্ত হয়েছে এখন—এক হচ্ছে টকশো নামের বকবকানি, অন্যটি হচ্ছে গানের কনসার্ট। দুইটারই মার্কেট আছে—হ্যাঁ, আছে তো! নতুবা এত চালায় কেন তারা? তার আসলে টিভি দেখাই হয় না। হয় সে খেলা থাকলে দেখবে, আর খবর-টবর দেখে—এর বাইরে আর কিছুই দেখে না। আর মাহী চৌধুরী তো সন্ধ্যার পর থেকে জি-বাংলা, স্টার-প্লাস, জি-বাংলা সিনেমা, ডিডি সেভেন; এমনকি তারা চ্যানেল দেখে। অবশ্য মাঝখানে মাগরেব আর এশার নামাজটাও ও পড়ে নেয়। একসাথে বা আলাদা আলাদা করে তারা খেয়েও নেয়। এখন মাহী চৌধুরী হয়তো ঘুমাচ্ছে, হয়তো শুয়ে শুয়ে একা-একাই তার সাথে ঝগড়া করে নিচ্ছে।
সে অনেকভাবে খেয়াল করে পেয়েছে, এই যে এই বিস্তৃত ড্রয়িংরুম আর কথা নামের তাদের মেয়েটি, এই দুটি অস্তিত্বই এই বাসাটার সাথে, এমনকি তার জীবনযাপনের সাথে ঠিক খাপ খায় না। এ দুইটা বিষয় যেন বাসার সাথে, এমনকি তার সারা জীবনের সাথেই মেলে না। যেন তারা অন্য কোনো জায়গা থেকে এসেছে। অন্য কোনো সুখ তারা রেখে যায়। সুমিত সৌরভ এই দুই বিষয়, কথা আর ড্রয়িংরুমটাকে আলাদা করে ইনজয় করে। কেন তা হয় তার উত্তর তার কাছে নাই। মাধুরীমার সাথে এ নিয়ে কথা বলা যায়। মাধুরীমা এলেই তার ভাবনায় ভিন্ন স্বপ্ন যুক্ত হয়। আসলেই সে আছে তো? কেউ তো এই নামে বিরাজ করছে! নাকি তা নাই! সুমিত সৌরভ এবার বারান্দার কাছে এসে দাঁড়ায়। ডানে বাঁয়ে দশটা টবে নানা ধরনের ফুলের গাছ লাগানো আছে। এই টবগুলো দেখলে তার একেবারেই ভালো লাগে না। মনে হয়, তারাও তার মতোই জেল খাটছে। তার যেমন সংসার নামের জেলখানা থেকে মুক্তি নাই, তাদেরও মুক্তি নাই। আচ্ছা, তারাও কি কান্ধে কবর নিয়ে ঘুরছে? তারাও কি কোথাও যেতে চায়? মানুষের জীবন গাছের মতো হলেও চলত। তারা তো জানেই তাদের আর কিছুই করার নেই, মাটির ভিতর থেকে রস টেনে নাও, সূর্যের কাছ থেকে খাবার সেদ্ধ করে খাও, আলো নাও, বাতাস নাও। খালি নাও আর নাও। তারা দেয়ই, তাদের এ দেওয়ায় তাদের কোনো বাসনা নাই, সাধনা লাগে না। মানুষের এই এক যন্ত্রণা, এই এক বিটলামি, না-চাইলে মায়ের দুধও মেলে না। এই যেমন, এখন সে চাইলেই বাতাসের মতো, রোদের মতো, ছায়ার মতো কিছু করে যেতে পারে না। এই গহিন রাতে চাইলেও সে দরজা না খুলে বাইরে যেতে পারে না। ঘর আর বাহিরের ভিতর কত কারসাজি করা থাকে। এমন যদি হতো যে এই জীবনে কোনো তালা নাই, ঘর আছে তো দরজা নাই, বাহির আছে তো সেখানে পুলিশ-র্যাবের কোনো দরকার নাই। তাই কি হয়? এ নিয়ে মাধুরীমার সাথে কথা হয়, ইনবক্সের কথা, chat করে, attached করে email-এ অনেক কথা বলে তারা। কিন্তু সে সেলফোন বা অন্য কোনো ঠিকানা দেয় না। এখন চাইলেই সে বাইরের এই রাত্রির ঘন অন্ধকার, কিংবা আলো কিংবা ছায়া অথবা তার জীবনের মায়া নিয়ে কথা বলতে পারবে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই বাইরের গ্রিলের দরজাও সে খোলে। এখন তার সামনে রাতের বিশাল জায়গা, বাংলো-বাড়ির ঝিমঝিম করা ঘুমন্ত বাসা। হঠাত্ সে চমকে ওঠে, এত রাতেও কুকুরের বাচ্চাটা ঘুমায়নি? ‘হিজ মাস্টারস ভয়েজ’-এর মতো সামনের পা দুটি খাড়া করে, পিছনের পায়ে সব ভার ছেড়ে দিয়ে মুখটা লম্বা করে তাকে দেখছে। যেন গুলি করে দিবে! এই এক আশ্চর্য ব্যাপার, কথার সাথে তার এত খাতির, সারাটা দিন তার পিছ ছাড়ে না। বেহায়ার মতো ঘুরতে থাকে এটি। মেয়েটার হাতে চা-ও খায় সে। কথার মায়ের সাথেও খুব খাতির। অনবরত এর সাথে কী কী সব কথা বলে, আদর করে। থাপ্পড় মারে। তা-ই দেখে, সুমিত সৌরভের মাও হাসে। তখন মায়ের হাসিটা খুব প্রলম্বিত হয়। হয়তো প্রাণীর সহজ বিচরণের সাথেই কেবল সোহনপুরের কিছু চিহ্ন পান। তা তো তার পাওয়াই লাগবে। কারণ এ পাওয়া তার জীবনের অংশ। সেই নদী, শুকায়ে যাওয়া নদী, ভাঙা পুল, ঘাসে ভেজা রাস্তা, সামনে বিশাল জমিনের মাঠ, যেখানে সীমানা শুরু হয় এক রেইনট্রি গাছ দিয়ে। মা তা নিয়ে ভাবেন। ভাবতে ভাবতে হয়তো অনেক মানুষ জড়ো হয়। তাদের নিয়ে গপসপ করেন, পান খান, আবারও বাইরের দিকে ফিরে ফিরে তাকান, আবার কবে সুমিত সৌরভ ফিরে আসে। সেসব একসময়কার ভাবনার কথা। সোহনপুরকে চিহ্ন দিয়ে রাখার কথা। এখন এই জল-পাহাড়-সাগরের শহরে মা তো সারাদিন অনেকটা একাই একটা ঘরে থাকেন। কথার পড়াশোনার যেই একটা বেতাল অবস্থা তিনি দেখেন, বিশেষত কথার মা দেখায়, তাতে তিনি ভয়েই নাতনীটার সাথেও কথা বলতে পারেন না। কথা তিনি বলবেনই-বা কেমন করে, নাতনীর শুদ্ধ ভাষার তোড়ে তার নিজের কথার ওপরই তার আস্থা চলে যায়। মা তখন ভেজা গমের ভেজা চোখের পাতা নিয়ে কী কী সব ভাবেন। তার সময় যায় ভাবনার ভিতর। হাজারটা চিন্তা করেন তিনি। এ নিয়ে কথার মা হাসাহাসি করতে করতে তাকে আরও মুছে দেয়। সুমিত বহু সময় ধরে মায়ের ঘরটা দেখে। বারান্দার পাশের বাইরের ঘরটায় তিনি থাকেন। তার সবচেয়ে সমস্যা হয় রাতের বেলা। তিনটা দরজা পেরিয়ে তিনি বাথরুমের দিকে যান কী করে? তাই কাজের মেয়েটাকেই একদিন কানে কানে বলেছিলেন, একটা পেশাবদানি জোগাড় করে সেখানে রাখতে পারে কিনা? তাই শুনে সে খিকখিক করে হাসতে হাসতে সেই কথা তখনই বেগমসাহেবকে জানায়। বেগমসাহেব তখনকার মতো কাজের বুয়াকে ধমকায়। অন্যদিকে তাকে সরিয়ে দেয়। এই কথা যেন কারও কানে না দেয়, তা বলে। কিন্তু আসল অ্যাকশন শুরু হয় কাজের বুয়া চলে যাওয়ার পর :
মা, আপনার বুদ্ধিটুদ্ধি কেমন বলেন তো!
কথা’র দাদী কিছু না বলে শুধু ফ্যালফ্যাল করে বউমার দিকে তাকান। তার কপালে যে বড়ো কিছু আছে তিনি শুধু এইটুকু আন্দাজ করতে থাকেন। কিছু না বলে, কিছু না বোঝার ভাব করে সব কিছু বুঝতে চান তিনি। তবে তার মুখের ভাবটা হচ্ছে, বিষয় কী মা! সেই ভাবকে দলামুচড়া করে কথার মা জানায়, বাসার কাজের বুয়ার সাথে কী বলতে হবে, এইটুকু যে না-বোঝে সে ৯টা বাচ্চা কী করে মানুষ করল? তাই সে বারবার বলে। বুড়া শাশুড়িকে জমিনে আছড়ানোর মতো করে কেবল কথা শোনায়। শেষ পর্যন্ত নিজের কথা নিজের বুকে রেখে সারাদিন বাথরুমের নিশানা দেখে যান তিনি। নিজের পায়ের কদম মুখস্থ করেন। তবে তার ভুলের পরিমাণ বাড়তেই থাকে। কোন দিকে দরজা, জানালা কোনটা, সময় ঠিক করা, এমনকি পশ্চিম দিকটা ঠিক করে নামাজে দাঁড়ানোটাও কঠিন মনে হতে থাকে তার। নিজের ছেলের রুমটা তিনি দেখেন। বহুবারই দেখেছেন তিনি। তার আশপাশ দিয়ে অনেকবারই বিড়ালের পায়ের শব্দের মতো ঘুরঘুর করেছেন। একটা মিষ্টি গন্ধ যেন আসে সেখান থেকে। তাই বার বার তাকে সেইদিকে কীসে যেন টানে। দুই-তিনবার বউমার সামনেও পড়ে গেছে। চোখে চোখে তখন সে প্রশ্ন করেছে, এইদিকে কী করেন মা? কিছু চান? না, তিনি কিছুই চান না। না-চাওয়ার ভিতরই তো জিন্দেগি পার করে দিলেন। সুমিতের বাপ যখন যখন-তখন তার আশেপাশে ঘুরঘুর করত, কথা না-থাকলেও কথা বলত, সেই সময়েই কিছু দাবি করলেন না তিনি, আর এখন তো তিনি নিজের জীবনটা কবরের দিকে বাড়িয়েই রেখেছেন। কী আর চাওয়ার আছে। তবে ছেলেটাকে যখন-তখন দেখার সাধ হয় তার। নিজের হাতে কিছু করে খাওয়ানোর লোভ তার আজও গেল না। কিন্তু অত বড়ো ছেলে, সংসারের অত অত নিয়ম, টাউনের চলাচলতির ভিতর সবই আউলাঝাউলা লাগে। নিজের ছেলের কাছে যেতেও তার পারমিশন নেয়া লাগে। কত নিয়ম যে আল্লার দুনিয়ায় তিনি দেখছেন। বুকের রক্ত পানি করে যাদের মানুষ করলেন তারা আজ কোথায় কোথায় যার-তার সংসার নিয়ে আছে। চাঁদের হাট করে এখন তিনি একা একা তার সময় কাটান! তিনি কয়েকবার ছেলের কমপিউটার রুমেও ঢুকেছেন। অত সময় ছেলেটা কী করে এখানে কাটায়? লুলা-ল্যাংরা, গরিব কামলার জন্য কত দরদ যে ছিল সুমিতের, কত মিছিল করেছে, পুািলশের দৌড়ানি খেয়েছে। রাত-বিরাতে কত মিটিং করেছে। আর এখন কী একটা যন্ত্রের সামনে খালি নাকি তর্ক করে? দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলবে? মানুষের কাম করতে হলে মানুষের তো দোয়া নেয়া লাগে, তাদের দরবারে যাওয়া লাগে। এইটা সে কী করে? তবু তিনি যন্ত্রটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেন, কি-বোর্ড নামের যন্ত্রটাতে বার বার আলতো করে আঙুল রাখেন। বুকসেলফে কত বই! এইগুলি কখন পড়ে?
সুমিত সৌরভ সেই রাতে মায়ের ঘরটা দেখে দেখে শ্রান্তক্লান্ত হয়। সেখানে আলো কেন জ্বলে! কী করেন মা? জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেন, মা জায়নামাজের বিছানায় পড়ে আছেন—ঘুমিয়েই গেছেন মনে হয়। এটা তার সারা জীবনের অভ্যাস, বাড়িতে থাকতে তো মেয়েটেয়ে ছিল, মানুষজন অহরহ আসা-যাওয়া করত—এখানে কে আর তাকে জাগিয়ে দিবে? জানালার ফাঁক দিয়ে আম্মা ডাকটি ভিতরে পৌঁছায় সে। মা নড়ে ওঠেন। যেন একটা আলোর পোঁটলা নামাজের ভিতর থেকে নড়ে উঠছেন! তাই দেখে সুমিত সামনের দিকে পা বাড়ায়। রোড-লাইটের মনোরম আলো বাংলোটার ভিতরেও ঝমঝম করে ঝরে। সে কামিনী গাছের ছায়ার ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই হাসনাহেনার গন্ধ পায়। কী যে মন আকুল করা গন্ধ। এই গন্ধটা যদি ফেসবুকে দেওয়া যেত! যদি সবটুকু স্বাদ তাতে ভরে মাধুরীমার কাছে পৌঁছানো যেত। আচ্ছা, এখনো কি সে ফেসবুকে আছে? তা থাকতেও পারে। কোথাও না কোথায় সে থাকেই। হয়তো সুমিত তাকে পায়, হয়তো পায় না। এমনও তো পারে, যখন যাকে মন চায় তখন তার সাথেই কথা বলে, হূদয় খুলে দেয়। অথবা দশ জনের সাথে একবারে কথা বলে; অথবা সবাইকে বিদায় দিয়ে নিজের সাথে নিজেই chat করে। তা কি করা যায়? নিজের সাথে তা পারবে? কী জানি, ডামি করে নিলেই তো হয়। ফেক-আইডি তো কতই আছে। এই এক জায়গা বটে! নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করা যায় না। মাঝে মাঝে মনে হয়, এটি হচ্ছে ভার্চুয়াল ব্রথেল—এর মিলও তো ব্রথেলের সাথেই। সন্ধ্যা হতে হতে যখন রাত বাড়ে, তখনই আইডি হোল্ডার অর্থাত্ কাস্টমাররা যার-তার দোয়ারে কড়া নাড়ে। দরজা-জানালা বন্ধ করে ইনবক্সে ঢোকে। নিজের খায়েশ মিটিয়ে কাজ করে। কথা বলে, হাসে, কাঁদে, রাগ দেখায়, এমনকি নিজেকেও দেখে নেয়। আচ্ছা, এখন কি সেখানে মাধুরীমাকে সে পাবে? কী জানি। তাকে সব-সময় একটা মলাটবন্দি বই মনে হয়। কখনো নিজেকে মেলে ধরে না—আড়াল দেয়, আড়াল নেয়। আড়ালে আড়ালে জীবন পার করতে চায় সে। তার কাছে যাওয়া মানে, সাত-আসমানের ওপরের খাস-কামরায় নিজেকে হাজিরা দেয়ানোর মতো ঘটনা! কী যে তার আছে, কী যে তার নাই। মাধুরীমা, আহা মাধুরীমা, মিছা দুনিয়ার সব ভাব দিয়ে তাকে ধরা যায় না। একটু একটু করে হাঁটতে হাঁটতে সে রেইনট্রি গাছটার তলে এসে দাঁড়ায়। কী যে ছায়া দেয় গাছটা। তার মনে পড়ে সোহনপুরের দক্ষিণ-মাথার সেই কড়ুই গাছটার কথা। স্কুল-কলেজে যাওয়া আসার পথে কতবার যে সে এর তলে জিরিয়ে নিয়েছে। হাশরের মাঠে সৃষ্টিকর্তা যদি জিগায়, হেইরে আমার বান্দা, তুই কী চাস? তখন সুমিত সৌরভ না-ভেবেই বলবে, ইয়া গাফুরুর রহিম, তুমি আমায় কড়ুই গাছের সেই ছায়াটা দাও যার নিচে আমি নিজেকে জুড়িয়ে নিতাম। এখন সে সোহনপুরের ছায়ার মতো ছায়া খুঁজেও পায় না। এই গহিন রাতে কোথায় পাবে সেই কড়ুই গাছ, সেই স্কুল, সেই কলেজ। সেই পথের সাথীদের খবরই বা কী? তবু সে খানিক দাঁড়ায়। এখানে এসেও মাধুরীমার মায়া যেন তার সাথে যুক্ত হয়। সেই মায়া হয়তো তাকে টেনে টেনে সামনের দিকে পাঠাতে থাকে। হঠাত্ই সে সজনে গাছের গোড়ায় এসে দাঁড়ায়। সোহনপুরের বাড়ির দক্ষিণ দিকের গাবগাছটার একটু দূরেই একটা সজনে গাছ ছিল। চোইতমাসের শেষ দিক থেকেই সেই গাছে গাছে ফুল ধরা শুরু হতো। নরম-স্নিগ্ধ গাছটাকে আরও মায়ায় জড়িয়ে রাখত। গাছের নরম ভাবটি একেবারে কাদা-কাদা হয়ে যেত তখন। হাতের একটু ছোঁয়া পেলেই নরম ছাল একেবারে আঙুলের সাথে লেগে থাকত। পাতাগুলির কী যে চিরল-চিরল নরম ঢেউ খেলানো নড়াচড়া ছিল! বসন্তের সবটুকু মায়া যেন তাতে লেগে থাকত। আচ্ছা, সেই গাছটা কি এখনো আছে? মরমালীকে কালই জিজ্ঞেস করবে সে। এখন নিশ্চয়ই তাতেও ফুল ধরেছে। সকাল হলেই ওরা কিভাবে যে ফুল কুড়াত! সজনে গাছের ফুলও নরম, বুকের ভিতর মায়া রাখে। গাছ নরম, ডাল নরম, ডালের পাতা নরম, ছয় স্তরে ডালের পাতাগুলির সামনে থাকে চিকন চিকন পাতা। সেই পাতার কাঁপন আরও চমত্কার। হালকা বাতাসেই একবার বুক নড়ে, একবার পিঠ নড়ে। সেই নড়নচড়ন এখনো সুমিত সৌরভ টের পাচ্ছে। এই একটা মাত্র জায়গায় যেন তাদের বাড়িটা টের পাওয়া যায়। সজনে গাছই তার বেশি আপন, বেশি ছায়া সেখানে, বেশি বেশি সোহনপুর সেখানে দৃশ্যমান হয়। সেই গাছের ছায়া থেকে তার সরতে ইচ্ছা করে না। এর নিচে একটু শুয়ে নিবে কিনা। তার ইচ্ছা করছে বারান্দা থেকে ইজিচেয়ারটা এখানে এনে একটু বিশ্রাম নেয়! হঠাত্ই মায়ের গলা শুনে একেবারে ভয় পেয়ে যায় সে; মা বলেন, অত রাইতে কী করো? বহু দূর থেকে, একেবারে সোহনপুরের বুক থেকে যেন ৪৫ বছর আগের সেই কথা শুনছে সে। তার বুকে ধকধক করা কাঁপন টের পায়। মাকেও সে দেখতে থাকে। রোড-লাইটের আলোতে মায়ের হলুদ রংটা আরও কাঁচা হলুদের মতো লাগে। সুমিতের ভয় লাগতে থাকে, মাকে আবার নিশিতে পায় নাই তো! পাহাড়ে পাহাড়ে নাকি কী ধরনের এক নিশি-ডাকা দেও থাকে, মানুষকে পথ ভুলিয়ে ভুলিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরায়। ভোরের আলোতে, সুবেহ সাদেকের আজানের সাথে সাথে কোনো এক পাহাড়ে মানুষটাকে রেখে চলে যায়। মানুষটা আর সেই আগের মানুষটি হতে পারে না। পাহাড়ি দেওয়ের সাথে একধরনের দোস্তি হয় তার। সেই দোস্তি ছাড়ানোর জন্য চাকমা-মার্মা সন্ন্যাসীর পিছে পিছে ঘুরে সমতলের মানুষ। পাহাড়ের দেও নাকি পাহাড়ের মানুষের বশে থাকে। মাকে সুমিত দেখে। দেখে দেখে তার ভয় বা শঙ্কা দূর হয়। মা হাসেন, হাসতে হাসতেই বলেন, যাও, নিজের বাড়িডা ঘুইরা দেইকা আইয়ো। তুমার বাপের কবরটাও জেয়ারত কইরা আইসো। সুমিত সৌরভ তাকে বোঝায়, বলে, আরে সেইসব কিছু না। আফনে ঘরে যান। মা ছেলেকে দেখেন, দেখতে দেখতে গ্রিলের দরজার দিকে যান। সুমিত ভাবে, আচ্ছা, মা, তার এখানে এল কী করে? তাই তাকে খোঁচায়। বাসার এই জীবন, বন্দি বন্দি কথা, চাকরির হিসাব-কিতাব, রেলের মুখস্থ রোগী, ওষুধ লেখার কেরানিগিরি করা—নিজেকেই তার মরা মরা লাগে। তার আর এখানে ভালো লাগে না। সোহনপুরের চিন্তাই তার মাথার ভিতরে কেমন জানি আউলাজাউলা লাগে। তাই তো, কতদিন বাড়ি যায় না সে!
আবারও সে ড্রয়িংরুমে ঢোকে, তাদের মাস্টাররুমের দিকে না গিয়ে কম্পিউটার রুমটার দিকে যায়। সুইচ অন করতে গিয়ে মায়ের কথা মনে হয়। সকালে তো সে অফিসেই চলে যাবে। ৯টায় অফিস। হয়তো মা তখন উঠবেই না। অথবা কথার মায়ের দেওয়া চা-নাস্তা খাবে। মা একা একাই খায়। কতদিন মায়ের সাথে বসে খাওয়াও হয় না। তার তো সময়ই মেলে না। আচ্ছা, মা তার কাছে গেল কী করে? এই চিন্তাই তাকে ফের চিন্তায় ফেলে। আবারও সে মায়ের রুমের দিকে যায়। সে জিগায়, আচ্ছা, আম্মা, আফনে আমার ধারো গেলাইন কেমেন? এ প্রশ্নে মা হাসেন, কাঠালিচাঁপার ঠোঁটের মতো মায়ের ঠোঁটে সেই হাসি অনেকক্ষণ বিচরণ করে। মায়ের হাসি থামে না। কী ব্যাপার! অনেক জনমের হাসি যেন তার কাছে সঞ্চিত আছে। সেই হাসি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার হাসি থামে না। একসময় বলেন, ‘বাপরে, তুমি বুড়া অইলে তুমিও নিজের পোলাপানের ধারে যাইতে পারবা—শইল্যের একটা গন্ধ আছে না? আছে না বাজান?’ সুমিত চোক্ষের জলে নিজেই ভাসে। সেই জলে ভাসতে ভাসতে কম্পিউটার রুমের দিকে এগোয়। রুমটা কি অনেক দূরে চলে গেল? অত সময় কেন যে লাগছে! সুইচ-টুইচ দিয়ে কম্পিউটার অন করে দেখে রাত বাজে চারটা! অত রাতে আর মাধুরীমা কোথায় থাকে। আড়ালের রমণী আড়ালেই পড়ে থাকে। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে যেন মাধুরীমা তার নিজের কবিতাই অনুবাদ করে—তোমায় বলিনি, বলো, বলিনি তোমায়? মলাট খুলে নিলে কি আর জীবন থাকে? রাতের গহিন অন্ধকারে, অন্ধকারের ভিতর তীক্ষ অন্ধকারে, কবিতা আকাশের মতো হয়, অনেক দূরের কিছু হয়। জীবনের আড়াল না-থাকলে কি জীবন হয়? এইটুকু বলে যেন সে হাসে। হাসতে হাসতে হাসির এক মিউজিয়াম বানায়! আবারও যেন সে বার্তা পাঠায়! সে লিখে রাখে, এসো, বন্ধু এসো, এসো আমরা আড়াল তর্জমা করি। সুমিত আবারও আড়ালের ভিতর ঘুরে আসে। আড়ালের ভিতরও আড়ালই থাকে। মাধুরীমা আড়াল হতে যে কত পছন্দ করে!


কথাকে নিয়ে সুমিত সৌরভ পাহাড়ের ওপরে উঠতে থাকে। এই পাহাড়টা তার খুব পছন্দের একটি জিনিস। একা একা কতবার যে এখানে এসেছে! পাহাড়ের এক গভীর নির্জন গন্ধ আছে। এর ছায়া আছে। মানুষকে নিয়ে আলাদা একটা সংসার করার বাসনা যেন আছে। এ নিয়ে কথার মা অর্থাত্ মাহী চৌধুরীর সাথেও তার কথা হয়েছে। পাহাড়ে আসার জন্য কয়েকবার সে বলেছে। মাহী তো আসেইনি, খ্যাক-খ্যাক করে বলেছে,
তুমি তো পারো শুধু পাহাড়ে যাওয়ার কথা বলতে?
কী বলো তুমি!
আচ্ছা, এত জিলাপি পাহাড় কেন করো?
আরে আমি শুধু জিলাপি পাহাড় কেন করব? হাতের কাছে আছে তাই বললাম।
না, না; কারণ আছে, তোমারে আমি চিনি না। তুমি অইলা গিয়া নিমকা শয়তান। বদের হাড্ডি।
এই তো শুরু হলো!
আরে হইছে; কী না কী বাল লেখবা, একটা গাছ চিনো না, ফুল চিনো না; আমারে নিবা গাছ চিনাইতে। তুমারে চিনি না আমি?
এই হচ্ছে মাহী—মাহী চৌধুরী! সব কিছুতেই ব্যাঁকাতেড়া কথা তার না-বললেই নয়। আবার মেয়েকে সে সাথে দিয়ে বলে, মেয়েরে রাইখা আবার ফেসবুকের কোনো ফ্রেন্ড নিয়া বইসো না। তখন সুমিত নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারে না। মাহী ভালোই জানে, কথা তার সাথে থাকা মানেই জলজ্যান্ত একটা পবিত্র গ্রন্থের সাথে তার সময় পার করার মতোই ব্যাপার। তার মেয়ে তার কাছে পৃথিবীর বড়ো আমানত। দুনিয়ার সব সেরা ভাবনা তখন সে ভাবতে চায়। আর কী না কী যে বলে মাহী! সে শুধু বলে, ফালতু কথা বাদ দাও। কিন্তু মাহী যখন কথা বলা শুরু করে তখন থামে না। তাও বলে সোহনপুরের ভাষায়। রাজশাহীর মেয়ে, কিন্তু সোহনপুরের ভাষাটা সে রপ্তই করেছে সুমিত সৌরভকে গালমন্দ করার জন্য। কিন্তু সুমিত সৌরভ তার সাথে এই জীবনে সোহনপুরের ভাষা বলে না। সে জানায়, তাতে নাকি ভাষার পবিত্রতা নষ্ট হয়। এই শোনে মাহীর শরীর কাঁপে, রাগতে রাগতে বুকে তার কারবালা নামে। শুকিয়ে আসে সব। কাঁপতে কাঁপতে সে বলে, খবিসের বাচ্চা খবিস।
আসরের আজানের মিনিট দশেক পরই সে কথা ও কথার মাকে নিয়ে সেদিন বের হয়। এই একটা বিষয় সে ফলো করে, আজানের ভিতর বা তার পরপরই সে বের হয় না। এমনিতেই তার বদনাম আছে, আল্লা-খোদার নাম তেমন নেয়ই না। আবার এই টাইমে বের হবে কেন? তার মায়েরও নিষেধ আছে। তিনি বলেন, বাবারে সমাজ না-মাইনা পারবা? সেদিনের পরদিনও বউ আর মেয়েকে নিয়ে সুমিত সৌরভ ওয়ার সেমিট্রির দিকে আসে। সময় থাকতে থাকতেই এর ভিতরটাই ঘুরতে থাকে তারা। কবরের কাছাকাছি থাকতে তার ভালোই লাগে। মনে হয় নিজের কান্ধের কবরের সাথে একেও রেখে দিবে! কবরে কবরে একটা মিতালী হবে। তার কান্ধের বায়বীয় কবর যেন তাতে আরাম পায়। সেইটা যেন নামাতে ইচ্ছা করে তার। সে তো পারলে কথাকে নিয়েই কান্ধের কবরে ঢুকে যায়! জীবন তার যেন জীবনের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে! কিন্তু মেয়ে সারি সারি কবরের ভিতরও নিজের আব্দারটা ছাড়ে না। আব্বু চলো না, আমার পরীক্ষা তো প্রায় শেষ, সুন্দরবন যাওয়ার প্লেন করো না। আরে বাবা, করব তো। মেয়ে বোঝে, বাবা যখন ‘আরে বাবা’ বলে, তখন তার বাবা প্লেন থেকে অনেক দূরেই থাকে। কিন্তু যদি বলে, আচ্ছা, দেখি কী করা যায়। এটাই বাবার আসল কথা। মাহী চৌধুরীও বলে, তুমি লেখালেখি করো, কত কথা বলো, ভক্ত-আশেকানদের লেকচার মারো, পণ্ডিতির শেষ নাই, অথচ সিদ্ধান্ত জানানোর বিষয়ে তো একেবারে বস হয়ে থাকো। কী জানি কে জানে, সুমিত সৌরভ অত বোঝে না। এ হয়তো তার রক্তের সাথে মিশে গেছে। রক্তের সাথে তো কতকিছুই মিশে যায়। মাধুরীমা কি আর কম মিশে আছে। কথা আবারও বলে, এবার কিন্তু আমরা সুন্দরবন যাবোই। এই বলে সে কতভাবে সেখানে যাওয়া যায়, তা-ই বলতে থাকে। তার মাথার ভিতর গোগল সার্চ করাই আছে। সবই থরে থরে সাজানো, সবই ইন্টারনেট থেকে কলেক্ট করা। হাই রেট থেকে চিফ রেট সবই সে বলে যায়। এইভাবে কী করে সেখান থেকে ঘুরে আসা যায়, তা বয়ান করতে থাকে সে। তার জবান বন্ধ হয় না, তা চলতেই থাকে—আব্বু, শোনো, তুমি তো ট্রেনের পাশ পাবেই। খুলনায় আমরা রেস্ট হাউজে উঠব। তা না হলে তোমার কোনো ফেসবুকফ্রেন্ডের বাসায় উঠব হিহিহি! তখন তুমি কত কথা বলতে পারবে! তারপর আমরা খুলনা থেকে মংলা চলে যাব। রাতের ট্র্রেনে গিয়ে সকালেই মংলা থেকে বোট নিয়ে সুন্দরবন চলে যাবে। তার পরে তিন-চার ঘণ্টা ঘুরে আবার ব্যাক করব। পরদিনই চলে আসব। ঠিক আছে আব্বু? রাজি তো? সুমিত মেয়ের দিকে তাকায়। তারা সামনে চলে—খানিক দূরে চলে যায় সুমিত। কথা বাবাকে দেখে, দেখার পর আরও দেখা তার থাকে। কী যে ভাবে সে। কথার চোখ ভিজে আসে। মেয়েটা কত পাকনা হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে বাবার চারটা পয়সা বাঁচাতে পারবে, তাও ভাবে। সুমিত আবার বলে, আরে বাবা, দেখা যাবে। আচ্ছা, তুই হিরণ পয়েন্টে যাবি না? শোন মা, যা করবি, ১০০% দিয়েই করবি। হিরণ পয়েন্ট না দেখলে সুন্দরবনের কিছুই দেখা হয় নারে মা। সুমিত সৌরভ মেয়ের হাত ধরেই কবরের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে পুব পাশের ঘরটার কাছে চলে যায়। ইটের ঘের দেওয়া একটা ঘর। সেই কতদিন আগের কথা, চিটাগং কলেজের মায়ারানীসহ একবার এর ভিতর ঢুকেছিল। তাকে দেওয়া গহিন-ঘন চুম্বনের আবেশ যেন এখনো তার শরীরে জড়িয়ে রেখেছে। আবারও এর কাছাকাছি আসে সে, মাধুরীমাকে এখানে নিয়ে আসার কথা ফেসবুকে কতবার বলেছে। তাতেই মাধুরীমা যেন কী এক আড়ালে চলে যায়। তখন আর জল-স্থল-মাটি-ছায়া, এমনকি রোদ্দুরেও থাকে না, অনেক দূরের, অনেক অনেক আকাশের মেঘ হয়ে যায় সে।
হঠাত্ই মনে হয়, কথা তার পিছনে নাই। কিভাবে যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। সুমিত তার কাছে যায়, তখনই তার মনে হয়, মেয়েটা নিজের কান্না লুকানোর চেষ্টাই আছে। কেন? কী হয়েছে তার? হিরণ পয়েন্টের কথা বলার জন্য এমনকি করছে? নাকি সুমিতকে সে ভিতর থেকেই দেখে ফেলছে। এই এক মেয়ে, এই এক মানুষ, এই এক রমণী, এই এক মা তার সবটুকু পড়ে ফেলে। সুমিত অতি মোলায়েমভাবে তার কান্ধে হাত রাখে। চুলের গভীর থেকে একটা গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। রোদের সাথে রোদ হয়ে ম্লান আলোর মতো করে তা সুমিতকে জড়িয়ে রাখছে। নাকি সে অনেক দূরের মেঘ হয়ে যাচ্ছে? কথার চুলে, মুখে, নাকে, ঠোঁটে, গালে ক্রমাগত যেন মানুষের বদল ঘটছে। সে কি ধীরে ধীরে মাধুরীমার রূপ নিচ্ছে? সুমিতের ভয় হয়। বিকালের আলোর কবলে পড়ে সেই ভয় আরও বাড়তে থাকে। তারা আরও সামনে এগোয়, একেবারে গেটের কাছে দাঁড়ানো মাহী কখন যেন হাঁটতে হাঁটতে একেবারে ভিতরের গেইটের দিকে যায়। সুমিত তখনও কী এক ঘোরের ভিতর হাঁটতে হাঁটতে আরও ধীরে হাঁটতে থাকে! তার স্মৃতিতে এখনো মাধুরীমার কথাই আসে। এ যেন এক যৌথসৃষ্টি, ‘মাধুরী’র সৌন্দর্যের সাথে ‘মা’ যুক্ত হয়ে আলাদা এক রূপ পায়। রক্তের সাথে আরেক রক্ত মিশে যায়। মাধুরীমার রূপ যেন পার্ট বাই পার্ট তার মনে আসতে থাকে। রক্তে রক্তে তার প্রবাহ চলে। রোদ নয়, বৃষ্টি নয়, জল নয়, স্থলও নয়, যেন মেঘের সাথে জোছনার এক প্রলেপ তৈরি হয়। সৌন্দর্যের এক স্রোত নামে। সেই স্রোতে নারী বা পুরুষ নয়, যেন প্রকৃতির ভিতর থেকে স্বাধীন এক রূপকথার রূপ আলাদা এক রূপ পায়। সেই রূপের ভিতর দুনিয়ার যত খাতির-প্রণয় জমতে থাকে। রূপের এক হাট জমেছে, রূপের চাষাবাদের জন্য সুমিতের স্মৃতিই যেন আসল এক তাড়না হয়ে আসে। তাতে এক-একটা চিহ্ন কাজে লাগে। শুধু প্রকৃতি বা মেঘজোছনার কথা নয়, যতিবিন্যাসের রূপও তাতে আছে। এইবার সে মাহী চৌধুরীর একেবারে মুখোমুখি পড়ে যায়। তার তাকানো দেখেই বোঝা যায়, সুমিতকে সে অনেকক্ষণ বা বহু জনম ধরেই চোখে চোখে রেখেছে। তার যেন জানাই আছে, প্রকৃতির কাছে এলে, কবরের গন্ধ পেলেই সুমিতের মাতলামো শুরু হবে। এটা এতই প্রকট যে এর জন্য মানসিক রোগের ডাক্তারের কথা সে আবার বলে, তার যে ডাক্তার-বন্ধু আছে, তার সাথে যাতে কথা বলে তা জানায়। কিন্তু সুমিত তা করবে না বা করে না। আসলে সুমিত কী যে করে তা মাহী ওরফে কথার মায়ের হিসাবে আসে না। তার কথা ভাবলেই নিজের সংসারটা অনেক লম্বা হয়ে যায়। এই মানুষটার সাথে, এমন পাগলের সাথে তার জীবনটা শেষ করতে হবে। তার কপালে কী করে শান্তি থাকে, নিজের পেটের মেয়েটা পর্যন্ত বাপের পাগলামিকে সাপোর্ট করে! একে তো মানুষটা রোগী নিয়ে থাকে, যে নাকি গল্প-উপন্যাসও লেখেন, ছোটকাগজ নামে কী কী পাবলিশ করে; তার ওপর আধাপাগল—এই লোকটার সাথে সাথে সে নিজেও যে পাগল হয়ে যায় কিনা, তা সে ভাবে। তাই সে দোয়া-দরুদ পড়ে আল্লার কাছে হাজার ফরিয়াদ জানায়। সে তো এখন কথার বাবার দিকে তাকায় না যেন রোজ কেয়ামতের ইশারা পায়। তার ভয় হয়, সারাক্ষণ মানুষটা কিসের ওপর থাকে! ডাক্তারি চেম্বারের মালিক পর্যন্ত তাকে কমপ্লেইন করেছে যে এমন ডাক্তার নাকি জীবনেও সে দেখে নাই, যে রোগী দেখার সময়, কখনো কখনো মেজাজও খারাপ করে ফেলে। একই কথা বার বার রোগীকে জিজ্ঞেস করে! মাহী তো এখন মেয়ে আর তার বাবার সাথে হাঁটছে না, যেন আগামীদিনের দুর্দিনের একটা চার্ট করে নিচ্ছে। তারা একসময় কফি ইন-এ যায়। সেখানেও কতদিন পর সুুমিত এল! কত যে জীবন ছিল এখানে। তার স্মৃতিও কি নাই? তারা সেদিন যখন বাসায় ফেরে তখন সন্ধ্যা একেবারে গাঢ় হয়ে এসেছে।
রাতে হঠাত্ই ম্যাসেজ আসে—শীতজোছনা যার নাম। সে জানায়, প্লিজ আমায় বন্ধু করুন। আমি সত্যিই আপনার ফ্যান। আপনার গদ্য আমার দারুণ লাগে। আমি লিখতে চাই। না না, লেখা শিখতে চাই। প্লিজ...
গদ্য কথাটা তার পছন্দ হয়েছে। এটা তার মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকে। তবে সুমিত সৌরভ তো এখন আর যাকে তাকে ফ্রেন্ড করে না। তার প্রায় ৫ হাজার ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। আর প্রোফাইল-পিকচার না থাকলে তো সে তার বাপকেও বিশ্বাস করে না। এখানে নিজের রক্তও বিশ্বাসের ভিতর থাকে না। কে যে কখন কোন দিকে খোঁচা মারে কে বলবে? ফ্রেন্ডরিকোয়েস্ট পাঠানো বন্ধুর ছবি-টবি না-থাকলে তো আর তাকে ফ্রেন্ড হিসাবে সে নিবেই না। কিন্তু ওর বলা গদ্য ভালো লাগে কথাটি তার মনে দাগ কাটে। তাই তাকে সে নিজেই ফ্রেন্ডরিকেয়েস্ট পাঠায়। অতি দ্রুত তা এক্সেপ্টও হয়। তার পরই তার ওয়ালে ওর মন্তব্য আসে। নানান status প্রতি-মন্তব্য চলতেই থাকে। তবে তাতে অনেকের ভিতর মাধুরীমাও তো কিছু না কিছু বলেই! আচ্ছা, এটা মাধুরীমা নিজে নয়ত? তার মন্তব্য তো সামাজিক নানান বিষয়কে খুঁচিয়ে দেয়। ঘটনা কী! এই ধরনের একটা ম্যাসেজ তাকে পাঠাতেই মাধুরীমা সেই যে এখানে মন্তব্য করা বন্ধ করে আর তাকে সেখানে পাওয়াই যায় না। তবে একটা ম্যাসেজই সুমিত সৌরভ পায়, তোমার মতো সন্দেহবাদী আর রাগী মানুষকে আমিই আনফ্রেন্ড করে ফেলতে পারি। তাতে সুমিত অনেক অনেক চিন্তায় পড়ে। অনেক দিক তাকে ভাবতে হয়, অনেক কথা, অনেক রাগ, এমনকি অনেক ব্যবহার তাকে ধুয়েমুছে ফেলতে হয়!
শীতজোছনা লিখতেই থাকে—‘কাল রাতে নেট অফ করে অনেক ভেবেছি। আমার কথা শেষ হয়, কিন্তু ভাবনা কেন শেষ হয় না? এসব কেন হচ্ছে! কত শত চিন্তা যে মাথায় আসে, মনে বিরাজ করে। আচ্ছা, সত্যি কথা বলো তো, কেন তোমার সাথে জড়াচ্ছি? যার বউ আছে, সংসার আছে। আসলে চট করে কিছু করা ঠিক নয়। প্রথম থেকেই আমার মনে হচ্ছিল ইনবক্সে কথা হলেই আমার কিছু একটা হবে। ইনবক্সের মতো খচ্চর জায়গা আর নাই। তোমার পরিবারের ছবি দেখছিলাম আজ। সবাইকে ভালোই লেগেছে।’ সুমিত সৌরভের তাতে রাগই হয়, এইসব কী লিখছ? কেন লিখছ। তুমি কে? অনেক সময় যায়, সময় বয়ে যায়—একসময় এর রিপ্লাই আসে,
আহা, কথায় কথায় রেগে যাও কেন বল তো? শোনো, চলো আমরা বন্ধু হই, আরও শুভাকাঙ্খী হই।
আরে আমরা তো বন্ধু আছিই।
না না, শুধু লেখার বন্ধু।
হ্যাঁ, তা হও, কে নিষেধ করেছে?
এই যে আবার রাগ করতেছো তুমি। আমি তোমার পাঠিকা হয়ে থাকি, ঠিক আছে? যা ভালো লেখো তুমি, ভাবছি তোমাকে বাদ দিয়ে তোমার লেখার সাথে প্রেম করব। আমি জানি সখা, তুমি ভালোবাস কি না। আমিও বাসি... কিন্তু হিসাব করতে ভালো লাগছে না। তার চেয়ে চলো কোনো স্বার্থ ছাড়াই মিশে যাই আমরা পরম আনন্দে। ...বি হ্যাপি।
নাহ, সুমিত সৌরভ আর পারছে না। এইসবের কী মানে থাকতে পারে? সেইদিনই তাকে সে আনফ্রেন্ড করে দেয়। তবে তারপরও হয়তো সে আসে, নানা নামে, রূপহীন, গন্ধহীন হয়ে আসে। হয়তো তার বয়সও থাকে না। অথবা নিজের বয়সটা সে নিজেই সৃজন করতে জানে। ফেসবুকে এত জানাজানি কী করে হয়, তা বিভিন্ন ভাবে বাড়ে। এমনই এক ম্যাসেজ আসে তার কাছে—এই আমার ফ্রেন্ড হবে? কেন? আমি তোমার ফ্যান তো। তোমার গল্প আর গদ্য যা সুন্দর। তুমিও দারুণ। কিন্তু আমি তোমার ফ্রেন্ড কেন হবো। কারণ আমার সুন্দর একখান ফেস আছে, আমার বুকও আছে হিহিহি।


হঠাত্ই সে নাজেল হয়। যেন সে বিদ্যুতের তলোয়ার। চারদিকেই তার ধার দেওয়া আছে যেন। সে এসেই সামনের চেয়ারাটায় ধ্রাম করে বসেই হাতলওয়ালা চেয়ারের দুই হাতে প্রসারিত হাত স্থাপন করে সুমিত সৌরভের দিকে তাকায়। শুধু তাকায় না, চুপিচুপি হাসে। তার হাসিকে ঠোঁটের কোনায় ঝুলিয়েও রাখে। তবে তার হাসিতে কোনো শব্দ থাকে না। এই হাসিটা সুমিত সৌরভ তার এলাকার এমপি সাহেবকে দিতে দেখেছেন। বড়ো কোমল, বড়ো মোহনীয়, এমনকি বড়ো বিটলামির ঘ্রাণ তাতে লেগে থাকে। তা-ই ছাত্রনেতাটি তার সামনের চেয়ারে বসে প্র্যাকটিস করছে। সে আসলে তা প্র্যাকটিসই করছে। এই ছেলে তো তার চেম্বারে অনেক এসেছে। একেবারে ন্যাংটা কাল থেকেই দেখছে একে। তার বাবা রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর হাবিলদার ছিল। সেই সুবাদে ওষুধ-টষুধ নিতে আসত। তার বাদে ছাত্রনেতা হওয়ার পর গপসপ মারার জন্য এসেছে। দশটা লোককে চেম্বারের সামনে রেখে নিজে পট করে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। অনেক অনেক সময় বসে লম্বা কথা বলেছে। কথা শোনানোটাও তো একটা কর্ম বটে। কিন্তু আজ তার হাসিটা অনেক ক্রিয়াশীল। অনেক কথা সে যেন রেখে যাচ্ছে। বিশেষ করে ফেসবুকে সুমিত সৌরভের স্ট্যাটান নিয়েই তার আসল কথা শুরু হয়।
আচ্ছা ডাক্তার সাব, (এই বলাটাও মাস ছয়েকের ব্যাপার, তার আগে স্যার-ট্যারই বলত) এইসব মাতব্বরি কেন করছেন? সুমিত সৌরভ তখন কিছু না বলে ‘কোন সব কথা জানতে চাওয়ার’ ভঙ্গি করে। সেই ভঙ্গিকে তছনছ করে দিয়ে আবার সে যোগ করে—দেশ কি খারাপ চলছে, বলেন, খারাপ চলছে? গণতন্ত্র আর কেমন চলে?
না না, আমি সেসব বলি না তো?
আরে রাখেন আপনার সেইসব বলা! দেশ এখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ‘চার-ছক্কা হৈচৈ/ বল গড়াইয়া গেলো কই’ নিয়া আছে; আর আপনারা ভেজাল বাজান। ধুর মিয়া।
আসলেই তা আমি তেমন কিছু করি নাই।
দেখেন কী করেছেন বা বলছেন তা আমার মোবাইলের ফেসবুক অপশনে গেলেই জানা যাবে।
আমি বলতে চাইছি।
আপনি বলতে চাইছেন, দেশটারে নিয়া ময়-মুরুব্বি দেশগুলি কাড়াকাড়ি করছে! তাই তো? দেশটারে আপনি নডি মানে বেশ্যার সাথে তুলনা করছেন?
না, মানে, আমরা তো চাই যে...
আরে রাখেন আপনার চাই যে—এইসব কইরেন না, আপনি মুরুব্বি মানুষ, গরিব মানুষের উপকারও করেন, তাই বলছি।
আসলে কিন্তু...
আবার কথা বলেন? আপনারে মনে করেন একটা চান্স দিলাম। বুইঝেন কিন্তু...
সামনে পিছে না তাকিয়ে সে হন হন করে কোন দিকে যেন চলে যায়। সে যে আসলে সরকারি বাহিনীর সেক্টর-অফিসের দিকেই গেছে তাই ইশারা করে জানায় চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট শ্রীধাম নাথ। সুমিত সৌরভ সেইদিন আর রোগী দেখতে পারে না। তার ভিতরটা গরগর করতে থাকে। তার ওপর ভর করেই সাড়ে চারটার ভিতরই চেম্বার ছেড়ে বাইরে আসে সে। পাহাড়ের ওপরের কড়ুই গাছটার নিচে বসে থাকে। একটু পরেই আর্টিস্ট সজীব তার সাথে যোগ দেয়। তারা কোনো কথা বলে না। কোনো কথা তাদের থাকে না। তাদের তো কোনো কথা থাকার দরকারও নাই। তারা কেবল কী হচ্ছে, কী হবে, কী হতে পারে, তা-ই আন্দাজ করে। তাদের আন্দাজ তাদের মনের ভিতর ঘুরপাক খায়। ঘূর্ণায়মান লাটিমের মতোই তাদের ভাবনা কেবলই ঘোরে। তারা একসময় রোদের ম্লান গন্ধ নিয়ে লালখানবাজার মোড়ের দিকে যেতে থাকে। একটা সরকারি বাহিনীর গাড়ি তাদের ক্রস করে যায়। ছাত্রনেতাটি মাথা বের করে যেতে যেতে জানায়, মনে রাইখেন ডাক্তার সাব। ভেজাল বাজায়েন না। এই বাহিনীর প্রত্যেকের গায়ে কালো পোশাক, মাথায় কালো পট্টি, চোখে কালো চশমা। রোজ কেয়ামতের সাইরেন বাজাতে বাজাতে তারা সামনের দিকে চলে।
তারা সেদিন বাসায় ফেরে না। তারা হয়তো তখন আসলে কোথাও ফেরে না। সজীব কেন যেন আরও ক্ষেপা; শহীদ-পরিবারের মানুষ হয়েও দেশের নামটা শুনলেই চ্যাত্ করে ওঠে। সে কয়, দেশটা চলতেছে? কেডায় কইলো চলে? সিম্পলি একটা ধান্ধার মধ্যেই দেশটা পইড়া আছে। স্রেফ, ফকফকা একটা ধান্ধা। বুঝো না, সোনার চান, তুমি বুঝো না? সে রাগে রাগী-বিলাইয়ের মতন গজরায়। তবু তারা পাহাড়কে হাঁটার সাথী করে সামনে বাড়ে। তারা জিলাপি পাহাড়ের চিপাচাপায় সময় খরচ করতে থাকে। আচ্ছা, পাহাড়টার চেহারা তো অনেক বদলে গেছে! এর চেহারার ওপর নিজের কোনো কন্ট্রোল নাই! তা-ই তো তারা দেখছে। পাহাড় কেটে কেটে এর রূপ বাড়িয়েছে কে যেন। রাস্তা ভদ্র করেছে। এখন ওপরে ওঠার সময় শর্ট করা যায়। পাহাড় নানাভাবে তার অঙ্গ সাজিয়েছে। নানাভাবে তাকে পরখ করা যায়। পাহাড়টির যেই নাম সেই নামের ওপর তাদের ভরসা কমতে থাকে। জিলাপির মতো বেঁকে বেঁকে উঠে গেছে বলেই না এর নাম জিলাপি পাহাড়। এখন তো হয়ে গেছে সিঁড়ি পাহাড়। এক প্যাঁচ থেকে অন্য প্যাঁচে ঘুরে ঘুরে না উঠে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেই চলে। ইটগুলিও স্পেশাল, সেই ইটরঙা ইট আর নাই, রেড অক্সাইড মেরে দেওয়া হালকা গোলাপি রঙের মায়া-মায়া একটা আবরণ পড়ে আছে সেখানে। এরই একটাতে তারা বসে। সুমিত সৌরভ সেলফোনের সেটেই ফেসবুক অপশানে গিয়ে বোঝে যে নাফিজ আরমানের বিয়েতে মাশরাফ আরেফিন বা নায়লা জামানরা যাচ্ছে না। তাতে যাচ্ছে না ফারুক ওয়াজিদও! সুমিত হাঁটতে হাঁটতে আপন মনেই ভাবে। আবার সে মাধুরীমাকে পাঠানো ম্যাসেজটি দেখে। কই, সে এটা পড়েছে কিনা তাও তো সুমিত বুঝতে পারছে না—তাও তো সপ্তাহ খানেক হয়ে গেল, তাকে জানিয়েছে যে নাফিজ আরমানের বিয়েতে তাদের শহরে সে যাবে। ওই শহরটা তার ভালোও লাগে না। এত জ্যাম, এত ঘাম, এত ব্যস্ততা, এত হৈচৈ—তবু যাওয়ার বিষয়টা তার মাথায় ঘুরছিল। কবির বিয়ে বলে কথা। এই কবির কাছেই নিসর্গ আর যৌনতার মুক্তির এক নতুন ইশারা পায় সে। তার কাব্যমাধুর্যে বার বার জানানো হয় যে মানুষ আসলে কার্যত একা। নিসর্গ আর যৌনতাই মানুষের সেই একাকিত্বকে আনন্দময় করতে পারে। সর্বজনীন স্বাচ্ছন্দ্যই সেই আনন্দের মূল সোপান বটে। তবু প্রকৃতি আর যৌনতার স্বাধীনতা অনেক বড়ো বিষয়। সজীব আর্টিস্ট মানুষ, প্রকৃতির ভিতর লেগে থাকে সে। এই যে এখন আকাশে মেঘের রায়ট লেগেছে, চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে, মেঘের ছায়ার সাথে আকাশের কালো ছায়া যুক্ত হচ্ছে, তাতে সজীব ক্রমে ক্রমে আরেক মানুষ হতে থাকে। এখন সে আকাশ দেখে পাগলের মতো, তার গন্ধ নেয়, রূপের কাছে নিজেকে সঁপে দেয় যেন। সুমিত সৌরভকেও কবিতায় পায়, যেন ধীরে ধীরে কী আসছে। তার সত্তায় কী যেন ভর করছে। তার ভালো লাগা অক্ষরে অক্ষরে প্রকাশ হতে থাকে :
এই যে নিরক্ষর শরীর আমার,
কেবলই নদীর মতো বয়ে যায়,
এখানে রূপ, বর্ণ, সৌগন্ধের নামগন্ধ নাই
যা আছে তা আমার চেনা হলো না।
তাই তুমি লিখে নাও হে মেঘদূত আমার,
মেঘের রূপ-গন্ধ ছায়া লাগে যাতে
শুদ্ধ অক্ষরে, নিপুণ কলায়
ওগো সহজ প্রাণের মানুষ,
ওগো প্রিয় অক্ষর আমার,
এই যে আমার সমূহ জীবন পেতে দিলাম।
তা জোরে জোরে পাঠ করে সুমিত সৌরভ, জীবন লাগিয়ে তাতে স্বর প্রকাশ করে। সজীব কুচকুচ করে হাসে। সে হাসতে হাসতে ভাবে, তার বন্ধুটি এবার তাহলে আসল চেহারায় এসেছে। অক্ষরে অক্ষরে এবার প্রতিমা বানাবে। অক্ষর-প্রতিমায় কি পাপ আছে? কেন থাকবে, প্রতিমা মানেই তো বুকের খাঁচায় আরেক উন্মুক্ত খাঁচা বানানো। তাই তো সুমিত সৌরভ বানাচ্ছে! হঠাত্ তারা বৃষ্টির কবলে পড়ে। ডাকাতের মতোই বৃষ্টি এসে তাদের রাঙিয়ে দিচ্ছে। শরীর-মন ভরিয়ে দিচ্ছে। তা-ই নিয়ে তারা দৌড়ায়, মনে মনে হাস্যকোলাহল তৈরি করে। তারা দুইজন একসময় সুমিতের বাসার দরজায় আসে। সুমিত দেখে যে বাসার ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে। পুরো বাসাটার ভিতরটা একেবারে চাপচাপ অন্ধকার হয়ে আছে। তাই তো মাহীর সেলফোনের নাম্বারে সে মিসড কল দেয়। মেঘ-বৃষ্টি-অন্ধকারের ভিতর দরজাটা পটপট করে খুলে যায়। সুমিতের মা তো দেখা যায় একমনে দাঁড়িয়ে আছেন! তিনি ভেজা-ভেজা গামছা এগিয়ে দেন সজীবের দিকে। কিন্তু কোনদিক থেকে যেন ঝড়ের বেগেই আসে মাহী চৌধুরী—সজীবকে একটু জোরেই সালাম দেয় সে। দুইজনকে দুইটা তোয়ালে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, ভাই তো দেখি আমাদের এইদিকে আসা ছেড়েই দিয়েছেন? কী ব্যাপার, আপনিও কি বন্ধুর মতো ফেসবুকে ঢুকেছেন নাকি? সজীব কেবল হাসে, হাসতে হাসতেই মাথা দুলিয়ে জানায় যে সে এই কাজে নাই। তারপর সে শব্দ করে হাসে। সেই হাসিতে মাহী চৌধুরী নিজেকে যুক্ত না করে কথার বাবাকে লোশন দেওয়ার মতোই বলে, দেখেছো, জগতে এইসব না করেও শিল্প করা যায়। সজীব আবার হাসে— সেই হাসিকে পাত্তা না দিয়ে বাথরুমের দিকে যায় সুমিত। তবে যাওয়ার আগে সজীবকে চা-নাস্তা দিতে বলে সে।
বাথরুমে অত সময় কেন লাগবে তার? মাহীর নজরেই প্রথম আসে বিষয়টি। এত সময় তো তার লাগার কথা নয়। এই মানুষটা বাথরুম আর খাবার টেবিলেই সময় নেয় সবচেয়ে কম! আর এখন তো তার আসারই নাম নাই। দরজায় নক করতে যাওয়ার সময়ই সে ফিরে আসে। কিন্তু চোখে মুখে এ কেমন থমথমে ভাব। ঘটনা কী! সে তো মসৃণ করে স্টাইল দেওয়া মেঝেতে পা রাখছে না যেন ভারী ভারী জিনিস মাড়িয়ে সামনে যাচ্ছে। বিষয়টা বলার আগেই সে সজীবকে ইশারা দিয়ে বাইরে নিয়ে যায়। তারপর মোবাইলের ম্যাসেজ অপশানে গিয়ে লাইন কটি দেখায়—‘নাটকির পো, মেয়ে-বউ-মা নিয়ে সংসার করতে চাইলে আমাদের কথা শুনে রাখ। আজ আমাদের বড়োভাই তোকে যা বলল, তা-ই অক্ষরে অক্ষরে পালন করবি। নতুবা তোর কপালে কাফন-ছাড়া-দাফন লেখা হয়ে থাকল।’ সজীবও যেন বোবার কবলে পড়েছে। তারা আর ভিতরে ঢোকে না। সুমিত তার মেয়েকে কেবল ইশারা দিয়ে গেল যে তারা এখনই আসছে। সময় যায়, মা ভাবে, কথা ভাবে, মাহীও ভাবে। সময়ের ভিতর দিয়ে চুপচুপ করে সময় পার হয়। নীরবতা নামে। তারা বাসায় ফেরে অনেক সময় পর। সেই সময়টা হয়তো তাদের জীবনের পতনের সাথেই সম্পৃক্ত হয়ে আছে। কারণ তারা এখন আর নিজেদের কথার ভিতর থাকতে পারে না। সুমিতের মোবাইল ফোনে আজগুবি সব আওয়াজ দিয়ে দিয়ে ম্যাসেজ আসতেই থাকে।
সেদিন রাত নামে—রাতের বয়স বাড়ে, সেই রাত ভোরের দিকে যায়। আরেকটা দিনের জীবন নতুন করে শুরু হয়। সুমিতের সেই দিনের সকালটা শুরু হয় তেরছা হালকা রোদ দিয়ে। তাদের রুমের ভিতর তা ঢুকে আলাদা এক ওম তৈরি করে। সেই তাপের তেজেই হয়তো সুমিতকে উঠতে হয়। বাথরুমে ফ্রেশ হয়ে সামনের দিকে সে আসে। তার মা যেন তার আসার অপেক্ষায়ই ছিলেন। তিনি একেবারে সুমিতের মুখের কাছে মাথা এনে জিজ্ঞাসা করেন, কিয়ো, কী অইছে? তুমি কোনো প্যাঁচে পড়ছো? সুমিত কিছুই বলতে পারে না। ঝুরঝুর করে সে কাঁদতে শুরু করে। সেই কান্না সে থামাতে চাইলেও পারে না। কান্নায় কান্নার ভিতর আরেক প্যাঁচ দেয়। একসময় তাতে হোহো শব্দ যুক্ত হয়। সেই শব্দই কথাকে এই বারান্দার দিকে নিয়ে আসে। সেও কিছু না বলে, বাবাকে জড়িয়ে নেয়। তার কান্নার কবলে পড়ে সুমিতের কান্না একেবারে ফোঁপানোর দিকে যায়। সে কেবল বলে, আমি কিচ্ছু জানি নাগো আম্মা। কী জানি কী আছে আমার কপালে!
আবারও সে ম্যাসেজ পায়, আবারও মরমির বিয়ের দাওয়াত পায়। যার সাথে তার বিয়ে পাকা হয়েছে, সেই নাফিজ আরমানও ইনবক্সে ম্যাসেজ পাঠায়। তাদের ব্যাকুলতার কাছে সুমিতকে নীরব হয়ে যেতে হয়। তার তো রাজধানী শহরে কাজও আছে। রহমান ভাই আর মিলি ভাবীর সাথে কতদিন হয় দেখা-সাক্ষাত্ নাই। কথার মা তো শ্যামলীর সেই ফ্ল্যাটটা দেখার জন্য পাগল হয়ে গেছে। আচ্ছা, ৮০ লাখ টাকা কি মুখের কথা? কে কাকে দেয়? আর লোনটোন নিয়ে এইসব করলে পরে শোধ করতে বারোটা বেজে যাবে না? প্রথম ধাক্কার টাকাটা যদি কোনোভাবে ম্যানেজ করা যেত, ডাউন-পেমেন্টটা না হয় নানাভাবে এইদিক সেইদিক টেনেটুনে ম্যানেজ করা যেত। তবু কথার মা-র কথা আর থামে না। তার কথা পরিষ্কার—চাকরি থাকতে থাকতে বাসার ব্যাপারে একটা কিছু করো। তারপরে তোমার ফকিরালী কও, আর লেখালেখি কও; যা খুশি করো। চাকরি শেষ হলে পর মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে পারব না। কথাটা মনে রাইখো। এই কথাটা সে এত জোর দিয়ে বলে, যেন তা না হলে সে তার নিজের পথ দেখবে। আচ্ছা সে কী কী করতে পারে? বাপের বাড়ি চলে যাবে? চাকরি করবে? তার কী করার আছে। গলায় তার অত জোর কেন? সেই জোরটাই সুমিতকে বারবার বিভ্রান্ত করে ফেলে। তাই তাকে ভাবতে হচ্ছে। মেয়েটার পড়ার যেই নেশা, নিজেরটা সে যেভাবে ম্যানেজ করে, নিজের পড়াশোনাটা সে পাবলিক কোনো প্রতিষ্ঠানেই করতে পারবে। মেডিকেল সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং না হোক, পাবলিক ভার্সিটিতে একটা চান্স তার হবেই। তাই তাকে নিয়ে সুমিত সৌরভের ভাবনা বেশি নয়। তার ভাবনা নিজেকে নিয়েই। আসলে তার বড়ো ভুল হয়ে গেছে সংসার নামের জেলখানায় ঢোকা। কী দরকার ছিল এইসব ঝামেলায় জড়ানো? নাহ, সে আর ভাবতেই পারছে না। তার নিজের কবরটাকেই আবার যেন যত্ন করে দেখে। ফেসবুকে ঢোকে সে। ইনবক্সে দেখে, ইমেইল চেক করে। এমনকি মাধুরীমার যতগুলি সম্ভাব্য ফ্রেন্ড আছে, যেসব ওয়াল আছে, নিজের ওয়াল আছে—সবই সে চেক করে। কোথাও তার জন্য কোনো কথা বা কথার ইঙ্গিত নাই। আচ্ছা, রাতের মেইল ট্রেনে তো তার রিজার্ভেশন দেওয়াই আছে, তাহলে কেবিনে উঠে, বিছানাপত্র নিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিলেই চলে! এক শহরের ঘুম, আরেক শহরের জাগ্রত অবস্থা হবে আর-কি। তারপর দুই-এক জায়গায় গেলেই তো এই শহরের দিনটা সাবাড় হয়ে যায়। রেলের লোকগুলি এই ট্রেনে কী যে মজা পায়! জনমের সুখ যেন তাদের এটিতেই আছে। মানুষজন না হোক রাজধানীর জ্যাম, গাড়িঘোড়ার হৈরৈ, মানুষের হাউখাউ, ধুলা-তেল-ঘামের গন্ধের ভিতর কি একটা মানুষের সারাটা দিন যেতে পারে না? কিন্তু হঠাত্ তার অত ফাঁকা ফাঁকা কেন লাগে। মনে হয় একটা শহর একেবারে খালি হয়ে আছে—যেন সাহারা মরুভূমির ভিতর দিয়ে একা একা যাচ্ছে সে। বুকে তার কারবালা লাগে যেন। তার অত কান্না আসে কেন? কেন তার রোদনকাতর সময় পার হয়। হঠাত্ই তার অস্থির লাগে। সারা বাসাটায় যেন কান্নার স্রোত বয়ে যায়। তার কিচ্ছু ভালো লাগে না। সবই যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। সেই দিনের সেই দুপুরে, ফেসবুকের কান্না নিয়ে সে বিছানায় যায়। মেয়ের সামনে পড়ে যাওয়াতে তার অস্থির লাগে। কথা জিজ্ঞেসই করে ফেলে, আব্বু তোমার কী হয়েছে? নারে মা, কিচ্ছু তো হয় নাই। না, আমি দেখছি তোমার কিছু হয়েছে। বিয়ে খেতে যাবে না? সুমিত তার মেয়ে কথাকে দেখে। দেখতে দেখতে বুক কাঁপিয়ে কান্নার মতো লাগে। আচ্ছা, তার সব কথা তার মেয়েটাই বা কেন বোঝে? সে কি তার রক্তের অংশ বলেই সব বোঝে? এত কেন বোঝে? সুমিতের ভয় লাগে, একা একা লাগে। বাসা, মা, কথা, মাহী, এমনকি পোষা কুকুরের বাচ্চাটার মাঝেও নিজেকে অহেতুক কিছু মনে হয়। মনে হয় তার কিছু নাই। তার যা আছে তার নাম হয়তো মরণ। জগতে কত রকমের জীবন আছে? অনেক রকম কি? সেটা কত রকম? জীবন যত রকমই হোক, মরণ তো এক রকমই? নাকি মরণও বহু রকম হয়? বহু বেশ ধরে বহু ভাবে আসে! জীবনকে তা ঘিরে থাকে! জন্মের পরপরই প্রাণীর যে সবচেয়ে আপন তার নাম মরণ। জীবনের কোলঘেঁষে সদা পাহারাদার সে। আচ্ছা, মরণের কেন মরণ হয় না? মরণের মরণ বলে কিছু থাকলে ভালোই হতো। কিছু মনে হয় আছে। অন্তত নিজের কাছে জমা থাকে। তাই তো মানুষ নিজের মরণ নিজে ঘটায়। তাই তো সুমিত সৌরভ কান্ধের ওপরে পরাবাস্তব কবর নিয়ে সমানে জগতে বিচরণ করছে। সকালেই আবারও সে ফেসবুকে ঢোকে; ঢুকেই লাইন কয়টা কম্পোজ করে, এবং তখনই তা মাধুরীমার ইনবক্সে ম্যাসেজ হিসাবে পাঠায়—‘কাল রাতে মডেমের ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাওয়াতে আর রিপ্লাই দিতে পারি নাই। বাইরে ছিল রাক্ষুসে নীরবতা, তাই আমার পক্ষে বাইরে যাওয়া হয়নি। এবার তোমার নীরবতার বিপরীতে কিছু কথা বলি। তবে আমার সময়, সময়ের ভিতরকার নানান ঝামেলা নিয়ে কথা বলে কী আর হবে! নিজের কথার ভার নিজেকেই নিতে হয়। তবে এটা সত্য যে, প্রচণ্ড অস্থিরতার ভিতর সময় গেছে আমার। কারণ তোমার এমনতর নীরবতা আশা করিনি।’ একটি কবিতা নামের জিনিসও সে পোস্ট করে—
ঘাস তো নিজেকে ঘাস বলেই জানে।
তবে ঘাসেরও চরণ আছে, আছে চলাচল
মাটি ঘষে ঘষে তার জীবন বয়ে যায়
আশ্চর্য সুন্দর এক জীবন বহন করে।
তাতে পায়ের স্পর্শ লাগে
পূজা হয়
কবরের জগত্ থাকে
তা কেউ হয়তো কান্ধে নিয়ে চলে
কে কী চায়, তাও ঘাস জানে বা জানে না।
আমি তাকে নিঃশ্বাসের সাথে মিশিয়ে বিদায় দিলাম।
তাই তো নিলাম ওগো মাধুরীমা
শ্বাস-প্রশ্বাস এক আরামদায়ক পদ্ধতি।
এ্যাজমা রোগীই তবে হায় জানে
বাতাস কত মূল্যবান...
সুমিত সৌরভ ভাবে, যা অনায়াসে পাওয়া যায়, তার মূল্য থাকে না, এই যে বাতাস, এই যে রোদ, এই যে জল, এই যে মেঘ; এসব তো ন্যাচারাল জিনিস। প্রয়োজনে বোঝা যায় তার মূল্য কী। ঘাস নিজেকে ঘাস বলে জানলেও কবরের ওপরে আরেক সংসার পাতে সে। পায়ের চিহ্ন তাতে লাগে। পায়ের স্পর্শ তাতে রয়ে যেতে পারে। এ দিয়ে আবার পূজাও হয়। অক্ষর দিয়ে পূজা হয় তা কি সে জানে না? সে ভাবে, ভাবতে ভাবতে মনে করে, আমি আমার মনকে তো বলি নাই, মন তুমি রোদনকাতর হও! কিন্তু তা হয়ে যেতে থাকলে আমি কী করব। বন্ধু কি বন্ধুর মন খারাপ দেখবে না? সময়ের ধারাবাহিকতার ভিতর সময় নিয়ে নানান পরিচর্যা চলে। একসময় সে মাধুরীমাকে জানায়—‘আনন্দমুখর মেলায় কাল যাবো।’
এইটুকু জানিয়েই সে ম্যাসেজ পাঠায়। অনেকক্ষণ ধরে এর রিপ্লাইয়ের জন্য অপেক্ষাও করে। তাও মানুষটার কোনো খবর নাই। নাহ, তার আর কিছুুই করার থাকে না। তাই তো সে অতি স্পেশাল এক ম্যাসেজ পাঠায়—‘আচ্ছা, আমি তো পিরালি ঘরানার মানুষ, আমার কাছে ওহি আছে, দুনিয়া কেয়ামত হয়া যাবে! কারণ কী? আমি বার বার ম্যাসেজ পাঠাতে দয়াল বাবার কাছ থেকে আওয়াজ আসে, ওরে পাগলা, দুনিয়াতে মায়া-মমতার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। নাইই—এক্কেবারে তা জিরো। বুঝোস না? মায়াহীন দুনিয়া আর কেয়ামত একই কথা। ঠিকই তো! তাই তো আমি আর যাব না কোথাও। এইখানেই থাকব আমি—থেকে থেকে নিজের ভিতর নিজের অটল ভাব আনব। কবরের ভিতর কবর হয়ে বেঁচে থাকব।’
তার ঘুম হয় না। সেলফোনের আরেকটা ম্যাসেজ তার ঘুমকে রক্তাক্ত করে দেয়। ‘শালার পুত তোর সাথে কালই একটা বোঝাপড়া হবে। ফেসবুকে মানুষকে তুই যন্ত্রণা দিস। আজেবাজে ম্যাসেজ পাঠাস! শালা রাজাকারের বাচ্চা, তোর কবর হবে আমাদের হাতেই।’ নাহ, কিছুই সুমিত সৌরভের মনমতো হচ্ছে না। সকালটাই আবারও ঝিম ধরা লাগে। কথা আবারও তার বাবার কাছে আসে। সোফার পাশে বসে সে তার চুল দিয়ে বাবার মাথা ঘষতে থাকে। সুমিতের তা অনেক ভালো লাগে। আরেকটা মানুষের জীবন যেন তার সাথে লেনদেন হচ্ছে। বার বার একই প্রশ্ন করে সে, আব্বু, তোমার মন না চাইলে বিয়েতেই যাবে না, অত চিন্তার কী আছে? সুমিত তার মেয়ের কথায় মিনমিন করে হাসে। মেয়েটা যে কত কিছু ভাবে! তাই তো কোথাও যাওয়ার কথা আর ভাববে না। তার কাছে জার্নিটা একেবারে একটা বিশাল ঝামেলা মনে হচ্ছে। তা ছাড়া এখন কি হেডকোয়ার্টার লিভ করা যাবে? ওই যে নেতার বাচ্চারা তাকে নিয়ে ঝামেলা করে যাচ্ছে তার কী হবে। তাদের যে কতদিকে খেয়াল আছে? কত প্রশ্ন তাদের—আপনি একটা অফিসার মানুষ, সারা বছর স্যান্ডেল পইরা অফিসে আসেন কেন? তাই তো, তা কেন সে করে! তার তো কোনো কারণও খুঁজে পায় না। তবে তখনকার মতো সে তাদের দিকে তাকিয়ে হে হে করে হাসে। মনে করেন, এইটা নিয়া চলাফেরায় আরাম আছে আর-কি। এর জবাবেই হয়তো তাদের একজন বলে, আরে কবি মানুষ, দুনিয়ার হুঁশ নাই। কারে কী কও? তখন থেকেই তার মনে হচ্ছে, আসলেই তারা কাকে কী বলছে। তবে এটা সত্য, চামড়ার স্যান্ডেল বিনে চামড়ার জুতা খুব একটা সে পরে নাই। কেন অন্য কিছু পরে নাই? তা নিয়ে বিয়ের প্রথম দিকে মাহী চৌধুরী খুব প্যানর প্যান করত। এমনকি তার মায়ের দোহাই দিয়ে নানান প্রশ্ন করত। তিনি নাকি বলতেন, কিরে মাহী, জামাইর জুতাটাও ঠিকমতো পরে যেতে বলতে পারিস না! মাহীর ছিল আরেক যন্ত্রণা—আচ্ছা স্বামী হয়েছে বলে কি সব তার খেয়াল করা লাগবে? মা বলতেন, হ্যাঁ তা করা লাগবে। এইটা একটা বিষয়। তা না হলে, মানুষ দশ কথা শোনাবে। একসময় দশজনেই বলবে, জামাইর পছন্দ বড়ো কথা নয়, বউই মনে হয় তার দিকে খেয়াল দেয় না। বা, বউকেই জামাই পাত্তা দেয় না। জামাইর লাইফটা একেবারে গেছে, বউটাকে তো তার পছন্দই হয় না। এইসব কি পাড়াপ্রতিবেশিরা তাকে ঠারে ঠারে বলে নাই? কিন্তু তার স্বামীকে দুই-একদিন ম্যানেজ করা গেছে। আসলেই মানুষটা দুনিয়াদারি নিয়ে নিজের মতো করে কী যেন করে! সুমিত সৌরভ স্বাধীন জিনিসটা খুব চায়। আচ্ছা, স্যান্ডেল পরাতে কিসের স্বাধীনতা! সুমিত তখন ভ্যাক ভ্যাক করে হাসতে হাসতে কয়, আরে বুঝলা না? দুনিয়াডারে না পারি, নিজের পায়েরে তো স্বাধীন করতে পারলাম। এই তার ভাবনা। কিন্তু মানুষ তা কেন মানবে—তাদের কেউ কেউ বলে, পাগল কারে কয়, এর নাম নাকি স্বাধীনতা। এইসব হচ্ছে পাগলের গোষ্ঠীর প্রলাপ। মাহী চৌধুরী কিছুদিনের ভিতর বুঝে ফেলে যে তার স্বামীর বংশের ভিতর পাগলামির একটা বিষয় আছে। সেইটা তার শাশুড়িও স্বীকার করেন।


আজ হঠাত্ই একটা প্রোফাইল-পিকচার সে পায়, সুমিতের ইনবক্সে তা অ্যাটাচড করা। তাতে লেখা আমিই কবিতা, আমিই ছবি। বাহ, এটাই হবে মাধুরীমা! এই তবে মাধুরীমা। হায় সহজ সত্যের মানুষ, তুমি এত সহজ, এত তোমার রূপ? এ তো আদি তুমি, এত সমকালের? বার বার সুমিত সৌরভ তা দেখে। দেখার পর আবার তা দেখে। সারাজীবনই শুধু দেখার জন্য কোথায় কোথায় কী যেন সে রেখে দেয়। ডেস্কটপ তো আছেই, নিজের ইমেইলে সেন্ড করে, প্যানড্রাইভে রেখে দেয়, ই-ফাইল, সি-ফাইলেও রাখে। তার কাজ ছবি দেখা। তাতে পাহাড়ি একটা ফ্লেভার আছে, গাঢ় কপালের নিচে, পাহাড়ি সবুজের গন্ধ নিয়ে নাকটা বসানো, সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো ওপর-নিচের ঠোঁট, গালে আছে জলজ আবহ, থুতনিতে আছে জীবনের নিঃসঙ্গতা, সারা বুকটি পানপাতার মতোই সলাজ আবরণে রাঙানো, চোখে যা বলে, তা বলার পরও আরও কী সব বলার থাকে। তাই সে দেখে। বুকের ভিতর ধ্রিম ধ্রিম করে কী যেন বাজে। তা ধকধক করতে করতে সারা হূদয়-মন-শরীরে যেন কী সব বাজনা বাজতে থাকে! তবু তার দেখা থামে না। জীবন বয়ে যায়, হয়তো অনেক জীবন পার হয়—অথবা, সময় থেমে যায়, তবু ছবি দেখা তার থামে না। ছবিটি মাধুরীমার মতোই সৃষ্টিশীল হয়, তাতে একাকিত্ব ভর করে, ছবিটিই একা একা কথা কয়, স্বর নামে তাতে, সেই স্বরের ভিতর থেকে সুর তৈরি হয়। ছবি কবিতা হয়। কবিতাও ছবি হয়। মাধুরীমা অনেক রঙের মানুষ হয়ে তার চোখের সামনে, হূদয়ের কোনাখামচিতে রূপরসগন্ধ ছড়ায়।
ছোট্ট করে নিজের সম্পর্কে কথাও বলে রাখে—‘গান গাইতাম সেই ছোট্টকাল থেকে। রবিঠাকুরের গল্প-উপন্যাস বেশি আপন ছিল। ঠাকুরমার ঝুলি যে কতবার পড়েছি। এরপর পরিচয় হয় পশ্চিমবাংলার সাহিত্যের সাথে, যা তখনকার সময়ে আমাদের পারিবারিক সংগ্রহে ছিল। আমি এ দেশের সাহিত্যে ঢুকতে গিয়ে তাই হোঁচট খাই। আমার হাতে বই এসেছে খুব ছোট্ট বয়সে, ধরো যখন আমি অক্ষরগুলোকে জোড়া লাগাতে শিখেছি। বাসায় মা, বড়বোনরা তখন গোগ্রাসে বই পড়ত। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি সবার মুখ বন্ধ। দেখতে দেখতে আমিও বই পড়তে ভালোবাসলাম। প্রথম দিকে রূপকথা পড়া শুরু করি, তাই আমাকে মায়ার জগতে ঢোকায়; এবং তারপর রুশ সাহিত্যে ডুবে গেলাম।’
‘এসো বন্ধু সর্বজনীন এক আনন্দমুখর মেলায়—তথায় তোমায় স্বাগতম’ সুমিত সৌরভ আবারও এমনই এক ম্যাসেজ পাঠায়। তা পাঠিয়ে জবাবের অপেক্ষায় থাকে। তার অপেক্ষার দিন বা রাত, বা দিনরাত আর শেষ হয় না। দিন যায়, রাতও যায়, রাতের স্বপ্নও যায়। একদিনের স্বপ্ন পরের দিন, তারও পরের দিন চেইন আকারে আসে। তবু সুমিত সৌরভ এর জবাব পায় না। তার বাসনার হয়তো মৃত্যু ঘটে, অথবা বাসনা বলে হয়তো কিছু থাকেও না। সুমিত সৌরভ ভাবে, ভাবতে হয়, তার ভাবনা বিনে তার আর পথ থাকে না। সেই ভাবনা হচ্ছে, হয়তো এর জবাব পাবে। কোনো একদিন এর জবাব হয়তো আসে। নাও তো আসতে পারে। জবাব আসতেই হবে এমন কোনো কথা নাই। কথা ছাড়াও তো মানুষের জীবন পার হয়। সে কথার ওপর থাকতে পছন্দ করে। তাই তো তার মেয়ের নামও রেখেছিল কথা। কথা তো সুমিতের কাছে অহরহ আসে, কথায় আসে, চলনে আসে, এমনকি স্বপ্নের ঘোরে আসে। কোত্থেকে এত কথা আসে, যায়ই বা কোথায়!
সেই দিনের রাতটা সুমিত সৌরভের কাছে এক কেয়ামত মনে হয়। কারণ রাজধানী শহরের দিকে তার ভ্রমণের সময়ই মাধুরীমার ম্যাসেজ পায় সে, ‘আমি তো আনন্দমুখর মেলায় প্রতিদিনই যাই, দেখা হলেও হতে পারে। ভালো থেকো তুমি।’ সেই, ‘দেখা হলেও হতে পারে, ভালো থেকো’, বলার ভিতরই সুমিতের বোঝা হয়ে যায়, মাধুরীমার সাথে দেখা হওয়াটা হয়তো চিত্তকথনের বিষয়ই থাকবে। হঠাত্ই তার সবই তছনছ হতে থাকে। তার জার্নি এত বিষময় লাগে যে, মনে হয়, সে আবার জল-পাহাড়-সাগরের নগরীতে ব্যাক করে। আনন্দমুখরতা ক্রমশ এক জঞ্জালের মতো লাগে তার। তখনই মনে হয়, নিজের ছায়াটাও তার নয়, তার বিশ্রাম তার নয়, তার দেখা তার নয়। তার সারা শরীর একটা জ্বলুনির মতো লাগে। বুক কাঁপিয়ে কান্না আসতে চায়। এই তো কেবিনে তো ইলেক্ট্রিক ক্যাডারের আরও এক অফিসার আছেন। তাকে আড়াল করে মুখ ভিতরের দিকে দিয়ে সে পড়ে থাকে। মানুষের ভিতরে আরও এক মৃত মানুষের ছায়া সে দেখে। সেই ছায়া থেকে নিজেকে আড়াল করতে গিয়ে সারা শরীরে মরা মানুষের গন্ধ পায়। সেই গন্ধই আরও সব গন্ধকে নিয়ে আসে। শরীর তার বরফের মতো ঠাণ্ডা হতে থাকে। সে আছে তো এখানে—এই জীবনে তার অস্তিত্ব আছে কি? তার শ্বাস নিজ-স্বভাবের বাইরে যেতে থাকে। শ্বাসের গায়ে শ্বাস লেগে শ্বাসকেই সামনে এগিয়ে দেয়! তারও পর একটা ঘুম হয় তার। ঘুমই যেন স্বপ্নকে টেনে আনে। মাধুরীমার মুখটা ক্রমশ পান পাতার মতো আদিবাসী মানুষের চেহারা নেয়। সেই চেহারার প্রতি সুমিতের ভয় লাগে, ছুঁতে গেলেও তা কোথায় যেন সরে যায়! নড়তে নড়তে তা পালিয়ে যায়। সেই পালানো অস্তিত্ব থেকেই মাটির গন্ধ আসে, ভেজা ভেজা হাওয়া লাগে তাতে। জল-মাটির এমন গন্ধ সুমিত বহুদিন যেন পায় না। এই হিসাব তার স্বপ্নেই যেন চলতে থাকে। হঠাত্ই তার শরীরে ঘাম নামে। ঘামতে ঘামতে শ্বাস ছোট হতে হতে তার ঘুম ভাঙে। সেই ভাঙা ঘুমেই তার ট্রেন চলে সাঁইসাঁই করে। কেবিনের ভিতরটা একেবারে অন্ধকার। মাঝে মাঝে তাতে আলো আসে। আলো আসে ইলেক্ট্রিক খাম্বা থেকে; বাড়িঘরের লাইট থেকে। তার তলপেটে প্রচণ্ড চাপ আসে। তাই খালাস করতে কেবিন খুলে বাথরুমের দিকে হাঁটতে থাকে সে। শরীর যেন চলে না, গলায় কারবালা নামে। বাথরুমের ট্যাপ থেকেই পানি নিয়ে গলা ভিজিয়ে নেয়। তাতে একটু স্বস্তি আসে। শরীরের ঠাণ্ডা ঝিম ধরা ভাবটা নিজের কন্ট্রোলে আসতে থাকে। ট্রেনের তুমুল চলাচলের ভিতরই খাড়ায়ে খাড়ায়ে সে তলপেট খালাস করে। বাথরুমের বাইরে এসে এবার খেয়াল করে দুইটা লোক কেবিন-অ্যাটেন্ডেন্টের সিটে মাথা ঝুলুনির ভিতর ঘুমিয়ে আছে। কেবিন-অ্যাটেন্ডেন্ট গেল কোথায়? কোন ধান্ধা করে সে? তার তো এইদিকেই থাকার কথা। নাকি কেবিনের অপর পাশে ফ্লোরে বিছানা করে ঘুম দিলো? হ্যাঁ, তা-ই তো! এই বুঝি তার ডিউটি! ওকে জাগিয়ে বলে রাখবে কিনা, তাকে যেন ভৈরববাজারে নামিয়ে দেয়। আনন্দমুখর মেলা তাকে আর টানছে না। এই ট্রেনে জার্নি এত বাজে আর কখনো হয় নাই। আচ্ছা, এখানে নেমে সোহনপুর চলে গেলে কেমন হয়? কেমন আছে সোহনপুর? তার কথা কি মনে রেখেছে সে? মনে রেখেছে মনে হয়। সে নিজে না হয় এর পথঘাট, ভাঙা ব্রিজ, সামনের খোলা মাঠ, মসজিদের বারান্দা, প্রাইমারি স্কুলের উদার জমিন, এমনকি কবরস্থানকে শুধাবে, মাধুরীমা ভুলে যেতে পারে, তোমরা আমায় মনে রাখো নাই? নাকি তোমরাও ভুলে গেলে, হায়, জীবনের সাথী আমার! হঠাত্ই তার চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়াতে থাকে। তার প্রতি লোমকূপ থেকে যেন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে! তা তো কন্ট্রোলই হচ্ছে না। আচ্ছা, জীবন কি এক নদীর নাম? সোহনপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তা সেই জলখেলি নদী মনে হয়! তাই তো তার জীবনটাই একটা নদীর মতো কান্নার ভিতর মিশে যাচ্ছে।


তোমারে এইসব তামশা করতে কেডায় কইছে? (সুমিত তার বউয়ের দিকে বিস্ময়ে তাকায়! তার কথার এমন মিশ্র রূপ কোত্থেকে এল? বইয়ের কথা নয়, রাজশাহী তো নয়ই, সোহনপুরও নয়; এমন ঢাকাইয়া শহুরে বচন তার কী করে আসে! কোন পির ধরল সে। এখন তো পিরদেরই সুদিন চলছে গো!)
কিসের কী তামাশা?
এই যে কী-সব Status মারাও।
Status কোথায় দেখলে?
আমার লগে মিছা কথা কও? ভালো জিনিস তো চোখে পড়ে না—আন্ধা হয়া গেছো।
কিসের ভালো জিনিস?
কেন—সাবের, শিবু, সুদেষ্ণা, সুমন, মোর্শেদ, রোমেনা, মনিররে দেখো না?
্হায়রে আমার সোনাবিবি, কী যে বলো!
কী বলি মানে? কত সুন্দর করে ওরা কথা লেখে—তা তো চোখে পড়ে না!
আরে কী বলো— Status-এর তুমিই বা কী বোঝো!
এহ্, আমি বুঝি না? বুঝি না মনে করছ, আমি সব বুঝি।
সব বুঝো মানে?
আরে সব বুঝি মানে সব বুঝি। বাদ দেও, আসল কথা কও। তুমি লেখো নাই যে দেশটা মনে হয় বেশ্যাবাড়ি হয়া গেছে! বড়ো বড়ো দেশেরা যেই টানাটানি করতেছে, আমরা গেছি—লেখো নাই?
আরে ধুর, আমি লিখি নাই তো, পাগলা আইজুদ্দী লেখছে মানে লিখেছে হা হা হা। আমি তাতে সিম্পলি শেয়ার দিছি, মানে তাতে আমার বন্ধুরাও তা অনায়াসে পড়তে পারবে।
আচ্ছা, তুমার হুঁশদিশ কি আর আল্লায় দিবে না?
কেন-কেন?
তুমার পুন্দেদে কতজন যে বাঁশ দিতে খাড়ায়া আছো, তা তুমি জানো। আচ্ছা, মাধুরীমা কে?
মানে!
কিচ্ছু বুঝো নাই, লাইজু আমারে সব কইছে। সমানে status মারতেছো। সমানে তারে নিয়া কান্দাকাটি করো নাই।
আরে কী বলে? (তার গলার কাঁপুনিতে, দুলুনিতে, গলার কথা গলার ভিতরই প্যাঁচ খেতে থাকে। তাতে বাইরে যেটুকু স্বর আসে, তা এমনই ভেজাভেজা যে তা থেকে কথা উদ্ধার করা একটা ঘটনা বটে—তবু কথার মা তাও বোঝে। বহু দিনের ভাবের আন্দাজেই সে বোঝে নেয়।)
আরে কী বলে! হু, আরে কী বলে! তাই তো কই, ঘুমের মধ্যে কী নাম নেয়! বদমাইশের গোষ্ঠী।
আরে আস্তে বলো, আম্মা আছে না।
থাকুক। তারে সাক্ষী রাইখা সব কথা হবে। নিজের ছেলেরে নিয়া খুব তো বড়াই করে সে। ফুইট্টে তাহা ফুলের মইদ্যে ভেজাল পাইবাগো মা, আমার পোলা খাডি সোনা। কী কথা—এর নাম বুঝি খাঁটি সোনা।
পরের কথাগুলি কান্নার কবলে পড়ে এমনই ভিজে যায় যে পিছনে দাঁড়ানো মাও বিকালের ম্লান আলোর ভিতর ঘামতে ঘামতে তার রুমের দিকে সরে যায়। মাহী চৌধুরী বাথরুমে গিয়ে পরান খুলে কাঁদতে শুরু করে। তার কান্না আর থামবে না যেন, যেন তা রোজ কেয়ামত পর্যন্ত চলবে। এই ফাঁকে কথা বাপের কাছে আসে। বালিশের পাশে বসেই অতি ধীরে বলতে থাকে, আম্মু তো নেট ইউজ করতে পারে। সুমিত তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে থাকে। ‘কী করে জানে’ বাপের এমন একটা ভাবের ভিতর মেয়ে জানায়, লাইজু আন্টি তিন দিন এসেছিল। সব দেখিয়ে গেছে। আশ্চর্য! এটা তো সুমিত সৌরভ কখনো ভেবে রাখে নাই। সে কখনো তার কাছে তো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও পাঠায়নি। তবে কি অন্য কোনো মেয়ের ছবি দিয়ে ফেক আইডি খুলল? ভুল নামের ভুল মানুষ হয়ে সে তার পিছনে লেগেছে!
বাইরে কত যে নীরবতা জমছে। মনে হয় তথায় গাছের পাতাও নড়বে না। মেয়ে তার এসএসসি’র প্র্যাকটিকেল খাতা ঠিক করছে। কালই হবে তার শেষ প্র্যাকটিকেল পরীক্ষা। মেয়েটাও দেখতে দেখতে চোখের সামনে কেমন বড়ো হয়ে যাচ্ছে। তার তো মনে হচ্ছে, এই সেদিন ডা. রওশন আপা তার হাতে একদলা টকটকে রক্তমাংসের টুকরা তোলে দিয়ে বলছে, নাও বাপধন, মেয়েমানুষকে হেলা করো না, মনে রেখো, সে কিন্তু মায়ের জাত। সেই মানুষ, সেই তার মেয়ে কেমন অহরহ তার মতামত জানায়। তাকে শান দিয়ে রাখে, বাবার কর্তব্য শেখায়। সুন্দরবন যাওয়ার জন্য সে জেদও করে! আবারও সুমিত বাইরে তাকায়। সজনে গাছের ডাঁটা কেমন বড়ো হয়ে যাচ্ছে। বসন্তের রং মনে হয় এই গাছেই বেশি লাগে। ভালোবাসায় একেবারে তুলতুলে হয়ে থাকে। সজনে ডাঁটার মাথায় এখনো ফুল লেগে আছে। এতদিন ফুল ধরে রাখে? গাছটাও কেমন নরম, উর্বর লাগছে। তার ভিতরে যেন মায়ার এক সংসার আছে। বাংলাদেশের মতোই জল-মাটি-নদীর ছোঁয়া নিয়ে দিন পার করে এরা। এদেশটার সাথেও তাদের তাহলে সখিতা আছে!
মাহী চৌধুরী এখনো ঘুমায়নি। এই তার এক বিষয়, তার মেজাজ একতরফা গরম হলে আর তা ঠাণ্ডা হতে চায় না। এর শেষ দেখে তবে ছাড়ে। এখন তো দেখা যায় তার মা-টাও সবক দেওয়া শুরু করেছে, তিনি বলেন বাবারে, ‘যেই দ্যাশের যেই বাও/ নাও মাথাত দে পাথলা বাও।’ খামাকা একলা সব ঠিক করতে পারবা তুমি। আর মাইয়াডা বড়ো অইতাছে, তার মনডা তো তুমি ছুডু করতে পারো না। তারও একটা ভবিষ্যত্ আছে; সুমিত তার মায়ের দিকে তাকায়—অবাক হতে হতে এর উত্তর দেওয়ার আগেই মা বলতে থাকে—মনে জানবা, ইজ্জত পাইতে সারাজীবন লাগে, যাইতে একটা মিনিটও লাগে না। হুঁশ কইরা চইলোগো বাবা। আমি আর কয়দিন! মায়ের গলাও ভিজে আসে।


একসাথে দশটা মানুষ এইভাবে চেম্বারে চড়াও হওয়াতে প্রথমেই সুমিত সৌরভ ঘাবড়ে যায়। তাদেরকে বসতে বলার কোনো প্রয়োজন পড়ে না; তারা নিজেরাই এক-একটা চেয়ারে তো বসেই, শ্রীধাম নাথকে ইশারা মারে চেম্বারের দিকে বাইরের চেয়ারগুলি ভিতরে দিয়ে দেওয়ার জন্য। তবে কথা বলার আগেই তারা যেভাবে মোবাইলফোনে কথা বলছে, তাতে চেম্বারের ভিতরটা একটা মত্স্যবাজারে রূপ নেয়। তারা তাদের কথাই বলে—এত কথার ভিতর কী শোনে—তা শুনে আবার নিজেরাই হৈরৈও করে ওঠে। হো হো হাসিতে নিজেদের কথাকেই রাঙিয়ে দেয়, অন্যজন সমানে গালি মারে, আরেকজন কথা বলতে বলতে কথা ছোট করতে করতে বাইরের দিকে চলে যায়। নানান কথনের রঙে পড়ে সুমিত তার ঘাবড়ানো থেকে নিজেকে বের করতে পারে না। তাই সামনের সেই ছাত্রনেতাকেই তমিজের সাথে বলে, ছোটোভাই, তোমার জন্য কী করতে পারি বলো। কিন্তু তার কথা মোবাইলফোনের খপ্পরে পড়ে তা মরে যায়, নেতার কান পর্যন্ত তা যায় না। তাই আবারও মুখে না বলে সে তাদের জন্য কী করতে পারে তা-ই জানতে আকারে ইঙ্গিতে ব্যাকুল হয়। এর জবাব দেওয়ার ভার নেয় নেতার বামপাশে বসা শ্রমিক নেতা। কথার জগতে এবার শ্রমিকনেতার পালা শুরু হয়,
ভাইজান, আপনে তো মানুষ সুবিধার না!
কেন ভাই, কী করলাম?
আপনি জানেন না?
না।
আপনি তাইলে সত্যই জানেন না!
কী যে বলেন ভাই!
তাইলে আমরা তার প্রমাণ দেখাব।
হ্যাঁ, দেখান, কী দেখাবেন!
এইবার তার সামনে একটা ভিডিও ফুটেজ অন করে। তাতে এক নারী দৃশ্যমান হয়। সেই নারী বোরখা পরা, সেই নারী ধীরে ধীরে বোরখা খুলে ফেলে। এর ভিতর থেকেই এক নারী জাগ্রত হয়, তাতে মাধুরীমার আদল স্পষ্ট রূপ পায়। সুমিত ক্রমে ক্রমে ঘামতে থাকে। তার স্মৃতিতে গতকালের এক নারীর কথা মনে হয়। সেই নারীও ক্রমে ক্রমে নিজেকে এইভাবে উন্মুক্ত করতেছিল। তাতে যেই নারী আসে, তাতে রহস্য ছিল। কোথায় যেন তাকে দেখেছে, এমন একটা ঘোর ছিল। হয়তো এটা তার মোহই ছিল। হয়তো সোহনপুরের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সে এক নারী ছিল। সে হয়তো মাধুরীমা নামের কেউ হতে পারে। কিন্তু তা তো দুই-এক মিনিটের জন্য ঘটেছিল। তা কি তার চেম্বারে হয়েছিল? নারী কি বাস্তবের কেউ ছিল? নাকি রূপকথার কোলাহলহীন অবস্থায় সুমিতের সত্তার ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সে আরেক সত্তা? কী জানি, সে ভাবতে পারছে না! কিন্তু তার চেম্বারে এখন দশটা মানুষের হো হো হাসিতে রুমটি যেন কুঁচকে আসে। যেন এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উঁচা-নিচা ভাব বদলে গেছে। হয়তো সে আরেক রুমে বসে আছে। এবার কণ্ঠের ভারে রুমটি যেন গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। এইবার ছাত্রনেতা তার মুখ খোলে। অথবা এমন একটা অবস্থার জন্যই তার মুখটি হয়তো বন্ধই ছিল; সময়ই তার মুখ খুলে দেয়। সে বলতে থাকে :
তো, ডাক্তার সাব, এইসব কী?
কোন সব কী?
আবারও কথার বদলে হো হো হাসিতে রুমটি ভরে যেতে থাকে। হাসি ফেটে ফেটে কথা হৈচৈ করে ওঠে!
আমি তো স্রেফ রোগী দেখছি।
আমাগোরে পোলাপান মনে করো খানকির পুত।
কে যে এমন কথাটি বলে তা সুমিত সৌরভ আন্দাজ করতে পারে না। তবে তার কপালে যে খারাপি আছে, তা তার বোঝার বাকি থাকে না। এইবার নেতা সমাধানে আসে—আচ্ছা, রাখেন আপনার জ্ঞানের কথা, কাজের কথায় আসেন। আমাদের দুই শর্ত—১. ফেসবুকে যে আপনি নেতাগিরি করেন, তা বাদ দিতে হবে। একেবারে নাকে খত দিয়ে বাদ দিবেন। ২. এই পোলাপানরা তাদের কাজ-কাম বাদ দিয়া আপনার শয়তানি পাহারা দেয়, তাদের তো ঘর-সংসার আছে—আছে না? কাজেই তাদের এ কাজের ক্ষতিপূরণ বাবদ এক লাখ টাকা দিবেন। এর পর তারা আর দাঁড়ায় না, কথা বলে না। সমুদয় কাজের জন্য ২৪ ঘণ্টার সময় নির্ধারণ করেই তারা হো হো হৈরৈ-এর ভিতর রুম থেকে নিস্ক্রান্ত হয়। তারা তার সময়কে রক্তাক্ত করতে করতে নানা দিকে হারিয়েও যায়। কিন্তু সুমিত সৌরভের সময় তো নানামুখী সময়ের কাছে বান্ধা পড়ে যায়। সময় যেতে যেয়েও যায় না। সমস্ত শরীরে তার অস্থিরতা ভর করে। ফেসবুকেও বার বার ম্যাসেজ আসে—‘খানকির পোলা এবার সাবধান। মনে থাকে যেন।’ সেই মনে থাকাকে মনে রাখতেই তার শরীরে ঘামের রায়ট লাগে। কথা আসে না তার মুখে। মাহী চৌধুরী তো বটেই, কথা তো আছেই, মায়ের ভাবসাবেও তার ছায়া পড়ে। এত অস্থির কখনো হয়নি সে। তাই সকলের ভিতর যেন সংক্রমিত হয়ে রয়। মাহী চৌধুরী তার কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতেই আছে—এইসব লেখালেখি করার দরকারটা কী? দুই-চারটা বাড়তি পয়সা আসত, তবু আমরা মনকে বোঝাতাম। তোমার দিন তো ভালোই যাচ্ছে; যত অশান্তি সব আমাদের। কোনদিন দেখবা নিজের মেয়েরে ওরা টান দিয়া নিয়া যাবে। সেই ম্যাসেজই আমার টেলিফোন সেটে আসতে আছে। দেখো কী হয়।
তখনও সন্ধ্যার আন্ধার নামে নাই। বিকালের রোদ সরতে সরতে ম্লান ছায়ার দিকে এগুচ্ছে। এই সময় মাহী চৌধুরীই-বা কোথায় গেল! বাড়িটাই বা একেবারে কাঁপতে কাঁপতে রক্তাক্ত হওয়া শুরু করল কেন? কে যেন কোন দিক থেকে ছায়ার মতো আসছে আর যাচ্ছে। ওপরের কড়া হুকুম; সুমিত একটা স্ট্যাটাসও দিতে পারবে না। মাধুরীমাই বা তাকে ওয়ার সেমিট্রির নিরালায় যেতে বলে কেন? এই রাতে, বা সন্ধ্যার পরপরই, কেন তার সাথে দেখা করতে যায়! তার মাথার ভিতর সোঁ সোঁ শব্দের স্রোত নামে। তাকে তো এখন বের হতেই হবে। তাই করতে যেয়ে সে মায়ের বাধা পায়—
মাগরিবের টাইমে কই যাও?
এই একটু বাইরে যাইতাছি। আইয়া পড়ুম।
কিন্তু মা কি আর নিজের ছেলেকে চেনেন না? চেনেন বলেই তার মনের খচখচানি যায় না। এক দৃষ্টিতে তার মুখ পানে চেয়ে থাকেন। কথা শুরু করতে যেয়েও গলার ভিতরে জমে থাকা শ্লেষ্মা দূর করেন। তিনি নিজের গলাকে মা কথা বলার মতো করে নেন। তিনি বলেন, এই সময়ে বাইরে যাইও না। মা তো কথা বলছে না যেন ছেলের অস্তিত্বকে জোড়াতালি দিচ্ছে। মায়ের মনে হয়, তার ছেলের জীবনে আলাদা এক ঝামেলা যুক্ত হয়েছে। কিছু একটা ওর
ভাবনায় আছে। আবারও কথা বলতে যেয়ে মনে হয় তার গলা কাঁপছে। কণ্ঠস্বর ভিজতে ভিজতে বারান্দায় লুটিয়ে পড়ছে। জঞ্জাল দূর করার মতোই বলেন, ‘আমারে কও না কী হইছে।’ ‘আরে কিছু না’, বললেও সুমিতের গলায় ক্লান্তির ভার নামে। সেই ভার কমানোর জন্যই হয়তো আরও কিছু বলতে চায়। কিন্তু মা বলে,
তুমার থায়ী কিছু দেখলাম না, নিজের বাসাডা পর্যন্ত অইলো না!
আরে অইবো আর-হি।
কবে অইবো? বউপোলাপান লইয়া কী করবা তুমি? এই চিন্তায় ত আমার মাতা নষ্ট অইয়া গেল-গা।
ইতান অহন বাদ দেইন ত। আফনে আছুইন ক্যারে, আফনে দেকবাইন।
কী কও তুমি? কী অইছে?
জানি না, আমি কিছু জানি না। সব বেইমানের দল। আম্মা আমি যাই।
আইবা কুন সময়?
এরপরের কথা হয়তো সে আর বলে না। হয়তো বলে, যা কেউ শোনে না। মানুষ কি মানুষের সব কথা শোনে, মানুষগুলি কী সব বলে? আবার সে বাইরের দিকে পা বাড়ায়। ততক্ষণে সে বহু দূরের দিকে যেতে থাকে। তার পিঠের ওপর মাগরেবের আজান পড়তে থাকে। কখন যেন কথাও এসে দাদীর কাঁধ ঘেঁষে নিজেকে দাঁড় করায়। তাদের চারপাশে ক্রমে ক্রমে রাতের ছায়া জমতে থাকে। সুমিত সৌরভ হাঁটছে তো হাঁটছেই। বহুকাল ধরেই হয়তো সে হাঁটছে। বার বার করে সেলফোনের স্ক্রিন চেক করে যাচ্ছে। কী জানি আছে সেখানে। এর মাধ্যমে নির্দেশ পাওয়া পথের দিকে সে চলতে থাকে। তার চলা থামার কি কোনো ইশারা নাই?
ক্রমে ক্রমে স্ক্রিনে দেয়া পথ ধরে চলতে চলতে মনে হয় কোন দিকে যেন সে চলে যাচ্ছে। শহুরে গাড়ির শব্দ কই? পাহাড়ের নির্জনতা কই? কোথায় আর্ট কলেজের সামনের রাস্তা? সবই ওর কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া লাগে! কথা নেই, জনমনুষ্যির চলাচল নেই, সবই নীরবতা দিয়ে গড়া! যেন মানুষের স্তব্ধতা সবকিছু নির্ণয় করে দিচ্ছে। কবর-কবর নীরবতা যেন তাকে ঘিরে ধরছে। সুমিত হাঁটতে হাঁটতে জীবনের অনেকগুলি স্তরের ভিতর দিয়ে যেন যায়। তার বয়স কি নড়ে? কতদিন ধরে সে জিন্দেগি করছে, তাও এক বিষয়। কতভাবেই না সে বেঁচে আছে। মরণও কি অনেকভাবেই হয়? মরমি ভাবের জীবন কী বলে? মরণ কার্যত একরকমই হয়। তার নীরবতা এখন নিজেকেই যেন মেপে দেখছে! এমনই একটা নির্জনতার ইঙ্গিতই তো মাধুরীমা তাকে দিয়ে রেখেছিল। তাহলে এখানেই কোথাও মাধুরীমা মানুষটা কি আছে? তার গায়ের গন্ধ, সৌন্দর্যের লীলাময়তা হয়তো এখনই দেখা যাবে। ভাবতে ভাবতে সে রাতের ঘন অন্ধকারের ভিতর ঢুকতে থাকে। তাকে যেন এক নেশায় ধরেছে। নিশি-পাওয়া-রাতের কোনো ইশারা আসে কিনা! হঠাত্ই তার সামনে যেন মাধুরীমার একটা কায়া বের হয়। সেই কায়ার ভিতর একটা ছায়া যেন নড়ে ওঠে। তাতে আরেক মানুষের রূপ আসে! সবই এক ঘোরের বিষয় মনে হয় ওর। আবার কায়াটা ছায়া হতে হতে কোথায় গেল? এখন তার সামনে কাকে দেখছে? সেই নেতা নাকি, যাকে সে তার রুমের দিকে দেখে এসেছে? চারপাশ বিদীর্ণ করে একটা হিসহিসে হাসির স্রোত বয়। যেন সব তছনছ হয়ে যাবে। যেন আগুনে পুড়ে সব মিশমার হয়ে যাবে। অন্ধকারের ভিতর তীক্ষ অন্ধকার ভেদ করে কী যেন তার পেট বরাবর ঢুকে যায়। সমস্ত নাড়িভূঁড়ি রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়তে থাকে। কোরবানির গরু জবাই করার মতো একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোয়। সেই আওয়াজ হয়তো রাতের অন্ধকারের ভিতর আরেক পথ রচনা করে।
সুমিত সৌরভকে যে আর পাওয়াই যাচ্ছে না। তার ওয়ালের সব ফুটেজও রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে! রক্তের স্রোতের ভিতর কি মানুষটা মিশে যাচ্ছে! নিজের নাড়িভূঁড়ি, রক্তপাত, ক্লান্তশ্রান্ত শরীরের দায়িত্ব কি নিজের বিলীয়মান দেহই নিয়ে নিলো? রক্তের সাথে কি নিজেকে মিশিয়ে দিচ্ছে সে। নাকি সে মরমি-মানুষ হয়ে নিজের জীবন নিয়ে অনেক অনেক জীবনের দিকেই নিজেকে টেনে নিচ্ছে? নাকি নিজের কান্ধে বয়ে বেড়ানো কবরেই ঢুকে গেল সে! এ এক কথা। কথাও তো অনেক থাকতে পারে। ফেসবুকের আজগুবি জগত্; কার খবর কে রাখে! সুমিত সৌরভ নামের কেউ হয়তো ফেসবুকে ছিলই কিনা, মাধুরীমা বলে আরও কেউ থাকল কিনা তাও তো আমরা জানি না। আমরা আসলে তেমন কিছুই জানি না। মিছা দুনিয়ার ভিতর আরেক মিছা দুনিয়ার কথাই তো হচ্ছে! তবু মাধুরীমা নামের কেউ থাকতেও পারে; নাও থাকতে পারে। তবে মাধুরীমা থাকলে হয়তো সুমিত সৌরভ নামেও কেউ ছিল!

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ২০
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫১
মাগরিব৫:৩২
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৮সূর্যাস্ত - ০৫:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :