The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

উপন্যাসিকা

তপন শীল ও তার বিবাহ-প্রকল্প

মহীবুল আজিজ

‘তপন শীল ফিল বাইত?’
তপন শীল বাড়ি থাকুক না থাকুক ভোরবেলা আহমদ মওলানা আরবি ভাষায় প্রশ্ন ছুড়তে-ছুড়তে তার বাড়ির উঠোনে পা রাখে। ভেতর থেকে ততক্ষণে তপন বেরিয়ে এসেছে। এলে তাকে আর উত্তর করতে হয় না যদিও সে মওলানার উত্তর আরবিতেই দেয়। এটা তপনেরই কৌশল। যেকোনো বিদেশি ভাষা রপ্ত করবার একটা বড় পন্থা হচ্ছে সে ভাষায় অনর্গল কথা বলা, ভাবের আদান-প্রদান অব্যাহত রাখা। সাধনপুর গ্রামের মসজিদের ইমাম আহমদ মওলানা তার ইমামতির সূত্রে কিছু আরবি জানলেও তা যে চোস্ত টাইপের আরবি না সেটা সে প্রথম বুঝতে পারে যখন তপন শীল তার আরবি-ভাষার ভুল একের পর এক ধরিয়ে দিতে থাকে। এমনিতে নিজে দোয়া-কালাম পড়া বা মসজিদে নামাজ পড়াতে গেলে যে-আরবির প্রয়োজন তা বইপত্র থেকে সেই যে একবার শিখে নেওয়া গেছে তা দিয়ে মওলানার গোটা জীবনটাই চলে যাচ্ছে। দশ বছর সৌদি আরবে কাটিয়ে তপন যখন তার বাবার মৃত্যুর পর স্থায়ীভাবে বসবাস করবার জন্য দেশেই অবস্থিতি নেয় তখন সে হিসাব করে দেখল, তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়ে গেছে, বিয়ে।
আহমদ মওলানা অবশ্য বিয়ের কথা বলতে বা বিয়ে সংক্রান্ত কাজে আসে না। তার ছেলে ফরিদ সৌদি-প্রবাসী। মওলানারও একবার সৌদি আরব যাওয়ার ইচ্ছেটা বহুদিন ধরে তার মনে জাগরুক হয়ে আছে। যাওয়ার টাকা জোগাড় হলে সৌদি আরব গিয়ে এক কাজে অনেক কাজই হয়তো করা যাবে। প্রথম ধাক্কায় হজটা সেরে ফেলবে এবং তারপর আরও ক’টা দিন থেকে পবিত্র মক্কা-মদিনা-তায়েফ ইত্যাদি জায়গা স্বচক্ষে দেখে তার মনপ্রাণ সার্থক করবার ইচ্ছে। সেখানে কিছুদিন থাকতে গেলে যদি আগে থেকে কথা বলার আরবি ভাষাটা ভালো করে শিখে ফেলা যায় তাহলে সৌদি আরবকে মনে হবে নিজেরই দেশ। তপন শীলের কথা বেশ মনে ধরে যায় মওলানার। কী সুন্দর আরবির ব্যবহার তপনের! বাংলায় স্কুলের দশ ক্লাস পেরিয়ে কেবলই এসএসসি’র জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনই হঠাত্ তার মা মিনতি রানী পক্ষাঘাতে ধরাশায়ী। তপনের লেখাপড়া শেষ। মা তার মরতে-মরতে বেঁচে যায় ও বেঁচে থাকে এবং বাপটা দুম করে মরে গেল। বাপ থাকা অবস্থাতেই তপনের আর্থিক অবস্থা যে খুব ভালো ছিল তা না। তার আয়-রোজগারে দুই বোনের বিয়ে দেওয়া গেল, মিনতি রানীর চিকিত্সা চলল, সংসারের চাকাও ঘোরে, কিন্তু লেখাপড়ার মতো ব্যয়বহুল কাজ অব্যাহত রাখা দুরূহই বটে। একটা সময়ে তবু অল্প চেষ্টা-চরিত্রে আপদকালীন সঙ্কট মোকাবেলা করা যেত। ধরা যাক, স্কুলে পরীক্ষার ফি-বাবদ এককালীন বেশ কিছু টাকা দিতে হবে। পকেটে একটা কাঁচি আর একটা সরু-পাতলা চিরুনি নিয়ে তপন চলে যেত শহরে। মিনতি রানী ঘষটানো স্বরে জানতে চাইত, কডে যওদ্দে? ‘মা’রে, বেশি দূরত্ ন যাইয়ম’—বলে তপন ছুটত বড় রাস্তার দিকে, শহরের বাস ধরবার জন্যে। দু’টো দিন শহরে থেকে ফিরলে পরীক্ষার ফি’র টাকা জোগাড় হয়ে গেল। শহরে তো অনেক সেলুন, কাজ জুটেই যায়। যদিও শীলের ছেলে শীল তপন শীল জানে, চুলকাটার পেশায় বর্তমানে সনাতন ধর্মের বাইরের লোকেরাও ঢুকে পড়েছে। একবার সেন্ট্রাল শপিংয়ে চুল কাটতে গিয়ে এক সহকর্মীকে পেল যার নাম নাহিদ মিঞা, বাড়ি মানিকগঞ্জে। বেশ কিছুদিন চুল-কাটার কাজ শিখে ক’টা দিন মোটামুটি স্বদেশে তত্পর থেকে একপর্যায়ে সে মস্কট চলে যায়। বর্তমানে মস্কটপ্রবাসী নাহিদ মিঞা চুল কেটে গ্রামের বাড়িতে টিনশেডের পাকা ঘর তুলেছে।
দেশটা কেশসম্পদে যথেষ্ট সমৃদ্ধ না হলেও চিরুনি-কাঁচির কাজের অভাব নেই। তেলে-খাবারে-ফলে-মাছে-মাংসে এবং যাবতীয় সম্ভাব্য প্রায় সব জিনিসে ভেজাল খেয়ে খেয়ে দেশের অধিকাংশ লোকই অকালে টাকবিশিষ্ট হয়ে পড়ে। তাতে করে মাথার সঞ্চয় হয়তো আশানুরূপ হয় না তবু কাঁচি-চিরুনির নিচে লোকেরা আসেই। বিরলকেশ লোকেরাও, দেখা গেছে, তাদের মাথার প্রতি বেশ যত্নশীল। টাকের এলাকায় অল্প কিছু চুলই হয়তো অবশিষ্ট রয়ে গেছে, তবু সেই সামান্য সঞ্চয়কে তপনের সামনে এগিয়ে দিয়ে তারা বলে, অবা, আঁর চুল্লুন্ এককানা সোন্দর গরি কাডি দও তো! কাঁচির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তপন। তপন দেশেই থাকত। তার বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা করল তারই পিসতুতো ভাই বিজয় শীল। বিজয় সৌদিপ্রবাসী আরো অনেককাল আগে থেকে। সাধনপুরে একমাত্র বিজয় শীলের বাড়িতেই একসঙ্গে পাওয়া যাবে—ফ্রিজ, টিভি, মাইক্রোওভেন, কম্পিউটার এসব যন্ত্রের সমন্বয়। বিজয়ের ছেলে মাধব স্কাইপ-এ রোজ কথা বলে তার বাপের সঙ্গে। তোর মা কডে?’ —বিজয়ের প্রশ্নে মাধব হয়তো বলে, শনিপুজাত্ গেইয়ে, নইলে, মা সেয়ান্ গইরেতা গেইয়ে পইর্-ঘাডোত্। কিন্তু তপন দশ বছরের টাকায় এসব যন্ত্রের মধ্যে কেবল একটা চৌদ্দ ইঞ্চি টিভিই শুধু কিনতে পেরেছে। কিছু টাকা ব্যাংকে আছে। সেই টাকা যেকোনো সময়েই তোলা যায়, কিন্তু তোলে না তপন। তুললেই খরচ হয়ে যাবে। সেই টাকা তপন তুলবে একবারই যখন সবকিছু বলতে গেলে একেবারে চূড়ান্ত হয়ে যাবে। টাকাটা তুলেই সে দরকারমতো একের পর এক খরচ করবে এবং সব টাকা খরচ হয়ে গেলে বা কিছু টাকা তারপর শেষপর্যন্ত হাতে থেকে গেলেও সে তপন শীল দেখবে তার হাতে হাত রেখেছে অপূর্ব সুন্দরী এক নারী, তার সদ্যবিবাহিতা বউ! অপূর্ব সুন্দরী যদি সে না-ও হয় সে তো তার স্ত্রীই হবে।

ঘুম থেকে উঠে মিনতি রানী পক্ষাঘাতগ্রস্ত ডান পা ঘষটাতে-ঘষটাতে যখন সূর্যদেবকে প্রণাম করবার জন্য একটা মন্ত্র পড়তে-পড়তে জানলা বা দরজার দিকে এগোতে থাকে তারও অনেক আগে তপন উঠে পড়েছে। মায়ের সংস্কৃত মন্ত্র তার কানে আসে। মা হয়তো বলে, অথ হ এনম্ অন্বাহার্যপচনঃ অনুশশাস... কিংবা, অথ হাগ্নয়ঃ সমুদিরে তপ্তো ব্রহ্মচারী কুশলং... ইত্যাদি। সংস্কৃত না বুঝলেও তপনের মনে হয় যে মিনতি রানীর উচ্চারিত মন্ত্র সূর্যসম্পর্কিত। সেই কতকাল আগে শেখা মন্ত্র দিনের পর দিন মাসের পর মাস উচ্চারিত হয়েই চলেছে তার মায়ের মুখে। এদিকে আগে হলে মিনতি রানীর উচ্চারিত মন্ত্র ফাঁকা-শূন্যতার মধ্য দিয়ে গড়িয়ে যেতে-যেতে গমগম করে প্রতিবেদন রচনা করতে-করতে ছুটতো। তখন জানলা বা দরজার ফাঁকফোঁকর গলে আসা রোদের ঝিলিকে সেই মন্ত্র যুগপত্ তপন ও তার মায়ের মনে আশ্চর্য এক দ্যুতি নিয়ে উদ্ভাসিত হতো। কিন্ত এখন মিনতি রানী যখন সূর্যদেবসম্পর্কিত সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করতে-করতে এগোয় তখন মওলানা আর তপনের যৌথ আরবি-চর্চার ফলে বেচারি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই ভোরের বেলা যখন সূর্যের আলো দেবতার আশীর্বাদ হয়ে ছিটকে এসে তার প্রাণের কন্দরে ঢুকবে, যখন সূর্যকে দেখে মনে হবে, আহা আরো একটি দিন বেঁচে রইলাম। আরো একটি দিন যদি কাল বাঁচি, ভাবে মিনতি রানী আর প্রাণের আবেগে আবারও উচ্চারণ করে যায় অনর্গল মন্ত্রাবলী। তপন তখন আধুনিক আরবি ভাষার বাক্যাবলী একের পর এক উপস্থাপন করে চলেছে, ওয়ায়িন তুরীদ? অনে কন্ডে যাইবেন? উরীদু ইলাল মাক্কাহ্। আঁই মক্কা যাইতাম চাইদ্দে। গভীর মনোযোগে আহমদ মওলানা তপনের কথা শুনে যায়। অবাক মওলানা ভাবে, কত বড়-বড় আরবি স্তবক বেলায়-বেলায় নামাজে-কালামে দোয়া-দরুদে নিত্য ব্যবহার করে যাচ্ছে সে, অথচ এত ছোট ছোট বাক্যে তপন যখন কথা বলে দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত নানা ভাব ও প্রয়োজনের বক্তব্যকে তার আওতাধীন করে নিয়ে, সেটাকে মনে হয় অপরিচিত অঞ্চলের ভাষা। তপন তো আরবিই বলে। তাহলে তার ব্যবহূত আরবি আর তপনের আরবি এত আলাদা কেন। তপনের আরবিকে সে বাতিলও করে দিতে পারে না। দশটা বছর সে টানা সৌদি আরবে কাটিয়েছে। সমাজের কত-কত লোকের সঙ্গে সে মিশেছে। শেখ-সৈয়দ-মীর এরকম উচ্চ-মধ্য লোকজনের সঙ্গে সে ভাববিনিময় করেছে তার সেই ভাষা দিয়েই। ক’দিন আগে তাদের এলাকায় একজন সৌদি শেখের প্রতিনিধি আসে। সে আসে শেখের ‘আল কাল্ব’-এর তাত্পর্য বোঝাতে। গ্রামের লোকেরা যাতে তাদের শিশুদের অল্প বয়সেই প্রতিষ্ঠানটিতে কোরান শেখাতে পাঠায় তার প্রচারণা নিয়ে উপস্থিত হয় তারা। সেদিন গ্রামের কয়েকজন প্রতিবেশি সুযোগ পেয়ে তপনকে নিয়ে যায় সঙ্গে। তপন ইচ্ছেমতো আরবি বলুক ওদের সঙ্গে। দুয়েকজনের মনে আগে থেকেই খানিকটা সন্দেহ থাকে—সত্যিই কি সৌদি লোকেরা তপনের কথা বুঝবে! তপনও কী বুঝবে তাদের কথা। কথায়-কথায় যে আহমদ মওলানা তপনকে সার্টিফিকেট দেয়, বলে যে মোসলমান নো অইলেও তপন যেরইম্মা সোন্দর আরবি কয় তার কনো তুলনা নাই! তপনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আরবিভাষী লোক যখন বুঝতে পারে যে সে আসলে মুসলমান নয়, কাফির তখন তাকে প্রথমত খানিকটা নিরুত্সাহ মনে হয়, কিন্তু তপনের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে সৌদি শেখের প্রতিনিধি এমন আনন্দিত ও আমোদিত বোধ করতে শুরু করে যে তাদের পারস্পরিক আলাপ শুনে গ্রামের লোকেদের মনে হয় যে আসলে দু’জন সৌদি লোকের মধ্যেই কথাবার্তা চলে। তাদের কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে তপনের আবয়বিক স্থানীয়তা ভুলে গিয়ে গভীরভাবে তপনের ভাষা-পারঙ্গমতাকে পরখ করে। তারা দেখে তপনের সব কথাই সৌদি লোকটা সুন্দরভাবে বুঝতে পারে। এক পর্যায়ে গ্রামের লোকদের মনে হয় যে কেবল কথা নয়, তপনের হাসি বা ইশারাতেও সৌদি ভাবই প্রকটিত। বিদেশি প্রতিনিধি চলে যাবার পরেও তপনের সম্মানের অবস্থান বজায় থাকে। স্থানীয় মওলানা ও তত্স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় তা আরো পাকাপোক্তই হয়।
এতকিছুর পরও তপনের প্রাথমিক সমস্যার সমাধান হয় না। তার বিদেশ-যাত্রার প্রাক্কালে মৃদুল শীলের বড় মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে দেখে মনে-মনে তাকেই তপন ভাবী স্ত্রীর মর্যাদায় বরণ করে নেয়। কিন্তু প্রিয়াঙ্কার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় একটা বিরাট ঘটনার ধাক্কায়। প্রিয়াঙ্কার এক দূর-সম্পর্কীয় মাসীকে দূরের যে-গ্রামে বিয়ে দেওয়া হয় সে-পরিবারের সামান্য একটু ভূমি দখল করবার জন্যে তখনকার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একজন প্রভাবশালী নেতার ষড়যন্ত্রের আগুনে পুড়ে মারা পড়ে সেই শীল পরিবারের এগারো জন সদস্য। ঘটনাটাকে একটা ডাকাতির ঘটনা বলে সাজানো হলেও আদতে তা ছিল গোটা শীল পরিবারকে নির্মূল করে তাদের জায়গা দখলের চক্রান্ত। কিন্তু যারা স্বাধীনতার লোক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক তাদেরও ব্যাপারটা বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। তারা বিশ্বাসই করতে পারে না, নির্মমতার এমন ভয়ঙ্কর স্বরূপ নিয়ে মানুষ হাজির হবে ছোট্ট একটু জমি গ্রাস করবার জন্যে। এগারো জন জীবন্ত মারা পড়ে এবং দ্বাদশ ব্যক্তি ঘটনাচক্রেই বেঁচে যায়। সে সেদিন শহরে গিয়েছিল একটা আশ্রমে ব্রজবাসী মহারাজ নামক প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত একজন সন্তুকে দেখবার জন্যে। শেষে সবাই পিতামাতা-হারানো যুবকটার জন্যে বলতে গেলে প্রায় ভিক্ষে করেই নিয়ে গেল প্রিয়াঙ্কা শীলকে। জেনে খুব মন খারাপ হয় তপনের, কিন্তু সে গভীরভাবে বেদনাহত বোধ করে প্রিয়াঙ্কার স্বামী বিমলের জন্যও। সৌদি-প্রবাসের কাহিনি একসময়ে বেশ গর্বভরে প্রচার করত তপন শীল। তার ধারণা ছিল বিদেশবাসের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ লোকদের মেয়ের বাবারা খুশি হয়েই কন্যা সম্প্রদান করবে। কিন্তু তপনের বিদেশবাসের অনুষঙ্গে মূল কাহিনির সঙ্গে ডালপালা শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে এবং স্থানিক-অস্থানিক মূল মিলিয়ে সবটা এমন জটাজটযুক্ত হয়ে পড়ে যে তপন শেষ পর্যন্ত পারলে তার বিদেশবাসের কাহিনি ভুলেই যায়। তপন বিয়ে করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে, কিন্তু বিয়েকে তার কাছে মনে হতে থাকে পৃথিবীর দুরূহতম গিরিখাত। বাপ বেঁচে থাকলে তার একটা গতি হয়তো হয়েই যেত, পিতার অনুপস্থিতিতে তপন শীল বিয়ের কনের অন্বেষণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

উত্সাহী তপন শহরের বড় দীঘির পাড় থেকে এক পরিচিত ইটভাটার এক হাজার ইট কিনে এনেছিল। ইচ্ছে ছিল বিয়ের কনে ঠিক হলেই দ্রুত সে তার নিজের থাকার ঘরটা মোটামুটি পাকা করে নেবে। ওপরে অবশ্য টিনেরই ছাদ। আর বউ যদি পয়া হয়, তপন ভাবে, টিনের ছাদ থেকে সিমেন্টের ছাদে যেতে আর ক’দিনই বা লাগবে! তবে শীল পরিবারের এগারো জনের জীবন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে তপনের মনে খানিক ভয় ঢুকে যায়। তা-ও ভয়টা তার জননী মিনতি রানী-বাহিত হয়েই তার মধ্যে ঢোকে। কমজোরী পায়ে হাত বোলাতে-বোলাতে তপনের মা বলে, বা সে তপনকে উদ্দেশ করেই প্রশ্ন করে, কি মনত্ অর্ ওডা পুত্, মোসলমান অক্কল থাইকেতা দিবো না দ্যাশত্? সে-প্রশ্নের উত্তর যে তপনের স্পষ্ট জানা বা নিজের ভবিষ্যত্ অবস্থান সম্পর্কে তার যে খুব একটা প্রত্যয়যুক্ত আভাস কোথাও মিলছে তা মনে না হলেও অসুস্থ মাকে আরো অসুস্থ না করবার বাসনায় তপন বলে, মা রে, তুঁই কি কইতা চও? দ্যাশত্ বিচার-আচার নাই নিকি? মিনতি রানী ঘাড় নাড়ে আর লোক মারফত শোনা কথা যাচাই করে ছেলের সঙ্গে। তাদেরই পরিচিত গ্রামে তাদেরই পরিচিত এগারোটা প্রাণ ছাই হয়ে নাই হয়ে গেল অথচ হত্যাকারীরা নাকি তখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারপর ধরা যাক, এই যে জাতীয় নির্বাচনের পর একবার তাদের গ্রামে এবং সারাদেশে বেছে-বেছে হিন্দুদের ঘরবাড়ি দোকানপাট মঠ-মন্দির সর্বত্র ধ্বংসযজ্ঞ-অগ্নিকাণ্ড আর লুটপাট চলল তারও কোনো বিচার হয় না। কত লোক মরে যায়, আহত হয়—তারও কোনো বিহিত হয় না। পাড়ায়-পাড়ায় হিন্দু-বাড়ি হিন্দু-মন্দির রক্ষা করবার জন্যে পাড়া-মহল্লার ছেলেরা রাতজেগে পাহারা বসায়। কোথাও-কোথাও তারপরও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। কালীবাড়ির স্বর্ণ লুট করে গলার চেন বানিয়ে সন্ত্রাসীরা ঘুরে বেড়ায়। কেউ দেখে না। তাদেরই একজন নির্বাচনের সময় আগের দিন এসে বলে তপনের মাকে—
: অ মাসি, ভোট দিতা যাইবা না?
: যাইয়ম! বলে মিনতি রানী।
: ত, ভোট কারে দিবা?
: তোঁয়ারারে ছারা আর কারে দিয়ম বাজি! মিনতি রানী বলে দরদ দিয়ে। মন দিয়ে শোনে যুবক। তারপর উপদেশের সুরে গলার স্বরে খানিকটা নমনীয়তা এনে বলে, তইলে মাসি কসেটা গরি তোঁয়ারে আর ভোট দিত্ যওন্ পইত্তো ন!
মিনতি রানী বুঝতে পারে যুবকের কণ্ঠস্বরের মিহি সন্ত্রাসের সুরটাকে। গোঁরা ধার্মিক এবং বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী সেই যুবক আসলে তাকে প্রচ্ছন্ন বা প্রত্যক্ষ হুমকিই দেয়। সোজা কথা সে এবং তার দল মিনতি রানীকে বিশ্বাস করে না। তপনের মা ভোটকেন্দ্রে যায় না কিন্তু তপনের পিসি যায়। যাওয়ার সময় আচমকা এক যুবকের সাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগে তপনের পিসি কৃষ্ণার। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে তিন/চারটি যুবক একটা রিকশায় তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায় তাকে। সেখানে তাকে বিশেষভাবে সেবা-তত্পরতা দেওয়া হতে থাকে। এভাবেই ভোটের বেলা পেরিয়ে গেলে একসময়ে কৃষ্ণা বাড়ি ফেরে এবং তার শরীরে কোথাও আর তেমন করে ব্যথা বোধ হয় না। তার মনে হয়, সাইকেলের সঙ্গে ধাক্কাটা তার পতন ত্বরান্বিত করলেও হাসপাতালে যাওয়ার মতো উপলক্ষ একটি সাজানো অধ্যায়ই ছিল। শুধু কৃষ্ণা একাই নয়, নানা জায়গা থেকে এমন অনেক খবর আসে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে শিকার হয় অযাচিত দুর্ভোগের।
তপনের কেনা এক হাজার ইটের একটি আয়তাকার স্তূপ জানলা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়বে। মিনতি রানী ভোরের বেলা সূর্যদেবকে প্রণাম করবার জন্য যেই না দুই হাত কপাল ছুঁইয়ে ওপরের দিকে তোলেন তখন দেখা যায় ইটের কোণ ঘেঁষে সূর্য দাঁড়ানো। দেখে মনে হয় যেন মিনতি রানীর জন্যই প্রতীক্ষারত। অভিভূত বোধ করে তপনের মা মিনতি। ইটের স্তূপের ফলে একটা সুবিধা হয়, মনে হয় যেন একটা কঠিন-স্থাপত্যিক ধ্রুপদী উপস্থাপক বলতে গেলে মিনতি রানীর চোখের সামনে সূর্যকে নৈবেদ্য দিচ্ছে। আবার সূর্য থেকে আসা আলো যখন তপনের সেই এক সহস্র ইটের ওপর পড়ে কখনো ছিটকে যায় কখনো পিছলে যায় তখন মিনতির মনে হয় যে এই ইটের দেয়াল ও কাঠামো প্রকৃত সুখী নীড় রচনা করবে তপনের জন্য। ফলে তপনের মাতা মিনতি রানীও তার ভাবী বধূর একটি মুখাবয়ব ইচ্ছে করেই জাগিয়ে তোলে মনের মধ্যে। তাকে শিগগির বাস্তবমুখী করবার তাগিদে সে তপনকে তাগাদা দেয়, অ পুত্, মাইয়া উগ্গা চাছে না? চাইলেই কি আর মেয়ে দেখা যায়। মেয়ে দেখলেও দেখাটা যত সহজ তাকে বাস্তবে হাতের নাগালে নিয়ে আসা অনেক কঠিন। বহু চেষ্টা-তদবির করে বাণীগ্রামের পরে একটা গ্রামে এক মেয়ে দেখতে গেল তপনের এক আত্মীয়। একথা-সেকথার পর তারা বিস্ময়কর এক তথ্য পরিবেশন করে বসে তপন সম্পর্কে। মেয়ের বাবা প্রথমটায় সরাসরিই বলে, কন্ তপন, সাধনপুরর মুসলিম তপন না! খুবই আশ্চর্য করবার মতো সংবাদ। মেয়ের বাবা এবং তাদের প্রায় সকলের ধারণা তপন নাকি সৌদি আরব গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং নিতান্ত অসুস্থ মায়ের কথা ভেবেই সেই তথ্য সে গোপন করে রেখেছে। তপনের পিসেমশাই যতই তার প্রতিবাদ করে তারা আশ্বস্ত হয় না। তাদের এমনও বিশ্বাস, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে তপনকে তার পুরোনো নামেই স্থিত রেখে তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে-কাজের বিবরণ দেওয়া তাদের সাধ্যে না কুলালে তারা বলে, ভগবান জানে! মেয়ের এক মাসতুতো ভাই তপনের নিখুঁত আরবি উচ্চারণের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে সৌদি আরব থেকে আসা মানুষের সঙ্গে তার কথোপকথনের ঘটনার সূত্র টেনে আনলে তপনের মনে পড়ে অনেক কথার পরে সবশেষে সে ‘আল কালেব’র লোককে বলেছিল, ‘ছা-আত্তাবিউ নাছীহাতাকা ফিল্ মুসতাকিবলে।’ কিন্তু কথাটা তো তপন শীলের মনের বা মুখের কথা ছিল না। সেটা ওই প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় প্রতিনিধি মানে এদেশের লোকগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতির সহজ-সরল ও সরাসরি বঙ্গানুবাদ। বরং, তপন ভাবে, তাদের এই জেনে খুশি হওয়া উচিত, গণ্ডগ্রামের এক অখ্যাত যুবক তপন শীল কী চমত্কার উচ্চারণে পৃথিবীর এক অতি ধনাঢ্য লোকেদের ভাষায় নিজের মনের ভাব প্রকাশে স্বতঃস্ফূর্ত! তপনের সঞ্চয়ে এক ফোঁটা তেল নেই তবু তেলের দেশের ভাষা তার মুখে ফোটে খইয়ের মতো। যেখানে আরবের উন্নত নাগরিক এলাকার লোকেরও তপনের ভাষা বুঝতে এতটুকু বেগ পেতে হয় না, সেখানে একটা বিয়ের কনে জোগাড় করতে তপনের প্রাণ ওষ্ঠাগত! অথচ, দেখো, গ্রামের এতগুলো লোক যারা জন্মসূত্রে মুসলমান তারা দাঁতমুখ খিঁচেও একটা বাক্য শুদ্ধ না করে অন্তত ভুল করেও বলতে পারল না ‘আল কালেব’র লোকটার সঙ্গে! আর তপন কী অবলীলায় যা-ই জিজ্ঞাসিত হয় বলে যেতে থাকে একটা কলের পুতুলের মতো।
শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে তপন তার স্থানীয় এলাকায় কনে দেখার চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দূরের দিকে মনোযোগী হয়। ভুলেও সে তার আরবি-যোগ্যতার প্রসঙ্গ তোলে না। বরং তার জন্য মেয়ের সন্ধান করা লোকেরা আগ বাড়িয়ে বলে, নাইতো’র পোয়ার লেহাপড়া শিকিয়েনে কাম্মান কী! এভাবে তপন আশাবাদী হতে থাকে। আজ-কাল-পরশু করে মেয়ের সন্ধান করা লোকেরা তপনকে আশা’র জিম্মায় রেখে তার বিদেশ থেকে আনা স্বল্প ধনের সঞ্চয়ে চা-শিঙ্গাড়া-পান-সিগ্রেট প্রভৃতির সদ্ব্যবহার চালিয়ে যায়। আনোয়ারা থেকে খবর আসে, সপ্তাহখানেকের মধ্যে সেখানকার সেলুনমালিক বাবুল শীলের মেয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সংবাদ এসে পৌঁছাবে। পটিয়া’র ভাটিখাইন থেকে খবর আসে, মানিক শীল তার ছোট মেয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানাবে আরো দিন দশেক পরে। মাঝখানে হয়-হয় করেও তপনের ভাগ্যে শিকে ফস্কে যায়। সাতকানিয়ার ঢেমশা থেকে এক লোক এসে তপনকে জানায় যে সেখানকার শীলপাড়ার সুভাষ শীলের একটা মেয়ে আছে—সুশ্রী এবং চলনসই। গেল তারা ঢেমশা। তপন বড় রাস্তায় আনু ফকিরের দোকানের পাশে একটা চা-খানায় বসে-বসে চা খায় আর তার বিয়ের সম্বন্ধের লোকেরা মেয়ের বাবার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালায়। তখনই হঠাত্ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো কোত্থেকে একটা মিছিল ছুটে আসে। মিছিলের লোকেরা সরকারকে উদ্দেশ করে তীব্র ভাষায় আক্রমণ এবং গালিগালাজ চালাতে থাকে। তারা দোকানপাটে হামলা করতে থাকে এবং তাদের রাস্তাঘাট, ঘর-বাহির ইত্যাদি কোনো বিষয়েই স্থির লক্ষ্য থাকে না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তপন দেখে, লোকেরা যে-যেদিকে পারছে ভয়ে প্রাণ নিয়ে ছুটছে। মিছিলের অধিকাংশ লোকের মাথায় টুপি, তাদের পরনে লম্বা জোব্বা, তাদের দাড়ি লম্বা ও খাটো এবং দাড়িহীন লোকেরাও তাদের মিছিলে হাজির। দাড়িঅলা এবং দাড়িহীন দেখতে ভিন্ন মনে হলেও সবাই মিলে তারা একই ভাষায় আচরণ করে যায়। তপন যে-দোকানটাতে বসেছিল সে দোকানের ম্যানেজারটা ‘অবা, ইত্তিরি বাইর ন আইয়ো’ বলে দোকানের ঝাঁপ ফেলে দেয়। কোলাহল সম্পূর্ণ হূদয়ঙ্গম করতে না পারলেও এক পর্যায়ে তপন বুঝতে পারে, পুলিশের আগমন ঘটেছে এবং সে আশায় বুক বাঁধে, পিটিয়ে পুলিশ সবক’টার দফারফা করে ছাড়বে।
এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল কোলাহল চলে। বেধড়ক পিটুনি, চিত্কার, গালাগাল, আর্তধ্বনি আর কোলাহলে ভরে যায় চতুর্দিক। তপনের কানে আসে মিছিলকারীদের প্রাণঘাতী উচ্চৈঃস্বর। সেই ভয়ঙ্কর চিত্কারের মধ্যে মিছিলের লোকরা এমনভাবে ‘আল্লা’ ‘আল্লা’ ধ্বনি তোলে যে তপনের মনে হতে থাকে, আল্লা শুধু তাদেরই, আর কারও নয়। হুঙ্কারে ফেটে পড়ে তারা—দেশ থেকে সনাতন ধর্মের লোকেদের প্রতিবেশী ইন্ডিয়াতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বলে। তাদের চিত্কার শুনে আতঙ্কিত তপন মনে-মনে মন্ত্রোচ্চারণ করে আর দেবতাদের ডাকে। তার বাড়ির সামনে ইটের স্তূপের ওপারে যে মগধেশ্বরীর মন্দির আছে সেই মন্দিরের দেবী মগধেশ্বরীর কথা তার মনে উঁকি দেয়। তার মা মিনতি রানী দিনে অন্তত একবার জোড় প্রণাম জানায় দেবী মগধেশ্বরীকে। এভাবেই দুঃস্বপ্নের একটি রাতের মতো কেটে যায় ঘণ্টাখানেক সময়। তারপর সব কেমন ঠাণ্ডা মেরে আসে। একটা আরবি দোয়া পড়ে ম্যানেজার চা-খানার ঝাঁপ একটু-একটু আলগা করতে শুরু করে। অন্যান্য দোকানপাটও ততক্ষণে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিকতার এমন আকস্মিক বিপর্যয়ে এবং রূপান্তরে তপনের আতঙ্ক তাকে অবশ করে দেয়। মগধেশ্বরী বা তার চাইতেও ধন্বন্তরী দেবাদিদেব কিংবা ঈশ্বরের নাম জপতে থাকা তপন নিজের সর্বাঙ্গের কাঁপুনি থামাতে ব্যর্থ হয়। আস্তে-আস্তে তপন, তার চারপাশের লোকজন এবং আকস্মিকতায় আক্রান্ত সবাই স্ব-স্ব সক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করলে এলাকাটি আবার আগের জীবনস্পন্দনের দিকে মোড় নেয়, কিন্তু রাস্তায় দোকানপাটের সামনে ইতস্তত যে ধ্বংসের ছাপ থেকে যায় তা সবার মনে সহসা এক গাঢ় অমোচনীয় ক্ষতের সৃষ্টি করে। কেননা, বাজারের প্রায় সব হিন্দু দোকানই ভাংচুরের শিকার এবং সেসব দোকানে চালানো হয়েছে যথেচ্ছ লুটপাট। একটি দোকানের সামনে মাটির গণেশ ছত্রখান হয়ে পড়ে থাকে। হয়তো বেশ শক্ত হওয়ার কারণে তার নাকটি ভাঙা পড়ে না। ভাঙা পড়ে না বলেই হয়তো লোকেরা ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া মাটির মূর্তিটিকে গণেশের বলেই শনাক্ত করতে পারে। লোকেরা বলাবলি করতে থাকে, অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে তারা প্রশ্ন করে, কনে এরিম্মা গরিত্তারে কও তো? হিতারা মানুষ না জল্লাদ! তারা শুনতে পায় টুপি-দাঁড়িঅলারা একটা পুলিশকে সম্ভবত মেরেই ফেলেছে। ভ্যানে করে অন্য পুলিশরা যখন তাকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তার চোখে ফুটে উঠেছিল বাজারে রোজ বিক্রি হওয়া মৃত মাছের ফ্যাকাশে চাহনি।

তপন যখন মৃত্যুর মতো কিছু একটার আকস্মিক স্পর্শ পেয়ে এবং তা থেকে ফের মুক্ত হয়ে পৃথিবীর উজ্জ্বল-সুন্দর রোদ আর আলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি একটি জীবনবিযুক্ত ও বিচ্ছিন্ন-দুর্লভ সংঘটন যার সঙ্গে সমাজবদ্ধ মানুষের, দৈনন্দিন জীবনে পাশপাশি সুখ-দুঃখ উদ্যাপনকারী লোকেদের সত্যিকারের কোনো সম্পর্ক নেই। নিতান্ত জল ঘোলা করে সুবিধার মাছ শিকার করাই ওদের কাজ। কাঁপুনি সামলে নিয়ে পুনরায় যার-যার ছন্দে ফিরে যাবার প্রচেষ্টারত বাজারের লোকেদের দিকে দৃষ্টি দেয় তপন। তখন প্রায় ছুটতে-ছুটতে তার শুভানুধ্যায়ীরা কোনো একটা অলিন্দের মতো পথ ফুঁড়ে হঠাত্ উদিত হলে তপন শীল দেখতে পেল তাদের সকলের মুখে লাফাচ্ছে আতঙ্ক এবং তারা অনর্গল কাঁপছে জ্বরোরোগীর মতো। ফলে একটু আগের আক্রান্ত তপন এবং ছুটে আসা তার লোকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। হাঁপাতে-হাঁপাতে ওদের মধ্যে সুধন নামের ছেলেটি কাতর স্বরে অনুরোধ করতে থাকে তপনকে—বিয়া গরনোর কাম নাই বাজি, বাঁচি তাকিলে বিয়া বহুত্ গরন যাইবো! বাজারের মধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তপনের বিবাহেচ্ছা অনেক আগেই মিইয়ে যায় তবু সে ঢেমশা গ্রাম থেকে আগতদের শঙ্কার কারণ বুঝতে পারে না। কিন্তু সব শুনে তপনের মনে হয়, নগর আর দেবালয়ে আজ আর কোনো পার্থক্য নেই। সে ভেবেছিল আকস্মিক প্রলয়ে বিশালতার একটি অতি ক্ষুদ্র কোণই কেবল আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। অথচ ঢেমশা থেকে আসা তার লোকেরা তাকে জানায়, যতদূর তারা জানতে পেরেছে আশপাশে অনেক মন্দির ভাংচুর-লুটপাটের শিকার। বিখ্যাত বিষ্ণু মন্দিরের অষ্টধাতুর মূর্তি, শিবমন্দিরের স্বর্ণমূর্তি, কালীমন্দিরের দামি অলঙ্কার-তৈজস সব লুটপাট করে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। বাধা দিতে গেলে তাদের আঘাত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও আহত-নিহত হওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। সবচাইতে যেটি মারাত্মক ঘটনা, যা অনেক মানুষের পাশাপাশি তপনের জন্যও বয়ে আনে এক ভয়ানক বেদনা—ঢেমশা গ্রামের যে মেয়েটিকে দেখতে গিয়েছিল তপনের লোকেরা, মালতি নামের সেই মেয়েটিকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। তারা লোকদের ঘর তছনছ করে ক্ষান্ত হয়নি, লুটপাট করে যতি দেয়নি, মারধর করেও শমিত হয়নি, মালতিকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে-যেতে বলেছে—লক্ষ্মীরে বোরকা পরাইবার লাই লই যাইদ্দে! জীবনে কোনোদিন যে মেয়েকে দেখেনি, জীবনে কোনোদিন যার সঙ্গে দেখা হবে কিনা ঠিক জানা নেই সেই মেয়ের জন্যে মনের গভীরে তাল-তাল অন্ধকার জমে ওঠে তপন শীলের।
পত্রিকা পড়ে লোকমুখে শুনে আর আশপাশে প্রত্যক্ষ করে তপন এমন দুর্ভাবনায় নিমজ্জিত হয় যে বিয়ের চিন্তাকে রেখে আসে বাড়ির সামনের সেই এক হাজার ইটের স্তূপ মগধেশ্বরীর মন্দির ছাড়িয়ে আরো বহু দূরে। মিনতি রানী জড়ানো গলায় বলে, মাইনসে কোয়াবলা গরের দ্যাশত্ থাইত্ পাইরতাম্ ন মত লার্! তপন প্রতিবাদ করে না। কেমন যেন একটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় সে দোলে। আহমদ মওলানা আসে একদিন সকালে। তার ছেলে ফরিদের চাকরি-স্থলে সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু ছেলে তা খুলে বলেনি। বলেছে, প্রয়োজনে সে খবর পাঠাবে। তপনের মনে জেগে ওঠা সঙ্কটের প্রতিষেধে মওলানা কিছু করতে না পারলেও তপনকে সে সাহস জোগায়। বলে, দেশের লোকে এমন ধর্মীয় উন্মাদনা মোটেও পছন্দ করে না। সব বাইরের দেশের চক্রান্ত যারা দেশটার ভালো সহ্য করতে পারে না, দেশটাকে পঙ্গু করে দিতে চায়। মওলানার কথা উপদ্রুত বোধ করতে থাকা তপনকে উদ্বুদ্ধ করে। সব রাজনীতির খেলা। মন্দির ভাঙার লোকেরা, লুটপাট করা লোকেরা, রাহাজানি করা লোকেরা যতই বলুক ঢাকা শহরে গিয়ে শক্তি দেখাবে, দেশ অচল করে দেবে, দেশকে কেবলমাত্র বিশেষ একটি ধর্মের মানুষদের জন্যই যোগ্য করে তুলবে মানুষ তাদের একটুও পছন্দ করে না। আহমদ মওলানা তপনের মনোবল চাঙ্গা করবার চেষ্টা চালায়, হুনো, তোঁয়ার বাপ-দাদা চইদ্দো গুষ্টি এডে বসত গরি গেইয়ে, তোঁয়ার জন্ম এই মেডিত্, তুঁই কিয়র্ লাই এই দ্যাশ ছাড়ি যাইবা, কইলে অইবো নিকি, মশকারি না! বোঝে সবই তপন, কিন্তু বিষ্ণু-মন্দিরের বিষ্ণুকে শিব-মন্দিরের শিবকে কালী-মন্দিরের কালীকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অথচ প্রতিটি আহত-রক্তাক্ত হূদয়ে অধিষ্ঠান করা বিষ্ণু-শিব-কালীকে আগ্রাসী সেসব মানুষ কীভাবে উত্খাত করবে! তারপরও মা মিনতি রানীর কথা কানে বাজে, দ্যাশত্ থাইত্ পাইরতাম্ ন মত লার্!
মিনতি রানীর আশঙ্কা অমূলক না বাস্তব এমন টানাপড়েন চলতে-চলতেই তপন শীল জীবনে প্রথমবারের মতো অনুভব করল, সে সনাতন ধর্মাবলম্বী সেটা সে নিজে ভুলতে পারলেও অনেকেই তা মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারে না। বসে বসে সে মওলানার কথা ভাবে। ভাবে মওলানার ছেলে ফরিদের কথা। আরব দেশে রেখে আসা বন্ধু-বান্ধবদের কথাও উঁকি দেয় মনে। আশপাশে তাকিয়ে এক অদ্ভুত দার্শনিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে, দেখো, একটা দেশ অথচ সেরকম কোনো সবুজ-শ্যামলিমা নেই। সেজন্যেই হয়তো মানুষগুলো রুক্ষ। একটা গাছ বাঁচাতে কত-কত গ্যালন জল খরচ করতে হয় দেশটাকে আর এই গরিব দেশটার যেদিকেই তাকাও সবুজ সবুজ আর সবুজ। ঘন সবুজ ঝোপের মধ্য দিয়ে ইটের স্তূপের ওপারে মগধেশ্বরীর মন্দিরটা। ইটগুলোও আর আগের মতো নেই। রোদে-বৃষ্টিতে ভিজে কোথাও কোথাও শ্যাওলা ধরে গেছে। পাড়ার ছেলেদের কথাবার্তাও কানে বাজে। পাড়ার ছেলেরা রাত জেগে এলাকা পাহারার ব্যবস্থা নেবে, এমন কথা শোনা গেছে। কোথাও কোথাও হিন্দু ঘরবাড়িতে আক্রমণ হয়েছে, কোথাওবা অরক্ষিত সম্পদ ছিনতাই হচ্ছে, কোথাওবা জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। কাজেই দুষ্কৃতকারীদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করবার তত্পরতা ঘরে-ঘরে। প্রতিটি ঘর থেকে প্রতিনিধি নেওয়া হয়। আত্মরক্ষার জন্য তাদের অবলম্বন থাকে বাঁশ-গাছের লাঠি কিংবা লৌহনির্মিত কিছু প্রাচীন যুগের অস্ত্রাবলী। প্রতিরোধকল্পে দৃঢ় পাড়ার যুবকরা যখন তপনের নাম ধরে ডাকতে-ডাকতে তার ঘরের নিকটে আসে ততক্ষণে মাথায় টুপি-পাগড়ি এবং পরনে লম্বা জোব্বা চার-পাঁচজন দাড়িঅলা লোক তপন শীলের ঘরে ঢুকে পড়েছে। দেখে প্রতিরোধকারী যুবকদের মনে হয়, এরা বুঝি সেই দলের লোক যারা ঢাকা শহরকে অচল করে দিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের ঘোষণা দিয়েছে। এরাই বুঝি সেই লোক যারা এরই মধ্যে বহু মন্দির লুট করেছে এবং আরো লুট করবে। কিন্তু আগুয়ান তপনকে তাদের সঙ্গে হেসে-হেসে কথা বলতে দেখে প্রতিরোধকারীদের মনে সংশয় জাগে। তারা স্থান ত্যাগ করে চলে যায়, কিন্তু তপন শীল তাদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে এক দুর্দম কৌতূহল। তপন ভেবেছিল তারা আহমদ মওলানার মতো কোনো দরকারি কাজে এসেছে। বসবার জায়গা অপ্রতুল হলেও তারা পাটি-মাদুর বিছিয়ে নিয়ে বসে পড়ে। ভেতরের ঘরে মিনতি রানী ঈশ্বরের নাম জপতে-জপতে ক্লান্ত হয়ে যায়। ছেলের চিন্তায় অস্থির মিনতি রানী বুঝে পায় না, আরবি-জানা তার ছেলেটা আরবি জেনে তার জীবনে আর কী-কী পরিস্থিতির মুখে পড়বে! অপরিচিত লোকদের কথা শুনে একটা মিশ্র অনুভূতি জাগে তপনের মনে।
পোশাকে তাদের খানিকটা অধরা মনে হলেও বস্তুত তারা সবাই স্বদেশি। এমনকি তাদের দলে তপনের বাড়ির কাছের একজনের সন্ধানও মেলে। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট, তারা ধর্মপ্রচারক। তারা তপন শীলের খবর জেনে তার খোঁজ নিতে এসেছে। তারা শুনেছে, তপন শীল অবিকল সৌদি লোকেদের মতো বিশুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলে। একথা-সেকথা’র পর তাদের একজন কাঁধে-রাখা কাপড়ের ব্যাগ থেকে দু’টো বই বের করে তপনকে দেয়। তপন একদৃষ্টে চেয়ে দেখে বই দু’টোকে—একটার লেখক আবুল হোসেন ভট্টাচার্য যার বিশেষণে ‘নও মুসলিম’ কথাটা ব্যবহূত হয়েছে। অন্যটার লেখক আবদুল হক মারমা। এর নামের সঙ্গেও ব্যবহূত হয়েছে ‘নও মুসলিম’ বিশেষণ-পদ। এর মানে এদের দু’জনের দু’জনই ধর্মান্তরিত লোক সেটা নামেই বোঝা যায়, কিন্তু তাদের নামে এ-ও বোঝা যায় যে যতদিন বইয়েতে তাদের নাম এমন বিশেষণযুক্তভাবে লেখা থাকবে ততদিন তারা নতুনই থেকে যাবে, পুরোনো হবে না। তপনকে তারা বোঝায়, ধর্মান্তরিত হলে তারা তাকে ভালো বেতনের চাকরি দেবে, বাড়তি কাজ দেবে। তাছাড়া তাকে সঙ্গে নিয়ে তারা গড়ে তুলবে নতুনতর একটা প্রচারণার আয়োজন। তপনের মতো এমন সুন্দর সৌদি ভাষাভাষীকে পেলে তাদের জন্য সেটা হবে অনেক বড় পুরস্কার। শুনে তপন মুহূর্তেই কর্তব্য স্থির করতে পারে না। সে অবাক হয়ে যায় তাদের প্রস্তাবে। ভেতরের ঘরে তার মা মিনতি রানী কাশি দেয়। কী সে বলে কী তার বলা দরকার কিছুই তপনের মাথায় ঢোকে না। সে ভাবে, দশটা বছর সৌদি আরবে সে কাটিয়ে এলো, কিন্তু সেখানে কেউ তাকে এমন প্রস্তাব দিল না, অথচ নিজের দেশে লোকরা কেন তাকে এমন প্রস্তাব দেয়! তাদের রুষ্ট না করবার জন্য তপন তাদের হাত থেকে বই দু’টো নেয় এবং তাদের বলে, আঁরে এককানা সমো দ’ন, আঁই ভাবি-চিন্তি অনোরারে জানাইয়ম্! তারা চলে যায় এবং যাওয়ার সময়ে আবারো তপনকে প্রভূত প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়। তপনের অনেক টাকা-পয়সা হবে, চাকরির চিন্তা, খোরাকের চিন্তা করতে হবে না। বরং সে ইচ্ছে করলেই নিয়মিত আয়-রোজগারে সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারবে।
মিনতি রানী জানতে চায় টুপি-পাগড়িপরা লোকদের আগমনের হেতু। তপন বানিয়ে-বানিয়ে যা মুখে আসে তা-ই বলে, ওরা দেশ থেকে বিদেশে লোক নেবে কাজের জন্য। যারা তাদের ভাষা বলতে ও বুঝতে পারবে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তপন তাদের মধ্যে কাজ করবে দোভাষী হিসেবে। জ্বলজ্যান্ত মিথ্যে কথাটা সে বানায় এরই মধ্যে আতঙ্কে-শঙ্কায় সংকুচিত হয়ে যাওয়া মা তার আরো যাতে সংখ্যালঘু হয়ে না পড়ে সেজন্য। মা বোঝে মায়ের মতো করে, কিন্তু পাড়ার লোকরা বোঝে না। প্রচারকদল চলে যাওয়ার পরপর পাড়া প্রতিরোধকারী যুবকরা আসে তপনের ঘরে। তারা তপনের কাছে সরাসরি জানতে চায়, অবা তপন, আঁরারে এককানা বুঝাই কওত চাই, জোব্বাজাব্বি পরা মাইনসর লয় তোঁয়ার এত কিয়র খাতির? তপনের মুখে কথা জোগায় না। ওরা ফের ফোঁড়ন কাটে, আঁরা মরির্ আঁরার্ জ্বালায়, আর তুঁই তো দেখির মহা শান্তিত্ বসবাস গরর্! তাদের একজন ‘চাই তো ইবা কি বই’ বলে তপনের হাত থেকে একটা বই ছোঁ মেরে নিয়ে নেয় এবং সে যখন সবার সামনে বইটি তুলে ধরে তখন সেটির রচয়িতা আবুল হোসেন ভট্টাচার্যের নাম দেখেই তারা কার্যকারণের সম্যক উপলব্ধি করতে পারে। বইটি না উল্টিয়েই তারা জানে সেটির বক্তব্য ও বিষয়বস্তু। পাড়া-প্রতিরোধকারী দলের একজন তখন গলায় প্রচণ্ড ঝাঁঝ ছড়িয়ে খানিকটা ব্যঙ্গ ও খানিকটা ক্রোধমেশানো স্বরে তপনকে এবং সবাইকে শুনিয়ে বলতে থাকে, অবা, তোঁয়ারা ব্যাক্কুনে চও, আঁরার তপন বও বলে ধর্ম পাল্টাই ফেইলেতা চার্! সেখানেই থামে না সে। ব্যঙ্গের সুরে জানতে চায়, অ, তপন বও, এয়া তুঁই একলা ধর্ম পাল্টাইবা নাকি তোঁয়ার মা-সহ? কী বলবে, কী বলা উচিত তপনের তা তো মাথায় আসেই না, উল্টো তার মনে হয় যে তার চিন্তার ওপর থেকেই তার নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যেতে বসেছে। ঢেমশায় বিয়ের কনে দেখতে যাওয়া, বাজারে সন্ত্রাসের মুখে পড়া, সেই কনের অপহরণ, দেশজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার ধারাবাহিকতা, রাতে হামলার শিকার হওয়ার ভয়, ধর্মপ্রচারকদের প্রস্তাব বা প্রচ্ছন্ন হুমকি, তারপর নিজের লোকেদের ভুল-বোঝা—কতটা চাপ মানুষ নিতে পারে! এদিকে লোকরা বলাবলি করছে, কেবল যে ঢাকা ঘেরাওয়ের হুমকি দিয়েছে রাজনৈতিক দলটি তা নয়, তাদের সেই ঘোষণার জেরে দেশজুড়ে শুরু হবে একটা মারাত্মক যজ্ঞ যার মহড়া এরই মধ্যে আরম্ভ হয়ে গেছে, যার প্রমাণ সে তপন হাতে হাতে পেয়েছে তার বিয়ের কনে দেখবার জন্য ঢেমশা গিয়ে। যেখানে পুলিশকেই জনজীবনের শান্তি রক্ষাকারী বলে গণ্য করা হয় সেই পুলিশই যদি মিছিলকারীদের হাতে নিহত হয়, তাহলে, তপন ভাবে, তার বাড়ির সামনে তখনো মগধেশ্বরীর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। যুবকদের ক্রমাগত বিদ্রূপে বিদ্ধ হতে হতে জমাটবদ্ধ ক্রোধে ফুঁসে ওঠে তপন। একবার মাত্র একবারই সে তার নিজের ভেতরকার শক্তির জানান

দিতে চায়। দিতে চায় এজন্য, যখন পৃথিবীর, চারপাশের ক্রমাগত অধত্বের পরিণামে তার নিজেরই নাই হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে তখন কোথায় যুবকরা তাকে সাহস-শক্তি জোগাবে, তার পরিবর্তে তারা ব্যঙ্গরত তার অসহায়ত্ব নিয়ে। চিত্কার করে পুঞ্জীভূত ক্রোধকে একটি মারাত্মক তীরের মতো তপন ছুড়ে দেয়— তোঁয়ারা যা কইতা লাইগেগা তা এক বন্ন সইত্য ন! তোঁয়ারা এই মুহূত্তোত্ আঁর ঘরত্তুন যওগই! আঁরে ইক্কিনি শান্তিত্ থাইকতো দও!
মিনতি রানীর নাভিশ্বাস ওঠে। চারদিকে শুধু আগুনের কাহিনি শোনা যায়। নিজের চিন্তা নয়, ছেলে তপনের চিন্তায় অস্থির হয়ে যায় সে। বিয়ে করবে বলে ছেলে ইট কিনে আনল এক হাজার। সেই ইট ভিজে শুকিয়ে আবার ভেজে আবার শুকিয়ে যায়। এদিকে লোকরাও তার ছেলেকে নিয়ে কানাঘুষা করে, সে টের পায়। কখনো কখনো তার কানে এমন গুঞ্জনের খবর আসে, তপইন্না কনো ধর্ম তেয়াগ গইরলো নি! তার ঘরত্ কতো ডইল্লা মানুষ আইয়ের্ যার! মিনতি রানীর অগাধ বিশ্বাস ছেলের ওপর। কিন্তু সে বুঝতে পারে না টুপি-দাড়িঅলা লোকরা এত কেন তার ছেলের কাছে আসে, তার ছেলের খোঁজ নেয়। তপনের কথা কানে বাজে মিনতি রানীর। যখনই ছেলেকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করে ছেলে বলে, অ মা, জলর্ মইদ্দে তাকি তুঁই কুমিরর্ লয় বিবাদ গরিবা নিকি! কথাটা নিশ্চয়ই সত্য। পাড়া-প্রতিরোধকারী যুবকদের চিত্কার-চেঁচামেচি শুনে ভয় ধরে মিনতি রানীর। লোকরা যে বলাবলি করছিল, আক্রমণ হতে পারে, হলে সব ছেড়ে আগে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে হবে। ছেলের সঙ্গে যে সে-বিষয়ে কথা বলবে তারও কোনো জো নেই। সন্ধ্যা কেবল উতরেছে—এমন সময় আহমদ মওলানা এসে হাজির তপনের ঘরে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো অবস্থা হয় তপনের। সে তো খুব বড় গলা করে বলল, ধর্মান্তরের বিষয় এক বর্ণ সত্য নয়। এখন মওলানার আগমনও ঠেকানো যাচ্ছে না, পাড়া-প্রতিরোধকারীদের মনের ভুলও ভাঙানো অসম্ভব। তারা যদি কোথাও ঘাপটি মেরে বসে থাকে তপনের ঘরে আসা-যাওয়া লোকেদের হিসাব রাখবার জন্যে তপন কী আর তাদের ঠেকাতে পারবে! হতাশ স্বরে সে কুশল জানতে চায় মওলানা’র।
ঘটনা খুবই খারাপ। আহমদ মওলানার কণ্ঠে ভার জমে থাকে। সৌদি-প্রবাসী তার ছেলে ফরিদ এমন সমস্যায় পড়েছে যা থেকে উদ্ধার অসম্ভব বলে লোকরা সৌদি আরব থেকে খবর পাঠিয়েছে। ছেলেকে যখন পাঠায় তখন কথা ছিল ছেলে একটা দোকানে বসবে। খদ্দেররা যাবে-আসবে, দোকানের জিনিস চাইলে ফরিদ তাদের এগিয়ে দেবে। সোজা কথা ফরিদ দোকানের সেলস্ম্যান। কিন্তু পরে জানা গেল তার ভিসায় গণ্ডগোল আছে, সে দোকানে না শহরেও না, সে থাকবে শহর থেকে দূরে একটা ফলের বাগানে। সে একা নয়, তার সঙ্গে আরও বাঙালি পাকিস্তানি ভারতীয়রা থাকবে। সেভাবেই থাকে মওলানার ছেলে। যে বেতন সে এবং তার মতো অন্য শ্রমিকরা পেত এবং পায় সেটা তার এবং তাদের জন্য অপ্রতুল হওয়াতে বছর তিনেক অপেক্ষা করে তারা দল বেঁধে দাবি জানায় বেতন বৃদ্ধির। তাদের প্রতিবাদে মালিক সাড়াও দেয়। একদিন এসে পুলিশ ফরিদসহ আরো জনাসাতেক শ্রমিককে ধরে নিয়ে যায়। পরপর তিন সপ্তাহ মোথা’র খাতায় নাম উঠেছিল ফরিদের। সে নাকি পর-পর তিন সপ্তাহ জুম্মার নামাজ বাদ দিয়েছিল। অথচ ফরিদ কাকুতি-মিনতি করে জানিয়েছে, একদিনের জন্যও তার নামাজ বাদ যায়নি। ওই তিন সপ্তাহে সে যে নামাজ পড়েছিল তার প্রমাণও সে স্পষ্ট দিতে পারে। যারা তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে একত্রে নামাজ আদায় করেছিল তারাই তো তার সাক্ষী। কিন্তু কি করে কি করে যেন ফরিদের পা’টা গর্তেই পড়ে থাকে। তবে তাকে এক শর্তে জামিনের আশ্বাস দেওয়া হয়। দেশে তার বাবা কিংবা আইনসঙ্গত অভিভাবক যদি মুচলেকা দেয়, না, ফরিদ আর কখনো অন্যায় করবে না, করলে তাকে সোজা দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে, একমাত্র তাহলেই তারা তাকে কারাগার থেকে ছাড়তে পারে। সৌদি কাফিলের ওপর সমস্ত রাগ ঝেড়ে আহমদ মওলানা তপনকে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়। স্থির হয় পরদিন সৌদি সময় দুপুর বারোটায় মওলানা এসে নিয়ে যাবে তপন শীলকে। তপন যা মওলানাও তা—তপন মোবাইলে কথা বলবে আরবিতে। তপন কথা বলবে মানে আহমদ মওলানাই কথা বলবে। মওলানার কথাই বলবে তপন। যাবার সময় জোর করে তপনকে বিশটা টাকা পকেটে গুঁজে দিয়ে যায় মওলানা।
ঘুম আসে না তপনের। আসেই বা কী করে! ঢেমশার অপহূত মেয়েটার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। কত মন্দিরে আগুন জ্বলল, দোকানপাট লুট হলো, ঘরবাড়ি ধ্বংস হলো। এদিকে মাথার ওপরে ঝোলে ধর্মপ্রচারকদের প্রতিশ্রুতি তথা প্রচ্ছন্ন হুমকি। যদিও তারা বলেছে, চাকরি জুটবে ভালো, আয়-রোজগারের চিন্তা নাই। পাড়া-প্রতিরোধকারীদের হুমকিও কম না। প্রতিটি ঘর থেকে জানমালের প্রতিরোধ-কল্পে গড়া হচ্ছে প্রতিরোধক দল। তপনকেও সেখানে নিশ্চিত করতে হবে প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি। কাল বাদে পরশু রাত জেগে পাহারার ডিউটি পড়েছে তপনের। ঘুম আসে কী করে! কাল নাকি দেশের রাজধানী অচল করে দেবে সেই রাজনৈতিক দলটি। তারা তাদের চূড়ান্ত শক্তি দেখাবে। সরকারকে তারা সরাসরি হুমকি দিয়েছে, গদি থেকে এবারে নামিয়েই দেবে। দলে-দলে নাকি লোকরা রাজধানীতে ভিড় জমিয়ে ঢাকাকে একটি মারাত্মক শহরে পরিণত করেছে। তপন তো তপন, লোকেরা বলাবলি করে, রাজধানীর মানুষজনের চোখের ঘুম চলে গেছে অনেক আগেই। তপন একাত্তর দেখেনি। ফলে যুদ্ধ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সম্পর্কে তার ধারণা থাকলেও তা তত সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু তার মা মিনতি রানী যখন একাত্তরের বর্ণনা দেয় শুনে গা শিউরে ওঠে তপনের। মিনতি রানী অনুচ্চস্বরে বলে ছেলে তপনকে, এখাত্তইর সালর মতো দিন আইস্ সে মত লার।

শেষ রাতের দিকে একটা প্রচণ্ড কোলাহল-চিত্কার আর হাঙ্গামার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তপন ও তার মা মিনতি রানীর। চারদিকে ছুটোছুটি-আর্তনাদ—বয়স্ক, শিশু, নারী, পুরুষ এমনকি কুকুর-বিড়ালের আর্তচিত্কারে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের বাতাস। ‘মার্, মার্, ধর্, ধর্’ চিত্কার তীরের মতো কোন দিকে ছুটে গেলে কারা যেন দৌড়াদৌড়ি-ছুটোছুটি করে বাতাস বিদীর্ণ করে দেয়। গুলি-বোমার শব্দও হয়তো শোনা যায় এসবের মধ্যে। কান পেতে আবহ বোঝার চেষ্টা করে তপন এবং মিনতি রানী দু’জনেই। অন্ধকারে ঠাহর হয় না, কিন্তু অনুভব করা যায়, একটা আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের পরম্পরা অব্যাহত রয়েছে সন্নিকটে। ‘আঁরে মারি ফ্যালাইয়ে, আঁরে মারি ফ্যালাইয়ে’ বলে একটানা চিত্কারের পর কারও কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেলে তপনের বুক কেঁপে ওঠে অজানা আশঙ্কায়। দরজা না খুলে তপন চুপচাপ তার মা মিনতি রানীকে নিয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকে নিস্তব্ধ হয়ে। কিন্তু বাইরের চলমান শব্দপ্রবাহ তাদের নিস্তব্ধতাকে এমনভাবে হ্যাঁচড়াতে থাকে যে তাদের মনে হতে থাকে সবই ঘটছে তাদেরই ঘরের ভেতরে। এভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর আকস্মিক নীরবতা সাধনপুর গ্রামে শুনশান ভোরের আগমন ঘোষণা করে এবং মসজিদের আজানের ধ্বনি তার ওপর দিয়ে বয়ে যায় অজানা ইঙ্গিতের মতো। আস্তে-আস্তে লোকরা ঘর থেকে বেরোয়। মগধেশ্বরী মন্দির এবং তার চারপাশে তখনো জমে রয়েছে রাতের অজানা কাহিনি যা দিবালোকে ক্রমশ জ্ঞাত হতে থাকে অনুষঙ্গাদির আলোকে। বিয়ে করে শুধু একটা কামরাকে পাকা করবার জন্য কিনে এনে স্তূপ করে রাখা তপন শীলের ইটের সঞ্চয় এক রাতেই নাই হয়ে গেছে। কিছু ইট যদিও ছড়িয়ে থাকে ইতস্তত তবু তপন শীল এবং তার মা মিনতি রানীর বুঝতে বাকি থাকে না, রাতের সংঘর্ষে একটা দল বা দু’টো দলই তপনের ইটকে অস্ত্র বানিয়ে একে অন্যের দিকে ছুড়ে দিয়েছে ইচ্ছেমতো। মন্দিরের মধ্যে রাখা মগধেশ্বরীর অষ্টধাতুর মূর্তিটা লুট করে কারা নিয়ে গেছে, তাই নিয়ে হাহাকার করে সাধনপুরের লোকরা। পাড়া-প্রতিরোধকারী দলের ছেলেরা তখন ফের জমায়েত হয় মন্দির-প্রাঙ্গণে যদিও এক রাতের মধ্যেই প্রাঙ্গণ আর অভ্যন্তরের মধ্যে ঘুচে গেছে প্রভেদ। সবাই বলাবলি করতে থাকে, ভোররাতের দিকে মন্দিরে আক্রমণ করেছে বহিরাগতরা এবং তাদেরকে পাল্টা আক্রমণ করে ফিরিয়ে দিয়েছে পাড়া-প্রতিরোধক দল।
পুলিশ আসবার সঙ্গে-সঙ্গে জায়গাটা নির্জন হয়ে পড়লেও আক্রান্তরা ভিড় করে অনাহূত ঘটনার স্ব-স্ব বিবরণ দিতে থাকে। বহিরাগতরা মূলত মন্দিরকেই অভিমুখ হিসেবে বেছে নেয়। তারা ভেবেছিল কোথাও কোনো প্রতিরোধ হবে না এবং তারা যথেচ্ছ হামলা চালিয়ে সব আগ্রাসনের প্রমাণ রেখে দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু তারা প্রতিরুদ্ধ হয়। ভোরের আলো ফুটলে সবাই দেখতে পেল মন্দিরের পুরোহিত সুবোধ পারিয়ালের ছেলে পরিমল মাটিতে শুয়ে—মৃত, মাথাটা থ্যাঁতলানো। আক্রমণকারীদের মধ্যেও মারা পড়ে একজন— পনের-ষোলো বছরের একটি ছেলে। কেউ তাকে চেনে না, কেউ তাকে দেখেওনি কোনোদিন। কেবল তপনের মনে হয়েছিল সেদিন ঢেমশায় এরকম কয়েকটি মুখ সে দেখতে পেয়েছিল যাদের আক্রমণে সমস্ত বাজার আর একটি গণেশ-মূর্তি ছত্রখান হয়েছিল। তপন ছোটে না, পালায় না। মা মিনতি রানীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির অদূরের মগধেশ্বরীর মন্দিরের দিকে চেয়ে থাকে। একসময়ে মন্দিরের প্রাঙ্গণ ভরে থাকত ভক্তদের দেওয়া অজস্র ফুলে। এখন সেই জায়গাটা ভরে আছে অসংখ্য ইটের টুকরোয়। পুলিশ অনেক লোককেই ধরে। তারা একসময় খুঁজে পায় ইটের মালিক তপন শীলকেও। তপন যত বোঝায় যে ইট তারই, সে বিয়ে করবার জন্য বড় দীঘিরপাড় থেকে এক হাজার ইট কিনে এনে রেখেছিল। পুলিশ কেবল শোনে, শুনে যায় এবং মিনতি রানীর শত কাকুতি-মিনতিতেও পুলিশ নাছোড়। তখন কোলাহল শুনে ছুটে আসে আহমদ মওলানাও। আসতে তো তাকে হতোই। সৌদি স্থানীয় সময় আর দুয়েক ঘণ্টা পর তপন তার হয়ে ফরিদের জামিনের ব্যাপারে আরবিতে সৌদি আরবের কাফিলের সঙ্গে কথা বলবার কথা। বললে সেই কাফিল নিশ্চয়তা পাবে এবং তার ছেলে ফরিদ ছাড়া পেয়ে যাবে কারাগার থেকে। সেদিন করণীয় সম্পর্কে কী সুন্দর উচ্চারণে তপন ‘আল কালেব’র লোককে বলছিল—আহাযা কুল্লামা-আফ আলহু? আহমদ মওলানার তখন মনে হয়েছিল, ভাষা শুদ্ধ বলাটা যেমন জরুরি, ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণটাও জরুরি।
ছুটন্ত আহমদ মওলানা ছুটতে-ছুটতে এসে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে পুলিশদের ওপর। মাঝখানে সাত/আটজনের একটা ভিড়, তাদের সবাইকেই গতরাতের ঘটনার সূত্রে গ্রেফতার করা হয়েছে। তপন তাদের বলতে গেলে মধ্যমণি। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আহমদ মওলানা তাকিয়ে থাকে পুলিশ এবং আসামিদের দিকে। তাকিয়ে থাকতে-থাকতে হঠাত্ তার কণ্ঠ সজোর চিত্কারে ফেটে পড়ে। কেন যে তার এই সজোর হুঙ্কার কে জানে। তপনকে আসামি ভাবতে কি তার কষ্ট হয়, তপনকে ধরে নিয়ে গেলে তার ছেলে সৌদি-প্রবাসী ফরিদের কাফিলের সঙ্গে আরবি-ভাষায় যোগাযোগের সূত্র ছিন্ন হয়ে সে অনাথবত্ হয়ে যাবে সেজন্য! চিত্কার করে সে তপনের হয়ে সাফাই গাইতে থাকে পুলিশের নিকটে। সে বোঝাতে থাকে যে তপন শীল নির্দোষ। সে কখনো কারো অনিষ্ট করেনি। সবচেয়ে বড় কথা সে আরবি ভাষা জানে, মওলানাদের চেয়ে, ইমামদের চেয়েও সে ভালো আরবি জানে। তার কথা এমনকি সৌদি আরবের নাগরিক লোকরাও বুঝতে পারে। ঘরে তার একা মা। তাকে ধরে নিয়ে গেলে তার মা’টা মরে যাবে। পুলিশের মনে হয় যে লোকটা পাগল। আহমদ মওলানার আরবি-ভাষা ও অন্যান্য সূত্রের ইতস্তত চারণা তাদের মনে একটা দুর্বোধ্যতার অনুভূতি জাগায়। লাঠি উঁচিয়ে তারা ইশারায় আহমদ মওলানাকে সরে যেতে বলে। পুলিশদের মধ্যে একজন শুধু মওলানাকে বলে, হোনেন, আমরা হইলাম ধরনের মালিক, হুননের মালিক না! আপনার যদি কিছু হুনানোর থাকে তাইলে থানা আছে, কোট-কাচারি আছে, হেইয়ানো যান!

মগধেশ্বরী মন্দিরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলেও, মন্দিরের অষ্টধাতুর মূর্তিটা একদম নাই হয়ে গেলেও পুলিশ যখন আসামিদের নিয়ে বেশ খানিকটা দূরে চলে যায় তখনও তারা গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরেও বলতেই হয় যে তারা মগধেশ্বরী মন্দির থেকে অনেকটা দূরত্বের মধ্যে গিয়ে পড়ল। একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বড় রাস্তা। আজই রাজধানীতে সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলটির সমাবেশ বা মহাসমাবেশ হওয়ার কথা। আহমদ মওলানার মনে অজানা আশঙ্কা উঁকি দেয়। কী হতে পারে মহাসমাবেশের পরিণতি, কোন দিকে মোড় নেবে পরিস্থিতি! এটা যে কেবল দেশের মানুষেরই কাজ মওলানা তা বিশ্বাস করে না। তার মনে হয়, এতে অবশ্যই হাত আছে বিদেশি শক্তির। কিন্তু মানুষের কি আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, চিত্কার করে আর গলা ফাটিয়ে হাজার বছর ধরে সমাজে বসবাস-করা একজনের সঙ্গে আরেকজনের বিভেদ-ফ্যাসাদ লাগিয়ে দেওয়ার কথা শুনেই জীবনের সব কাজ ফেলে লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে যাবে একে অন্যের দিকে! বিশ্বাস হয় না আহমদ মওলানার। আরো অনেক কিছুই বিশ্বাস হয় না তার। কিন্তু তার মাথার ভেতরটা ঝাঁ-ঝাঁ করতে শুরু করে। ফলে সে দেশ-জাতি-ভবিতব্য এসব গুরুতর প্রসঙ্গ সরিয়ে রেখে তার নিজের প্রসঙ্গে ফিরে আসে। তার ছেলে ফরিদ হয়তো কারাগারের জানলার শিকে মাথা রেখে ভাবছে, দেশ থেকে তার বাপ আহমদ মওলানা একটা না একটা গতি করে ফেলবেই। এদিকে তপন শীলটাকেও ঢুকিয়ে ফেলা হবে আরেক কারাগারে। দুই দেশের দুই কারাগারের দুই আসামির চিন্তায় অস্থির আহমদ মওলানা অকস্মাত্ তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে। সেসব কার উদ্দেশে কী হেতু তা জানা যায় না। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত, আহমদ মওলানার উচ্চারিত সেসব গালি এমনই গালিগালাজ যে সেসব মুদ্রণের তো প্রশ্নই ওঠে না, প্রকাশেরও অযোগ্য!

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২৭
ফজর৪:০২
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৭
এশা৮:০৮
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :