The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গান

গানের প্রেমিকারা

জাহিদ আকবর

প্রিয় কোনো ভালবাসার গান শুনতে শুনতে কি মনে হয়নি গানের কথাগুলো হয়তো আমার জন্যই রচিত! নিজের মনের অনুভব, অনুভূতিগুলো যেন গানের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে। গানের সুরে-সুরে কি বুকের মধ্যখানে, চোখের তারায় খুঁজে পাইনি একটা মুখের ছবি? সেই মুখটা কি ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি দূরে বহুদূরে? অবশ্যই ভাসিয়ে, উড়িয়ে নিয়ে গেছে সেই প্রিয় মুখখানি। ভালবাসার গানে একজন নায়িকার উপস্থিতি থাকে। আমরা যারা গান শুনি, নিজের নিজের কল্পনার তুলিতে আঁকি সেই নায়িকার মুখ। গানের কথায় এসব নায়িকা কখনো এমনি থাকে। কখনো নিজস্ব নাম নিয়ে ছড়িয়ে থাকে, জড়িয়ে থাকে গানের পঙিক্ততে পঙিক্ততে। গানের সেসব নায়িকাকে আমরা কল্পনা করি নিজের মনের মতো করে। কেননা এসব নায়িকার নির্দিষ্ট কোনো ছবি আঁকা থাকে না। প্রতিটি শ্রোতা তার মনের মাধুরী মিশিয়ে আঁকেন গানের প্রিয়-প্রিয় নায়িকাদের। এমনই কিছু গানের নায়িকার তালাশে চলুন ঘুরে আসি গানের রাজ্য থেকে। গানগুলো হয়তো গীতিকাররা লিখেছেন তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ, ভাবনা থেকে। সুরকাররা নিজের ভাবনা থেকে সুর করেছেন। একজন শ্রোতা হিসেবে এই গানগুলো নিয়ে নিজের ভাবনার কথাগুলোই হয়তো লিখব। কোনো কোনো ড়্গেত্রে হয়তো মিলেও যেতে পারে তাদের সেই ভাবনার সঙ্গে। মিলে গেলে বিষয়টি কাকতালীয় ছাড়া আর কিছুই নয়। চলুন গানের নায়িকাদের ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যাই।
পপসম্রাট আজম খানের গাওয়া একটি গান। ‘চুপ চুপ অনামিকা চুপ, কথা বলো না, তুমি আমি এখানে, কেউ জানে না।’ গানটিতে ‘অনামিকা’ নামের একটি মেয়ের দেখা পাই। মেয়েটির সঙ্গে হয়তো একটি ছেলের ভালবাসা মাত্র শুরু হয়েছে। চুপ করে দুজন কোথাও দেখা করতে গেছে, কিন্তু তাদের মনে হাজারো ভয়, সংশয়। দুজন দুজনকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছে না। গানের শেষ অন্তরাতে বলা হয়েছে, ‘তোমার আমার পরিচয় জানবে সবাই, জেনে গেলে তখন বলো, হবে কি উপায়।’ অনামিকাকে আমরা ’৭১ সালের পরবর্তী সময়কার একটি মেয়ে হিসেবে কল্পনা করতে পারি।
‘ময়না, এখন আমার জন্য রাত্রি জাগে না, কবিতার লাইন চুরি করে চিঠি লেখে না, সেই ময়না এখন অন্য কারো আমার কেহ না।’ ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর ‘ময়না’ অ্যালবামের শিরোনামের গান এটি। গানটি শুনতে শুনতে কল্পনায় ‘ময়না’র ছবিটি চোখের সামনে ভেসে উঠবে। একটি মেয়ে রাত জেগে পড়ার টেবিলে বসে চিঠি লিখছে। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে কেউ দেখে ফেলছে কিনা। যদিও গানটিতে বিরহের আর্তনাদ ফুটে উঠেছে ময়নার জন্য। এই গানটি ছাড়াও ‘ঊর্মিলা চৌধুরী’ এবং ‘মাধবী’ নাম নিয়ে গান রয়েছে আইয়ুব বাচ্চুর।
প্রয়াত সুদর্শন নায়ক শৌখিন গায়ক জাফর ইকবালের গাওয়া মন খারাপ করে দেয়া একটি গান— ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারো ঘরণী, জেনে রেখো প্রাসাদের বন্দিনী, প্রেম কভু মরেনি।’ গানটি শুনতে শুনতে দু-চোখ কেন জানি নীরবে ভিজে যায়। সুরটা বুকের কোথায় হাহাকার তৈরি করে। ‘নন্দিনী’র মুখের আদলে বার বার কেন জানি অভিনেত্রী ববিতার মুখটি ভেসে ওঠে। আশা রাখি লেখাটা নজরে এলে কিছু মনে করবেন না তিনি। আমার ভীষণ প্রিয় অভিনেত্রী ববিতা গানের নন্দিনী। ‘চলে গেছ কিছু তো বলে যাওনি, আর পিছু ডাকেনি।’
‘চোখের দেখায় মনের দেখা হয়, চোখের দেখা যদি মনে রয়, ভালবেসে তোমরা তাকে কী বলবে? ও বিজলী চলে যেও না।’ অপরূপ এক সুন্দরী মেয়ে বিজলী। তাকে দেখলে, যার সামনে পৃথিবীর সবকিছু তুচ্ছ মনে হবে, যার ভালবাসায় ভেসে যেতে, ভাসাতে ইচ্ছে করবে সব। দেহ-মনে একাকার হয়ে যেতে চাইবে। বিজলী এমনই সুন্দর। ‘তোমায় আমি করছি নিশানা, মনের আড়াল হতে দেব না।’
রাজপ্রাসাদের নৃত্যশালায় মীরাবাই নাচছে। চোখ বুজতেই দেখা যায়, শরাবের পেয়ালা হাতে বসে আছেন সুদর্শন রাজা। দেহে আগুন ধরিয়ে দেয়ার মতো সুন্দরী ‘মীরাবাই’ নূপুরের নিক্কণ ধ্বনিতে আন্দোলিত করছে চারদিক।
‘ঝাকানাকা ঝাকানাকা দেহ দোলানা, মন বলে মন বলে দেহ ঝোক্কানা, মীরাবাই হেইলা দুইলা দরবার নাচায়।’ বাঁকা ঠোঁটের হাসিতে, হরিণী চোখের এই নাচ মীরাবাই ছাড়া আর কেউ নাচতে পারবে না। এছাড়া জেমসের গানের নায়িকারা হলেন ‘হোমায়রা’, ‘সুম্মিতা’। আমরা তার দরাজ কণ্ঠে যখন শুনি, ‘হোমায়রার নিঃশ্বাস চুরি হয়ে গেছে’ কিংবা ‘সুস্মিতার সবুজ ওড়না উড়ে যায়’— আমাদের মনের গভীরে এক-একটি ‘হোমায়রা’ এবং ‘সুস্মিতা’ এসে বসে থাকে, যার যার নিজস্ব কল্পনায়। যুগ যুগ ধরে থেকে যাবে এমন করে।
‘নীলাঞ্জনা’ শেখ ইশতিয়াকের গানের নায়িকা। গানটি আমাদের নিয়ে যায় অনেক দূরে। প্রয়াত গায়ক শেখ ইশতিয়াকের দরদমাখা কণ্ঠে গানটা শুনতে শুনতে চারদিক কেমন ভারী হয়ে যায়! লাল টিপ, নীল শাড়ি পরা পুতুলের মতো একটি মেয়ে চোখের সামনে দিয়ে এসে চলে যায়। ‘নীলাঞ্জনা ওই নীল-নীল চোখে চেয়ে দ্যাখো না, তোমার ওই দুটি চোখে আমি হারিয়ে গেছি, আমি বোঝাতে তো কিছুই পারব না।’ এক সময় নীলাঞ্জনা অন্যের হয়ে যায়। থেকে যায় শুধু স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাস! এভাবেই নীলাঞ্জনারা অমর হয়ে থাকে।
কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া ‘চন্দনা গো রাগ করো না, অভিমান করে বলো আর কী হবে, সময় চলে যায়, মন শুধু জ্বলে যায়, তৃষ্ণার জল নিয়ে এসো না তবে।’ গানটি প্রিয় মানুষের সঙ্গে অভিমানের। দুজন দুদিকে নীরবে পুড়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরের উচ্চারণ এই গানটি। গানটি আইয়ুব বাচ্চুর সুরে। তার স্ত্রীর নাম চন্দনা। হয়তো প্রেমের শুরুতে কোনো অভিমানে গানটি রচিত হয়েছে। ‘সব গান থেমে যায়, সব ফুল ঝরে যায়, লজ্জা বসন ছিঁড়ে এসো না তবে।’ কুমার বিশ্বজিতের আরেক গানের নায়িকা ‘সোমা’। এটি শুধু তার ভালবাসার গান। ভালো লাগা প্রকাশের গান।
‘শোন সোমা একটু দাঁড়াও, কথা শুনে যাও, এই অন্ত্মরে তুমি ছাড়া নাই কারো নাম, এই জীবনে আর কিছু চাই না যে দাম। তুমি আমার আমি তোমার আমরা দুজন শুধু দুজনার।’ গানটিতে কুমার বিশ্বজিতের সহশিল্পী ছিলেন হৈমন্তী শুক্লা।
মাকসুদের গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘মৌসুমী’। গানটির কথা লিখেছেন প্রয়াত গীতিকবি নজরুল ইসলাম বাবু। ‘মৌসুমী’ গানটি নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে ভীষণ উন্মাদনা ছিল। সেই উন্মাদনা এখনো ছড়িয়ে রয়েছে শ্রোতাদের মধ্যে। কে এই ‘মৌসুমী’ — এটা নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে ছিল অনেক প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। ‘মৌসুমী কারে ভালবাসো তুমি, মৌসুমী বলো কারে খোঁজ তুমি, মৌসুমী আছি একা এই আমি।’ গানের কথা থেকে বোঝা যায় মৌসুমী নামের একটি মেয়ের সঙ্গে অভিমান নিয়ে এই গানটি। কোনো কারণে মৌসুমী অভিমান করে দূরে চলে গেছে। তাকে ফেরানোর জন্য হূদয়ের গভীর আকুতি নিয়ে গানটি তৈরি হয়েছে। মৌসুমী সব অভিমানের গান।
মিতালী মুখার্জির গাওয়া ‘তোমার চন্দনা মরে গেছে, ওকে আর ডেকে কী হবে, ওর জন্য হূদয়টি শূন্য রেখে, কী হবে কী হবে।’ গানটি লিখেছেন মুন্সী ওয়াদুদ, সুর করেছেন শেখ সাদী খান। চন্দনার এটি গভীর বেদনার, কষ্টের গান। নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছে সে। এখন আর কোনো ডাক তাকে সাড়া দিতে বলে না। সবকিছু চুপচাপ নীরব। সময় পেরিয়ে অনেক দূরের মানুষ হয়ে গেছে চন্দনা। ‘যখন সময় ছিল, ছিল কল্পনা, তখন তোমার এই মন ছিল না।’ এখন আর প্রেমের কাছে ফিরতে চায় না সে। যুগ যুগ ধরে এমন চন্দনা রয়েছে আমাদের চারপাশে। নিজেকে একা একা বয়ে বেড়াতে পছন্দ করে।
নীলা তুমি কি চাও না হারাতে ওই নীলিমায়, যেখানে দুটি মন এক হয়ে ছবির মতো জেগে রয়, নীলা তুমি জানো না, আমার হূদয় ঠিকানা।’ মাইলসের গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘নীলা’। ভালবাসার চিরন্ত্মন প্রকাশ এই গানটি। নীলা নামের একটি মেয়েকে ভালবাসার কথা বলা হয়েছে গানটিতে। পৃথিবীর সবকিছুর বিনিময়ে নীলাকে জীবনে জড়াতে চাই। অনাবিল সুখে ভাসতে-হারাতে চাই নীলাকে নিয়ে। গানের ‘নীলা’ আমাদের সবার মনের নীলা হয়ে ওঠে। আমরা কল্পনায় নীলার প্রেমিক হয়ে উঠি। এখানেই গানটির সার্থকতা।
‘সুইটি তুমি আর কেঁদো না, অভিমান করো না, দূরে দূরে থেকো না, ঘুম আসে না, না রে না ঘুম আসে না।’ হাসানের গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘সুইটি’। এই সুইটি হয়ে যায় আমাদের সবার। আমরা তার জন্য কাঁদি, রাত জাগি। দূরে কোথাও হারিয়ে যাই। সুইটির জন্য মন কেমন করে। জীবনের সবকিছু বাজি ধরতেও রাজি হয়ে যাই। ‘তুমি আমি যে তরীর হাল ধরেছি, পাড়ি দেব মোরা বহুদূর, পথে বাধা কত পাহাড় ও সাগর, তবু তুমি ভেঙে পড়ো না।’ একসঙ্গে জীবনের অনেক পথ চলার অঙ্গীকার। হূদয়ের গভীর উচ্চারণ সুইটি।
মনির খানের গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘অঞ্জনা’। গানটির অনেকগুলো পর্ব হয়েছে। এক-একটি পর্বে অঞ্জনার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রথম অঞ্জনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি একটাও। ‘অঞ্জনা তুমি জানলে না, একুশে অক্টোবর তোমার জন্মদিনে, কত যন্ত্রণার ঝড় বয়ে যায় আমার মনে। তবুও পালন করবোই আমি তোমার জন্মদিন, ভুলিনি আজো কোনোদিন ভুলবো না, আমার দুঃখ-সুখের মাঝে কেবল তুমি সান্ত্বনা।’
গানটি শুনে বোঝা যায় অঞ্জনা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে গভীর প্রণয় ছিল। হঠাত্ বিয়ে হয়ে যায় অঞ্জনার। সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়! তবু অঞ্জনাকে ভালবেসে যান। একটি মুহূর্তও ভুলতে পারেন না অঞ্জনাকে। প্রেম তো এমনই। দাগ থেকে যায় বুকের খুব গভীরে। একজীবন এভাবেই নীরবে পুড়ে যেতে হয়, অঞ্জনা নীরবে পুড়ে যাওয়ার নাম।
ফকির আলমগীরের গাওয়া ‘ও সখিনা গেছোস কিনা ভুইল্যা আমারে, আমি অহন রিকশা চালাই ঢাকা শহরে।’ ‘সখিনা’ একটা প্রতীক, একটা সংসারের নাম। গণমানুষের প্রেমিকা হয়ে ওঠে সখিনা। সারাদেশে এমন অসংখ্য সখিনা ছড়িয়ে আছে। তারা যুগ যুগ ধরে বাড়ির আঙ্গিনায় কলাগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে নগরবাসী প্রেমিকের জন্য।
নচিকেতা, অঞ্জন দত্ত ও সুমনেরা গীতিকার সুরকার গায়ক বলে তাদের গানের নায়িকা নীলাঞ্জনা, রঞ্জনা ও বেলাদের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের গানের নায়িকাদের জন্মবৃত্তান্ত অজানাই থেকে যাবে। কারণ এখানে গীতিকার-শিল্পী আলাদা দুজন মানুষ।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৭
ফজর৪:৪০
যোহর১২:০৫
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৬
এশা৭:২৮
সূর্যোদয় - ৫:৫৬সূর্যাস্ত - ০৬:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :