The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

শিল্পকলা

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমার শিল্পভ্রমণ

রফি হক

ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ভিজিটিং স্কলার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন মাসের অতিথি হয়ে ছিলাম আমেরিকাতে (১ মার্চ ২০১৪ থেকে ৩০ মে ২০১৪ পর্যন্ত)। বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি অব সাউদার্ন এশিয়ান স্টাডিজ আমন্ত্রণপত্রে আমাকে আগেভাগেই জানিয়েছিলেন আমার শিল্পকর্মের প্রদর্শনী করবেন। এছাড়া বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলা আন্দোলনের ওপর একটি বক্তৃতা দিতে হবে। সাউথ এশিয়ান ল্যাংগুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনস বিভাগের সকলশ্রেণির ছাত্রদেরকে বাংলাদেশের শিল্পকলা সম্পর্কে অবহিত করবার অনুরোধটিও করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এমন আমন্ত্রণের যোগ্য ব্যাক্তি আমি নই। প্রথমে আমার সম্মতিই ছিল না। আমি রাজিও হইনি। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর সাউথ এশিয়ান ল্যাংগুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনসের শিক্ষক মন্দিরা ভাদুড়ি ছাড়বার পাত্র নন।
আমি যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণটি গ্রহণ করি এই অভিপ্রায়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাকে রাজি করানোর চেষ্টায় প্রাণপাত করলেন। আমি যত তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি এই সম্মানের মানুষ আমি নই, তত তিনি সংকল্পে অটুট থেকেছেন। শেষকালে আমি তাঁকে অসহযোগিতা করেছি নানাভাবে। যেমন তিনি আমার কাছে আমার বায়োগ্রাফি, অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কাগজপত্র যখন চাইলেন—আমি মুখ এঁটে বসে রইলাম। এ যেন বাঙালির অসহযোগ আন্দোলন! তখন তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ ছেড়ে দিলেন।
মাস চারেক পর ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর আরেক মেধাবী চৌকস রানু রায়চৌধুরী আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখলেন, ‘রফি’দা, আপনি আসছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে’। আমি বাজ পড়বার মতো বিদ্যুত্ অনুভবে চমকে উঠেছি। পরে মন্দিরা আমাকে জানিয়েছেন কী কী ভাবে আমার পেপারস সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলি সাবমিট করেছিলেন কমিটিতে। কমিটি যোগ্য মনে করেই আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মন্দিরা ভাদুরি এটিও জানাতে ভুললেন না যে বাংলাদেশ থেকে প্রথম কোনো শিল্পীকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় আমন্ত্রণ জানাল প্রদর্শনী এবং বক্তৃতার জন্য। এরা অফিসিয়াল আমন্ত্রণ পাঠিয়ে দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আমার একধরনের অভিমান আছে। এটা নানা কারণে তৈরি হয়েছে। আমার স্বপ্ন ছিল আমি একদিন শিক্ষক হব। বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব ভালো ফল করায় আমি যখন চারুকলায় শিক্ষকতার জন্য আবেদন করেছিলাম, তারা আমাকে ভীষণভাবে অপমান করেছিল। সেই অপমানে আমি আহত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। এরপর থেকে এ জগত্ আমি এড়িয়ে চলি।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন আমন্ত্রণ পেয়ে আমি খুশি হয়েছি, আপ্লুত হয়েছি। আমার নিজের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সম্মান জানাতে না পারলেও দূর দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সম্মান জানাচ্ছে, এরচেয়ে পরম পাওয়া আর কী-ই হতে পারে!
বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে আমেরিকায় থাকাকালে সে দেশের প্রধান কয়েকটি আর্ট মিউজিয়াম দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। চারুকলায় যখন পড়তাম তখন আমার খুব ইচ্ছে হতো, বইয়ে বা আর্ট ম্যাগাজিনে বড় বড় শিল্পীদের যেসকল পেইন্টিংসের রিপ্রোডাকশন দেখি, তা যদি সত্যি কখনো সামনা সামনি দেখতে পারি, জীবন সার্থক হবে। এই পৃথিবীতে জন্মেছি, শিল্পী হওয়ার জন্য পড়ালেখা করছি, আর পৃথিবীর সেরা মিউজিয়ামগুলি দেখে যাব না?
আমি কুষ্টিয়ার ছেলে। বাল্য-কৈশোর কেটেছে শিলাইদহ-কালোয়া, খোকসা-কুমারখালী, চুয়াডাঙ্গা-নীলমণিগঞ্জ, মেহেরপুরে। কখনো নদীতীর ঘেঁষে হেঁটেছি মাইলের পর মাইল, কখনো আমবাগান জঙ্গলে হারিয়েছি একাকী, কখনো বা রেল লাইন ধরে হেঁটেছি দীর্ঘ পথ। মফস্বলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে ইচ্ছে হতো, ম্যাট্রিক পাশ করে আমি ঢাকা যাব। ঢাকা আমার স্বপ্নের শহর, আমার সকল মুগ্ধতা ছিল ঢাকাকে ঘিরে।
আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে যখন ঢাকায় থিতু হলাম, তখনও মনে হয়েছে, ঢাকার মতো এত জীবন্ত শহর কোথাও দুটি নেই। পঁয়ত্রিশ বছর ঢাকাতে, তবু এতটুকু মুগ্ধতা কমেনি। এমনকি প্যারিস-মাদ্রিদ গিয়েও ঢাকার জন্য হাঁসফাঁস করেছি।

আমার এই লেখাটি ঠিক প্রচলিত ভ্রমণকাহিনির বাক্ ভঙ্গিমার মতো নয়। এটা আমার ভ্রমণের দিনলিপি।
শনিবার : মার্চ ১, ২০১৪
আবুধাবীতে কানেক্টিং ফ্লাইট মিস করে মনটা ভীষণ খারাপ হয়েছিল। আমার মন খারাপ দেখে ইতিহাদ এয়ারলাইন্সের ট্রান্সফার কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা মেয়েটি মুহূর্তমাত্র দেরি না করে ছুটোছুটি শুরু করে জানাল, তোমার জন্য দুটো অপশন আছে— ১. আজই লন্ডন ফ্লাইটে লন্ডন হয়ে নিউ ইর্য়কের জেএফকে থেকে শিকাগো যেতে পারো। ২. তারচে আজ বরং থেকে যাও আবুধাবীতে। এয়ারলাইন্স তোমার হোটেল ব্যবস্থা করছে। তুমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে এরই মধ্যে তোমার UAE ভিসা কনফার্মেশন এসেছে...! আগামীকাল সকালের ফ্লাইটে শিকাগো ওহায়্যার যাবে।
আমি টিকটিকির মতো চোখ বড় করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এয়ারলাইন্সের আরেকজন কর্মী আমার দিকে জ্যুস আর জলের বোতল বাড়িয়ে বলল—আমি বুঝেছি তোমার মনের অবস্থা। আচ্ছা চলো আমাদের এয়ারলাইন্সের বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জে, সেখানে তুমি লাঞ্চ করে আরাম করো। আমরা কিছু একটা ব্যবস্থা করছি। তুমি চিন্তা করো না। আর শোনো, লাউঞ্জ থেকে কোথাও যেও না। ততক্ষণে বুঝে নিয়েছি, আজ শনির দশায় পড়েছি।
চিন্তা করতে না করলেও বড় চিন্তা হলো, কারণ, সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও কেউ আর খোঁজ নিতে এল না। আমিও নিজ থেকে আর যোগাযোগ করলাম না। ইতিহাত এয়ারলাইন্সের বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জ সত্যিই আরামের। খানা-পিনার কোনো কমতি নেই সেখানে। ঘুমানোরও আরবীয় রাজকীয় ব্যবস্থা, তবু ঘুম এলো না।

রবিবার : মার্চ ২, ২০১৪
কথা ছিল আবুধাবী থেকে শিকাগোর উদ্দেশে Y151 উড়বে সকাল ১০ :১০-এ। উড়ল ১১ :১০-এ। ১৭ ঘণ্টার টানা ফ্লাইট। শিকাগো পৌঁছে লাগেজ কালেক্ট করে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যে। ভালো লাগল যে এয়ারপোর্টে কাস্টমসের বাড়াবাড়ি নেই। এয়ারপোর্টের বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা আর হিম বাতাস। সেই হিম বাতাস উপেক্ষা করে আমাকে রিসিভ করতে দাঁড়িয়ে আছে আমার শিল্পীবন্ধু মন্দিরা। তবে ইলিনয় স্টেট বেশ আন্তরিক।

সোমবার : মার্চ ৩, ২০১৪
ভোরে বরফ পড়ছিল। এখন আলো ঝলমলে স্নিগ্ধ দিন। আজ মাইনাস সতের (-১৭)।
শিকাগো শহরের একটা অন্যরকম সৌন্দর্য আছে।
সেখানে এখন আর দস্যু আল্ কাপনের যুগ নেই।
শিকাগোর অবস্থানটি এমন যে, একদিকে নিউ ইয়র্ক অন্যদিকে লসএঞ্জেলেস, মাঝখানে শিকাগো। এই শহরের স্থাপত্যশৈলী অনন্য সাধারণ। পৃথিবীর সকল বিখ্যাত স্থাপত্যবিদেরা এখানে কাজ করেছেন। এই শহরেই বাস করতেন বিখ্যাত আর্কিটেক্ট ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই আছে ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট ট্রাস্ট। ওকপার্কে রয়েছে তাঁর বাড়ি ও স্টুডিও।
শিকাগোতে সমদ্র নেই ঠিকই, কিন্তু সমুদ্র-প্রতিম মিশিগান লেক নিজের সৌন্দর্যেই বহমান। তাক্যুয়েজ নীল জলের মিশিগান লেক থেকে চোখ ফেরানো কঠিন।
ডাউনটাউনে ‘সিয়ার্স টাওয়ার,’ ‘হ্যানকক টাওয়ার’ পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ স্থাপনা। এই দুটি টাওয়ারের নকশা তৈরি করেছেন বাংলাদেশের স্থপতি ফজলুর রহমান খান। কোনো বাংলাদেশির এমন কৃতিত্বে ভালো লাগে। গর্ব হয়।

মঙ্গলবার : মার্চ ৪, ২০১৪
অবশেষে আজ কিছু ঘুম হলো।
হাইডপার্কের সাউথ কর্নেল অ্যাভিন্যুর আশপাশটা বেশ।
গতকাল তীব্র হিমের ভেতর অনেক হাঁটলাম। হাঁটতে হাঁটতে হিম হাওয়াটা উপভোগ করতে চেষ্টা করলাম। বেশ লাগল। চারপাশের বরফের ভিতর দিয়ে ফুটপাতের চিকন পথটার ভিতর আমাদের গ্রামের আলপথের একটা গন্ধ খুঁজতে চেষ্টা করছিলাম। আমি সাজুয্য খুঁজিনি। খুঁজেছি এসেন্সটি।
একটা ফোনের খুবই দরকার। ফোন কিনতে গতকাল বিকেলে বেরিয়েই প্রথম গিয়েছিলাম Radio Shack-এ। এখন আমার নতুন ফোন হয়েছে, নম্বর : 31234xxxxx
হাঁটতে হাঁটতে ফিফটি সিক্স স্ট্রটটের বনি সানতেতে (Bonne Sante) গিয়ে আমার কাঙ্ক্ষিত অ্যালোভেরা পেলাম বটে কিন্তু তা বোতলজাত করা দ্রব্যটির মূল্য ৩৬ ডলার...! ওখান থেকে বেরিয়ে যখন ফিফটি ফিফথ স্ট্রিটের ট্রেজার আইল্যান্ডে (Treasure Island) ঢুকলাম... আর সেই কাঙ্ক্ষিত কাণ্ডওয়ালা অ্যালোভেরা (খোদ বাংলাদেশের মতো) পেয়ে ভালো লাগল। মূল্য দেড় ডলার। কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে বোতলজাতের মার্কেটিং ট্র্যাপে পড়ে বেশ মন খারাপ হলো। কিন্তু কাণ্ডওয়ালা অ্যালুভেরা মন ভালোও করে দিল... তাই বাইরের হিম বাতাসকেও মনে হলো হুমায়ূনের ‘লিলুয়া বাতাস’।
ট্রেজার আইল্যান্ড থেকে বেরিয়ে office depot-তেও যাওয়া হলো একবার।
অনেককে লিখব, ক্যাটালগ বা আমার নতুন বইটি পাঠাব ভেবে 0ffice depot থেকে সুন্দর কিছু এনভেলাপ কেনা হলো। বাংলাদেশে এই জিনিসটির অভাব খুব তীব্র। এসব ছোট ছোট জিনিস একটি জাতির রুচি তৈরিতে অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
কথা ছিল মন্দিরার বন্ধু রানু রায় চৌধুরীসহ জাপানিজ সুসী খেতে যাব। সন্ধ্যায় রানু এলে প্রস্তাব করল, রফিদা, চলুন ইথিওপিয়ো রেস্টুরেন্টে ডিনার করি। আমি তখন দ্রব্যগুণে আচ্ছন্ন।

বুধবার : মার্চ ৫, ২০১৪
কোনোই হয়তো কারণ নেই, তবু রাতে এমনসব স্বপ্ন দেখলাম যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই। শিকাগো আসবার পর নিয়ম করে ঠিক আড়াইটায় ঘুম ভাঙছে। আমি উঠে বাইরের আবছা অন্ধকার দেখি। আবছা অন্ধকারে বাইরে স্তূপ হয়ে জমে থাকা বরফের ভিতর নিজের ব্যাকুলতা খুঁজি।
গতকাল বিকেলে ডাউন টাউনে গিয়েছিলাম। ৬ নং বাস ধরে অপূর্ব বরফে ঢাকা নগরীর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম মনরে স্ট্রিট হয়ে আর মিশিগান অ্যাভিনিউয়ের কর্নারে। ওখান থেকে সামান্য হাঁটাপথে শিকাগোর প্রধান আর্ট মেটেরিয়াল শপ ব্লিকে (BLICK).
ব্লিকে গিয়ে বেশ খানিকটা দ্বিধান্বিত ও অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। জাপান ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের আর্ট মেটেরিয়াল শপে গিয়েও এমনটি হয়েছে, কিন্তু ব্লিক একেবারেই আলাদা। একটি আর্ট মেটেরিয়াল শপে গিয়েও নিজের রুচিকে আরো উন্নত করবার বোধ জাগতে পারে, শিল্পী হবার পথে যেসকল কাঁটাঝোপ আছে তা সরিয়ে নিজের সাধনার পথকে উসকে দিতেই পারে এমন একটি আর্ট মেটেরিয়ালের দোকান—তা কাল আরেকবার অনুভব করলাম।
ব্লিক থেকে বেরিয়ে DSW (designers shoe wear)-এ গিয়ে জুতো দেখতে দেখতে মনে হলো জুতো শিল্পে বাংলাদেশ পশ্চিমাদেশের সমকক্ষ। বাংলাদেশে—বিশেষ করে আমার অগ্রজ, সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের এপেক্স ফুটওয়্যার জুতো শিল্পকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আমি যেমন নিজেকে Printmaker বলি, নাসিম নিজেকে Shoemaker বলেন—নিজেকে প্রকাশের এই ভঙ্গিটি আমাকে আনন্দ দেয়।
BLICK এবং DSW-এর মুগ্ধতায় ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে।
বাইরের হিম হাওয়া আরো গাঢ় হয়ে আসছে। মন্দিরাকে অনুসরণ করে Hot Wok Cold Sushi রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভাত মাছের মতো সুসি খাবার বেশ পর মনে হলো যে জাপানিজ খাদ্যের গন্ধ ও স্বাদ গ্রহণ করছি। তীব্র ক্ষুধায় মানুষের সকল সংবেদন লোপ পায়...! তবে সুসি, টেম্পুরা, মিসো স্যুপ উপভোগ করেছি।
রাত হয়েছে, ফিরতে হবে ঘরে। Hot Wok Cold Sushi থেকে আবার BLICK-এর সম্মুখে অপেক্ষা। ধরতে হবে ফিফটি ফিফথ স্ট্রিটের ৬ নং বাস।

বৃহস্পতি বার : মার্চ ৫, ২০১৪
সমুদ্রসম লেক মিশিগান এবং শাদা শুভ্র বরফে ঢাকা হাইডপার্ক—
শুভ্র বরফে বরফ একাকার... শিকাগোতে এমন বরফ পড়েনি গত চল্লিশ বছর! লেকের ঢেউসমেত বরফের চাঁই হয়ে আছে। যেন অনন্ত হিমপ্রবাহের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছি।

বুধবার : মার্চ ১২, ২০১৪
সকালে গিয়েছিলাম শিকাগো Hyde Park ART CENTER-এ। নতুন অনুভব স্রোতের মতো একটির পর একটি বয়ে গেল। আমার ভালো লাগাটা কী ভাষায় বোঝাব...! প্রতিষ্ঠানটি যে অনেক বড় তা কিন্তু নয়, কিন্তু ছোটোর ভিতরে কত সুন্দর করে একটি রুচিপাঠের আয়োজন করা যায় তা আমাকে বিস্মিত করেছে। ভালো যা কিছু তা সব সময়ই একটা আনন্দ দেয়, সেই আনন্দটি আজ সারাদিন ছুঁয়ে গেল...!

সোমবার : মার্চ ১৭, ২০১৪
বরফ ভাঙতে শুরু করেছে। লেকের জল নীল সাধারণত..., এখানে তার্কোয়েজ নীল, বোতলের ছিপি খোলার মতো চেহারা নিয়ে বসে আছি লেক কিনারে, নীল নীল জল ঘন হয়ে আসে, আকাশ ও নীল জলের মালিক লেক মিশিগান।

মঙ্গলবার : মার্চ ১৮, ২০১৪
এখন থেমেছে বরফ বৃষ্টি। এখন ঘরে দোল-পূর্ণিমার আলো ঢুকে অপর্থিব পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টের সাত তলা থেকে দক্ষিণের লেক মিশিগানের আনুভূমিক রেখাটি দেখা যায়। আজ ঝড়ের মতো সোঁ সোঁ হাওয়া যেন বেহালার ছড় টানার শব্দ। শিকাগো ফিরেছে শিকাগোতে...

শুক্রবার : মার্চ ২১, ২০১৪
ডাউনটাউনে ওয়াবাস স্ট্রিটের কলম্বিয়া কলেজের অ্যাঙ্কর স্টুডিওতে প্রিন্টমেকিং শুরু করেছি। স্টুডিওটি খুবই সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং গোছানো। এখানকার প্রফেসর ডেভিডের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি কেবল একজন শিক্ষকই নন, শিল্পী এবং দক্ষ সংগঠকও। তিনি আমার শিল্পকর্মের প্রশংসা করলেন। স্টুডিওতে তাঁর সহকর্মী ও ছাত্রদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার সঙ্গে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার শিক্ষক আমার বন্ধু শিল্পী মন্দিরা ভাদুড়ি ছিলেন। আমার কাজ করার পদ্ধতি ও মনোযোগ দেখে মন্দিরা খুব আপ্লুত। সবমিলিয়ে শিকাগোতে আর্টওয়ার্ক করতে পারার আনন্দ মনকে ছুঁয়ে গেল। রাতে ঘরে ফিরে Hugh Prather-এর Notes to Myself পড়লাম... অপূর্ব ছোট ছোট কবিতা—
“I am not interested so much what I
do with my hands or words as what I do
with my feelings. I want to live from the
inside out, not from the outside in..”

মঙ্গলবার : মার্চ ২৫, ২০১৪
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে গেলাম। অপূর্ব এবং বিশাল লাইব্রেরি। লাইব্রেরির একটা নাম আছে—রেগেনস্টাইন লাইব্রেরি। পরিচয় হলো লাইব্রেরির ডিরেক্টর লরা রিংয়ের সঙ্গে। এই লাইব্রেরির চতুর্থ তলায় বাংলা বইয়ের সংগ্রহ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। কী নেই তাদের সংগ্রহে!
আজ শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়টি ঘুরে দেখা হলো। এতদিন বরফের কারণে রাস্তায় সেভাবে বের হইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস, ওরিয়েন্টাল আর্ট মিউজিয়াম, লগান সেন্টার (ডিপার্টমেন্ট অব ভিজ্যুয়াল আর্ট সংক্ষেপে DoVA, স্মার্ট মিউজিয়াম ভিজিট শেষে একটি ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেলাম। রেস্টুরেন্টের নামটা খুব মনে ধরল মেডিচি রেস্টুরেন্ট। এখানে সর্বত্র শিল্পের ছোঁয়া।

বুধবার, মার্চ : ২৬, ২০১৪
আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। এই দূর আমেরিকায় বসে দেশের কথা মনে পড়ছে। এখানে আজ বাইরে বেশ ঝকঝকে রোদ। নীল আকাশ। তাপমাত্রা মাইনাস ফোর। রশীদ খাঁ-র বাজনা শুনছি। বিমূর্ত শিল্পের মতো বাজনার ভিতরের রহস্য। শুনছি, ভালো লাগছে। তাল লয় আঙ্গিক কিছুই বুঝি না। এই সূক্ষ আঙ্গিকের ভিতর যে মোচড়—হিসেব তারও আছে নিশ্চয়। শিল্পের আনন্দটা ভাগ করবার জন্য হিসেবটা কি খুব জরুরি...? সুরটা যে শুনতে পাচ্ছি, এর দোলা এসে লাগছে মনে... মীড়ের মোচড়ে শিল্পীর আর্ত আনন্দিত মনটাকে ছুঁতে পারছি এটাই বা কম কী...!

বৃহস্পতি বার, মার্চ : ২৭, ২০১৪
আগামী ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য আমার প্রদর্শনীর ‘আর্ট রিসেপশানের’ নিউজটি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্মার্ট মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটসহ DoVA-এর ওয়েবসাইটেও দেওয়া হয়েছে।
আজ সকাল থেকে মেঘলা আর ছিঁচ-কাঁদুনে বৃষ্টি। শীত-বৃষ্টি। আজ এখানে মাইনাস তিন। বাইরে হাড় কাঁপানো হাওয়া। কাল বিকেলে ‘আর্ট-লেকচার’ লেখার কাজে ঘরে যখন বন্দি, হঠাত্ করেই তখন এলেন জীন ফিত্জমোন। জীন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিনস্ট্রেটর। আমাকে নিয়ে অন্তহীন ভাবনা, পরিকল্পনা। কথা বলার সময় নয় সেটা, তবু জীন আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আগলে রাখল সারা বিকেল-সন্ধ্যে। শিল্পকলায় তাঁর আগ্রহ অপরিসীম। এনথ্রোপোলজিতে পড়ালেখা করা জীন ফটোগ্রািফি ও ফিল্মমেকিং করেন। তাঁর আন্তরিকতায় মুগ্ধ এবং বিস্মিত। শিল্প লাবণ্যে ভরা জীনকে বহুদিন মনে থাকবে।

রবিবার : মার্চ ৩০, ২০১৪
সাউথ এশিয়ান ল্যাংগুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনস বিভাগের শিক্ষক মন্দিরা ভাদুড়ি তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন : This is for the first time in Bangla language classes, I have tried to bring art as a cultural component. Rafi Haque, a well-known artist from Bangladesh has come to the University of Chicago and he will interact with Bangla students of all levels.

মঙ্গলবার : এপ্রিল ১, ২০১৪
ল্যাংগুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনসে অ্যাডভান্সড স্টুডেন্টদের ক্লাস নিলাম। তাদের কৌতূহল আমাকে খুব অবাক করল। ওদের জানার আগ্রহ এবং কোনো বিষয়ের ওপর লেকচার হলে সেই সম্পর্কে পড়াশোনা করে আসবার প্রস্তুতি আমার ভালো লাগল। আমিও ওদের সঙ্গে নিজের ভাবনা আদান-প্রদান করে মজা পেলাম। ছাত্ররা খুবই ইমেপ্রসিভ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ফ্যাকাল্টিতে, ভবনে, ক্যান্টিনে আমার এক্সিবিশনের ফ্লায়ের টাঙ্গানো হয়েছে। আমি দূর থেকে তাকিয়ে দেখছি। অন্য অনুভূতি তৈরি হচ্ছে ভিতরে। প্যারিসেও এমনটি হয়েছিল।

বৃহস্পতি বার : এপ্রিল ৩, ২০১৪
আগামীকাল আমার প্রদর্শনী। বিকেল ৪ :৩০, ফস্টার হল ওয়ান ও থ্রি-তে।
সুজিত সরকারের একট কবিতা মনে পড়ছে সকাল থেকে—
‘এক হাজার মানে এক তারপর তিনটি শূন্য
এক লক্ষ মানে এক তারপর পাঁচটি শূন্য
এক কোটি মানে এক তারপর সাতটি শূন্য
শূন্য মানে কিছু নয়
শূন্য মানে কিছু নেই...’

শুক্রবার : এপ্রিল ৪, ২০১৪
আজকের সন্ধ্যেটা ছিল অন্যরকম। প্রদর্শনী উপলক্ষে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফস্টার একশ’ তিনে। আমি ভাবিনি যে এত সংখ্যক অধ্যাপক সেখানে উপস্থিত থাকবেন। আমাকে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো সমাগত অতিথিবৃন্দের সঙ্গে তাতে বেশ সংকোচ হলো। এত বড় সম্মানের ব্যাক্তি আমি নই। তবু, শিল্পীকে তার সর্বোত্তম বিকাশের মধ্যে মেলে ধরবেন আয়োজকেরা এটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমার তাতে সায় থাকে না বেশিরভাগ সময়ই।
বাংলাদেশের চিত্রকলায় নিজের নিজের কাজ নিয়ে বিভোর থেকেছেন আমার যেক’জন শিক্ষক, তাঁদের মুখগুলো আজ মনে পড়ছিল বড় বেশি করে। সফিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মনিরুল ইসলাম—এই তিনটি নাম একসঙ্গে উচ্চার্য নয়, তবুও এঁরাই আমাকে আপ্লুত ও অনুপ্রাণিত করেন, স্বপ্ন দেখান। ঘুম অথবা স্বপ্নের আস্তরণের মধ্যে কাফকা যেমন নির্মাণ করেন গল্প বলার বাস্তব অতীত এক রীতি। সেই অবচেতনার আস্তরণের ভিতর ঢুকে গেলে তেমনি স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিকের চিকন ভেদ রেখাটি আর আলাদা করা যায় না। স্বপ্ন যেন গড়িয়ে পড়ে সুররিয়েল পেইন্টিংয়ের মতো এর ওর গায়ে—এভাবেই প্রসারিত হয় গুরু-শিষ্যের পরম্পরা।

বুধবার : এপ্রিল ৯, ২০১৪
আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফস্টার ওয়ান ও থ্রি-তে (Foster 103) আমার লেকচার।
সকালটা আলো হাওয়াময়। একটি লোক ফিফটি ফোরথ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে গেল... আচ্ছা, শূন্যকে ‘ও’ বলে কেন? কোনো কিছুতেই অবাক হই না আজকাল। এমন কি কোকিলের বাসায় কাক ডিম পাড়লেও না...! জামফলের মতো কালো মেঘ দেখি না বহুদিন। দুটো নিরীহ পাখি বসেছে লেক কলোনির তারে। আমি লিখি বাংলা অক্ষর। অক্ষর হেঁটে চলে, কখনো দৌড়ায়। যতদূর চোখ যায় অপার্থিব...

মঙ্গলবার : এপ্রিল ১০, ২০১৪
‘বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলা : প্রবণতা ও স্বরূপ সন্ধান’ (Quest for Identity and Emerging Trends in the CONTEMPORARY ART OF BANGLADESH) আমার বক্তৃতার শিরোনাম। ফ্যাকাল্টির সকলে এসেছিলেন।
খ্যাতিমান অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন অন্যান্য ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের সঙ্গে। বক্তৃতা শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে অধ্যাপক ও ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ-কৌতূহল আমার ভালো লাগল। বাংলাদেশের শিল্পকলা সম্পর্কে এদের ধারণা তেমন নেই। যতটা ধারণা আছে গার্মেন্ট এবং আদিবাসীদের নিয়ে। অনেকে বললেন, আপনি প্রথম কোনো স্কলার যিনি বাংলাদেশের আর্টকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। এ ধরনের কথায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়।
রাতে আমার সম্মানে ডিনারের আয়োজন ছিল। নিজের সংকোচ ও লজ্জার খোলাস থেকে বেরিয়ে অনেকের সঙ্গে খুব আন্তরিকভাবে কথা বললাম। বিদগ্ধ পণ্ডিত অধ্যাপক আলাম সাহাব আমাকে বুকে টেনে নিলেন। অনুভবের এমন মুহূর্তগুলো যদি ফ্রেমে বন্দি করা যেত!

আগামীকাল অলবেনি-নিউ ইয়র্ক যাচ্ছি। আমার বন্ধু সালমা কানিজের ওখানে। শিকাগো থেকে এই প্রথম বাইরে যাচ্ছি। মনটা হালকা হাওয়ায় উড়ছে। আহা... নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত মিউজিয়ামগুলো দেখব।

শনিবার : এপ্রিল ১২, ২০১৪
বাংলাদেশের অনেক তরুণ শিল্পী এখন নিউ ইয়র্কে থাকেন। অনেক উঞ্ছবৃত্তির পরেও তারা ছবিআঁকার জন্য সময় বের করে ছবি আঁকেন নিয়মিত। কয়েকজন মিলে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কুইন্সে একটি সুন্দর গ্যালারি স্থাপন করেছে। সেখানে প্রর্দশনী হয় আমেরিকান-ইউরোপীয়ান তরুণ শিল্পীদের। দেখে খুব ভালো লাগল।

আমার যাওয়া উপলক্ষে নিউ ইয়র্ক বা কাছাকাছি অবস্থানকারী বাংলাদেশের সকল তরুণ শিল্পী একত্রিত হয়েছিল শনিবার ১২ই এপ্রিল, সন্ধ্যায়। কতদিন পরে দেখা হলো একেকজনের সঙ্গে। প্রবাসী শিল্পী বিশ্বজিেক সঙ্গে নিয়ে পুরো বিষয়টি দেখভাল করেছিল আমার বন্ধু সালমা কানিজ।
আমার সকল বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীরা সেদিন সন্ধ্যায় অনেক কষ্ট করে এসেছিলেন কেবল ভালোবাসার টানে, তাদের সকলের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বাংলা নতুন বছর সুন্দর হোক সকলের জীবনে।

সোমবার : এপ্রিল ২১, ২০১৪
প্রাত্যহিকতার স্রোতের বাইরে স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্ন-ভাবনার পারম্পর্য বেশি সময় ধরে রাখা যায় না। সৃষ্টিকাজের কত খণ্ড খণ্ড উপায়ের কথা ভাবি, টুকে রাখি বুকপকেটের নোটবুকে। শিল্পসৃষ্টির জীবনে দীর্ঘকাল জুড়ে কত খণ্ড খণ্ড স্বপ্ন।
কেবল দুঃখকেই করেছি বহন কোনোদিন তা থেকে মুক্তি চেয়েছি এমন তো খুব মনে পড়ে না। শিল্পী মনস্তত্ত্ব বড় জটিল, তার সামর্থ্যের বাইরে যাওয়া মুখের কথা নয়।
কিন্তু স্বপ্ন সেই অসামর্থ্যকে অতিক্রম করতে চায় কখনো কখনো। আমার স্বপ্ন দূরের ওই বাতিঘর পর্যন্ত যাওয়া। সৃষ্টিকাজের চূড়ান্ত সাফল্য বলে কিছু নেই। কবি, লেখক শিল্পীদের লক্ষ্য বাতিঘরটিকে স্পর্শ করা বা লাইট হাউসে পৌঁছানো। কিন্তু কেউই পৌঁছাতে পারে না সেখানে। লাইট হাউস পর্যন্ত যে যতটুকুন যেতে পারে সেটুকুনই তার সাফল্য—এমনটি পড়েছিলাম একজন লেখকের আত্মজীবনীতে।
লেক মিশিগানের বাতিঘর সে কথা মনে পড়িয়ে দিল আরেকবার।

মঙ্গলবার : এপ্রিল ২২, ২০১৪
কত ক্ষুদ ক্ষুদ্র মুহূর্তে বিবশ হয় মন। বিবশিত মন কোথাও আশ্রয় খোঁজে, আশ্রয় পেয়েও যায়। মনটা তখন বৃষ্টি, মনটা তখন উদাস। মনটা তখন কোবাল্ট ব্লু, মনটা তখন টার্কোয়েজ, মনটা তখন বিশাল আকাশ।
মনের সকল কালো সাদার দখলে আসুক...
বৃষ্টি নামুক, বৃষ্টি, বৃষ্টি...
মনটা এখন সেরেলিন (ব্লু), মনটা এখন মল্লিকা বনে, বেঁচে থাকো রবীন্দ্রনাথ।

বুধবার : এপ্রিল ২৩, ২০১৪
এরকমের সময় ও সান্নিধ্যের ঘোর কাটতে সময় লাগে। কানেক্টিকাটের রিত্জফিল্ডের নির্জন কিন্তু উজ্জ্বলতম বাড়িতে আমাদের অভ্যর্থনা হলো তার পিয়ানোর মূর্চ্ছনায়। চোখের জলে চোখ টলটল, টুপ... টাপ। মাথা নিচু করে আছি, একটু দূরে বন্ধু কানিজ নির্বাক, চুপ... চাপ। বাজনার ভিতর দিয়ে সুজানকে জানা হলো অন্য অভিজ্ঞতায়।
বাড়ির ভিতরে পেইন্টিংস, স্কালপচার, মাস্কস্, বইয়ের দঙ্গল...! যেন প্রকৃতি আর সাহিত্যের ভিতর দিয়ে শিল্পের আনন্দলোকে পৌঁছানো।
একেকটা মানুষের কত রূপরহস্য থাকে, সেই রূপের কত রকমের সৌন্দর্য থাকে, প্রেক্ষিত থাকে, সেসবের ভিতরের সূক্ষ্মতায় পৌঁছানো দুরূহতম কাজ। সুজান বেনটনের (Suzanne Benton) সঙ্গে আমার পরিচয় কুড়ি বছর চার মাস হলো। শিল্পকর্মের সূত্রে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে মাত্র তিন বার। দু-বার ঢাকায়, এবার আমেরিকায়।
সুজান বেনটন ভাস্কর, ছাপচিত্রী, পেইন্টার, মাস্ক পারফর্মার... আমেরিকার ষাট দশকের নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম একজন।
আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করব... আমার উত্কণ্ঠার শেষ নেই। সুজানেরও প্রহর কাটে না। ও বলেছিল, তোমাকে আমি নিউ ইয়র্ক থেকে নিয়ে যাব আমার বাড়িতে। নিউ ইয়র্কে আমরা গুগেনহেইম মিউজিয়াম, মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম, হুইটনি মিউজিয়াম দেখব...। বার বার ফোন, ‘রফি আই কান্ট ওয়েট টু সি ইউ...’ যখন শুনলাম, নিউ ইয়র্ক থেকে সুজানের বাড়ি আড়াই ঘণ্টার ড্রাইভ... আমার বন্ধু কানিজ পরামর্শ দিলো, আমরাই ওর সঙ্গে দেখা করব রিত্জফিল্ডের বাড়িতে, বস্টন যাবার অথবা আসবার পথে। বয়স বিবেচনায় সুজানকে দৌড়াদৌড়ির সকল রকমের কষ্ট থেকে রেহাই দেওয়াটা আমাদের বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
অলবানি থেকে রিত্জফিল্ডের দূরত্বও আড়াই ঘণ্টার। কিন্তু আমরা পথ হারিয়ে পাহাড় নদী আর বিস্তীর্ণ প্রান্তরের কুহেলিকায় আচ্ছন্ন হয়ে সেই দূরত্ব চার ঘণ্টায় নিয়ে গেলাম। এর ওপর ছিল কানিজের নতুন মাইলেজ তত্ত্ব...! বাতাস কেটে গাড়ি চলে পাহাড়-প্রান্তর ডিঙিয়ে... কিন্তু গাড়ির মিটারে মাইল কমে না...! বন্ধু কানিজের ধারণা, পাহাড় এঁকেবেঁকে সাপের মতো আছে, তাই মাইল কমছে না...!
সুজানের জন্ম ১৯৩৩ সালের ২১ জানুয়ারি, নিউ ইয়র্কের অদূরে ব্রুকলিনে। সুজানের নিজের কথায়, ‘আমি কোনো দেবশিশু ছিলাম না। আবার স্বাভাবিক সাধারণ শিশুও ছিলাম না। কিন্তু স্বাধীনভাবে জীবন-যাপনে বিশ্বাসী আমার মা আমাকে আগলে রাখতেন তাঁর ছায়াতলে সর্বক্ষণ। আমাকে তিনি নাচ শেখার স্কুলে পাঠিয়েছেন, আফ্রিকান নাচ। আমার আট বছর বয়সে পিয়ানো কিনে দিয়েছেন; যখন কিনা পিয়ানো কেনা অনেকটাই আমার মায়ের সামর্থ্যের বাইরে ছিল...!

‘যেদিন আমি কুইন্স কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট হলাম, সেদিন আমার হাই স্কুল শেষ না করা মায়ের সেই অপূর্ব অহংকারী সপ্রতিভ দীপ্তিময় মুখের অভিব্যক্তির কথা খুব মনে পড়ে—সেই দৃশ্য ভুলবার নয়। তখন আমি কুড়ি।
আমি নিউ ইয়র্কের একটি হাই স্কুলের আর্ট টিচার ছিলাম। আমার বিয়ের দু-বছরের মাথায় (১৯৫৮) গর্ভবতী হলাম। গর্ভবতী মহিলারা স্কুলে কাজ করতে পারে না। আমি আমার গর্ভ ধারণের বিষয়টি লুকিয়েছিলাম আমার শিল্পীসত্ত্বার ভিতরে। একসময় চাকরি ছেড়ে দিলাম...’
সুজানের বাড়ির প্রতিটি ঘর, স্টুডিও আমি ঠিক দেখিনি, আমি আসলে ঘরগুলো এবং স্টুডিও বইয়ের অক্ষরের মতো করে মনোযোগী ছাত্রের মতো করে পড়েছি। একেকটি ঘর পড়বার পর অন্য একটি ঘর পড়বার অভিপ্রায়ে অস্থির উন্মাদনায় ছুটেছি। আমার শরীরে তখনো পিয়ানোর মূর্চ্ছনা, নিজের আর্ত আনন্দিত মনটাকে যেন ছুঁতে পারছিলাম। এবং পুরো ভ্রমণটা হয়ে উঠছিল শিল্পের মতন...!

শনিবার : এপ্রিল ২৬, ২০১৪
ভালো লাগল আজ।
সকাল থেকে সারাদিন সন্ধ্যে পার করলাম অ্যাঙ্কর স্টুডিওতে। নতুন কাজ নতুন সম্ভাবনা, নতুন উদ্দীপনা। কাজ শেষে মিশিগান অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে ওয়কার স্ট্রিটে কর্নার বেকারিতে টোমেটো স্যুপ, গ্রিলড স্যান্ডোউইচ আর কাচের পাশে বসে শহর দেখা। হাতের ব্যথাটা ভালো হবে কবে?
আজ অনেক ঠাণ্ডা ছিল। হাড়-কাঁপুনে ঠাণ্ডা।

রবিবার : এপ্রিল ২৭, ২০১৪
শিল্পকর্মের ভাষা বদলেছে। আজকাল ‘প্রদর্শনী’কে ‘প্রজেক্ট’ বলা হয়। বিশ্বের সমকালীন শিল্পভাষার সঙ্গে আমাদের যোগ তেমন একটা নেই। ‘আর্ট সামিট’, ‘আর্ট ক্যাম্প’, ‘আর্ট ওয়ার্কশপ’সহ নানা ধরণের কার্যক্রম আমাদের দেশে ঘটে চলেছে বিরামহীনভাবে। এতে করে দেশের তরুণদের ভিতর একটা উত্সাহের জায়গা তৈরি হয়েছে, এটাও কম কথা নয়।
তরুণেরা নতুন নতুন চিন্তার ভিতর দিয়ে নতুন নতুন বোধ তৈরি করছেন। আমার আশা, একদিন যোগ্য কিউরেটিংয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্পকলাও বিশ্ব সমকালীনতার মধ্যে যোগ হবে। এবং আজকের তরুণদের চেষ্টা নিশ্চিত যথাযথ সম্মান পাবে।
গিয়েছিলাম ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর Cobb Hall-এ Chiristina Mackie -এর ‘Colour Drop’ নামের প্রর্দশনী দেখতে।
বর্তমানে শিল্পকর্ম ঠিক কোন ইঙ্গিতে দর্শকের কাছে পৌঁছুবে সেই ‘পৌঁছুনোর মনস্তত্ত্ব’ নিয়ে সমকালীন শিল্পীরা বেশ ভাবেন। দর্শকের যাতে করে বুঝতে অসুবিধে না হয় তার জন্য আলাদা টেক্সট থাকে। এক্সিবিশন ফ্লায়ারে আলাদা করে বিশদ ব্যাখ্যা থাকে পুরো প্রজেক্টটির ওপর। অভিনন্দন Chiristina Mackie

মঙ্গলবার : এপ্রিল ২৯, ২০১৪
‘...আমি ঘরকুনো মানুষ। কোনো পার্টিতে আমন্ত্রিত হলেও যেতে চাই না, যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি জানতে পারছি সেখানে ঠিক কী কী হচ্ছে... আমি ঘরে বসে থাকতেই পছন্দ করি এবং আমার বেডরুমের মনিটরে প্রতিটি পার্টির মুহূর্তগুলো দেখি...।’
—অ্যান্ডি ওয়ারহোল

রবিবার : মে ৪, ২০১৪
পরশু রাত জেগে আব্বাসউদ্দিনের ভাটিয়ালি গান শুনছিলাম লো ভলিয়্যুমে। ‘ও নদীর কূল নাই... কিনার নাইরে... আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাবো কাহারে শুধাইরে...’ এমন মাটির সুর মন ভিজিয়ে দেয়। যেন অনন্ত হাওয়া পাড়ি দিয়ে সেই গানের কথাগুলো আমার কানে পৌঁছুচ্ছে। খেয়াল করলাম—বাইরে হাওয়ার প্রবল ঝাপটা এবং বৃষ্টির দাপাদাপি। শিকাগো এসে অনেক পুরোনো ও ছেলেবেলাকার কথা মনে হয়।
বর্ষাকলে হাত-পা গুটিয়ে জানালার পাশে বসে থাকতে হতো। কখনো বড়শিতে ভাত গেঁথে জানালা দিয়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম। কাগজের নৌকো বানিয়ে ফেলে দিতাম জলে। জলের তোড়ে সে নৌকো তখনই ডুবে যেত। তবু নৌকো বানানো চলত অবিরাম।
একাত্তরে গ্রামে ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস। তখন আমার ছয় বছর, পদ্মায় দেখতাম—আমার চেয়েও বয়সে ছোট ছেলেমেয়ে কলাগাছের গুড়ি, হাঁড়ি-কলসি ধরে সাঁতার কাটছে। সে পদ্মা সমুদ্রসম, অপর প্রান্ত দেখা যেত না। একটু বড়রা নদীতীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের বেঁকে যাওয়া শাখা থেকে ঝাঁপ দিত পদ্মার বুকে। আরো দূর দিয়ে ভুট-ভুট করে কালো ধোঁয়া ছেড়ে লঞ্চ যেত। সেই দূরের লঞ্চটি একটু পরে দিগন্ত রেখায় মিলিয়ে যেত। শুধু ধোঁয়ার রূপটি হাওয়ায় ভাসত।
তখন আমিও সাঁতার শিখেছি খালাদের পিঠে চড়ে। খালা নাইতে নেমে বলত, ‘দু-কাঁধে হাত দিয়ে থাকবি, আমি যখন সাঁতার কাটব, তুই দুই পা নাড়াবি...।’ এত বছর পর আজ আইভি খালার কথা মনে পড়লো! জাঁহাবাজ সুন্দরী আর ডাকা-বুকো ছিলেন তিনি। মাছ ধরা শিখেছি একটু পরে। বড়শিতে কেঁচো গেঁথে মাছ শিকার!
কুষ্টিয়ার গড়াই নদী পার হলেই হরিপুর, কয়া, কালোয়া আর রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ। পদ্মার তীর ঘেঁষে সেই কালোয়া গ্রামটি এখন নেই, পদ্মায় বিলীন হয়েছে। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়ি ছিল মাটির। মাটির ডোয়া (মেঝে), দরমার বেড়া, ওপরে খড়ের কিংবা ঢেউ-খেলানো টিনের চাল। মূল কাঠামো বাঁশ কিংবা শালের খুঁটির।
আম জাম নারকেল সুপারি গাছ ছিল প্রচুর। হেঁসেল ঘরের পেছনে ছিল বিশাল বাঁশঝাড়। ঝাড়ই বলতাম, বাগান নয়। সেই বাঁশের ঝাড়ের ভয়ে রাতে ঘুম হতো না। ওখানে ভূত-পেত্নী আছে। ঘন ঝাড়ের নিচ দিয়ে মানুষেরা খুব সমীহ করে যাওয়া-আসা করে। কেউ কেউ ফিট হয়ে যেত আচানক। তখন ভূত নামানোর ওঝা ডাকতে হতো। একদিন ওঝা বাবা আমার আম্মাকে বলল, ‘তোমার ছেলেটার ওপর পরীর নজর আছে..!’ ওঝা বাবার কথা শুনে আমার সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, ডাংগুলি খেলা সব বন্ধ হলো। ওইদিনই মনে মনে ঠিক করেছিলাম, ওই ওঝা বাবাজিকে জীবনেও ক্ষমা করব না! করিও নি..!
পরে দেখেছি, ওই গ্রামের মানুষের জীবন ভূত-পেত্নী দিয়ে ঠাসা। আজ মনে হয় এসব থেকে কত কত দূরে চলে এসেছি। সত্যি কি দূরে আসতে পেরেছি...?
ছবিটি বেশ রহস্যের...! হাইডপার্কের সাউথ কর্নেলে ‘ক্যারোলান’ নামের এই বাড়িটির করিডোরেও ভূত-টূথ আছে নাকি? শিকাগোতেও ভূত...!
ছবিটি তুলেছিলাম লম্বা করিডোরের, পারস্যের রকমারি ডিজাইনের কার্পেটে মোড়া করিডোর, কোথাও কেউ ছিলও না—কিন্তু একটি অদৃশ্য মানবের অর্ধেক জুতো এলো ছবিতে! শিকাগোর ভূতেরা জুতোও পরে নাকি...! ইন্টারেস্টটিং...!

আমেরিকার শিকাগো শহরে এসেও শুনেছি ভূত-পেত্নীর কাহিনি। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা হাইডপার্কের অনেক বাড়িতেই আছে প্রেতাত্মাদের আনাগোনা! কোনো এক প্রেতাত্মা হাইডপার্কের এই বিল্ডিংয়ে একটি অল্পবয়েসি মেয়ের কাছে এসে বেঁচে থাকা জীবনের গল্প করে, সাহায্য চায়, নাকি সুরে গান গায়...! এখানে আমার একটা ভীষণ প্রাণোচ্ছ্বল বন্ধু আছেন, অসীম সাহস তার, বাহুজোরও প্রবল মনে হয়,—কিন্তু রাতে ‘ভূতের ভয়’ বাহুবল থেকেও প্রবল। আসলে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের জীবন হলো ভূত-পেত্নীতে ঠাসা।

শুক্রবার : মে ৯, ২০১৪
শিল্পী নীলিমা শেখের চিত্রকর্মের একটি অসাধারণ প্রদর্শনী দেখে এলাম শিকাগো আর্ট ইনস্টিটিউটে। মাত্র ৮টি পেইন্টিং নিয়ে মিউজিয়ামের বিশেষ প্রর্দশনী।

শনিবার : মে ১০, ২০১৪
অসাধারণ মিষ্টি একটি ছোট্ট কিন্তু প্রাণময় শহর ম্যাডিসন। উইসকন ইউনিভার্সিটির অল্পবয়েসি ছাত্র-ছাত্রীদের যে প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস সামান্য সময়ের জন্য দেখেছি তা অসমান্য। জয় মানুষ...
ম্যাডিসন ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের চারপাশ জুড়ে প্রতি শনিবার ‘চাষিবাজার’ (ফার্মাস মার্কেট) বসে। ম্যাডিসনের আশপাশের এলাকা থেকে চাষিরা জড়ো হন তাদের উত্পাদিত পণ্য নিয়ে। উইসকনসিন মূলত ডেইরি এলাকা। শুনেছি এখানকার ‘চিজ’-এর সুনাম আমেরিকা জুড়ে। মেলায় তাই দুগ্ধজাত দ্রব্যের বিকিকিনি হয় দেখার মতো। পুরো ছোট্ট ম্যাডিসন শহরের প্রধান সড়কও চাষিবাজারে আসা মানুষগুলোর দখলে চলে যায়... অপরূপ সেই দৃশ্য।
ম্যাডিসন মিউজিয়াম অব কনটেমপোরারি আর্টে (MMoCA) এক তরুণ শিল্পীর কাজ দেখে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। উপস্থাপনাধর্মী শিল্পকর্মের ভিতর শিল্পীর রসবোধের অনন্যসৌন্দর্য দারুণভাবে উপভোগ করেছি।
ম্যাডিসন মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টে (MMoMa) গিয়ে সংগতভাবেই বসে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর—কিছু প্রশ্ন এবং আফসোস হলো। শেষটায় নিরুদ্বেগ এক শান্তি নিয়ে বেরিয়ে এলাম পথে...

রবিবার : মে ১১, ২০০৩
ঘরকুনো স্বভাবের ভিতরমহলের মানুষ আমি। সারাক্ষণই মরমি সমীক্ষণে মেতে থাকি—আমার নিবিড় বন্ধুসংখ্যা অতি অল্প। তেমন একজন বন্ধু ভিতরমহলা থেকে বের করে উইসকনসিনের ক্যাপিটল—ম্যাডিসনে নিয়ে গিয়েছিল। মুগ্ধতায় কেটেছিল দুটি দিন। আমার স্নায়ব সংবেদনে দুটি দিন এতই গভীর দাগ কেটেছিল যে সেসব মুগ্ধ স্বরক্ষেপণের পুনারাবৃত্তি করতেও ভালো লাগে।

শনিবার : মে ১৭, ২০১৪
আরকানসাস ইউনিভার্সিটির ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টে গিয়ে আমাদের চারুকলার কথা মনে এল। এর আর্কিটেকচারাল ডিজাইনও আমাদের বেশ কাছাকাছি। এখানকার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টের ছাত্রদের কাজের থেকে ভিন্ন, অন্যরকম। এরা পরিশ্রমী, উদ্যোমী এবং উত্সুক। ঐতিহ্যের প্রতি এখানকার ছাত্রদের রয়েছে কৌতূহল, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। যা আমেরিকার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টে নেই বললেই চলে। নিবিড়, ঘন নির্জনতার উচ্চারণের মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুভব করলাম কবিতার মতো করে।

বুধবার : মে ২১, ২০১৪
অ্যারিজোনা মরুভূমি পুরোটাই রুক্ষ নয়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঝোপ। পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে তিনতলা বাড়ির সমান সাউয়ারো ক্যাকটাসগুলো পেরিয়ে এসে সমতলে নামছি। শীফা বলল : রফি ভাই, একটা সাইন দেখেছ? আমরা ছয় হাজার ফুট থেকে সমতলে নামছি। এঁকে বেঁকে নামতে নামতে হঠাত্ একটা দৃশ্যের ভিতর ঢুকে ভয় পেয়ে গেলাম। দম আটকানো খোলা জায়গা।
আমরা মানুষেরা অট্টালিকার বাইরেও প্রকৃতির ভিতরেও বন্দি থাকি। পরিচিত আলো, পরিচিত হাওয়া, পরিচিত আকাশ। আবার কখনো পরিচিত গাছপালা, কখনো জঙ্গল, বুনো ঝোপ-ঝাড়, কখনো পাহাড়, কখনো বা সমুদ্র। কিন্তু হঠাত্ আপনি দেখলেন যে এসব পরিচিত এলিমেন্টস আপনার চারপাশে নেই আর! আপনি একটা বিশাল খোলা জায়গায় এসে পড়েছেন, যেখানে আকাশ-ভূমি-দিগন্ত রেখা সব একাকার। এই আকাশ, আলো-হাওয়া কিছুই আপনার চেনা নয়! তখন?
আমি একটা বড় রকমের ধাক্কা খেয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। শিরদাঁড়া ঠাণ্ডা হবার মতো ভয়। শুধু ধূসর, ধূসর আর ধূসরতা... এই ধূসরতার বুক চিরে রাস্তা চলে গেছে আসমানের ভিতরে! এরপর আর কিছু নেই! শীফাকে বলি : এটাই কি স্বর্গের রাস্তা?
মনে পড়লো শিল্পী জ্যাকসন পোলক ফিল্মের শেষ দৃশ্য।
বান্ধবীদের নিয়ে হুড উঠানো ক্যাডিল্যাকে এমন আসমানের পথেই তিনি চলেছিলেন। তারপর ফেড আউট...

বৃহস্পতি বার : মে ২২, ২০১৪
প্রায় তিন মাস আগে যখন শিকাগো আসি তখন আমার ল্যান্ডলর্ড ময়না পড়ানোর মতো করে বলেছিলেন, ‘‘সিয়ার্স টাওয়ার’ যেতে ভোলো না বাবা। ওই উঁচু বিল্ডিংটির ইঞ্জিনিয়ার বাংলাদেশের এফ আর খান।’ সিয়ার্স টাওয়ারে যাওয়া হয়নি এখনো। তবে আজ গিয়েছিলাম মিশিগান অ্যাভেনিউতে ‘দ্য জন হ্যানকক সেন্টার’-এ। এই বিল্ডিংটির ইঞ্জিনিয়ারও এফ আর খান সাহেব। চুরানব্বই তলার শীর্ষে উঠে সারা বিকেল থেকে রাত সাড়ে ন-টা অব্দি ছিলাম...! আক্কু (চৌধুরী) ভাই থেকে কথা ধার করে বলছি—‘জয় মানুষ’

মে ২৭, ২০১৪
রবার্ট হেইনকেইন। তাঁর শিল্পযাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে, লসএঞ্জেলেসে। সেইসময়ের আমেরিকার মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের ‘মোমের আলোর মতো ঠোঁটের অরাজকতার’ সংস্কৃতিকে দেখেছেন তিনি। তাঁর শিল্পকর্মে পল্লবে পল্লবে শাখা-প্রশাখায় ব্যাপ্তি পেয়েছে সেসব। সামান্য বিষয় এবং মেটেরিয়ালও হতে পারে শিল্পের অনুষঙ্গ—এ যেন বেহালায় ছড় টেনে টেনে সুর তুলে গহিনে যাওয়া!
নিত্যদিনের ম্যাগাজিনের অসংখ্য ইমেজ, ভোগ্যপণ্য, যৌনতা ও প্রচণ্ডতা, প্রিন্টেড ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সস্তারুচি আর বেপরোয়া দাম্ভিকতার মধ্যে খুঁজেছেন রসবোধ! দুর্নীতি, খুন-ভায়োলেন্স, নষ্ট রাজনীতি আর যৌনগন্ধমাখা শরীর যখন সমাজের গায়ের আরেক জামা হয়ে সেঁটে থাকে নিজের গায়ে তখন সে গন্ধ ধুয়ে যেতে প্লাবনের মতো বৃষ্টি দরকার। হেইনকেনের শিল্পকর্ম দেখে এমনটি মনে হয়েছিল আমার।
‘দুলতে দুলতে মাটিতে শিকড় রেখেও হাওয়ায় যতদূর উড়ে যেতে পারে গাছ—একজন শিল্পী তারচে বেশিই অতিক্রম করতে পারে সীমার সীমানা। হেইনকেনের শিল্পকর্ম দেখতে দেখতে এমনটিই মনে হচ্ছিল। রবার্ট হেইনকেইন (Robert Heinecken) আমেরিকান কন্সেপচুয়াল এবং পপ শিল্পী। জন্ম ১৯৩৩ সালে। পপ শিল্পী হিসেবে এতদিন জানতাম এঁদেরকে—রিচার্ড হ্যামিলটন, পিটার ব্লেক, জেসপার জোনস, লিসেনস্টাইন, রবার্ট রোজেনবার্গ, অ্যান্ডি ওয়ারহোল, ডেভিড হকনি।
কিন্তু এবার মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট, মোমাতে হেইনকেনের রেট্রোসপেক্টিভ না দেখলে তিনি অধরা থেকে যেতেন অন্তত আমার কাছে। ওয়ারহোলদের সমসাময়িক হয়েও নিজেকে তেমন করে প্রকাশ করেননি কেন? মনের মধ্যে খচখচ করছে তাই। ২০০৬ সালে হেইনকেনের মৃত্যুর পর এটিই তাঁর প্রথম রেট্রোসপেক্টিভ, যা মোমা আয়োজন করেছে, এই এপ্রিলে। হেইনকেন নিজের জীবনটি উত্সর্গ করেছিলেন শিল্পসাধনায় এবং অধ্যাপনায়।

শনিবার : মে ৩১, ২০১৪
আজ আমার ফ্লাইট বিকেল পাঁচটায়। দেশে ফিরে যাচ্ছি। আহ্...
মিহির চক্রবর্তীর একটি লেখার কয়েকটি লাইন মনে পড়ছে খুব করে।
‘...বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ গণ্ডি পেরিয়ে সে যখন পথে এসে দাঁড়ালো তখন বসন্ত।
মনে আছে, সমস্তদিন বন্ধুবান্ধবী মিলে অফুরন্ত আড্ডা দেবার পরে একে একে সকলকে বিদায় অর্থাত্ বাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসার পরে, একটু বেশি রাতে, সে একা দাঁড়িয়েছিলো প্রায়-নির্জন ফুটপাথের ওপর একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে। মনে আছে, সে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলো : কোন্ দিকে, এবার?...’
শাদা বরফের স্তব্ধতা ভেঙে পেয়েছিল ভাষা
খুঁজে উদগ্রীব চেতনা...
বিদায় ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো
বিদায় প্রিয় বন্ধুসকল, প্রিয় শিকাগো।

ব্যবহূত সকল ছবি লেখকের সংগ্রহ থেকে নেওয়া

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১১
ফজর৫:১০
যোহর১১:৫২
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:৩০সূর্যাস্ত - ০৫:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :