The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

ভ্রমণ

ফসলের ঘ্রাণঅ্যামিশ গ্রামে

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

ঠিকানা বদলানো মানুষ কি নিজেও কিছুটা বদলায়? হয়তো জীবন তাদের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে বলেই ঠিকানা বদলাতে হয়। দার্জিলিংয়ের তিব্বতি রিফিউজি ক্যাম্পে গিয়ে এমন একটা অনুভূতি হয়েছিল অনেক দিন আগে। এবার এসেছি মানচিত্রের পুরো উল্টো দিকে নীল চোখ আর বাদামি চুলের ঠিকানা বদলানো এমন মানুষদের গ্রামে। গ্রামে ঢোকার মুখে হাটের মতো একটা জায়গা। সেখানে সারি সারি দোকান। তাতে পসরা সাজানো, ক্রেতার ভিড়ও কম নয়, শুধু বিক্রেতা নেই। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখি, অনেকে পকেট থেকে টাকা রেখে জিনিস তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম, এর নাম বিশ্বাস।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীল লোহিত নামে লেখা ‘নিরুদ্দেশের দেশে’ বইতে এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। নীলু পাহাড়ের পাশ দিয়ে ফিতের মতো নদী পেরিয়ে যে গ্রামে যায় সেই গ্রাম মানুষের স্বপ্ন দিয়ে তৈরি। সেখানে মুদ্রার প্রচলন নেই। কেউ তার খেতে শস্য ফলায়, অন্যজন কাপড় বোনে আর নিজেদের মধ্যে বিনিময় করে। সবাই ঘরের দরজা রাতে খোলা রেখেই ঘুমায়। সেই গ্রামে প্রবেশের মুখে একটা ব্ল্যাক বোর্ড আছে। সেই বোর্ডে পথিকেরা চক-খড়ি দিয়ে যা ইচ্ছে তাই দু-এক লাইন লিখে যায়, পরেরজন এসে তা মুছে দিয়ে আবার নতুন কোনো কথা লেখে, কখনো বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় অক্ষর। অর্থাত্ অমরত্বের প্রত্যাশাহীন সব শব্দ। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে সেই দিকশূন্যপুর গ্রামের সবাই একসময় শহুরে মানুষ ছিল। ম্যাটেরিয়ালিস্টিক জীবনের এক একজন সফল মানুষ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জীবনের প্রতি বিরক্ত হয়ে ঠিক করেছিলেন খুব সরল জীবন বেছে নেবেন। সেই মানুষেরা মিলে তৈরি করেছে দিকশূন্যপুর গ্রাম।
নীল লোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) যদিও কল্পনা করে লিখেছিলেন অমন গ্রামের কথা কিন্তু আমি আর আমার বন্ধু দিয়া সত্যি সত্যি এমন একটা গ্রামের খোঁজ পেয়েছি খোদ আমেরিকায়। তাও খুব দূরে কোথাও নয়, নিউ ইয়র্ক থেকে মাত্র ৩ ঘণ্টার পথ। ফিলাডেলফিয়ার আপার ডার্বি থেকে থার্টিয়ে বাস স্টপেজে নেমে এম ট্র্যাক ট্রেনে উঠেছি। ল্যাংকেস্টারে এসে ২০ মিনিটের রাস্তা ‘বার্ড ইন হ্যান্ড’। ট্রেন আর বাস বদলে যাওয়ায় আমাদের প্রায় ৫ ঘণ্টা লাগল পথে। এমন লম্বা জার্নিতে সবাই সাধারণত কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়। কিন্তু পাওলি পার হবার পর দিয়ার উচ্ছ্বসিত শব্দের স্রোতে তা আর সম্ভব হয়নি। এরপর পিটসবার্গ স্টেশন ক্রস করে ল্যাংকেস্টার পর্যন্ত এক মুহূর্েতর জন্য নিজেই চোখ ফেরাতে পারিনি জানালা থেকে। এক-একটা স্টেশন পার হচ্ছে আর আমরা ঢুকে যাচ্ছি অধিক জনমানবহীন গাঢ় সবুজ ফসলের খেত, শূন্য প্রান্তরের বুকের ভেতর। পৃথিবীর এমন কোনো ভ্রমণকাহিনি পাওয়া যাবে না যেখানে রাস্তার দুপাশের দৃশ্য লেখককে মুগ্ধ করেনি। সেখানে আমরা তো মুগ্ধ হতেই এসেছি। আমেরিকা আসার পর এই প্রথম গ্রাম দেখছি, জনমানবহীন প্রান্তর আর পথের পাশে ফলের গাছ। এ দেশে বনভূমি বেশির ভাগ হাতে তৈরি, তাই অধিকাংশ শহরের রাস্তার দুপাশে যা দেখা যায় তা পরিকল্পিত ও কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায়, সব দেখতে প্রায় একই রকম। এভাবে গাছ লাগানোর পেছনে অবশ্য যুক্তি রয়েছে। ম্যাপল, উইলো আর রেডবাডজাতীয় গাছগুলো সব ঋতুতে বেঁচে থাকে আর গড়নটা হালকা বলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিটা কম হয়। কিন্তু ল্যাংকেস্টারের পথের পাশের ওক, ম্যাগনোলিয়া, আজলা, চেস্টনাট আর অ্যাপেল গাছেরা মানুষের চেয়ে প্রকৃতির ইচ্ছেতে জন্মেছে বেশি। সেই সব গাছে বসা কাঠবিড়ালির ছবি তোলার চেষ্টা করে দেখেছি, ট্রেনের গতিতে ঝাপসা দেখায়। বাংলাদেশের একটি অঞ্চলে বিড়ালকে মেকুর ডাকা হয়। আমার এক বন্ধু কাঠবিড়ালির বাংলা নামকরণ করেছে তক্তামেকুর। দিয়া অনেক বছর হলো এ দেশে আছে, তক্তামেকুর জাতীয় শব্দ শুনে সে এতই মুগ্ধ যে কাঠবিড়ালি দেখলেই ট্রেনের ভেতর থেকে তক্তামেকুর বলে ডাকছে। ট্রেনের শব্দে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হরিণ চমকে তাকাচ্ছে। পুরোপুরি দেখে ওঠার আগেই আমরা সরে যাচ্ছি অন্য সবুজের কাছে। ঘণ্টা দেড়েকের সেই অসহ্য সুন্দর পথ দিয়ে আমরা ল্যাংকেস্টার স্টেশনে পৌঁছলাম। নেমেই মনে হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি সময়ে চলে এসেছি। অনেক পুরনো এই স্টেশন। নিউ ইয়র্ক থেকে হ্যারিসবার্গের যোগাযোগ এই স্টেশন দিয়ে। তাই বলা হয় কি-স্টোন সার্ভিস। ১৮৩৪ সালে তৈরির পর ১৯২৯ সালে সংস্কার করে নির্মাণ করা হয় বর্তমানের এই লাল রঙের বিল্ডিং। স্টেশনে এসে প্রথমেই চোখ আটকে যাবে এক প্রাগৈতিহাসিক কাঁটা ঘড়ির শরীরে। এখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে বার্ড ইন হ্যান্ড ২০ মিনিটের পথ। তবে আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। ফোনে যে আমাদের গাইডের কাজ করেছে সে সামান্য কিছুটা বোঝাতে বাকি রেখেছিল আর অতি উত্সাহে বাকিটা ভুল আমরা নিজেরাই বুঝেছি।
পথ খুঁজে পাওয়ার পর বুঝতে পেরেছি পথ হারিয়ে যাওয়াতেও কিছু একটা প্রাপ্তি থাকে। ল্যাংকেস্টারের এই গ্রামের মানুষেরা শহুরে মানুষের দৃষ্টিতে অন্যরকম এক জীবন যাপন করে। সেই যাপিত জীবনে অনেক কিছু নেই, আবার এমন অনেক কিছু রয়েছে যা কসমোপলিটন শহর এমনকি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবনেও এখন অনুপস্থিত। প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক আর মানুষের প্রতি বিশ্বাস। বার্ড ইন হ্যান্ড গ্রামের মানুষেরা সংখ্যায় অল্প হয়েও বেশ কয়েকটি কারণে আলোচিত বলেই এত দূর তাদের দেখতে আসা। পাশের গ্রাম প্যারাডাইজ, তার আগের গ্রামের নাম ইন্টারকোর্স। বার্ড ইন হ্যান্ড সাইনবোর্ডের নিচে একটা ছবি, হাতের ওপর পাখি বসে আছে। দেখেই ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে নেমে গেলাম, বুঝলাম ঝামেলা হয়েছে। এটা আসলে ওয়েলকাম গেট, গ্রাম কয়েক মাইল দূরে। আর এমনই এক জায়গা, নিউ ইয়র্কের মতো বাস, ট্রেন, ট্যাক্সি কিছুই নেই। মাইলের পর মাইল শুধু উঁচু-নিচু ফসলের খেত। সেই খেতের ভেতর হঠাত্ হঠাত্ মাথা তুলে আছে এক-একটা খামারবাড়ি। বার্ড ইন হ্যান্ড লেখা দেখে যেখানে নেমেছি এটা একটা ফারমারস মার্কেট। সামনে বিশাল এক হর্স রাইড শো-কার রাখা আছে। মার্কেটে ঢোকার আগেই একটা ঘ্রাণ বাতাসে পাওয়া যায়। অনেকটা বৃষ্টির পর ফসল থেকে উঠে আসা ঘ্রাণ আবার মনে হয় সদ্য ঘাস কাটার ঘ্রাণ মিশে গিয়েছে। ভেতরে ঢুকে হাঁ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এত মানুষ, সাথে এত নীরবতা! দোকানের বিক্রেতা বেশির ভাগই মহিলা এবং তাদের প্রত্যেকের পোশাকের স্টাইল প্রায় একই। গলা থেকে পা পর্যন্ত লম্বা এক ছাটের ফুল স্লিভ জামা। মাথার পেছনে প্রত্যেকের গোলমতো স্কার্ফ বাঁধা। আর দোকানগুলো ভর্তি বিভিন্ন ফলমূল, হাতে তৈরি কেক-ব্রেড দিয়ে। অনেকগুলো স্যুভেনির শপ। এখানকার ফ্রেশ অ্যাপেল জুস আর স্ট্রবেরি পাই বিখ্যাত। উল্টো দিকে পপকর্ন ভাজা হচ্ছে নানা রকম ফ্লেভার দিয়ে। এই ফ্লেভারগুলো পর্যন্ত নিজেরা বাড়িতে বানিয়েছে। এইসব দোকানের নাম দেখে একটা ধারণা পাওয়া যায়। যেমন গ্র্যান্ড মাস বেকারি বা গ্রিন ফাদারস পপকর্ন শপ।
আমরা এসেছি ‘অ্যামিশ’ গ্রামে। এখানকার মানুষেরা খুব বেশি ফ্যামিলি ওরিয়েন্টেড। আর ২০০৬ সালের দুর্ঘটনার পর তাদের জেনোরোসিটির গল্প তো এখন পৃথিবীর সবাই জানে। সে বছর ল্যাংকেস্টারের ওয়েস্ট নিকেল ভিলেজে আকস্মিক বন্দুক হামলায় ৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় অ্যামিশদের প্রতিক্রিয়া ছিল মানুষের উদারতার যুগান্তকারী উদাহরণ। এই ঘটনা নিয়ে তৈরি ছবি ‘অ্যামিশ গ্রেস’ দেখে এক গভীর উপলব্ধি হয় মানুষের। চার্লস কাল রবার্ট নামে এক ড্রাইভার অ্যামিশ ভিলেজের মানুষের আতিথেয়তা গ্রহণ করে অ্যামিশদের ওয়ান রুম স্কুলে আকস্মিক হামলা চালায়। ১০ জনকে গুলি করে নিজেই আত্মহত্যা করে। চার্লসের শেষকৃত্যে তার পরিবার ছাড়া কোনো মানুষ ছিল না। তখন অবাক করে দিয়ে অ্যামিশ গ্রামের সব মানুষ উপস্থিত হয় শেষকৃত্যে। হত্যাকারীর পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলে, তারা তাদের সন্তানের হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছে। কেননা ‘ঈশ্বরই একমাত্র মানুষের বিচার করার ক্ষমতা রাখেন’। সত্যি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বানানো এই ছবির গল্পের মূল ম্যাসেজটা শেষে। ক্ষমা আর মানুষকে ভালোবাসার কথা।
যে মানুষরা নিজেদের সন্তানের হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে জানে সেই অ্যামিশদের গ্রামে এসে কিছুটা বেশি উত্সাহ থাকাই স্বাভাবিক। রাস্তা ভুল করে নেমে পড়েছি মার্কেটে। মার্কেট ঘুরে এক অ্যামিশ মহিলা দোকানদারকে দিয়া জিজ্ঞেস করল যাবার উপায়। তিনি ম্যাপ বের করে দোকানের ফোন থেকে বাস কাউন্টারে ফোন করলেন। নাম্বার দিয়ে জানালেন, একটা লোকাল বাস আছে এক ঘণ্টা পর। ট্যাক্সি না নিয়ে বাসে গেলে প্রায় ২০ ডলার সাশ্রয়। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সেই বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। ফার্মারস মার্কেট থেকে বেরিয়ে এক অ্যামিশ তরুণীও এসে যোগ দিয়েছে বাসের কিউতে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সাদা জামা পরিহিতা অবলীলায় রাস্তার পাশের ঘাসের উপর বসে পড়লো আর কাপড় নষ্ট হওয়ার ভয়ে রোদেই দাঁড়িয়ে থাকলাম দিয়া আমি। বাস এলে তিনজন একসাথেই উঠলাম। মেয়েটির নাম রেবেকা গ্লিক। সে যাবে নিজের গ্রামে আর সেই গ্রাম দেখতেই এখানে আসা। বাসে বসে রেবেকার কাছ থেকেই জেনে নিলাম সেখানে গিয়ে কী কী করতে হবে। বাস থেকে নেমে বিচ্ছিন্ন হবার আগ মুহূর্তে রেবেকা গ্লিক এমন একটা হাসি উপহার দিলো আমার বুকের ভেতর আটকে গেলো সেই দৃষ্টি। পুরুষ হলে আমি গ্রাম না দেখে তার পেছনেই হয়তো দিনটা পার করার দুঃসাহস দেখাতাম। সমবয়সীর পোশাকে কোথাও কোনো বাহুল্য নেই, অলংকারবিহীন মুখ আর এ বয়সেই অমন নির্মোহ দৃষ্টি আমাদের যেন আরো বেশি করে বস্তুবাদী প্রমাণ করে গেলো। যাবার আগে গ্রামে ঢোকার মুখেই সেই হাট যেখানে দোকানের বিক্রেতা তার পসরা রেখে চলে যায় অপরিচিত মানুষের প্রতি পরম বিশ্বাসে। আজ গুড ফ্রাইডে বলে মানুষের উপস্থিতি বেশি। এখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ভিলেজের রাউন্ড ট্যুরে। শত শত একর জমিতে জন্মাচ্ছে ভুট্টা। উঁচু-নিচু মাঠের ভেতরে ভেতরে বাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে গাছ আর বেঁধে রাখা গবাদিপশু। বেশির ভাগই ছাগল আর ভেড়া। আমাদের ঘোড়ার গাড়ির চালক ইসাক ওয়াগলা জানালেন, ১০ বছর বয়স থেকে সে এই গাড়ি চালিয়ে জীবিকা মেটায়। তার মা আর ছোট ভাই ভুট্টা চাষ করে। এই গ্রামের মানুষ ইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করে না। তাদের টেলিভিশন, মোবাইল ফোন নেই। কেননা এসব বস্তু ঈশ্বরের প্রার্থনা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে বলেই তাদের বিশ্বাস। কথায় কথায় চালক আমাদের অ্যামিশদের পবিত্র গ্রন্থ থেকে একটা উক্তি বললেন, করেনথিয়ান দুই-এর ৬:১৭-তে বলা হয়েছে, ‘Come out from among them and be ye separate, saith the Lord.’ অর্থটা এমন— ঈশ্বর বলেন, অনেকের ভেতর থেকে তুমি তোমার সত্ত্বায় ফিরে আসো।’ এই বাক্যটি অ্যামিশদের মূল প্রেরণা বলা যায়।
অ্যামিশদের প্রকৃতিবাদী সাধারণ জীবন-যাপনের কথা শুনেই সবাই তাদের দেখতে আসে, কিন্তু নিউ ইয়র্ক থেকে মাত্র ৩ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে সরাসরি এখানে এলে প্রথমে বিশ্বাস হয় না এই বৈপরীত্য। গ্রামের পথ ধরে ঘোড়ার গাড়িতে যেতে যেতে দেখেছি তারা সহজ, স্নিগ্ধ ও বিনয়ী। তিনশ বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রযুক্তি উপেক্ষা করে আসায় নিজেরাই প্রকৃতির অনিবার্য অংশ হয়ে গিয়েছে। প্রতিদিন শত শত শহুরে পর্যটকের হাতে ট্যাব, মোবাইল ফোন দেখেও কোন শক্তিতে এমন নির্মোহ হতে পারে মানুষ! খুব বিস্ময়ের! এই জায়গাকে বলা হয় ডাচ কাউন্টি। অ্যামিশরা অন্যদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে কিন্তু নিজেদের ভেতর কথোপকথনে এখনো জার্মানি ভাষার প্রচলন ধরে রেখেছে। অ্যামিশরা ল্যাংকেস্টারে এসেছিল ১৭১০ সালের দিকে। সুইজারল্যান্ডের অ্যানাব্যাপটিস্ট ক্যাথলিক চার্চ থেকে মূলত তাদের বিশ্বাসের উত্পত্তি। অ্যামিশ অর্থ ‘সত্যবাদী’ আর অ্যানাব্যাপটিস্ট মানে হলো ‘ব্যাপটিজম বিরোধী’। এদের প্রথম গোড়াপত্তন হয় ১৬৯০ সালের প্রথম দিকে সুইজারল্যান্ডে ‘জেকব আম্মান’-এর হাত ধরে। এই অ্যানাব্যাপটিস্টরা মূলত প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান। তবে বাইবেলের অনেক বিষয়ের সাথে প্রবলভাবে দ্বিমত পোষণ করে। সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা ব্যাপটিজম গ্রহণের বয়স নিয়ে। খ্রিস্টান ধর্মে নবজাতকের ব্যাপটিজম করে পাপমোচন করা বাধ্যতামূলক কিন্তু অ্যানাব্যাপটিস্টরা মনে করে, একটা শিশু জন্মগতভাবেই নিষ্পাপ। নিষ্পাপ শিশুর পাপ-পুণ্যের কোনো পার্থক্য ধারণ করার কথা নয়। তাই ওই বয়সে ব্যাপটাইজ করার চিন্তাটা অ্যামিশদের কাছে অগ্রহণীয়। তবে অ্যামিশদের প্রচলিত নিয়মানুসারে ষোলো বছরে ব্যাপটাইজ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই সুইস খ্রিস্টান সমাজ অ্যানাব্যাপটিস্টদের বাইবেলবিরোধী এ ধরনের কথাবার্তা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ধর্মের বিরুদ্ধে এমন দুঃসাহসিক কথা বলার জন্য সুইস সরকার তাদের উপর নির্যাতন শুরু করে। স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং পরে ‘অ্যামিশ নিধন’ নামে একটি বিশেষ পুলিশ বাহিনী তৈরি করে তাদের সুইজারল্যান্ড থেকে স্থায়ীভাবে বের করে দেওয়া হয়। তখন ঈশ্বরের কৃপাপ্রার্থী এই সম্প্রদায় আশ্রয় নেয় জার্মানিতে। কিন্তু জার্মানিতেও তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে সেই অনিশ্চিত জীবন শুরু হয়। নির্মোহ এক জীবনের জন্য ক্রমাগত অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে জায়গা বদলে বদলে ৪টি অ্যামিশ পরিবার প্রথম আসে ল্যাংকেস্টারে। এর এক দশক পরই আরো ২০টি পরিবার এসে যোগ দেয় তাদের সাথে। শুরু হয় ইউরোপ থেকে অ্যামিশদের এ দেশে এসে বসবাস। প্রধানত পেনসিলভেনিয়া, ওহাইও, ইলিনয়, আইওয়া, নিউ ইয়র্ক, মিজৌরি স্টেটে তাদের দেখা গেলেও অন্যান্য স্টেটে কমবেশি ছড়িয়ে আছে অ্যামিশ। অ্যামিশদের কয়েকটি বিষয় না বললে পার্থক্যটা ঠিক স্পষ্ট হয় না। তারা ঘোরতর প্রযুক্তিবিরোধী ও ধর্মীয় জীবন-যাপনের জন্য পরিচিত। তবে তাদের অন্যরকম দুটো প্রথা হলো ‘বান্ডেলিং’ আর ‘রামসপ্রিঙ্গা’। বান্ডেলিং চর্চাটা অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। বিয়ের আগে হবু বর ও কনে এক বিছানায় ঘুমাবে কিন্তু তাদের খাটের মাঝখানে কাঠের দেয়াল তুলে দিয়ে সেই খাট পৃথক করে দেওয়া হবে। এতে একে অপরকে দেখতে পারবে কিন্তু স্পর্শ করতে পারবে না। দুজনের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি আর ধৈর্যশক্তি বাড়ানোর অভিপ্রায়ে এমন চর্চা। এদিকে রামসপ্রিঙ্গাকে বলা যায় মতামতের মূল্যায়ন। পরিণত হওয়ার পর অ্যামিশ ছেলেমেয়েদের স্বাধীনভাবে জীবন-যাপনের সুযোগ দেয়া হয়। এক্ষেত্রে তারা নিজেদের গ্রাম ছেড়ে নাগরিক আধুনিক জীবন দেখার একটা সুযোগ পায়। ৫-৬ জন অ্যামিশ ছেলেমেয়ে মিলে নাগরিক জীবনে সমবয়সীদের সাথে কিছুদিন থাকতে যায়। দুরকম জীবন দেখার পর সে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কোন জীবনটা সে যাপন করবে। অ্যামিশ জীবন পরিত্যাগ করলে সে আর তার সমাজে স্থান পাবে না। যদিও বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই অ্যামিশ জীবনেই ফিরে যায়।
আমাদের ঘোড়ার গাড়ির চালকের মুখ থেকে এই অন্যরকম নিয়ম-কানুনের কথা শুনতে শুনতে আমরা অনেকখানি গ্রাম পার হয়ে এসেছি। এখানে রাস্তা পাহাড় কেটে তৈরি। ঢেউয়ের মতো খেলে যাওয়া প্রান্তর আর তার ভেতর বিচ্ছিন্ন এক একটা খামার বাড়ির অস্তিত্ব। অন্যান্য সব সমাজের মতো অ্যামিশদের জীবনেও বিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিয়ে সামনে রেখে তারা বিভিন্ন ধরনের উত্সব করে। ছেলেমেয়েরা যখন ষোলো বছরে পা রাখে তখন থেকেই এরা নিজেদের সঙ্গী খুঁজতে শুরু করে। সাধারণত বিশ-বাইশ বছর বয়সেই সবাই বিয়ে সম্পন্ন করে। তবে বিয়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘ। নিজেদের পছন্দমতো বর নির্ধারিত হবার পরই শুধু কনে নিজের থেকে তার বাবা-মাকে হবু বর সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সম্ভাব্য বর-কনেরা তাদের নামের তালিকা চার্চে লিখিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে এবং পরবর্তী রোববার বিশেষ অতিথিদের উপস্থিতি আর ভোজের মধ্য দিয়ে তালিকাভুক্ত বর-কনেদের নাম ঘোষণা করা হয়। চার্চ থেকে প্রকাশিত তালিকায় বর-কনের নাম নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই বর আর কনের অভিভাবকরা বিয়ের আয়োজন শুরু করে। কনের মা নিজের হাতেই তার মেয়ের বিয়ের পোশাক বানায়। বর এবং তার বাবা-মা চার্চের নির্দিষ্ট অতিথি তো বটেই, অ্যামিশ সমাজের অন্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও নিমন্ত্রণ করে অনুষ্ঠানে। খাবারটা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ থাকে, তবে বিয়ে হয় কনের কোনো আত্মীয় বাড়িতে। বিয়ের আগে একই ঘোড়ার গাড়িতে করে বর-কনে ঘুরে ঘুরে গ্রামের সবাইকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে আসে। যেকোনো মঙ্গল বা বৃহস্পতিবার বিয়ে হয়। বিয়ের পোশাক হিসেবে অ্যামিশ পুরুষরা পরে কালো লম্বা কোর্তা, মাথায় টুপি আর মেয়েরা নীল গাউন। মেয়ের বাড়ির প্রবেশদ্বার সাজানো হয় নীল ফুল ও কাগজ দিয়ে। অ্যামিশদের যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী চলে। তাদের প্রবিত্র গ্রন্থকে বলা হয় অর্ডনাং বা অর্ডার। ধর্মীয় ও সামাজিক নিয়ম মিলিয়ে তৈরি এই গ্রন্থ। এটি প্রত্যেককে বেদবাক্যের মতো মেনে চলতে হবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য যারা নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে বসতি গড়েছে, তাদের গ্রামে কোনো গির্জা তেমন চোখে পড়ে না। ধর্ম নিয়ে প্রদর্শিত কোনো বাড়াবাড়ি নেই। ধর্মের বাহ্যিক রূপের চেয়ে ব্যক্তিজীবনে ব্যবহারিক বিষয়টি প্রাধান্য পায় অ্যামিশদের কাছে। প্রতি রোববার কোনো বাড়িতে বা কমিউনিটি সেন্টারে গান গেয়ে আনন্দ করে তারা সময় কাটায়। তবে গানে কোনো রকম যন্ত্রসংগীত ব্যবহার করা অ্যামিশদের জন্য ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। উপাসনালয়ে নারী ও পুরুষ পৃথক দিকে বসে। নিজেদের গোত্রের বাইরে কোনো রকম আচার বা অনুষ্ঠানের কথা অ্যামিশরা ভাবতেই পারে না। তাদের নিজেদের পরিধি ছোট হওয়ায় আমিশরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো করে বুঝতে চেষ্টা করে। এই সম্প্রদায়ের মানুষদের কনফেশনটাও প্রচলিত খ্রিস্টানদের চেয়ে ভিন্ন রকমের। গির্জাগুলোতে সাধারণত দেখা যায়, বন্ধ দরজার ওপাশে কেউ একজন পাদ্রি অন্তরালে থাকেন। এপাশে কেউ নত হয়ে তার কনফেশন করে। কিন্তু অ্যামিশদের কনফেশন করতে হয় সবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। অভিযুক্ত মানুষটি তার পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশী সবার সামনে তার ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হয় এবং প্রতিজ্ঞা করে, একই ঘটনা আর কখনো সজ্ঞানে সে করবে না। অ্যামিশদের মধ্যেও সম্প্রদায়গত কিছু ব্যবধান রয়েছে। সব অ্যামিশ এক নয়। প্রত্যেকে তাদের সম্প্রদায়ের জন্য তৈরি সাবঅর্ডার মেনে চলে। তবে কয়েকটি বিষয়ে সব অ্যামিশকে একই নিয়ম পালন করতে হয়। যেমন প্রত্যেকে নন আমিশদের থেকে পৃথক জীবন যাপন ও প্রযুক্তিকে অস্বীকার করতে বাধ্য। পোশাকে বেল্ট, গ্লাভস, টাইয়ের মতো বাহুল্য কাপড় ব্যবহার নিষিদ্ধ। অ্যামিশ নারীরা শৌখিন কোনো কাপড় পরতে পারবে না। তাদের পোশাকে কোনো নঁকশা থাকবে না। বিবাহিত আমিশদের দাড়ি কেটে ফেলা ও নারীদের চুল ছোট করার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অ্যামিশদের শাস্তি দেয়ার নিয়মটা কঠিন। তারা বলে মেডাং বা শানিং। এঠা হচ্ছে কঠিন এক শাস্তি যা কমিউনিটি সদস্যরা মিলে কারো বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়। কাউকে হুমকি ও অনিরাপদ মনে হলে তাকে সমাজ থেকে পরিত্যাগ করে এক ঘরে করা হবে। মৃত্যু পর্যন্ত তার উপর এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। সম্প্রদায় ও পরিবারের কেউ কোনোভাবে তার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারবে না। অ্যামিশদের বাহন হিসেবে ব্যবহূত হয় ঘোড়া টানা গাড়ি যা ‘বাগগি’ নামে পরিচিত। বাগগি অ্যামিশদের প্রতীক বলা যায়। এক ঘণ্টার বাগগি ভ্রমণে আমাদের সাথে একটি ইহুদি পরিবার রয়েছে। সেই পরিবারের কনিষ্ঠ দুই সদস্য অনেক আগেই গাড়ির চালক ইসাকের পাশে বসেছে। গাড়ির ভেতর আমরা দুজন আর ইহুদি দম্পতি। একই সাথে রাস্তার দুপাশে চোখ রাখছি আর ইসাকের মুখ থেকে তাদের এসব নিয়ম-আচারের কথা শুনছি। ইসাক ঘোড়া চালাচ্ছে, দুই ক্ষুদে ইহুদি পর্যটককে সামলাচ্ছে আবার হাসি মুখে বলে যাচ্ছে এসব কথা। ওর ধৈর্য দেখে আমরা বিস্মিত। এক চাকার এক সাইকেল ঠেলে ঠেলে বয়স্ক একজন আমাদের উল্টো দিক থেকে আসছিলেন। ইসাক তাকে দেখে গাড়ি থামিয়ে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। সে তার টুপি বো করে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এক মুখ হাসি উপহার দিয়ে গেলো। আশ্চর্য সেই রেবেকার মতো হাসি। মানুষ পরিষ্কার হূদয় নিয়ে যখন হাসে তার এক আলাদা প্রকাশ রয়েছে এমন নিষ্পাপ দৃশ্য আর কিছু হয়তো হয় না। ল্যাংকেস্টারের ভেতর ঘোরার সময় একটা জিনিস খুব চোখে পড়েছে, উইন্ড মিল। বেশির ভাগ জায়গায় পানি তোলে এই উইন্ড মিল দিয়ে, তবে যেখানে গ্যাস রয়েছে, তারা পানির পাম্পসহ বিভিন্ন কাজে গ্যাস ব্যবহার করে। কৃষিকাজ করে জীবন-যাপনে এরা বেশি আগ্রহী। পুরুষ গবাদিপশু দিয়ে মাঠে ভুট্টা, তামাক, সয়াবিন, বার্লি, আলুসহ বিভিন্ন রকম শাক-সব্জির চাষ করে। আর মেয়েরা কুয়ো বা জলাধার থেকে পানি সংগ্রহ করে, কাপড় বোনে, মধু তৈরি করে, ফুল আর ফলের চাষ করে। অ্যামিশ মেয়েরা এ দেশের মতো কাপড় লন্ড্রিতে দেয় না, বরং হাতে ধুয়ে দড়িতে শুকিয়ে নেয়। আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানে তাদের আস্থা নেই। তাদের বিশ্বাস শারীরিক সুস্থতার পূর্বশর্ত হলো মানসিকভাবে সুস্থ থাকার পূর্ণ নিশ্চয়তা। অ্যামিশদের ধারণা পৃথিবীতে এত পাপ আর সমস্যার একমাত্র কারণ হলো প্রকৃতিবিরুদ্ধ হওয়া, প্রকৃতিকে ধ্বংস করা। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানেই হলো ঈশ্বরের কাছাকাছি বসবাস। অ্যামিশরা বিশ্বাস করে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মানুষকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ করে দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে ঈশ্বরের সাথে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির।
পেনসিলভেনিয়ার আইন অনুযায়ী অ্যামিশরা সরকারকে প্রাপ্য খাজনা দিয়ে থাকলেও সরকারের কাছ থেকে বিনিময়ে অবসর ভাতা, চিকিত্সা ভাতা কিংবা স্কুল ভাতার মতো কোনো সুবিধা গ্রহণ করে না। ভিলেজের ওয়ান রুম স্কুলে এইট গ্রেড পর্যন্ত তারা পড়ালেখার সুযোগ পায়। খুব সাদামাটা এক কক্ষের স্কুল ঘর নিজেদের এলাকাতেই রয়েছে। এক ঘণ্টার ভিলেজ ট্যুরে আমরা দেখার সুযোগ পেয়েছি ঠিকই কিন্তু খুব একটা ছবি তোলা হয়নি। ছবি তোলার বিষয়ে এখানে কিছু কঠোরতা আছে। এই নিয়মের প্রতি অসম্মান মানে যাদের দেখতে এতদূর আসা তাদের অশ্রদ্ধা করা। ইসাকও আমাদের অনুরোধ করেছে গ্রামের ভেতর যেন ক্যামেরা বের না করি। বাগগি রাইডে বার্ড ইন হ্যান্ডের প্রায় অর্ধেকটা দেখা হয়েছে। ইসাক আমাদের আবার নামিয়ে দিলো সেই হাটের মতো জায়গাটায়। সুনীল তার নিরুদ্দেশের দেশে লিখেছিলেন ‘আমি মাঝে মাঝে সেই জায়গাটার কথা ভাবি, কিন্তু আমারও যাওয়া হয়ে উঠে না। কেউ আমাকে ডেকে নিয়ে যায় দক্ষিণে, কেউ উত্তরে। যার অস্তিত্বই জানা নেই তাকে না পাবার ত কোন দুঃখ থাকে না।’
এই গ্রামে আসার আগে সত্যি অনেকবার অনেক রকম করে ভেবেছি এমন সরল জীবনের মানুষদের কথা কিন্তু এবার আমাদের দুঃখ জন্মেছে। এমন শান্ত গ্রাম ও প্রকৃতিবাদী মানুষ দেখে ফেরার পর নিজেকে বড় বেশি বস্তুগত ভোগবাদী মনে হয়। মনে হয় এই শান্ত জীবনে আমি বহিরাগত হয়ে এসেছি। সুনীলের নীলু ইচ্ছে হলেই নদী পার হয়ে দিকশূন্যপুর যেতে পারত কিন্তু আমেরিকার ল্যাংকেস্টারের অ্যামিশ ভিলেজে আমার হয়তো দ্বিতীয়বার আর আসা হবে না। আমি এখানে শঙ্খ ঘোষের সেই কবিতার মতো। ‘আমার কথা কি বলতে চাও না? নিশ্চিত তুমি বহিরাগত। উঁচু স্বর তুলে কথা বলে যারা, জেনে নাও তারা বহিরাগত। মাঠে মাঠে ধরে যেটুকু ফসল সেসবও এখন বহিরাগত। বর্শাফলকে বিষ মেখে নিয়ে কালো মুখোশের আড়ালে বহিরাগতরা এসে ঠিক ঠিকই বুঝে নেয় কারা বহিরাগত।’
অ্যামিশদের গ্রাম থেকে ফিরে আসার সময় বুঝেছি অমন ফসলময় শান্ত জীবনে আমরা বহিরাগতই। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, আমাদেরও ট্রেন ধরার তাড়া রয়েছে। ফেরার পথে সেই অ্যামিশ ফার্মার মার্কেট পেরিয়ে আসার সময় দেখলাম, দোকান বন্ধ হচ্ছে। মহিলা বিক্রেতারা দিনের বেঁচে যাওয়া ফলমূল গুছিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হয়তো আর কিছুক্ষণের ভেতর রেবেকার পরিবারের সবাই ঘরে ফিরবে। আমরা নিউ ইয়র্ক ফেরার আগেই রেবেকাদের বাড়ির মোমবাতি জ্বেলে রাতের প্রার্থনা শেষ হয়ে যাবে। বুঝলাম, সকালে পথ হারিয়ে না গেলে এমন একটা বাজার আমাদের কখনো দেখে যাওয়া হতো না। কখনো জানাই হতো না, রেবেকা গ্লেন হেসে উঠলে নারী হয়েও আমি মুগ্ধ হতে পারি। সন্ধ্যার মুখে আবার ল্যাংকেস্টার স্টেশনে এসেছি। ছায়ার ভেতর স্টেশনের লাল রং অধিক গাঢ় হয়েছে। ফিলাডেলফিয়ার ট্রেনে উঠলাম। চাইলেই হয়তো এমন জীবন আর আমরা বেছে নিতে পারি না। লোভ আর পণ্যের হাতছানি এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ঈশ্বর আমার মতো মানুষদের দেননি যা অ্যামিশদের দিয়েছেন।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ১৯
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০৩
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৩২
এশা৭:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৩৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :