The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

অন্যদিগন্ত

ডাবলিনের লেখক জাদুঘরকল্পনা যেখানে বাস্তবের কাছে পরাজিত

শাহনেওয়াজ বিপ্লব

পৃথিবীতে কিছু বিস্ময় আছে, বাংলাদেশে বসে শুনলে যেটাকে কল্প-কাহিনিই মনে হবে। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন রাইটার্স মিউজিয়াম তার একটি। পৃথিবীর একমাত্র লেখক জাদুঘর এটি। বাংলাদেশে স্মরণীয় কোনো লেখকের নামে একটি মাত্র রাস্তা, পার্ক বা বিমানবন্দরের নাম দিয়ে যেখানে দায়িত্ব শেষ করা হয়, লেখকদের অপ্রকাশিত লেখা বা তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না; সেখানে গত ৩০০ বছর ধরে আইরিশ লেখকদের নিজের হাতে লিখে যাওয়া প্রত্যেকটি লেখা, তাঁদের লেখার কলম ও অনান্য লিখন-সরঞ্জাম, লেখার টেবিল, তাঁদের পঠিত বইগুলো, যে চেয়ারে বসে তাঁরা লিখতেন; এমনকি টেলিফোন আবিষ্কারের পর, ঘরের যে টেলিফোন থেকে তাঁরা বাইরে লেখক ও প্রকাশকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, সেসব টেলিফোন সেট পর্যন্ত অত্যন্ত সযত্নে সংরক্ষিত হয়েছে এই জাদুঘরে। আর সে জন্যেই বলা হয়ে থাকে, একজন কবি, কথাসাহিত্যিক বা নাট্যকারের অভিজ্ঞতা অপূর্ণ থেকে যাবে, যদি না আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন শহরে গিয়ে পৃথিবীর একমাত্র লেখক জাদুঘরটি দেখে থাকেন।
পৃথিবীর একমাত্র এই লেখক জাদুঘরের উদ্যোক্তা ঊনবিংশ শতাব্দীর আইরিশ লেখক-সাংবাদিক মরিস গরহাম [১৯০২-১৯৭৫]। ডাবলিন পর্যটন কর্পোরেশনের সহায়তায় তিনিই মূলত প্রচণ্ড পরিশ্রমে সারাজীবন ধরে অন্য আইরিশ লেখকদের সাথে নিয়ে লেখক পরিবারগুলোর সহায়তায় দুষ্প্রাপ্য সব লেখা ও লেখক-স্মৃতি সংগ্রহ করেন। তবে আজীবন লেখক জাদুঘরের সব লেখা ও লেখক-স্মৃতি সংগ্রহ করে গেলেও তাঁর জীবদ্দশায় লেখক জাদুঘরটি দেখে যেতে পারেননি মরিস গরহাম। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালে ডাবলিনের ১৮ পারনেল স্কয়ারে আঠারো শতকের এক পুরনো বাড়িতে স্থাপিত হয় ডাবলিন রাইটার্স মিউজিয়াম। যদিও প্রথম দিকে ডাবলিনে পর্যটক আকর্ষণ এবং পর্যটকদের সাথে আইরিশ সাহিত্য এবং আইরিশ লেখকদের পরিচয় করিয়ে দেবার প্রত্যাশা নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ডাবলিন রাইটার্স মিউজিয়াম, কিন্তু এটি এখন আয়ারল্যান্ড ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীর একমাত্র ও মহোত্তম লেখক-জাদুঘরের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
ডাবলিন রাইটার্স মিউজিয়াম লেখক জাদুঘর বলেই এতে লেখক আর লেখালেখি ছাড়া অন্য বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়নি। তাই লাইব্রেরিটি লেখকদের জীবন-যাপন গ্যালারি, তাঁদের সারা জীবনের লেখালেখির ধারাক্রম, লেখক কক্ষ—এ রকম নানা ভাগে সাজানো হয়েছে। এখানেই রয়েছে একই সাথে আইরিশ রাইর্টাস সেন্টার, আইরিশ নাট্যকার সোসাইটি, আইরিশ শিশুসাহিত্যিক ট্রাস্ট এবং আয়ারল্যান্ডের অনুবাদক সমিতির অফিসও।
সবচেয়ে যেটি উল্লেখযোগ্য ডাবলিন লেখক জাদুঘরের ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে—বর্তমানে জীবিত রয়েছেন এমন কোনো লেখককে জাদুঘরে জায়গা দেওয়া হয়নি। এমনকি খুব বিখ্যাত লেখক; যেমন সীমাস হিনি ১৯৯৫ সালে নোবেল পুরস্কার পাবার পরও ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁকে জায়গা দেওয়া হয়নি লেখক জাদুঘরে। জীবিত অবস্থায় কাউকেই জায়গা দেওয়া হবে না, সে যত বড় বিখ্যাত লেখকই হোন না কেন, প্রথম থেকে এটিকেই মূলনীতি ধরে রাখা হয়েছে লেখক জাদুঘরের ক্ষেত্রে। গত ৩০০ বছর ধরে আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ও অবস্থানকারী লেখকদের প্রাধান্য দেওয়া হলেও জেমস জয়েস, বার্নার্ড শ, ডব্লিউবি ইয়েটস, জোনাথান সুইফট, স্যামুয়েল বেকেট, সীমাস হিনি—এ রকম খ্যতিমানদের, যারা আন্তর্জাতিকভাবে বেশি পরিচিত এবং যারা বিশ্বসাহিত্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাঁদেরকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর সে জন্যে লেখক ও তাঁদের লেখালেখি বা সাহিত্যকর্ম প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও সময় ভাগ করে নেয়া হয়েছে। লেখক জাদুঘরটিকে দুই ভাগে ভাগ করে প্রথম ভাগে প্রদর্শন করা হচ্ছে আইরিশ সাহিত্যের আদিযুগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লেখক ও তাঁদের লেখা। মূলত এ অংশে প্রদর্শিত হচ্ছে আইরিশ সাহিত্যের আদিকাল থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ে আইরিশ সাহিত্যের সব গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের ছবি, নানা লেখক-আন্দোলন এবং গুরুত্বপূর্ণ ও কম গুরুত্বপূর্ণ সব লেখকদের তালিকা। দ্বিতীয় ভাগে প্রদর্শন করা হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর খ্যাতনামা লেখকদের। তবে বিংশ শতাব্দীর খ্যাতনামাদের ভেতরও আবার সবচেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছেন জেমস জয়েস ও জোনাথান সুইফট। জেমস জয়েস সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেও জোনাথান সুইফট কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাননি। তার পরও সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলস বা গালিভারের ভ্রমণকাহিনিকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেওয়া হয়েছে এ জন্যে যে, ইংরেজরা আয়ারল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল বলে আইরিশরা সব সময় ইংরেজদের ঘৃণা করে এসেছে। গালিভারস ট্রাভেলসে জোনাথান সুইফট লিলিপুট বলতে আইরিশদের আর গালিভার বলতে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ইংরেজদেরই চিত্রিত করেছেন বলেই দাবি করে আইরিশরা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে এই দুর্দান্ত দ্রোহের প্রতীক হিসেবে গালিভার ট্রাভেলসের লেখক জোনাথান সুইফটকে বেশ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। জয়েস তাঁর ইউলিসিস আর সুইফট তাঁর গালিভারস ট্রাভেলস যেভাবে লিখেছিলেন তার ম্যানুস্ক্রিপ্ট ছাড়াও সংরক্ষিত আছে সামুয়েল বেকেটের ওয়েটিং ফর গডো, ডব্লিউ বি ইয়েটসের কবিতা, সীমাস হিনির কাব্যগ্রন্থগুলোর প্রথম সংস্করণ এবং প্যাট্রিক কাভানাগের গ্রেট হাঙ্গারের প্রথম সংস্করণ।
এছাড়া সংরক্ষিত আছে এডওয়ার্ড ম্যাক গুইরে, হ্যারি কেরনফ এবং মিখায়েল ফেরেল—এসব খ্যাতনামা শিল্পীদের আঁঁকা লেখক প্রতিকৃতি, রয়েছে বার্নার্ড শ-র অটোগ্রাফ দিতে অস্বীকার করে লেখা চিঠি এবং সামুয়েল বেকেটের চিঠিপত্র। ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে লেডি গ্রেগরির, আছে লেখক অস্টিন ক্লার্কের লেখার টেবিল, সামুয়েল বেকেটের টেলিফোন, মেরি ল্যাভিনের খেলনা ভালুক, অলিভার গোগারটির পাওয়া পুরস্কার ও ব্রেন্ডন বেহানের কলম, ধূমপান-পাইপ এবং টাইপরাইটার। জাদুঘরের গ্র্যান্ড সিঁড়ির শীর্ষে দোতলার বর্ধিত অংশে আছে মরিস গরহাম লাইব্রেরি হল। এখানে বিরল সব বইয়ের প্রথম সংস্করণ এবং সমালোচনামূলক কাজসহ সব বই জাদুঘরে রিজার্ভ রাখা হয়েছে এবং এই বিশেষ সংগ্রহ থেকে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
জাদুঘরের বেজমেন্টে রয়েছে লেখক আড্ডার ব্যবস্থা। সারা পৃথিবী থেকে রাইর্টাস মিউজিয়াম দেখতে আসা লেখক এবং আইরিশ লেখকদের আড্ডার জন্য রয়েছে একটি দারুণ রেস্টুরেন্ট। জাদুঘরের দোতলায় রয়েছে বইয়ের দোকান, যেখান থেকে জাদুঘরে স্থান পাওয়া লেখকদের সাহিত্যগ্রন্থ বা লেখকদের চিঠিপত্রের সংগ্রহ কিনতে পারবেন লেখক বা দর্শনার্থীরা। আর জাদুঘরের ওপরে ওঠার সিঁড়ি ঘেঁষে ডান-বাম উভয় পাশজুড়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের জীবন-যাপনের চিত্রমালা।
লেখক জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর কিউরেটরের দায়িত্বে আছেন রবার্ট নিকোলসন। তাঁর কাজ হলো, যখনই আয়ারল্যান্ডে একজন লেখকের মৃত্যু হবে তখনই তার জন্য লেখক জাদুঘরে কিছুটা জায়গা করে দেওয়া। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত গত ২২ বছরে সে দায়িত্ব তিনি বিশ্বস্ততার সাথে পালন করে চলেছেন।
পৃথিবীর একমাত্র এই লেখক জাদুঘরটি সারা বছর সব সময় খোলা থাকে।
ডাবলিন রাইটার্স মিউজিয়ামের খোলা থাকার চলতি মৌসুমের [২০১৪, গ্রীষ্মকালীন] সময়সূচি ঘোষিত হয়েছে ইতিমধ্যে :
মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা রাখা হবে, সারা সপ্তাহে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা, কেবল রবিবার ও সরকারি ছুটির দিন ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
আয়ারল্যান্ডকে বলা হয় সাহিত্যের রত্নগর্ভা। শুধু বিশ শতকেই সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন এই দেশটি থেকে চার জন। নোবেল পাবার তালিকায় ছিলেন প্রায় আরো দশ জন। আমাদের দেশের মতো কেবল বইয়ের কাগজে নয়, আইরিশ লেখকেরা বেঁচে আছেন তাদের জন্য সংরক্ষিত লেখক জাদুঘরে। দুই বছর আগে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন রাইটার্স মিউজিয়ামে গিয়ে দেখেছি, কী পরম নিষ্ঠার সাথে সংরক্ষিত হয়েছে লেখক-স্মৃতি আর তাঁদের সাহিত্যকর্ম। কী মমত্বের সাথে সংরক্ষণ করা হয়েছে লেখকদের সব স্মারক! আর আমাদের দেশে?
এ রকম একটি লেখক জাদুঘর আমাদের দেশে কি শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে?

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৩
ফজর৪:৫৯
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৮সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :