The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

উপন্যাস

পাখিপুরেরবিস্তার

মঈনুল আহসান সাবের

হাসিব মাহমুদ লাজুক গলায় বলল—বাবা, আসব?
সে ছিল এক শীতের সন্ধ্যা। কিছু অসময়ের বৃষ্টিও ছিল। শীতে জলে এক অস্বস্তিকর অবস্থা। আর লোকজন সবাই চলে যাওয়ায় হঠাত্ করেই সুনসান চারদিক। অস্বস্তি লাগাছিল হাসিব মাহমুদের। এই অস্বস্তি তার কণ্ঠে ছিল, আবার কিছুটা লজ্জাও লাগছিল তার। এই দুই মিলে সে বিব্রত বোধ করছিল। সে অস্বস্তি কাটাতে চাচ্ছিল, নিজেকে বলছিল, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই কিছু নেই, বাবাই তো।
হাসির শব্দ শুনল সে, মৃদু হাসির, সেটা থেমেও গেল, লুত্ফর রহমানের গলা শুনল সে—আমার কাছে আসবি, জিজ্ঞেস করিস কেন!
না বাবা, তুমি ব্যস্ত... ব্যস্ত না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম। আসব?
আয়। ... আয়, বাপ। তোকে দেখি।
একটু থমকাল হাসিব মাহমুদ। সে বুঝল লুত্ফর রহমানের গলা আর্দ্র। বাবাকে দেখার ইচ্ছা কি তারও কম?
তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। সে ছিল দুরন্ত স্বভাবের। কোথাও এক মুহূর্ত বসে থাকা তার স্বভাবে ছিল না। শুধু বাবার কাছে গেলে সে নেওটা হয়ে পড়ত, সে বাবার সঙ্গে লেগে থাকতে চাইত, তার ভেতর, মনে আছে তার, ঘোর তৈরি হতো।
হাসিব মাহমুদের মনে হলো সেই ঘোর ফিরে আসছে, সে জিজ্ঞেস করল—বাবা, কী করো? ছোটবেলায় এই প্রশ্নটি ছিল তার প্রিয়। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করত—বাবা, তুমি কী করো? হয়তো কোনো কারণে কিছুক্ষণ দেখা নেই বাবার সঙ্গে, সে হয়তো পাশের ঘরে ছিল, খেলায় কিংবা বর্ণমালায়, সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে কিংবা বাবা, সে যে কারণেই তাদের দেখা হয়নি কিছুক্ষণ, তারপর সে হাসতে হাসতে বাবার সামনে হাজির হতো—বাবা, তুমি কী করো?
বাবার উত্তর ছিল নানা রকম—কাজ করি বাপ।
বই পড়ি হাসিব।
ডায়রি লিখি বাবু।
হিসাব করি রে।
ঘুমাই। বুঝেছিস? আমি ঘুমাই।
আজ এতদিন পর ওই প্রশ্ন, লুত্ফর রহমান শব্দ করে হাসতে আরম্ভ করল—এই প্রশ্ন করে ছোটবেলায় তুই আমাকে খুব জ্বালাতি।
হুঁ, মনে আছে। ... এই এখনো মনে পড়ছিল।
তোর মা মাঝে মাঝে তোকে জোর করে নিয়ে যেত, কিন্তু তুই ডাকাতের মতো ফিরে আসতি। ... কী যে সব দিন ছিল! ... তুই, অঞ্জন, পিকলু, শ্যামলী। ... আর তুই... এতদিন পর তুই এখন আমার কাছে! আশ্চর্য না?
এ কি আর বলার অপেক্ষা রাখে, এ খুব আশ্চর্যের! সে তো বেশ আগেই বলে রেখেছিল, বাবার কাছে থাকবে সে। তার ধারণা ছিল, এ নিয়ে কেউ আপত্তি করবে না। একটু অন্যরকম কারও কারও মনে হতে পারে, আবার খুব অন্যরকম, এরকম হয়ই না—তাও না, সুতরাং কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু পিকলু আপত্তি করল। হাসিব ভেবেছিল এই পিকলুই ব্যাপারটা বুঝবে। ছোটবেলা থেকে এই পিকলু অন্যরকম। অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলত, আর অদ্ভুত কাণ্ড ঘটাত। রোজকার ঘটনা আর নিয়মনীতিতে তার কোনো টান ছিল না। এই পিকলু আপত্তি করে বসল। বহুদিন সে দেশের বাইরে, ওখানেই তার বিয়ে, ওখানেই তার ছেলেমেয়ে আর শেকড় গজিয়ে তার থাকা। সে ফোন করে বলল, কার কাছ থেকে খবর পেয়েছে কে জানে, খুব তো একটা যোগাযোগ তার নেই এদিকে, তবে কিছু কিছু খবর হয়তো পৌঁছে যায়, পিকলুর কাছেও পৌঁছে গেল, আর সে বলল—একটা কথা শুনলাম, তুমি নাকি বাবার...।
হাসিব বলল—হ্যাঁ, অমনই ঠিক করেছি।
কেন, বাবা কি একা থাকতে পারছে না?
আমার একটা ইচ্ছা পিকলু... অনেক দিনের...।
পিকুলিয়র ইচ্ছা তোমার...। মানে হয় না।
হাসিব তখনই ঠিক করে রেখেছিল পিকলুর কথা সে বাবাকে বলবে। নালিশের মতো করে বলবে না, তবে বলবে।
হাসিব বাবার দিকে তাকাল, মৃদু গলায় বলল—বাবা, আমার খুব ভালো লাগছে। লুত্ফর রহমান নিঃশব্দে হাসল—আমি জানতাম না বাবা তুই আসবি। তুই এসেছিস... তুই এসেছিস! আচ্ছা, আরও কয়েকটা দিন থেকে আসতে পারলি না?
সে কি আর আমি চাইলেই হয়! বাদ দাও। তুমি খুশি হওনি আমাকে দেখে?
হবো না! বললাম না—আমি জানতামই না তুই আসবি।
আমার এতদিন ধরে ঠিক করে রাখা...। কখন জানলে?
কখন? ... সকাল ৭টা ২২ না?
হুঁ। সকাল ৭টা ২২।
আমার ছিল রাত ৯টা ১৮।
মনে আছে বাবা। আমরা ছিলাম সবাই।
তোর মা ছিল না।
হুঁ, মা। ... মা ছিল না।
তোর বয়স এখন কত রে?
৬৯, বাবা।
এমন কিছু না। আজকাল এটা কোনো বয়স। আজকাল দেখছি তো ৮০-র নিচে কেউ আর এদিকে আসতেই চায় না। সেই জন্য বললাম, আরও কিছুদিন থেকে আসতে পারতি।
পারতাম। পারতাম হয়তো।... পারলে কীইবা হতো!
কী হতো কে জানে! তবে জীবনে সব সময়ই কিছু না কিছু দেখার থেকেই যায়।
তা-ই? তা-ই কি বাবা? ... হবে। তা হলে দেখায় ইতি টানার ব্যাপারটাও থেকে যায়। আমার বরং তোমার কাছে এসেই ভালো লাগছে।
আচ্ছা আচ্ছা, ভালো লাগলেই ভালো। ... হাসিব...।
কী বাবা?
ছোটবেলায় তোর শরীরে দুধ দুধ গন্ধ পেতাম। কর্পূর আর আতরের গন্ধ ছাপিয়ে আমি সেই গন্ধটা পাচ্ছি।

পিকলু ফোন করল রাতে। বেশ রাতে। আজ হাসিবের বাসায় ফোনের পর ফোন। এ বাসায় হাসিবের স্ত্রী সাদিয়া আর দুই ছেলে শাফিক শাফকাত আর অদ্বিত মাহমুদ থাকে। শাফিকের বিয়ে হয়েছে, তার এক ছেলে। অদ্বিত বিয়ে করেনি, সে বিয়ে করবে এমন কোনো লক্ষণ নেই। মেয়ে জাবিনের বিয়ে হয়ে গেছে। সে আলাদা থাকে, তবে আজ রাতে সে মায়ের সঙ্গে থাকবে। অধিকাংশ ফোন এই জাবিন ধরছে। পিকলুর ফোনও জাবিনই ধরল।
কে, আনিকা? পিকলু জানতে চাইল।
আমি জাবিন। আনিকা ঘরে। বাচ্চাকে ঘুম পাড়াচ্ছে।
সব কিছু ঠিকঠাক?
ঠিকঠাক। একদম।
আহা, আমি ঠিক তেমন বলিনি। ভাবি কেমন আছেন?
মা আছে। বসে আছে।
খেয়াল রাখিস।... আমি একবার ভাবলাম যাব। পরে মনে হলো, কী হবে! ভাইয়া নেই।
চাচা, আমি যতদূর জানি এইসব থাকা না থাকার ইমোশন আপনার নেই।
না, না, তবু... কবর কি বাবার কবরেই হলো?
হুঁ। হুঁ বলে জাবিন কঠিন কিছু শোনার অপেক্ষায় থাকল, শুনলে কঠিন কিছু বলার প্রস্তুতিও সে রাখল। পিকলু অবশ্য তেমন কিছু বলল না, বরং সে বলল—ঠিকই আছে। ভাইয়ার ইচ্ছা। আমি এখানে এক হুজুরকে জিজ্ঞেস করেছি, অসুবিধা নেই। নিয়ম আছে।
আছে, নিয়ম না থাকলে ওটা করা যেত না।
হ্যাঁ, ঠিক। যাক ভালো হয়েছে। ভাইয়ার ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে আর বাবাও খুশি হবে। বড় ছেলে, বড় সন্তান। বাবা আর সবার চেয়ে ভাইয়াকে বেশি ভালোবাসত।
আমার মনে হয় দাদা সবাইকেই সমান ভালোবাসতেন।
না, বাবা ভাইয়াকে বেশি ভালোবাসত। অবশ্য তাতে কিছু এসে যায় না। কোনো সমস্যাও তৈরি হয় না। সেজন্য আমারও মনে হচ্ছে মৃত্যুর আগে বলে যাব আমাকে যেন দেশে এনে বাবার কবরেই কবর দেওয়া হয়। আমি, ভাইয়া, বাবা তিনজন মিলে বেশ থাকলাম।
বলেন। আমারও জানা থাকল।
পিকলু হাসতে আরম্ভ করল—তা কি আর হবে রে। আমি ঠিক করে রেখেছি মৃত্যুর আগে আমি নিখোঁজ হয়ে যাব। খুব নির্জনে একাকী আমার মৃত্যু হবে। এটুকু আমার প্রাপ্য, এই সৌন্দর্যটুকু, নিঃসঙ্গ মৃত্যুর।
শাফিক ঘর থেকে বেরিয়েছে, জাবিনের দিকে তাকাল—কে? ... রিসিভারটা তুলে রাখো। আর ভালো লাগে না। আমি সেল ফোন অফ করে রেখেছি।
থাকুক। জাবিন বলল। মানুষজন ফোন করবে না? করবে। তুই না হয় সেল অফ রাখ।
রেখেছি। বুবু... ভালো লাগছে না বুবু। চলো, মা-র কাছে বসি সবাই।
চলো। অদ্বিত কী করছে?
গাঁজা খাচ্ছে। ও আর কী করবে। শাফিকের কণ্ঠে বিরক্তি।
না, আমি গাঁজা খাচ্ছি না। আমি শুয়ে ছিলাম। অদ্বিত বেরিয়ে এসেছে। বেরিয়ে আসতে আসতে সে শাফিকের কথা শুনেছে। শাফিকের কথায় কিছু অভিযোগ মিশে ছিল, তা নিয়ে অদ্বিতের রাগ বা বিরক্তি নেই। তাই সে শুধু সহজ গলায় জানাল সে গাঁজা খাচ্ছিল না।
আনিকা কি ঘুমিয়ে পড়েছে? জাবিন জানতে চাইল।
না, না, ঘুমাবে কেন! প্রখরকে ঘুম পাড়াচ্ছে। ছেলেটা ঘুমাতে চায় না।
তারা তিনজন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, কিছু প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কথা হলো, তারা তারপর তাদের মা সাদিয়ার কাছে গিয়ে বসল। সাদিয়ার কাছে ছিল জাবিনের মেয়ে অতিন্দ্রিলা। সে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে নানীর পাশে বসে ছিল। মা আর মামাদের ঢুকতে দেখে সে উঠে গেল। সাদিয়া এই পুরোটা একবার চোখ তুলে দেখল, চোখ নামিয়ে নিল।
মা, ঘুমের ওষুধটা নিয়েছ?
সাদিয়া উত্তর দিল না।
জাবিন শাফিকের দিকে তাকাল—প্রেশারের ওষুধটা দিয়েছিলি তখন?
হুঁ। কিন্তু খালিপেট...।
অদ্বিত বলল—মা, একটু কিছু খাও। আমি তোমাকে তুলে খাওয়াই।
সাদিয়া চোখ তুললেন—তোরা যা। আমি একা থাকব। একা থাকতে আমার ভালো লাগবে।
একা কেন থাকবে মা! আসো, বরং বাবার গল্প করি।
কী গল্প করবি! একটা লোক তার মতো করে চলে গেল, তার আবার কী গল্প!
আচ্ছা বাবার গল্প থাক। কুলখানি কবে করব, ঠিক করা দরকার, আর কাকে কাকে বলা দরকার...। মা, তিনদিনের দিন...?
তোরা যা তো এখান থেকে, যা। আমাকে সহজ করতে হবে না। আর কুলখানি কবে করবি আর কাকে কাকে বলবি, এসব তোরা ঠিক কর।
জাবিন, শাফিক আর অদ্বিতি বসল। তারা অবশ্য বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। শাফিক তাকিয়ে থাকল বিছানার চাদরের দিকে, অদ্বিতের চোখ থাকল হাতের আঙুলের দিকে, জাবিনের চোখ থাকল সাদিয়ার সাদাটে শাড়ির হালকা পাড়ের দিকে। পাড়টা সুন্দর—তার একবার মনে হলো।
তোদের যেতে বলেছিলাম। বসে আছিস কেন! সাদিয়া বিরক্তি নিয়ে একসময় বলল। সে এক এক করে তিনজনের দিকে তাকালও। যা, যার যার ঘরে যা।
মা, তুমি এত বিরক্ত হচ্ছ কেন? বসি না আমরা।
তোরা বসলে কি তোদের বাবা ফিরে আসবে? ... কী রে, আসবে?
না, ... বাবা, আসবে না।
তা হলে এখানে বসে থাকবি কেন! ... আচ্ছা, ব্যাপার দেখ, একটা মানুষ এই ভোরবেলায়ও ছিল, এখন নেই! কী এক কাণ্ড করলেন! চলে গেলেন। বলি, আমাকে রেখে যাওয়ার দরকার খুব বেশি ছিল? আক্কেল থাকবে না লোকটার!

লুত্ফর রহমান অনেকক্ষণ হলো নিশ্চুপ। অস্বস্তি লাগছে হাসিবের। কিন্তু সে কিছু বলতেও পারছে না। তার একবার মনে হচ্ছে, হয়তো বাবা তার এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়নি। বাবা হয়তো একাই থাকতে চেয়েছিল। কমদিন কি হলো? বাবা এখানে আছেন ২৭ বছর। ২৭ বছর ধরে এক জায়গায় একা থাকলে একা থাকার অভ্যেস হয়ে যায়। সে কি না তার মধ্যে হুট করে ঢুকে পড়ল! এই এটা, এটা হয়তো বাবার পছন্দ হয়নি। এখন সমস্যা, তার ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। হুট করে এভাবে, ফিরে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা না রেখে চলে আসাটা তা হলে কি ঠিক কাজ হয়নি? অবশ্য, হুট করে—এটা বলবে না হাসিব। এই সিদ্ধান্ত তার অনেক দিনের। শুধু একবার এলে আর ফিরে যাওয়া যাবে না, এ বিষয়টা তার মাথায় ছিল না।
হাসিব সামান্য মুখ ফিরিয়ে বাবার দিকে তাকাল। লুত্ফরের মুখে স্মিত হাসি। হাসি দেখে কিছু স্বস্তি বোধ করল হাসিব, যদিও সে এ-ও টের পেল, টের পেল মানে তার মনে হলো, বাবা তার উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন না। সুতরাং স্মিথ হাসি দেখে কতটা স্বস্তি তার পাওয়া উচিত, কিছুটা সে পাচ্ছে, হাসিব সিদ্ধান্ত নিতে পারল না।
বেশ অনেকটা সময় যদিও তাদের কথা নেই, যখন কথা হচ্ছিল, বেশ কথা হচ্ছিল। বাবা দুধের গন্ধ পাওয়ার কথা বলল। তারপর বলল—জানিস, আমার খুব অবাক লাগছে। তারপর আরও নানা কথা। একসময় লুত্ফর রহমান চুপ। হাসিব সেটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কথা বলতে বলতে মানুষ একসময় চুপ করতেই পারে। আর, তারও হঠাত্ চুপ করে থেকেই নানা কথা ভাবতে ইচ্ছা করছিল। এই যে, এই যে লোকটা, হাসিবের মনে হচ্ছিল, এই লোকটা তার বাবা। ২৭ বছর আগে তাদের বাড়ি দেড়তলা, সে থাকে ছাদে দুটো ঘর তুলে, সকালে ঘুম ভাঙলে সে ছাদে কিছু হাঁটাহাঁটি করে, কখনো রেলিং-এর কাছে গেলে নিচে বাগানে বাবাকে দেখে বসে থাকতে, কখনো খবরের কাগজ পড়তে কখনো শুধুই বসে থাকতে, সে একবার জিজ্ঞেস করেছিল—বাবা, তুমি কীভাবে পারো? ওই যে দেখি, বাগানে বসে থাকো তো থাকোই।
বাগান করি না? বাগান করতে আমার ভালো লাগে।
বাবা, তুমি বসে থাকো। সব সময় বাগান করো না। বসে থাকো।
বসে থাকতে আমার ভালো লাগে।
সে বুঝি। না হলে আর অতক্ষণ...! কী ভাবো বাবা?
কী ভাবি? এ কথা তোকে কী করে বোঝাই। কত কী ভাবার আছে।
সেও জানি, কত কী ভাবার আছে। কিন্তু কী ভাবো?
নিজের কথা ভাবি রে।
হাসিব আশা করেছিল সে শুনবে বাবা বলছে—তোদের কথা ভাবি। এই যে তোরা, তোর ছেলেমেয়েরা, শ্যামলীর ছেলেমেয়েরা, পিকলুটা কি বিয়ে করবে না?... কিন্তু বাবা বলল, বাবা নিজের কথা ভাবে। কী কথা, সেটা জানার খুব ইচ্ছা হয়েছিল তার। বাবা বলল—সেই প্রথম থেকে ভাবি, যতদূর মনে পড়ে পেছনের কথা, কেমন ছিল কেমন হলো আর এখন কেমন—এসব ভাবি। নিজের কথা ভাবি রে, সেই ছোট্ট আমি...।
এক সকালে ছাদে হাঁটতে হাঁটতে নিচে উঁকি দিল হাসিব, দেখল বাবা ঘাড় ঘুরিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখাচুখি হতেই হেসে তাকে নামতে বলল। নিচে নামল হাসিব, বাবা বলল—আমাকে ধর বাপ, ঘরে নিয়ে যা।
বুঝতে সময় লেগেছিল হাসিবের, সে যখন চেয়ার থেকে বাবাকে টেনে তুলছিল, বাবার তখন শরীর ছেড়ে দেওয়া, সে বলেছিল—পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরেছে বাবা? ওভাবে বসে থাকলে...।
বাবার আয়ু ছিল আর আধাঘণ্টা। মৃত্যুর সময় বাবা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলেছিল। কেউই সেটা বুঝতে পারেনি, হাসিবও না। তবে, পরে, অসংখ্যবার সে সেটা বোঝার চেষ্টা করেছিল—কী বলেছিল, কী বলেছিল বাবা! তার বোঝা হয়নি। তার একেকবার একেক কথা মনে হয়েছিল, মনেই হয়েছিল শুধু, মনে হওয়া একটা কথাও তার বাবার শেষ কথা মনে হয়নি।
এখন কি সেটা জিজ্ঞেস করা যাবে? যাবে নিশ্চয়। তবে এই এখনই জিজ্ঞেস না করে পরে জিজ্ঞেস করা ভালো। সে বাবার দিকে তাকাল আর বাবা বলল—জানিস, আমার খুব অবাক লাগছে।
কেন অবাক লাগছে বাবার, হাসিব সেটা জানতে চাইল না। সে বাবার মুখ থেকে শুনতে চাইল। সে অনুমান করতে পারছে বাবার অবাক লাগার কারণ, এখন দেখার পালা তার অনুমান ঠিক কি না। লুত্ফর বলল—তোর সঙ্গে আমার কতদিন পর দেখা হচ্ছে বল তো।
হিসাব করল হাসিব, তারপর জানাল—২৭ বছর বাবা।
২৭ বছর! অনেক সময়। তোর সঙ্গে আবার দেখা হবে, ভাবিনি।
হাসিব হাসল। সে বলল—আমি অবশ্য ভাবতাম।
তখন জীবিত ছিলি। জীবিতরা ভাবে। এটা তাদের একটা প্রিয় ভাবনা।
তোমার ইচ্ছা করত না? মানে, আবার দেখা হোক...।
কিছুক্ষণ ভাবল লুত্ফর, দুপাশে মাথা নাড়ল—বলতে পারব না হতো কি না। ঠিক বুঝতে পারছি না। এখানে-ওখানে অনেক পার্থক্য। ... কিন্তু হাসিব...।
হ্যাঁ বাবা, বলো।
ধর, বলতে পারছি না, তোদের সঙ্গে দেখা হোক এটা আমি চাইতাম কি না, তবে এই যে তুই এসেছিস না, তোর কথা তো জানবই, তোদের সবার কথাই আমার এখন জানতে ইচ্ছা করছে। সবাই কে কেমন আছে, হ্যাঁ? বল দেখি বাপ।
কার কথা দিয়ে শুরু করা যায়? তাদের সংসারে এখন অনেক লোক, যদিও তারা এখন আর আগের মতো করে থাকে না। থাকে তারা তাদের নিজের মতো করে, তাদের কথা বাবাকে বলা যায় এক এক করে। শুরু কাকে দিয়ে করবে? প্রখরকে দিয়ে শুরু করা যায় না? এই বছর দু হয়েছে ছেলের, এর মধ্যে একটা জিনিস সে বুঝেছে—দাদা লোকটাকে জ্বালাতে হবে। জ্বালানোর বেশকিছু কায়দাও তার আয়ত্ত্বে। তার কথা দিয়ে শুরু করা যায়, এভাবে—শাফিককে তুমি ছোট দেখেছ বাবা, একটু চুপচাপই থাকত, ছোটবেলা থেকে কেমন একা একা, কিন্তু ওর যে ছেলে, প্রখর, বাবা, তুমি যদি দেখতে, বিচ্ছু একটা।
এভাবে শুরু করবে ভেবে মুখ খুলল হাসিব, বলল—তুমি চলে যাওয়ার পর মা আরও সাত বছর বেঁচে ছিল। শান্তিতে ছিল না।
তোর মা, না?... আমি বুঝলাম যখন আমি চলে যাচ্ছি, তোদের মায়ের কথা খুব মনে হলো। খুব ইচ্ছা করছিল তাকে দেখতে। কিন্তু পরিষ্কার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সব ঝাপসা সব ঝাপসা।
মা তোমার মাথার পাশে বসে ছিল। আমাদের মধ্যে মা-ই সবার আগে বুঝতে পেরেছিল তুমি চলে যাচ্ছ।
তোর মা আর আমার মধ্যে কথা ছিল আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না। তোর মা, তোর মা ছিল এক অসাধারণ মহিলা। হাসিমুখে এত সইতে পারত।
বাবা, কিছুদিন আগে অতিন্দ্রিলার সঙ্গে এ নিয়ে কথা হচ্ছিল। জাবিনের মেয়ে। বন্ধুরা ওকে অতি বলে ডাকে, তো, ও আমাদের আড্ডায় বসে না, ভালো লাগে না ওর, স্বাভাবিক, সেদিন একটু বসেছিল, আমি কী এক কথায় কথায় মায়ের কথা বলছিলাম, এই যে, তুমি যা বললে না—হাসি মুখে সব সইতে পারত, আমরাও দেখেছি—এক হাতে কত কী সামলাত মা, তা শুনতে শুনতে অতি বলল—আচ্ছা, বড় নানী দেখছি খুবই বোকা টাইপের ছিলেন। অবশ্য পরেই বলল—স্যরি, এভাবে বলা উচিত হয়নি আমার, তখন ওরকমই ছিল। এখন ভাবা যায় না।
লুত্ফর রহমানের মুখে মুচকি হাসি খেলে গেল—ওদের কথা পরে শুনব। ওদের তো চিনি না। ওদের কথা শুনতে তাই খুব একটা উত্সাহ পাচ্ছি না, পরে শুনব বাপ, অবসরে।
মা সারাদিন প্রায় চুপ করেই থাকত। আমরা চেষ্টা করতাম, মা হ্যাঁ হুঁ করত, খুব বেশি কিছু বলত না। অঞ্জনের বিয়ের সময়ও...।
অঞ্জনকে নিয়ে আমি চিন্তা করতাম। চাকরি করতে চায় না, চায় না মানে মন নেই, সব সময় বন্ধুদের সঙ্গে...। ওর খবর কী, হাসিব?
হাসিব হাসল—ওর খবর পরে বলি বাবা। এখন মা-র কথা।
হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন লিলির কথা। লিলি খুব ভালো ছিল রে। আমরা একবার দার্জিলিং গিয়েছিলাম। কষ্ট করেই যেতে হয়েছিল, ২-৩টা দিন ছিলামও টেনেটুনে। লিলি যে কী খুশি হয়েছিল। একবার বলেই বসল, এই পাহাড়ের ওপর ঘর বানিয়ে থেকে যাব।
হাসিবের মুখে সামান্য হাসি দেখা গেল। হাসিটা সে বাবার কাছ থেকে লুকাতে চাইল। লুকানো গেল না, বরং তার হাসি কিছুটা তার বাবাকে ছুঁয়ে গেল, লুত্ফর বলল—তোদের মা কিন্তু খুব রোমান্টিক ছিল। তোদের অবশ্য সেটা বোঝার কথা না।
কিন্তু বাবা, মা যে তোমাকে কী ভালোবাসত সেটা আমরা বুঝতাম।
আর আমিও যে অনেক ভালোবাসতাম, এটা বুঝতি না?... আচ্ছা, তোর মার কবর কোথায়?
আজিমপুরে বাবা। নতুনটায়। ওখানে কবর থাকে না। ... মা অমনই বলে গিয়েছিলেন।
ওহ। ... না, এটাই ভালো হয়েছে তোরা ওর শেষ ইচ্ছাটাকে গুরুত্ব দিয়েছিস। ... আমাকে একবার বলেছিল, আমার আগে মারা গেলে ওকে যেন ওর মায়ের পাশে কবর দেই। ... হ্যাঁরে, লিলির দিককার কারও সঙ্গে তোদের যোগাযোগ আছে? লিলির ভাইবোনদের ছেলেমেয়েদের কারও সঙ্গে? কিছুই জানি না।
মাথা নাড়ল হাসিব—না বাবা, নেই-ই। মাঝখানে বেশ আগে কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে জাবিনের সঙ্গে ওদের কার যেন দেখা হয়েছিল, টুকটাক কিছু কথাও হয়েছিল। তারপর আর হয়নি।
অথচ দেখ, একসময় কী সম্পর্কই ছিল দুই পরিবারে। কত যাওয়া-আসা...। হাসিব?
হাসিব একটু বেখেয়াল হয়েছিল, সে মনে করার চেষ্টা করছিল তার মামা বা খালা কারও কথা, ঠিক গুছিয়ে মনে পড়ছিল না, লুত্ফরের ডাক শুনে সে ফিরে তাকাল—হ্যাঁ, বাবা?
তোর হয়তো তোর মামা-খালার কথা মনে পড়বে। তুই দীর্ঘদিন দেখেছিস ওদের। কিন্তু তোদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ওদের কারও ছেলেমেয়ের কোনো যোগাযোগ হয়নি। হলেও কেউ কাউকে টানেনি। এটা ব্যাপার না। এমন হতেই পারে। ... আমাকে বাপ, আসলে অন্য একটা ব্যাপার ভাবাচ্ছে। ... এই যে তোর মা। এই যে তোর মা আর আমি দুজন দুজনকে ভালোবাসতাম। এই যে আমরা এত এত গল্প করতাম আর অভিমান, এই যে আমরা দুজন মিলে তোদের বড় করে তুলেছিলাম—তারপর কী হলো? আমি থাকলাম কোথায়, আর তোদের মা থাকল কোথায়!

অঞ্জন এলো সকাল সকাল। এ বাসায় সে কম আসে। কাল সকালে এসেছিল হাসিবের মৃত্যুর খবর পেয়ে। ছিল দাফন পর্যন্ত। মাঝখানে দুবার শুধু অল্প সময়ের জন্য জরুরি কাজে বাইরে যেতে হয়েছিল। তারপর দাফন পর্যন্ত ছিল, আবার রাতেও একবার ঘুরে গিয়েছিল। তার স্ত্রী বা ছেলেমেয়েরা অবশ্য আসতে পারেনি। তারা দেশের বাইরে। বেড়াতে বা পড়তে নয়, তারা আসলে দেশের বাইরেই থাকে। মাঝে মাঝে আসে। অঞ্জনও খুব কম সময়ই থাকে। সে গতকাল ভিড়ের মধ্যে কার সঙ্গে যেন কথা বলতে গিয়ে গলা একটু তুলেও ছিল—কেন থাকব, বলুন, কেন থাকব! আপনি থাকার পক্ষে দশটা যুক্তি দেখালে আমি না-থাকার পক্ষে একশটা যুক্তি দেখাতে পারব। অঞ্জনের এসব রাগের কথা না, সে নিজেই বারবার বলে, সে বলে এসব তার ক্ষোভের কথা, তার কষ্টের কথা, সে দেশ নিয়ে হতাশ, অথচ এ দেশটার কী সম্ভাবনাই না ছিল।
রাতে এ বাড়ির সবাই ঘুমোতে গিয়েছিল, ঘুমোতে গিয়েছিল মানে বিছানায় শুয়েছিল, কারোরই ঘুম হয়নি। অঞ্জনকে দরোজা খুলেছে জাবিন, খুলে অবাকও হয়েছে—তুমি!
তুমি মানে! তুমি মানে কী! আমি আসতে পারি না? আমাকে দেখে অবাক হচ্ছ কেন?
মেজাজ দেখিও না চাচা। তোমার মজাজের আমি থোড়াই কেয়ার করি।
আর তুমিও ঝগড়া বাঁধিও না। এ বাসায় গতকাল একজন মারা গেছে।
ওহ! জানতাম না।
অঞ্জন কঠিন চোখে তাকাল যদিও, দাঁড়াল না। সে চলে গেল সাদিয়ার ঘরে। সাদিয়া ছিল জায়নামাজে। অঞ্জনকে দেখে নেওয়াটুকু, তারপর সাদিয়া আবার চোখ নামাল। শরীর কেমন ভাবি—অঞ্জন জিজ্ঞেস করল। সাদিয়া উত্তর দিল না। অঞ্জনকে দেখে মনে হলো উত্তরের আশা সে করেওনি। সে বিছানার এক কোণে বসল। ঘরের চারপাশে তাকাতে তাকাতে বলল—তোমার ঘরে অলো-বাতাস খুব কম ঢোকে।
সাদিয়া মুখ তুলল—আমার আলো-বাতাস লাগবে না। আলো-বাতাস নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। সাদিয়ার কথা যেন কান পর্যন্ত পৌঁছাল না অঞ্জনের—আর ঘরটাও ছোট। বেশ ছোট। আমি আগে খেয়াল করিনি।
আগে খেয়াল করোনি এসব বলার জন্য তুই এই সকালে এসেছিস?
অঞ্জন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না, সাদিয়াকে দেখেও মনে হলো না সে উত্তর পেতে ইচ্ছুক। অঞ্জন উঠল, ঘরের ভেতরে এবং ঘরের বাইরে কিছুটা সময় হেঁটে এল, ফিরে এসে বলল—আমাদের এই বাড়িটাও বাইরে থেকে দেখতে ভালো লাগে না। কেমন যেন চারকোনা বাক্স...। ভাবি, আমি যে কারণে এসেছি, মানে এসেছি তো ভাইয়ার জন্যই, তোমাকে দেখতেও, মনটা খুব ভালো না। ... কুলখানির কথা কিছু ভেবেছ, কবে কোথায়... লোকজনকে বলার ব্যাপার আছে।
শাফিক আর জাবিনের সঙ্গে কথা বলে দেখো। ওদের বাবা।
সে তো বলবই। তোমারও বলার আছে। সম্ভবত বেজোড় দিনে হয় কুলখানি, না?
সাদিয়া সামান্য মাথা ঝাঁকালো—হ্যাঁ।
আমার পরিচিত খুবই ভালো হুজুর আছেন। এই কিছুদিন আগে রানারা মিলাদ দিল, ওদের তো কেউ মারা না গেলেও পরপর কয়েকটা ক্ষতি, তো ওরা মিলাদ দিল, তখন দিল্লি থেকে খুব নামকরা হুজুর নিয়ে এসেছিল। হুজুর আছে এখনো, বিভিন্ন জনের চাপে পড়ে নানা জায়গায় মিলাদ পড়াতে হচ্ছে। আমি ভাবছিলাম ওই হুজুরকে আনি ভাইয়ার কুলখানিতে। সাদিয়া চোখ তুলে কথাগুলো শুনল, তার ভেতর কিছুটা পরিবর্তন, একটু যেন শিথিল হয়ে গেছে শরীর। অঞ্জন বলল—এখন এই ব্যাপারটা আলোচনা হওয়া দরকার। আর এখনই। বুকিং পাওয়ার ব্যাপার আছে, ভাবি। অঞ্জন উঠল, সাদিয়ার কাছে এগিয়ে এল ও একটু ঝুঁকে পড়ে সাদিয়াকে ধরল—তুমি ওঠো দেখি ভাবি, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে জানি। কিন্তু তোমার এখনো অনেক কিছু করার আছে। ওঠো তুমি। অঞ্জন তাকে টেনে তুলতে নিলে, সাদিয়া উঠতে উঠতে ফোঁপাতে আরম্ভ করল—কী এমন বয়স হয়েছিল তার, বলো, কী এমন বয়স হয়েছিল! আমাদের কেন এখনই তার কুলখানি নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে! সবাই যখন উপস্থিত, অঞ্জন বেশ জোরের সঙ্গেই কথা শুরু করল। শুধু অদ্বিত একবার মৃদু গলায় জানতে চাইল—চাচা, এই হুজুর কি ক্ষ্যাপ মারতে এদেশে এসেছেন?
অঞ্জন কড়া চোখে তাকাতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল—তুই কি সকালবেলা উঠেই নেশা করেছিস? চোখ লাল কেন?
আমি নেশা করা ছেড়ে দিয়েছি। চোখ লাল বাবার জন্য কেঁদেছি বলে। আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না? দেশি হুজুরে তোমাদের আর কুলোচ্ছে না। বিদেশি হুজুরে বেশি পুণ্য।
দেখ, উনি খুবই মশহুর, সারা ইসলামি ওয়ার্ল্ডে উনি রিনাউন্ড...।
রিনাউন্ড না হলে তোমরা আনো? সনু নিগম, অলকা ইয়াগনিক, ওই মডেলটার কী যেন নাম...।
সাদিয়া বলল—থাম তো বাবা, দরকারি কথাগুলো শেষ হোক...।
অঞ্জন বলল—ভাইয়ার জন্য আমার করার আগে। আমার ১৩ বছরের বড়। যেন বাবার মতো। আগলে রেখে আমাদের বড় করেছে... কত ভালোবাসা কত প্রশ্রয়....।
জাবিনের মেজাজটা ভালো নেই। বাবাকে সে ভালোবাসত, বাবাও তাকে, এই বাবা হঠাত্ করে মারা গেলেন, এটা দুঃখের, তবে এ কারণে মেজাজ খারাপ হয় না, তার মেজাজ খারাপ হয়েছে অন্য কারণে। তার আর রুম্মনের একটা ভুল হয়ে গেছে। ভুল অবশ্য সে বলবে না, না করেও উপায় ছিল না। বড় মেয়ে অর্চিকে ওলেভেল পাশ করার পরপরই তারা বিদেশ পাঠিয়ে দিয়েছে। রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু ওই রেজাল্টে ওলেভেল কেন, এলেভেল করে গেলেও স্কলারশিপের গন্ধও জোটে না। তাই বলে তারা মেয়েকে পাঠাবে না, চেনাজানার মধ্যে আরও অনেকেই যখন পাঠিয়ে দিল, তা হয় না। ফলে তারাও পাঠিয়ে দিল। যারা খরচের কথা তুলেছিল—না না, ওতো ২৫% স্কলারশিপ পাবে, কিছুদিনের মধ্যে ওটা বেড়ে ৫০% হবে। তেমন কিছু হওয়ার কথা ছিল না, হয়ওনি। ফলে খরচের পুরোটাই তাদের টানতে হচ্ছে। মেয়ের রেজাল্ট অবশ্য ভালো হচ্ছে। তবে এসব নিয়েও আজকাল অনেকে কথা বলে—আরে, ওই দেশে এমন অনেক কলেজ আছে, না লিখলেও ভালো নাম্বার দিয়ে দেয়। তারপর সময়মতো একটা সার্টিফিকেট। এটাই ওদের ব্যবসা। মানুষজনের কেন যে এত চোখ টাটায়, বোঝা ভার। তা আমাদের মেয়ে যদি অমন একটা কলেজে ভর্তি হয়েই থাকে, তুই তোদের মেয়েকে ভালো একটা কলেজে ভর্তি করা, ঝামেলা মিটে গেল।
সে যা-ই হোক, অর্চিকে নতুন করে টাকা পাঠানোর সময় হয়ে গেছে, টাকা জোগাড় হয়নি। টাকার পরিমাণ কম না, তাদের জন্য বেশিই। রুম্মন চাকরি করে, পাশাপাশি সাপ্লাইয়ের একটা ব্যবসা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে। কিন্তু এ দুটো করেও একটু যে ভদ্রভাবে থাকা— সে ব্যবস্থা হয় না। মাঝে মাঝে বিরক্তি ধরে যায়—এর কোনো মানে হয় বলো?
লোকজন এই পথে ওই পথে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে, আমরা সত্পথে দুটো পয়সা কামাতে পারি না। তার চেয়ে অসত্ হওয়া ভালো ছিল।
হও না। এই দেশে হওয়াই উচিত। তুমি যে সত্ আছ, কে তালি দিচ্ছে, বলো? কেউ দিচ্ছে?
না। কেউ না। তা হলে সত্ থাকব কেন বলো!
এই দেশে ভালো আছে গরিব আর বড়লোকরা। আমাদের কোনো জায়গা নেই। আমাদের জন্য কোনো সুযোগও নেই।
দেখো, খুব কি বেশি চাই আমরা? সামান্য। মেয়েকে বাইরে পড়াব, এটাও পারি না। অন্য কিছু না, মেয়েকে পড়াতেই চেয়েছি।
মাঝে মাঝে মনে হয়, অর্চিকে পাঠিয়ে ভুল করেছি।
না, না এটা কী বলো!
এরপর আবার অতিন্দ্রিলাকেও পাঠাতে হবে। ও তো আগেই বলে রেখেছে, ওর বন্ধুরা সব বাইরে যাবে, সুতরাং ও-ও যাবে। আর, অর্চিই যখন গেছে...।
শোনো যত কষ্টই হোক, অতিকেও পাঠাতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই, এর বাইরে যাওয়া যাবে না।
কাল রাতে জ্বরজ্বর ছিল রুম্মনের। সে দশটার দিকে চলে গেছে বাসায়। তা ছাড়া টাকা জেগাড়ের জন্য কিছু জরুরি ফোন করারও দরকার ছিল। ওসব এ বাসায় হবে না, কে কখন কী শুনে ফেলবে!
আজ একদম ভোরে সে ফোন করেছে। এ বাড়ির খবর নিয়েছে জাবিনের কাছ থেকে, তারপর জানিয়েছে টাকা জোগাড় হয়নি। এরাদুল বলেছিল টাকার কথা, সে দেশে নেই। রুম্মন যদিও চিন্তা করতে বারণ করেছে, জাবিনের মেজাজ সেই থেকে খিঁচড়ে আছে। এই যে এখন চাচা ভাষণ দিচ্ছে বিজ্ঞের মতো, লোকটার মুখে চোতরাপাতা ঘষে দিতে ইচ্ছা করছে। এই বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব বড়ই অসহ্য, আরও অসহ্য—অধিকাংশ সময় সেটা মেনে নিতে হয়, এটা। লোকটা বিজ্ঞ ছিল না, টাকা হওয়ার পর বিজ্ঞ হয়ে গেছে, এখন সব জানে ও বোঝে।
অঞ্জন বলল—কাকে কাকে বলতে হবে এ তালিকাটা আমাদের একটু ভেবে ভেবে করতে হবে। কেউ যেন বাদ না পড়ে। সব আত্মীয়-স্বজন সব বন্ধুবান্ধব, চেনাজানা লোকজন।
শাফিক একটু ইতস্তত করল—আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বাবার খুব একটা সম্পর্ক ছিল না।
তাই বলে বলবে না তাদের? ভাবি, তুমি কী বলো?
আমি... বলা সবাইকেই উচিত।
আর শুধু সরাসরি ভাইয়ের আত্মীয়-স্বজন কেন! তুমি আনিকার আত্মীয়-স্বজনকে বলো, জাবিন রুম্মনের আত্মীয়-স্বজনকে বলুক, এভাবে। সবাই দায়িত্ব নিয়ে তালিকা বানাক, আজ থেকেই তাদের এক এক করে বলা হোক।... অদ্বিত, তুইও কিছু কাজ করিস। ছাদে যা। ছাদ, কার পার্কিং আর এই অ্যাপার্টমেন্ট মিলে মিলাদ হবে। আমরা বড় একটা কম্যুনিটি সেন্টার ভাড়া করতে পারতাম। কিন্তু এই মিলাদ বাসায় হওয়া ভালো।
অদ্বিত বলল—হুঁ, বাসায়ই হোক। লোক বেশি হয়ে গেলে একজন আরেকজনের কোলে বসবে। আমার মনে হয় না অসুবিধা হবে। লোকজন এটুকু মেনে নেবে।
অদ্বিত, এটা তোর বাবার কুলখানি। ইয়ার্কি ফাজলামো একটু কম কর। নাকি আজও সকালে উঠেই...।
কী যে বলো চাচা, নেশা করা সেই কবে ছেড়ে দিয়েছি। মা জানে। এখন শুধু তোমাকে দেখলে নেশা হয়।
ভুরু কুঁচকে যাচ্ছিল অঞ্জনের, সামলে নিল—আমাকে দেখে নেশা... নেশা করা যে তুই ছাড়িসনি...।
তোমাকে দেখলে বড়লোক হতে ইচ্ছা করে। এটাই নেশা।
অ। পারিস শুধু আমাকে খোঁচাতে। ... আচ্ছা, খরচের ব্যাপারটা...।
অঞ্জন, হাসিব টাকা রেখে গেছে। সব খরচ ওখান থেকেই হবে।
ঠিক আছে ঠিক আছে। শুধু হুজুরের খরচটা আমার।
বেশ কিছুটা সময় এখানে গেল। তার জরুরি কাজ আছে। শুল্ক রেয়াত নিয়ে তাদের একটা মিটিং আছে! সরকার আর তাদের মাঝখানে একটা গ্রুপ কাজ করছে। মিটিংটা আসলে তাদের সঙ্গে। তার ওখানে থাকতেই হবে এমন না, কিন্তু সে থাকতে চায়। নিক্সনকে সে তার এই ইচ্ছার কথা জানিয়েও রেখেছে। নিক্সন বলেছেন, সময়মতো হাজির থাকতে। সে হিসেবে তার হাতে খুব একটা সময় নেই। তবু সে বের করে বাড়ির সামনে কিছুটা সময় দাঁড়াল। সাড়ে বারো কাঠা জায়গা। শুধু তাদের অ্যাপার্টমেন্টগুলো বড়, এক ফ্লোরে দুটো করে, বাকি ফ্লোরগুলোয় চারটা করে। তবে প্লানটা ভালো না, জায়গা খামোখা নষ্টও করা হয়েছে। এটা যা হতে পারত, তার কিছুই হয়নি। এখন সে, এটা যা হতে পারত, তা করতে চায়। ডেভলপার যারা ছিল, তাদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তাদের আগের অবস্থা নেই, বড় প্রতিষ্ঠানের চাপে তারা দিশেহারা। তারা না বলেনি। এখানে যারা অ্যাপাটমেন্ট কিনেছিল, তাদের কেউ কেউ হয়তো না বলবে, কিন্তু তাদের ‘না’ কীভাবে ‘হ্যাঁ’ হয়, সে বিদ্যা তার আয়ত্ত্বে আছে। দুপাশে দুটো বাড়ির সঙ্গেও তার কথা হয়েছে। তারা নিমরাজি। সে এখানে দারুণ একটা বিল্ডিং তুলতে চায়। এটা ভেঙে ফেলে নতুন করে। হাসিবকে সে একবার বলেছিল, আর কাউকে বলেনি, হাসিব সেভাবে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। তবে তার আপত্তি ছিল না। মুখে না বললেও কারও আপত্তি আছে কি নেই এটা অঞ্জন বুঝতে পারে। সে ধারণা করছে, এখন, কিছুদিন পর কাজটা শুরু করা অধিকতর সহজ হবে। একটাই কারণ কাজ করবে—লোভ। মানুষ লোভী হতে ভালোবাসে।

দুটা পরিবারের মধ্যে একটা সম্পর্ক হয়েছিল। লুত্ফর রহমান বলল। কেউ কাউকে চেনে না। কিন্তু সম্পর্ক হলো, সম্পর্ক বড়ও হলো, তারপর দেখ, সম্পর্ক আবার কেমন ঢিলাও হয়ে গেল। এখন ওই দুই পরিবারের কেউ কাউকে প্রায় চেনেই না। আবার নতুন করে চেনাজানা হলেও হয়তো আন্তরিকতা তৈরি হয় না।
বাবার কণ্ঠে অভিমান না হতাশা না ক্লান্তি, নাকি সেটা নির্ভেজাল সাদামাটা গলা, হাসিব বুঝতে পারল না। বুঝতে না পারার কারণে তার অস্বস্তি হলো। এমনিই এতদিন পর বাবার কাছে এসে তার ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, ঠিক অস্বস্তিও হয়তো সেটা না, সে সহজ হতে পারছে না, একটু সময় লাগবে, সে জানে, এই সহজ হতে না পারার সঙ্গে বাড়তি কিছু অস্বস্তি যোগ হলে ঝামেলা! সে বলল—বাবা, এটাই বোধহয় নিয়ম। এভাবেই সম্পর্কগুলো থাকে না।
আবার থাকেও। থাকে না? বল।
থাকে। হাসিব স্বীকার করে মাথা ঝাঁকাল।
তা হলে নিয়ম বলে কিছু নেই। ওই যে হঠাত্ সম্পর্ক তৈরি হয়, সে সম্পর্ক বড় হয়ে ছড়িয়ে যায়, তারপর সেটা নানা অবস্থায় থাকতে পারে—অবিকল থাকা, কিছুটা থাকা, কিছুটা না থাকা—নিয়ম বলে কিছু নেই। ... নিয়ম শুধু এখানে আছে, মানুষ, না শুধু মানুষ কেন, জগত্ জুড়ে প্রাণী সকল, জন্মানোর পর একটা সময়ে এসে মারা যাবে। কেউ আধা দিন বাঁচবে, কেউ একদিন, কেউ দেড়দিন, কেউ একশ বছর। ... হাসিব?
হাসিব, যদিও বুঝতে পারল না কী প্রশ্নের উত্তর তাকে দিতে হবে, সে ব্যস্ত হয়ে উঠল—জি বাবা, বলো।
তুই কেমন আছিস? মানে, তুই কেমন ছিলি বাপ? বেঁচে থাকতে ভালো লাগত তোর, সব সময়? কখনো কি মনে হয়েছে মরে যাই?
হাসিব তাকিয়ে দেখল বাবার মুখে মিষ্টি মিষ্টি হাসি। বাবার এই হাসিটা সে ছোটকাল থেকে চেনে। এই হাসির অর্থ—খুব মজা হচ্ছে। এটা বাবার প্রিয় হাসি। এই হাসি বাবাকে সে বহুবার হাসতে দেখেছে। সে বলল—আমার ধারণা প্রাণিজগতে শুধু মানুষেরই কখনো কখনো মনে হয়—মরে যাই, আর কোনো প্রাণীর হয় না, আর এমনিতে সব প্রাণীই বেঁচে থাকতে খুব ভালোবাসে। ওই যে ছোট পিঁপড়া, একই রকম নিরস একটা জীবন ওর, একটু টিপে দিও, দেখবে বেঁচে থাকার জন্য পালাতে অস্থির।
তোর মা পিঁপড়া দেখতে পারত না। কিন্তু মানুষ খুব ভালো ছিল। অমন মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।
দেখো বাবা, পিঁপড়া পছন্দ না হওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। আবার কোনো কারণ ছাড়াও হতে পারে এটা।
কারণ ছিল। ... আমি সেই কবে গ্রাম ছেড়েছি, তোদের বলেছি মাঝে মাঝে। তোর দাদা ছিল বিলাসী ও স্বার্থপর মানুষ। আমরা তার ৪ ছেলে ১ মেয়ে, আমাদের নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা, আয়দায় নেই। সে আছে তার মতো। আমরা যাই তার কাছে, তার কাছে পৌঁছাতে পারি না। তাকে পাই না। আমরাও তাই একসময় আমাদের মতো করে থাকি। কিন্তু স্বার্থপর নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত বাবা, স্বার্থহীন আধা-পাগলি মা-র সংসারে থাকাই কঠিন। আমাদের একমাত্র বোনটা আত্মহত্যা করল। হাসিব, তুই তোর ফুফুকে কখনো দেখিসনি। দেখেছিস?
হাসিব, নিজেও বুঝল না কেন, কিছু কুণ্ঠাবোধ করল—না বাবা।
আমার ছেলে তুই, কিন্তু আমার বোনকে তুই দেখিসনি। আমার মাকে দেখেছিস? তোর দাদীকে?
হাসিব তাকিয়ে দেখল লুত্ফর রহমানের মুখে সেই হাসি। তা হলে কি অস্বস্তি বোধ করার কিছু নেই? হাসিব বলল—কী করে দেখব বাবা!
তা ঠিক। সেটা সম্ভব ছিল না বাপ। কিন্তু তোর দাদীকে দেখিসনি, তোর ফুফুকে না, এটাই কথা। কিন্তু তারা ছিলেন। ... ওহ, দাঁড়া, তোর দাদাকে তোরা দেখিসনি। আচ্ছা, দেখিসনি দেখিসনি, তাতে কোথাও কিছু থেমে থাকেনি। কতজন তাদের বাবা-মাকেও দেখে না। তাদেরও কিছুই থেমে থাকে না। ... যা বলছিলাম। ... কী বলছিলাম, বাপ?
তোমার ছোটবেলার কথা বলছিলে, মা যে পিঁপড়া অপছন্দ করত এটা বলছিলে।
হুঁ। তোর ফুপু আত্মহত্যা করল। তোর দাদা ব্যাপারটা সহজভাবে নিল, যেন এটা রোজকার একটা ঘটনা। শুধু থানা পুলিশে ঝামেলা বোধ করল। আর তোর দাদী ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে পথের লোকজনকে জনে জনে ডেকে আহলাদের সুরে সুরে বলতে লাগত—এ-ই, জানো জানো, আমার মেয়ে না আত্মহত্যা করছে।
তুমি এসব বলেছ বাবা। কয়েকবার বলেছ।
আবার বলতে ইচ্ছা করছে। ... আমি বাড়ির বড় ছেলে। বাড়ির বড় ছেলেরা দায়িত্ব নেয়। আমি কী করলাম? আমি পালালাম। কেন পালাচ্ছি—সেটা জানি, কিন্তু এই পালাচ্ছি তারপর কী করব, তা জানি না—এই অবস্থায় পালালাম। আমার কোনো দুঃখ হলো না। এই গল্পও বলেছি। তা-ই না?
বলেছ, বাবা। তুমি এসব গল্প মাঝে মাঝে বলতে।
কিছু কিছু অংশ বলতাম না। পালাবার সময় আমি ভেবেছিলাম, আমি আবার এখানে ফিরে আসব। শহরে গিয়ে আমি অনেক টাকা-পয়সার মালিক হবো। একটা গাড়ি কিনব। তারপর সেই গাড়িতে করে টাকা-পয়সা নিয়ে ফেরত আসব। ... হাসিব, এই অংশটা তোদের কখনো বলিনি।
তুমি খালি হাতে বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছিলে। কম তো কিছু করোনি বাবা।
শহরে থেকে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করেছি আর কি। নতুন জায়গায় থিতু হওয়া। যা বলছিলাম—পালালাম। পালাবার পথে শুধু রতন আখঞ্জির সঙ্গে দেখা হলো। আমাদের গ্রামেরই মানুষ। বাবার কিছু ছোট। অবস্থা আমাদের চেয়ে খারাপ। গ্রামের অনেক লোক অবশ্য তাকে জমিদার বলে খেপাত। কারণ তার জমি ছিল অনেক। অনেক মানে অনেক। তবে সেসব জমি খানা-খন্দক আর বনজঙ্গলে পড়েছে, কিছু পড়েছে গ্রাম থেকে বাইরের দিকে। এই জমি তার কোনো কাজে লাগত না। যা-ই হোক, এই রতন আখঞ্জি আমাকে জিজ্ঞেস করল—এই ভোরবেলা কই যাও? আমি বললাম—এই তো। তিনি বুঝলেন এই এই তো মানে কী। জিজ্ঞেস করলেন—ফিইরা আসবা তো? তিনি যে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ফিরে যাব কিনা, আমার ফিরে যাওয়া নিয়ে তাকে যে কিছুটা চিন্তিত মনে হলো, তা আমার জন্য ভালোবাসা থেকে না। সেটা তার কন্যার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। তার ইচ্ছা ছিল তিনি তার কন্যা লায়লার সঙ্গে আমার বিবাহ দেবেন।
বাবা, ধরো, তুমি বাড়ি থেকে পালালে না, গ্রামেই থেকে গেলে, আর রতন আখঞ্জির মেয়ে লায়লার সঙ্গে তোমার বিয়ে হলো... এমনও হতে পারত।
পারত। অনেক রকম হতে পারত। কিন্তু আগে থেকে আমরা কেউ জানি না কেমন হবে। ... এখন হাসিব, যা বলছিলাম, আমি তো শহরে চলে এলাম, অচেনা শহর... এই অচেনা শহর আমার চেনা হয়ে গেল। নিজ গ্রামে আমার আর ফেরা হলো না। ... হাসিব, আমাদের বাড়িটা কি ওরকমই আছে। হালকা নীল রঙ, দেড়তলা, লম্বা একটা ছাদ, নিচে অনেকটা বাগান। তোরা কেউ বাগানে বসে থাকিস?

এ শহরের কোনো ভবিষ্যত্ আছে, অদ্বিতের সেটা মনে হয় না। সে অবশ্য এখন এ শহরের কথা ভাবতে চায়নি। সে বাবার কথা ভাবতে চেয়েছিল। হাসিব মাহমুদের কথা। সে অঞ্জন চাচা চলে যাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ ছিল মা, জাবিন আর শাফিকের সঙ্গে। কাকে কাকে দাওয়াত দেওয়া উচিত, আরও কাকে কাকে দাওয়াত দেওয়া যায়—এসব আলোচনার এক ফাঁকে সে উঠে দাঁড়াল। বাকি তিনজনই তার দিকে ফিরে তাকাল—কী হলো।
সে মাথা নাড়ল। তার কিছু হয়নি। আসছি, একটু—সে বলল। ঘরে এসে সে শুয়ে পড়ল বিছানায়। সে বুঝল তার খারাপ লাগছে। বাবার জন্য তার খারাপ লাগছে। একটা মানুষ, পুরো একটা মানুষ, ছিল, হঠাত্ নেই। আর সে মানুষটার ওপরই তার নির্ভরশীলতা ছিল বেশি। সে যখন আসক্ত হয়ে পড়ল, ওই মানুষটাকেই সে সবচেয়ে কাছে পেয়েছিল—বাবা, অনন্ত, বাবা, এসব খেলে কী হয় বাবা? আর না খেলেই বা কী হয়?
অদ্বিত এখন বোঝে, তখন তখনই কাজ করেনি বাবার ওই কথা, তবে বাবার ওই কথাই একটু একটু করে তার ভেতর কাজ করেছিল—খেলে কী হয়? আর না খেলেই বা কী হয়?
একসময় এই জিজ্ঞাসা সে নিজের দিকে ক্রমাগত ছুঁড়তে আরম্ভ করেছিল। তারপর এই দুইয়ের পার্থক্য যখন বিলীন, সে বাবাকে বলেছিল—বাবা, তোমার ওই কথাটা অনেক জরুরি ছিল।
বাবার মনে ছিল কোন কথা, বাবা তা-ই বুঝতে চেয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল।
ওই যে, তুমি আমাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতে—খেলে কী হয়, আর না খেলেই বা কী হয়?
জিজ্ঞেস করেছিলি নিজেকে? উত্তরটা পেয়েছিস?
জিজ্ঞেস করেছিলাম। কতবার! কিন্তু উত্তর পাইনি।
একটু নিরাশ লেগেছিল বাবাকে, অদ্বিতের মনে আছে, সে হেসেছিল, হেসে বলেছিল—উত্তর যখন পেলাম না, তখন কী করলাম জানো? খাওয়া ছেড়ে দিলাম।
ছেড়ে দিয়েছিস! অদ্বিত, বাবা...?
বাবা, সত্যি। এই তো এক সপ্তাহ হলো। তোমাকে আগে বলতে পারতাম। বলিনি। আমার নিজের বোঝার ছিল—সত্যিই ছেড়েছি কি না।
বাবা বলেছিল—চল, ছাদে যাই। হঠাত্ করেই বলা—চল, ছাদে যাই।
তারা ছাদে গিয়েছিল। বাবা তার কাঁধে হাত রেখেছিল। তারা হাঁটতে হাঁটতে গল্প করেছিল অনেক। সে নানা রকম গল্প।
আজ, এই একটু আগে, বাবার কুলখানিতে কাকে কাকে বলা হবে, এই আলোচনা করতে করতে তার হঠাত্ সেই বিকালের কথা মনে পড়ল—সে আর বাবা ছাদে হাঁটছে। এই দৃশ্য চোখের সামনে উঠে এলে তার মন খারাপ হয়ে গেল। সে উঠে এল ঘরে, বিছানায় শুয়ে পড়ল, ভাবল, চোখ বন্ধ করে বাবার কথা ভাববে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখল, সে বাবার কথা ভাবতে ভাবতে সে ভাবছে—এ শহরের কোনো ভবিষ্যত্ নেই। এত আন্তরিকভাবে কোনো শহরকে মেরে ফেলা হয়েছে কি না, তার জানা নেই।
এ চিন্তাটা অদ্বিত মাথা থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করল। কেন হঠাত্ এটা ভর করল—তাও সে বোঝার চেষ্টা করল। তার মনে হলো—অঞ্জন চাচা চলে যাওয়ার পর থেকে এ চিন্তাটা তার ভেতর আসা-যাওয়া করছে। অঞ্জন চাচার উদ্দেশ্যটা সে জানে। কখনো স্পষ্ট করে কিছু বলেনি, কিন্তু কিছু হিসাব মিলিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে খুব একটা বুদ্ধি লাগে না। আর, আজ চাচার আসার ও কথা বলার ধরন, এসব দেখে সে অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে। চাচার অবশ্য খুব একটা নমনীয় হওয়ার দরকার নেই। তার ধারণা, টাকা-পয়সার বড় ধরনের প্রস্তাব পেলে সবাই রাজি হয়ে যাবে। মা হয়তো একটু, কিংবা একটু বেশিই গাইগুই করবে—মানুষটার স্মৃতি মানুষটার স্মৃতি। তবে কতদিন? ওদিকে যারা অ্যাপার্টমেন্ট কিনে এখানে বাস করছে, তাদের সংখ্যা কম, তারা নতুন ও আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টের লোভে রাজি হয়ে যাবে, কেউ কেউ যদি রাজি না হয়, তাদের সামলানো চাচার জন্য কঠিন হবে না।
তারপর কী হবে? এই অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং ভেঙে আরও নতুন আরও আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরি হবে। নানারকম সুযোগ সুবিধা থাকবে সেখানে। তারপর? তারপর এদিক ওদিক আরও কিছু অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং উঠবে। তারপর? তারপরও তা-ই। একটা শহর ঠিকমতো বিকশিত হওয়ার আগেই ধুঁকতে শুরু করবে।
ধুঁকুক। মরে যাক। হারিয়ে যাক। চাচার কী? অদ্বিত জানে, অঞ্জন চাচার কিছু না। এই গ্রুপটার কিছু না। সংখ্যায় বেশি না তারা। ৫ শতাংশ, নাহ, অত হবে না, আরও কম। তবে একটু নমনীয়ভাবে হিসাবটা করা যায়। অঞ্জন চাচা এখনো চূড়ায় ওঠেনি। চূড়ায় যারা আছে তারা ২ শতাংশ। এই ২ শতাংশের নিচে আছে ৫ শতাংশ। বাংলাদেশটা তাদের। এই যে ‘তাদের’, এটা অনেকটা প্রাচীনকালের ধারণা অনুযায়ী। প্রাচীনকালে মানুষের শিকারের ভূমি ছিল, পশুর চারণভূমি ছিল। সেসময়ের মানুষ সেখানে শিকার করত, পশু চরাত, এভাবে বেঁচে থাকত, তবে ঠিক সেখানেই তাদের ডেরা হতো না, তাদের ডেরা হতো কিছু দূরে। সারাদিন চারণভূমিতে কাটিয়ে তারা ডেরায় ফিরে যেত। জীবিকা এক জায়গায়, বসবাস আরেক জায়গায়। এখন বাংলাদেশ চারণভূমি। যারা চরায়, তারা বেশির ভাগ সময় বিদেশে থাকে। এখন সুবিধা বেশি। চরানোর জন্য সারাদিন থাকতেও হয় না। কই, অঞ্জন চাচা থাকে? থাকে, মাঝে মাঝে, আরও কম থাকলেও চলে, কোনোসময় একদম না থাকলেও চলবে। তবে বাংলাদেশ চারণভূমি হিসেবে থাকবে। ... থাকুক, আমার কী—অদ্বিত বলল। আমার কিছুতে কি কিছু এসে যায়! আমি বরং বাবার কথা ভাবি। এই বলে সে বাবার কথা ভাবতে গেল। সে দেখল, বাবার পাশাপাশি তার দাদার কথাও মনে হচ্ছে। যদিও দাদা লোকটার কথা তার কিছুই মনে নেই। দাদা যখন মারা গেছে, সে তখন কত ছোট!

লুত্ফর রহমানের কণ্ঠে হাহাকার—বাসাটা তোরা ভেঙে ফেলেছিস! ... আমার বাসাটা তোরা ভেঙে ফেলেছিস!
লুত্ফর রহমান এভাবে আর্তনাদ করে উঠবে, হাসিবের ধারণা ছিল না। সে বলল—বাবা...।
ভেঙে ফেলেছিস!
বাবা, শোনো...।
কী শুনব! তোরা তোরা বুঝলি না, ওটা আমার স্বপ্ন! আমি উদ্বাস্তু মানুষ ছিলাম, আমার ওপর চাল ছিল না, একটু একটু করে পয়সা জমানো, একটু একটু করে জমি কেনা...।
বাবা, এসব আমরা জানি। তুমি বহুবার বলেছ।
তারপরও? আমার স্বপ্নটা দেখলি না।
হাসিবের একবার ইচ্ছা হলো সে এরকম বলে—বাবা, বাড়িটা ভেঙে যখন বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট তোলা হচ্ছিল, তখন আমাদের ভেতরও স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নও বুঝতে হবে তোমাকে। সে অবশ্য এভাবে বলল না, কারণ বাবার সঙ্গে সে কখনো এভাবে কথা বলেনি। তা ছাড়া, সে মাত্র কিছুক্ষণ হলো এখানে এসেছে, এসেই ঝগড়ার মতো কিছু শুরু করে দেওয়া ভালো দেখাবে না। সে তাই মৃদু গলায় বলল—একটা ব্যাপার ভেবো দেখো বাবা। তোমার চার ছেলেমেয়ে। সবারই সংসার ছিল বা হবে। ওই বাসায় সবার জায়গা হয় ছেলেমেয়ে নিয়ে? তোমার জায়গা ছিল বেশ কিছুটা কিন্তু বাড়িটা বড় ছিল না।
আমি সবসময় ছোট গোছানো বাড়ি পছন্দ করতাম...।
সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তোমার প্রয়োজনটাও দেখতে হবে। তোমার ছেলেমেয়েদেরও ছেলেমেয়ে হবে, তাদেরও সংসার হবে। তখন কী হবে?
অত যুক্তি দিতে হবে না। যুক্তি দিলেই সবকিছু যুক্তিসঙ্গত হয়ে যায় না।
যুক্তি নয়, বাবা। একটু শুধু বোঝানোর চেষ্টা করছি। তুমি যখন ছিলে, তখন ঠিকই ছিল সবকিছু, গোছানোই। কিন্তু তুমি যখন থাকলে না, সবকিছু একটু একটু করে কেমন বদলে যেতে আরম্ভ করল। ... বোঝাতে পারব না। সবকিছু বলে বোঝানো যায় না।
হয়েছে বাপ। মুরুব্বিদের মতো কথা বলিস না।
হাসিব হাসতে আরম্ভ করল—বাবা, আমার বয়স মনে আছে তোমার?
আছে। এমন কিছু না। আরও কিছুদিন থেকে আসতে পারতি ওখানে।
আফসোস নেই বাবা।
তোর আফসোস সবসময়ই কম। ভাইদের মধ্যে তুই সবসময়ই একটু অন্যরকম। ... আচ্ছা, তোরা যে বিল্ডিংটা তুলেছিস, এখন আমাকে সেটার গল্প বল।
হাসিব বলতে আরম্ভ করল। একটু সময় নিয়ে একটু খুলেমেলেই বলল সে। গুছিয়ে বলল, যেন বাবা সহজে বোঝে। বাবার মনে না-বোঝার কোনো কষ্ট থাক, সেটা সে চাচ্ছে না। বাবা জিজ্ঞেস করল—তা হলে তোরা ভাইবোন এখন এক সঙ্গেই থাকিস, একই বিল্ডিং-এ?
হাসিব মাথা নাড়ল—না বাবা, ঠিক সেরকম না। ধরো আমরা ৪ ভাইবোন সবাই দুটো করে অ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছি। আমার দুই ছেলে থাকে আমার সঙ্গে, থাকে মানে আছে ওরা এখানে। আরেকটা ভাড়া। ওটার পয়সা যায় সাদিয়ার কাছে, সাদিয়ার কথা মনে আছে বাবা? সাদিয়া সে পয়সা কিছু নিজে রাখে, কিছু শাফিক জাবিন আর অদ্বিতের মধ্যে ভাগ করে দেয়। শাফিকের একটা ছেলে হয়েছে, আর জাবিনের দুটো মেয়ে। অদ্বিত বিয়ে করবে কি না, বুঝতে পারছি না।
সব কত বড় হয়ে গেছেরে। ভাবলে কেমন অবাক লাগে। আমার ছেলে তুই, এই সেদিনও এই টুকুন ছিলি, আর এখন চলে এসেছিস আমার কাছে। ওদিকে তোর ছেলেমেয়েরাও বাচ্চার বাবা-মা হয়ে...।
ওদের জন্য খারাপ লাগে। ... তোমার দেখতে ইচ্ছা করে ওদের?
নাহ। ওদের কথা আমার সেভাবে মনে নেই। অনেকদিন হলো না! মন খারাপ করিস না। তোরও কিছুদিন পর ওদের জন্য মন খারাপ হবে না। কৌতূহল হয়তো থাকবে, কিন্তু আবেগ থাকবে না। আমার যেমন জানতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু বাড়তি কোনো টান অনুভব করছি না। করলে এখানে থাকা কঠিন হতো। হয়তো উঠে রওনাই দিতাম।
হুঁ। ... শ্যামলী, শ্যামলী একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে কিছুদিন আগে, হাসপাতালে আছে, আমার খবর পেয়েও আসতে পারেনি; শ্যামলী, পিকলু, অঞ্জনও দুটো করে ফ্লাট পেয়েছে। ওরা অবশ্য কেউ থাকে না। ভাড়া দিয়ে রেখেছে। ... বাবা, শ্যামলীর জীবনটা কষ্টের, অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওদের কোনো ছেলেপুলে হয়নি।
পিকলু কি আমেরিকায় থেকে গেল?
গেল। তুমি মারা যাওয়ার দেড় বছর আগে গেল। এই দেশ নাকি ওর ভালো লাগে না। তোমার মৃত্যুর খবর পেয়ে এসেছিল। তারপর আরও কয়েকবার। তবে ওসব নিছকই আসা। এর মধ্যে বছর সাতেক আসেনি। ওখানেই বিয়ে করেছে, ওখানেই ছেলেমেয়ে, ওখানেই নাতি-নাতনি...।
খুব অদ্ভুত, তা-ই নারে বাপ?
পিকলু বাবা সেই ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত।
না না, আমি সেটা বলছি না। আমার কথা ধর। আমি পাখিপুর গ্রাম থেকে এসে ঢাকা শহরে মিশে গেলাম, তোদের মা চর বরকত থেকে এসে আমার সঙ্গে মিশে গেল। আর আমাদের দুজনের তোরা না চিনলি পাখিপুর না চর বরকত। কোনো সম্পর্কও থাকল না। তোদেরই এক ভাই চলে গেল আমেরিকা, সে কতটা মিশতে পারল জানি না, তার ছেলেমেয়ে আর নাতি-নাতনি মিশে গেল। এদিকে তাদের আর কোনো যোগাযোগ থাকল না।
হাসিব মাথা ঝাঁকাল—খুব অদ্ভুত, বাবা।
অদ্ভুত। মানুষ কী না পারে আর কী না করে!
বাবা, অঞ্জনও ঠিক দেশে নেই। ... মানে আছে... আবার নেই।
এটা কী ধরনের ব্যাপার হলো!
ওর ওয়াইফ, ছেলেমেয়ে বিদেশেই থাকে। বছরে, দু-বছরে আসে।
এটা কী ধরনের সংসার?
অঞ্জন যায়। মাসে দু’মাসে। কখনো মাসে দুবার তিন বার।
এ তো অনেক খরচ রে।
অঞ্জনের কাছে খরচ না। বাবা, ওর অনেক টাকা হয়েছে।
ওর অবশ্য ছোটবেলা থেকেই খুব বড়লোক হওয়ার ইচ্ছা।
সেটা মনে আছে। বড়লোক বড়লোক গল্প করতেও ও খুব ভালোবাসত। তবে তুমি যেভাবে ভাবছ বাবা, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম না। ও অনেক বড়লোক হয়েছে। তুমি এ ধরনের বড়লোক দেখোনি।
ওহ! তা, কী করে ও?
ব্যবসা। সে তো বটেই—ব্যবসা। গার্মেন্ট রিয়েল এস্টেট, প্রথম দিকে কিছু ম্যান পাওয়ার করেছিল। অঞ্জন ব্যবসা ভালো বোঝে।
তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে অনেক টাকা করেছে ও।
বললাম না!
বললি। কিন্তু আমি যখন মারা গেলাম তখনো ও তেমন কিছু করে না। তারপর কতদিন আর গেছে। এর মধ্যে এত টাকা করে ফেলেছে!
হাসিব হাসতে আরম্ভ করল—বাবা, তুমি মারা গেছ ২৭ বছর।
হ্যাঁ, জানি তো। মনে আছে। তো?
বাংলাদেশে বড়লোক হতে ২৭ বছর লাগে না বাবা, ২৭ মাসেও হওয়া যায়।
লুত্ফর রহমান অবাক হলো—২৭ মাসে! বলিস কী! কীভাবে? ব্যবসা না ফটকা?

এ কদিনেও কোথাও কোনো সুবিধা করা যায়নি। টাকা দেবে যে লোক, বিদেশ থেকে ফিরেছে বটে, কিন্তু তার অভাব কাটেনি। অভাবী লোককে কিছু বলা যায় না। তবে কাকে বলা যায়; এ ভাবনাটা থেকেই গেছে। সময় কম সময় ফুরিয়ে আসছে। জাবিন একবার ভেবেছে, অঞ্জন চাচাকে সে পয়সার কথা বলবে। যে কয়টা পয়সা, সেটা চাচার জন্য অতি অতি তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু লোকটা খবিশ টাইপের। হয়তো দেবে না, দিলেও সুযোগ পেলেই কথা শোনাবে। এমনিতেই লোকটাকে পছন্দ করে না সে। তাদেরই একজন, তাকে কেন অমন বড়লোক হতে হবে!
আরেকবার শ্যামলীর কথা ভেবেছিল জাবিন। শ্যামলীর খালার খরচ কম। দুটো ফ্লাটের ভাড়া, সঙ্গে খালুর পেনশনের টাকা—হাতে বাড়তি কিছু টাকা তাদের থাকারই কথা। সমস্যা হলো—সময়টা ভালো না। খালা পা ভেঙে ক্লিনিকে পড়ে আছে, ভুগবে। এ সময় চাওয়া যায় না। শ্যামলী খালা অবশ্য কিছু কথাও তৈরি করে রেখেছে, জাবিন মাঝেমাঝেই তার ব্যবহার দেখেছে—ছেলেপুলে নেই আমাদের, কে দেখবে! টাকা যে আমাদের কত দরকার!
জাবিন আর রুম্মন ঠিক করল টাকাটা তারা মা-র কাছে চাইবে। এ সময় মা-র কাছে চাওয়াটা কেমন দেখায়, তারা জানে। কিন্তু তাদের প্রয়োজনটাও দেখতে হবে। এমন পরিস্থিতি না হলে তারা চাইতই না। আর, একদম নিচ্ছে না তারা, তারা ধার নিচ্ছে। এই যে ফ্লাট ভাড়া এখানকার, সেই টাকা মাসে মাসে মা-র কাছে চলে যাবে, মা যদি চায়।
মা-র কাছে চাইবার আগে জেবিন আর রুম্মন কিছু প্রস্তুতি নিল। সেটা কুলখানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর। জাবিন আগেই বলে রেখেছে, বাবার কুলখানির পর সে বাসায় চলে যাবে। তা, কুলখানি হয়ে যাওয়ার পর একসময় সবাই ক্লান্তি বোধ করার সুযোগ পেল, যে যার ঘরে, এর মধ্যে জাবিন আর রুম্মনের ঝগড়াটা লাগল। প্রথমে নিচু লয়ে, তারপর খুব অল্প সময়ে সেটা উঁচু হলো। তারপর একসময় জাবিনকে দেখা গেল চোখ মুছতে মুছতে সাদিয়ার ঘরে উপস্থিত—মা, তোমাকে একা কথা বলব। তুমি কিছু মনে করবে না। উপায় নেই বলে বলছি।
কথাটা বল। তোর বলা হলে আমি নামাজে বসব।
আমরা কিন্তু ঝগড়া করিনি। আমি আর রুম্মন। আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয় না। ওই যে একটু হৈ চৈ হলো না, ওটা আসলে দুজনের কষ্ট থেকে... দেখো মা...।
যা বলবি, বলে ফেল। আমার প্যাচাল ভালো লাগে না।
প্যাচাল কোথায়! জাবিন একটু ক্ষুণ্ন হওয়ার চেষ্টা করল। তবে কথাটা বললও সে। বলার আগে এদিক ওদিক সতর্কচোখে তাকিয়ে নিল। এ বাসায় বায়োনিক কানের একজন আছে, সেই ছোটবেলা থেকে, কিছু বললেই তা কীভাবে কীভাবে অদ্বিত্বের কানে পৌঁছে যায়! তা, এটাও যদি যায়, কিছু করার নেই, তবে সতর্ক থাকতে দোষ কী! চারপাশে কারও ছায়া দেখা গেল না, জাবিন তবু গলা নামিয়ে বলল, একটু ফিসফিস করে, একটু কান্না মিশিয়ে। শুনে সাদিয়া হতাশমুখে তাকাল তার দিকে—যেটা পারবি না, সেটা করিস কেন! তোদের ক্ষমতা আছে মেয়েকে বিদেশে পড়ানোর! পাঠিয়ে দিলি!
কী বলো মা! অত কিছু ভাবলে চলবে! ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বলে কথা। এটা একটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার মা!
হয়েছে। স্বপ্ন শেখাস না আমাকে। সারাজীবন অনেক স্বপ্নের ওঠানামা দেখেছি।
জাবিন কিছুটা দমলেও হাল ছাড়ল না—অর্চির ব্রেইন ভালো। রেজাল্ট ভালো। ও যখন বলল দেশের বাইরে পড়তে যাবে, আমরা কী করে না বলি, বলো।
কার যে কী ব্রেইন, বুঝি না ওসব। ... কত লাগবে?
জাবিন জানাল কত লাগবে।
আচ্ছা, দেখি। নাতনিদের ব্যাপার, যদিও তোর দুই মেয়ে আমাকে আড়ালে বুড়ি বলে ডাকে, ভাবে বিশাল মূর্খ, কিছুই বুঝি না...।
না না মা, কী বলো...।
বলেছি তো দেব। যা, নামাজে বসব।
জাবিন তখনই ঠিক করে নিল এই টাকা সে ফেরত দেবে না। কখনো দেবে না। নাতনির জন্য তার নানী কিছু টাকা খরচ করতেই পারে। মেয়ের জন্যও পারে। সুতরাং ফেরত দেবার কথা আসছে কেন, জাবিন নিজেকে বলল। বলে সে উঠল। উঠে ঘুরতেই সে অদ্বিতের মুখোমুখি, ধাক্কা প্রায় লেগেছিল, অদ্বিত সহজ গলায় বলল—দেখতে এলাম মা কী করছে। আপা, তোর বাণিজ্য হলো?
নেশা করেছিস? আবার? জাবিন খর চোখে তাকাল।
রেগে যাচ্ছিস কেন! বাণিজ্য খারাপ কিছু না।
ভাগ্নি... ভাগ্নি বিদেশে পড়ছে, কোথায় তার সুবিধার দিকে নজর রাখবি, আছিস মানুষকে খোঁচাতে।
এরপর অতিকেও নাকি পাঠিয়ে দিবি?
দেব। তোর সমস্যা?
না, আমার কিসের সমস্যা। তবে বুঝে শুনে পাঠাস, সেদিন দেখলাম ইংরেজি ভুল বলছে।
তুই, তুই একটা নেশাখোর। অতি ইংরেজি ভুল বলেছে!
হুঁ। বলেছে। ওর আর দোষ কী! স্কুলে যা শিখবে, তা-ই বলবে। বাসায় তুই আর দুলাভাইও ইংরেজি জানিস না।
তুই, তুই পারবি ওর মতো ইংরেজি বলতে?
পারব না। তরতর করে ইংরেজি বলার অভ্যেস আমার নেই।
এই এক ফ্যাশন শুরু হয়েছে দেশে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লেই তার সব খারাপ।
ওমা, আমি সেকথা কখন বললাম!
বলে তো। বলে দেশের কোনো খবর জানে না, দেশের কোনো খবর রাখে না, একুশে ফেব্রুয়ারি কী হয়েছিল তা জানে না, ২৬ মার্চ কী, তা জানে না...।
শোনো আপা, কথাটা ঠিক না। এটা ইংরেজি বাংলা মিডিয়ামের ব্যাপার না, এসব অনেকেই জানে না। বরং ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা বেশি জানলেও জানতে পারে। ওরা আসলে অনেক কিছুই বাংলা মিডিয়ামের চেয়ে বেশি জানে।
কথাটা মনে রাখিস।
আচ্ছা। অদ্বিত হাসি চাপল। তা হলে যাও তুমি। আমি মা-র সঙ্গে একটু কথা বলি।

শাফিক আর আনিকা কিছু কিছু নিয়ম মেনে চলে। তারা বলে ডিসিপ্লিনড লাইফের বিকল্প নেই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গোসল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার। সন্ধ্যার দিকে বাড়ির কাছের পার্কে হাঁটা। কোনোদিন সেটা সম্ভব না হলে রাতে খাওয়ার পর ছাদে উঠে কয়েক পাক। তারা বলে—জীবনটা গোছানো থাক।
শাফিক বাবার মৃত্যুর পর আজ প্রথম অফিস যাবে। চার দিনের ছুটি ছিল তার, ছুটি ছিল মানে অফিসে বলে রেখেছিল। টেলিফোনে সে অবশ্য খোঁজখবর রেখেছে। তবু জানে বিপুল পরিমাণ কাজ জমা হয়ে থাকবে। কাজ নিয়ে তার ভয় নেই। কাজ করতেই সে ভালোবাসে। কিন্তু এখন নাস্তার টেবিলে তার ক্লান্ত লাগছে। সে ছোট করে হাই তুলল, বলল—আনিকা, আমার ক্লান্তি কাটছে না।
স্বাভাবিক। গত কয়েকটা রাত তোমার একেবারেই ঘুম হয়নি।
কী করে ঘুমাব! চোখ বন্ধ করলেই বাবার মুখ।
হ্যাঁ! ... কোনো কিছুর ঠিকও ছিল না। ... তুমি অফিসে গিয়ে গাড়িটা ছেড়ে দিও।
কোথাও যাবে?
মা-র ওখানে। খুব সাফোকেটিং লাগছে। একটু ফ্রেশ এয়ার দরকার।
মা একা থাকবে। জাবিনও চলে যাবে...।
যাব না?
না না, যাও। এমন হতে পারে মা-র একা থাকতেই ভালো লাগবে। এ ক’দিন তো এত মানুষ...।
হুঁ। ... সাউদার্নের জমির ইন্সটলমেন্ট নেক্সট উইক, মনে রেখো।
নোট করা আছে। ... আনিকা...।
আনিকা তাকাল—কিছু বলবে?
হুঁ... বলব।
আনিকা তাকিয়ে থাকল।
বাবার মৃত্যুটা আমাকে অনেক নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।
আনিকা হাত বাড়িয়ে শাফিকের কাঁধে রাখল—খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
ঠিক সেটা না...।
তোমাকে ভালোও বাসতেন খুব...।
বাসতেন। ... আনিকা, মানুষের জীবন খুব তাড়াতাড়ি চলে যায়। মানুষের সময় আসলে খুব অল্প। হেসেখেলে পার হতে হতে হঠাত্ দেখা যায়—সময় শেষ।
আনিকা প্রথমে চুপ করে থাকল, তারপর বলল—থাক, এসব বোলো না।
দেখো, আমারও কিন্তু বয়স হয়ে গেছে। অথচ প্রখর এখনো কত ছোট...।
তোমার এমন কোনো বয়স হয়নি শাফিক। খামোখা এসব বলছ।
কিন্তু দিন তো পার হচ্ছে। পার হচ্ছে না?
বাহ! দিন পার হবে না?
অথচ মনে হয় জীবনে এখনো একটা টার্গেট সেট করতে পারিনি।
তুমি কেন এসব বলছ আমি বুঝতে পারছি না। টার্গেট আছেই। টার্গেট নেই?
শাফিক চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে দাঁড়াল। ছোট করে আরেকটা হাই তুলল—কয়েকটা দিন যাক। আমি একটু বেড়াতে যেতে চাই। অবশ্যই তুমি আমি প্রখর। বেশি দূরে না। এই ধরো, ভুটান। ঠিক আছে?

বাবা। হাসিব বলল। অঞ্জন প্রথমদিকে বলত বড়লোক হওয়ার প্রথম শর্ত নাকি বড়লোক হওয়ার ইচ্ছা।
বাংলাদেশের কথা বলেছে? কারও ইচ্ছা হলো আর বড়লোক হয়ে গেল?
না না, শুধু বাংলাদেশ কেন! ... আচ্ছা, দাঁড়াও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা বেশি প্রযোজ্য, তবে সব মিলিয়ে এটা ঠিক, মানে অঞ্জনের কথা অনুযায়ী—তোমার ইচ্ছা থাকতে হবে। ইচ্ছা না থাকলে ওটা হয় না।
দাঁড়া। লুত্ফর রহমান বলল। একটু ভেবে দেখি ওর কথাটা। লুত্ফর রহমান ভাবতে আরম্ভ করল। একসময় মনে হলো ভাবনায় সে সন্তুষ্ট—এর সঙ্গে একটা কথা যোগ করতে হবে। অঞ্জন যেটা বলেছে, সেটা ঠিক, তবে এর সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার আছে। তুই কি বলতে পারবি সেটা কী?
হাসিব ভাবল। ভাবল, কোনো সিদ্ধান্তে অবশ্য পৌঁছাতে পারল না। সে দুপাশে মাথা নাড়ল—না বাবা, বুঝতে পারছি না।
খুব সহজ। তুই যে জীবনে আছিস, সে জীবনের প্রতি তোর অনীহা থাকতে হবে। তোকে অপছন্দ করতে হবে সে জীবন। এই জীবন অপছন্দের, অন্য জীবন পছন্দের—এমন হতে হবে।
বাহ বাবা, সুন্দর করে বললে।
তুই অঞ্জনের কথা ভেবে দেখ। সেই ছোটবেলা থেকে ও অন্যরকম। ওর এটা চাই, ওর ওটা চাই। আমাকে টাকার জন্য চাপ দিত। বলত—মনমতো কিছু করতে পারি না। ... হাসিব, কথাটা সত্যি। আমার কথাই ধর, আমি যে জীবনে ছিলাম সে জীবন নিয়ে যদি সন্তুষ্ট থাকতাম, তবে আমার আর বেরিয়ে পড়া হতো না।
তুমি বড়লোক হওনি, বাবা।
বড়লোক হওয়া না-হওয়ার ব্যাপার না। আমি নতুন একটা জীবন শুরু করতে পেরেছিলাম, এটাই কথা। না হলে ওই পাখিপুরেই পড়ে থাকতে হতো। হয়তো ওখানেই কিছু করতাম। ছোটখাটো ব্যবসা বা আশপাশে ছোট চাকরি...।
বাবা, তোমার আর পাখিপুরে ফিরে যেতে ইচ্ছা করেনি?
এই তো ভাবনার মধ্যে ফেলে দিলি। ... আমার ইচ্ছা করত না। প্রথম প্রথম একটুও না। কী জন্য মনে পড়বে? ছেড়েই এসেছি। তখন আমি ব্যস্তও। শহরের জীবন সহজ কিছু না। বিশেষ করে অচেনা শহরে। কিন্তু আমি হেস্তনেস্ত না করে ফিরে যাব না, এটা ঠিক করাই ছিল। ফিরলে, কোথায় ফিরব, এ ভাবনাও ছিল। তখন তো খুব খাটাখাটনির সময়। লেখাপড়া শেষ হয়নি। সেটা করার চেষ্টা করছি, আবার টিকে থাকার জন্য পয়সা জোগাড় করতে হয়, সে শেষ চেষ্টাও করছি। ফিরে যাব কি যাব না, এটা ভাবারই সময় পেতাম না।
বাবা, ভাগ্যিস তুমি ফিরে যাওনি। হাসিবের মুখে হাসি।
কী হতো ফিরে গেলে?
জানি না। ... এই যে তুমি আর আমি কথা বলছি এখানে বসে, এটা বোধহয় হতো না।
লুত্ফর রহমান হাসল—তারপর যখন কিছুটা থিতু হয়ে বসলাম, একটু একটু করে কিছু পয়সাও এলো হাতে... বিয়ে করেছি, শহরের বাইরে কিছু জমিও কিনেছি...।
এখন আর শহরের বাইরে না বাবা, এখন শহরের নামকরা এলাকা ওটা।
জমি কিন্তু একবারে কিনতে পারিনি। প্রথমে ধর, দু কাঠা কিনলাম, তারপর আবার দেড় কাঠা, তারপর ধর আবার কিছু পয়সা এলো হাতে, আবার কিনলাম...।
শেষ পর্যন্ত বেশ অনেকটাই জমি কিনেছিলে বাবা। এখন শহরে দূরের কথা, শহরের আশেপাশেও তুমি একসঙ্গে এতটা জমি পাবে না। আর দাম? দাম কত সেটা উল্লেখ না করে হাসিব হাসল।
আমার ভাবলে অবাক লাগে। আমি যখন কিনছিলাম তখন ওটা নিচু এলাকা, ময়লা জমে থাকা, মানুষ ওখানে থাকবে ভাবা যায় না। কিন্তু আমার ওখানে কেনা ছাড়া সঙ্গতি ছিল না। আমি কিনলাম। আমার বন্ধুর মতো ছিল আবদুল করিম। করিম সাহেবও কিনলেন আরেকটু সামনে, তারপরও এদিক ওদিক কত জায়গা! মাঝে মাঝে আমি আর করিম সাহেব বলাবলি করতাম—আরও যদি পায়সা থাকত, আরও কিছু জমি কিনতাম। জমি কেনার মধ্যে মজা আছেরে—নিজের। কিন্তু জমির খোঁজ থাকলেও পয়সা ছিল না।
এখন উল্টো, বাবা। এখন পয়সা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে মানুষ, জমির খোঁজ নেই।
বুঝতে পারছি না। সে তো ধর, আমি বেঁচে থাকতেই কিছুটা দেখেছি...।
তারপর আরও ২৭ বছর চলে গেছে, বাবা।
সেটা একটা ব্যাপার। তবু বুঝতে পারছি, জমির খোঁজে দৌড়াদৌড়ি করছে, এরা কারা?
মানুষ বেড়েছে না? একদিন তুমি এসেছিলে, তারপর আরও কত মানুষ এসেছে। যারা এসেছে, থিতু হয়ে বসার পর তাদের সংসার বেড়েছে, বেড়েছে অঞ্জনদের সংখ্যাও। বড় জমি তারা কিনে নেয়, ভাগ ভাগ করে বিক্রি করে। কখনো বিল্ডিং তুলে বিক্রি করে। মানুষ কেনে। না কিনে যাবে কোথায়! থাকতে হবে না?
ঠিক। থাকতে হবে। এই থাকতে হবে ভেবে আমিও কিনেছিলাম। ফিরে যাওয়ার কথা আমিও ভাবতাম না। পরে যখন থিতু হলাম অনেকটাই, দু’কামরার বাড়িও করেছি, তুই হয়েছিস, শ্যামলী আরেকটু আগে... তখন কখনো পাখিপুরের কথা মনে হতো। মনে হতো, যাই ঘুরে আসি। ... মনে হতো এই আর কি...।
আমাদের নিয়ে গিয়েছিলে একবার...।
তখন আর কিছুই নেই। বাবা-মা বেঁচে নেই। ভাইরা আছে যদিও, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে। যেন অচেনা জগতের অচেনা মানুষ। আমিও, তারাও। ওদের ছেলেমেয়েরাও তোদের সঙ্গে সহজ করে মিশতে পারেনি, কিংবা তোরা পারিসনি। ... এরপর আর যেয়ে কী হবে!
আমার আবছা মনে আছে, কারও নাম মনে নেই...।
হয়তো দেখ, আমাদের এই শহরেই আছে।
এ শহরে! হাসিব মাথা ঝাঁকাল। হ্যাঁ, হতেই পারে।
ধর আমার বড় ভাই, হাবিবুর রহমান, হাবিবুরের ছেলে হয়তো লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নিয়েছে এ শহরে, কিন্তু লেখাপড়াও শেষ করেছে এখানে, এখানেই চাকরি পেয়েছে...।
হতে পারে বাবা। তারপর ধরো, আর ফিরে যায়নি। এখানেই সংসার হয়েছে, ছেলেমেয়ে হয়েছে। এমন হতে পারে, তিনি ফিরে গেলেও তার ছেলেমেয়েরা ফিরে যায়নি।
কিন্তু তোদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ওদের কখনো দেখা হয়নি।
হয়তো হয়েছে। কিন্তু জানা হয়নি। ... বাবা, এখন আর কেউ জানতে চায় না। আগে খুব আহ্লাদ করে জানতে চাইত না—ভাই, আপনার বাড়ি কোথায়? এখন খুব কম দেখি। কারও কোথায় বাড়ি, তা দিয়ে কার কী!
হ্যাঁ, কী! আমার বাড়ি পাখিপুর না কোথায়, তাতে কী?
তোমার হয়তো কিছু। কিন্তু আমাদের কী? আমাদের ছেলেমেয়েদের আরও কিছু না। ওদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, পাখিপুর কীভাবে যেতে হয়, ওরা বলতে পারবে না।
তুই পারবি?
আমি!
হ্যাঁ, তুই।
তুমি পারবে?
লুত্ফর রহমানের মুখে মিটিমিটি হাসি—আমি বোধ হয় পারব।
আমি পারব না। পাখিপুরের রাস্তা আসলে কোনটা?
এই ধর... আসলে অনেক রাস্তা দিয়েই যাওয়া যায়। তুই এদিক দিয়ে যেতে পারবি, আবার ওদিক দিয়েও যেতে পারবি...।
বাবা, তুমিও কি ভুলে গেছ?
আরে না। তোর নিজেরও কি মনে হচ্ছে না যদি কেউ যেতে চায়, অনেক রাস্তা দিয়েই যেতে পারে। এখান দিয়ে, ওখান দিয়ে কিংবা আরও অন্য কোনো খান দিয়ে...।
বাবা, আমার মনে হচ্ছে, তুমি পাখিপুর থেকে আসার রাস্তার কথা বলছ। পাখিপুরের আসার রাস্তা অনেক, কিন্তু আমি যাওয়ার রাস্তার কথা বলছিলাম...।
তুই কিন্তু এখনো আমাকে অঞ্জনের বড়লোক হওয়ার গল্প বলিসনি! সে গল্প বাবা, আমার চেয়ে অঞ্জন ভালো বলতে পারবে।
তবু। তোরও পারার কথা। ও বড়লোক হয়েছে, তুই ওর বড়লোক হওয়া দেখেছিস।
কিন্তু ভেতরের খবর আমি জানি না, বাবা। কত কি দেখি তা-ই না? দেখাটা কীভাবে দেখলাম, দৃশ্যটা কীভাবে তৈরি হলো তা কি আর বুঝি!
তা ঠিক। ঠিক। ... আচ্ছা বাপ, তুই যেমন এলি। অঞ্জনও কি আসবে? তাহলে ওর মুখ থেকেই শুনতে পারতাম।
একটু ভাবতে নিল হাসিব, পরমুহূর্তে বলল—আমি আসলে ভাবার ভান করছি। খামোখা। এখানে ভাবার কিছু নেই। না বাবা, ও আসবে না। ও কোথায় মারা যাবে, ও সেটা নিজেও জানে না। কেউই জানে না। ওর কথা আলাদাভাবে বলছি, ও হয়তো তখন বিদেশে, ওর স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের কাছে। আর ধরো, ওর কাছে গল্প কিন্তু এই একটাই—কী করে ও বড়লোক হলো। আর কিন্তু গল্প নেই। তুমি এই এক গল্পই শুনবে।
এটা অবশ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। ওর গল্প ওর মুখ থেকেই শোনা হয়ে গেল। তারপর কী? বলা তো যাবে না—বেশ, এখন তুই যা।
আসলে হলো কী—দেশ স্বাধীন হওয়ায় এই দেশের মানুষের খুব বড়লোক হওয়ার ইচ্ছা হলো। সুযোগও তৈরি হলো অনেক।
সময়টা আমি দেখেছি। লুত্ফর রহমান সম্মতি জানাল।
তুমিই বুঝবে।... ধরো ব্যাপারটা এরকম—দেশ স্বাধীন যখন হয়েছে, তখন কিছু একটা করতে হয়। কিছু একটা করার ইচ্ছা তার ভেতরে ছিল, আবার কিছু একটা করার ইচ্ছা তার সামনে থাকা সুযোগগুলোও তার ভেতরে তৈরি করে দিচ্ছিল।
জীবন কিন্তু অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছিল রে। আমার মনে আছে। কিন্তু নানা মানুষ নানাভাবে পয়সা কামাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম। পারমিট, লাইসেন্স, সাপ্লাই...।
তুমি মনে করে দেখো বাবা, এদের হাতে যখন বেশকিছু পয়সা চলে এলো, তখন এদের অনেকেই আবার স্থায়ী একটা ব্যবসা করতে চাইল। শুরু করলও অনেকে, তাদের কেউ কেউ টিকেও থাকল। এদের সঙ্গে পুরোনো ব্যবসায়ী পরিবারগুলোও যোগ দিয়েছিল। আমি চিনতাম কাউকে কাউকে, চিনতাম মানে নাম জানতাম। আমি আর কীভাবে চিনব!
এই এদেরই সঙ্গে একসময় মিশে গেল অঞ্জন। একেকটা সময় আসে, নানারকম সুযোগ নানাসময় তৈরি হয়, অনেকে আবার অপেক্ষায় না থেকে সুযোগ তৈরি করে নেয়, ঠিক কীভাবে এদের একজন হয়ে গেল অঞ্জন, তা তো বলতে পারব না বাবা, তবে অনেকটা এভাবেই...।

কী আনন্দ পাও বলো তো? অর্ণা তার কাছে জানতে চাইল। এই যে তুমি মানুষজনের পেছনে নিরীহ মুখে লাগো, তার পিত্তি জ্বালিয়ে দাও, জিনা হারাম করে দাও, কী আনন্দ পাও, বলো?
অদ্বিত মুখ আরও নিরীহ করে ফেলল—আমাকে বলছ?
দ্বিত, আমার কিন্তু মেজাজ চড়ে যাবে।
অদ্বিত বলল—ও। ... কোথায় যাবে?
কোথায় যাবে মানে!
তুমি না বললে তোমার মেজাজ চড়ে যাবে! চড়ে কোথায় যাবে?
গড! এই তোমার বাবা মারা যাওয়ার কারণে তোমার মন খারাপের নমুনা।
অদ্বিত চুপ করে থাকল। ততক্ষণে তাদের গাড়ি ভিড় পার হয়ে কিছুটা জায়গা পেয়েছে। অর্ণা গতি বাড়িয়েছে, তার স্টিয়ারিং ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে অদ্বিত চুপ করে থাকল। অর্ণা ফিরল তার দিকে—বলো। ... তোমার মন খারাপ শুনেই-না আমি তোমার জন্য সময় বের করলাম।
অদ্বিত বলল, অর্ণা, আমার সত্যিই মন খারাপ। বুঝতে পারছ না?
অর্ণা লেখাপড়া শেষ করে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসতে শুরু করেছে। তার অবশ্যই ইচ্ছা ছিল একদম নিজের মতো করে কিছু করার। তাকে বলা হয়েছে, পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে থেকে পারিবারিক ব্যবসার ভেতর থেকেও সেটা করা যায়। অর্ণা সেটা মেনে নিয়েছে—হ্যাঁ, সেটা সম্ভব। তাদের পারিবারিক ব্যবসার পরিসর ছোট নয়, সেটাও কিছুটা জেনে বুঝে রাখার ব্যাপার আছে। আপাতত সে সোমের ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। সোম বাবার সঙ্গে রাগারাগি করে বছর দুয়েক আগে বিদেশ চলে গেছে। এ দু-বছরে সে একবারও দেশে ফেরেনি। তারা গেলে অবশ্য দেখা করেছে, একসঙ্গে ঘুরেছে ফিরেছে। বছর দেড়েক ধরে চেষ্টা চলছে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার। সম্ভবত সোম এবার এসে পড়বে। এখন নিজের জন্য অনেকটাই সময় পাবে অর্ণা। সোমের বুদ্ধি অনেক, সে একাই ব্যবসার অনেক কিছু সামাল দিতে পারবে।
পাখিপুরে অর্ণাদের একটা কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল আছে। এটার মার্কেটটা অর্ণাকে দেখতে হয়। এই কাজটা খারাপ না। এটা নিয়ে তার একটা মিটিং ছিল আজ। অদ্বিত ফোন করে এমনভাবে মন খারাপের কথা বলতে লাগল, মিটিং তাকে শিফট করতে হলো। বাবা শুনলে রাগ করবে, কারণ বাবার এসব খুবই অপছন্দ। এই যে, তেমন কোনো কারণ ছাড়াই মিটিং শিফট করা, তেমন কোনো কারণ ছাড়াই টাকা খরচ করা—অদ্ভুত একটা জেনারেশন হয়েছ তোমরা। তোমরা টাকা খরচ করতে ভালোবাস কিন্তু টাকা ভালোবাস না। একদম নতুন বড়লোকদের মতো, টাকা নিয়ে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। বাবার সঙ্গে এসব নিয়ে টুকটাক লাগে অর্ণার, সোমেরও লাগত, লাগে দাদারও সঙ্গে, দাদার কথা আরও চাচাছেলা—এখানকার মাল ওখানে সরিয়ে দু-পয়সা কামিয়ে ফেলেছে, অন্যের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে পয়সা নিয়েছে, ট্যাক্স ছাড় করিয়ে জিনিস এনে তিন গুণ দামে বিক্রি করেছে, আমার নাতি-নাতনীদের আচরণ সেই ফড়িয়াদের মতো কেন! দাদার নাক খুব উঁচু, প্রায় সবগুলো ক্লাবেই যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে—কেন যাব, কোনো কারণ ছাড়াই পয়সার ঝনঝন আওয়াজ শোনাতে চায়; সন্ধ্যাবেলা সকালবেলা ড্রেস পরে হাজির হয়ে খামোখা ঠা ঠা করে হাসতে আরম্ভ করে আর হিল্লি দিল্লি মারে। ওদের গায়ে গন্ধ, ওরা যেখানে থাকে, সেখানে বসা যায় না। আমার ক্লাবে যাওয়ার দরকার নেই। বাবা অবশ্য ঠিক অতটা না। তার এই নতুন ক্লাসটার সঙ্গে ওঠাবসা আছে—একদম বিছিন্ন থাকা সম্ভব না। ক্যাশের বিশাল একটা অংশ তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগও ভালো। বাবা যতই এদের লুটেরা বলুক, এদের কাছ থেকে খুব একটা দূরে থাকা উচিত হবে না। এদের সঙ্গে চার পেশের সম্পর্ক না থাকুক, এক পেশের রিলেশন রাখতে হবে।
আজ একটা মিটিং ছিল মার্কেট এক্সপানশন নিয়ে, বাবা এটা জানে। সে মিটিং শিফট করেছে, বাবা এটাও জানবে। এই রিস্ক সে নিয়েছে অদ্বিতের জন্য। সমস্যা হচ্ছে, অদ্বিতের জন্য রিস্ক নিতে তার ভালো লাগে। হ্যাঁ, এটাই সমস্যা। কেন কারও জন্য রিস্ক নিতে ভালো লাগবে! বিশেষ করে, যখন বোঝা দায়, যার জন্য রিস্ক নিল সে সেটা কতটা বুঝল আর মূল্য দিল, এটাই বোঝা দায়। অদ্বিতের একটা সমস্যা হচ্ছে, জীবনে সবকিছুই সে প্রাপ্য ভেবে বসে আছে। তবে প্রাপ্যর জন্য তার আহাজারি নেই, পেলাম না—ঠিক আছে, পেলাম না। সে যে অর্ণাকে ফোন করে তার মন খারাপের কথা বলছিল, যদি অর্ণা না আসত, অর্ণা যদি না আসত, তার মিটিং-এর কথা বলত, পরে দেখা করার কথা বলত, অদ্বিত ভাবত—আচ্ছা, ঠিক আছে, অর্ণা এলো না, এলো না। সে রাগ করত না, অভিমান পুষে রাখা দূরের কথা। কিন্তু ওই যে কথা—অদ্বিতের জন্য রিস্ক, আচ্ছা, ‘রিস্ক’ শব্দটা সে না হয় বাদ দিল, ওর জন্য নিয়মের বাইরে যেতে ভালো লাগে। ফলে অদ্বিত মন খারাপের কথা বলল আর সেও মিটিং সরিয়ে চলে এলো। তারপর রাস্তায় অদ্বিতের নিরীহ মুখের ইয়ার্কি ফাজলামো দেখে সে মহাবিরক্ত।
তারা একটা ভিড়ের মধ্যে পড়েছিল। ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে একটা গাড়ি মৃদু ধাক্কা দিয়েছিল। মৃদুই। এসব নিয়ে ভিড়ের মধ্যে কেউ মাথা ঘামায় না। কিন্তু অদ্বিত গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিল। অর্ণা প্রিমিও নিয়ে বেরিয়েছে, পেছনের গাড়িটা বিশাল জিপ। চালক মাঝবয়সী সুদর্শন। মৃদু ধাক্কার ব্যাপারটি তিনিও খুব সহজভাবে নিয়েছেন। এই যে মৃদু হলেও ধাক্কা দিয়েছেন সামনের গাড়িটিকে, এটা কোনো ব্যাপার না। অদ্বিত পেছন ফিরে দুবার তাকাল, বলল—ভাব নিচ্ছে। বলে সে গাড়ি থেকে নেমে গেল। গাড়ির কাচ নামাল অর্ণা। চারপাশে মৃদু শোরগোল, হাতের ইঙ্গিতে পেছনের জিপের চালককে কাচ নামানোর ইঙ্গিত করল, তারপর বলল—আপনার গাড়িটা দেখছি বিশাল! বিদেশি, না? নিপাট, নিরীহ ভদ্রলোকমার্কা প্রশ্ন, যেন অদ্বিতের জানার খুবই কৌতূহল। প্রথম প্রশ্নেই পেছনের গাড়ির চালককে একইসঙ্গে বিরক্ত ও বিব্রত মনে হলো। অদ্বিত বলল—একটা কথা কিন্তু আছে। গাড়ি ইম্পোর্টেড হলেও, ব্রেক কিন্তু লোকাল। বদলিয়ে নেওয়া যায় না? পেছনের গাড়ির চালক কী উত্তর দেবে, বুঝতে না পেরে একসময় জানালার কাচ উঠিয়ে দিল, এই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে উত্সাহী মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। তাদের কেউ কেউ উঁকি মেরে অর্ণাকেও দেখছে, তার কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে। অদ্বিত, প্লিজ—অর্ণা বলল। অদ্বিত গাড়িতে ফিরল, যেন কিছুই হয়নি, এমন একটা ভাব, সরল গলায় জানতে চাইল—আমরা কোনদিকে যাব?
আমার মেজাজ তুমি গরম করে দিয়েছ। খুবই গরম। অর্ণা বলল—কী আনন্দ পাও এসব করে, বলো কী আনন্দ পাও?
তাদের বন্ধু ঝংকার তাদের এক অ্যাপার্টমেন্টে একটা কফিশপের মতো করেছে। শপ, তবে ওখানে কফি বিক্রি হবে না। যারা যারা ওখানে আসবে, তারা সবাই মাসে মাসে ডোনেট করবে, সে পয়সায় ওটা চলবে। ওটা ওদের আড্ডার জায়গা। ডেকোরেশন ও বসার অ্যারেঞ্জমেন্ট ঝংকার নিজ হাতে করেছে। অর্ণা এক টানে সেখানে নিয়ে গাড়ি থামাল। অদ্বিতের দিকে তাকাল মাথা নাড়ল—না, এখানে যাব না, এখানে যাব না। এখানে নানা ঝামেলা।
তোমার কি অফিসে জরুরি কাজ ছিল—অদ্বিত জানতে চাইল। মিটিং। তুমি জানো, কাজের সময় আমি অন্যকিছুতে সময় দিতে চাই না।
স্যরি বলা উচিত। কিন্তু তুমি জানো স্যরিট্যরি বলা আমার ঠিক ধাতে নেই।
বেলো না। তুমি স্যরি বললে কেমন যেন শোনায়।
হুঁ, জানি। কী কাজ ছিল তোমার?
তুমি শুনে কী করবে! অর্ণা বলল বটে এরকম, তবে সে অদ্বিতকে জানালও কী কাজ ছিল তার।
একটু ভেবে নিল অদ্বিত—একটা কাজ করবে?
কোথাও বসে কফি খাই। তারপর তুমি তোমার বাসার রাস্তা দেখো, আমি আমার অফিসের।
চলো, আমরা এক কাজ করি। পাখিপুর যাই।
পাখিপুর যাই মানে! পাখিপুর কেন যাব?
তোমাদের কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলটা ওখানে না? তোমার কিন্তু এই মিলের প্রোডাক্ট নিয়েই আজ মিটিং ছিল।
তো? আমার মিল দেখে কী হবে? আমার মিটিং প্রোডাক্টের প্রপার মার্কেটিং নিয়ে। মিল নিয়ে না। তা ছাড়া ওই মিল আমি দেখেছি। কয়েকবার।
তবু, আবার দেখলে। অনেক সময় ব্যাকগ্রাউন্ডটা দেখা জরুরি। তুমি হয়তো মিলটা এমনি দেখেছ, অনেকবার। কী দেখেছ—একটা মিল দেখেছে—কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডসহ দেখেনি।
কে বলল তোমাকে?
আমার মনে হচ্ছে?
অদ্বিত, আমার মনে হচ্ছে, এমনভাবে বলল অর্ণা তার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, হতাশ হওয়ার ভঙ্গিতে মাথাও নাড়ল একসময়—রাস্তা যদি ফাঁকা থাকে, তাও যেতে লাগবে আড়াই-তিন ঘণ্টা। আর জ্যাম থাকলে...।
আগে তো রাস্তাই ছিল না। ছিল?
কোনোরকম একটা ছিল। না থাকলে ওর খোঁজ পাওয়া গেল কীভাবে?
তারপর তোমরা যারা ওখানে জমি কিনে মিলটিল দিলে, সরকারের লোকজনকে ধরে ঘুষটুষ দিয়ে রাস্তাটা ভালো করে নিলে, না?
তা তো বটেই। মালপত্র আনা-নেওয়ার ব্যাপার আছে না! ভালো রাস্তা না হলে পোষাবে? ...
একটা মজার ব্যাপার শুনবে? দাদা ক্লাবে যাওয়া কেন বন্ধ করেছে জানো?
সে তো জানি কিছুটা
একটা ঘটনা আছে নির্দিষ্ট করে। আমার ধারণা সেটাই মূল কারণ। ...
আমার দাদাকে তো দেখেছ। তাকে একসময় অনেকে গ্রেগরি পেক বলত। পুরোনো বন্ধুরা যারা আছেন, তারা এখনো কেউ কেউ বলেন। এই যে পাখিপুরে কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল হলো, এটা দাদার বুদ্ধি। দাদা ব্যবসাটা ভালো বোঝেন, আমাদের সবার চেয়ে ভালো বোঝেন। হিসাব নিকাশ করে পাখিপুর খুঁজেও বের করেছিলেন তিনি। বাকিরা গেছে বেশ পরে, আমাদের মিল ততদিনে প্রোডাকশনে চলে গেছে। ... যাকগে, এখন গল্পটা বলি—
কাজেম হাসনাত রহমান এক সন্ধ্যায় ক্লাবে বসে আছেন। ক্লাবে আসা তিনি কমিয়ে দিয়েছেন। এখন মাঝেসাঝে আসেন, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না, নতুনদের সঙ্গেও। এই দেখা হওয়াটা কখনো কখনো জরুরি। তার অবশ্য বিরক্তি আছে। এখনকার পরিবেশ নিয়ে তার বিরক্তি আছে, এখনকার ছেলেরা পারে তো ক্লাবটাকে মাছের বাজার বানিয়ে রাখে। শুধু মদ খাওয়া, শুধু ফুর্তির গল্প বলা, শুধু বড় বড় গল্প করা। আজও চোখের সামনে ঘটনাগুলো এরকম। কাজেম হাসনাত রহমান বসেছেন, এটা ততদিন অলিখিতভাবে সিনিয়র জোন হিসেবে পরিচিত ছিল। তারাই বসতেন যারা এ ক্লাবটির বহু দিনকার সদস্য। ইদানিং এ ব্যাপারগুলো উঠে যাচ্ছে। একটু একটু করে উঠতি ছেলেগুলো এদিকটায় ঢুকে পড়ছে। তাদের অঙ্গভঙ্গি, তাদের অনেকের গায়ে ট্রেডার ট্রেডার গন্ধ, কাজেম হাসনাত রহমানের অসহ্য লাগে। কিন্তু কী উপায়, মাঝেসাঝে আসতেই হয়। সেও যে আছে, এটা বোঝানোর জন্য আসতেই হয়।
কিছু দূরের একটা টেবিলে বেশ হৈচৈ। একেকবার একেকজন কে কী বলছে আর বাকিরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ছে। কাজেম হাসনাত রহমান অপেক্ষা করছেন, তার তেমন পরিচিত একজন বা কয়েকজন চলে আসবে, সময় পার করা তার জন্য তখন আর সমস্যা হবে না। এমনিতে চেনাজানা লোকজন আছে কিছু কিছু, সালাম বা হাইহ্যালো চলছে, তবে তাদের পাশে বসিয়ে গল্প করতে তার ভালো লাগবে না। কারও খোঁজে কাজেম হাসনাত রহমান মাঝেমাঝেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন, কিছু দূরের টেবিল থেকে, যে টেবিলে হৈচৈ হচ্ছিল বেশ, একজন উঠে এলো। অল্প বয়স, অমার্জিত মুখ, পরনের পোশাক যদিও দামি, মানানসই নয়, হাতে পানীয়ের গ্লাস, তবে স্টেডি। দেখে পিত্তি জ্বলল কাজেম হাসনাত রহমানের, তবে তিনি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।
স্যার, আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?
পিত্তি জ্বলতে নিয়েছিল, কাজেম হাসনাত রহমান সামাল দিলেন, ছেলেটা ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করেছে। তিনি তার নাম বললেন।
আমি স্যার গালিব চৌধুরী। বাবা আজহার চৌধুরী। ... চিনতে পারছেন?
চিনতে পারার কথা? কাজেম হাসনাত চৌধুরী চেষ্টা করলেন, পারলেন না, তিনি দুপাশে মাথা নাড়লেন—স্যরি।
দাদাকে চিনবেন। আনোয়ারুল চৌধুরী। ... স্যার, আমরা পাখিপুরের জমিদার... মানে এখন আর জমিদারি কী... তবু... আপনি আমাদের জমি কিনেছিলেন...।
একটু সময় লাগল যদিও, কাজেম হাসনাত রহমান চিনতে পারলেন। তার বিরক্তি লাগল, আবার হাসিও পেল—জমিদার, না?
স্যার, ওসব জমিদারি অবশ্য পুরোনো দিনের কথা। ... শেষ জমিদার আসলে ছিলেন আমার বাবার দাদা রতন আখঞ্জি চৌধুরী।
তা, আপনি এখানে কী করছেন? স্যরি, ঢাকায়ই থাকছেন?
জি। এখানকার মেম্বার হলাম কিছুদিন আগে।
কাজেম হাসনাত রহমান বড়ই আশ্চর্য বোধ করলেন, এখন কারা কখন কীভাবে মেম্বার হয়ে যাচ্ছে, তারা জানতেও পারছেন না। আচ্ছা, সেটা দেখা যাবে, কিন্তু এ ছেলে মেম্বার হওয়ার মতো এত পয়সা পেল কোথায়!
তার মনে আছে পাখিপুরে তিনি বেশ কয়েকবার জমি কিনেছিলেন। এই গালিব চৌধুরী যে জমির কথা বলছেন, সেটা বোধহয় বছর বিশেক আগে কেনা। একদম একটা গ্রাম, গাড়ি নিয়ে সেখানে যাওয়াও কঠিন, গ্যাস দূরের কথা, বিদ্যুত্ও নেই, পাকাবাড়িও খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু এ জায়গা এরকম থাকবে না, এটা না বুঝলে ব্যবসায়ী হওয়া যায় না। তিনি পানির দরে এখানে জমি কিনলেন। সেটা এই ছেলের দাদা আনারুলের কাছ থেকে। আনারুলরা কি চৌধুরী ছিল? কাজেম হাসনাত রহমান হাসলেন, ছিল কি ছিল না, তাতে তার কী! তার মনে আছে, আনারুল লোকটার পায়ে ছিল ধুলো। তার সামনে কী কাচুমাচু অবস্থা, আবার একসঙ্গে এতগুলো জমি বিক্রি হবে বলে কী বিগলিত। দরটা পানিরই ছিল, তার কাছে, ওদের কাছে নিশ্চয় অনেক ছিল। তার দেখাদেখি পরের কয়েক বছরে আরও কয়েকজন ওখানে জমি কিনেছিল। হয়তো এদেরই জমি, কিংবা এদের মতো আর কারও। অ, সেই টাকায় এদের চেহারা বদলে গেল!
ছেলেটা তার বলার অপেক্ষায় থাকেনি, নিজে নিজেই উল্টোদিকের চেয়ারে বসে পড়েছে। কাজেম হাসনাত রহমান মনে মনে বললেন—এখন আর এসব আশা করে কী? তিনি ছেলেটাকে আবার একবার দেখলেন—কী করেন আপনি?
স্যার, আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।
সে দেখা যাবে। কী করেন?
আমার স্যার চীনের সঙ্গে কিছু ব্যবসা আছে।
হুমম। ... চীনের সঙ্গে...। আচ্ছা, আপনার দাদা যখন জমি বিক্রি করলেন আমার কাছে, মানে আমি যখন কিনলাম, তখন বয়স কত আপনার?
১৪। তখন স্যার তখন আমি আপনাকে দেখেছিলাম, আপনি খেয়াল করেননি।
অনেক আগের কথা। আপনি আমার চেহারা মনে রেখেছেন?
রেখেছি স্যার। বিশেষ করে নামটা। ওখানে জমি কেনা আপনিই শুরু করেছিলেন। ... ওখানে আমি যাদের সঙ্গে গল্প করছিলাম, তাদের একজন আপনার কথা বলল, বলল, আপনি আমাদের পায়োনিয়র ব্যবসায়ীদের একজন...।
তা-ই? তা, আপনার ব্যবসা কেমন চলছে?
ভালো। স্যার, ভালো। আমি পারশু আবার চীন যাচ্ছি।
একটা কথা, ব্যক্তিগত হয়ে যেতে পারে... ব্যবসা কি আপনার বাবা শুরু করেছিলেন, না আপনি?
সেদিন ক্লাব থেকে ফিরে এসে কাজেম হাসনাত রহমান ঘোষণা দিলেন, তিনি আর ক্লাবে যাবেন না।
স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে ধুলোমাখা পায়ে যারা একদিন জমি বিক্রি করে গদগদ হয়ে গিয়েছিল, তারা এখন তার পাশে এসে অবলীলায় বসে পড়ে।
অর্ণা অদ্বিতের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল—এই গল্পটা তোমার কেমন লাগল?
তোমার দাদা কি স্নব?
আমার দাদাকে তুমি দেখেছ। গল্পও করেছ। তোমার কী মনে হয়, স্নব?
কিছুটা। তবে তারচেয়ে বেশি নিজের অভিজাত্য সম্পর্কে সচেতন। অর্থহীন।
নিজের আভিজাত্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া অর্থহীন?
দেখো পাখিপুরকে তোমরাই বড় করে দিয়েছ। পাখিপুর এখন ছড়াবেই। কাঁচা টাকার কাছে অভিজাত্য দাঁড়াতে পারে না।
দাদা অবশ্য একটা ব্যাপারে খুব অবাক হয়েছিলেন। জমি তিনি অনেকটাই কিনেছিলেন। তবে সেটা অনেক টাকার ব্যাপার ছিল না...।
তোমার দাদার কাছে। যারা বিক্রি করেছিল, তাদের কাছে অনেক টাকা ছিল।
তা ঠিক। তা ছাড়া তারপর আরও অনেকেই কিনেছিল ওখানে।
ফলে ওখানে টাকা ওখানে গড়াগড়ি খেতে আরম্ভ করল। আর টাকা কী করে সে তুমি জানোই। টাকা মানুষকে বাইরে টেনে আনে। পাখিপুরও তাই ছড়িয়ে যেতে আরম্ভ করল।
খুব বেশিদিনের ব্যাপার না। অথচ এরমধ্যে লোকটা ক্লাবের মেম্বার হয়ে গেছে। মেম্বার হতে অনেক টাকা লাগে তুমি জানো। যত টাকা লাগে তত টাকায় তারা হয়তো জমিই বিক্রি করেনি। এদিক দিয়ে ব্যাপারটা বেশ অবাক করা।
বেশ অবাক করা। কিন্তু টাকাই দ্বিগুণ হয়, তিনগুণ চারগুণ হয়। যে লোকটার কথা বললে, তার বাবা বুদ্ধিমান ছিল। টাকা হাতে পেয়েই খরচ করতে আরম্ভ করেনি। বরং টাকা হাতে পেয়ে টাকার লোভে পড়ে গিয়েছিল।
তারপর বেশকিছু টাকা হয়ে যাওয়ার পর তারা এখন জমিদার হয়ে গেছে। অর্ণা হাসল।
তা হবেই। তারা নিশ্চয় বলবে না তাদের শুধু জমিই ছিল, কিন্তু সেই জমি কোনো কাজের ছিল না...।
কাজের ছিল না?
কাজের বানালে তোমরা, যখন কিনতে আরম্ভ করলে। তারা অবাক হয়ে দেখল জমির এত দাম! জমি বিক্রি করলে এত টাকা পাওয়া যায়। তারপর তারা ভাবল, তারা তা হলে জমিদারই ছিল। এই ভাবাকে তুমি নিশ্চয় ভুল বলবে না।
বেশ, ভুল বললাম না।
যে লোক আজ পেছন থেকে তোমার গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছিল, কে জানে সেও হয়তো কোনো পাখিপুরের লোক।
অর্ণা স্থির চোখে অদ্বিতের দিকে তাকাল—তুমি বললে ধাক্কা দিয়েছিল। তোমার এই ধাক্কা শব্দটা প্রতীকি?
অদ্বিত সামান্য হাসল—তোমাকে আমি খুব বেশি পছন্দ করি কেন, জানো?
না। বলো।
কারণ মাঝে মাঝে তুমি খুব শার্প।
মাঝে মাঝে?
মাঝে মাঝে। কারোর পক্ষেই সবসময় শার্প হওয়া সম্ভব না।
হুমম। ... ধাক্কা। আমাদের তা হলে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে।
চাচ্ছে না। ওটা হয়তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
ভয়ঙ্কর।
এখন বলো, যাবে পাখিপুর?
না।


লুত্ফর রহমান জিজ্ঞেস করল—তোর কী মনে হয়, জীবনে বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি পয়সার দরকার হয়?
হাসিব একবার তার বাবার দিকে তাকাল, চোখ ফিরিয়ে নিল, তারপর আবার তাকাল, তাকিয়েই থাকল।
লুত্ফর রহমান সামান্য হাসল—কী দেখিস?
তোমাকে।
আমাকে দেখিস?
কেন? তোমাকে দেখা যাবে না?
আহা, আমি কি তা-ই বললাম নাকি? কেন দেখিস?
কেন দেখি? ... বাবা, আমার খুবই অবাক লাগছে।
লুত্ফর রহমানকে কৌতূহলী দেখাল—অবাক লাগছে কেন?
তুমি আমার বাবা...।
আমি তোর বাবা, এই কারণে অবাক লাগছে?
হাসিব মাথা ঝাঁকাল—হুঁ।
লুত্ফর রহমান হেসে ফেলল—মানে কী!
মানুষের এই সম্পর্কগুলো বাবা। পারস্পরিক এই সম্পর্কগুলো। কেউ কারও কিছু ছিল না। তারপর কেউ কারও বাবা হয়ে যাচ্ছে, কেউ কারও মা, কেউ মামা কেউ চাচা। আবার দেখো, একসময় এই সম্পর্কগুলো থাকছেও না। তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে, এমন ইচ্ছা আমার ছিল, কিন্তু দেখা হবেই, এমন নিশ্চয়তা ছিল না।
মনটা খারাপ করে দিলি তুই, বাপ। ধর, তুই এলি, কিন্তু আর তো কেউ আসবে না। আমি আর তুই রইলাম এখানে পড়ে। দেখা হবে কথা হবে। অথচ দেখ, তোর মা-র সঙ্গে দেখা হবে না, তোর ভাইবোনদের সঙ্গে তোদের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে...। একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখ, তোর নাতি-নাতনি বড় হবে, তাদের ছেলেমেয়ে হবে, তাদের ছেলেমেয়ে, তাদের সংসার হবে, তাদের জীবন হবে, আমি সেখানে কোথাও থাকব না।
বাবা, শুধু নিজের কথা বলছ! আমিও থাকব না।
আমরা থাকব না।
কিন্তু সব থাকবে।
সেদিন তোর সঙ্গে আমার ছোটবেলা নিয়ে কথা হচ্ছিল। তারপর থেকে মাঝে মাঝে পাখিপুরের কথা মনে হচ্ছে। পাখিপুরের আমি কোথায় এসে শুয়ে আছি!
মা-র গ্রামের নাম কী বলেছিলে...?
মনে পড়ছে না। ধর, ওটাও এক পাখিপুর...।
পাখিপুরের মা কোথায় এসে শুয়ে আছে!
পিকলু কোথায় শুয়ে থাকবে, কে জানে!
বাবা, অঞ্জনের ব্যাপারেও ওই এক কথা।
সবার ব্যাপারেই এই এক কথা। কে কোথায় মিশে যাবে, কেউ জানে না। তুই দেখ, আমার বাবা, যেমন বাবাই হোক, কোথায় পড়ে আছে..., আমার মা আমার ভাইবোনরা, ধাত্ হাসিব, এসব কথা বলতে ভালো লাগছে না।
তোমার এখানে অনেকদিন হয়েছে বাবা। তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি মাত্র এলাম। আমার ওই পৃথিবীর কথা বেশি বেশি মনে পড়ছে।
আসলে কেউ না হাসিব, কেউ কারও না।
ওভাবে ভাবতে ইচ্ছা করে না, বাবা।
সব জীবনই আসলে আলাদা।
সব জীবন?
একটা বন্ধন থাকে বইকি, তবু, সব জীবনই আলাদা।
লোকটাকে সরল টাইপের মনে হয়। কিছু লোক এরকম থাকে। প্রথম দর্শনে যাদের সরল টাইপ মনে হয়, মনে হয় পৃথিবীর অনেক কিছুই তার বোঝার বাইরে, পরে দেখা যায় আসলে পৃথিবীর অনেক কিছুই সে বুঝে বসে আছে। এই যে আতাহার আলী, এই লোকটাকে অঞ্জন ধরতে পারছে না। আতাহার আলীকে তার কাছে পাঠিয়েছে রহমতুল্লাহ—একজনরে পাঠাইতে চাই আপনার কাছে, পারলে জায়গা দিয়েন। এটা একটা কথার কথা। কারণ রহমতুল্লাহ নিজেও জানে, অচেনা কাউকে জায়গা দেওয়ার কিছু নেই। এমনিতেও জায়গা সবাইকে করে নিতে হয়। সে নিজেও কি সেটা করে নেয়নি? ... উঁহু, তার জায়গা সে একা করেনি।
বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে কখনো কখনো সে বিরক্ত হয়ে উঠেছে। বন্ধুরা ঠিকই দু-পয়সা কামাচ্ছে, তার কিছু হচ্ছে না। আবার, এটাও ঠিক, দু-পয়সা কামানো ব্যাপারটাও তার পছন্দ হচ্ছে। দু-পয়সা কামালে তার পোষাবে না। তবে শুরু বলেও একটা কথা আছে। সে বন্ধুদের বলল—কীরে!
কীরে মানে কী? কী, কী?
আমার দেখি কিছু হয় না।
বইসা থাকলে হবে?
আমি বসে আছি! এটা কী বলিস?
লাইন তোকে কেউ দেবে না, তোকে বের করতে হবে।
মাঝখানে কিছু ম্যানপাওয়ার করেছিল সে। কাজটা করত আমান, তার স্কুলের বন্ধু, তার সঙ্গে ঘেষটাঘেষটি করে কিছু টাকা সে কামিয়ে ফেলেছিল। এমন কিছু টাকা না, কিন্তু টাকা। সে টাকা সে খরচ করেনি। ইচ্ছা করেছিল অনেকবার, কিন্তু সে নিজেকে সামলাতেও পেরেছিল। তবে টাকা কতদিন খরচ না করে ফেলে রাখা যায়, এই ভয়ও তার ছিল। হুট করে না কিছু সে করে বসে, আর টাকাগুলো নষ্ট হয়।
তার আগে হাসান রাজার সঙ্গে তার পরিচয়। হাসান রাজার কাছে তাকে নিয়ে গিয়েছিল হাসান রাজার খালাত ভাই, তার বন্ধু মির্জা—এই একটা, এই একটা উপকারই আমি তোর করব। তবে তোকে শুধু আমি নিয়েই যাব, তোর হয়ে আর কিছু করব না। বাকিটা করতে হবে তোকে। পারলে পারবি, না পারলে নাই। সে পেরেছিল। যদিও পারাটা মোটেও সহজ ছিল না।
হাসান রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল—ব্যবসা করবেন?
জি, ব্যবসা করার ইচ্ছা।
কেন?
এই কেনর কী উত্তর দেবে, তা নিয়ে সে বেশ চিন্তায় পড়েছিল। টাকা দরকার, জীবনে অনেক টাকা দরকার—এ কথাটাই কি সরাসরি বলবে? খারাপ শোনাবে না? নাকি বলবে, আসলে ব্যবসা করতে ইচ্ছা করে তার। ইচ্ছার একটা দাম আছে না? ইচ্ছা পূরণের জন্যই সে আসলে ব্যবসা করতে চায়।
হাসান রাজা তাকে নিশ্চুপ থেকে ভুরু নাচাল—বলুন।
চাকরি একটা করতাম। এত পুওর স্যালারি...।
পোষাত না?
না। একদমই না।
আরও অনেক আর্ন করা দরকার?
জি।
তা হলে ভালো স্যালারির একটা চাকরি করুন।
অঞ্জনের মনে আছে সে চুপ করে ছিল।
অমন কোনো চাকরিতেও পোষাবে না?
জি না।
অমন কোনো চাকরি করার যোগ্যতা আছে?
একটু সময় নিল অঞ্জন—না। ... আমি আসলে ব্যবসাই করতে চাই।
এখন যারা ব্যবসা করতে আসছে, তাদের অধিকাংশের অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো না। সম্ভবত আপনারও তা-ই?
এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না অঞ্জন। পরে সে জানতে পারে এই হাসান রাজা ছাত্র হিসেবে তুখোড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারত, বেশি বেতনের বড় চাকরি করতে পারত, তার ওদিকে মন নেই, তার ব্যবসায়ে মন।
হাসান রাজা বলল—তা বলুন এখন, আমি কী করতে পারি?
সেটা ভেঙে বলতে হবে কেন! এই ব্যাটা কি বুঝতে পারছে না সে কী করতে পারে?
আমাদের একটা বড় সমস্যা। আমরা ব্যবসা করতে চাই, কিন্তু কী ব্যবসা করতে চাই, সেটা জানি না। যেন একটা ব্যবসা হলেই হলো! এটা কোনো কথা হতে পারে না। যে ব্যবসা করতে চায়, তাকে নিজেকেই ঠিক করতে হবে কোন ব্যবসা সে করবে, কেন করবে এটার একটা ব্যাখ্যাও থাকতে হবে তার কাছে।
আমি গার্মেন্টস, মানে পোশাক তৈরির ব্যবসা করতে চাই।
কেন, আমি করি বলি?
না, সেজন্য না। আমি এটাই করব।
আপনি কি জানেন, দেরি করে ফেলেছেন। আমি শুরু করেছি ১৩ বছর আগে। এর মধ্যে আরও কত কতজন এসেছে এই ব্যবসা করার জন্য, আপনি সুবিধা করতে পারবেন না।
আমি এ ব্যবসাটাই করতে চাই।
কেন করতে চান? আমাকে বোঝান।
বোঝানোর খুব একটা বিদ্যা অঞ্জনের ছিল না। কিন্তু চারপাশে সে দেখছে, যে-ই ব্যবসা করে, তৈরি পোশাকের ব্যবসা করে। পরিশ্রম আছে শুরুতে, একবার লাইনে চলে এলে তখন অবশ্য পরিশ্রমটা গায়ে লাগে না, তখন নিজে পরিশ্রম করার প্রয়োজনও তেমন পড়ে না। অঞ্জনের এই ব্যবসাই পছন্দ, এই এটাই।
হাসান রাজা তাকে সাহায্য করেছিল। যতটুকু অঞ্জন আশা করেছিল, তারচেয়ে বেশিই করেছিল। কেন করেছিল, তার কোনো ব্যাখ্যা অঞ্জনের কাছে নেই। বারকয়েক তার ইচ্ছা হয়েছিল হাসান রাজাকে জিজ্ঞেস করবে। জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে সহযোগিতার কথা সে মনে রেখেছে। হাসান রাজা বেঁচে নেই, তার ছেলেরা কখনো দেশে কখনো বিদেশে থাকে, বাবার ব্যবসায় তাদের মন নেই, তারা আছে কম্পিউটার, সফটওয়্যার এসব নিয়ে, তাদের মজা নাকি ওখানেই। এদের সঙ্গে অনিয়মিত হলেও একটা সম্পর্ক সে বজায় রেখেছে। তাদের কাছে বলেছেও কয়েকবার তাদের বাবার সহযোগিতার কথা। অঞ্জন দেখেছে, এটার কোনো গুরুত্ব নেই তাদের কাছে।
যে লোকটা এসেছে তার সঙ্গে দেখা করতে, তাকে প্রথম দর্শনে সরল মনে হয়। আধাঘণ্টা কথা বলার পরও সরল মনে হয়, এমন কি দু’ঘণ্টা পরও। রহমতুল্লাহ বলেছিল, লোকটা ভালো, বুঝছেন? তা ভালো মানুষের প্রতি আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে, নাকি?
দায়িত্ব আছে কি না, অঞ্জন নিশ্চিত না। তবে হাসান রাজার কাছে সে সহযোগিতা পেয়েছিল, এটা সে ভোলেনি। সে মনে করে, তার কাছ থেকে কেউ সহযোগিতা পেলেও তার ভালো লাগবে। আর, সে তো ব্যবসার পথেই লোকজনকে আনতে চায়। অদ্বিতকেও আনতে চেয়েছিল, তার আগে শাফিককে। তা, শাফিক ধরাবাঁধা চাকরি ছাড়া কিছু বোঝে না, আর অদ্বিত সে কী বোঝে তা অঞ্জন বোঝে না।
লোকটার সঙ্গে বারতিনেক কথা হয়েছে তার। এখনো তার ভেতর কোনো ফাঁক-ফোকর দেখেনি সে। প্রথম পরিচয়ের দিনেই এমন একটা হাসি দিল—ভাই, একটা সত্য কথা বলব।
বলেন।
গরিবই ছিলাম। টাকা-পয়সা ছিল না। বাড়িতে ওয়েল্ডিংয়ের কারখানা ছিল দুইটা। তেমন ভালো ব্যবসা না, চলত।
তারপর কি গুপ্তধন পেলেন?
জি।
জি শুনে কৌতূহলী হলো অঞ্জন। লোকটা কি সত্যিই গুপ্তধন পেয়েছে? এ যুগে কেউ গুপ্তধন পায়! তা হলে ইয়ার্কি মারছে? লোকটার মুখ দেখে অবশ্য মনে হলো না ইয়ার্কি মারছে—গুপ্তধন। ... বাপজানের জমি ছিল, জমিতে ছিল বাঁশঝাড়, এইটা ছিল বাড়তি ইনকাম—বাঁশ বিক্রি। আবার ধরেন, লোকজন বিনাপয়সায়ও নিত। অনেক জায়গা অনেক বাঁশ, নিক লোকে, মানা করতাম না। আমরা ভাবতাম এটা বাঁশঝাড়ই থেকে যাবে সারা জীবন। আমার এক ভাই অবশ্য বলেছিল, ওখানে বাঁশ কেটে দোকান দিতে কয়েকটা, শুনে আমরা খুব হেসেছিলাম। আশপাশে নাই মানুষ, নাই বাড়িঘর, নাই কিছু। ওখানে কিসের দোকান দিব। আর কে আসবে সেই দোকানে।
বুঝলাম। বড়লোক হলেন কী করে? বাঁশ বিক্রি করে?
জমি। জমি বিক্রি করে। ওই বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে সরকারি রাস্তা তৈরি হলো। এই ধরেন এইখানে আমাদের জমি আর ঐখানে দিয়ে রাস্তা। সরকারি বড় রাস্তা, হাইওয়ে। আমাদের আর কিছু করা লাগল না।
খুনজখম, ঝামেলা হলো না?
তা কিছু হলো বটে। তখন আমাদের জমিরও কত দাবিদার কত দখলদার। সেসব আমরা সামাল দিতে পারলাম। তবে আমরা বেশি সময়ও ছিলাম না।
কী করলেন?
দাম বাড়ছিল হু হু করে। আমরা জমি বিক্রি করে দিলাম। অনেকে কিনতে চান। আমাদের যাকে পছন্দ হলো, তার কাছে বিক্রি করে দিলাম।
পরে বিক্রি করলে আরও অনেক বেশি পয়সা পেতেন।
তা পেতাম। কিন্তু ততদিন জমি রাখতে পারতাম কি না কে জানে! যার কাছে বিক্রি করলাম, তিনিও সেই একই কথা বলছিলেন। কতদিন রাখতে পারবা, হ্যাঁ? কতদিন রাখতে পারবা? আমরা বুঝলাম আমরা রাখতে পারব না। আমরা বিক্রি করে দিলাম। যে পয়সা পেলাম, অত পয়সা কোনোদিন একসঙ্গে দেখব, ভাবি নাই।
পুরোনো গল্প। অঞ্জন বলল। গত কয়েকবছর ধরে এই হয়েছে, এই হয়েছে।
এত বলতে পারব না। ... একটা কথা। জমি যিনি কিনলেন, তিনি গার্মেন্টসের ব্যবসা করেন। কাপড় কাটেন, সিলাই করেন আর বিদেশ পাঠান। আপনিও তা-ই করেন, না?
হুম। আমিও তা-ই করি।
জমি কি শুধু আপনারাই কিনেন? ... তা-ই তো শুনি। আপনারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে হলেও, যত জমি পান, সব কিনে নেন।
আমরা কিনি বলেই না, আপনারা বিক্রি করতে পারেন। তবে শুধু আমরা না, আরও কেউ কেউ কেনে। ওদের ব্যবসা আপনি বুঝবেন না।
যারা রাজনীতি করে, তারাও কিনে।
অঞ্জনের সৈকতের কথা মনে পড়ল। তাদের স্কুলের বন্ধু। তিন ভাইবোন। সারাজীবন তারা কেউ কিছু করল না। বাবা বেশ কিছু জমি, দুটো বাড়ি আর একটা মার্কেট রেখে গিয়েছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর তারা দূরের জমিগুলো বিক্রি করে দিয়ে টাকা ব্যাংকে রাখল, একটা বাড়ি ডেভলপারকে দিয়ে মার্কেট কাম অ্যাপার্টমেন্ট তুলল, বাকি বাড়িটায় তারা দু-ভাই থাকে। দু-ভাই প্রায়ই বলে—আমরা কেন কিছু করতে যাব! আমাদের দুটো মার্কেট আছে, কয়েকটা অ্যাপার্টমেন্ট আছে, আমরা কেন কিছু করতে যাব!
তারা যে বাড়িটায় থাকে, সেটার দিকে নজর পড়েছে এক রাজনৈতিক নেতার। নেতা আবার সংসদ সদস্য। পাখিপুর নির্বাচনে জিতে অধিকাংশ সময় শহরে থাকে। শহরে সে কিছু জমি কিনেছে আগেই, নির্বাচনে জেতার পর তার মনে হচ্ছে আরও কিছু জমি দরকার। তা, কেনার জমি শহরে আর তেমন নেই, কিছু আছে দখল করার। তা-ই নিয়ে কামড়াকামড়ি, যে পারে। সৈকত বলল—দোস্তো, সংসদ সদস্য ব্যাটার জ্বালায় দেখি অস্থির আছি। তারা যারা ব্যবসা করে বা সম্পত্তির মালিক, তাদের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা। তাদের বায়নাক্কার শেষ নেই—এই লাগবে ওই লাগবে। আমার বাড়ির কাজের মেয়েটা বিয়ে করবে, মা-বাবা মরা মেয়েটা, আমার কাছেই ছিল, ভালো একটা ছেলে পেয়েছি, বিয়ের খরচটা আপনি দিন না। তবে এটা কথার কথা, আবদার কতদূর পর্যন্ত যায়, তার একটা নমুনা মাত্র, সাধারণত এত ছোট আবদার তারা ধরেন না।
অঞ্জন জিজ্ঞেস করল—বাড়িটা রাখতে পারবি?
পারব। এতদিন রেখেছি না! কিন্তু কতদিন পারব সেটা কথা। চাপ লেগেই আছে। জমির সঙ্গে আছে বারো কাঠা জমি, এটাই সমস্যা, এক দুই কাঠা থাকলে সমস্যা হতো না।
কী করবি এখন, বিক্রি করে দিবি?
আমরা বসেছিলাম আলোচনা করতে। হয়তো দেব বিক্রি করে। তবে ওই নেতার কাছে না, অন্য কারও কাছে। ... মন খারাপ হবে, বুঝেছিস?
তা কিছুটা হবেই। এতদিন ধরে আছিস।
ঠিক সেজন্য নয়রে। মন খারাপ অন্য কারণে হবে।
সৈকতের আর কী কারণে মন খারাপ হবে, সেটা ধরার চেষ্টা করল, পারল না।
বাবা জমিটা কিনেছিল পানির দামে। একেবারেই পানির দামে। তারপর না হয় ৪০টা বছর গেছে। এখন আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি, এ জমির দাম আরেকটু বেড়েছে। ঠিক আরেকটু না, অনেকটুকু। প্রথমদিকে জমির দাম একটু একটু করে বাড়ত, এখন বাড়ে অনেকটুকু অনেকটুকু করে লাফিয়ে লাফিয়ে। ... বাড়ে, আর আমি হিসাব করি—আমরা তা হলে এত টাকার মালিক, আমরা তা হলে এত টাকার মালিক।
অঞ্জন হাসতে আরম্ভ করেছিল।
হাসিস না। ভাব একবার।
ভাবলাম। তা হলে আর বিক্রি করবি কেন!
শেষ পর্যন্ত রাখতে পারব না বলে। নানা রকম চাপ বাড়ছে, তুই জানিস। এই পাখিপুরের এমপি সাহেবই জান কয়লা করে দিল। ... অঞ্জন, মন্দ না এটা। ধর, এখন জানি আমরা, আমি এত শত কোটি টাকার মালিক। সে খাতা কলমে। যদি বিক্রি করে দেই, টাকা সরাসরি হাতে চলে আসবে। তুই ভেবে দেখ, বাবা বোধ হয় লাখ তিনেক টাকায় কিনেছিল। তারপর এত বছর আমরা এখানে থাকলাম, আর কিছুই করলাম না, বিক্রি করলে আমরা শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যাব। ... অঞ্জন, অত টাকা দিয়ে আমরা কী করব!
সৈকত যদি তাদের বাড়িটা বিক্রি করে দেয়, যে পরিমাণ টাকা একসঙ্গে হাতে পাবে, খরচ করার বুদ্ধি পাবে না সে, দেখা করতে আসা আতাহার আলীরও সেই একই অবস্থা। কিছু তফাত অবশ্য আছে দুজনের। সে সৈকতকে দেখছে ছোটবেলা থেকে। এখনই তার খুব আরাম-আয়েশের জীবন, সে কিছুই করে না, সে ঘোরাফেরা করে, টিভি দেখে সিনেমা দেখে, বেড়াতে যায়। বাড়ি বিক্রি করলেও এই এসবই করবে। আরও কিছু টিভি কিনবে, বাসা আরও কীভাবে আরামের ও চাকচিক্যের বানানো যায়, তা ভাববে, এখন হয়তো থ্রিস্টারে থাকে, তখন হয়তো বিদেশে গিয়ে ফাইভস্টারে থাকবে, ওর কাছে টাকা খরচ করার আর কোনো পথ জানা নেই, তার ভেতর প্রয়োজনই নেই। পাখিপুরে জমি বিক্রি করে আসা এই আতাহার আলীর টাকার পরিমাণ সৈকতের তুলনায় অনেক কম, অনেক কম, কিন্তু সে কিছু করতে চাচ্ছে। করতে যদি পারে, একটু একটু করে টাকা বাড়বে না তার? বাড়তে বাড়তে তার টাকা সৈকতের টাকার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে না? যদি নাও হয় অতটা, আতাহার আলীর টাকার শব্দ পাওয়া যাবে। অলস টাকার চেয়ে চলমান টাকার আওয়াজ সব সময়ই বেশি, ক্ষমতাও।
অঞ্জন আতাহার আলীকে জিজ্ঞেস করল—বলেন, কী পরিকল্পনা আপনার?
একটা ইউনিভার্সিটি দিতে চাই ভাই। এইটা ফাইনাল।
নাহ। ইউনিভার্সিটি বেশি হয়ে গেছে।
কী বলেন ভাই! কত লোকের টাকা হইছে, আমাদের পাখিপুরের দেখি কতজন ঢাকা শহরের ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চায়। আগে লোকাল কলেজে বিএ, এমএ কইরা খুশি থাকত এখন যারে জিগাই, সেই বলে—এমবিএ করব। ভাই, আমি নামও ঠিক করছি—এমবিএ ইউনিভার্সিটি।
আরে ভাই, চলবে না। এখন চলবে না, কয়েক বছর গ্যাপ দিয়ে করলে চলবে।
আমরা ধরেন ছাত্রছাত্রীদের কিছু বাড়তি সুবিধা দিলাম...।
কী রকম?
ধরেন দুই-তিন রকম সিস্টেম থাকল—কেউ এক বছরে অনার্স পাশ করতে চাইলে করবে, কেউ দুই বছরে করতে চাইলে করবে, চার বছরেও করা যাবে। আমরা, তারা কী রকম চায় সেইভাবে সার্টিফিকেট দিয়ে দেব।
এভাবে তারা শিখবে কী?
ভাই, সেটা আমাদের ভাবলে চলবে না।
অঞ্জন হেসে ফেলল—আমি ভেবেছিলাম আপনি সরল টাইপ লোক। এখন দেখছি বুদ্ধি পাকা।
আমি অন্যায় কিছু বলি নাই। ব্যবসা করব যখন, ব্যবসার দিকটা দেখব না?
বাদ দেন। এই ব্যবসায় সুবিধা হবে না। আবার নতুন করে টাকা-পয়সা আসুক লোকজনের হাতে, তাদের একটু ইচ্ছা করুক ছেলেমেয়েদের ঢাকায় রেখে ইউনিভার্সিটিতে পড়াবে, তখন?
তা হলে? হোটেল দেব?
হোটেল দেওয়ার পয়সা আপনার নেই। অত বড় চিন্তা করেন না।
লোন নেব। ব্যাংকের লোন। তারপর লোন শোধ করব না।
পারবেন না। সবার সেই ক্ষমতা থাকে না।
এইদল সেইদল সরকারি দলের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে নেব পার্টনার। তারা সামাল দেবে না?
না-ও দিতে পারে। দেখা গেল আগেই শেয়ার বিক্রি করে সরে পড়ছে।
ভাই, শুধু নিরাশ করতেছেন...। আচ্ছা, রেস্তোরাঁ দিব। পশ রেস্তোরাঁ। বিদেশ থেকে বাবুুর্চি আনব। সে রানবে। সুন্দরী মেয়েরা মেন্যু নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে...।
কতজন লোক বাইরে পশ রেস্তোরাঁয় খায়, হিসাব আছে?
জি না।
প্রফিট কত হতে পারে, ধারণা করেছেন?
জি না।
রেস্তোরাঁ ব্যবসার খারাপ সময় যাচ্ছে। যাদের হাতেই বাড়তি টাকা আছে, একটা করে রেস্তোরাঁ খুলে বসছে। আবার গুটিয়েও ফেলছে। অথেনটিক কুইজিন দিলেই হবে। টাকা আছে মানুষের আতাহার আলী, অথেনটিক কুইজিন বোঝার জিভ নাই, এখনো তৈরি হয়নি। আমারও না।
তাইলে কী করব, ভাই? যেইটা বলি সেইটাতেই বাগড়া দেন।
কারণ আপনার টাকাগুলো নষ্ট হোক, এটা আমি চাই না।
একবার ভাবছিলাম ঢাকা-পাখিপুর এসি বাস চালু করব। এখন কিন্তু এসি বাসে পাখিপুরে যাওয়ার আর ওখান থেকে আসার লোক আছে।
আগে কখনো বাসের ব্যবসা করেছেন?
আরে নারে ভাই। আগে তো জমি ছিল, টাকা ছিল না। ... ভাই, এই ব্যবসাও হবে না?
যারা অনেকদিন ধরে বাসের ব্যবসা করে তারা আপনাকে ঢুকতে দেবে?
তাদের তো এসি বাস নাই। আমার তো এসি বাস।
সেটাই সমস্যা। দেখা যাবে আপনার বাস প্যাসেঞ্জার পাচ্ছে শুধু, তারা পাচ্ছে না।
তাইতে আমার কী! আমার তো ব্যবসা হবে।
ওরা স্যাবোটাজ করবে। হয়তো ঘনঘন এক্সিডেন্ট...।
ভাই, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?
হুঁ হুঁ, নিশ্চয়ই।
আমি যা বলি তাইতেই দেখি আপনে বাগড়া দেন!
কথাটা ঠিক না। অঞ্জনের প্রথমে ধারণা ছিল না লোকটার কাছে কী পরিমাণ টাকা আছে। রহমতুল্লাহর কথায় তার মনে হয়েছিল টাকার পরিমাণ ভালোই হবে। লোকটাকে জিজ্ঞেস করে টাকার পরিমাণ জানার পর সে কিছুটা দমেই গেছে। এই টাকায় আসলে কী হবে!
তার অবশ্য মনে আছে এ পরিমাণ টাকায়, নাহ, এর চেয়ে বেশ কিছু কম টাকায় সে শুরু করেছিল। সমস্যা হলো, তারপর বেশ কয়েকটা বছর পার হয়ে গেছে। এ ক’টা বছরে টাকার মান হয়তো এতটা কমে যাওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু গেছে। গেছে বলেই সে বুঝতে পারছে না আতাহার আলী কোন ব্যবসায় শুরু করতে পারে। সে নিজে যে সব ববসার কথা বলেছে, তার একটাও জুতের মনে হয়নি। সে নিজেও ওসব ব্যবসার কোনোটায় না থাকলেও ব্যবসায়ই আছে, সে বোঝে অন্য কোনো ব্যবসার ভবিষ্যত্ কোন সময়ে কেমন হতে পারে। সে যা-ই হোক, একটা ব্যবস্থা, যেমনই হোক, আতাহার আলীকে করে দিতে হবে। তার অবশ্য ধারণা, লোকটা যত না ব্যবসা করতে চায়, তার চেয়ে বেশি ঢাকা শহরে থাকতে চায়, ঢাকা শহরে থেকে সে ব্যবসা করছে—এরকম একটা ধারণা দিতে চায়। কথায় কথায় তার এই ইচ্ছার কথা প্রকাশও হয়ে গেছে—ভাই, ধরেন ছেলেমেয়েরা এখন ঢাকা শহরে ইংলিশ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আর আমি থাকি পাখিপুর, এইটা ভালো দেখায় না।
আপনি শুনেছি এখানেই থাকেন!
পার্মানেন্ট না।
তা থাকেন পার্মানেন্ট, কে বারণ করেছে!
ভাই, যখন মাঝেমধ্যে পাখিপুর যাব, যাব তো নিশ্চয়, গাড়ি নিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়া যাব। তখন লোকজন জিজ্ঞাসা করবে, কী করি! কিছু তো একটা উত্তর দিতে হবে, না?
তা একটা দিতে হবে বইকি।
তখন একটা ভালো ব্যবসার কথা বলতে পারলে ভালো না।
তা বটে তা বটে।
তারপর ধরেন, আমাদের পাখিপুরের আরও কতজন এই শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তাদের সঙ্গে দেখা হলে বাইরে ভাব নেই কিন্তু ভেতরে লজ্জা লাগে। তাদেরও তো বুক ফুলায়া কিছু একটা বলতে হয়। তারপর ধরেন, আমিই তো শেষ না, আরও জমি বিক্রি হবে, আরও আসবে। তখন কিছু একটা শুরু করা আরও অনেক কঠিন হবে, এইটা বইলা বোঝানোর কিছু না।
বুঝতে পারছি। ... আমি কয়েকদিন পর জানাই?
বেশি সময় নিয়েন না, ভাই। শুরু করায়া দেন।
লোকটা চলে গেল। সময় কিছুটা নষ্টই হলো। এখন কিছু একটা ধরিয়ে দিতে পারলে সামনে সময় নষ্ট হবে না। ধরিয়ে দেওয়াটা কঠিন। তার নিজের ব্যবসা আছে, সে আপাতত নতুন ব্যবসার কথা ভাবছে না। অন্যের হয়ে ভাবতে গিয়ে সে দেখল, করার মতো ব্যবসা এখন কম। যা আছে তা শুধু বেশি পয়সার ব্যবসা। তাও না, আসলে ব্যবসা বলতে যা বোঝায়, তা-ই নেই। পাখিপুর থেকে আরও আরও লোক যদি আসে ব্যবসার খোঁঁজে, অবস্থা আরও কঠিন হবে। আতাহার আলীকে সে যদি বলে, তার নিজের এলাকায়ই কিছু একটা শুরু করতে, লোকটা বোধহয় রাজি হবে না, বুঝতে চাইবে না—আপাতত এভাবে শুরু করলে ভালো। এই যেমন পাখিপুরে লোকটা জমি কিনতে শুরু করবে, পাখিপুরে কিনবে, পাখিপুরের আশেপাশে কিনবে, আরও ভেতরে গিয়ে কিনবে—তারপর ওখানে হাউজিং হবে। আতাহার আলী সিটি। এক লাখ টাকার জমি দশ লাখ টাকায় বিক্রি করবে। লোকটা কি এই বুদ্ধিটা নেবে? না নিলে, অঞ্জন ভাবল, সে নিজে কি এটা নিয়ে একটু ভাববে?

প্রখর গলা তুলে কাঁদছে। প্রখরকে নিয়ে বেরিয়েছিল শাফিক আর আনিকা। কিছু টুকটাক কেনাকাটা ছিল। আনিকা বলল—কফি খেয়ে যাই। এদের কফিটা ভালো।
যা যা কেনা হয়েছে, তা গাড়ির ভেতরে। শুধু একটা খেলনা পিস্তল প্রখরের হাতে। সেটা সে হাতছাড়া করতে একেবারেই রাজি না। কফিশপে তারা ব্রাউনি আর কফি খেল, প্রখর ব্রাউনি কিংবা আইসক্রিমের আশপাশ দিয়েও গেল না, সে ব্যস্ত থাকল তার হাতের পিস্তল নিয়ে। শাফিক বলল—অবস্থা দেখেছ, আইসক্রিমের কথাও ভুলে গেছে।
ভুলুক। আইসক্রিম ওর বেশি না খাওয়াই ভালো।
তা না হয় খেলো না। আমি ওর মনোযোগের কথা বলছি।
খেলনা পেলে ওর আর কিছু চাই না।
খেলনার মধ্যে পিস্তল ওর সবচেয়ে প্রিয়। ব্যাপার কী! বড় হয়ে কি পিস্তলবাজ হবে নাকি?
হোক। যে সময় পড়েছে। তোমার মতো না হলেই হলো।
আমি! আমি আবার কী করলাম!
তুমি কিছু করোনি। আমি শুধু বলছি, তোমার মতো না হওয়াই ভালো।
কিন্তু এর লক্ষণ দেখছি মাস্তান হওয়ার।
হোক।
কী বলো! শাফিক হাসল।
হাসিটা আনিকার মুখেও ছড়াল—হোক! যে দিনকাল পড়েছে।
কফিশপ থেকে বেরোনোর পর দুটো অল্প বয়সী কিশোর তাদের পেছনে পেছনে লেগে থাকল। গাড়ি একটু দূরে পার্ক করতে হয়েছে, ওটুকু হেঁটে যেতে যেটুকু সময় লাগে, সেটুকু সময়ের মধ্যে দুই কিশোর তাদের ব্যস্ত করে তুলল—আফা, দশটা ট্যাকা দেন, আইসক্রিম খাব। অন্যজন কফির আবদার জানাল—সে কফি খেতে চায়। শাফিক বিরক্ত হয়ে আনিকার দিকে তাকাল—কী রকম ইয়ার্কি মারে দেখেছ?
অনিকা প্রচণ্ড বিরক্ত—এদের একটা পয়সাও দেওয়া উচিত না।
শাফিক বলল—দেবও না।
পারলে দুটার দু-গালে থাপ্পড় বসাতাম।
তারা যতদূর পারল, ওই দুই কিশোরকে উপেক্ষা করল। উপেক্ষা করা কঠিন, তারা গায়ের সঙ্গে গা প্রায় লাগিয়ে রাখে, যেন নিজ শরীরের সব ময়লা তাদের পোশাকে তুলে দিতে চায়। এটুকুতে শেষ হলো না, ঘটনাটা ঘটল গাড়ির দরোজা খুলে ভেতরে ঢোকার সময়। একজন টান দিয়ে প্রখরের হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে নিল, নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অনেকটা পথ দৌড়ে পার হয়ে গেল। নিরাপদ দূরত্ব তৈরি হয়েছে মনে করলে তারা থামল, দূর থেকে পিস্তল তুলে তাদের দিকে তাক করল, ট্রিগারও টিপল, তারপর উধাও হয়ে গেল।
ব্যাপারটা বুঝতে কিছুক্ষণ লাগল শাফিক আর আনিকার। প্রখর কান্না জুড়ে দিয়েছে। তাকে সামলানো যতটা জরুরি, ঘটনায় অবাক হওয়া তার চেয়ে কম জরুরি নয়। শাফিক হতভম্বের মতো বলল—এটা কী হলো, আনিকা, এটা কী হলো!
আনিকা তোতলাল—এভাবে কেড়ে নেবে, এভাবে কেড়ে নেবে! মগের মুল্লুক!
আমি দৌড়ে যাব?
ধরতে পারবে? খামোখা কেন দৌড়াবে? রাস্তায় দেখো এতগুলো লোক, দেখল শুধু, কেউ কি ওদের থামাল?
এখন আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে মজা দেখছে। ... এরা মানুষ!
প্রখর, কেঁদো না বাবা, আবার কিনে দেব, দুইটা কিনে দেব। ওরা তো একটা নিয়েছে।
কী পরিমাণ ফাজিল, দূরে গিয়ে আবার গুলি করার ভঙ্গি করে।
একদিন সত্যি সত্যি করবে।
কী!
একদিন সত্যি সত্যি গুলি করবে।
কী বলো! কেন! আমরা কী করেছি!
আমরা কিছুই করিনি। ওদের ইচ্ছা ওরা গুলি করবে।
আনিকা শাফিকের দিকে তাকাল, দুই কিশোর যেদিকে পালিয়েছে সেদিকে, তাদের অবশ্য দেখা গেল না, সে প্রখরের দিকেও তাকাল—দেশ একটা!
সেদিন আনিস কী বলল মনে নেই? ওর হাতে কোকের ক্যান ছিল। ক্যান হাতে ও গাড়িতে উঠছিল। ভিক্ষা চাচ্ছিল ৪-৫ জন। শেষে একজন ক্যান টান দিতে গিয়ে নিতে পারেনি, সেটা রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল।
বলেছিলে। ... তখন অতটা বুঝতে পারিনি।
আমাদের হচ্ছে এই এক সমস্যা। নিজের ওপর এসে না পড়লে বুঝি না।
আনিকা বিরক্ত হয়ে শাফিকের দিকে তাকাল।
আনিস অবশ্য ওদের একজনকে ধরে ফেলেছিল। কী লাভ! মুহূর্তের মধ্যে ওকে ঘিরে একটা জটলা হয়ে গেল। ভয়ের ব্যাপার।
কয়েকদিন পর বোধহয় এরা ঘরে ঘরে ঢুকবে।
ঢুকবে। ঢুকে বলবে—কী আছে আপনার, দেন, নিতে এসেছি।
এমনও বলতে পারে—যান আপনারা বের হন, আমরা থাকব। ... শাফিক, এদের সংখ্যা দিনদিন শুধু বাড়ছেই। ... এত এত এরা আসে কোত্থেকে?
চারপাশের পাখিপুর থেকে। তুমি পাখিপুরে যদি এদের রাখতে না পার, এরা এখানেই আসবে। কিন্তু এ নিয়ে কারও মাথা ব্যথা আছে, বলো?
বাড়ি ফিরে আনিকা গোসল করতে গেল। সে বলল—এমন একটা ঘটনা। সারা শরীর ঘিনঘিন করছে। গোসল না করলে এটা কমবে না।
শাফিক ঠিক করল, গোসল সেও করবে। একটু পরে। এখন সবকিছুর আগে সে একটু থিতু হয়ে বসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। মনে হচ্ছে একটু আরাম করে বসতে পারলে নিজেকে গোছানো মনে হবে। সে সিগারেট ধরিয়ে, সিগারেট সে সাধারণত খায় না, বাসায় তবু প্যাকেট থাকে, প্যাকেট পড়েই থাকে অধিকাংশ সময়। ফেলে দিয়ে নতুন আরেকটা প্যাকেট কিনতে হয়, সে সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় বসল। তার ওই ঘটনার পর থেকে বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছে—এই দেশে কি আর থাকা যাবে? আর বেশিদিন থাকা যাবে? ঘটনাটা হয়তো খুব ভয়ের কিছু না, অনেকে হয়তো ফান হিসেবে নেবে, অনেকে হয়তো বিরক্ত হবে রাগ করবে, কিছুক্ষণ পর ভুলে যাবে। শাফিকের মনে হলো এটা ভুলে যাওয়া বা তাচ্ছিল্য করা উচিত হবে না। কারণ, তার ধারণা, এই ঘটনা আরও অনেক ঘটবে, ঘনঘন ঘটবে, বড় আকারে ঘটবে, ওদের জ্বালায় টেকা অস্থির হবে। ওদের হুমকির মুখে নিজেদের অসহায় মনে হবে। তখন?
শাফিক অসহায় বোধ করল, বিরক্ত তো বটেই। কেন এরকম হবে? কেন তারা নিজেদের মতো নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে পারবে না? কেন তাদের তাদের মতো থাকতে দেওয়া হবে না। এই যে পাখিপুর থেকে লোকজন উঠে আসছে তো আসছেই, কেউ ভাবছে এদের নিয়ে, কেউ এদের পাখিপুরেই থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে! দিলে, তারা আর আসত না। দেওয়া হয়নি, তারা আসছে, নিজেদের মতো করে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। তারা জায়গা করে নিচ্ছে, এদিকে তাদের জায়গা কমে যাচ্ছে। এখন তারা কী করবে, কোথায় থাকবে, স্বস্তিতে? শাফিক টের পেল তার ভেতরটা তিতা তিতা হয়ে আছে।
এই গতকালও তার মেজাজ ছিল ফুরফুরে। অঞ্জন চাচা তাকে দেখা করতে বলেছিল। সে অফিস ছুটির পর দেখা করতে গিয়েছিল। প্রস্তাবটা ভালো লেগেছে শাফিকের। এ তো ঠিক, তাদের এই বিল্ডিং ভেঙে আশপাশের আরও কিছু জমি যোগ করে এটাকে আরও বড় সুন্দর করে বানানো যায়। আরেকটু খোলামেলাভাবে থাকা, আরও কিছু বাড়তি অ্যাপার্টমেন্ট তাদের হওয়া—সব মিলিয়ে এটা একটা ভালো প্রজেক্ট। তার ধারণা মাকে রাজি করানো যাবে। শ্যামলী, জাবিন, অদ্বিত এরাও নিশ্চয় রাজি হবে। আনিকাকে কথাটা গতরাতে বলা হয়নি। সে ভেবেছিল আজ বলবে। এখন আর বলার ইচ্ছাটা নেই। সে জানে আনিকা এখন এসব কিছু শুনতেও চাইবে না। সে গোসল সেরে বেরিয়ে আবার ওই প্রসঙ্গে নিয়েই পড়বে। আচ্ছা, তারা কি তখন সেকেন্ড হোমের কথা একবার ভাববে?
গতকাল চাচা এই প্রসঙ্গ একবার তুলেছিল—একটা বিকল্প ব্যবস্থা রাখবে না? তুমি কি মনে করো এই দেশে বেশিদিন থাকতে পারবে? একটা কিছু করো দেশের বাইরে। অঞ্জন চাচার কথা পরিষ্কার—দেখো, আমি পাখিপুরে বিকল্প এক প্রজেক্টের কথা ভাবছি। ওখানকার এক লোককে ব্যবসার বুদ্ধি দিতে গিয়ে এই বুদ্ধিটা পেয়ে গেছি। এসব বুদ্ধি পাওয়াই যায়, সেটা হলো, আমি ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তারিত ভাবলাম। হুম, বিশাল এক সিটি সেখানে গড়ে তোলা যায়। একটু রিজোর্ট টাইপই করব। বড়লোকদের জন্য। যারা কিনবে, তারা এই ভেবে কিনবে—এখানেও থাকল একটা। আমি জানি এটা আমাকে ব্যবসা দেবে। আমি নিজেও ওখানে একটা রাখব। কিন্তু এর বহু আগেই কি আমি আমার জন্য বাইরে একটা ব্যবস্থা করিনি?
শাফিক ঠিক করল, আনিকা গোসল সেরে বের হলে সেটা জানালও যে তাদের বোধহয় একটা সেকেন্ড হোমের কথাও ভাবা দরকার।
আনিকার মুখ দেখে বোঝা গেল এতে তার কোনোই আপত্তি নেই, যদিও সে বলল—কঠিন, অত টাকা কোথায় আমাদের!
প্রথম ব্যাপার হচ্ছে—ইচ্ছা। সেটা আমাদের আছে কি না...।
আহা, শুধু ইচ্ছা থাকলেই হচ্ছে না।
কিন্তু ইচ্ছাটা থাকতে হবে। সেকেন্ড হোম হিসেবে আমরা কোন দেশ বেছে নেব সেটা ঠিক করতে হবে। তারপর টার্গেট নিয়ে এগোব। ইচ্ছা থাকলে হবে না কেন!
তা ঠিক। দেখো। ... ভালো একটা দেশ...।
সব দেশই বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। তবে তারপরও এই দেশকে আমরা ভালোবাসি।
তা তো বটেই। আর আমরা তো একেবারে চলে যাব না...।
না না, তা কেন!
থাকল একটা!
হ্যাঁ, থাকল একটা। এই তো।
অঞ্জন চাচার প্রস্তাবটা অদ্বিতের কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে। তাকে না দিলে অবশ্য প্রস্তাবটা প্রস্তাব হিসেবে ঠিকই আছে, তাকে দিয়েছে বলেই সমস্যা। আচ্ছা, এই লোকের কি কোনো কালেও আক্কেল হবে না!
পাখিপুরে তার বিশাল প্রজেক্ট হতে যাচ্ছে। বিশাল জায়গা নিয়ে রিজোর্ট সিটি। দেশে এরকম প্রজেক্ট নাকি এই প্রথম। অদ্বিত বলল—সে কারণেই আমাকে এর দায়িত্ব নিতে হবে?
আরে, আগে আমার কথা শোন। সব সময় আগ বাড়িয়ে কথা বলা।
অদ্বিত শুনল বটে। তার কোনো আগ্রহ তৈরি হওয়ার কথা না, তৈরি হলোও না। সে শুধু অঞ্জনকে বেয়াক্কেলই ভাবল। বেয়াক্কেল না হলে তাকে কেন প্রস্তাব দেবে? তাকে দেখছে না ছোটবেলা থেকে, তাকে ছোটবেলা থেকে দেখেও একটুও চেনেনি! একথা বললে চাচাও অবশ্য একটা কথা বলতে পারে। সেটা হলো—হুঁ, আমি তো চিনিই তোকে।
তা হলে আর সুপারভাইজার হতে কেন বলছ?
কী আশ্চর্য! সুপারভাইজার ভাবছিস কেন!
আচ্ছা, সুপারভাইজার না। অনেক বড় কিছু। কিন্তু আমাকে কেন বলছ! তোমার কি ধারণা আমি কিছু করার মানুষ?
সে জন্যই বলছি। কিছু একটা করতে হবে না?
এখানেও একটা ভুল হয়েছে তোমার। আমি কিছু করার মানুষ না।
এ কথাটা সে সুযোগ পেলেই বলে—আমি কিছু করার মানুষ না।
অর্ণা একদিন বলল—শোনেন, এর মধ্যে কোনোই বাহাদুরি নেই।
কী, এই যে কিছু করার মানুষ না আমি, এর মধ্যে?
এটা বলার মধ্যেও। তুমি কি বোঝো এটা এক ধরনের লোক দেখানো কথা?
তা-ই কি? আমি তো এটা মন থেকেই বলি।
তোমার মনে হয়। কিন্তু তুমি আসলে এ কারণে কথাটা বলো—এটার মূল্য তোমার কাছে অনেক! তোমার ধারণা তুমি এটা বলো মানে বিশাল একটা কথা বলো।
তা-ই? তা হলে মাঝে মাঝেই তোমাকে একথাটা বলতে হয়।
তাতে কী লাভ হবে?
ভাবব—তোমাকে বিশাল একটা কথা বললাম।
অঞ্জন চাচা যে তাকে পাখিপুর প্রজেক্টে ঢোকাতে চেয়েছে সেটা অদ্বিত অর্ণাকে বলল—আমাকে এমন একটা প্রস্তাব চাচা কী করে দিলেন, ভেবে পাই না।
দিয়েছেন। বুঝতে পারেননি তুমি আসলে কোনোই কাজের না। আচ্ছা অদ্বিত, তোমার কখনোই খারাপ লাগে না? এই যে তুমি আয়দায়হীন!
খারাপ লাগবে কেন! জগতে আমার মতো একজন-দুজন থাকতে হয়।
ওহ, আচ্ছা!
তোমাকে পাখিপুর প্রজেক্টের কথা বলি বরং। চাচার বিশাল প্রজেক্ট, প্রচুর জায়গা লাগবে। চাচার পার্টনার একজন আছে। তার হয়তো কিছু জমি আছে, সেটুকুতে হবে না। সুতরাং আরও অনেক জমি কিনতে হবে। কিন্তু শুধু কিনলে হবে না, দখলও করতে হবে। কাজ কঠিন না। দিন কয়েক ঘোরাফেরা করলেই আর ওখানকার লোকজনের সাথে কথা বললেই বোঝা যাবে কোন জমি কিনতে হবে, কোন জমি দখল করা যাবে।
ভালোই দেখছি বোঝো।
তাই বলে ভেবো না আমাকে দিয়ে কিছু হবে। ... শোনো, যারা বিক্রি করবে জমি, তারা টাকা পাবে। তারা রাতারাতি পয়সার মালিক হয়ে যাবে। তাদের কেউ কেউ বসে খাবে বইকি, ভাববে—এত পয়সা জীবনেও ফুরাবে না। আবার কেউ কেউ ভাববে—পয়সা যখন পেলাম, কিছু করতে হয়। কোথায় করবে? পাখিপুরেই করা যায়। কিন্তু তাদের মনে হবে কী আশ্চর্য, পাখিপুরে কেন কিছু করা! পয়সা হলে ঢাকা যেতে হয়, আমরাও ঢাকা যাব। কিছু যদি করতেই হয়, ঢাকায়ই করব। বুঝতে পারছ না?
খুব।
তো, পাখিপুর ছেড়ে তারা ঢাকা চলে আসবে। আর এদিকে যাদের জমি দখল হবে, তারা পড়বে বিপদে। পাখিপুরে কিছুই করার খুঁজে পাবে না তারা। আবার যারা জমি বিক্রি করেছে, তাদের জমির ওপর নির্ভর করেও কিন্তু অনেকে বেঁচে ছিল। জমি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর তাদেরও কিছু করার থাকবে না। তারা ভাববে, প্রজেক্ট আরম্ভ হলে তারা কাজ পাবে। তা হয়তো তাদের কেউ কেউ পেলেও পেতে পারত, কিন্তু প্রজেক্ট আরম্ভ হতে, তাদের প্রয়োজন যদিও এই এখনই, ঢের দেরি। কিছুদিন অপেক্ষা করে হতাশ তারাও কিছু একটা করে খাবার আশা নিয়ে ঢাকায় চলে আসবে। ... বুঝতে পারছ?
পরিষ্কার।
অর্ণা।
বলো।
আমার খুব পাখিপুর যেতে ইচ্ছা করে।
যাও না। কে বারণ করেছে। তোমার চাচার সঙ্গে যাও।
নাহ, আমার তোমাদের পাখিপুরে যেতে ইচ্ছা করে। সেখানে তোমাদের কী একটা মিল গম্ভীর মুখে কাপড় তৈরি করে...। কিংবা আরও ভেতরের কোনো ভেতরের পাখিপুরে। হ্যাঁ, আরও ভেতরের। তোমরা, চাচারা এখনো সেখানে যাওনি। এখনো যে পাখিপুর বড় হতে শুরু করেনি। ... অর্ণা, যাবে?
সাদিয়ার পক্ষে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব না। আবার প্রতিবাদ করে বন্ধ করে দেওয়া, তিনি জানেন এটাও সম্ভব না। সে অবশ্য জোর গলায়ই বলেছে, না, সে এর মধ্যে নেই, সে এটা চায় না, সে এর কোনো দরকার দেখছে না। তবে সে জানে—এটা বলেছে। সে বলেছে এটা তাহলে তার মৃত্যুর পর হোক। এটা শুনে তার ছেলেমেয়েদের কেউ কেউ, অঞ্জন তো বটেই, এমনভাবে তাকাল—তার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! কোনো কি নিশ্চয়তা আছে সে খুব তাড়াতাড়ি মারা যাবে। না, সে নিশ্চয়তা সেও দিতে পারে না।
হাসিব মারা যাওয়ার পর কিছুদিন তার এমন মনে হয়েছিল, তার আর বেঁচে থাকার দরকার কী! ছেলেমেয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত, অদ্বিতও অসহায় বোধ করবে না, সুতরাং সে যেতেই পারে। এতগুলো বছর যে মানুষটার সঙ্গে সংসার, সুখ-দুঃখে, হাসি-আনন্দে, কষ্ট-ভালোবাসায়, সে লোকটা যদি এত সহজে চলে যেতে পারে, তার থাকার দরকার কী! লোকটাকে ছাড়া তার পক্ষে থাকা সম্ভব না—এরকমও তার মনে হতো। গত কয়েকদিন হলো সাদিয়া দেখছে ওরকম মনে হওয়াটা তার কমে এসেছে। এই নিয়ে লজ্জা বোধ হয়নি তার, কিছু অস্বস্তি হয়েছে। অস্বস্তিটা এরকম—এই যে তার মরে যাওয়ার ইচ্ছাটা কমে গেছে, এটা কি হাসিব বুঝে ফেলবে? এটা হাসিবের জীবিত অবস্থার কোনো ব্যাপার হলে, আর সে সেটা টের পেলে, ঠোঁট টিপে হাসত নিশ্চয়—আচ্ছা!
মৃত্যুর পরও টের পাওয়া যায় কি না, সাদিয়ার ধারণা নেই। মৃত্যুর পরই সব কিছুর শেষ কি শেষ না, এই নিয়েও তার ভেতর কিছু দ্বিধা আছে। হয়তো এই শেষ। সবকিছু চুকে বুকে গেছে। হয়তো শেষ না, হয়তো বহু বছর পর হাশরের ময়দানে পুনরুত্থান। এত বছর পর আবার হাসিবকে দেখলে তার কেমন লাগবে, ভাবলে, তার চোখ ভিজে যায়। সে ঠিক করে রেখেছে, প্রথম সে এ কথাটি বলবে—আমাকে রেখে চলে আসাটা তোমার ঠিক ছিল?
তবে সেইদিনের দেরি আছে, সে জানে। এখন আপাতত জীবনের বাকি দিনগুলো শান্তি আর স্বস্তিতে পার করে দেওয়া। এর মধ্যে এই বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি তোলার দরকার আছে বলে তার মনে হয় না। কিন্তু অঞ্জন ছেলেমেয়েগুলোর মাথা নষ্ট করে দিয়েছে। জাবিন তো ঘ্যানঘ্যানই শুরু করেছে—মা, তুমি বোধহয় আরও একটা ফ্ল্যাট বেশি পাবে। অর্চি আর অতিন্দ্রিলার কথা কিন্তু মনে রেখো, মা। এসব কথায় সে বড়ই বিরক্ত হয়। মানুষেরই লোভ হবে, ঠিক আছে, কিন্তু সেই লোভের মুখ এমন বেরিয়ে থাকবে কেন!
সাদিয়া ঘর ছেড়ে বের হলো। বাসায় কেউই নেই। অদ্বিত একটু আগে বেরিয়েছে, তার অনেক আগে বেরিয়েছে শাফিক, সে অফিসে পৌঁছে গাড়ি পাঠালে আনিকা প্রখরকে নিয়ে তার বাবার বাসায় গেছে। বাসায় সে একা। সন্ধ্যা পর্যন্ত তার এভাবেই কাটবে—একা একা। এসব সময়ে মাঝে মাঝেই হাসিবকে তার হাতের কাছে পেতে ইচ্ছা করে—দেখেছ, আমার অবস্থা দেখেছ?
এই প্রশ্নের কি কোনো উত্তর দিত হাসিব? দেখছি তো—এরকম কিছু কি সে বলত?
শুধু দেখছ!
আর কী করব!
আর কিছুই করার নেই! আমি একা...।
তুমি ভেবে বলো তো আমার আসলেই কিছু কি করার আছে?
সাদিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু-পাশে মাথা নাড়ল—নাহ, হাসিবের আসলেই কিছু করার নেই। সাদিয়ার বাকি জীবনে হাসিবের আর কিছু করার নেই। এভাবে, একা একা তাকে বাকি সময়টুকু পার করে দিতে হবে। কিন্তু কী আশ্চর্য, তার চলে যেতেও ইচ্ছা করে না। যে জীবনে তার কিছুই করার নেই, সে-জীবনেই সে থেকে যাচ্ছে, কিছু করার নেই তবু থেকে যাচ্ছে।

এখন মানুষজন অনেক বেড়ায়। আমাদের সময় বেড়ানোর ব্যাপারটা তেমন ছিল না। তা আমি আর তোর মা একবার চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম। এক আত্মীয়ের বিয়ে ছিল, তোর মায়ের দিককার। আমরা ভাবলাম, যাই। বিয়েতেও যাওয়া হবে আবার কিছু বেড়ানোও হবে। ... হাসিব, কবরে এসে কি তোর ভালো লাগছে, বাপ?
হঠাত্ এমন এক প্রশ্নের কারণ হাসিব বুঝতে পারল না। এমন এক প্রশ্নের উত্তরেই-বা সে কী বলে, সে একটু চিন্তায় পড়ে গেল। সে বিষয়টা নিয়ে ভাবেওনি। সে মাত্র এসেছে।
লুত্ফর রহমান বলল—বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে আমি আর তোর মা কিছু বেড়ালাম। একটা কবরস্থানে গেলাম। সিমেট্রি। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে আমেরিকান ও ব্রিটিশ সৈনিক যারা আশেপাশের অঞ্চলে মারা গিয়েছিল...।
জানি বাবা। ওদের ওখানে কবর দিয়ছিল...। আমিও গিয়েছিলাম বছর পাঁচেক আগে। সবাই মিলে চট্টগ্রাম আর কক্সবাজারে গিয়েছিলাম তখন।
কক্সবাজারেও গিয়েছিলি। সমুদ্রে?
আসলে সমুদ্র দেখতেই গিয়েছিলাম...।
আমার দেখা হয়নি। তোর মারও না। একবার তোর মা খুব উতলা হয়েছিল সমুদ্র দেখবে। ... হয়নি।
অসাধারণ। সাদিয়া বলল—সে সারারাত সমুদ্রের কাছে বসে থাকবে।
হুম। ... জীবনে সবকিছু হয় না। ... যা বলছিলাম। ওয়ার সিমেট্রি। প্রথমে ভেবেছিলাম কবরস্থান আর দেখার কী! কিন্তু দেখলাম যখন, পৃথিবীর শান্ততম একটা স্থান মনে হলো। হঠাত্ই যে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শান্ত, নির্জন, পবিত্র, মনে হলো এখানে যারা ঘুমিয়ে আছে, কী শান্তিতেই-না আছে।
আমারও এমনই মনে হয়েছিল, বাবা। চুপচাপ... চুপচাপ...।
ওখানে শুনেছিলাম, অনেকের আত্মীয়স্বজন নাকি বিদেশ থেকে এসে ফুল দিয়ে যায়, দাঁড়িয়ে থেকে যায় কিছুক্ষণ...।
হ্যাঁ, বাবা, আমরাও শুনেছি, আমরা অল্পবয়সী একটা মেয়েকে দেখেওছিলাম। বিদেশি। কথা বলার খুব ইচ্ছা হয়েছিল। কে সে, কার কবরে এসেছে...। বিরক্ত হতে পারে ভেবে কথা আর বলা হয়নি।
আশ্চর্যের ব্যাপার, না? তোরা যদি অল্পবয়সী কাউকে দেখে থাকিস, বুঝতে হবে যার কবরে সে এসেছে, সে আসলে এক অর্থে তার কেউই না। কারণ, আত্মীয় হলেও তার মৃত্যুর কত কতদিন পর মেয়েটির জন্ম!
হ্যাঁ, ওই মেয়েটির জন্মের বহু বহু আগে ওই সৈনিক মারা গেছে। মেয়েটি হয়তো গল্প শুনেছে। কিংবা গল্পও শোনেনি। শুধু জানে এখানে তার এক পূর্বপুরুষ শুয়ে আছে।
যুদ্ধের গল্প কীভাবে কীভাবে যেন ভালোবাসার গল্প হয়ে যায়।
আর ওখানে যারা শুয়ে আছে, তাদের কথা ভেবে দেখো বাবা। কত বছর আগে কত দূরের দেশে তাদের জন্ম, আর শুয়ে থাকল কোথায়!
ওখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল, এই যে এখানে যারা শুয়ে আছে তাদের সবারই নিজের একটা জীবন ছিল। সবারই আলাদা আলাদা জীবন। সেই জীবনে তাদের আর ফিরে যাওয়া হয়নি।
বাবা, মানুষের জীবনে কত যে গল্প!
অবশ্য ফেলে আসা জীবনে কারোরই ফেরা হয় না।
এটা বাবা, দু’রকম। কখনো পরিস্থিতি তোমাকে ফিরতে দেয় না। কখনো তোমার ফেরার ইচ্ছা থাকে না, তাই ফেরা হয় না।
আরও কিছু আছে, বাপ। জীবন শুরু হওয়ার পর একটু একটু করে বদলে যায়। বদলাতে বদলাতে এমন অবস্থায় যায়, ফেলে আসা জীবনের সঙ্গে তার কোনো মিল থাকে না। আমার কথাই ধর। আমি কি ইচ্ছা করলেই ফিরতে পারতাম পাখিপুরে? ... হাসিব, তুই কিন্তু এখনো বলিসনি, এখানে এসে তোর ভালো লাগছে কি লাগছে না।
ভাবিনি বাবা। এখানে ভালো কী মন্দ কী...।
এখানকার কবরস্থানগুলো ভালো না। তাই ওয়ার সিমেট্রির কথা বললাম। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ওখানে থাকতে পারলে বেশ হতো।
ওটা বাবা যুদ্ধের সৈনিকদের জন্য।
তফাত কী? আমার নিজেকে একসময় সৈনিকই মনে হতো।
আমার সেরকম কখনো মনে হয়নি, বাবা।
তা হলে? জীবন যদি যুদ্ধ না হয়, জীবন কী?
বাবা, জীবন হচ্ছে পার করে দেওয়া।
পার করে দেওয়া?
হ্যাঁ, বাবা। পার করে দেওয়া।
ওহ।
যারা আরও পরে আসবে, তারা হয়তো অন্যরকম বলবে।
আর কারও সঙ্গে কারওর উত্তর হয়তো মিলবে না।
হয়তো মিলবে হয়তো মিলবে না। জীবন বহুরকম।
জীবন বহুরকম। ... শুধু মৃত্যু এক রকম। ... হাসিব, তুই কি সত্যিই এসেছিস?
মানে! সত্যিই এসেছি মানে!
বুঝতে চাচ্ছি। এসেছিস, নাকি ভাবছি এসেছিস?
তুমিই না বললে দুধের গন্ধ পেলে!
প্রিয় কিছু গন্ধ বোধ হয় মানুষ সঙ্গে নিয়েই আসে।
হয়তো। ... কিন্তু বাবা, তুমি আমার মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিলে।
কী?
এসেছি তো? নাকি ভাবছি—এসেছি?
আচ্ছা, এই ভাবনাটা আমরা বাদ দেই।
বাদ। ... বাবা, আমরা বরং ওদের নিয়ে কথা বলি।
কাদের নিয়ে?
পিকলু, অঞ্জন, সাদিয়াও আছে, আমার ছেলেমেয়েরা আছে...।
একটু ভাবল লুত্ফর রহমান, তারপর বলল—থাক। কী দরকার! ওরা ওদের জীবনে আছে, থাকুক।

(একই বিষয়ক একটি তুলনামূলক বৃহত্ লেখার খসড়াপর্ব)

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২৪
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৬
এশা৭:০৯
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :