The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

অন্যদিগন্ত

বব মার্লে, ডেভিড বার্নেট এবং জু জু

পারভেজ চৌধুরী

এর আগে কখনো জুলিয়ান মার্লের গান শুনিনি। নামটাও জেনেছি খুব বেশিদিন আগে নয়। তবুও নিজে গেলাম শুটিংয়ে। অনুষ্ঠান প্রযোজনার দায়িত্ব যারই থাকুক, বিভাগীয় প্রধান হিসেবে একটা দায়িত্ব থেকেই যায়। হোটেল শেরাটনে পৌঁছে দেখি শুটিং ইউনিট পৌঁছে গেছে ততক্ষণে। সব ঠিকঠাক। শুটিং ইউনিট অপেক্ষা করছে কখন জু জু আসবে। জুলিয়ান মার্লের ডাক নাম জু জু। গানের সাথে জড়িত ছোটবেলা থেকেই অন্য ভাইদের মতো। ২০০৯ সালে তাঁর তৃতীয় অ্যালবাম ‘অ্যাওয়াক’ গ্র্যামি মনোনয়ন পেয়েছিল বেস্ট রেগে অ্যালবাম ক্যাটাগরিতে। সেই থেকে নামটা ক্ষীণভাবেই শুনেছিলাম ব্রিটিশ জ্যামেইকান—এই রেগে শিল্পীর। রাস্তাফারি আন্দোলনের সাথেও যুক্ত। যে রুমে শুটিং-এর জন্যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল সেই রুমে এক বাদামি হাতের কড়া ধাক্কায় তার দরোজা খুলে গেল। একদল মানুষের মাঝে একজনকে দেখা গেল বাতাসের মধ্যে শরীর ভাসিয়ে ভাসিয়ে ঘরে ঢুকল। অবিকল বাবার মতো দেখতে। জটা চুল। চাপা ভাঙা। হালকা শরীর। দলের সবাই যেন একেকজন নভোচারী, মহাশূন্যে ভাসছে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে কেউ কেউ ভূতলে লুটিয়ে এমনভাবে পড়ছে, মনে হয়, এটাই তাদের স্বাভাবিক জীবন। প্রতিদিনের জীবনধারা। এসবের পরও এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে নিজেদের সামলিয়ে নিচ্ছে। সবার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর জু জু-র দিকে হ্যালো বলতেই মনে হলো অনিচ্ছায় হাত বাড়িয়ে উত্তরে হ্যালো বলল। হ্যান্ডশেক করতে করতে বললাম—
: এত ভাব নিও না! তোমার বাবা আমাদের বন্ধু।
কথাটি শুনেই জু জু আমাকে জড়িয়ে ধরে গলা উঠিয়ে বলতে লাগল
: হ্যাঁ, পৃথিবীটাই দেখি বাবার বন্ধু।
তার কিংবদন্তি বাবার কথা শুনে, দেখলাম, আইস ব্রেকিং শুরু হলো এক নিমেষেই, অবিরল জলধারা এ যেন বরফগলা নদী। সাক্ষাত্কার নেওয়া হলো। তিন ক্যামেরায়। জু জু-র গানের বিষয়ও মানুষ। মানুষের জীবন। সাক্ষাত্কার নিলেন কণ্ঠশিল্পী আমরিন মূসা এবং প্রযোজক ছিলেন মুশফিক কল্লোল। সাক্ষাত্কার নেওয়ার পর আমরা তাদের অনেক গিফট দিলাম। তার মধ্যে ছিল দোতারা। গিফট কেনার সময় এমনভাবে চিন্তা করেছি, বিমানে করে সেগুলো তারা যেন সাথে করে নিয়ে যেতে পারে তাদের দেশে। দোতারা পেয়ে মহাখুশি জুলিয়ান। অনেক প্রশ্ন করে বুঝে নিলো বিষয়টা। সে বলে দিলো, পরবর্তী গান কম্পোজ করার সময় সুরযন্ত্র হিসেবে দোতারার ব্যবহার রাখবে সে গানে। তারপর জ্যামাইকান সুর গেয়ে গেয়ে দোতারার সঙ্গে টিউন করে নিলো। মনে পড়ে গেল ২০০০ সালের কথা। তখন একুশে টেলিভিশনে কাজ করি। ‘আশপাশের দেশে’ নামে একটা এশিয়ান দেশসমূহে ট্রাভেল শো করার পর মনে হলো, এটা বিশ্বভ্রমণের অনুষ্ঠান নয় কেন? ‘বাকস পেটরা’ নামে শুরু করেছিলাম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল শো। শুটিং করতে গিয়েছিলাম মধ্য এশিয়ায়। উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে এক খরতপ্ত দুপুরে ঘুরতে ঘুরতে একটি পুরোনো বাদ্যযন্ত্রের দোকান পেয়ে যাই। বয়স্ক দোকানি রসুল গমাজফ এসে এই বাদ্যযন্ত্র, ওই বাদ্যযন্ত্র দেখায় আর কি যেন বলে, কিছুই বুঝি না। হঠাত্ ‘দোতর’ বলতে বলতে দোতরার মতো দেখতে একটা বাদ্যযন্ত্র এনে বাজাতে শুরু করলেন। দোতরের সেই সুর পেয়ে উপস্থাপিকা ও কণ্ঠশিল্পী মেহরীন (উজবেকরা তাকে মেখরিন বলে ডাকত) গান ধরলেন, ও কি ও গাড়িয়াল ভাই...। কী যে অদ্ভ্ভুত মিল! দুই ভিনদেশি, ভিনভাষী মিলে পুরো গানটা শেষ করলেন। বোঝা গেল, দোকানি একজন সুদক্ষ যন্ত্রীও বটে। গান শেষ হতে স্বর্ণ দিয়ে বাঁধানো দাঁতের হাসির পরাগ ছড়িয়ে কি যেন বলল, দোভাষী উলুগ বেগ এসে বুঝিয়ে দিলো, সুর কোনো কাঁটাতারের সীমারেখা মানে না। ব্রিটিশ-জ্যামাইকান এই শিল্পীর হাতে দোতারা দেখে, দোতরার সাথে গান টিউন করা দেখে অনেকদিন পর আবারও মনে হলো, সুর কোনো কাঁটাতারের সীমরেখা মানে না।
জু জু ওর টিশার্ট গিফট করল আমাদের। টিশার্ট নিতে নিতে বললাম, জানো? আমি কিন্তু ডেভিড বার্নেট-এর ইন্টারভিউ করেছি। ডেভিড বার্নেট নামটা শোনার সাথে সাথেই তার চোখ দুটি জ্বল জ্বল করে ওঠে।
: বলো কী? কবে? কখন? কোথায়? কী বললো?
উত্তর নেই, প্রশ্নের পাহাড়।
সেও আরেক গল্প। আলোকচিত্রী ড. শহীদুল আলম একদিন ফোন করে বললেন, ফটোগ্রাফার ডেভিড বার্নেট আসছেন বাংলাদেশে। আমি তাকে নিয়ে কিছু করব কি-না? ডেভিট বার্নেট-এর নামটা শোনার সাথে সাথে ১৯৭১ সালের সেই টাইমস পত্রিকার কভার স্টোরিটা চোখে ভাসল। একজন বাবা তার ছোট মেয়েকে বুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। বার্নেট সম্পর্কে খুব বেশি না জানলেও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বখ্যাত টাইমস পত্রিকার আলোকচিত্রী হিসেবে অনেক ছবি তুলেছিলেন। সেসব জানা আছে। শহীদুল (আলম) ভাইকে বললাম, কী করব জানি না, কিন্তু কিছু একটা করব। হাতে যে কয়দিন সময় আছে ভেবে-চিন্তে একটা আইডিয়া ডেভেলপ করা যাবে। ১৯৭১-এর ছবি নিয়েই কিছু একটা হতে পারে এবং হবে।
২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর এক সুবর্ণ সন্ধ্যায় গেলাম শুটিং ইউনিট নিয়ে দৃক গ্যালারিতে। ‘৭১-এ তোলা ছবি নিয়ে দুজনের কথাবার্তা হবে। দুজন মানে দুই বিখ্যাত আলোকচিত্রী ড. শহীদুল আলম এবং ডেভিড বার্নেট। এরই মধ্যে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে বার্নেট সম্পর্কে জেনে নিয়েছি। অনেক শক্তিশালী আলোকচিত্রী তিনি—ছবি তোলায় এবং ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো রাষ্ট্রপতির ছবি তুলতে পারে যখন তখন। রয়েছে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব। কিন্তু তার কথাবার্তায় মার্কিন প্রশাসনের বিরোধিতা প্রবল।
ডেভিড ও শহীদুল (আলম) ভাইয়ের কথাবার্তা জমে উঠেছে। শুটিং-এর একপর্যায়ে ডেভিড কথার মাঝখানেই বলেন,
: পারভেজ, কিছু বলছ না কেন? আমরা শুধু শুটিং করেই চলেছি।
নিজেদের আলাপ শেষ করে ক্যামেরা অন থাকা অবস্থায় ডেভিড আবারও বললেন,
: এই পারভেজ, কিছু বলছ না কেন? তুমি কি শুটিং শেষ করবে না আজ?
: ‘কাট’
চিত্কার করে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, এইবার শিল্পী বব মার্লেকে নিয়ে বলার পালা।
: ওহ! এইজন্য তুমি কিছু বলছ না? বুঝতে পেরেছি।
বলে ডেভিড বার্নেট স্মৃতিকাতর হয়ে উঠলেন। সেও তো অনেকদিন হয়ে গেল। ১৯৭৬ সাল। টাইম ম্যাগাজিন পাঠিয়েছিল জ্যামাইকাতে শিল্পী বব মার্লের ওপর ফটোফিচার করতে। বব মার্লে তখনও উত্তর আমেরিকায় পরিচিত নন। পৃথিবীতে তো নয়-ই।
জ্যামাইকায় বেশ কিছুদিন রেগে শিল্পী বব মার্লের সাথে সময় কাটান ডেভিড বার্নেট। অনেক ছবি তোলেন। করেন বিখ্যাত বিখ্যাত সব অসাধারণ পোর্ট্রেট।
ডেভিড বার্নেট-ই প্রথম এই রেগে শিল্পীকে উত্তর আমেরিকায় পরিচয় করিয়ে দেন। সেই থেকে বব মার্লের পরিচয় মিডিয়ায় ছড়াতে থাকে বিশ্বব্যাপী। এই কথাগুলো গিলে খাচ্ছিল আমার কাছ থেকে জুলিয়ান মার্লে। সে কোনোদিনও ভাবেনি বাংলাদেশে তার বাবাকে এভাবে সে দেখতে পাবে।
জুলিয়ান আমাকে বলল—
: তুমি তো শুধু বাবার বন্ধুই নও; আমারও। ডেভিড বার্নেট-এর সাক্ষাত্কারটা আমাকে দিতে হবে এবং হবেই। এটা আমার জন্য এক মূল্যবান সম্পদ। ঐতিহাসিক প্রামাণ্য। বুঝলাম, বব মার্লে তোমাদেরই মানুষ। পুরো পৃথিবীর মানুষ। অন্তত আমাকেও কিছুটা শেয়ার করতে দাও...

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২৭
ফজর৪:০২
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৭
এশা৮:০৮
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :