The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

অন্যদিগন্ত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গযেমন দেখায় যা যা দেখায়

দিব্যদ্যুতি সরকার

এর আগে বেশ কয়েকবার ভারত দেখা হয়েছে। তবে সেসব দেখা কেমন দেখা তা খুলে না বললে ঠিকমতো বোঝা যাবে না। প্রথমবার ভারত দর্শন হয় রাজশাহীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে তাদের প্রায় সবারই পদ্মা পেরিয়ে ওপার যাওয়ার একটা সখ কোনো না কোনো সময়ে জাগে। ওখানে পড়ার সময়ে আমাদের প্রায়ই ওরকম সখ হতো এবং সেই সূত্রে একটি নৌকা ভাড়া করে পদ্মা পার হয়ে মুর্শিদাবাদের ওপার গিয়ে প্রথম ভারত দেখি। তখন অবশ্য ভারতের ভেতরে ঢোকার সুযোগ হয়নি। কিন্তু আমরা তো ভারতে ঢুকতে যাইনি, গিয়েছিলাম ভারত দেখতে। ফলে ভেতরে না ঢুকেও সেবার যা যা দেখেছিলাম তখন তার মূল্য ছিল বিরাট। মোটামুটি ছোটখাটো একটি মানববন্ধনের মতো করে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের দিকে পেছন ফিরে ভারতের মধ্যে যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত এক-একটি করে দৃশ্য দেখতে থাকলাম। সত্যিই সে এক অভিনব আগ্রহে ভারত দেখা। সীমান্তের এপার থেকে তাকিয়ে দেখছি ভারতের মধ্যে ছোট ছোট চালা ঘর, গাছপালা সব বাতাসে নড়ছে। দূরে কয়েকটি গরু চরছে, বাংলাদেশের মতো ছোটখাটো চেহারার গরু; সেখানে একজন মহিলা গোবর কুড়াচ্ছে। আরও দূরে দেখলাম একটি পরিবার ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে একজনের পরনে বোরখা। খানিকক্ষণ পর পর ওপার থেকে আমাদের দিকে বিএসএফ-এর পাহারাদাররা তাকাচ্ছে। আমরা ছয়-সাতজন বন্ধু দূরে দাঁড়িয়ে ভারত দেখছি আর যে যেটুকু দেখছি সেটুকুর ওপর ভিত্তি করে এক-একটি গল্প তৈরি করে বান্ধবীদের শোনাচ্ছি। বান্ধবীরাও আমাদের প্রতিভায় মুগ্ধ।
দ্বিতীয়বারের ভারত দর্শন হয়েছিল জাফলং সীমান্তে। এখানেও ভারত দেখবার জন্য একটি নদী পার হতে হয়। তবে সেটি নামেই নদী; তেমন গভীর না, চওড়াও না, কোনোরকমে এবড়ো থেবড়ো হয়ে বয়ে যাচ্ছে। নদীটির নাম ডাওকি; ভারতের মেঘালয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। নদীটির বাংলাদেশ অংশে যা প্রথমেই চোখে পড়বে, তা হলো অসংখ্য নৌকা। এসব নৌকার কিছু কিছু আমাদের মতো ভারত দেখতে আসা লোকেদের পার করে যতদূর সম্ভব সীমান্তের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। কিছু নৌকা তীরে একটি জায়গায় শাপলা ফুলের পাপড়ির মতো সাজিয়ে রাখা, দেখে মনে হয় যেন বিশ্রাম নিচ্ছে; বাকি নৌকাগুলো নদী থেকে পাথর তুলছে। এই পাথরগুলো কিছুক্ষণ আগেও ছিল ভারতীয় পাথর। স্রোতের টানে গড়িয়ে গড়িয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশে প্রবেশ করেই ডাওকি নদীটি একরকম বাংলাদেশি চেহারা পেয়েছে; এবড়ো থেবড়ো, এখানে স্রোত ওখানে চর। বালির চরে দাঁড়িয়ে সীমান্তের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়বে উঁচু একটি পাহাড়ের সারি। তার ওপর নানা রকম গাছ। দূর থেকে দেখে বোঝা যাবে, সেসব গাছের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের মাজা বরাবর একটি পাকা রাস্তা চলে গেছে। সেটি আবার গিয়ে মিলেছে একটি ঝোলানো সেতুর সাথে। এই ঝুলে থাকা সেতুটি যুক্ত হয়েছে মেঘালয়ের ডাওকি বন্দরের সাথে। সেতুটির দিকে তাকিয়ে থাকলে দেখা যাবে যে ওটির ওপর দিয়ে গাড়ি চলছে। পাহাড়ি ওই রাস্তার পাশে রয়েছে ছোট ছোট পাকা ঘর। এবারও দূর থেকে সীমান্তের পাহারাদারদের আবিষ্কার করা গেল। ডাওকি নদীর বালির চরে আড়াআড়িভাবে ছোট ছোট রং লাগানো সীমান্ত পিলার সারি করে পোঁতা। পিলারগুলোর একদিকে বাংলাদেশ আর অন্যদিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। জাফলং ফিরে আসার সময় একজন বাংলাদেশি যুবক তার গেঞ্জির মধ্য থেকে একটি সুন্দর বোতল বের করে আমাদের সামনে মেলে ধরলো। যুবকটির গায়ের রং কুচকুচে কালো, কিন্তু দাঁতগুলো ধবধবে সাদা। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ওই দাঁতগুলো বের করে সে বলল, বোতলটি এইমাত্র মেঘালয় থেকে এসেছে। বোতলের মধ্যে মেরুন রঙের মদ।
এর পরের বারের ভারত দেখা সাতক্ষীরা সীমান্তে। এখানে দেবহাটা নামক একটি থানা আছে। থানাটি বলতে গেলে একেবারেই বাংলাদেশ সীমান্ত রেখার ওপরে। স্থানটির নাম যে দেবহাটা, তা একরকম সার্থক বলেই মনে হলো। কারণ, দেবতারা এমনিতেই হাট বাজার করেন না। তবুও তাদের নামে যদি একটি হাট হয় তাহলে সেখানে মালামাল তেমন কিছু থাকার কোনো দরকার পড়ে না। সকালে যখন সত্যি সত্যি হাট বসলো, তখন সেখানে মনপ্রাণ খুলে দেখবার মতো কিছু দোকান এলো। হাটের সবচেয়ে বড়ো কাপড় চোপড়ের দোকানদারটি এলেন একটি সাদা বস্তা মাথায় করে। শাড়ি-গামছা ইত্যাদি কিনতে এসেছে এ রকম কয়েকজন লোক ধরাধরি করে বস্তাটি মাথা থেকে নামিয়ে আনলো। এরপর দোকানদার একটি চট বিছিয়ে তার ওপরে কয়েকখানা শাড়ি-গামছা আর লুঙ্গি মেলে তৈরি করলেন দেবহাটার সবচেয়ে অভিজাত এবং একমাত্র বস্ত্রবিতানটি। আর লোকে কেউ উপুড় হয়ে কেউ হাঁটু ভেঙে বসে সেই কাপড় পছন্দ শুরু করল। তখনকার সবচেয়ে বড়ো মিষ্টির দোকানটিও একটি দর্শনীয় বস্তু ছিল বটে। দোকানটি দোচালা; একটি চালে কয়েকটি লালচে টিন আর আরেক চালের অর্ধেক গোলপাতা দিয়ে ঢাকা। বাকি সামনের অর্ধেকটা খোলা। দোকানের মধ্যে একপাশে একটি লম্বা বেঞ্চ। সকালের রোদের প্রায় পুরোটাই দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়ে; খরিদ্দারদের কষ্ট হবে ভেবে দোকানদার সেখানে একটি পলিস্টারের কাপড় ঝুলিয়ে রেখেছে। মিষ্টি কিনতে কিনতে ময়রাকে জিজ্ঞাসা করলাম, দেবহাটায় আপেল পাওয়া যাবে কি না। ময়রা বুঝতে পারল নতুন এসেছি। এখানে অহেতুক কেউ আপেল খোঁজ করে না।
দেবহাটার এই হাটটির পশ্চিম পাশেই ইছামতী নদী। এমন কিছু বড়ো নদী না। একটু জোরে চেঁচিয়ে ডাকতে পারলে ওপারের মানুষ তা শুনতে পায়। সকালে দেখলাম কয়েকজন বাংলাদেশি ডায়াবেটিসের রোগী নদীর পাশ দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। তুলনায় ওপারটা বেশ ফাঁকা। কোনো ডায়াবেটিসধারীকে সেখানে চোখে পড়লো না। দুই সীমান্তের মাঝখানে কোনো নো ম্যানস ল্যান্ডও নেই, রয়েছে একটি নদী। অনায়াসে একে নো ম্যানস রিভার বলা যায়। ওই নদীর পূর্ব পারে দাঁড়িয়ে দেখলাম পশ্চিম পারে ভারত। আর তাকে সারাক্ষণ চৌকি দিচ্ছে বিএসএফ-এর জোয়ানরা।
একবার উত্তরবঙ্গ ঘুরতে গিয়ে উঁকি দিয়ে ভারত দেখার সুযোগ হয়েছিল। এবারের দলনেতা ছিলেন লেখক গোলাম মুরশিদ। এছাড়া কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ছিলেন, ছিলেন আভিধানিক স্বরোচিষ সরকারও। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ছিলেন হাসান আজিজুল হক ও গোলাম মুরশিদ। ঘোরাঘুরিতে তাঁদের উত্সাহ সত্যিই ঈর্ষা করার মতো। ফলে সোনা মসজিদ দেখেই তাঁরা ফিরে আসতে রাজি ছিলেন না। সোনা মসজিদ থেকে কিছুটা পথ এগিয়ে সীমান্তের একেবারে ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো মসজিদ দেখা হয়েছিল। ওখানকার স্থানীয় এক ব্যক্তি পশ্চিম দিকের একটি আখ বাগান দেখিয়ে বলল, ওই বাগানের পশ্চিম পাশে রয়েছে ভারত। ভারত দেখার আশায় একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আখ বাগানের মাথার ওপর দিয়ে পশ্চিম দিকে তাকাতে থাকলাম। দূরে কয়েকটা উঁচু গাছের ডগা মাত্র দেখা গেল। নিশ্চয়ই ওগুলো ভারতীয় বংশোদ্ভূত কোনো বৃক্ষ ছিল। হঠাত্ তাকিয়ে দেখলাম একটি ছেলে আর একজন মহিলা দুটো পোটলা মাথায় করে আখ বাগানের মধ্য থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের দিকে হাঁটতে লাগল।
এভাবে দূর থেকে বেশ কয়েকবার ভারত দেখা হয়েছে। ফলে সত্যি সত্যি যখন ভারত ভ্রমণের একটি সুযোগ মিলল, তখন সবকিছুই খুব খুঁটিয়ে দেখবার দারুণ ইচ্ছে মনে জাগল। ভারত দর্শনের এই অভিযাত্রার শুরুটা করতে হয়েছিল সাতক্ষীরা শহর থেকে। সাতক্ষীরা শহর থেকে ভারত সীমান্ত তেমন দূরে নয়। এখান থেকে যে যানবাহনে করে ভোমরা বর্ডারে যেতে হয়, তার নাম ‘গ্রামবাংলা’। এটির ইঞ্জিন হলো স্যালো মেশিন আর সাতক্ষীরার মিস্ত্রিরা তাতে নানা সাইজের তক্তা পিটিয়ে দুই সারি বসবার সিট তৈরি করেছে। চলার সময় এই যানটিতে একই সাথে ভটভট এবং ঝনঝন এই দুটো মধুর (!) আওয়াজ হতে থাকে। এই ভটভট আর ঝনঝন শব্দতরঙ্গের সাথে আরও যুক্ত হয় কাঁপতে কাঁপতে চলা। কিছুদূর পরপর রাস্তার ছাল-চামড়া উঠে যাওয়ায় এই কম্পনের জন্য গ্রামবাংলার যাত্রীরা সকলেই একরকম প্রস্তুত হয়েই থাকে।
আমাদের দেশের কাস্টমস ও ইমিগ্রেশান পেরিয়ে গেলাম খুব সহজে। বিদেশ ভ্রমণের সরকারি আদেশখানা দেখে ঝটপট পাসপোর্টে একটা করে সিল মেরে আর একবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছেড়ে দিলো। এরপর পনেরো-বিশ হাত চওড়া একটি ছোট্ট নো ম্যানস ল্যান্ড পেরিয়ে যাওয়ার পর ভারতের কাস্টমস আর ইমিগ্রেশান। ইমিগ্রেশানে লাইনে যখন দাঁড়িয়ে আছি, দেখি সকলের হাতে মোটামুটি দুটো জিনিস ধরা। একটি পাসপোর্ট আর অন্যটি হলো বাংলাদেশি মুদ্রায় পঞ্চাশটি করে টাকা। সিনেমা হলের টিকিট কাটার মতো একটি জানালার ফুটো রয়েছে, এর মধ্য দিয়ে সকলে এই দুটো বস্তু একে একে ঢুকিয়ে দিচ্ছে আর ভেতরের দুইজন ব্যক্তি একটা করে সিল মেরে দিচ্ছে। একসময়ে ভিসা বিহীন পাসপোর্টটি এগিয়ে দিলাম, সাথে বাংলাদেশ সরকারের বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিপত্র। ভেতরে বসে থাকা অফিসার চেহারার মানুষটি আমার দিকে এবং পাসপোর্ট আর অনুমতিপত্রের দিকে কয়েকবার তাকালেন। তারপর টেবিলের দিকে ঝুঁকে পড়ে বেশ সাবলীল গলায় বললেন, পঞ্চাশটি টাকা দিন। তিনি আমাকে অশেষ দয়া করে ভারতে ঢুকতে দিচ্ছেন, এই পঞ্চাশটি টাকা হলো তার নজরানা! মনে হলো একটা ছোটখাটো বিতর্কে নামি। কিন্তু তাতে আমাকে শুধু ইমিগ্রেশানের ওই শ্রীমানটিকে দেখে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হতে পারতো। ভাবলাম, শুরুটা ভালোই হয়েছে! ভারত সরকার আমাকে ভিসা বিহীন প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে আর তার একজন কেরানি আমার কাছে টাকা চাইছে। এমন অভিনব স্টার্ট এখানেই একটি ঝগড়া বাধিয়ে শেষ করার দরকার কী? ভেতরে ঢুকে দেখি আর কী কী অপেক্ষা করছে। ত্রিশ টাকা এগিয়ে দিলাম। লোকটি খুব বিরক্ত হলো এবং আরেকবার তিক্ত সুরে বলল, আরো বিশ টাকা। বাংলাদেশ কয়েকবার দুর্নীতির সূচকে প্রথম দিকে উঠেছে বলে আমাদের খুব মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু খুব চিন্তা করেও মনে করতে পারলাম না যে বাংলাদেশে কোথাও প্রকাশ্য দিবালোকে লাইন দিয়ে ঘুষের টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কিনা।
ভারত সীমান্তের এই এলাকাটির নাম ঘোজাডাঙা। স্থলবন্দর হলেও এর গ্রামীণ চেহারাটা এখনো বোঝা যায়। যখন এসব সীমান্ত তৈরি হয়নি, তখন নিশ্চয়ই এখানকার এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে কলসি কাঁখে করে মহিলারা জল আনতে যেত। ছেলেরা যেত হাডুডু খেলতে কিংবা রাত্রে যাত্রা গান শুনতে। মানুষ না পারলেও এখনো নিশ্চয়ই ভোমরা আর ঘোজাডাঙার কুকুর-বেড়ালেরা ইচ্ছে মতো এপার-ওপার করে থাকে। যা-ই হোক, সীমান্ত পার হওয়ার পর পরই প্রথম যে অবৈধ কাজটি সকলেই একবার করে করছে তা হলো বাংলাদেশি ফোন দিয়ে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে ফোন করা। ভারতের মধ্যে ঢুকে বাংলাদেশি ফোন দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সাথে কথা বলার মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা আছে। ফোনে কথা বলার সময়েই খেয়াল করলাম দুই-তিনটি কাক ভারতীয় একটি আম গাছ থেকে হঠাত্ বাংলাদেশের দিকে উড়ে গেল। মানুষ স্বঘোষিত সৃষ্টির সেরা জীব, কিন্তু সে এমন একধরনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৈরি করেছে যে সামান্য একটি কাকের মতো সীমান্ত অতিক্রম করার স্বাধীনতা সে কখনো ভোগ করতে পারবে না।
ঘোজাডাঙা থেকে ভারতের সবচেয়ে কাছের শহর বসিরহাট মহকুমা পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে। স্কুটারে সেখানে যেতে হবে। স্কুটার স্ট্যান্ডে দেখলাম পাগড়ি পরা ফরসা চেহারার একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। সারা মুখ দাড়ি আর গোঁফে ঢাকা। গায়ে পাঞ্জাবি আর পাজামা। এই হলো শিখ মানুষ। বাংলাদেশে আমরা সর্বক্ষণ মুসলমান আর হিন্দু দেখি। মনে হলো এই শিখ মানুষটিকে যদি দাড়ি কামিয়ে আর গোঁফ ছেটে দিয়ে দেওয়া হয়, তিনি দিব্যি বাঙালির মতো দেখাবেন। দাড়ি গোঁফ আর পোশাকের মহিমায় এক-একজন মানুষ যে কী বিচিত্র আইডেন্টিটি পেয়ে যায়, ভাবলে অবাক লাগে।
যে রাস্তা দিয়ে বসিরহাট শহরে পৌঁছাতে হয়, সেটি বেশ এবড়ো থেবড়ো হয়ে আছে। বসিরহাট শহরে চলাচলের মূল বাহন হলো ভ্যান। নুরুল নামের মধ্যবয়স্ক একজন ভ্যান চালকের কাছে শুনলাম এখানকার অধিকাংশ ভ্যানওয়ালা নাকি মুসলমান। নুরুলের দুই ছেলে আর তিন মেয়ে। ছেলেরা কলকাতায় রং মিস্ত্রির কাজ করে। লেখাপড়া তেমন শেখেনি। কেন শেখেনি, এই প্রশ্নের তেমন ভালো উত্তর নুরুলের কাছ থেকে পাওয়া গেল না। শুধু বোঝা গেল ছেলেদের একটু বয়স হলেই সে তাদের রোজগারের পথে নামিয়ে দিতে চেয়েছে। লেখাপড়া করার ব্যাপারটা সে গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। তাদের গ্রামটা মুসলমান প্রধান। অধিকাংশই নাকি অল্প লেখাপড়া জানা; মাদ্রাসায়ও পড়ে অনেকে। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনাদের কি স্কুলে ভর্তি হতে কোনো বাধা আছে? নুরুল বলল, না বাধা নেই, তবে স্কুলে ধর্ম পড়ায় না।
বসিরহাট শহরে কিন্ডার গার্টেন, প্রাইমারি ও স্কুল পর্যায়ে মুসলমান ছাত্রদের হার আশংকাজনক হারে কম; কোনো কোনো ক্ষেত্রে দশ শতাংশও হবে না। অথচ এখানকার প্রায় অর্ধেক অধিবাসীই মুসলমান। শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করে জানা গেল যে মুসলমান ছাত্ররা মূলত মাদ্রাসায় পড়ে। স্কুলে যারা পড়ছে তাদেরও অনেকে মাধ্যমিক শেষ করে না; বিভিন্ন কাজে নেমে পড়ে। মুসলমান ছাত্রদের এই দুরবস্থা কলকাতায় আরও ভয়াবহ। গড়িয়া এলাকার একটি মাধ্যমিক স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখলাম সেখানকার ছাত্রদের পাঁচ শতাংশও মুসলমান নয়। শিয়ালদহের একটি মেয়েদের স্কুলে এই অবস্থা আরও করুণ বলে মনে হলো। পুরো স্কুলে মুসলমান মেয়েদের হার দুই শতাংশ হবে কিনা সন্দেহ। শিক্ষকদের অবস্থাও তা-ই, স্কুলে বড়োজোর এক-দুই জন মুসলমান শিক্ষক। শিক্ষকদের না থাকার কারণ হিসেবে চাকরিতে তাদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে বলে একটা অভিযোগ দাঁড় করানো যায়, কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি না হওয়ার কোনো বৈষম্যমূলক কারণ চোখে পড়ল না। এরপর হুগলির একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এবং বর্ধমানের দুইটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের সাথেও কথা বলে দেখেছি, সর্বত্রই একই চিত্র। বর্ধমান শহরের নবম শ্রেণির একজন ছাত্রীর কাছে শোনা গেল যে, তাদের স্কুলে একজন মাত্র মুসলমান শিক্ষক ছিলেন। খুব ভালো পড়াতেন। কিন্তু মাস দুয়েক আগে তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এখন সেখানে কোনো মুসলমান শিক্ষক নেই। মুসলমান ছেলেমেয়েও আছে খুব কম। শতকরা হিসেবে পাঁচ থেকে দশজন। অথচ পুরো পশ্চিমবঙ্গের সাতাশ শতাংশ অধিবাসী মুসলমান। ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় মুসলমানেরা যে ইংরেজি না শেখার এমনকি লেখাপড়া না শেখার একধরনের অভ্যাসের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানেরা সেই অভ্যাস থেকে খুব বেশি বেরিয়ে আসতে পেরেছে বলে মনে হলো না। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁদের উপস্থিতি খুব কম। মুম্বাইয়ের শাহরুখ খান, সালমান খান প্রমুখ খান বংশীয় সুপার হিরোদের দেখে ওখানকার মুসলমানদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিতির মাত্রাটা বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে কলকাতা-সহ ওখানকার বিভিন্ন মফস্বল শহরের বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের খোঁজখবর নিলে। বাংলাদেশের মুসলমানের সাথে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানের এ এক বিরাট পার্থক্য।
বাংলাদেশের একবারে গা ঘেঁষে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে নানারকম পার্থক্য। এই পার্থক্যের একটি হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভারতের রেল ব্যবস্থার সর্বজনীনতা এবং বিশালতার কথা সর্বজনবিদিত। এই ব্যবস্থাটিই মূলত ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থার সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশে কয়েকদিন আগেও রেল মন্ত্রণালয় বলে কিছু ছিল না। সমপ্রতি যে রেল মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় চালু হয়েছে, সেখানকার মন্ত্রিত্ব পাওয়া এমন কিছু শ্লাঘার ব্যাপার বলে মনে করা হয় না। কিন্তু ভারতে রেল মন্ত্রকের মন্ত্রিত্ব পাওয়া একটি বিশাল মর্যাদার ব্যাপার। এর কারণ হলো এই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের বিশালতা। ভারতীয় রেল যে কতটা জনগণের যানবাহন, তা কয়েকটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। প্রথমে আসা যাক ভাড়ার কথায়। ধরুন, আপনি যাবেন বসিরহাট থেকে কলকাতা, দূরত্ব বিরাশি কিলোমিটার। টিকিট কাটতে গিয়ে যে ভাড়াটার কথা শুনবেন, বাংলাদেশি কান দিয়ে শুনলে তাকে ভ্রান্তশ্রবণ বলে মনে হতে পারে—মাত্র পনেরো টাকা। অথবা যাবেন কলকাতা থেকে অন্তত দেড়শ কিলোমিটার দূরের কোনো গন্তব্যে। ভাড়া খুব বেশি হলে ত্রিশ টাকা। এই ভাড়াটা আবার ওই দূরত্বের সবচেয়ে বেশি ভাড়া। কারণ, আপনি একটি টিকিট কেটে একবারের জন্য দেড়শ কিলোমিটার যাচ্ছেন, ফলে ভাড়া একটু বেশি। এখানে ‘পাইকারি’ দামে টিকিটের ব্যবস্থা আছে। আপনি যদি মাসিক একটি টিকিট কেটে ডেইলি প্যাসেন্জারি করতে চান, তাহলে প্রতি একশ কিলোমিটারের ভাড়া দশ টাকার মতো পড়তে পারে। এই ট্রেনগুলো অবশ্য লোকাল ট্রেন; কিন্তু বাংলাদেশি লোকাল ট্রেনের অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে যদি ওই ট্রেন ধরতে যান, তাহলে এটা নিশ্চিত যে আপনি নিজেই ধরা খাবেন। নতুন যদি সেখানে যান, তাহলে মনে রাখবেন যদি টাইম টেবিলে এই ধরনের কোনো লোকাল ট্রেনের স্টেশনে আসার সময় লেখা থাকে আটটা বেজে বারো মিনিট, তাহলে আটটা পনেরো মিনিটে গিয়ে দেখতে পাবেন সে ট্রেন ততক্ষণে পরের স্টেশনের কাছে চলে গেছে। এই ট্রেনগুলো ঘন ঘন থামে কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য এবং সময় মেনে মেনে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের শহর এলাকার ভিড়টা অভাবনীয়ভাবে কমিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছে। কলকাতায় এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষ পঞ্চাশ থেকে একশ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সময়মতো অফিস করছে। ট্রেনগুলো সব সময় মেনে মেনে চলাতে কারও অফিস সময়ের সমস্যা হচ্ছে না। ঢাকার নিউমার্কেট থেকে যিনি টিএসসিতে অফিস করেন, তার যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন চল্লিশ টাকার মতো খরচ লাগে। এই একই খরচে কলকাতার অন্তত ষাট কিলোমিটার দূর থেকে অফিসে গিয়ে ফিরে আসা যায়। দুই দেশের টাকার মানের কিছু পার্থক্য অবশ্য রয়েছে, তবে সে এমন কিছু বিরাট নয়। আমাদের একশত টাকা দিলে মোটামুটি বিরাশি-তিরাশি টাকার মতো ভারতীয় রুপি মেলে।
ভারতের লোকাল এই ট্রেনগুলো চলে বিদ্যুতে; ট্রেনের দুই মাথায় আর মাঝের দিকে তিনটি দণ্ড ওপরে বৈদ্যুতিক তারের সাথে সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকে আর এই ছোঁয়ার শক্তিতে কোনোরকম ধোঁয়া না উত্পাদন করেই ট্রেন দৌড়াতে থাকে। লোকাল ট্রেনগুলোর বডিটা যাকে বলে আয়রন বডি, পুরোটাই লোহার তৈরি—সিট সেলফ এমনকি যাত্রীরা যে ঝুলন্ত হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে সে সবই লোহার। এটা দেখে বাংলাদেশি যেকোনো মানুষের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে ট্রেন পোড়ানোর দৃশ্যগুলো মনে পড়তে পারে। মনে পড়বে এই কারণে যে এই আপদমস্তক লোহার ট্রেনে কোনোভাবেই আগুন লাগানো যাবে না। পেট্রল ঢেলে আগুন লাগালেও না; কারণ পেট্রলও যখন শেষ হবে আগুনও তত্ক্ষণাত্ নিভে যাবে। ট্রেনে চড়া এখানে ছোটখাটো একটা গবেষণার মতো ব্যাপার বলা যায়। কোন ট্রেন কয়টায় কোন স্টেশনে আসবে বা যাবে, তার ভাড়া কত, কী কী খানাপিনার ব্যবস্থা সেখানে রয়েছে—এসব নিয়ে সেখানে রীতিমতো বই পর্যন্ত রয়েছে। আর আমাদের জন্য যা নতুন তা হলো, ওখানে যেকোনো স্টেশন থেকে ভারতের যেকোনো গন্তব্যের টিকিট কাটা যায়। লোকাল ট্রেনের ক্ষেত্রে টিকিট কাটতে হয় দূরত্ব হিসেবে। হয়তো পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্বের কোনো স্টেশনের টিকিট কাটা হলো, এরপর যেকোনো লোকাল ট্রেনে একটানা অথবা ভেঙে ভেঙে যেভাবে ইচ্ছা সেখানে যাওয়া যাবে।
কলকাতা শহরের মধ্য দিয়ে সারাদিন আরেক ধরনের ট্রেন চলাচল করে। তবে তা মর্ত্য কলকাতায় নয়, পাতাল কলকাতায়। আপনি যখন ফুরফুরে মেজাজে বিধান সরণির ফুটপাথ দিয়ে হাটছেন, তখন ভাবতেই পারবেন না যে আপনার পায়ের তলার মাটির নিচ দিয়ে প্রতি মিনিটে হাজার হাজার মানুষ শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। কাজকর্ম মিটিয়ে চুপচাপ অসংখ্য মানুষ মাটির তলা দিয়ে কখন যে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের পক্ষে তা কল্পনা করাও কঠিন। শহরের অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটির তলায় এই বিরাট কাণ্ডটি ঘটে চলেছে। মাটির তলার স্টেশনগুলোও চমত্কার। একেবারে মাটির ওপরের স্টেশনের মতো সবকিছুই সেখানে রয়েছে। বাড়তি রয়েছে সর্বক্ষণ অন করে রাখা বড়ো বড়ো কয়েকটি টেলিভিশন। বিভিন্ন প্লাটফর্ম দিয়ে একের পর এক ট্রেন হুস হুস করে আসছে আর যাচ্ছে। তবে নতুন যা তা হলো এই ট্রেনে কোনো হর্ন লাগে না। চলার পথটাই যার বিরাট একটি কংক্রিটের গর্ত, তার আবার হর্নে কী প্রয়োজন!
কলকাতার সাথে ঢাকার একটি চোখে পড়ার মতো তফাত হলো যানজটের। যানজট ওখানে নেই বললেই চলে। যানবাহনও রয়েছে হরেক রকমের। এর মধ্যে আমাদের দেশে নেই এমন দুটো যান হলো ট্রাম আর টানা রিকশা। দুটো বিআরটিসি বাস জুড়ে দিয়ে সেটিকে একটি ছোট রেলের ওপর দিয়ে চালানোর ব্যবস্থা করলে যে রকম দেখাতে পারে, ট্রাম গাড়ি মোটামুটি সে রকম দেখতে। ট্রামের এই পাটিগুলো শহরের রাস্তার মধ্য দিয়েই চলে গেছে। একবার তার ওপর দিয়ে বাস, ট্যাক্সি যাচ্ছে আবার কিছুক্ষণ পরে সেখান দিয়েই যাচ্ছে ট্রাম। ট্রেনের যেমন একটা আলাদা প্রেস্টিজ আছে; রাস্তা ক্রস করার সময় দুই পাশে অন্য সব যানবাহন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে; ট্রামের তেমন কিছু নেই। যদি কখনো রাস্তার গাড়ির ভিড়ে ট্রাম লাইন ব্লক হয়ে যায়, তখন বাসের মতো ট্রামও অপেক্ষা করে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যায়। ট্রামের ড্রাইভার বেচারাকে অবশ্য সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, বাসের মতো বসে বসে ড্রাইভ করার সুবিধা তার নেই। এহেন থেমে থেমে চলা একটি যানবাহনে চাপা পড়ে জীবনানন্দ দাশ মারা গিয়েছিলেন, ভাবলে অবাক লাগে। শোনা যায় জীবনানন্দ ওই দিন নাকি খুব অন্যমনষ্ক ছিলেন। ধারণা করি, জীবনানন্দ দাশ অন্যমনষ্ক ছিলেন না; তিনি জানতেন ট্রাম তো যখন তখন থেমে পড়তে পারে; আসলে অন্যমনষ্ক ছিলেন ট্রামের ড্রাইভার। কলকাতায় মদ যেমন পানির মতো বিক্রি হয়, কে জানে কয়েক বোতল বাংলা মদ খেয়ে তিনি ট্রাম চালাচ্ছিলেন কিনা। নইলে ফাঁকা রাস্তায় একজনের গায়ের ওপর ট্রাম তুলে দেওয়ার কোনো কারণ থাকার কথা নয়।
কলকাতার মূল রাস্তাগুলোতে রিকশা নেই, রিকশার দেখা মিলবে মূলত পার্শ্ব রাস্তাগুলোতে। এই রিকশায় মানুষ ঠিক কী কারণে ওঠে, সেটি বোঝা মুশকিল। কারণ, এটি চলে মানুষের হাঁটার গতিতে, কোনো প্যাডেল করার ব্যাপার এতে নেই। দেখতে এটি অনেকটা হুড লাগানো ঠেলা গাড়ির মতো। শুধু পার্থক্য হলো ঠেলা গাড়ি ঠেলতে হয় আর এই রিকশা টানতে হয়। ভারী মালপত্র সাথে থাকলে সেগুলো টেনে নেওয়ার জন্য এতে ওঠার একটা কারণ আবিষ্কার করা যেতে পারে, কিন্তু দেখা যাবে বাক্সপেটরা নেই এমন দিব্যি সুস্থ-সবল মানুষও এতে উঠে ঢুলতে ঢুলতে পথ চলছেন। কখনো কখনো এটি এত আস্তে চলে যে একে ছাড়িয়ে লোকে পায়ে হেঁটে চলে যায়। টানা রিকশার ওপরে পায়ের ওপর পা তুলে বসে এই আস্তে চলার মধ্যে বোধহয় একটা কলকাত্তাইয়া বাবুগিরি আছে।
কলকাতার বাবুরা বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আজও কৌতূহলের বস্তু। এইসব বাবুদের একটি অভিজাত আবাসিক এলাকা হলো সল্টলেক। বসবাসের জন্য এমনকি বাবুগিরি জন্যও এলাকাটা খুব সুন্দর। যারা শুধু বাংলাদেশের অভিজাত আবাসিক এলাকা দেখেছেন, তারা সহজে এই এলাকাটার আভিজাত্য বুঝতে পারবেন না। প্রথম যে দৃশ্যটি চোখে পড়বে তা হলো, এই এলাকার প্রায় সব ভবনই দোতলা। ঢাকার অনেক অভিজাত এলাকায় একটি বাড়ির জানালার দুই হাত দূরে পাশের বাড়ির আরেকটি জানালা ছুঁই ছুঁই করে থাকে। আর অনেক জায়গায় ভবনগুলো এত কাছাকাছি যে কোনো রকম স্পাইডারম্যান না হয়েই ছাদের ওপর দিয়ে ছোট ছোট লাফ দিয়ে এক ব্লক থেকে অন্য ব্লকে চলে যাওয়া যায়। সল্টলেকের একটা বাড়ি থেকে আরেকটা বাড়ির মাঝে রয়েছে বেশ খানিকটা করে ফাঁকা জায়গা, চূড়ান্ত শক্তি দিয়ে দীর্ঘলম্ফ দিয়েও এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই। চলাচলের রাস্তাগুলো বেশ ছিমছাম, লোকজনও তেমন বেশি চোখে পড়বে না। দু-একটি প্রাইভেট গাড়ি চলছে, হর্নের শব্দও তেমন শোনা যায় না। অধিকাংশ বাড়িগুলোই এক-একটি সুন্দর আর্কিটেকচার, কোনো কোনো বাড়ির সজ্জার অন্যতম উপকরণ হলো নানা রকম সৌখিন গাছ। রাস্তাগুলো মোটামুটি লম্বভাবে একটার সাথে আরকেটা আড়াআড়ি করে সাজানো। এলাকাটির কিছুদূর পর পর একটি করে খেলার মাঠ আর পার্ক। বাংলাদেশে এ রকম গণপার্ক প্রায়ই কারও না কারও দখলে থাকে : হয় ময়লা আবর্জনা, হয় নেশাপ্রিয় মানুষ বা ফেরিওয়ালাদের, না হয় এলাকার কোনো প্রভাবশালীর রড সিমেন্ট আর বালিতে দখল হয়ে থাকে। রাত আটটার দিকে সল্টলেকের একটি মাঠে গিয়ে দেখা গেল খেলার মাঠে ঝকঝকে আলো আর সেখানে ছেলেমেয়েরা ব্যাডমিন্টন খেলছে। পার্কের ফুলগাছগুলোর চেহারা দেখলে বোঝা যায়, নিয়মিত সেখানে ফুল ফোটে। রাত নয়টার দিকে যদি দেখেন পার্কের গাছের মাঝে বেঞ্চে বসে কয়েকজন তরুণী কিংবা বাড়ির কর্ত্রীরা বসে খোশগল্প করছেন, তাহলে অবাক হবেন না। রাত্রে পার্কে বসে এ রকম সময় কাটানো এখানকার স্বাভাবিক ঘটনা।
সল্টলেকের বাসিন্দারা প্রায় সকলেই বিশাল রকমের ধনী। অনেকে হয়তো থাকেন মুম্বাই কিংবা লন্ডনে; বছরে পূজোর সময় একবার কলকাতায় আসতে হয় তাই সেখানে একটি বাড়ি করে রেখেছেন। এদের অনেকের সত্যি সত্যিই খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই, নতুন নতুন কোন স্টাইলে খাওয়া পরা নাচাগানা আর ঘোরা যেতে পারে সেটাই এদের অনেকের একমাত্র জীবনব্রত। হেলেদুলে নরম নরম পা ফেলে যখন এরা চলতে থাকে, তখন মনে হতে পারে—খোদা, এরাও এক ধরনের মানুষ! কলকাতার এসব ধনবানরা যেমন একধরনের দর্শনীয় মানুষ, ধনহীনরাও কম দর্শনীয় মানুষ নন। সেখানকার ভিক্ষাজীবী মানব সন্তানদের একবার দেখে নিলে বিষয়টি বোঝা যাবে।
পশ্চিম বাংলা বাংলাদেশ থেকে এমন কিছু ধনী নয়, কিন্তু সেখানে ভিক্ষুকের সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে আশ্চর্যজনক হারে কম। অনেক রেল স্টেশনে আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে একটিও ভিক্ষুকের দেখা নাও পেতে পারেন। আর যদিবা পান, তাহলে বাংলাদেশি ভিক্ষুকের তুলনায় তারা ঢের আলাদা প্রজাতির। এদের বিশেষত কলকাতার ভিক্ষুকদের ভেতরও কিছু ‘আভিজাত্য’ রয়েছে। চলতি বাস বা মেট্রো ট্রেনে কোনো ভিক্ষুক সাধারণত চোখে পড়বে না। ভিক্ষুক যা দু-একটার দেখা মেলে, তা মূলত লোকাল ট্রেনে। তাদের অধিকাংশই আবার শিল্পী ভিক্ষুক, গান গাওয়া তাদের একটি সাধারণ অভ্যাস। সেসব গান আবার আল্লা রসুল কিংবা হরে কৃষ্ণ জাতীয় গান নয়। অধিকাংশই দুনিয়াদারির গান। হয়তো সমকালীন কোনো জনপ্রিয় সিনেমার গান কিংবা কোনো ক্লাসিক পুরোনো দিনের গান। তবে সেগুলোর অধিকাংশই থাকে করুণ আবেদনের। যেমন, একজন হয়তো গাইছে, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে, মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে।’ আরেকজন গাইছে, ‘আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি।’ বাংলাদেশেরও কিছু ভিক্ষুক গান গেয়ে ভিক্ষা করে, কিছু ভিক্ষুক একধরনের হামদ-নাত পরিবেশন করে। অধিকাংশ তার বেসুরো, তাল লয়ের কোনো ঠিক নেই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে গলাও বিশ্রী।
গান গাওয়া বাংলাদেশি ভিক্ষুকদের খুব একটা পছন্দের নয়। তাদের কৌশল খুব প্রাকটিকাল ধরনের। হয় নিজের বিকলাঙ্গ শরীর প্রদর্শন করে, না হয় নিজের দুঃখের কাহিনি বর্ণনা করে এরা সাহায্য প্রার্থনা করে। কেউ কেউ অবশ্য নিজের লাভের চেয়ে ভিক্ষাদাতার লাভটাকে বড়ো করে দেখিয়ে ভিক্ষা চায়। তাদের ভাষ্য, আপনি দুটো-একটা টাকা দান করলে আল্লাহতায়ালা আপনাকে অশেষ সওয়াব দিবেন। অনেকে ভিক্ষা পেয়ে সাথে সাথে কিছু দোয়া করে দেয়, সাথে বাচ্চা-কাচ্চা থাকলে অভিভাবকের মতো মাথায় হাতও বুলিয়ে দেয়। কোনো কোনো ভিক্ষুকের কোলে থাকে ভগ্নস্বাস্থ্য একটি ঠোট্ট শিশু, কারো বা হাতে থাকে কোনো চেয়ারম্যান কিংবা ডাক্তারের একটি প্রত্যয়নপত্র অথবা ওষুধের প্রেসক্রিপশন। ইদানিং অবশ্য স্মার্ট কিছু ভিক্ষুক দেখা যাচ্ছে, যারা অত কথা ব্যয় করতে চায় না। এরা ভিজিটিং কার্ডের মতো ছোট ছোট কার্ড ছাপিয়ে নিয়েছে। লোকজন হয়তো বাসে কিংবা ট্রেনে বসে আছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এরা ঝটপট একটি একটি করে কার্ড প্রত্যেকের কোলে রেখে দেবে। সেখানে তার ভিক্ষার মূল কারণ বর্ণনা করে একটি করুণ কাহিনি লেখা থাকে। কার্ড বিলি করার কিছুক্ষণ পরে ভিক্ষুকটি এক-এক জনের কাছে গিয়ে কার্ডটি সংগ্রহ করে এবং মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে সাহায্য আশা করে। টাকা দিলেও তেমন দোয়া-আশীর্বাদ করে না, না দিলেও জ্বালাতন করে না। এরা স্বল্পভাষী ভিক্ষুক। অর্ধ ভিক্ষা অর্ধ জীবিকা ধরনের একরকম জীবিকাও বাংলাদেশে আছে। সেক্ষেত্রে একজন প্রতিবন্ধী হয়তো কিছু চকলেট কিংবা কোনো খাবারের ছোট ছোট প্যাকেট নিয়ে আপনাকে সেটি কিনতে অনুরোধ করবে। কিংবা হাতে থাকবে একটি অপ্রচলিত স্থানীয় পত্রিকা। আপনি কিনতে না চাইলে আপনাকে পীড়াপীড়ি করতে থাকবে এবং জানিয়ে দিতেও ভুলবে না যে সে একজন প্রতিবন্ধী হয়েও ভিক্ষা না করে ব্যবসা করছে। অতএব আপনার দায়িত্ব তার পণ্য কিনে তাকে সাহায্য করা।
পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের বিচিত্র ভিক্ষুক চোখে পড়বে না। আগেই বলেছি সেখানকার অধিকাংশ ভিক্ষুকই কণ্ঠশিল্পী। সেক্ষেত্রেও অবশ্য কিছু বৈচিত্র্য রয়েছে। চিরকাল ধরে ভিক্ষুকরা যে খালি গলায় গান গাইত, সেটি এখন বদলাতে শুরু করেছে। এখন তাদের অধিকাংশেরই হাতে থাকে একটি ছোট বাদ্যযন্ত্র। সমপ্রতি দেখা যাচ্ছে, গলায় ঝোলানো একটি মিউজিক প্লেয়ার। প্লেয়ারে মিউজিক ট্রাক বাজছে আর ভিক্ষুকটি শিল্পীর মতো তাতে গলা বসিয়ে দিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছে। এদের অনেকের গানের গলা সত্যিই মধুর। খেয়াল করে শুনলে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের অনেক মফস্বলের ‘খ্যাতিমান’ শিল্পীও এর কাছে কিছু না। এছাড়া চিত্রশিল্পী ভিক্ষুকও সেখানে রয়েছে। বিশেষত কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আশেপাশে গেলে এই ধরনের চিত্রকরদের চোখে পড়বে। সামনে হয়তো ক্রিসমাস; দেখবেন ভিক্ষুকটি ফুটপাথের ওপর ক্রুসবিদ্ধ যিশুর ছবি ফুটিয়ে তুলছে। এই শিল্পী ভিক্ষুকদের কেউ অবশ্য আপনার কাছে টাকা চাইবে না। লোকে খুশি হয়ে তাদের টাকা দেয়। সত্যি বলতে কি, লোককে খুশি বা বিনোদন দেওয়ার মতো এদের সত্যিই কিছু প্রতিভা আছে। ওখানকার একটি শহরের সব ভিক্ষুক একত্র করে যদি তাদের মধ্য থেকে বেছে বেছে শিল্পী নিয়ে একটি দল বানিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সেটি লোকে উপভোগ করবে।
যদিও ভিক্ষায় এরা ধর্মীয় ব্যাপার আমদানি করে না, তবুও অনুমান করা যায় যে এসব ভিক্ষুকের প্রায় সকলেই হিন্দু সমপ্রদায়ের। বাংলাদেশে যেমন অধিকাংশ ভিক্ষুকই মুসলমান। বসিরহাট থেকে কলকাতা যাবার ট্রেনে একদিন একটি মুসলমান ভিক্ষুক চোখে পড়ে। একটি মুসলমানি টুপি মাথায় দিয়ে ঠিক বাংলাদেশি ভিক্ষুকের স্টাইলে আল্লাহ-রসুল উল্লেখ করে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ভিক্ষা করছে। বাংলাদেশে কোনো হিন্দু ভিক্ষুককে কেউ কখনো মা কালী বা হরে কৃষ্ণ বলে ভিক্ষা চাইতে শুনেছে বলে মনে হয় না। দুই দেশের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ভিক্ষুকদের মধ্যে এটি একটি চোখে পড়ার মতো পার্থক্য।
আমাদের দেশে গণপরিবহনে চড়তে গেলে নিয়মিত কিছু ঝগড়াঝাটি করতে হয় কিংবা দেখতে হয়। সেসব ঝগড়ায় প্রায়ই বাংলা ভাষার অশ্লীল শব্দগুলোর সদ্ব্যবহার হয়। পথেঘাটে চলতে গেলে তো বটেই, চায়ের দোকানের আড্ডা, বন্ধুদের গল্পসল্প সর্বত্রই অশ্লীল শব্দ একটি দারুণ বাচিক বিনোদন। পশ্চিমবঙ্গে এটি তেমন চোখে পড়ল না। ভালো করে বোঝার জন্য কলকাতার গড়িয়া বস্তিতে এক রাত কাটানোর বন্দোবস্তও করলাম। সেখানকার প্রায় সব অধিবাসীই বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। কলকাতায় থেকে থেকে তাদের বাংলাদেশি ভাষাটাও পালটে গেছে, কিন্তু মুখখারাপগুলো পালটায়নি। অনেকদিন পর সেখানে কিছু স্বদেশি মুখখারাপ শুনতে পেলাম। দেশে মুখখারাপ শুনতে বিশ্রী লাগে; কিন্তু অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, গড়িয়াতে বাংলাদেশি মুখখারাপ অত খারাপ লাগছে না; বরং যত শুনতে থাকলাম তত দেশের কথা মনে পড়তে লাগল। এজন্যই বোধহয় কবি বলেছেন, দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।
বাংলাদেশে একটি নিষিদ্ধ ব্যাপার প্রায় সকলেই নিয়মিত চর্চা করে থাকে। নিষিদ্ধ এই কর্মটি হলো প্রকাশ্য ধূমপান। নিষিদ্ধ এই ধূম্রকুণ্ডলী খাওয়া যে কতটা উপভোগ্য, বাংলাদেশের পথেঘাটে বের হলে তা বোঝা যায়। প্রায় সর্বত্রই দেখা মিলবে ধূমপানের। বাংলাদেশি এই ধূমপানের মধ্যে একটি সর্বজনীনতা আছে, কে জানে একধরনের পরার্থপরতাও আছে কিনা। সর্বসাধারণের মধ্যে যে ধূমপান করা হয়, সেই ধোঁয়ার কিছু অংশ আশেপাশের সবার মধ্যে আপনাআপনি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিড়িটি যে খায় তার আশেপাশে থাকা সকলেই তার সাথে সাথে এটি খেতে থাকে। ধূমপায়ীদের কাছে এই ঘ্রাণ নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও বিনে পয়সায় ধূমপানের তৃপ্তি দেয়। কিন্তু অধূমপায়ীদের বসে বসে উসখুস করতে হয়। ধূমপায়ীরা বিশ্বাস করেন যে সিগারেট বিড়িও এক ধরনের খাদ্য; এবং বিশ্বব্যাপী যে কঠিন ও তরল খাবারের ছড়াছড়ি তার মধ্যে একমাত্র বায়বীয় খাদ্য। কিন্তু প্রকাশ্যে এই বায়বীয় খাদ্যটি খাওয়ার ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা বাংলাদেশ থেকে ঢের পিছিয়ে। অন্তত শহরের কোথাও ধূমপান চোখে পড়ার সম্ভাবনা ওখানে খুবই ক্ষীণ।
তবে প্রকাশ্য ধূমপানের সে অভাব সুদে আসলে উসুল হয়ে গেছে মদ খাওয়ায়। বাংলাদেশে যদি ধূমপান সর্বজনীন হয় পশ্চিমবঙ্গে মদ্যপান সর্বজনীন। মদ বাংলাদেশেও খাওয়া হয়, তবে বেশিরভাগ লোকই জানেন না যে কোথায় তা কিনতে পাওয়া যায়। পকেটে টাকা থাকলেই কারো যদি মনে হয়, যাই একটু মদ গিলে আসি, তাহলেও মদ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। বড়ো বড়ো শহরে অল্পকিছু বার রয়েছে, সেখানেই লোকেরা চিনাবাদাম মাংস কিংবা নানারকম স্পাইসি ফ্রাই সহযোগে ওয়াইন খায়। সেসব ওয়াইনের বোতলগুলোরও একধরনের আভিজাত্য আছে, ওয়াইনের রংটা দেখলেও অনেকের মন জুড়িয়ে যায়। কিন্তু বাংলা ভাষায় যাকে মদ বলে এ তো ঠিক তা হলো না, বিশেষত স্বদেশি ও সর্বজনীন মদ হলো না। স্বদেশি মদের রং, বোতল, দোকানের শ্রী কিংবা সেখানে যারা খেতে আসেন, তাদের চেহারার মধ্যে একধরনের স্বাদেশিকতা আছে। পুরোনো আমলের গ্রাম্য কবিরাজেরা যে ধরনের কাচের বোতলে পানিপড়া দিতেন, বাংলা মদের বোতলটা হবে সেই ধরনের। ওই বোতলের মধ্যে যে বস্তুটি থাকে, তার রংও বমি আসার মতো; যেন গ্রাম্য ঝুলন্ত পায়খানার গু মেশানো পানি! স্বাদ নাকি তারও চেয়ে বিশ্রী। বিশ্রী সুন্দর বলে একটা কথা বাংলায় চালু আছে, এ সেই বিশ্রী সুন্দর। সুন্দর বলতে হলো, কারণ অমন সর্বজনীন পানীয়কে সুন্দর না বলার ঝুঁকি নিতে সাহস করিনে। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন বাম শাসন ছিল। এখন সেখানে বামেরা ক্ষমতায় নেই, ক্ষমতায় যারা এসেছে তারা ঠিক ডানও নয়, বলা যায় গণতন্ত্রবাদী। বাম শাসনের মূল লক্ষ্য হলো সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা, আর গণতন্ত্রের লক্ষ্য জনশাসন। অন্যান্য খাবারের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কিছু সাম্য ও গণতান্ত্রিক বণ্টন সেখানে হয়েছে, কিন্তু সর্বজনীন বেশরম সাম্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মদের ক্ষেত্রে। ছোট একটি গ্রাম্য হাটেও এখানে মিলতে পারে মদের দোকান। তাও আবার কোনো গলি বা আড়ালে আবডালে নয়, একেবারে রাস্তার পাশে ভালো পজিশন মতো কোনো দোকানে। রাস্তার একদিকে হয়তো চালের আড়ত, পাশে একটি মুদির দোকান এরপর হয়তো একটি মদের দোকান, তারপর একটি ওষুধের দোকান। লোকের যাতে খুঁজে পেতে অসুবিধা না হয়, তার জন্য দোকানের সামনে রয়েছে একটি সাইনবোর্ড। পশ্চিমবঙ্গের অনেক দোকানপাটের সাইনবোর্ড হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা, কিন্তু স্বদেশি মদের সব দোকানের সাইনবোর্ডই বাংলায় লেখা। কোথাও লেখা ‘মদের দোকান’ আবার কোথাও লেখা ‘বাংলা মদের দোকান’।
বাংলাদেশিরা অমন প্রকাশ্য মদের দোকান দেখতে অভ্যস্ত নয়, যেমন অভ্যস্ত নানারকম মণ্ডা-মিঠাইয়ের দোকান দেখতে। পশ্চিমবঙ্গের মিষ্টির দোকানগুলোও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখবার মতো। বাংলাদেশের মতো ওখানেও মিষ্টি সেলফে সাজিয়ে রাখা হয়। তবে পার্থক্য হলো প্রতিটি মিষ্টির ঢিবির ওপর রয়েছে ছোট্ট একটি করে নেমপ্লেট। নেমপ্লেটে আবার একটি মাত্র সংখ্যা ছাড়া কিছুই লেখা থাকে না। যে নেমপ্লেটে লেখা আছে ৫, সেই ঢিবির প্রতি পিচ মিষ্টির দাম পাঁচ টাকা করে। কিনতে হবে গুনে গুনে, আর সেখানকার লোকেরা যেভাবে তা কিনে নিয়ে যাচ্ছে, তা দেখলে বাংলাদেশিদের ভয়ানক হাসি লাগতে পারে। যেমন একজন হয়তো কিনল দুটো চমচম আর দুটো কমলাভোগ। সাকুল্যে দাম হলো চৌদ্দ টাকা। দোকানদার ওই চার টুকরো মিষ্টি একটি প্যাকেটে পুরে খরিদ্দারের হাতে দিয়ে বলল, দাদা আবার আসবেন। বাংলাদেশ যতই গরিব হোক চার-পাঁচ টুকরো মিষ্টি নেওয়ার মতো কোনো প্যাকেট এ দেশের কোনো মিষ্টির দোকানে পাওয়া যাবে না। ওখানে কিন্তু ওই ধরনের প্যাকেটই বেশি মজুত থাকে। মিষ্টির দোকানে গিয়ে দেখবেন চার-পাঁচ ধরনের মিষ্টির প্যাকেট। এক কেজি মিষ্টি ধরবে এমন প্যাকেট রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। দুই কেজি ধরতে পারে তেমন প্যাকেট অনেক দোকানে নেইই। বাংলাদেশে আত্মীয় বাড়ি যেতে গেলে এক কেজি মিষ্টি নিয়েও অনেকে তৃপ্তি পান না, কদাচিত্ দু-একজন হয়তো আধকেজি নিয়ে সংকুচিত মনে আত্মীয় বাড়ি গিয়ে হাজির হতে পারেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দশ-বারোটা মিষ্টির তিনশ গ্রাম মতো সাইজের এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে দিব্যি হূষ্টমনে লোকে আত্মীয় বাড়ি যাচ্ছে।
মাছ-মাংসের ক্ষেত্রেও ওখানকার কেনাকাটার বৈশিষ্ট্য বিচিত্র। অধিকাংশ বড়ো মাছই বিক্রি হয় কেটে কেটে। হয়তো চার কেজি সাইজের একটি রুই বাজার থেকে টুকরো টুকরো হয়ে বারো ভাগে বিক্রি হয়ে বারো জনের রান্নাঘরে রান্না হচ্ছে, কেউ কিনেছে তিন পিচ তো কেউ পাঁচ পিচ। একই রুইয়ের মাথা খাচ্ছে আলীপুরের লোক তো পেটি খাচ্ছে জানবাজারের কেউ। মুরগিও বিক্রি হচ্ছে কেটে কেটে, যার চারশ গ্রাম দরকার সে পাঁচশ গ্রাম কিনবে না। এমনকি সবজিও এভাবে কেনাবেচা চলছে—চারশ গ্রাম আলু, ছয়শ গ্রাম মিষ্টি কুমড়া আর তিনশ গ্রাম শিম! কেনাকাটার এই রকমসকম দেখলে বাংলাদেশি যে কারোরই ভীষণ হাসি পাবে। এত যে কম কম কেনা, তার মানে কিন্তু এই নয় যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ভোজনপ্রিয় না। বরং এমন সব বিচিত্র পদ তারা তৈরি করতে পারে, যা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। নিমন্ত্রিত হয়ে খেতে বসলে হয়তো দেখবেন দুই ধরনের সুক্ত, তিন ধরনের চচ্চড়ি, দুই ধরনের ডাল, তিনটে মাছের পদ আর শেষে একটি চাটনি কিংবা অম্বল অথবা দুধকলা। কলকাতায় এমন অনেক হোটেল রয়েছে যেখানে প্রতিদিন অন্তত গোটা পঞ্চাশেক পদের তরকারি পাওয়া যায়, যার একটিও মাছ কিংবা মাংসের নয়। বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাস মূলত আমিষপ্রধান, পশ্চিমবঙ্গে সবজি আর দুধ প্রধান। বাংলাদেশের রান্নার বৈচিত্র্য আর পদসংখ্যা অল্প, পশ্চিমবঙ্গে পদসংখ্যা বেশি; এত বেশি যে ঠিক রাখার জন্য হাতে পেনসিলও রাখতে হতে পারে। বাংলাদেশে ভরপেট খেয়ে ঢেকুর তুললে পোলাও বা মাংস যা-ই হোক একক একটি ঘ্রাণ বেরিয়ে আসে, পশ্চিমবঙ্গের ঢেকুরে অমন একক ঘ্রাণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ভারতমাতা মানে যে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, তা তাঁর বাঙালি সন্তানদের খাবার মেনুর দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায়।
বস্তুত আমরাও ওই বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতিরই একাংশ। স্বাধীন দেশ হওয়াতে একধরনের বাংলাদেশি বাঙালিত্ব আমরা নির্মাণ করেছি এবং করে চলেছি। সে বাঙালিত্বের মধ্যে রয়েছে দারুণ সব উপলক্ষ আর পার্বণের নির্মাণ। বর্ষবরণ, ঋতুবরণ প্রভৃতি এখানে একটি রীতিমতো বাংলাদেশি রূপ পেয়েছে। খুব অবাক ব্যাপার হলো, এসবের মধ্যে বাঙালিত্বের একধরনের আদর্শিক প্রেরণাও অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। ফলে রবীন্দ্র কিংবা নজরুল জয়ন্তী কিংবা লালন উত্সব অথবা দুই মাস পর পর ঋতুবন্দনা সবকিছুর মধ্যে বাংলাদেশি বাঙালিদের একটি আদর্শিক লড়াইয়ের কাজও হয়ে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গে এই সাংস্কৃতিক লড়াই বা পার্বণের নবনির্মিতি চোখে পড়ে না। পুজোঠুজোয় অবশ্য নানা থিম চর্চা সেখানে হচ্ছে, কিন্তু সে তো ধর্মীয় ব্যাপার; হিন্দু ছাড়া অন্যান্য সমপ্রদায় সেখানে কোনো আবেগ বোধ করে না। ওখানকার সংস্কৃতি চর্চা মূলত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবেই হয়; মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সাথে ওদের সংস্কৃতিচর্চার দৃশ্যমান সংযোগ সৃষ্টি হয়নি। হতে পারে তেমন সংযোগ সৃষ্টির প্রয়োজনও এতদিন পড়েনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই প্রয়োজনের দিন তাদেরও বুঝি আসছে, যেদিন সংস্কৃতিচর্চাকে তাদেরও মৌলবাদের ও সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সমরাস্ত্রের মতো প্রয়োগ করা লাগতে পারে। আর সেদিন বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে একটি বাতিঘর। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশ আছে যারা সংস্কৃতির শক্তির ওপর ভরসা করে আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণের লড়াইয়ে রয়েছে?

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৫
ফজর৪:০৯
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৭
এশা৭:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:২৯সূর্যাস্ত - ০৬:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :