The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

খসড়া মানুষ

জয়া ফারহানা

মাটির ভাবগতিক আসিরুদ্দীর চেয়ে ভালো আর কে বোঝে এই তামাম সাজিয়ারায়। সকলেই ভাবে বাইস্যা কালের (বর্ষা কালের) নরম জেলো মাটি হলেই বুঝি বীজতলা তৈরির কারবার করা যায়। কিন্তু আসিরুদ্দী বোঝে যুবতী মেয়ে ছেলের ডিম ফোটার যে একখান জোয়ারের দিন আছে, মাটিরও আছে সেইরাম। গন্ধ শুঁকে সে বলে দিতে পারে মাটির সেই জোয়ারের দিনের কথা। তা এ অঞ্চলে বর্গাচাষিদের মধ্যে তার নামডাকও সেই রকম। যে জমিতে আসিরুদ্দীর হাত পড়ে সেই মাটিতে ধান নয় যেন সোনা ফলে, সোনা। পরান্ড মণ্ডল তাকে ডেইকে কয়, আসির রে মাটির জান এত ভালো বেসলি কিন্তুক তোর মান্যতা, ধরে রাখপে এমন কলাম আর কেউ-ই থাকল না। তা পরান্ড মণ্ডলের কথাখানা মিথ্যে নয় এক রত্তি। আসিরুদ্দীর চার চারটি ছেলে সন্তান। একজনও কেউ বাপের পথ ধরিল না। ক্যারে বিটারা? আইজ যে তুরা সগ্গুলি এত লায়েক হইয়েছিস তা তো এই মাটির খেয়েই। অবশ্য গোটা এলাকার মানুষ যখন তার ছেলেদের আয় উন্নতির কথা বলে, নানান গল্প করে গুটুদিয়া গঞ্জের চায়ের দোকানে বসে সেইসব রৌশনদার কেচ্ছা শুনতে তার মন্দ লাগে না। বর্গাচাষি হলে কী। সে পায়ে দেয় চার ইঞ্চি হিলের চামড়ার স্যান্ডেল। ছেলেরা তাকে বলে, আব্বা তুমি কলাম আর খালি পায় থাকপা না। আমাগের এডা ইজ্জত আছে না? তা আছে বটে। বড় ছেলে আফাজুদ্দি খুলনা-সাতক্ষীরা হাইওয়ের পাশে স’মিল দিয়েছে। মেজ আলিমুদ্দির পোলট্রি ফিডের দোকান। সেজ আইনুদ্দীনের মিষ্টির দোকান ডুমুরিয়া বাজারে। কেবল ছোটটাকে নিয়েই একটু কাহিল আসির। তার একটাই গো। মিডিলিস্টে যাবে। তা যাবি যা। কিন্তু জমি-জিরাত বিক্রির কথা আসে কেন? বর্গাচাষি আসির যে ধান পায় তাতে তার আর গোলেনাজ বেগমের বছর খোরাকী হয়েও থেকে যায় ধান।
নিজের যে ক’কানি জমি আছে সেখানে তিল, পেঁয়াজ, বছরের সবজি সবই ফলে। মন্দ কী। জমানো টাকা থেকে ছোট ছেলে আজিজকে খুচরো খুচরো কয়েকবার টাকা যে দেয়নি ব্যবসাপাতির জন্য তা-না, কিন্তু কোনোকিছুতেই ছেলেটা সুবিধে করে উঠতি পারিল না। ভাবে আসির। আর পারবে কী করে—দা-কোপ গঞ্জে গিয়ে দু’দান জুয়া তাস পেটানো কি যাত্রাপালা দেখা সেইডে এমন কোনো ফ্যাচালের কাম না। কিন্তু মাঞ্জা মেইরে রজনীগন্ধা সেন্ট মেইখে সেদিন তার মাকে কবে, ‘মা, রাইতে আর আসপ না কলাম। আসিরুদ্দি বোঝে সেদিনের ঘটনা সুবিধার না। কুপির আলোয় তার চোয়াড়ে মুখ ভারি অচিন ঠেকে আসিরুদ্দির কাছে। এই কি সেই ছুয়াল (ছেলে) যে জন্মের সময় বাইস্যার (বর্ষার) কী তড়পানি! বাপরে। গোলেনাজ বেগমের বাকি ৩ টে ছেলের সগলডির জন্ম জেলেখা দাইয়ের হাতে। কিন্তু আজিজ যেন মায়ের গর্ভ থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছিল, এত অনায়াসে তাকে পাওয়া যাবে না। হলোও তা-ই। সাজিয়ারা থেকে ১০ কি.মি. খানা-খন্দকের রাস্তা ভেইঙ্গে ভ্যানে করে তাকে নিয়ে আসতি হলো উপজেলা সদরের হাসপাতালে। গ্যাদা কালে নাত্তিরে মাইয়ের নিশায় সে কানত যেন কোনো বেড়াল ছানা কাঁদছে। পাশে সারাদিনের খাটুনিতে পরিশ্রান্ত গোলেনাজ বেগম তখন অসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। দুধের ধারা যে ছিপছিপিয়ে গড়াচ্ছে সেদিকে তার হুঁশ নাই। আজিজ জন্মাবার পর সাজিয়ারার সকলে মানতে বাধ্য হলো যে আসির ভাগ্যবান বটে। কারণ সে-বছর তার রাঙি গাইটাও বিয়ালো। আহা কী মায়াকাড়া হরিণ শিশুর মতো বাছুর বিয়ালো রাঙি। আর গোলেনাজ যে আজিজকে বিয়ালো সেও তেমনি মায়াকাড়া। যেন আসিরের ভাঙা ভিটেয় একখান নয়, দুখান রুপোর চান। দশ মাস বাদে সেই ছোট্ট মাটির পুতুলটার দুখানা দাঁত বের হলো। কারণে, অকারণে যখন তখন সে সেই দু’খানি মাত্র দুধে-দাঁতওয়ালা মাড়ি বার করে হাসে। আহা, আর হাসিটাও যেন রুপোর চানের মতো ঝকমকে। যা সামনে পায় তারই ওপর ওই নতুন দাঁত দু’খানির জোর পরখ করে দেখে। মাটির ঢেলা, টুকরো কাঠ, মায়ের আঁচল, গোলেনাজের মাই—যা পায় তাতেই কামড় বসিয়ে খিল খিল করে হাসে। তার কিছুদিন বাদেই খলবল করে হামাগুড়ি দিয়ে সে এমনভাবে ছুটে পালাত যেন পারলে তক্ষুনি সাজিয়ারা ছেড়ে তেপান্তরে পৌঁছায়। আবারো বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে আসিরুদ্দীর। ছেলে বুঝি তার তেপান্তরে যাবার জন্যই জন্ম নিয়েছে। সেই ছোটবেলা থেকেই আজিজের পাখির দিকে ঝোঁক, পক্ষী উড়াল দিলেই সে আসিরুদ্দির মুখের দিকে তাকিয়ে তার নিজস্ব ভাষায় কত কীই যে বোঝাতে চাইত। সেই আজিজ। দেখতে দেখতে একদিন আসিরের মাথাও ছাড়িয়ে গেল উচ্চতায়। কখনো খবর আসে—বাজারে চায়ের দোকানে উঠতি ছুয়াল-পাওয়ালদের সাথে চায়ের মদ্যি ফেন্সি দেওয়ার হুকুম দেয়, কেউ এসে খবর দেয়, সে নাকি আজিজের কোমরে দেখেছে ছয় ইঞ্চি ডেগার। আশি-আশি সুতোর বড়লোকি লুঙ্গি পরে। মোবাইলে চেয়ারম্যান, থানা নেতাদের সাথে খাইখাতিরের আলাপ করে। লম্বা জুলপি, শহরমুখো হলো জিনসের প্যান্ট। গোলেনাজ, যে গোলেনাজ—তার মা, সেও তখন তাকে চিনতে পারে না। দিনকাল বদলে গেছে। সাজিয়ারার মতো নিস্তরঙ্গ গ্রাম, যেখানে প্রত্যেকটি দিনই প্রায় একই রকম—সেখানেও নিত্য ঝুট-ঝামেলা লেগেই থাকে। সন্ধ্যা নামতেই আজিজ উপজেলা সদরের বাজারে বসে। তখন তার অন্য আরেক রূপ। একদম, চেয়ারম্যান সাবের স্বরে বলে, ‘এই দুইটে ফুল বোতল লাগা’। আলেকও তেমনি চাল্লু মাল। বোতলের মধ্যে নেশার ট্যাবলেট গুলে রাখে সে। আজিজ ভাবে, জব্বর মাল। জোস্নাকলির কথা, তার মনে পড়ে। জোছনা এখনো সে ছাড়া অন্য কাস্টমারেরে বসায় তার ঘরে—এইটা মনে পড়লেই তার মাথার ভেতরে কী একটা যেন নাই হয়ে যায়। একটা হাতাভাঙা বিশাল কড়াইয়ে তেলাপিয়া মাছ বলক তুলছে। চায়ের দোকানের সামনে ছোট্ট একটা কেরাসিনের চুলা। ভেতরে ছোট্ট তিন খানা বেঞ্চি। কাঠের কাচ ঘেরা ছোট ছোট আলমারিতে স্টিলের থালিভর্তি মিষ্টি। এই ভরা সন্ধ্যায়ও সেই থালির মিষ্টির ওপর ডুমো মাছি বসেছে। আবার আলমারির ওপর ছোট্ট একখানা গনেশের মূর্তিও আছে। তার সামনে ধূপের ধোঁয়া। মুসলমান দোকান হলে থাকত আগরবাতি। এক পাশে গনেশ, অন্যপাশে টেবিলের ওপর নিঝুম কয়েকটি মদের গেলাস। হাসিও পায় আজিজের। আজ সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি। দুপুরবেলা বৃষ্টি না থাকলেও আকাশের অবস্থা সুবিধার ছিল না। এখনো আকাশটা থমথমে হয়ে আছে। সেজন্যই সম্ভবত বাজার জমেনি আজ। একটা ঝিমমারা শব্দ উঠছে চারদিক থেকে। আবারও তার চোখ চলে যায় হাতাভাঙা তেলাপিয়ার কড়াইয়ে। জোস্নাকলির জন্য তার বুকের ভেতরটাও ওইরকম টগবগায়। দুপুর থেকেই আজ নিতাই চরণের মালখানায় বসেছে আজিজ আর তার দলবল। একজন সিগারেটের মতো কাগজের মোড়কে গাঁজা ডলছে আর আজিজটা টেনেই যাচ্ছে। তার চোখ দুটো এখন কোড়াপাখির চোখের মতো লাল। পাটের আঁশের মতো লম্বা চুলগুলো বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে। বিদ্যুত্ চলে গেলে ঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার দখল নিল। নিতাই তড়িঘড়ি আয়োজন সারছে কুপির আলোর উজালার জন্য। আজিজের একবার মনে হলো নিতাইকে বলে, আস্তে ধীরে-রে নেতাই, দপ করে জ্বালতে গেলে দপ করে নিভে যাবে। বলা হলো না। করুক যার যেমন খুশি। সব শালা ফিচেল। নিতাইটাও। কম লোভী নাকি সে? ভাই-বেরাদর সব ইন্ডিয়া পগার পার। এই মালু এইখানে পইড়ে আছে কেবল কবে ওর জ্যাঠা মরবে আর তার বাড়িটা দখলে নেবে এই লোভে। অবশ্য না নিলেও কোনো মুসলমান নেতার দখলে যাবে। তা নিক। শালার মালুরা কি মুসলমানদের কম ঘিন্না করিচে নাকি। এই যে নেতাই চরণ এখন শালপাতা কি কলাপাতা বাদ দিয়ে স্টিল কিংবা মেলামাইনের পিরিচে করে মর্যাদার সাথে মিষ্টিটা ছানাটা দেয়, কলকাতায় শালাগের আগের আগের গুষ্ঠীরা মুসলমানদের হাতেও মিষ্টি দেত না, ছুঁয়া লাইগে যদি ওগেরের জাত চইলে যায় সেই ভয়তে মিষ্টি দিত ছুইড়ে। বোঝ শালারা। তোরা যেমুন পূর্বজন্মের বরাত টানিস এহন পূর্বজন্মের পাপের খেসারত দিতি মুসলমানের পা তেলা। বিষ্টিবাদলার দিনি (দিনে) অবিরাম ডাকে পোকামাকড়। এইবার বর্ষার যে তোড়জোড় তাতে মনে লয় গঞ্জ বাজার সব ভাইসে যাবে, কিচ্ছু থাকপে নানে। নেতাই চরণ হিন্দু বলে সবাইকেই তার খুশি করে চলতে হয়, তার প্রমাণ তার দোকানের দেয়াল। সব দলেরই পোস্টার সাঁটা সেখানে। আর বছর সরকারি পার্টির ক’জন পাতি মাস্তান নেতাই চরণকে কলো, ‘নেতাই তোর দুকানটা ছাড়—আমরা কেলাব করি।’ ব্যাটা উপরি উপরি ম্যান্দামারা ভাব ধরলি কী অবে, তলে তলে ঠিকই নারায়ণ এম.পির সাথে যোগাযোগ রাহিল। খাওয়ার মদ্যি খাইছে খালি কয়খান রাম দার কোপ। তা পরে আবার খুলনে সদর হাসপাতালের চিকিছে নিয়ে যেই কে সেই—খাইসটে নেতাইয়ের কই মাছের পেরান। তবে ঘটনার পর বুঝা গেল নিতাই চরণ বেকামের না। ঘিলু, মগজ আছে।
নেতাই চরণ যে কেন লাথিটা ঝাটাটা খেয়েও মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চায়, বোঝে না আজিজ। সে তো পারলে এখনিই মিডিলিস্টে চলে যায়। শালার একখান দ্যাশ। নেতাই চরণ মাটি কপালে ছুঁয়ে দোকান খোলে। যেন মাটি ওর গনেশ। ঠিক ওর বাপটার মতো। বাপও নাকি মাটির মইদ্যে কী সব গন্ধ পায়। যত্তসব ফিচেল কতাবার্তি। মাটির আবার পেরথক ঘিরান কী? সব মাটিরই ঘিরান এক। সে তো এই মাটির মদ্যি কেঁচোর ঘিরান ছাড়া আর কিছু পায় না। বাপ কয়, আজিজ, বাপরে মাটিই কলাম জেবন। মাটি জেবন না ছাই। জেবন হলো গি পাত্তি মানে নোট। যেমন ধরিছেন, নোটের জোগাড় হলি পার গাঁজাটারও জোগাড় হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। তারপর প্যাকেট থেকে সিগ্রেট বের করে কাঠি দিয়ে সিগ্রেটের ভেতরকার সুকা বের করে গাঁজা ঢুকিয়ে দিলেই ব্যস। কিছুক্ষণ টানার পর নিশা লেগে গেলি পার আর চিন্তে নাই। সেই সুমায় নিজিরে যা ভাবতি ইচ্ছা হয় ভাবা যায় ইচ্ছামাফিক কান্দন হাসন জোস্নাকলির ভাবসাগরে ডুব দেয়া এক সময় কুনো দুককু আর দুককু থাকে না। গাঁজার হেকমতিটাও এইখানে। জোস্নাকলি আহা! কেন যে তার পরানডা ওইখানে বান্দা কে জানে। যাত্রাপালার নটী রে যে পরান দেছে তার জীবনের এই দশাই তো হওনের কথা। ক্যা যে সেই হানে তার পরানখান বান্দা পড়ল কে বা জানে। এই রহম যাত্রার দল তো কতই আসে ডুমুরিয়া শহরে। জোস্নাকলির দলও আসল। সাজিয়ারা বাজারের এক কোনায় পায়রার খোপের মতো ছোট ছোট ঘরে তারা থাকে। চারদিকে আবর্জনা—কালি পড়া হাঁড়ির গাদা, ছাইয়ের রাশ। দুর্গন্ধে বাতাস বিষের মতো ভারী। তার-ই মধ্যে পদ্মফুলের মতো জোস্নাকলি। ওই সময় তাদের দলের একটা বাচ্চা ছেলে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের মোড়ে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মরল। সে কী কান্না জোস্নাকলির। নেতার সাথে সেও গিয়েছিল দেখতে। জোস্নাকলির কান্না তো কান্না নয় যেন পরানখান বাইরবার দশা। নেতা কলেন, আহা মায়ের পরান। জোস্নাকলির ভরসাহারা দৃষ্টি দেখেই নেতা তার মাথায় হাত রেখে কলেন, ‘কানবেন না মা, আল্লাহর মাল আল্লায় নিছে। সেইটা বোধ হয় জোস্নাকলিকে আরো বেশি কষ্ট দিয়েছিল’। কারণ সে তো মা নয়। পরে সব জেনেছিল আজিজ। সংকোচ শঙ্কায় মাখামাখি আজিজ সেই প্রথম অনুভব করল, কী যেন একটা তোলপাড় বয়ে যাচ্ছে তার বুকের ভেতর। জোস্নাকলি বার বার তার বুকের মাদুলীটা মাথায় ঠেকাল। তখন আজিজ এও জানতে পারল, জোস্নাকলি তার আসল নাম নয়। তার আসল নাম রাধা রাণী।
জোস্নাকলির সাথে ঘনিষ্ঠতা যত বাড়তে থাকল ততই আজিজ বুঝল, এই মাটির প্রতিমার অবয়বের মধ্যে কোনো পাপ নাই। ঠোঁট দুটি থরথর করে কাঁপিয়ে সে কেবল বলত, ‘পূর্ব জন্মের পাপ খণ্ডন করছি গো’। তারপর রাতের মোহ কেটে গেলে পরক্ষণেই মনের মধ্যে কী যেন একটা কিলবিল করে উঠত। সে কী ঘৃণা? ঘৃণার কালে কেবল জিভটাকে কেটে ফেলতে মন চাইত। তারপর ঘরের দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে আজিজকে বলতে শোনা যেত, বাইর-হ ডাকিনী, হারামজাদী বেশ্যা। আবার রাত এলে যেই কে সেই। শরীর ক্ষুধার কলঙ্ক শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল। আদর-আহলাদের কালে খুব জুত্ করে জোস্নাকলি ওরফে রাধা রাণীর কাছে প্রশ্ন রেখেছিল আজিজ, ‘ঘর থোন পালায় আলি কেন ময়না’?
‘রাগ করে পলায় আলি নাকি সোনা?’ রাধা রাণী নিরুত্তর। আজিজ ব্যাকুল আগ্রহের সাথে জানতে চায়, ‘বিয়ে করিস না কেনে?’ রাধা রাণী এমন বিস্ময় নিয়ে আজিজের মুখের পানে চেয়েছিল। হায়রে সেই চাহনির মধ্যে যেন এক দুনিয়ার সমান অসহায়ত্ব আর কষ্ট... কিংবা তারও চেয়ে বেশি কিছু। দেখে আজিজের মতো ফালতু লাফাঙ্গা পাতি মাস্তানেরও বুকের মধ্যে শেল বেঁধার মতো কষ্ট শুরু হলো। এক দুনিয়ার সমস্ত নালিশ যেন ছিল সেই চাউনির মধ্যে। হায়রে! সে যে কী ব্যাখ্যাতীত চাহনি! আজো ভুলতে পারে না আজিজ। আর যখনিই রাধা রাণী কিংবা জোস্নার ওই চাহনিটুকু মগজের মধ্যে গেঁথে যায়, নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হতে থাকে তার। শুধু ওই তাকানোর ভঙ্গিটুকু গেঁথে থাকে মাথায়। এত অভিমান আজিজ এই দুনিয়ার কারো চোখে কোনোদিন দেখে নাই। সেই কথা মনে হতেই সে আরেকবার আম কাঠের পলকা টেবিলে সজোরে আঘাত করে চিত্কার করে, হারামির পুত, গোলামের পুত নেতাই আরো এক ফুল বোতল। দেখে কাশেম ভড়কে যায়। নিচু স্বরে বলে, ছাড়ান দ্যান ওস্তাদ। বিষ্টি বুধায় থামবি নে। বাড়ি যান ওস্তাদ। মৌমাছির চাক ভাঙলে মাছিগুলো যেমন মানুষকে ছেকে ধরে, কাশেমের এই আপ্ত বাক্যের পরে দুঃখ ক্ষোভ অভিমান তেমনই ছেকে ধরে আজিজকে। মনে পড়ে রাধা রাণীর হাসি। যে হাসিতে ব্যঙ্গ নাই শ্লেষ নাই এমন কি ব্যথার রেশ পর্যন্ত নাই আবার সুখের ছোঁয়া তো নাই-ই। কেমন করে এমন জগত্ সংসারের বাইরের এক হাসি হাসতে পারে লোকে!! জীবনে কতদিন পুলিশ তাকে হাজতে পুরে রেখেছে। অন্ধকার রাত্রে ছোট্ট ঘরটায় সে একা বসে রাত কাটিয়ে দিয়েছে, নেতাদের চামচাদের কারো ছাড়াতে যাবার কথা। যায় নাই। পুলিশের মারের কাতরানিতে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে... কতদিন। তো না খাওয়ার কষ্টও করেছে সে, কিন্তু রাধা রাণীর জন্য যে কষ্ট, তার ধরন আলাদা। ধরনটা সে বুঝতে চায় কিন্তু তার সামান্য মাথায় কুলায় না। আবারও তাগিদ দেয় কাশেম। উস্তাদ নিশা বন করেন, ঘটনা একটা ঘইটা গ্যাছে। কাশেম জানে এই কথাটা বলে সে ভুল করল। নেশারু মানুষেরা এমনিতেই থাকে টাল। চলমান নেশায় কথা বেশি বলার ঝোঁকটাও থেকে যায়। কিন্তু না বলে উপায় নেই। প্রথমে কাশেম ভেবেছিল ঘটনাটা সে বলবে না। কিন্তু ওস্তাদ আজকে এক্কেবারে ফিল্মী স্টাইলে পান করতাছে। সন্ধ্যা থেকে ঘটনাটা খেয়াল করে টাসকি খেয়েছে কাশেম। কারণ, আজ ভোরেই বিল ডাকাতিয়ায় জোস্নাকলি মানে রাধা রাণীর লাশটা পড়ে থাকতে দেখেছে। আর কী আচানক! আইজই ওস্তাদের নিশার বান ডাকছে। তাইলে সইত্যই ওস্তাদে জোস্নাকলিরে মহব্বত করত! কী জানি হইতেও পারে আবার না-ও পারে। কিন্তু আজিজকে সে চেনে একেবারে ন্যাংটো বেলা থেকে। মদ ধরার পর থেকে ওস্তাদে কুনোদিন এত নিশার ঝামেলায় যায় নাই। তাই মনডায় কইল একটা কোনো টান ওই যে টেলিপ্যাথি না কি কয় হেইডা আছে নাকি। ওস্তাদে যদি হোনে জোস্না রানী নাইকা। ওই কাশেমের বাচ্চা বিড় বিড় কইরে কী কইস?’ বলে আজিজ। কাশেম বোকা কিসিমের মানুষ। সে মনের ভাব কৌশলে বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারে না। এক সময় আজিজ, কাশেমের কাছ থেকে ঠিকই সব কথা বের করে ফেলে। কিন্তু আরো বেশি বিস্ময় নিয়ে কাশেম লক্ষ করে, ঘটনা শোনার পরও ওস্তাদ নীরব। বিষয়টা কী? বিষয় বোঝার জন্য কাশেমেরও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। আজিজ আজকে ভালোমতোই টাল হয়েছে। সে নিজেই গড় গড় করে বলতে থাকে, কেমন করে কী কারণে জোস্নাকলিকে সে খুন করেছে। কাশেম নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে আজিজের দিকে। তারপর কোনোরকম সামলে নিয়ে বলে, ‘আপনে ওস্তাদ?’ ‘হ আমি’ মদারু গলায় উত্তর করে আজিজ। যারে আমি পাব না, তারে কাউ কি পাতি দেব না। তা ছাড়া রাধা রাণীর বাঁইচ্যা থাকনেরই বা কাম কী ক? এই দুইন্যাত কেউ রাধা রাণীরে মান্যতা দেবে না রে কাশেম। রাধা রাণীগের জন্ম অয় বেইজ্জত হবার জন্যি। তুই কি জানিস কাশেম, পালায় নটী হওনের আগে রাধা পাড়ায় ছিল। সেই হানে তার মা হওনের রাস্তা বন করিছে। হাইওয়ের অ্যাক্সিডেন্টে যে বাচ্চাডা মরল তারে রাধা রাণী আপনার ছাওয়ালের চেয়েও বেশি পেয়ার করত। মায়ের জাত তো। মা না হইলেও মায়ের দরদটা আছে। মনটা আছে—বুঝলি কাশেম। আর এমতেও রাধার গতরে খালি মায়া আর মায়া। আচ্ছা ক দিহি কাশেম, দুইন্যাত ভালা মানুষগুলানরেই বাইছ্যা বাইছ্যা আল্লাহ এত কষ্ট দেয় ক্যা? রাধা রাণীরে কেউ মাটি চাপাও দিবার চায় না। শ্মশানেও নিবার চায় না অথচ হগলতিই হ্যার ঘরে গ্যাছে। রাত বাড়ে। আজিজের নেশাও বাড়ে। আর কতা তো আজকে তাকে পেয়েই বসেছে। কাশেম ভাবে, মানুষটা আজ আর মানুষ নাই। কী একটা কিছু একটা ভর করেছে তার ওপর। খুব খারাপ কিসিমের মানুষেরও মনের কোণে কোথাও সামান্য একটু মানুষ থাকে। সেই মানুষটা বেরিয়ে আসে নানান ঘটনায়। নানান পরিস্থিতিতে। আজিজ আবার বলে চলে, অথচ দ্যাখ কাশেম এই আমি, আমার লিডার কি যায় নাই রাধার ঘরে? তাগোর সকলেরই কিন্তু কব্বর হবে। কী রঙ্গ ক কাশেম, কী রঙ্গ!

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২৭
ফজর৪:০২
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৭
এশা৮:০৮
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :